Thread Rating:
  • 5 Vote(s) - 4.2 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
#1
Video 
‘দি কাউ ইজ আ ভেরি ইউজফুল অ্যানিমেল। বাট ইন মাই কান্ট্রি, ট্রাফিক জ্যাম ইজ মোর ইউজফুল। বিকজ ইট টিচেস আস পেশেন্স...’
সকাল সাতটায় আমার ঘুম ভাঙল এই অদ্ভুত ইংরেজি শুনে। কণ্ঠস্বরটা তুহিনের। সে আমার পাশের রুমেই থাকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে এখন খুব সম্ভবত হাত-পা নেড়ে আইইএলটিএস (IELTS)-এর স্পিকিং টেস্টের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে যুক্তরাজ্যে যাবে। সে জন্য সে গরুর রচনার সাথে ট্রাফিক জ্যাম মিশিয়ে এক অভিনব দর্শনের জন্ম দিচ্ছে।
আমি বিছানায় উঠে বসলাম।
মেস বলতে সাধারণত মানুষের চোখে যে ছবিটা ভাসে— ঘিঞ্জি একটা ঘর, দড়িতে লুঙ্গি ঝুলছে, ছারপোকা মারা তোশক আর ডাইনিং টেবিলে তরকারির হলুদ দাগ— আমাদের বাসাটা ঠিক তেমন না। মিরপুরের এই বাসাটায় চারটা রুম। আমরা চারজন ব্যাচেলর থাকি। ভাড়া বিশ হাজার। প্রত্যেকে পাঁচ হাজার করে দিই। এর বাইরে বিদ্যুৎ, পানি আর গ্যাসের বিল ভাগাভাগি হয়।
আমাদের খাওয়া-দাওয়ার সিস্টেমটাও একটু অন্যরকম। মেসে সাধারণত দুই বেলা মিল থাকে, আমাদের এখানে তা নেই। দুপুরে আমরা সবাই যার যার অফিস বা কাজে বাইরে থাকি, তাই দুপুরের খাবারের কোনো ঝামেলা নেই। রহিমা খালা নামের একজন বয়স্ক মহিলা সন্ধ্যাবেলা আসেন। শুধু রাতের রান্নাটা করে দিয়ে চলে যান।
আমরা চারজনের মধ্যে তিনজনই ছোটখাটো চাকরি করি। শুধু তুহিন কিছু করে না। তার কাজ হলো সারাদিন ইংলিশ মুভি দেখা আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজদের মতো উচ্চারণ করার বৃথা চেষ্টা করা। ওর বাবা-মা গ্রাম থেকে টাকা পাঠান, সেই টাকায় তার দিব্যি চলে যায়।
আমি খাট থেকে নেমে মুখ ধুতে গেলাম। তুহিনের রুমের দরজা খোলা। আমাকে দেখতে পেয়েই সে চওড়া হাসি দিল।
‘ব্রাদার রাশেদ, গুড মর্নিং! হাউ ইজ দ্য ওয়েদার টুডে?’
আমি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললাম, ‘ওয়েদার ভালো। তবে তুমি গরুর রচনার সাথে ট্রাফিক জ্যাম কেন মেলাচ্ছ, সেটা বুঝতে পারছি না। এক্সামিনার যদি জিজ্ঞেস করে তোমার প্রিয় প্রাণী কী, তুমি কি বলবে ট্রাফিক জ্যাম?’ তুহিন একটুও দমল না। ‘ভাই, আপনি বুঝবেন না। আইইএলটিএস-এ লজিক দেখে না, দেখে ফ্লুয়েন্সি। আপনি কত কনফিডেন্টলি গাঁজাখুরি কথা ইংরেজিতে বলতে পারেন, সেটাই হলো মেইন ফ্যাক্ট।’
কথা মন্দ বলেনি। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই তো এই থিওরিতে চলছে। কে কত কনফিডেন্টলি মিথ্যা বলতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করে তার সফলতা।


আমি নিজের রুমে ফিরে এলাম। আমার রুমটা বেশ ছিমছাম। এক পাশে একটা সিঙ্গল খাট, আরেক পাশে ছোট একটা পড়ার টেবিল। টেবিলের ওপর কয়েকটা ডিকশনারি, ল্যাপটপ আর ছড়ানো ছিটানো কিছু কাগজ।

টেবিলের ওপর রাখা আমার মানিব্যাগটার দিকে চোখ পড়ল। মাসের দশ তারিখ পেরিয়েছে। পকেটের অবস্থা ধীরে ধীরে হালকা হতে শুরু করেছে। আমার অফিস থেকে বেতন দেয় পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। এই পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। এরা মাসের এক তারিখে দলবেঁধে আমার অ্যাকাউন্টে ঢোকে, আর দশ তারিখের ভেতর এরা হাওয়া হয়ে যায়।

মিরপুরে এই চার রুমের ফ্লাটের একটা রুমের ভাড়া, রহিমা খালার বেতন, বাজারের টাকা, অফিসে যাওয়া-আসা, দুপুরের খাওয়া আর আমার দৈনিক এক প্যাকেট সিগারেটের খরচ মিলিয়ে পঁচিশ হাজার টাকা কীভাবে যেন উড়ে যায়। বাকি থাকে দশ হাজার। এই দশ হাজার টাকা আমি অত্যন্ত পবিত্র মনে করে মাসের শুরুতে নওগাঁয় বাবার কাছে পাঠিয়ে দিই।

আমি নওগাঁর ছেলে। পড়াশোনা করেছি নওগাঁ জিলা কলেজে। আহামরি কোনো ছাত্র ছিলাম না। ক্লাসের ফার্স্ট বয় বা সেকেন্ড বয় টাইপ ছেলেদের আমার সবসময় ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হতো। আমি ছিলাম মাঝামাঝি গোত্রের। তবে আমার একটা অদ্ভুত শখ ছিল। বই পড়া আর সিনেমা দেখা। লুকিয়ে লুকিয়ে সেবা প্রকাশনীর বই পড়া আর সুযোগ পেলেই হলে গিয়ে সিনেমা দেখা।
জিলা কলেজ থেকে পাস করে নওগাঁ কলেজে ভর্তি হলাম। সেখানেও পড়াশোনার একই ধারা। কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় টিকে গেলাম। শুধু টিকেই গেলাম না, সাবজেক্ট পেয়ে গেলাম জার্নালিজম!

আমার বাবা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তার ধারণা হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজম পড়া মানেই পাস করে বের হওয়ার সাথে সাথে আমি টেলিভিশনের পর্দায় বুম হাতে দাঁড়িয়ে যাব। সারা দেশের মানুষ আমাকে দেখবে।

বাস্তবতা যে কতটা ভিন্ন, তা আমি ঢাকায় এসে বুঝেছি। জার্নালিজম পাস করে আমি এখন কাজ করি ‘ঢাকা পেপারস’ নামের একটা অনলাইন পোর্টালে। সেখানে আমি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে বসে বিদেশি খবর বাংলায় অনুবাদ করি। সোজা কথায়, আমি একজন অনুবাদক। টেলিভিশনের পর্দায় আমাকে কেউ দেখে না। আমার নামের বাইলাইনটাও খবরের একদম নিচে এমন ছোট করে দেওয়া থাকে যে, আতশ কাঁচ দিয়ে খুঁজতে হয়।

তবুও বাবা খুশি। তিনি গ্রামের ভুসিমালের দোকানে বসে চা খেতে খেতে এলাকার লোকদের বলেন, ‘আমার বড় ছেলে ঢাকা পেপারসে আন্তর্জাতিক খবর সামলায়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কী পলিসি নিল, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কোথায় বোমা মারল— সব আমার ছেলের হাত দিয়ে পাস হয়ে দেশে ছড়ায়।’

বাবার এই আনন্দটুকুর জন্যই আমি মাসের শুরুতে দশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিই।

ল্যাপটপটা অন করতেই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকালাম। মায়ের কল।

সকালবেলা মায়ের ফোন আসা মানেই কোনো না কোনো দুঃসংবাদ। সুসংবাদ দেওয়ার জন্য মায়েরা সাধারণত দুপুরবেলা বেছে নেন। আমি ফোন ধরলাম, ‘হ্যালো মা, বলো।’ মায়ের গলা কাঁপছে। ‘রাশেদ, তুই কি অফিসে যাস?’
‘না, মাত্র উঠলাম। কী হয়েছে? বাবা ঠিক আছে তো?’
‘তোর বাপ ঠিক আছে। কিন্তু তোর ছোট ভাই নিহাদ তো একটা কাণ্ড করে বসছে।’

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। নিহাদ, আমার ছোট ভাই। আমার চেয়ে ৬ বছরের ছোট। খুব উড়নচণ্ডী। পড়াশোনায় একদম মন নেই। আমি বললাম, ‘কী কাণ্ড? আবার কারও সাথে মারামারি করেছে?’


‘মারামারি না। কাল রাতে বন্ধুদের সাথে কার যেন একটা মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে গেছিল। রাস্তায় স্লিপ কেটে পড়ে বাইকের সামনের অংশ পুরা ভাইঙ্গা ফেলছে। যার বাইক, সে এখন ক্ষতিপূরণ চায়।’

‘ক্ষতিপূরণ কত চায়?’

‘দশ হাজার টাকা। তোর বাপ তো শুনেই রেগে আগুন। বলছে, সে এক টাকাও দেবে না। ছেলে জেলে গেলে যাক। কিন্তু আমি তো মা, আমি ক্যামনে সহ্য করি বল? লোকটা আজ সকালেও আইসা দোকানের সামনে চিল্লাচিল্লি করছে।’

আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘মা, তুমি বাবাকে কিছু বোলো না। আমি দেখছি। নিহাদকে একটু সাবধানে থাকতে বোলো। ঢাকা শহর হলে কথা ছিল, নওগাঁর মতো জায়গায় এত স্পিডে বাইক চালানোর কী আছে?’

মা একটু আশ্বস্ত হলেন। ‘তুই টাকা পাঠাবি?’
‘হ্যাঁ, পাঠাব। তুমি টেনশন কোরো না।’

ফোন রেখে আমি আমার ল্যাপটপের এক্সেল শিটটা খুললাম। সেখানে আমার সেভিংসের একটা হিসাব রাখা আছে।

আমার আয়ের আরেকটা উৎস আছে। আমি ‘চন্দ্রবিন্দু’ নামের একটা প্রকাশনীতে পার্ট-টাইম প্রুফ রিডারের কাজ করি। অন্যের লেখা ভুল বানানের পাণ্ডুলিপি লাল কালি দিয়ে শুদ্ধ করা। কাজটা বিরক্তিকর হলেও আমি মনোযোগ দিয়ে করি। তাছাড়া বাজারে আমার নিজের অনুবাদ করা দুটো বই আছে। বই দুটো মোটামুটি চলে। এদেশে অনুবাদকের খুব একটা দাম নেই, তবে মাস শেষে কিছু রয়্যালটি আসে।

প্রুফ দেখা আর বইয়ের রয়্যালটি মিলিয়ে প্রকাশনী থেকে আমার মাসে হাজার দশেক টাকা আসে। এই টাকাটা আমি কখনো ছুঁয়েও দেখি না। এটা সোজা আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে চলে যায়।

বাবার একটা স্বপ্ন ছিল, জীবনে একবার হজ করবেন। কিন্তু ভুসিমালের দোকান চালিয়ে সংসার চালানোর পর হজের টাকা জমানো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমার স্বপ্ন, বাবাকে হজ না হোক, অন্তত উমরাহটা করাব। মাকেও সাথে পাঠাব।

আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, দুজনের উমরাহ প্যাকেজে প্রায় তিন লাখ টাকার মতো লাগবে। আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে গতকাল পর্যন্ত জমা ছিল এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা।

আমি এক্সেল শিটে এক লাখ চল্লিশ হাজার থেকে দশ হাজার বিয়োগ করলাম। সংখ্যাটা নেমে এলো এক লাখ ত্রিশ হাজারে। আমার স্বপ্নটা আরও কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে গেল।

হিসাবটা মেলাতেই আমার মনটা খারাপ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলো না। আমার মনে এক ধরনের অদ্ভুত নির্লিপ্ততা কাজ করে। যেকোনো পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আমার আছে। আমি জানি, জীবনে দুই আর দুইয়ে সবসময় চার হয় না। মাঝে মাঝে বাইশও হয়ে যায়, আবার শূন্যও হয়ে যায়।

আমি শার্ট গায়ে দিয়ে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম।

মিরপুর দশ নাম্বার থেকে কারওয়ান বাজার যাওয়ার বাস ধরতে হবে। আমার অফিসের শিফট শুরু হয় সকাল দশটায়। দশ নাম্বারের গোলচত্বরে এসে দাঁড়ালে মনে হয়, ঢাকা শহরে মানুষের চেয়ে বাসের সংখ্যা বেশি, আবার বাসে ওঠার সময় মনে হয় বাসের চেয়ে মানুষের সংখ্যা বেশি। এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা।

একটা ‘বিকল্প অটো’ বাস এসে দাঁড়াল। আমি ভিড় ঠেলে ওঠার চেষ্টা করলাম। ঢাকা শহরে বাসে ওঠার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। এখানে ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ বা সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট থিওরি কাজ করে। যে যত বেশি কনুই চালাতে পারবে, সে তত সহজে বাসে উঠতে পারবে।

আমি কনুই চালিয়ে বাসের ভেতরে জায়গা করে নিলাম। বসার সিট নেই। হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে থাকতে হবে। আমার ঠিক পাশেই এক ভদ্রলোক অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে তার চশমার কাঁচ মুছছেন।

ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভাই, ঢাকা শহরটা একটা গ্যাস চেম্বার হয়ে গেছে, খেয়াল করেছেন?’
আমি মাথা নাড়লাম, ‘জি। তবে গ্যাস চেম্বারে সাধারণত বাস চলে না, এখানে চলছে।’

ভদ্রলোক আমার রসবোধ বুঝলেন না। তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আমি মতিঝিল যাচ্ছি। এই জ্যাম ঠেলে কখন পৌঁছাব আল্লাহ মালুম। আপনি কী করেন ভাই?’
‘আমি অনুবাদ করি।’
‘অনুবাদ? মানে কোর্ট-কাচারির দলিল-দস্তাবেজ?’
‘না। বিদেশি খবর অনুবাদ করি। একটা অনলাইন পত্রিকায়।’

ভদ্রলোক একটু হতাশ হলেন বলে মনে হলো। ‘ও আচ্ছা। খবর। দেশে তো খবরের অভাব নেই, আবার বিদেশি খবর! কে পড়ে এসব?’

