Thread Rating:
  • 8 Vote(s) - 3.38 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Adultery একলা চলো রে..LOVE, SEX AUR DHOKA
#1
প্রথম পর্ব: 

 
ঢাকা শহরের মতিঝিল এর যেকোনো আধুনিক বাণিজ্যিক ভবনের মতোই এই আকাশচুম্বী টাওয়ারটি তার আধুনিকতার জানান দেয়। গ্লাস আর স্টিলের নিখুঁত কারুকাজে তৈরি এই ভবনের সতেরো তলার পুরো ফ্লোর জুড়ে ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর হেড অফিস। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এই কর্পোরেট হাউজের মূল চাবিকাঠি যাঁর হাতে, তিনি হলেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান—আলতাফ সিরাজ চৌধুরী।

বাইরে তখন বিকেলের নরম রোদ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যার গোধূলিলগ্নে। এসি করা বিশাল রুমটার ভেতরটা এক অদ্ভুত শীতলতায় মোড়ানো। ঘরের তাপমাত্রা সবসময় উনি ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেট করে রাখেন। এই শীতলতা শুধু ঘরের আবহাওয়ার নয়, এর চেয়েও বহুগুণ বেশি শীতল এই রুমের মানুষটির মন।

রুমটার ইন্টেরিয়র ডিজাইন দেখলে যেকোনো শিল্পরসিকের চোখ জুড়িয়ে যাবে। ইতালিয়ান মার্বেলের মেঝেতে জুতোর শব্দ পর্যন্ত হয় না। পেছনের সুবিশাল দেওয়ালজোড়া কাঁচের জানলার বাইরে দেখা যাচ্ছে ব্যস্ত ঢাকার অগোছালো আকাশরেখা—অসংখ্য গাড়ি, ব্যস্ত মানুষের ছুটোছুটি, আর দূরে জ্বলে ওঠা নিয়ন আলো। কিন্তু এই দৃশ্য দেখার বা উপভোগ করার মতো কোনো অবকাশ বা মানসিকতা আলতাফ সাহেবের নেই।

মাহমুদ আলতাফ সিরাজ চৌধুরী—বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই, কিংবা পার হয়ে গেছে বলা চলে। মাথার চুলগুলোতে এখন রূপালি বরফের আস্তরণ, কিন্তু চেহারার শক্ত ও কর্কশ ভাব বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং বয়সের সাথে সাথে তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। চওড়া কপাল, কুঁচকানো ভ্রু, তীক্ষ্ণ ও অনুকম্পাহীন দৃষ্টি—সব মিলিয়ে প্রথম দেখায় যেকোনো মানুষ তার সামনে দাঁড়াতে ভয় পাবে। তার গায়ে সবসময় পরিপাটি করে কাটা স্যুট, টাইয়ের নট নিখুঁত। গত তিন দশক ধরে তার নিয়মে কোনোদিন এতটুকু ব্যত্যয় ঘটেনি। সকাল আটটায় অফিসে ঢোকা, রাত দশটা বা তারও পরে অফিস ত্যাগ করা—এটাই তার জীবন।

সাফল্যের সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে তিনি তার জীবনের সমস্ত ব্যক্তিগত অর্জনকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন। কোনো সঙ্গী নেই, নেই কোনো কোলাহলপূর্ণ সংসার, সন্তানের স্নেহের পরশ বা স্ত্রীর ভালোবাসার উষ্ণতা। তিনি চিরকুমার। একা। এই বিশাল সাম্রাজ্যের তিনি একচ্ছত্র অধিপতি বটে, কিন্তু এই চার দেওয়ালের ভেতরে তিনি এক নিঃসঙ্গ দ্বীপ। তার জগৎ কেবল ফাইল, ব্যালেন্স শিট, প্রফিট-লস স্টেটমেন্ট আর বিশ্ববাজারের ওঠানামার খবরের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

টেবিলে রাখা মহামূল্যবান মন্টব্লংক পেনটা দিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টে স্বাক্ষর করছিলেন তিনি। তার মুখের পেশিগুলো শক্ত হয়ে আছে। এই মুহূর্তে একটা ছোট ভুলও তিনি সহ্য করেন না। তার অধীনস্থ কোনো এমপ্লয়ি যদি সামান্যতম শৈথিল্য দেখায়, তবে তার কড়া তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হয়। অফিসের সবাই তাকে যমের মতো ভয় পায়। কেউ তার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ও ফিসফিস করে কথা বলে, পা টিপে হাঁটে।
....

হঠাৎ করে আলতাফ সাহেবের কলমটা থেমে গেল। ডকুমেন্টের কাগজ থেকে তার তীক্ষ্ণ চোখ দুটো সরে গেল সামনের বিশাল মেহগনি কাঠের দরজার দিকে। দরজাটা আংশিক বন্ধ, তবে তার ওপরের অংশে স্বচ্ছ কাঁচ লাগানো।

তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সবসময় অত্যন্ত প্রখর। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, রুমের বাইরে করিডোরে কেউ একজন গত পনেরো মিনিট ধরে পায়চারি করছে। ভারী জুতোর মৃদু শব্দ, তারপর থেমে যাওয়া, আবার ফিসফিস করে হাঁটার আওয়াজ। সাধারণ কোনো পিওন বা এক্সিকিউটিভ হলে এতক্ষণ সাহস পেত না। এটা কারোর পদচারণা, যিনি ভেতরে ঢোকার জন্য সাহস সঞ্চয় করতে পারছেন না।

আলতাফ সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন। তার কপালে গভীর ভাঁজ পড়ল। এই সুশৃঙ্খল অফিসে নিয়মভঙ্গ বা বিনা অনুমতিতে কেউ তার রুমের কাছাকাছি আসবে—এটা তিনি বিন্দুমাত্র বরদাস্ত করেন না।

তিনি ঘড়ি দেখলেন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বাজে। অফিসের বাকি সবাই প্রায় কাজ গুটিয়ে বাড়ি চলে গেছে। তাহলে এই সময়ে করিডোরে কে চক্কর কাটছে?

তিনি চেয়ার থেকে এক ইঞ্চিও নড়লেন না। শুধু তার দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হলো। তিনি অপেক্ষা করলেন দেখতে চান, এই ধৃষ্টতা কার।

বাইরে তখন ঘাম মুছছেন আবদুল মালেক।

আবদুল মালেকের বয়স চল্লিশের কোঠায়। পরনে মেরুন রঙের সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্ম, যা গায়ে একটু ঢিলেঢালা। মাথায় টুপিতে সামান্য ময়লা জমেছে। তার কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে গালের ওপর। তার হাত দুটো মৃদু কাঁপছে। গত তিন মাস হলো সে এই প্রতিষ্ঠানে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি পেয়েছে। এর আগে তার জীবনটা ছিল বড় বেশি দুর্বিষহ, এক অন্তহীন অন্ধকূপের মতো।

মালেকের চাকুরির বয়স সবেমাত্র তিন মাস। তিন মাস আগে যখন সে এই অফিসে প্রথম এসে আলতাফ সাহেবের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল, সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো তার বুক কেঁপে ওঠে। তখন তার পকেটে একটাও টাকা ছিল না, বাড়িতে ছোট বোন বা অসুস্থ মায়ের ওষুধ কেনার পয়সা ছিল না। পেটে ভাত ছিল না দিনের পর দিন। সেদিন সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। আলতাফ সাহেবের মতো এমন একজন বজ্রকঠিন মানুষের সামনে সে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিল। নিজের চরম অভাবের কথা বলতে বলতে একেবারে তার পায়ে লুটিয়ে পড়েছিল সে।

আলতাফ সাহেব সাধারণত আবেগ বা কান্নাকাটিতে গলে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি সেদিনও বিরক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু কী মনে করে যেন সেদিন তার মনের গভীরে অদ্ভুত এক শীতল স্রোত বয়ে গিয়েছিল। তিনি মালেককে তুলে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন এইচআর ডিপার্টমেন্টে যাওয়ার জন্য। তখনই ১০,০০০ টাকা মাসিক বেতনে তাকে সিকিউরিটি গার্ডের পদে বহাল করা হয়। সেই থেকে মালেক এই চাকরিটাকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত মনে করে। সে আলতাফ সাহেবকে কোনো সাধারণ মানুষ ভাবে না, ভাবে কোনো অদৃশ্য শক্তির দেবতার মতো, যিনি তাকে অনাহার থেকে বাঁচিয়েছেন।

কিন্তু আজ মালেকের মনে অন্য একটা তাগিদ কাজ করছে। একটা অদ্ভুত দ্বিধা, এক বুক সংকোচ আর ভয়ের এক মিশ্র অনুভূতি তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সে পকেট থেকে বারবার একটা রুমাল বের করে ঘাম মুছছে, আর দরজার দিকে তাকাচ্ছে।
.....

"ভেতরে কে?"

আলতাফ সাহেবের গম্ভীর ও ভারী কণ্ঠস্বরটা করিডোরের নিস্তব্ধতা চিরে প্রতিধ্বনিত হলো। ইন্টারকমের স্পিকার অন করাই ছিল। এই একটা মাত্র হুকুমেই বাইরে থমকে গেল মালেকের হৃৎস্পন্দন।

দরজাটা আস্তে করে ধাক্কা খেল। তারপর অত্যন্ত সাবধানে, ভয়ে ভয়ে দরজাটা একটু ফাঁক হলো। মালেক ভেতরে প্রবেশ করল। তার দুই হাত কোমরের দুই পাশে শক্ত করে সেঁটে আছে, মাথা নিচু করা। ঘরের ভেতরে পা রেখেই তার পা যেন বরফে পরিণত হলো। বিশাল ওই রুমের জাঁকজমক আর আলতাফ সাহেবের ভীতিপ্রদ উপস্থিতি তাকে আরও ছোট করে দিল।

"স্যার... আমি, মালেক," তার গলা দিয়ে শব্দগুলো প্রায় বেরোচ্ছিল না। ঢোক গিলল সে।

আলতাফ সাহেব কলমটা টেবিলে রেখে চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে বসলেন। তার চোখের চশমাটা সামান্য নামিয়ে দিয়ে মালেকের আপাদমস্তক দেখলেন। তার চেহারায় বিরক্তি স্পষ্ট।

"কী ব্যাপার, মালেক? গত কুড়ি মিনিট ধরে বাইরে টিকটিক করে ঘুরছ কেন? অফিসের করিডোর কি তোমার পায়চারি করার জায়গা? নাকি তোমার ডিউটির সময় শেষ হয়ে গেছে বলে মনে করছ?" আলতাফ সাহেবের গলায় বরফের মতো ঠান্ডা কর্কশতা।

মালেক ভয়ে কেঁপে উঠল। সে দ্রুত দুই হাত জোড় করে ফেলল। "মাফ করবেন স্যার! আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে মাফ করে দেবেন। আপনার কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর কোনো উদ্দেশ্য আমার ছিল না স্যার। আমি শুধু... মানে..."

"কথা পেঁচিয়ে লাভ নেই। সোজাসুজি বলো কী চাও। তোমার কাজের সময় আমি ফালতু কথা শোনার মানুষ নই," আলতাফ সাহেব হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিলেন।

মালেক আরও বেশি ঘাবড়ে গেল। সে তার শুকনো ঠোঁট দুটো চাটল। তারপর অত্যন্ত কাঁপাকাঁপা গলায় যা বলল, তা শোনার জন্য আলতাফ সাহেব প্রস্তুত ছিলেন না।

"স্যার, একটা কথা বলার ছিল... আসলে স্যার, আপনি তো জানেন, আমি আজ থেকে তিন মাস আগে এখানে ঢুকেছি। আপনার দয়ায় আমার চাকরিটা হয়েছে। তারপর তো স্যার... এক মাস হলো আমি... আমি বিয়ে করেছি।" শেষ কথাটা বলতে গিয়ে মালেকের মুখটা লজ্জায় ও সংকোচে লাল হয়ে উঠল। সে মাথা নিচু করে রইল।

আলতাফ সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। বিয়ে করেছে? চল্লিশ বছর বয়সে বিয়ে করাটা হয়তো মালেকের কাছে বড় কোনো ঘটনা, কিন্তু একজন কর্পোরেট চেম্বারের প্রধান নির্বাহীর কাছে এটা চরম এক তুচ্ছ ও অর্থহীন ব্যক্তিগত প্রলাপ। তার মুখের বিরক্তি আরও গাঢ় হলো।

"বিয়ে করেছ তো তোমার বউকে নিয়ে সংসার করছ, আমাকে জানাতে এসেছ কেন? এটা কি কোনো ম্যারেজ রেজিস্ট্রি অফিস নাকি যে তোমার কাবিননামা আমাকে দেখতে হবে?" আলতাফ সাহেবের গলায় তীক্ষ্ণ ভৎসনা।

মালেক তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে প্রতিবাদ করল। "না স্যার! না না, তা বলছি না স্যার। আসলে... আমার স্ত্রী... সে গ্রামের সাধারণ মেয়ে। কিন্তু সে আসার পর থেকে যখনই সে শুনেছে যে আপনি মায়া করে আমাকে এই চাকরিটা দিয়েছেন, সে তখন থেকেই আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করে স্যার। সারাক্ষণ সে আপনার কথা বলে। বলে যে, ওই লোকটার জন্যই আজ আমাদের দু'বেলা দু'মুঠো ভাত জুটছে, আমরা শান্তিতে ঘুমাতে পারছি।"

আলতাফ সাহেব নির্বিকার মুখে তাকিয়ে রইলেন। এসব চাটুকারিতা বা কৃতজ্ঞতার বুলি তার বহু শোনা। তিনি মুখ ফুটে বললেন, "বেশ তো, ভালো কথা। এখন কাজ করো গিয়ে।"

কিন্তু মালেক নড়ল না। সে আরও বেশি কুঁকড়ে গিয়ে বলল, "স্যার, আমার স্ত্রী চাচ্ছে... মানে সে  আপনারে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতে চায় স্যার। এটাই তার অনেক দিনের একটা বড় ইচ্ছা।"
...

কথাটা শোনার পর আলতাফ সাহেবের চোখ দুটো বিস্ময়ে সামান্য কুঁকড়ে গেল। তিনি জীবনে বহু ধরনের প্রস্তাব পেয়েছেন—কোম্পানির শেয়ার হোল্ডারদের কোটি টাকার বিনিয়োগের প্রস্তাব, বিদেশি বড় বড় কোম্পানির পার্টনারশিপের অফার, কিন্তু এমন অদ্ভুত ও হাস্যকর প্রস্তাব তিনি গত ত্রিশ বছরেও পাননি।

তার একটা সিকিউরিটি গার্ডের নববিবাহিতা স্ত্রী তার জন্য রান্না করে আনবে! এ কোন দুনিয়ার কথা বলছে এই লোকটা?

"মালেক! তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?" আলতাফ সাহেবের গলা এবার বেশ উঁচুতে উঠল। তিনি সোজা হয়ে বসলেন। "তুমি কি ভুলে গেছ এটা কোন জায়গা? এটা কোনো চ্যারিটি হোম নয়, বা তোমার কোনো গ্রাম্য আত্মীয়ের বাড়ি নয় যে যা ইচ্ছা তাই নিয়ে চলে আসবে। আমি কার বাড়িতে কী খাই না খাই, তার কোনো ঠিকঠিকানা আছে? আমি বাইরের মানুষের হাতে রান্না খাই না। আর এগুলো কোন পাগলামি শুরু করেছ?"

