Thread Rating:
  • 8 Vote(s) - 3.38 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Adultery একলা চলো রে..LOVE, SEX AUR DHOKA
#41
## পঞ্চদশ পর্ব

পুরান ঢাকার সেই ঘিঞ্জি ও সংকীর্ণ গলির ল্যাম্পপোস্টের ঝাপসা আলোর নিচে তখন এক চরম থমথমে ও বরফশীতল পরিবেশ বিরাজ করছে। বাতাসে যেন পিনপতন নিস্তব্ধতা। রাস্তার পাশে পার্ক করা সিলভার সেডান গাড়িটার ঠিক পাশেই ঘটে যাওয়া দৃশ্যটি আবদুল মালেকের চোখের সামনে এমন এক ধাক্কা দিয়েছে যে তার ভেতরের সমস্ত পৃথিবী যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেছে।

ক্লান্ত শরীর আর হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে বাড়ি ফেরা একজন স্বামী তার নিজের বাড়ির ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে নিজ চোখে দেখল যে, তার কোম্পানির চেয়ারম্যান—যাকে সে দেবতার মতো ভক্তি করে, আর তার নববিবাহিতা স্ত্রী—যাকে সে নিজের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছে—তারা দুজন গভীর রাতে এমন এক অন্তরঙ্গ ও খোলামেলা চুম্বনে মগ্ন!

মালেকের মুখ দিয়ে কেবল অবিশ্বাসের সুরে বেরিয়ে এসেছিল—*"ইতি!"*

সেই একটিমাত্র শব্দে রাতের বাতাস যেন কেঁপে উঠেছিল। চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরী এবং ইতি—দুজনেই এমনভাবে থতমত খেয়ে দূরে সরে দাঁড়িয়েছিল, যেন তারা হাতেনাতে কোনো অপরাধের দায়ে ধরা পড়ে গেছে। আলতাফ সাহেবের ফর্সা ও শক্তপোক্ত মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। তিনি তো এত বড় একজন কোম্পানির চেয়ারম্যান, কর্পোরেট দুনিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি—আজ একটা সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের সামনে এমন অপ্রস্তুত ও অপরাধী অবস্থায় পড়তে হবে, তা তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি।

আর ইতির কথা তো বলাই বাহুল্য। তার ভেতরকার ধূর্ত ও প্রখর বুদ্ধি তখন ১০০ মাইলের গতিতে কাজ শুরু করে দিয়েছে। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল যে এই মুহূর্তে যদি সে কোনো ভুল করে বা সত্য স্বীকার করে, তবে শুধু তার সংসারটাই ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে না, বরং মালেকের অন্ধ বিশ্বাস চিরতরে শেষ হয়ে যাবে এবং একটা বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে যাবে। তাই এক সেকেন্ডের জন্যও সময় নষ্ট না করে ইতি তার মনের ভেতরকার সমস্ত অভিনয় দক্ষতা ও চতুরতাকে এক জায়গায় এনে এক মাস্টারপিস মিথ্যাচারের জাল বুনতে শুরু করল।

-----
মালেক যখন বিশ্বাস করতে না পেরে চোখ দুটো বড় বড় করে পা কাঁপাতে কাঁপাতে সামনে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই ইতি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে অত্যন্ত দ্রুত পায়ে দৌড়ে স্বামীর কাছে গিয়ে পৌঁছাল। সে মালেকের হাত দুটো এক মুঠোয় শক্ত করে ধরে ফেলল।

ইতির মুখে তখন কোনো ভয়ের ছাপ নেই, বরং তার চোখে মুখে ছিল এক কৃত্রিম উদ্বেগ ও ভয়ের দারুণ এক অভিব্যক্তি। সে এমনভাবে হাঁপাতে শুরু করল, যেন সে নিজে কোনো মারাত্মক বিপদের মধ্য দিয়ে গেছে।

ইতি একটু উচুঁ গলায়, কিন্তু অত্যন্ত নাটকীয় ও উদ্বেগের সুরে বলে উঠল, "মালেক! তুমি এতক্ষণে এলে? আল্লাহর দোহাই লাগে, তাড়াতাড়ি করো! এসো, তাড়াতাড়ি ধরো স্যারকে!"

মালেক থমকে দাঁড়িয়ে হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে ইতির দিকে তাকিয়ে খাবি খাওয়া গলায় বলল, "ইতি... এ... এগুলো কী হচ্ছিল এখানে? আমি নিজের চোখে দেখলাম..."

"কীসব আজেবাজে বকছ!" ইতি মালেককে কথা শেষ করতে দিল না। সে কৃত্রিম রাগের সুরে ও অত্যন্ত চতুরতার সাথে বানিয়ে বানিয়ে বলতে শুরু করল, "মালেক, তোমার মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে নাকি! আসার পথে একটু ভালো করে দেখতে পারো না? একটু আগে হঠাৎ করে স্যারের মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল! উনার বুকটা কেমন যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিল, দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি তো ভয়ই পেয়ে গেছিলাম যে মানুষটা বুঝি এই পথেই মারা যান! উনি তখন কথাই বলতে পারছিলেন না, তাই আমি জল মুখে দিয়ে স্যারের মুখে মুখ লাগিয়ে একটু কৃত্রিম শ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম, যাতে উনার বুকটা একটু হালকা হয়! আর তুমি এসে উল্টাপাল্টা ভাবছ?"

কথাটা শোনার সাথে সাথেই আলতাফ সিরাজ চৌধুরী—যিনি কর্পোরেট দুনিয়ায় এত বছর ধরে হাজারো কঠিন পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় সামলিয়েছেন—তিনি ইতির এই বুদ্ধিমত্তা ও চতুর অভিনয় দেখে মনে মনে এক অদ্ভুত স্বস্তি পেলেন। তিনি পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ ইতির সাথে সুর মেলালেন।

আলতাফ সাহেব নিজের বুকটা হাত দিয়ে চেপে ধরে এমনভাবে জাঁকিয়ে একটা কাসুনি দিলেন—*মালেক! খিক-খিক!*—যেন তাঁর সত্যিই দম আটকে আসছে এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্টের সমস্যা হচ্ছে। তিনি কাঁপাকাঁপা ও রূঢ় গলায় বললেন, "মালেক... বাছা রে... আমার বুকটা... উফ! মনে হচ্ছে এখুনি আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে! একটু বাতাসে দম আটকে আসছিল... তোমার বউ তোমায় দেখে ভালোই হয়েছে, জলদি আমাকে একটু ঘরের ভেতরে নিয়ে চলো, বাবা! আমার বড় কষ্ট হচ্ছে!"

-----

মালেক হলো এমন একজন মানুষ, যার অন্তরে আলতাফ সাহেবের প্রতি অন্ধ ভক্তি ও বিশ্বাস শিকড় গেড়ে বসে আছে। সে এত বছর ধরে দেখে এসেছে এই মানুষটিই তাদের অন্নদাতা। তাই ইতি যখন এত জোড় দিয়ে শ্বাসকষ্টের কথা বলল, আর খোদ চেয়ারম্যান সাহেব যখন নিজে বুকে হাত দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে সেই কথা সমর্থন করলেন, তখন মালেকের সরল ও অবুঝ মনে সামান্যতম সন্দেহের কোনো অবকাশই রইল না।

সে মুহূর্তের জন্য ভুলে গেল সে একটু আগে নিজের চোখে কী দেখেছে। তার সমস্ত রাগ, ক্ষোভ ও অভিমান এক পলকে কর্পূরের মতো উড়ে গিয়ে তার জায়গায় জমা হলো এক গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক।

মালেক দ্রুত এগিয়ে এসে আলতাফ সাহেবের অন্য হাতটি নিজের কাঁধের ওপর তুলে নিয়ে অত্যন্ত উৎকণ্ঠার সাথে বলে উঠল, "ওহ্‌ খোদা! স্যারের আবার এমন অ্যাটাক হলো কেন? দাঁড়ান স্যার, আমি ধরে নিয়ে যাচ্ছি। ইতি, তাড়াতাড়ি দরজা খোলো!"

ইতি তড়িঘড়ি করে পকেট থেকে চাবি বের করে ফ্ল্যাটের দরজাটা খুলে দিল। তারা দুজনে মিলে আলতাফ সাহেবকে ধরে সোজা ঘরের ভেতরে নিয়ে এল। ড্রয়িংরুমের সেই পুরোনো, জীর্ণ সোফাটায় আলতাফ সাহেবকে অত্যন্ত সাবধানে বসিয়ে দেওয়া হলো।

আলতাফ সাহেব সোফায় বসে নিজের কপাল ও গলার ঘাম মুছতে মুছতে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলতে লাগলেন। তাঁর অভিনয় এতটাই নিখুঁত ছিল যে দেখলে যে কেউ সত্যি সত্যি বিশ্বাস করবে তিনি কোনো মারাত্মক শারীরিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

মালেক খুব বিচলিত হয়ে সোফার সামনে দাঁড়িয়ে হাত কচলাতে কচলাতে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল, "স্যার, আপনার শরীরটা এখন কেমন লাগছে বলুন তো? আমি কি ডাক্তার ডাকব? কিংবা কোনো ইনহেলার বা ওষুধ আনব?"

আলতাফ সাহেব বুকে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে অত্যন্ত দুর্বল ও ক্ষীণ গলায় বললেন, "না... ডাক্তার এখনই লাগবে না, মালেক। একটু... একটু জল দাও তো বাবা। বুকে বড় চাপ লাগছে।"

ইতি সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘর থেকে দ্রুত এক গ্লাস ঠান্ডা জল এনে আলতাফ সাহেবের হাতে দিল। আলতাফ সাহেব সেই গ্লাসের জল এক চুমুকে শেষ করে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।

------
জল খাওয়ার পর আলতাফ সাহেবের মুখের ফ্যাকাশে ভাবটা কিছুটা কাটল বটে, তবে তিনি অভিনয় বজায় রেখে আগের মতোই দুর্বলভাবে সোফায় এলিয়ে বসে রইলেন।

ইতি তখন অত্যন্ত চতুরতার সাথে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল। সে তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে খুব উদ্বেগের সুরে বলল, "মালেক, শুধু জল খেলে তো হবে না। স্যারের বুকে যে টান ধরা ভাবটা দেখছি, উনার এখনো শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমাদের গলি থেকে মোড়ের ওই বড় ফার্মেসিটা তো এখনো খোলা আছে। তুমি দ্রুত দৌড়ে গিয়ে ফার্মেসি থেকে স্যারের জন্য শ্বাসকষ্টের একটা ভালো কিছু ওষুধ নিয়ে এসো তো!"

মালেক একটুও দেরি করল না। সে মনিবের এই চরম অসুস্থতার খবর শুনে পুরোপুরি বিচলিত হয়ে পড়েছিল। সে তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি এখুনি যাচ্ছি ইতি! এক মিনিটও দেরি করব না।"

বলেই মালেক আর এক মুহূর্ত কেবিনের ভেতরে দাঁড়াল না। সে দ্রুত পায়ে ড্রয়িংরুম থেকে বেরিয়ে বাইরে গিয়ে দরজাটা একটু টেনে দিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল—ফার্মেসি থেকে ওষুধ আনার জন্য সে তখন পুরোপুরি অন্ধের মতো ছুটে চলেছে।

----

মালেকের পায়ের শব্দ সিঁড়ি দিয়ে নিচে মিলিয়ে যাওয়ার শব্দটুকু পেতেই—*কটকট* করে সে চলে যাওয়ার সাথে সাথে ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমের বাতাসটা হঠাৎ করেই পুরো বদলে গেল।

সোফায় বসা আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর অসুস্থতার সেই ভান করা দুর্বলতা মুহূর্তের মধ্যে উবে গেল। তাঁর চোখের ভেতর তখন ফুটে উঠল এক তীব্র, আদিম ও সর্বগ্রাসী কামনার আগুন। তিনি এক ঝটকায় সোজা হয়ে সোফায় বসে পড়লেন।

আর ইতি? সে দরজার ছিটকানিটা ভালোভাবে আটকে দিয়ে যখন ঘুরে দাঁড়াল, তখন তার মুখের সেই উদ্বেগের নাটকীয় ভান পুরোপুরি উধাও। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলছে এক বিজয়ী, ধূর্ত ও দুষ্টুমিভরা হাসি।

ইতি আলতাফ সাহেবের খুব কাছে এগিয়ে এল। সে খিলখিল করে হেসে ফিসফিস করে বলল, "কী দারুণ অভিনয়টাই না করলাম, স্যার! দেখলেন তো? আস্ত একটা বাঘের মুখ থেকে কীভাবে শিকার ছিনিয়ে আনলাম বলুন তো?"

আলতাফ সাহেব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি সোফা থেকে এক লাফে উঠে দাঁড়ালেন এবং নিজের দুই শক্তিশালী হাত দিয়ে ইতিকে সোজা নিজের কোলে তুলে নিলেন!

ইতি মৃদু একটা চকিত শব্দ করে আলতাফ সাহেবের গলায় নিজের দুই হাত জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল। সে আলতাফ সাহেবের কোলের ওপর একপাশে বসে ফিসফিস করে বলল, "ওরে বাবা! এত শক্তি আপনার কোথায় লুকিয়ে থাকে, স্যার? একটু আগে তো মনে হচ্ছিল আপনি সত্যিই মারা যাচ্ছেন!"

আলতাফ সাহেব ইতির নরম চিবুকটা নিজের এক হাতে শক্ত করে ধরে অত্যন্ত উত্তাল ও পাগলপারা গলায় বললেন, "তুমি যা বুদ্ধি খাটিয়েছ, ইতি—তাতে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ এক মুহূর্তে টেকে গেছে! তুমি আস্ত একটা জাদুকরী মেয়ে! এখন বলো, ওই বোকা গার্ডটাকে তো বাইরে পাঠিয়ে দিলে, আর কতক্ষণ সময় আছে আমাদের হাতে?"

