Thread Rating:
  • 15 Vote(s) - 2.4 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Fantasy মৌসুমী: আমাদের ব্যক্তিগত মালেনা
#21
অধ্যায় ৩: নিষিদ্ধ ডিজিটাল দেওয়াল ও ইতালিয়ান দুপুর
এক
পার্টির সেই অবিস্মরণীয় রাতের পর গড়িয়ে গেছে দুটি দিন ও দুটো দীর্ঘ নিঝুম রাত। কিন্তু মৌসুমীর মনের ভেতর থেকে সেই চার সেকেন্ডের অদ্ভুত বিদ্যুৎচমকের দাহ্য রেশ বিন্দুমাত্র মেলেনি। বরং তা আরও গভীরভাবে তাঁর মনোজগতে শিকড় গেড়ে বসেছে।
গুলশানের এই সুবিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ির সুউচ্চ সিলিংওয়ালা মাস্টার বেডরুমে তিনি এখন একদম একা। স্বামী ওমর সানি রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসার কাজে ঢাকার বাইরে, ফিরতে আরও দিন দুয়েক দেরি হবে। ছেলে-মেয়ে নিজেদের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার আর বন্ধু-বান্ধবদের নিজস্ব ভুবনে ব্যস্ত। বাড়িতে সার্বক্ষণিক কাজের লোকের অভাব নেই, কিন্তু এত বড় বাড়িতে মৌসুমীর মনে হচ্ছিল এক অসীম, হাঁ-করা শূন্যতা তাঁকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে।

বিকেলের হালকা রোদ যখন গুলশানের মেহগনি গাছগুলোর পাতার ফাঁক দিয়ে বারান্দায় এসে পড়েছে, তখন মৌসুমী এক কাপ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি হাতে নিয়ে বারান্দার রকিং চেয়ারে এসে বসেছিলেন। হাতে তাঁর আইফোন। স্ক্রিনের আলো জ্বলছে আর নিভছে। তিনি মনের অজান্তেই হোয়াটসঅ্যাপের বিশাল কন্টাক্ট লিস্ট বারবার উপর-নিচে স্ক্রল করছেন। আর তাঁর ডান হাতের তর্জনীটা বারবার গিয়ে থমকে দাঁড়াচ্ছে একটা নির্দিষ্ট নামের ওপর—‘Ihan (Actor)’!

নামটা সেভ করার সময় ব্র্যাকেটে তিনি নিজেই ‘Actor’ শব্দটি লিখেছিলেন, যাতে সহকর্মীদের বিশাল ভিড়ে নতুন এই ছেলের নাম আলাদা করা যায়। কিন্তু এখন, এই অলস বিকেলে মনে হচ্ছে—এই কেজো পরিচয়টুকুর আর কোনো দরকার নেই। ইহানের মুখটা, তার ঘন চশমার আড়ালের প্রখর দৃষ্টি, আর তার শরীর থেকে আসা সেই চন্দনের মিষ্টি কোলনের ঘ্রাণ যেন স্পষ্ট ভাসছে মৌসুমীর নাকের ডগায়।

মৌসুমীর ৫২ বছরের দীর্ঘ, পরিপক্ক জীবনে এমন মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধায় তিনি খুব কমই পড়েছেন। তিনি ঢালিউডের তিন দশকের সম্রাজ্ঞী, কত শত প্রভাবশালী পুরুষ, সুপারস্টার আর পরিচালক তাঁর একটা মাত্র ফোন বা সম্মতির জন্য চাতক পাখির মতো মাসের পর মাস বসে থাকে। আর আজ, তিনি বায়ান্ন বছর বয়সে এসে একুশ বছরের এক সম্পূর্ণ নবীন ছেলের ফোন নাম্বারের দিকে তাকিয়ে ভাবছেন—একটা সাধারণ হাই বা মেসেজ পাঠাবেন কি পাঠাবেন না!

“ছিঃ মৌসুমী! কী করছ তুমি?”—মায়ের মতো শাসন করে উঠল তাঁর মনের ভেতরের নীতিবান সত্তা। “ও তোমার পেটের সন্তানের বয়সী। ওর সাথে এভাবে গায়ে পড়ে যাচেছ পড়ে যোগাযোগ করা কি তোমার মতো একজন ব্যক্তিত্বময়ী নারীর শোভা পায়? সমাজ জানলে কী বলবে?” কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর ভেতরের অবদমিত, সুপ্ত নারীসত্তা গর্জে উঠল— “আরে, ও তো আমার সহকর্মী! আমরা একসাথে একটা অসাধারণ সিনেমা বানিয়েছি, যা সমালোচকদের মন জয় করেছে। একটা সফল কাজ শেষ হওয়ার পর একজন সহকর্মীর ভালো-মন্দের খোঁজ নেওয়া তো একদম সাধারণ সৌজন্য। এতে অন্যায় বা অনৈতিকতার কী আছে? কেন নিজেকে এত খাঁচায় বন্দি করে রাখবে?”

দ্বিতীয় সত্তাটিরই শেষ পর্যন্ত জয় হলো।

মৌসুমী সোফায় একটু সোজা হয়ে বসলেন। রেশমি কাফতানের শাটিন কাপড়টা তাঁর ভরাট উরুর ওপর ছড়িয়ে পড়ল। তিনি কাঁপাকাঁপা আঙুলে দ্রুত টাইপ করলেন। খুব সাধারণ, প্রথাগত আর পেশাদার একটা মেসেজ—যাতে কোনো বাড়তি আবেগ বা ইঙ্গিত না থাকে: “হাই ইহান, কেমন আছো? অনেক দিন কোনো খোঁজ নেই। পড়াশোনা কেমন চলছে?”

মেসেজটা সেন্ড বাটন চেপে পাঠাতেই মৌসুমী তড়িঘড়ি করে ফোনটা উল্টো করে টিপয়ের ওপর রেখে দিলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত অজানা ভয়ে ‘ধক’ করে উঠল। পর্দায় চোখ না রেখেও তিনি বুঝতে পারলেন অনলাইনে ‘ডাবল টিক’ পড়েছে। তার মানে মেসেজটা সফলভাবে ডেলিভারড হয়েছে। দশ মিনিট পার হলো। পনেরো মিনিট। আধঘণ্টা... এক ঘণ্টা!

ইহানের কোনো রিপ্লাই নেই। মৌসুমী চরম অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি বারবার কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন, কিন্তু কফি ততক্ষণে ঠান্ডা বরফ হয়ে গেছে। তিনি ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলেন—ইহানের হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস দেখাচ্ছে ‘অফলাইন’। ‘লাস্ট সিন’ দেখাচ্ছে তিন ঘণ্টা আগে।

তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন, “হয়তো ভার্সিটিতে ক্লাসে আছে, বা বন্ধুদের সাথে ব্যস্ত। ও তো আর আমার মতো একাকী অবসর বসে নেই। এত অস্থির হওয়ার কী আছে?” কিন্তু মন তো আর যুক্তি মানে না! মনের এক গোপন কোণে এক তীক্ষ্ণ অপরাধবোধ ও ভয় খচখচ করতে লাগল। ছেলেটা কি ইচ্ছা করেই তাকে এড়িয়ে চলছে? নাকি সেদিনের সেই চার সেকেন্ডের তীব্র আলিঙ্গনের মুহূর্তে মৌসুমীর বুকের কাঁপন ইহানও টের পেয়েছিল? সে কি মৌসুমীকে কোনো ‘কামতৃষ্ণার্ত বয়স্ক নারী’ ভেবে দূরে সরে যাচ্ছে?


এই লজ্জাকর ভাবনায় মৌসুমীর গাল ও কান অনুশোচনায় গরম হয়ে উঠল। অবশেষে সন্ধ্যা সাতটা বাজতে দশ মিনিটে ফোনের বিশেষ নোটিফিকেশন টোনটি বেজে উঠল—‘টুং’! মৌসুমী সোফা থেকে প্রায় ছোঁ মেরে ফোনটা হাতে নিলেন। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে ইহানের নাম। সে রিপ্লাই দিয়েছে। “আসসালামু আলাইকুম ম্যাম। আমি ভালো আছি। আসলে আজ সারাদিন ভার্সিটিতে সেমিস্টার প্রেজেন্টেশনের মারাত্মক চাপ ছিল, তাই ফোন চেক করার একদম সময় পাইনি। সরি ফর দ্য লেট রিপ্লাই ম্যাম। আপনি কেমন আছেন?”