মালেক ভয়ে এবার একেবারে মেঝেতে বসে পড়ার উপক্রম হলো। সে দুই হাত জোড় করে মিনতি করতে লাগল, "স্যার, রাগ করবেন না স্যার! আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি জানি আপনার মতো বড় মানুষ আমাদের মতো গরিবের ঘরের খাবার খাবেন না। কিন্তু স্যার, মেয়েটার খুব শখ। সে সারাদিন রান্না নিয়ে পড়ে থাকে। সে বলছিল, একটা বড় স্যারের জন্য রান্না করতে পারব—এই ভাগ্য কি আমার হবে? সে যদি নিজ হাতে একটু রান্না করে আপনাকে খাওয়াতে পারে, সে মনে খুব শান্তি পাবে স্যার। একটুখানি শুধু... দয়া করুন স্যার।"

আলতাফ সাহেবের ভেতরের কাঠিন্যটা আবার শক্ত হয়ে উঠল। তিনি এই সমস্ত আবেগীয় আবর্জনা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পছন্দ করেন। মানুষের সাথে মেলামেশা, তাদের তুচ্ছ সুখ-দুঃখের অংশীদার হওয়া—এসব তার অভিধানে নেই।

তিনি হাত নেড়ে স্পষ্ট ভাষায় বলতে যাচ্ছিলেন, "অসম্ভব! এসবের কোনো দরকার নেই। যাও কাজে যাও।"

কিন্তু ঠিক তখনই মালেক এক অদ্ভুত সত্য প্রকাশ করে ফেলল, যা আলতাফ সাহেবকে এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিল।

"স্যার, আপনি রাগ করবেন না। আমি আসলে তারিখ ঠিক করতে পারিনি বলেই আজ আপনাকে বলতে এসেছি। ও বলছিল, স্যার যদি তারিখটা বলে দেন, তবে আমি বাজার থেকে ভালো জিনিসপত্র কিনে আনব। ও নিজের হাতে মাছ, মাংস ভালো করে ধুয়ে, মসলা বেটে রান্না করবে। যদি দুই দিন পরে বলেন, তবে আমি সেভাবেই সব জোগাড় করে রাখব।"

"দুই দিন পরের কথা বলছ?" আলতাফ সাহেব একটু থমকালেন। তার কড়া মুখের ওপর এক মুহূর্তের জন্য এক ভাবনাহীন ছায়া নেমে এল। তার জীবনটা এতই যান্ত্রিক যে, আগামী দুই দিন পর কী হবে বা তিনি কী করবেন, তার কোনো ব্যক্তিগত রুটিন নেই। সবই মিটিং, প্রেজেন্টেশন আর ফিনান্সিয়াল অডিটের ছকে বাঁধা।

তার ভেতরে অদ্ভুত এক ক্লান্তি কাজ করছিল। গত কয়েকদিন ধরে পেপটিক আলসারের কারণে অফিসের ক্যান্টিনের বা বাইরের রেস্টুরেন্টের তেল-মশলাযুক্ত খাবার তার সহ্য হচ্ছিল না। ডাক্তার তাকে বারবার নরম, সেদ্ধ ও ঘরোয়া খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু তার তো রান্না করার কেউ নেই। সারাদিন ফ্ল্যাটে ফিরে হয় ঠান্ডা খাবার, নয়তো হোটেলের পার্সেল খেতে হয়।

মালেকের সরল মুখের দিকে তাকিয়ে তার হঠাৎ মনে হলো—একটা গরিব মানুষ, নতুন সংসার পেতেছে, তার বউয়ের আনন্দের একটা ছোট শখ হয়েছে। এতে তার কী এমন ক্ষতি হবে? তাছাড়া, সাধারণ ঘরোয়া রান্নার গন্ধ কেমন হয়, তা তো তিনি ভুলেই গেছেন প্রায়।

আলতাফ সাহেব ঠান্ডা গলায় বললেন, "শোনো মালেক। আমি এসব শখ-টখের ধার ধারি না। আজ বলছি বলেই বলছি—খাবারের বা এসব রান্নার কোনো প্রয়োজন নেই।"

মালেকের মুখটা একদম শুকিয়ে গেল। তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। সে যেন আকাশ থেকে পড়ল।

কিন্তু আলতাফ সাহেবের পরের বাক্যটি মালেকের ম্রিয়মাণ মুখে হঠাৎ আলোর ঝলকানি এনে দিল।

"তবে... যদি এতই জেদ ধরে থাকে তোমার ওই বউ, তাহলে পরশু দিন... মানে আগামী বুধবার কি আর কী... আচ্ছা, পরশু দিন দুপুরের লাঞ্চের সময় যাব। এর বেশি যেন কোনো কথা না হয়। যাও, এখন বাইরে যাও।"


মালেক যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে আলতাফ সাহেব শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছেন! তার বুকটা গর্বে ও আনন্দে ফুলে উঠল। তার চোখে জল এসে গেল, তবে সেটা কষ্টের নয়, চরম কৃতজ্ঞতার। সে বারবার মাথা নিচু করে সালাম ঠুকতে লাগল।

"বহু ধন্যবাদ স্যার! আল্লাহ আপনার ভালো করুন! আপনি অনেক বড় মনের মানুষ স্যার! আমি ও ইতি পরশু ঠিক দুপুরের সময় খাবার নিয়ে রেডি থাকব স্যার। আসসালামু আলাইকুম।"

মালেক আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে অত্যন্ত সন্তর্পণে, বুকভরা একরাশ আনন্দ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল এবং আলতো হাতে দরজাটা বন্ধ করে দিল।

রুমটা আবার আগের মতো নিখুঁত নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল।

এসি-র ঠান্ডা বাতাসটা মৃদু আওয়াজে বইছে। আলতাফ সাহেব আর আগের মতো ডকুমেন্টে মনোযোগ দিতে পারলেন না। তিনি কলমটা টেবিলে রেখে চেয়ারে পেছনে মাথা এলিয়ে দিলেন। চোখ দুটো বন্ধ করলেন কিছুক্ষণের জন্য।

তার মনের গহীনে কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি নাড়া দিয়ে গেল। একটা সিকিউরিটি গার্ড, যার পেটে হয়তো সবসময় ঠিকমতো ভাত জোটে না, তার নববিবাহিতা স্ত্রী তার মতো একজন কর্পোরেট টাইকুনের জন্য নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াতে  চাইছে! কেন? কী পাওয়ার আশায়? কোনো স্বার্থ নেই তো এর পেছনে?

কর্পোরেট দুনিয়ায় এত বছর কাটিয়ে তিনি একটা জিনিস খুব ভালো করে শিখেছেন—বিনামূল্যে কেউ কাউকে এক কাপ চাও খাওয়ায় না। সবার পেছনেই কোনো না কোনো স্বার্থ থাকে। মালেক কি তবে তার বেতনের প্রমোশন চায়? কিংবা তার মেয়ের বা বোনের কোনো চাকরির ব্যবস্থা করতে চাইছে?

কিন্তু লোকটার চোখ দুটো যখন তিনি দেখেছেন, তখন সেখানে কোনো চতুরতার ছাপ পাননি। সেখানে ছিল শুধুই এক ধরনের সহজ সরল আবেগ, কৃতজ্ঞতার বিশুদ্ধ প্রকাশ।

আলতাফ সাহেব চোখ খুললেন। তার সামনে বড় কাঁচের জানলার বাইরে তখন রাতের ঢাকা শহরটা অসংখ্য আলোয় ঝলমল করছে। নিচের রাস্তায় ছোট ছোট পিঁপড়ের মতো গাড়িগুলো ছুটছে।

তিনি একা। একদম একা। এই বিশাল সাম্রাজ্যের মালিক তিনি ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে যখন তিনি ফ্ল্যাটে ফেরেন, তখন চার দেওয়াল তাকে গিলে খাওয়ার জন্য এগিয়ে আসে। কোনো দিন কেউ তার জন্য দরজা খুলে দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে না। কেউ জিজ্ঞেস করে না—"সারাদিন কেমন কাটল?"

তিনি মনে মনে ভাবলেন, আচ্ছা... ওই সিকিউরিটি গার্ডটার বউ... সে দেখতে কেমন হবে? নিশ্চয়ই গ্রামের সহজ-সরল কোনো তরুণী। তার হাতের রান্না কেমন হবে কে জানে? হয়তো একটু ঝাল বেশি দেবে, কিংবা নুন কম হবে। তবুও, সে তো নিজ হাতে ভালোবাসার ছোঁয়া দিয়ে রান্না করবে।

তার মনের একটা কোণ মৃদু শিউরে উঠল। অদ্ভুত এক ভাবনা তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"পুত্রবধূ..." শব্দটা তার মনের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হলো।

হাঁ, তার তো কোনো সন্তান নেই। বিয়েই করেননি তিনি। কিন্তু যদি তার কোনো ছেলে থাকত, যদি তার একটা ভরা সংসার থাকত, তবে হয়তো এই বয়সে এসে তার ঘরেও এমন একজন নববিবাহিতা পুত্রবধূ থাকত। যে হয়তো প্রতিদিন সকালে চা বানিয়ে দিত, দুপুরের খাবার টিফিন বক্সে গুছিয়ে দিত, বাবার মতো যত্ন করে খেয়াল রাখত।

আলতাফ সাহেব নিজের এই অবাস্তব চিন্তায় নিজেই মৃদু হাসলেন। কী সব আবলুস-তাবলুস ভাবছেন তিনি! এই বয়সে এসে এসব  আবেগপ্রবণ চিন্তা তার মতো মানুষের সাথে মানায় না। তিনি আলতাফ সিরাজ চৌধুরী—যিনি পাথর দিয়ে নিজের ভাগ্য গড়েছেন, যার জীবনে অনুকম্পার কোনো স্থান নেই।

তবুও... পরশু দিনের কথাটি ভাবতেই তার মনের কোথাও যেন একটুখানি কৌতূহলের বরফ গলতে শুরু করল।

তিনি টেবিলে রাখা ফাইলটার পাতা উল্টালেন। কিন্তু মনের ভেতরে মালেকের সেই কথাগুলো আর তার নববিবাহিতা স্ত্রীর রান্নার কল্পনার চিত্রটা বারবার ভেসে উঠতে লাগল। একটা অদৃশ্য সুতো যেন তাকে এই তুচ্ছ অথচ উষ্ণ ঘটনার সাথে বেঁধে ফেলল। বাইরে ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে এগোতে লাগল, আর আলতাফ সাহেব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সামনের দেয়ালঘড়িটার দিকে, যেখানে সময় যেন একটু ধীরেই চলল। (চলবে)
[+] 4 users Like Romzan83's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#2
দ্বিতীয় পর্ব:

পরের দিন সকাল থেকেই অফিসের বাতাসটা কেমন যেন থমথমে ছিল। আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর কেবিনের চারপাশের গ্লাস ওয়ালের বাইরে কর্মচারীরা আসা-যওয়া করছে অত্যন্ত সন্তর্পণে, যেন পিনপতন নিস্তব্ধতা বজায় থাকে। কিন্তু খোদ আলতাফ সাহেবের নিজের মনের ভেতর কী যে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছিল, তা তিনি নিজেই বুঝতে পারছিলেন না। গত ত্রিশ বছরের কর্পোরেট জীবনে এমন কোনো দিন আসেনি যেদিন তিনি কাজের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে এত দীর্ঘ সময় ভেবেছেন।

দুপুর তখন প্রায় বারোটা বাজে। ইন্টারকমের লাল বাতিটা জ্বলতেই আলতাফ সাহেব রিসিভার তুলে নিলেন। ওপাশ থেকে এইচআর ম্যানেজারের গলা ভেসে এল, "স্যার, দুপুরের মিটিংয়ের ফাইলগুলো কি...?"

"আজকের সমস্ত মিটিং ক্যানসেল করে দাও," আলতাফ সাহেবের ঠান্ডা ও দৃঢ় কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

ম্যানেজার সামান্য থমকে গিয়ে বললেন, "ক্যানসেল, স্যার? কিন্তু ওই বিদেশি ডেলিগেটসদের সাথে..."

"আমি যা বলেছি তাই করো। আর কোনো কথা শুনতে চাই না," রিসিভারটা রেখে দিলেন তিনি।

আলতাফ সাহেব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তার পরনে  আয়রন করা গাঢ় নীল রঙের স্যুট। তিনি তার এক্সিকিউটিভ টেবিলের ওপর থেকে গাড়ির চাবিটা তুলে নিলেন। সবসময় তার নিজস্ব ড্রাইভার থাকে, যে তাকে অফিসে আনা-নেওয়া করে। কিন্তু আজ তিনি কাউকে কিছু না বলেই নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার মনের গভীরে কে যেন ফিসফিস করে বলছিল—আজকের যাত্রাটা কোনো ব্যবসায়িক মিটিংয়ের নয়, এটি এক অদ্ভুত ব্যক্তিগত কৌতূহল ও অবচেতনের টানে গড়া এক রহস্যময় পথচলা।

অফিসের বেসমেন্টে নেমে নিজের প্রিমিয়াম সেডান গাড়িটার ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন তিনি। ইঞ্জিন স্টার্ট নেওয়ার সাথে সাথে এসি-র ঠান্ডা হাওয়া তাকে ঘিরে ধরল। তিনি স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর গাড়িটা গ্যারেজ থেকে বের করে রাস্তার দিকে ছুটিয়ে দিলেন।

মালেকের দেওয়া ঠিকানাটা তার পকেটের নোটপ্যাডে লেখা ছিল। পুরান ঢাকার এক সংলগ্ন গলি, যেখানে রিকশার টুংটাং শব্দ আর মানুষের কোলাহল সবসময় লেগেই থাকে। গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে আলতাফ সাহেব ভাবছিলেন, তার মতো একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পপতি, যিনি প্রতিদিন কোটি টাকার ডিল সই করেন, তিনি কেন আজ স্বেচ্ছায় এমন একটা নিম্নবিত্ত এলাকায় সিকিউরিটি গার্ডের বাসায় লাঞ্চ করতে যাচ্ছেন? এর উত্তর তার নিজের কাছেও পরিষ্কার ছিল না।
....
ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ বুধবার দুপুরের খাবারের কথা চূড়ান্ত করার সময় আলতাফ সাহেব মালেককে ডেকে পাঠিয়েছিলেন তার কেবিনে।

মালেক তখন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে রুমে ঢুকেছিল। সে ভেবেছিল, হয়তো চেয়ারম্যান সাহেব রেগে গিয়ে তার আগের কথা ফিরিয়ে নেবেন বা বকাঝকা করবেন। কিন্তু আলতাফ সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর গলায় যে কথাটি বলেছিলেন, তাতে মালেক অবাক হয়েছিল বৈকি, তবে তার চেয়েও বেশি বিভ্রান্ত হয়েছিল।

আলতাফ সাহেব ফাইলপত্র থেকে চোখ তুলে মালেকের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, "মালেক, তোমার স্ত্রীর রান্নার কথা তো বল্লে। কিন্তু একটা শর্ত আছে।"

মালেক হাত জোড় করে আমতা আমতা করে বলেছিল, "শর্ত, স্যার? কী শর্ত? আপনার যেকোনো হুকুম মাথা পেতে নেব স্যার।"

"শোনো," আলতাফ সাহেব তার চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে একটু ঝুঁকে বসেছিলেন। "আমি যখন তোমাদের বাসায় খেতে যাব, তখন তোমার স্ত্রী যেন কোনো ধরনের পর্দা, * বা * পরে আমার সামনে না আসে। আমি এসব ভনিতা বা মুখ ঢাকাঢাকি পছন্দ করি না। আমি দেখতে চাই যাকে সে রান্না করাচ্ছে, তার মুখের অভিব্যক্তি কেমন। পরিষ্কার কথা, সে উন্মুক্ত মুখে আমার সামনে আসবে। পারবে তো এটা নিশ্চিত করতে?"

কথাটা শুনে মালেক একটু থমকে গিয়েছিল। তাদের পরিবার বা সামাজিক মফস্বলে ঘরের বউরা সাধারণত একটু রাখঢাক করে চলে। কিন্তু আলতাফ সাহেবের মতো এমন একজন প্রতাপশালী ও প্রভাবশালী মানুষের মুখের ওপর 'না' বলার সাহস বা ধৃষ্টতা মালেকের ছিল না। তাছাড়া, চেয়ারম্যান সাহেব তার ত্রাতা, তার অন্নদাতা। তিনি যা বলবেন, সেটাই তার কাছে আইন।

মালেক দ্রুত মাথা নিচু করে সায় দিয়ে বলেছিল, "জি আচ্ছা স্যার! আপনার কোনো অসুবিধা হবে না স্যার। ও কোনো পর্দা করবে না আপনার সামনে। আপনি যে সময় বলবেন, আমি সব ঠিক করে রাখব।"

"বেশ। আমি নিজেই আসছি পরশু দিন দুপুরে। ঠিকানাটা আমাকে দিয়ে যাও," আলতাফ সাহেব অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন।
.....


বুধবার দুপুর। ঘড়িতে তখন ঠিক একটা বেজে দশ মিনিট। মালেকের বাসার সামনে এসে আলতাফ সাহেব তার গাড়িটা পার্ক করলেন। চারপাশের ঘিঞ্জি পরিবেশ, গলির সরু রাস্তা আর রিকশার জট—সব মিলিয়ে এই জায়গার সাথে আলতাফ সাহেবের অভিজাত গুলশানের ফ্ল্যাট বা আলিশান অফিসের আকাশ-পাতাল তফাত।

তিনি গাড়ি থেকে নামলেন। গায়ে আজও সেই পরিপাটি স্যুট, যদিও এই পরিবেশের সাথে তা বেমানান। তার হাতে একটা সুন্দর গিফট র‍্যাপ করা মাঝারি আকারের উপহারের ব্যাগ। তিনি গলির ভেতরে একটু হেঁটে নির্দিষ্ট বিল্ডিংটার সামনে এসে পৌঁছালেন। তিন তলার ছোট ফ্ল্যাট। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতেই দেখলেন দরজাটা সামান্য খোসা মেলা, আর বাইরে দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে মালেক।

মালেক চেয়ারম্যান সাহেবকে নিজের চোখের সামনে ওই গলি দিয়ে উঠতে দেখে যেন আকাশ থেকে পড়ল! সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে একটা কোম্পানির চেয়ারম্যান নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে তার মতো একজন সাধারণ গার্ডের নুন-ভাত খাওয়ার ছোট্ট বাসায় চলে এসেছেন!

"স্যার! আপনি... আপনি নিজে ড্রাইভ করে চলে এসেছেন? আমাকে তো বললেই আমি গাড়ি রিসিভ করতাম বা আপনাকে নিয়ে আসতাম!" মালেক প্রায় দৌড়ে এসে দুই হাত জোড় করে ফেলল, তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না।

আলতাফ সাহেব অত্যন্ত গম্ভীর ও শান্ত গলায় বললেন, "দরকার নেই। তোমার ঠিকানাটা আমার জিপিএসে ছিল, চলে এসেছি। দরজা খোলো।"

মালেক তাড়াতাড়ি দরজাটা পুরোপুরি মেলে ধরে বলল, "আসুন স্যার, ভেতরে আসুন। আমাদের এই গরিবখানায় আপনাকে স্বাগতম।"

আলতাফ সাহেব জুতো খুলে ঘরের ভেতরে পা রাখলেন। এটি একটি ছোট্ট দুই রুমের ফ্ল্যাট। ড্রয়িং কাম ডাইনিং স্পেসটা বেশ ছোট, একটা পুরোনো প্লাস্টিকের টেবিল আর দুটো চেয়ার পাতা। এক কোণে একটা ছোট খাট আর সামান্য কিছু আসবাবপত্র। ঘরের ভেতর থেকে রান্নার দারুণ একটা সুবাস ভেসে আসছিল—দেশি মুরগির মাংস আর গরম মশলার সুবাস। পুরো বাড়িটা ছিমছাম পরিষ্কার, যদিও জায়গার অভাব স্পষ্ট।

মালেক অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে একটা চেয়ার টেনে দিয়ে বলল, "স্যার, দয়া করে এখানে বসুন। আমি একটু হাত-মুখ ধোয়ার পানি নিয়ে আসছি। আর... ইতি! ওগো শুনেছ? স্যার চলে এসেছেন!"
...


