Posts: 47
Threads: 0
Likes Received: 21 in 15 posts
Likes Given: 59
Joined: Aug 2025
Reputation:
0
(14-09-2026, 07:47 PM)রিও_৭ Wrote: আমার খুব ভালো লাগে আপনার মন্তব্য পড়ে।
আপনি আমার গল্পটা খুব মন দিয়ে পড়েন। আর শুধু মন দিয়েই পড়েন না ,বড় ইমোশনালি পড়েন গল্পটি।
কেন ?
ইমোশন একটু কমিয়ে পড়ুন। গল্পটা মা -ছেলের মজার গল্প কিন্তু।
ওই টমের চক্করে পড়বেন না। ছোকরাটা ম্যা ম্যা করে আপনাকে ইমোশনাল বানিয়ে দেবে।
গল্পে টম তো প্রথম পুরুষ , ও ওর মতো বলছে,ওকে বলতে দিন!
গল্পটার লিড রোলে তো অনামিকা আছে !
ওত্তো চাপ নেবার কি আছে ?
আবার এটাও বলেছেন আপনি ,কোনো চরিত্রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করতে চাইছেন না। আপনার এই কথাটাই আমার খুব খুব ভালো লাগলো।
আপনার বিশ্লেষণ গুলো মন দিয়ে পড়ে , আমার কি মনে হয় জানেন ,
প্রথমত , আমার খুব ভালো লাগে আপনার বিশ্লেষণ পড়ে ।
দ্বিতীয়ত ,আপনি যদি গল্প লেখেন ,আপনি খুব ভালো গল্প লিখতে পারবেন।
সেটা আপনার বিশ্লেষণ পড়লেই বোঝা যায় ।
আমি গল্প পড়তে ভালোবাসি, জানেন তো।
ওই হঠাৎ করে জোর করে কোনো কারণ ছাড়াই জোগাড় করে, ভিলেন ভাড়া করে নিয়ে আসা গল্প ,আমার একদম পড়তে ভালো লাগে না।
তাই আমিও, গল্প লিখতে গিয়ে ভাবলাম, কেন ?কোনো চরিত্র খারাপ হতে যাবে কেন? কী ব্যাপার, চরিত্রটার হঠাৎ করে পেট খারাপ হলে তো চলিবে না?
আবার তন্ময় সব ঠিক- ঠিক কথা বলবে ,মহান ব্যাক্তি ,আলফা ক্যাটাগরির মাল ,সব ঠিক ঠিক কাজ করবে সে হতে পারে না। তাহলে তন্ময় মহান পুরুষ নয় একেবারেই।
আমি তাই তন্ময়কে ছটফটে ,অশান্ত, অদূরদর্শী,বদমেজাজি কলেজ পড়ুয়া এক যুবক দেখিয়েছি ।
আচ্ছা ,একটা ছোট্ট জিনিস আপনাকে আমার বলতে হবে এবার। অনামিকার ব্যাপারে।
"Anamika bubu ke bollo je se jar sathe khusi tar sathei prem korte pare,tar jake pochondo hobe take biyeo korte pare,"....
(এটা সঠিক কথা একদমই না। )
অনামিকা ঠিক কি কি বলেছে বুবু কে ,(দেখিতো এবার )
***********
(৪)খ—উপহার।
মা গল্প বলতেই যাচ্ছিলো।
আমিই বরঞ্চ মা কে থামিয়ে দিলাম।
আর বললাম,
— "আচ্ছা মা , তুমি ভাস্কর আঙ্কেল কে অনেক অনেক ভালোবাসো , তাই না ?"
মা খানিকক্ষণ চুপ রইলো। আমি মায়ের কোলে মাথা রেখে বুঝতে পারছি ,মায়ের শ্বাস -প্রশ্বাস সব যেন স্তব্ধ হয়ে গেল ,নিমেষে।
তারপর অনেক ভেবে মা আমাকে বললো,
— "ভালো তো বাসিই ভাস্কর কে..."
মায়ের গলাটা কেঁপে উঠলো।
আমার প্রশ্নটা কি এতটাই কঠিন ছিল ?
তারপর মা বললো,
— "কিন্তু ... তোর চাইতে বেশি নয়।"
একটু থেমে। ...
— "ভাস্করের ভালোবাসার সাথে মিশে আছে ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থ, কিন্তু
তোর সাথে...রয়েছে কেবল একজন মায়ের, ছেলের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা!"
—"বুঝতে পারলি কি কিছু , বোকা ছেলে কোথাকার !
আমি কি তোকে ভুলে যেতে পারি কোনোদিন ,মা হয়ে !"
***********
১০(গ)—হয়নি যে কথা জানা।
— “তুমি কেন ভাস্কর আঙ্কেলকে ভালোবাসতে গিয়েছিলে? আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে তুমি? আমার পারমিশন নিয়েছিলে তুমি?”
মা আমাকে এক ধাক্কা দিয়ে নিজের গায়ের থেকে সরিয়ে দিল। তারপর মা বিছানার উপর উঠে বসল। আমিও মায়ের সঙ্গে বিছানার উপর উঠে বসলাম। মা আর আমি মুখোমুখি ।
— “বুবু, আমি বুঝতে পারছি না, আমি কার সঙ্গে কথা বলব, কার সঙ্গে বলব না, কীভাবে মিশব, মিশব না, সেটা তুই কেন ঠিক করে দিবি? আমার ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই? আমি বিয়ে করব কি করব না,
সেটা তোর উপর আমি ছেড়ে দিয়েছি। এবার আমার কাউকে ভালো লাগতে পারে না? আমি কি তাহলে অফিস, চাকরি,সব ছেড়ে দিয়ে তোর মুখের সামনে বসে তোকে দুদু খাওয়াতে আরম্ভ করে দিই?”
***********
(৩)—মুখোমুখি।
মা কাঁপা গলায়,
— " জানিস তো বুবু ,আমি পৃথিবীতে সব কিছু ছেড়ে দিতে পারবো রে । কিন্তু তোকে হারাতে পারবো না আমি । কোনোদিনের জন্যে না। কারণ আমি তোর মা !”
মা কথাটা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লো। আর বারে বারে বলেছিলো সেদিন ,
— "আমি তোকে হারাতে পারবো না বুবু…কোনোদিনের জন্য নয়।"
***********
খাত্তম ,গায়া ,টাটা ,গুড বাই !
গল্প ওখানেই শেষ করে দিয়েছে তো অনামিকা। বহু আগেই !
আপনি চিন্তা করছেন কেন মশাই ?
একদম খপাৎ করে লাইন টা ধরতে হইবো না! ছাইড়া দিলা চলবো !
"এই লাইনেই গল্পটা শেষ করে দিয়েছে অনামিকা দিদিমুনি ।"
টম কিন্তু আবার মায়ের এই কথা গুলোই স্মৃতিচারণ করছে কোথায় দাঁড়িয়ে ?
টম বাবা জীবন এখন এয়ারপোর্টে ,দাঁড়িয়ে আছে তো !
মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া সময়ের স্মৃতিচারণ করছে তো টম ?
হা ,হা ,হা , !
ওরে ,মা রে মা ,তুই যাবি টা কোথায় মা !
এবার অনামিকা ছেলের ভালোবাসার পরীক্ষা নিতে হইবো না ?
ছেলে কেন বারবার আমার গায়ে উঠে যাচ্ছে ,বাঁদরের মত ?
শুধু কি আমি ,নাকি অন্য যাকে সামনে পাচ্ছে ,তার গায়েই উঠে যাচ্ছে ছেলে ?
প্রেম ছিল বলছে ,সেটা কেন ভাঙলো ?
"ছেলের কি আমার প্রতি ,শুধুই কি শরীরের ভালোবাসা?
নাকি ,নারী শরীরের নেশা নয় তো ?"
এটাই হল আসল গল্পটা ।
মানে ,সঙ্গমে নেইকো ক্ষতি ,তবে বন্ধনে ,দিয়ো নাকো ফাঁকি !
হোলো তো !
ওই টেস্টার দিয়ে যেমন আমরা টেস্টিং করি না , লাল আলো ,না সবুজ আলো ?
ওই টেস্টিং চলছে আর কি !
***********
এবার অনামিকায় ফিরছি ,
প্রথমত অনামিকা ভাস্করকে ভালোবাসে।
এক জনকে। সেটা ছেলেকে বলেছে সে । ব্যাস। পরিষ্কার কথা।
কিন্তু এমন নয় ভাস্করের ঘাড়েই ঝুলে পড়তেই হবে অনামিকার। ছেলে অনুমতি দিলে তবেই।
খুব ভালো করেই জানে সেটা টমের তস্কর আঙ্কেল। টম পারমিশন না দিলে সানাই... বাজবে... না।
তাই ভাস্করকে কি বলে এসেছিল অনামিকা?
ভাস্কর তুই থাম!
রুক যাও তুম, ভাস্কর।
" আমি কার সঙ্গে কথা বলব, কার সঙ্গে বলব না, কীভাবে মিশব, মিশব না, সেটা তুই কেন ঠিক করে দিবি?".....
....."এবার আমার কাউকে ভালো লাগতে পারে না?"
খুশি মত "প্রেম" করার কথা অনামিকা এখানে বলছে কি একবার ও ?
কই না তো !
ভালোবাসা যা আছে অনামিকার , ছেলে ছাড়া আরেক জনের সাথেই রয়েছে। একজনের সাথেই। স্রেফ এক আদমি ।
সেটা ভাস্কর। ব্যাস !
কথা বলা ,মেলামেশা , ভালোলাগা মানেই তো প্রেম হয়ে গেল নাকি ।
ভালোলাগা আর প্রেম ,ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য আছে না ?
তাছাড়া অনামিকা তো বলেই দিচ্ছে ,
"আমার ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই?"
ব্যক্তিস্বাধীনতা মানে যা খুশি নয় তো। মানে রাশ লীলা চালিয়ে যাব তা নয় ।
আসলে অনামিকার বারবার এক কথা শুনে তো মাথা গরম হয়ে গেছিল ,
"মা তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো ! আমাকে না ভাস্কর আঙ্কেল কে।" এই কথাটা টম অনামিকাকে প্রচুর বার বলেছে ।
আরেকটা ব্যাপার টম শুধু যে ভাস্কর আঙ্কেলের সাথেই ব্যাপারটা করেছে সেটাও নয় ,ওর বাবার সাথেও করেছে , এই বোকা বোকা তুলনাটা টা?
তখন অনামিকার মাথা গেছে গরম হয়ে , এ ছেলে বার বার এক প্রশ্ন কেন করে খালি ?
তখন ওটা অনামিকা রাগের মাথায় বলে ফেলেছিল !
আর সেদিন মা আমাকে বলেছিল ,
— “ আমি ভাস্করকেই তোর চেয়ে বেশি ভালোবাসি। কিছু করতে পারবি তুই?"
— “ এবার আমি ভাস্করকেই বিয়ে করবো।"
— “আগে ভদ্র হতে শেখ! সভ্য হতে শেখ।"
"কিছু করতে পারবি তুই?" (রাগ হলেই তো বলি আমরা )
আর রাগের মাথায় আমার .....কি ?
ঠিক কথা বলি কি ?
***********
এবার অনামিকা এসেছে কলকাতায় ,দুবছর পর।
বেচারি অনামিকা ছেলেকে সামনাসামনি এসে দেখছে ,ছেলে তার প্রতি অবসেস্ট হয়ে বসে আছে।
এবার অনামিকাও যে ছেলের প্রেমে পড়ে যাবে সেটা ও বুঝতে পারেনি।
ওই ,
"পায়ে পড়ি বাঘ মামা ,তুমি যে এ ঘরে কে তা জানতো !"
এবার ছেলে তো। একটা আলাদা ইমোশন কাজ করেছে অনামিকার।
আর ব্যাস ,ডুব মেরে দিয়েছে।
তারপর আর সামলাতে পারছে না। কোনদিকে দৌড়াবে !
***********
গল্প অনেক আগেই খতম হয়েই গেছে। প্রেম তো! সেটা আবার নিষিদ্ধ প্রেম। তাই এনিয়ে, বিনিয়ে, লটকিয়ে, ঘুরিয়ে, প্যাচিয়ে নাক দেখানোর মত আরকি। ভিতরে ভিতরে অনামিকা সব সেটিং করেই ফেলেছে তো। রেজিস্ট্রির ব্যাপারে অনামিকা চেপে গেছে না ?(হা ,হা, হা )
গানের যেমন অলঙ্কার থাকে না ,রাগ ,রাগিনী ,বৈরাগ, বিরাগ ,অনুরাগ-কশ্যপ ,বাব্বা যদিও আমি জানি না সে সব!
প্রেমের ও রাগ ,অভিমান ,চোটপাট না হলে কি প্রেম জমে নাকি !
একটু মারপিট করুক না। মা ছেলে মিলে । ক্ষতি কি।
আরে বাব্বা , এটা তো আর কপোত কপোতীর প্রেম নয়। প্রেমে একেবারে মম করবে কেন, (আমি তুমি -তুমি আমি, চলো এবার চুমু খেয়ে ফেলি!)
এটা তো মা-ছেলের প্রেম।
ওত্তো প্রেম থাকলে ভালো লাগবে নাকি, মা ছেলের ইন্সেস্ট স্টোরি।
মনে হবে , এ শালা মালটা , রোমান্টিক প্রেমের গল্প লিখতেই গেছিল , কিন্তু শুধু মাকে রিপ্লেস করে নায়িকা বানিয়ে গল্প লিখে ফেলেছে, মালটা ।
মা কে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও গল্পে ।
মা হয়ে গেছে রোমান্টিক নায়িকা।
আবার মা ছেলের প্রথম সঙ্গম তো আর স্বামী স্ত্রীর প্রেমে একবারে গদো গদো হয়ে ফুলসজ্জার ধারাবিবরণী তো লিখতে পারি না ।
তাই প্রথম সঙ্গমে ছিল ভয় ,অনিচ্ছা ,পাপবোধ, কলঙ্কের দণ্ড। আর তার সাথে টমের উত্তেজনার শীঘ্র পতন। তাই তাড়াতড়ি খতম।
আবার মা ছেলের প্রথম সঙ্গম হবে ,
হঠাৎ করে / আকস্মিক / অপ্রত্যাশিত
আর তার পর ,
এই যা... ঘপাঘপ হয়ে গেল। এবার কি হবে! পাপ বোধ চলে আসবে না ।
তাহলে আর নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প লিখলাম কেন। কপোত কপোতীর প্রেমের গল্প লিখলেই পারতাম।
কপট কপোতীর প্রেমের গল্প লিখতে বসলে , বাসর ঘরে খাট ভেঙে ফেলা অব্দি চালিয়েও যেতাম ভাই , মাঝখানে নো থামা থামি ! চালিয়ে যাও কাকু -কাকিমা!
***********
আচ্ছা ,
আপনি এত্ত দুঃখ দুঃখ মন নিয়ে এ গল্পটা পড়ছেন কেন বলুন তো ?
গল্পটা তে তন্ময় অনেক মজার মজার কাজ -কারবার করেছে না। গল্পটা মজার গল্পতো ।
একটু দুঃখ দুঃখ আছে অবশ্য ।
আরে ,মা ছেলে নিষিদ্দ প্রেম করবে ,কষ্ট দুঃখ পেতে হবে না।
***********
এবার দেখি আরেকটা জিনিস ,
মাকে সন্তানরা রাগ করে যা খুশি বলে ফেলে না।
"মা তুমি একটা এই ,"
মা তুমি একটা সেই ,"
বলে না সন্তানরা ।
মানছি তন্ময় খুব বাজে কথাটাই বলেছে ওর মাকে ,
অনামিকাও তেমনি দিয়েছে ছেলের গালে কষিয়ে একটা চড় মেরে।
মায়ের সম্মন্ধে আজেবাজে কথা। বেশ করেছে অনামিকা।
অনামিকার রাগ টাও একবার ভাবুন ,
যে মা তার ছেলের গায়ে কোনোদিন হাত তোলেনি ,তার গায়েও হাত উঠে গেছে বেচারির ।
এবার অনামিকা বেচারি কি করবে।
ছেলের সাথে ছোট্ট থেকে আদর করে ,ওদের মা ছেলের মধ্যে বডি কনট্যাক্ট ছিলই। ঠিক আছে ,সেটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মেনে নেয়া যায়!
কিন্তু অনামিকা যে আবার দুইবছর বাদে এসেছে , মা ছেলের নিষ্পাপ মাতৃ স্নেহের বডি কনট্যাক্ট টা উল্টো দিকে কনভার্ট হয়ে গেছে।
এবার ছেলে তো অনেকটাই বড় হয়ে গেছে ,হাতে পায়ে। আবার দুবছর পর ছেলেকে সামনে পেয়ে ইমোশন সেটা কোথায় রাখবে।
বেচারি অনামিকা দু দিনের জন্যে ছুটিতে এসে , মহা ফাঁপরে পরে গেছে।
ছেলের সাথে বডি কন্ট্রাক্ট ফিজিক্যাল রিলেসন ,শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে।
এই জো অল্প সময়ের জন্যে দেখা , ওদের মধ্যে দূরত্ব ,বিচ্ছেদটাই কি হবে এবার ?
তাই গল্পটার "সময়" খুব বড় একটা ফ্যাক্টর হয়ে গেছে !
***********
১০(গ)—হয়নি যে কথা জানা।
আমি মাকে জড়িয়ে ধরলাম। আমরা দুজনেই হাসতে থাকলাম।
আর হাসতে হাসতে দুজনের চোখটা ভিজে এল। আমি মায়ের দিকে ভেজা চোখে তাকিয়ে বললাম ,
— “মা ,আসবে তো আমি যেদিন যাবো !"
মা আমার দিকে তাকিয়ে ভেজা চোখে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলেছিল,
— “দেখা যাবে!”
— “আগে ওই দিনটাই তো আসুক!"
ওই দিন,
কোন দিন,
সেই দিন,
বাদ দিন ,
আমাকে একটা,
কাঁচ কলা দিন ?
ওরে ,মা রে ,মা ,
"ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের একটা বাঁকা হাসি"
ছেলে কিনা বিদেশে চলে যাচ্ছে ,আর মায়ের ঠোঁটে হাসি।
চলবে এই এক্সপ্রেশন। হাসি একদম ফাঁসি হয়ে যাবে না।
ছেলেকে ছেড়ে দেবে অনামিকা,মগের মুল্লুক নাকি ! হুম ! খাল একদম খিচে নেব না।
যা না তুই, আরে তুই যা না রে , যা ,যা ,যা কদ্দুর যাবি যা দেখি। যা তো তুই কার কত্ত দৌড় একবার দেখি তো !
আর ,কার কত্ত খেমটা আছে তো দেখি একবার । (কোমরে হাত দিয়ে অনামিকা )
আমার কাছ থেকে আমারই ছেলেকে কেড়ে নেবে । হুম !