মৌসুমী বুক ভরে এক দীর্ঘ শ্বাস ফেললেন। যাক, বাঁচা গেল! খুবই শান্ত, মার্জিত আর বিনীত উত্তর। কোনো বাড়তি আদিখ্যেতা বা ফাজিলমি নেই। মেসেজের সেই ‘ম্যাম’ সম্বোধনটা দেখে মৌসুমীর মনের এক কোণে সামান্য যেন অভিমানের সূক্ষ্ম কাঁটা বিধল, আবার অন্য কোণে এক বিরাট স্বস্তিও পেলেন। অন্তত সীমানাটা ঠিক আছে।

তিনি দ্রুত লিখলেন, “ইটস ওকে। পড়াশোনাটাই আসল। আমি ভালো আছি। নিজের শরীরের যত্ন নিও।”
ইহান উত্তর দিল, “ধন্যবাদ ম্যাম। আপনিও নিজের খেয়াল রাখবেন।”

কথোপকথনটা হয়তো সেখানেই চিরতরে শেষ হতে পারত। নিয়ম অনুযায়ী হওয়া উচিতও ছিল তা-ই। কিন্তু বাস্তব আর হৃদয়ের গতিপথ সবসময় নিয়মের রেখা ধরে হাঁটে না। এখান থেকেই অলক্ষ্যে শুরু হলো এক অদৃশ্য, আবেশময় ডিজিটাল সুতোর টান।


দুই
পরের একটা মাস ধরে মৌসুমী আর ইহানের মধ্যে চলল এক ধীরলয়ের, গভীর আর তীব্র ডিজিটাল সম্পর্ক। খুব ঘনঘন তারা মেসেজ করত না—হয়তো দিনে একবার, বা সপ্তাহে তিন-চারবার। কখনো মৌসুমী নিজে থেকে কোনো সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করতেন, কখনো ইহান হঠাৎ কোনো ইন্টারেস্টিং মিম, বইয়ের রিভিউ বা চলচ্চিত্রের সুন্দর দৃশ্য শেয়ার করত। বাইরে থেকে দেখলে কথাগুলো ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক আর নির্দোষ:

“আজ ক্যাম্পাসে খুব বৃষ্টি নামল, ম্যাম। ছাতা আনিনি, একবারে ভিজে একাকার।”
“সাবধানে থেকো ইহান, ঠান্ডা লাগিয়ে ফেলো না যেন। গরম চা বা কফি খেয়ে নাও।”

অথবা,

“ম্যাম, আজ বিকেলে টিভিতে আপনার ‘মেঘলা আকাশ’ দেখাচ্ছিল। শুটিংয়ের চাপের মধ্যেও পুরোটা আবার দেখলাম। বিশেষ করে আপনার ওই বৃষ্টির দৃশ্যের এক্সপ্রেশন... জাস্ট আনপ্যারালাল!”
“থ্যাঙ্ক ইউ ইহান। ওটা আমার নিজেরও খুব হৃদয়ের কাছের একটা কাজ।”

কিন্তু এই ছোট ছোট, সুতি কাপড়ের মতো সাদা টেক্সটগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক মারাত্মক ডিজিটাল রাসায়নিক বিক্রিয়া!

এই মেসেজগুলো মৌসুমীর স্থবির, একঘেয়ে আর বিষাদময় জীবনে অক্সিজেনের মতো কাজ করতে শুরু করল। তিনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন এক নতুন রুপে। সারাদিন তিনি ঘরের কাজ করেন, জিম করেন, বিকেলের আলোয় হাঁটেন, কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকে টেবিলের ওপর রাখা সেই কালো আয়তক্ষেত্রাকার আইফোনটার দিকে। কখন ফোনটার স্ক্রিন জ্বলে উঠবে? কখন সেই কাঙ্ক্ষিত বার্তাটি আসবে?

ওমর সানি চট্টগ্রাম থেকে বাড়ি ফিরেছেন। সংসার তার স্বাভাবিক সামাজিক নিয়মে চলছে—খাবার টেবিলে গল্প, ব্যবসায়ের হিসাব, আত্মীয়দের খোঁজখবর। কিন্তু মৌসুমী যেন এক সুদূরের সমান্তরাল ভুবনে বসবাস করতে শুরু করেছেন। যে ভুবনে তিনি ৫২ বছর বয়সী কোনো দায়িত্বশীল মা বা প্রবীণ স্ত্রী নন; যে ভুবনে তিনি কেবলই এক পরম আকর্ষনীয় নারী—যার অস্তিত্বের তীব্র ব্যাকুলতা প্রকাশ পায় একুশ বছরের এক সুগঠিত তরুণের গোপন বার্তার আহ্বানে।

একদিন তপ্ত দুপুরে মৌসুমী ড্রয়িংরুমের নরম সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে ল্যাপটপে নেটফ্লিক্স ও অ্যামাজন প্রাইম স্ক্রল করছিলেন।
কোনো সিনেমা বা সিরিজই তাঁর মন টানছিল না। গতানুগতিক হলিউড থ্রিলার, সস্তা কোরিয়ান রোমান্স—সব যেন চরম পানসে আর মেকি লাগছে। হঠাৎ তাঁর মনে হলো, ইহানকে জিজ্ঞেস করলে কেমন হয়? আজকের এই আধুনিক প্রজন্মের তরুণরা তো বিশ্ব চলচ্চিত্রের খুব ভালো খবর রাখে।

তিনি ড্রয়ার থেকে ফোনটা হাতে নিলেন। হোয়াটসঅ্যাপ খুলে টাইপ করলেন: “ইহান, ফ্রি আছো?”

ঠিক দুই মিনিট পর স্ক্রিনে ভেসে উঠল: “জি ম্যাম, বলুন। ক্লাসের গ্যাপ চলছে।”

মৌসুমী সোফায় পজিশন বদলে নিয়ে লিখলেন, “একটা ভালো মুভি সাজেস্ট করতে পারো? একটু অন্যরকম কন্টেন্ট। এই গতানুগতিক মারামারি বা সস্তা রোমান্স দেখতে একদম ইচ্ছে করছে না। ভালো কোনো ক্লাসিক বা আন্তর্জাতিক আর্ট ফিল্ম হলে ভালো হয়।”

ইহান টাইপ করছে... ‘typing...’ লেখাটা ভেসে উঠছে আর নিভছে। মৌসুমী কৌতূহলী হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ইহান লিখল, “ম্যাম, আপনি কি ইতালিয়ানসিনেমা দেখেন?”


মৌসুমী উত্তর দিলেন, “খুব একটা দেখা হয়নি। তবে সাবটাইটেল থাকলে কোনো সমস্যা নেই। ভাষা তো শিল্পের বাধা নয়।”

ইহান লিখল, “তাহলে আপনি আজই ‘Malèna’ (2000) দেখতে পারেন। বিখ্যাত ডিরেক্টর জুসেপ্পে তোর্নাতোরে-র মাস্টারপিস। আমার মনে হয় সিনেমাটার নান্দনিকতা আর আবেগ আপনার খুব ভালো লাগবে। তবে...”


ইহান থেমে গেল।


মৌসুমী দ্রুত লিখলেন, “তবে কী?”

ইহান লিখল, “না কিছু না ম্যাম... সিনেমাটা একটু বোল্ড আর সেন্সুয়াল, কিন্তু প্রচণ্ড পাওয়ারফুল। মনিকা বেলুচ্চি আছেন মূল চরিত্রে।”

মনিকা বেলুচ্চি!


নামটা মৌসুমীর সুপরিচিত। বিশ্বসিনেমার অন্যতম আবেদনময়ী দেবী এবং সৌন্দর্য ও কামনার প্রতীক হিসেবে তাঁর খ্যাতি। মৌসুমীর ভেতরে এক সুপ্ত কৌতূহল জেগে উঠল। “আচ্ছা, ধন্যবাদ। আমি আজ বিকেলেই দেখব,” মৌসুমী সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে চ্যাট বন্ধ করলেন।

তিন

সেদিন বৃষ্টিভেজা বিকেলেই মৌসুমী নিজের মাস্টার বেডরুমের দরজায় খিল তুলে দিলেন। ঘরের ভারী পর্দাগুলো টেনে দিয়ে আবোছায়া এক পরিবেশ তৈরি করলেন। এসিটা ১৬ ডিগ্রিতে সেট করে, বিছানার ওপর ল্যাপটপ নিয়ে বসলেন। এইচডি কোয়ালিটিতে ইতালিয়ান মাস্টারপিস ‘Malèna’ স্ট্রিম হতে শুরু করল। প্রথম দৃশ্য থেকেই মৌসুমী যেন এক মায়াবী সম্মোহনের ভেতর তলিয়ে যেতে লাগলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সিচিলির (Sicily) এক ছোট্ট, রক্ষণশীল সুন্দর তটরেখাঘেরা শহর। আর সেই শহরের ধুলোবালি ও সোডিয়াম আলোমাখা রাস্তা দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক অনন্যা রূপসী নারী—মেলেনা স্করডিয়া (মনিকা বেলুচ্চি)। মৌসুমী মন্ত্রমুগ্ধের মতো ল্যাপটপের আলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

মনিকা বেলুচ্চি যখন পর্দায় প্রথম আবির্ভূত হন, তখন তাঁর গায়ের সুগঠিত ভরাট শাড়ি-পোশাক, কোমর দোলে হেঁটে যাওয়ার রাজকীয় ভঙ্গি, আর তাঁর চোখে জমে থাকা এক পরম একাকীত্ব ও বিষাদ পুরো সিচিলি শহরকে স্তব্ধ করে দেয়। মৌসুমী সিনেমাটি দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই মেলেনার সাথে নিজের জীবনের এক অদ্ভুত, ভয়ংকর ও নিখুঁত মিল খুঁজে পেতে শুরু করলেন!

মেলেনা একা। তার স্বামী যুদ্ধে গেছে, যার কোনো খোঁজ নেই (মৌসুমীর ক্ষেত্রে স্বামী সানি তাঁর ব্যবসা ও নিজস্ব জগতে ব্যস্ত)। পুরো সিচিলি শহরের পুরুষরা মেলেনাকে নিয়ে কামনার ফ্যান্টাসি বুনে, তার রূপ ও ভরাট শরীর নিয়ে রসালে চর্চা করে, রাস্তায় হেঁটে গেলে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকায়, কিন্তু কেউ তার ভেতরের নিঃসঙ্গ হৃদয়ের খবর রাখে না!

মেলেনা যখন রেশমি পোশাক পরে সিচিলির স্কয়ার দিয়ে হেঁটে যায়, তখন শহরের ছোট ছোট কিশোর ও তরুণ ছেলেরা সাইকেল চালিয়ে তাকে দূর থেকে অনুসরণ করে। তাদের চোখে কামাকুল বিস্ময়, ভয় আর পরম আরাধনার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। আর ঠিক সেখানেই আবির্ভাব ঘটে গল্পের প্রধান অনুঘটক—রেনাতো নামের এক ১৩-১৪ বছরের তরুণ কিশোরের।

রেনাতো দূর থেকে মেলেনাকে ভালোবাসে। সে মেলেনাকে ছুঁতে পারে না, মেলেনার সাথে কথা বলার সাহস তার নেই। কিন্তু সে গোপনে মেলেনার বাড়ির জানালার ফাঁক দিয়ে তাকে দেখে, মেলেনার ফেলে দেওয়া জিনিস কুড়িয়ে এনে বুকে ধরে রাখে। রেনাতোর এই যে দূর থেকে দেখা, এই যে এক বয়স্ক, সুগঠিত পরম রূপসী নারীর প্রতি এক কিশোরের পবিত্র অথচ তীব্র শরীরী আরাধনা—তার সেই ব্যাকুল চোখের দৃষ্টির ভেতরে মৌসুমী যেন পরিষ্কার দেখতে পেলেন ২১ বছরের ইহানের মুখটি!