মালেকের ডাক শুনে ভেতরের রুমের পর্দাটা একটু সরে গেল। তারপর পর্দা সরিয়ে যে নারীটি বাইরে বেরিয়ে এল, তাকে দেখে আলতাফ সাহেবের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।

তিনি টেবিলে রাখা গিফট ব্যাগটা হাত থেকে নামাতে ভুলে গেলেন। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল সামনের মানুষটির ওপর।

ইতি—মালেকের নববিবাহিতা স্ত্রী। তার বয়স কুড়ির কোঠায় হবে। তার গায়ের রঙ দুধের মতো ফর্সা, মুখাবয়ব অত্যন্ত কোমল ও নিখুঁত। চুলগুলো অত্যন্ত যত্নে পেছনের দিকে টেনে শক্ত করে খোপা করা, যার কারণে কপালটা আরও উজ্জ্বল ও প্রশস্ত দেখাচ্ছে। তার চোখের মণি দুটো বড় বড়, গভীর ও মায়াবী। ঠোঁটের কোণে এক মিষ্টি ও সহজ হাসি লেগে আছে, যা ঘরের অন্ধকার কোণটাকেও আলোকিত করে তুলেছে।

তার পরনে ছিল একটা ঘিয়ে বা হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি, যার আঁচলটা অত্যন্ত পরিপাটি করে কাঁধের ওপর গোঁজা। আর তার ব্লাউজটা ছিল বেশ আধুনিক ও খোলামেলা কাটের—পাতলা ফিতার স্লিভলেস স্টাইলের হোয়াইট ইনার বা ব্লাউজের ওপর শাড়ির আঁচলটা এমনভাবে ঝুলে ছিল, যা তার শরীরের লাবণ্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলছিল। আলতাফ সাহেব জীবনে বহু রূপসী মডেল বা উচ্চবিত্ত নারী দেখেছেন, কিন্তু এমন নিখুঁত, মেকআপহীন অথচ তীব্র আকর্ষণীয় গ্রামীণ সৌন্দর্য তিনি এর আগে কখনো দেখেননি।

ইতি আলতাফ সাহেবের সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে সামান্য ভয় ও প্রচুর শ্রদ্ধা মিশ্রিত এক অদ্ভুত আলো। সে বিন্দুমাত্র পর্দা না করে সরাসরি আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে তাকাল।

মালেক একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "স্যার, এ হলো ইতি... আমার বউ। ইতি, ইনিই হলেন সিরাজ সাহেব, আমাদের কোম্পানির চেয়ারম্যান স্যার, যার দয়ায়..."

ইতি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা আলতাফ সাহেবের পায়ের কাছে মেঝেতে ঝুঁকে পড়ল। সে আলতাফ সাহেবের জুতোর সামনে হাত রেখে তাকে ভক্তিভরে পা ছুঁয়ে সালাম করার চেষ্টা করল।

আলতাফ সাহেব যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলেন। তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হলো। তিনি এক মুহূর্তে নিজের চেয়ার ছেড়ে দ্রুত হাত বাড়িয়ে ইতির কাঁধ দুটো শক্ত করে ধরে ফেললেন।

"এ কী করছ! ওঠো... ওঠো বলছি!" আলতাফ সাহেবের গলার স্বরটা সামান্য কেঁপে উঠল।

তিনি যখন ইতির দুটো নরম কাঁধ ধরে তাকে ওপরের দিকে তুললেন, তখন তাদের দুজনের শারীরিক দূরত্ব অত্যন্ত কমে এল। ইতি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে লজ্জায় একদম লাল হয়ে গেল। তার বুক তখনো মৃদু হাপাতে শুরু করেছে। আলতাফ সাহেব তার কাঁধ থেকে হাত সরালেন না—তিনি আধা সেকেন্ড বা এক সেকেন্ডের বেশি সময় ধরে একেবারে একদৃষ্টিতে ইতির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই চোখের ভেতর কোনো কর্পোরেট কঠোরতা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত বিমোহিত মোহগ্রস্ত দৃষ্টি।

ইতি লজ্জা পেয়ে তার মাথা নিচু করে ফেলল। সে আলতাফ সাহেবের ওই গভীর ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে একটু আষ্টেপৃষ্ঠে শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে ফিসফিস করে বলল, "স্যার... আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? প্লিজ... বসুন না।"

......

আলতাফ সাহেব যান্ত্রিকভাবে একটা চেয়ারে এসে বসলেন। কিন্তু তার মনের ভেতর তখন প্রবল ঝড় বইছে। তার কানের ভেতরে হাতুড়ি পেটানোর মতো শব্দ হচ্ছিল।

সামনে বসা ইতি তখন ব্যস্ত হয়ে পড়ল মেহমানকে আপ্যায়ন করার জন্য। সে বলল, "স্যার, আপনি একটু বসুন। আমি হাত ধোয়ার পানি আর আপনাদের জন্য জুস নিয়ে আসছি। রান্না প্রায় হয়ে গেছে।"

বলে সে দ্রুত আবার ভেতরের রুমে চলে গেল। কিন্তু সে চলে যাওয়ার পরও তার সুতির শাড়ির সুবাস আর তার সেই মায়াবী মুখের অবয়ব আলতাফ সাহেবের চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল।

চেয়ারে বসে থাকা আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মাথাটা কেমন যেন ঘুরছিল। তিনি নিজের দুহাতে নিজের কপালটা চেপে ধরলেন। তার জীবনের গত ত্রিশ বছরের সমস্ত হিসাব-নিকাশ, সমস্ত নিয়ম ও শৃঙ্খলা এই মুহূর্তে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

তার মনের অতল গভীরে এক অদ্ভুত, নিষিদ্ধ এবং অত্যন্ত তীব্র একটা ভাবনা জন্ম নিল—যা শোনার বা ভাবার কোনো অধিকার তার নেই।

তার মস্তিষ্কের কোণ থেকে কে যেন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলে উঠল:
এই মেয়েটি... এই ইতি কি আদৌ কোনো সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রী হওয়ার যোগ্য? এই রূপ, এই কোমলতা, এই মায়াবী দৃষ্টি—এ কি কোনো গরিবের কুটিরে মানায়? এ তো কোনো রাজপ্রাসাদের রানি হওয়ার কথা ছিল!

তার মনের অবচেতন মন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। তিনি নিজের অজান্তেই ভাবতে শুরু করলেন—মালেক তো নিতান্তই একজন সাধারণ গার্ড, অভাবের তাড়নায় দিন কাটানো মানুষ। সে কীভাবে এই তরুণী ও রূপসী মেয়ের স্বামী হতে পারে? এটা তো একটা মারাত্মক অসঙ্গতি!

আর তখনই আলতাফ সাহেবের বুকের ভেতর একটা তীব্র বিদ্যুতের চমক খেলে গেল। তার সমস্ত রোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল। তার মনের গভীরে এক অবাস্তব, ঘোরলাগা অনুভূতি তাকে গ্রাস করে ফেলল—

ইতির কি ওই গার্ডটার স্ত্রী হিসেবে থাকা উচিত? নাকি... নাকি ওর প্রকৃত জায়গা হওয়া উচিত আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর বিশাল শূন্য ফ্ল্যাটে, যেখানে সে কেবল কোনো পুত্রবধূ নয়... বরং এই বয়সে এসেও এক নিঃসঙ্গ পুরুষের একমাত্র জীবনসঙ্গী, তাঁর নিজের স্ত্রী হিসেবে থাকবে?

চিন্তাটা মাথায় আসতেই আলতাফ সাহেব শিউরে উঠলেন। তিনি নিজেই নিজের এই ধারণায় আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। তিনি কে? তিনি আলতাফ সিরাজ চৌধুরী! দেশের অন্যতম শীর্ষ কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব! তাঁর বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই, আর এই মেয়েটি কুড়ির কোঠার তরুণী! তিনি একটা সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রীর দিকে এমন কুৎসিত, অবাস্তব এবং লোভী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন? এ কোন পাপে তিনি জড়িয়ে পড়ছেন?

ঠিক সেই মুহূর্তে ইতি ট্রে হাতে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার মুখে সেই সরল হাসি, হাতে গ্লাসের ট্রে। সে এসে অত্যন্ত বিনীতভাবে আলতাফ সাহেবের সামনে গ্লাসটা এগিয়ে দিল।

"স্যার, ঠাণ্ডা পানিটা খান। গরমের মধ্যে কষ্ট করে আসার জন্য অনেক ধন্যবাদ।"

ইতি যখন গ্লাসটা এগিয়ে দিচ্ছে, তখন তার খোলামেলা ব্লাউজের মধ্য দিয়ে তার সুগঠিত গলার হাড় আর কাঁধের নিখুঁত চামড়া আলতাফ সাহেবের চোখের সামনে আরও স্পষ্টভাবে ভেসে উঠল। আলতাফ সাহেব আবেশের মতো তাকিয়ে রইলেন। তাঁর হাত দুটো সামান্য কাঁপল। তিনি গ্লাসটা নেওয়ার সময় ইতির আঙুলের সাথে নিজের আঙুলের ছোঁয়া লাগতেই তাঁর ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

বাইরে তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার উপক্রম, কিন্তু আলতাফ সাহেবের ভেতরের দুনিয়াটায় এক প্রলয় শুরু হয়ে গেছে—যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ খোলা নেই। (চলবে)
[+] 6 users Like Romzan83's post
Like Reply
#3
[Image: IMG-20260809-092106-779.png]
[+] 3 users Like Romzan83's post
Like Reply
#4
Just great great update.. Suruta bhalo hoeche.. Next update er opekhai
[+] 1 user Likes Slayer@@'s post
Like Reply
#5
তৃতীয় পর্ব

ছোট্ট ফ্ল্যাটটার ছোট্ট ড্রয়িংরুম কাম ডাইনিং স্পেসটা যেন হঠাৎ করেই এক অন্যমাত্রার আভিজাত্য আর ঘ্রাণে ভরে উঠেছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে দেশি মুরগির মাংসের ঝোল, জিরে-আদার সুবাস আর গরম ভাতের মিষ্টি ধোঁয়া। বাইরে তখন দুপুর গড়িয়ে মাথার ওপর চড়তে শুরু করেছে রোদ। গলির কোলাহল, রিকশার টুংটাং শব্দ—কোনো কিছুতেই যেন আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মনোযোগ নেই। তাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয়, তাঁর সমস্ত চেতনা এই মুহূর্তে কেবল বন্দি হয়ে আছে একটিমাত্র ঘরে, এই ছোট্ট ফ্ল্যাটের চার দেওয়ালের ভেতরে।

আলতাফ সাহেব সোফায় বসে সামান্য নড়েচড়ে বসলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা এখনো ধুকপুক করছে। একটু আগে ইতির ওই চোখের চাহনি আর তাঁর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্যটা বারবার তাঁর মানসপটে রিলিজ হচ্ছে। একজন ষাটোর্ধ পুরুষ, যাঁর জীবন কেবল ফাইল, হিসেব-নিকেশ আর কংক্রিটের দালানে কেটে গেছে, তিনি হঠাৎ এমন এক ঘোরের মধ্যে পড়ে যাবেন—তা তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি।

ঠিক তখনই ভেতরের রুমের পর্দাটা একটু নড়ে উঠল। ইতি অত্যন্ত বিনম্র ভঙ্গিতে, পায়ে পায়ে ড্রয়িংরুমে এগিয়ে এল। তার পর সেই হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি আর খোলামেলা ব্লাউজের সাজ। শাড়ির কুঁচিগুলো পরিপাটি করে গোঁজা, কাঁধের ওপর দিয়ে আলতো করে নেমে গেছে আঁচল। তার মুখে সেই লাজুক অথচ মিষ্টি হাসি।

ইতি হাতজোড় করে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় ডাকল, "স্যার... খাবার সব রেডি। ডাইনিং টেবিলে একটু আসবেন প্লিজ? খাবার তো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"

আলতাফ সাহেব চেয়ার ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখাবয়ব গম্ভীর রাখার একটা কৃত্রিম চেষ্টা আজও বজায় আছে, কিন্তু চোখের গভীরের সেই অস্থিরতা তিনি লুকাতে পারছেন না। তিনি শান্ত গলায় বললেন, "হ্যাঁ, চলো।"

ডাইনিং টেবিলটা খুব ছোট—একটা পুরোনো প্লাস্টিকের টেবিল, যার ওপর সুন্দর করে একটা ফুলতোলা চাদর বিছানো। টেবিলে স্টিলের থালায় সাদা গরম ভাত, ধোঁয়া ওঠা দেশি মুরগির মাংস, আলুভর্তা আর ডাল সাজানো। সবকিছুতেই যেন একটা ঘরোয়া নিখুঁত ছোঁয়া।

মালেক খুব উৎসুক ও আনন্দিত মুখে টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে বারবার বলছিল, "স্যার, আমাদের মতো গরিবের ঘরে আপনার আসার সৌভাগ্য হয়েছে—এটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। ইতি সকাল থেকে নিজের হাতে সব রান্না করেছে স্যার।"

আলতাফ সাহেব টেবিলের সামনে চেয়ারে গিয়ে বসলেন। তিনি বসার সাথে সাথেই ইতি আর মালেক দুজনে মিলে পরিবেশন শুরু করল।

-......

আলতাফ সাহেব চেয়ারে বসে চামচে করে ভাত আর মাংসের প্লেটটার দিকে তাকালেন। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি বেশিক্ষণ খাবারে আটকে রইল না। তাঁর চোখ চলে গেল টেবিলের পাশে দাঁড়ানো ইতির ওপর।

ইতি তখন একটু ঝুঁকে আলতাফ সাহেবের প্লেটে আরও একটু মাংসের ঝোল তুলে দিচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার শাড়ির আঁচলটা সামান্য সরে গেল। ইতির কোমর থেকে শুরু করে তার সুগঠিত, সাপের মতো নমনীয় ও বাঁকানো শরীরের ভাজগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠল। বিশেষ করে, তার শাড়ির ফ্রেমে বন্দি থাকা গভীর নাভিটি শাড়ির ফাঁক থেকে একটু যেন উঁকি দিল।

দৃশ্যটি দেখার সাথে সাথে আলতাফ সাহেবের বুকের ভেতরটা হাড়হিম হয়ে গেল। তাঁর হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে আবার তীব্র বেগে ড্রাম বাজাতে শুরু করল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি এতটাই বেড়ে গেল যে তিনি স্পষ্ট নিজের বুড়ো আঙুলের স্পন্দন কানের কাছে শুনতে পেলেন।

তিরিশ বছর ধরে তিনি বহু সুন্দরী ও অভিজাত নারীর সান্নিধ্য পেয়েছেন, কিন্তু গ্রামীণ মেকআপহীন এই তরুণীর শরীরের এই আদিম ও প্রাকৃতিক লাবণ্য তাঁকে এমন এক ঘোরের মধ্যে ফেলে দিল, যা তিনি জীবনে কখনো অনুভব করেননি। তাঁর গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস গিলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলেন।

ইতি চামচটা রেখে অত্যন্ত মায়াবী গলায় জিজ্ঞেস করল, "স্যার... তরকারিতে ঝাল-নুন ঠিক আছে তো? আপনি তো শহরের বড় বড় হোটেলের খাবার খান, আমাদের এই গরিবের হাতের রান্না আপনার মুখে রোচবে কি না কে জানে!"

আলতাফ সাহেব ঢোক গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন। তিনি ধীর ও ভারী গলায় বললেন, "না... মালেক... মানে ইতি, খুব সুন্দর গন্ধ বেরিয়েছে। রান্না চমৎকার হয়েছে।"

মালেক খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, "দেখছ ইতি? স্যার কত বড় মানুষ, উনি নিজে প্রশংসা করছেন! তুমি খাওয়াদাওয়া শুরু করো স্যার।"

---

আলতাফ সাহেব খাওয়া শুরু করলেন। সত্যি বলতে, খাবারগুলো এত সুস্বাদু ছিল যে তাঁর পেপটিক আলসারের পুরোনো ব্যথার কথা তিনি ভুলেই গেলেন। ঝাল-মশলার নিখুঁত ভারসাম্যে তৈরি দেশি মুরগির মাংসের স্বাদ তাঁর বহু বছর খাওয়া হয়নি। তিনি বেশ তৃপ্তি সহকারে খেলেন।

খাওয়া শেষে মালেক জলভরা একটা জগ আর গ্লাস এনে হাত ধোওয়ার ব্যবস্থা করে দিল। আলতাফ সাহেব হাত ধোওয়ার পর বেসিনের দিকে না গিয়ে টেবিলেই বসেছিলেন। তাঁর হাত আর মুখ সামান্য ভেজা ছিল।

ঠিক তখনই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল।

টেবিলে কোনো তোয়ালে বা টিস্যু পেপার ছিল না। ইতি তখন ঠিক তাঁর পাশেই দাঁড়িয়েছিল। আলতাফ সাহেব আবেশের ঘোরে এবং সম্পূর্ণ অবচেতন মনে ডান হাত বাড়িয়ে ইতির কাঁধের ওপর থেকে ওর ঝুলন্ত হলুদ শাড়ির নরম আঁচলটা টেনে নিলেন! এবং সেই আঁচল দিয়েই অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে নিজের ভেজা হাত ও মুখটা মুছে ফেললেন!