ইতি তার চোখের চাউনি আরও একটু মাদক করে, ব্লাউজের ভাঁজে হাত রেখে আলতাফ সাহেবের বুকের খুব কাছাকাছি মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, "সময় বেশিক্ষণ নেই, মালেক ওষুধ নিয়ে ফিরে আসতে বড় জোর দশ মিনিট লাগবে। দেখি আপনি কিভাবে কাজে লাগান, স্যার!"
-----

আর কোনো কথা নয়। আলতাফ সিরাজ চৌধুরী আর ইতি—দুজনেই যেন আর এক মুহূর্তও নষ্ট করতে রাজি ছিল না। একটু আগে গলির মোড়ে যে অসম্পূর্ণ চুম্বনটুকু মালেকের উপস্থিতির কারণে থমকে গেছিল, সেই ক্ষোভ, সেই ভয় আর সেই লুকিয়ে থাকা উত্তেজনার সমস্ত বহিঃপ্রকাশ যেন এই দশ মিনিটের ছোট্ট পরিসরে ঘটে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো।

আলতাফ সাহেব নিজের মুখটা একেবারে নামিয়ে এনে ইতির সেই লালচে ও আকর্ষণীয় ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো সজোরে চেপে ধরলেন।

সে এক অত্যন্ত পাগলাটে, হিংস্র ও ব্যাকুল চুম্বন। ইতিও বিন্দুমাত্র পিছু হটল না; সেও আলতাফ সাহেবের শার্টের কলার খামচে ধরে, নিজের সমস্ত উষ্ণতা ঢেলে দিয়ে সেই চুম্বনের চরম প্রতিদান দিতে শুরু করল। তাদের ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের ঘর্ষণে রুমের ভেতরে এক অদ্ভুত কামোদ্দীপক শব্দের সৃষ্টি হলো। দুজন মানুষ যেন এই দুনিয়ার সমস্ত নিয়ম, সমস্ত পাপ-পুণ্য এবং সমস্ত ভয়ের সীমানা ছাড়িয়ে একে অপরের ঠোঁটের ভেতরে পুরোপুরি হারিয়ে গেল।

বাইরে তখন গভীর রাতের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়ে আসছে, গলির মোড় দিয়ে মালেকের ফিরে আসার সময় ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে তখন বইছে এক নিষিদ্ধ ও সর্বনাশা উন্মাদনার ঝড়—যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো রাস্তা বাকি নেই। (চলবে)
[+] 4 users Like Romzan83's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#42
[Image: IMG-20260813-072527-059.png]
[+] 1 user Likes Romzan83's post
Like Reply
#43
ষোড়শ পর্ব

পুরান ঢাকার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমের নিবু নিবু আলোয় তখন এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও নিষিদ্ধ পরিবেশ বিরাজ করছে। ফ্ল্যাটের মেইন দরজার ছিটকানিটা একটু আগে ভেতর থেকে ভালোভাবে আটকে দেওয়া হয়েছিল। সোফাতে বসা প্রৌঢ় শিল্পপতি আলতাফ সাহেব আর তাঁর ছদ্মবেশী চতুর প্রেমিকা ইতি—দুজনের শরীরের ভাষা বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে, তারা ঠিক কোন মানসিক অবস্থায় রয়েছে।

একটু আগে গলির মোড়ে স্বামী মালেকের উপস্থিতির কারণে যে অসম্পূর্ণ চুম্বনটুকু থেমে গিয়েছিল, তার সমস্ত ক্ষোভ, ভয় আর তীব্র কামনার বহিঃপ্রকাশ এখন এই রুদ্ধদ্বার কক্ষের ভেতরে ঘটার অপেক্ষায়।

দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দটুকু পেতেই, সোফাতে বসা আলতাফ সাহেবের অসুস্থতার ভান করা দুর্বলতা কর্পূরের মতো উবে গেল। তাঁর ষাটোর্ধ শক্তপোক্ত শরীরের ভেতর যেন এক নতুন যৌবনের জোয়ার বইতে শুরু করল। তিনি আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে, নিজের সমস্ত পুরুষালি আবেগ দিয়ে সোফাতে বসা ইতিকে সজোরে নিজের কোলে টেনে বসিয়ে নিলেন।

ইতি মৃদু একটা চকিত শব্দ করে, কিন্তু কোনো প্রতিবাদ না করে খিলখিল করে হেসে উঠল। সে আলতাফ সাহেবের কাঁধের ওপর নিজের দুই সুগঠিত হাত জড়িয়ে ধরে খুব আদুরে ও প্রলুব্ধকারী গলায় ফিসফিস করে বলল, "কী ব্যাপার, স্যার? একটু আগে তো মনে হচ্ছিল আপনি বুঝি এই পথেই মারা যাচ্ছেন। এখন আবার এত শক্তি কোথায় পেলেন?"

আলতাফ সাহেব ইতির সেই লালচে ও আকর্ষণীয় চিবুকটা নিজের দুই আঙুলের মাঝখানে ধরে মুখটা একটু ওপরের দিকে তুলে ধরলেন। তাঁর চোখ দুটো তখন কামনায় দাউ দাউ করে জ্বলছে। তিনি একেবারে রুদ্ধশ্বাসে বললেন, "তুমিই তো আমার সঞ্জীবনী সুধা, ইতি! ওই বোকা গার্ডটাকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে তুমি আমার জীবনটাই বাঁচিয়ে দিলে। এখন তো আমার সারা শরীর দিয়ে কেবল আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে।"

বলেই তিনি নিজের মুখটা নামিয়ে এনে সরাসরি ইতির নরম ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো সজোরেঁ চেপে ধরলেন!

সে এক অত্যন্ত পাগলাটে, হিংস্র ও ব্যাকুল চুম্বন। ইতিও বিন্দুমাত্র পিছপা হলো না; সেও আলতাফ সাহেবের শার্টের কলার খামচে ধরে, নিজের সমস্ত উষ্ণতা ঢেলে দিয়ে সেই চুম্বনের চরম প্রতিদান দিতে শুরু করল। তাদের ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের ঘর্ষণে রুমের ভেতরে এক অদ্ভুত শব্দ সৃষ্টি হলো। দুজন মানুষ যেন এই দুনিয়ার সমস্ত নিয়ম, সমস্ত পাপ-পুণ্য এবং সমস্ত ভয়ের সীমানা ছাড়িয়ে একে অপরের ঠোঁটের ভেতরে পুরোপুরি হারিয়ে গেল।

চুম্বনের আবেশে আলতাফ সাহেব পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে গেলেন। তিনি যেন আর এই মোহাচ্ছন্ন আবেশ থেকে বের হতে চাইছিলেন না। তিনি ইতিকে আরও শক্ত করে নিজের বাহুডোরে বেঁধে ফেললেন, যেন সে হারিয়ে যাবে।
-----
ঠিক সেই মুহূর্তেই—যখন তাদের চুম্বনের জোয়ার চরমে উঠেছে, তখন বাইরে থেকে ভেসে এল কড়া নাড়ার শব্দ—*কটকটকট*।

আলতাফ সাহেব আর ইতি—দুজনেই একসাথে চমকে গিয়ে চুমু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তাদের দুজনেরই নিশ্বাস তখন ভারী হয়ে আছে, কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।

বাইরে থেকে আবদুল মালেকের উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "ইতি! দরজা খোল! আমি ওষুধ নিয়ে এসেছি।"

ইতি তড়িঘড়ি করে আলতাফ সাহেবের কোল থেকে নেমে সোজা হয়ে বসল। তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল, তবে সে বিন্দুমাত্র ঘাবড়ে না গিয়ে দ্রুত নিজের শাড়ির আঁচলটা ও খোলামেলা ব্লাউজটা ঠিকঠাক করে নিল। সে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে একটু দুষ্টু হাসি দিয়ে ফিসফিস করে বলল, "উফ! এই লোকটা ঠিক সময়েই হাজির হয়! আপনি একটু সোজা হয়ে বসুন, আমি দরজা খুলে দিচ্ছি।"

ইতি দ্রুত পায়ে হেঁটে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মালেক তখন চরম উৎকণ্ঠায় হাঁপাচ্ছে, তার হাতে ফার্মেসির একটা ছোট কাগজের ব্যাগ। সে দৌড়ে ঘরে ঢুকে সোফাতে বসা আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন গলায় বলল, "স্যার! ফার্মেসি থেকে এই সিরাপ আর এই জরুরি ওষুধগুলো নিয়ে এলাম। আপনার শরীর এখন কেমন লাগছে? আমি কি অ্যাম্বুলেন্স ডাকব?"

ইতি তখন অত্যন্ত চতুরতার সাথে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে স্বামীর হাত থেকে ওষুধের ব্যাগটা নিয়ে নিল। সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, "মালেক! তোমার এত দৌড়ানোর দরকার ছিল না। স্যার একটু জল খেয়ে এখন আগের চেয়ে একটু ভালো অনুভব করছেন। তুমি এখন আর অ্যাম্বুলেন্সের কথা ভাবো না। আমি এখনই স্যারের জন্য ওষুধ রেডি করে আনছি। তুমি বরং স্যারের কাছে থাকো, আমি আসছি।"

বলেই ইতি ওষুধের ব্যাগটা নিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

-----

রান্নাঘরের অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে ইতি তার সমস্ত চতুর বুদ্ধি কাজে লাগাল। সে জানে, আলতাফ সাহেবের কোনো শ্বাসকষ্ট ছিল না, এটা পুরোপুরি একটা নাটক। কিন্তু এই নাটকটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য তাকেও একটা কিছু তৈরি করে খাওয়াতে হবে।

সে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে একটা ছোট স্টিলের বাটিতে কিছুটা জল গরম করতে বসল। তারপর ফার্মেসির ব্যাগ থেকে কাশির সিরাপের বোতলটা বের করে তার ঢাকনাটা খুলে ফেলল। সে জানে, এই সিরাপ খেলে ঘুম পায়, যা আলতাফ সাহেবের এখন প্রয়োজন নেই। তাই সে সিরাপের বোতলটা না খুলে একপাশে রেখে দিল।

তার বদলে সে বুদ্ধি করে রান্নাঘরের সেলফ থেকে এক টুকরো আদা, গোলমরিচ, লবঙ্গ, আর মধু বের করল। সে খুব সাধারণ একটা তুলসী পাতার চা বা ক্বাথ তৈরি করার নাটক করল। সে আদা থেঁতো করে গরম জলে ফেলে তাতে লবঙ্গ, গোলমরিচ আর মধু মিশিয়ে একটা ক্বাথ তৈরি করল।

এই পুরো প্রক্রিয়াটা করতে তার মাত্র পাঁচ মিনিট লাগল। ক্বাথটা যখন হালকা গরম হয়ে এল, তখন সে সেটাকে ছেঁকে একটা সুন্দর কাঁচের গ্লাসে ঢেলে নিল।

ইতি মনে মনে খলখল করে হাসতে লাগল—সে খুব ভালো করেই জানে যে সে তার এই 'মায়াবী ক্বাথ' বা 'মিথ্যাচারের অমৃত' দিয়ে কীভাবে তার সরল স্বামী আর লোলুপ চেয়ারম্যান—দুজনকেই বোকা বানাতে যাচ্ছে। সে তার তৈরি করা সেই সাধারণ ক্বাথের গ্লাসটা হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়াল।

------

ড্রয়িংরুমে ফিরে এসে ইতি দেখল, দৃশ্যপট পুরো বদলে গেছে। মালেক তার মনিব আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর পায়ের কাছে বসে অত্যন্ত ভক্তিভরে আলতাফ সাহেবের বড় দুটো পা টিপে দিচ্ছে। আলতাফ সাহেব সোফাতে এলিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে আছেন, আর মালেক তাঁর পা টিপতে টিপতে অত্যন্ত কাতর গলায় বলছে, "স্যার, আমার যদি একটু আগে ভুল বুঝার জন্য ক্ষমা করবেন। আমি তো জানতাম না আপনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আপনার শরীর যেন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে—আমি আল্লাহর কাছে এই দোয়াই করি।"

দৃশ্যটা দেখে ইতির বুকের ভেতরকার অহংকার আরও বেড়ে গেল। সে যে জাল বুনেছে, তাতে তার স্বামী নিজেই কীভাবে নিজেকে সঁপে দিয়েছে, তা দেখে সে অবাক হলো।

ইতি মিষ্টি হেসে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল, "মালেক, তুমি থামো। আমি স্যারের জন্য একটা ক্বাথ তৈরি করে এনেছি। এটা খেলে স্যারের বুকের ব্যথা আর শ্বাসকষ্ট এক নিমেষে দূর হয়ে যাবে। দেখো স্যার, গরম আছে, একটু চুমুক দিয়ে খান।"

আলতাফ সাহেব চোখ খুলে ইতির হাত থেকে সেই গ্লাসটা নিলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন যে এটা কোনো আসল ওষুধ নয়, কিন্তু ইতির হাতের ছোঁয়া ও তার তৈরি করা এই পানীয় তাঁর কাছে অমৃতের চেয়েও বেশি মনে হচ্ছিল। তিনি ইতির দিকে তাকিয়ে এক চিলতে কৃতজ্ঞতার ভান করে বললেন, "ইতি, তুমি সত্যিই অনেক গুণবতী মেয়ে। এমন যত্ন এই জীবনে আমি কারো কাছ থেকে পাইনি।"

আলতাফ সাহেব সেই গরম ক্বাথটা ইতির হাত থেকে চুমুক দিয়ে পান করতে শুরু করলেন। তিনি ইচ্ছা করে নিজের একটু ভালো লাগার ও সুস্থ হওয়ার অভিনয় করতে লাগলেন—তিনি গ্লাসটা পান করার পর একটু জোরে শ্বাস ফেলে বললেন, "উফ! সত্যিই অনেক আরাম পেলাম, ইতি। বুকের চাপটা যেন হালকা হয়ে গেল। তোমার হাতের জাদুকরী ক্বাথ খেয়ে আমি যেন নতুন জীবন ফিরে পেলাম।"

মালেক তখন আনন্দে গদগদ হয়ে মাথা নাড়তে লাগল। তার মনিব সুস্থ অনুভব করায় সে যেন নিজের দুনিয়া ফিরে পেল। সে পরম ভক্তিতে আলতাফ সাহেবের পায়ের কাছে বসে রইল।

-----
আলতাফ সাহেব ক্বাথটা পুরোপুরি শেষ করে গ্লাসটা ইতির দিকে ফেরত দিলেন। তারপর তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না—তাঁর ভেতরের লোলুপতা ও মোহ এতটাই তীব্র হয়ে উঠল যে তিনি সবকিছু ভুলে গেলেন।

তিনি সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ইতিকে আবার নিজের বুকের কাছে টেনে নিলেন। ইতি আলতাফ সাহেবের বুকে মাথা রেখে মিষ্টি করে হাসল।

আলতাফ সাহেব ইতির চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে অত্যন্ত আবেগময় গলায় বলতে লাগলেন, "মালেক! তুমি তো তোমার স্ত্রীর প্রতি কর্তব্য পালন করে যাচ্ছ, কিন্তু তুমি যে এমন একজন দেবীতুল্য রত্নকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেয়েছ—তা তুমি জানো না! তোমার মতো ভাগ্যবানের পৃথিবীতে আর কেউ নেই, মালেক! তোমার স্ত্রী অনেক দয়ালু ও বুদ্ধিমতী। আজ যদি ও সঠিক সময়ে না থাকত তবে আমি হয়ত সত্যিই মারা যেতাম। তোমরা দুজন আমার অনেক বড় উপকার করলে।"

মালেক অন্ধ ভক্তিভরে মাথা নেড়ে সায় দিল। সে ভাবতেও পারল না যে তার এই দয়ালু মনিব ঠিক এই মুহূর্তেই তার স্ত্রীকে নিয়ে কী পরিকল্পনা করছে।

আলতাফ সাহেব আর কোনো কথা না বলে ইতিকে আরও শক্ত করে নিজের বাহুডোরে বেঁধে ফেললেন। তারপর মালেকের চোখের সামনেই—তার কোম্পানির মালিক তার সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রীর—তিনি অত্যন্ত নিচু ও ফিসফিসে গলায় ইতির কানের কাছে কিছু একটা বললেন, আর সাথে সাথেই নিজের মুখটা নামিয়ে এনে সজোরে ইতির কপালে অত্যন্ত গাঢ়, উষ্ণ ও দীর্ঘ সময় ধরে একটি চুমু খেলেন।

সেই চুমুটা ছিল মালিকের প্রতি আনুগত্যের উপহার—না, বরং সেটা ছিল এক সর্বনাশা ও লজ্জাজনক অধিকারের বহিঃপ্রকাশ!