সিনেমাটি যত সামনের দিকে এগোতে লাগল, মৌসুমীর শরীর তত বেশি গরম ও ঘামে আর্দ্র হতে লাগল। মনিকা বেলুচ্চির সেই voluptuous, সুগঠিত, ভরাট বক্ষ ও নিতম্বের ক্যানভাস, তাঁর শরীরের প্রতিটি মাংসল বাঁক, আর তাঁর প্রতি সেই কিশোর রেনাতোর অনিয়ন্ত্রণযোগ্য কামনার আরতি—সব যেন মৌসুমীর বর্তমান জীবনের এক নিখুঁত দর্পণ হয়ে উঠল! বিশেষ করে, মৌসুমীর নিজের বর্তমান যে শারীরিক গঠন—৩৬-৩৭ বছর বয়সে অর্জিত সেই ‘Regal Fuller Frame’ (৩৮-৩৬-৪৪ ইঞ্চি, ৭৭ কেজি)—তা মনিকা বেলুচ্চির সেই কালজয়ী শরীরের সাথে একদম হুবহু মিলে যায়! কোনো ছিপছিপে জিরো ফিগার নয়, বরং মাংসল, ভরাট, মাতৃত্বপূর্ণ অথচ ভয়াবহ রকমের প্রলুব্ধকর নারীত্ব।

সিনেমা শেষ হলো। এননিও মোররিকোনের (Ennio Morricone) হৃদয়বিদারক সুর বাজতে বাজতে এন্ড ক্রেডিট ভেসে উঠল।

মৌসুমী ল্যাপটপের পর্দাটা দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন। অন্ধকার ঘরে তিনি চিত হয়ে শুয়ে রইলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা দ্রুত ওঠানামা করছে। গালে আর ঘাড়ে হালকা ঘামের ফোঁটা। এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ ঘোরের মধ্যে তিনি তলিয়ে যাচ্ছেন। হঠাৎ তাঁর মনে এক প্রশ্ন বিদ্যুৎবেগে আঘাত হানল—

“এই সিনেমাটা ইহান আমাকে কেন সাজেস্ট করল? এটা কি শুধুই একটা ভালো আর্ট ফিল্মের সুপারিশ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে ইহানের কোনো গোপন রূপক বার্তা? ইহান কি নিজেকে সেই কিশোর ‘রেনাতো’ আর আমাকে সেই কামনাময়ী রূপসী ‘মেলেনা’ হিসেবে কল্পনা করে?”

রেনাতো যেমন বয়সের বাধার কারণে মেলেনাকে প্রকাশ্যে নিজের করতে পারে না, শুধু দূর থেকে আরাধনা করে আর ফ্যান্টাসিতে বুঁদ হয়ে থাকে—ইহানও কি মৌসুমীর ‘Regal Fuller Frame’-এর দিকে তাকিয়ে ঠিক একই অনল অনুভব করে?

মাথার ভেতর উত্তাল প্রশ্নের ঝড়। মৌসুমী আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কামনার ঘোর, কৌতূহল আর অবদমিত আবেগের বশবর্তী হয়ে তিনি নাইট স্ট্যান্ড থেকে ফোনটা হাতে নিলেন। ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা বেজে পনেরো মিনিট।

চার

তিনি হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করলেন। ইহানের নামের পাশে সবুজ ডট জ্বলছে—সে ‘Online’। মৌসুমী কাঁপা হাতে লিখলেন, “ইহান, মুভিটা দেখা শেষ করলাম মাত্র।”

সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই এল, “কেমন লাগল ম্যাম?”
মৌসুমী লিখলেন, “অসাধারণ! মনিকা বেলুচ্চি অনবদ্য। আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা হৃদয় ছুঁয়ে যায়।”

ইহান উত্তর দিল, “আমি জানতাম আপনার ভালো লাগবে ম্যাম। এই সিনেমার নান্দনিকতা আর গভীরতা আপনার টেস্টের সাথে খুব যায়।”

কথাটা সেখানেই থামতে পারত। কিন্তু মৌসুমীর ভেতরের সেই নিষিদ্ধ, দাহ্য কৌতূহল আর সামলানো গেল না। তাঁর আঙুলগুলো যেন এক অদৃশ্য শয়তানের বশবর্তী হয়ে টাইপ করতে শুরু করল। মনের সবচেয়ে গোপন, বিপজ্জনক কোণ থেকে বেরিয়ে এল সেই প্রশ্নটা—যা তিনি গত এক মাস ধরে নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন:


“আচ্ছা ইহান, একটা সত্যি কথা বলবে? তুমি আমাকে ‘Malèna’ সাজেস্ট করলে কেন? সিনেমার গল্পের সাথে কি আমাদের কোনো... মানে, তুমি কি এই সিনেমার মাধ্যমে আমাকে বিশেষ কিছু ইঙ্গিত করলে?” মেসেজটা সেন্ড বাটন চাপার সাথে সাথে... মৌসুমীর হৃদপিণ্ড যেন স্তব্ধ হয়ে গেল!

“হে ঈশ্বর! এ আমি কী করলাম!”—মৌসুমীর মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল!

তিনি নিজের কপাল চেপে ধরলেন। এই মেসেজটার মানে কী দাঁড়ায়? তিনি কি নিজেই নিজের গোপন দুর্বলতা ইহানের কাছে প্রকাশ করে দিলেন? তিনি কি বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি ইহানের সেই গোপন ফ্যান্টাসি আর কামনার দৃষ্টি সম্পর্কে শতভাগ সচেতন?
একজন বায়ান্ন বছর বয়সী জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত, সম্মানী মহাতারকা হয়ে তিনি একুশ বছরের এক তরুণের কাছে এমন লজ্জাকর, খোলামেলা প্রশ্ন কীভাবে করতে পারলেন?

যদি ইহান এটাকে সস্তা বয়স্ক নারীর ‘ভীমরতি’ বা বাজে আচরণ ভেবে খারাপ মনে করে? যদি সে এই মেসেজের স্ক্রিনশট নিয়ে কাউকে দেখিয়ে দেয়? যদি তাঁর তিন দশকের ভাবমূর্তি এক লহমায় ধুলোয় মিশে যায়? আতঙ্কে ও লজ্জায় মৌসুমীর হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।

“না, না! এই মেসেজ রাখা যাবে না! এখনই মুছে ফেলতে হবে!”

তিনি দ্রুত মেসেজটা সিলেক্ট করলেন। তাঁর আঙুল থরথর করে কাঁপছিল। তিনি ‘Delete for Everyone’ অপশনে সজোরে চাপ দিলেন। মেসেজটা মুছে গেল। চ্যাটবক্সে এখন স্রেফ লেখা উঠছে: “You deleted this message.”

মৌসুমী বুকের ওপর হাত রেখে হাপরের মতো শ্বাস নিতে লাগলেন। যাক, বাঁচা গেছে! নিশ্চয়ই দেখেনি। এত কম সময়ের মধ্যে তো দেখার কথা নয়! কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর চোখ চলে গেল চ্যাটবক্সের ওপরের দিকে। সেখানে ইহান অনলাইন আছে, কিন্তু ‘typing...’ দেখাচ্ছে না।

মৌসুমীর মাথার ভেতর রিমঝিম শব্দ হতে লাগল। সে কি ফোন লক থাকা অবস্থায় লক-স্ক্রিনের নোটিফিকেশন ব্যানার থেকে পুরো মেসেজটা পড়ে ফেলেছে? নাকি চ্যাটবক্স খোলাই ছিল? এক মিনিট... দুই মিনিট... পাঁচ মিনিট। ইহান কোনো কিছু লিখল না। সে কোনো প্রশ্ন করল না—“ম্যাম, কী ডিলিট করলেন?”

এমনকি সে কোনো ডাবল টিকের উত্তর না দিয়ে নীরব থেকে ধীরপায়ে অফলাইন হয়ে গেল। সেই নীরবতা মৌসুমীকে বিষাক্ত ছুরির মতো বিঁধতে লাগল। যদি সে না দেখত, তবে একজন সাধারণ ছেলে হিসেবে নিশ্চিতভাবেই জিজ্ঞেস করত, “ম্যাম, আপনি কী মেসেজ পাঠিয়ে আবার ডিলিট করলেন?”

যেহেতু সে একদম চুপ করে অফলাইন হয়ে গেল, তার মানে—সে দেখেছে! সে মেসেজের প্রতিটি শব্দ পড়েছে! লজ্জায়, অপমানে আর আত্মগ্লানিতে মৌসুমী বিছানার ওপর কুঁকড়ে গেলেন। এখন তিনি কী মুখ নিয়ে শুটিং ফ্লোরে বা বাইরে ইহানের সামনে দাঁড়াবেন? ছেলেটা নিশ্চয়ই মনে মনে ভাবছে—এই বয়সে এসে মৌসুমী ম্যাডামের মাথা খারাপ হয়ে গেছে!