কথাটা খুব একটা মিথ্যা না। আমাদের দেশের মানুষের অন্যের হাঁড়ির খবর জানার আগ্রহ বেশি। ট্রাম্প আমেরিকায় কী করল, তার চেয়ে পাশের বাড়ির ভাবি কেন আজকে শাড়ি পরে বের হলো, সেই খবর এদেশের মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাস কারওয়ান বাজার পৌঁছাতে পৌঁছাতে দশটা বেজে গেল। আমি বাস থেকে নেমে ‘ঢাকা পেপারস’-এর অফিসের দিকে হাঁটতে লাগলাম।

আমাদের অফিসটা একটা কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ের পাঁচতলায়। অফিসে ঢুকতেই নিউজ রুমের চিরাচরিত কোলাহল কানে এল। সবাই ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে খটখট করে টাইপ করছে। কেউ কেউ ফোনে চিৎকার করে কথা বলছে।

আমি আমার ডেস্কে গিয়ে বসলাম। ডেস্কটা একদম কোণায়। জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তা দেখা যায়। আমি ল্যাপটপ অন করতেই আমাদের শিফট ইনচার্জ এহসান ভাই আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

এহসান ভাইয়ের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মাথার চুল সামনের দিকে বেশ পাতলা। তিনি সারাক্ষণ একটা অদ্ভুত তাড়াহুড়োর মধ্যে থাকেন। পৃথিবীতে যেন এইমাত্র বিরাট কোনো প্রলয় ঘটে গেছে এবং সেটা ব্রেকিং নিউজ হিসেবে না দেওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই, এমন একটা ভাব।

‘রাশেদ, আজকে কিন্তু বেশ কয়েকটা ইম্পর্ট্যান্ট নিউজ আছে। জলদি হাত চালাও।’

আমি বললাম, ‘কী নিউজ ভাই?’

এহসান ভাই একটা প্রিন্ট করা কাগজ আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। ‘ফ্রান্সের এক লোক তার সমস্ত সম্পত্তি একটা বিড়ালকে উইল করে দিয়েছে। বিড়ালটার নাম হচ্ছে লুসি। লুসির নামে এখন নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, গাড়ি আর ড্রাইভার আছে। নিউজটা একটু রসিয়ে রসিয়ে লিখবে। মানুষ এসব পড়তে খুব পছন্দ করে।’

আমি কাগজটার দিকে তাকালাম। আমার এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকার সেভিংস আর নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ বিশ হাজার টাকার কথা মনে পড়ল। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লুসি নামের কোটিপতি বিড়ালের খবরটা বাংলায় অনুবাদ করতে শুরু করলাম।

অনুবাদ করতে করতে আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি যদি ফ্রান্সের ওই বিড়ালটা হতাম, তাহলে আমার বাবা-মাকে উমরাহ করতে পাঠাতে কোনো সমস্যাই হতো না। হয়তো লুসি নিজেই একদিন মক্কায় গিয়ে উমরাহ করে আসবে, কে জানে!

খবরটা শেষ করে মাত্র সাবমিট করেছি, এমন সময় আমার মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে দেখলাম, ‘চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনী- মতিন সাহেব’।

মতিন সাহেব চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর মালিক। লোকটা ভালো, তবে অত্যন্ত হিসেবি। তিনি এক কাপ চা খাওয়াতেও দশবার হিসাব করেন।

আমি ফোন ধরলাম, ‘জি মতিন সাহেব, বলুন।’
‘রাশেদ ভাই, কেমন আছেন? আপনাকে গত সপ্তাহে দেওয়া বইটার প্রুফ দেখা শেষ? জমা দেওয়ার ডেট তো কালকে। কাজ কি শেষ হয়েছে?’

‘জি, প্রায় শেষ। আজ রাতের ভেতর কমপ্লিট করে কাল অফিসে দিয়ে আসব।’

‘খুব ভালো। আর শোনো ভাই, নতুন একটা অনুবাদের কাজ হাতে এসেছে। একটা স্প্যানিশ থ্রিলার বইয়ের ইংরেজি ভার্সন। তুমি কি করতে পারবে?’

আমার বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। নতুন বইয়ের অনুবাদ মানে নতুন রয়্যালটি। নতুন টাকা। 

আমি স্বাভাবিক গলা বজায় রেখে বললাম, ‘পারব। তবে আমার রেটটা কিন্তু এবার একটু বাড়াতে হবে মতিন সাহেব। আগের রেটে পোষাচ্ছে না।’

মতিন সাহেব সঙ্গে সঙ্গে গলা নামিয়ে ফেললেন। যেন আমি তার কাছে কিডনি চেয়ে বসেছি। ‘আরে রাশেদ ভাই, আপনি তো জানেনই প্রকাশনা শিল্পের কী করুণ অবস্থা! কাগজের যা দাম! বই তো বিক্রি হয় না। তার ওপর অনুবাদের বই। লোকে তো এখন পিডিএফ পড়ে। আমি তো আপনাকে আপন মানুষ মনে করে কাজটা দিতে চাইলাম।’

আমি মনে মনে হাসলাম। প্রকাশকদের এই এক কথা। কাগজের দাম আর প্রকাশনা শিল্পের করুণ অবস্থা। অথচ প্রতি বছর বইমেলায় তারা নতুন গাড়ি কিনে ঘুরে বেড়ায়।

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, কাল যখন প্রুফ দিতে যাব, তখন রেট নিয়ে কথা হবে।’
‘আচ্ছা ভাই, চলে আসেন। কাল একসাথেই চা খাব।’

ফোন রেখে আমি একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। স্প্যানিশ থ্রিলার বইটার অনুবাদ করতে পারলে হয়তো বিশ হাজার টাকা একসঙ্গে পাওয়া যাবে।


আমি আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকালাম। এহসান ভাই আরেকটা নিউজ পাঠিয়েছেন। এবার আর কোনো বিড়ালের খবর না। মেক্সিকোতে ড্রাগ কার্টেলের গোলাগুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর।

আমি কি-বোর্ডে আঙুল চালাচ্ছি। আমার মাথার ভেতর তখন মেক্সিকোর গোলাগুলির বদলে ঘুরে বেড়াচ্ছে তিন লাখ টাকার স্বপ্ন, নিহাদের অ্যাকসিডেন্ট, আর স্প্যানিশ থ্রিলারের রেট।

আমার জীবনটা এই অনুবাদের মতোই। এক ভাষার আবেগ অন্য ভাষায় বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা। আমি আমার চারপাশের পৃথিবীর খবর বাংলায় অনুবাদ করি, কিন্তু আমার নিজের জীবনের ভেতরের খবর কেউ অনুবাদ করতে পারে না।

অফিস থেকে বের হতে হতে সন্ধ্যা ৬টা বেজে গেল। কারওয়ান বাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি বাসের জন্য। ঢাকা শহরের এই সময়টা সবচেয়ে অদ্ভুত। রাস্তার সোডিয়াম বাতির হলুদ আলোয় সবকিছু কেমন যেন মায়াময় মনে হয়। ধুলোমাখা বাতাস, হর্ন, মানুষের চিৎকার— সব কিছু মিলিয়ে একটা বিরাট বিশৃঙ্খলা। অথচ এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি আছে।

বাস এলে আমি উঠলাম। এবার বসার সিট পেয়েছি। জানালার পাশে। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। বাতাস এসে আমার মুখে লাগছে। আমার পকেটে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা বেতনের হিসাব, আর মাথায় তিন লাখ টাকার স্বপ্ন।

বাস এগোচ্ছে। আমার জীবনও এগোচ্ছে। আমি রাশেদ আহমেদ। আমার গল্প শুরু হলো। আপনি শুনছেন তো?
[+] 7 users Like Orbachin's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#2
Nice start .. pls proceed..
Like Reply
#3
Darun
Like Reply
#4
Good Starting
Like Reply
#5
২।
আমাদের ‘ঢাকা পেপারস’ অফিসে প্রায় সত্তর জন লোক কাজ করে। সত্তর জন মানুষ একটা ফ্লোরে বসে যখন একসাথে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চালায়, তখন অদ্ভুত একটা শব্দ হয়। চোখ বন্ধ করে শুনলে মনে হবে, বিশাল কোনো টিনের চালে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।

অফিসটা মূলত কয়েকটা ডেস্কে ভাগ করা। ন্যাশনাল ডেস্ক, পলিটিক্স, এন্টারটেইনমেন্ট, স্পোর্টস এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক। এর মধ্যে সবচেয়ে নিরিবিলি এবং শান্তিতে থাকি আমরা। মানে ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের মানুষজন।

আমাদের ডেস্কে আমরা মোট তিনজন। আমি, মামুন আর আমাদের লাইন ম্যানেজার এহসান ভাই। আমি আর মামুন সমান লেভেলের কর্মী। আমাদের পদবি এক, কাজ এক, বেতনও এক। এমনকি আমাদের ল্যাপটপের কনফিগারেশনও এক। আমাদের কাজ হলো রয়টার্স, বিবিসি বা আল-জাজিরা থেকে বিদেশি খবরগুলো নামিয়ে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়া।

মামুন ছেলেটা বেশ ইন্টারেস্টিং। তার ইংরেজি জ্ঞান ভয়ংকর রকমের আক্ষরিক। সে মাঝে মাঝেই অনুবাদ করতে গিয়ে এমন সব বাক্য তৈরি করে, যা পড়লে চমকে উঠতে হয়। সেদিন দেখলাম সে ‘He kicked the bucket’ (সে মারা গেছে) অনুবাদ করেছে— ‘সে বালতিতে লাথি মেরেছে’। আমি তাকে অনেক বুঝিয়েছি যে বিদেশি খবরের মধ্যে বালতি বা লাথির কোনো জায়গা নেই। সে আমার কথা শোনে, কিন্তু দুই দিন পর আবার নিজের নিয়মে ফিরে যায়।

অফিসে আমার ছুটি সোমবার। আর মামুনের ছুটি শুক্রবার।

শুক্রবার ছুটি থাকা মানে আপনি সামাজিকভাবে একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ। আপনি জুমার নামাজ পড়তে পারবেন, দুপুরে বাসায় গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেতে পারবেন, বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারবেন। কিন্তু সোমবার ছুটি থাকাটা এক ধরনের সামাজিক অভিশাপ। সোমবার আপনার সব বন্ধু অফিসে ব্যস্ত। রাস্তায় জ্যাম, বাজারে ভিড়। সোমবার আপনি চাইলেও কারও সাথে আড্ডা দিতে পারবেন না।

তাই সোমবারে মাঝেমধ্যে ‘চন্দ্রবিন্দু’ প্রকাশনীর অফিসে যাই।

চন্দ্রবিন্দুর অফিসটা কাঁটাবনে। পুরনো একটা বিল্ডিংয়ের দোতলায়। সেখানে সবসময় নতুন ছাপানো বইয়ের গন্ধ, আঠা আর পুরনো কাগজের গন্ধ মিলেমিশে একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ তৈরি করে। এই ঘ্রাণটা আমার খুব পরিচিত এবং প্রিয়।

প্রকাশনীর মালিক মতিন সাহেব আমাকে বেশ পছন্দ করেন, কারণ আমি বিনা পয়সায় তার অফিসের একটা চেয়ার দখল করে বসে থাকলেও, মাঝে মাঝে ফ্রি-তে দু-একটা পাণ্ডুলিপির প্রুফ দেখে দিই।

বিকেলের দিকে এখানে বেশ জমজমাট আড্ডা হয়। ঢাকা শহরের কিছু উদীয়মান কবি, সাহিত্যিক আর বেকার বুদ্ধিজীবীরা এখানে জড়ো হন। তারা অত্যন্ত গম্ভীর মুখে চায়ে চুমুক দেন এবং ফরাসি সাহিত্য, লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা কিংবা উত্তর-আধুনিকতা নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করেন, যেন এই সমস্যাগুলো সমাধান না হলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হয়ে যাবে।

আমি চুপচাপ তাদের কথা শুনি। মাঝে মাঝে তারা আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, "কী রাশেদ ভাই, আপনার কী মত?"
আমি খুব সাবলীল ভঙ্গিতে বলি, "আপনারা যা বলেছেন, এর বাইরে আসলে আর কিছু বলার নেই। আমি আপনাদের সাথে একমত।"

এই একটা বাক্যের কারণে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর আড্ডায় আমার বেশ কদর আছে। সবাই আমাকে ‘সমঝদার’ এবং ‘জ্ঞানী’ মানুষ হিসেবে সম্মান করে। মাঝে মাঝে এই প্রকাশনী থেকে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন বা পাঠচক্রের আয়োজন করা হয়। তখন আমাকেও ডাকা হয়। আমি গম্ভীর মুখে স্টেজে বসে থাকি। দু-চারটে কঠিন শব্দ ব্যবহার করে বইয়ের ওপর আলোচনা করি। মানুষজন খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে।

এরকমই এক সোমবার সকালের কথা। আমি মেসে বসে ঝিমুচ্ছি। হঠাৎ চন্দ্রবিন্দুর মতিন সাহেবের ফোন।
আমি ফোন রিসিভ করলাম, "জি মতিন সাহেব, বলুন।"
মতিন সাহেব একটু ব্যস্ত গলায় বললেন, "রাশেদ ভাই, সামনের বুধবার সন্ধ্যায় কি আপনার সময় হবে? একটু আসতে হবে আমাদের অফিসে।"
"কী ব্যাপার? কোনো জরুরি কাজ?"
"তেমন কিছু না। একটা বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান। ছোট করে। আপনাকে একটু কথা বলতে হবে।"
"কোন বই?"
"ওই যে, দশ-পনেরো দিন আগে আপনি যে বইয়ের প্রুফ দেখলেন না?"

