Thread Rating:
  • 9 Vote(s) - 3.33 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Fantasy মৌসুমী: আমাদের ব্যক্তিগত মালেনা
#1
অধ্যায় ১: রহস্যের গন্ধ ও নতুন প্রস্তাব
এক।
গুলশানের অভিজাত ফ্ল্যাটের বিশাল ড্রয়িংরুমে তখন এক পিনপতন নীরবতা। নভেম্বর মাসের হালকা শীতে ঢাকার বাতাসে এক ধরনের শীতল আমেজ নেমে এসেছে। সন্ধ্যার মিহি অন্ধকার ধীরপায়ে ঢুকে পড়ছে নগরীতে। জানালার ভারী মখমলের পর্দাগুলো সামান্য সরিয়ে দেওয়া হয়েছে; সেখান দিয়ে আসা বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে সোফায় বসে থাকা এক নারীর ওপর।

তিনি আরিফা পারভিন জামান মৌসুমী।

বাংলা চলচ্চিত্রের তিন দশকের একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী, লাখো ভক্তের আদরের ‘প্রিয়দর্শিনী’। মৌসুমীর সামনে মেহগনি কাঠের তৈরি সুন্দর টিপয়-এর ওপর ধপায়মান এক কাপ গরম ব্ল্যাক কফি রাখা। বাষ্প উঠছে সুবাসিত কফি থেকে। কিন্তু সেদিকে তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তাঁর দৃষ্টি সম্পূর্ণ নিবদ্ধ হাতে ধরা একটি স্পাইরাল বাইন্ডিং করা নতুন স্ক্রিপ্টের ওপর।

৫২ বছর বয়সেও তাঁর রাজকীয় উপস্থিতি যেন পুরো ঘরকে এক অদ্ভুত আভায় ভরিয়ে রেখেছে। সময়ের নিপুণ তুলির আঁচড়ে তাঁর বাহ্যিক রূপে পরিবর্তন এসেছে সত্য, কিন্তু কমেছে কি তাঁর তেজ? একদমই না। ক্যারিয়ারের শুরুর সেই ছিপছিপে, চপল গড়ন আজ আর নেই। সময়ের স্বাভাবিক পরিক্রমায় তা এক পরিণত, ভরাট এবং গম্ভীর রূপ নিয়েছে। ৩০ বছর বয়সে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ বা ‘মেঘলা আকাশ’-এর দিনে যে ৩৬-২৭-৩৬ ইঞ্চির জ্যামিতিক ফিগার নিয়ে তিনি রুপালি পর্দা কাঁপাচ্ছন, আজ সেখানে প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মে যোগ হয়েছে মাতৃত্ব, জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞতালব্ধ এক প্রশান্তি।

মৌসুমী নিজের বর্তমান শারীরিক গঠন নিয়ে ভীষণ সচেতন এবং একইসাথে শতভাগ আত্মবিশ্বাসী। ৩৮-৩৬-৪৪ ইঞ্চির (প্রায়) এই ভরাট শরীরে তিনি এখন ধারণ করেন এক রাজকীয় গম্ভীর সৌন্দর্য। ওজন এখন ৭৪ থেকে ৭৮ কেজির মধ্যে ঘোরাফেরা করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান বা ফিটনেস বিশেষজ্ঞরা যাকে বলেন 'এ্যান্ডোমরফ ফ্রেম' (Endomorph frame), মৌসুমী স্বয়ং সেটাকে মনে করেন তাঁর জীবনের অর্জিত আভিজাত্য। এই ‘Regal Fuller Frame’ বা রাজকীয় ভরাট গড়নই এখন তাঁকে সমসাময়িক অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে তোলে। তিনি ভালো করেই জানেন, দর্শকরা এখন আর তাঁকে স্রেফ গ্ল্যামারাস নায়িকা হিসেবে পর্দায় দেখতে চায় না; তারা দেখতে চায় একজন পরিপক্ক, শক্তিশালী অভিনেত্রী হিসেবে।

স্ক্রিপ্টের সাদা পাতায় চোখ বুলাতে বুলাতে তিনি মনে মনে অতীত আর বর্তমানকে মেলাচ্ছিলেন। কত কত বসন্ত পার হয়ে গেছে এই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে! সাফল্যের চূড়ায় উঠেছেন, একসময় যা ধরেছিলেন তা-ই সোনা হয়ে ফুটেছে। আবার পর্দার পেছনের রাজনীতির কদর্য রূপও দেখেছেন। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে শিল্পী সমিতির নির্বাচন, জায়েদ খান ও স্বামী ওমর সানিকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অনভিপ্রেত বিতর্ক—এসব তাঁকে মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ আর ক্লান্ত করেছিল। এফডিসির মেকি কোলাহল আর সস্তা গসিপ থেকে তিনি নিজেকে অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছেন। এখন তিনি চান এমন কাজ, যা তাঁর নাম, ব্যক্তিত্ব এবং অর্জিত সম্মানের সঙ্গে মানানসই হবে।

তাঁর ঠিক উল্টো দিকের সোফায় সোজা হয়ে বসে আছেন ইফতি। বছর পঁচিশের এক প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ পরিচালক। চোখে তাঁর মোটা ফ্রেমের চশমা, গায়ে সাদামাটা সুতি কুর্তা আর জিন্স। ইফতির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে, যদিও ঘরে হালকা শীতের পরশ।

সামনে স্বয়ং ‘প্রিয়দর্শিনী’ বসে আছেন—যিনি একসময় সালমান শাহর বিপরীতে অভিনয় করে কোটি হৃদয়ে ঝড় তুলেছিলেন, যিনি ‘মেঘলা আকাশ’ আর ‘দেবদাস’-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজের ঝোলিতে পুরেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তাঁর সামনে বসে স্ক্রিপ্ট শোনানো চাট্টিখানি কথা নয়। ইফতি ভালো করেই জানে, মৌসুমী ম্যাডাম গত কয়েক বছরে ডজন ডজন স্ক্রিপ্ট ফিরিয়ে দিয়েছেন। তিনি এখন আর যেমন-তেমন কাজ বা সস্তা বাণিজ্যিক সিনেমায় হাত দেন না। চরিত্রের গভীরতা আর ব্যক্তিত্বের মিল না থাকলে তিনি স্রেফ ‘না’ বলে দেন।

কফির বাষ্প কমে এল। মৌসুমী ধীরে ধীরে স্ক্রিপ্টের পাতা উল্টাতে উল্টাতে মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর চোখের সেই গভীরতা আজও ঠিক নব্বইয়ের দশকের মতোই মায়াবী আর তীক্ষ্ণ।

“ইফতি, তাই না?” মৌসুমীর কন্ঠে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর গম্ভীরতার মিশ্রণ।

ইফতি একটু সোজা হয়ে বসলো, কপালে হাত দিয়ে ঘাম মুছে বলল, “জি, ম্যাডাম। আমি ইফতি।”

“তুমি লিখেছ, গল্পের প্রধান চরিত্র ‘মিসেস রেহানা’ একজন সাধারণ গৃহিণী। কিন্তু তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অসাধারণ। সে আগাথা ক্রিস্টি, স্যার আর্থার কোনান ডয়েল আর ফেলুদা পড়তে ভালোবাসে। তাই তো?”

“জি, ম্যাডাম। একদম ঠিক ধরেছেন।” ইফতি দ্রুত মাথা নাড়ল।

মৌসুমী চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে আবার স্ক্রিপ্টে চোখ রাখলেন। “গল্পটা আমাকে সংক্ষেপে তোমার নিজের মুখে শোনাও। আমি দেখতে চাই, তুমি এই চরিত্রটাকে কীভাবে ভিজ্যুয়ালাইজ করছ। পরিচালকের ভিশনটা বোঝা আমার জন্য খুব দরকার।”

ইফতি টিপয়ের পাশে থাকা এক গ্লাস পানি তুলে নিয়ে এক চুমুকে গলাটা ভিজিয়ে নিল। সে জানত, এই মুহূর্তটাই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সে তার চোখের চশমাটা একটু ঠিক করে নিয়ে বলা শুরু করল।

“ম্যাডাম, গল্পের প্রেক্ষাপট ঢাকার উত্তরার একটা শান্ত, অভিজাত কিন্তু নিঝুম পাড়া। গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু ‘মিসেস রেহানা’—অর্থাৎ আপনি। সেখানে থাকেন। স্বামী একজন ব্যস্ত ব্যবসায়ী, কাজের সূত্রে প্রায়ই ঢাকার বাইরে কিংবা বিদেশে থাকেন। একমাত্র ছেলে আর মেয়ে—দুজনেই পড়াশোনা আর চাকরির সূত্রে বিদেশে স্থায়ীভাবে সেটলড। বিরাট ডুপ্লেক্স বাড়িতে রেহানা বড় একা। তবে তার একা লাগাটা কোনো বিষাদ নয়, বরং সে তার এই সময়টাকে উপভোগ করে। সে বারান্দায় বসে থাকে, চা খায়, বই পড়ে আর চোখের চশমার ফাঁক দিয়ে পাড়ার মানুষগুলোর আসা-যাওয়া পর্যবেক্ষণ করে।”

ইফতি একটু থামল। মৌসুমী নীরব, তিনি চোখ বন্ধ করে দৃশ্যটি কল্পনা করার চেষ্টা করছেন।

ইফতি সাহস পেয়ে বলে চলল, “রেহানা শরীরে এবং মনে একজন পরিপক্ক, অভিজাত নারী। তার বয়স বায়ান্ন। সে তার বয়সের ভারিক্কি চালচলন বা শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে বিন্দুমাত্র লজ্জিত বা অস্বস্তিতে ভোগে না। বরং সে সেটাকেই তার ব্যক্তিত্বের একটা শক্তিশালী অংশ বানিয়ে নিয়েছে। শাড়ির আঁচল, হাতের মোটা চুড়ি আর চোখের চশমার আড়াল থেকে সে পুরো দুনিয়াকে এক অন্য দৃষ্টিতে দেখে।”

মৌসুমী মনে মনে মৃদু হাসলেন। চরিত্রটির বর্ণনা যেন হুবহু তাঁর বর্তমান জীবনের সাথে মিলে যাচ্ছে। এই যে তিনি এখন একটু ভারী গড়নের শাড়ি পরেন, মার্জিত সাজসজ্জা করেন, চুলে এক ধরনের আভিজাত্যের ছাপ রাখেন—পরিচালক সেটাকেই চমৎকারভাবে গল্পের ক্যানভাসে কাজে লাগাতে চাইছেন।

“তারপর?” মৌসুমী চোখের ইশারায় ইফতিকে এগিয়ে যেতে বললেন।

“গল্পের টার্নিং পয়েন্ট আসে যখন পাড়ার মোড়ের সেই বিখ্যাত মিষ্টির দোকান—‘মায়ের দোয়া স্টোর’-এ এক নিঝুম রাতে একটা বড় চুরির ঘটনা ঘটে। দোকানমালিকের সারাজীবনের সঞ্চয়, ক্যাশ বাক্সের টাকা আর পেছনের সিন্দুক ভেঙে মূল্যবান জিনিসপত্র উধাও হয়ে যায়। পরদিন সকালে পুলিশ আসে, গতানুগতিক তদন্ত শুরু করে। তারা পাড়ার এক পুরোনো ছিঁচকে চোরকে সন্দেহ করে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু রেহানার মনে খটকা লাগে। পুলিশের এই থিওরি তার একদম পছন্দ হয় না।”

“কেন? খটকা লাগার কারণ কী?” মৌসুমীর কৌতূহল বাড়ল।

“কারণ,” ইফতি হাসল, “রেহানা সে রাতে বারান্দায় বসে বই পড়ছিল। রাত দুইটায় সে যখন বাইরে তাকায়, দেখে টিপ টিপ বৃষ্টি হচ্ছিল। কিন্তু চুরির জায়গা থেকে যে টিনের চালের কথা পুলিশ বলছে, সেখানে বৃষ্টি পড়লে তো একরকম শব্দ হওয়ার কথা। তাছাড়া সে রাতে পাড়ার তিনটা কুকুর একসঙ্গে ডাকছিল না, ডেকেছিল শুধু একটা কুকুরের বিশেষ সুরে। এই ছোট ছোট অসঙ্গতি তাকে গভীরভাবে ভাবায়। রেহানা বুঝতে পারে, পুলিশ ভুল পথে হাঁটছে। আসল অপরাধী অন্য কেউ, এবং সে খুব কাছেরই লোক। তাই রেহানা সিদ্ধান্ত নেয়, সে নিজেই এর গোপন সমাধান খুঁজবে।”

মৌসুমী কফির কাপে একটা ছোট চুমুক দিলেন। “আকাঙ্ক্ষনীয় গল্প। কিন্তু একা একজন বায়ান্ন বছর বয়সের নারীর পক্ষে তো আর রাস্তায় নেমে ডিটেকটিভগিরি করা সম্ভব নয়। পুলিশের চোখ এড়িয়ে সে কীভাবে তথ্য জোগাড় করবে? তার তো একজন সহযোগী দরকার। একটা ‘তপসে’ দরকার।”

ইফতি উৎসাহিত হয়ে উঠল। “একদম পয়েন্টে ধরেছেন ম্যাডাম! এখানেই গল্পের আসল ম্যাজিক। আপনার সহযোগী বা আপনার ‘পার্টনার ইন ক্রাইম’ হলো আপনার পাশের ডুপ্লেক্সের নতুন ভাড়াটে—২১ বছরের এক ছোকরা। নাম ‘আয়ান’।”

“২১ বছরের ছেলে?” মৌসুমী একটু ভুরু কোঁচকালেন। “আমার তপসে কি কোনো সমবয়সী বন্ধু হতে পারত না?”