মালেক তখন আনন্দে গদগদ হয়ে মাথা নিচু করে বসেছিল। সে বুঝতে পারল না যে তার সামনেই ঠিক কী ঘটে গেল। সে ভেবেছিল এটা কেবল তার মনিবের প্রতি তার স্ত্রীর দয়া ও করুণার পুরস্কার। কিন্তু সেই কপালে গাঢ় চুম্বনের মাধ্যমে আলতাফ সিরাজ চৌধুরী যেন ওই মুহূর্তেই মালেকের সমস্ত বিশ্বাস, সমস্ত সম্মান আর সমস্ত পুরুষত্বের চিরতরে পতন ঘটিয়ে দিলেন।

-----

কপালে গাঢ় চুম্বনের পর আলতাফ সাহেব সন্তুষ্টির হাসি হেসে ইতিকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, "আচ্ছা মালেক, রাত অনেক হয়েছে। আমি এখন যাই। তোমরা সাবধানে থেকো।"

মালেক তড়িগড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "জি স্যার, আপনি সাবধানে যান। কাল সকালে অফিসে দেখা হবে।"

আলতাফ সাহেব দরজা খুলে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজার ছিটকানিটা আবার ভিতর থেকে লেগে গেল।

মালেক তখন ড্রয়িংরুমে ইতির সামনে এসে হাত কচলাতে কচলাতে অত্যন্ত অনুতপ্ত ও লজ্জিত গলায় বলতে লাগল, "ইতি! আমাকে ক্ষমা করো। আমি সত্যি বলছি, তোমাকে একটু আগে ভুল বুঝেছিলাম। তুমি না থাকলে স্যার হয়তো আজ বেঁচেই থাকতেন না। আমি তো শুধু ভেবেছিলাম... তুমিও আমাকে ক্ষমা করে দিও, ইতি! তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।"

ইতি তখন সম্পূর্ণ ড্রয়িংরুমের অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। তার স্বামী যখন তার দিকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন ইতির ফর্সা মুখটা এক চিলতে বিজয়ী, ধূর্ত ও রহস্যময় হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে খুব ভালো করেই জানে যে সে তার মায়াবী জাদুতে কীভাবে তার অন্ধ বিশ্বাসী স্বামীকে চিরদিনের জন্য বশ করে ফেলেছে—এমনকি তার চোখের সামনেই তার মনিবের সাথে পরকীয়া করার পরও।

ইতি কোনো কথা না বলে কেবল মৃদু হেসে নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে দিল। তার এই মিষ্টি হাসির আড়ালে তখন লুকিয়ে ছিল এক বিশাল ও সর্বনাশা খেলা—যেখানে সে একদিকে তার স্বামীর অন্ধ বিশ্বাসকে জিইয়ে রেখেছে, অন্যদিকে তার মনিবের লোলুপতাকে উসকে দিয়েছে। সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধতায় তখন বইছিল এক নিষিদ্ধ ও মোহাচ্ছন্ন উপত্যকা, যার শেষ কোথায় তা কেবল সময়ই বলে দেবে। (চলবে)
[+] 4 users Like Romzan83's post
Like Reply
#44
[Image: IMG-20260813-074404-489.png]
[+] 2 users Like Romzan83's post
Like Reply
#45
Great writing
[+] 1 user Likes Nisat's post
Like Reply
#46
Bah bhalo khel dekhalo to... Darun egoche golpo darun hoche... Chalia jan..
[+] 1 user Likes Slayer@@'s post
Like Reply
#47
Awasome update. Just great.. Just aktai request malek ke puro puri plzz chutia dekhaben na
Like Reply
#48
সপ্তদশ পর্ব
পরের দিন সকালের সোনালী রোদ এসে পড়েছিল পুরান ঢাকার পুরোনো তিনতলা বিল্ডিংয়ের ছোট ফ্ল্যাটটার জানলার ওপর দিয়ে। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল আটটা বেজে দশ মিনিট। রাতভর নানা নাটকীয়তা, উত্তেজনা, আর আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর সাথে নিষিদ্ধ অভিসারের পর ফ্ল্যাটের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত থমথমে ও নিস্তব্ধ পরিবেশ বিরাজ করছে।

রাতের সেই ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে সকালের আবহাওয়া বেশ শান্ত। আবদুল মালেক—সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠেছে। তার গায়ে তখনো পরা রয়েছে সিকিউরিটি গার্ডের মেরুন রঙের ইউনিফর্মের প্যান্ট আর একটি সাধারণ গেঞ্জি। গত রাতের সেই ঘটনার পর থেকে মালেকের অবচেতন মনে যেন একটা খটকা কোথাও না কোথাও কাজ করছিল। যদিও ইতির সেই নিখুঁত অভিনয় এবং চেয়ারম্যান সাহেবের শ্বাসকষ্টের নাটক সে একরকম অন্ধের মতোই বিশ্বাস করেছিল, তবুও মনের কোণে লুকিয়ে থাকা কিছু ধোঁয়াশা পুরোপুরি কাটেনি।

মালেক ঘুম থেকে উঠে পানি খাওয়ার জন্য রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। রান্নাঘরের সিঙ্কের পাশে রাখা ছোট প্লাস্টিক র‍্যাকটার ওপর গতকাল রাতে সে ফার্মেসি থেকে যে কাশির সিরাপের বোতল আর জরুরি ওষুধের প্যাকেটগুলো এনে রেখেছিল, সেগুলোর ওপর তার নজর পড়ল।

মালেক হাত বাড়িয়ে ওষুধের ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। তারপর সে অবাক হয়ে লক্ষ করল—গত রাতে সে যে কাশির সিরাপের বোতলটা এনেছিল, তার কাগজের বাক্সটা এখনো খোলা হয়নি! একদম অটুট ও অক্ষত অবস্থায় সেটা পড়ে রয়েছে। আর সাথে থাকা ওষুধগুলোর প্যাকেটও সম্পূর্ণ সিল করা, একটা বড়ি বা চামচ ওষুধও সেখান থেকে বের করা হয়নি!

এই দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথেই মালেকের বুকটা ছাঁৎ করে উঠল। তার পিঠ দিয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল। সে চোখের পলকে বুঝতে পারল—গত রাতে সে যখন পাগলের মতো দৌড়ে ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনেছিল, তখন ইতি তো বলেছিল যে স্যার ক্বাথ খাওয়ার পাশাপাশি এই ওষুধগুলোও খাবেন এবং উনার বুক হালকা হয়েছে। কিন্তু ওষুধের তো সিলগালাই খোলা হয়নি! তাহলে গত রাতে চেয়ারম্যান সাহেবকে আসলে কোন ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল? নাকি পুরোটাই একটা সাজানো নাটক ছিল?

মালেকের হাতের মুঠোয় ওষুধের শিশিটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। তার কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল, ঘরের ভেতরে এমন কিছু একটা চলছে, যা সে পরিষ্কার দেখতে পেয়েও চোখের ভুলের কারণে এড়িয়ে যাচ্ছে।

-----

মালেক আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে হাতে সেই অবিকৃত ওষুধের শিশিটা নিয়ে দ্রুত পায়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে এসে উপস্থিত হলো।

বসার ঘরে তখন ইতি হাতে একটা ঝাঁটা নিয়ে ফ্লোর ঝাড়ু দিচ্ছিল। সকালের মিষ্টি রোদে তার ফর্সা মুখাবয়বটা বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। সে বেশ ফুরফুরে মেজাজে ঝাঁটা দিয়ে ঘর পরিষ্কার করছিল, যেন পৃথিবীতে কোনো ঘটনাই ঘটেনি।

মালেক সরাসরি ইতির সামনে গিয়ে একদম শক্ত পায়ে গিয়ে দাঁড়াল। তার চেহারার মধ্যে এখন আর আগের সেই সরল ও গদগদ ভাব নেই; তার জায়গায় ফুটে উঠেছে এক কঠিন সন্দেহ আর ক্ষোভের ছাপ।

মালেক তার ডান হাতে ধরা সেই সিল করা ওষুধের শিশিটা ইতির চোখের ঠিক সামনে সজোরে উঁচিয়ে ধরে অত্যন্ত ঠান্ডা ও শক্ত গলায় বলে উঠল, "ইতি! এদিকে তাকাও! আমার চোখের দিকে তাকিয়ে এটার জবাব দাও!"

ইতি ঘরের কাজ থামিয়ে একটু চমকে ওঠার ভান করল। সে অত্যন্ত সাবধানে ঝাঁটাটা একপাশে রেখে খুব স্বাভাবিক গলায়, কোনো জড়তা না রেখে বলল, "কী হলো, মালেক? সকালে উঠে এভাবে চিল্লাচ্ছ কেন? হাতে ওইটা কী নিয়েছ?"

মালেক দাঁতে দাঁত চেপে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "কী নিয়েছি দেখছ না? গত রাতে ফার্মেসি থেকে এই কাশির সিরাপ আর ওষুধগুলো আমি নিজের রক্ত জল করা টাকায় দৌড়ে গিয়ে এনেছিলাম না? তুমি নিজে বলেছিলে স্যারকে এই ওষুধগুলো দিতে হবে। কিন্তু এখন রান্নাঘরে গিয়ে দেখি—এই সিরাপের সিলগালা পর্যন্ত খোলা হয়নি! একটা বড়িও এখান থেকে বের করা হয়নি! তাহলে গত রাতে তুমি স্যারকে কোন ওষুধ খাইয়েছিলে, আর এত বড় মিথ্যা কথা কেন বললে আমাকে?"

কথাটা শোনার পর ইতির বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠলেও তার মুখের চেহারায় বিন্দুমাত্র ভয়ের লেশমাত্র প্রকাশ পেল না। সে হলো এমন এক চতুর ও ধূর্ত নারী, যে যেকোনো বিপদের মুখ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে আনার জাদুকরী ক্ষমতা রাখে।

-----

ইতি বিন্দুমাত্র ঘাবড়ে না গিয়ে অত্যন্ত শান্ত, সাবলীল ও মিষ্টি একটা হাসি দিল। সে মালেকের হাত থেকে ওষুধের শিশিটা খুব সহজ ভঙ্গিতে নামিয়ে রেখে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল, "এই ব্যাপার নিয়ে তুমি এত সকালবেলা মাথা গরম করছ, মালেক? ছিঃ! একটু তো মাথা খাটিয়ে ভাবো।"

মালেক ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান গলায় বলল, "মাথা খাটিয়ে ভাবব মানে? ওষুধ এনেছি অথচ খাওয়াওনি—এটার আবার কী মানে হয়?"

ইতি খুব চতুরতার সাথে বুঝিয়ে বলতে শুরু করল, "আরে বাবা, শোনো! যখন তুমি ফার্মেসিতে ওষুধ আনতে গেছিলে, তখন তো স্যারের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। কিন্তু তুমি দরজা থেকে বের হওয়ার পর পরই আমি যখন রান্নাঘরে গিয়ে গরম জল বসালাম, তখন আমার হঠাৎ মনে হলো—স্যার হলো এত বড় একজন ধনাঢ্য ও বয়স্ক মানুষ। উনারা সারাজীবন এই হেভি এলোপ্যাথিক কেমিক্যাল ওষুধ বা কাশির সিরাপ এড়িয়ে চলেন। এই ধরনের কেমিক্যাল সিরাপ হঠাৎ খেলে হিতে বিপরীত হতে পারে, প্রেসার আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই আমি আর ওই এলোপ্যাথি ওষুধ দিইনি।"

"তাহলে কী দিলে?" মালেক উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করল।

ইতি খুব মিষ্টি একটা ভঙ্গি করে বলল, "আমি তো বললামই! আমি ঘরে থাকা খাঁটি মধু, আদা, লবঙ্গ আর গোলমরিচ দিয়ে একটা টাটকা ভেষজ ক্বাথ তৈরি করে খাইয়েছিলাম। ওই প্রাকৃতিক ভেষজ ক্বাথ খাওয়ার সাথেই সাথেই স্যারের বুকের কফ ও চাপ একদম পরিষ্কার হয়ে গেছিল, উনি ঝটপট সুস্থ হয়ে গেলেন! ঘরোয়া টোটকা বা ভেষজ জিনিস যা কাজ করে, এই এলোপ্যাথি সিরাপ কি তা পারে? তাই আমি আর ওই ওষুধগুলো খোলবার প্রয়োজন মনে করিনি। এতে এত সন্দেহ করার কী আছে বলো তো?"

মালেক ইতির এই যুক্তিযুক্ত ও গুছিয়ে বলা কথাগুলো শোনার পর কিছুটা থমকে গেল। সে সাধারণ একজন গার্ড, বিজ্ঞান বা ভেষজ চিকিৎসার এত প্যাঁচ সে বোঝে না। সে ভাবল, ইতির কথাতেও তো একটা লজিক আছে। ঘরের টোটকা ওষুধ অনেক সময় সত্যিই ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

-----

কিন্তু মালেকের মনের ভেতরে কাঁটার মতো বিঁধে থাকা মূল প্রশ্নটা তো আর এই ওষুধের শিশি ছিল না; মূল প্রশ্নটা ছিল গত রাতে গলির মোড়ে সে নিজের চোখে যা দেখেছে!

মালেক ওষুধের কথা বাদ দিয়ে এবার আরও একটু এগিয়ে এসে ইতির কাঁধের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত কঠোর ও হাড় হিম করা গলায় জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, ওষুধের কথা নাহয় বাদ দিলাম। কিন্তু গত রাতে যখন আমি ডিউটি শেষ করে বাসার সামনে এসে পৌঁছলাম, তখন আমি নিজের চোখে যা দেখলাম—সেটার কী জবাব দেবে, ইতি?"

ইতি একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলল, "গত রাতে কী দেখেছ তুমি?"

"মিথ্যা বলো না!" মালেকের গলা কাঁপতে লাগল। "আমি নিজের চোখে দেখলাম, রাস্তার পাশে চেয়ারম্যান সাহেব তোমাকে জড়িয়ে ধরে সরাসরি তোমার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে চুমু খাচ্ছিলেন! আমি নিজের চোখে আমার মনিবকে আর আমার স্ত্রীকে অমন নোংরা অবস্থায় দেখেছি, ইতি! তুমি কি ভেবেছ আমি অন্ধ?"

কথাটা শোনার পর ইতির ভেতরে ভেতরে একটা তীব্র উত্তেজনার শিহরণ খেলে গেল, কিন্তু সে বাইরে নিজেকে পাথরের মতো শক্ত ও শান্ত রাখল। সে একটু খিলখিল করে হেসে উঠল—এমন একটা হাসির রোল তুলল, যেন মালেক পৃথিবীর সবচেয়ে বোকা ও হাস্যকর কথাটা বলেছে।

ইতি হাসতে হাসতে বলল, "ওমা! তুমি ওইটা দেখেছ? গত রাতে বুঝি ওইটা তোমার চোখে পড়েছে?"

"হাসছ কেন তুমি?" মালেক রাগে ফুঁসে উঠে বলল, "আমার বউকে আরেকজন পুরুষ ঠোঁটে চুমু খাচ্ছে, আর তুমি হাসছ?"

ইতি একটু কাছে এসে মালেকের চিবুকের নিচে হাত দিয়ে অত্যন্ত ঠাট্টার সুরে ও দুষ্টুমিভরা গলায় বলল, "আহা রে আমার সরল স্বামী! তোমার কি আক্কেল একটুও হয়নি? গত রাতে যখন স্যারের মারাত্মক শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল, তখন উনি তো কথাই বলতে পারছিলেন না। আমি তখন বাঁচানোর জন্য মুখে মুখ লাগিয়ে কৃত্রিম শ্বাস দিচ্ছিলাম। আর তুমি সেটাকে চুমু ভেবে বসলে! আচ্ছা, একটা কথা বল তো—আমার এই ঠোঁটে বা আমার শরীরে এমন কী আছে যে চেয়ারম্যান সাহেব আমার প্রেমে পড়ে যাবেন? তাছাড়া, তুমি তো জানোই আমার চুমুতে কি সাংঘাতিক বিষ আছে, তাই না? সেই বিষাক্ত চুমু যদি কেউ খায়, সে তো বাঁচবে না, আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে! কাল তো স্যার প্রায় মরেই যাচ্ছিলেন, আমার ওই কৃত্রিম শ্বাসের ঠেলায় তো উনি কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফিরেছেন।
-----

ইতির এই ধূর্ত ও বক্রোক্তির কথা শুনে মালেকের মাথা যেন আরও গুলিয়ে গেল। সে একদিকে যেমন রাগে কাঁপছিল, অন্যদিকে ইতির এই আত্মবিশ্বাসী মুখের কথাগুলো খণ্ডন করার মতো কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছিল না।

ইতি তখন হঠাৎ করে নিজের মুখটা ফুলিয়ে, চোখের কোণে কৃত্রিম রাগ ফুটিয়ে অত্যন্ত ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল, "আর হ্যাঁ, বারবার বলছি কি না শোনো! তুমি কিন্তু দিন দিন বড্ড বেশি সন্দেহবাতিকগ্রস্ত হয়ে উঠছ, মালেক! একজন কোম্পানির চেয়ারম্যান, যিনি আমাদের ভগবানস্বরূপ, যিনি আমাদের অন্নদাতা—উনার সাথে কিনা আমার এই নিয়ে জঘন্য কথা বলো! তোমার কি একটুও লজ্জা করে না? কাল রাতে যদি আমি সময়মতো ক্বাথ বানিয়ে না দিতাম আর মুখে মুখ দিয়ে ওইভাবে শ্বাস না টানতাম, আজ সকালে স্যারের লাশ বের হতো এই বাসা থেকে! আর তুমি এসে উল্টাপাল্টা সন্দেহ করছ? তোমার এই বাজে স্বভাব যদি না বদলায়, আমি কিন্তু বাপের বাড়ি চলে যাব বলে দিচ্ছি!"