পাঁচ

একটি দিন গেল। দুটি দিন কেটে গেল। মৌসুমী তাঁর আইফোনটা ড্রয়ারের একদম গভীরে লুকিয়ে রেখেছেন। তিনি হোয়াটসঅ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢোকার সাহস পাচ্ছেন না। এক চরম অপমান আর আতঙ্কের প্রহর গুনছেন তিনি। দ্বিতীয় দিন রাত যখন পৌনে বারোটা, মৌসুমী যখন নিজের মনে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন যে এই বয়সে এসে তিনি যা করেছেন তা চরম পাপ, আর তিনি কোনোদিনও ইহানের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখবেন না—ঠিক তখনই বন্ধ ড্রয়ারের ভেতর থেকে ফোনটা কেঁপে উঠল।

‘টুং’!

মৌসুমী চমকে উঠলেন। তিনি ধীরে ধীরে ড্রয়ার খুলে ফোনটা বের করলেন। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে ইহানের নাম। তাঁর বুকটা ধড়াস করে উঠল। তিনি কাঁপাকাঁপা হাতে লক খুললেন। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজটা ওপেন করলেন। ইহান লিখেছে: “ম্যাম, গত দুটো দিন আমি নিজের সাথে অনেক লড়াই করেছি। আপনি মেসেজটা পাঠানোর পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় ডিলিট করে দিয়েছিলেন, তাই প্রফেশনাল ভদ্রতার খাতিরে হয়তো আমার চুপ থাকাই উচিত ছিল। কিন্তু অনেক সময় নীরবতা দুটো মানুষের মধ্যে অসীম ভুল বোঝাবুঝি আর দূরত্ব তৈরি করে। আমি আপনাকে সত্যিটা বলতে চাই—আমি মেসেজটা আমার ফোনের নোটিফিকেশন বার থেকেই পড়ে ফেলেছিলাম ডিলিট হওয়ার আগেই।”

মৌসুমীর মাথার ভেতর পুরো পৃথিবীটা ঘুরতে লাগল! সে দেখেছে! সে স্পষ্ট পড়ে ফেলেছে! ঠিক এক মিনিট পর ইহানের দ্বিতীয় মেসেজটি এল। বিশাল এক দীর্ঘ বার্তা: “আমি জানি না আমার এই কথাগুলো বলা কোনো ধৃষ্টতা বা অপরাধ কি না। কিন্তু আপনার মতো একজন সত্যি কারের শিল্পীর সামনে মিথ্যা বলাটা হবে আমার অভিনয়ের প্রতি অকৃজ্ঞতা। ম্যাম, আমি আপনাকে ‘Malèna’ সিনেমাটি একদম ইচ্ছা করেই সাজেস্ট করেছিলাম।”

মৌসুমীর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। তিনি নিঃশ্বাস বন্ধ করে পড়তে লাগলেন: “কারণ ওই সিনেমায় যখনই মনিকা বেলুচ্চি স্ক্রিনে আসতেন, তাঁর সেই আভিজাত্য, তাঁর সেই ভরাট সৌন্দর্য, তাঁর বিষাদময় একাকীত্ব—আমার বারবার কেবলই আপনার কথা মনে করাচ্ছিল। সিনেমার সেই কিশোর রেনাতো যেমন দূর থেকে মেলেনার সেই রাজকীয় সৌন্দর্য দেখে কামনায় আর ভক্তিতে নিঃশ্বাসের গতি হারিয়ে ফেলত... আমি সত্যি বলছি ম্যাম, উত্তরার শুটিং ফ্লোরে আপনার পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করার সময়, কিংবা সেদিনের পার্টিতে আপনার ওই অফ-হোয়াইট শিফন আর মুক্তার হার পরা রূপ দেখে—আমিও নিজের ভেতর ঠিক একই 'রেনাতো'কে খুঁজে পেয়েছি। আমার চোখে আপনিই আমার বাস্তব জীবনের ‘মেলেনা’।”

মেসেজের শেষ অনুচ্ছেদটি পড়ে মৌসুমীর হাতের ফোন প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো: “ম্যাম, আমি যদি ‘Malèna’ আপনাকে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে সাজেস্ট করে থাকি, যদি এর মাধ্যমে আমি আপনার প্রতি আমার ভেতরের সুপ্ত, অনিয়ন্ত্রণযোগ্য আকর্ষণের কোনো ইঙ্গিত দিয়ে থাকি—তবে কি আপনি আমার ওপর ভীষণ রাগ করেছেন?”


ঘরজুড়ে থমথমে নীরবতা। এসি চলার শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। মৌসুমী সোফায় নিথর হয়ে বসে রইলেন। সময় যেন অনন্তকালের জন্য থমকে গেছে। ইহান স্বীকার করেছে! সে সম্পূর্ণ সততার সাথে, কোনো মেকি লুকোচুরি না করে স্বীকার করে নিয়েছে যে সে ইচ্ছাকৃতভাবেই সিনেমাটি দিয়েছিল! সে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে সে মৌসুমীর সেই ৭৭ কেজি ওজনের ‘Regal Fuller Frame’-এর ভেতরে কেবল একজন প্রবীণ অভিনেত্রীকে নয়, বরং মনিকা বেলুচ্চির মতো এক কামনাময়ী, অপার্থিব দেবী ‘মেলেনা’কে দেখতে পায়! আর সে নিজে মৌসুমীর সামনে দাঁড়িয়ে এক কামনাকুল, ব্যাকুল ‘রেনাতো’!

সবচেয়ে বড় কথা, সে মৌসুমীর কাছে অনুমতি চেয়েছে—“আপনি কি রাগ করেছেন?”

স্রেফ  সাধারণ প্রশ্ন নয়। বিপজ্জনক, নিষিদ্ধ প্রেমের প্রস্তাব! এটা এমন এক অদৃশ্য চাবি, যা একাধারে মৌসুমীর সাজানো সংসার আর তিন দশকের অর্জনকে ধ্বংস করতে পারে, আবার অন্যদিকে এক সুপ্ত, দাহ্য ও তীব্র নারীত্বের দুয়ার খুলে দিতে পারে!

যদি মৌসুমী উত্তর দেন: “হ্যাঁ, আমি রাগ করেছি। তোমার স্পর্ধা দেখে আমি অবাক!”—তবে খেলা এখানেই শেষ। ইহান অপরাধীর মতো ক্ষমা চাইবে, চিরতরে সরে যাবে। মৌসুমীর সামাজিক সম্মান ও নীতি বজায় থাকবে। আর যদি তিনি উত্তর দেন: “না”...

তবে তিনি এক বাক্যে সম্মতি জানিয়ে দেবেন! তিনি স্বীকার করে নেবেন যে বায়ান্ন বছর বয়সে এসেও এই একুশ বছরের তরুণের কামনার আরতিতে তিনি তৃপ্ত! তিনি পা দেবেন এক অসম, নিষিদ্ধ, পাপবিদ্ধ কিন্তু প্রলুব্ধকর আকর্ষণের অতল গহ্বরে! মৌসুমীর চোখের সামনে ভেসে উঠল তাঁর দীর্ঘ ৩০ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার, স্বামী ওমর সানি, সন্তান, সমাজ, এফডিসি আর হাজার হাজার ভক্তের দৃষ্টিভঙ্গি।

আর অন্যদিকে ভেসে উঠল ইহানের সেই প্রখর, গভীর চোখ, তার শরীরের চন্দনের সুবাস, সেদিনের সেই চার সেকেন্ডের বুকে জমে থাকা উত্তাপ, আর এই স্বীকারোক্তির সততা। বায়ান্ন বছর বয়সে এসে মৌসুমী অনুভবে টের পেলেন, তাঁর শরীরের প্রতিটা কোষ, প্রতিটা রক্তকণিকা এক নতুন অনল নিয়ে জেগে উঠছে।

তিনি কি স্রেফ সমাজের দেওয়া এক 'আইকন' বা ‘বয়স্ক দেবী’র খাঁচায় বন্দি হয়ে জীবন কাটাবেন? নাকি একজন রক্তমাংসের তৃষ্ণার্ত মানবী হয়ে এই তরুণের ব্যাকুল আহ্বানে সাড়া দেবেন? মৌসুমী অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন। তাঁর কাঁপাকাঁপা আঙুল দুটো আইফোনের জ্বলজ্বলে স্ক্রিনের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে।


তিনি জানেন, এই একটিমাত্র শব্দের ওপর নির্ভর করছে তাঁর জীবনের মোড় কোন দিকে ঘুরবে। মৌসুমী এক গভীর, দীর্ঘ শ্বাস নিলেন। শরীরের সমস্ত দ্বিধা আর নীতিবোধকে এক পাশে সরিয়ে রেখে, তিনি ধীরপায়ে টাইপ করলেন একটি মাত্র শব্দ— 

“না।” 


তিনি সেন্ড বাটন চাপলেন। মেসেজটি চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নীল রঙের দুটি টিক চিহ্ন ভেসে উঠল। মৌসুমী ফোনটি নিজের বুকের একদম মাঝে, স্পন্দিত হৃদপিণ্ডের ওপর চেপে ধরে চোখ বন্ধ করলেন। তিনি জানেন না সামনে কী কালবৈশাখী ঝড় অপেক্ষা করছে, কিন্তু তিনি এটুকু নিশ্চিতভাবে জানেন—আজ রাতে মেলেনা তার রেনাতোকে ফিরিয়ে দেয়নি।

[+] 5 users Like Orbachin's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#22
Darun
Like Reply
#23
আপনার লেখা বরাবরই অনবদ্য। ২১বছর, বিশেষ করে "৫২ বছর" কি বারবার আসতেছে, মানে রিডানডেন্সি হচ্ছে কিনা? ইহানের ২১ বছর বয়স কি প্রেক্টিক্যাল, একটু বেশি হতে পারতো?
[+] 1 user Likes madlust247's post
Like Reply
#24
অর্বাচীন দাদা,
খুব খুব ভালো হচ্ছে।
Like Reply
#25
অধ্যায় ৪: অসম বৃত্তের জ্যামিতি ও নিষিদ্ধ উপহার

