20-06-2026, 04:30 PM
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
|
Romance কিছু সম্পর্ক
|
|
20-06-2026, 04:30 PM
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে, ঠিক আমার মতো — অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
28-08-2026, 06:50 PM
কিছু সম্পর্কঃ ৯ (ছ) এর পরের অংশ……
বিকেল গড়াতেই জয় আর রানী আবার হসপিটালে উপস্থিত হলো। তখন অবশ্য রহিম ঘুমিয়ে পড়েছে। জান্নাত সোফায় বসে মোবাইল স্ক্রল করছে, যেখানটায় কিছুক্ষণ আগেও ওর বাবা জয়নাল বসে ছিল। আর আয়শা ছোট চেয়ারে বসে আছে। ঘরে শব্দ বলতে শুধু এসির একটা মৃদু গুঞ্জন। কাচের জানালা পেরিয়ে বিকেলের আলো কেবিনের সাদা দেয়ালে এসে কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। জয় দ্বিতীয় বিছানায় গিয়ে বসলো। জান্নাত মোবাইল থেকে চোখ তুলে একবার জয়ের দিকে তাকালো। সকালে যতটা শার্প দেখাচ্ছিলো, আশ্চর্যভাবে সারাদিন ভার্সিটিতে কাটিয়ে আসার পর এখন ওকে তার চেয়েও বেশি শার্প লাগছে। এমন নয় যে জয় ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট এসব নিয়ে খুব ভাবে, বা সেসবের পেছনে খুব দৌড়াদৌড়ি করে। তবুও আজকের জেল্লাটা একটু অন্যরকম। একটু আলাদা। মনে হচ্ছে, ওর ভেতরে কোথাও একধরনের গর্ব জমেছে। শুধু গর্ব নয়, তার সঙ্গে খুব সূক্ষ্ম একটা অহংকারও মিশে আছে। যেন সারাদিনের ভিড়, ক্লাস, ক্যাম্পাস, আড্ডা সব পেরিয়ে জয় এখানে ফিরেছে ক্লান্ত হয়ে নয়, বরং নিজের ভেতরে কোনো গোপন বিজয় নিয়ে। রানী প্রথমেই বসলো না। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো ঘুমন্ত রহিমের কাছে। বেডের মাথার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। রহিমের চোখগুলো আজ যেন একটু বেশি কোটরের ভেতর বসে গেছে। মুখের চামড়ায় ক্লান্তির টান। বুকটা শ্বাস নেওয়ার সাথে সাথে একটু বেশিই ওঠানামা করছে। খুব মৃদু, কিন্তু চোখে পড়ার মতো। কেবিনের সাদা আলোতে সেই ওঠানামাটা আরও স্পষ্ট মনে হচ্ছিলো রানীর কাছে। সকালেও রানী আব্বুকে দেখে গেছে। কিন্তু তখন এসব কিছু খেয়াল করা হয়নি। তখন ঘরে এত মানুষ, এত কথা, এত স্বস্তির ভান ছিল যে, আব্বুর শরীরের এই নীরব ক্লান্তি চোখে পড়েনি। আসলে মানুষকে সত্যি করে দেখতে হলে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখা প্রয়োজন। জেগে থাকা মানুষ কথা দিয়ে, হাসি দিয়ে, চোখের দৃষ্টি সরিয়ে অনেক কিছু লুকাতে পারে। কিন্তু ঘুমন্ত শরীর কিছু লুকাতে পারে না। ঘুমন্ত মুখ নিজের আসল চেহারা মেলে ধরে। রানী ছোট করে একটা নিঃশ্বাস ফেললো। স্বাভাবিক কোনো নিঃশ্বাস নয়। এই মুহূর্তে রানী কিছু একটা অনুধাবন করেছে। সে অনুধাবন করেছে, ওর আব্বুর বয়স হচ্ছে। যে আব্বুর উপস্থিতি এতদিন ওর কাছে নিরাপত্তার চাদরের মতো ছিল। যাকে ঘরে ঢুকতে দেখলেই মনে হতো, এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। আর ভয় নেই। যার গলা শুনলেই মনে হতো, বাইরে যত ঝড়ই থাকুক, ঘরের ভেতর এখনো আশ্রয় আছে। সেই আব্বু বদলে গেছে। ধীরে ধীরে, চোখের সামনে, দিনের পর দিন। অথচ রানী টেরই পায়নি। হয়তো মানুষ নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষদের বদলে যাওয়া সবচেয়ে শেষে বুঝতে পারে। কারণ প্রতিদিন দেখা মুখের ভাঙন আলাদা করে চোখে পড়ে না। শুধু একদিন হঠাৎ ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে মনে হয়, এই মানুষটা এত ক্লান্ত হলো কবে? আব্বুর মুখের সেই ক্লান্তিটা তখনও রানীর চোখের কোণে আটকে ছিল। তবে পেছনে থাকা এই মানুষগুলোর মাঝে থাকলে চাপটা নিজে থেকেই একটু হালকা হয়ে