Thread Rating:
  • 54 Vote(s) - 3.2 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
হারিয়ে যাইয়েন না
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
update chai



Quote:যুক্তি যেখানে শেষ হয়, অনুভূতির অরণ্য সেখান থেকেই শুরু।
Like Reply
অপেক্ষা.. অপেক্ষা...
কবে শেষ হবে এই অপেক্ষা?
Like Reply
opekkhay royechi



Quote:যুক্তি যেখানে শেষ হয়, অনুভূতির অরণ্য সেখান থেকেই শুরু।
Like Reply
Update?
Like Reply
উপসংহার
জীবন আসলে কী?
নদীর পাড়ে বসে জলের প্রবাহ দেখতে দেখতে প্রাচীন ঋষিরা বলতেন, জীবন হলো বয়ে চলা অনন্ত স্রোত। আবার বিজ্ঞানের অধ্যাপকেরা ব্ল্যাকবোর্ডে চকের দাগ টেনে অঙ্ক কষে বুঝিয়ে দেন, জীবন কেবল কিছু জৈবিক উপাদানের আকস্মিক রাসায়নিক বিক্রিয়া, যা যথাসময়ে নিভে গিয়ে শীতল জড়পদার্থে রূপ নেবে। তবে মধ্যবিত্তের যাপিত জীবনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার নিজস্ব কিছু দর্শন তৈরি হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়, জীবন আসলে স্মৃতির এক অদ্ভুত ভাঁড়ার ঘর। সেখানে পুরোনো কিছু তীব্র হাহাকার সাজানো থাকে, কিছু মিঠে রোদ জমে থাকে, আর থাকে কিছু নিষিদ্ধ স্বপ্নের কঙ্কাল।
সময়ও বড় নিষ্ঠুর কারিগর। সময়ের গতিপথ মানুষের মর্জিমতো চলে না। যখন কোনো মানুষের জীবনে তীব্র প্রেমের জ্বর আসে, তখন দিনের পর দিনগুলো যেন পলকের নিঃশ্বাসে হারিয়ে যায়। পক্ষান্তরে, বিরহের দিনগুলোতে প্রতিটি প্রহর হয়ে ওঠে শতবর্ষের মতো দীর্ঘ।
আজ ক্যালেন্ডারের পাতায় আগস্ট মাসের মধ্যভাগ। বর্ষার ভারী বর্ষণ শেষে প্রকৃতিতে এখন সোনালি রোদের খেলা। আজ থেকে ঠিক তিন বছর পূর্বেও এমনই আগস্টের মেঘমেদুর দিন ছিল।
সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো মনের গহীনে আজও জীবন্ত ভাস্কর্যের মতো জ্বলজ্বল করে। আনিকা নাওহারের জুলাইয়ের শেষ ভাগে লন্ডনে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিয়তির নিয়ম বড় অদ্ভুত। টিকিট বাতিল করে, সমস্ত কাজ পিছিয়ে দিয়ে উনি আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ধানমন্ডির সেই ষোলো তলা ভবনের ফ্ল্যাটে রয়ে গিয়েছিলেন। ওই অতিরিক্ত দিনগুলোতে আমরা দুজন যেন পৃথিবীর সমস্ত মায়াকে আষ্টেপৃষ্টে আঁকড়ে ধরেছিলাম। সেখানে কোনো ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি ছিল না, কোনো স্থায়ী নীড়ের আশ্বাস ছিল না; ছিল কেবল ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তের তীব্র তৃষ্ণা। উনি যখন শেষবারের মতো উবার গাড়িতে উঠে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে রওনা হলেন, তখন গাড়ির কাঁচের ওপারে উনার চোখজোড়া ছলছল করছিল। গাড়িটা দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার পর ঢাকা শহরের বিষাক্ত বাতাসে আমার মনে হয়েছিল, আমার বুকের ভেতরকার সবটুকু বাতাস কেউ বুঝি নিঃশেষে শুষে নিয়ে গেছে।
তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ তিনটি বছর। ছত্রিশটি মাস।
আমি আর সেই পুরোনো রাশেদ আহমেদ নেই। কারওয়ান বাজারের অনলাইন সংবাদপত্রের আন্তর্জাতিক ডেস্কে আমার পদোন্নতি হয়েছে। বেতন এখন আগের চেয়ে সম্মানজনক। মেসের সেই ছোট দমবন্ধ কুঠুরি ছেড়ে আমি মিরপুরের দিকে অপেক্ষাকৃত খোলামেলা জায়গায় উঠেছি। বাবার মুদি দোকানে কিছু মূলধন বাড়িয়ে দিয়েছি, ছোট ভাই নিহাদ এখন কলেজে পড়াশোনা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছে। আমার সঞ্চয়ের খাতায় বাবা-মাকে নিয়ে পবিত্র ভূমিতে পাঠানোর মতো অর্থও ধীরে ধীরে জমা হতে শুরু করেছে।
দৃশ্যপট: নওগাঁর পারিবারিক আবহে বিবাহ বাসর
স্থানটি হলো আমার নিজ জেলা নওগাঁর সদর থেকে খানিকটা দূরে, আমাদের পৈতৃক ভিটা।
চারপাশে শান্ত, শ্যামল পল্লীপ্রকৃতি। বাড়ির উঠোনজুড়ে টানানো হয়েছে লাল, নীল আর সাদা কাপড়ের বিশাল শামিয়ানা। উঠোনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন আমগাছগুলোর ডালে রঙিন কাগজের শিকল ঝুলছে, যা ভাদ্রের বাতাসে মৃদু দুলছে। মাটির সোঁদা গন্ধের সাথে মিশে গেছে খাঁটি গাওয়া ঘিয়ে রান্না হওয়া কাচ্চি বিরিয়ানির সুবাস, জাফরানের মিষ্টি ঘ্রাণ আর ধূপের ধোঁয়া। উঠোনের এক কোণায় বসানো নলকূপের চারপাশে গ্রামের মহিলারা সমবেত হয়ে হাসাহাসি করছেন, কেউ পান বাটছেন, কেউবা বড় বড় গামলায় মিষ্টি সাজাচ্ছেন। দূরপাল্লার সাউন্ডবক্সে বাজছে সানাইয়ের সুর। সেই সুর বাতাসের বুকে এক মিশ্র অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে— আনন্দ আর বিষাদের যুগলবন্দি।
আমার পিতা আজ ভোরে উঠেই সুতির ধবধবে পাঞ্জাবি পরে মহাব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। উনার চেহারায় বহু বছর পর পরম তৃপ্তির আভা। সারা জীবন মুদির দোকানে চাল-ডাল মেপে মেপে যে মানুষটি কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে রাখতেন, আজ তিনি আত্মীয়স্বজনদের আপ্যায়ন করতে করতে গর্বে বুক ফুলিয়ে হাঁটছেন। আমার মা লাল পাড়ের শাড়ি পরে কখনো রান্নাঘরে ছুটছেন, কখনো বরযাত্রীদের ঘরে এসে শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিচ্ছেন। উনার চোখদুটো বারবার আনন্দে ভিজে উঠছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে বড় ছেলের বিয়ে কেবল দুজন মানুষের মিলন নয়, তাদের কাছে এটি বংশের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মহোৎসব।
আমি বসে আছি আমাদের চুনকাম করা পুরোনো দালানঘরের বৈঠকখানায়।