এক
হোয়াটসঅ্যাপের নীল ব্যাকগ্রাউন্ডে জ্বলজ্বল করা একটি মাত্র শব্দ—‘না’। বর্ণমালার হিসেবে নিতান্তই ক্ষুদ্র, কিন্তু এর মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক অভিঘাত ছিল প্রচণ্ড। এই একটি মাত্র শব্দ প্রতিষ্ঠিত মহাতারকা এবং উদীয়মান তরুণের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অদৃশ্য, নিরেট সামাজিক কাঁচের দেওয়ালটাকে এক নিমেষে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল।

এ কোনো সাধারণ অস্বীকৃতি নয়; ছিল  চূড়ান্ত, নীরব ও ভয়ংকর সম্মতি। নিষিদ্ধ অরণ্যে প্রবেশের সবুজ সংকেত। পরের কয়েকটা সপ্তাহে মৌসুমীর যাপিত জীবনে নেমে এল এক অদ্ভুত, পরাবাস্তব বসন্ত। ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন নভেম্বর ফুরিয়ে ডিসেম্বরের হিমেল হাওয়া ঢাকার রাজপথ ছুঁয়েছে। রাতে উত্তরের বাতাস ব্যালকনির গাছগুলোতে মৃদু কাঁপন তোলে। কিন্তু মৌসুমীর রক্তে তখন বইছিল ফাগুনের মাতাল, অপ্রতিরোধ্য ঘূর্ণিবায়ু।

গত এক দশকে তাঁর সকালগুলো ছিল অত্যন্ত একঘেয়ে, সাংসারিক এবং যান্ত্রিক। সকালে ঘুম ভেঙে তিনি কাজের মাসিকে হাঁকডাক দিতেন, নাস্তার মেনু ঠিক করতেন, ড্রাইভারের ছুটির হিসাব নিতেন কিংবা এফডিসির শিল্পী সমিতির কোনো ক্লান্তিকর মিটিং নিয়ে ফোনে কথা বলতেন।

কিন্তু এখন?

এখন ভোরে চোখ মেলার আগেই তাঁর ডান হাতটি অবচেতনভাবেই চলে যায় নরম সাটিনের বালিশের নিচে রাখা ফোনটার দিকে। ফোনের স্ক্রিনে যদি ইহানের কোনো ‘গুড মর্নিং’ টেক্সট থাকে, কিংবা দশ সেকেন্ডের একটা গাঢ় ভয়েস নোট ভেসে ওঠে—“শুভ সকাল ম্যাম, আজ আপনার দিনটা সুন্দর কাটুক”—তবে মৌসুমীর পুরো দিনটা শরতের মেঘমুক্ত উজ্জ্বল রোদের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে।

আর যদি কোনোদিন সকাল নয়টা বেজে যাওয়ার পরেও নোটিফিকেশন বার শূন্য থাকে? তবে এক তীব্র, অনাহূত অভিমান আর শ্বাসরুদ্ধকর বিষণ্নতা তাঁর বুকের ভেতর চেপে বসে। তিনি তখন কোনো কাজে মন বসাতে পারেন না; মেকআপের ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে অস্থির আঙুলে বারবার হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রল করতে থাকেন।

ইহানের সাথে তাঁর এই ডিজিটাল সংযোগের কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক সংজ্ঞা ছিল না। এটি ঠিক প্রথাগত প্রেমিকের মতো বাঁধাধরা সম্পর্ক নয়, আবার স্রেফ গুরু-শিষ্য বা সহকর্মীর বন্ধুত্বও নয়। এটি ছিল এক নিষিদ্ধ, ধূসর ও তীব্র কামনামাখা সম্পর্কের চোরাবালি। ইহান কখনো মুখে সরাসরি বলেনি—“আমি আপনাকে ভালোবাসি”। কিন্তু সে মৌসুমীকে এমন এক মহামূল্যবান জিনিস দিতে শুরু করল, যা এই বয়সে একজন মহাতারকার জীবনে সবচেয়ে দুর্লভ—‘সময়’।

ওমর সানি সারাদিন তাঁর নতুন রেস্তোরাঁ ব্যবসা, এফডিসির মিটিং আর বন্ধুদের আড্ডায় ব্যস্ত থাকেন। সন্তানরা নিজেদের উচ্চশিক্ষা, ক্যারিয়ার আর নিজস্ব বন্ধুবান্ধবদের ভুবনে নিবেদিত। গুলশানের এই সুবিশাল তিন হাজার স্কয়ার ফিটের ডুপ্লেক্স অ্যাপার্টমেন্টটি মৌসুমীর কাছে রূপ নিয়েছিল এক নিঃসঙ্গ, পাথুরে দুর্গে। আর সেই দুর্গের নিশ্ছিদ্র প্রাচীর ভেদ করে ইহানের উপস্থিতি প্রবেশ করেছিল তপ্ত মরুভূমিতে এক পশলা আকস্মিক শ্রাবণধারার মতো।

তারা কথা বলত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

কখনো গভীর রাতে অডিও কলে, কখনো অলস দুপুরে ভিডিও কলে।

ইহান কথা বলত তার বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ডিপার্টমেন্ট নিয়ে, সত্যজিৎ রায় আর তারকোভস্কির সিনেমা নিয়ে, কখনো বা আধুনিক বিশ্ব রাজনীতির প্যারাডক্স নিয়ে। মৌসুমী মুগ্ধ হয়ে, আধশোয়া হয়ে শুনতেন। তাঁর মনে হতো, তিনি যেন তরুণের প্রখর, সতেজ চোখ দিয়ে পুরো পৃথিবীটাকে নতুন করে দেখছেন।

ইহানের গলার স্বর ভারী ও কিছুটা পুরুষালী ভাঙা, কিন্তু তাতে এক ধরনের অদ্ভুত ছেলেমানুষি আবদার ও অধিকারবোধ মিশে থাকত। যখন ভিডিও কলে কথা বলার সময় ইহান হঠাৎ থেমে গিয়ে মৌসুমীর খোলা কাঁধ আর ঢিলেঢালা রেশমি পোশাকের দিকে অপলক তাকিয়ে বলত—“ম্যাম... ওহ সরি, মৌসুমী ম্যাম... এই গাঢ় মেরুন রঙের পোশাকে আপনাকে না একদম অপার্থিব লাগছে। মনে হচ্ছে যেন কোনো ইতালিয়ান ভাস্কর্য কথা বলছে”—তখন মৌসুমীর চিবুক ও গালের রক্তিম আভা কোনো কৃত্রিম মেকআপ দিয়ে ঢাকতে হতো না।

মৌসুমী নিজের অজান্তেই লক্ষ্য করলেন, তিনি অবিশ্বাস্যভাবে বদলে যাচ্ছেন।

তিনি এখন সকালের জিম সেশনে আগের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগী। ট্রেইনারকে বলে নিজের ‘Regal Fuller Frame’-এর প্রতিটি বাঁককে আরও বেশি আকর্ষণীয় ও টানটান করার কসরত করছেন। কঠোর ডায়েট চার্ট মেনে চলছেন, পার্লারে গিয়ে নিয়মিত বিশেষ হাইড্রা-ফেসিয়াল আর স্কিন পলিশিং করাচ্ছেন। চুলে করিয়েছেন চকোলেট ব্রাউন আর বার্গান্ডির চমৎকার ব্লেন্ড।

তাঁর শরীরে বয়সের কারণে যে মেদটুকু জমেছিল (৩৮-৩৬-৪৪ ইঞ্চি), সেটাকে তিনি আগে কিছুটা বার্ধক্যের ভার ভাবতেন। কিন্তু এখন, ইহানের গভীর প্রশংসাসূচক বাক্যগুলো মনে করে তিনি উপলব্ধি করেন—এটাই তাঁর পরম সম্পদ, এটাই তাঁর কামোদ্দীপক রাজকীয় নারীত্ব।
ইহান একদিন চ্যাটে লিখেছিল: “ম্যাম, আজকের এই জিরো ফিগারের কৃত্রিম মেয়েদের চেয়ে আপনার এই সুগঠিত, ভরাট আভিজাত্য হাজার গুণ বেশি প্রলুব্ধকর। ঠিক যেন রেনেসাঁ যুগের মাইকেলেঞ্জেলো বা তিশিয়ানের ক্যানভাস থেকে নেমে আসা কোনো চিরন্তন দেবী।”

এই  বাক্য মৌসুমীকে যে তীব্র আত্মবিশ্বাস আর নারীত্বের অহংকার এনে দিয়েছিল, তা তাঁর গত তিন দশকের ক্যারিয়ারে কোনো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বা ভক্তদের হাততালিও দিতে পারেনি।
দুই

মাঝেমধ্যে তারা দেখা করতে শুরু করল। তবে চরম সতর্কতায় ও নিশ্ছিদ্র গোপনীয়তায়। গুলশান বা বনানীর কোনো পরিচিত, চাকচিক্যময় রেস্তোরাঁয় নয়—যেখানে পাপারাজ্জি বা পরিচিত মহলের লোলুপ চোখ থাকতে পারে। তারা বেছে নিত ঢাকা শহরের কোলাহলমুক্ত উপকণ্ঠ। কখনো পূর্বাচলের নির্জন হাইওয়ে ধরে দীর্ঘ ড্রাইভ, কখনো তিনশ ফিট সড়কের একদম পেছনের কোনো নামহীন, নিভৃত ক্যাফে।

মৌসুমী কখনোই নিজের মার্সিডিজ বা ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে যেতেন না, পাছে ড্রাইভার খোকন কিছু টের পেয়ে যায়। তিনি * না পরলেও বড় কালো ওভারসাইজড সানগ্লাস, মাথায় দামি সিল্কের স্কার্ফ জড়িয়ে সম্পূর্ণ সাধারণ বেশে উবার প্রিমিয়াম কল করতেন। নির্দিষ্ট একটা দূরবর্তী পয়েন্টে গিয়ে তিনি ইহানের প্রাইভেট কারে গিয়ে উঠতেন।