আসে। হয়তো এ কারণেই পেছনের ফিসফিস কথাগুলোও ধীরে ধীরে তার কানে ঢুকতে শুরু করল। “আমার কার্ড কই? নিজের মনে করে রেখে দেওয়ার ইচ্ছা আছে নাকি?” প্রথমে শুরু করলো জয়। “এই নে তোর কার্ড।” “পাঁচ হাজার কথা হইছিলো। তুই মনে হয় ভুলে গেছিস, মেসেজ আসে আমার মোবাইলে।” “বাকিটা গত কয়েক মাসে তোর আর তোর নায়িকার ড্রামা সহ্য করার জরিমানা।” কথাটা শুনেই রানী চট করে পেছনে ঘুরে তাকালো। জয়ের দিকে বা জান্নাতের দিকে নয়। প্রথমেই তাকালো আয়শার দিকে। আয়শা শুনেছে কিনা সেটা বোঝার চেষ্টা করলো। মুখে কিছু নেই, কিন্তু মনে মনে জয় আর জান্নাতকে অসংখ্য অভিশাপে ভাসিয়ে দিচ্ছে। এই দুজনের মুখে কোনো দরজা-জানালা নেই। যা খুশি, যেখানে খুশি, বলে ফেলতে পারে। আয়শার দিকে তাকাতেই আয়শা নরম করে নিজের চিরাচরিত মিষ্টি হাসি দিলো। তারপর চোখের ইশারায় রানীকে বসতে বললো। রানীও হেসে জান্নাতের পাশে গিয়ে বসে পড়লো। তবে হাসিটা ঠিক স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না, টেনে আনা হাসি ছিল। “দুপুরে কিছু খেয়েছিস? কলা আছে, দেই?” রানী বসতেই আয়শা ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলো। “না না, খাবো না বড় আম্মু।” রানীর পেটে আসলেই আর জায়গা নেই। ফেরার আগে জয় ওকে জোর করে বার্গার কিং থেকে বড় একটা বার্গার খাইয়ে এনেছে। আজ থেকে নাকি রানীর ওজন বাড়ানোই জয়ের একমাত্র গোল। আর জয় কথাগুলো খুব নিরীহ ভঙ্গিতে বলেনি। তাই বার্গার কিং-এর কথা মনে হতেই রানীর গালে লাল একটা শেড পড়ে গেলো। ওদিকে জান্নাত আর জয়ের কথাও চলছিল। জয় কার্ডটা পকেটে রাখতে রাখতে জান্নাতের পাশে রাখা প্যাকেটগুলোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “কি কিনলি?” জান্নাত হেসে বলল, “মনে কর, অস্ত্র-গোলাবারুদ।” “কার জীবন তামা তামা করতে যাচ্ছিস?” জয় একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বললো। “তোদের সাংবাদিকদের কাজই তো মানুষের জীবনে নাক গলানো।” “উহু, মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে নয়।” জান্নাত এবার একটু সোজা হয়ে বসলো। “তবে কারো জীবনযাপন যদি অন্য কারো জীবনকে বিষিয়ে তোলে, সেখানে নাক গলানোকে আমরা পবিত্র দায়িত্ব মনে করি।” শেষের কথাগুলো জান্নাত একটু উঁচু স্বরেই বলে ফেলেছিল। জান্নাতের উঁচু স্বর শুনে আয়শা বিরক্ত হয়ে দুজনকেই মৃদু ধমক দিলো, “আহ, চুপ কর তো তোরা। রহিম ভাই ঘুমাচ্ছে।” কথার ফাঁকে রহিম ঘুমের ভেতর সামান্য নড়লো। সঙ্গে সঙ্গে সবাই কয়েক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তারপর আবার কেবিনে এসির মৃদু গুঞ্জনটা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। আয়শা দুই ভাইবোনকে ধমক দিয়ে আবার রানীর দিকে নজর দিলেন। বললেন, “আচ্ছা কলা না খা, কমলা আছে। সেটা খা। কমলায় তো আর পেট ভরবে না।” রানী উত্তরে কিছু বলে ওঠার আগেই জান্নাত বলে উঠলো, “আম্মু!” সবাই তাকাতেই জান্নাত একটু আহত হওয়ার ভান করে বললো, “আমি এতক্ষণ ধরে এলাম, আমাকে তো কলা-কমলা কিছুই দিলে না?” জান্নাতের স্বরে স্পষ্ট খোঁচা। হিংসা নয়। বরং আয়শা যে রানীর সামনে একটু বেশি নরম হয়ে যায়, সেটাই ধরে ফেলেছে। “তুই নিয়ে খা, না করেছে কে?” ধরা পড়ে গিয়ে আয়শা নিজেকে ডিফেন্ড করলেন। “তুই ছোটবেলা থেকেই হিংসুক, আর হিংসুকই রয়ে গেলি জান্নাত।” পাশ থেকে জয় যোগ দিলো। জান্নাত এবার মায়ের দিক থেকে জয়ের দিকে ঘুরলো। “তুই তো বলবিই। তোর তো ভালোই লাগছে আম্মু রানীকে বেশি আদর করছে।” “হয়েছে হয়েছে।” রানী আর বেশি বাড়তে দিলো না জান্নাতকে। নিজেই উঠে গেলো। কলা-কমলা নিয়ে এসে জান্নাতকে