বলে ইতি মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে যাওয়ার ভান করল।

কিন্তু মালেক আর সহ্য করতে পারল না। তার ভেতরে জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভ একটা মোচড়ে গিয়ে চরম সীমায় পৌঁছাল। সে এক ঝটকায় হাত বাড়িয়ে ইতির মাথার সেই সুদৃশ্য ও পরিপাটি করে বাঁধা খোপার চুলগুলো এক মুঠোয় সজোরে খপ করে খামচে ধরল!

সে খোপার গোড়ায় এমন জোরে চাপ দিল যে ইতির মাথার চুলে টান লেগে তার পুরো শরীরটা একটু পিছিয়ে এল।

"উফ! মালেক! কী করছ কী!" ইতি ব্যথায় একটু শিটিয়ে উঠে নিজের ফর্সা কপাল কুঁচকে ফেলে ফিসফিস করে বলল, "আমার চুলে এভাবে টানছ কেন? লাগছে তো!"

মালেক ইতির চুল মুঠি করে ধরে তার মুখের একদম কাছে নিজের মুখ নিয়ে এসে দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত কঠোর, হুমকিভরা ও কঠিন গলায় বলল, "বেশি চালাকি করার চেষ্টা কোরো না, ইতি! আমি সরল হতে পারি, কিন্তু বোকা নই। গতকাল থেকে যা যা হচ্ছে, আমার মাথার ভেতর সব গোলমাল পাকিয়ে যাচ্ছে। আজ তোমায় পরিষ্কার সতর্ক করে দিচ্ছি—আমার এই গরিবের সংসার আর আমার সরল জীবন নিয়ে যদি তুমি বা ওই চেয়ারম্যান কোনো ছিনিমিনি খেলার চেষ্টা করো, আর কোনো দিন যদি এমন কোনো দৃশ্য আমার চোখে পড়ে—তবে আমি কার কিচ্ছু মানব না! খুন করে ফেলব দুজনকে! মাথায় যেন থাকে!"

-----

মালেকের এই শক্ত ও হিংস্র হুমকির মুখে দাঁড়িয়েও ইতি একটুও ঘাবড়াল না। সে খুব ভালো করেই জানত যে এই রাগী মানুষটাকে কাবু করার একমাত্র হাতিয়ার তার নিজের শরীর ও তার মায়াবী উপস্থিতি।

ইতি ব্যথার ভান করা মুখটা একটু নরম করে ফেলল। তারপর সে কোনো কথা না বলে নিজের শরীরটাকে সাপের মতো বাঁকিয়ে একদম ধীরে ধীরে মালেকের খুব কাছাকাছি, প্রায় তার বুকের সাথে লেপ্টে এগিয়ে এল।

তার পরনের খোলামেলা ব্লাউজের উষ্ণতা এবং সকালের ঘুমের আমেজে তৈরি হওয়া তার মুখ থেকে একটা হালকা, মাদক ও নিজস্ব বাসি মুখের সুবাস—যা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মানুষের শরীরে স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়—সেটা সরাসরী মালেকের নাকের ঠিক ডগার সামনে এনে ফেলল!

ইতি একদম ফিসফিসে, নরম ও সম্মোহনী গলায় মালেকের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, "খুন করবে? এত বড় স্পর্ধা তোমার? যেই মানুষটার দয়ায় তোমার পেটে ভাত জোটে, তাঁকে খুন করবে? আর আমাকে সন্দেহ করছ? নাও... ভালো করে শুঁকে দেখো তো আমার এই মুখে কোনো অপরাধের গন্ধ পাচ্ছ কি না..."

মালেক যখন ইতির সেই ফর্সা ও উষ্ণ মুখের খুব কাছ থেকে ওই মাদক ও বাসি শরীরের গন্ধটুকু সরাসরি নিজের নাকের ভেতরে টেনে নিল, তখন তার পা দুটো যেন পলকের জন্য কেঁপে উঠল! একজন স্বামীর দুর্বলতার জায়গায় যখন একজন নারীর শরীরের এই তীব্র আবেদন এসে আঘাত করে, তখন সমস্ত রাগ, সমস্ত সন্দেহ এক নিমেষে বরফের মতো গলে জল হয়ে যায়।

মালেকের মাথার ভেতরটা হঠাৎ করে চক্কর দিয়ে উঠল। সে যেন একটা ঘোর বা নেশার মধ্যে পড়ে গেল। তার চোখের সামনে তখন চারপাশের ঘরবাড়ি সব ঘুরপাক খাচ্ছে। সে ইতির চুলের সেই মুঠিটা আস্তে করে আলগা করে দিল, আর তার হাত দুটো আপনাআপনি নেমে এল ইতির সুগঠিত কাঁধের ওপর।

ইতি খিলখিল করে একটা বিজয়ী হাসি দিয়ে মালেকের বুক থেকে একটু সরে দাঁড়াল। সে নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে দিয়ে চোখের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমি ফুটিয়ে অত্যন্ত মিষ্টি ও কৌতুকভরা গলায় বলল, "যাও, আর বেশি নাটক করতে হবে না! এখন বকবক বন্ধ করে জলদি নিজের সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্মটা ঠিক করে নাও, আর তাড়াতাড়ি ডিউটিতে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নাও। দেরি হলে কিন্তু তোমার ওই রাগী চেয়ারম্যান সাহেব আবার বেতন কেটে নেবে!"

মালেক তখন আর কোনো প্রতিবাদ করতে পারল না। সে মাথা ঘুরতি অবস্থাতেই বিভ্রান্তের মতো ইতির দিকে তাকিয়ে রইল, আর ইতি তখন রান্নাঘরের দিকে মুচকি হাসতে হাসতে হেঁটে চলে গেল। অন্ধ বিশ্বাসের সেই জালে মালেক তখন এমনভাবে জড়িয়ে গেছে! সে কি কখনো এই জাল ছিড়ে বেরুতে পারবে?(চলবে)
[+] 2 users Like Romzan83's post
Like Reply
#49
[Image: IMG-20260814-003347-420.png]
[+] 2 users Like Romzan83's post
Like Reply
#50
অষ্টাদশ পর্ব

মতিঝিলের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকার ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’ ভবনের সতেরো তলার এক্সিকিউটিভ কেবিন। বাইরে তখন দুপুরের চড়া রোদ কাঁচের জানলা ভেদ করে এসির ঠান্ডা বাতাসেও যেন এক অস্বস্তিকর ভ্যাপসা গরম তৈরি করেছে। চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর বিশাল মেহগনি কাঠের টেবিলের চারপাশে তখন বড় বড় কর্পোরেট ডিরেক্টর ও কোম্পানির তিন উর্ধতন কর্মকর্তা বসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ফাইন্যান্সিয়াল মিটিংয়ে ব্যস্ত।

টেবিলের ওপর ছড়ানো নানা রকমের ব্যালেন্স শিট, প্রফিট-লস স্টেটমেন্ট আর প্রজেক্টের ফাইল। কিন্তু কোম্পানির এই সর্বেসর্বা মালিক, ষাটোর্ধ আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মন আজকের এই কোটি টাকার মিটিংয়ে বিন্দুমাত্র নেই। তাঁর সমস্ত চেতনা আর মনোযোগ আটকে রয়েছে অন্য কোথাও। গত রাতের সেই অদ্ভুত নাটক, রান্নাঘরে ইতির ভেষজ ক্বাথ তৈরি, মালেকের সেই সন্দেহপ্রবণ চাহনি—সবকিছু তাঁর মাথার ভেতর বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। তিনি কেবল ভাবছেন, মালেকের মনের মধ্যে কোথাও কি কোনো গভীর সন্দেহ ঢুকে গেল? সে কি সত্যিই কিছু টের পেয়েছে?

এদিকে কেবিনের বাইরে করিডোরের ঠিক কোণটায় দাঁড়িয়ে ছটফট করছে আবদুল মালেক। তার গায়ে সেই পরিচিত সিকিউরিটি গার্ডের মেরুন রঙের ইউনিফর্ম। আজ সকাল থেকে তার মনের ভেতর যে ঝড় বইছে, তা সে কাউকে বোঝাতে পারছে না। গত রাতের সেই রান্নাঘরের ঘটনার পরও তার অবচেতন মন বারবার তাকে বলছিল—এই চাকরি ছেড়ে গ্রাম বা নিজের এলাকায় ফিরে যাওয়াই এই মুহূর্তে তার পরিবারের সম্মান বাঁচানোর একমাত্র উপায়। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, সে আর এই নরককুণ্ডে থাকবে না। সে সরাসরি চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে দেখা করে তার চাকরি ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেবে।

মালেক করিডোরে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে উসখুস করছিল। সে কেবিনের দরজায় দায়িত্বরত পিএকে একাধিকবার অনুরোধ করেছে চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে একবার দেখা করার জন্য। কিন্তু পিএ কড়া গলায় জানিয়ে দিয়েছে—এখন বড় মিটিং চলছে, চেয়ারম্যান সাহেব অত্যন্ত ব্যস্ত, এখনই ভেতরে যাওয়া যাবে না।

প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর অবশেষে মিটিং শেষ হলো। ডিরেক্টর ও কর্মকর্তারা একে একে গম্ভীর মুখে ফাইলপত্র গুটিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন।

-----

কক্ষ ফাঁকা হতেই আলতাফ সিরাজ চৌধুরী নিজের টেবিলের ওপর হাত রেখে একটু ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসেছিলেন। ঠিক তখনই বাইরে থেকে অনুমতি নিয়ে অত্যন্ত মলিন ও বিধ্বস্ত মুখে কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করল আবদুল মালেক।

মালেক সোজা এসে আলতাফ সাহেবের টেবিলের সামনে দাঁড়াল। তার মুখ ফ্যাকাশে, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ। সে দুই হাত জোড় করে অত্যন্ত থরথর ও গম্ভীর গলায় বলল, "স্যার... আসসালামু আলাইকুম।"

আলতাফ সাহেব চশমাটা একটু নামিয়ে ভ্রু কুঁচকে মালেকের দিকে তাকালেন। তিনি একটু বিরক্তির সুরে বললেন, "কী ব্যাপার, মালেক? গেটে ডিউটি না করে এভাবে কেবিনে চলে এলে কেন? আবার কোনো সমস্যা হয়েছে?"

মালেক এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত শক্ত ও দ্ব্যর্থহীন গলায় বলল, "স্যার, আমি আজ এখানে ডিউটি করার জন্য বা অন্য কোনো কাজের জন্য আসেনি। আমি এসেছি আপনার কাছে একটা জরুরি কথা বলতে। আমি এই চাকরিটা আর করব না, স্যার। আমি আজকেই আমার পদত্যাগপত্র জমা দিতে চাই। আমি আমার চাকরি ছেড়ে দিচ্ছি।"

কথাটা শোনার পর আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে ছাঁৎ করে উঠল! তিনি চেয়ার থেকে সোজা হয়ে বসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মালেকের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কী বললে? চাকরি ছাড়বে মানে কী? মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে তোমার, মালেক? হঠাৎ করে তোমার কী হলো যে এমন একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলে?"

মালেক মাথা নিচু করে রইল। তার চোয়ালের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠেছে। সে খুব ঠান্ডা অথচ থমথমে গলায় বলল, "না স্যার, আমার মাথা ঠিক আছে। আমি অনেক ভেবেচিন্তেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই কোম্পানিতে আর এক দিনও কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।"

আলতাফ সাহেব একটু সামলে নিয়ে নিজের কর্পোরেট কণ্ঠস্বরটাকে আরও গম্ভীর করে বললেন, "কারণটা কী, মালেক? হঠাৎ করে এভাবে চাকরি ছাড়ার পেছনে তো একটা যৌক্তিক কারণ থাকতে হবে। কোম্পানির কি বেতনে কোনো সমস্যা হচ্ছে? নাকি কেউ তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে? খুলে বলো আমাকে।"

মালেক মুখ তুলে আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার চোখের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ আর হতাশা পরিষ্কার ফুটে উঠছিল। সে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলল, "স্যারের কাছে আমার কোনো লুকোচুরি নেই। কেন চাকরি ছাড়ছি, সেই কারণটা আমি মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারব না, স্যার। এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। শুধু এটুকু বলতে পারি—আমার ঘরের ভেতরে এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, আমার স্ত্রীর নৈতিক স্খলন ঘটেছে বলে আমার সন্দেহ হচ্ছে বা এমন কিছু ঘটে চলেছে যা একজন স্বামীর পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। আমি আমার বউকে নিয়ে এই শহর ছেড়ে চিরদিনের জন্য গ্রামে চলে যাচ্ছি। এই শহরে আর এক মুহূর্তও আমি থাকতে চাই না।"

------

‘নৈতিক স্খলন’ আর ‘গ্রামের বাড়ি চলে যাওয়ার’ কথাটা যখন মালেকের মুখ থেকে বের হলো, তখন আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মাথার ভেতর যেন একটা বিশাল বোমা ফেটে গেল! তিনি তো খুব ভালো করেই জানেন যে সেই নৈতিক স্খলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুটি আর কেউ নয়, খোদ তিনি নিজে!

আলতাফ সাহেবের চোখের সামনে মুহূর্তের জন্য অন্ধকার নেমে এল। তিনি উপলব্ধি করলেন, মালেক যদি ইতিকে নিয়ে গ্রামে চলে যায়, তবে তিনি তাঁর জীবনের এই একমাত্র নেশা, একমাত্র আসক্তি—ইতিকে চিরকালের মতো হারিয়ে ফেলবেন! ইতির সেই খোলামেলা শরীর, তার মায়াবী হাসি, তার ছোঁয়া—সবকিছু এক নিমিষে তাঁর জীবন থেকে মুছে যাবে। এই চিন্তাটাই তাঁর ষাট বছরের জীবনে কখনো না আসা এক অচেনা আতঙ্ক ও ভয়ের সৃষ্টি করল।

আলতাফ সাহেব নিজের ভেতরের সেই প্যানিক বা ভয়টাকে কোনোমতে লুকিয়ে অত্যন্ত দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলের সামনে এলেন এবং খুব স্নেহের ও ভনিতার সুরে মালেকের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "আরে মালেক! মাথা এত গরম করছ কেন বাবা? একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবো।"

মালেক একটু পিছিয়ে গিয়ে বলল, "না স্যার, ভেবেই বলছি। আমার আর এই শহরে থাকার ইচ্ছে নেই।"

আলতাফ সাহেব মরিয়া হয়ে মালেককে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তিনি বললেন, "শোনো, শোনো! একটা মানুষের জীবনে পারিবারিক ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি বা টেনশন থাকতেই পারে। তাই বলে একটা ভালো চাকরি এভাবে হুট করে ছেড়ে দিতে হয় নাকি? তুমি আমাদের পুরোনো ও বিশ্বস্ত কর্মী। তোমার কাজের প্রতি আমার অনেক ভরসা আছে। এক কাজ করো—তোমার বর্তমান বেতন তো অনেক কম, আজ থেকে তোমার বেতন বাড়িয়ে একদম পনেরো হাজার (১৫০০০) টাকা করে দিচ্ছি! বল্টু বা অ্যাকাউন্টসকে আমি এখনই বলে দিচ্ছি। আর কোনো সমস্যা থাকবে?"