অনামিকা এই রকম প্রচুর সিংনাল দিয়ে দিয়েছে ওর বুবু সোনাকে। প্রপ্রপ্রপ্রপ্রপ্রপ্রপ্রপ্রপ্রচুর
আর ,বুবু সোনা তো বুবু সোনাই। মায়ের বিয়ের সানাই এর শব্দই কেবল শুনতে পাচ্ছে! পে এ এএএএ!
আর কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।
***********
অনেক ঠুস্ ঠাস শব্দ জব্দ দেয়া আছে গল্পে ।
"অশ্বত্থামা হত ইতি গজ" কেস এক্কেরে !
তাছাড়া অনামিকা একটা ফরেন এম এন সি তে চাকরি করা মেয়ে তো , হম্মম্ম মাইয়া। এখানেও বিষয়টা আবার সেই খপাৎ করে ধরতে হবে কিন্তু !
না , যাক গে বাদ দিন!
সব কথা ওত্তো সোজা সোজা ছেলেকে বললে চলবে অনামিকার ?
জটিল চরিত্র! কিছুই বুঝিতে পারিবেন না!
ললনাময়ী মা এক্কেরে !(আছে না একটা গান এসব শব্দ নিয়ে ! )
তো "ঠুস্ ঠাস" "শব্দ জব্দ" ব্যাপারটা আমি গল্প পড়তে গিয়ে শিখেছি ।
তবে আমি কোনো লেখক নই তবে। লিখতেও জানি না ! ওই গল্পের বই পড়তে ভালোবাসি ।
এমনি ইচ্ছে হল। তাই মজা করে গল্প লিখলাম আরকি ।
গল্পের আপডেট নিয়েই ফিরবো! দেখি, কবে ফিরি ,একটু সময় দিন...
লাটাইয়ের সুতো গুটিয়ে। ঘুড়ি তো এবার পকেটে!
***********
একটা গানের লাইন দিয়ে শেষ করি ,
অনামিকা আর টম এখন দুজনেই কি গাইছে জানেন তো ,
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখি বো... বো... বো...... বো... বো...
প্রেমের গল্প তো এটা ,১০০% লাভ লাভ লাভ লাভ লাভ
সঙ্গমে নেই কো ক্ষতি ,বন্ধনে দিয়ে নাকো ফাঁকি !
হা ,হা ,হা Dada ebar only 1 part dilen?
•
Posts: 147
Threads: 0
Likes Received: 127 in 71 posts
Likes Given: 478
Joined: Oct 2024
Reputation:
11
সত্যি বলতে এই গল্পটি পড়া শুরু করার পর থেকে, আমিও চাপ নিচ্ছিলাম।
কিন্তু এখন খোদ লেখকই যখন বলে দিলেন, 'অত্তো চাপ নেবার কি আছে!"
তাই আজ থেকে "চাপে পড়া বারণ"।
লেখকের ভাষ্যমতে অনামিকাই যেহেতু লিড রোল, তাই পিকচার আভি বাকী হ্যা, সেটা বোঝাই যাচ্ছে।
লেখকের জন্য আন্তরিক শুভকামনা।
Posts: 242
Threads: 0
Likes Received: 143 in 114 posts
Likes Given: 174
Joined: Apr 2025
Reputation:
8
(14-09-2026, 07:47 PM)রিও_৭ Wrote: আমার খুব ভালো লাগে আপনার মন্তব্য পড়ে।
আপনি আমার গল্পটা খুব মন দিয়ে পড়েন। আর শুধু মন দিয়েই পড়েন না ,বড় ইমোশনালি পড়েন গল্পটি।
কেন ?
ইমোশন একটু কমিয়ে পড়ুন। গল্পটা মা -ছেলের মজার গল্প কিন্তু।
ওই টমের চক্করে পড়বেন না। ছোকরাটা ম্যা ম্যা করে আপনাকে ইমোশনাল বানিয়ে দেবে।
গল্পে টম তো প্রথম পুরুষ , ও ওর মতো বলছে,ওকে বলতে দিন!
গল্পটার লিড রোলে তো অনামিকা আছে !
ওত্তো চাপ নেবার কি আছে ?
আবার এটাও বলেছেন আপনি ,কোনো চরিত্রের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করতে চাইছেন না। আপনার এই কথাটাই আমার খুব খুব ভালো লাগলো।
আপনার বিশ্লেষণ গুলো মন দিয়ে পড়ে , আমার কি মনে হয় জানেন ,
প্রথমত , আমার খুব ভালো লাগে আপনার বিশ্লেষণ পড়ে ।
দ্বিতীয়ত ,আপনি যদি গল্প লেখেন ,আপনি খুব ভালো গল্প লিখতে পারবেন।
সেটা আপনার বিশ্লেষণ পড়লেই বোঝা যায় ।
আমি গল্প পড়তে ভালোবাসি, জানেন তো।
ওই হঠাৎ করে জোর করে কোনো কারণ ছাড়াই জোগাড় করে, ভিলেন ভাড়া করে নিয়ে আসা গল্প ,আমার একদম পড়তে ভালো লাগে না।
তাই আমিও, গল্প লিখতে গিয়ে ভাবলাম, কেন ?কোনো চরিত্র খারাপ হতে যাবে কেন? কী ব্যাপার, চরিত্রটার হঠাৎ করে পেট খারাপ হলে তো চলিবে না?
আবার তন্ময় সব ঠিক- ঠিক কথা বলবে ,মহান ব্যাক্তি ,আলফা ক্যাটাগরির মাল ,সব ঠিক ঠিক কাজ করবে সে হতে পারে না। তাহলে তন্ময় মহান পুরুষ নয় একেবারেই।
আমি তাই তন্ময়কে ছটফটে ,অশান্ত, অদূরদর্শী,বদমেজাজি কলেজ পড়ুয়া এক যুবক দেখিয়েছি ।
আচ্ছা ,একটা ছোট্ট জিনিস আপনাকে আমার বলতে হবে এবার। অনামিকার ব্যাপারে।
"Anamika bubu ke bollo je se jar sathe khusi tar sathei prem korte pare,tar jake pochondo hobe take biyeo korte pare,"....
(এটা সঠিক কথা একদমই না। )
অনামিকা ঠিক কি কি বলেছে বুবু কে ,(দেখিতো এবার )
***********
(৪)খ—উপহার।
মা গল্প বলতেই যাচ্ছিলো।
আমিই বরঞ্চ মা কে থামিয়ে দিলাম।
আর বললাম,
— "আচ্ছা মা , তুমি ভাস্কর আঙ্কেল কে অনেক অনেক ভালোবাসো , তাই না ?"
মা খানিকক্ষণ চুপ রইলো। আমি মায়ের কোলে মাথা রেখে বুঝতে পারছি ,মায়ের শ্বাস -প্রশ্বাস সব যেন স্তব্ধ হয়ে গেল ,নিমেষে।
তারপর অনেক ভেবে মা আমাকে বললো,
— "ভালো তো বাসিই ভাস্কর কে..."
মায়ের গলাটা কেঁপে উঠলো।
আমার প্রশ্নটা কি এতটাই কঠিন ছিল ?
তারপর মা বললো,
— "কিন্তু ... তোর চাইতে বেশি নয়।"
একটু থেমে। ...
— "ভাস্করের ভালোবাসার সাথে মিশে আছে ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থ, কিন্তু
তোর সাথে...রয়েছে কেবল একজন মায়ের, ছেলের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা!"
—"বুঝতে পারলি কি কিছু , বোকা ছেলে কোথাকার !
আমি কি তোকে ভুলে যেতে পারি কোনোদিন ,মা হয়ে !"
***********
১০(গ)—হয়নি যে কথা জানা।
— “তুমি কেন ভাস্কর আঙ্কেলকে ভালোবাসতে গিয়েছিলে? আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলে তুমি? আমার পারমিশন নিয়েছিলে তুমি?”
মা আমাকে এক ধাক্কা দিয়ে নিজের গায়ের থেকে সরিয়ে দিল। তারপর মা বিছানার উপর উঠে বসল। আমিও মায়ের সঙ্গে বিছানার উপর উঠে বসলাম। মা আর আমি মুখোমুখি ।
— “বুবু, আমি বুঝতে পারছি না, আমি কার সঙ্গে কথা বলব, কার সঙ্গে বলব না, কীভাবে মিশব, মিশব না, সেটা তুই কেন ঠিক করে দিবি? আমার ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই? আমি বিয়ে করব কি করব না,
সেটা তোর উপর আমি ছেড়ে দিয়েছি। এবার আমার কাউকে ভালো লাগতে পারে না? আমি কি তাহলে অফিস, চাকরি,সব ছেড়ে দিয়ে তোর মুখের সামনে বসে তোকে দুদু খাওয়াতে আরম্ভ করে দিই?”
***********
(৩)—মুখোমুখি।
মা কাঁপা গলায়,
— " জানিস তো বুবু ,আমি পৃথিবীতে সব কিছু ছেড়ে দিতে পারবো রে । কিন্তু তোকে হারাতে পারবো না আমি । কোনোদিনের জন্যে না। কারণ আমি তোর মা !”
মা কথাটা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লো। আর বারে বারে বলেছিলো সেদিন ,
— "আমি তোকে হারাতে পারবো না বুবু…কোনোদিনের জন্য নয়।"
***********
খাত্তম ,গায়া ,টাটা ,গুড বাই !
গল্প ওখানেই শেষ করে দিয়েছে তো অনামিকা। বহু আগেই !
আপনি চিন্তা করছেন কেন মশাই ?
একদম খপাৎ করে লাইন টা ধরতে হইবো না! ছাইড়া দিলা চলবো !
"এই লাইনেই গল্পটা শেষ করে দিয়েছে অনামিকা দিদিমুনি ।"
টম কিন্তু আবার মায়ের এই কথা গুলোই স্মৃতিচারণ করছে কোথায় দাঁড়িয়ে ?
টম বাবা জীবন এখন এয়ারপোর্টে ,দাঁড়িয়ে আছে তো !
মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া সময়ের স্মৃতিচারণ করছে তো টম ?
হা ,হা ,হা , !
ওরে ,মা রে মা ,তুই যাবি টা কোথায় মা !
এবার অনামিকা ছেলের ভালোবাসার পরীক্ষা নিতে হইবো না ?
ছেলে কেন বারবার আমার গায়ে উঠে যাচ্ছে ,বাঁদরের মত ?
শুধু কি আমি ,নাকি অন্য যাকে সামনে পাচ্ছে ,তার গায়েই উঠে যাচ্ছে ছেলে ?
প্রেম ছিল বলছে ,সেটা কেন ভাঙলো ?
"ছেলের কি আমার প্রতি ,শুধুই কি শরীরের ভালোবাসা?
নাকি ,নারী শরীরের নেশা নয় তো ?"
এটাই হল আসল গল্পটা ।
মানে ,সঙ্গমে নেইকো ক্ষতি ,তবে বন্ধনে ,দিয়ো নাকো ফাঁকি !
হোলো তো !
ওই টেস্টার দিয়ে যেমন আমরা টেস্টিং করি না , লাল আলো ,না সবুজ আলো ?
ওই টেস্টিং চলছে আর কি !
***********
এবার অনামিকায় ফিরছি ,
প্রথমত অনামিকা ভাস্করকে ভালোবাসে।
এক জনকে। সেটা ছেলেকে বলেছে সে । ব্যাস। পরিষ্কার কথা।
কিন্তু এমন নয় ভাস্করের ঘাড়েই ঝুলে পড়তেই হবে অনামিকার। ছেলে অনুমতি দিলে তবেই।
খুব ভালো করেই জানে সেটা টমের তস্কর আঙ্কেল। টম পারমিশন না দিলে সানাই... বাজবে... না।
তাই ভাস্করকে কি বলে এসেছিল অনামিকা?
ভাস্কর তুই থাম!
রুক যাও তুম, ভাস্কর।
" আমি কার সঙ্গে কথা বলব, কার সঙ্গে বলব না, কীভাবে মিশব, মিশব না, সেটা তুই কেন ঠিক করে দিবি?".....
....."এবার আমার কাউকে ভালো লাগতে পারে না?"
খুশি মত "প্রেম" করার কথা অনামিকা এখানে বলছে কি একবার ও ?
কই না তো !
ভালোবাসা যা আছে অনামিকার , ছেলে ছাড়া আরেক জনের সাথেই রয়েছে। একজনের সাথেই। স্রেফ এক আদমি ।
সেটা ভাস্কর। ব্যাস !
কথা বলা ,মেলামেশা , ভালোলাগা মানেই তো প্রেম হয়ে গেল নাকি ।
ভালোলাগা আর প্রেম ,ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য আছে না ?
তাছাড়া অনামিকা তো বলেই দিচ্ছে ,
"আমার ব্যক্তিস্বাধীনতা নেই?"
ব্যক্তিস্বাধীনতা মানে যা খুশি নয় তো। মানে রাশ লীলা চালিয়ে যাব তা নয় ।
আসলে অনামিকার বারবার এক কথা শুনে তো মাথা গরম হয়ে গেছিল ,
"মা তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো ! আমাকে না ভাস্কর আঙ্কেল কে।" এই কথাটা টম অনামিকাকে প্রচুর বার বলেছে ।
আরেকটা ব্যাপার টম শুধু যে ভাস্কর আঙ্কেলের সাথেই ব্যাপারটা করেছে সেটাও নয় ,ওর বাবার সাথেও করেছে , এই বোকা বোকা তুলনাটা টা?
তখন অনামিকার মাথা গেছে গরম হয়ে , এ ছেলে বার বার এক প্রশ্ন কেন করে খালি ?
তখন ওটা অনামিকা রাগের মাথায় বলে ফেলেছিল !
আর সেদিন মা আমাকে বলেছিল ,
— “ আমি ভাস্করকেই তোর চেয়ে বেশি ভালোবাসি। কিছু করতে পারবি তুই?"
— “ এবার আমি ভাস্করকেই বিয়ে করবো।"
— “আগে ভদ্র হতে শেখ! সভ্য হতে শেখ।"
"কিছু করতে পারবি তুই?" (রাগ হলেই তো বলি আমরা )
আর রাগের মাথায় আমার .....কি ?
ঠিক কথা বলি কি ?
***********
এবার অনামিকা এসেছে কলকাতায় ,দুবছর পর।
বেচারি অনামিকা ছেলেকে সামনাসামনি এসে দেখছে ,ছেলে তার প্রতি অবসেস্ট হয়ে বসে আছে।
এবার অনামিকাও যে ছেলের প্রেমে পড়ে যাবে সেটা ও বুঝতে পারেনি।
ওই ,
"পায়ে পড়ি বাঘ মামা ,তুমি যে এ ঘরে কে তা জানতো !"
এবার ছেলে তো। একটা আলাদা ইমোশন কাজ করেছে অনামিকার।
আর ব্যাস ,ডুব মেরে দিয়েছে।
তারপর আর সামলাতে পারছে না। কোনদিকে দৌড়াবে !
***********
গল্প অনেক আগেই খতম হয়েই গেছে। প্রেম তো! সেটা আবার নিষিদ্ধ প্রেম। তাই এনিয়ে, বিনিয়ে, লটকিয়ে, ঘুরিয়ে, প্যাচিয়ে নাক দেখানোর মত আরকি। ভিতরে ভিতরে অনামিকা সব সেটিং করেই ফেলেছে তো। রেজিস্ট্রির ব্যাপারে অনামিকা চেপে গেছে না ?(হা ,হা, হা )
গানের যেমন অলঙ্কার থাকে না ,রাগ ,রাগিনী ,বৈরাগ, বিরাগ ,অনুরাগ-কশ্যপ ,বাব্বা যদিও আমি জানি না সে সব!
প্রেমের ও রাগ ,অভিমান ,চোটপাট না হলে কি প্রেম জমে নাকি !
একটু মারপিট করুক না। মা ছেলে মিলে । ক্ষতি কি।
আরে বাব্বা , এটা তো আর কপোত কপোতীর প্রেম নয়। প্রেমে একেবারে মম করবে কেন, (আমি তুমি -তুমি আমি, চলো এবার চুমু খেয়ে ফেলি!)
এটা তো মা-ছেলের প্রেম।
ওত্তো প্রেম থাকলে ভালো লাগবে নাকি, মা ছেলের ইন্সেস্ট স্টোরি।
মনে হবে , এ শালা মালটা , রোমান্টিক প্রেমের গল্প লিখতেই গেছিল , কিন্তু শুধু মাকে রিপ্লেস করে নায়িকা বানিয়ে গল্প লিখে ফেলেছে, মালটা ।
মা কে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কোথাও গল্পে ।
মা হয়ে গেছে রোমান্টিক নায়িকা।
আবার মা ছেলের প্রথম সঙ্গম তো আর স্বামী স্ত্রীর প্রেমে একবারে গদো গদো হয়ে ফুলসজ্জার ধারাবিবরণী তো লিখতে পারি না ।
তাই প্রথম সঙ্গমে ছিল ভয় ,অনিচ্ছা ,পাপবোধ, কলঙ্কের দণ্ড। আর তার সাথে টমের উত্তেজনার শীঘ্র পতন। তাই তাড়াতড়ি খতম।
আবার মা ছেলের প্রথম সঙ্গম হবে ,
হঠাৎ করে / আকস্মিক / অপ্রত্যাশিত
আর তার পর ,
এই যা... ঘপাঘপ হয়ে গেল। এবার কি হবে! পাপ বোধ চলে আসবে না ।
তাহলে আর নিষিদ্ধ প্রেমের গল্প লিখলাম কেন। কপোত কপোতীর প্রেমের গল্প লিখলেই পারতাম।
কপট কপোতীর প্রেমের গল্প লিখতে বসলে , বাসর ঘরে খাট ভেঙে ফেলা অব্দি চালিয়েও যেতাম ভাই , মাঝখানে নো থামা থামি ! চালিয়ে যাও কাকু -কাকিমা!
***********
আচ্ছা ,
আপনি এত্ত দুঃখ দুঃখ মন নিয়ে এ গল্পটা পড়ছেন কেন বলুন তো ?
গল্পটা তে তন্ময় অনেক মজার মজার কাজ -কারবার করেছে না। গল্পটা মজার গল্পতো ।
একটু দুঃখ দুঃখ আছে অবশ্য ।
আরে ,মা ছেলে নিষিদ্দ প্রেম করবে ,কষ্ট দুঃখ পেতে হবে না।
***********
এবার দেখি আরেকটা জিনিস ,
মাকে সন্তানরা রাগ করে যা খুশি বলে ফেলে না।
"মা তুমি একটা এই ,"
মা তুমি একটা সেই ,"
বলে না সন্তানরা ।
মানছি তন্ময় খুব বাজে কথাটাই বলেছে ওর মাকে ,
অনামিকাও তেমনি দিয়েছে ছেলের গালে কষিয়ে একটা চড় মেরে।
মায়ের সম্মন্ধে আজেবাজে কথা। বেশ করেছে অনামিকা।
অনামিকার রাগ টাও একবার ভাবুন ,
যে মা তার ছেলের গায়ে কোনোদিন হাত তোলেনি ,তার গায়েও হাত উঠে গেছে বেচারির ।
এবার অনামিকা বেচারি কি করবে।
ছেলের সাথে ছোট্ট থেকে আদর করে ,ওদের মা ছেলের মধ্যে বডি কনট্যাক্ট ছিলই। ঠিক আছে ,সেটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মেনে নেয়া যায়!