একটা কলা আর একটা কমলা দিলো। জয়কেও একটা কমলা দিলো। কলা দিলো না। জানে, জয় কলা মুখেই তুলবে না। তারপর নিজে একটা কমলা নিয়ে সেটা খোসা ছাড়াতে শুরু করলো। একটা কোষ আয়শাকে দিলো, আরেকটা নিজের মুখে দিয়ে বললো, “এবার সবাই খুশি তো?” আয়শা হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতেই বললেন, “দেখছিস কেন আমি রানীর যত্ন নিই বেশি? আমার মা হয়।” কথাটা বলার পর আয়শা একটু চুপ করে রইলেন। হাসিটা মুখে থাকলেও দৃষ্টি যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য দূরে কোথাও চলে গেল। একবার ঘুমন্ত রহিমের দিকে তাকালেন, তারপর আবার রানীর মুখে ফিরে এলেন। ভবিষ্যৎ, নাকি অতীত, সেটা বোঝা গেল না। ****** রাজীব ঘুম থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলো। কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারলো না, সে কোথায় আছে। মাথার ভেতর ঘুমের ভার এখনো ঝুলে আছে। তারপর পাশে রাখা মোবাইলটা হাতে নিয়ে সময় দেখে নিলো। সন্ধ্যা হয়ে আসছে প্রায়। ধুর বাল, এতক্ষণ ঘুমাইলাম? বিছানা থেকে নামতেই শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করে উঠলো। দিনের বেলা লম্বা ঘুম দিলে রাজীবের শরীর কখনো ভালো লাগে না। বরং মনে হয় মাথার ভেতর তুলা ভরে রাখা হয়েছে। বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিলো। ঠাণ্ডা পানির ঝাপটায় চোখের লালভাব পুরো কাটলো না, তবে ঘুমের ধোঁয়াটা কিছুটা সরে গেল। আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে রাজীব নিজেই একটু বিরক্ত হলো। গাল, ঠোঁট, চোখ সব এখনো ঘুমের কারণে সামান্য ফুলে আছে। চোখের নিচের ক্লান্তিও পুরো যায়নি। দ্রুত একটা জিন্স আর টি-শার্ট পরে নিলো। তার উপর পাতলা একটা জ্যাকেট জড়িয়ে নিলো। চুলে কয়েকবার হাত চালিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করলো, কিন্তু চুলও যেন আজ নিজের মতো থাকতে চায়। নিচে নেমে দরজা খুলে উঠানে বেরিয়ে এলো। উঠানের বাতাসে দিনের গরম আর সন্ধ্যার ঠাণ্ডা মিশে আছে। চাবি দিয়ে দরজা বন্ধ করে বাইকের দিকে এগোলো। বাইকটা শেডের নিচে ছিল। সিটে হাত বুলিয়ে একবার দেখে নিলো, তারপর স্টার্ট দিলো। ইঞ্জিনের শব্দ উঠান ভরিয়ে দিতেই রাজীবের মনে হলো, একটু দেরি হয়ে গেছে। খুব বেশি নয় হয়তো, কিন্তু হাসপাতালের মানুষজন অপেক্ষা করছে, এই ভাবনাটুকুই ওর বুকের ভেতর হালকা অস্থিরতা তৈরি করলো। বাইক নিয়ে রাস্তায় উঠলো রাজীব। **** এদিকে কেবিনের ভেতর রহিম জেগে উঠেছে। বিছানার মাথার দিকটা একটু উঁচু করা। রহিম আধশোয়া হয়ে আছে, গায়ের উপর পাতলা চাদর। চোখে ঘুমের ভার আছে এখনো, কিন্তু মুখে আগের চেয়ে কিছুটা স্বস্তি। হাতে কমলার রসের একটা গ্লাস। ডাক্তার এসে দেখে গেছে। ছুটি দিয়েছে। ব্যাগপত্র প্রায় গোছানো। জয়নাল বিল পরিশোধ করে ফিরে এসেছে। তবু কেউ বের হচ্ছে না। যেন সব কাজ শেষ, কিন্তু একটা কিছু এখনো আটকে আছে। আয়শা ছোট টেবিলের পাশে চেয়ারে বসে ব্যাগ গুছাচ্ছে। রহিমের চশমার কেস, মোবাইল চার্জার, পানির বোতল, টিস্যু, ভাঁজ করা গামছা, এসব আলাদা করে রাখছে। মাঝে মাঝে ব্যাগের চেইন টেনে দেখে আবার খুলছে, যেন কিছু বাদ পড়ে গেছে কিনা তা নিজেই নিশ্চিত হতে পারছে না। জয়নাল দ্বিতীয় বেডে বসে আছে। হাতে হসপিটালের বিলের ফাইল। জান্নাত সোফার কোণায় বসে আছে। হাতে মোবাইল, স্ক্রল করছে। তবু ওর চোখ বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। মনোযোগ পুরোপুরি মোবাইলে নেই। জয় আর রানী রহিমের বিছানার কাছেই। রানী পায়ের দিকের পাশে বসে আছে, এক হাত চাদরের উপর রাখা। জয় দাঁড়িয়ে