কোম্পানির চেয়ারম্যান নিজের মুখে দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের বেতন এক লাফে এত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন—এটা সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু মালেকের কাছে টাকা বা বেতনের চেয়ে তার নিজের সম্মান এবং মনের ভেতর জমে থাকা সন্দেহটা অনেক বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মালেক মাথা নেড়ে শক্ত গলায় বলল, "টাকার জন্য আমি চাকরি ছাড়ছি না, স্যার। আমার বেতনের বা টাকার কোনো লোভ নেই। আমার ঘরের শান্তি নষ্ট হয়ে গেছে, সেখানে টাকা দিয়ে আমি কী করব? আমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, স্যার। আমি আজকেই আমার শেষ দিন হিসেবে ধরে নিচ্ছি।"

আলতাফ সাহেব দেখলেন টাকা দিয়েও এই বোকা গার্ডটাকে আটকানো যাচ্ছে না। তখন তিনি একটু সুর নরম করে নরম গলায় বললেন, "মালেক, এভাবে রাগ করে হঠকারী সিদ্ধান্ত কোরো না। তুমি একটু বাড়ি যাও, ঠান্ডা মাথায় দুদিন ভেবে দেখো। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত এক রাতে নিতে হয় না। তুমি যাও, গিয়ে ভালো করে চিন্তা করো, তারপর আমাকে জানিও।"

মালেক দেখল চেয়ারম্যান সাহেব যখন বারবার অনুরোধ করছেন, তখন সে আর মুখের ওপর না বলতে পারল না। সে একটু ইতস্তত করে বলল, "আচ্ছা স্যার... আপনি যখন বলছেন, তখন আমি বিষয়টি নিয়ে আরও একবার ভেবে দেখব। তবে আমার মনের অবস্থা আপনি বুঝছেন না।"

"হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি ভেবে দেখো। যাও এখন নিজের ডিউটিতে ফেরো," আলতাফ সাহেব কোনোমতে তাকে রুম থেকে বিদায় করলেন।

-----
মালেক কেবিন থেকে বের হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর হাত কাঁপতে শুরু করল। তিনি এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলেন না। নিজের টেবিলের ওপর রাখা আইফোনটা তুলে সাথে সাথে ইতির নাম্বারে ডায়াল করলেন।

রিং হওয়ার দুই সেকেন্ডের মাথায় ওপাশ থেকে অত্যন্ত দ্রুত ও ছটফটে গলায় ইতির মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
"হ্যালো! স্যার! এত তাড়াতাড়ি ফোন করলেন যে? আজ মিটিং ছিল না?"

আলতাফ সাহেবের গলা কাঁপছিল। তিনি কোনো রাখঢাক না করে একেবারে হাপাতে হাপাতে বললেন, "মিটিংয়ের কথা বাদ দাও, ইতি! আজ এক অদ্ভুত মারাত্মক বিপদ চলে এসেছে মাথা ওপর দিয়ে!"

ওপাশে ইতি একটু অবাক হয়ে গম্ভীর গলায় বলল, "বিপদ? আবার কী বিপদ হলো, স্যার?"

আলতাফ সাহেব রুদ্ধশ্বাসে বললেন, "তোমার ওই স্বামী—মালেক একটু আগে আমার কেবিনে এসে হাজির হয়েছিল। সে সরাসরি আমার মুখের ওপর বলে গেছে যে সে এই চাকরি ছেড়ে দেবে এবং তোমাকে নিয়ে সোজা গ্রামে চলে যাবে! সে নাকি সন্দেহ করছে যে তোমার নৈতিক স্খলন ঘটেছে!"

কথাটা শোনার পর ইতি কিন্তু বিন্দুমাত্র ভয় পেল না। বরং তার মুখের ভেতর এক চিলতে রহস্যময় ও ধূর্ত হাসি খেলে গেল। সে খুব শান্ত ও আদুরে গলায় ফিসফিস করে বলল, "ওমা! তাই নাকি? আমার স্বামী বুঝি এত বড় বাহাদুর হয়ে গেছে যে চাকরি ছেড়ে আমাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে?"

আলতাফ সাহেব ব্যাকুল হয়ে বললেন, "এতে তোমার হাসি পাচ্ছে, ইতি? ও যদি তোমাকে গ্রামে নিয়ে চলে যায়, আমি তো তোমাকে আর দেখতে পাব না! আমি তোমায় ছাড়া বাঁচব না, ইতি! আমি মরে যাব! আমি তো একটু আগে ওকে আটকে রাখার জন্য বেতন বাড়িয়ে পনেরো হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব পর্যন্ত দিয়েছি, কিন্তু ও বলল ভেবে দেখবে। তুমি যেকোনো মূল্যে এই গ্রাম যাওয়ার পরিকল্পনা বন্ধ করো, ইতি!"

ইতি তখন আরও একটু উস্কানিমূলক ও নাটকীয় সুরে বলল, "আহা রে! আমার জন্য আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যান সাহেবের কলিজা এত কাঁপছে দেখে আমার তো বুক জুড়িয়ে যাচ্ছে! কিন্তু আপনি কি ভুলে গেছেন, স্যার? মালেক তো আইনগতভাবে আমার স্বামী। সে যা বলবে, সমাজের নিয়মে আমাকে তো তার সব সিদ্ধান্ত মেনে নিতেই হবে। সে যদি জোর করে আমাকে টেম্পোতে তুলে গ্রামে নিয়ে যায়, আমি তো অসহায়, তাই না?"

-----

আলতাফ সাহেব তখন পুরোপুরি দিশেহারা। তাঁর সমস্ত অহংকার, সমস্ত কর্পোরেট ক্ষমতা যেন এই একটিমাত্র নারীর কাছে এসে ধুলায় মিশে গেছে। তিনি প্রায় আর্তনাদ করার মতো গলায় বললেন, "না, ইতি! আমি তোমাকে কোনোভাবেই ওই মালেকের কাছে হারিয়ে যেতে দিতে পারব না। তুমি আমার! শুধু আমার! বলো, আমি কী করলে তুমি এই শহর ছেড়ে কোথাও যাবে না? আমি তোমার জন্য কী করতে পারি?"

ইতি তখন আলতাফ সাহেবের সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁকে আরও বেশি করে নিজের জালে জড়িয়ে ফেলার জন্য এক মারাত্মক চাল চালল। সে ফোনের ওপাশ থেকে নিজের গলায় এক মাদক ও উস্কানিমূলক সুর এনে ফিসফিস করে বলল, "কী করতে পারেন, সেটা কি আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে, স্যার? আপনি তো নিজেকে খুব ক্ষমতাধর পুরুষ বলে মনে করেন, কোটি কোটি টাকার মালিক বলেন। অথচ সামান্য একজন সিকিউরিটি গার্ডের হাত থেকে তার স্ত্রীকে নিজের করে নেওয়ার সাহস আপনার নেই?"

আলতাফ সাহেব চমকে গিয়ে বললেন, "এর মানে কী, ইতি?"

ইতি একটু পৈশাচিক ও মিষ্টি হেসে অত্যন্ত প্রলুব্ধকারী গলায় বলল, "এর মানে হলো—আপনি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবেসে থাকেন, যদি আমাকে ছাড়া আপনার এক মুহূর্তও না চলে, তবে শুধু মুখে মুখে ভালোবাসার কথা বললে চলবে না, স্যার। আপনাকে আপনার ভালোবাসার চরম প্রমাণ দিতে হবে।'

আলতাফ সিরাজ চৌধুরী ইতির এই কথা শোনার পর এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রী তাঁকে দিয়ে এমন এক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ইন্ধন জোগাচ্ছে, যা থেকে আর ফিরে আসার কোনো রাস্তা নেই। কিন্তু ইতির প্রতি তাঁর সেই অন্ধ ও সর্বগ্রাসী লালসা তাঁকে অন্ধ করে দিয়েছিল।

তিনি কাঁপাকাঁপা গলায় প্রতিজ্ঞা করার সুরে বললেন, "ঠিক আছে, ইতি... তুমি যখন চাচ্ছ, তখন আমি তাই করব। তোমার প্রতি আমার আসক্তি প্রমাণ করে দেখাবো। তুমি একটুও চিন্তা কোরো না, তুমি শুধু আমার হয়ে থেকো।"

ফোনের ওপাশে দাঁড়িয়ে ইতি তখন এক চিলতে বিজয়ী ও পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ল। সে খুব ভালো করেই জানল যে সে তার চতুর বুদ্ধিমত্তায় দুই পুরুষকে কীভাবে নিজের হাতের পুতুলের মতো নাচিয়ে চলেছে। (চলবে)
[+] 2 users Like Romzan83's post
Like Reply
#51
[Image: IMG-20260814-005049-767.png]
[+] 1 user Likes Romzan83's post
Like Reply
#52
Eti character ta bhaloi mysterious mone hoche.... Kichu akta plan banache.. Bes thrill baper ache chalia jan.. Khub bhalo lagche
[+] 1 user Likes BiratKj's post
Like Reply
#53
ঊনবিংশ পর্ব

মতিঝিলের ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’ ভবনের সতেরো তলার এক্সিকিউটিভ কেবিনে তখনো ইতির কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি ভাসছে। আলতাফ সিরাজ চৌধুরী—যিনি কর্পোরেট দুনিয়ার একচ্ছত্র অধিপতি—আজ একটা সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রীর হাতে এমনভাবে পুতুলের মতো নাচছেন, তা তিনি নিজেই কল্পনা করতে পারেননি। ইতির ওই একটিমাত্র উস্কানি—"আমাকে পাওয়ার চরম প্রমাণ দিন"—তাঁর ষাট বছরের অভিজ্ঞ মস্তিষ্কে যেন এক নতুন আদিম কামনার আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।

তিনি আর এক মুহূর্তও মতিঝিলের গ্ল্যামারাস কেবিনে সময় নষ্ট করলেন না। তাঁর সমস্ত অহংকার, সমস্ত কর্পোরেট ক্ষমতা যেন এক ঝটকায় ধুলায় মিশে গেছে ইতির ওই মাদকসিক্ত কন্ঠস্বরের কাছে। তিনি দ্রুত নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন, টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কোটি টাকার প্রজেক্টের ফাইলগুলো একপাশে ঠেলে ফেলে দিলেন। তাঁর ফর্সা ও শক্তপোক্ত মুখটা তখন লাল হয়ে আছে, চোখের ভেতর কেবল এক সর্বনাশা উন্মাদনা।

আলতাফ সাহেব দ্রুত পায়ে কেবিনের বাইরে বেরিয়ে এলেন। তাঁর পিএ দৌড়ে এসে কিছু বলতে গেল, কিন্তু আলতাফ সাহেব হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন। তিনি লিফটে করে সোজা গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামলেন। বেসমেন্ট পার্কিং থেকে তাঁর ব্যক্তিগত ড্রাইভারকে সরিয়ে দিয়ে তিনি নিজেই ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন।

ইঞ্জিন স্টার্ট নিয়েই তিনি গাড়িটাকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বেসমেন্ট থেকে বের করে মতিঝিলের মেইন রোডের দিকে ছুটিয়ে দিলেন। তাঁর গাড়ি তখন যেন এক উন্মাদ অশ্ব—তার গন্তব্য কেবল একটাই—পুরান ঢাকার সেই ঘিঞ্জি গলি, যেখানে আবদুল মালেকের সংসার পাতা।

------

মেইন গেইটে ডিউটি করছিল আবদুল মালেক। তার পরনে সেই মেরুন রঙের সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্ম, কাঁধে ঝুলে থাকা ছোট একটা লাঠি। ডিউটি শেষ হতে এখনো প্রায় এক ঘণ্টা বাকি। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গেট দিয়ে আসা-যাওয়া করা গাড়িগুলোর দিকে তাকাচ্ছে, আর তার মনের ভেতর কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে—গ্রামের বাড়িতে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার স্বপ্ন। সে ভাবছে, কালই সে স্যারকে গিয়ে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেবে, এই চাকরি সে আর করবে না।

দূর থেকে আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর চেনা কালো গাড়িটা গেইটের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসতে দেখে মালেক সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে ভেবেছিল, চেয়ারম্যান সাহেব হয়তো কোনো কাজে বাইরে বেরোচ্ছেন, তাই সে লাঠিটা হাতে নিয়ে গেট খোলার জন্য প্রস্তুত হলো।

গাড়িটা যখন গেটের খুব কাছাকাছি এল, তখন আলতাফ সাহেব জানলা দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলেন—ইউনিফর্ম পরা মালেক দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে মুখে এক অদ্ভুত সরলতা ও আশা। সেই সরলতা ও আশাটাই মুহূর্তের মধ্যে আলতাফ সাহেবের ভেতরের কামনার আগুনকে আরও হিংস্র করে তুলল। তিনি মনে মনে ভাবলেন—*‘তুই এই মেয়েটিকে নিয়ে গ্রামে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিস, মালেক? আজ আমি তোকে দেখিয়ে দেব—টাকা আর ক্ষমতার জোর কাকে বলে। এই ইতি তোর নয়, এই ইতি কেবল আমার!’*

আলতাফ সাহেব মালেকের গায়ের ওপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়ার মতো একটা অভিব্যক্তি নিয়ে গাড়িটাকে কমানোর বদলে উল্টো গিয়ার বাড়িয়ে দিলেন। *ভোঁ-ভোঁ* শব্দে ইঞ্জিন গর্জে উঠল, টায়ার রাস্তার পিচ কেটে সশব্দে এগিয়ে গেল। গাড়িটা প্রায় মালেকের পায়ের ওপর দিয়েই গেইট পার হয়ে মূল রাস্তায় বেরিয়ে গেল।

মালেক হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। সে বিশ্বাস করতে পারল না যে তার মালিক এভাবে তাকে প্রায় চাপা দিয়ে চলে গেলেন। একটা অদ্ভুত আশঙ্কা ও শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত তার শরীরে বয়ে গেল। কেন চেয়ারম্যান সাহেব এতটা মরিয়া হয়ে এভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন, তা সে বুঝতে পারল না।

-----

মতিঝিলের মেইন রোডে গাড়িটা প্রচণ্ড গতিতে ছুটছিল। আলতাফ সাহেব এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে নিজের আইফোনটা বের করলেন। তাঁর আঙুলগুলো তখন থরথর করে কাঁপছে। তিনি ইতির নাম্বারে ডায়াল করলেন।

রিং হওয়ার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে অত্যন্ত চটপটে ও ছটফটে গলায় ইতির কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
"হ্যালো! স্যার! আপনি কি এখনো অফিসেই আছেন?"

আলতাফ সাহেবের গলা দিয়ে কোনোমতে শব্দ বের হলো। তিনি রুদ্ধশ্বাসে বললেন, "না, ইতি! আমি অফিস থেকে বের হয়ে গেছি। আমি সোজা তোমার বাসার দিকে আসছি। মালেককে আমি একটু আগে গেটে ডিউটিতে দেখে এসেছি। ওই শয়তানটার সামনে দিয়ে আমি গাড়ি ছুটিয়ে চলে এসেছি! এখন তুমি আর এক মুহূর্তও ঘরে থেকো না। জলদি! এক্ষুনি! বাসার নিচে নেমে এসে মেইন রোডের মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি এখুনি তোমাকে তুলব!"

ফোনের ওপাশ থেকে ইতি খিলখিল করে হেসে উঠল—এমন এক হাসির রোল তুলল, যা শুনলে যে কেউ বিশ্বাস করবে এই মেয়েটি কোনো সাধারণ বউ নয়, এক পাকা অভিনেত্রী ও খলনায়িকা।

ইতি টিটকারির সুরে বলল, "ওরে বাবা! চেয়ারম্যান সাহেবের তো দেখছি একেবারে রোমিওদের মতো অবস্থা! আমার স্বামী ডিউটিতে আছে, আর আপনি তার চোখের সামনে দিয়ে তার বউকে অপহরণ করার জন্য ছুটে আসছেন? আপনার কি বয়সের কথা একটুও মনে থাকে না, স্যার? এই বয়সে এমন কান্ড করলে লোকে কী বলবে?"

আলতাফ সাহেব পুরোপুরি দিশেহারা। তাঁর সমস্ত অহংকার, সমস্ত কর্পোরেট ক্ষমতা যেন এই একটিমাত্র নারীর কাছে এসে ধুলায় মিশে গেছে। তিনি প্রায় আর্তনাদ করার মতো গলায় বললেন, "এতে তোমার হাসি পাচ্ছে, ইতি? তুমি।না বললে আমার ভালোবাসার প্রমাণ দিতে। আমি তোমাকে এক মুহূর্তও না দেখে থাকতে পারছি না। মালেক যদি তোমাকে গ্রামে নিয়ে যায়, আমি মরে যাব! আমি সব কিছু পরোয়া করি—সমাজ, লোকলজ্জা, এমনকি ওই বোকা গার্ডটাকেও! তুমি এক্ষুনি নিচে নামো, আমি গাড়িতে আছি!"