ঘরের মেঝেজুড়ে বিছানো হয়েছে শীতলপাটি, তার ওপর সুতির সাদা চাদর। দেওয়ালে কাঠের ফ্রেমের পুরোনো আয়না, যেখানে দেখা যাচ্ছে আমার সম্পূর্ণ অচেনা প্রতিচ্ছবি। ঘরের কোণায় রাখা কাঁঠাল কাঠের ভারী আলমারি, যার ওপর ফুলদানিতে সাজানো হয়েছে তাজা রজনীগন্ধার তোড়া। রজনীগন্ধার তীব্র, মিষ্টি ঘ্রাণ পুরো ঘরের বাতাসকে ভারী করে রেখেছে।
আমার পরনে আজ রাজকীয় তসরের সিল্কের পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির বুকে এবং কলারে সুতোর নিপুণ কাজ করা। গায়ের রং বাদামি তসরের কাপড়ে বেশ মানিয়েছে। নিচে পরা হয়েছে ঘি রঙের জরিপাড় দেওয়া ধুতি, যা বেশ কায়দা করে কোঁচানো। পায়ে রয়েছে গাঢ় খয়েরি রঙের ভেলভেটের নাগরা জুতো। কাঁধের ওপর আলতো করে জড়ানো মেরুন রঙের জরির কারুকাজ করা উত্তরীয়। আয়নায় তাকিয়ে নিজের চিবুকের পরিপাটি ছাঁটা দাড়ি আর শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, সময় মানুষকে সত্যিই বদলে দেয়। আজ আমার চোখের দৃষ্টিতে সেই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের বন্য, অতৃপ্ত নেকড়ের মতো চাহনি নেই। সেখানে আজ বিরাজ করছে সামাজিক দায়িত্ববোধে স্থির এক পুরুষের নীরব সংকল্প।
আমার বন্ধুরা আমাকে ঘিরে বসে আছে। হাসাহাসি চলছে, মিষ্টি খাওয়ানোর ধুম পড়েছে। কিন্তু আমার ভেতরের মনস্তত্ত্ব এক অদ্ভুত রূপালী পর্দায় অতীতের ছায়াছবি দেখতে ব্যস্ত।
________________________________________
পাত্রীর পরিচিতি ও রূপের বিবরণ
আমার বিবাহ হচ্ছে আমাদের গ্রাম থেকে চার-পাঁচ গ্রাম দূরের এক সম্ভ্রান্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের কন্যার সাথে।
মেয়ের নাম সুমনা।
সুমনার পিতা গ্রামের হাইকলেজের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। অত্যন্ত নীতিবান, স্বল্পভাষী এবং সম্মানিত মানুষ। উনাদের পরিবারটি ঠিক আমাদের মতোই— মধ্যবিত্তের চিরায়ত নীতিবোধ, অল্পে তুষ্ট থাকার স্বভাব আর ধর্মীয় মূল্যবোধে গড়া। সুমনা স্থানীয় সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক সম্পন্ন করেছে। গৃহকর্মে নিপুণ, বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং শান্ত স্বভাবের মেয়ে হিসেবে এলাকায় তার বেশ সুনাম।
আমি সুমনাকে প্রথমবার দেখতে গিয়েছিলাম মাস তিনেক পূর্বে, পারিবারিকভাবে। সেদিন সুমনা কাঠের ট্রেতে করে মিষ্টি আর চায়ের কাপ নিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করেছিল। তার হাঁটার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল গ্রামবাংলার তরুণীদের সহজাত লাজুকতা।
আজ সুমনা বসে আছে পাশের গ্রামের এক সুসজ্জিত বাসরকক্ষে। কিছুক্ষণ বাদেই বরযাত্রী সমেত আমি সেখানে উপস্থিত হব।