“না ম্যাডাম,” ইফতি দ্রুত ব্যাখ্যা করল। “আয়ান ভার্সিটিতে পড়ে। সারাদিন কানে হেডফোন গুঁজে থাকে, অনলাইন গেমিং, ড্রোন প্রযুক্তি আর সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে মেতে থাকে। বাহ্যিকভাবে সে একদম আজকের জেন-জি (Gen-Z) যুগের প্রতিনিধি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেও আপনার মতোই চরম রহস্যপিপাসু। সে শার্লক হোমসের ফ্যান, ক্রাইম থ্রিলার সিরিজ দেখে দিনরাত পার করে। শুরুতে আপনাদের মধ্যে জেনারেশন গ্যাপের কারণে চরম খটমট লাগে। আপনি তাকে ‘বেয়াদব, ডিজিটাল প্রজন্মের ছোকরা’ ভাবেন, আর সে আপনাকে ‘ব্যাকডেটেড, খিটখিটে আন্টি’ ভেবে এড়িয়ে চলে।”

মৌসুমী শব্দ করে হেসে ফেললেন। সেই হাসিতে যেন পুরো ড্রয়িংরুমের গম্ভীর পরিবেশ এক লহমায় হালকা হয়ে গেল। “তারপর? খটমটটা কীভাবে বন্ধুত্বে রূপ নেয়?”

“তারপর একদিন সিঁড়িতে বা বারান্দায় দেখা,” ইফতি সাবলীলভাবে বলে যেতে লাগল। “আপনি তাকে শার্লক হোমসের একটা লজিক্যাল ভুল নিয়ে খোঁচা দেন। সেও মেজাজ হারিয়ে পাল্টা জবাব দেয় ব্যোমকেশ বক্সীর সাইকোলজি নিয়ে। ব্যস! দুজন রহস্যপ্রেমীর মাথার তার জুড়ে যায়। আপনারা বুঝতে পারেন, আপনারা দুজন দুজনকে সম্পূরক করতে পারেন। আপনি আপনার জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, গভীর মানবিক পর্যবেক্ষণ আর তীক্ষ্ণ মেধা দিয়ে ক্লু বের করেন; আর সে তার তরুণ বয়সের এনার্জি, ড্রোন প্রযুক্তি, হ্যাকিং আর দৌড়ঝাঁপ দিয়ে সেটা প্রুফ করে।”

ইফতি একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। “ম্যাডাম, আপনারা দুজনে যখন তদন্তে নামবেন, তখন আপনাদের সম্পর্কটা আর সস্তা ‘আন্টি-ভাতিজা’র জায়গায় থাকবে না। সেটা হয়ে উঠবে চমৎকার এক নিখাদ বন্ধুত্বের। অনেকটা ফেলুদা আর তোপসের সম্পর্কের মতো, কিন্তু একদম নতুন মোড়কে—যেখানে ফেলুদা হলেন একজন বায়ান্ন বছর বয়সী সুতি শাড়ি পরা অভিজাত শৌখিন গৃহিণী, আর তোপসে হলো টি-শার্ট আর ছিঁড়ে যাওয়া জিন্স পরা এক একুশ বছরের জেন-জি তরুণ।”

মৌসুমী শান্ত হয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। চোখের সামনে যেন একটা সেলুলয়েডের দৃশ্য ভেসে উঠছে।

দীর্ঘদিন পর এমন একটা স্ক্রিপ্ট তিনি শুনছেন যা তাঁকে সত্যিই দোলা দিচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে তাঁকেও তো একই ধরনের টাইপকাস্ট চরিত্রে প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছিল—হয় নায়ক-নায়িকার মা, না হয় কোনো কান্নাকাটি করা দুঃখিনী নারী। কিন্তু এই ‘মিসেস রেহানা’ চরিত্রটির জন্য তাঁকে কোনো মেকআপের প্রলেপ দিয়ে বয়স লুকাতে হবে না। জিম করে জোর করে মেদ ঝরিয়ে ১৮ বছরের কিশোরী সাজতে হবে না। তাঁর বর্তমান ওজন, তাঁর চোখের নিচের হালকা বয়সের ছাপ, তাঁর চিবুকের গাম্ভীর্য, তাঁর ‘Regal Fuller Frame’—সবকিছুই এই রহস্যময়ী অথচ সাধারণ গৃহিণী চরিত্রটির জন্য একদম নিখুঁত। এখানে তাঁর গ্ল্যামার নয়, বরং তাঁর মগজ, উপস্থিতি আর ব্যক্তিত্বই হবে মূল অস্ত্র।

“গল্পের ক্লাইম্যাক্সটা কীভাবে ভেবেছ?” মৌসুমী চশমাটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

“ক্লাইম্যাক্সে আপনারা দুজন আবিষ্কার করবেন, এই মিষ্টির দোকানের চুরিটা স্রেফ সামান্য কোনো অর্থচুরি নয়। এর পেছনে জড়িয়ে আছে ওই এলাকার এক প্রভাবশালী পাচারকারী চক্রের বিশাল নেটওয়ার্ক। আর সেটা উন্মোচন করতে গিয়ে আপনারা দুজনেই মুখোমুখি হবেন চরম বিপদের। জীবনের ঝুঁকি তৈরি হবে। তখন একদিকে আপনার ঠান্ডা মাথার অভিজ্ঞতা আর অন্যদিকে আয়ানের ডিজিটাল মেধা—এই দুটোর সমন্বয়ে আপনারা কেসটা সলভ করবেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, পুলিশ আসার আগেই আপনারা সমাধানটা পুলিশের হাতে এমনভাবে তুলে দেবেন যেন পুলিশই বাহবা পায়। আপনারা নিজেদের ফোকাসে আনবেন না, বরং বারান্দায় বসে এক কাপ চা আর কোকা-কোলা হাতে দুজনে উদযাপিত করবেন নিজেদের সেই গোপন বিজয়।”

ইফতি কথা শেষ করে থামল। সে বুক ভরে শ্বাস নিল। তার চোখ জোড়া এখন মৌসুমীর মুখের প্রতিটি অভিব্যক্তি পড়ার চেষ্টা করছে।

ড্রয়িংরুমে আবার কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা।

মৌসুমী আস্তে করে চশমাটা টিপয়ের ওপর রাখলেন। কফির ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া কাপটার দিকে তাকালেন, তারপর ইফতির দিকে সোজা দৃষ্টি পাত করলেন।

“স্ক্রিপ্টটা আমার সত্যি খুব পছন্দ হয়েছে, ইফতি। অনেক দিন পর সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে এমন একটা খাঁটি আর রিফ্রেশিং আইডিয়া শুনলাম। বিশেষ করে এই অসম বয়সের অদ্ভুত বন্ধুত্বের কনসেপ্টটা। আমাদের চলচ্চিত্রে নারীকে সবসময়ই পুরুষদের অধীনস্ত অথবা স্রেফ রোমান্টিক অবজেক্ট হিসেবে দেখা হয়। বয়স ৫০ পার হলেই অভিনেত্রীদের ঝুলিতে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু বায়ান্ন বছর বয়সের একজন নারীকে এভাবে বুদ্ধিমান, স্বাধীন আর একটি থ্রিলারের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে উপস্থাপন করার ভাবনাটা সত্যি প্রশংসনীয়।”

ইফতির মুখে যেন এক চিলতে রোদ হেসে উঠল। “তার মানে... ম্যাডাম, আপনি রাজি?”

“আমি নীতিগতভাবে রাজি,” মৌসুমী একটু বিরতি দিলেন। “আমি ‘খায়রুন সুন্দরী’র মতো গ্রামীণ নারী হয়ে দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছি, ‘এক কাপ চা’-তে অতিথি হয়েছি, নানা সামাজিক ড্রামায় কাজ করেছি। কিন্তু এমন ‘আরবান ডিটেকটিভ’ তো হওয়া হয়নি। তবে...”

“তবে কী ম্যাডাম?” ইফতি উৎসুক হয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইল।

“আমার একটা বড় প্রশ্ন আর শর্ত আছে,” মৌসুমী তাঁর একটি আঙুল তুলে ইফতিকে থামালেন।

“বলুন ম্যাডাম, আপনার যেকোনো শর্ত আমরা মেনে নেব।”

“এই যে ২১ বছরের তরুণ চরিত্রটি—‘আয়ান’,” মৌসুমীর গলায় আবার সেই সতর্ক গাম্ভীর্য। “এই চরিত্রে কে অভিনয় করছে? এটা কিন্তু মোটেও সাধারণ কোনো কাস্টিং নয়। কারণ পুরো সিনেমাটার প্রাণ নির্ভর করছে আমার আর তাঁর রসায়ন বা স্ক্রিন কেমিস্ট্রির ওপর। যদি তার অভিনয়ের গভীরতা না থাকে, আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস না থাকে, তবে আমি যতই চেষ্টা করি না কেন, সিনেমাটা দর্শকরা গিলবে না। কে সে? ইন্ডাস্ট্রির কোনো পরিচিত মুখ?”

কথাটি বলতে বলতেই মৌসুমীর চোখের সামনে ভেসে উঠল এফডিসির সাম্প্রতিক কিছু জঘন্য রাজনীতির অভিজ্ঞতা। কাদা ছোঁড়াছুড়ি, সস্তা পাবলিসিটি স্টান্ট আর অহংকারের লড়াই। তিনি স্পষ্ট করে নিতে চান, নতুন কোনো অপেশাদার বা বিতর্কিত মানুষের সাথে কাজ করে তিনি তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ভাবমূর্তি নষ্ট করবেন না।

ইফতি একটু ইতস্তত করল। চশমাটা খুলে কাপড়ে মুছল, তারপর বলল, “ম্যাডাম, আমরা এই চরিত্রের জন্য ইন্ডাস্ট্রির কোনো প্রতিষ্ঠিত হিরোকে নিচ্ছি না।”

“কেন?” মৌসুমীর ভুরু সামান্য কুঁচকে গেল।

“কারণ আমরা চেয়েছি চরিত্রটা একদম রিয়ালিস্টিক হোক। কোনো প্রতিষ্ঠিত স্টারের ইমেজ যেন ‘আয়ান’ চরিত্রটাকে গিলে না ফেলে। আমরা একদম নতুন একটা ছেলেকে কাস্ট করেছি। যার আসল বয়সই একুশ বছর। সে থিয়োটার ব্যাকগ্রাউন্ডের ছেলে, আবৃত্তি করে, তবে সিনেমায় এটাই তার প্রথম কাজ। আমরা ওর মধ্যে এক ধরনের নিখাদ অকৃত্রিমতা পেয়েছি।”

“একেবারে নতুন ছেলে?” মৌসুমী কিছুটা সংশয় প্রকাশ করলেন। “এটা তো বড় একটা রিস্ক হয়ে যাচ্ছে না, ইফতি? আমার মতো এত বছরের অভিজ্ঞ একজন অভিনয়শিল্পীর সামনে দাঁড়িয়ে সে কি সংলাপে স্পন্টেনিটি ধরে রাখতে পারবে? নাকি নার্ভাস হয়ে পুরো সিন মাটি করবে?”