আছে ওর কাছাকাছি, বিছানার ধারের দিকে একটু ঝুঁকে। কিছুক্ষণ পর পর রহিম আর রানীর সাথে কথা বলছে। কথাগুলো যে ফানি সেটা রহিম আর রানীর মুখের হাসি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে রাজীব ঢুকলো। ঢুকতেই সবার আগে জান্নাত তাকালো রাজীবের দিকে। মোবাইলের স্ক্রিন তখনো ওর হাতে জ্বলছে, কিন্তু ওর চোখ আটকে গেল রাজীবের মুখে। ঘুম থেকে উঠেছে বোঝা যাচ্ছে। চোখ এখনো লালচে, গাল আর ঠোঁটে ঘুমের হালকা ফোলা ভাব। চুলও পুরোপুরি ঠিক হয়নি। জান্নাত খেয়াল করলো ঘরে ঢুকেই ছেলেটা নিজের ঘুম, নিজের ক্লান্তি সব গিলে ফেললো যেন। চোখ একবারেই কাজের জায়গাগুলো খুঁজতে শুরু করলো। জয়ও রাজীবকে দেখেই নিজের ভঙ্গি একটু বদলে নিলো। বিছানার দিকে ঝুঁকে থাকা শরীরটা সোজা করলো, কাঁধ সামান্য টানটান হলো। মুখের সেই হাসিখুশি ভাবটাও কিছুটা কমে গেলো, উধাও হলো না, কিন্তু আগের মতোও রইলো না। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এলো রানীর মাঝে। সেই সবচেয়ে বেশি স্টিফ হয়ে গেলো, একটু আগের সেই শিথিল ভাব রইলো না। রাজীবের সামনে জয়ের এত কাছাকাছি অবস্থান ওর কাছে এলার্মিং লাগে। আর কারো সামনে নয়, এমনকি নিজের বাবার সামনেও না। জান্নাত এখনো তাকিয়ে আছে রাজীবের দিকে। অন্যরাও তাকিয়েছে। ঘরে একজন মানুষ ঢুকলে তাকানোই স্বাভাবিক। জয়নাল তাকিয়েছে। আয়শা ব্যাগ থেকে মুখ তুলে তাকিয়েছে। রহিমও তাকিয়েছে, বরং রাজীবকে দেখেই তার চেহারা একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। রানী তাকিয়েছে, আর তাকিয়েই নিজের অবস্থান সামান্য পরিবর্তন করেছে। জয়ও তাকিয়েছে, আর সেই তাকানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভঙ্গি বদলে নিয়েছে। কিন্তু জান্নাতের তাকানো অন্য সবার চেয়ে আলাদা। ওর কাছে ব্যাপারটা শুধু ঘরে কেউ ঢুকেছে, এমন নয়। সে এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিল, কখন রাজীব ঢুকবে। আর রাজীব ঢোকার পর সে প্রকৃত অর্থেই দেখেছে ওকে। মুখের ঘুম, চোখের লালচে ভাব, চুলের অগোছালো অবস্থা, আর সেই সবকিছুর নিচে চাপা দেওয়া তাড়াহুড়ো, সব। আর সেই কারণেই ওর চোখ এড়ালো না, রাজীবের দৃষ্টি প্রথমে কোথায় গেল। স্বভাবতই, রাজীবের চোখ প্রথমে গেল রানীর দিকে। প্রথমে রাজীব খুঁজলো রানীর চোখ। গতকাল দুপুরের সেই চোখ। আতঙ্কে স্থির না থাকা মণি, অচেনা দৃষ্টি, কাউকে ঠিকমতো চিনতে না পারার সেই ভয়ের ঘোর। গাড়ির ভেতর কুঁকড়ে থাকা মুখ, হাতের অনিয়ন্ত্রিত কাঁপুনি, আর নিজের মানুষদের দিকেও যেন দূরের মানুষের মতো তাকানো। আজ সকালে রানী স্বাভাবিক ছিল। কথা বলেছে, হেসেছে, আব্বুর পাশে বসেছে। তবু রাজীবের ভেতরের দুশ্চিন্তা পুরো কাটেনি। এত সহজে কাটার কথাও নয়। গতকাল যা দেখেছে, সেটা একদিনের স্বাভাবিকতায় মুছে যাওয়ার মতো কিছু না। রানীকে দেখলেই এখন কিছুদিন রাজীব হয়তো আগে সেই দৃশ্যটাই দেখবে। তারপর বর্তমানের রানীকে মিলিয়ে নেবে। এই মুহূর্তেও তাই করলো। রানীর চোখে সেই ভয় আছে কি না, মুখে সেই শূন্যতা আছে কি না, শরীর আবার কুঁকড়ে আছে কি না, রাজীব এক ঝলকে দেখে নিলো। তারপর বুঝলো, না, রানী এখন ঠিক আছে। অন্তত এই মুহূর্তে ঠিক আছে। রানী ও খেয়াল করেছে , ভাই এর দৃষ্টি , সে কিছুটা আঙ্কনফর্টেবল ফিল করে আবার একটু নড়েচড়ে বসে , চোখ নামিয়ে নেয় । তারপরই রাজীবের চোখে পড়লো রানীর অবস্থান। রহিমের বিছানার পায়ের কাছে বসে আছে। আর জয় দাঁড়িয়ে আছে খুব কাছেই। এবার রাজীবের দৃষ্টি সামান্য থামলো। রাজীব যতক্ষণ ঘুমিয়েছে, মরার মতো ঘুমিয়েছে। সেই ঘুমে স্বপ্নও ছিল না। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগে যে চিন্তাটা মাথায় ছিল, সেটা আবার একবার উঁকি দিলো। তবে এই মুহূর্তে রাজীব সেটা নিয়ে তেমন ভাবলো না। ঘুমানোর আগে নিজেকেই তো বলেছে, রানীর প্রতি তার বিশ্বাস আছে। জয়কে হয়তো আগের মতো বিশ্বাস করতে পারছে না, কিন্তু রানীর উপর তার বিশ্বাস এখনো অটুট। নিজের বোনকে নিয়ে এমন ভাবনা দুর্বল মুহূর্তের ভাবনা ছাড়া আর কিছু নয়। তাই রাজীব সেই ভাবনাকে আর জায়গা দিলো না। ওর সামনে এখন অন্য কাজ আছে।