বলেই তিনি আর ইতির কোনো কথা শোনার সুযোগ না দিয়ে ফোনটা কেটে দিলেন। তিনি জানতেন, ইতি আসবে। সেই মায়াবী জালে তিনি এমনভাবে জড়িয়ে গেছেন যে চাইলেও আর বের হতে পারবেন না।

------

কালো জার্মান সেডানটি পুরান ঢাকার সেই ঘিঞ্জি ও সংকীর্ণ গলির মুখে এসে ব্রেক কষল। খুঁজে দেখলেন, গলির মুখে একটি রিকশার পাশে একমনে দাঁড়িয়ে আছে ইতি।

আজকের সাজটা তার একটু অন্যরকম। হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ির সাথে মানানসই একটা কাজ করা ব্লাউজ। চুলগুলো পরিপাটি করে খোপা করা, গলায় সেই হার্ট আকৃতির দুল। তাকে দেখলে মনে হবে, সে কোনো দেবীতুল্য পবিত্র নারী। কিন্তু তার এই রূপের আড়ালে যে কত বড় এক প্রলয় লুকিয়ে আছে, তা কেবল আলতাফ সাহেবই অনুভব করতে পারছিলেন।

ইতি কালো গাড়িটা দেখেও কোনো ঘাবড়ানোর ভান করল না। সে একটু মুচকি হাসল—এক চিলতে বিজয়ী হাসি। সে আস্তে আস্তে গাড়ির প্যাসেঞ্জার সাইডের দরজার কাছে এগিয়ে এল।

আলতাফ সাহেব দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে এলেন। তাঁর সমস্ত শরীর তখন কামনার আবেশে কাঁপছে। তিনি আর কোনো কথা না বলে, কোনো ভদ্রতা না দেখিয়ে ইতির হাত দুটো এক মুঠোয় শক্ত করে ধরলেন। ইতি মৃদু একটা চকিত শব্দ করে আপত্তি করার ভান করল, কিন্তু আলতাফ সাহেব তাকে আর এক মুহূর্তও গলির ভেতরে দাঁড়াতে দিলেন না।

তিনি প্রায় জোর করেই ইতিকে টেনে সোজা গাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন। ইতি কোনো প্রতিবাদ করল না, বরং আলতাফ সাহেবের হাতটা নিজের হাতের ভেতর একটু চেপে ধরল।

আলতাফ সাহেব দ্রুত ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন এবং সেন্ট্রাল লক টিপে গাড়ির দরজাগুলো বন্ধ করে দিলেন। তারপর ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে গাড়িটাকে উল্টোপথে আবার মূল মতিঝিলের দিকে ছুটিয়ে দিলেন। কেবিনের ভেতরে জমে থাকা নীরবতা আর আবেশ এক অদ্ভুত উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছিল।

------

গাড়ি চলছে দ্রুতগতিতে, রাতের ফাঁকা রাস্তায়। গাড়ির ভেতরকার মৃদু আলোয় ইতির ফর্সা মুখখানা মায়াবী দেখাচ্ছে। আলতাফ সাহেব গাড়ি চালাতে চালাতে বারবার ইতির দিকে তাকাচ্ছিলেন। তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।

গাড়িটাকে রাস্তার পাশে একটু নিরাপদ জায়গায় পার্ক করে তিনি ইঞ্জিন বন্ধ করলেন। তারপর পুরোপুরি ইতির দিকে ঘুরে বসে অত্যন্ত গভীর, আবেগঘন ও পাগলপারা গলায় বলে উঠলেন, "ইতি... আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছি! আমি আর কোনো লুকোচুরি চাই না। আমি তোমাকে আজই, এখুনি বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি! তোমাকে ছাড়া আমার এই বিশাল সাম্রাজ্য, এই কোটি কোটি টাকা—সবকিছু অর্থহীন মনে হচ্ছে।"

কথাটা শোনার পর ইতির ভেতরের চতুর সত্তা জেগে উঠল। সে একটু মুচকি হাসল—এক চিলতে ধূর্ত ও কৌতুকভরা হাসি। সে আলতাফ সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত ও স্বাভাবিক গলায় বলল, "ওমা! তাই নাকি? আপনি তো দেখছি একেবারে রেডি! কিন্তু একটা সামান্য কথা কি আপনি ভুলে গেছেন, স্যার? আমি তো বিবাহিতা। আমি আবদুল মালেকের স্ত্রী। আমাদের এখনো কোনো ডিভোর্স হয়নি। অন্যের বিবাহিত স্ত্রীকে জোর করে তুলে এনে বিয়ে করা—আমাদের দেশের আইনে তো এটা বড় একটা অপরাধ! আপনার মতো এত বড় একজন শিল্পপতি—এমন একটা জঘন্য কাজ করবেন?"

ইতি এমনভাবে কথাটা বলল, যেন সে খুব অবাক হয়েছে এবং আলতাফ সাহেবের এই হঠকারী সিদ্ধান্তে সে যেন ফেঁসে যেতে পারে।

------

ইতির এই চাতুর্যভরা মন্তব্য বা আইনের ভয় আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর কামনার আগুনকে আরও উসকে দিল। তিনি বুঝতে পারলেন, এই মেয়েটি তাঁকে পরীক্ষা করছে—সে দেখছে তিনি কতটা মরিয়া।

আলতাফ সাহেব আর এক মুহূর্তও সহ্য করতে পারলেন না। তাঁর ষাটোর্ধ শক্তপোক্ত শরীরটা যেন এক পৈশাচিক শক্তিতে জেগে উঠল। তিনি এক ঝটকায় হাত বাড়িয়ে ইতির মাথার সেই সুদৃশ্য ও পরিপাটি করে বাঁধা খোপার চুলগুলো নিজের মুঠোর মধ্যে সজোরে খপ করে খামচে ধরলেন!

চুলে টান লেগে ইতির মাথাটা একটু পেছনে বাঁকিয়ে গেল। তার ফর্সা কপাল কুঁচকে গেল, চোখের ভেতর ফুটে উঠল এক চকিত ভয়—যে ভয়টা সে আজ পর্যন্ত কারো সামনে প্রকাশ করেনি।

আলতাফ সাহেব ইতির চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে তার মুখটা নিজের মুখের খুব কাছাকাছি—প্রায় নাকের ডগার সামনে—টেনে আনলেন। তাঁর চোখের ভেতর তখন কেবল এক সর্বনাশা লালসা। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত হিংস্র, বন্য ও চূড়ান্ত গলায় বললেন, "চুপ করো! আর একটা শব্দও উচ্চারণ করবে না! আইন? সমাজ? লোকলজ্জা? আবদুল মালেক? আজ থেকে এই দুনিয়ায় আমার ইচ্ছার বাইরে আর কোনো আইন চলবে না! আমি এই সমাজ, এই লোকলজ্জা—সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আমার সিদ্ধান্তই ফাইনাল! আমি কাউকে পরোয়া করি না, ইতি! তোমাকে আজীবন আমার পাশে রাখার জন্য আমি যেকোনো অপরাধ করতে পারি!"

বলেই তিনি আর কোনো কথা না বলে সজোরে ইতির নরম ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট দুটো চেপে ধরলেন!

সে ছিল এক অত্যন্ত হিংস্র, লোভী ও সর্বগ্রাসী চুম্বন। সারাদিনের জমানো সমস্ত তৃষ্ণা, সমস্ত কামনা যেন তিনি ওই একটি চুম্বনের মাধ্যমে নিবারণ করতে চাইছিলেন। ইতিও বিন্দুমাত্র পিছপা হলো না; সেও আলতাফ সাহেবের শার্টের কলার খামচে ধরে, নিজের সমস্ত উষ্ণতা ঢেলে দিয়ে সেই চুম্বনের চরম প্রতিদান দিতে শুরু করল। তাদের ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের ঘর্ষণে কেবিনের ভেতরে এক অদ্ভুত শব্দ সৃষ্টি হলো।

বাইরে তখন গভীর রাতের অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়ে আসছে, কিন্তু সেই গাড়ির ভেতরে বইছিল এক নিষিদ্ধ ও সর্বনাশা উন্মাদনার ঝড়—যেখানে ভালোবাসা আর লালসার রেখা পুরোপুরি মুছে গেছে।

------

চুম্বনের আবেশে আলতাফ সাহেব পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে গেলেন। তিনি যেন আর এই মোহাচ্ছন্ন আবেশ থেকে বের হতে চাইছিলেন না। তিনি ইতিকে আরও শক্ত করে নিজের বাহুডোরে বেঁধে ফেললেন।

যখন চুম্বন থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন, তখন আলতাফ সাহেবের নিশ্বাস ভারী হয়ে আছে, কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। তিনি ইতির চোখের দিকে তাকিয়ে হাপাতে হাপাতে বললেন, "বলো, ইতি... তুমি কি আমার পাশে থাকবে? তুমি কি আমার হবে?"

ইতি তখন আবার সেই মুচকি হাসি—এক চিলতে ধূর্ত, রহস্যময় ও প্রলুব্ধকারী হাসি—হাসল। সে আলতাফ সাহেবের বুকে মাথা রেখে অত্যন্ত সম্মোহনী ও বিজয়ী গলায় ফিসফিস করে বলল, "আপনার মতো একজন ক্ষমতাধর পুরুষ যখন আমার জন্য এত কিছু করতে পারেন, যখন আমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও বাঁচতে পারেন না—তখন আমি আর কে যে আপনাকে না করব, স্যার? আপনি যখন সবকিছু পরোয়া না করে আমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন আমিও সমাজ-সংসারের সমস্ত নিয়ম ভেঙে আপনার সাথে শামিল হতে রাজি আছি। আমি কেবল আপনারই—আজ থেকে, চিরকালের জন্য। তবে আমার কিছু শর্ত আছে। "
'তোমার সব শর্ত আমি মেনে নিবো! ' ব্যাকুল আলতাফ সাহেব বললেন।
'ঠিক আছে, আমাকে তাহলে আপনার সাথে নিয়ে চলুন!'
ইতির এই চূড়ান্ত সম্মতির পর আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর বুকের ভেতরকার সমস্ত আতঙ্ক ও ভয় মুহূর্তের মধ্যে কর্পূরের মতো উবে গেল। তিনি বিজয়ী হাসি হেসে আবার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে অন্ধকারের ভেতর ছুটিয়ে দিলেন—এক সর্বনাশা অভিসারের দিকে। (চলবে)
[+] 3 users Like Romzan83's post
Like Reply
#54
[Image: IMG-20260815-075741-566.png]
[+] 1 user Likes Romzan83's post
Like Reply
#55
বিংশ পর্ব

মতিঝিলের মেইন রোড ছেড়ে কালো জার্মান সেডান গাড়িটি যখন ঢাকার এক আলিশান ও নিরিবিলি উপশহরের দিকে ছুটছিল, তখন কেবিনের ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। গাড়ির সিটে পাশাপাশি বসে থাকা আলতাফ সিরাজ চৌধুরী আর ইতির শরীরের দূরত্ব তখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। ড্রাইভিং সিটের স্টিয়ারিং হুইলে আলতাফ সাহেবের একটা হাত শক্ত করে রাখা, অন্য হাতটা আলতো করে ইতির কোলে রাখা ফর্সা আঙুলগুলোর ওপর রাখা রয়েছে।

বাইরে তখন রাতের কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকার ভেদ করে হেডলাইটের আলো পথ কাটছে। গাড়িটা যখন একটি সিগন্যালে এসে সামান্য গতি কমিয়ে থেমে গেল, তখন ইতি আলতাফ সাহেবের হাত থেকে নিজের হাতটা একটু সরিয়ে নিল। সে সোজা হয়ে বসে নিজের শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর ঠিক করে বসল। তার চোখের ভেতর তখন কোনো ভয়ের লেশমাত্র নেই, বরং সেখানে ঝলক দিচ্ছে এক সুদূরপ্রসারী, ঠান্ডা ও অত্যন্ত ধূর্ত পরিকল্পনা।

আলতাফ সাহেব ইতির এই হঠাৎ সরে বসা দেখে একটু চমকে গেলেন। তিনি উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, "কী হলো, ইতি? এভাবে সরে বসলে কেন? তুমি কি আমার ওপর এখনো কোনো কারণে রাগ করে আছ?"

ইতি একটা মায়াবী ও মিষ্টি হাসি দিল—যে হাসির নিচে লুকিয়ে থাকে অনেক বড় একটা স্বার্থপরতার জাল। সে খুব শান্ত ও সুকৌশলী গলায় বলল, "রাগ করতে যাব কেন, স্যার? আপনি তো আমার জন্য সমাজ, সংসার, লোকলজ্জা—সবকিছু ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছেন। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছেন কি, আমার ভবিষ্যৎটা আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে?"

আলতাফ সাহেব ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "এর মানে কী, ইতি? তোমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আবার ভাবছ কেন? আমি তো আছি! তোমার সব শর্ত মেনে নিয়েছি। আমি তো তোমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি।"

ইতি একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলার অভিনয় করে অত্যন্ত চতুরতার সাথে বলল, "বিয়ে তো আপনি করবেন বলছেন, স্যার। কিন্তু আমার কথাটাও তো একটু ভাবতে হবে। আমি তো একজন সাধারণ ঘরের মেয়ে, আবদুল মালেকের মতো সামান্য একজন সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রী ছিলাম। আপনার হাত ধরে যখন আমি ঘর ছাড়ব, স্বামী ছাড়ব, সমাজ ছাড়ব—তখন আমার নিজের বলতে আর কিচ্ছু থাকবে না। আমার কি কোনো সামাজিক পরিচয় বা নিরাপত্তা থাকবে?"

আলতাফ সাহেব তখনো ইতির এই গূঢ় মতলব বুঝতে পারেননি। তিনি স্নেহের সুরে বললেন, "অবশ্যই থাকবে, ইতি! আমি তো তোমাকে আমার রানি বানিয়ে রাখব। টাকার অভাব তোমার জীবনে কোনো দিনও হতে দেব না।"

ইতি তখন তার আসল খেলায় নামল। সে একটু ঝুঁকে আলতাফ সাহেবের মুখের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে অত্যন্ত ফিসফিস করে, অথচ পরিষ্কার ও ধারালো গলায় বলল, "টাকার কথা তো আমি বলছি না, স্যার। টাকা তো আজ আছে কাল নেই। তাছাড়া আপনার বয়স কত হয়েছে, একটু ভেবে দেখেছেন? আপনি হলেন ষাটোর্ধ একজন বয়স্ক মানুষ, আর আমার বয়স সবেমাত্র যৌবনের শুরু। মানুষের জীবন তো অনিশ্চিত—আজ আছি তো কাল নেই। আপনার শরীর যদি কোনো কারণে খারাপ হয়ে যায়, কিংবা খোদা না করুক আপনি যদি হঠাৎ করে মারা যান—তখন আমার এই অসহায় অবস্থাটার কী হবে বলুন তো? স্বামী আমাকে চিরকালের মতো তাড়িয়ে দেবে, সমাজ আমাকে বয়কট করবে, মাথার ওপর থেকে ছাদটুকুও থাকবে না। তখন আমি এই দুনিয়ায় কার ভরসায় বেঁচে থাকব?"