“সেটা আপনি ওকে দেখলেই বুঝতে পারবেন ম্যাডাম,” ইফতি দৃঢ়তার সাথে বলল। “ছেলেটা অসম্ভব ট্যালেন্টেড। আমরা টানা দুই মাস তার অডিশন আর ওয়ার্কশপ নিয়েছি। ওর নাম ‘ইহান’। আমি ভাবছিলাম, আপনি যদি গল্পের প্রাইমারি গ্রিন সিগন্যাল দেন, তবে আমরা একটা আড্ডার আয়োজন করব। আপনি, আমি, আমাদের প্রযোজক আর ইহান এক সাথে বসব। আপনি কথা বলে দেখুন। আপনার যদি ১% মনে হয় যে সে পারবে না, আমরা সাথে সাথে কাস্টিং বদলে ফেলব। সিদ্ধান্ত শতভাগ আপনার।”

মৌসুমী তরুণ পরিচালকের এই পেশাদারিত্ব আর আত্মবিশ্বাস দেখে মনে মনে কিছুটা প্রভাবিত হলেন।

“ঠিক আছে,” মৌসুমী মাথা নেড়ে সায় দিলেন। “তাই হোক। আয়োজন করো। আমি ছেলেটাকে সামনাসামনি দেখতে চাই। মনে রেখো ইফতি, ফেলুদার যেমন তোপসেকে ছাড়া চলে না, আমার ‘মিসেস রেহানা’রও কিন্তু একদম পারফেক্ট তোপসে চাই। ভুল মানানসই লোক হলে কিন্তু আমি প্রথম দিনই প্রজেক্ট প্যাক-আপ করে দেব।”

“ধন্যবাদ ম্যাডাম! একদম কথা দিচ্ছি, আপনার নিরাশ হওয়ার সুযোগ নেই,” ইফতি আনন্দে বিগলিত হয়ে বলল।


দুই।

তিন দিন পরের কথা। স্থান: গুলশানেরই একটি অত্যন্ত পরিচিত ও আভিজাত্যপূর্ণ রেস্তোরাঁ—‘দ্য অলিভ গার্ডেন’। রেস্তোরাঁর ভেতরের পরিবেশটা বেশ শান্ত, মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় ধাঁচে সাজানো। হালকা মেহগনি আলোর আবহে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে সফট ক্লাসিক্যাল ভায়োলিনের সুর। রেস্তোরাঁর একদম পেছনের প্রাইভেট লাউঞ্জ রুমটি আজকের সন্ধ্যার জন্য পুরোপুরি বুক করা হয়েছে। সময় তখন রাত পৌনে আটটা।

রেস্তোরাঁর কাঁচের দরজা ঠেলে যখন মৌসুমী প্রবেশ করলেন, তখন পুরো লাউঞ্জে যেন এক অদৃশ্য বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল। সেখানে থাকা ওয়েটার থেকে শুরু করে কোণায় বসে থাকা অতিথিরা—সবার দৃষ্টি এক লহমায় তাঁর দিকে নিবদ্ধ হলো।

তিনি আজ পরেছেন রাজকীয় গাঢ় নীল রঙের হাতে বোনা খাঁটি জামদানি শাড়ি। আঁচলে আর পাড়ে সূক্ষ্ম রুপালি সুতোর কাজ। গলায় ও কানে হালকা মানানসই হিরের গয়না। চুলগুলো পেছনে একটা মার্জিত খোঁপায় বাঁধা, দু-একটা রূপালি চুল যেন তাঁর অভিজ্ঞতার স্মারক হিসেবে সযত্নে রাখা। বায়ান্ন বছর বয়সেও তাঁর ত্বকের স্বাভাবিক সজীবতা আর চোখের অন্তর্ভেদী দীপ্তি পুরো আবহকে থমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

৭৬ কেজি ওজনের ভরাট শরীরটা জামদানির আভিজাত্যে আবৃত হয়ে এক অপূর্ব মাতৃত্বপূর্ণ অথচ অদম্য সৌন্দর্যের স্বাক্ষর বহন করছে। তিনি যখন হেঁটে আসেন, তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে এক ধরনের রাজকীয় স্বাচ্ছন্দ্য প্রতিফলিত হয়।

লাউঞ্জের ভেতরে তিনজন লোক আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। মৌসুমীকে ভেতরে ঢুকতে দেখে তিনজনই তড়িৎগতিতে নিজের জায়গা থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। পরিচালক ইফতি, প্রবীণ চলচ্চিত্র প্রযোজক জনাব আজিম চৌধুরী, আর একবারে কোণায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘদেহী তরুণ।

প্রযোজক আজিম চৌধুরী তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এলেন। সালাম দিয়ে বললেন, “আসসালামু আলাইকুম ভাবি! কেমন আছেন? কতদিন পর আপনার সাথে দেখা!” আজিম সাহেব নব্বইয়ের দশকের নামকরা প্রযোজক, মৌসুমীর স্বামী অভিনেতা ওমর সানির অত্যন্ত পুরোনো এবং বিশ্বস্ত বন্ধু।
মৌসুমী মার্জিত হাসিতে উত্তর দিলেন, “ওয়ালাইকুম আসসালাম আজিম ভাই। ভালো আছি। আপনি তো আজকাল সিনেমা থেকে অনেক দূরে, হঠাৎ এই নতুন প্রজেক্টে প্রযোজক হয়ে ফিরে এলেন যে?”

আজিম চৌধুরী একটু হেসে জবাব দিলেন, “কী করব বলুন ভাবি? এই তরুণ ছেলে ইফতি যখন গল্পটা নিয়ে আমার কাছে এল, শুনে মনটা এক মুহূর্তে কেড়ে নিল। আর যখন শুনলাম প্রধান চরিত্রে আপনি ছাড়া অন্য কাউকে চিন্তা করা যাচ্ছে না এবং আপনি প্রাথমিক সম্মতি দিয়েছেন—তখন ভাবলাম এমন একটা ভালো কাজের অংশ না হয়ে থাকাটা ভুল হবে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এখন ভালো গল্পের বড্ড অভাব।”

ইফতি পাশ থেকে এগিয়ে এসে বলল, “ম্যাডাম, আসুন। বসুন প্লিজ।” মৌসুমী নির্ধারিত সোফায় গিয়ে বসলেন। তাঁর হাতের দামী ব্যাগটি পাশে রেখে তিনি সোজা তাকালেন কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা তরুণটির দিকে।

ছেলেটি লম্বায় প্রায় ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি। ছিপছিপে শক্ত শরীর। ত্বকের রং ফর্সা, পরিচ্ছন্ন ক্লিন শেভ করা মুখমণ্ডল, চুলগুলো আধুনিক কিন্তু রুচিশীল কায়দায় ছাঁটা। তার পরনে একটা নেভি ব্লু কালারের ফুল হাতা টি-শার্ট আর বেইজ কালারের ট্রাউজার। ছেলেটির চোখেমুখে স্পষ্ট নার্ভাসনেস বা এক ধরনের কম্পন কাজ করছে। সে তার দুই হাত পেছনে মুড়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ইফতি ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ইশারা করল। “ম্যাডাম, ও-ই ইহান। আমাদের গল্পের ‘আয়ান’।”

ইহানের বুকটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। এতকাল যাকে সে টিভির পর্দায়, বড় ক্যানভাসে আর সিনেমা হলে দেখে এসেছে, সেই জীবন্ত কিংবদন্তি ‘প্রিয়দর্শিনী’ মৌসুমী আজ তাঁর মাত্র তিন ফুট দূরত্বে বসে আছেন!

ইহান অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে হাঁটু গেড়ে মৌসুমীর পায়ের কাছে হাত রেখে সালাম করতে গেল। মৌসুমী সাধারণত এভাবে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার সংস্কৃতি ব্যক্তিগত জীবনে খুব একটা পছন্দ করেন না, কিন্তু এই তরুণটির ভঙ্গি এত সাবলীল, শালীন আর শ্রদ্ধাপূর্ণ ছিল যে তিনি বাধা দিলেন না।

“আসসালামু আলাইকুম, ম্যাম,” ইহানের গলার স্বর সামান্য কাঁপছিল। “আমি ইহান। ম্যাম, আমি আপনার কতটা বড় ভক্ত তা হয়তো মুখে বলে বোঝাতে পারব না। ছোটবেলায় আম্মুর সাথে বসে ড্রয়িংরুমে ভি সি আর-এ আপনার সিনেমা দেখতাম। আজ আপনার সামনে দাঁড়াতে পেরে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না।”

মৌসুমী তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলেটিকে কয়েক সেকেন্ড পর্যবেক্ষণ করলেন। ২১ বছর বয়স। মুখমণ্ডলে এক ধরনের সরলতা আছে, তবে চোখের কোণে বুদ্ধিমত্তা আর স্পর্ধার একটা মিষ্টি ছাপ দৃশ্যমান। আর এই দ্বৈত ভাবটাই ‘আয়ান’ চরিত্রের মূল প্রাণ।

“বসো, ইহান,” মৌসুমী পাশের খালি চেয়ারটি দেখিয়ে শান্ত স্বরে বললেন।

ইহান বসল, তবে সোফার একদম এক কোণে শরীর সংকুচিত করে।

মৌসুমী নিজের ভেতরে জমে থাকা কঠোর ভাবটা একটু আলগা করলেন। ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটিয়ে বললেন, “এত নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই, ইহান। আমরা এখানে কোনো তারকার ইন্টারভিউ নিতে আসিনি। আমরা এখানে সহকর্মী হিসেবে গল্প করতে এসেছি। তুমি কি সিনেমাটির মূল প্লট আর তোমার চরিত্রটা সম্পর্কে জেনেছ?”

ইহান একটু শক্ত হয়ে বসল, নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “জি, ম্যাম। ইফতি ভাই আমাকে পুরো স্ক্রিপ্টটা পড়িয়েছেন। আমি চারবার পড়েছি।”

“তাহলে তো তুমি জানো, তোমার ক্যারেক্টারটা কতটা ট্রিকি,” মৌসুমীর চোখ দুটি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে উঠল। “তুমি এখানে স্রেফ একটা মিষ্টি তরুণ নও। তুমি এই যুগের জেন-জি প্রজন্যের রিপ্রেজেন্টেটিভ। তোমাকে আমার চরিত্রের সাথে পর্দায় রীতিমতো টেক্কা দিতে হবে। আমার যুক্তিগুলোকে নস্যাৎ করতে হবে, আমার সনাতন পর্যবেক্ষণকে ‘পুরোনো আমলের’ বলে খোঁচা দিতে হবে। তুমি কি আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সেই সংলাপগুলো বলতে পারবে? নাকি আমার ইমেজের সামনে তুমি জড়সড় হয়ে থাকবে?”