কিন্তু অনামিকা যে আবার দুইবছর বাদে এসেছে , মা ছেলের নিষ্পাপ মাতৃ স্নেহের বডি কনট্যাক্ট টা উল্টো দিকে কনভার্ট হয়ে গেছে।
এবার ছেলে তো অনেকটাই বড় হয়ে গেছে ,হাতে পায়ে। আবার দুবছর পর ছেলেকে সামনে পেয়ে ইমোশন সেটা কোথায় রাখবে।
বেচারি অনামিকা দু দিনের জন্যে ছুটিতে এসে , মহা ফাঁপরে পরে গেছে।
ছেলের সাথে বডি কন্ট্রাক্ট ফিজিক্যাল রিলেসন ,শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে।
এই জো অল্প সময়ের জন্যে দেখা , ওদের মধ্যে দূরত্ব ,বিচ্ছেদটাই কি হবে এবার ?
তাই গল্পটার "সময়" খুব বড় একটা ফ্যাক্টর হয়ে গেছে !
***********
১০(গ)—হয়নি যে কথা জানা।
আমি মাকে জড়িয়ে ধরলাম। আমরা দুজনেই হাসতে থাকলাম।
আর হাসতে হাসতে দুজনের চোখটা ভিজে এল। আমি মায়ের দিকে ভেজা চোখে তাকিয়ে বললাম ,
— “মা ,আসবে তো আমি যেদিন যাবো !"
মা আমার দিকে তাকিয়ে ভেজা চোখে ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলেছিল,
— “দেখা যাবে!”
— “আগে ওই দিনটাই তো আসুক!"
ওই দিন,
কোন দিন,
সেই দিন,
বাদ দিন ,
আমাকে একটা,
কাঁচ কলা দিন ?
ওরে ,মা রে ,মা ,
"ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের একটা বাঁকা হাসি"
ছেলে কিনা বিদেশে চলে যাচ্ছে ,আর মায়ের ঠোঁটে হাসি।
চলবে এই এক্সপ্রেশন। হাসি একদম ফাঁসি হয়ে যাবে না।
ছেলেকে ছেড়ে দেবে অনামিকা,মগের মুল্লুক নাকি ! হুম ! খাল একদম খিচে নেব না।
যা না তুই, আরে তুই যা না রে , যা ,যা ,যা কদ্দুর যাবি যা দেখি। যা তো তুই কার কত্ত দৌড় একবার দেখি তো !
আর ,কার কত্ত খেমটা আছে তো দেখি একবার । (কোমরে হাত দিয়ে অনামিকা )
আমার কাছ থেকে আমারই ছেলেকে কেড়ে নেবে । হুম !
অনামিকা এই রকম প্রচুর সিংনাল দিয়ে দিয়েছে ওর বুবু সোনাকে। প্রপ্রপ্রপ্রপ্রপ্রপ্রপ্রপ্রপ্রচুর
আর ,বুবু সোনা তো বুবু সোনাই। মায়ের বিয়ের সানাই এর শব্দই কেবল শুনতে পাচ্ছে! পে এ এএএএ!
আর কিছুই শুনতে পাচ্ছে না।
***********
অনেক ঠুস্ ঠাস শব্দ জব্দ দেয়া আছে গল্পে ।
"অশ্বত্থামা হত ইতি গজ" কেস এক্কেরে !
তাছাড়া অনামিকা একটা ফরেন এম এন সি তে চাকরি করা মেয়ে তো , হম্মম্ম মাইয়া। এখানেও বিষয়টা আবার সেই খপাৎ করে ধরতে হবে কিন্তু !
না , যাক গে বাদ দিন!
সব কথা ওত্তো সোজা সোজা ছেলেকে বললে চলবে অনামিকার ?
জটিল চরিত্র! কিছুই বুঝিতে পারিবেন না!
ললনাময়ী মা এক্কেরে !(আছে না একটা গান এসব শব্দ নিয়ে ! )
তো "ঠুস্ ঠাস" "শব্দ জব্দ" ব্যাপারটা আমি গল্প পড়তে গিয়ে শিখেছি ।
তবে আমি কোনো লেখক নই তবে। লিখতেও জানি না ! ওই গল্পের বই পড়তে ভালোবাসি ।
এমনি ইচ্ছে হল। তাই মজা করে গল্প লিখলাম আরকি ।
গল্পের আপডেট নিয়েই ফিরবো! দেখি, কবে ফিরি ,একটু সময় দিন...
লাটাইয়ের সুতো গুটিয়ে। ঘুড়ি তো এবার পকেটে!
***********
একটা গানের লাইন দিয়ে শেষ করি ,
অনামিকা আর টম এখন দুজনেই কি গাইছে জানেন তো ,
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখি বো... বো... বো...... বো... বো...
প্রেমের গল্প তো এটা ,১০০% লাভ লাভ লাভ লাভ লাভ
সঙ্গমে নেই কো ক্ষতি ,বন্ধনে দিয়ে নাকো ফাঁকি !
হা ,হা ,হা Amar comment er explanation pore je apnar valo legeche etei ami khushi dada.Ha,ami ektu emotional,jodio ekjon medical student er pokkhe ei emotional hoye porata kajer kotha noi,pore kichu khetre problem create korte pare, tao majhe majhe emotional hoye pori.Tobe oisob golpo lekha tekha amake diye hobe na dada,ami khali golpo pore o sunei khushi,ha,amio prochur boi porechi and ekhono pori, chotobela theke collect korte korte barite ekta choto khato library hoye geche, sob dhoroner book i pori,bisesh kore detective story,tar karonei amar ei bisleshon o deduction dhormi comment gulo kora,
Apni asosto korar por jodio ektu khushi hoyechi,asole ki bolun to,eto valo ekta Incest story te ma o cheler jodi sese bicched hoye jai, tahole khubi kosto hobe,jehetu golper lead role Anamika,tai tar uporei onek kichu depend korche,tobe eta refuse korbo na je porte porte majhe majhei Anamikar opore khubi rag hoi,jai hok,man-obhimaner por jodi next update e dujone intimate hoi,tahole jouno milon er somoy intimacy er matra ta besi i rakhben.Thick jemon er ager update tate dekhiyechilen,milon drishya tar beauty aro besi bere jabe,ar bubuke bhetore ejaculation korte na deoar karon mone hoi Anamikar risky period cholchilo,tai songom sese calendar dekhechilo se,asa kori porer Satardey Anamikar safe period chole asbe, tokhon hoito se cheleke bhetore birjopat korte anumoti debe.
Ar vai bole dakar request apnake agei korechilam,tao barbar dada dadai bolchen,ete kintu kichuta offended ami.Next Satardey er opekkhay thakbo.
Posts: 1,033
Threads: 0
Likes Received: 420 in 341 posts
Likes Given: 6,124
Joined: Sep 2021
Reputation:
15
Posts: 83
Threads: 1
Likes Received: 645 in 78 posts
Likes Given: 199
Joined: Jul 2026
Reputation:
237
(15-09-2026, 09:48 AM)Vinsent Wrote: Amar comment er explanation pore je apnar valo legeche etei ami khushi dada.Ha,ami ektu emotional,jodio ekjon medical student er pokkhe ei emotional hoye porata kajer kotha noi,pore kichu khetre problem create korte pare, tao majhe majhe emotional hoye pori.Tobe oisob golpo lekha tekha amake diye hobe na dada,ami khali golpo pore o sunei khushi,ha,amio prochur boi porechi and ekhono pori, chotobela theke collect korte korte barite ekta choto khato library hoye geche, sob dhoroner book i pori,bisesh kore detective story,tar karonei amar ei bisleshon o deduction dhormi comment gulo kora,
Apni asosto korar por jodio ektu khushi hoyechi,asole ki bolun to,eto valo ekta Incest story te ma o cheler jodi sese bicched hoye jai, tahole khubi kosto hobe,jehetu golper lead role Anamika,tai tar uporei onek kichu depend korche,tobe eta refuse korbo na je porte porte majhe majhei Anamikar opore khubi rag hoi,jai hok,man-obhimaner por jodi next update e dujone intimate hoi,tahole jouno milon er somoy intimacy er matra ta besi i rakhben.Thick jemon er ager update tate dekhiyechilen,milon drishya tar beauty aro besi bere jabe,ar bubuke bhetore ejaculation korte na deoar karon mone hoi Anamikar risky period cholchilo,tai songom sese calendar dekhechilo se,asa kori porer Satardey Anamikar safe period chole asbe, tokhon hoito se cheleke bhetore birjopat korte anumoti debe.
Ar vai bole dakar request apnake agei korechilam,tao barbar dada dadai bolchen,ete kintu kichuta offended ami.Next Satardey er opekkhay thakbo.
ঠিক আছে সব !
কিন্তু আপডেট আসবে পরের শনিবার ! একটু সময় দিন !
Posts: 3,457
Threads: 0
Likes Received: 1,531 in 1,357 posts
Likes Given: 45
Joined: May 2019
Reputation:
35
•
Posts: 242
Threads: 0
Likes Received: 143 in 114 posts
Likes Given: 174
Joined: Apr 2025
Reputation:
8
Ekdom,apni time nin ,kono problem nei,kintu compensation hisabe next Satarday boro update chai dada.
Posts: 244
Threads: 0
Likes Received: 332 in 159 posts
Likes Given: 1,060
Joined: Jun 2021
Reputation:
38
Posts: 425
Threads: 0
Likes Received: 184 in 156 posts
Likes Given: 1,646
Joined: Aug 2023
Reputation:
2
Posts: 299
Threads: 0
Likes Received: 90 in 78 posts
Likes Given: 657
Joined: Feb 2024
Reputation:
4
Posts: 242
Threads: 0
Likes Received: 143 in 114 posts
Likes Given: 174
Joined: Apr 2025
Reputation:
8
20-09-2026, 03:20 PM
(This post was last modified: 20-09-2026, 03:22 PM by Vinsent. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
(20-09-2026, 03:15 PM)Sadiyaxyz Wrote: আপডেট কোন দিন আসবে
Vai ager message ta check korun,sposto bola ache porer Satardey update asbe.valo kore na dekhei update kobe asbe, update kobe asbe bolata thick noi.
Posts: 613
Threads: 3
Likes Received: 871 in 423 posts
Likes Given: 6,297
Joined: Jul 2019
Reputation:
187
(08-08-2026, 03:20 AM)রিও_৭ Wrote: আরেকটি নিষিদ্ধ প্রেমের গপ্পো
রিও
আজ মায়ের ছুটির শেষে বিদায়ের পালা!
আমি কলকাতা বিমান বন্দরের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলাম মাকে। মা পিছন ফিরে হেঁটে চলেছে কলকাতা বিমান বন্দরের ভিতরের দিকে মুম্বইতে যাবার ফ্লাইটের উদ্দেশ্যে ।
মায়ের একপাশের হাতটা শক্ত করে ধরে রয়েছেন ভাস্কর আঙ্কেল। আজ আমার মা ,আমাকে ছেড়ে মুম্বাইতে ফিরে যাচ্ছেন নিজের কর্মস্থলে যোগদেবার জন্যে ।
মা ভাস্কর আঙ্কেলের হাত ধরে,পিছন ফিরে হাঁটতে হাঁটতে ,একটি বারের জন্যে ঘাড় ঘোরালো আমার দিকে চেয়ে।
আমি দূর থেকে দেখতে পেলাম মায়ের চোখটা তখনো লাল হয়ে জলে ভিজে রয়েছে ।
ক্রমশ...
ei lekhatir anek sambhabana acche bole mone hoy. likhe jan bhai.
•
Posts: 147
Threads: 0
Likes Received: 127 in 71 posts
Likes Given: 478
Joined: Oct 2024
Reputation:
11
পরবর্তী আপডেট ছোট হলেও কি যায় আসে....
ঘটনার ঘনঘটা থাকলেই চলবে।
অনেক অনেক শুভকামনা রইলো রিও_৭ দাদা।
Posts: 145
Threads: 0
Likes Received: 50 in 39 posts
Likes Given: 7
Joined: Jul 2024
Reputation:
0
Posts: 242
Threads: 0
Likes Received: 143 in 114 posts
Likes Given: 174
Joined: Apr 2025
Reputation:
8
Reo dada,bikele ba sondhei ki update asbe?
Posts: 83
Threads: 1
Likes Received: 645 in 78 posts
Likes Given: 199
Joined: Jul 2026
Reputation:
237
১১(ক)— জানি এ ভুল !
সেদিন গোটা কতক সিগারেট টেনে, মনমরা হয়ে বাইকে করে রাস্তার এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম । কোথায় যাচ্ছি, কেনই বা যাচ্ছি, সেসবের কোনো হিসেব ছিল না।
শুধু মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে কয়েক পেগ মদ যদি গলায় ঢালা যায়, তবে হয়তো বুকের ভেতর জমে থাকা অশান্তিটুকু কিছুটা সময়ের জন্যে ভুলে থাকা যাবে।
বাড়িতে অশান্তি, মা কে রাগের মাথায়, যা তা বলে ফেলেছি , মা আমাকে ভালোবাসা তো দূরের কথা , মা আমার সাথে আর কথাই বলবে না।
সে আমি খুব ভালো করেই মাকে চিনি । বেকার বেকার ভাল মা টাকে আবার রাগিয়ে দিলাম। মুখে যা নয় তাই বলে ফেললাম। ছি ছি !
এদিকে আবার কলেজের সেমিস্টার, তার সঙ্গে সামনে রয়েছে আবার কম্পিটিটিভ এক্সাম , আবার বিদেশে পড়তে যাওয়ার চিন্তা।
সবকিছু যেন একসঙ্গে এসে মাথার ভেতর জট পাকিয়ে গিয়েছিল। তার ওপর মা-ও চলে যাবে আমাকে ছেড়ে। অশান্তি তো যা করার করেই ফেললাম আমি ।
মা, তুমিও আমাকে ভুল বুঝলে,তাই না !
আমি তো তোমাকেই কাছে পেতে চেয়েছিলাম !
আমি তো তোমাকেই সব চাইতে বেশি ভালোবাসি ,প্রেম করতে চেয়েছিলাম তোমারই সাথে ।
এইসব কথাই মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম সেদিন। আমার ভেতরের অশান্তিটুকু কিছুতেই পিছু ছাড়ছিল না। একরাশ অভিমান জমে ছিল মায়ের প্রতি।
বুকের ভেতরটা তখন কেমন হুহু করে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, এই পৃথিবীতে সত্যিই আমার কেউ নেই। যে আমাকে আপন করে, নিজের করে, নিঃশব্দে এসে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলবে,
'আমি তোর সাথে আছি।' এ দুনিয়ায় সবাই বড় স্বার্থপর। স্বার্থপরের দুনিয়া এটা। মা তুমিও স্বার্থপর! তুমি যে মা। আর আমার মা, আমারই কাছে কিভাবে স্বার্থপর হতে পারে?
তুমি চলে যাচ্ছ মা , আর আমার বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে যে ।
অথচ, পৃথিবীতে যাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি,সেই মাকেই , আমি খারাপ কথা বলে ফেললাম!
আমি একটা অপদার্থ ছেলে। ছোটলোক ছেলে আমি একটা।
মা তো আমাকে ঠিক কথাই বলেছে, সভ্য, ভদ্র ছেলে আমি কিছুই হতে পারিনি।
আমার সেদিন নিজের মনের মধ্যে অনুশোচনা হচ্ছিল। আর ,আরেকটা জিনিস মাথায় ঘুরছিল। সেটা হল ভাস্কর আঙ্কেল।
শালা, যে লোকটার প্রতি আমার এতো রাগ ,ক্ষোভ ,প্রথমত সেই লোকটা সেটা জানেই না।
আর ,দ্বিতীয়ত ,আমি যে লোকটার সাথে নিজেকে তুলনা করছি ,ওই লোকটার আমি বালের যোগ্যও হতে পারবো না কোনোদিন। আর এটাই বাস্তব।
তাহলে মা আমাকে কেন ভালোবাসতে যাবে। ভাস্কর আঙ্কেলকে ছেড়ে। সিম্পল একদম সোজা ব্যাপার। আর মা ঠিক সির্দ্ধান্তই নিয়েছে।
আল বাল চিন্তা আমার মাথাতেই আসবে এই সব।
ভাবতে ভাবতেই কখন যে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল , টেরই পাইনি। বাইকটা ছুটে চলছিল নিজের গতিতে, আর চোখের জলে সামনের রাস্তাটা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছিল।
হাতের মুঠোটা হ্যান্ডেলের ওপর আরও শক্ত হয়ে উঠছিল, অথচ বুকের ভেতরটা তখন কেবলই গুমরে গুমরে কাঁদছিল ।
আমার অশ্রুজলে বারবার ভেসে উঠছিল মায়ের মুখের প্রতিচ্ছবি।
মমতাময়ী সেই মায়ের স্নিগ্ধ, পবিত্র মুখটা যতবারই মনে পড়ছিল, ততবারই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে উঠছিল।
মনে হচ্ছিল, মাকে আমি কতটা কষ্ট দিয়েছি, আর সেই অপরাধবোধের ভারে আমার চোখের জল যেন কিছুতেই থামছিল না।
আর তাই সেদিন প্রতি মুহূর্তে ,কান্না ভেজা চোখে ,বুকে জমা একরাশ দুঃখ ,বেদনা নিয়ে সেই নির্মল,মায়ামাখা মায়ের মুখটাই ভেসে উঠছিল চোখের সামনে।
মা... তুমি আমাকে চড় মারলে! লাগেনি মা ,আমার লাগেনি। মা, তুমি কোনোদিন আমার গায়ে একটা আঁচড়ও কাটনি ছোট্ট বেলা থেকেই।
অথচ আজ ,আমি এতটাই ছোটোলোক ,এতটাই নিচ , ইতর হয়ে গেছি মা ,আমি তোমার কাছে। আমি তোমার সম্পর্কে নোংরা নোংরা কথাগুলো বলে ফেললাম।
তাই তুমি আমাকে চড় মারলে মা ! গায়ে হাত তুললে আমার তুমি ।
আমারই ভুল! আমি মায়ের ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারি না। কখনোই না। কিন্তু কেন যে এই ভুল প্রশ্নগুলো আমি মাকেই করে ফেলি, সে ভগবানই জানে।
মাকে বোধহয় আমি অন্ধের মতোই বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। আর যে ভালোবাসার কোনো মানেই নেই। মাকে আমি মায়ের মতো ভালোবাসতে গিয়ে আরও কিছুটা অন্যরকম ভাবে ভালোবেসে ফেলেছি।
আর যেটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।
নিজের প্রতি নিজেরই ,রাগ, অভিমান আর কষ্ট সব কিছু যেন একসঙ্গে এসে মাথাটা এলোমেলো করে দিচ্ছিল আমার।
এইসব চিন্তাই করছিলাম সেদিন। রাস্তার ট্রাফিকের সামনে লাল আলোর সিগনাল টা জ্বলে উঠতেই বাইকটা থামিয়ে দিলাম। কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইলাম বাইকে ।
মনে হলো, না... আগে একটা বারে যাই। বসে মদ গিলি ।মাকে আমি অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি। মাকে আর আমি কষ্ট দেব না কোনোদিন।
এই অসহ্য যন্ত্রণা, এই অপরাধবোধ, এই নিজের কাছেই নিজের ছোট হয়ে যাওয়ার অনুভূতিকে পিছনে ফেলে , সবকিছু থেকে দূরে, বহু দূরে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল আমার সেদিন।
বাইকটা ঘুরিয়ে নেব ভেবেছিলাম । ঠিক তখনই পকেটের ভেতর মোবাইলটা বেজে উঠল।
বাইকটা ধীরে ধীরে রাস্তার একপাশে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করালাম। তারপর পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখি বাবার ফোন!