আমি স্মৃতি হাতড়ে মনে করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, একটা কবিতার বই।
আমি বললাম, "লেখকের নাম কী যেন?"
"আনিকা নাওহার। বইয়ের নাম ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’। আপনি তো প্রুফ দেখেছেন, বইটা নিয়ে ভালো-মন্দ দুই-চার কথা বলবেন আরকি। পারবেন না?"
আমি বললাম, "পারব। কিন্তু বুধবার তো আমার অফিস ভাই। ৬টার আগে তো ফ্রি হতে পারব না।"
"আরে ভাই, আমার প্রোগ্রাম তো পাঁচটা থেকে, একটু ম্যানেজ করেন।"
"ঠিক আছে, দেখতেছি।"
"দেখতেছি না, আপনার থাকা লাগবে।"
"আচ্ছা, আসব আমি। প্যারা নাই।"

ফোন রেখে আমি ল্যাপটপে ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’ বইটার পিডিএফ ফাইল ওপেন করলাম। বই নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রস্তুতি লাগে। নাহলে স্টেজে উঠে বোকার মতো তাকিয়ে থাকতে হয়। বাংলাদেশে এমনিতেই মহিলা কবির সংখ্যা কম। যারা আছেন, তারা বেশিরভাগই ফেসবুকে দুই লাইনের স্ট্যাটাস দেন, যেগুলোকে ঠিক কবিতা বলা যায় না। আনিকা নাওহার সেই হিসেবে কিছুটা ব্যতিক্রম। উনি মোটামুটি পরিচিত। তবে উনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না।

আমি বইয়ের পিডিএফের শেষে দেওয়া ‘লেখক পরিচিতি’ অংশটা বের করলাম। উনার জন্ম বাংলাদেশে। কিন্তু বেড়ে ওঠা এবং বর্তমান নিবাস ইংল্যান্ডে। উনার মতো কবিদের আমরা বলি ‘পরিযায়ী পাখি’ বা ‘অতিথি পাখি’। এরা বছরে একবার দেশে আসেন। ঠিক বইমেলার আগে আগে। এসে নিজেদের টাকায় বই প্রকাশ করেন, পুরো বইমেলায় অত্যন্ত সুন্দর শাড়ি পরে স্টলে স্টলে ঘুরে বেড়ান, পাঠকদের অটোগ্রাফ দেন। তারপর বইমেলা শেষ হলেই আবার ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় ফিরে যান। পরের এগারো মাস তাদের আর কোনো খবর থাকে না।

লেখক পরিচিতির নিচে একটা ছবি দেওয়া আছে। ফ্ল্যাপের ছবি। ছবি অনুযায়ী উনার বয়স বোঝা মুশকিল, তবে ফ্ল্যাপের লেখায় দেওয়া আছে— জন্ম ১৯৯০, অর্থাৎ বয়স ৩৬।

ফ্ল্যাপের ছবির একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। এখানে সবাইকেই একটু চিন্তিত এবং সুন্দর দেখায়। আনিকা নাওহারকেও খুব সুন্দর লাগছে। তার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের উদাসীনতা আছে, যেটা কবিদের জন্য বাধ্যতামূলক। একজন কবি যদি বাজারের ফর্দ হাতে নিয়ে তোলা ছবি ফ্ল্যাপে দেন, মানুষ সেই বই কিনবে না। কবিদের থাকতে হয় মেঘ, বৃষ্টি আর বিষণ্ণতার কাছাকাছি।

আমি উনার কয়েকটা কবিতা আবার পড়লাম। প্রুফ দেখার সময় খেয়াল করেছিলাম, উনি ‘শূন্যতা’ শব্দটা খুব বেশি ব্যবহার করেছেন। প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই কোনো না কোনো শূন্যতা আছে। ইংল্যান্ডের মতো একটা সুন্দর দেশে বসে একজন মানুষের ভেতরে এত শূন্যতা কোথা থেকে আসে, সেটা আমার মতো মিরপুরের মেসে থাকা একজন সাধারণ অনুবাদকের পক্ষে বোঝা মুশকিল।

বুধবারের জন্য আমি আমার মাথায় একটা ছোটখাটো স্ক্রিপ্ট তৈরি করে ফেললাম। স্টেজে উঠে আমি বলব— "আনিকা নাওহারের কবিতায় আমরা এক ধরনের প্রবাসকালীন বিচ্ছিন্নতাবোধ দেখতে পাই। এই শূন্যতা শুধু ব্যক্তির নয়, এই শূন্যতা যেন পুরো আধুনিক সভ্যতার..." ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ধরনের কথাগুলো শুনতে খুব ভারী মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে এর কোনো মানে নেই।

মঙ্গলবার অফিসে গিয়েই আমি এহসান ভাইয়ের ডেস্কের সামনে দাঁড়ালাম।
এহসান ভাই তখন খুব মনোযোগ দিয়ে আল-জাজিরার ওয়েবসাইট খুলে কী একটা নিউজ পড়ছেন। তার কপালে ভাঁজ। পৃথিবীর কোথাও কোনো বোমা ফুটলে বা কোনো দেশের সরকার পতন হলে এহসান ভাইয়ের কপালের ভাঁজ গভীর হয়।
"এহসান ভাই?" আমি শান্ত গলায় ডাকলাম।
এহসান ভাই চোখ না তুলেই বললেন, "বলো রাশেদ। সিরিয়ার অবস্থা তো ভালো না। আরেকটা হামলা হয়েছে।"
"সিরিয়ার অবস্থা তো গত দশ বছর ধরেই ভালো না ভাই। আমি অন্য একটা বিষয়ে কথা বলতে এসেছিলাম।"
এহসান ভাই এবার মুখ তুলে তাকালেন। "কী বিষয়?"
"আগামীকাল বুধবার আমাকে একটু আগে ছাড়তে হবে। মানে, বিকেল ৩টার দিকে।"

অফিসে ছুটি বা আর্লি লিভ চাওয়ার সময় বসের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে হয় না। একটু অপরাধী ধরনের চেহারা করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। আমি সেই চেষ্টা করলাম।
এহসান ভাই ভ্রু কুঁচকে বললেন, "তিনটায়? কেন? তোমার তো আবার বিয়ে-শাদির ব্যাপার নেই যে পাত্রী দেখতে যাবে।"
"পাত্রী না ভাই। একটা প্রকাশনা অনুষ্ঠান আছে কাঁটাবনে। সেখানে আমাকে একটু কথা বলতে হবে।"
"কীসের প্রকাশনা?"
"কবিতার বই।"
এহসান ভাই এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন আমি তাকে বলেছি আমি মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার জন্য টিকিট কাটতে যাচ্ছি।
"কবিতা? তুমি কবিতা নিয়ে কথা বলবে? তুমি তো অনুবাদক। তুমি কবিতা বোঝো?"
আমি বিনীত গলায় বললাম, "একটু-আধটু বুঝি ভাই। প্রুফ রিডিংয়ের কাজ তো করি। সেখান থেকেই ডাকছে।"
এহসান ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ঠিক আছে, যাও। তবে ভাই, তুমি তো জানোই এগুলার কী সব টাইম-ইন, টাইম-আউটের হিসাব করে। একদিন যেহেতু ৩ ঘণ্টা আগে চলে যাবা, আরেকদিন কিন্তু ৩ ঘণ্টা বেশি করে কাভার আপ করে দিও।" 
আমি বললাম, "জি ভাই, অবশ্যই।"

আমি ডেস্কে ফিরে, নিউজ করলাম প্রথমে দুটো। একটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আপডেট। আরেকটা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে, যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। নিউজ দুটো শেষ করে আনিকা নাওহারের ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’-এর পিডিএফ বের করে আবার দু-একটা কবিতা পড়লাম।

মানুষ আসলে সারাজীবনই মুখোশ পরে থাকে। আমি যে কাল স্টেজে উঠে উনার কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করব, সেটাও একটা মুখোশ। কারণ আমি জানি, উনার কবিতাগুলো খুব সাধারণ মানের। কিন্তু আমি সেটা বলব না।
মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, মিথ্যা বলাটা একটা শিল্প। আর আমরা সবাই সেই শিল্পের ছোটখাটো এক একজন শিল্পী।

বুধবার সকালটা অন্য আট-দশটা সাধারণ দিনের মতোই শুরু হলো। তাড়াহুড়ো করে গল্প এগিয়ে নেওয়ার কিছু নেই। মানুষের জীবন তো আর সিনেমার ট্রেইলার না যে শুধু অ্যাকশন আর ক্লাইম্যাক্স থাকবে। জীবনের বেশিরভাগ অংশ জুড়েই থাকে একঘেয়েমি, পুনরাবৃত্তি আর ভীষণ সাধারণ কিছু মুহূর্ত।

আমাদের মেসের সকালবেলাটা বেশ ইন্টারেস্টিং। চার রুমের এক বাসিন্দার নাম রাজু। একটা ওষুধ কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ, অল্প বেতন। তবে এইটা ওর আপাত জীবন। ওর টার্গেট সরকারি চাকরি। সে বিসিএস পরীক্ষার্থী। তার জীবনের একটাই লক্ষ্য— যেকোনো মূল্যে সরকারের একজন গ্যাজেটেড কর্মকর্তা হওয়া। এজন্য সে প্রতিদিন ভোরে উঠে বারান্দায় পায়চারি করে আর বিড়বিড় করে সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করে।

আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই শুনলাম রাজু বারান্দায় দাঁড়িয়ে আপন মনে বলছে, "বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়া, মুদ্রার নাম লেভ... বুরকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগু, মুদ্রার নাম ফ্র্যাঙ্ক..."
আমি বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় গেলাম। চোখেমুখে ঘুমের রেশ। রাজু আমাকে দেখে পড়া থামিয়ে বলল, "রাশেদ ভাই, উঠলেন?"
আমি হাই তুলে বললাম, "হুম। তুমি তো দেখি আজ আফ্রিকায় চলে গেছ। বুরকিনা ফাসো নিয়ে পড়েছ।"

রাজু গম্ভীর মুখে বলল, "ভাই, বিসিএস জিনিসটা হলো একটা মহাসাগর। কোথা থেকে যে এক মার্কের প্রশ্ন চলে আসবে, কেউ জানে না। গত বছর প্রশান্ত মহাসাগরের একটা ছোট দ্বীপের রাজধানীর নাম জিজ্ঞেস করেছিল। আমি রিস্ক নিতে চাই না।"
আমি বললাম, "খুব ভালো। তা বুরকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগু, এটা জেনে তোমার জীবনে ঠিক কী উন্নতি হবে বলে তুমি মনে করো?"

রাজু একটু থতমত খেয়ে গেল। তারপর বলল, "উন্নতি তো হবে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পর। তখন তো আর বুরকিনা ফাসো নিয়ে ভাবতে হবে না। তখন ভাবব পোস্টিং আর প্রমোশন নিয়ে। আপাতত এই ওয়াগাদুগুই আমার ভবিষ্যৎ।"

আমি হাসলাম। রাজুর লজিক খুব পরিষ্কার। আমি বাথরুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। ব্যাচেলর মেসে সকালবেলা বাথরুমের সিরিয়াল পাওয়াটা অনেকটা লটারি জেতার মতো। আমাদের ফ্ল্যাটে বাথরুম দুটো। কিন্তু সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যে এই দুটো বাথরুম নিয়ে রীতিমতো স্নায়ুযুদ্ধ চলে। আমি গিয়ে দেখলাম, তুহিন একটা বাথরুম দখল করে বসে আছে। ভেতর থেকে আইইএলটিএস-এর স্পিকিং প্র্যাকটিসের শব্দ আসছে। সে বাথরুমে বসেও ইংরেজিতে কথা বলছে।

"ইয়েস, আই থিংক গ্লোবাল ওয়ার্মিং ইজ আ ভেরি বিগ ইস্যু..."
আমি বাথরুমের দরজায় টোকা দিয়ে বললাম, "তুহিন ভাই, গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে পরে থিংক করো। এখন বাথরুমটা একটু ছাড়ো। আমার অফিসে লেট হয়ে যাচ্ছে।"
তুহিন ভেতর থেকেই বলল, "জাস্ট টু মিনিটস, ব্রাদার! আই অ্যাম অলমোস্ট ডান।"

সকাল দশটায় আমি কারওয়ান বাজারে ‘ঢাকা পেপারস’-এর অফিসে এসে পৌঁছালাম।
অফিসের পরিবেশ প্রতিদিনের মতোই। সবাই ল্যাপটপে মুখ গুঁজে আছে। আমি আমার ডেস্কে গিয়ে বসলাম। ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে আমি আর মামুন পাশাপাশি বসি। মামুন আজ খুব সিরিয়াস মুখে একটা নিউজ অনুবাদ করছে। তার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ আটকে গেল।

সে একটা আমেরিকান নিউজ এজেন্সির খবর অনুবাদ করছে। খবরটা হলো, ক্যালিফোর্নিয়ায় একটা ব্যাংকে ডাকাতি করতে গিয়ে একজন লোক হাতেনাতে ধরা পড়েছে। ইংরেজিতে লেখা ছিল: "The bank robber was caught red-handed by the security officer."
মামুন তার স্বভাবসুলভ আক্ষরিক অনুবাদ করেছে: "ব্যাংক ডাকাতটিকে পুলিশ লাল হাতে ধরে ফেলে।"

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "মামুন, একটু এদিকে তাকাও।"
মামুন চোখ না সরিয়েই বলল, "বলেন ভাই। খুব ইম্পর্ট্যান্ট নিউজ। ক্যালিফোর্নিয়ায় ডাকাতি।"
"ডাকাতি ঠিক আছে। কিন্তু ডাকাতটা লাল হাতে ধরা পড়ল কীভাবে? সে কি ডাকাতি করার আগে হাতে আলতা মেখেছিল?"