ঘরজুড়ে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। আজিম চৌধুরী আর ইফতি উদ্বেগের সাথে ইহানের দিকে তাকালেন। ইহান কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। সে অনুভব করল, এটা স্রেফ কোনো সাধারণ প্রশ্ন নয়—এটা একজন কিংবদন্তি অভিনেত্রীর পক্ষ থেকে তার অভিনয়ের যোগ্যতা পরীক্ষার প্রথম টেস্ট।

ইহান একটা গভীর শ্বাস নিল। সে তার ভেতরের ভীতি আর ফ্যান বয় ভাবমূর্তিকে জোর করে দূরে ঠেলে দিল। তার চোখের পলক স্থির হয়ে গেল। নার্ভাস ভাবটা যেন এক লহমায় ভেল্কির মতো উবে গেল। তার অবয়বে ফুটে উঠল গল্পের সেই অবাধ্য অথচ তীক্ষ্ণ তরুণ ‘আয়ান’।

সে মৌসুমীর চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। একদম নির্ভীক, কিন্তু চরম মার্জিত গলায় বলল:

“ম্যাম, যদি স্ক্রিপ্ট আর পরিস্থিতির খাতিরে আয়ান মনে করে যে মিসেস রেহানা ভুল আর আয়ান নিজে ডিজিটাল লজিক দিয়ে ঠিক—তবে আয়ান হিসেবে আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে যুক্তি তুলে ধরতে আমার এক সেকেন্ডও ইতস্তত হবে না। কারণ আয়ান তো তার ড্রোন, স্মার্টফোন আর অ্যালগরিদম ছাড়া কিছু বোঝে না। তার কাছে তো আপনার এনালগ মেথড আর অনুমানের ওপর ভিত্তি করে গোয়েন্দাগিরি কিছুটা হাস্যকর লাগবেই! আর আমি যদি আয়ান হতে না পারি, তবে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করার কোনো যোগ্যতা আমার নেই।”

শব্দগুলো লাউঞ্জের বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলো।

ইফতি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। আজিম সাহেবের মুখে মুচকি হাসি।

মৌসুমী কয়েক সেকেন্ড ইহানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তাঁর পুরো মুখে এক বিচ্ছুরিত হাসি ছড়িয়ে পড়ল। তিনি দু-হাত তুলে আলতো হাততালি দিলেন।

“ব্রিলিয়ান্ট! ভেরি গুড!” মৌসুমীর কণ্ঠে আন্তরিক প্রশংসার সুর। “এই কনফিডেন্সটাই আমি দেখতে চাইছিলাম, ইহান! একজন অভিনেতার আসল শক্তি হলো সে ক্যামেরা বা তার সহশিল্পীর তারকাখ্যাতি দেখে দমে যাবে না, সে চরিত্রের ভেতর ঢুকে যাবে। তুমি সেটা কয়েক সেকেন্ডে করে দেখালে।”

ইহানের কাধের ভারী বোঝাটা যেন নেমে গেল। সে কৃতজ্ঞতায় মাথা নোয়াল। “থ্যাঙ্ক ইউ, ম্যাম।”

ওয়েটার এসে কফি, চিকেন স্যাটে আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই দিয়ে গেল। পরিবেশটা এখন অনেক বেশি সহজ আর উষ্ণ হয়ে উঠেছে। মৌসুমী কফির কাপ তুলে নিয়ে কফিতে সামান্য চুমুক দিলেন। তারপর টেবিলের সবার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট আর গম্ভীর গলায় বললেন: “শোনো ইফতি, আজিম ভাই এবং ইহান—কাজটা শুরু করার আগে আমার কিছু নীতিগত স্পষ্ট শর্ত আছে। এগুলো মানলে তবেই আমরা শুটিং ফ্লোরে যাব।”

“বলুন ভাবি, আমরা শুনছি,” আজিম চৌধুরী মনোযোগ দিলেন।

“প্রথমত,” মৌসুমী কফির কাপটা রাখলেন। “শুটিংয়ের সময় সেটে কোনো ধরনের নোংরা পলিটিক্স, দলাদলি বা কাদা ছোঁড়াছুড়ি আমি এক চুলও সহ্য করব না। এফডিসির ভেতরের ওই সস্তা ট্র্যাশ রাজনীতি আর ব্যক্তিগত কাদা ছোঁড়াছুড়ি থেকে আমি নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়েছি। আমি শান্তিতে কাজ করতে চাই। সেটে শুধু আর্ট আর কাজের আলোচনা হবে।”

তিনি ইহানের দিকে তাকালেন। “দ্বিতীয়ত, ইহান, তুমি একদম নতুন। তোমার সামনে অনেক পথ। খবরের কাগজ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাকে নিয়ে, আমার অতীত নিয়ে, কিংবা জায়েদ-ওমর সানি ইস্যুর মতো পুরোনো অনভিপ্রেত বিতর্ক নিয়ে অনেক গসিপ দেখবে। শুটিং সেটে বা বাইরে সংবাদমাধ্যমের সামনে এসব ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কোনো কথা বা গসিপ আমি একদম পছন্দ করি না। তোমার ফোকাস থাকবে শতভাগ অভিনয়ে। তুমি কাজ দিয়ে চিনাবে নিজেকে, সস্তা পাবলিসিটি দিয়ে নয়।”

ইহান গভীর শ্রদ্ধার সাথে উত্তর দিল, “ম্যাম, আমি আপনাকে নিশ্চিত করছি, আমি এখানে কোনো গসিপ বা সস্তা নাম কামাতে আসিনি। আমি থিয়েটার থেকে এসেছি, অভিনয়ের ব্যাকরণকে সম্মান করতে শিখেছি। আপনার মতো একজন আন্তর্জাতিক মানের অভিনেত্রীর সাথে স্ক্রিন শেয়ার করার সুযোগ পাওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লার্নিং প্রসেস। আমি আমার কাজের প্রতি শতভাগ সৎ থাকব।”


মৌসুমী হাসলেন। ছেলেটির সুশিক্ষিত আর শালীন কথোপকথন তাঁর বেশ মনঃপূত হলো। বর্তমান যুগের অনেক নতুন অভিনেতার মধ্যে যে ধরনের উদ্ধত আর বেপরোয়া ভাব দেখা যায়, ইহানের মধ্যে তার ছিটেফোঁটাও নেই। থিয়েটারের সুশৃঙ্খল চর্চা হয়তো তাকে এই ব্যক্তিত্ব দিয়েছে।
[+] 9 users Like Orbachin's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#2
Darun
Like Reply
#3
তিন

“এবার কাজের কথায় আসি,” মৌসুমী চশমাটা পরে নিয়ে বললেন। “ইফতি, শুটিং লোকেশন আর কস্টিউম নিয়ে তোমার কী পরিকল্পনা?”

ইফতি তার ডায়েরি খুলে বলল, “ম্যাডাম, আমরা উত্তরার ৮ নম্বর সেক্টরে একটা পুরোনো আমলের বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়ি ফাইনাল করেছি। বাড়িটার মধ্যে এক ধরনের ক্লাসিক আর রাজকীয় আভা আছে, আবার কিছুটা নির্জনতাও আছে। ওখানে আপনার আর আয়ানের ফ্ল্যাট সেট করা হবে। আর চুরির দৃশ্য এবং পুরান ঢাকার রিকনস্ট্রাকশন সিনগুলো আমরা সত্যি পুরান ঢাকার 'মায়ের দোয়া স্টোর' আর তার আশপাশের গলিগুলোতে শুট করব—একদম রিয়েল লোকেশনে, মধ্যরাতে।”

“উত্তম,” মৌসুমী মাথা নাড়লেন। “তবে মিসেস রেহানার কস্টিউম আর মেকআপ নিয়ে আমার কিছু নিজস্ব ভাবনা আছে। আমি চাই এই চরিত্রটিকে যেন একদম খাঁটি, মাটিঘেঁষা অথচ আভিজাত্যপূর্ণ মনে হয়।”

“আপনার আইডিয়াটা শুনতে চাই ম্যাম,” ইফতি বলল।

“আমরা কোনো মেকআপ প্রলেপ দিয়ে আমার বয়স ঢাকার চেষ্টা করব না,” মৌসুমী সোজাসুজি বললেন। 

“চোখের কোণের হালকা ভাজ, চিবুকের নিচের মাতৃত্বের ছাপ—এগুলোই হবে মিসেস রেহানার শক্তি। আমি সাধারণ সুতি বা তাঁতের শাড়ি পরব—যেমন ধরো সুতি জামদানি, টাঙ্গাইলের সুতি শাড়ি। ব্লাউজগুলো হবে একটু ঢোলা আর মার্জিত। গহনা বলতে হাতে থাকবে শুধু মেহগনি বা কাঠের চুড়ি, না হয় একটা মোটা বাউটি। আর চোখে থাকবে একটা চওড়া ফ্রেমের চশমা, যা আমি থ্রিলারের সময় নাকের ডগায় নামিয়ে আনব। মেকআপ হবে একদম মিনিমাল—বলতে পারো অলমোস্ট নো-মেকআপ লুক। দর্শকরা যেন আমাকে স্ক্রিনে দেখে কোনো ফ্যান্টাসির নায়িকা না ভাবে, তারা যেন মনে করে—এ তো আমাদেরই পাশের বাসার একজন বিদুষী, শান্ত কিন্তু প্রখর বুদ্ধিমতী আন্টি!”

“ওয়ান্ডারফুল!” ইফতি উত্তেজিত হয়ে খাতায় দ্রুত নোট লিখে নিল। 

“ম্যাডাম, আপনি যেভাবে ক্যারেক্টারটাকে ওউন করছেন, এতে গল্পটার প্রাণ একশো গুণ বেড়ে গেল।”


“আর ইহানের পোশাক?” মৌসুমী ইহানের দিকে তাকালেন।


“ও পরবে সাধারণ গ্রাফিক টি-শার্ট, আলগা শার্ট, আর ঢোলা জিন্স। কানে এয়ারপডস ঝুলবে সবসময়,” ইফতি বলল।

“গুড। visual contrast-টা খুব সুন্দর হবে,” মৌসুমী মন্তব্য করলেন। 

“একটি দৃশ্যে যখন সুতি শাড়ি পরা বায়ান্ন বছরের এক পরিণত নারী আর টি-শার্ট পরা একুশ বছরের তরুণ পাশাপাশি হেঁটে কোনো ক্রাইম সিন পরীক্ষা করবে, সেই ফ্রেমটাই দর্শককে আটকে রাখবে।”


কথা চলতে চলতে ঘড়ির কাঁটা রাত নটার ঘর ছুঁল। টেবিলে কফির কাপগুলো খালি হয়ে এসেছে। পরিবেশ জুড়ে এখন এক ধরনের ইতিবাচক আর সৃষ্টিশীল কাজের উত্তেজনা। দীর্ঘ তিন দশকের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে মৌসুমী কত শত চরিত্র করেছেন! ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’-এর সেই চপল বালিকা রেশমি থেকে শুরু করে ‘মেঘলা আকাশ’-এর প্রতিবাদী নারী, ‘দেবদাস’-এর চিরন্তন চন্দ্রমুখী কিংবা ‘খায়রুন সুন্দরী’র গ্রামীণ ট্র্যাজিক নায়িকা। তিনি প্রেমিকা হয়েছেন, বিরহী স্ত্রী হয়েছেন, আদর্শ মা হয়েছেন, আবার কখনো রূপালী পর্দার আইকন হয়েছেন।

কিন্তু আজ, ৫২ বছর বয়সে এসে, তিনি অনুভব করছেন—এই ‘মিসেস রেহানা’ চরিত্রটি তাঁর জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। এখানে তাকে কোনো পুরুষ তারকার ছায়াতলে থাকতে হচ্ছে না, কিংবা কোনো কৃত্রিম গ্ল্যামার প্রদর্শন করতে হচ্ছে না। এখানে তাঁর প্রধান অস্ত্র হবে তাঁর জীবনলব্ধ মেধা, অভিজ্ঞতার ভার, এবং রূপালী পর্দায় নিজের স্থান পুনর্দখল করার এক নীরব আত্মবিশ্বাস।

রেস্তোরাঁর বাইরে তখন হালকা টিপ টিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। শীতে আর্দ্র ঢাকার রাস্তাগুলো সোডিয়াম বাতির আলোয় ভিজে চকচক করছে। সবাই টেবিল থেকে উঠে দাঁড়াল।

আজিম চৌধুরী হাত বাড়িয়ে বললেন, “ভাবি, আপনার এই সম্মতি পুরো প্রজেক্টটাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেল। আমরা আগামী মাসের ১৫ তারিখ থেকেই ফ্লোরে যাচ্ছি।”

“আমার শুভকামনা রইল আজিম ভাই। আশা করি আমরা ভালো একটা কাজ উপহার দিতে পারব,” মৌসুমী হাত মেলালেন।

ইহান আবার নিচু হয়ে বিনীতভাবে হাত জোড় করল। “ম্যাম, আমি আজ রাতে স্ক্রিপ্টটা আবার নতুন করে পড়ব। আপনার সাথে অভিনয় করার সুযোগ পাওয়াটা আমার জীবনের সেরা উপহার।”

মৌসুমী ইহানের কাঁধে হাত রাখলেন। এক ধরনের মাতৃসুলভ অথচ পেশাদার উষ্ণতায় বললেন: “স্ক্রিপ্টটা স্রেফ মুখস্থ কোরো না ইহান, আয়ানের মনস্তত্ত্বটা বোঝার চেষ্টা করো। মনে রেখো, আমাদের স্ক্রিন কেমিস্ট্রিটা কিন্তু খুব সূক্ষ্ম হতে হবে। আমরা বন্ধু, আবার একে অপরের বুদ্ধির প্রতিযোগীও। তোমার তোপসে যেন আমার ফেলুদাকে সমানে সমানে টক্কর দিতে পারে। তৈরি থেকো কিন্তু!”