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে, ঠিক আমার মতো — অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
29-08-2026, 05:57 PM
(29-08-2026, 12:31 AM)Saj890 Wrote: Acter a long time জি ভাই, দেরি হয়ে গেলো । এত দেরির পর ও পড়েছেন তার জন্য ধন্যবাদ
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে, ঠিক আমার মতো — অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
29-08-2026, 06:41 PM
যাদের কাছে গল্পটা ভালো লেগেছে , তাদের অনুরধ করবো , প্রথম পোস্ট থেকে দেখেন একটু
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে, ঠিক আমার মতো — অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
30-08-2026, 10:59 AM
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে, ঠিক আমার মতো — অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
30-08-2026, 11:19 AM
প্রথম আর দ্বিতীয় পর্বে , কমিক স্টাইলে কিছু ছবি দিয়েছি , জানাবেন কেমন হয়েছে ।
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে, ঠিক আমার মতো — অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
30-08-2026, 02:44 PM
Bah fire elen... Khub bhalo laglo.. Bhalo hoche chalia jan
31-08-2026, 04:25 PM
(30-08-2026, 02:44 PM)Slayer@@ Wrote: Bah fire elen... Khub bhalo laglo.. Bhalo hoche chalia jan ধন্যবাদ ভাই,
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে, ঠিক আমার মতো — অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
01-09-2026, 08:44 AM
আপনি আবার ফিরে এসে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গল্প শেষ করার চেষ্টা করছেন দেখে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। নতুন আপডেট সুন্দর হয়েছে। কমিক ছবিগুলোও সুন্দর হয়েছে। নিয়মিত আপডেট চাচ্ছি।
01-09-2026, 03:23 PM
অনেক দিন ধরে "কিছু সম্পর্ক" গল্পটি পড়বো পড়বো করছিলাম,
কিন্তু আগের মত ফোরামে নিয়মিত আসা হয়ে ওঠেনা। পাশাপাশি সময়ের স্বল্পতা। সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়ে গতকাল রাত থেকে পড়তে শুরু করলাম। দারুণ লিখেছেন আপনি। সত্যিই ভালো লেগেছে। আপনার জন্য শুভকামনা।
01-09-2026, 04:11 PM
(01-09-2026, 08:44 AM)skam4555 Wrote: আপনি আবার ফিরে এসে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গল্প শেষ করার চেষ্টা করছেন দেখে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। নতুন আপডেট সুন্দর হয়েছে। কমিক ছবিগুলোও সুন্দর হয়েছে। নিয়মিত আপডেট চাচ্ছি। অনেক ধন্যবাদ ভাই , চেস্টা করবো নিয়মিত আপডেট দিতে
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে, ঠিক আমার মতো — অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
01-09-2026, 04:13 PM
(01-09-2026, 03:23 PM)Mohomoy Wrote: অনেক দিন ধরে "কিছু সম্পর্ক" গল্পটি পড়বো পড়বো করছিলাম, ধন্যবাদ , পড়ে জানাবেন ,যে কোন ধরনের সাজেশন দিতে পারেন । ভালো খারাপ দুই ই বলেতে পারেন । এখানে বলতে সমস্যা হলে পি এম করে জানাতে পারেন ।