সুমনার আজকের রূপের বর্ণনা আমার কানে এসেছে আমার ফুফাতো বোনদের মাধ্যমে। সুমনা পরেছে গাঢ় লাল রঙের কাতান বেনারসি শাড়ি। শাড়িজুড়ে খাঁটি সোনালি জরির সুক্ষ্ম লতাপাতার নকশা। সেই ঐতিহ্যবাহী লাল বেনারসির আঁচল তার মাথা ঢেকে রেখেছে। তার কপালে চন্দনের ছোট ছোট ফোঁটার অলংকরণ, সীমন্তে চিকন সিঁদুরের রেখা। চোখে কাজলের গভীর রেখা, নাকে নোলক আর কানে দুলছে ভারী স্বর্ণের ঝুমকো। গলায় সোনার পাটিহার।
সুমনার শারীরিক সৌন্দর্য আনিকার মতো কোনো হলিউডি লাস্যময়ী বা বন্য প্রকৃতির নয়। তার শরীর কোনো গ্রিক ভাস্কর্যের মতো উদ্দাম জ্যামিতিতে গড়া নয়। পক্ষান্তরে, সুমনার মাঝে রয়েছে শ্যামল মাটির মতো এক স্নিগ্ধ, ভরাট এবং পবিত্র রূপ। তার মুখমণ্ডলে এক অদ্ভুত সরলতা রয়েছে, যা দেখলে মনে কোনো কামনার দাবানল জ্বলে ওঠে না, মনে জাগে পরম আশ্রয়ের তৃপ্তি। তার ফর্সা-শ্যামলা ত্বকে মেকআপের আতিশয্য নেই, আছে কেবল বিয়ের কনের স্বভাবজাত রক্তিম আভা।
________________________________________
অতীত ও বর্তমানের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব
বৈঠকখানায় বসে যখন আমি নাগরা জুতো জোড়া ঠিক করছিলাম, তখন আনিকা নাওহারের মুখখানা আমার স্মৃতির জানালায় হঠাৎ উঁকি দিল।
কী অদ্ভুত বৈপরীত্য!
তিন বছর পূর্বে এই আগস্ট মাসেই আমি ছিলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতের বাসিন্দা। সেই জগৎ ছিল ষোলো তলার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ফ্ল্যাট, দামি ফরাসি পারফিউমের ঘ্রাণ, কিং-সাইজ বিছানার নরম তোশক, আর বিলাসী সাটিনের স্লিপিং গাউন পরা এক নারী। সেখানে ছিল ব্ল্যাক লেবেল হুইস্কির তিতকুটে স্বাদ, ব্ল্যাক লেসের অন্তর্বাস, আর মধ্যরাতের উদ্দাম আর্তনাদ। সেখানে প্রেম ছিল আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত লাভার মতো, যা সমস্ত সমাজ, সমস্ত সংস্কারকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে চেয়েছিল।
আর আজ?
আজ আমার চারপাশের বাতাসে উড়ছে খাঁটি সর্ষের তেলের রান্নার ঘ্রাণ, আতরের মিষ্টি সুবাস আর গাঁদা ফুলের মালা। আজ আমার সামনে কোনো নিষিদ্ধ রাতের হাতছানি নেই। আজ আমার সামনে রয়েছে সারাজীবনের সামাজিক বৈধতা, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর তৃপ্তি আর এক পবিত্র বন্ধনের অঙ্গীকার।
আনিকা আমাকে সেই গুলশানের রেস্তোরাঁয় বসে লন্ডনের বিলাসবহুল জীবনের হাতছানি দিয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন, "আমার সাথে লন্ডনে চলো রাশেদ। আমি তোমার সমস্ত দায়িত্ব নেব।"
আজ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আমার মনে হচ্ছে, সেদিন উনার সেই কোটি টাকার বিলাসী প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে আমি কোনো ভুল করিনি। সেদিন যদি আমি লোভে পড়ে লন্ডনের বিমানে চড়ে বসতাম, তবে হয়তো আজ আমি টেমস নদীর পাড়ে কোনো বিশাল অট্টালিকায় বাস করতাম। কিন্তু সেখানে আমার নিজস্ব কোনো পরিচয় থাকত না। আমি হতাম এক ধনবতী প্রবাসীর আশ্রিত ছায়া। সেখানে বাবার এই গর্বিত মুখের হাসি থাকত না, মায়ের এই খুশির চোখের জল থাকত না। মধ্যবিত্তের আত্মসম্মানবোধের যে তীব্র অহংকার, তা হয়তো বিদেশের মাটিতে চিরতরে হারিয়ে যেত।