মামুন এবার আমার দিকে তাকাল। "লাল হাত মানে? ওহ, 'রেড-হ্যান্ডেড' বুঝাচ্ছেন? তো রেড মানে তো লাল আর হ্যান্ড মানে হাত। লাল হাতই তো হয়।"
আমি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে বললাম, "রেড-হ্যান্ডেড একটা ইডিয়ম। এর মানে হলো হাতেনাতে ধরা পড়া। লাল হাতে ধরা পড়া না। তুমি যদি এটা পাবলিশ করো, পাঠকরা ভাববে ক্যালিফোর্নিয়ার ডাকাতরা হাতে মেহেদি বা আলতা দিয়ে ডাকাতি করতে যায়।"

মামুন একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। "ও আচ্ছা! ঠিক আছে ভাই, চেঞ্জ করে দিচ্ছি। আপনি না থাকলে যে আমার কী হতো!"
"আমার কিছু হতো না, তবে ঢাকা পেপারসের পাঠকদের ইংরেজি জ্ঞান সম্পর্কে অদ্ভুত একটা ধারণা তৈরি হতো।" আমি বলে নিজের ল্যাপটপ অন করলাম।

দুপুরের দিকে এহসান ভাই আমাদের ডেস্কে এলেন। তার হাতে একটা কফির মগ।
"রাশেদ, আজকে তো তুমি একটু আগে বের হবে, তাই না?"
আমি ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে বললাম, "জি ভাই।"
"হ্যাঁ, মনে আছে। যাওয়ার আগে ইউরোপের ওই নিউজটা একটু দেখে দিয়ে যেও। আর শোনো, ওই যে কবিতার বই নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছ... বই পড়েছ তো ঠিকমতো? নাকি শুধু ফ্ল্যাপ পড়েই স্টেজে উঠে যাবে?"

আমি হাসলাম। "প্রুফ দেখার সময় পুরো বই-ই পড়তে হয়েছে ভাই। চিন্তা করবেন না, মান-সম্মান ডুববে না।"
"বেস্ট অফ লাক,"
বলে এহসান ভাই চলে গেলেন। এহসান ভাই যেতেই মামুন ফিসফিস করে বলল, "রাশেদ ভাই, কাহিনী কী?"
"কীসের কাহিনী?"
"এই যে আপনি কবিতা-টবিতা নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছেন। প্রেম-ট্রেম নাকি?"
আমি হাসলাম। "প্রেম হবে কার সাথে? বইয়ের কাগজের সাথে?"

মামুন চোখ ছোট করে বলল, "কাগজের সাথে না। নিশ্চয়ই কোনো মহিলা কবি। আমি খেয়াল করেছি, পুরুষ কবিদের অনুষ্ঠানে কেউ আগে ছুটি নিয়ে যায় না। মহিলা কবিদের ব্যাপার আলাদা। তা কবির বয়স কত?"
আমি মামুনের দিকে তাকিয়ে বললাম, "ছত্রিশ। ইংল্যান্ডে থাকেন।"
মামুন একটু হতাশ হলো বলে মনে হলো। "ছত্রিশ? তাইলে তো খালাম্মা। খালাম্মাদের বইয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য আপনি নিউজ ফেলে যাচ্ছেন? আপনার লজিক তো আমি বুঝতেছি না ভাই।"

আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে বললাম, "মামুন, পৃথিবীতে সব কিছুর লজিক থাকে না। তুমি যেমন ‘He kicked the bucket’-এর অনুবাদ করো বালতিতে লাথি মারা, এটাও ঠিক সেরকম। এর কোনো লজিক নেই, কিন্তু ব্যাপারটা ঘটে।"
মামুন আর কথা বাড়াল না। সে তার রয়টার্সের নিউজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

বিকেল চারটার দিকে আমি অফিস থেকে বের হলাম।
কারওয়ান বাজার থেকে কাঁটাবনের দূরত্ব খুব বেশি না হলেও ঢাকা শহরের জ্যামে সেটা পাড়ি দেওয়া একটা ছোটখাটো যুদ্ধ। আমি একটা রিকশা নিলাম। রিকশাওয়ালা ষাট টাকা চাইল, আমি দরদাম করলাম না। আজ আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত চাঞ্চল্য কাজ করছে। প্রতিদিনের একঘেয়ে রুটিনের বাইরে গিয়ে আজ আমি একটা সাহিত্য আড্ডায় কথা বলতে যাচ্ছি। যদিও আমি জানি, এসব আড্ডার বেশির ভাগ কথাই ফাঁকা আওয়াজ, তবুও একটু তো ভালো লাগেই।

কাঁটাবনে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর অফিসে যখন পৌঁছালাম, তখন সন্ধ্যা চারটা পয়তাল্লিশ বাজে।
অফিসের ভেতরটা বেশ জমজমাট। নতুন বইয়ের গন্ধ, সিউডোর (Sudo) আঠার গন্ধ আর চায়ের গন্ধ মিলেমিশে একটা অদ্ভুত সাহিত্যিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মতিন সাহেব অত্যন্ত ব্যস্ত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছেন। তার পরনে একটা ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি। প্রকাশকরা সাধারণত খুব সাধারণ পোশাকে থাকেন, কিন্তু কোনো অনুষ্ঠান থাকলে তারা হঠাৎ করেই বুদ্ধিজীবীদের মতো পোশাক পরেন।

আমাকে দেখেই মতিন সাহেব এগিয়ে এলেন। "আরে রাশেদ ভাই! আসেন আসেন। আপনার জন্যই ওয়েট করছিলাম। অনুষ্ঠান তো একটু পরেই শুরু হয়ে যাবে।"
আমি বললাম, "বাকিরা কোথায়? লেখক এসেছেন?"
"হ্যাঁ, উনি তো সেই কখন এসে বসে আছেন। উনার তো ইংল্যান্ডের অভ্যাস, একদম টাইম ধরে চলে। আসেন, আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিই।"

আমি মতিন সাহেবের পেছন পেছন প্রকাশনীর ভেতরের দিকের ছোট কেবিনটার দিকে এগোলাম। কেবিনের দরজা খোলা।
ভেতরে ঢুকতেই আমার চোখের দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। আমার মনের ভেতরে খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু স্পষ্ট একটা ধাক্কা লাগল। আমি সাধারণত খুব সহজে চমকাই না। ঢাকা শহরে থাকতে থাকতে এবং সারাদিন দুনিয়ার সব উদ্ভট খবর অনুবাদ করতে করতে আমার আবেগ-অনুভূতি বেশ ভোঁতা হয়ে গেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি সত্যিই চমকে গেলাম।

সোফায় যিনি বসে আছেন, তিনি আনিকা নাওহার।
বইয়ের ফ্ল্যাপে পড়েছিলাম উনার বয়স ছত্রিশ। কিন্তু এই মহিলাকে দেখে কোনোভাবেই ছত্রিশ মনে হচ্ছে না। ইংল্যান্ডের পরিষ্কার আবহাওয়া, দূষণমুক্ত পরিবেশ আর উন্নত জীবনযাপন সম্ভবত মানুষের বয়সকে একটা জায়গায় ফ্রিজ করে দেয়। আমাদের দেশের ছত্রিশ বছর বয়সী একজন সাধারণ গৃহিণীর চেহারায় যেখানে সংসারের ক্লান্তি আর বয়সের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সেখানে আনিকা নাওহারের চেহারায় এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা।

উনার পরনে একটা গাঢ় মেরুন রঙের সিল্কের শাড়ি। শাড়ি পরার ধরনে একটা দারুণ আভিজাত্য আছে, আবার একই সাথে আছে একটা সূক্ষ্ম অবহেলা। স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর দিয়ে খুব সুন্দরভাবে লুটিয়ে পড়েছে। আমার চোখ অনুবাদকের চোখ। খুঁটিনাটি খেয়াল করা আমার পেশাগত রোগ। আনিকা নাওহারের শারীরিক সৌন্দর্যের একটা অদ্ভুত আবেদন আছে, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

তাঁর গায়ের রঙ নিখুঁত ফর্সা, তবে ফ্যাকাশে নয়। চোখের দৃষ্টিতে একটা শান্ত, স্নিগ্ধ ভাব। কিন্তু সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে তাঁর শারীরিক গড়ন। যাকে ইংরেজিতে বলে পারফেক্ট ‘আওয়ারগ্লাস’ ফিগার। আমি মনে মনে একটা দ্রুত হিসাব কষলাম। আমার আন্দাজ খুব একটা ভুল হয় না। উনার ভাইটাল স্ট্যাটস সম্ভবত ৩৬-২৮-৩৬ এর আশেপাশে হবে। ভরাট এবং সুডৌল বক্ষদেশ, শাড়ির কুঁচির ফাঁক দিয়ে হালকা উঁকি দেওয়া মেদহীন ছিপছিপে কোমর আর আকর্ষণীয় নিতম্ব— সবকিছু মিলিয়ে ছত্রিশ বছরের একজন পূর্ণাঙ্গ নারীর যে শারীরিক আবেদন থাকতে পারে, সেটা তাঁর মাঝে শতভাগ, বরং তার চেয়েও বেশি উপস্থিত। অথচ এই পুরো আবেদনটার মধ্যে কোনো উগ্রতা নেই। আছে এক ধরনের পরিশীলিত মুগ্ধতা।

হালকা মেকআপ করেছেন তিনি। ঠোঁটে শাড়ির সাথে মিলিয়ে গাঢ় মেরুন রঙের লিপস্টিক। চুলগুলো খোঁপা করা, সেখান থেকে দু-এক গোছা অবাধ্য চুল ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে। পুরো রুমের বাতাসে একটা খুব দামি পারফিউমের গন্ধ ভাসছে। শ্যানেল বা ডিওর-এর কোনো একটা পারফিউম হবে হয়তো।
[+] 6 users Like Orbachin's post
Like Reply
#6
Truly great start
Like Reply
#7
Darun
Like Reply
#8
Valo laglo
Like Reply
#9
যতটুকু পড়লাম বেশ ভালোই লাগলো। এর পরবর্তী অংশ পড়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রইলাম।
Like Reply
#10
৩।

সবকিছু মিলিয়ে ছত্রিশ বছরের একজন পূর্ণাঙ্গ নারীর যে শারীরিক আবেদন থাকতে পারে
, সেটা তাঁর মাঝে শতভাগ, বরং তার চেয়েও বেশি উপস্থিত। অথচ এই পুরো আবেদনটার মধ্যে কোনো উগ্রতা নেই। আছে এক ধরনের পরিশীলিত মুগ্ধতা। হালকা মেকআপ করেছেন তিনি। ঠোঁটে শাড়ির সাথে মিলিয়ে গাঢ় মেরুন রঙের লিপস্টিক। চুলগুলো খোঁপা করা, সেখান থেকে দু-এক গোছা অবাধ্য চুল ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে। পুরো রুমের বাতাসে একটা খুব দামি পারফিউমের গন্ধ ভাসছে। শ্যানেল বা ডিওর-এর কোনো একটা পারফিউম হবে হয়তো।

 
মতিন সাহেব গলা খাঁকারি দিলেন। "আনিকা আপা, এই যে আমাদের রাশেদ ভাই। রাশেদ আহমেদ। উনিই আপনার বইয়ের প্রুফ দেখেছেন। খুব মেধাবী ছেলে। ঢাকা পেপারসের ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে আছেন, আবার আমাদের এখানেও সময় দেন।"

আনিকা নাওহার মুখ তুলে তাকালেন। উনার চোখের মণি দুটো হালকা বাদামি। উনি খুব মিষ্টি করে হাসলেন।

"ওহ, আপনিই রাশেদ সাহেব? আপনার কথা মতিন ভাইয়ের কাছে অনেক শুনেছি। থ্যাংক ইউ সো মাচ। আপনি খুব যত্ন করে আমার পাণ্ডুলিপির প্রুফ দেখেছেন। আমি দেখেছি, আপনি অনেকগুলো চমৎকার শব্দ ব্যবহার করে আমার কিছু লাইনের ইমপ্রুভমেন্টও করেছেন।"

উনার গলার স্বরটা খুব মোহনীয়। বাংলা উচ্চারণে সামান্যতম কোনো বিদেশি টান নেই। একদম নিখুঁত, প্রমিত বাংলা।

আমি একটু অপ্রস্তুত বোধ করলাম। আমার পকেটে পঁচিশ হাজার টাকার বাজেট, মেসে রাজুর বুরকিনা ফাসোর রাজধানী মুখস্থ করা আর অফিসে মামুনের বালতিতে লাথি মারা— এসবের মাঝখান থেকে উঠে এসে হঠাৎ করে এরকম একজন অপরূপা, সুশিক্ষিত এবং অভিজাত নারীর সামনে দাঁড়িয়ে থাকাটা একটু কেমন যেন পরাবাস্তব মনে হচ্ছিল।

আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম, "ধন্যবাদ। আপনার কবিতাগুলো আসলে বেশ ভালো। প্রুফ দেখার সময় আমাকে খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি। বানান ভুল প্রায় ছিলই না।"

আনিকা নাওহার আরেকটু হাসলেন। "আমি তো বছরে একবার আসি দেশে। বাংলা ভাষার চর্চাটা ওভাবে হয় না লন্ডনে। তাই একটু ভয়েই ছিলাম।"

মতিন সাহেব ঘড়ি দেখে বললেন, "চলুন আপা, বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে। আমরা প্রোগ্রামটা শুরু করে দিই।"

প্রকাশনীর সামনের দিকের বড় রুমটায় তখন জনা বিশেক মানুষ জড়ো হয়েছেন। এদের মধ্যে কয়েকজন বয়স্ক কবি, কয়েকজন তরুণ সাহিত্যিক এবং কিছু পত্রিকা অফিসের সাহিত্য পাতার লোক।