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে, ঠিক আমার মতো — অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
01-09-2026, 09:34 PM
কিছু সম্পর্ক ঃ ৯ (ছ) এর শেষ অংশ
রাজীব রহিমের দিকে এগিয়ে যেতেই রহিম বলল, “রিলিজ হয়ে গেছে।” বলার ভঙ্গিতে একটা স্বস্তি আছে। যেন এতক্ষণ ওকে হসপিটালে আটকে রাখা হয়েছিল, আর এখন অবশেষে ছাড়া পেয়েছে। গলার স্বর এখনো দুর্বল, কিন্তু কথার ভেতর পুরনো রহিমের হালকা হাসি ফিরে এসেছে। “হুম, কিন্তু কোচিং নিয়ে কী বলেছে সেটা তো বললা না আব্বু।” রানী সাথে সাথেই রহিমের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল। তারপর নিজেই যোগ করলো, “ডাক্তার বলেছে আগামী পনেরো দিন কোনো ক্লাস নয়। তারপরও ক্লাস কমাতে হবে।” রহিম হাতে থাকা কমলার রসের গ্লাসে চুমুক দিলো। একটু খেয়ে নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “আচ্ছা বুঝেছি রে মা। এইবার একটু শান্তি দে। এই কথা এইবার নিয়ে কতবার বললি?” “একশ বার বলবে। তুই চুপ কর।” পাশ থেকে জয়নাল রানীকে সাপোর্ট দিলো। জয়নালের গলার জোর এমন, যেন ডাক্তার, নার্স, হসপিটালকেও হার মানায়। রহিম অসুস্থ, তাই এখন রহিমের নিজের কথারও খুব বেশি দাম নেই জয়নালের কাছে। বন্ধুর উপর এমন নির্দয় অধিকারই জয়নালের ভালোবাসার ভাষা। রাজীব দৃশ্যটা দেখে সামান্য হাসলো। “ঠিক আছে, আমি বিল দিয়ে আসি।” “তার আর দরকার নেই।” জয়নাল হাতে থাকা বিলের ফাইলটা সামান্য তুলে দেখালো। “বিল হয়ে গেছে।” তারপর ফাইলটা রাজীবের দিকে বাড়িয়ে দিলো। “যা, নার্সদের কাছ থেকে ফাইল বুঝে নিয়ে আয়। আমরা বের হই।” রাজীব ফাইলটা নিলো। নেওয়ার ফাঁকেই একবার রহিমের দিকে তাকালো। রহিম কিছু বললো না। শুধু চোখে একবার ইশারা করলো। খুব ছোট ইশারা। অন্য কারো চোখে হয়তো পড়ার কথাও নয়। কিন্তু রাজীব বুঝে গেলো। এখানে আর কোনো কথা নেই। জয়নাল কেন বিল দিল, এই প্রশ্ন রাজীব করতেও যেতো না। সে অধিকার বা সাহস, কোনোটাই নিজেকে দেয় না। তবুও একবার রহিমের কাছ থেকে আশ্বস্ত হয়ে নিলো। কারণ জয়নালের সঙ্গে সম্পর্ক একরকম, আর রহিমের নীরব সম্মতি আরেকরকম। দুটো আলাদা সুতোয় বাঁধা, কিন্তু একই গিঁটে এসে মিশে যায়। “ঠিক আছে।” রাজীব ফাইলটা হাতে নিয়ে বললো, “আমি অ্যাম্বুলেন্স করছি।” “আরে না, অ্যাম্বুলেন্স লাগবে না।” রহিম সাথে সাথে বাধা দিলো। “এমনি গাড়ি কর। আমি কি শুয়ে শুয়ে যাবো নাকি?” কথাটা পুরোপুরি রহিম-সুলভ। তাই রাজীব আর কোনো তর্ক করলো না। ও জানে, ওর বাবা কিছুতেই অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে সাইরেন বাজিয়ে এলাকায় ঢুকবে না। পারলে হেঁটে যাবে, যেন কিছুই হয়নি। “আচ্ছা ঠিক আছে, তবে আমি হুইলচেয়ার নিয়ে কোনো কথা শুনতে চাই না।” রাজীব সচরাচর বাবার সাথে এমন সরাসরি অথরিটি নিয়ে কথা বলে না। আজকে কথাটা ওর নিজের কাছেই নতুন কিছু মনে হলো। রহিম মুখ বাঁকালো। “এইটা আবার নতুন ঝামেলা দেখি, তুইও যোগ হলি।” রানী সাথে সাথে বললো, “ঝামেলা না। নিয়ম।” জয় পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বললো, “ছোট আব্বু, আজকে সংসদে বিরোধী দল একাই। সবাই সরকার পক্ষ।” রহিম এবার সত্যি হেসে ফেললো। হাসিটা খুব জোরালো নয়, তবু ঘরের ভেতরের হাওয়া আরও কিছুটা হালকা হলো। জয়নাল দ্বিতীয় বেড থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো, “সরকার পক্ষ না, জরুরি অবস্থা জারি হইছে। তুই চুপচাপ হুইলচেয়ারে বসবি। আমার গাড়ি নিচেই আছে। ধীরে সুস্থে নিয়ে যাবো। লোকজন ভাববে প্রধানমন্ত্রী হসপিটাল থেকে