ইহান হাসল। এবার তার চোখে কোনো শঙ্কা ছিল না, ছিল এক তরুণ অভিনেতার অদম্য প্রত্যয়। “আমি শতভাগ তৈরি, ম্যাম।”
চার

রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে মৌসুমী তাঁর মার্সিডিজ গাড়ির পেছনের আসনে গিয়ে বসলেন। চালক খোকন ড্রাইভিং সিটে বসে ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করল, “ম্যাডাম, সোজা গুলশানের বাসায় যাব?”

“হাঁ খোকন, বাসায় চলো। তবে একটু ধীরে যেও,” মৌসুমী ক্লান্ত ভঙ্গিতে সোফাসেটের মতো আরামদায়ক গাড়ির সিটে হেলান দিলেন।

গাড়িটি ধীরে ধীরে পার্কিং লট ছেড়ে গুলশান এভিনিউয়ের মূল সড়কে গিয়ে পড়ল। বাইরে ঢাকার রাত এখন আরও নিঝুম আর রহস্যময় রূপ ধারণ করেছে। কাঁচের জানালায় হালকা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এসে জমছে। সোডিয়ামের হলুদ আলো আর ফুটপাতের আধুনিক ক্যাফেগুলোর রঙিন নিয়ন সাইনবোর্ডের আলো এসে গাড়ির ভেতরে আলো-ছায়ার এক অদ্ভুত মায়াজাল বুনে চলেছে।

মৌসুমী শাড়ির আঁচলটা একটু গায়ে জড়িয়ে নিলেন। কপালে হাত দিয়ে চশমাটা সামান্য ওপরে তুললেন। তাঁর মনে স্মৃতি আর ভাবনার এক বিশাল মিছিল বয়ে যাচ্ছিল। জীবনটা সত্যিই কত অদ্ভুত এবং বৈচিত্র্যময়!

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন তিনি কিশোরী বয়সে বিটিভির রূপচর্চার অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপন দিয়ে বিনোদন জগতে পা রেখেছিলেন, কিংবা যখন ১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহানের ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রে প্রথমবার সালমান শাহর হাত ধরে বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন—তখন কি তিনি ভেবেছিলেন তিন দশক পর ঢাকার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

সেই সোনালী দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও তাঁর বুকটা হালকা কেঁপে ওঠে। সালমান শাহ, জসিম, রাজীব, রাজ্জাক স্যার, মান্না ভাই—কত কত মহীরুহ ছিলেন তাঁর চারপাশে! এফডিসির সেই সুবিশাল ফ্লোরগুলোতে দিনরাত শত শত মানুষের কোলাহল থাকত, ক্যামেরার লাইট ফুটত, একটার পর একটা ঐতিহাসিক সিনেমার জন্ম হতো।

তারপর সময় গড়িয়েছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সিনেমা বদলেছে, আবার সেলুলয়েডের সেই আবেগও অনেকখানি হারিয়ে গেছে। মাঝখানের সময়টায় কত রাজনৈতিক টানাটানি, শিল্পী সমিতির নোংরা নির্বাচন, জায়েদ খানের অনভিপ্রেত বিতর্ক, আর ওমর সানির সাথে পারিবারিক জীবন নিয়ে সংবাদমাধ্যমের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘাটাঘাটি—এসব তাঁর হৃদয়কে ভীষণভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। অনেক সময় তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো আর কোনোদিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন না। হয়তো চিরতরে রূপালী পর্দা থেকে বিদায় নিয়ে দূরে কোথাও নিভৃত জীবন কাটাবেন।

কিন্তু শিল্পীর কি কোনোদিন সত্যি বিদায় হয়?

ক্যামেরার লেন্সের পিছনের সেই এক অদৃশ্য টান—যা রক্তে একবার মিশে গেলে সারাজীবন থেকে যায়। আজ এই ৫২ বছর বয়সে এসে, যখন তরুণ পরিচালক ইফতি তাঁর হাতে এই 'অর্বান ডিটেকটিভ' এর স্ক্রিপ্ট তুলে দিল, তখন মৌসুমী অনুভব করলেন—তাঁর ভেতরের সেই ঘুমন্ত অভিনেত্রীটি আবার জেগে উঠেছে।

তিনি আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেলেন। না, তিনি আর ২০ বছরের সেই চপল গ্ল্যামারাস ‘রেশমি’ নন। তিনি ৩০ বছরের সেই স্লিম সুগঠিত ফিগারের রূপসী সুন্দরীও নন। কিন্তু আজ এই ৫২ বছর বয়সে, এই ৭৬ কেজি ওজনের ভরাট শরীরে, এই ‘Regal Fuller Frame’-এর আভিজাত্যে তিনি যে মহিমা আর তেজ ধারণ করেন—তা তাঁর ২০ বছর বয়সের রূপের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বরং এতে যোগ হয়েছে অভিজ্ঞতার এক গভীর রাজকীয় দীপ্তি।

দর্শকরা এখন আর তাঁকে স্রেফ সুন্দর একটা মুখের জন্য পর্দায় দেখবে না। দর্শকরা দেখবে কীভাবে বায়ান্ন বছরের এক পরিণত গৃহিণী তার তীক্ষ্ণ মগজ, শান্ত উপস্থিতি আর অসাধারণ অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে অপরাধ জগতের জটিল রহস্যের জট খুলে ফেলে। আর তার পাশে থাকবে একুশ বছরের এক তরুণ, যার সাথে তার সম্পর্কের রসায়ন বাংলা চলচ্চিত্রে এক সম্পূর্ণ নতুন ধারা তৈরি করবে।

গাড়িটি তখন গুলশান-২ এর সিগনাল পেরিয়ে তাঁর বাড়ির গলির দিকে বাঁক নিচ্ছিল। রাস্তার পাশে সারি সারি বড় মেহগনি আর কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো টিপ টিপ বৃষ্টিতে ভিজছে। সোডিয়াম লাইটের ম্লান আলো এসে পড়েছে গাছের ভেজা পাতাগুলোর ওপর।

মৌসুমী জানালার কাঁচটি এক ইঞ্চি নিচে নামালেন। ভেজা মাটির আর হালকা শীতের এক মিষ্টি সুবাস গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাতাস এসে স্পর্শ করল তাঁর কপাল আর গাল। তিনি গাড়ির সিটে আরেকটু সোজা হয়ে বসলেন। ডান হাতটি দিয়ে কাঁচের ওপর জমে থাকা বাষ্পটুকু হালকা করে মুছে দিলেন।

কাঁচের গায়ে ভেসে উঠল তাঁর নিজের সুস্পষ্ট প্রতিবিম্ব। গাঢ় নীল জামদানি, চশমার ফাঁক দিয়ে প্রখর দুটি চোখ, আর মুখে এক অপার্থিব আত্মবিশ্বাসের রেখা। তিনি নিজেকে দেখলেন। এক লহমার জন্য মনে হলো, তিনি এখন আর আরিফা পারভিন জামান মৌসুমী নন—তিনি এখন ‘মিসেস রেহানা’। যে নারী কোনো বাধা মানে না, যে নারী জীবনের বায়ান্নতম বসন্তে এসেও নতুন করে পৃথিবীকে জয় করতে জানে।

গাড়ির কাঁচে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে তিনি বিড়বিড় করলেন
, “তদন্ত শুরু হোক তবে।”

অধ্যায় ২: প্রদীপের নিচে ও অদ্ভুত শিহরণ

এক

উত্তরের ভিআইপি রোডের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা সেই পুরোনো ডুপ্লেক্স বাড়িটিতে তখন কাজের তুলকালাম পরিবেশ। চারপাশের বিশাল ট্রাইপড, চারকোল ব্ল্যাক রিফ্লেক্টর, শত শত গজ লম্বা মোটা ক্যাবল আর মেকআপ ভ্যানের ব্যস্ততায় পুরো এলাকাটা একটা অস্থায়ী স্টুডিওর রূপ নিয়েছে। শীতের সকালের নরম রোদ তখনও ডুপ্লেক্সের লাল ইটের দেয়ালে পুরোপুরি নামেনি, অথচ শুটিং ফ্লোরে পারদের পারদ চড়ছে।

পরিচালক ইফতি তাঁর প্রফেশনাল ড্রপ-ডাউন মনিটরের সামনে ঝুঁকে বসে আছেন। গলায় সাউন্ড ট্র্যাকিং হেডফোন ঝুলছে। হঠাৎ তিনি চড়া গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, “কাট! গুড শট! পারফেক্ট টাইম! লাভলি!”

ফ্লোরে জমে থাকা নীরবতা নিমেষেই ভেঙে গেল। ক্রু মেম্বারদের স্বস্তির নিঃশ্বাস আর সহকারী পরিচালকদের ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপ শুরু হলো আবার।

দৃশ্যটা ছিল স্ক্রিপ্টের অন্যতম প্রাণবন্ত একটা অংশ। গল্পে মিসেস রেহানা (মৌসুমী) তাঁর বারান্দার টিপয়ে চা খেতে খেতে খবর পেয়ে নিচে নেমে এসেছেন। কারণ, তাঁর সহকারী ‘আয়ান’ (ইহান) পাড়ার এক সন্দেহভাজন লোকের পেছনে গোয়েন্দাগিরি করতে গিয়ে মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে নিজের ফোনে ইনস্টাগ্রাম লাইভ চালু করে বসে আছে!
পর্দার দৃশ্যে মৌসুমী চশমাটা নাকের এক সেন্টিমিটার ডগায় নামিয়ে এনে, গাঢ় নীল রঙের সুতি শাড়ির আঁচলটা কোমরে শক্ত করে পেঁচিয়ে আয়ানকে রীতিমতো শাসন করছিলেন। স্ক্রিপ্টে নির্দিষ্ট কিছু সংলাপ ছিল ঠিকই, কিন্তু টেক নেওয়ার মাঝপথে মৌসুমী নিজের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত ‘ইম্প্রোভাইজেশন’ (Improvisation) বা স্বতঃস্ফূর্ত সংলাপ যুক্ত করে দিলেন।

তিনি চোখের চশমাটা আর একটু নামিয়ে, এক হাত কোমরে রেখে কড়া গলায় বললেন, “আচ্ছা আয়ান, তোমাদের এই জেন-জি জেনারেশনের আসল সমস্যাটা কী বলো তো? তোমরা কি পাড়ার চোর ধরবে নাকি ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে নিজেদের ফলোয়ার বাড়াবে? চোর ধরাটা কি কোনো রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস যে লাইভ করে সবাইকে জানাতে হবে?”

ঘটনার আকস্মিকতায় কাস্টিং ডিরেক্টর হয়তো ঘাবড়ে যেতেন, কিন্তু ইহান মোটেও দমে গেল না। সেও তাত্ক্ষণিকভাবে স্ক্রিপ্ট ছেড়ে চরিত্রের ভেতরে ঢুকে গেল। সে নিজের আইফোনটা একহাতে উঁচিয়ে ধৃষ্টতার সাথে হাসল, “আন্টি, আপনার ধারণাই নেই! ফলোয়ারই তো আসল পাওয়ার! আপনি এনালগ যুগের মানুষ, বুঝবেন না—এটা হলো ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স! চোরও এখন আমার লাইভ দেখে ভয়ে আত্মসমর্পণ করবে।”

পুরো ফ্লোরে হাসির রোল উঠল। লাইটম্যান, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে প্রোডাকশন বয় পর্যন্ত কেউ নিজেদের হাসি চেপে রাখতে পারল না। গত ২৫ দিন ধরে এই উত্তরার সেটে টানা শুটিং চলছে। এই পঁচিশ দিনে মৌসুমী আর ইহানের কাজের সম্পর্কটা যেন একদম জমে ক্ষীর হয়ে উঠেছে। প্রথম দিন গুলশানের ‘দ্য অলিভ গার্ডেন’ রেস্তোরাঁয় ইহানের মধ্যে যে প্রাথমিক আড়ষ্টতা বা কিংবদন্তি অভিনেত্রীর সামনে দাঁড়ানোর ভীতিটুকু ছিল, তা যেন উত্তাপ পেয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। এখন সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে মৌসুমীর মেধা আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে সংলাপ ছুড়ে দেয়।

শুধুমাত্র পর্দার সামনের দৃশ্যেই নয়, পর্দার পেছনে অর্থাৎ অন-সেট আর অফ-সেটেও তাদের মধ্যকার এই রসায়ন পুরো ইউনিটের সবচেয়ে বড় বিনোদন আর আলোচনার খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

দুপুরের লাঞ্চ ব্রেকের সময় প্রতিদিন এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যেত। মৌসুমী সাধারণত এফডিসির বা বাইরের কোনো ক্যাটারিংয়ের ভারি বা মসলাদার খাবার খুব একটা পছন্দ করেন না। তিনি নিজের গুলশানের বাসার নিজস্ব বাবুর্চিকে দিয়ে টিফিন ক্যারিয়ারে করে হালকা সুস্বাদু খাবার আনাতেন। সরষে পাবদা, ছোট মাছের চর্চরি কিংবা কাঁচামরিচ দিয়ে ঝাল খাসির মাংসের ঝোল।

খাওয়া শুরুর সময় তিনি টেবিল থেকে ইহানকে ডেকে আনতেন। “ইহান, শোনো! ওই শুকনো রুটি আর পোল্ট্রি মুরগি খাওয়া বন্ধ করো। এদিকে এসো।”

ইহান হয়তো লাজুক মুখে এসে দাঁড়াত, “ম্যাম, না ঠিক আছে... আমি প্রোডাকশনের খাবারেই অভ্যস্ত।”

“চুপচাপ বসো!” মৌসুমী আদেশের সুর ফুটিয়ে নিজের টিফিন ক্যারিয়ারের বাটি থেকে বাসমতী চালের ধোঁয়া ওঠা ভাত আর পাবদা মাছের বড় পেটিটা ইহানের প্লেটে তুলে দিতেন। “এই বয়সে কঙ্কালের মতো শুকনো হয়ে থাকলে অভিনয় করবে কীভাবে? গায়ে মাংস-রক্ত না থাকলে স্ক্রিনে ব্যক্তিত্ব ফোটে না। খাও তো!”