গাড়ির পেছনের কিংবা পাশের সিটে পাশাপাশি বসে থাকার সেই সময়গুলোতে বাতাসের প্রতিটি কণা যেন বিদ্যুৎবাহী হয়ে উঠত। ইহান যখন স্টিয়ারিং হাতে ড্রাইভ করত, মৌসুমী তখন বসতেন ঠিক তাঁর বাম পাশের প্যাসেঞ্জার সিটে। তাদের দুজনের শরীরের দূরত্ব থাকত মাত্র কয়েক ইঞ্চি। গাড়ির সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাসের ভেতর ইহানের শরীর থেকে ভেসে আসত তামাক, পুরুষালী ঘাম আর দামি ওউড পারফিউমের এক অদ্ভুত নেশা ধরানো সুবাস।

মাঝেমধ্যে গিয়ার বদলানোর সময় কিংবা আকস্মিক ব্রেক কষার মুহূর্তে ইহানের শক্ত, বলিষ্ঠ কনুই বা হাতের আঙুলের অগ্রভাগ আলতো করে ছুঁয়ে যেত মৌসুমীর শাড়ির পাড় কিংবা উন্মুক্ত কনুই। সেই সামান্য, অতি সংক্ষিপ্ত ছোঁয়ায় মৌসুমীর পরিণত শরীরে এমন সব সুপ্ত, অবদমিত হরমোনের তীব্র বিস্ফোরণ ঘটত—যা তিনি ভেবেছিলেন বহু বছর আগেই তাঁর জীবন থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে। তাঁর মেরুদণ্ড বেয়ে এক হিমশীতল অথচ দাহ্য শিহরণ নেমে যেত নাভির গভীরে।

একদিন রক্তিম বিকেলে তারা উত্তরার দিয়াবাড়ির শেষ প্রান্তে, কাশফুলের বিশাল নির্জন মাঠের পাশে গাড়ি থামিয়েছিল। সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমের দিগন্তে হেলে পড়ছে। শীতের গোধূলি আকাশটাকে আবির, কমলা আর রক্তিম মায়ায় রাঙিয়ে দিয়েছে। বাতাসে সাদা কাশফুলগুলো এক অপূর্ব ছন্দে দুলছিল।

ইহান স্টিয়ারিং হুইলে দুই হাত রেখে আনমনে তাকিয়ে ছিল দূরের রক্তিম দিগন্তের দিকে। গাড়ির ভেতরের মৃদু আলোয় তার ধারালো চোয়াল আর ক্লিন শেভ করা মুখাবয়ব যেন আরও বেশি নিখুঁত দেখাচ্ছিল। মৌসুমী নিজের সিল্কের স্কার্ফটা আলগা করে চশমাটা খুললেন। তাঁর চোখের গভীরতায় জমে থাকা চিরন্তন প্রশ্নটা আর চেপে রাখতে পারলেন না।

তিনি খুব নরম, আর্দ্র গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ইহান... একটা কথা সত্যি বলবে? তুমি আমার সাথে এভাবে গোপনে সময় কাটাও কেন? তোমার বিশ্ববিদ্যালয়ে তো তোমার বয়সী কত রূপসী, আধুনিক আর আকর্ষণীয় তরুণী আছে... তুমি তো তাদের সাথে মিশতে পারো, প্রেম করতে পারো। আমার কাছে তোমার কী পাওয়ার থাকতে পারে?”

ইহান ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে সরাসরি মৌসুমীর চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই দৃষ্টিতে কোনো চপলতা ছিল না; ছিল এক অবিশ্বাস্য গভীরতা আর অদম্য আকর্ষণ—যা মৌসুমীকে মুহূর্তের মধ্যে শারীরিকভাবে দুর্বল ও দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলল। ইহান স্টিয়ারিং থেকে এক হাত নামিয়ে সিটের হাতলের ওপর রাখল। মৌসুমীর হাতের খুব কাছে, কিন্তু স্পর্শ করল না।

“সমবয়সী মেয়েদের সাথে কথা বলে আমি কোনো প্রাণ পাই না, ম্যাম,” ইহানের কন্ঠস্বর খাদে নেমে এল। “ওদের চিন্তা-ভাবনা বড্ড অগভীর, বড্ড প্লাস্টিক। ওরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কেবল ইনস্টাগ্রামের রিলস, মেকআপ ব্র্যান্ড আর ক্ষণস্থায়ী রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু আপনার পাশে বসলে... আপনার সাথে কথা বললে আমার মনে হয় আমি এক অতলান্ত, রহস্যময় মহাসমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আছি। যে সমুদ্রের প্রতিটি ঢেউয়ে আছে অভিজ্ঞতা, আভিজাত্য আর এক গভীর বিষাদের গল্প।”

ইহান একটু থামল। তার দৃষ্টি মৌসুমীর চোখের পাতা থেকে নেমে এসে স্থির হলো তাঁর ভরাট, রক্তিম ঠোঁটের ওপর। “আমি আপনার স্টারডমের ভক্ত নই ম্যাম,” ইহান ফিসফিস করে বলল, “আমি আপনার এই পরিণত রূপ, এই রাজকীয় উপস্থিতি আর আপনার এই সুপ্ত নারীত্বের অন্ধ পূজারী।”

কথাগুলো কি নিছকই কোনো দক্ষ চিত্রনাট্যের সংলাপ? নাকি বিভ্রান্ত তরুণের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ? মৌসুমী জানেন না। এবং এই পরম মুহূর্তে তিনি তা জানতেও চান না। তিনি শুধু এই মায়াবী বিষের প্রতিটি ফোঁটা তৃষ্ণার্তের মতো পান করতে চান। তিনি এক মুহূর্তের জন্য ভুলে যেতে চান যে তিনি এই সমাজের চোখে একজন প্রবীণ মহাতারকা, তিনি ভুলে যেতে চান যে তিনি এক পূর্ণবয়স্ক সন্তানের জননী। তিনি শুধু সেই আদিম নারী হতে চান—যে একজন তরতাজা, সুদর্শন পুরুষের চোখে দেবীর মতো আকাঙ্ক্ষিত ও পূজিত হয়ে বেঁচে আছে।

কিন্তু প্রতিটি নিষিদ্ধ সুখের পেছনেই ওত পেতে থাকে এক বিষাক্ত কালো ছায়া। মৌসুমীর সেই ছায়াটি ছিল তাঁর নিজস্ব বিবেক আর নীতিবোধের দংশন। রাতে যখন তিনি নিজের সুরম্য প্রাসাদে ফিরে আসতেন, তখন এক ভয়াল অপরাধবোধ তাঁকে চারপাশ থেকে অজগরের মতো পেঁচিয়ে ধরত।

ডিনার টেবিলে বসে ওমর সানি যখন তাঁর রেস্তোরাঁর লাভ-ক্ষতি, নতুন জমি কেনা বা রাজনৈতিক বন্ধুদের গল্প করতেন, মৌসুমী তখন প্লেটের দিকে তাকিয়ে রোবটের মতো চামচ নাড়তেন। স্বামীর মুখের দিকে তাকালে তাঁর নিজের আত্মাকে একজন জঘন্য বিশ্বাসঘাতক, এক কলঙ্কিত চরিত্র বলে মনে হতো।

অথচ পরক্ষণেই তাঁর বিদ্রোহী মন চিৎকার করে উঠত—“কেন? এই মানুষটা কি গত পনেরো বছরে একবারও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছে—‘মৌসুমী, তোমাকে আজও পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী মনে হয়’? তিনি কি একবারও আমার এই নিঃসঙ্গ আত্মার খবর নিয়েছেন? তবে কেন আমি এক ফোঁটা জীবন্ত অনুভূতির জন্য অপরাধবোধে দগ্ধ হব?”
তিন

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়। ঢাকার আকাশ আজ সকাল থেকেই কুয়াশা আর মেঘের চাদরে ঢাকা। মৌসুমীর মনটা আজ সকাল থেকেই এক অদ্ভুত বিষাদ আর গ্লানিতে ভারী হয়ে ছিল। কারণটা ঘটেছিল আগের রাতে। ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে তিনি হঠাৎ দেখতে পান তাঁর একমাত্র মেয়ে ফাইজা একটি নতুন ছবি পোস্ট করেছে। ছবিতে ফাইজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার ইউনিভার্সিটির সহপাঠী এক তরুণ—যার সাথে ফাইজা প্রেম করছে। ছেলেটি দেখতে অসম্ভব স্মার্ট, বয়স হয়তো তেইশ বা চব্বিশ বছর। সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে মৌসুমীর বুকের ভেতরটা যেন বরফ হয়ে গিয়েছিল।

তাঁর মেয়ের প্রেমিকের বয়স চব্বিশ... আর ইহানের বয়স একুশ!