রিলিজ পাইছে।” পাশ থেকে আয়শা বলল, “তুমি সব সময়েই অতিরিক্ত কর।” “হুম করি। কোনো সমস্যা আছে কারো?” প্রশ্নটা করে জয়নাল সবার দিকে তাকালো, যেন চ্যালেঞ্জ করছে, কারো কিছু বলার আছে কিনা। কেউ কোনো উত্তর দিলো না সেই চ্যালেঞ্জের। শুধু আয়শা ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করলেন, আর রহিম কমলার রসের গ্লাসটা হাতে নিয়ে মুখ লুকিয়ে হাসলো। রাজীব ফাইলটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ালো। যাওয়ার আগে একবার রানীর দিকে তাকালো। খুব অল্প সময়ের জন্য। “আমি ফাইল নিয়ে আসি। ওষুধের নিয়মকানুনও বুঝে আসছি।” কথাটা বলে বেরিয়ে যাওয়ার সময় রাজীবের চোখ একবার জান্নাতের দিকে গেল। ততক্ষণে জান্নাত আর রাজীবের দিকে তাকিয়ে নেই। সে নিজের মোবাইলে কিছু একটা স্ক্রল করছে। তারপর দরজা খুলে রাজীব বেরিয়ে গেলো। আয়শা শেষবারের মতো দেখে নিলেন সব ঠিক আছে কিনা। জয়নাল জয়কে বললো ব্যাগ নিয়ে গাড়িতে রাখতে। জয় বিড়বিড় করতে করতে ব্যাগ নিলো, “শালা শেষ পর্যন্ত ব্যাগ আমার কাঁধে।” ***** ব্যাগপত্র যা ছিল, সব গাড়ির ডিকিতে তোলা হয়েছে। রাজীব হুইলচেয়ার ঠেলে রহিমকে নিয়ে আসছে গাড়ির সামনে। পাশেই রানী হাঁটছে। রহিমের বারবার আপত্তি সামলাচ্ছে সে। রানী না থাকলে মনে হয় রহিমকে এতক্ষণ হুইলচেয়ারে বসিয়ে রাখা যেত না। রহিম যতবার বলছে, “আমি হেঁটে যেতে পারবো,” রানী ততবারই হুমকি দিচ্ছে, “এক পা নামালে কিন্তু আমি আব্বু বলে ডাকবো না।” রহিম প্রতিবারই মুখ বাঁকাচ্ছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চুপচাপ বসে থাকছে। জয় গাড়ির সামনেই ছিল। নিজের মোবাইল বের করে ছবি তুলে বলল, “এটা বাঁধাই হবে। ছোট আব্বু অন হুইলস।” জান্নাত ওর পাশেই ছিল। সাথে সাথে ওর বাহুতে একটা চাপড় মেরে বলল, “তোর জোক দিন দিন গার্বেজ হচ্ছে, সেটা কি জানিস?” এদিকে রাজীব আর রানী, দুজনের মুখ থেকেই প্রায় কিছু একটা বেরিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সাথে সাথে দুজনেই সেটা থামিয়ে দিলো। রানী চোখ পাকিয়ে জয়কে শাসাতে গিয়েও থেমে গেল। তারপর আড়চোখে একবার রাজীবের দিকে তাকালো। আর রাজীব নিজের কথাটা গলার ভেতরেই আটকে ফেললো। কয়েক মাস আগেও হলে সে নির্দ্বিধায় বলে দিতো। জয়কে এমন ফালতু জোকের জন্য এক ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিতো। কিন্তু এখন কথাটা মুখ পর্যন্ত এসে আর বের হলো না। তবে রানীর মতো রাজীবের চোখে-মুখে সেটা ফুটে উঠলো না। বাইরে থেকে ওকে একই রকম শান্ত দেখাচ্ছিল। শুধু হুইলচেয়ারের হাতলে ওর আঙুলের চাপটা সামান্য শক্ত হয়ে গেল। রহিম রাজীবের কাঁধে ভর করে গাড়িতে উঠে গেলো। জয় ড্রাইভিং সিটে। জয়নাল তার পাশের প্যাসেঞ্জার সিটে। পেছনে রহিমের এক পাশে আয়শা, অন্য পাশে রানী। রানী বসার পর ওর ওড়নার এক কোণা দরজার বাইরে বেরিয়ে ছিল। রাজীব সেটা দেখে নিচু হয়ে তুলে ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। তারপর দরজা লাগিয়ে বলল, “আমি আসছি বাইকে।” গাড়ি স্টার্ট হলো। জয়নাল শেষবারের মতো জয়কে বলে দিলো, গাড়ি যেন দেখে চালায়। পেছন থেকে রহিম বলল, “আমার শরীর কাঁচের না যে ভেঙে যাবে। জয়, তুই ঠিকমতো চালা তো।” কিন্তু জয়নালের মুখ দেখেই জয় বুঝে গেলো, আসলে কীভাবে চালাতে হবে। তবু পেছনে ঘুরে রহিমের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি চিন্তা করো না ছোট আব্বু, আমি উড়াইয়া নিয়া যাবো।” কথাটা বলার ফাঁকে একবার রানীর দিকেও তাকিয়ে নিলো। দুজনের চোখ মিললো সবার অলক্ষ্যে। তবে রানীর চোখে হাসি ছিল না, শাসন ছিল। যেন