ইহান বাধ্য ছেলের মতো খেতে বসত। আর খেতে খেতেই চলত আড্ডা। খাওয়ার পর পর ইহান আবার মৌসুমীকে শেখাতে বসত কীভাবে প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হয়।

“ম্যাম, আপনি ফেসবুকের পেজটা নিজে চালান না কেন?” ইহান ফোন বের করে দেখাত। “দেখুন, এই যে ইনস্টাগ্রামের নতুন ফিল্টারগুলো। আপনি একটা 'রিল' বানালে তো দেশে তোলপাড় পড়ে যাবে।”

মৌসুমী কফির কাপে চুমুক দিয়ে হসে ফেলতেন, “ওরে বাবাসে! তোদের এই ফিল্টার আর রিলসের মধ্যে আমি নেই। আমি ভাই পুরোনো আমলের মানুষ, সামনাসামনি পারফর্ম করতে ভালোবাসি। আমার ফেস-এ প্রকৃতির ফিল্টারই থাক।”

একদিন দুপুর থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। আউটডোর শট নেওয়ার কোনো উপায় ছিল না। ডুপ্লেক্সের চওড়া বারান্দায় সবাই প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসে চা খাচ্ছিল। বৃষ্টির পানিতে উত্তরার বাগানটা সবুজ থেকে আরও গাঢ় সবুজ রূপ নিচ্ছিল।

মৌসুমী খেয়াল করলেন, বারান্দার এক কোণে কাঁচের জানালার দিকে মুখ করে একাকী দাঁড়িয়ে আছে ইহান। তার হাতে একটা মোটা বাঁধাই করা বই আর কিছু খাতা। তার কপালে চিন্তার রেখা, হাত দুটো পকেটে গেঁথে সে একমনে বৃষ্টির ফোঁটার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে।

মৌসুমী চা-এর কাপটা হাতে নিয়ে ধীরপায়ে এগোেেন। তাঁর গাঢ় সবুজ সুতি শাড়ির আঁচলটা মেঝেশে সামান্য ঘষা খাচ্ছিল।

“কী হলো আমাদের ইয়াং ডিটেকটিভ সাহেব?” মৌসুমী কানের পাশ থেকে আলগা চুল সরিয়ে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “কোনো জটিল কেস সলভ করছ নাকি? নাকি পাড়ার চোর আবার লাইভ দেখে পালিয়ে গেল?”

ইহান চমকে পাশ ফিরল। মৌসুমীকে দেখে ম্লান একটু হাসল। সে জানালার গ্রিল ধরে বলল, “না ম্যাম... তেমন কিছু না। আসলে ভার্সিটির সেমিস্টার ফাইনালের একটা জটিল অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে আগামী সপ্তাহে। সাবজেক্টটা হলো—'মাস মিডিয়া অ্যান্ড সোসিও-কালচারাল চেঞ্জেস'। শুটিংয়ের টানা শিডিউলের কারণে কদিন ধরে বইতেই চোখ বোলানো হয়নি। কেস সলভ করার চেয়ে এই থিওরি সলভ করা যে কত কঠিন!”

মৌসুমী স্নেহের দৃষ্টিতে ছেলেটির দিকে তাকালেন। ২১ বছরের তরুণ—একদিকে রুপালি পর্দার জাদুকরী জগতে পা রাখার স্বপ্ন, অন্যদিকে বাস্তব জীবনের পড়াশোনা ও ডিগ্রির চাপ। এই বয়সের অনেক ছেলেই এত চাপের মুখে খেই হারিয়ে ফেলে। কিন্তু ইহান চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

“নিয়ে এসো তো দেখি তোমার অ্যাসাইনমেন্টের টপিকটা,” মৌসুমী পাশের রতনের চেয়ারটা টেনে বসে বললেন। “আমার তো পড়াশোনা আর প্রাতিষ্ঠানিক থিওরি বহুকাল আগের, তবু দেখি—একজন অভিজ্ঞ অভিনেত্রী আর সমাজকে কাছ থেকে দেখা নারী হিসেবে তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারি কি না।”

সেদিন বিকেলে উত্তরের সেই ডুপ্লেক্সের বারান্দায় তৈরি হলো এক রূপকথার মতো দৃশ্য। একপাশে বসে আছেন বাংলা চলচ্চিত্রের তিন দশকের একচ্ছত্র সম্রাজ্ঞী, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত মহাতারকা মৌসুমী—তাঁর পরনে রাজকীয় সবুজ শাড়ি, চোখে চশমা, আর তাঁর ঠিক সামান্য নিচে কার্পেটে হাঁটু গেড়ে বসে আছে ২১ বছরের এক শিক্ষানবিস তরুণ।

মৌসুমী তাঁকে নিজের জীবনের তিন দশকের অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝাচ্ছিলেন কীভাবে সমাজের রুচি বদলায়, কীভাবে নব্বইয়ের দশকের যৌথ পরিবারের মানসিকতা আজ ডিজিটাইজড একাকীত্বে রূপ নিয়েছে। তিনি কোনো পাঠ্যবইয়ের মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং জীবনের গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে থিওরিগুলোকে ব্যাখ্যা করছিলেন। আর ইহান মুগ্ধ হয়ে খাতায় নোট নিচ্ছিল, মাঝে মাঝে যুক্তি দেখাচ্ছিল তার নিজস্ব আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে।

পরিচালক ইফতি দূরের একটা কোণ থেকে এই দৃশ্যটা দেখে থমকে দাঁড়ালেন। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের আইফোনটা বের করে সাইড-এঙ্গেল থেকে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে এক মিনিটের একটা ভিডিও আর কিছু অসাধারণ ক্যান্ডিড ছবি তুলে রাখলেন।
ইফতি মনে মনে বললেন, “এই কেমিস্ট্রি যদি সিনেমায় ফুটে ওঠে, তবে বাংলা চলচ্চিত্র নতুন কিছু দেখতে চলেছে। সিনেমার প্রমোশনে এই স্টিল পিকচারগুলো সোনা ফলাবে!”
[+] 11 users Like Orbachin's post
Like Reply
#4
Darun update
Like Reply
#5
Darun
Like Reply
#6
Darun
Like Reply
#7
আপনি ai দিয়ে এসব লিখে লেখার মান নষ্ট করেন কেন
[+] 1 user Likes Rana Sarkar's post
Like Reply
#8
পরীমনি কে নিয়ে স্টোরি এখনো এলো না।।।
Like Reply
#9
(13-08-2026, 12:39 AM)Rana Sarkar Wrote: আপনি ai দিয়ে এসব লিখে লেখার মান নষ্ট করেন কেন


“এই ছেমড়ী, কি করছিলি এখানে”? – রাগত স্বরে প্রশ্ন মিতুনদির। উত্তর দিতে পারছে না চমচম। বাড়ীর দাদাবাবু এবং তার দিদি বেডরুমে ঢুকে দরজা দিতেই কৌতুহল এবং সন্দেহ হয় তার। চাবির ফুটো দিয়ে ভিতরের দৃশ্য দেখার এবং দরজায় কান লাগিয়ে শোনার চেষ্টা করছিলো সে।
 ভালো করে দেখতি এবং শুনতি পারতেছিলো না; কিন্তু আবছা অন্ধকারে যেটুকু দেখিছে এবং অস্পষ্ট যেটুকু শুনতে পেরিছে, তাতে পরিস্কার বুঝতে পারতেছিলো ভিতরে লটরপটর চলতিছে। তারও শরীলের মধ্যি কেমন একটা হতি শুরু করে। মাইয়ের বুঁটি শক্ত হইয়ে দাড়ায়ি যায়, দুই পায়ির মাঝির চেরায় জল কাটতি শুরু করে তার।
--------------------
xossip picture adda - https://photos.app.goo.gl/dSKFGuGLQv1vThtf8

Like Reply
#10
Nice plot and update soon
Like Reply
#11
Update
Like Reply
#12
Sera sera starting.. Akta kotha bujlam apni osomo boyoser golpo darun likhte paren... Next update er opekhai
Like Reply
#13
সুন্দর হচ্ছে ম্যান
Like Reply
#14
Update soon
Like Reply
#15
আপনার লেখা " মায়ের বান্ধবী " গল্পটা খুব কন্সটাকটিভ, ম্যাচিউড, এবং সাবলীল ছিলো৷ আশাকরি এটা সেটা কে ছাড়িয়ে যাবে৷ ধারাবাহিক প্লট বিল্ডিং, হুট করে সেক্স না আনা, এবং সেক্স এর পরেও চরিত্রের সম্মান ধরে রাখা খুবই সাবলীল ছিলো। এখানে আরো নতুনরুপে সেই ধারাবাহিকতা রাখবে আশাকরি। ম্যাচিউড, ভরাট শরীরে মৌসুমি মনে হয় রাফ এন্ড টাফই প্রেফার করবে, রাফ ( স্পাংকিং, হেয়ার পুলিং, স্ল্যাং) পেশন ( কিস, হাগ) এর সমন্বয় থাকলে ভালো লাগবে, সাথে ইন্ডাস্ট্রির অভিজ্ঞতা, আফরাট আল অভিজ্ঞতদের কাছ থেকেই তো নতুনরা শিখবে৷
Like Reply
#16
Valo laglo
Like Reply
#17
দুই

অবশেষে সমস্ত অনিশ্চয়তা ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেল মৌসুমী অভিনীত ‘অসম সমীকরণ’। বড় বাজেটের সস্তা কমার্শিয়াল ধামাকা বলতে ঢালিউডে সাধারণত যা বোঝানো হয়—এই সিনেমা মোটেও তা ছিল না। এতে কোনো আইটেম সং ছিল না, কোনো উরু উরু টাইপের রোমান্টিক ডুয়েট গান ছিল না, না ছিল ভিলেনের সাথে নায়কের গাড়ি ওড়ানোর সাউথ ইন্ডিয়ান মারামারি, আর না ছিল ব্যাংকক বা তুরস্কে গিয়ে কালারফুল গানের শুটিং।

কিন্তু মুক্তির প্রথম দিন থেকেই সিনেমাটি নিয়ে সচেতন, শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী মহল, চলচ্চিত্র সমালোচক এবং সোশ্যাল মিডিয়ার রুচিশীল দর্শকদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব তোলপাড় শুরু হয়ে গেল।

দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় ও শিল্প সংস্কৃতির পাতায় বড় বড় অক্ষরে রিভিউ ছাপা হলো: “মৌসুমীর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ও পরিপক্ক প্রত্যাবর্তন—'অসম সমীকরণ'”

“নবীন তরুণ ইহানের চোখধাঁধানো অভিনয়ের সাথে কিংবদন্তি মৌসুমীর অভিনয় শৈলী বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন দিগণ্তের সূচনা করল।”

ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সের সবকটি শাখা, যমুনা ব্লকবাস্টার এবং চট্টগ্রামের মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে উপচে পড়া ভিড় না থাকলেও, প্রতিটি প্রাইম শোতে প্রযোজকের হিসেবের চেয়ে অনেক বেশিই দর্শক হল। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণী এবং বয়স্ক দম্পতিরা সিনেমাটি দেখতে হলে ভিড় জমালেন।

ব্যবসা দিয়ে বলতে গেলে এটি কোনো তথাকথিত ‘স্প্ল্যাশ ব্লকবাস্টার’ ছিল না, কিন্তু প্রযোজক আজিম চৌধুরীর দ্বিগুণ টাকা উঠে এসে সিনেমাটি ‘মডারেট হিট’করল।

মৌসুমীর জন্য এই সাফল্য বিশাল নৈতিক বিজয়। গত এক দশক ধরে ইন্ডাস্ট্রি আর এফডিসির কিছু সংকীর্ণ মানসিকতার লোক প্রচার করে আসছিল যে—৫০ পেরিয়ে যাওয়া কোনো নারী অভিনেত্রীর আর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার যোগ্যতা থাকে না; তাঁদের নাকি স্রেফ নায়ক-নায়িকার কান্নাকাটি করা মা বা শাশুড়ির চরিত্রে অভিনয় করে বিদায় নেওয়া উচিত।

মৌসুমী ‘অসম সমীকরণ’ দিয়ে সোজা ব্যাটে ছক্কা হাঁকালেন। তিনি প্রমাণ করে দিলেন, বায়ান্ন বছর বয়সেও নিজের ফিগার নিয়ে কোনো লজ্জা না পেয়ে, কোনো ২০ বছরের নায়কের বাহুলগ্না না হয়েও, স্রেফ নিজের মেধা, উপস্থিতি আর আভিজাত্য দিয়ে একটা পুরো ব্যবসাসফল সিনেমা একাই কাঁধে টেনে নেওয়া যায়।


তিন
‘অসম সমীকরণ’-এর এই অভাবনীয় সম্মানজনক সাফল্য উদযাপন করতে মৌসুমী নিজের গুলশানের বাসভবনে এক ঘরোয়া গেট-টুগেদার পার্টির আয়োজন করলেন। তিনি চাননি কোনো বড় ফাইভ স্টার হোটেলে জাকজমকপূর্ণ কমার্শিয়াল পার্টি করতে, যেখানে ক্যামেরার ঝলকানি আর অচেনা মানুষের ভিড়ে কাজের মূল নির্যাস হারিয়ে যায়। তিনি শুধু সিনেমার কাস্ট, ক্রু এবং তাঁর জীবনের খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজন প্রিয় মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ মৌসুমীর গুলশানের সুবিশাল ফ্ল্যাটটি এক অপূর্ব আলোয় সজ্জিত হয়ে উঠল। ড্রয়িংরুমে মেহগনি কাঠের আসবাবপত্রের ওপর থেকে ওয়ার্ম হোয়াইট আলোর রোশনাই ঠিকরে পড়ছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব হালকা ভলিউমে বাজছিল ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের সরোদের এক মিষ্টি সুর। বাতাসে ছড়ানো দামী রজনীগন্ধা ফুল আর চন্দনের হালকা সুবাস।
মৌসুমী আজ নিজেকে সাজিয়েছেন একদম অন্যরকম আভিজাত্যে।

তিনি পরেছেন একটি খাঁটি অফ-হোয়াইট রঙের শিফন শাড়ি। শাড়ির গায়ে খুব সূক্ষ্ম মুক্তার মতো সুতোর কাজ। গলায় পেঁচানো দু-লহরের আসলি সাউথ-সি মুক্তার নেকলেস, আর কানে মানানসই মুক্তার দুল। চুলগুলো একদম কড়াকড়ি করে বাঁধা নয়, বরং আলগা করে ছেড়ে দেওয়া পেছনে—যাতে দু-একটি রূপালি চুলের রেশ স্পষ্ট বোঝা যায়।

বায়ান্ন বছর বয়সে তাঁর ৭৭ কেজি ওজনের শরীরে এই অফ-হোয়াইট শিফন আর মুক্তার সংমিশ্রণ তাঁকে এক অপার্থিব, স্নিগ্ধ রূপ দিয়েছিল—ঠিক যেন শরতের কোনো প্রশান্ত শুভ্র সকাল।

তিনি মুখে নির্মল হাসি নিয়ে নিজেই অতিথিদের ট্রে থেকে জুস ও স্ন্যাকস তুলে দিয়ে আপ্যায়ন করছিলেন। তাঁর স্বামী অভিনেতা ওমর সানি এই মুহূর্তে তাঁর নতুন রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসার কাজে চট্টগ্রাম ও সিলেটে এক সপ্তাহের সফরে আছেন; ফলে এই বিশাল সন্ধ্যার একক আয়োজক ও ‘হোস্ট’ হিসেবে মৌসুমীকেই পুরো ঘর সামলাতে হচ্ছিল।

পার্টির এক কোণায়, বারান্দার কাঁচের দরজার ঠিক পাশে একটা ছোটখাটো জটলা জমেছিল। আর সেই জটলার ঠিক কেন্দ্রবিন্দু বা মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইহান। ইহানের দিকে নজর পড়তেই মৌসুমীর চোখ দুটো কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।

আজ বাস্তবের ইহানকে দেখে মনে হচ্ছে সে যেন কোনো আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ থেকে নেমে আসা এক মডেল! 
তার পরনে একদম বডি-ফিটেড কুচকুচে কালো রঙের প্রিমিয়াম সুতি শার্ট, সাথে ডার্ক গ্রে বা ছাই রঙের ট্রাউজার্স। শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত খুব নিখুঁতভাবে ফোল্ড করা, যার ফলে তার হাত দুটোর শক্ত পেশি ফুটে উঠেছে। ডান হাতে একটি দামী মেটালিক অ্যানালগ রিস্টওয়াচ। চুলগুলো খুব সুন্দর করে স্পাইক না করে ক্লাসিক্যাল কায়দায় পেছনের দিকে আঁচড়ানো।

শুটিংয়ের সময় গত এক মাস ধরে মৌসুমী তাকে দেখেছেন ‘আয়ান’ চরিত্রের চশমা পরা, এলোমেলো চুল আর ঢোলা টি-শার্টের এক বাউণ্ডুলে তরুণ লুকে। কিন্তু আজ, সান্ধ্যকালীন আলোয়, পরিপূর্ণ আধুনিক পোশাকে বাস্তবের এই ২১ বছরের তরুণ ইহানকে দেখে যে কারো চোখ আটকে যেতে বাধ্য।

মৌসুমী ঘরের এক কোণায় জুসের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে দূর থেকে ইহানকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ইহান অত্যন্ত মার্জিত আর আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে আজিম চৌধুরী আর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলছিল। তার কথা বলার স্টাইল, ডিপ কন্ঠস্বর আর ভুবনভোলানো সরল হাসি পুরো ঘরের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিল। তার দৈহিক গঠনে আর উপস্থিতিতে এমন এক ধরনের আধুনিক স্মার্টনেস আর পুরুষালী আভিজাত্য ছিল, যা সচরাচর ২১ বছরের তরুণের মধ্যে দেখা যায় না।

মৌসুমী আরও খেয়াল করলেন
, ইউনিটের যে তরুণী জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর আর কাস্টিং টিমের দুটি মেয়ে ছিল—তারা রীতিমতো মুগ্ধ আর অপলক দৃষ্টিতে ইহানের দিকে তাকিয়ে আছে। ইহান সবার সাথেই হেসে কথা বলছে, কিন্তু তার আচরণের মধ্যে কোনো সস্তা চপলতা বা অহেতুক ফ্লার্ট করার মানসিকতা নেই। সে যে কতটা সুশিক্ষিত আর সামাজিকভাবে দক্ষ, তা আজকের সন্ধ্যায় তার প্রতিটি পদক্ষেপে স্পষ্ট।

হঠাৎ মৌসুমীর মনের গভীরের কোনো এক গোপন অলিন্দে এক নিষিদ্ধ ও তীব্র ভাবনা বিজলীর মতো উঁকি দিয়ে গেল— “ছেলেটা তো ভয়াবহ সুন্দর আর আকর্ষণীয়! স্ক্রিনে বা ক্যামেরার লেন্সের ভেতর ওকে যতটা ভালো লাগে, সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে তো ওর ব্যক্তিত্ব আরও দশগুণ বেশি শক্তিশালী মনে হয়!”

ভাবনাটা মনের পর্দায় ভেসে উঠতেই মৌসুমী ভেতরে ভেতরে চরম চমকে উঠলেন! এক ধরনের অপরাধবোধ তাঁর স্নায়ুকে কাঁপিয়ে দিল। তিনি হাতের জুসের গ্লাসটা টিপয়ের ওপর ঠক করে রাখলেন। নিজের অজান্তেই নিজেকে মনে মনে প্রচণ্ড ধমক দিলেন:

“ছিঃ মৌসুমী! তোমার মাথায় এসব কী নোংরা আর আবর্জনা ভাবনা আসছে? ও তোমার ছেলের বয়সী! ও তোমার সন্তানের মতো এক তরুণ অভিনেতার সাথে কাজ করেছে মাত্র। তুমি বাংলা চলচ্চিত্রের তিন দশকের রাজরাণী, এত ব্যক্তিত্বহীন চিন্তা তুমি কীভাবে করতে পারছ?”

তিনি মাথাটা জোরে একপাশে ঝাঁকালেন, যেন নিজের ভেতরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবনাগুলোকে জোর করে ঝেড়ে ফেলে দিতে চান। তারপর নিজের স্বাভাবিক ভাবমূর্তি ফিরিয়ে এনে দ্রুত অন্য বয়স্ক অতিথিদের সাথে কথা বলতে এগিয়ে গেলেন।

চার
রাত ক্রমশ গভীর হতে লাগল। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে সান্ধ্যকালীন ভোজ পর্ব শেষ হলো। সুস্বাদু খাবার আর আড্ডার পর অতিথিরা একে একে বিদায় নিতে শুরু করলেন। আজিম চৌধুরী সালাম জানিয়ে চলে গেলেন। পরিচালক ইফতি মৌসুমীর কাছাকাছি এসে পরম শ্রদ্ধায় মাথা নিচু করে পা ছুঁয়ে সালাম করল।

“ম্যাম, আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব আমি জানি না। আপনার সেই প্রথম দিনের সাপোর্ট আর মিস রেহানা চরিত্রটাকে নিজের ভাবার মানসিকতা না থাকলে 'অসম সমীকরণ' কোনোদিনও সিনেমা হলে আলো দেখতে পেত না।”

মৌসুমী ইফতির মাথায় হাত রেখে উষ্ণ গলায় বললেন, “ধন্যবাদ তোমার পাওয়ার কথা ইফতি। তুমি আমাকে এমন একটা চরিত্র উপহার দিয়েছ, যেখানে আমার বয়স বা চেহারাকে লুকিয়ে কৃত্রিম হতে হয়নি। ভালো থেকো, নতুন কাজ শুরু করলে আবার জানাবে।”

সবাই চলে যাওয়ার পর, হলরুমের বিশাল ফয়ার বা প্রবেশদ্বারের কাছে দরজার কাছে বিদায় নিতে এল শেষ অতিথি—ইহান। তখন ড্রয়িংরুম প্রায় ফাঁকা। প্রোডাকশনের দুজন লোক দূরের টেবিলে ডিনার ট্রাঙ্কগুলো গোছাচ্ছে। আলোর তীক্ষ্ণতা অনেক কমে এসেছে।

ইহান ধীরপায়ে মৌসুমীর সামনে এসে দাঁড়াল। কালো শার্টের বোতামের ফাঁক দিয়ে তার চওড়া বুকের ওপরের অংশ দেখা যাচ্ছে। সে সামান্য ঝুঁকে বিনীত কণ্ঠে বলল: “ম্যাম, আজ আমি আসি। আজকের সন্ধ্যাটা সত্যি আমার জীবনের অন্যতম সেরা একটা স্মৃতি হয়ে থাকবে। আর আপনার বাসার এই ডিনার... বিশেষ করে খাসির মাংসের রেজালাটা—অসাধারণ! আমি মনে হয় একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছি।”