সামনে একটা ছোট টেবিল রাখা। সেখানে আনিকা নাওহারের ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’ বইয়ের কয়েকটা কপি সাজানো। আমাকে এবং আনিকা নাওহারকে পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসানো হলো। আমার গা ঘেঁষেই উনি বসেছেন। উনার পারফিউমের দামি সুবাসটা আমার স্নায়ুকে কিছুটা হলেও এলোমেলো করে দিচ্ছে।

অনুষ্ঠান শুরু হলো। মতিন সাহেব ছোট্ট একটা স্বাগত বক্তব্য দিলেন। এরপর একজন বয়স্ক কবি আনিকা নাওহারের সাহিত্যচর্চা নিয়ে বেশ কিছু ভারিক্কি কথা বললেন, যার অর্ধেকই আমি বুঝতে পারলাম না।

এরপর মতিন সাহেব আমার দিকে তাকালেন। "এবার আমাদের তরুণ অনুবাদক এবং প্রুফরিডার রাশেদ আহমেদ বইটির ওপর তার পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাবেন।"

আমি আস্তে করে উঠে দাঁড়ালাম। আমি জানি, এই ধরনের জায়গায় কী বলতে হয়। আমি গলাটা একটু খাদে নামিয়ে, অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বলতে শুরু করলাম।

"উপস্থিত সবাইকে শুভ সন্ধ্যা। আনিকা নাওহারের ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’ বইটির পাণ্ডুলিপি পড়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমরা যারা ঢাকা শহরে থাকি, আমাদের চারপাশের বাস্তবতা বড়ই রূঢ়। কিন্তু আনিকা নাওহার যখন সুদূর ইংল্যান্ডে বসে কবিতা লেখেন, তখন তার কবিতায় আমরা এক ধরনের প্রবাসকালীন বিচ্ছিন্নতাবোধ বা ডায়াসপোরা (Diaspora) দেখতে পাই। এই শূন্যতা শুধু ব্যক্তির নয়, এই শূন্যতা যেন পুরো আধুনিক সভ্যতার।"

আমি আড়চোখে আনিকা নাওহারের দিকে তাকালাম। উনি খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছেন। উনার চোখে একটা মুগ্ধতার আবেশ।

আমি চালিয়ে গেলাম, "উনার কবিতায় শব্দচয়ন খুব সহজ, কিন্তু তার ভেতরের অর্থ অনেক গভীর। যেমন একটা কবিতায় উনি বলেছেন, ‘আমি আয়নায় নিজেকে দেখি, কিন্তু ছায়াটা আমার নয়’। এই যে আত্মপরিচয়ের সংকট, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, এটাই উনার কবিতার মূল সুর। আমি মনে করি, এই বইটি আমাদের সমসাময়িক বাংলা কবিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে থাকবে।"

আমি বক্তব্য শেষ করে বসলাম। সবাই হাততালি দিল। আনিকা নাওহার আমার দিকে সামান্য ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বললেন, "অসাধারণ বলেছেন আপনি। আমার নিজের কবিতায় যে এত গভীরতা আছে, সেটা আমি নিজেও জানতাম না।"

উনার বলার ভঙ্গিতে একটা সূক্ষ্ম হিউমার ছিল। আমি বুঝতে পারলাম, এই নারী শুধু সুন্দরীই নন, যথেষ্ট বুদ্ধিমতী এবং রসিকও। আমি মৃদু হেসে বললাম, "সমালোচকদের কাজই হলো লেখকের না-জানা কথাগুলো বানিয়ে বানিয়ে বলা।"

আনিকা নাওহার এবার শব্দ করে হেসে উঠলেন।

আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন শেষ হলো। বইয়ের ফিতা কাটা হলো। এরপর শুরু হলো চা-চক্র। সিউডোর আঠা আর বইয়ের গন্ধের সাথে এবার সিঙারা আর চায়ের গন্ধ যোগ হলো। সবাই আনিকা নাওহারকে ঘিরে ধরেছে অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য।

আমি ভিড় থেকে একটু দূরে, একটা বুকশেলফে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলাম আর সিঙারায় কামড় দিচ্ছিলাম। আমার কাজ শেষ। এখন আমার মেসের দিকে রওনা হওয়ার কথা।

হঠাৎ দেখলাম আনিকা নাওহার ভিড় ঠেলে আমার দিকেই এগিয়ে আসছেন। উনার হাতে উনার বইয়ের একটা কপি। শাড়ির আঁচলটা আলতো করে এক হাতে ধরা। হাঁটার সময় উনার শরীরের নিখুঁত ঢেউগুলো খুব সুন্দর একটা ছন্দের সৃষ্টি করছে।

উনার দিকে তাকিয়ে আমার মিরপুরের মেসের কথা মনে পড়ল। এই মহিলার সাথে আমার কোনোভাবেই কোনো সংযোগ হতে পারে না। আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই গ্রহের বাসিন্দা।

উনি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। "রাশেদ সাহেব, আপনি পালিয়ে যাচ্ছেন না তো?"

আমি সিঙারার শেষ অংশটুকু গিলে বললাম, "পালিয়ে যাব কেন? আমার কাজ তো শেষ। চা খাচ্ছিলাম।"

উনি বইটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। "এটা আপনার জন্য। আমি অটোগ্রাফ দিয়েছি। যদিও আপনি প্রুফ দেখার সময় পুরোটা পড়েছেন, তবুও লেখকের নিজের হাতের একটা কপি আপনার কাছে থাকা উচিত।"

আমি বইটা নিলাম। প্রথম পাতায় খুব সুন্দর পেঁচানো অক্ষরে লেখা— ‘রাশেদ আহমেদকে, যিনি আমার কবিতার ভেতরের শূন্যতাটুকু এত সুন্দর করে ধরতে পেরেছেন। শুভকামনা— আনিকা নাওহার।’

আমি বললাম, "অনেক ধন্যবাদ। বইটা আমি সযত্নে রাখব।"

"আমি আসলে আপনার সাথে একটু কথা বলতে চাইছিলাম," আনিকা একটু ইতস্তত করে বললেন।

"বলুন।"


"আমি আমার পরের বইয়ের কাজ শুরু করেছি। একটা উপন্যাস।"

"খুব ভালো কথা।"

"আমি চাই, আমার ওই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিটাও আপনি এডিট করে দিন। মানে, প্রুফ দেখা আর ভাষাটা একটু ঠিকঠাক করে দেওয়া। আমি মতিন ভাইকে বলেছিলাম, কিন্তু উনি বললেন আপনি নাকি খুব ব্যস্ত থাকেন। তাই সরাসরি আপনাকে বলা।"

আমি একটু অবাক হলাম। আমার মতো একজন সাধারণ অনুবাদকের কাছে একজন লন্ডনপ্রবাসী সুন্দরী লেখিকা সরাসরি কাজ চাইছেন।


আমি বললাম, "ব্যস্ত থাকি ঠিকই, তবে সময় বের করা যাবে। আপনি পাণ্ডুলিপি পাঠালে আমি দেখে দেব।"

"দ্যাটস গ্রেট!" আনিকার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। "আমি কি আপনার ফোন নাম্বারটা পেতে পারি? মানে, আমি তো হোয়াটসঅ্যাপেই স্ক্রিপ্ট পাঠাব। আপনার সাথে যোগাযোগ রাখতে সুবিধা হবে।"

একজন অপরূপা নারী নিজে থেকে ফোন নাম্বার চাইছে, আর আমি ঢাকা শহরের একজন সামান্য ব্যাচেলর মানুষ হয়ে সেটা দেব না— এমন বোকা আমি নই।

আমি বললাম, "অবশ্যই।"

আমি আমার নাম্বারটা বললাম। আনিকা নিজের আইফোন বের করে নাম্বারটা সেভ করে নিলেন।

"আমি আপনাকে একটা মিসড কল দিয়ে রাখছি। আমার নাম্বারটা সেভ করে নিয়েন। আনিকা নামে।"

আমার পুরনো শাওমি ফোনটা বেজে উঠল। আমি স্ক্রিনে দেখলাম একটা আননোন নাম্বার।

"পেয়েছি," আমি বললাম।

"ওকে রাশেদ। আমি পাণ্ডুলিপি রেডি করে আপনাকে হোয়াটসঅ্যাপে নক করব। আর হ্যাঁ, আপনার আজকের স্পিচটা সত্যিই খুব দারুণ ছিল।"

আনিকা নাওহার আবার ভিড়ের ভেতর হারিয়ে গেলেন। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার হাতের তালুতে উনার দেওয়া বইটার স্পর্শ। বাতাসে তখনো উনার পারফিউমের হালকা সুবাস লেগে আছে। ৩৬-২৮-৩৬ এর এক অদ্ভুত রহস্যময়ী নারী, যিনি ইংল্যান্ডে আইটি ফার্ম চালান, আবার বাংলায় শূন্যতার কবিতা লেখেন।

আমি প্রকাশনীর অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এলাম। রাত আটটা বাজে। কাঁটাবনের রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সবকিছু একটু ঘোলাটে লাগছে।
আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। কল হিস্ট্রিতে গিয়ে সর্বশেষ নাম্বারটা সেভ করলাম। ‘Anika Nawhar’.

নামটা সেভ করার সময় আমার মনের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। আমার একঘেয়ে, রুটিনবাঁধা জীবনে, যেখানে কিম জং উনের মিসাইল, নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ আর মেসের বাথরুমের লাইন ছাড়া আর কিছু ছিল না— সেখানে হঠাৎ করে একটা খুব দামি পারফিউম মাখা, মেরুন শাড়ি পরা আভিজাত্য এসে উঁকি দিয়েছে।

আমি একটা সিগারেট ধরালাম। ধোঁয়া ছেড়ে আকাশের দিকে তাকালাম। ঢাকা শহরের আকাশে তারা দেখা যায় না। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, ধোঁয়ার আড়ালে কোথাও হয়তো দু-একটা তারা জ্বলজ্বল করছে।


 
মানুষ হিসেবে আমি অত্যন্ত বিরক্তিকর। কথাটা আমি কোনো বিনয় দেখানোর জন্য বলছি না। আমি আসলেই বিরক্তিকর একজন মানুষ। আমার জীবনে কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো গভীর ট্র্যাজেডি নেই, এমনকি উল্লেখ করার মতো কোনো রোমাঞ্চও নেই। একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট হিসেবে আমার জীবন নিয়ে যদি কোনো পরিচালক সিনেমা বানাতে চান, তবে সেই সিনেমার প্রথম দশ মিনিটেই দর্শকরা ঘুমিয়ে পড়বে এবং পরিচালককে টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য হলের বাইরে বিক্ষোভ হবে।

আমার প্রতিদিনের রুটিন একটা ফটোকপি মেশিনের মতো। সকালে উঠি, রহিমা খালার রান্না করা আগের রাতের বাসি তরকারি দিয়ে দুটা রুটি খাই, মিরপুর দশ নাম্বার থেকে কনুই চালিয়ে বিকল্প বাসে উঠি, কারওয়ান বাজারে অফিসে যাই, ল্যাপটপের সামনে বসে দুনিয়ার তাবৎ খবর বাংলায় অনুবাদ করি, তারপর আবার বাসের হাতল ধরে ঝুলে ঝুলে মেসে ফিরে আসি। এর মধ্যে কোনো থ্রিল নেই।

আমি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে বসে প্রতিদিন দেখি পৃথিবীতে কত কী ঘটে যাচ্ছে! ফ্রান্সে দাঙ্গা হচ্ছে, মেক্সিকোতে মাফিয়ারা পুলিশের সাথে গুলি বিনিময় করছে, জাপানে ভূমিকম্প হচ্ছে, আমেরিকায় কোনো এক সিরিয়াল কিলার ধরা পড়ছে। এই পুরো পৃথিবীটা একটা বিশাল অ্যাকশন মুভি। আর সেই মুভির এক কোণায়, মিরপুরের একটা স্যাঁতস্যাঁতে মেসের বাসিন্দা রাশেদ আহমেদ অত্যন্ত শান্তিতে তার একঘেয়ে, বিরক্তিকর জীবন পার করছে।

আমার এই একঘেয়ে জীবন নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। বরং আমি এটাই পছন্দ করি। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি একটা শামুকের মতো। নিজের খোলসের ভেতর গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকতেই আমার সবচেয়ে বেশি আরাম লাগে। খোলস থেকে মাথা বের করলেই বাইরের পৃথিবীর রোদে আমার চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

ঢাকা শহরে আমার চেনাজানার পরিধি নেহাত ছোট না। সাংবাদিকতার সাথে (পড়ুন, অনুবাদের সাথে) যুক্ত থাকার কারণে, আর চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীতে যাতায়াতের সুবাদে আমার ফোনবুকে কয়েকশ মানুষের নাম্বার সেভ করা আছে। রাস্তাঘাটে বের হলে অনেকেই হাত তুলে বলে, ‘কী অবস্থা রাশেদ ভাই?’ আমিও দাঁত বের করে হাসি, বলি, ‘এই তো ভাই, চলছে। আপনার খবর কী?’