কয়েক সেকেন্ড যেন স্থির হয়ে গেলাম ।
বাবার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম। কী সব প্রসেসিং-ট্রসেসিং নিয়ে কথা বলছিল কে জানে , আমিও তখন হুম-হাঁ করে সেসব কথায় সায় দিয়ে যাচ্ছিলাম।
সত্যি বলতে কি ,বাবা কড়া ভারী গলায় চিবিয়ে চিবিয়ে কী বলছিল সেদিন আর আমি কী উত্তর দিচ্ছিলাম , কিছুই তখন মাথায় ঢুকছিল না আমার ।
বাবার সঙ্গে কথা বলছি, এমন সময় দেখলাম দিদুন ও ফোন করছে।
মনে মনে ভাবলাম ,মায়ের ফোনটা তো আমি ভেঙে ফেলেছি,তাই দিদুনের মোবাইল থেকে মা ফোনটা করছে।
বাবার ফোন কাটতে না কাটতেই, দিদুনের কলটা রিসিভড করতেই, মায়ের গম্ভীর নাকি নাকি গলার স্বরে, কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর ভেসে এল কানে,
— "এই মুহূর্তের মধ্যে যেখানে আছিস, যেভাবে আছিস, ঘরে আগে আসবি তুই। আমি বলে দিচ্ছি, ঘরে আসবি তুই কিন্তু এক্ষুনি ।
আমি চুপ করে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকলাম রাস্তার ধারে । মা যাতে আমার কান্নার শব্দ শুনতে না পায়, তাই মোবাইলটা মিউট করে দিয়েছিলাম ।
— " বুবু, তুই কিন্তু বাড়িতে ঢোক, বলে দিচ্ছি কিন্তু আমি ।"
— " আচ্ছা , কথা বলবি না তো তুই, তাই তো।"
— " তাহলে দেখ এবার!"
— " আমি গায়ে আগুন লাগিয়ে নিচ্ছি এক্ষুনি, শান্তি পাবি তো তুই!"
আমি সাথে সাথেই মোবাইলটা আনমিউট করে রাস্তার মাঝে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বললাম,
— "না মা, আমি আসছি, এক্ষুনি আসছি মা আমি তোমার কাছে। তুমি কিচ্ছু করোনা মা প্লিজ।"
— "সরি, মা সরি!"
আমি ফোনের ঐপাশ থেকে শুনতে পেলাম মায়ের কান্নার শব্দ। আমিও ফোন ধরে কাঁদছি মায়ের সাথেই । তারপর বেশ কিছুক্ষন মা আমি দুজনেই কাঁদছিলাম। কেউ কোনো কথা বলছিলাম না কারুর সাথেই ।
অবশ্য , কথা বলার মতো পরিস্থিতিতেও ছিলাম না আমরা কেউ তখন।
ফ্ল্যাটে ঢুকেই দিদুন দরজাটা খুলল, দিদুন আমার সাথে আর কোনো কথাই বলছিল না। ঘরের মধ্যে শান্ত শীতল থমথমে পরিবেশ।
মাকে খুঁজছিলাম তখন । বারান্দা থেকে উঁকি মেরে দেখলাম ,মা দিদুনের ঘরের খাটে চুপ চাপ বসে আছে।
আমি গুটি গুটি পায়ে হেঁটে গেলাম দিদুনের ঘরের দিকে। মা গোমড়া মুখে আমার দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।
দেখলাম মায়ের চোখ-মুখ সব লাল হয়ে ফুলে উঠেছে কাঁদতে কাঁদতে । আর চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে । আমি মায়ের পাশে আস্তে করে বসলাম। চুপটি করেই।
খাটের উপরে রাখা মায়ের মোবাইল টা হাতে তুলে দেখলাম , মোবাইল স্ক্রিন ড্যামেজ। মা ঝপ করে আমার হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিল।
মাথা নিচু করেই মায়ের হাতটা আস্তে করে চেপে ধরলাম খাটের উপরেই । মা আমার হাতটা সরিয়ে নিল।
আমি মাথা তুলে মায়ের অশ্রুসজল, মায়ামাখা মুখের দিকে তাকিয়ে আর থাকতে পারলাম না। বুকের ভিতরটা ফেটে যাচ্ছিল সেদিন।
আমি সঙ্গে সঙ্গেই মাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরতেই গেছিলাম ,কিন্তু মা আমাকে সেদিন বলেছিল ,
— “ছুঁবি না আমাকে তুই ! জানোয়ার! আমার চোখের সামনে থেকে চলে যা তুই ! ”
আমি মায়ের সেই রক্ত জবার মতো লাল টকটকে বিস্ফরিত চোখের হুঙ্কারের গর্জনে ভয় পেয়ে খাট থেকে উঠে দাঁড়ালাম।
মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মাথাটা আস্তে আস্তে নিচু করে ফেললাম, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে। মায়ের চোখের দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না। আমারও চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে এসেছিল সেদিন।
মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মাথাটা আস্তে আস্তে নিচু করেই ,মৃদু স্বরে মাকে সেদিন বলেছিলাম,
— “ সরি মা !"
আর আমি এটাও জানতাম, মাকে যা যা বাজে বাজে কথা গুলো বলেছি ,যেটা আমার মা মোটেও নয়। আর মায়ের যে আমার এই সরি বলাতে, কোনো কাজই হবেনা ,সেটাও আমি খুব ভালো করেই জানতাম।
আর আমি এটাও ভাবলাম ,আমি মায়ের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করতে গিয়ে ,অনেক অনেক দূরে সরে গেছি !
নিজের ঘরের খাটে এসে, চুপ চাপ বসে ছিলাম। মাথা নিচু করেই !
Posts: 83
Threads: 1
Likes Received: 645 in 78 posts
Likes Given: 199
Joined: Jul 2026
Reputation:
237
১১(খ)—স্বপ্নের ওপারে, শুধুই মায়া।
পরের দিন সকালে ঘুমটা নিজের থেকেই ভেঙে গিয়েছিল। চোখ মেলতেই দেখলাম, জানলা দিয়ে আসা সকালের রোদ ঠিকরে এসে পড়েছে চোখে-মুখে।
বিছানায় শুয়ে শুয়েই শুনতে পাচ্ছিলাম, বারান্দায় দিদুনের পায়ের শব্দ। তার সঙ্গে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে থালা-বাসনের টুংটাং আওয়াজ। সন্ধ্যা মাসি কাজে এসেছে। দিদুনের সাথে ওনার গলার শব্দ পাচ্ছিলাম।
বিছানায় শুয়ে শুয়েই ভাবছিলাম,আর মাত্র একটা দিন। আগামীকালই তো মা মুম্বাই চলে যাবে। অফিস জয়েন করবে।
তাই আর মায়ের সঙ্গে কোনো ঝামেলা, কোনো অশান্তি করব না আর ।
মাকে এবার মায়ের মতোই একটু নিরিবিলি, শান্তিতে থাকতে দেওয়াটাই হয়তো ঠিক হবে।
কিন্তু তাই বলে… মায়ের মুখও কি আর দেখব না আমি?
ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে, খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে জানালাটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। খুব অলস লাগছিল শরীরটা, আর মাথাটায় ছিল ভার একটা ভাব।
ঠিক এই ভাবেই কালকেও একটা ভোর হয়ে সকাল হবে। মা চলে যাবে!
ইসসস! মা যে কেন এলো! মা না এলেই পারতো! বেকার বেকার, ছিলাম ছিলাম, নিজের মতো ডাল-ভাত মার্কা ম্যাড়মেড়ে জীবন নিয়ে দিব্যি ছিলাম।
সাথে ছিল কলেজ, বন্ধু, আড্ডা, ইয়ার্কি, ক্লাব, ভলি ,হাসি-মজা ,এইসব নিয়ে নিজের মতো বেশই তো ছিলাম।
আর মাঝে মাঝে শর্মিষ্ঠার দিকে ক্যালাই কাত্তিকের মতো তাকিয়ে তাকিয়ে রাতে একান্তে বাড়ি ফিরে কষ্ট পেতাম। ওইটাই অনেক ভালো ছিল।
মা যে আবার আমার মত ,বঞ্চিত ব্যর্থ প্রেমিকের মনের মধ্যে ঢুকে ,বাসা বেঁধে ফেলবে , সেটা তো আগে বুঝতেই পারিনি !
মা দুদিনের জন্য ছুটিতে এসেই মনটাতে কেমন যেন ঝড় বইয়ে দিয়ে চলে গেল। এতদিন মা ছিল মোবাইলের ভয়েস আর ভিডিও কলে। ওই খানেই বন্দি হয়েই , না হয় থাকতে পারতো। সামনে যে কেন আসতে গেল মা!
দিব্যি হ্যাঁ ,না, ভালো-মন্দ কিছু একটা বলে চালিয়ে দিতাম এতদিন। কে আর কার মনের খবর রাখতে গেছে! ধুর, যা চলছিল সেটাই বরঞ্চ ভালো ছিল।
সকালে বারান্দার টেবিলে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলাম ,মা কি চা খেতেও বারান্দায় আসবে না নাকি।
দিদুনের ঘরের আয়নার কাচ ভেঙে ফেলেছি, তাই পাড়ার এক ফার্নিচারের দোকানে কল করে ওদের ডেকে পাঠালাম। কাচ নিয়ে এসে বাড়িতেই ফিটিং করে দেবে , সেইরকম কথাই হয়েছিল আমার , ওদের সাথে ।
শেষ দুদিন কলেজে যাব না ভেবেছিলাম , মায়ের জন্যেই।
মায়ের সাথে সারাদিন হাসি-মজা করে শেষ দুটো দিন কাটাবো।
না!
সেইসব আমার কপালে নেই! অতো ভালো কপাল নিয়ে জন্মালে কি আর কপাল চাপড়াতে হয় নাকি কারও!
তারপর ভাবলাম,খারাপ যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। মায়ের সামনে দাঁড়ানোর মুখ আমার নেই। আর কলেজে যখন যাবই না, তখন নিজের ঘরে বন্দি হয়েই পড়াশোনা করে দিনটা কাটিয়ে দিই।
বিকেলের দিকে বরঞ্চ কোচিং ক্লাসে চলে যাব।
নিজের ঘরে বন্দি হয়ে পড়াশোনা করছিলাম। তবুও মনটা পড়ে ছিল বারান্দার দিকে। পর্দাটা একটু ফাঁক করে, ঘরের দরজাটাও অল্প খুলে রেখেছিলাম , পড়ার ঘর থেকে বারান্দার দিকে মাকে উঁকি মেরে দেখব বলে।
পড়তে পড়তে বারান্দার দিক থেকে মা আর দিদুনের গুনগুন করে কথা বলার শব্দ কানে আসছিল। তার সঙ্গে ভেসে আসছিল মায়ের গায়ের সেই পরিচিত সুবাসটাও।
মা এখনো এই ঘরেই রয়েছে! মা এখনো আমার আশেপাশেই আছে!
তার অস্তিত্বটুকুর অনুভূতি পাচ্ছিলাম ,মুখচোরা হয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে।
বেশ একটু বেলার দিকে ডাইনিং টেবিলে বসে সকালের টিফিন খাচ্ছিলাম। কিছুক্ষণ পর কলিং বেলের শব্দ কানে ভেসে এল।
দরজা খুলে দেখলাম , ওই ফার্নিচারের দোকানের লোকগুলো আয়নার কাচ নিয়ে এসেছে।
আমি ওদের সঙ্গে দিদুনের ঘরে ঢুকলাম। মা খাটে বসে ছিল, উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে। আমি দিদুনের ঘরে ফার্নিচারের লোকগুলোর কাজ দেখছিলাম।
মায়ের ভাঙা মোবাইলটা বিছানার ওপর পড়ে থাকতে দেখলাম। আর ভাবলাম, মায়ের একটা খুব তাড়াতাড়ি মোবাইল কেনা প্রয়োজন। মায়ের দামি মোবাইলটা ভেঙে ফেলেছি।
এই মোবাইলটা রিপেয়ার করতে যে খরচ হবে, তাতে আরেকটা ভালো কোম্পানির মোবাইল হয়ে যাবে।
ফার্নিচারের লোকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে এইসব কথাই ভাবছিলাম। ঠিক সেই সময়েই আবার কলিং বেলের শব্দ পেলাম।
আমিই গিয়েছিলাম দরজা খুলতে। দিদুন তখন বাথরুমে ঢুকেছিল স্নান করতে।
দরজা খুলে দেখলাম, একজন ডেলিভারি বয় দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা চৌকো বাক্স। বাক্সটা আমার হাতে দিয়ে বলল, ওটিপি পিনটা লাগবে।
বাক্সটা হাতে নিয়ে ভাবলাম, এটা মায়ের নতুন মোবাইল। খুব সম্ভবত গতকাল রাতেই মা অর্ডার দিয়েছিল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভাবছিলাম আমার গতকালের কুকীর্তির কথাগুলো।
ঠিক তখনই মা আমার হাত থেকে বাক্সটা কেড়ে নিল। তারপর দিদুনের মোবাইলটা হাতে নিয়ে লোকটাকে ওটিপি পিন বলল।
আমি ওখান থেকে সরে চলে গেলাম।
মা ডেলিভারি বয়ের কাছ থেকে মোবাইলটা নিয়ে কিছুক্ষণ পর আবার দিদুনের ঘরের খাটে এসে বসলো। আমিও তখন দিদুনের ঘরেই ছিলাম।
মা নতুন মোবাইলটা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আমিও চুপচাপ আয়নার কাচ লাগানোর কাজ দেখছিলাম।
ফার্নিচারের লোকগুলো দিদুনের ড্রেসিং টেবিলের কাচ লাগিয়ে চলে যাওয়ার পর, আমি আমার মতো স্নান করে পড়তে বসেছিলাম। মায়ের সঙ্গে না হচ্ছিল কথা, না হচ্ছিল চোখে চোখে কোনো আলাপের বিনিময়।
খাটের উপর বসে পড়াশোনা করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, আমার মোবাইলটা কেঁপে উঠল। হাতে নিয়ে দেখলাম, মা টেক্সট পাঠিয়েছে।
মা,
— ay tui ki korchis re
আমি,
— parasona korchi maa
মা,
— ki porchis sata send kor too?
আমি সেদিন মাকে কেমিস্ট্রির বইয়ের পাতার ছবিগুলো তুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর মা আমাকে আর কিছুই বলেনি।
আর আমিও মাকে আমার কাছে ডাকিনি। এমনিতেই মা আসবে না আমার কাছে , তার উপর দুটো গালাগালি করে দেবে, জানোয়ার, গাধা, গরু,শুয়োর !
পুরো এনিম্যাল সাফারি বানিয়ে ছাড়বে আমাকে । দরকার নেই !
তাই মাকে মায়ের মতো থাকতে দিতেই চেয়েছিলাম আমি।
দুপুরের দিকে, লাঞ্চের সময় মা, আমি আর দিদুন একসাথেই খেতে বসেছিলাম।
মা আমার উল্টোদিকে নিজের পরিচিত খাবারের চেয়ারেই বসে ছিল। মা খাবার বেড়ে দিচ্ছিল।
মায়ের চোখের দিকে একবার তাকালাম, ওই ঝলসানো চোখের দিকে তাকানোর সাহসে কুলোয়নি সেদিন।
তাই মাথা নিচু করে খাবারের থালার দিকে তাকিয়ে শুকনো ভাতগুলো নিয়ে আঙুলে নাড়াচাড়া করছিলাম। দেখলাম, ডালের গোল হাতাটা এগিয়ে এল খাবারের থালার উপরে।
ডালের হাতাটার সঙ্গে ডালটাও টলমল করে কাঁপছিল।
মাথাটা সামান্য তুলে বুঝতে পারলাম, মায়ের হাত।
সেদিন যেন বড্ড কাঁপছিল মায়ের হাতটা।
লাঞ্চ করে সেদিন দুপুরে একা একা কম্পিউটারে পড়াশোনার কাজই করছিলাম।
মা আর দিদুন ওরা একসঙ্গেই দুপুরবেলায় ওদের ঘরেই ছিল। আমি কোচিং ক্লাসের টাস্কগুলো কমপ্লিট করছিলাম।
তারপর বিকেলের দিকে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখলাম, দিদুন বারান্দায় সোফায় বসে টিভি দেখছে। আমাকে দেখে দিদুন চা বানিয়ে এনে দিল।
আমি কোচিং ক্লাসে যাব বলে জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে দিদুনের পাশেই সোফায় বসে চা খেতে খেতে দিদুনকে জিজ্ঞেস করলাম,
— “আচ্ছা দিদুন, আমি বিদেশে পড়াশোনা করতে চলে যাচ্ছি, তা তোমার মন খারাপ করছে না আমার জন্য?”
দিদুন আমাকে বিরক্তির সুরে বলেছিল ,
— " তুই একটা পাজি ছেলে কোথাকার। তা তোকে চোখের সামনে দেখতে না পেয়ে আমার কষ্ট লাগবে না। দুটো নয় ,পাঁচটা নয় ,তুই আমার এক মাত্র নাতি।"
— " আমি নিজের হাতে,সেই ছোট্ট বেলা থেকে , তোকে মানুষ করেছি যে !
— " কিন্তু কি করবো আর আমি , আমি তো তোর পড়াশোনা আটকে ,নিজের কাছে তোকে রেখেদিতে পারি না ! সে ক্ষমতা আমার নেই !"
আমি দিদুনকে জড়িয়ে ধরলাম, আর দিদুনের কপালে একটা ছোট্ট করে চুমু খেলাম।
আর দিদুন আমাকে আদর করে বলল,
— “দুদিনের জন্যে তোর মা, তোরই সাথে দেখা করতে এল। কালই আবার চলেও যাবে।”
— “মায়ের সাথে এইভাবে কেউ অশান্তি করে কোনো ছেলে!”