মুছে ফেলার পর মুহূর্তেই তাঁর হুঁশ হলো। তিনি বুঝতে পারলেন তিনি কী করে বসেছেন! এটা কোনো হোটেল নয়, কোনো করপোরেট অফিস নয়—এটা একটা গরিব সিকিউরিটি গার্ডের ঘর, আর যার শাড়িতে তিনি হাত-মুখ মুছেছেন, সে তাঁর এমপ্লয়ির নববিবাহিতা স্ত্রী!

আলতাফ সাহেবের চোখ দুটো কপালে উঠল। তিনি চমকে গিয়ে তৎক্ষণাৎ আঁচলটা ছেড়ে দিয়ে এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিলেন। তাঁর ফর্সা মুখটা লজ্জায় ও আতঙ্কে লাল হয়ে উঠল।

তিনি অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে বলে উঠলেন, "ওহ গড! আই অ্যাম সো সরি... ইতি! আমি আসলে... মানে খেয়াল করিনি! একদম অবচেতন মনে হয়ে গেছে... আমাকে মাফ করে দিও।"

ইতি তো এমন আচরণের জন্য বিন্দুমাত্র প্রস্তুত ছিল না। সে প্রথমে একটু থমকে গেল, তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সে ভাবতেই পারেনি দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্পপতি আলতাফ সিরাজ চৌধুরী তার শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ও হাত মুছবেন! কিন্তু পরমুহূর্তেই ইতির মুখে এক অদ্ভুত লাজুক ও খুশির হাসি ফুটে উঠল। তার গাল দুটো লাল হয়ে গেল। সে ফিক করে হেসে মাথা নিচু করে ফেলল।

সে অত্যন্ত বিনম্র গলায় বলল, "আরে স্যার! এতে সরি বলার কী আছে! আপনি আমার স্বামীর এত বড় উপকার করেছেন, আমাদের এই বাসায় এসে খেয়েছেন—এটাই আমাদের সৌভাগ্য। আমার শাড়ির আঁচলে আপনার হাত মোছা হয়েছে তো কী হয়েছে, এতে আমি বিন্দুমাত্র রাগ করিনি স্যার, বরং ধন্য হয়েছি।"

মালেকও পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে মাথা নাড়তে লাগল। সে হাতজোড় করে বলল, "ঠিক বলেছেন ইতি! স্যার, আপনার মতো মানুষ আমাদের ঘরে পা দিয়েছেন—এটাই আমাদের সাত পুরুষের ভাগ্য। আঁচলে হাত মুছেছেন তো কী হয়েছে, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সম্মানের!"

আলতাফ সাহেব স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। কিন্তু তাঁর মনের ভেতরে অপরাধবোধ আর লোভের এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি জট পাকিয়ে গেল।

---

খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পর আলতাফ সাহেব সোফায় এসে বসলেন। ঘরের গরমে তাঁর কপাল দিয়ে সামান্য ঘাম ঝরছে। তিনি চেইন স্মোকার—দিনের মধ্যে অন্তত দুই প্যাকেট দামি বিদেশি সিগারেট তাঁর লাঙে প্রবেশ করে।

তিনি পকেট থেকে তাঁর সিলভার রঙের গোল্ডফ্লেকের কেসটা বের করলেন। তারপর সেখান থেকে একটা অত্যন্ত দামি, ব্রান্ডের সিগার-টাইপের স্লিম সিগারেট বের করে মুখে গোঁজলেন। পকেট থেকে একটা সোনার গোল্ডেন ইম্পোর্টেড লাইটার বের করে আগুন জ্বেলে দিলেন।

সোফায় বসে তিনি আস্তে করে একটা বড় ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাদের দিকে ছেড়ে দিলেন। ঘরের সেই ছোট পরিসরে সিগারেটের সুবাস ছড়িয়ে পড়ল।

মালেক একটু এগিয়ে এসে বিনীতভাবে বলল, "স্যার, ধোঁয়া কি আপনার কষ্ট হচ্ছে? ঘরের দরজাটা কি একটু খুলে দেব?"

"না, ঠিক আছে," আলতাফ সাহেব ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বললেন। তাঁর চোখ দুটো তখনো ইতির ওপর আটকে আছে, যে একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিল।

আলতাফ সাহেব পকেট থেকে তাঁর লেদার ওয়ালেটটা বের করলেন। ওয়ালেট খুলে সেখান থেকে একদম মুড়মুড়ে, নতুন পাঁচটি এক হাজার টাকার নোট বের করলেন। মোট পাঁচ হাজার টাকা।

তিনি নোটগুলোর দিকে তাকিয়ে ইতির দিকে হাত বাড়িয়ে ডাকলেন, "ইতি... এদিকে এসো তো একটু।"

ইতি একটু ইতস্তত করে এগিয়ে এল। "জি স্যার?"

আলতাফ সাহেব সেই পাঁচ হাজার টাকার নোটের বান্ডিলটা ইতির সামনে বাড়িয়ে ধরে বললেন, "আজকের এই চমৎকার রান্নার জন্য আর আমার আসার স্মৃতির জন্য এটা আমার পক্ষ থেকে একটা ছোট বকশিস বা উপহার মনে করো। এটা রাখো।"

ইতি প্রথমে চমকে গেল। সে দুই হাত পেছনে সরিয়ে নিয়ে মাথা নেড়ে বলল, "না না স্যার! এ আপনি কী বলছেন! আমি তো নিজ খুশিতে রান্না করেছি। এর জন্য আপনার কাছ থেকে টাকা নেব কেন? এটা তো অন্যায় হবে স্যার!"

আলতাফ সাহেব একটু গম্ভীর গলায়, কিন্তু চোখের কোণে এক অদ্ভুত স্নেহের দৃষ্টি রেখে বললেন, "না না, মানা করবে না। এটা কোনো পারিশ্রমিক নয়, এটা আমার স্নেহের উপহার। নাও, হাতে নাও।"

মালেকও পাশ থেকে ইতির দিকে তাকিয়ে বলল, "আরে ইতি, স্যার যখন দিচ্ছেন, তখন আর না করিস না। নে, স্যারের হাত থেকে নে।"

ইতি বাধ্য মেয়ের মতো ধীরেসুস্থে এগিয়ে এসে আলতাফ সাহেবের বাড়িয়ে দেওয়া হাত থেকে টাকাটা গ্রহণ করল। যখন সে টাকাটা ধরল, তখন আলতাফ সাহেবের গরম আঙুলের ছোঁয়া তার নরম আঙুলে লাগতেই দুজনই যেন একটা মৃদু বিদ্যুৎস্পর্শ অনুভব করল। ইতি টাকাটা নিয়ে অত্যন্ত সংকোচের সাথে আঁচলের কোণে গুজে রাখল, কিন্তু তার মনের ভেতরে এক অন্যরকম খুশির জোয়ার বয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল, এই লোকটা যতটাই কঠিন বাইরে থেকে, ভেতরটা তার ভীষণ উদার।

---
সিগারেটের শেষ টান দিয়ে আলতাফ সাহেব অ্যাশট্রেতে সেটা নিভিয়ে ফেললেন। তাঁর বুকের ভেতর তখন এক অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করছে। তিনি মালেকের দিকে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টিতে এমন কিছু একটা ছিল, যা সাধারণ কেউ হলে ভয় পেত, কিন্তু মালেক অন্ধ ভক্তিতে এতটাই অন্ধ যে সে এর পেছনের গভীর অর্থ বুঝতে পারল না।

আলতাফ সাহেব সোফার হাতলে হাত রেখে সোজা হয়ে বসলেন। তাঁর গলার স্বরটা একটু নিচু, ভারী এবং অদ্ভুত রকমের নরম শোনাল।

"মালেক..." আলতাফ সাহেব ডাকলেন।

"জি স্যার? বলুন স্যার," মালেক খুব মনোযোগ দিয়ে সামনে এগিয়ে এল।

আলতাফ সাহেব একটু থামলেন। তারপর সিধে ইতির চোখের দিকে তাকিয়ে মালেকের উদ্দেশে বললেন, "একটা কথা বলার ছিল... মানে, তোমার কি কোনো আপত্তি আছে কি না জানি না।"

মালেক ভ্রু কুঁচকে হাসিমুখে বলল, "আপত্তি? আপনার আবার কিসের আপত্তি স্যার? আপনি যা বলবেন, সেটাই তো আমাদের জন্য আইন। বলুন স্যার, কী বলতে চান?"

আলতাফ সাহেব গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, "আসলে... ইতি যেভাবে এত সুন্দর রান্না করেছে, এত যত্ন করে আপ্যায়ন করেছে... আমার ওকে দেখে খুব মায়া হয়েছে। আমি কি... আমি কি ইতির কপালে একটা স্নেহের চুমু খাওয়ার অনুমতি পেতে পারি? মানে, ঠিক যেভাবে একজন অভিভাবক তার আদরের মেয়ে বা পুত্রবধূকে স্নেহ করে, ঠিক সেভাবে।"

কথাটা শোনার পর ড্রয়িংরুমের বাতাসটা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরোপুরি থেমে গেল।

মালেক এক সেকেন্ডের জন্য একটু থমকে গেল। কিন্তু তার সরল ও অন্ধ বিশ্বাসের জগতে আলতাফ সাহেব একজন দেবতার সমান। সে একটুও খারাপ কিছু ভাবল না, বরং সে ভাবল চেয়ারম্যান সাহেব তাদের এত ভালোবাসেন যে তিনি তাদের আপন করে নিতে চান।

মালেক কোনো দ্বিধা না করে অত্যন্ত হাসিমুখে মাথা নেড়ে বলল, "আরে স্যার! এ আবার কেমন কথা বলছেন! আপনি আমাদের অভিভাবক, আমাদের ভগবান। আপনি ইতির কপালে একটা চুমু দিয়ে স্নেহ করবেন—এতে আমার আবার আপত্তি কিসের? বরং আমি খুব খুশি হব স্যার! ইতি... যাও, সামনে যাও স্যারের।"

ইতি লজ্জায় পুরো লাল হয়ে গেছে। তার বুক তখন আরও জোরে কাঁপছে। সে বুঝতে পারছে না সে কী করবে। তার দুই গাল দিয়ে রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে। সে মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল, কোনো প্রতিবাদ করল না, বরং তার ভেতর এক অদ্ভুত সম্মোহন কাজ করছিল।

আলতাফ সাহেব আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। তিনি সোফা থেকে আস্তে করে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর ষাটোর্ধ শক্তপোক্ত শরীরটা ইতির সামনে এসে দাঁড়াল।

তিনি একটু ঝুঁকে পড়লেন। ইতির সেই উজ্জ্বল, ফর্সা কপালটা তাঁর ঠিক চোখের সামনে। আলতাফ সাহেব তাঁর ডান হাত দিয়ে অত্যন্ত আলতো করে ইতির কাঁধটা ধরলেন, আর তাঁর মুখটা ইতির কপালে নামিয়ে এনে দীর্ঘ সময় ধরে একটা অত্যন্ত গাঢ়, উষ্ণ এবং তীব্র চুমু খেলেন।

সেই চুম্বনের ভেতর শুধু কোনো সাধারণ স্নেহ ছিল না—সেখানে ছিল এক দীর্ঘকালের জমে থাকা নিঃসঙ্গতা, এক নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষার তীব্র তৃষ্ণা এবং এক অদ্ভুত মোহগ্রস্ত অধিকারবোধ।

ইতি চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার পুরো শরীরটা যেন কেঁপে উঠল। সে আলতাফ সাহেবের শরীরের সেই সুবাস আর উষ্ণ নিঃশ্বাস নিজের ভেতরে অনুভব করল। তার মাথা কেমন যেন ঘুরে যাওয়ার উপক্রম হলো।

চুমু খাওয়া শেষ করে আলতাফ সাহেব যখন মুখ তুললেন, তখন তাঁর নিজের চোখ দুটোও সামান্য আর্দ্র ও লাল হয়ে গেছে। তিনি ইতির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু গলায় বললেন, "অনেক ধন্যবাদ ইতি... তোমার এই রান্নার স্বাদ আমি সারা জীবন মনে রাখব।"

ইতি চোখ নিচু করে, গাল দুটো লাল করে ফিসফিস করে বলল, "আপনাকেও ধন্যবাদ... স্যার..."

মালেক পাশে দাঁড়িয়ে খুব খুশি হয়ে উঠল। সে বলল, "বাহ! খুব ভালো লাগল স্যার! আপনারা দুজন বসুন, আমি একটু মিষ্টি নিয়ে আসি।"

আলতাফ সাহেব ঘড়ি দেখলেন। দুপুর গড়িয়ে গেছে। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, "না মালেক, আর মিষ্টির দরকার নেই। আমাকে এবার অফিসে ফিরতে হবে। অনেক কাজ বাকি আছে।"

তিনি মালেক ও ইতির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু রুম থেকে বের হওয়ার সময়ও তাঁর মনটা ওই ছোট্ট ফ্ল্যাটেই পড়ে রইল। তিনি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে বারবার ভাবলেন—এই ইতিকে কি সত্যিই তিনি আর নিজের জীবন থেকে কোনোদিন দূরে সরিয়ে রাখতে পারবেন? নাকি এই শুরু হলো এক নতুন ও ভয়ংকর অধ্যায়ের?
[+] 4 users Like Romzan83's post
Like Reply
#6
[Image: Gemini-Generated-Image-5s5ys05s5ys05s5y.jpg]
[+] 1 user Likes Romzan83's post
Like Reply
#7
চতুর্থ পর্ব:


ঢাকা শহরের মতিঝিলের আকাশচুম্বী ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর সতেরো তলার পুরো ফ্লোর জুড়ে সেই আলিশান কেবিন। ঘরের এসিটা আগের মতোই নিখুঁত ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেট করা, মার্বেল পাথরের মেঝেতে জুতোর কোনো শব্দ হয় না, জানলার বাইরে বিকেলের পড়ন্ত রোদে ব্যস্ত ঢাকার চঞ্চল রাস্তাঘাট। কিন্তু এই নিখুঁত ও শীতল পরিবেশের ভেতর আজ এক অদ্ভুত অস্থিরতা বিরাজ করছে।

চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরী নিজের মহামূল্যবান মেহগনি কাঠের এক্সিকিউটিভ টেবিলে বসে আছেন। তাঁর সামনে খোলা রয়েছে কয়েক কোটি টাকার একটি নতুন প্রজেক্টের ফাইল, যার ওপর বড় বড় অক্ষরে ফিনান্সিয়াল অডিট রিপোর্ট প্রিন্ট করা। কিন্তু বিগত দুই ঘণ্টা ধরে তিনি ওই ফাইলের একটি লাইনও পড়তে পারেননি। তাঁর ডান হাতের মন্টব্লংক পেনটা স্থির হয়ে টেবিলের ওপর পড়ে আছে।

তাঁর মাথার ভেতরে কেবল একটাই মুখ বারবার ক্যালাইডোস্কোপের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে—ইতি।

সেই ফর্সা মুখাবয়ব, খোপা করে বাঁধা চুল, বড় বড় মায়াবী চোখ, আর পরনের সেই হালকা হলুদ শাড়ি ও খোলামেলা ব্লাউজের অবয়ব। গতকাল দুপুরে মালেকের ছোট্ট ফ্ল্যাটে যা ঘটেছিল, তারপর থেকে আলতাফ সাহেবের ভেতরের সমস্ত শৃঙ্খলা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। ত্রিশ বছরের কর্পোরেট জীবনে তিনি কখনো কোনো বিষয়ের প্রতি এতখানি অমনোযোগী হননি। তাঁর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। বুকটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে।

তিনি চেয়ার থেকে হঠাৎ এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন। বড় কাঁচের জানলার সামনে এসে হাত দুটো পকেটে গুঁজে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। কিন্তু বাইরের কোনো দৃশ্যই তাঁর চোখে পড়ছিল না। তাঁর মনে শুধু বাজছিল ইতির সেই কাঁপাকাঁপা গলার ফিসফিসানি—"স্যার... বসুন না।"

তাঁর মনের ভেতর একটা তীব্র ছটফটানি শুরু হলো। তিনি আর এক মুহূর্তও এই এসির ঠান্ডা বাতাসে নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি বুঝতে পারছেন, তাঁর এই ব্যাকুলতার কোনো যুক্তি নেই, কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই—তবুও তাঁর পা দুটো যেন আর তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই।

-----

আলতাফ সাহেব আর দেরি করলেন না। তিনি নিজের স্যুট কোটটা গায়ে জড়িয়ে, টেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা পকেটে পুরে সতেরো তলা থেকে সরাসরি লিফটে নিচে নেমে এলেন।

গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে মূল গ্লাস ডোর দিয়ে যখন তিনি বাইরে প্রাঙ্গণে এলেন, তখন দুপুরের রোদটা একটু নরম হয়ে এসেছে। কোম্পানির বিশাল মেইন গেটের সামনে তখন ডিউটি করছে আবদুল মালেক। মেরুন রঙের সিকিউরিটি গার্ডের ইউনিফর্ম পরে মালেক অত্যন্ত সততার সাথে গেটে দাঁড়িয়ে আসা-যাওয়া করা গাড়িগুলোর দিকে খেয়াল রাখছে।

চেয়ারম্যান সাহেবকে নিজের দিকে হেঁটে আসতে দেখে মালেক চমকে উঠল। সে দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সম্মান ও ভক্তির সাথে স্যালুট ঠুকল।

খুব বড় গলায় ও বিনীত সুরে মালেক বলে উঠল, "আসসালামু আলাইকুম স্যার! আপনি এই সময়ে বাইরে? কোনো স্পেশাল ভিজিটর বা মিটিং আছে কি বাইরে, স্যার?"