কিন্তু এই ‘চেনাজানা’ মানুষগুলোর মধ্যে আমার একজনও ‘বন্ধু’ নেই।

বন্ধু বলতে আমি সেই মানুষটাকে বুঝি, যাকে রাত তিনটার সময় ফোন করে বলা যায়, ‘দোস্ত, আমার খুব মন খারাপ, তুই আয়।’ আমার ফোনবুকে এমন কোনো নাম্বার নেই। আর সত্যি কথা বলতে কী, আমার কখনো কাউকে রাত তিনটায় ফোন করার প্রয়োজনও পড়ে না। আমার মন খারাপ হলে আমি কাউকে ডাকি না। আমি চুপচাপ বারান্দায় ইজি চেয়ারটায় বসে একটা সিগারেট ধরাই। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আকাশের দিকে তাকাই। ঢাকা শহরের আকাশে তারা দেখা যায় না, কিন্তু আমি মনে মনে কয়েকটা তারা বসিয়ে নিই। আমার কাছে নিজের সঙ্গটাই সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়।

মানুষের সঙ্গ আমার খুব একটা পছন্দ না। আমি গভীর সম্পর্ক ভয় পাই। গভীর সম্পর্ক মানেই হলো দায়িত্ব, প্রত্যাশা আর দিন শেষে একগাদা অভিমান। আমি হালকা কথাবার্তাতেই সবচেয়ে বেশি খুশি। ওই যে, রাস্তায় দেখা হলে ‘কেমন আছেন’, ‘দিনকাল কেমন যাচ্ছে’, ‘বাসায় সব ভালো তো’— এই ধরনের কথা। এই কথাগুলোর কোনো ওজন নেই। এগুলো বাতাসের মতো। বললাম, আর মিলিয়ে গেল। কেউ কারো কাছে কোনো জবাবদিহিতার মধ্যে থাকল না।

আজ অফিসে এসে ল্যাপটপ খুলেই আমি একটা অদ্ভুত খবর পেলাম। রয়টার্সের নিউজ। জাপানের টোকিও শহরে এক লোক নিজেকে ভাড়া দেয়। তার কাজ হলো, যাদের বন্ধু নেই বা যারা একা, তাদের সাথে সময় কাটানো। সে কোনো কথা বলে না, কোনো উপদেশ দেয় না। শুধু চুপচাপ পাশে বসে থাকে। ক্লায়েন্ট চাইলে সে তার সাথে কফি খায় বা পার্কে হাঁটে। এর বিনিময়ে সে প্রতি ঘণ্টায় দশ হাজার ইয়েন চার্জ করে।

খবরটা অনুবাদ করতে করতে আমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। আমি মনে মনে ভাবলাম, লোকটার পেশাটা তো দারুণ! আমার চরিত্রের সাথে একদম মানিয়ে যায়। আমিও তো চুপচাপ থাকতে পছন্দ করি। টোকিওতে থাকলে হয়তো আমিও ভালো একটা ব্যবসা করতে পারতাম।

আমার পাশের ডেস্কে মামুন বসে আছে। সেও একটা নিউজ নিয়ে খুব গম্ভীর।

আমি বললাম, "মামুন, কী নিউজ করছ?"

মামুন চোখ না তুলেই বলল, "ভাই, ফ্লোরিডায় এক লোক তার পোষা কুমিরের সাথে বিয়ে করেছে। কুমিরের নাম ডেইজি। লোকটা কুমিরটাকে ওয়েডিং গাউন পরিয়ে চার্চে নিয়ে গেছে।"

"খুবই ভালো খবর। তা তুমি কি অনুবাদ করছ?"

মামুন গর্বের সাথে বলল, "আমি হেডলাইন দিয়েছি— 'ফ্লোরিডায় কুমিরের গলায় বরমাল্য, ভালোবাসার জয়'।"

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "মামুন, কুমিরের গলায় বরমাল্য দিলে কুমির যদি বরের মাথা কামড়ে ধরে, তখন ভালোবাসার জয়টা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? তুমি হেডলাইন দাও— 'পোষা কুমিরকে বিয়ে এক ব্যক্তির'।"

মামুন একটু হতাশ হলো। "ভাই, আপনার নিউজে কোনো ইমোশন নাই। আপনি একদম শুকনা মানুষ। সব কিছুতেই আপনি এত ফ্যাক্ট খোঁজেন কেন?"

মামুনের কথা খুব একটা ভুল না। আমি আসলেই শুকনা মানুষ। আমার ভেতরে ইমোশনের পরিমাণ খুবই কম।


আমাদের অফিসে বেশ কয়েকজন নারী, তরুণী এবং মেয়ে কলিগ আছেন। একটা পত্রিকা অফিসে সব ধরনের মানুষই থাকে। এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্কে আছে নিতি। মেয়েটা সারাদিন বলিউড আর হলিউডের গসিপ নিয়ে পড়ে থাকে। তার ঠোঁটে সবসময় কড়া লাল লিপস্টিক থাকে আর চোখে থাকে রাজ্যের কৌতূহল। সে মাঝে মাঝে আমার ডেস্কে এসে দাঁড়ায়।

"রাশেদ ভাই, আপনার কাছে কি টাইপ-সি চার্জার হবে?" নিতি চুইংগাম চিবাতে চিবাতে জিজ্ঞেস করে।

আমি ড্রয়ার থেকে চার্জারটা বের করে দিই।

"থ্যাংক ইউ ভাই! জানেন, আজকে দীপিকা পাড়ুকোনের একটা ইন্টারভিউ পড়লাম। মেয়েটা যা না স্মার্ট! আপনার দীপিকাকে কেমন লাগে?"

আমি খুব নিরাসক্ত গলায় বলি, "ভালো।"

"শুধু ভালো? আরে, শি ইজ আ গডেস! আপনি এমন কেন ভাই? কোনো কিছু নিয়েই আপনার কোনো এক্সাইটমেন্ট নাই।"

নিতি চার্জার নিয়ে চলে যায়। আমি আবার আমার কাজে মন দিই।

ন্যাশনাল ডেস্কে আছেন ফারহানা আপা। উনার বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক আগে। উনার দুনিয়া উনার স্বামীকে ঘিরে। উনি মাঝে মাঝে টিফিন বক্সে করে বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসেন। খাওয়ার সময় আমাকে ডাকেন।

"রাশেদ, এদিকে আসো। আজ তোমার ভাইয়ার পছন্দের খমাংসের ভুনা এনেছি। খেয়ে দেখো তো কেমন হয়েছে।"

আমি এক টুকরো মাংস মুখে দিয়ে বলি, "খুব ভালো হয়েছে আপা।"

"তোমার ভাইয়া তো এক বসায় চার পিস মাংস খেয়ে ফেলে। সে আবার একটু ঝাল বেশি পছন্দ করে।"


আমি মাথা নাড়ি। ফারহানা আপার স্বামীর ঝাল খাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, কিন্তু আমি সেটা প্রকাশ করি না। আমি হালকা হাসিমুখে উনার কথা শুনি।

এই যে নিতি বা ফারহানা আপা— এদের সবার সাথেই আমার সম্পর্ক এই পর্যন্তই। অফিসে দেখা হলে হাসি বিনিময় করা, কেউ কিছু খেতে দিলে খাওয়া, আর ফেসবুকের কল্যাণে কারো জন্মদিন হলে টাইমলাইনে গিয়ে একটা দায়সারা ‘হ্যাপি বার্থডে! মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্য ডে’ লিখে দেওয়া। এর জবাবে তারা আমাকে লেখে, ‘থ্যাংক ইউ রাশেদ ভাই’। ব্যস, সম্পর্ক শেষ। পরের বছর জন্মদিনের আগ পর্যন্ত এই সম্পর্কের আর কোনো অগ্রগতি হয় না।

আমার জীবন এভাবেই খুব মসৃণভাবে, কোনো ঢেউ ছাড়া গড়িয়ে যাচ্ছে।কিন্তু সম্প্রতি এই মসৃণ জীবনে একটা ছোটখাটো ঢেউ তোলার চেষ্টা করছেন আমার মা। মা ইদানীং ফোনে কথা বলার সময় কথায় কথায় বিয়ের প্রসঙ্গ টানছেন। সরাসরি কিছু বলেন না, আকার-ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করেন।

আজ দুপুরে খাওয়ার পর পরই মায়ের ফোন। আমি তখন অফিসের লাউঞ্জে বসে চা খাচ্ছিলাম।

"হ্যালো মা, বলো।"

"রাশেদ, খেয়েছিস?" মায়ের গলার স্বর খুব নরম। এই নরম স্বরের মানেই হলো সামনে কোনো কঠিন কথা আসছে।

"হ্যাঁ মা, এইমাত্র খেলাম। তুমি খেয়েছ?"

"আমি আর কী খাব! বয়স হচ্ছে, শরীরে নানান রোগবালাই বাসা বাঁধছে। আজ সকালে তোর ছোট ফুপুর সাথে কথা হলো।"

"ফুপুর কী অবস্থা?"

"ফুপুর অবস্থা তো ভালো। ফুপাতো ভাই সুমনের তো ছেলে হলো কালকে। ফুটফুটে একটা বাচ্চা। সুমন তো তোর চেয়ে দুই বছরের ছোট। সে এখন সন্তানের বাবা হয়ে গেল।"


আমি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলাম। "খুব ভালো খবর। সুমনকে আমার হয়ে কংগ্র্যাচুলেট করো। আমি পরে ওকে ফোন দিয়ে দেব।"

মা এবার মোক্ষম চালটা চাললেন। "সুমনের ছেলে হয়েছে, আর তুই এখনো মিরপুরের মেসে পড়ে আছিস। তোর তো এখন বয়স কম হলো না। উনত্রিশ পার হয়ে যাচ্ছে। আর কতদিন এভাবে একা একা থাকবি? এবার তো একটা সংসার করা দরকার।"

আমি শান্ত গলায় বললাম, "মা, সংসার করার জন্য যে যোগ্যতা লাগে, সেটা আমার এখনো হয়নি।"

মা রেগে গেলেন। "কীসের যোগ্যতা? তোর কি হাত-পা নেই? তুই কি চাকরি করিস না? মাসে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা বেতন পাস। ঢাকা শহরে একটা স্বামী-স্ত্রী চলার জন্য এই টাকা যথেষ্ট।"

"মা, সংসারের যোগ্যতা মানে শুধু টাকা না। সংসারের যোগ্যতা হলো ম্যাচুরিটি। মানসিক পরিপক্বতা। আমার মনে হয় না আমার সেই ম্যাচুরিটি এখনো এসেছে।"

"এসব তুই বইয়ের ভাষায় কথা বলছিস। বিয়ে করলে সব ম্যাচুরিটি এমনিতেই চলে আসবে। মানুষ কি শিখে তারপর বিয়ে করে? বিয়ে করার পর শেখে।"

"মা, এটা তো কোনো ড্রাইভিং কলেজ না যে রাস্তায় গাড়ি নামিয়ে তারপর ধাক্কা খেতে খেতে চালানো শিখব। এটা আরেকজন মানুষের জীবনের ব্যাপার। আপাতত আমি এসব নিয়ে ভাবছি না।"

মা একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "তুই বুঝবি না। আমরা মরে গেলে যখন দুনিয়ায় তোর আপন বলতে কেউ থাকবে না, তখন বুঝবি একা থাকার কী কষ্ট।"

মায়েরা এই একটা জায়গায় এসে খুব সুন্দর ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করতে পারেন। আমি আর কথা বাড়ালাম না। মাকে শান্ত করে ফোনটা কেটে দিলাম।
ফোন কেটে আমি লাউঞ্জের কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরের কারওয়ান বাজারের ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
[+] 5 users Like Orbachin's post
Like Reply
#11
চমৎকার শুরু..... চালিয়ে যান.....
Like Reply
#12
অস্থির ভাই
Like Reply
#13
Darun
Like Reply
#14
খুব ভালো লাগলো পড়ে।
Like Reply
#15
Valo update
Like Reply
#16
excellent writing keep going on
Like Reply
#17
Valo laglo
Like Reply
#18
অসাধারণ। আপনার লিখার প্রতিভা আছে। লিখার স্টাইলটাও দারুন। আপনি মেইনস্ট্রিম লেখক হবার চেষ্টা করুন।
Like Reply
#19
৪।
মায়ের কথাটা আমি একদম উড়িয়ে দিতে পারিনা। সমাজে থাকতে গেলে বিয়ে-শাদি নিশ্চয়ই করতে হবে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থাটাই এমনভাবে তৈরি যে, আপনি সারাজীবন একা থাকতে পারবেন না। একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর আপনি যদি একা থাকেন, সমাজ আপনাকে বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করবে। লোকে ভাববে আপনার চরিত্রে কোনো সমস্যা আছে, অথবা আপনার শারীরিক কোনো অক্ষমতা আছে। সমাজ চায় সবাই একটা ছাঁচে ঢালা জীবন পার করুক। পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে, বাচ্চা, রিটায়ারমেন্ট এবং মৃত্যু। এর বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।

আমি জানি, আমাকেও কোনো একদিন এই সিস্টেমের কাছে মাথা নত করতে হবে। কোনো একদিন আমাকেও একটা বিয়ের পিঁড়িতে গিয়ে বসতে হবে। কিন্তু আপাতত না। আমি এখনো নিজের সাথে জীবন কাটানোটা উপভোগ করছি।


তবে একটা মানুষের সাথে জীবন শেয়ার করা মানে কী?

এর মানে হলো, আপনার একান্ত ব্যক্তিগত শূন্যতাটুকু অন্য একজনকে ভাগ করে দেওয়া। আপনার বাথরুম, আপনার বিছানা, আপনার পড়ার টেবিল— সবকিছুতে অন্য একজনের অস্তিত্ব মেনে নেওয়া। আমি কি এর জন্য প্রস্তুত?