— “গতকাল সারারাত ঘুমোয়নি তোর মা। খালি আমার পাশে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেছিল।”
আমি দিদুনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, দেরি হয়ে যাচ্ছে। কোচিংয়ে ঢুকতে হবে।
সেদিন কোচিং ক্লাস করছিলাম।
কী মনে হলো, একবার শর্মিষ্ঠার দিকে তাকালাম। ও অবশ্য আমার দিকে তাকায়নি । নিজের মতো মন দিয়ে ক্লাস করছিল।
আর আমি ভাবছিলাম, মাকে নিজের মতো বাঁচতে দেওয়াই উচিত। সেটাই তো ঠিক।
আমি বরঞ্চ চলে যাব বিদেশে। তবে জীবনে আর কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেম করব না, শালা! এ বিশাল ঝামেলার জিনিস ।
সামনে একটা বসে আছে , সে আমাকে বিশ্বাসই করতে পারল না । বাড়িতে যে আছে ,সেও আমাকে ভুল বুঝল।
তাই প্রেম করা তো দূরের কথা, বিয়েই করব না কোনোদিন কাউকে।
সে আবার আমাকে ছেড়ে পালিয়ে যাবে কি না, তার কোনো গ্যারান্টি আছে নাকি!
এই বেশ ভালো আছি ।
বেকার বেকার জীবনে কাউকে মন দিয়ে, আবার সেই মন নিয়ে ছেলে খেলা করে, মনের অশান্তি বাড়িয়ে লাভ নেই আর।
বিদেশে গিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করব। চাকরি করব। নিজের মতো ঘুরে বেড়াব একা একা। সেটাই বরঞ্চ ভালো হবে আমার জন্যে।
কোচিং ক্লাস শেষ করে বাইক স্টার্ট দিতে যাব, ওমনি মোবাইলটা বেজে উঠল।মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখলাম, স্ক্রিনে মায়ের ছবিটা ভেসে উঠেছে।
মোবাইলে মায়ের ছবিটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই ভাবলাম,মায়ের কী টাইমিং জ্ঞান! ঘড়ি ধরে বসে থাকে বোধহয় সারাক্ষণ আমার জন্য।
আর মা বোধহয় আমার কথাই চিন্তা করে। আর তা না হলে এ জিনিস হওয়ার নয়।
মা হয়তো আমাকে ঠিকই ভালোবাসে। আমিই বোধহয় মাকে মায়ের মতো করে ভালোবাসতে পারিনি।
সমস্যাটা তো আমিই তৈরী করেছি , মা তো করেনি!
মাকে সেদিন ফোনে বলেছিলাম,
— “আমি একটু ক্লাবে যাব, মা। আজ বনির জন্মদিন। তাই ওর সঙ্গে দেখা করতে হবে।”
সেদিন ক্লাবে ঢুকেই বনিকে দেখেই ,আমার সেই রবার্তো কার্লোসের ফ্রি-কিকটার কথাটা মনে পড়ে গেল।
চালিয়ে দিলাম বনির পশ্চাৎপ্রদেশ বরাবর। গদাম করে লাথিটা মেরেছিলাম ওকে। পাশে আদভিক আর আমির হাততালি দিয়ে হো হো করে হেসে বলল,
— “গোল!”
— “সলিড দিয়েছিস ভাই!"
আর আমি বনিকে বললাম,
— “হ্যাপি বার্থ ডে, কুতরিয়ান!”
বনি পাছায় হাত বোলাতে বোলাতে ,
—"ওফফ হারামি ,আস্তে মারবি তো !"
সেদিন আমরা সবাইমিলে বনির জন্যে কেনা গিফট বক্স টা ওর হাতে তুলে দিয়েছিলাম । উপহারের বাক্সটা হাতে নিয়ে বনির মুখটা সেদিন আনন্দে ভোরে উঠেছিল।
আর বনিকে আমি বলেছিলাম,
— “আজ তোর জন্মদিন, তাই বেঁচে গেলি শালা।”
— “বাইনচোদ! বারে বসে মাল খাওয়ার ছবিগুলো পোস্ট করেছিলিস, আর আমাকে ট্যাগ করতে গেলি কেন, শুয়ার !”
— “আমার বাপকে তোমরা চেনো না! কী জিনিস!”
— “এই তোদের জন্যেই আমি বাবার কাছে কেস খেয়ে গেলাম!”
সেদিন ওদের আমি আগেই বলে রেখেছিলাম, আগামীকাল মা চলে যাবে। তাই বনির জন্মদিনের পার্টিটা পরের উইকেই হবে।
সেদিন ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম। আর বনি আমাদের বিয়ার খাইয়েছিল। ওতেই আমরা সেদিন সন্তুষ্ট ছিলাম অবশ্য।
বাইক চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময় মনটা বড্ড খারাপ লাগছিল।
মা আগামীকাল চলে যাবে। বাড়িটা আবার ফাঁকা হয়ে যাবে। সেই ভাবনাটাই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী করে তুলছিল।
তাই তাড়াতাড়ি বাইক চালিয়ে ফ্ল্যাটে ঢুকলাম। মনে মনে শুধু একটা আশাই ছিল, মা চলে যাবে বলে যদি একটু দয়া-দাক্ষিণ্য করে আমার সঙ্গে কথা বলে! এইটুকুতেই আমি সন্তুষ্ট। আর কিছু চাই না জীবনে।
এইসব কথাই মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম সেদিন।
ফ্ল্যাটে ঢুকে উঁকি মেরে দেখলাম, মা দিদুনের ঘরে। আমি ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে নিজের ঘরেই ছিলাম।
দিদুন আমার জন্যে প্লেটে করে খাবার এনে টেবিলে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।
ভাবলাম, মা আমাকে খাবার এনেও দেবে না। মায়ের কি দয়া, মায়া, মমতা বলে কিছুই নেই নাকি? সব উধাও হয়ে গেল।
রাত পোহালেই ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই চলে যাবে মা। আমার জন্যে একটু মন খারাপও করে না মায়ের! এ কেমন মা!
তবু মনটা সেদিন রাতে খুব উসখুস করছিল।
মা হৃদয়হীন হতেই পারে। আমার মা টা ওমনিই জিনিস !
আমি তো আর মায়ের মতন হৃদয়হারা হতে পারি না।
মা কি এখনোও আমার সঙ্গে কথা বলবে না? তাই ভাবলাম, দেখি তো মা দিদুনের ঘরে কী করছে।
আমি বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছিলাম। লুকিয়ে লুকিয়ে উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখলাম, মা দিদুনের ঘরে দিদুনের সঙ্গেই কথা বলছে। আর মা আমার দিকে একবার তাকিয়েই আবার মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে।
ভাবলাম, না, মা তো সেই রেগেই আছে। আমি মায়ের চোখ দেখলেই সব বুঝতে পারি। তার সঙ্গে মায়ের নাকের ডগায় লেগে থাকা লালচে আভার রেশ তখনও পুরোপুরি কাটেনি।
তাই ভাবলাম, না ভাই ,দরকার নেই।
নিজের ঘরে ঢুকে কম্পিউটারের চেয়ারটাতে বসে ছিলাম।
আর আমার সি পি ইউ ক্যাবিনেটের উপরে সাজিয়ে রাখা, মায়ের জন্মদিনে আমার দেওয়া সেই ছোট্ট শোপিসটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
শোপিসটার গায়ে লেখা—
“My Heart Beats Only For You.”
অনেকক্ষণ ধরে শুধু ওই লেখাটার দিকেই চোখ বোলাচ্ছিলাম।
আর মনে পড়ে যাচ্ছিল, মায়ের সঙ্গে কাটানো হাসি-মজার দিনগুলোর কথা।
আর ভাবছিলাম, মা বোধহয় এটাও আমাকে ফিরিয়ে দিয়েই যাবে। সঙ্গে করে নিয়ে যাবে না।
মায়ের হার্ট আর আমার জন্য বিটস করবে না, তাই!
যা নচ্ছার ছেলের ভুল করে জন্ম দিয়ে ফেলেছে মা । সেটাই স্বাভাবিক!
দিদুনের ডাকে রাতের খাবার খেতে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসলাম। আমি খাবার খেতে গিয়ে ,আমার উল্টো দিকের চেয়ারে বসে থাকা মায়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়েছিলাম।
কিন্তু মা, আমার দিকে মুখ তুলে একটি বারের জন্যেও তাকাল-ই না।
আর ভাবছিলাম, ইসস, মায়ের ওই চেয়ারটা আবার সেই আগের মতোই ফাঁকা হয়ে যাবে । মায়ের চেয়ারটাতে আবার আগের মতোই ধুলো জমতে শুরু করবে।
কিছুদিন আগে মজা করে টেবিলের তলায় ঢুকে গিয়ে মায়ের সঙ্গে মজা করেছিলাম।
আর সেই মজা করার মানুষটাই আমার থেকে দূরে চলে যাবে । আমি তাড়াতাড়ি খেয়ে বেসিনে হাত মুখ ধুয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেলাম।
আমি সেদিন খাটে বসেই পড়ছিলাম। আর মায়ের জন্য মন খারাপ করছিল।
বেশ কিছুক্ষণ পর, রাতের দিকে দরজার দিক থেকে আলতো একটা শব্দ হলো।
দরজার দিকে আমার তাকানোর প্রয়োজনই হলো না। মায়ের গায়ের পরিচিত সুবাসের অনুভূতিতেই টের পেয়েছিলাম,দরজার সামনে মা দাঁড়িয়ে আছে।
মা আমার ঘরে এসে, খুব ধীর শান্ত ভাবে ,খাটের কোনায় চুপ করেই বসেছিল,মাথা নিচু করে।মায়ের হাতে ছিল ল্যাপটপ আর মোবাইল।
মা আমার দিকে চোখে চোখ রেখে তাকাচ্ছিল না আর।
মা ল্যাপটপটা খাটের উপরে আস্তে করে রাখল। মা কেমন যেন নিজে নিজের মধ্যেই গুটিয়ে গেছিল সেদিন।
হয়তো মা ও আমার মধ্যে, সেদিন দুপুর বেলায় ঘটে যাওয়া,আকস্মিক শারীরিক সম্পর্কটার ভয় ,লজ্জা আর পাপবোধের বিবেকের দংশন কাজ করছিল মায়ের মনের গভীরে।
তাই মা এতটা চুপ ছিল । তাই মা সেদিন ছিল শান্ত।
আমি শুধু কম্পিউটার ক্যাবিনেটের উপরে সাজিয়ে রাখা, শোপিসটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে মাকে বলেছিলাম ,
—"ওটা নিয়ে যাবে না মা ?"
—"তোমার সঙ্গে করে!"
—"আমি যে তোমাকে জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলাম ওটা। "
মা মাথা নিচু করেই খুব ধীরে মাথা দোলাল। অসম্মতি প্রকাশ করল শুধু। মুখে কিছুই বলল না।
আমিও মাথাটা নিচু করলাম। সেদিন আমার খুব খারাপ লাগছিল।
এটা ভেবেই মা চলে যাবে, সে নয় যাক! বুঝলাম। চলে যাক !
মা আমার দেওয়া জন্মদিনের উপহারটাও আমাকেই ফিরিয়ে দিয়েই যাবে। বেশ ,ঠিক আছে ,সেটাও না হয় মেনে নিলাম।
আসলে , আমি কি আদৌ মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য সন্তান ? মানে, যোগ্য কাজ করেছি কি কিছু?
তারপর ভাবলাম, না! করিনি তো। একদমই করিনি।
তাই মাকে ছোঁয়ার অধিকারও আমার নেই। মাকে কিচ্ছু বলার অধিকার ও আমার নেই।
এটাই হয়তো আমার যোগ্য শাস্তি।
তাই মাথা নিচু করেই মাকে সেদিন একটাই কথা বলেছিলাম,
— “মা, পারলে আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও!”
Posts: 83
Threads: 1
Likes Received: 645 in 78 posts
Likes Given: 199
Joined: Jul 2026
Reputation:
237
আমি দেখলাম, মা মাথাটা নিচু করেই রেখেছে।
মায়ের কাঁধ দুটো যেন হালকা দুলে উঠল। মাথাটাও সামান্য ঢেউ খেলে উঠল।
আর বিছানার চাদরের ওপর টপ টপ করে গড়িয়ে পড়তে থাকল মায়ের চোখের জল।
— “আমি তো তোর নষ্ট মা, কিন্তু তুই নষ্ট ছেলে হবি কেন?”
মা আস্তে আস্তে মাথাটা তুলল। আমি মায়ের চোখের দিকে তাকালাম।
মায়ের চোখ দুটি সেদিন কৃষ্ণচূড়ার মতো লাল হয়ে উঠেছিল।
আমি মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারিনি সেদিন।
আর আমার সেদিন এটাই মনে হয়েছিল ,মা আমার উপর শুধু রেগেই নেই।
মায়ের এই ভেজা চোখের দৃষ্টিতে মিশে আছে দুঃখ, অভিমান আর অপমানের নির্যাস।
আমার ইচ্ছে করছিল মাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে কাঁদি। অনেক, অনেক কাঁদি।
আমি মাকে ‘নষ্ট মা’ বলে ফেলেছি । অথচ সেই মুহূর্তে ইচ্ছে করছিল মাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিতে! কিন্তু পারিনি।
আমার হাত দুটো কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, নিজের গালেই নিজে চড় মারি।
আমি খুব শান্ত,মৃদু স্বরে মাকে বললাম ,
—" আমার ভুল হয়ে গেছে মা!"
—"আমাকে ক্ষমা করে দাও তুমি!"
আমি কিছুক্ষন চুপ করেই থাকলাম । মা ও আমাকে কিছুই বলল না। মাথা নিচু করেই বসে থাকলো।
—"মা ,আর কোনোদিন এসব আজে বাজে কথা তোমাকে বলবো না আমি!"
—"কথা দিচ্ছি মা ! সরি মা ! প্লিজ ! প্লিজ ! মা!"
—"আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা !"
মা খুব ধীরে আস্তে আস্তে মাথাটা তুলল। আর আমার চোখের দিকে চেয়ে রইলো কিছুক্ষন ।
মায়ের চোখ লাল হয়ে গল গল করে গড়িয়ে পড়তে থাকলো জল।
মা দুহাত তুলে , আমাকে কাছে ডেকে বলল ,
—" আয় এদিকে !"
আমি শুধু মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলছিলাম।
মা নিজের থেকেই আমাকে নিজের বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরলো। আমি মায়ের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে কাঁদলাম। মা আমার মাথাটা চেপে ধরে থাকলো দুহাত দিয়ে জড়িয়ে নিজের বুকের মাঝে ।
আর আমি আমার নিজের এই কলঙ্কিত পাপিষ্ঠ মুখটাকে লুকিয়ে ফেলতে চাইলাম মায়ের বুকের মাঝে।
মায়ের চোখের জল গড়িয়ে পড়লো আমার কাঁধের উপরেই।
মায়ের শীতল বুকের মাঝে আমার মাথাটা ধীরে ধীরে দুলে উঠছিল, আর কাঁপছিল মায়ের কাঁধ দুটি ,নিঃশব্দ কান্নার ভারে।
আমি মায়ের কোলে মাথা পেতে শুয়ে ছিলাম সেদিন,আর মায়ের সঙ্গে বিড়বিড় করে কথা বলছিলাম আমরা দুজনে।
মা আমার কপাল বেয়ে ধীরে ধীরে চুলের দিকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।
মায়ের হাতের মোলায়েম পরশে আমার মনটা যেন স্নিগ্ধ, শান্ত, শীতল এক অনুভূতিতে ভরে উঠেছিল।
হঠাৎ আমার চোখ পড়ল দেয়ালে টাঙানো আমার স্প্যানিশ গিটারটার পাশেই রাখা মায়ের ভায়োলিনের বক্সটার দিকে।
আমি মাকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “মা, তোমার মনে আছে, এবার ছুটিতে এসে একদিন তোমাকে আমি বলেছিলাম, আমাকে একদিন তুমি তোমার ওই ভায়োলিনটা বাজিয়ে শোনাবে!”
— “আজকে একটু বাজাবে, মা, ওই ভায়োলিনটা? আমি কত্ত দিন শুনি না, তোমার ওই বেহালাটার বো-এর টান।”
— “মা, তোমার মনে আছে, ছোট্টবেলায় আমি যখন তোমার কাছে যেতাম, তুমি আমাকে ছুটির দিনে ভায়োলিন বাজিয়ে শোনাতে!”
— “আজ একটু শোনাবে?... মা!”
মা মাথা নিচু করেই মাথা নাড়লো। আর আমাকে বলল ,
— " ঠিক আছে !"
সেদিন মা চেয়ারে বসে আমাকে ওই ভায়োলিনটা বাজিয়ে শোনাচ্ছিল।
মা বেহালাটা বাঁ কাঁধে তুলে থুতনির নিচে আলতো করে চেপে ধরল। বাঁ হাতের আঙুলগুলো তারের উপর নড়াচড়া করতে লাগল। আর ডান হাতে ধরা বো-টা ধীরে ধীরে তারের উপর দিয়ে এগিয়ে পিছিয়ে যেতে লাগল।
মায়ের ময়ূরপুচ্ছের মতো চুলগুলো একপাশের গালটিকে আড়াল করে ঝুলে পড়ল । তারই সাথে একপাশের কেশগুচ্ছ দুলতে থাকল ভায়োলিনের বো-এর ছন্দে।
আমি মায়ের বাজানো ভায়োলিনটার করুণ শব্দটা কানে ভেসে আসতেই সঙ্গে সঙ্গে মাকে থেমে যেতে বললাম।
— “আচ্ছা, মা, তুমি ভায়োলিনের এই পরিচিত একই বিষণ্ণ সুরটা কেন বারবার বাজাও, বলো তো?”
একটা আশ্চর্য বিষয় আমি সেদিন লক্ষ্য করেছিলাম।
আমি তো ঘুমের মধ্যে প্রায়ই সেই শান্ত নদীর ধারে একাকী সাদা পরীটাকে দেখি, যার চেহারাটা অনেকটা আমার মায়ের মতো। স্বপ্নে তার সঙ্গে প্রায় দিনই দেখা হয় আমার। কিন্তু কথা বলা আর হয় না।
সে আমাকে এক মায়াজালে আবদ্ধ করে ফেলে।
কিন্তু যেদিন , আমার মা ছুটিতে সবে এসেছিল আমার কাছে। আর আমি সেদিন রাতে ওই পরীটার স্বপ্নও দেখেছিলাম ওই দিনেই ।
কিন্তু তার ঠিক পরেই, আমি আরেকটাও স্বপ্ন দেখেছিলাম সেই দিন । মা গভীর রাতে বারান্দায় একাকী ভায়োলিনটা বাজাচ্ছিল আর কাঁদছিল ।
আর আমার ঘুমের গভীরে স্বপ্নে শুনতে পাওয়া ,মায়ের পরিচিত সেই ভায়োলিনের করুণ সুরটার সঙ্গে সেই দিনের মায়ের ভায়োলিনের সুর একদম এক।
কেন? মা একই করুণ সুর বারবার বাজাবে কেন?
আমি মাকে সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম,
— “আচ্ছা, মা, তোমার তো অনেক গানের সুর তোলা আছে এই ভায়োলিনের বো-এর টানে। এই একই করুণ সুরটাই বারবার বাজাও কেন তুমি?”