কিন্তু আলতাফ সাহেব মালেকের দিকে তাকালেনও না। তাঁর মুখটা পাথরের মতো কঠিন ও গম্ভীর করা। তিনি মালেকের স্যালুটের কোনো জবাব না দিয়ে, বরফের মতো শীতল দৃষ্টিতে কেবল এক পলক তার দিকে তাকিয়ে সোজা নিজের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।

মালেক একটু থমকে গেল। সে অবাক হয়ে ভাবল, চেয়ারম্যান সাহেব কি কোনো কারণে রেগে আছেন? নাকি কোনো বড় কোনো কর্পোরেট টেনশনে আছেন?

কিন্তু মালেকের মাথায় ঘুণাক্ষরেও এই চিন্তা এল না যে, তাঁর এই অবহেলা বা উপেক্ষার পেছনে অন্য কোনো গভীর কারণ লুকিয়ে আছে। মালেক যেহেতু ডিউটিতে মেইন গেটে দাঁড়িয়ে আছে, তার মানে একটাই—তার বাসাটা এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা। আর এই একটা মাত্র তথ্যই আলতাফ সাহেবের মস্তিষ্ককে পুরোপুরি অন্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

আলতাফ সাহেব নিজের প্রিমিয়াম সেডান গাড়িটার ড্রাইভিং সিটে এসে বসলেন। ইঞ্জিন স্টার্ট নেওয়ার সাথে সাথেই গাড়ির এসি হুশ করেজেড়ে উঠল। তিনি স্টিয়ারিং হুইলে দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর হৃদস্পন্দন তখন দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে। তিনি মনে মনে ভাবলেন—*ইতি এখন বাসায় একা। মালেক তো ডিউটিতে সারাদিন গেটেই থাকবে।*

এই একটিমাত্র সুপ্ত ভাবনা তাঁর সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার করে দিল। তিনি গাড়িটাকে গ্যারেজ থেকে বের করে সোজা পুরান ঢাকার সেই চেনা গলিটার দিকে ছুটিয়ে দিলেন।

-----

আধঘণ্টা পর গাড়িটা সেই পুরোনো বিল্ডিংটার নিচে এসে বসল। আলতাফ সাহেব গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে সোজা তিন তলায় উঠে এলেন। তাঁর পরনে সেই নিখুঁত স্যুট, চুলে সামান্য অগোছালো ভাব।

তিনি মালেকের ফ্ল্যাটের কাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর হাত দুটো সামান্য কাঁপছিল। তিনি একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজায় আলতো করে তিনবার টোকা দিলেন—*কটকটকট*।

ভিতর থেকে জুতোর মৃদু আওয়াজ এল। কেউ একজন দরজা খুলে দিল।

দরজাটা যখন পুরোপুরি ফাঁক হলো, তখন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে দরজায় দাঁড়ানো ইতি থমকে গেল। তার চোখ দুটো বিস্ময়ে পুরোপুরি গোল হয়ে গেল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না যে আজ আবার এই ভরদুপুরে তাদের এই গরিবের ফ্ল্যাটের দরজায় স্বয়ং কোম্পানির চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন! আর এবার তো সাথে মালেকও নেই—মালেক তো !

ইতি পরনে সেই একই রকম ঘরোয়া পোশাকে ছিল—হালকা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি আর খোলামেলা স্লিভলেস ব্লাউজ। তার চুলগুলো আজও সুন্দর করে খোপা করে বাঁধা, কপালে সামান্য ঘামের ফোঁটা জমেছে। সে কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সে দ্রুত দুই হাত জোড় করে নিচু হয়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বলল, "আসসালামু আলাইকুম স্যার! আপনি... আপনি হঠাৎ এই সময়ে? মালেক তো অফিসে, ও তো ডিউটিতে গেছে!"

আলতাফ সাহেব ঘরের ভেতরে ঢোকার জন্য এক পা এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখ দুটো ইতির মুখ থেকে নামিয়ে তার সুগঠিত শরীরের দিকে এক দৃষ্টিতে আটকে রইল। তাঁর দৃষ্টিতে এমন এক ধরনের তীব্র ক্ষুধা ও মোহ কাজ করছিল, যা দেখে ইতি সামান্য লজ্জা পেল এবং অস্বস্তিতে পড়ে গেল।

আলতাফ সাহেব খুব ভারী ও নিচু গলায় বললেন, "জানি... মালেক অফিসে আছে, গেটে ডিউটি করছে। আমি জানি বলেই এসেছি।"
-----
ইতি দরজার সামনে থেকে একটু সরে গিয়ে পথ করে দিল। সে অত্যন্ত দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে গেল। একজন কোম্পানির চেয়ারম্যান এভাবে হুট করে গার্ডের বাসায় চলে আসাটা শুধু অস্বাভাবিকই নয়, এর মধ্যে এক অদ্ভুত রহস্যময়তা রয়েছে।

ইতি দরজাটা পুরোপুরি মেলে ধরে নরম গলায় বলল, "আসুন স্যার... ভেতরে আসুন।"

আলতাফ সাহেব জুতো খুলে ঘরের ভেতরে পা রাখলেন। ড্রয়িংরুমটা আগের মতোই পরিপাটি ও ছোট। তিনি সোফার দিকে এগিয়ে গিয়ে সোজা সেখানে বসে পড়লেন। তাঁর চোখ তখনো ইতির চালচলন ও শরীরের প্রতিটা বাঁকের ওপর নিবদ্ধ।

ইতি একটু দাঁড়িয়ে থেকে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, "স্যার... হঠাৎ কোনো সমস্যা হয়েছে কি? অফিসে কি মালেকের কোনো ভুলত্রুটি হয়েছে, যার কারণে আপনি নিজে ছুটে এসেছেন?"

আলতাফ সাহেব সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসলেন। তিনি পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে কপালটা মুছে শান্ত অথচ অদ্ভুত এক সুরে বললেন, "না, ইতি। অফিসে কোনো সমস্যা হয়নি। মালেকও ভালো কাজ করছে। আসলে... আমি এদিক দিয়ে একটা অফিশিয়াল কাজে যাচ্ছিলাম। গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে হঠাৎ মনে হলো..."

তিনি একটু থামলেন। ইতির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে একটা মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, "গত পরশু দিন তোমাদের এখানে এসে তোমার হাতের রান্না খেয়েছি ঠিকই, কিন্তু তোমার হাতের চা তো আমার খাওয়া হয়নি। গতকাল সারাদিন অফিসে শুধু ওই চা আর তোমার কথাটাই মাথায় ঘুরছিল। তাই ভাবলাম, আজ যখন কাজের ফাঁকে এদিক দিয়ে যাচ্ছিই, তখন একটু ঘুরে যাই।"

কথাটা শোনার পর ইতির ফর্সা গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে কখনো কল্পনাও করেনি যে দেশের এত বড় একজন নামকরা শিল্পপতি তার হাতের চা খাওয়ার জন্য এতটা আকুল হয়ে একা একা তাদের এই ছোট্ট ফ্ল্যাটে চলে আসবেন! তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আনন্দে ও সঙ্কোচে দুলে উঠল।

ইতি মাথা নিচু করে মৃদু হেসে বলল, "স্যার! চা খাওয়ার জন্য তো এত দূর আসলেন! তা ছাড়া আমার হাতের চা... আপনি এত বড় মানুষ, আমার হাতের চা আপনার পছন্দ হবে কি না কে জানে!"

আলতাফ সাহেব সোফার হাতলে হাত রেখে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন, "তোমার হাতের চা পছন্দ না হওয়ার কোনো কারণ নেই। তুমি জলদি এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসো তো দেখি। যেমন করে পারো, নিজের হাতে বানিয়ে নিয়ে এসো।"

"জি আচ্ছা স্যার, আমি এখনই বানাচ্ছি," বলে ইতি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে হেঁটে গেল।

-----

ইতি রান্নাঘরের ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে ড্রয়িংরুমটা পুরোপুরি নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

আলতাফ সাহেব একা বসে রইলেন সোফায়। তাঁর বুকটা তখন প্রবল বেগে ধুকপুক করছে। তিনি পকেট থেকে তাঁর সেই সিলভার রঙের গোল্ডফ্লেকের কেসটা বের করলেন। তারপর একটা অত্যন্ত দামি বিদেশি সিগারেট বের করে মুখে গোঁজলেন। পকেট থেকে লাইটার বের করে আগুন জ্বেলে একটা দীর্ঘ টান দিলেন।

মুখ দিয়ে ঘন ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী তিনি ছোট ড্রয়িংরুমের ছাদের দিকে ছেড়ে দিলেন। সিগারেটের তীব্র সুবাস চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।

কিন্তু সিগারেটের এই ধোঁয়া তাঁর মনের আগুন নেভাতে পারল না, বরং তা আরও বাড়িয়ে দিল। তিনি চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। এই দুই রুমের ছোট্ট ফ্ল্যাট, যেখানে কোনো বিলাসবহুল আসবাব নেই, কোনো দামি এসি নেই—অথচ এই চার দেওয়ালের ভেতরে এমন এক মায়াবী নারী বাস করে, যা তাঁর বিশাল অট্টালিকা বা আলিশান ফ্ল্যাটের সমস্ত জৌলুসকে ফিকে করে দিয়েছে।

তিনি মনে মনে ভাবলেন—*মালেক কোথায়, আর ইতি কোথায়! এই মেয়েটি কি সত্যিই ওই সাধারণ গার্ডটার সাথে সারাজীবন কাটিয়ে দেওয়ার জন্য জন্ম নিয়েছে? এ কি কোনো সাধারণ মানুষের ঘর করার যোগ্য? না... এর প্রকৃত জায়গা তো অন্য কোথাও হওয়া উচিত ছিল।*

আলতাফ সাহেবের মনের গহীনে সেই নিষিদ্ধ এবং তীব্র আকাঙ্ক্ষাটা আবার ফুঁসে উঠল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল ইতির সেই সদ্য ধোয়া খোপার চুল আর শাড়ির আঁচলের ফাঁক থেকে উঁকি দেওয়া সুগঠিত কোমর।

রান্নাঘর থেকে চায়ের কেটলিতে জল ফোটার মৃদু সাঁই সাঁই শব্দ ভেসে আসছে। সেই শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে আলতাফ সাহেবের হৃদস্পন্দন আরও দ্রুত হতে লাগল। তিনি জানেন না এই খেলায় তিনি কোথায় গিয়ে ঠেকবেন, তবুও তিনি আর পিছিয়ে আসার কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভাবতে পারছেন না। সিগারেটের শেষ টান দিয়ে তিনি অ্যাশট্রেতে সেটা গুঁজে ফেললেন, আর ইতির ফিরে আসার প্রতীক্ষায় অধীর আগ্রহে সোফায় সোজা হয়ে বসে রইলেন।

[Image: IMG-20260809-190052-346.png]
[+] 4 users Like Romzan83's post
Like Reply
#8
Starting great just great... Chalia jan... Waiting for next
[+] 1 user Likes BiratKj's post
Like Reply
#9
plz continue posting... thanx
[+] 1 user Likes Amipavelo's post
Like Reply
#10
চালিয়ে যাও
[+] 1 user Likes Raj Pal's post
Like Reply
#11
পঞ্চম পর্ব:

রান্নাঘরের ছোট্ট গ্যাস চুলার ওপর রাখা কেটলির জলটা ফুটে ওঠার পর ইতি খুব যত্ন করে দুধ, চা পাতা আর সামান্য আদা দিয়ে এক কাপ সুবাসিত লাল-দুধ চা তৈরি করল। একটা সুন্দর সিরামিকের কাপে সেই ধোঁয়া ওঠা চা ঢেলে সে যখন ড্রয়িংরুমে ফিরে এল, তখন পুরো ঘরটা আলতাফ সাহেবের মুখের জ্বালানো দ্বিতীয় সিগারেটের নীল ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।

আলতাফ সিরাজ চৌধুরী তখনো সোফায় একা বসে গভীরভাবে কিছু একটা ভাবছিলেন। তাঁর চোখের সেই তীক্ষ্ণ কর্পোরেট দৃষ্টি এখন কেমন যেন এক গভীর উদাসীনতা ও ক্লান্তিতে ঢাকা। তাঁর মুখের সামনে রাখা গোল্ডফ্লেকের কেস থেকে আরেকটি সিগারেট তখন সবেমাত্র পুড়তে শুরু করেছে।

ইতি এসে অত্যন্ত সাবধানে চায়ের কাপটা টেবিলে রাখল। তার পরনের হালকা হলুদ শাড়ি আর খোলামেলা ব্লাউজের স্নিগ্ধতা সেই ধোঁয়া ওঠা ধূসর পরিবেশেও এক অদ্ভুত আলোর আভা ছড়াচ্ছিল। সে নরম গলায় ডাকল, "স্যার... চা বানিয়ে এনেছি। একটু দেখুন তো কেমন হয়েছে।"

আলতাফ সাহেব তাঁর আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে হালকা করে গুঁজে নিভিয়ে ফেললেন। তিনি নিজের দৃষ্টি ইতির ওপর স্থির করে অত্যন্ত শান্ত ও গম্ভীর গলায় বললেন, "দাঁড়াও ইতি, চা তো এনেছই। কাপটা এখানে রাখো, আর সোফায় আমার পাশে এসে বসো তো একটু।"

কথাটা শোনার পর ইতি সামান্য চমকে উঠল। সে কিছুটা ইতস্তত করল, তার ফর্সা মুখাবয়ব হালকা লাল হয়ে উঠল। সে দ্বিধান্বিত গলায় বলল, "আমি... মানে, আমি তো এখানে দাঁড়িয়েই দিতে পারব স্যার। আপনার পাশে বসাটা কি ঠিক হবে?"

আলতাফ সাহেব এবার একটু জোরালো এবং নির্দেশমূলক অথচ মায়াবী গলায় বললেন, "কোনো অন্যায় বা ভুল হচ্ছে না। বলছি বসো, পাশে এসে বসো। তোমার সাথে কিছু কথা আছে।"

মালিক বা কোম্পানির সর্বোচ্চ কর্মকর্তার এই সরাসরি আদেশের সামনে ইতি আর না করতে পারল না। সে অত্যন্ত সংকোচ ও দ্বিধার সাথে সোফার এক কোণে, আলতাফ সাহেবের ঠিক পাশেই বসল। তাদের দুজনের শরীরের মাঝখানের দূরত্বটুকু তখন এতটাই কম যে ইতির শাড়ির আঁচল আলতাফ সাহেবের সুটকোটের কাপড়ের সাথে হালকা ছুঁয়ে গেল।

-----

আলতাফ সাহেব চায়ের কাপটা তুলে নিলেন। কাপে চুমুক দেওয়ার আগে তিনি ইতির দিকে এক পলক তাকালেন, তারপর চায়ে একটা ছোট চুমুক দিলেন। আদার হালকা ঝাঁঝ আর দুধের নিখুঁত মিশ্রণে চায়ে এক চমৎকার স্বাদ এসেছে।

তিনি চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু বছর আগের এক অচেনা ও ধূসর অতীত।

"চা চমৎকার হয়েছে, ইতি," আলতাফ সাহেব বলতে শুরু করলেন। তাঁর গলাটা আগের চেয়ে অনেক বেশি নরম ও থমথমে শোনাল। "জানত, গত ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি শুধু টাকা, প্রফিট, ব্যালেন্স শিট আর কর্পোরেট সাম্রাজ্য গড়ার পেছনে ছুটেছি। মানুষ ভাবে আলতাফ সিরাজ চৌধুরী একজন অত্যন্ত সফল মানুষ, যার জীবনে কোনো অভাব নেই। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে কী পরিমাণ শূন্যতা লুকিয়ে আছে, তা কেউ জানে না।"

ইতি খুব মন দিয়ে তাঁর কথা শুনছিল। সে বড় বড় চোখ দুটো মেলে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন একজন রূপকথার রাজার দুঃখের গল্প শুনছে।

আলতাফ সাহেব নিজের ডান হাত দিয়ে নিজের কপালটা একটু চেপে ধরে বলতে লাগলেন, "আজ থেকে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা। তখন আমার পকেটে একটাও টাকা ছিল না। বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়েছিল আমার ঘাড়ে। ছোট ভাই-বোনগুলোর মুখে দু'মুঠো ভাত তুলে দেওয়ার জন্য আমি দিনে আঠারো ঘণ্টা কাজ করেছি। রাস্তায় ঘুরেছি, না খেয়ে থেকেছি, তীব্র অপমান সহ্য করেছি। তখন আমার মাথায় একটাই ভূত চেপেছিল—আমাকে বড় হতে হবে, আমাকে টাকা কামাতে হবে। কারণ আমি হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলাম, এই পৃথিবীতে গরিব মানুষের কোনো দাম নেই, কোনো সম্মান নেই।"

ইতি ফিসফিস করে বলল, "সেটাই তো স্বাভাবিক স্যার। অভাব মানুষকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেয়।"

"ঠিক বলেছ, ইতি," আলতাফ সাহেব একটু থেমে আবার শুরু করলেন। "টাকা তো আমি ঠিকই কামালাম। আজকের এই 'সিরাজ এন্টারপ্রাইজ', এই বিশাল বহুতল ভবন, ব্যাংক ব্যালেন্স—সব আমার হাতের মুঠোয়। কিন্তু এই সাফল্যের সিঁড়ি বাইতে গিয়ে আমি আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলো পেছনে ফেলে এসেছি। আমার কোনো বন্ধু ছিল না, কোনো আনন্দের মুহূর্ত ছিল না।"

তিনি ইতির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটা সত্য প্রকাশ করলেন, যা তিনি জীবনে কখনো কাউকে বলেননি।

"তুমি বিশ্বাস করবে কি না জানি না, ইতি—আমার এই জীবনে কখনো কোনো নারীর সাথে কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। আমি বিয়ে করিনি। সমাজ আমাকে 'চিরকুমার' বলে জানে। কিন্তু কেউ জানে না যে আমি স্বেচ্ছায় এই চিরকুমার জীবন বেছে নিয়েছিলাম। কারণ আমার বিশ্বাস ছিল, বিয়ে বা সংসার মানেই একটা পিছুটান, একটা দুর্বলতা। আমি চেয়েছিলাম আমার জীবনটা শুধু সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাবে। কিন্তু আজ এই ষাট বছর বয়সে এসে যখন আয়নার সামনে দাঁড়াই, তখন দেখি আমার চারপাশে শুধু টাকা আছে, সফলতার ইমারত আছে, কিন্তু পাশে ধরে রাখার মতো আপন বলতে কেউ নেই!"