ইতির এই কথাগুলো আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মতো একজন পাকা ব্যবসায়ীর মাথায় যেন একটা ঠান্ডা জলের ছিটা দিল। তিনি এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, মেয়েটি কেবল অন্ধের মতো তাঁর প্রেমে বা শরীরের টানে ভেসে যায়নি; সে তার জীবনের একটা পাকাপোক্ত, নিরাপদ ও কোটিপতি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার জন্যই এই পদক্ষেপে পা বাড়াচ্ছে।

---

আলতাফ সিরাজ চৌধুরী হলেন ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর মতো বিশাল শিল্পগোষ্ঠীর মালিক। তাঁর জীবনে টাকা-পয়সা, সম্পত্তি আর সম্পদের কোনো কমতি নেই। কিন্তু তাঁর কোনো সন্তান নেই, উত্তরাধিকারী বলতেও কেউ নেই। চিরকুমার থাকার কারণে তিনি সারাটা জীবন একা কাটিয়েছেন। তাই ইতির মুখে যখন এই ভবিষৎ নিরাপত্তার কথাটি তিনি শুনলেন, তখন তাঁর অন্ধ লালসা এবং বুড়ো বয়সের দুর্বলতা তাঁকে এমন এক অন্ধত্বে ফেলে দিল যে তিনি ইতির এই স্বার্থপর দাবিটাকে এক প্রকার বুদ্ধিমত্তা ও অধিকার বলে ভুল করলেন।

আলতাফ সাহেব আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করলেন না। তিনি গাড়িটাকে রাস্তার পাশে একটি নিরিবিলি জায়গায় পার্ক করে পুরোপুরি ঘুরলেন এবং দুই হাত দিয়ে ইতিকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন।

তিনি ইতির কপালে নিজের ঠোঁট দুটো সজোরে ও অত্যন্ত গাঢ়ভাবে চেপে ধরে দীর্ঘক্ষণ ধরে একটি উষ্ণ চুমু খেলেন। সেই চুম্বনের মধ্যে ছিল এক অন্ধ আত্মনিবেদন এবং ইতির সমস্ত শর্ত মেনে নেওয়ার আকুলতা।

চুমু শেষে আলতাফ সাহেব ইতির চোখের দিকে তাকিয়ে হাপাতে হাপাতে বললেন, "ইতি! তুমি এত বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে, তা আমি আগে বুঝতে পারিনি! তুমি ঠিকই বলেছ—তোমার ভবিষৎ নিয়ে তো আমাকেই ভাবতে হবে। আমি তোমাকে মন দিয়ে ভালোবাসি, ইতি। আমার এই বিশাল সাম্রাজ্য, এই কোটির পর কোটি টাকার সম্পত্তি—সবকিছু তো তোমার জন্যই! আমি তোমাকে ছাড়া আমার এই জীবনের কোনো মানে দেখি না। তুমি যা চাইছ, আমি তাই দিতে প্রস্তুত আছি।"

ইতি আলতাফ সাহেবের বুকে মাথা রেখে মিষ্টি করে হাসল। সে খুব চতুর সুরে ফিসফিস করে বলল, "শুধু মুখে মুখে বললে তো আর সমাজ বা আইন মানবে না, স্যার। কাজী অফিসে যাওয়ার আগে আমাকে তো আইনি নিরাপত্তা দিতে হবে। যাতে আপনার অবর্তমানে কেউ আমার গায়ে একটা আঙুলও তুলতে না পারে।"

আলতাফ সাহেব এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা করলেন না। তাঁর মাথার ভেতর তখন ইতির শরীর আর তার প্রতি আসক্তি ছাড়া আর কোনো চিন্তা কাজ করছিল না। তিনি সাথে সাথে নিজের পকেট থেকে আইফোনটা বের করে বললেন, "ঠিক আছে! আমি এখনই আমার ব্যক্তিগত উইলের উকিলকে ফোন করছি। আমার সমস্ত সম্পত্তির আইনগত দায়িত্ব আজকেই তোমার নামে লিখে দেব। দেখি কার সাধ্য আছে তোমার গায়ে হাত তোলে!"

------

রাত তখন প্রায় নয়টা বেজে গেছে। ঢাকার গুলশানের এক অভিজাত এপার্টমেন্টে কাগজপত্রে ডুবে ছিলেন অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামান—যিনি গত পঁচিশ বছর ধরে সিরাজ পরিবারের সমস্ত আইনি দলিলপত্র, সম্পত্তি ও উইলের কাজ অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে সামলে আসছেন।

হঠাৎ করেই তাঁর বেডরুমে রাখা ল্যান্ডফোন ও মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল—*রিং... রিং... রিং...*।

অ্যাডভোকেট সাহেব বিরক্ত হয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন এত রাতে কে ফোন করল! তিনি তাড়াতাড়ি ফোনটা রিসিভ করে ওপাশ থেকে অত্যন্ত গম্ভীর ও ভারী গলায় বললেন, "হ্যালো? কে বলছেন?"

ওপাশ থেকে আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর অত্যন্ত দ্রুত, উত্তেজিত ও কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "রফিক সাহেব! আমি আলতাফ বলছি! ঘুম ভেঙে দিলাম নাকি?"

অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামান কোম্পানির চেয়ারম্যানের গলা শুনে সাথে সাথে বিছানায় সোজা হয়ে বসে পড়ে বললেন, "আরে স্যার! আপনি এই রাতে... কোনো বিপদ বা জরুরি সমস্যা হয়েছে নাকি?"

আলতাফ সাহেব কোনো রাখঢাক না করে হাপাতে হাপাতে বললেন, "হ্যাঁ, জরুরি ব্যাপারই বটে! শোনো রফিক সাহেব, কাল সকালের জন্য অপেক্ষা করার সময় আমার নেই। আমি ঠিক করেছি, এখনই একটা নতুন উইল তৈরি করতে হবে। আমার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, ব্যাংকের ব্যালেন্স, ফ্যাক্টরি আর ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিকানা সংক্রান্ত সমস্ত দলিলপত্র তৈরি করতে হবে।"

অ্যাডভোকেট সাহেব একটু অবাক হয়ে খাতা-কলম কাছে টেনে নিয়ে বললেন, "উইল তো আগের করা আছে, স্যার। হঠাৎ করে নতুন করে উইল করার কথা বলছেন কেন? আর কাকে নমিনি বা উত্তরাধিকারী করতে চান, তা তো আমাকে একটু পরিষ্কার করে বলতে হবে।"

আলতাফ সাহেব তখন পাশের সিটে বসা ইতির দিকে এক নজর তাকিয়ে, আরও দৃঢ় ও শক্ত গলায় বললেন, "শোনো রফিক সাহেব, আমার উইলের বয়ান খুব পরিষ্কার হবে। আমার অবর্তমানে—অর্থাৎ আমার মৃত্যুর পরে—আমার এই বিশাল সাম্রাজ্য ও সমস্ত সম্পত্তির একক মালিক হবে একজন বিশেষ নারী, যার নাম ইতি আক্তার। সে কেবল আমার সম্পত্তির মালিকই হবে না, সে আমার আইনগত স্ত্রী হিসেবে ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর চেয়ারম্যানের আসনে বসবে এবং কোম্পানির সমস্ত ক্ষমতা তার হাতে থাকবে!"

ওপাশ থেকে অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামান এই কথা শোনার পর প্রায় স্তব্ধ হয়ে গেলেন! তিনি কয়েক সেকেন্ড কোনো কথাই বলতে পারলেন না। তিনি তো জানেন আলতাফ সাহেব সারাজীবন বিয়েই করেননি, আর হঠাৎ করে রাতের বেলা এমন একটা অচেনা মেয়ের নামে আস্ত একটা কর্পোরেট সাম্রাজ্যের উইল লিখে দেওয়ার কথা বলছেন!

অ্যাডভোকেট সাহেব একটু ভয়ে ভয়ে বললেন, "স্যার... বিষয়টি কি একটু বেশি তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে না? এভাবে মাঝরাতে হঠাৎ করে উইল তৈরি করা... একটু আইনি জটিলতা থাকতে পারে। তাছাড়া সাক্ষীদের উপস্থিতিও..."

"কোনো জটিলতা আমি শুনতে চাই না, রফিক সাহেব!" আলতাফ সাহেব রাগে ও উত্তেজনায় গর্জে উঠলেন। "আমি যা বলছি, ঠিক সেটাই হবে! আপনি আপনার চেম্বারে সমস্ত কাগজপত্তর, প্রিন্টার আর সিলগালা নিয়ে রেডি থাকুন। আমি ঠিক আধা ঘণ্টার মধ্যে আপনাকে ফোন করে আপনার অফিসে পৌঁছাচ্ছি। যত টাকা লাগুক ব্যবস্থা করেন!"

বলেই আলতাফ সাহেব আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ফোনটা কেটে দিলেন।

------

আলতাফ সিরাজ চৌধুরী ফোনটা কাটার পর ইতির দিকে তাকিয়ে একটা বিজয়ী হাসি দিয়ে বললেন, "শুনলে তো, ইতি? রফিক সাহেবকে আমি বলে দিয়েছি। আর মাত্র আধা ঘণ্টা, এর মধ্যেই আমরা উনার গুলশানের চেম্বারে পৌঁছে যাচ্ছি। উইল রেডি হয়ে যাবে।"

ইতি মনে মনে এক অদ্ভুত আনন্দ ও উল্লাসে ফেটে পড়ল। সে ভাবতেও পারেনি যে এই বুড়ো মানুষটিকে সে এত সহজে নিজের হাতের পুতুল বানিয়ে ফেলবে। সে খুব মিষ্টি ও অনুগত গলায় বলল, "আপনার এই ভালোবাসার কথা আমি সারাজীবন মনে রাখব, স্যার। আপনি সত্যিই আমার জন্য এত কিছু করছেন!"

আলতাফ সাহেব গাড়ি স্টার্ট দিলেন এবং গুলশানের সেই বিখ্যাত আইনি চেম্বারের উদ্দেশ্যে গাড়ি ছুটিয়ে দিলেন।

ঠিক পঁচিশ মিনিট পরে, আলতাফ সাহেবের কালো জার্মান সেডান গাড়িটি অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামানের চেম্বারের প্রাইভেট পার্কিংয়ে এসে থামল। আলতাফ সাহেব গাড়ি থেকে নেমে অত্যন্ত যত্নে ইতির হাত ধরে গাড়ি থেকে নামালেন। তারপর দুজন একসাথে লিফটে করে দোতলায় উঠে অ্যাডভোকেট সাহেবের প্রাইভেট চেম্বারের দরজায় গিয়ে পৌঁছলেন।

দরজা খোলাই ছিল। ভেতরে ঢুকেই দেখা গেল, বয়স্ক অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামান অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বিশাল মেহগনি কাঠের টেবিলের সামনে বসে আছেন। তাঁর সামনে ল্যাপটপ খোলা, প্রিন্টার থেকে তখনো তাজা কালিতে ছাপানো কিছু আইনি কাগজ বের হচ্ছে। তাঁর চেহারায় এক ধরনের টেনশন ও বিস্ময় স্পষ্ট ফুটে উঠছিল।

আলতাফ সাহেব ইতিকে নিয়ে সরাসরি টেবিলের সামনে গিয়ে বসলেন। আলতাফ সাহেব অত্যন্ত ভাবলেশহীন ও ধমকের সুরে বললেন, "সব ঠিক আছে তো, রফিক সাহেব? উইল প্রিন্ট করা হয়েছে?"

অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামান চশমাটা নাক থেকে একটু নামিয়ে ইতির দিকে এক নজর তাকিয়ে, তারপর আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে খুব সাবধানে বললেন, "উিলের ড্রাফট আমি তৈরি করে প্রিন্ট করে নিয়েছি, স্যার। তবে আমি আপনার ভালোর জন্যই বলছি—এই ধরনের সেন্সিটিভ বিষয়ে একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করা উচিত ছিল। উইলে যা লেখা হয়েছে, তাতে আপনার এই বিশাল কোম্পানির শত শত কোটি টাকার মালিকানা একেবারে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষের হাতে চলে যাবে..."

আলতাফ সাহেব হাত তুলে রফিক সাহেবকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে কঠোর গলায় বললেন, "আমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত, রফিক সাহেব! আমার সম্পত্তি, আমার কোম্পানি—কাকে দেব না দেব, সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনি আমাকে আইনি জ্ঞান দিতে আসবেন না। উইলের কাগজে যেখানে যেখানে সই করতে হবে, সেটা জলদি দেখান।"

-----

অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামান বুঝলেন এই মুহূর্তে চেয়ারম্যানের সাথে তর্কে যাওয়া বৃথা। তিনি তখন বাধ্য হয়ে সেই আইনি দলিলের কাগজগুলো আলতাফ সাহেবের সামনে মেলে ধরলেন।

কাগজের ওপর বড় বড় অক্ষরে টাইপ করা রয়েছে সেই ঐতিহাসিক ও সর্বনাশা উইল:

> *"অত্র দলিলের মাধ্যমে আমি, সৈয়দ আলতাফ সিরাজ চৌধুরী... সুস্থ মস্তিষ্কে ও স্বেচ্ছায় ঘোষণা করিতেছি যে, আমার মৃত্যুর পর আমার মালিকানাধীন ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর সমস্ত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, ব্যাংকের সমস্ত একাউন্ট, গুলশান ও ধানমন্ডির সমস্ত ফ্ল্যাট এবং কোম্পানির যাবতীয় শেয়ারের একক ও সর্বময় মালিক হইবে ইতি আক্তার। এবং তিনি আইনগতভাবে আমার স্ত্রী ও উত্তরাধিকারী হিসেবে উক্ত কোম্পানির ‘চেয়ারম্যান’ পদে আসীন হইবেন..."*

উইলের এই বয়ানটা যখন ইতি নিজের চোখে দেখল, তখন তার বুকটা একটা হর্ষধ্বনিতে কেঁপে উঠল। সে জীবনে কখনো স্বপ্নেও ভাবেনি যে পুরান ঢাকার একটা সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের ঘর থেকে সে একদিন ঢাকার অন্যতম শীর্ষ এক শিল্পপতির শত কোটি টাকার সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র রানি বনে যাবে! তার ফর্সা মুখটা তখন খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে খুব সন্তর্পণে আলতাফ সাহেবের কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল, "আপনার এই বিশ্বাস আমি কখনো ভাঙব না, স্যার।"

আলতাফ সাহেব ইতির চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে রফিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কলম দিন। আমি সই করব।"

অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামান একটি দামি পার্কার কলম আলতাফ সাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।

আলতাফ সাহেব বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সেই উইলের নির্দিষ্ট জায়গায় নিজের সই করে দিলেন—*‘সৈয়দ আলতাফ সিরাজ চৌধুরী’*। তারপর তিনি কোম্পানির সিলমোহর ও অফিশিয়াল সিল দিয়ে সেটাকে আইনি বৈধতা দিলেন।

এরপর রফিক সাহেব ইতির দিকে তাকিয়ে বললেন, "ম্যাডাম, আপনাকেও এখানে সাক্ষর করতে হবে এবং সাক্ষী হিসেবে উইলের শর্তগুলো মেনে নিতে হবে।"

ইতি একটুও সময় নষ্ট না করে অত্যন্ত সাবলীল ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে সেই কলমটি হাতে তুলে নিল। সে উইলের পাতায় নিজের নাম সই করল—*‘ইতি আক্তার’*।

দুজন সাক্ষীর সই এবং অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামানের সিল ও স্বাক্ষরের মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় আইনি উইলটি পাকাপোক্তভাবে তৈরি হয়ে গেল।

------

উইলের সই সম্পন্ন হওয়ার পর অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামান অত্যন্ত গম্ভীর মুখে কাগজগুলো একটা লেদার ফোল্ডারে ভরে আলতাফ সাহেবের হাতে তুলে দিলেন। তিনি কোনো কথা বললেন না, কেবল একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

আলতাফ সাহেব ফোল্ডারটি হাতে নিয়ে খুব সন্তুষ্টচিত্তে একটা মুচকি হাসি দিলেন। তিনি রফিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, "ধন্যবাদ, রফিক সাহেব। আপনার বিশ্বস্ততার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এই দলিলের একটা কপি আমার লকারেই থাকবে, আর একটা কপি আপনার কাছে সুরক্ষিত রাখুন।"

"ঠিক আছে, স্যার," রফিক সাহেব মলিন মুখে জবাব দিলেন।

আলতাফ সাহেব আর এক মুহূর্তও সেখানে সময় নষ্ট করলেন না। তিনি ইতির হাত ধরে অত্যন্ত গর্বিত ও বিজয়ী ভঙ্গিতে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলেন। লিফটে করে নিচে নামার সময় আলতাফ সাহেব ইতিকে নিজের বাহুডোরে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বললেন, "এবার দেখলে তো, ইতি? আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি! এখন আর দুনিয়ার কোনো শক্তি নেই যা তোমাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারে। মালেক তো দূরের কথা, কেউ তোমার গায়ে হাত দিতে পারবে না!"