মা সেদিন আমাকে বলেছিল ,
— “ আমার মন যখন যেমন থাকে, আমার ভায়োলিনের বো-এর টানও সেই দিকেই সুর তোলে। এটা আমি কিছুই করতে পারি না। এটা আমার মন টাই আমাকে বলে দেয় !"
— “কিন্তু তার মানে মা , তোমার মন এখন খারাপ ,তাই তো !"
— " আচ্ছা বুবু ,তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করছি।
তুই কি এই করুণ সুরটা আগে, মানে কিছুদিন আগে আমাকে বাজাতে শুনে ছিলিস? "
আমি মাকে বললাম ,
— " হ্যা ,আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম ! তুমি মাঝরাত্তিরে স্বপ্নের মধ্যে এই ভায়োলিনের করুন সুরটাই বাজাচ্ছিলে আর কাঁদছিলে। !
যে স্বপ্নটা আমার একদম ভালো লাগেনি মা। বিশ্রী স্বপ্ন ছিল ওটা। একদম বাজে। "
— " কি আশ্চর্য জানিস তো বুবু ,আমিও জানিস ঠিক এই স্বপ্নটাই দেখেছিলাম। আমি ভায়োলিনের এই সুরটাই বাজাচ্ছি !বারান্দায় বসে। আর কাঁদছি !
তুইও এসে ছিলিস আমার স্বপ্নে ! আর আমাকে থামিয়ে দিয়ে ছিলিস তুই ! আমার এই ভায়োলিনের করুণ সুর, তুই আমাকে বাজাতে দিসনি। তাই তোকে জিজ্ঞেস করলাম।"
— "তার মানে?"
আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম,
— "এটা কী করে সম্ভব, মা? স্বপ্ন আবার এক হয় নাকি?"
মা আমাকে বলল,
— "আসলে আমি এই করুণ সুরটা তোকে আগে ছোট্ট বেলায় ,অনেকবার বাজিয়ে শুনিয়েছি তো, তাই তোর এটা পরিচিত সুর ছিল আগের থেকেই!"
— "তাই তোর আর আমার স্বপ্নটা বোধ হয় মিলে গেছে! তাই হয়তো হবে !"
— "রাতে যে স্বপ্ন দেখি, মানে কি কিছু আছে তার!"
কিন্তু আমি ভাবছিলাম, স্বপ্ন, আবার একই স্বপ্ন দুজনে এক সাথে দেখছি। ওই সেই বালিশের তলায় মায়ের প্যান্টি ঢুকে যাবার মতো রহস্যজনক ব্যাপারটা না খানিকটা!
ঠিক সেই সময়ে মনে মনে ভাবছিলাম, আমি একজন বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও, মানুষের এই স্বপ্ন দেখার রহস্যটা আমার কাছে রহস্যের মতোই লাগে চিরকাল।
এর অনেকটাই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে যদিও, কিন্তু ঠিক কেন মানুষ স্বপ্ন দেখে, তার সম্পূর্ণ উত্তর এখনও বিজ্ঞানের কাছেও নেই।
মানুষ যে ঘুমের মধ্যে কী স্বপ্ন দেখে, আর কেনই বা দেখে, সে একমাত্র ঈশ্বরই জানে!
আর তাই আজ ও , এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনেক অনেক রহস্যের সমাধান, বিজ্ঞানের কাছে অধরাই রয়ে গেছে।
আমি মায়ের সেই ভায়োলিনটা যত্ন করে জায়গামতো দেয়ালে টাঙিয়ে রেখে দিতে দিতে মাথা চুলকাতে চুলকাতে ভাবছিলাম, এও আবার হয় নাকি রে বাবা!
তারপর মাকে বললাম ,
— " মা ,তুমি আমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও তো !"
আমি মাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিলাম। দুজনেই পাশ ফিরে, মুখোমুখি। আর মা নিঃশব্দ রাতে আমাকে মৃদু স্বরে বিড়বিড় করে বলতে থাকল,
— " বুবু, তুই কাল আর কলেজের ক্লাসগুলো বন্ধ করবি না , কোচিং ক্লাস যেমন চলছে চলুক।
— "তোর বাবা যখন ডাকবে, তখন চলে যাবি। আমি তোকে আটকাবো না। কক্ষনো না !"
— "পরে তুই হয়তো কথা শোনাবি আমাকে, 'মা, তুমিই তো বাবার কাছে যেতে বারণ করেছিলে আমাকে!'"
— "আমি তোদের বাপ ব্যাটার মধ্যে নেই কিন্তু !"
মা আমাকে কথা গুলো বলছিল। আর আমি ভাবছিলাম,মা আমাকে নিজের থেকে দূরে বহুদূরে সরিয়ে দিতে চাইছে। মায়ের মনে এতটুকুও কি মায়া ,মমতা নেই আমার জন্যে!
মা আমাকে নিজের কাছে রাখতে পারলো না তাহলে !
কিন্তু আমি মায়ের মায়ামাখা চোখের দিকে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষন । মায়ের চোখের মনি আমার চোখের দিকে চেয়ে থাকতে পারছিল না সেদিন ।
আমি দেখেছিলাম , মায়ের চোখের মণি ছিল বড্ড অস্থির ,আর তারই সাথে মায়ের মনটাও! মায়ের স্নিগ্ধ, নিষ্পাপ দৃষ্টির সাথেই কথা বলছিলাম এক,আর মায়ের মুখের কথা, কান দিয়ে শুনতে পাচ্ছি আরেক!
সেদিন মায়ের পাশে শুয়ে কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল, তা আমার মনে নেই। আর সেদিনই আমি সেই পরীটার স্বপ্নটাই দেখেছিলাম।
ধোঁয়াটে এক নির্জন, শান্ত জায়গা ,চারদিক পাহাড়ে ঘেরা। সেই নির্জনতার মাঝখানে কুলকুল শব্দে বয়ে চলা শান্ত নদীটির ধারে বসে আছে সেই সাদা পোশাকের পরীটি।
ঠিক যেন পরীর বেশ ধারণকারী আমার মাকেই আমি দেখছি।
কিন্তু রহস্যজনকভাবে, সেদিন ওই সাদা পরীটা আমার সঙ্গে কোনো ছলনার মায়াজালে আমাকে আবদ্ধ করল না।
আমি ধীরে ধীরে, শান্ত পায়ে হেঁটে পরীটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আমি পরীটার মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে তাকিয়ে ওকে দেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পরীটা বারবার মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। বোধহয় লজ্জা পাচ্ছিল। আমি ওমন করে তাকিয়ে ছিলাম, তাই হবে বোধহয়।
আমি পরীটার পাশেই চুপ করে গিয়ে বসে রইলাম।
নিঃশব্দ, ঠান্ডা সেই জায়গাটিতে বসে কুলকুল ধারায় বয়ে চলা নদীটির জলতরঙ্গের শব্দে ,মন দিয়ে কান পাতলাম।
আমি ওই শান্ত নদীটার কাচের মতো স্বচ্ছ জলের ধারায় হাত ডুবিয়ে জল ছিটিয়ে খেলা করছিলাম একা একাই।
কী নরম, পাতলা আর ঠান্ডা সেই নদীর বয়ে চলা জলের ধারা ,যেন মনে হচ্ছিল, শিশিরভেজা কচি দূর্বা ঘাসের ডগা ছুঁয়ে আছি।
কিছুক্ষণ পর ওই পরীটাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— "ওই সাদা পরী, তুমি আমার মাকে আমার কাছে এনে দিতে পারো?
আমি তো মাকে বড় ভালোবাসি! মা তো আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে!"
পরীটা সেদিন আমার করুণ, বিষাদমাখা মুখটার দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ।
ঠিক আমার মায়ের মতোই তার চোখের চাহনি।
আমি সেদিন পরীটাকে একদম সামনে থেকেই দেখতেও পেয়েছিলাম। তার আগে পরীটা আমাকে কিছুতেই ধরা দিত না।
আমার মনে হয়েছিল সেদিন, এ তো হুবহু আমার মা! খালি পরীর বেশ ধারণ করে আছে।
পরীটা আমাকে দেখে হাসছিল । আমাকে দেখে পরীটা ছলনাময় হাসি হাসছিল বলে সেদিন আমার তখন পরীটার উপর ভারী রাগ হয়েছিল।
আর পরীটা আমাকে শুধু বলল,
— "তোমার মা তো তোমারই!"
আমি পরীটাকে বললাম,
— "কিন্তু মা তো আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আর আমাকেও বহু দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে।"
পরীটা খিলখিল করে হেসে বলল,
— "দুহাত মেলে দাঁড়িয়ে থেকো তারই প্রতীক্ষায়।"
ঠিক তার পরেই আচমকা আমার ঘুমটা ভেঙে গেল অ্যালার্মের শব্দে।
আমি ঘুমের ঘোরে চমকে উঠলাম ।
তারপর জানালাটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ভোরের প্রভাতী আলো ফুটে উঠেছে।
মনটা খারাপ হয়ে গেল। আজ মায়ের ছুটির শেষে বিদায়ের পালা!
মা বোধহয় গতকাল রাতে আমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে, আমার ঘরের টেবিল ক্লকের অ্যালার্মটা সেট করে রেখেই, দিদুনের ঘরে ঘুমোতে চলে গিয়েছিল।
আমি ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই খাটে বসেছিলাম, দুই পা ঝুলিয়ে।
ভাবলাম, ইসসস! এত তাড়াতাড়ি ভোর হয়ে গেল কেন?
আমি তো পরীটার সাথে কথা বলছিলাম, কথাই শেষ হল না আমার!
মায়ের চলে যাবার সময় হয়ে এল !
তারপর ভাবলাম,
এরপর তো এই ঘর থেকে মিলিয়ে যাবে মায়ের সান্নিধ্যের সেই মলিন সুবাসটাও।
ঘরটাও আগের মত শান্ত হয়ে যাবে।
মা আমার ঘরে ঢুকল খুব ধীরে আর শান্ত পায়ে।
মা তখন পরিপাটি করে চুল বেঁধে, মেরুন রঙের চুড়িদার পরে, গায়ে ওড়না জড়িয়ে আমার ঘরে ঢুকে বলল,
—“ঘুম ভাঙলো তাহলে তোর !"
—“বুবু, চল, আমাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়ে আসবি!”
আমি মায়ের চোখের দিকে তাকালাম।
মা আমার চোখের সামনে থেকে চোখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু মায়ের চোখের মণি দুটো সেদিন কেমন অস্থির মনে হচ্ছিল আমার। মায়ের চোখের মণিকে আমি চিনি।
আমি মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ,কম্পিউটারের উপরে রাখা শোপিসটার দিকে আঙুল তুলে মাকে আরেকবার জিজ্ঞেস করলাম ,
— “মা, ওটা নিয়ে যাবে না তোমার সাথে !”
মা আমার শোপিসটার দিকে তাকাল। তারপর মা আমার কম্পিউটারের সামনে গিয়ে, আমার উপহার দেওয়া শোপিসটার গায়ে হাত বুলিয়ে বলল,
— “আমার হার্টবিটস তোর সাথেই থাকুক।”
— “চল, চল, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
আমি মাকে আর কিছুই বলিনি ।
আমি ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম ।
দিদুনও তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে গিয়েছিল, মা চলে যাবে বলে। মা আর আমার জন্যে চা বানিয়ে এনে দিয়েছিল দিদুন ।
আমি প্লেট হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম।
মাও চা খাচ্ছিল, তবে মা আমার দিক থেকে পিছন ফিরে দিদুনের সাথেই গল্প করছিল, চায়ের প্লেট হাতেই।
আমি আড়চোখে মায়ের চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছিলাম। আমি মায়ের চোখে চোখ রাখতেই মা ঘুরে যাচ্ছিল। তবে মা আর দিদুনের মধ্যে কথা চলছিল।
আমিও ঘুরে যাচ্ছিলাম মায়ের সাথেই। এইভাবে ঘুরে ঘুরে, লুকোচুরি খেলাটা মা আর আমার মধ্যে চলছিল নিঃশব্দে।
মা কিছুতেই আমার চোখের দিকে তাকাবে না। আর আমিও মায়ের চোখের পিছন ছাড়বো না।
মায়ের চায়ের কাপের শেষ চুমুক দিয়ে ,কাপটা টেবিলে নামিয়ে , মা দিদুনকে প্রণাম করল।
আমিও মাকে প্রণাম করতে গেলাম।
মা পা সরিয়ে নিল। তারপর আমাকে আঙুল তুলে বলল,
—“আগে তুই তোর দিদুনকে প্রণাম কর!”
আমি দিদুন, তারপর মা ,দুজনকেই প্রণাম করলাম।
ঘর থেকে বেরোনোর সময় দিদুনের চোখে জল।
দিদুন কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলল,
—“ভালোভাবে থাকিস মা! আর পৌঁছে ফোন করিস!”
—“আর ছেলের সাথে ফোনে অশান্তি করবি না একদম!”
আমি গ্যারাজ থেকে বাইক বের করে, মাকে নিয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
Posts: 83
Threads: 1
Likes Received: 645 in 78 posts
Likes Given: 199
Joined: Jul 2026
Reputation:
237
১১(গ)—শুধু তোমারই প্রতীক্ষায়।
মা হেলমেট পরে আমার বাইকের পিছনে একপাশে পা রেখে বসেছিল। সকালের দিকে রাস্তায় খুব একটা যানজট ছিল না।
তাই সো সো করে কিছুদূর বাইক চালিয়ে মুকুন্দপুর হয়ে রুবি, সায়েন্স সিটি, ইএম বাইপাস ধরে, চিংড়িঘাটা, উল্টোডাঙা, বাগুইআটি হয়ে সোজা এয়ারপোর্টে এসে পৌছালাম মাকে নিয়েই।
রাস্তায় আসার সময় মায়ের সাথে একটা কথাও আমি বলিনি। মাও অবশ্য কোনো কথাই বলছিল না আমার সাথে।
আমি বাইকটা এয়ারপোর্টের পার্কিং জোনে নিয়ে গিয়ে থামালাম। মা বাইক থেকে নামল।
মায়ের চোখ দুটো যেন আত্মপ্রত্যয়ের দীপ্তিতে জ্বলজ্বল করে উঠল।
তারপর আমার সামনে দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। গটগট করে মায়ের হিল জুতোর শব্দটা লোকজনের কোলাহল ,সকালের ব্যস্ততার মধ্যেও কেমন স্পষ্ট হয়ে কানে এসে লাগছিল।
মায়ের হাতে ছিল ছোট্ট একটা লাগেজ ব্যাগ।
আমি মায়ের হাঁটার সুনিপুণ ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, নিঃশব্দে মায়ের পিছন পিছন হাঁটছিলাম।
মায়ের চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে । চিবুকটা ছিল সামান্য উঁচুতে , আর শিরদাঁড়া ছিল টানটান সোজা। মায়ের প্রতিটা পদক্ষেপের মধ্যেই যেন আমি আত্মবিশ্বাসের দৃঢ়তাকেই খুঁজে পাচ্ছিলাম ।
ক্লিপের আঁটা মায়ের বারগান্ডি কালার করা চুলগুলো গোছা ধরা বেগুনি রঙের মোরগঝুঁটি ফুলের মতোই হাঁটার ছন্দে দুলছিল।
মা যত এক পা, দু পা করে এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, ততই আমার চোখের সামনে বদলে যাচ্ছিল আমার চেনা সেই স্নেহময়ী মা টা ।
মনে হচ্ছিল, আমার পরিচিত মমতাময়ী মা ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো খোলসটা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে। তার জায়গায়, আমার চোখের সামনে তৈরি হয়ে উঠছে কর্পোরেট জগতের এক আত্মবিশ্বাসী নারী মূর্তি ।
আমি শুধু চুপ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম, আর নিঃশব্দে মায়ের পিছন পিছন হেঁটে চলছিলাম,হন হন করে ,মায়ের পায়ের গতিতেই।
আর ঠিক তখনই,
একটা ইনভিক্টো এসে থামল এয়ারপোর্টের গেটের সামনে।
গাড়ির দরজা খুলতেই প্রথমে চোখে পড়ল কালো জুতোর একজোড়া। তারপর গাঢ় নীল স্যুট পরা, চোখে সানগ্লাস ,পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানো অবস্থায় গাড়ি থেকে নেমে এলেন ভাস্কর আঙ্কেল।
মা ভাস্কর আঙ্কেলকে দেখে থমকে দাঁড়াল। সঙ্গে আমিও।
উনি গাড়িটা নিয়ে ড্রাইভারকে বাড়ি ফিরে যেতে বললেন। তারপর ভাস্কর আঙ্কেলের দিকে মা এগিয়ে গেল, আর ভাস্কর আঙ্কেলও আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন।
—“গুড মর্নিং, টম!”
ভাস্কর আঙ্কেল সহাস্যে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন।
—“মর্নিং, আঙ্কেল।”
আমি ওনাকে বললাম। ভাস্কর আঙ্কেলের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলাম।
উনি আমাকে বললেন,
—“টম, তাহলে আমি তোমার মাকে নিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে যাই। ফ্লাইটের সময় হয়ে আসছে যে আমাদের ।”
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে বললাম,
—“গুড বাই আঙ্কেল ! টাটা !”
আর মা আমার দিকে তাকিয়ে, চোখে চোখ রেখে ভেজা চোখে বলল,
—“তুই বাড়ি ফিরে যা বুবু ! আমি আসছি, কেমন!”
মা কে বিদায় জানিয়ে, বিমানবন্দরের একপাশের কোণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের সামনে যেন একে একে ফিরে আসা স্মৃতিমাখা দিনগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে ,
কখন যে চোখের কোণে জল জমে উঠেছিল, নিজেই টের পাইনি।
আমি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালাম। আমাকেও এবার এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি ফিরতে হবে।
হঠাৎ কেন, সঠিক জানি না,এয়ারপোর্টের গেটের মুখ থেকে পিছন ফিরে হাঁটতে নেব বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে,একটা পা বাড়িয়েছি শুধু,
ওমনি আমার স্বপ্নে দেখা ,সেই পরীটা,আমার কানের কাছে এসে কিছু একটা বলে গেল গুন্ গুন্ করে !
আমি থমকে দাঁড়ালাম। এয়ারপোর্টের এন্ট্রান্স গেটের ঠিক উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়েই দাঁড়িয়ে রইলাম।
পরীটা যেন আমার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে গেল, মায়ের জন্য দুহাত মেলে,মায়েরই প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকো চুপটি করে !
সাথে সাথেই আমার শরীরের ভিতর দিয়ে একটা ঢেউয়ের তরঙ্গ খেলে গেল নিজের থেকেই।
আমার দুটো পা আর কিছুতেই নাড়াতেই পারছিলাম না। সামনের দিকে এগোতেও পারছিলাম না যেন। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে থমকে দাঁড় করিয়ে রাখলো একই জায়গায়।
আমার মাথা ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে যেতে থাকল আকাশের পানে । চোখের পাতা দুটো নিজের থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। কেউ যেন কোথা থেকে এসে, পাখির ডানার মতো, কাঁধের দুপাশে ছড়িয়ে দিল আমার দুই বাহু।
দাঁড়িয়ে রয়েছি আমি, মায়ের ফিরে আসার প্রতীক্ষায়!