-----

কথাগুলো বলতে বলতে আলতাফ সাহেবের গলাটা যেন সামান্য কেঁপে উঠল। তাঁর ষাটোর্ধ শক্তপোক্ত শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই নিঃসঙ্গ ও ক্লান্ত মানুষটা যেন হঠাৎ করে বেরিয়ে এল।

তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি হঠাৎ করে সোফায় ইতির ঠিক দিকে একটু ঝুঁকে পড়লেন এবং নিজের ডান হাত বাড়িয়ে ইতির সেই নরম, ফর্সা হাতটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোর মধ্যে শক্ত করে ধরে ফেললেন।

ইতির হাতটা তখন আলতাফ সাহেবের হাতের ছোঁয়ায় সামান্য কেঁপে উঠল। সে আকস্মিক এই স্পর্শে হতবাক হয়ে গেল।

আলতাফ সাহেব অত্যন্ত কাতর ও ভারী গলায় বললেন, "ইতি... আজ এত বছর পর তোমার এই বাসায় এসে, তোমার হাতে তৈরি চা খেয়ে, তোমার সাথে কথা বলে আমার মনে হচ্ছে... আমি ভুল করেছি। বড় ভুল করেছি। টাকা দিয়ে সব কিছু কেনা যায়, কিন্তু একটা মানুষের ছোঁয়া, একটা মানুষের ভালোবাসা কেনা যায় না। আজ আমি বুঝতে পারছি, আমি বড় একা... বড় বেশি একা! আমার জীবনে এখন একজন সত্যিকারের সঙ্গীর প্রয়োজন, যে আমার এই বিশাল শূন্য ফ্ল্যাটে আমার দিকে তাকিয়ে বলবে—'সারাদিন কোথায় ছিলে? একটু জল খাও।' কিন্তু আমার জীবনে কেউ নেই!"

ইতির বুকটা আলতাফ সাহেবের এই অসহায় রূপ দেখে কেঁপে উঠল। সে একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রী হলেও তার অন্তরের কোমলতা ও মায়া এতটুকু কম ছিল না। দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষটি আজ তার সামনে একজন একেবারে ভাঙা মানুষের মতো বসে আছেন—দৃশ্যটা সে সহ্য করতে পারছিল না।

ইতি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে, অত্যন্ত মায়ায় ভরা এক দৃষ্টি নিয়ে নিজের হাতটা আলতাফ সাহেবের হাতের ভেতরে রেখেই আলতো করে উল্টো তাঁর হাতটা চেপে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল।

সে নরম ও মিষ্টি গলায় বলল, "স্যার... দয়া করে এমন কথা বলবেন না। আপনার মন খারাপ করবেন না তো! আপনি তো এত বড় একটা মানুষ, কত মানুষের কর্মসংস্থান করেছেন, কত মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। আমরা গরিব মানুষ হলেও আপনাকে দেবতার মতো সম্মান করি, ভক্তি করি। আমার স্বামী মালেক সারাদিন আপনার কথা বলে। সে তো সবসময় বলে, সিরাজ স্যার আমাদের দেবতা, উনি না বাঁচালে আমরা কবেই না খেয়ে মরে যেতাম। আপনার মতো মানুষের মনে এত কষ্ট কেন থাকবে স্যার? প্লিজ, আপনি মন খারাপ করবেন না।"

---

আলতাফ সাহেব ইতির সেই সান্ত্বনার সুরে যেন কিছুটা শান্তি পেলেন। তিনি ইতির হাতের নরম উষ্ণতা অনুভব করতে করতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তিনি একটু সামলে নিয়ে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা, ইতি... সত্যি করে বলো তো। মালেক তো খুব সাধারণ একজন সিকিউরিটি গার্ড, সারাদিন রোদে পুড়ে কাজ করে, সামান্য বেতন পায়। তুমি তো দেখতে এত সুন্দর, তোমার তো আরও অনেক ভালো জায়গায় বা সচ্ছল পরিবারে বিয়ে হতে পারত। তুমি কি এই গরিব সংসারে মালেককে বিয়ে করে সত্যিই সুখী হতে পেরেছ?"

ইতির মুখে তখন এক মৃদু ও লাজুক হাসি ফুটে উঠল। সে তার মাথাটা একটু নিচু করে শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে বলল, "সুখ-অসুখ তো মানুষের মনের ব্যাপার, স্যার। আমার জীবন তো এমন কিছু বিলাসবহুল ছিল না যে আমি খুব রাজরানি হয়ে থাকব। মালেক মানুষটা খুব ভালো, সে সারাদিন অনেক পরিশ্রম করে আমাকে ভালো রাখার জন্য। সে আমায় খুব ভালোবাসে।"

সে একটু থেমে আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে বলল, "আর আমাদের এই যে আজ একসাথে সংসার করার সুখ, এর মূল কারণ তো শুধু আপনি, স্যার! আপনি যদি সেদিন মালেককে ওই চাকরিটা না দিতেন, যদি মায়া করে ওর কান্নায় ১০,০০০ টাকা মাইনে ঠিক না করতেন, তবে আজ আমাদের এই সংসারটাই হতো না। হয়তো না খেয়ে বা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে আমাদের দিন কাটত। তাই আমাদের এই ছোটখাটো সুখের পেছনে একমাত্র আপনারই দয়া রয়েছে।"

ইতি আরও বলল, "বেতন কম হলেও কী হবে স্যার, আমরা তো আর দশটা মানুষের মতো লোভী নই। মালেক যা আনে, আর আমি যেভাবে পারি—দুটো ডাল-ভাত রান্না করে আমরা মিলেমিশে মানিয়ে চলার চেষ্টা করি। আমাদের কোনো বড় চাহিদা নেই। শুধু আপনাদের মতো বড় মানুষের আশীর্বাদ মাথার ওপর থাকলে আমাদের আর কিছু লাগবে না।"

আলতাফ সাহেব ইতির এই সরল ও লোভহীন কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তাঁর মনের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত আলোড়ন বয়ে যাচ্ছে। তিনি ভাবছেন—যে মেয়েটি এত সুন্দর, এত মায়াবী, যে চাইলে যেকোনো বড় জায়গায় নিজের ভাগ্য খুঁজতে পারত, সে আজ এই সামান্য সিকিউরিটি গার্ডের সাথে একটা ছোট ফ্ল্যাটে কি দারুণ তৃপ্তি নিয়ে বেঁচে আছে!

কিন্তু একই সাথে আলতাফ সাহেবের মনে সেই পুরোনো জেদ আর তীব্র আকর্ষণটা আরও প্রবল হয়ে উঠল। তিনি মনে মনে বললেন—*এই মেয়েটি এই সাধারণ গার্ডের সাথে থাকার জন্য তৈরি হয়নি। এর আসল জায়গা আমার পাশে, আমার সেই বিশাল সাম্রাজ্যের ছায়ায়।*

তিনি ইতির হাতটা নিজের হাত থেকে ধীরে ধীরে ছাড়িয়ে নিলেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি তখনো ইতির মুখের ওপর স্থির হয়ে রইল। বাইরের আকাশটা তখন আস্তে আস্তে গোধূলির আলোয় লালচে হয়ে আসছে, আর ঘরের ভেতরে দুই মানুষের মাঝে তৈরি হচ্ছে এক অদ্ভুত, রহস্যময় ও নিষিদ্ধ গল্পের নতুন এক অধ্যায়।

https://i.ibb.co.com/mVGnrHKk/IMG-202608...19-748.png
[+] 3 users Like Romzan83's post
Like Reply
#12
ষষ্ঠ পর্ব:

ড্রয়িংরুমের ছোট চার দেওয়ালের ভেতরে তখন গোধূলির নরম আলো ফিকে হয়ে আসছে। বাইরে ঢাকার ব্যস্ত গলিটার কোলাহল যেন অনেক দূরে কোনো অবাস্তব সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো শোনাচ্ছে। এসি করা বিশাল কেবিন বা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের সাথে কোনো মিল না থাকা সত্ত্বেও এই ছোট্ট দুই রুমের ফ্ল্যাটটাই এখন আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর সমস্ত মনোযোগ এবং চেতনার কেন্দ্রবিন্দু।

তিনি সোফায় ইতির ঠিক পাশেই বসে আছেন। একটু আগে ইতির নরম হাত নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে তিনি তার তীব্র একাকিত্বের কথা বলেছিলেন। কিন্তু মুহূর্তের উত্তেজনা পেরিয়ে এখন তাঁর মনের ভেতর কাজ করছে এক সুদূরপ্রসারী ও প্রবল সিদ্ধান্ত। ষাটোর্ধ এই কর্পোরেট টাইকুন জীবনে অনেক জয় দেখেছেন, অনেক কঠিন চুক্তি সই করেছেন, কিন্তু আজকের এই চুক্তিটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এক জুয়া।

আলতাফ সাহেব তাঁর মুখের সামনে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সরাসরি ইতির চোখের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখের সেই গভীর চাউনিতে এক ধরনের না-বলা ব্যাকুলতা আর জেদ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।

তিনি ইতির হাতটা আবার নিজের হাতের মধ্যে তুলে নিলেন। খুব নিচু, গম্ভীর ও নরম গলায় তিনি বললেন, "ইতি... তোমাকে আজ একটা কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমি কোনো রাখঢাক করতে পছন্দ করি না, তুমিও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ আমার মনের অবস্থা।"

ইতি সামান্য চমকে গেল। সে আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে তাকাতে গিয়েও লজ্জায় ও সংকোচে চোখ নামিয়ে নিল। তার ফর্সা গাল দুটো আবার লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। সে অস্পষ্ট গলায় বলল, "কী কথা বলছেন, স্যার? আমি ঠিক বুঝছি না..."

আলতাফ সাহেব একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বললেন, "আমি তোমাকে কোনো গার্ডের বউ বা সাধারণ মেহমান হিসেবে দেখছি না আর। গত কয়েকদিন ধরে তোমাকে দেখার পর, তোমার সাথে কথা বলার পর আমার মনে হচ্ছে—আমার এই শূন্য জীবনে তোমার মতো একজন মানুষের ভীষণ প্রয়োজন। আমি তোমাকে আমার বন্ধু হিসেবে পেতে চাই, ইতি। তুমি কি আমার বন্ধু হবে?"

কথাটা শোনার পর ইতি যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো! সে আতিপাতি করে ভাবতেও পারেনি যে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একজন শিল্পপতি, শত কোটি টাকার কোম্পানির চেয়ারম্যান, তার মতো একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডের স্ত্রীকে সোজাসুজি বন্ধুত্বের প্রস্তাব দেবেন!

ইতি তার হাতটা আলতাফ সাহেবের মুঠোর থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আমতা আমতা করে বলল, "এ... আপনি এ কী বলছেন, স্যার! আপনার মাথা ঠিক আছে? আমি কোথায় এক গরিব সিকিউরিটি গার্ডের সাধারণ স্ত্রী, আর আপনি কোথায় সিরাজ এন্টারপ্রাইজের চেয়ারম্যান! আপনার বন্ধু হওয়ার যোগ্যতা কি আমার আছে? সমাজের মানুষ কী বলবে? আর মালেক জানলে..."

-----
ইতি যতই নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার বা লজ্জা পাওয়ার ভান করুক না কেন, আলতাফ সাহেবের ভেতরের জেদ তাতে আরও চড়ে বসল। তিনি মরিয়া হয়ে ইতির হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বললেন, "সমাজ কী বলল, কে কী ভাবল—তাতে আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর কিচ্ছু আসে যায় না, ইতি! এই সমাজে টাকার জোর যার আছে, আইন আর সমাজ তার পক্ষেই কথা বলে। কে কী বলবে তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি শুধু জানি, আমার যা ভালো লাগছে, আমি সেটাই অর্জন করব।"

তিনি থামলেন না। ইতির মুখের ওপর নিজের দৃষ্টি স্থির রেখে একের পর এক এমন সব প্রলোভন ছুড়ে দিতে লাগলেন, যা একজন সাধারণ ও অভাবী পরিবারের মেয়ের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

"তুমি কি ভাবছ তোমার যোগ্যতা কম? শোনো, আজ থেকে তোমার কোনো অভাব থাকবে না," আলতাফ সাহেব আবেগে কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন। "তুমি যা চাও—শাড়ির দোকান থেকে শুরু করে দামি কসমেটিকস, সোনার গহনা, যা তোমার শখ—সব আমি পূরণ করে দেব। তোমার সব কেনাকাটার দায়িত্ব আমার। তুমি শুধু হুকুম করবে, আর তোমার দরজায় জিনিস পৌঁছে যাবে।"

ইতি একটু হেসে ফেলল। তার সেই হাসির ভেতরে বিস্ময় যেমন ছিল, তেমনি ছিল এক অদ্ভুত কৌতূহল। সে ফিসফিস করে বলল, "স্যার, আপনি যা বলছেন, তা তো পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। এত কিছু কেন দেবেন আমাকে?"

আলতাফ সাহেব আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "শুধু কেনাকাটা নয়, ইতি। আমি মাঝে মাঝেই তোমাকে নিয়ে এই দমবন্ধ করা শহর থেকে বাইরে কোথাও বেড়িয়ে আসব। উইকেন্ডে কক্সবাজার বা সিলেটের কোনো বিলাসবহুল রিসোর্টে যাব আমরা। শুধু তাই নয়—দরকার হলে আমি তোমাকে নিয়ে দেশের বাইরে, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক বা সুইজারল্যান্ডেও ঘুরতে নিয়ে যাব। তুমি কি কখনো প্লেনে চড়েছো? দেশ দেখেছো বাইরে গিয়ে?"

ইতির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সিঙ্গাপুর বা ব্যাংকক—এসব তো তার কল্পনারও বাইরে। সে শুধু সিনেমা বা টিভিতে দেখেছে। সে মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল, "স্যার, আপনি যা বলছেন, তা কোনো রূপকথার গল্পের মতো শোনাচ্ছে। এসব তো আমাদের ভাগ্যে কোনোদিনও ছিল না।"

"ভাগ্যে ছিল না তো কী হয়েছে? ভাগ্য আমি তোমার বদলে দেব!" আলতাফ সাহেব দৃঢ় প্রতিজ্ঞার সুরে বললেন।

-----

কিন্তু ইতির মনের কোণে একটা ভয় তো থেকেই যায়। সে একটু চিন্তিত মুখে, শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে বলল, "সবই তো বুঝলাম, স্যার। কিন্তু আপনি এসব কথা বলছেন ঠিকই, তবে আমার তো একটা সংসার আছে। মালেক যদি কোনোভাবে টের পায় বা জানতে পারে যে আপনি আমাকে এসব প্রস্তাব দিচ্ছেন, আর আমি আপনার সাথে বাইরে যাচ্ছি বা বন্ধুত্বের কথা বলছি—তাহলে সে তো আমাকে আস্ত রাখবে না! ও তো মারাই ফেলবে আমাকে, কিংবা পাগল হয়ে যাবে।"

মালেকের কথা উঠতেই আলতাফ সাহেবের মুখের সেই রোমান্টিক ভাবটা আবার একটা ঠান্ডা ও কঠিন কর্পোরেট খোলসে ঢাকা পড়ে গেল। তিনি অবজ্ঞার সুরে হাত নেড়ে বললেন, "মালেক? ওই সাধারণ সিকিউরিটি গার্ডটা তোমাকে মারবে? ওর এত বড় স্পর্ধা হয়েছে যে সে আমার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাবে? শোনো ইতি, মালেক আমার কোম্পানিতে চাকরি করে, আমার এক ইশারায় ওর চাকরি চলে যেতে পারে। ও তো আমার তলে চলে। তোমার স্বামীর বিষয়টি কীভাবে সামলাতে হবে, সেটা আলতাফ চৌধুরী খুব ভালো করেই জানে। তোমাকে ও নিয়ে এক বিন্দুও ভাবতে হবে না। আমি সব ব্যবস্থা করে দেব।"

ইতি অবাক হয়ে আলতাফ সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটির ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। তিনি যা চান, তা যেকোনো ভাবে হাসিল করতে পারেন।

ঠিক তখনই আলতাফ সাহেব পকেট থেকে তাঁর লেদার ওয়ালেটটা বের করলেন। ওয়ালেট খুলে সেখান থেকে একদম মুড়মুড়ে, নতুন পাঁচটি এক হাজার টাকার নোট বের করলেন। মোট পাঁচ হাজার টাকা। তিনি নোটগুলো ইতির চোখের সামনে বাড়িয়ে ধরে বললেন, "নাও, এটা রাখো। নিজের পছন্দমতো ভালো একটা শাড়ি বা নিজের শখের কিছু কিনে নিও।"

ইতি টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে একটু পিছিয়ে গেল। সে ইতস্তত করে বলল, "না স্যার, এত টাকা আমি নিতে পারব না। আপনি সেদিনও দিয়েছেন... আজ আবার..."