আমার মনে হয়, আমি এখনো ভেতর থেকে একটা অপরিণত বালক হয়ে আছি। যে বালক প্রতিদিন সকালে উঠে অফিসে আসে, গম্ভীর মুখে কি-বোর্ডে আঙুল চালিয়ে বিশ্বের বড় বড় খবর অনুবাদ করে, কিন্তু দিন শেষে সে চায় কেউ তাকে বিরক্ত না করুক। সে চায় নিজের একটা জগৎ, যেখানে সে একা।

অফিসে আমার নারী কলিগদের দিকে তাকালে আমার কখনোই মনে হয়নি, এদের কারো সাথে জীবন শেয়ার করা যায়। নিতি, ফারহানা আপা বা অন্য যারা আছেন— তারা সবাই ভালো মানুষ। কিন্তু তাদের সাথে জীবন কাটানোর কথা ভাবলে আমার কেন যেন দমবন্ধ লাগে। আমার মনে হয়, এদের সাথে বিয়ে হলে আমাকে সারাজীবন শাহরুখ খানের সিনেমার রিভিউ শুনতে হবে, অথবা গরুর মাংসের ভুনার রেসিপি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

এই যে ‘ম্যাচুরিটি’ বা পরিপক্বতার কথা আমি মাকে বললাম, এই জিনিসটা আসলে কী? হঠাৎ করে আমার চোখের সামনে আনিকা নাওহারের মুখটা ভেসে উঠল।

গত মঙ্গলবার চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর সেই ছোট্ট কেবিনটায় আমি যে নারীটিকে দেখেছিলাম। ছত্রিশ বছর বয়সী এক পরিপূর্ণ নারী। উনার দিকে তাকিয়ে আমার একবারের জন্যও মনে হয়নি যে উনি কোনো অপরিণত বা অগভীর মানুষ। উনার বসার ভঙ্গি, উনার শাড়ির আঁচল টেনে নেওয়ার ধরন, এমনকি উনার চোখের শান্ত দৃষ্টি— সবকিছুর মধ্যে একটা দারুণ আভিজাত্য এবং মানসিক পরিপক্বতা ছিল।

আমি মনে মনে একটা অদ্ভুত হিসাব মেলাতে শুরু করলাম। আমি যদি কখনো বিয়ে করি, তবে আমার এমন কাউকেই দরকার। যার সাথে কথা বলার জন্য আমাকে শাহরুখ খানের সাহায্য নিতে হবে না। যার সাথে আমি চুপচাপ বসে থাকলেও মনে হবে না যে আমি সময় নষ্ট করছি। আনিকা নাওহারের মতো রূপবতী, গুণবতী, আকর্ষণীয় এবং পরিণত (Mature) কাউকে যদি আমি বিয়ে করতে পারতাম, তবে বিষয়টা মন্দ হতো না।

উনার শারীরিক গঠন, ওই যে ৩৬-২৮-৩৬ এর নিখুঁত জ্যামিতি— সেটা শুধু একটা বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়। আমার মনে হয়, একজন নারীর শরীর যখন তার বয়সের সাথে সাথে পূর্ণতা পায়, তখন তার মনটাও পূর্ণতা পায়। আনিকা নাওহারের সেই পূর্ণতাটুকু আছে। উনার সাথে কথা বলার সময় মনে হচ্ছিল, আমি এমন একজনের সাথে কথা বলছি যে আমার প্রতিটি কথার ওজন বুঝতে পারছে। উনার পারফিউমের সেই হালকা শ্যানেল বা ডিওর-এর সুবাসটা আমার মাথার ভেতর এখনো মাঝেমধ্যে হানা দেয়।

আমি জানি, আনিকা নাওহারের মতো কাউকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আর আনিকা নাওহারকে তো নয়ই। আমি জানি উনি বিবাহিতা। চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর মতিন সাহেবের সাথে একদিন কথার ছলে জেনেছিলাম। মতিন সাহেব বলেছিলেন, "আনিকা আপার হাসব্যান্ড তো অনেক বড় ইঞ্জিনিয়ার। লন্ডনে উনাদের বিশাল বাড়ি। আপা তো শখে লেখালেখি করেন।"

সুতরাং আনিকা নাওহার আমার কাছে একটা সুন্দর স্বপ্নের মতো। একটা স্ট্যান্ডার্ড। যদি কখনো বিয়ে করতেই হয়, তবে আমি এমন কাউকেই খুঁজব, যার ভেতরে আনিকা নাওহারের মতো একটা স্থিরতা আছে। যে আমাকে আমার মতো থাকতে দেবে, আবার একই সাথে আমার একাকীত্বটাকে একটা সুন্দর সঙ্গ দিয়ে ভরিয়ে তুলবে।

আমি লাউঞ্জ থেকে উঠে আবার আমার ডেস্কে ফিরে এলাম। ল্যাপটপের স্ক্রিনে একটা নতুন নিউজ এসেছে। স্পেনের মাদ্রিদে এক লোক তার বাড়ির ছাদে একটা বিশাল টেলিস্কোপ বানিয়েছে, শুধু মঙ্গল গ্রহ দেখার জন্য। তার দাবি, মঙ্গল গ্রহে নাকি মানুষের চেয়েও উন্নত কোনো প্রাণী আছে।

আমি কি-বোর্ডে হাত রাখলাম। স্পেনের লোকটার মঙ্গল গ্রহের প্রতি এই আকর্ষণ দেখে আমার হাসি পেল। মানুষ নিজের পৃথিবীর মানুষদের সাথে ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারে না, অথচ কোটি কোটি মাইল দূরের মঙ্গল গ্রহের প্রাণীর সাথে যোগাযোগ করার জন্য টেলিস্কোপ বানিয়ে বসে আছে!আমি অনুবাদ করতে শুরু করলাম।

"স্পেনের মাদ্রিদ শহরের এক বাসিন্দা মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন..."

অফিস শেষ করে মেসে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে গেল। আজ মেসে রহিমা খালা আসেননি। তুহিন আর রাজু মিলে ডিম ভাজি আর ডাল রান্না করেছে। আমি চুপচাপ তাদের সাথে খেতে বসলাম।

তুহিন খেতে খেতে বলল, "রাশেদ ভাই, আপনি তো নিউজ করেন। আপনি কি জানেন কানাডায় ইমিগ্রেশনের নতুন রুলস কী?"

আমি ভাতে ডাল মাখাতে মাখাতে বললাম, "তুহিন, আমি ইন্টারন্যাশনাল নিউজ অনুবাদ করি, ইমিগ্রেশন কনসালটেন্সি করি না। তুমি গুগলে সার্চ করলেই তো পারো।"

রাজু ডিমের কুসুমটা মুখে দিয়ে বলল, "রাশেদ ভাইয়ের তো কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। উনি মিরপুরের মেসে বসে সারা জীবন কাটিয়ে দেবেন। তাই না ভাই?"

আমি হাসলাম। কোনো উত্তর দিলাম না। রাজু কথাটা খুব একটা ভুল বলেনি।আমার আসলেই কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। আমি শুধু চাই, আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে তিন লাখ টাকা জমুক, বাবা-মা উমরাহ করে আসুক, আর আমি আমার এই শান্ত, বিরক্তিকর জীবনে প্রতিদিন সকালে উঠে এক কাপ চা খেয়ে অফিসে যাই।

খাওয়া শেষ করে আমি বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। মিরপুরের রাস্তায় তখনো প্রচুর গাড়ি। সিএনজির হর্ন আর বাসের ইঞ্জিনের শব্দে চারপাশ মুখরিত। আমি পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম। সিগারেটের ধোঁয়াটা বাতাসের সাথে মিশে যাচ্ছে।

আকাশে আজ মেঘ নেই। দূর থেকে ঢাকা শহরের সোডিয়াম বাতিগুলোকে মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীতে নেমে আসা এক ঝাঁক ক্লান্ত তারা। 




মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কীএই অতি গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং দার্শনিক প্রশ্নটা সাধারণত মানুষের মাথায় আসে গভীর রাতে। যখন চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকে, ঘরের ভেতর টিকটিকি পোকা ধরার জন্য ওত পেতে থাকে, আর মানুষের চোখে ঘুম থাকে না— ঠিক তখন। কিন্তু আমার মাথায় এই প্রশ্নটা এল সকালবেলা, মিরপুর দশ নাম্বারের গোলচত্বরে দাঁড়িয়ে ‘বিকল্প অটো’ বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময়।

চারপাশের দিকে তাকালে জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে বিভ্রান্ত হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। আমার সামনে দিয়ে একটা লোক এক কাঁধে মুরগির খাঁচা আর অন্য কাঁধে সবজির বস্তা নিয়ে দৌড়াচ্ছে। তার জীবনের এই মুহূর্তের উদ্দেশ্য হলো কাওরান বাজারে গিয়ে এগুলো বিক্রি করা। একটু দূরে এক ট্রাফিক পুলিশ অত্যন্ত বিরক্ত মুখে হাত নেড়ে একটা রিকশাকে থামাচ্ছেন। তার জীবনের উদ্দেশ্য হলো এই জ্যাম কমানো, অথবা রিকশাওয়ালার কাছ থেকে বিশ টাকা জরিমানা আদায় করা।

কিন্তু সামগ্রিকভাবে, একটা মানুষের জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী? আমি বাস থেকে ধাক্কাধাক্কি করে ওঠার সময় এই বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলাম। বাসে আজ বসার সিট পাইনি। একটা রডের হ্যান্ডেল ধরে বাদুড়ের মতো ঝুলে আছি। আমার ঠিক নিচে বসা এক ভদ্রলোক পত্রিকা পড়ছেন। পত্রিকার হেডলাইন— ‘শেয়ারবাজারে ধস, কোটিপতি থেকে রাস্তায়’।

আমি ভাবলাম, এই যে আমরা প্রতিদিন সকালে উঠে গাধার মতো খাটছি, মাস শেষে কিছু টাকা পাচ্ছি, আবার সেই টাকা দিয়ে চাল-ডাল কিনছি— এর শেষ কোথায়?

কেউ কেউ বলেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে মহৎ উদ্দেশ্য হলো নিজের বাবা-মাকে দেখে রাখা। কথাটা অবশ্যই খুব সুন্দর এবং পবিত্র। আমার নিজের জীবনের বর্তমান উদ্দেশ্যও অনেকটা সেরকমই। আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে তিন লাখ টাকা জমবে, আর আমি আমার বাবা-মাকে মক্কায় উমরাহ করতে পাঠাব। এটা ভেবে আমি এক ধরনের মানসিক শান্তি পাই।

কিন্তু আমি যদি লজিক দিয়ে চিন্তা করি
, তাহলে এখানে একটা বড় ফাঁকি আছে। বাবা-মা তো আর অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন না। প্রকৃতির নিয়মেই তারা একদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন। তখন কী হবে? তখন কি আমার জীবনের উদ্দেশ্য শেষ হয়ে যাবে? তখন আমি কী করব?

এই প্রশ্নের উত্তর সমাজ খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। সমাজ বলে, বাবা-মা চলে যাওয়ার পর তোমার জীবনের উদ্দেশ্য হবে তোমার নিজের সন্তানদের দেখে রাখা। তাদের বড় করা, পড়াশোনা করানো, মানুষের মতো মানুষ করা।

আমি বাসের হ্যান্ডেল ধরে দুলতে দুলতে ভাবলাম, এটা তো তাহলে একটা রিলে রেসের মতো হয়ে গেল! রিলে রেসে যেমন একজন দৌড়ে এসে আরেকজনের হাতে কাঠি ধরিয়ে দেয়, জীবনটাও ঠিক তাই। আমার বাবা-মা আমাকে বড় করেছেন, আমি আমার সন্তানদের বড় করব, তারা তাদের সন্তানদের বড় করবে। এটা একটা বায়োলজিক্যাল সাইকেল। এখানে মহত্ত্বের কিছু নেই। কুকুর-বিড়ালও তাদের বাচ্চাদের দেখে রাখে। তাহলে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানুষের জীবনের বিশেষ উদ্দেশ্যটা কী দাঁড়াল?

কেউ কেউ বলেন, মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য হলো অন্যের উপকার করা, মানুষের সেবা করা। যেমন মাদার তেরেসা। এই লজিকটা শুনতেও খুব ভালো লাগে। কিন্তু বাস্তব জীবনে অন্যের উপকার করাটা খুব কঠিন কাজ। আমি নিজের মেসের মিলের টাকাই ঠিকমতো হিসাব করে কুলিয়ে উঠতে পারি না, আমি আবার কার উপকার করব? বাসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘর্মাক্ত লোকটার যদি এখন পকেটমার হয়ে যায়, আমি কি নিজের পকেট থেকে তাকে টাকা দেব? দেব না। আমি বড়জোর ‘আহারে, বেচারার পকেটটা গেল’ বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলব। এর বেশি কিছু না।

আবার আরেক দলের মানুষ আছেন, যারা ভাবেন জীবন হলো অ্যাডভেঞ্চার। তারা বলেন, ‘ইউ অনলি লিভ ওয়ানস’— ইয়োলো (YOLO)। জীবন মাত্র একবার। সুতরাং এই জীবনে প্রচুর টাকা কামাতে হবে, আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে হবে, সুইজারল্যান্ডে স্কাই-ডাইভিং করতে হবে।

আমি এই ‘অ্যাডভেঞ্চার’ দলের মানুষদের কথা ভেবে একটু হাসলাম। আমার অ্যাডভেঞ্চার শুরু হয় মিরপুরের মেস থেকে কারওয়ান বাজারের অফিসে যাওয়ার পথে। বিকল্প বাসের যে ঝাঁকুনি আর ড্রাইভারের যে ব্রেক কষার স্টাইল, তাতে সুইজারল্যান্ডের স্কাই-ডাইভিংয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম থ্রিল পাওয়া যায় না। তাছাড়া, পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের ভেতর জীবন পার করা একজন অনুবাদকের কাছে অ্যাডভেঞ্চার মানে হলো মাসের পঁচিশ তারিখে পকেটে এক হাজার টাকা বেঁচে যাওয়া।

আমি একবার একটা ইংরেজি আর্টিকেলে পড়েছিলাম— 'টাইম ইজ আ ফ্ল্যাট সার্কেল'। মানুষের জীবন নাকি একটা সমতল বৃত্তের মতো। এই জীবনে আমরা যা করছি, তা আমরা বারবার করব। অনন্তকাল ধরে এই একই জিনিস ঘটতে থাকবে। আমি রাশেদ আহমেদ, একজন সাধারণ অনুবাদক, অনন্তকাল ধরে এই বিকল্প বাসে ঝুলতে ঝুলতে কারওয়ান বাজারে যাব। অনন্তকাল ধরে এহসান ভাই আমাকে তাড়া দেবেন, আর অনন্তকাল ধরে আমি কিম জং উনের মিসাইলের খবর বাংলায় অনুবাদ করব।

চিন্তাটা মাথায় আসতেই আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। অনন্তকাল ধরে একই কাজ করে যাওয়ার চেয়ে ভয়ংকর কোনো শাস্তি আর হতে পারে না। গ্রিক পুরাণের সিসিফাসের মতো, যে একটা পাথর পাহাড়ের চূড়ায় তোলে, আর সেটা আবার গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। আমার জীবনটাও কি একটা সিসিফাসের পাথর?