হিসাবটা মাথার ভেতর আসতেই মৌসুমীর হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। এক অসীম লজ্জা আর মানসিক চাবুকের ঘা তাঁর স্নায়ুতে এসে আছড়ে পড়ল। আজ দুপুরেই ইহান মেসেজ দিয়েছিল। সে দেখা করতে চেয়েছে। বলেছে, তার কাছে মৌসুমীর জন্য একটা অত্যন্ত বিশেষ ও ব্যক্তিগত জিনিস আছে, যা সে নিজের হাতে তুলে দিতে চায়।

মৌসুমী সকালে শক্ত মনে ঠিক করেছিলেন তিনি যাবেন না। তিনি স্পষ্ট ‘না’ লিখে টেক্সট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিকেলে যখন ইহানের একটি মাত্র আকুতিভরা ছোট মেসেজ এল—“ম্যাম, প্লিজ... শুধু আধা ঘণ্টার জন্য। আমি অপেক্ষা করব”—তখন মৌসুমীর সমস্ত নীতিবোধ আর বয়সের অহংকার বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ল।

বিকেল ঠিক সোয়া পাঁচটায় তারা বনানীর এক নিভৃত, আন্ডারগ্রাউন্ড বুক ক্যাফেতে দেখা করল। ক্যাফেটি আধুনিক কায়দায় সাজানো হলেও এর আলো-আঁধারি পরিবেশ বেশ চমৎকার। মেহগনি কাঠের তাকে সাজানো হাজার হাজার পুরোনো বই, কফির কড়া সুবাস আর ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব মৃদু লয়ে বাজছে জ্যাজ মিউজিক। কোলাহল থেকে বাঁচতে তারা একদম পেছনের দিকের একটা প্রাইভেট বুথ বেছে নিল।

ইহান আজ পরেছে একটি নিখুঁত সাদা রঙের লিনেন শার্ট। শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, যার ফলে তার ফর্সা ও পেশিবহুল হাত দৃশ্যমান। গলায় খোলা দুটো বোতাম। তাকে দেখাচ্ছিল কোনো গ্রিক পুরাণের তরুণ দেবতার মতো—একাধারে পবিত্র অথচ তীব্রভাবে প্রলুব্ধকর।

আর মৌসুমী আজ নিজেকে সযত্নে ঢেকে এনেছেন একটি গাঢ় নীল রঙের কাশ্মীরি সিল্কের সালোয়ার-কামিজে। তাঁর ভরাট বক্ষযুগল ও কোমরকে ঢেকে রেখেছে একটি চওড়া ওড়না। চোখে হালকা সুরমা, ঠোঁটে ন্যুড লিপস্টিক। টেবিলে ধোঁয়া ওঠা দুটি ক্যাপুচিনো দিয়ে গেল ওয়েটার।

দুজনেই কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। কফির কাপ থেকে ওঠা বাষ্প তাদের দুজনের চোখের মাঝখানে এক মায়াবী পর্দা তৈরি করছিল। “ম্যাম, আপনাকে আজ খুব গম্ভীর আর চিন্তিত দেখাচ্ছে,” ইহান নিচু স্বরে বলল। তার গলার স্বর ক্যাফের মৃদু মিউজিকের সাথে মিশে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করছিল।

মৌসুমী এক চিলতে ম্লান হাসলেন। কফির কাপে আঙুল ঘষতে ঘষতে বললেন, “কিছু না ইহান। বয়স হচ্ছে তো... মাঝে মাঝে মন আর শরীর কোনোটারই ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।” ইহান টেবিলের ওপর দিয়ে তার ডান হাতটি ধীরে ধীরে এগিয়ে দিল। কিন্তু সে মৌসুমীর হাত স্পর্শ করল না।

সে তার হাতের তালুটি মৌসুমীর ফরসা, নিটোল হাতের ঠিক এক সেন্টিমিটার দূরত্বে এনে স্থির করে রাখল। এই যে স্পর্শ না করেও স্পর্শের চরম অনুভূতি তৈরি করা—ইহানের এই শারীরিক দূরত্বের খেলাটা মৌসুমীর রক্তে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। তিনি অনুভব করতে পারছিলেন ইহানের হাতের তালু থেকে নির্গত হওয়া তীব্র জৈবিক উত্তাপ।

“বয়স তো স্রেফ একটা পার্থিব সংখ্যামাত্র, ম্যাম,” ইহান এক দৃষ্টিতে তাঁর চোখের দিকে চেয়ে বলল। “আপনি যদি নিজেকে সমাজ আর বয়সের বেড়াজালে বন্দি ভাবেন, তবেই আপনি বন্দি। আমার চোখে আপনি আজও সেই ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর অনন্যা রেশমি, আপনিই আমার চিরন্তন স্বপ্ন।”

মৌসুমী এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ নামিয়ে নিলেন। “সিনেমার কাল্পনিক সংলাপ দিও না ইহান। বাস্তব জীবন সিনেমার চেয়ে অনেক বেশি নিষ্ঠুর আর নির্মম।” ইহান কোনো কথা বলল না। সে ধীরে ধীরে নিজের চামড়ার সাইড ব্যাগ থেকে একটি নিখুঁতভাবে মোড়ানো উপহার বের করল। গাঢ় খয়েরি রঙের ভেলভেট পেপারে মোড়ানো মাঝারি সাইজের একটি প্যাকেট। সে প্যাকেটটি টেবিলের ওপর মৌসুমীর হাতের সামনে রাখল।

“আপনার জন্য একটা অতি ক্ষুদ্র উপহার এনেছি ম্যাম,” ইহানের চোখেমুখে এক ধরনের অদ্ভুত লাজুকতা ও গভীর অনুভূতি খেলে গেল। “আমি জানি আপনি আপনার জীবনে কোটি টাকার হিরে, সোনা আর বিলাসবহুল উপহার পেয়েছেন। আমার মতো একজন সাধারণ ছাত্রের পক্ষে হয়তো সেসব দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু এটা আমার সাধ্যের মধ্যে কেনা আমার হৃদয়ের সবচেয়ে দামি জিনিস।”

মৌসুমী অবাক চোখে প্যাকেটের দিকে তাকালেন। “কী এটা ইহান?”

“খুলে দেখুন।”

মৌসুমীর আঙুল কাঁপছিল। তিনি অতি সন্তর্পণে খয়েরি কাগজের মোড়কটি খুললেন। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটি ক্লাসিক বাঁধাই করা হার্ডকভার বই। বইটির নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ নয়, কিংবা কোনো চটুল রোমান্টিক আধুনিক উপন্যাসও নয়।  কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের এক অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক ও বেদনাবিধুর কালজয়ী উপন্যাস—‘বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল’।

মৌসুমী বইটির প্রচ্ছদ দেখে থমকে গেলেন। একজন বিদুষী নারী হিসেবে তিনি এই উপন্যাসের মূল ভাববস্তু খুব ভালো করেই জানেন। এটি এক অসম বয়সী প্রেম, এক প্রবীণ পরিপক্ক নারীর প্রতি এক তরুণের গভীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এবং নিষিদ্ধ ভালোবাসার এক নিঃশব্দ হাহাকারের গল্প! মৌসুমী অত্যন্ত ধীরহাতে বইটির প্রথম সাদা পাতাটি উল্টালেন।

সেখানে পৃষ্ঠাটির একদম মাঝখানে, গাঢ় নীল কালির নিব-কলমে গোটা গোটা আধুনিক ক্যালিগ্রাফিতে কিছু একটা লেখা রয়েছে। মৌসুমী নিজের চশমাটা ঠিক করে লেখাটির ওপর চোখ রাখলেন। সেখানে লেখা: “বৃষ্টির কোনো বয়স নেই, সে যখন অঝোরে ঝরে তখন ভিজে যাওয়া মাটির মাতাল গন্ধটা চিরকাল একই থাকে। অনুভূতিরও কি তবে বয়স থাকা জরুরি? 
—চিরকালের জন্য আপনার, ‘রেনাতো’।”

লেখাটি পড়া মাত্রই মৌসুমীর শরীরের সমস্ত লোমকূপ একযোগে দাঁড়িয়ে গেল!
‘রেনাতো’! সেই ইতালিয়ান মাস্টারপিস ‘Malèna’ সিনেমার সেই কিশোর প্রেমিক—যে মনিকা বেলুচ্চির রূপের বেদীতে নিজের শৈশব ও যৌবন উৎসর্গ করেছিল! ইহান নিজেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রেনাতো’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তার মানে, সে মৌসুমীকে স্রেফ কোনো সিনিয়র অভিনেত্রী বা বন্ধু হিসেবে নয়, বরং রক্তমাংসের সেই চরম কামনাময়ী ও অপার্থিব ‘মেলেনা’ হিসেবেই নিজের মনের সিংহাসনে বসিয়ে পূজা করছে!

বইটি দুই হাতে শক্ত করে চেপে ধরে মৌসুমী মুখ তুলে ইহানের দিকে তাকালেন। ইহানের তরুণ চোখে তখন কোনো কপটতা নেই; আছে এক সর্বগ্রাসী, অপ্রতিরোধ্য আত্মসমর্পণ আর ভালোবাসার অবুঝ আর্তি। মৌসুমীর বুকের ভেতর এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে যেতে লাগল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।

তিনি কি এই ছেলের চোখে সত্যি এক অপ্রতিরোধ্য প্রেমের দেবী? নাকি এটি ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের সেই জটিল টান—কোনো এক মাতৃসম, অভিজ্ঞ ও ভরাট শরীরের নারীর প্রতি এক তরুণের তীব্র আদিম আকর্ষণ? “ধন্যবাদ ইহান...” মৌসুমীর কন্ঠস্বর কেঁপে উঠল, চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। “এটা... এটা আমার জীবনের পাওয়া অন্যতম সেরা এবং সবচেয়ে ভারী উপহার।”

ইহান নির্মল হাসল। “আপনার চোখে এই মুগ্ধতাটুকুই আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি, ম্যাম।”

সেদিন ক্যাফেতে আর বেশিক্ষণ বসা সম্ভব হলো না। মৌসুমী দ্রুত বিল মিটিয়ে উঠে পড়লেন। তাঁর বুকের ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ইহানের এত কাছে বসে থাকাটা তাঁর জন্য ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল। তিনি তীব্রভাবে ভয় পাচ্ছিলেন—আর পাঁচটা মিনিট যদি তিনি ওই টেবিলের ওপারে বসে থাকেন, তবে হয়তো সমস্ত সামাজিক শালীনতা ভুলে তিনি ইহানের হাত নিজের বুকে টেনে নেবেন!
চার