"মানা করবে না বলছি!" আলতাফ সাহেব একটু জোর করেই টাকাটা ইতির হাতের মুঠোয় গুঁজে দিলেন।

এতগুলো টাকা একবারে হাতে পেয়ে ইতির অবচেতন মন ভেতরে ভেতরে দারুণ খুশি হয়ে উঠল। গরিবের সংসারে পাঁচ হাজার টাকা মানে অনেক কিছু। সে মনে মনে ভাবতে লাগল, মানুষটা যতই খ্যাপামি করুক না কেন, পকেট থেকে টাকা বের করতে একটুও কার্পণ্য করে না।

ইতি একটু মুচকি হেসে আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। সে একটু রহস্যময় সুরে বলল, "আচ্ছা স্যার, আপনার এত যখন জেদ, তখন আপনার এই বন্ধুত্বের প্রস্তাব আর উপহার আমি এক বাকੇ উড়িয়ে দিচ্ছি না। আমি ভেবে দেখব... সত্যিই ভেবে দেখব আপনার কথাটা।"

-----

আলতাফ সাহেব যখন শুনলেন ইতি তাঁর প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দেয়নি, বরং "ভেবে দেখবে" বলেছে, তখন তাঁর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত বিজয়ের উল্লাস বয়ে গেল। তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসলেন।

কিন্তু ইতির মাথা তখন অন্য একটা খেলায় মজে গেছে। সে চাচ্ছিল আলতাফ সাহেবকে পুরোপুরি নিজের মোহর মধ্যে আটকে ফেলতে, যাতে তাঁর মাথার ঠিক না থাকে।

ইতি আলতাফ সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি একটা হাসি দিল। তারপর সেই পাঁচ হাজার টাকার মুড়মুড়ে নোটের বান্ডিলটা হাতে নিয়ে সে ইচ্ছে করেই একটু অন্যরকম একটা ভঙ্গি করল। সে আলতাফ সাহেবের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে অত্যন্ত ধীরস্থির ও খোলামেলা ভঙ্গিতে তার স্লিভলেস ব্লাউজের সামনের কাঁধের ও বক্ষের ভাজের ভেতরে সেই টাকার নোটগুলো গুঁজে দিতে শুরু করল!

তার পরনের হালকা হলুদ শাড়ির আঁচলটা তখন এক পাশে সরিয়ে রাখা, আর ব্লাউজের ফিতার ঠিক পাশেই সে অত্যন্ত সুকৌশলে ও ইচ্ছাকৃতভাবে টাকার বান্ডিলটা এমনভাবে ঢোকাল, যা তার শরীরের কোমল ত্বকের সাথে সরাসরি ঘষা খেল।

আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর মতো একজন বজ্রকঠিন মানুষ, যিনি জীবনে কোনোদিন কোনো নারীর সামনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি, তিনি এই দৃশ্য দেখে একেবারে থ মেরে গেলেন!

তাঁর চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। তিনি পলকহীন দৃষ্টিতে ইতির সেই নমনীয় শরীরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। বুকের ভেতর যে ধুকপুকানি একটু আগে কমে এসেছিল, তা এখন হাজার গুণ বেড়ে গিয়ে তাঁর কান দিয়ে বের হওয়ার উপক্রম হলো।

ইতি টাকাটা ব্লাউজের ভাঁজে গুঁজে দিয়ে একটা দুষ্টু ও লাজুক হাসি দিয়ে আলতাফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "টাকাটা সযত্নে রেখে দিলাম, স্যার। আপনার এই উপহার কি আর ফেলে দেওয়া যায়?"

আলতাফ সাহেব তখন আর কোনো কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না। তিনি পাথরের মূর্তির মতো সোফায় বসে রইলেন, আর তাঁর চোখের সামনে তখন শুধু ভাসতে লাগল এক নিষিদ্ধ নেশার ঘূর্ণি—যেখান থেকে ফিরে যাওয়ার সমস্ত রাস্তা চিরতরে হারিয়ে গেছে। (চলবে)

[Image: IMG-20260809-235121-246.png]
[+] 3 users Like Romzan83's post
Like Reply
#13
Ufff sei
Like Reply
#14
অসাধারণ। চালিয়ে যান।
Like Reply
#15
চমৎকার
Like Reply
#16
সপ্তম পর্ব:

পরের দিন সকালে ঢাকা শহরের আকাশজুড়ে ছিল মেঘের ঘনঘটা। মতিঝিলের ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ির হর্ন আর মানুষের ছুটোছুটির আওয়াজ ছাপিয়ে ‘সিরাজ এন্টারপ্রাইজ’-এর সতেরো তলার এক্সিকিউটিভ কেবিনের ভেতর তখন বইছিল এক চরম থমথমে ও বরফশীতল আবহাওয়া। এসি-র তাপমাত্রা সবসময়কার মতো ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেট করা থাকলেও রুমের ভেতরের উত্তাপ যেন অন্য কোনো কারণে বহু গুণে বেড়ে গিয়েছিল।

চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরী নিজের বিশাল মেহগনি কাঠের টেবিলের পেছনে সোজা হয়ে বসে আছেন। তাঁর চোখের চশমাটা টেবিলের ওপর উল্টো করে রাখা। তাঁর কপালে গভীর ভাঁজ, কুঁচকানো ভ্রু আর চোয়ালের শক্ত পেশিগুলো দেখলেই বোঝা যায় তিনি চরম মাত্রায় বিরক্ত ও ক্ষিপ্ত। গতকাল বিকেলে পুরান ঢাকার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটে ইতির সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো তাঁর মস্তিষ্কে বারবার ঘুরেফিরে আসছে। সেই মোহগ্রস্ততা, সেই প্রলোভন আর ইতির ব্লাউজের ভাঁজে টাকা গুঁজে দেওয়ার দৃশ্যটি তাঁর ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তিনি সারারাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেননি।

তাঁর মনে এক প্রবল জ্বালা তৈরি হয়েছিল—যে নারী বা যে শরীর নিয়ে তিনি এমন মজে আছেন, সেই নারীর স্বামী হলো তাঁর অফিসেরই এক সাধারণ সিকিউরিটি গার্ড, যে প্রতিদিন তাঁর কেবিনের সামনে ডিউটি করে। এই চিন্তাটাই আলতাফ সাহেবের অহমিকায় মারাত্মকভাবে আঘাত হানছিল। তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না যে তাঁর অধীনস্থ একজন সামান্য কর্মচারী এমন এক অমূল্য রত্নকে নিজের স্ত্রী হিসেবে ঘরে রাখবে।

আলতাফ সাহেব টেবিলের ওপর রাখা ইন্টারকমের স্পিকারের বাটনটা সজোরে টিপে ধরলেন।

তাঁর গম্ভীর, ভারী ও কর্কশ কণ্ঠস্বর করিডোরের স্পিকার দিয়ে প্রতিধ্বনিত হলো, "সিকিউরিটি গার্ড আবদুল মালেক! বলছি, অবিলম্বে আমার কেবিনে এসে হাজির হও। এক মিনিটের বেশি যেন সময় না লাগে!"

ইন্টারকমের এই আকস্মিক ও হুকুমের সুরে নিচের গেটে বা করিডোরে দায়িত্বরত মালেকের বুকটা কেঁপে উঠল। মালেক তখন সবেমাত্র তার ডিউটি শুরু করেছে। চেয়ারম্যান সাহেবের এমন রাগী গলা শুনে তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত যেন বরফ জমে গেল। সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে বা লিফটে চড়ে সতেরো তলায় ছুটে এল।

-----

মালেক যখন কাঁপতে কাঁপতে আলতাফ সাহেবের বিশাল কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল, তখন তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সে ঘরের ভেতরে পা রেখেই দুই হাত জোড় করে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে বলল, "আসসালামু আলাইকুম স্যার... আপনি ডেকেছেন? কোনো ভুল হয়েছে কি স্যার?"

আলতাফ সাহেব চেয়ার থেকে এক ইঞ্চিও উঠলেন না। তিনি বরফের মতো ঠান্ডা ও অনুকম্পাহীন দৃষ্টিতে মালেকের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর টেবিলের ওপর রাখা একটা সাধারণ ফাইলের কাগজ দেখিয়ে অত্যন্ত রূঢ় গলায় বলে উঠলেন, "ভুল? তোমার মতো একটা অযোগ্য গাধাকে এই কোম্পানিতে রেখে আমি নিজেই সবচেয়ে বড় ভুল করেছি, মালেক!"

মালেক চমকে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল, "স্যার? আমি কী করলাম স্যার? আজ তো আমি কোনো ভুল করিনি..."

"চুপ!" আলতাফ সাহেব হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন। তাঁর গলার স্বর আরও উঁচুতে উঠল। " মুখে আবার কথা বলে! আজ কয়টায় এসেছ?"
গার্ড মাথানিচু করে বলল, "স্যার, আজ দশ মিনিট লেট হয়ে গেছে!"
আলতাফ সাহেব রেগে বললেন, "তোমার এই সামান্য অবহেলা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কত বড় ক্ষতি করতে পারে, তার কোনো ধারণা আছে তোমার ঘিলুতে?"

আসলে প্রায়ই সবাই লেট করে; এটা ছিল মালেককে অপমান করার একটা নিখাদ বাহানা মাত্র। আলতাফ সাহেবের ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভ আর হিংসা এখন এই সাধারণ মানুষটার ওপর গিয়ে পড়ছে।

মালেক ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে প্রায় মাথা ঠেকানোর উপক্রম করে বলল, "স্যার, আমাকে ক্ষমা করে দিন স্যার! আমার ভুল হয়ে গেছে স্যার। ভবিষ্যতে আর কখনো এমন ভুল হবে না স্যার। দয়া করে আমাকে মাফ করে দিন!"

আলতাফ সাহেব চেয়ারে পেছনে হেলান দিয়ে বাঁকা হেসে অত্যন্ত কটূ ভাষায় বললেন, "মাফ? তোমাকে মাফ করার জন্য তো আমি এখানে বসিনি! তিন মাস আগে যখন পেটে ভাত ছিল না, আমার পায়ে লুটিয়ে পড়েছিলে—সেকথা কি ভুলে গেছ? আমার দয়ায় তোমার চাকরি হয়েছে, আমার টাকায় তোমার সংসার চলছে, পেটে ভাত জুটেছে। আর আজ তুমি কাজের চেয়ে অন্য ধান্দায় বেশি মন দিচ্ছ!"

-----

মালেক কান্নাকরা গলায় হাত জোড় করে বলল, "না স্যার! আল্লাহর কসম, আমি কোনো ফাঁকি দিই না স্যার। আমি সবসময় সততার সাথে ডিউটি করি।"

আলতাফ সাহেব তাঁর ঠান্ডা চোখ দুটো আরও তীক্ষ্ণ করে মালেকের দিকে তাকালেন। তিনি এমন এক নিষ্ঠুর আঘাত হানলেন, যা মালেক কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি।

"মিথ্যা কথা বলো না, মালেক!" আলতাফ সাহেব দাঁতে দাঁত চেপে বললেন। "তোমার ভাবভঙ্গি আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি। বাড়িতে অমন যুবতী আর সেক্সি বউ থাকলে কারোরই কি আর ডিউটিতে মন টেকে? তোমার বউকে ত দেখেছি! গ্রামের মেয়ে বলো! ঠিকই ত নিজের বিশাল স্তনযুগল আমাকে দেখিয়ে বেড়ালো! সেক্সি বউয়ের মোহে পড়ে থেকে তুমি অফিসের কাজে ফাঁকি দিচ্ছ। তোমার এই ঢিলেঢালা ভাব আমি আর বরদাস্ত করব না।"

মালেক এই কথা শুনে লজ্জায় ও অপমানে একেবারে মাটিতে মিশে যাওয়ার উপক্রম হলো। একজন স্বামীর সামনে তার স্ত্রীকে নিয়ে এমন মন্তব্য করাটা কত বড় অপমান, তা বলে বোঝানো যাবে না। কিন্তু সে প্রতিবাদ করার বিন্দুমাত্র সাহস দেখাতে পারল না।

আলতাফ সাহেব নিজের হুকুম জারি করে ঠান্ডা গলায় বললেন, "শোনো মালেক, আজ থেকে তোমার ডিউটির সময় বাড়িয়ে দেওয়া হলো। সকাল ঠিক ৯টা থেকে তোমার ডিউটি শুরু হবে, আর রাতে অফিস বন্ধ হওয়া পর্যন্ত—মানে রাত ১০টা পর্যন্ত তোমাকে একটানা গেটে দাঁড়িয়ে ডিউটি করতে হবে। কোনো ছুটি নেই, কোনো বাহানা চলবে না। যাও, এখন আমার চোখের সামনে থেকে বের হয়ে যাও!"

মালেক আর একটিও কথা বলার সাহস পেল না। তার চোখ দিয়ে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। সে অত্যন্ত অপমানিত ও ভেঙে পড়া মনে মাথা নিচু করে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল।

-----

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গেছে। টানা তেরো ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ডিউটি করার পর মালেক যখন ক্লান্ত শরীর আর বিধ্বস্ত মন নিয়ে পুরান ঢাকার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটে এসে পৌঁছাল, তখন তার চেহারা দেখে চেনার উপায় ছিল না। তার কাঁধে ঝুলে থাকা সিকিউরিটি গার্ডের পোশাকটা ঘামে ভেজা, মুখটা সম্পূর্ণ মলিন ও বিবর্ণ।

সে দরজা খুলে ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই ইতি এগিয়ে এল। ইতি তখনো রাতের রান্নার পাট চুকিয়ে তার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করছিল। মালেকের এই বিধ্বস্ত ও কান্নাকরা মুখাবয়ব দেখে ইতি সাথে সাথে বুঝতে পারল যে অফিসে কিছু একটা মারাত্মক খারাপ ঘটনা ঘটেছে।

ইতি দ্রুত কাছে এসে মালেকের কাঁধে হাত রেখে উদ্বিগ্ন গলায় বলল, "কী হয়েছে তোমার, মালেক? তোমার মুখটা এমন শুকনো কেন? আজ এত দেরি হলো কেন ফিরতে? অফিসে কি কোনো বড় সমস্যা হয়েছে?"

মালেক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ঘরের একটা চেয়ারে বসে পড়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, "ইতি... আজ চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে যা-তা ভাষায় গালিগালাজ করেছেন। সামান্য একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমাকে সবার সামনে অপমান করেছেন।"

ইতি অবাক হয়ে বলল, "সে কী! সিরাজ সাহেব তো খুব ভালো মানুষ ছিলেন, তিনি তো সেদিন আমাদের বাসায় এসে এত সুন্দর ব্যবহার করলেন! হঠাৎ তোমার ওপর এমন রেগে গেলেন কেন?"

মালেক মাথা তুলে অত্যন্ত ক্ষোভ ও অপমানের সুরে বলল, "তিনি শুধু গালিগালাজ করেই ক্ষান্ত হননি, ইতি... তিনি আমার দিকে তাকিয়ে এমন সব নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, যা একজন স্বামীর পক্ষে শোনা অসম্ভব! তিনি বলেছেন, ঘরে নাকি সেক্সি বউ থাকলে কারোরই ডিউটিতে মন টেকে না! তিনি আমার ডিউটি বাড়িয়ে সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত করে দিয়েছেন। আমার জীবনটা আজ তিনি নরক বানিয়ে দিয়েছেন, ইতি!"

ইতি স্বামীর মাথার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অত্যন্ত ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সাথে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। যদিও তার নিজের মনের ভেতরেও আলতাফ সাহেবের সেই অদ্ভুত কথাগুলোর একটা অন্যরকম প্রতিধ্বনি হচ্ছিল, তবুও সে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য খুব শান্ত গলায় বলল, "মালেক, তুমি শান্ত হও। প্লিজ এভাবে ভেঙে পড়ো না।"

ইতি আরও বোঝানোর সুরে বলল, "বড় বড় কোম্পানির বড় কর্তারা তো এমনই হন। মাথার ওপর কাজের কত চাপ থাকে, হয়তো আজ কোনো কারণে স্যারের মেজাজ খুব খারাপ ছিল, তাই তোমার ওপর রাগ ঝেড়েছেন। এর পেছনে অন্য কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই। তুমি অমন খারাপ ভেব না তো!"

মালেক চোখের জল মুছে বলল, "কিন্তু উনি আমার ডিউটি এত বাড়িয়ে দিলেন কেন? আমি সারাদিন খাটব কী করে?"