প্রেমের সংজ্ঞাও তো বয়সের সাথে সাথে পাল্টে যায়। উনত্রিশ বছর বয়সে আমার কাছে ভালোবাসা মানে ছিল শুধুই শরীর, শুধুই বুনো আকর্ষণ আর মধ্যরাতের মিলন। আজ বত্রিশ বছর বয়সে এসে আমি বুঝতে পারছি, ভালোবাসা কেবল বিছানার ওপর শেষ হয়ে যায় না। ভালোবাসা মানে হলো দুজন মানুষের পাশাপাশি বসে শান্তভাবে জীবনের বাকি পথটুকু পাড়ি দেওয়ার সাহস। ভালোবাসা মানে হলো অসুস্থ হলে মাথায় হাত রাখা, সংসারের ছোটখাটো আনন্দ-বেদনা ভাগাভাগি করা, আর দিন শেষে নিজের আপন নীড়ে ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা।
আনিকা ছিলেন আমার জীবনের বৈশাখী ঝড়। যে ঝড় সমস্ত গাছপালাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে এক মহাপ্রলয়ের সৃষ্টি করে। সেই ঝড়ের একটা নিজস্ব ভয়ংকর সৌন্দর্য থাকে, যা মানুষকে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ করে দেয়। কিন্তু মানুষ ঝড়ের ভেতর সারা জীবন ঘর বেঁধে বাস করতে পারে না। ঝড় থামার পর মানুষকে আবার মাটির ওপরেই নতুন করে কুঁড়েঘর তুলতে হয়।
সুমনা হলো সেই শান্ত, শীতল বৃষ্টি, যা তপ্ত মাটিকে জুড়িয়ে দেয়, ফসলের মাঠে সোনালি ধানের জন্ম দেয়।
________________________________________
বিবাহ লগ্ন ও পবিত্র অঙ্গীকার
সন্ধ্যা নামার মুখে আমাদের বরযাত্রীর গাড়িবহর রওনা হলো সুমনাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
গ্রামের মেঠোপথ ধরে মাইক্রোবাসগুলো ধীরগতিতে এগোচ্ছে। রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ ধানের ক্ষেত বাতাসে দোলা খাচ্ছে। দূরে বাঁশঝাড়ের পেছনে সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে এক রক্তিম আভা ছড়িয়ে।
সুমনাদের বাড়িতে পৌঁছানোর পর শুরু হলো চিরাচরিত গ্রামীণ আনুষ্ঠানিকতা। গেট আটকে শালীদের দুষ্টুমি, বরের পথ আটকে টাকা দাবি, আর মুরুব্বিদের হাসিমুখের দরকষাকষি। আমার বন্ধুরা আমাকে নিয়ে রসিকতা করছে, আর আমি মুখে এক চিলতে হাসি ধরে রেখে সব কিছু নীরবে উপভোগ করছি।
বিয়ের আসরে আমাকে বসানো হলো সুসজ্জিত এক মঞ্চে।
সামনে কাজি সাহেব বসে আছেন উনার বিশাল বাঁধানো রেজিস্ট্রি খাতা নিয়ে। সাথে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। কাজি সাহেব গম্ভীর গলায় দেনমোহর, শর্তাবলী এবং ধর্মীয় বিধানগুলো পড়ে শোনালেন।
"রাশেদ আহমেদ, আপনি কি তিন লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করিয়া, উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে, সুমনা খাতুনকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করিতে সম্মত আছেন?"