মৌসুমী তাঁর ঠোঁটে সেই চিরচেনা স্নিগ্ধ, রাজকীয় হাসি ফুটিয়ে রাখলেন। কিন্তু তাঁর ভেতরের মনটা অজানা কোনো এক কারণে সামান্য অস্থির হয়ে উঠছিল। “ভালো থেকো ইহান,” মৌসুমী মিষ্টি গলায় বললেন। “পড়াশোনাটা একদম অবহেলা করবে না। সামনে তোমার ভালো ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। কোনো নতুন ভালো স্ক্রিপ্ট পেলে অবশ্যই আমাকে জানিও।”

বিদায় নেওয়ার এই অন্তিম মুহূর্তে, আজকালকার জেন-জি জেনারেশনের সামাজিক সৌজন্যের স্বাভাবিক অভ্যাসবশত, ইহান এক পা এগিয়ে এল। সে সাধারণ প্রথাগত হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়াল না। পরিবর্তে, শোবিজ জগতের আধুনিক কায়দায় সে একটা ‘সেমি-হাগ’ (Semi-hug) বা হালকা একহাতে সৌজন্যমূলক আলিঙ্গন করে বিদায় জানাতে চাইল।

শোবিজ বা সামাজিক অঙ্গনে একজন সহকর্মীকে বিদায় জানানোর সময় এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক, অনাকর্ষক এবং নিরপেক্ষ একটা সৌজন্য আচরণ। মৌসুমীও তাঁর দীর্ঘ তিন দশকের ক্যারিয়ারে হাজার হাজারবার এমন হ্যান্ডশেক বা সৌজন্য আলিঙ্গনে অভ্যস্ত। তিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই শরীরটা সামান্য এগিয়ে দিলেন।

কিন্তু ঠিক তখনই... কালান্তক বিপত্তিটা ঘটে গেল। ইহান যখন তার ডান হাতটি মৌসুমীর শিফন শাড়িতে ঢাকা ডান কাঁধের ওপর রাখল, এবং তার চওড়া বুকের ডান পাশটা মৌসুমীর ভরাট স্তন ও বুকের পাঁজরের সাথে মাত্র দুই সেকেন্ডের জন্য স্পর্শ করল—ঠিক সেই মুহূর্তে মৌসুমীর পুরো শারীরিক ও স্নায়বিক ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে যেন এক কোটি ভোল্টের তীব্র এক বৈদ্যুতিক প্রবাহ ধেয়ে গেল!

মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবীটা যেন ঘূর্ণায়মান অক্ষ থেকে থমকে গেল! ঘরের সরোদের সুর, ঘড়ির কাঁটার শব্দ, দূরের গাড়ির হর্ন—সবকিছু এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। মৌসুমীর নাকের ছিদ্রে এসে আঘাত করল ইহানের শরীর থেকে আসা এক তীব্র, মাদকতাময় পুরুষালী সুবাস—যেটা দামী চন্দনের কোলন, হালকা ঘাম আর তরতাজা যৌবনের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। ইহানের হাতের আঙুলগুলোর শক্ত ও উষ্ণ স্পর্শ তাঁর পাতলা শিফন শাড়ি ভেদ করে সোজা গিয়ে পৌঁছাল মৌসুমীর ত্বকের গভীরে। ২১ বছরের রক্তে উছলে ওঠা সেই তরুণ শরীরের অনাবিল তাপমাত্রা মৌসুমীর ৫২ বছর বয়সী ভরাট, সুগঠিত দেহের প্রতিটা কোষে এক নিষিদ্ধ, অচেনা আর প্রচণ্ড দাহ্য আলোড়ন সৃষ্টি করল!

ঘটনাটা ঘটল মাত্র তিন থেকে চার সেকেন্ডের মধ্যে। ইহান সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবেই, বিন্দুমাত্র অনভিপ্রেত কিছু না ভেবে, নিজেকে আলতো করে সরিয়ে নিল। সে তাঁর মুখাবয়বে সেই নির্ভেজাল, নিষ্পাপ সুন্দর হাসিটা ফুটিয়ে বলল, “গুড নাইট, ম্যাম! ভালো থাকবেন।”

তারপর সে ঘুরে লিফটের দিকে হেঁটে গেল। লিফটের স্টিলের দরজায় তার ছায়া মিলিয়ে গেল।

কিন্তু মৌসুমী?

তিনি ড্রয়িংরুমের বিশাল সেগুন কাঠের ভারী দরজাটার সামনে এক নিরেট পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন! তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস মারাত্মকভাবে দ্রুত হয়ে উঠেছে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডের ধক-ধক শব্দটা তিনি স্পষ্ট নিজের কানে শুনতে পাচ্ছেন, যেন ভেতরের কোনো বাঁধ ভেঙে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। তাঁর দুই হাতের তালু ঘেমে উঠছে, আর হাঁটু দুটো সামান্য কাঁপছে।

তিনি তড়িঘড়ি করে ভারী দরজাকপোট বন্ধ করে দিলেন। বাইরে লক করার ছিটকিনিটা তুলে দিয়ে, দরজার কাঠের পিঠ ঠেকিয়ে তিনি অন্ধকারের মধ্যে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর বুকটা ওঠানামা করছে।

“এটা কী হলো? খোদা! এটা আমার সাথে কী হলো? কেন এমন হলো??” তিনি নিজের ভেতরের তোলপাড়কে প্রশ্ন করলেন।


গত ৩০ বছরের ক্যারিয়ারে কত শত সুদর্শন নায়ক, কত শত সহশিল্পী, প্রেমিক, স্বামী তাঁকে চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে কিংবা সৌজন্যের খাতিরে প্রকাশ্যে এবং গোপনে জড়িয়ে ধরেছেন! রাজ্জাক, আলমগীর, জসিম থেকে শুরু করে সালমান শাহ, ওমর সানি, ফেরদৌস—কারো স্পর্শেই তো কোনোদিন এমন নিয়ন্ত্রণহীন, রক্ত হিম করা বিদ্যুৎ চমকায়নি!

এমনকি তাঁর স্বামী ওমর সানির শারীরিক স্পর্শের সাথেও তো আজকের এই অনুভূতির কোনো বিন্দুমাত্র মিল নেই! তবে কেন? কেন এই একুশ বছরের এক সম্পূর্ণ নতুন ছোকরার সামান্য চার সেকেন্ডের একটা সৌজন্য স্পর্শে তাঁর বায়ান্ন বছরের পরিপক্ক, অভিজ্ঞ এবং সসংযত শরীরে এমন এক নারকীয় আলোড়ন আর কামনার আগ্নেয়গিরি জেগে উঠল?

এটা কি মাতৃস্নেহ বা বাৎসল্য
?

মৌসুমী মনের ভেতর এক নির্মম সত্য অনুভব করলেন। না! বাৎসল্য বা মাতৃস্নেহে কখনো রক্তে এমন আগুনের উত্তাপ লাগে না! মাতৃস্নেহে কখনো নারীর সুপ্ত কামনার স্নায়ুগুলো এভাবে জাগ্রত হয়ে চিৎকার করে ওঠে না!
তবে কি... এটা সেই নিষিদ্ধ আকর্ষণ?

পাঁচ
মৌসুমী দ্রুত পা চালিয়ে ড্রয়িংরুম পার হয়ে নিজের মাস্টার বেডরুমে ঢুকে দরজায় খিল তুলে দিলেন। ঘরের এসি জ্বলছে, অথচ তাঁর কপালে আর ঘাড়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। তিনি ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

হাতের কাঁপন সামলে তিনি এক লহমায় গলার দু-লহরের মুক্তার নেকলেসটা খুলে মেঝের উডেন ফ্লোরে ছুড়ে ফেললেন। কানের দুল দুটো খুলতে গিয়ে তাঁর আঙুল কাঁপছিল। তিনি আয়নার দিকে তাকালেন।

আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে এক বায়ান্ন বছর বয়সী পরিপূর্ণ নারীর অবয়ব। তাঁর গাঢ় নীল শিফনের ভেতর থেকে বেরিয়ে থাকা গলা ও বুকের অংশে এক অস্বাভাবিক রক্তিম বা গোলাপী আভা ফুটে উঠেছে। চোখের মনি দুটি অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত, আর ঠোঁট দুটো সামান্য কাঁপছে।

তিনি জোরে বিড়বিড় করে উঠলেন, “এটা স্রেফ একটা বিভ্রান্তি! আমি ক্লান্ত... আমি মানসিকভাবে অনেক দিন পর একটা বড় কাজ শেষ করেছি, তাই হয়তো আমার স্নায়ুগুলো এভাবে ভুল সিগন্যাল দিচ্ছে। আমি ওমর সানির স্ত্রী, আমি এক তরুণ ছেলের মা! আমি কীভাবে একুশ বছরের একটা ছেলের স্পর্শ নিয়ে এভাবে ভাবতে পারি?”

তিনি দ্রুত বেডরুমের মেইন লাইটগুলো বন্ধ করে দিলেন। ঘরে শুধু বেডসাইড ল্যাম্পের একটা হালকা লালচে আভা জ্বলতে লাগল। তিনি নাইটি পরে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন। কিন্তু এসি চলার পরও তাঁর পুরো শরীরে এক অদ্ভুত উত্তাপ আর ব্যাকুলতা ছড়িয়ে পড়ছিল। তিনি রেশমের চাদরটা বুকের ওপর টেনে নিলেন, কিন্তু সেই চাদরের স্পর্শেও যেন তিনি ইহানের হাতের সেই উষ্ণ চাপ অনুভব করতে লাগলেন!

চোখ বন্ধ করলেন।

কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই অন্ধকারের ক্যানভাসে ভেসে উঠছে ইহানের সেই কুচকুচে কালো শার্ট পরা সুঠাম শরীর, তার হাতের ফোল্ড করা স্লিভ, তার মিষ্টি সেই ভুবনভোলানো হাসি, আর কানের কাছে তার সেই ফিসফিস করে বলা কথা—“গুড নাইট, ম্যাম!”

মৌসুমী বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে লাগলেন। একদিকে তাঁর দীর্ঘ ত্রিশ বছরের অর্জিত সামাজিক সম্মান, সুচিত্রা সেন-সম ভাবমূর্তি, দাম্পত্য নীতি আর বয়সের গাম্ভীর্য—অন্যদিকের তাঁর রক্তের ভেতরে জাগ্রত হওয়া এক অচেনা, নিষিদ্ধ, সংবেদনশীল এবং তীব্র শারীরিক শিহরণ।

তাঁর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। হৃদস্পন্দনের প্রতিটি বিট যেন ঘড়ির কাঁটার সাথে তাল মিলিয়ে একুশ আর বায়ান্নর এক অসম অংকের হিসাব কষছিল। একুশ বছর বয়স—যৌবনের প্রারম্ভ, আগুনের প্রখরতা, নাছোড়বান্দা আকর্ষন। বায়ান্ন বছর বয়স—শরীরের পূর্ণতা, অভিজ্ঞতার দাহ, আর নিভে আসার আগের শেষ তীব্র শিখা।

এই দুটি পৃথিবীর মোড় যখন চার সেকেন্ডের এক আলিঙ্গনে এসে একসাথে ধাক্কা খেল, তখন মৌসুমীর রাজকীয় অস্তিত্বের ভিত্তিপ্রস্তর নাড়িয়ে দিল।

ঘরের চালে তখন বাইরের টিপ টিপ বৃষ্টির শব্দ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বারান্দার টবে ভেজা পাতার গন্ধ ভেসে আসছে। মৌসুমী বালিশে মুখ গুজে রেশমি চাদরটা দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর চোখে তখন কোনো ঘুম নেই, আছে এক তীব্র অস্থিরতা আর নিষিদ্ধ অনুভূতির সাথে একাকী এক যুদ্ধের ক্লান্তি।
একুশ আর বায়ান্নর এই অদ্ভুত অংকের হিসাব মেলাতে মেলাতে, ছটফট করতে করতেই একসময় ভোরের দিকে ক্লান্ত ঘুমে ঢলে পড়লেন মৌসুমী।
[+] 8 users Like Orbachin's post
Like Reply
#18
Darun
[+] 1 user Likes Saj890's post
Like Reply
#19
Wonderful update and keep rocking
Like Reply
#20
Darun darun hoche.. Dada khub bhalo cholche chalia jan
Like Reply




Users browsing this thread: 1 Guest(s)