অফিসে যখন পৌঁছালাম, তখন সকাল দশটা বেজে দশ মিনিট। এহসান ভাই আজ একটু শান্ত আছেন। পৃথিবীর কোথাও হয়তো গতরাতে বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেনি। আমি ডেস্কে গিয়ে ল্যাপটপ অন করলাম। আমার পাশের ডেস্কে মামুন বসে আছে। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা নিউজ পড়ছে।

"কী ব্যাপার মামুন? এত সিরিয়াস কেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। মামুন আমার দিকে ফিরে তাকাল। তার চোখে এক ধরনের দার্শনিক দৃষ্টি। সে বলল, "রাশেদ ভাই, আপনি কি জানেন বিলিয়নিয়ার জেফ বেজোস তার স্ত্রীর সাথে ডিভোর্স দিয়ে নতুন একটা মেয়ের সাথে প্রেম করছে?"

আমি বললাম, "হ্যাঁ, জানি। পুরোনো খবর। তো এতে তোমার এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে? জেফ বেজোস কি তার সম্পত্তির কোনো অংশ তোমাকে লিখে দিচ্ছে?"

মামুন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ভাই, সম্পত্তির কথা হচ্ছে না। আমি আসলে একটা জিনিস নিয়ে চিন্তা করছিলাম। এই যে মানুষ এত টাকা কামায়, এত ক্ষমতা অর্জন করে, এত বড় বড় কোম্পানি বানায়— এগুলোর আসল উদ্দেশ্য কী?"

আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। একটু আগে বাসে আমি ঠিক এই জিনিসটা নিয়েই ভাবছিলাম। আমি বললাম, "কী? তুমিই বলো।" মামুন খুব গম্ভীর গলায় বলল, "নারী। ভাই, মানুষের জীবনের, বিশেষ করে পুরুষ মানুষের জীবনের সব উদ্দেশ্য, ইচ্ছা, আগ্রহ— সব কিছুর মূলেই হলো নারী। আপনি পৃথিবীর ইতিহাস দেখেন। ট্রয়ের যুদ্ধ কেন হয়েছিল? হেলেনের জন্য। সম্রাট শাহজাহান তাজমহল কেন বানিয়েছিলেন? মমতাজের জন্য। একজন পুরুষ যখন প্রচুর টাকা কামাতে চায়, তখন সে আসলে কী চায়? সে চায় ওই টাকা দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারীটিকে নিজের করে পেতে। আল্টিমেটলি এত টাকা দিয়ে সে নারীকে জিততে চায়।"

আমি অবাক হয়ে মামুনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছেলেটা মাঝে মাঝে ‘বালতিতে লাথি মারা’ টাইপ অনুবাদ করলেও, তার মাথার ভেতরে দেখি একটা আস্ত দার্শনিক বাস করছে।

মামুন বলতে থাকল, "ক্ষমতা হলেও একই কথা ভাই। একজন মন্ত্রী বা বড় নেতা যখন ক্ষমতা দেখায়, তখন সে আসলে অবচেতন মনে প্রমাণ করতে চায় যে সে কতটা শক্তিশালী। আর শক্তিশালী পুরুষের প্রতি নারীরা দুর্বল থাকে। আপনি যতই বলেন না কেন যে মানুষ নিজের শান্তির জন্য টাকা কামায়, আসলে তা না। নারীই হলো পুরুষের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য।"

মামুনের এই ‘সিরিয়াস ফিলোসফি’ শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কথাটা কি আসলেই সত্যি? ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের সমস্ত কাজের পেছনে নাকি অবদমিত যৌনাকাঙ্ক্ষা কাজ করে। মামুনের কথাটাও অনেকটা সেরকমই। একজন মানুষ সারাজীবন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যখন একটা বিশাল অট্টালিকা বানায়, তখন সে আসলে চায় ওই অট্টালিকার বারান্দায় একজন সুন্দরী নারী এসে দাঁড়াক। ওই নারী তার সম্পদের প্রশংসা করুক। নারী ছাড়া পুরুষের সমস্ত অর্জন যেন অর্থহীন।

আমি নিজের জীবনের দিকে তাকালাম। আমার বয়স উনত্রিশ। নারী কখনোই আমার জীবনের মূল ফোকাস ছিল না। আমি মেয়েদের থেকে সচেতনভাবেই একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলেছি। অফিসে নিতি বা ফারহানা আপার সাথে আমার কথা হয়, কিন্তু সেটা ওই ‘ভাই-বোন’ টাইপ সহকর্মীর সম্পর্ক। এর বাইরে কিছু না। রাস্তাঘাটে সুন্দরী মেয়ে দেখলে আমি হয়তো এক সেকেন্ডের জন্য তাকাই, কিন্তু পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে নিই। আমার মনে হতো, আমার মতো একজন ম্যাড়ম্যাড়ে, বিরক্তিকর এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জীবনে কোনো রোমান্টিক অ্যাঙ্গেল থাকতে পারে না।

আমি সবসময় ভেবে এসেছি, বিয়ে-শাদি আমি করব সমাজ রক্ষার জন্য। বাবা-মায়ের চাপে পড়ে। আমার নিজের ভেতরের কোনো তাগিদ থেকে নয়।
কিন্তু...

কিন্তু মামুনের কথাটা শোনার পর থেকে আমার মাথার ভেতর একটা মুখ বারবার ভেসে উঠতে লাগল। আনিকা নাওহার। গত মঙ্গলবার চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর সেই ছোট কেবিনটায় আমি তাকে দেখেছিলাম। ছত্রিশ বছর বয়সী এক অপরূপ নারী। উনার সেই গাঢ় মেরুন শাড়ি, নিখুঁত ফর্সা ত্বক, আর একটা পারফেক্ট ‘আওয়ারগ্লাস’ ফিগার। ওই যে আমি মনে মনে হিসাব করেছিলাম— ৩৬-২৮-৩৬ এর এক অদ্ভুত জ্যামিতি।

আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি, কিন্তু আমার চোখের সামনে ভাসছে আনিকা নাওহারের সেই অবাধ্য চুলের গোছা, যেটা উনার ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছিল। উনার দামি পারফিউমের গন্ধটা যেন এখনো আমার নাসারন্ধ্রে লেগে আছে।

আমি নিজেকে একটা প্রশ্ন করলাম। যদি মামুনের কথা সত্যি হয়, যদি মানুষের জীবনের আল্টিমেট উদ্দেশ্য একজন নারীই হয়— তাহলে সেই নারীটি কেমন হওয়া উচিত? নিতি বা ফারহানা আপার মতো কেউ? যার সাথে সারাজীবন পাশের বাসার ভাবির গসিপ আর গরুর মাংসের রেসিপি নিয়ে কথা বলতে হবে? নাকি আনিকা নাওহারের মতো কেউ?

আমি চোখ বন্ধ করে দৃশ্যটা কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। আমি কাজ থেকে ফিরেছি। আমার ড্রয়িংরুমে একটা বুকশেলফ। সেখানে অনেক বই। আর সোফায় বসে আছেন আনিকা নাওহার। উনার হাতে একটা কফির মগ। উনি আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো চপলতা নেই, আছে এক ধরনের গভীর প্রশান্তি আর মানসিক পরিপক্বতা। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "আজকের দিনটা কেমন কাটল আপনার?" আর আমি উনাকে বললাম, "আজকে অফিসে একটা ফরাসি দার্শনিকের খবর অনুবাদ করছিলাম..."

কল্পনাটা করতেই আমার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। আমি চোখ খুলে ফেললাম। আমার মতো মানুষের জীবনে এরকম কল্পনা করাটাও এক ধরনের অপরাধ। আনিকা নাওহার একজন বিবাহিতা নারী। লন্ডনে উনার স্বামী আছেন, যিনি অনেক বড় ইঞ্জিনিয়ার। উনাদের বিশাল আইটি ফার্ম আছে। আনিকা নাওহার আমার থেকে যোজন যোজন দূরের এক নক্ষত্র। উনি শুধু শখে দেশে আসেন, বই বের করেন, আর আমার মতো অনুবাদকদের দিয়ে উনার বইয়ের শূন্যতা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ান।

কিন্তু লজিক্যালি চিন্তা করলে, আনিকা নাওহারের এই উপস্থিতি আমার দর্শনে একটা বিশাল পরিবর্তন এনে দিয়েছে। আমি এতদিন ভাবতাম, আমি একা থাকতে পছন্দ করি। আমার নারীসঙ্গ পছন্দ না। কিন্তু আনিকাকে দেখার পর আমার মনে হচ্ছে, বিষয়টা আসলে তা নয়। আমার নারীসঙ্গ পছন্দ না, এটা ভুল। বরং, আমার ‘সাধারণ’ নারীসঙ্গ পছন্দ না। আমি আসলে খুঁজছিলাম এমন কাউকে, যার ভেতরে একটা গভীরতা আছে। যার শারীরিক সৌন্দর্য আমাকে আকর্ষণ করবে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আকর্ষণ করবে তার বুদ্ধিমত্তা, তার কথা বলার ভঙ্গি, তার আভিজাত্য।

যদি আনিকা নাওহারের মতো রূপবতী, গুণবতী, আকর্ষণীয় এবং পরিণত (Mature) একজন নারী জীবনের উদ্দেশ্য হয়, তবে সেই উদ্দেশ্যটা কিন্তু একেবারেই মন্দ হয় না। বরং, তেমন একজন নারীকে জয় করার জন্য, তার মনোযোগ পাওয়ার জন্য, আমি হয়তো জীবনের যেকোনো ফ্ল্যাট সার্কেল ভাঙতে রাজি আছি।

"ভাই, কী ভাবছেন এতক্ষণ ধরে?" মামুনের কথায় আমার ঘোর কাটল।


আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম, "কিছু না। তোমার জেফ বেজোসের থিওরি নিয়েই ভাবছিলাম। কথাটা তুমি খুব একটা খারাপ বলোনি।" মামুন বিজয়ের হাসি হাসল। "আমি তো আপনাকে বলি ভাই, দুনিয়ার সব লজিক ফেল মারবে, কিন্তু আমার লজিক ফেল মারবে না। আপনি মিলিয়ে দেখেন।"

আমি আর কথা বাড়ালাম না। ল্যাপটপে নতুন একটা খবর এসেছে। ইতালির ভেনিস শহরে এক বৃদ্ধ দম্পতি তাদের বিয়ের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আবার বিয়ে করেছেন। আমি খবরটা অনুবাদ করতে শুরু করলাম। কিন্তু আমার শব্দগুলোর ভেতরে কেমন যেন একটা নরম অনুভূতি কাজ করতে লাগল।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। অফিসের লাউঞ্জে বসে আমি একা চা খাচ্ছি। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। ঢাকা শহরে বৃষ্টি নামলে রাস্তার যে কী জঘন্য অবস্থা হয়, সেটা সবাই জানে। ড্রেনের পানি উপচে রাস্তা তলিয়ে যায়। রিকশাওয়ালারা ভাড়া ডাবল করে দেয়। কিন্তু লাউঞ্জের এই কাঁচের জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে মন্দ লাগে না।

হঠাৎ আমার প্যান্টের পকেটে মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠল। আমি মোবাইলটা বের করলাম। হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন। আমি স্ক্রিন আনলক করলাম। মেসেজটা এসেছে 'Anika Nawhar' এর কাছ থেকে।আমার আঙুলগুলো একটু কাঁপল। আমি মেসেজটা ওপেন করলাম।

"Hi Rashed, this is Anika. Hope you are having a good day. আমি আমার নতুন উপন্যাসের প্রথম তিনটে চ্যাপ্টারের ড্রাফট রেডি করেছি। আপনাকে পাঠালাম। সময় করে একটু দেখে জানাবেন, ল্যাঙ্গুয়েজটা ঠিক আছে কি না। No rush. টেক ইওর টাইম।"

মেসেজের নিচে একটা পিডিএফ ফাইল অ্যাটাচ করা। আমি মেসেজটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। এই মেসেজটার মধ্যে রোমান্টিক কিছু নেই। এটা সম্পূর্ণ একটা প্রফেশনাল মেসেজ। একজন লেখক তার প্রুফরিডারকে পাণ্ডুলিপি পাঠিয়েছেন। এর বেশি কিছু না।

কিন্তু আমার কেন যেন মনে হলো, এই মেসেজটা আমার সেই ‘ফ্ল্যাট সার্কেল’ জীবনের একঘেয়েমিতে একটা ছোট্ট ঢিল ছুঁড়ে মেরেছে। পুকুরের শান্ত জলে ঢিল পড়লে যেমন ছোট ছোট তরঙ্গ তৈরি হয়, আমার মাথার ভেতর এখন ঠিক তেমন কিছু তরঙ্গ তৈরি হচ্ছে।

আমি টাইপ করতে শুরু করলাম। "Hello Anika. Got the file. I will look into it tonight and let you know. Thanks."

মেসেজটা সেন্ড করে আমি মোবাইলটা টেবিলে রাখলাম। তারপর চায়ের কাপে একটা বড় চুমুক দিলাম। বাইরে বৃষ্টি আরও তীব্র হয়েছে। কারওয়ান বাজারের মোড়ে একটা বাস আটকে আছে। মানুষজন ছাতা মাথায় দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে। ঢাকা শহরের বিশৃঙ্খলা, আমার পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের জীবন, আর মিরপুরের মেস। কিন্তু আমার ভেতরে আজ একটা পরিবর্তন এসেছে। আজ আমি জানি, আমার জীবনের উদ্দেশ্য যদি কোনোদিন বদলায়, তবে সেটা কেমন হবে। আমি আনিকা নাওহারকে পাব না, সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। কিন্তু আনিকা নাওহার আমাকে শিখিয়ে দিয়ে গেলেন, আমার গন্তব্যটা আসলে কী হতে পারে। জীবনটা সত্যিই মাঝে মাঝে খুব ইন্টারেস্টিং হয়ে ওঠে।
[+] 3 users Like Orbachin's post
Like Reply
#20
Great update
Like Reply




Users browsing this thread: babai, 2 Guest(s)