আমার বুকের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য যেন পুরো মহাবিশ্ব স্তব্ধ হয়ে গেল।
আমার চোখের সামনে শেষবারের মতো ভেসে উঠল ধানমন্ডির সেই বৃষ্টিভেজা কাঁচের জানালা, লঞ্চের সেই ভিআইপি কেবিনের অন্ধকার, আর আনিকার সেই বিষাদমাখা বাদামি চোখজোড়া।
বিদায় আনিকা নাওহার। বিদায় আমার যৌবনের সেই বন্য, নিষিদ্ধ বসন্ত।
আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। আমার কণ্ঠস্বর বৈঠকখানার পিনপতন নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়ে খুব স্পষ্ট, দৃঢ় এবং শান্তভাবে প্রতিধ্বনিত হলো—
"আলহামদুলিল্লাহ। কবুল।"
চারপাশ থেকে সমস্বরে দোয়া উচ্চারিত হলো। বাবার হাতটা এসে আমার কাঁধের ওপর পরম স্নেহে চেপে বসল। আমি মুখ তুলে দেখলাম, আমার বৃদ্ধ বাবার চোখে তখন আনন্দাশ্রু।
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে, খাওয়া-দাওয়ার পর্ব চুকিয়ে গভীর রাতে নতুন বধূকে নিয়ে আমরা ফিরে এলাম আমাদের বাড়িতে।
________________________________________
বাসর রাতের রূপরেখা ও নব সূচনা
রাত তখন প্রায় আড়াইটা।
পুরো বাড়ি শান্ত হয়ে গেছে। দূর থেকে ডেকে উঠছে নিশাচর পাখিরা। উঠোনের শামিয়ানা নিভে গেছে, শুধু বারান্দার হ্যারিকেনটা টিমটিম করে জ্বলছে।
আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম আমাদের সুসজ্জিত বাসরঘরের দিকে।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নাকে এসে লাগল রজনীগন্ধা, বেলি আর গোলাপের মিশ্রিত এক মাতাল করা প্রাকৃতিক সুবাস। পুরো খাটজুড়ে ফুলের জাল বিছানো হয়েছে। মেঝের কার্পেটের ওপর ছড়ানো রয়েছে তাজা গোলাপের পাপড়ি। ঘরের এক কোণায় পিতলের পিলসুজে জ্বলছে সুগন্ধি মোমবাতি।
বিছানার ঠিক মাঝখানে, লাল বেনারসির ঘোমটা টেনে মাথা নিচু করে বসে আছে সুমনা। তার শরীরটা লাজুক কাঁপনে সামান্য থরথর করছে।
আমি ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে সাবধানে আটকে দিলাম।
লক হওয়ার সেই শব্দটা আমার কানে বাজল। কিন্তু আজ আর কোনো অপরাধবোধ নেই, কোনো পুলিশের ভয় নেই, কোনো গোপন কলঙ্কের শঙ্কা নেই। আজ এই চার দেয়ালের ভেতর যা ঘটবে, তা সমাজের চোখে, ধর্মের চোখে এবং আইনের চোখে সম্পূর্ণ পবিত্র।
আমি খুব ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানার এক প্রান্তে বসলাম।
বিছানার তোশকটা মৃদু দেবে গেল। সুমনা আরও একটু আড়ষ্ট হয়ে ঘোমটা টেনে নিজের মুখ লুকানোর চেষ্টা করল।
আমি আমার হাতখানা বাড়িয়ে দিলাম। খুব আলতো করে, পরম মমতায় আমি সুমনার সেই লাল বেনারসির ঘোমটাখানা ওপরের দিকে তুলে ধরলাম।
মোমবাতির নরম আলোয় আমার নবপরিণীতা স্ত্রীর মুখমণ্ডলটি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কপালে চন্দনের ফোঁটা, রক্তিম ঠোঁটে মিষ্টি এক ভীরু কম্পন, আর ডাগর ডাগর চোখদুটো লজ্জায় মেঝের দিকে নিবদ্ধ। এই মুখে কোনো কৃত্রিম আভিজাত্যের অহংকার নেই, কোনো জটিল মানসিক বিকারের অন্ধকার নেই। এখানে আছে শুধু এক সাধারণ বাঙালি নারীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পবিত্র রূপ।