মা ফিরে আসছে!
মা এয়ারপোর্টেই আছে! মা আমাকে ছেড়ে কোত্থাও যায়নি!
আমি অনুভূতি পেলাম, মায়ের চেনা-পরিচিত সেই সুবাসটা যেন আমার গায়ের অনেক অনেক কাছেই ফিরে এসেছে।
আমার কাঁধের দুপাশ জড়িয়ে ধরেছে মায়ের সেই নরম দুটি হাত।
পিছন ফিরে ঘুরে দেখার আমার প্রয়োজন পড়ল না।
মানুষের কোলাহল, ব্যস্ততার মাঝে, আমি দু -চোখ বন্ধ করে ,দুহাত মেলে অনুভব করলাম, মায়ের মাথাটা ঠেকে রয়েছে আমার ঠিক কাঁধের পিছনেই।
আর তারই সঙ্গে আমার কাঁধের দিকের জামার কাপড়টা ধীরে ধীরে ভিজে যাচ্ছে।
মা কাঁদছে!
মা কাঁপা গলায় আমাকে বলল,
—“আমাকে তো ফিরে আসতেই হবে তোর কাছে !”
—“কিন্তু তুই?
—“কেন ?”
আমিও ভেজা গলায় মাকে বললাম ,
—“আমিও দাঁড়িয়েই ছিলাম, তোমারই ফিরে আসার প্রতীক্ষায়।”
—“আর তুমি কি ভেবেছিলে মা ,আমি আমেরিকায় পড়াশোনা করতে চলে যাব , তোমাকে ফেলে রেখে ! "
কিছুক্ষণ বাদে দেখলাম, ভাস্কর আঙ্কেলও এসে দাঁড়ালেন আমার আর মায়ের সামনে।
ভাস্কর আঙ্কেল আমাকে বললেন,
—“তোমার মা তো আমাকে বলেই দিল, ‘আমাকে নাকি বিয়ে করতে পারবে না!’”
—“ঠিক আছে তবে!”
—“তাহলে টম, আমার জন্যে একটা কাজ করো দেখি। একজন পাত্রী খুঁজে দাও তাহলে আমার জন্যে !”
—“আমাকেও তো কাউকে না কাউকে বিয়ে করতে হবে তো ,নাকি !"
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে সবার প্রথমে মাথা ঝুকিয়ে প্রণাম করলাম।
ভাস্কর আঙ্কেল আমাকে জিজ্ঞেস করলেন ,
—“ হঠাৎ প্রণাম করলে যে আমাকে ?"
উনি আমার কান্ড দেখে হেসে ফেললেন।
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে বললাম ,
—“ আঙ্কেল ,বিয়ে বাড়িতে সবার মাঝে আপনাকে প্রণাম করাটা পেন্ডিং রেখেছিলাম। "
—“ ঠিক এই দিনটার জন্যেই !"
তারপর আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে বললাম,
—“একটা দারুণ পাত্রীর সন্ধান আমার কাছেই আছে। সুন্দরী, স্লিম, গায়ের রং ফর্সা, সুমুখশ্রী, শিক্ষিতা, গৃহকাজে নিপুণা,উচ্চতায় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি ।
—“কিন্তু বয়সটাই একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে, বুঝলেন আঙ্কেল!”
ভাস্কর আঙ্কেল আমাকে মজা করেই বললেন,
—“পাত্রীর কী বা নাম তাহার?”
—“কী বা তাহার বংশপরিচয়?”
আমি ভাস্কর আঙ্কেলকে হাসতে হাসতে বললাম,
—“পাত্রীর নাম প্রভা মিত্র!”
—“আমার দিদুন!”
—“চলবে?”
মা, আমি আর ভাস্কর আঙ্কেল আমরা তিনজনেই হেসে উঠলাম!
তারপর মা ভাস্কর আঙ্কেলকে বলল,
—“ আচ্ছা, তাহলে চলি, ভাস্কর! আমি তো সবকিছুই সামনাসামনি বলে দিলাম তোমাকে।"
—“ আর , আমি তো অফিসের এইচ.আর ডিপার্টমেন্ট কে রেজিগনেশন লেটার পাঠিয়েই দিলাম তোমার সামনেই ।"
—“ আমি মেডিক্যাল লিভ নিয়ে কিছুদিন পরে অফিসে গিয়ে নলেজ ট্রান্সফার করব তাহলে!”
ভাস্কর আঙ্কেল মাকে বললেন,
—“ঠিক আছে, অনামিকা। তুমি নয়, আরও ক’টা দিন মেডিক্যাল লিভে থাকো।
—“আমাকে তো তোমার মতো মেডিকেল নিলে চলবে না , অফিসে ঢুকতে হবে। "
—“আর এই যে তোমাদের মা ব্যাটার চক্করে পড়ে ,আমার ফ্লাইট মিস হয়ে গেল!
—“দেখি, পরের কোনো ফ্লাইটে টিকিট পাই কি না!”
আমি আর মা ভাস্কর আঙ্কেলকে বিদায় জানিয়ে, মাকে বাইকের পিছনে চাপিয়ে, বাড়ির পথেই রওনা দিলাম ।
Posts: 83
Threads: 1
Likes Received: 645 in 78 posts
Likes Given: 199
Joined: Jul 2026
Reputation:
237
১২(ক)—শুধু তুমিই আছো ,হৃদয় মাঝে।
আনুমানিক এক বছর পর.....
প্ল্যাটফর্মের বাইরে থেকে শুনতে পেলাম, ডাউন ফালাকনুমা সুপারফাস্ট এক্সপ্রেসের অ্যানাউন্সমেন্ট হচ্ছে। ঘড়িতে তখন পনেরোটা তিরিশ।
আকাশের দিকে মাথা তুলে দেখলাম, শরৎকালের নীল আকাশটা যেন ধুয়ে-মুছে আরও স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে । নীলের বুকজুড়ে সাদা সাদা মেঘের দল ভেসে বেড়াচ্ছিল। আকাশে-বাতাসে পুজোর গন্ধের আমেজ।
প্ল্যাটফর্মের বাইরে তখন একঝাঁক তরুণ-তরুণীর দল, সকলে মিলে হাসি-ঠাট্টায় মশগুল। কারও কাঁধে ব্যাগ, কারও হাতে ট্রলি। পুজোর ছুটি। হোস্টেল থেকে তাই বাড়ি ফেরার পালা।
দিল্লি, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, কেরালা, অরুণাচল প্রদেশ বাদ নেই কোনো কিছুই ।
হিমাচল প্রদেশ থেকে তামিলনাড়ু , আসাম থেকে গুজরাট দেশের কোনা কোনা থেকে আসা সব উইডখোরগুলো এক জায়গাতেই জড়ো হয়েছে আরকি ।
কেউ টানছে সুট্টা , কেউ দারুর বোতল নিয়ে আড্ডা জমিয়েছে, আর তার মাঝেই চলছে হাসি-ঠাট্টার ফোয়ারা , চিৎকার-চেঁচামেচি।
ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্ট শুনেই , আমার তাই আলভিদা জানাতেই হল, হোস্টেলের প্রথম বর্ষের আরও দুজন রুমমেট কে।
একজন যাবে কেরালা। ওর জন্য ডাউন সাঁতরাগাছি-তিরুবনন্তপুরম নর্থ স্পেশাল।
আর আরেকজনের বাড়ি আমাদের রাজ্যেরই লাল মাটির দেশ বাঁকুড়া। ও ধরবে ডাউন হলদিয়া-আসানসোল এক্সপ্রেস।
কাঁধে একটা পিঠ ব্যাগ আর হাতে ল্যাপটবের ব্যাগটা নিয়ে ,হোস্টেলের রুমমেট দের সাথে সুট্টার শেষ টান টেনে আর গলায় দারু ঢেলে ,আমি ছুটলাম ফালাকনুমা সুপারফাস্ট ধরতে,এক্সপ্রেসের গতিতেই ।
পুজোর ছুটি তাই, হোস্টেল নামক পাগলাগারদ ছেড়ে যে যার বাড়ির পথে!
ছুটতে ছুটতে, দৌড়াতে দৌড়াতে, ঝাঁপিয়ে পড়ে, লোকজনের ধাক্কা-ঠেলা-গুঁতো খেতে খেতে একেবারে পিংপং বলের মতো বাউন্স হয়ে ,
প্ল্যাটফর্মে জনঅরণ্যের মাঝে হাঁপাতে-হাঁপাতে ,ঘামতে-ঘামতে দাঁড়িয়ে ছিলাম সভ্য-ভদ্রলোক জনের সাথেই। অন্তত সেটাই আমার মনে হয়েছিল ।
ট্রেন ঢুকলো প্লাটফর্মে।
প্ল্যাটফর্মে ট্রেন এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ করে সেই সব সভ্য-ভদ্রলোকেরা ট্রান্সফর্ম হয়ে মধ্যযুগীয় বর্বর যাযাবরে পরিণত হয়ে গেলেন,আর আমাকে কোমরের ধাক্কায় তুলে দিলেন ট্রেনের কামরায়।
নে, এবার কাকে কামড়াবি, কামড়া!
পুজোর সময়ের ট্রেন। তিল ধারণের জায়গাটুকুও নেই। নিজেকে আলু, পেঁয়াজ, আদা-রসুন, টমেটোর বস্তা বললেও সম্মান করা হয়।
কামরায় সাথে ছিল কলেজের আরও বেশ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব , দাদা-দিদিদের চেনা-জানা মুখ।
আর তারই সঙ্গে ছিল সরগম ,বিভিন্ন ভাষার, সুর সংগীতের মেলবন্ধন। মিলে সুর মেরা তুমহারা।
বাদুড় কিংবা বাঁদর ঝোলা হয়ে, এর-ওর ঘাড়ে-মাথায় চেপে ঝিকঝিক করতে করতে হাওড়া স্টেশনে যখন এসে থামলাম, তখন সন্ধ্যে প্রায় সাড়ে ছয়টা।
হাওড়া স্টেশনে নেমে স্পাইডারম্যানের মতো উড়তে উড়তে, চার গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে একটা ক্যাব বুক করলাম।
পকেটের মোবাইল টা বেজে উঠল,
— "বুবু ,কদ্দুর রে তুই !"
— " এই তো আসছি ই ই ই ই ই মা ,গঙ্গাটা পেরোনোর পরিকল্পনা চলছে হাঁপাতে হাঁপাতে সাঁতার কেটে !"
— " এই চুপ ! ট্রেন থেকে নেমেছিস তো ঠিক ঠাক !"
— " খালি এক্সট্রা কথা !"
— " খাবার গরম করবো কখন ?"
— "হাওড়া স্টেশন থেকে ক্যাব বুক করেছি মা ,তবে খাবার দাবার গরম করার প্রয়োজন নেই। "
— "ম্যাপে রাস্তার যা সুন্দর পরিস্থিতি দেখছি মা , লাল গাইছে গান ,পথে এবার নামো সাথী ! পথ তো লালে লাল !"
— "বেশি চিন্তা করোনা মা !হামাগুড়ি দিয়েও হোক,লাউ গড়গড় করে গড়াতে গড়াতেই হোক , বাড়ি ঠিক পৌঁছে যাবোই কাল ভোর বেলার দিকে !"
— " কি যে বলে ছেলেটা! কিছুই বুঝি না !"
— " এই তুই চুপ কর তো !"
— " রাখ ফোন !"
— " রুবি ঢুকে জানাবি !"
এসিতে বসে ক্যাবে করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে মনে হল , শালা ,জীবনে বেঁচে গেলাম এ যাত্রায় । ট্রেনে আরেকটু হলেই প্রাণটাই বেঘোরে চলে যেত।
ফাঁটা বাঁশে বিচি পর্যন্ত আটকে দিয়েছিল ,কি ভয়ংকর পাবলিক রে ভাই !
ক্যাবে বসেও শুনতে পেলাম ওই রাজস্থানি সংগীত রুনা আন্টি লায়লা হয়ে গাইছেন ,
“ও লাল, মেরি পাট রাখিয়ো, বালা ঝুলে লালন।”
তোমার লাল আসছে মা !
চিন্তা নেই !
যাইহোক ,তিন মাস বাদে বাড়ি ফিরছি। হাওড়া ব্রিজ দিয়ে যাওয়ার সময় মনে হলো, যাক বাবা, চেনা-পরিচিত জায়গায় ঢুকে পড়েছি। পাবলিকের মারধর খাবার আর চিন্তা নেই।
ক্যাবের জানলাটা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবতে থাকলাম মায়ের কথা। আর ফেলে আসা বছর খানিক আগের কথাগুলোই।
আসলে মা ছাড়া আমার যেমন অস্তিত্বই থাকত না , ঠিক তেমনি মা ছাড়া আজ আমি যে জায়গায় পৌঁছেছি, যতটুকুই পৌঁছেছি, সেটাও হতো না।
মা আমার জন্যেই মুম্বাইয়ের সেই ফরেন এমএনসি কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল। এখন কলকাতাতেই চাকরি করে। তবে সে এমএনসি নয়।
বাবা আমাকে ফোন করে বলেছিল আমেরিকায় যেতে। আমি বাবাকে বলে দিয়েছিলাম, মা আমার সাথেই কলকাতায় থাকবে। অতএব, আমাকে নিয়ে তোমার কোনো চিন্তা করার দরকার নেই।
তুমি তোমার জায়গায়, তোমার মতো ভালো থেকো, সুস্থ থেকো বাবা।
শেষ বছরটি মায়ের কঠোর অনুশাসন, নিয়মানুবর্তিতার মধ্যেই কেটেছে আমার।
মা ছাড়া আমি JEE Advanced ক্র্যাক করতে পারতাম না ,সে আমি জানি, আর জানে আমার মা ।
তাই বছর খানিক আগে ,এয়ারপোর্ট থেকে মাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পর আমি ভেবেছিলাম, বেশ তো হলো, আমার ভালোই মজা হলো,মাকে পেয়ে গেলাম প্রতি রাতের জন্যে।
কিন্তু বাড়ি ফিরে মা আমাকে খুব ভালো করেই বুঝিয়ে দিয়েছিল, মায়ের বাড়ি ফিরে আসার আসল উদ্দেশ্য কী ছিল।
মা আমাকে সুপথে পরিচালিত করে, কঠোর নিয়মের আবর্তের মধ্যে, সময় বেঁধে পড়াশোনা করিয়ে, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পাইয়ে দেওয়ার জন্যেই, মায়ের আমার কাছে ফিরে আসার আসল উদ্দেশ্য ছিল।
তাই মা ও দিদুনের কড়া শাসন, শিষ্টাচারেই কেটেছিল আমার শেষ বছরটি।
আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে চান্স পেয়ে যাওয়ার পর বাবা খুশি হয়েছিল বটে, তবে আমার ইঞ্জিনিয়ারিং ইভেন্টসে মা পেয়েছিল গোল্ড আর বাবা সিলভার।
তাই ওই ব্যাপারে আমি দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে , বাবা ও মায়ের কাঁধ উঁচু করে,দুজনের একটি করে হাত তুলে ধরে, দুই ভারত-পাকিস্তান নামক চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী চ্যাম্পিয়নদের উৎসাহিত করেছিলাম।
কারণ, আমার এই জন্মের জন্য দুই পরস্পর বিরোধী প্রতিদ্বন্দ্বী , প্রতিযোগী হিসেবে বাসরশয্যা নামক রেসলিং কম্পিটিশন এ সমানভাবে লড়াই করেছিলেন ফুলসজ্জা নামক কুস্তির আখড়ায় , ঘাম ও ঝরিয়ে ছিলেন একসাথে, এককালে।
এর বেশি আমি আর কিছুই বলতে পারব না!
মায়ের মুখে শুনেছিলাম, ভাস্কর আঙ্কেল অন্য আরেকজন পাত্রী খুঁজে বিয়ে করেছেন। উনি বর্তমানে সুখে-শান্তিতেই আছেন।
আর আমার মা?
আমার জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করেছে। ত্যাগ স্বীকার করেছে।
রাতের পর রাত আমার পাশে বসে, ঢুলতে ঢুলতে রাত জেগে আমি ঠিকমতো পড়ছি কি না, সেটা লক্ষ্য করেছে মা । আমার পড়াশোনার ব্যাপারে ,প্রয়োজনে যথা সামর্থ সাহায্য করেছে।
পরের দিন অর্ধঘুমন্ত অবস্থায় অফিস গেছে। জোঁকের মতো পড়ে থেকেছে আমার উপর।
‘বুবু, এটা সেন্ড কর, বুবু, ওটা সেন্ড কর।’ অফিসের কাজের ফাঁকে এই সব করেছে মা।
মা যা যা করেছে, সব আমার জন্যেই।
এতে মা কী পেল?
মা ও আমার সম্পর্কের সমীকরণ স্বল্প সময়ের মধ্যেই যে গভীর আবেগ, মায়া, ভালোবাসা , ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড(MnO₂)ক্যাটালিস্টের মতন,
মা ছেলের শারীরিক সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল, শেষ এক বছরে তার লেশমাত্র ছিল না বললেই চলে ।
তাছাড়া, শেষ বছরটিতে মায়ের কঠোর অনুশাসন, নিয়মানুবর্তিতা, আর শিষ্টাচারের ফাঁক-ফোকরেও সে সব প্রবেশ করতে পারেনি মা ও আমার মধ্যে।
আর আমার মনেও মায়ের প্রতি ছিল না কোনো সংশয় আর অশান্তি। কারণ আমি তো বুঝেই গিয়েছিলাম, মা আমার ছিল, আছে আর থাকবেও।
তবে মা আমাকে একটাই কথা দিয়েছিল,'আগে JEE Advanced হবে ক্র্যাক , আর ঠিক সেই বছরই জন্মদিনে তুই আমার কাছে যে গিফট চাইবি, সেটাই পাবি।'
তাই আমার কর্তব্য ছিল ,JEE Advanced নামক হরধনুটিকে ক্র্যাক করে মায়ের হাতে তুলে দেওয়া।
আমি মায়ের জন্যে সব করতে পারি, মা-ও আমার জন্যে সবকিছুই করতে পারে। হ্যায় ,মা আমার জন্যে সব কিছুই করতে পারে।
এমনকি, মা আমার জন্যে সবকিছুই নির্দ্বিধায় ছেড়েও দিতে জানে।
মা শুধু আমাকে ভালোবাসতেই জানে! নিজের জীবনের থেকেও মা আমাকে বেশি ভালোবাসতে জানে! সে আমি জানি !
তবে মা আমার সাথে প্রেম করতে জানে না!
— "হ্যালো, হ্যালো ,মা, শুনতে পাচ্ছ মামনি !"
— "আমি, রুবি!"
— "তুমি আমার জন্যে মাইক্রোওভেন অন করো!"
— "আমি আসছি মা!"