রাত তখন পৌনে বারোটা। গুলশানের এই তিনতলা সুরম্য রাজপ্রাসাদ আজ এক অমানবিক নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ওমর সানি আজও সিলেটে ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত। একমাত্র ছেলে ফারদিন তার নিজের আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে, আর মেয়ে ফাইজা হয়তো পাশের ঘরে ল্যাপটপে সিনেমা দেখছে কিংবা ঘুমিয়ে পড়েছে। কাজের বুয়ারা নিচতলার কোয়ার্টারে চলে গেছে।

মৌসুমী তাঁর মাস্টার বেডরুমে সম্পূর্ণ একা। ঘরের সমস্ত উজ্জ্বল আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু বেডসাইড টেবিলের ভিক্টোরিয়ান শেডের লালচে ল্যাম্পটি জ্বলছে, যা পুরো ঘরে এক রহস্যময়, আলো-আঁধারি ও আদিম রোমান্টিক আভা ছড়িয়ে রেখেছে। মৌসুমী একটি রকিং ইজিচেয়ারে বসে আছেন। তাঁর কোলের ওপর খোলা রাখা সেই উপহার পাওয়া বই—‘বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল’।

তিনি তাঁর সিল্কের ভারী কামিজটি বদলে ফেলেছেন। এখন তাঁর পরনে একটি ঢিলেঢালা, মসৃণ কালো সাটিনের স্লিপার নাইটগাউন। সুগঠিত ও ভরাট ‘Regal Fuller Frame’ (৩৮-৩৬-৪৪ ইঞ্চি) সেই পাতলা সাটিনের আড়ালে এক অনাবিল, মাংসল ও রাজকীয় মহিমায় দৃশ্যমান। খোলা কাঁধ আর গলার ত্বক লালচে ল্যাম্পের আলোয় চকমক করছে।

সামনে রাখা বিশাল ড্রয়িং ড্রেসিং টেবিলের ফুল-লেংথ বেলজিয়াম আয়নার দিকে তাকিয়ে মৌসুমী হঠাৎ শিউরে উঠলেন। তিনি এক দৃষ্টিতে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালেন। “মৌসুমী, তুই এ কী করছিস?”—ভেতরের এক অদৃশ্য সত্তা যেন আয়নার ওপার থেকে তীব্র ব্যঙ্গাত্মক হাসিতে ফেটে পড়ল।

“এই যে বইটা তুই পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে বসে আছিস, এটা কোনো সাধারণ উপহার নয় রে! এটা হলো এক জ্বলন্ত অঙ্গার, এক সর্বনাশা পাপের পরোয়ানা!”

মৌসুমী নিজের কপালে হাত রাখলেন। হিসাবটা আবার তাঁর মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। এক নির্মম, নিষ্ঠুর গাণিতিক হিসাব!

তাঁর নিজের গর্ভজাত বড় ছেলে—ফারদিন। তার বর্তমান বয়স ২৮ বছর।
তাঁর একমাত্র আদরের মেয়ে—ফাইজা। তার বয়স ২২ বছর।
আর এই ইহান... যে ছেলেটি তাঁকে ‘রেনাতো’ হয়ে উপহার পাঠায়, তার বয়স মাত্র ২১ বছর!

মাথাটা বনবন করে ঘুরে উঠল মৌসুমীর। ইহানের বয়স তাঁর নিজের ছেলের চেয়ে পুরো সাত বছরের ছোট! এমনকি তাঁর ছোট মেয়ের চেয়েও এক বছরের ছোট! তাঁর মেয়ে যে তরুণের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়াচ্ছে, ইহান সেই ছেলের চেয়েও বয়সে অনুজ!

আর এমন এক তরুণের সাথে তিনি—বাংলা চলচ্চিত্রের তিন দশকের সম্রাজ্ঞী, লাখো মানুষের আদর্শ ‘প্রিয়দর্শিনী’ মৌসুমী—লুকিয়ে প্রেম করছেন? ডিজিটাল চ্যাটে কামনার শিহরণ খুঁজছেন? নির্জন গাড়িতে বসে তার হাতের ছোঁয়া পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠছেন? লজ্জা, ঘৃণা আর আত্মধিক্কারে মৌসুমী নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললেন।

“ছিঃ মৌসুমী! ছিঃ! তোর এই চরম অধঃপতন? এক কচি ছেলের চাটুকারিতায় নিজেকে সঁপে দিচ্ছিস? সমাজ যদি এই সত্যের এক বিন্দুও জানতে পারে, তবে তোর ত্রিশ বছরের অর্জিত সম্মান, তোর ‘মৌসুমী ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’, তোর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার—সবকিছু নর্দমার আবর্জনায় পরিণত হবে! মানুষ তোকে নিয়ে ট্রোল করবে, ছিঃ ছিঃ করে থুতু ফেলবে! বলবে—‘বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে মাগির!’”

চোখের পাতা বেয়ে গরম অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তাঁর চিবুকে। কিন্তু... কিন্তু হৃদয় কি কোনোদিন সমাজের এই অঙ্ক মেনেছে? মৌসুমী চোখ মুছে বইটি আবার হাতে তুলে নিলেন। তিনি বইটির পাতার ভেতর নিজের মুখ ডুবিয়ে দিলেন। নতুন ছাপা বইয়ের কাগজের গন্ধের সাথে সাথে সেখানে স্পষ্ট মিশে আছে ইহানের শরীরের সেই পাগল করা ওউড আর চন্দনের সুবাস!

মৌসুমীর চোখের সামনে ভেসে উঠল বিকেলের সেই ক্যাফের দৃশ্য। ইহানের সেই সাদা শার্টের আড়ালে সুগঠিত পৌরুষ, তার কথা বলার সেই বিনীত অথচ আগ্রাসী ভঙ্গি, তার চোখের সেই তীব্র কামনাকুল মুগ্ধতা—যা মৌসুমীকে এক লহমায় পৃথিবীর সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত নারী বানিয়ে দেয়!

মৌসুমী সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে গভীর শ্বাস নিলেন। তাঁর বুকের ভারী খাঁচাটা সাটিনের কাপড়ের নিচে দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। তিনি ভাবলেন, “কেন? আমার কি এই জীবনে এক ফোঁটা পরম সুখ পাওয়ার অধিকার নেই? গত পঁচিশ বছর ধরে আমি কি শুধু একজন আদর্শ স্ত্রী, একজন নিবেদিতপ্রাণ মা আর একজন দায়িত্বশীল সুপারস্টারের মুখোশ পরেই বেঁচে থাকব? ওমর সানি কবে শেষবার আমার হাত ধরে বলেছিল—‘মৌসুমী, আমি তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসি’? কবে শেষবার সে আমার শরীরের প্রতি এমন তীব্র তৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়েছিল? আমার ভেতরের রক্তমাংসের নারী তো মরে যায়নি! আমার দেহ তো কোনো পাথরের স্তূপ নয়!”

তিনি বইটি আলতো করে নামিয়ে রাখলেন নিজের মসৃণ উরুর ওপর। ঠিক সেই মুহূর্তে, নিঝুম বেডরুমের নীরবতা ভেঙে সাইড টেবিলের ওপর রাখা আইফোনটি কেঁপে উঠল—‘টুং’।

মৌসুমী ধীরহাতে ফোনটি তুলে নিলেন। হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনে ইহানের মেসেজ ভেসে উঠেছে: “ম্যাম, নিরাপদে বাড়ি পৌঁছেছেন তো? আপনার ওই নীল শাড়ির মায়া আর আপনার চোখের বিষাদ আজও আমাকে সারা রাত ঘুমাতে দেবে না।”

মৌসুমী ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরলেন। তাঁর কাঁপাকাঁপা আঙুলগুলো স্ক্রিনের কীবোর্ডে গিয়েও থেমে গেল। তিনি খুব ভালো করেই জানেন—তিনি এক ভয়াল, অন্ধকার ও ধ্বংসাত্মক চোরাবালির কিনারে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জানেন, এই নিষিদ্ধ পথের শেষ মাথায় অপেক্ষা করছে এক অতল খাদ—যেখানে পা পিছলে পড়লে তাঁর পরিবার, ক্যারিয়ার আর ব্যক্তিত্বের সবকিছু ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।

কিন্তু সেই অতল খাদের নিচে অনন্ত পতনের যে উন্মাদনাময়, অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক শিহরণ—তা আজ এক মারাত্মক মাদকের মতো মৌসুমীর পুরো শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়েছে। মৌসুমী ইহানের দেওয়া বইটি পরম তৃষ্ণায় নিজের বুকের নরম খাঁচায় আরও শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর ফোঁটাটি গিয়ে পড়ল প্রথম পাতার সেই নীল কালির লেখার ওপর—‘আপনার রেনাতো’।

এটা কি চরম পাপের অনুশোচনা, নাকি বহু বছর পর এক নিষিদ্ধ ভালোবাসার পরশ পাওয়ার তীব্র আনন্দের অশ্রু—মৌসুমী নিজেও আর আলাদা করতে পারছেন না। বাংলা চলচ্চিত্রের তিন দশকের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও অপরাজেয় সম্রাজ্ঞী আজ এক আনাড়ি তরুণের সাজানো কামনার স্ক্রিপ্টে সম্পূর্ণ আটকা পড়ে গেছেন। এবং সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো—তিনি এই স্ক্রিপ্ট থেকে বের হতে চাইছেন না।

[+] 5 users Like Orbachin's post
Like Reply
#26
Moushumi ke Instagram e pathai Instagram... Seen korche ...written has no clue regarding moushumi character ...
Like Reply
#27
Darun
Like Reply
#28
Nice update and keep rocking
Like Reply
#29
Update?
Like Reply
#30
Update?
Like Reply
#31
Update Please!
Like Reply
#32
লেখক কই হারিয়ে গেলেন?
Like Reply




Users browsing this thread: 1 Guest(s)