আমি উনার ফর্সা, কোমল চিবুকটি আমার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে আলতো করে একটু উঁচিয়ে ধরলাম।
সুমনা চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো আগুনের শিখা নেই, সেখানে রয়েছে এক প্রশান্ত দিঘির শীতল জল।
আমি হাসলাম। আমার জীবনের সমস্ত অস্থিরতা, সমস্ত ট্রমা আর সমস্ত অনিশ্চয়তা যেন ওই চোখের দিঘিতে এক নিমেষে বিলীন হয়ে গেল।
"কেমন আছ সুমনা?" আমি খুব কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলাম।
সুমনা কোনো জবাব দিল না। সে শুধু তার লাল মেহেদি রাঙানো নরম হাতখানা আমার হাতের তালুর ওপর সমর্পণ করে দিয়ে লজ্জায় আমার বুকের ওপর মাথা এলিয়ে দিল।
আমি ওকে আমার দুই বাহুর পরম আশ্রয়ে জড়িয়ে নিলাম।
বাইরে তখন ভোরের আগমনী বার্তা নিয়ে বাতাস বইতে শুরু করেছে।
Like Reply
Mind blowing
Like Reply
Jah ses hote jai tahole... Osonkho dhonnobad lekhok কে ai golpo ta somaptir pothe niye jabar jonnno... Carry on
[+] 1 user Likes Slayer@@'s post
Like Reply
অবশেষে শেষ হলো।
ধন্যবাদ।
Like Reply
চমৎকার সমাপ্তি। গল্পটার একটি সুন্দর পরিসমাপ্তির জন্য ধন্যবাদ। আশায় থাকলাম আপনার থেকে আরো একটি সুন্দর গল্পের জন্য। তবে এবার অনুরোধ থাকল যেন গল্পের নায়িকা যেন নায়ক থেকে বেশি বয়সের না হয়ে সম বা কাছাকাছি বয়সের যেন আমরা একটি নতুন ধরনের গল্পের স্বাদ পাই।
Like Reply
JUST AWESOME....
"Dare to dive deep into the adult realm!"
[size=medium]



Like Reply
বিদায় আনিকা নাওহার। তুমি এসেছিলে আমার ব্যক্তিগত frustration এর দিনে। গভীর রাতে জোনাকি যেমন সামান্য আলো বয়ে বেড়ায় তেমনি তুমি আর তোমার ৩৬-২৮-৩৬ এর দৈহিক জ্যামিতি নিয়ে হুট করেই আমার মনে জায়গা করে নিলে। অনুবাদক রাশেদ যখন তোমার শরীরের প্রতিটা কোষ থেকে উত্তাপ গ্রহণ করেছে তখন আমার মতো অসংখ্য পাঠক তোমার কল্পনায় নিজেদের পেয়েছে উত্তেজনার শিখরে। সত্যিই তোমার আভিজাত্যের প্রতি আমি আকর্ষিত হয়েছি, তোমার সৌন্দর্যের কল্পনার মগ্ন হয়েছি। ধন্যবাদ লেখক সাহেবকে উপভোগ্য গল্পটির পরিসমাপ্তি ঘটানোর জন্য। দারুণ উপভোগ করেছি গল্পটি। তবে একটু মনোক্ষুণ্ণ ও হয়েছি বটে আপনার আপডেটের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে। লেখক সাহেবের জন্য শুভকামনা। আশা করছি দ্রুত নতুন কোনো গল্প নিয়ে আসবেন। আর "মৌসুমি আমাদের ব্যক্তিগত মালেনা" এই গল্পটারো আপডেট দেবেন আশা রাখছি। ধন্যবাদ।
[+] 2 users Like Rain forest passer's post
Like Reply
VAlo laglo
Like Reply
মাস্টার ক্লাস লেখনী। বরাবরের মতোই অসাধারণ
Like Reply
৫ স্টার রেটিং
Like Reply




Users browsing this thread: John Abraham, 2 Guest(s)