ইতি আলতাফ সাহেবের কাঁধে মাথা রেখে খুব মিষ্টি ও ধূর্ত একটা হাসি দিল। সে মনে মনে ভাবল—*‘মালেক তো কেবল একটা পুতুল মাত্র, আর এই বুড়ো মানুষটা হলো আমার হাতের চাবি। আজ থেকে এই সাম্রাজ্যের আসল রানি আমিই!’*

বাইরে রাত বেড়ে চলেছে । রাতের সেই দীর্ঘ ও নাটকীয় অভিসারের সমাপ্তি ঘটেছিল এক এমন উইলের পাতায়, যা আগামী দিনে পুরান ঢাকার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটে এবং মতিঝিলের কাঁচঘেরা অফিসে এক অবিশ্বাস্য ও ভয়ানক প্রলয় ডেকে আনতে চলেছে। (চলবে)
[+] 4 users Like Romzan83's post
Like Reply
#56
[Image: IMG-20260815-080946-553.png]
[+] 2 users Like Romzan83's post
Like Reply
#57
Chalu meye... Thriller baper ache.. Darun hoche... Next update er opekhai
[+] 1 user Likes Slayer@@'s post
Like Reply
#58
Great great... Khub bhalo.. Waiting for next update
[+] 1 user Likes BiratKj's post
Like Reply
#59
একুশ পর্ব

পরের দিন সকালের সোনালী রোদ এসে পড়েছিল গুলশানের সেই সুউচ্চ আলিশান ফ্ল্যাটের বিশাল কাঁচের জানলা ভেদ করে। শিল্পপতি সৈয়দ আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর ব্যক্তিগত ও দুর্ভেদ্য দুর্গ। যে ফ্ল্যাটের প্রতিটি কোণায় জড়িয়ে রয়েছে কোটি কোটি টাকার আভিজাত্য, মার্বেল পাথরের ফ্লোর, ইটালিয়ান ঝাড়বাতি আর দামি সোফা-সেট।

সেই বিশাল ড্রয়িংরুমের মাঝে দাঁড়িয়ে ইতি তখন নিজের চোখ দুটো বড় বড় করে পুরো ফ্ল্যাটটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। তার পরনে সেই পরিচিত হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি আর খোলামেলা ব্লাউজ, গলায় ঝুলছে সেই ৭৫ হাজার টাকার লকেট। গতকাল রাতে অ্যাডভোকেট রফিকুজ্জামানের চেম্বারে সই করা সেই ঐতিহাসিক উইলটি এখন আলতাফ সাহেবের লকারে সুরক্ষিত, যার বলে এই ফ্ল্যাটের এবং পুরো ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর ভবিষ্যৎ মালিক এখন এই সাধারণ ঘরের মেয়ে ইতি।

ইতি বসার ঘর থেকে হেঁটে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বেডরুম, ডাইনিং রুম আর তারপর সোজা গিয়ে দাঁড়াল বিশাল কাঁচঘেরা বেলকনিতে । বেলকনির দরজা ঠেলে সে যখন বাইরে এসে দাঁড়াল, তখন তার পায়ের নিচে যেন আস্ত একটা শহর লুটিয়ে পড়েছে। গুলশানের সুউচ্চ এপার্টমেন্টের সেই বারান্দা থেকে পুরো ঢাকা শহরের গুলশান লেক, বড় বড় বহুতল ভবন, আর ব্যস্ত রাজপথের প্যানোরামিক ভিউ দেখা যাচ্ছে। সকালের মিষ্টি বাতাসে তার চুলগুলো একটু উড়ছিল, আর তার ফর্সা মুখে ফুটে উঠেছিল এক পরম তৃপ্তি ও বিজয়ের হাসি। সে মনে মনে ভাবল—*‘যে পুরান ঢাকার ছোট্ট স্যাঁতসেঁতে ফ্ল্যাটে আমার দিন কাটত, আজ আমি সেই পুরো শহরের মালকিন হয়ে গেলাম!’*

ঠিক সেই মুহূর্তেই—পেছন থেকে নিঃশব্দ পায়ে হেঁটে এসে আলতাফ সিরাজ চৌধুরী নিজের দুই শক্তিশালী হাত দিয়ে ইতিকে একেবারে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর গায়ে তখন ঘরে পড়ার আরামদায়ক সাদা শার্ট ও প্যান্ট। তাঁর মুখাবয়বে বয়সের ছাপ থাকলেও গত রাতের ওই উইলের পর থেকে তাঁর ভেতরের চাঞ্চল্য ও আনন্দ যুবকদের মতো হয়ে উঠেছে।

ইতি একটু চমকে ওঠার ভান করে ঘাড় ঘুরিয়ে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকাল। সে খিলখিল করে হেসে উঠে অত্যন্ত আদুরে ও কৌতুকভরা গলায় বলল, "ওমা! আপনি এভাবে লুকিয়ে পেছনে এসে ধরলেন কেন, স্যার? আমার তো হার্টফেল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল!"

আলতাফ সাহেব ইতির কাঁধে নিজের মুখটা গুঁজে দিয়ে গভীর তৃপ্তির নিশ্বাস ফেললেন। তিনি ফিসফিস করে বললেন, "তোমার এই চমক দিতে আমার খুব ভালো লাগে, ইতি। বল তো, আমার এই বাসাটা তোমার কেমন লাগছে? কাল রাতে তো শুধু অন্ধকারের মধ্যে এসেছ, আজ দিনের আলোয় পুরোটা ভালো করে দেখে নাও। এই পুরো সাম্রাজ্য আজ থেকে তোমার!"

ইতি আলতাফ সাহেবের হাতের আঙুলের ওপর নিজের হাত রেখে মুচকি হেসে বলল, "খুব সুন্দর, স্যার! এত বড় বাড়ি আমি জীবনে কখনো টিভিতেও দেখিনি।আপনার কি এখনো ঠিকমতো ঘুম ভাঙেনি নাকি?!"

আলতাফ সাহেব একটু হেসে ইতির চিবুকটা ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বললেন, "ঘুম আমার অনেক আগেই ভেঙে গেছে, ইতি। তবে তোমাকে বউয়ের সাজে দেখার যে নেশা আমার মাথায় চেপে বসেছে, তাতে আমার চোখের পাতা আর এক ফোঁটাও এক হচ্ছে না। এখন আর সময় নষ্ট করার সময় নেই।"

-----

আলতাফ সিরাজ চৌধুরী ইতির কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখের ভেতর তখন এক ধরনের তাড়া ও উদ্দাম উত্তেজনা কাজ করছে।

তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ইতির হাত দুটো ধরে বললেন, "শোনো, ইতি! আমি বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করতে চাই না। আজ সকালেই আমাদের কাজী অফিসে যাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা পাকা করা আছে। আমার বিশ্বস্ত লোক সব রেডি করে রেখেছে। তুমি জলদি করে ঘরে যাও, গিয়ে ওই সাধারণ শাড়ি পাল্টে ফেলো। আমার ড্রয়িংরুমের ভেতরের আলমারিতে দেখবে, আমি তোমার জন্য অনেক দামি দামি বেনারসি শাড়ি, সোনার গহনা আর পারফিউম এনে রেখেছি। তুমি জলদি করে বউয়ের সাজে একেবারে রানি হয়ে সেজে প্রস্তুত হয়ে নাও। আমরা আধা ঘণ্টার মধ্যে বের হব।"

ইতির চোখ দুটো তখন আলমারির ওই দামি শাড়ি আর গহনার কথা শুনে আরও চকচক করে উঠল। সে বুঝল, এই বুড়ো মানুষটি তাকে সত্যিই আস্ত একটা রানি বানিয়ে ছাড়বে।

তার মনের ভেতর তখন এক পৈশাচিক আনন্দ কাজ করছিল। সে আলতাফ সাহেবের আরও একটু কাছে এগিয়ে এল। তারপর একটু দুষ্টুমিভرا হাসি দিয়ে আলতাফ সাহেবের ডান গালের ঠিক মাংসল অংশে নিজের দাঁত দিয়ে একটু জোরে, কিন্তু অত্যন্ত আদরমাখা ও কামোদ্দীপক ভঙ্গিতে একটা ছোট কামড় বসিয়ে দিল!

*পিক!*—আলতাফ সাহেব একটু ব্যথার ভান করে মৃদু একটা শব্দ করে উঠলেন, "উফ! ইতি! এটা কী করলে?"

ইতি খিলখিল করে হেসে আলতাফ সাহেবের সেই কামড় দেওয়া জায়গায় নিজের নরম আঙুল বুলিয়ে দিয়ে অত্যন্ত মিষ্টি ও বাধ্যগত গলায় বলল, "এটা হলো আপনার সেই হুকুমের অগ্রিম সালাম, স্যার! আপনি আমাকে রানি সাজিয়ে কাজী অফিসে নিয়ে যাবেন, আর আপনার সেই হুকুম কি আমি অমান্য করতে পারি? আপনার যেকোনো হুকুম আমার কাছে চিরকাল সর্বেসর্বা ও পালনীয়। আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি দশ মিনিটের মধ্যে বউয়ের সাজে একেবারে পরিপাটি হয়ে আপনার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছি।"

বলেই ইতি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে এক লাফে ড্রেসিংরুমের দিকে ছুটে গেল, আর আলতাফ সাহেব নিজের গালের সেই কামড়ের দাগটায় হাত বুলাতে বুলাতে এক অদ্ভুত মোহাচ্ছন্ন হাসিতে ফেটে পড়লেন।

------

আর অন্যদিকে—গুলশানের এই বিলাসবহুল প্রাসাদের ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেল পুরান ঢাকার সেই ছোট্ট, জীর্ণ ফ্ল্যাটে।

রাত তখন পোহাতে পোহাতে সকাল হয়ে গেছে। গতকাল রাত থেকে আবদুল মালেক ডিউটি শেষ করে যখন বাসায় ফিরেছিল, তখন সে দেখল ফ্ল্যাটের দরজা বাইরে থেকে সামান্য ভেজানো, কিন্তু ভেতরে চাবি দিয়ে আটকানো। সে ভেবেছিল ইতি হয়তো ঘুমাচ্ছে কিংবা আশেপাশের কোনো দোকানে গেছে। কিন্তু রাত গড়িয়ে যখন ভোর হয়ে গেল, আর ইতি ঘরে ফিরে এল না—তখন মালেকের বুকের ভেতরকার রক্ত ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো!

সে ঘরের কোণায় কোণায়, রান্নাঘরে, বাথরুমে—সব জায়গায় পাগলের মতো ইতির নাম ধরে ডাকল, কিন্তু কোথাও ইতি নেই। তার জামাকাপড়, শাড়ি—সবকিছু ঠিক আছে, কেবল পরনের ওই হলুদ সুতির শাড়িটা আর গলার লকেটটা ছাড়া আর কোনো জিনিস সে নিয়ে যায়নি।

সকাল হতে না হতেই মালেক তার সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্মটা কোনোমতে গায়ে গলিয়ে পাগলের মতো রাস্তায় বেরিয়ে এল। সে পুরান ঢাকার অলিগলি, মুদির দোকান, রিকশার গ্যারেজ, বাসস্ট্যান্ড—সব জায়গায় হালের গরুর মতো ছুটতে লাগল। সে যাকে পেল তাকেই জিজ্ঞেস করতে লাগল, "আপনারা কি ইতিকে দেখেছেন? আমার বউটাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছেন?"

লোকে তাকে পাগল ভাবল। কেউ কোনো সঠিক খবর দিতে পারল না।

মালেক তখন আর কোনো উপায় না পেয়ে সোজা দৌড়ে গিয়ে উপস্থিত হলো স্থানীয় লালবাগ থানায়। থানার বড় দারোগার সামনে গিয়ে সে কেঁদে ফেলে হাত জোড় করে বলল, "স্যার! দয়া করে আমার বউটাকে একটু খুঁজে দিন! আমার বউ ইতি—কাল রাত থেকে হঠাৎ করে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়ে গেছে! সে কোথায় গেল আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না! কেউ কি তাকে অপহরণ করেছে?"

থানার দারোগা তখন টেবিলে পা তুলে একটা চুরুট টানছিলেন। তিনি মালেকের কথা শুনে এক পলক তার দিকে তাকালেন, তারপর অত্যন্ত উদাসীন ও তাচ্ছিল্যের সুরে হাত নেড়ে বললেন, "যাও যাও! এখানে নাটক করতে এসো না। নতুন বউ রাগ করে বাপের বাড়ি গেছে কিংবা কোনো প্রেমিকের সাথে ভেগে গেছে—এতে পুলিশের কী করার আছে? যাও, নিজের কাজে মন দাও!"

মালেক আর্তনাদ করে বলল, "না স্যার! সে বাপের বাড়ি যায়নি! আমি খোঁজ নিয়েছি! আমার বউ এমনি যাওয়ার মেয়ে নয়! দয়া করে একটা জিডি বা কমপ্লেন নিন!"

দারোগা তখন একটু রেগে গিয়ে টেবিল চাপড়ে বললেন, "বলছি তো কমপ্লেন নেওয়া যাবে না! যাও এখান থেকে মাথা খারাপ কোরো না!"

মালেক জানত না যে এই পুলিশ অফিসারদের মুখ আগেই আলতাফ সিরাজ চৌধুরী মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে বন্ধ করে রেখেছেন। ওপর মহলের হুকুম ছিল—সিকিউরিটি গার্ড মালেকের বউ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ থানায় এলেও যেন তা গায়ে হাওয়া দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ যে তাকে পাত্তাই দেবে না, তা মালেক কল্পনাও করতে পারেনি। সে থানা থেকে বের হয়ে এল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া অবস্থায়। তার মাথা কাজ করছিল না, সে আস্ত একটা দিশেহারা মানুষে পরিণত হয়েছিল।

-----

রাস্তার ধুলোবালিতে দাঁড়িয়ে মালেক যখন বুঝতে পারল যে পুলিশও তাকে সাহায্য করবে না, তখন তার চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। সে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তার পাশে একটা ইটের ওপর বসে পড়ল।

তার মনের মধ্যে বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলো—গাড়ির মোড়ে চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে ইতির সেই অন্তরঙ্গ দৃশ্য, রান্নাঘরে ওষুধের শিশি না খোলার রহস্য, আর বারবার চেয়ারম্যান সাহেবের সেই তাকে আটকে রাখার অদ্ভুত চেষ্টা ও বেশি বেতন দেওয়ার লোভ।

মালেকের সরল ও অন্ধ বিশ্বাসের ভেতরে হঠাৎ করেই একটা বিদ্যুৎ চমকে উঠল। সে মনে মনে ভাবল—*‘সবকিছুর পেছনে কি তবে... ওই চেয়ারম্যান সাহেবের হাত আছে? ইতি কি তবে চেয়ারম্যান সাহেবের সাথেই...?’*

এই ভংকর চিন্তাটা মাথায় আসতেই মালেকের শরীর কেঁপে উঠল। সে প্রথমে এই কথা বিশ্বাস করতে চায়নি, কারণ সে তো আলতাফ সাহেবকে দেবতার মতো ভক্তি করত। কিন্তু এখন আর কোনো পথ খোলা নেই। তার বউ নিখোঁজ, পুলিশ সাহায্য করছে না, আর একমাত্র ওই কোম্পানির চেয়ারম্যান সাহেবই হলেন সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি যিনি চাইলে সব খবর রাখতে পারেন।

মালেক তখন একটা চূড়ান্ত ও মরিয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে সোজা রিকশা ধরে সরাসরি মতিঝিলের ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’ ভবনের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সে ঠিক করেছে, সে সোজা গিয়ে চেয়ারম্যান সাহেবের পায়ে ধরে সাহায্য চাইবে—সে জানবে যে চেয়ারম্যান সাহেব এত বড় একজন মানুষ, তিনি নিশ্চয়ই তার এই গরিব কর্মচারীর বউকে খুঁজে বের করার জন্য পুলিশ বা প্রশাসনকে লাগিয়ে দেবেন!

মালেক তো ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি যে সে যার কাছে সাহায্য চাইতে যাচ্ছে, সেই মানুষটিই তার সর্বনাশের মূল হোতা এবং সে এই মুহূর্তে গুলশানের সেই আলিশান প্রাসাদে ইতিকে চিরকালের মতো নিজের করে নেওয়ার শেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মতিঝিলের গেইটের দিকে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলা মালেকের সেই অন্ধ বিশ্বাসের অবসান ঘটার সময় তখন ঘনিয়ে আসছিল, আর পুরান ঢাকার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটের শূন্যতা তখন এক মহা প্রলয়ের অপেক্ষা করছিল। (চলবে}
[+] 2 users Like Romzan83's post
Like Reply
#60
[Image: IMG-20260818-075027-265.png]
[+] 1 user Likes Romzan83's post
Like Reply




Users browsing this thread: 1 Guest(s)