ইতি অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে স্বামীর হাত চেপে ধরে বলল, "উনি যেভাবে বলেছেন, তুমি ঠিক সেভাবেই কাজ করো। স্যারের কথার ওপর কথা বলতে যেও না। উনি আমাদের অন্নদাতা, উনি আমাদের বাঁচিয়েছেন। আজ হয়তো উনার মন খারাপ তাই এমন করেছেন, কাল ঠিকই সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি একদম মন খারাপ কোরো না, চলো হাত-মুখ ধুয়ে একটু খেয়ে নাও।"

মালেকের মন কিছুটা শান্ত হলো ইতির কথায়। কিন্তু পর্দার আড়ালে আলতাফ সিরাজ চৌধুরীর এই নিষ্ঠুর আদেশের পেছনে যে এক গভীর ও ভয়ংকর চক্রান্ত লুকিয়ে ছিল, তা তখনো মালেকের কল্পনার বাইরে ছিল।(চলবে)
[+] 1 user Likes Romzan83's post
Like Reply
#17
[Image: IMG-20260810-074851-107.png]
Like Reply
#18
অষ্টম পর্ব:

তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামার প্রস্তুতি চলছে। আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা, ভ্যাপসা গরমে চারপাশের বাতাস যেন থমকে আছে। সতেরো তলার সুশৃঙ্খল কাঁচঘেরা কেবিন থেকে নিচের দিকে তাকালে মেইন গেটের গার্ডবক্সটা স্পষ্ট দেখা যায়।

চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরী নিজের এক্সিকিউটিভ টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে জানলার বাইরে নিচের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর চোখে বাইনোকুলার না থাকলেও তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন—মেইন গেটের ঠিক সামনে মেরুন রঙের সিকিউরিটি গার্ডের পোশাকে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ব্যস্ততার সাথে গেট সামলাচ্ছে আবদুল মালেক। গত কালকের সেই কঠোর আদেশের পর আজ সকাল থেকে মালেক একটানা ডিউটিতে রয়েছে। তার মানে পরিষ্কার—পুরান ঢাকার সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটে ইতি এখন সম্পূর্ণ একা।

আলতাফ সাহেবের বুকের ভেতরটা একটা তীব্র উল্লাসে কেঁপে উঠল। তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যস্ত ছকবাঁধা জীবন, কর্পোরেট নিয়মকানুন—সবকিছু আজ এই একটিমাত্র আকর্ষণের সামনে তুচ্ছ হয়ে গেছে। তিনি আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারলেন না। নিজের টেবিলে রাখা স্যুট কোটটা কাঁধে জড়িয়ে, গাড়ির চাবিটা পকেটে পুরে তিনি এক প্রকার দ্রুত পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে লিফটে চেপে নিচে নেমে এলেন।

বেসমেন্ট গ্যারেজে এসে নিজের প্রিমিয়াম সেডান গাড়িটার ড্রাইভিং সিটে বসলেন তিনি। ইঞ্জিন স্টার্ট নেওয়ার সাথে সাথে এসি-র ঠান্ডা হাওয়া তাঁর তপ্ত শরীরকে শীতল করে দিল। তিনি গাড়িটাকে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে গ্যারেজ থেকে বের করে পুরান ঢাকার সেই চেনা গলিটার দিকে ছুটিয়ে দিলেন। তাঁর মাথার মধ্যে কেবল একটাই চিন্তা—যেকোনো মূল্যে ইতির সান্নিধ্য তাঁকে পেতেই হবে। মালেক সালাম দিতে গিয়ে দেখলো আলতাফ সাহেব ঝড়ের বেগে কোথায় যেন বের হচ্ছেন।

-----

আধঘণ্টা পর গাড়িটা সেই পুরোনো তিনতলা বিল্ডিংয়ের নিচে এসে থামল। আলতাফ সাহেব গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত তিন তলায় উঠে এলেন। তাঁর পরনে আজও সেই নিখুঁত স্যুট, তবে চুলে সামান্য অগোছালো ভাব, যা তাঁর ভেতরের অস্থিরতাকে প্রকাশ করছিল।

তিনি মালেকের ফ্ল্যাটের কাঠের দরজার সামনে এসে পৌঁছালেন এবং অত্যন্ত আলতো করে দুবার কড়া নাড়লেন—*কটকটকট*।

ভিতর থেকে জুতোর মৃদু আওয়াজ এল, তারপর দরজাটা একটু ফাঁক হলো। দরজা খুলে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইতি যখন দেখল বাইরে স্বয়ং কোম্পানির চেয়ারম্যান আলতাফ সিরাজ চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন, তখন সে একটু অবাক হলো।

ইতি আজও খোলামেলা ব্লাউজে ছিল। সে তড়িঘড়ি করে নিজেকে সামলে নিয়ে অত্যন্ত মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে মাথা নিচু করে বলল, "আসসালামু আলাইকুম স্যার! আপনি... আপনি এই সময়ে আবার একা একা...?"

কিন্তু ইতি তার বাক্যটি পুরোপুরি শেষ করার সুযোগ পেল না। আলতাফ সাহেব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তাঁর ভেতরের সমস্ত সংযম ও প্রহর ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। তিনি দরজার ফাঁক গলে এক ঝটকায় ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন এবং কোনো কিছু চিন্তা না করেই নিজের দুই হাত বাড়িয়ে ইতিকে শক্ত করে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন!

ইতি এই আকস্মিক ও বড্ড সাহসী আচরণে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। সে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না যে একজন নামকরা শিল্পপতি তাঁর নিজের গার্ডের বাসায় এসে এমন কাণ্ড ঘটিয়ে বসবেন। ইতির ফর্সা মুখাবয়ব ভয়ে ও লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে প্রথমে সামান্য কেঁপে উঠল এবং নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য একটু ধাক্কা দিতে চাইল।

"স্যার... ছাড়ুন! কী করছেন এসব? কেউ দেখে ফেললে কী হবে!" ইতি ফিসফিস করে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল।

আলতাফ সাহেব ইতির চুলে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে অত্যন্ত কাতর ও ভারী গলায় ফিসফিস করে বললেন, "কাউকে দেখতে হবে না, ইতি। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। সারারাত তোমার কথা ভেবে আমার ঘুম হয়নি। শুধু মনে হচ্ছিল কখন তোমার কাছে ছুটে আসি।"

----

ইতি বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে আলতাফ সাহেবের মাথা পুরোপুরি গরম হয়ে আছে। তাঁকে এভাবে জেদ ধরে রাখলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাছাড়া, সে নিজেই তো গত কয়েকদিনে এই মানুষের কাছ থেকে প্রচুর সুযোগ-সুবিধা ও মনোযোগ পাচ্ছে।

তাই সে নিজেকে একটু আলগা করে অত্যন্ত চতুর ও ঠান্ডা মাথায় আলতাফ সাহেবের বুক থেকে নিজের শরীরটা ছাড়িয়ে নিল। সে মুচকি হেসে অত্যন্ত নরম সুরে আলতাফ সাহেবের বাহু ধরে বলল, "স্যার, প্লিজ... এভাবে পাগল হলে তো চলবে না। একটু শান্ত হোন। দরজাটা এখনো খোলা আছে, কেউ যদি গলিতে আসা-যাওয়া করে দেখে ফেলে, তবে তো আস্ত রাখবে না আমাদের! আসুন, সোফায় গিয়ে বসুন।"

ইতি খুব স্নেহের সাথে আলতাফ সাহেবকে টেনে এনে সেই পুরোনো সোফায় বসালাল। আলতাফ সাহেব ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত দৃষ্টিতে ইতির দিকে তাকিয়ে সোফায় বসে পড়লেন। ইতি নিজে তাঁর ঠিক পাশেই বসল।

সোফায় বসার পর আলতাফ সাহেব আর একটুও সময় নষ্ট করলেন না। তিনি ইতির হাত দুটো নিজের মুঠোয় পুরে দিয়ে একরকম মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করে বসলেন, "বলো ইতি... গতকাল যা বলেছিলাম, বন্ধুত্বের প্রস্তাবের বিষয়ে তোমার সিদ্ধান্ত কী? তুমি কি ভেবে দেখেছ? আমাকে আর কত অপেক্ষায় রাখবে?"

ইতি তখন একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করল। সে তার মুখটা সামান্য ফুলিয়ে, ভুরু কুঁচকে এক চমৎকার কপট রাগ দেখাল। সে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে অভিমানের সুরে বলল, "বন্ধুত্বের কথা বলছেন, স্যার? আপনার ওপর আমার প্রচণ্ড রাগ হয়েছে! আপনি যে গতকাল আমার স্বামীর ওপর এত বড় অন্যায় করলেন, ওকে বিনা কারণে ডেকে পাঠিয়ে অতগুলো মানুষের সামনে অপমান করলেন—সেটার খবর কি আপনার আছে?"

আলতাফ সাহেব একটু অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন, "মালেককে বকেছি বলে তোমার এত রাগ হয়েছে? সে তো অফিসের সামান্য একটা ভুল করেছিল..."

"ভুল কিসের ভুল!" ইতি বাধা দিয়ে একটু ঝাঁঝালো অথচ মিষ্টি গলায় বলল, "ও তো কোনো ভুলই করেনি! আপনি ইচ্ছে করে ওর ওপর রাগ ঝেড়েছেন, তাই না? আর কী সব নোংরা কথা বলেছেন আমাকে নিয়ে! আমি।নাকি।আপনাকে আমার স্তন দেখিয়ে বেড়াই? আমার স্বামী হিসেবে ও তো আমার কাছে এসব শুনে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। আপনি কেন ওর ওপর এভাবে খড়্গহস্ত হলেন?"

-----

আলতাফ সাহেব এবার একটা বাঁকা ও রহস্যময় হাসি দিলেন। তিনি ইতির আরও একটু কাছে ঘেঁষে বসে অত্যন্ত ধীর ও ফিসফিসে গলায় স্বীকার করে নিলেন সেই নির্মম সত্যটি।

"হ্যাঁ, ইতি... আমি ইচ্ছে করেই করেছি," আলতাফ সাহেব কোনো রাখঢাক না করে স্বীকার করলেন। "আমি জানি মালেক সারাদিন গেটে ডিউটিতে থাকলে তুমি এই ফ্ল্যাটে একা থাকো। আর আমার মন সবসময় তোমার কাছেই ছুটে আসে। আমি তো সহ্য করতে পারি না যে আমার মনের মানুষটা একটা সাধারণ গার্ডের সাথে সারাক্ষণ আটকে থাকবে। আমি তো চাই মালেক বাড়ি থেকে দূরে থাকুক, অফিসে পড়ে থাকুক, যাতে আমি সুযোগ পেয়ে তোমার কাছে একা আসতে পারি, তোমার সান্নিধ্য পেতে পারি।"

কথাটা শোনার পর ইতির বুকটা কে যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই প্রভাবশালী মানুষটি কেবল তার লাভের জন্য তার স্বামীর জীবনটাকে কীভাবে নিজের হাতের পুতুলের মতো নাচাচ্ছেন। কিন্তু একই সাথে, একজন নারীর অবচেতন মন ভেতরে ভেতরে এক অদ্ভুত অহংকার ও রোমাঞ্চ অনুভব করল—যে দেশের এত বড় একজন কোটিপতি পুরুষ কেবল তার টানেই এত বড় ষড়যন্ত্র করতে পারে!

ইতির গাল দুটো লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে উঠল। সে চোখ নিচু করে শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে ফিসফিস করে বলল, "আপনি সত্যিই খুব খারাপ মানুষ, স্যার! নিজের স্বার্থের জন্য একটা নিরীহ মানুষের জীবন নিয়ে এভাবে খেলা করছেন... ছিঃ!"

আলতাফ সাহেব ইতির চিবুকটা খুব আলতো করে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বললেন, "খারাপ বলো আর যা-ই বলো, ইতি—তোমার জন্য এই পৃথিবীর যেকোনো খারাপ কাজ করতে আমি প্রস্তুত। বলো, আমার বন্ধুত্বের প্রস্তাব কি গ্রহণ করলে?"

ইতি আর না করতে পারল না। সে চোখের কোণে এক চিলতে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আপনার এই জেদের কাছে তো হার মানতেই হয়, স্যার। আচ্ছা... মেনে নিলাম আপনার বন্ধুত্ব।"

-----

আলতাফ সাহেব ইতির মুখ থেকে এই স্বীকৃতি শোনার পর যেন স্বর্গের রাজ্য জয় করে ফেললেন। তাঁর মুখে এক অনাবিল তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তিনি সোজা হয়ে বসে বললেন, "ধন্যবাদ, ইতি! আমার এই জয় তোমার কাছে অনেক দামি। আর আজ এই খুশিতে আমরা এই ফ্ল্যাটের চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি থাকবে না। আমি তোমাকে আজ বাইরে কোথাও নিয়ে যাব।"

ইতি চমকে গিয়ে সোজা হয়ে বসল। সে একটু ভয় পেয়ে বলল, "বাইরে নিয়ে যাবেন মানে? কোথায়? এই দুপুর-বিকেলে আমি আপনার সাথে বাইরে যাব? যদি কেউ দেখে ফেলে, বিশেষ করে মালেক যদি কোনোভাবে জানতে পারে বা অফিসের কেউ যদি আমাদের একসাথে দেখে, তাহলে তো কেয়ামত হয়ে যাবে! আমি কোথাও যেতে পারব না।"

আলতাফ সাহেব আত্মবিশ্বাসের সাথে হাসলেন। "কেউ কিছু দেখবে না। আর মালেকের কথা বলছ? ও তো এখন অফিসেই আছে, গেটে ডিউটি করছে। তাছাড়া, তোমার স্বামীর অনুমতি নিয়েই আমরা বাইরে যাব, বুঝলে?"

"স্বামীর অনুমতি?" ইতি অবাক হয়ে বলল, "মালেক কি কখনো আমাকে আপনার সাথে বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেবে? ও পাগল নাকি?"

"ওকে পাগল বানানোর দায়িত্ব আমার," আলতাফ সাহেব পকেট থেকে নিজের আইফোনটা বের করলেন। "দাঁড়াও, আমি এখনই তোমার স্বামীর সাথে কথা বলছি। দেখি ও কীভাবে না বলে।"

আলতাফ সাহেব ফোনবুক থেকে মালেকের অফিশিয়াল নাম্বারটা ডায়াল করলেন এবং লাউডস্পিকার অন করে ফোনটা টেবিলে রাখলেন।

রিং হওয়ার দুই সেকেন্ডের মাথায় ওপাশ থেকে অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে ও দ্রুত কণ্ঠে মালেকের গলা ভেসে এল—
"হ্যালো! আসসালামু আলাইকুম স্যার! মালেক বলছি, গেটেই আছি স্যার। কোনো সমস্যা হয়েছে কি স্যার?"

আলতাফ সাহেব অত্যন্ত ঠান্ডা, গম্ভীর ও কর্তৃত্বপূর্ণ গলায় বললেন, "শোনো মালেক, জরুরি একটা কথা আছে। আমি এখন একটা অফিশিয়াল কাজে পুরান ঢাকার দিকে আছি। আমার সাথে একজন বিশেষ অতিথি আছেন। আমি চাচ্ছি আমার এই অতিথিকে একটু পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার খাওয়াতে এবং আশপাশের কিছু ঐতিহাসিক জায়গা ঘুরে দেখাতে। কিন্তু আমি ত ওদিকটা চিনি না।। আমি চাচ্ছি ইতিকেও আমাদের সাথে এই গাড়ি ড্রাইভ করে একটু ঘুরিয়ে আনতে। ও আমাদের কিছু ভালো খাবার রেস্টুরেন্ট দেখিয়ে দিবে। ওরও তো সারাদিন ঘরে বন্দি থেকে দমবন্ধ অবস্থা।"

ওপ্রান্তে ফোনের ওপারে থাকা মালেক তো চেয়ারম্যান সাহেবের এই অদ্ভুত কথা শুনে একেবারে আকাশ থেকে পড়ল! সে জীবনেও কল্পনা করতে পারেনি যে তার কোম্পানির চেয়ারম্যান নিজে তার স্ত্রীকে বাসা থেকে নিয়ে গিয়ে ঘুরিয়ে বেড়াবেন!

মালেক আমতা আমতা করে ভয়ে ভয়ে বলল, "স্যার... ইতিকে আপনি... মানে আমার বউকে আপনি ঘুরতে নিয়ে যাবেন? কিন্তু স্যার....... "

আলতাফ সাহেবের গলায় তখন এক চিলতে কঠোর হুমকির সুর বেজে উঠল। তিনি ঠান্ডা গলায় বললেন, "এত আমতা আমতা করছ কেন? আমি তোমাকে অর্ডার দিচ্ছি, মালেক! ইতি আমার সাথে যাবে, একটু হাওয়া বদল করবে। এতে তোমার কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। আমি কি আমার গার্ডকে ভুল বুঝতে শুরু করব?"

মালেক ভয়ের চোটে কেঁপে উঠল। সে ভাবল, চেয়ারম্যান সাহেব এমনিতেই গতকাল তার ওপর খুব রেগে আছেন, এখন যদি সে এই সামান্য বিষয়ে 'না' বলে, তবে তো সে চাকরিটাই রাখবে না, তাকে রাস্তায় বসিয়ে দেবে! তাছাড়া, চেয়ারম্যান সাহেব তো তাদের অন্নদাতা, তিনি তো আর খারাপ কিছু করবেন না।

মালেক দ্রুত দুই হাত জোড় করার ভঙ্গিতে ফোনে বলে উঠল, "না না স্যার! আমার কোনো আপত্তি নেই স্যার! আপনি যখন বলছেন, তখন অবশ্যই ইতি আপনার সাথে যেতে পারে। এতে আমার ভীষণ সৌভাগ্য হবে স্যার! আপনি ইতিকে সাবধানে নিয়ে যাবেন।"

"গুড বয়," আলতাফ সাহেব সন্তুষ্টচিত্তে বললেন। "ঠিক আছে, ডিউটি করো। রাখছি।"

তিনি কল কেটে দিয়ে ফোনের স্ক্রিনটা বন্ধ করে টেবিলে রাখলেন। তারপর ইতির দিকে তাকিয়ে বিজয়ী বীরের মতো একটা হাসি দিয়ে বললেন, "বলা বাহুল্য, তোমার স্বামী নিজে সানন্দে সম্মতি দিয়েছে। এখন আর কোনো বাধা নেই। চলো, আমার সাথে গাড়ি পর্যন্ত চলো।"

ইতি চোখ বড় বড় করে পুরো ঘটনাটা দেখল। সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল। সে দেখল, এই মানুষটির ক্ষমতার শক্তির কাছে তার স্বামী মালেক কতটা অসহায় একটা পুতুল মাত্র। ইতি আর বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ করতে পারল না। সে নিজের শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে, মাথায় একটু হাত বুলিয়ে আলতাফ সাহেবের হাত ধরে ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।

বাইরে তখন গোধূলির আলোয় এক নতুন ও নিষিদ্ধ গল্পের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে।(চলবে)
[+] 2 users Like Romzan83's post
Like Reply
#19

[Image: IMG-20260810-080757-383.png]
Like Reply
#20
Sundor update
[+] 1 user Likes Nisat's post
Like Reply




Users browsing this thread: 3 Guest(s)