রাস্তার জ্যামে আটকে বেকার লাগছিল।
মায়ের মুখটা সামনে থেকে তিন মাস বাদে নয়, মনে হচ্ছিল তিন বছর বাদে গিয়ে দেখব।
একবার ভাবছিলাম ,ক্যাব থেকে নেবে , রাস্তার ফুটপাত দিয়ে জগিং করতে করতে বাড়ি চলে যাই।
গাড়িতে বসে ছটফট-ছটফট করছিলাম। কার সঙ্গে ভাট বকব, ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।
সামনে পেলাম ক্যাবের ড্রাইভার আঙ্কেলকে।
— "আঙ্কেল, এত্ত রাস্তা জ্যাম।"
— "এলাকার সব গাড়ি বাইরে বেরিয়ে গেছে নাকি!"
— "আচ্ছা আঙ্কেল ,টেসলা ফ্লাইং কারটা কবে কলকাতায় লঞ্চ করছে বলুন তো?"
— "হুম, কো নাহি পাতা, বাবু!"
হামাগুড়ি দিতে দিতে, গড়াতে গড়াতে, হাঁপাতে হাঁপাতে এপার্টমেন্টের সামনে এসে পৌঁছুলাম।
লিফটে সুইচ টিপেছি, কী মনে হলো, যাই তো গ্যারাজে আমার প্রিয় সারথিটিকে দেখে আসি ।
দৌড়ালাম গ্যারাজের দিকে। নববধূর মতো ঘোমটা তুলে, মায়ের কিনে দেওয়া হিমালয়ানকে দেখলাম!
ওমা! আমাকে দেখে , একপাশে মুখ ফিরিয়ে লজ্জা পাচ্ছে আমার হিমালয়ান। আমাকে তিনমাস পর দেখছে তো, তাই হবে বোধয়!
তাই আমার রয়্যাল মেমসাহেবের হেডলাইটে টোকা মেরে,ঘোমটা দিয়ে আবারো ঢেকে রাখলাম।
দৌড়ালাম লিফটের দিকেই।
লিফটে চেপে উপরে উঠছি, এক তলা, দু-তলা, আর বুকের ভিতরটা ঢিশ ঢিশ করছে।
ইসসস, মাকে তিন মাস পর হলেও, তিন বছর পর দেখছি তো! তাই মাকে দেখেই অনেক কিছু করতে হবে, সেই কবে থেকে হোস্টেলে প্ল্যান করে রেখেছি।
সব ঠিকঠাক পারবো তো করতে?
তিনতলায় এসেই ‘টিরিং’ করে লিফট থমকে দাঁড়ালো!
লিফটের বাইরে পা রাখলাম!
ওমা, দেখি কি ,নাইটি পরে ঐশ্বর্যা আন্টি তো দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আমারই প্রতীক্ষায় !
কিন্তু আমার স্ক্রিপ্টে যে ছিল, আমি টিং টং করে কলিং বেল বাজাবো। মা গেট খুলবে !
সঞ্জয় বনশালি অ্যাকশন বলবে !
ধুস শালা!
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মায়ের দিকে এগিয়ে গেলাম।
মায়ের চোখে চোখ রেখে,
— “কেমন আছো, পারো!”
— “না, মানে মা!”
— “কেমন আছো, মা!”
মা আমার দিকে ভুরু কুঁচকে তাকালো।
আমার জঘন্য এক্সপ্রেশনের জন্যেই বোধহয়!
— “ মা ,পালাট কে দেখো গে নাহি মেরা চেহেরা!"
মায়ের ভুরু আরও কুঁচকে গেল।
মা হয়তো ভাবছিল,
ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পাঠালাম।
তিন মাস পর ,ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়ে ছেলে কি পাগল হয়ে বাড়ি ফিরে এল নাকি?
আর আমি কী করবো, স্ক্রিপ্ট ধরে, শেষ এক মাস আগে থেকেই , হোস্টেলের রুমমেট কেরালা আর বাঁকুড়াকে পালা করে পারো ভেবে রিহার্সেল করেছি। স্ক্রিপ্টে যা থাকবে, তাই তো করবো। নাকি !
মায়ের চোখে চোখ রেখে, পকেট থেকে তিনটে দেশলাই বাক্স বের করলাম।
তার মধ্যে দুটো দেশলাই বাক্স মায়ের কানের সামনে নাড়িয়ে, মাকে বুঝিয়ে দিলাম ওই দুটো দেশলাই বাক্স ফাঁকা। ওতে কোনো দেশলাই কাঠি নেই।
তাই ওই দুটো খালি দেশলাই বাক্স মায়ের হাতে দিয়ে দিলাম।
আর আমার হাতে থাকা তিন নম্বর দেশলাই বাক্সটি মায়ের কানের সামনে নাড়িয়ে দিতেই শব্দ হলো। মাকে বুঝিয়ে দিলাম, এতে দেশলাই কাঠি আছে বটে। কিন্তু কম!
আমি ওই দেশলাই বাক্সটি খুলে মাকে দেখালাম, আর মাত্র তিনটে দেশলাই কাঠি ওতে অবশিষ্ট আছে।
তার মধ্যে একটা দেশলাই কাঠি বক্স থেকে বের করে, দেশলাই বক্সটি বন্ধ করে দিলাম।
আর হাতে থাকা দেশলাইটি ,দেশলাই বাক্সের বারুদের গায়ে ঠুকে, ওই দেশলাই কাঠিটি জ্বালিয়ে মা ও আমার চোখের ঠিক মাঝখানে ধরলাম।
মায়ের চোখের তারায় দেখতে পেলাম, আমার আঙুলে জ্বলতে থাকা দেশলাই কাঠিটির অগ্নিশিখার প্রতিফলনটিকেই।
আর আমি মাকে বললাম,
— “আজ অষ্টআশিতম দিন!”
— “মা, আমি তোমাকে চোখের সামনে থেকে ঠিক সাতাশি দিন পর দেখছি!”
আসলে মা যেদিন আমাকে কলেজের হোস্টেলে ভর্তি করে, আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, ঠিক সেদিন আমি বাড়ি থেকে মাকে সঙ্গে নিয়ে হোস্টেলে যাবার সময়,
তিনটে দেশলাই বাক্সে, প্রতিটা দেশলাই বাক্সে, গুনে গুনে তিরিশটা দেশলাই কাঠি ভরে, মোট নব্বইটা দেশলাই কাঠি ,হোস্টেলে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলাম ।
আমি জানতাম পুজোর ছুটিতে বাড়ি যাব। মায়ের সাথে আমার দেখা হবে।
তাই একটা একটা করে দেশলাই কাঠি প্রতিদিন রাত ঠিক বারোটা বাজার এক মিনিট আগে জ্বালিয়ে দিতাম। ওই জ্বলতে থাকা দেশলাই কাঠিটির অগ্নিশিখাটিকে দেখতে দেখতে আমার মায়ের মুখটা মনে পড়তো।
আর ভাবতাম, আরও একটা দিন কমে এল।
আমি প্রতিদিন কানের সামনে দেশলাই বাক্সটি নাড়িয়ে নাড়িয়ে ভাবতাম, দেশলাই কাঠিগুলো কবে শেষ হবে আর তারসাথে আমার প্রতীক্ষার পালা।
আমি দেখতে থাকলাম, আমার আঙুলের ফাঁকে জ্বলতে থাকা দেশলাই কাঠিটার শিখা মায়ের চোখের তারার মাঝে টলমল করে জ্বলছে!
আমি মায়ের সামনেই এসে গেছি !
আমি তো মায়ের চোখের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম রোমান্টিক শারুক নজরেই ।
মাও আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল তন্ময় হয়েই।
কিন্তু মা দেখছিল সেই তাঁর বুবু সোনাকে। রোমান্টিক তন্ময়কে, মোটে ভি নয়।
— " ঠোঁট কিন্তু কালো হয়ে যাচ্ছে বুবু !"
— " দিনে কটা করে হয়ে যাচ্ছে ,শুনি !"
ফ্ল্যাটের সদর দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ,দুইহাত মেলে ,আঁকড়ে ধরলাম দরজার দুপাশের ফ্রেমদুটিকে। আর মাকে মৃদু স্বরে বললাম ,
— " আস্তে ,দিদুন ঘরে আছে না !"
— " না ,নেই ! ওই সুতপাদি দের বাড়ি গেছে !"
— " কিন্তু এসে যাবে এক্ষুনি ! তুই আসছিস ,ফোন করে বলে দিয়েছি মাকে! "
মা ,একটু থেমে !
— " ঘরের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি?"
— "ঢুকবি না ?"
আমি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ভাবলাম ,
আমি যতই মাকে বিদ্যা বালান আন্টি ভাবি না কেন ,মা আমাকে শারুক ,ফারুক কোনোদিনই ভাবে না !
মায়ের কাছে আমি ওই , বুবু সোনাই থেকে যাব চিরকাল !
আমি মায়ের পিছন পিছন ঘরের বারান্দায় ঢুকলাম। আর মাকে নিজের কাছে ডাকলাম।
তারপর হাটু মুড়ে বসে ,মায়ের পা দুটো জড়িয়ে ধরে ,নিজের কোলে তুলে নিলাম। আর উঠে দাঁড়িয়ে মাকে কোলে তুলে গোল গোল পাক খেতে থাকলাম।
আর মা তো খিল খিল করে হাসতে হাসতে আমাকে বলতে থাকলো ,
— " বুবু ,দেখ আমি কিন্তু আগের থেকে অনেক ভারী হয়ে গেছি !"
— "আমার মাথা ঘুরছে কিন্তু !"
— " হো ,হো ,হো !"
— "আমাকে নিচে নামা !"
— "প্লিজ ! প্লিজ ! সোনা !"
— " আমার মাথা ঘুরছে !"
— " হি !হি !হি !"
আমি মাকে নিজের কোল থেকে নিচে নামালাম।
আর মা কপালে হাত দিয়ে চক্কর সামলাতে সামলাতে আমাকে বলল ,
— " ইসসসস, আমার ওজন দুই কিলোগ্রাম বেড়ে গেছে ! জানিস তুই !
— " বাষট্টি কেজি!"
আমিও মাকে বললাম ,
— " তুমি দিন দিন প্রস্থে বাড়ছো ,আর আমি উচ্চতায় !"
— " পাঁচ ফুট এগারো !"
— " ইসস মা আর এক ইঞ্চি কি লম্বা হবো না আমি !"
— " ভারী একেবারে লম্বু হয়েছেন ছেলে!"
— " আরেকটু হয়ে যেতে পারিস !"
— " যদি ,ওই সিগেরেট ফোঁকা ছেড়ে ,দুধ খাওয়া ধরিস !"
— " আমি তো সেটাই চাই মা !"
— " ব্যাস ! থাক ! বুঝে গেছি !"
— " তোর পরের সেন্টেন্স টা কি হবে !"
মা আমি দুজনেই হাসতে থাকলাম দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে।
মাতৃদেহের তনুলতাটিকে জড়িয়ে ধরে, তাঁর হিমেল পরশের স্নিগ্ধ অনুভূতিতে, এক যুগ পর যেন ফিরে পেলাম মাতৃঅঙ্গের সেই সুপরিচিত ঘ্রাণটিকেই।
মাতৃক্রোড়ের সুকোমল নিবিড় স্পর্শে আমার তৃষ্ণার্ত ব্যাকুল হৃদয়ে যেন খুঁজে পেল চিরচেনা নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের প্রশান্তির অনুভূতি।
আর আমি ভাবলাম, আমি তো মায়ের সব সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেই এসেছি শেষ এক বছর ধরে,
— “বুবু, উঠবি না বই ছেড়ে!”
— “বুবু, টাস্ক কমপ্লিট না করে ঘুমোতে পারবি না কিন্তু!”
— “বুবু, মোবাইলের সব গেম আনইনস্টল কর!”
— “বুবু, আজকে বাইরে আড্ডা দিতে যেতে পারবি না।”
আমি তো মায়ের কথা অমান্য করিনি।
হরধনু তো ভঙ্গ করেই ফেলেছি আমি, আর সেটা তো মায়ের জন্যেই সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তবুও কি আমি মাকে পাবো না!
মাকে আমি আর কোনোদিন মার্লবোরো খেতে দেখিনি। কারণ আমি মাকে সিগারেট খেতে বারণ করেছিলাম। মা আমার কথা রেখেছিল, বাধ্য মায়ের মতোই।
কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় ছিল, মাকে সেই ভাস্কর আঙ্কেলের দেওয়া মার্লবোরোর প্যাকেট থেকে সিগারেট চুরি করে, ছাদে গিয়ে টানতে টানতে, দায়িত্ব নিয়ে আমিই প্যাকেট খালি করে ফেলেছিলাম।
তবে একদিন মা আমাকে বলেছিল,
— “লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট ফুঁকছিস নিজে, আর লোককে জ্ঞানপাপীর মতো জ্ঞান দিতে যাবার দরকারটা কী!"
আমি মাকে সহাস্যে বলেছিলাম,
— “কারণ তুমি আমার মা। "
— “ওসব চলবে না !তাই!"
মা সিগারেট খাবে, তারপর মদ খাবে ,ঐসব আমার পছন্দ নয়।
— “আমি যা খুশি খেতে পারি। "
— “কারণ আমি তো চ্যাংড়া ছেলে!"
সেদিন মা আমার কান মুলে ধরেছিল। আর বলেছিল ,
— “তোর এই ফালতু লজিক গুলো না , আমি বলেই মাথা নিচু করে , কান পেতে শুনছি ! বুঝতে পেরেছিস তো !"
আর অন্য কোনো মা হলে না , শুনতো না ! বুঝেছিস তো ! তোকে জাস্ট ইগনোর করতো !"
মা রান্নাঘরের দিকে যেতে লাগলো , আর বলতে বলতে গেল ,
— " আর জলখাবার কি খাবি?তোর জন্যে পাস্তা করেছিলাম !মাইক্রোওভেনে গরম করে রেখেছি।”
— " নাকি একেবারে রাতের ডিনারই খাবি এক্ষুনি ?"
— " না ,না এক্ষুনি কি ডিনার !"
— "পাস্তা দাও ! আমাকে ক্লাবে যেতে হবে !"
— "বনি,আদভিক ,আমির আমার জন্যে ক্লাবে অপেক্ষা করছে সেই কখন থেকে !"
আমি মায়ের পিছন পিছন রান্নাঘরে গিয়ে ওভেনের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আর এক এক করে খাবারের সসপ্যানের ঢাকনা খুলে দেখতে থাকলাম আমার জন্যে রাতের ডিনারে কী আয়োজন।
দেখলাম একটায় চিলি চিকেন। আরেকটি পালং পনির।
ওটা অবশ্য ঘাস-পাতা প্রেমী দিদুনের জন্যেই ছিল।
আমি সসপ্যানের ঢাকনা খুলে এক পিস চিলি চিকেন মুখে ঢোকাতে যাব,
মা চিৎকার করতে শুরু করল,
— "কোথায় বাইরে থেকে এসেছিস। হাত-মুখ ধোয়া নেই, কিছু নেই, রাখ মাংসটা, ফেলে দে ওটা!"
আমি মুখে পুরে নিলাম মাংসের পিস।
— "ইসস, কী জন্মের নোংরা! ছি!"
মা আমাকে বকাঝকা করছিল। ওটা অবশ্য কমন ব্যাপার!
টিং টং করে বেল বেজে উঠল। আমি রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম।
— "আরে, কখন থেকে বলছি জানিস, সুতপা আর শেফালীকে, আমার নাতি আসবে এক্ষুনি, আমি যাই, আমি যাই, আর আমাকে ছাড়ছেই না!"
আমি দিদুনকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম!
তারপর দিদুনের পা জড়িয়ে ধরতেই গেছিলাম, শুনলাম মায়ের চিৎকার,
— "এই না, বুবু, একদম না।"
— "মায়ের সাথে ওটা তুই করিস না! মায়ের কিন্তু মাথা ঘুরে যাবে!"
— "খবরদার বলছি কিন্তু!"
মায়ের চিৎকারে ভয় পেয়েই গেছিলাম। শেষমেশ দিদুনকে প্রণাম করেই নিস্তার দিয়ে দিলাম।
আমি হাত মুখ ধুয়ে হাপুস হুপুস করে পাস্তা খাচ্ছিলাম। কোপ কোপ করেই। ক্লাবে যেতে হবে।
মা টেবিলের সামনে আমার খাওয়া দেখছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে।
— " এ আবার কেমন খাওয়া হচ্ছে শুনি ,বুবু !"
আমি মাথা তুললাম না। এমনিতেই হোস্টেলের যা খাবার দাবার,তাতে মুখে চরা পড়ে গেছিল। মায়ের হাতের খাবার জিভ ছুঁতেই , সেটার রেটিং লেভেল এমনিতেই টেন ষ্টার!
মা ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে আমার মুখের সামনের দিকে বসলো।
আর চিবুকে হাত দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো।
আমি খেতে খেতে থমকে গেলাম।
ভাবলাম ,যাক মাও তাহলে আমাকে দেখছে।
জয় লাল বাবার জয়। মাকে তাহলে পটিয়ে ফেলেছি।
— " আমার ছেলে কি কম যায় ? আই আই টি !"
— " আমি অপর্ণাকে বলেছি , আমার ছেলের পাশে টিনাকে মানাবে বেশ !"
আমি থ মেরে কিছুক্ষন ভাবলাম !
আর মনে মনে বললাম , লাল বাবা কে ভরসা করাই...না থাক !
— "আচ্ছা মা ,বাড়িতে ভালো কোয়ালিটির ইঁদুর মারার বিষ আছে? "
— " দু চার প্যাকেট দাও তো !"
— "জলে গুলে ঢোক গিলে খেয়ে ফেলি !"
— "তারপর পুজোটা নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে ,মোবাইলে গেম খেলে পের করে দেব !"
— "ভালো হবে কি সেটা ?"
আমার প্রিয় সারথিটি কে গ্যারেজ থেকে বের করে ক্লাবে গেলাম।
ক্লাবে দৌড়ে ঢুকেই চিৎকার করে ,
— " ওই বাইনচোদ গুলো ,চলে এসেছি রে আমি ! কোথায় রে তোরা !"
সাথে সাথে দৌড়ে এল আদভিক ,আমির আর বনি !
যেদিন ওদের ছেড়ে হোস্টেলে গিয়েছিলাম ,ওদের জড়িয়ে খুব কেঁদেছিলাম।
একটা বিষয় ,ওই দিন বন্ধুদের বুকে জড়িয়ে ধরে উপলব্দি করেছিলাম ,
ছোটবেলার বন্ধুদের ওই প্রাণ খুলে বাইনচোদ বলে খিস্তি দিয়ে যে শান্তিটা পাওয়া যায় মনে ,সেই তৃপ্তিটা বোধয় আর কোনো বন্ধুদের সাথেই পাওয়া যায় না!
বন্ধুদের জন্যে কিছু চকলেট টফি নিয়ে এসেছিলাম।
সেদিন অনেক রাত হয়ে গেছিল ।
তাই ওদের সাথে কিছুক্ষণ ইয়ার্কি-ফাজলামি মেরে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।
|