বলছে, দাঁড়াও, তোমাকে পেয়ে নেই। অন হুইলস বুঝাবো। গাড়ি রাজীবের সামনে দিয়েই বেরিয়ে গেলো। রাজীব দাঁড়িয়ে একটা ছোট শ্বাস ফেললো। দীর্ঘশ্বাস নয়। যেন একটা কাজ শেষ হয়েছে, তাই শরীরের ভেতর আটকে থাকা শ্বাসটা নিজে থেকেই বেরিয়ে এলো। তারপরই খেয়াল করলো, জান্নাতও পাশে দাঁড়িয়ে আছে। রাজীব এতক্ষণ এটা ভাবেনি। নার্স স্টেশনে যাওয়ার আগে একবার চোখ পড়েছিল, তারপর আর জান্নাতের অবস্থান ওর খেয়াল ছিল না। ও ভেবেছিল, একাই বাইকে যাবে। হঠাৎ দেখে একটু অবাকই হলো। “তুই আছিস? গাড়িতে যাস নাই?” জান্নাতের ঠোঁট দুটো একটু শক্ত হলো রাজীবের কথা শুনে। অবশ্য সাথে সাথেই সেটা আবার চলে গেল। তার বদলে একবার আই রোল করে বলল, “আমি যে কবে থেকে অদৃশ্য হওয়ার পাওয়ার পেলাম, সেটাই তো জানতে পারলাম না।” কথাটা মজা করে বলা হলেও এর অর্থ রাজীব বুঝতে পারলো। মজার আড়ালে ছোট একটা খোঁচা আছে। তবে এই কথার বিপরীতে বলার মতো কিছু ওর কাছে এখন নেই। তাই বলল, “তোর অদৃশ্য হওয়ার না, অন্য সুপার পাওয়ার আছে। এখন চল যাই, আগে যেতে পারলে ভালো হবে।” এই বলে রাজীব বাইকের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। জান্নাত ফলো করলো না। উল্টো রাজীবকে থামিয়ে দিলো। “এই, দাঁড়া। দুপুরে কিছু খেয়েছিস তুই?” না, রাজীব দুপুরে কিছু খায়নি। সকালে হসপিটাল থেকে নাস্তা করে গিয়ে গোসল করে যে ঘুম দিয়েছিল, সেটা ভাঙতেই দেরি হয়ে গিয়েছিল। উঠেই সরাসরি হসপিটাল চলে এসেছে। খাওয়ার কথা মাথায় আসেনি। হসপিটালে এসেও সময় হয়ে ওঠেনি। রিলিজ, নার্স স্টেশন, বাবাকে গাড়িতে তোলা, এইসবেই সময় পেরিয়ে গেছে। জান্নাত কথাটা তুলতেই ওর নিজের খাবারের প্রয়োজন মনে এলো। “বাসায় গিয়ে খেয়ে নেবো। এখন সময় নাই।” “তোরে কি আমি ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে আমন্ত্রণ জানিয়েছি?” জান্নাত রাস্তার পাশের ফুড ভ্যানটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওই দেখ, স্যান্ডউইচ বিক্রি করতেছে। ওইখান থেকে দুইটা খেয়ে নে।” কথাটা বলে জান্নাত রাজীবের বাহু ধরে প্রায় টেনেই নিয়ে যেতে চাইলো। রাজীবের মনে গতকালের কথা ভেসে উঠলো। রাজীব খাচ্ছে, আর জান্নাত তাকিয়ে দেখছে। ওই তাকানো নিজের উপর আরেকবার অনুভব করতে রাজীবের খারাপ লাগবে না। কিন্তু কিছু একটা ওকে বাধাও দিচ্ছে। তাই বলল, “আরে সময় নেই। এখন চল, তাড়াতাড়ি বাড়ি যাই। গিয়ে খেয়ে নেবো।” জান্নাত এবার থেমে গেল। কোমরে দুই হাত রেখে রাগী স্বরে জিজ্ঞাসা করলো, “ক্যান? তুই কি ব্রিটিশ?” “মানে?” “মানে দুইটা স্যান্ডউইচ খেতে তোর দুই ঘণ্টা লাগবে? প্রথমে চোয়ালের এক পাশে নিয়ে ষোলো বার, তারপর অন্য পাশে নিয়ে ষোলো বার চাবানোর পর গিলবি?” জান্নাতের এই কথা শোনার পর রাজীব আর কিছু বলতে পারলো না। হেসেই ফেললো। গতকালের পর থেকে এই প্রথম মন খুলে হাসা। তারপর জান্নাতের পেছনে পেছনে সেই ফুড ভ্যানের সামনে গিয়ে দুটো স্যান্ডউইচ খেলো। স্বাদ যাচ্ছেতাই। কিন্তু সঙ্গটা এই যাচ্ছেতাই স্যান্ডউইচকেও অন্য অর্থ দিচ্ছে।
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে, ঠিক আমার মতো — অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
03-09-2026, 06:40 PM
(This post was last modified: 03-09-2026, 06:41 PM by KK001. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
valo golpo
17-09-2026, 08:15 AM
আপডেট চাই
19-09-2026, 10:05 PM
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে, ঠিক আমার মতো — অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ। |
|
« Next Oldest | Next Newest »
|