Thread Rating:
  • 49 Vote(s) - 3.18 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
এইরকম চোদার বর্ণনা পড়ে আমারই তো এখন চুদতে ইচ্ছা করছে। চোখের সামনে ভাসছে যেন সবকিছু।
পাগল করে দেয়া আপডেট।
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
দুর্দান্ত আপডেট।
Like Reply
Fatafati
Like Reply
Just bapok.. Speechless.. Khub bhalo hoche.. Chalia jan
Like Reply
Update?
Like Reply
বসে আছি পথ চেয়ে......
রেগুলার আপডেট পেয়ে পেয়ে অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে।
Like Reply
ভাই, আপডেট দিয়েন। আপনি অসাধারণ লেখেন।
[+] 1 user Likes Martin Samir's post
Like Reply
ভাই আপডেট দিয়েন।আপনার দেওয়া রেগুলার গল্প পড়ে পড়ে অভ্যাস হয়ে গেছে। আপনার এই অসাধারণ লেখনী মিস করতেছি
Like Reply
আপডেটের অপেক্ষায়
Like Reply
update please



Quote:যুক্তি যেখানে শেষ হয়, অনুভূতির অরণ্য সেখান থেকেই শুরু।
Like Reply
Update please....
Like Reply
৪৭।
উদ্দাম, প্রলয়ঙ্করী এবং সমস্ত স্নায়ু-ছিঁড়ে-ফেলা মিলনের পর আমরা দুজনেই বিছানায় কিছুক্ষণ একদম রোবটের মতো বসে থাকলাম।


মানুষের শরীর বড়ই অদ্ভুত এক জৈবিক যন্ত্র। একটু আগে যে শরীরটা কামনার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল, যে মস্তিষ্কটা পৃথিবীর সমস্ত লজিক ভুলে গিয়ে কেবল মাংসের ভেতর মাংসের প্রবেশের জন্য হাহাকার করছিল— ঠিক সেই চরম বিন্দুটা বা ক্লাইম্যাক্সটা পার হয়ে যাওয়ার পর, সবকিছু কেমন যেন নিস্তব্ধ, শূন্য আর যান্ত্রিক হয়ে যায়। আমি বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছি। আমার পাশে আনিকা। দুজনেরই গায়ে এক সুতোও কাপড় নেই। আমাদের দুজনের শরীর থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, বিছানার সাদা চাদর ভিজে একাকার। আনিকার সেই অপ্সরী রূপ, উনার সেই ভরাট বক্ষদেশ, উনার সেই নিখুঁত জ্যামিতিক কোমর— সবকিছু এখন আমার চোখের সামনেই উন্মুক্ত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটু আগের সেই পাগলাটে, বন্য আকর্ষণটা এখন আর নেই।

এই চরম নিস্তব্ধতায় বসে আমার মনে হলো, আমরা মানুষেরা নিজেদেরকে যত বড় আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব বলে দাবি করি না কেন, আসলে আমরা স্রেফ কিছু কেমিক্যাল আর হরমোনের দাস। আমরা সাহিত্য রচনা করি, কবিতা লিখি, রোমান্স আর নান্দনিকতার দোহাই দিই। আমরা বলি— "আমি তোমার আত্মাকে ভালোবাসি", "তোমার চোখের দিকে তাকিলে আমি পৃথিবী ভুলে যাই।" কিন্তু দিন শেষে, এই সমস্ত কাব্যিক বুলির নিচে লুকিয়ে থাকে একটা চরম নগ্ন, আদিম এবং জৈবিক সত্য।

সেক্স বা শারীরিক মিলন শুধু একটা বায়োলজিক্যাল নিড বা জৈবিক চাহিদা ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি যতই ভালোবাসার প্রলেপ মাখান, যতই আদর, সোহাগ আর রোমান্সের চাদরে এটাকে মুড়িয়ে রাখুন না কেন— চরম মুহূর্তে পৌঁছে আপনি বুঝতে পারবেন, এখানে কোনো আত্মা নেই, কোনো কবিতা নেই। এখানে আছে শুধু দুটো মাংসপিণ্ডের ঘর্ষণ। একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায়, একটা নির্দিষ্ট ছন্দে দুটো শরীরের ঘর্ষণের ফলে স্নায়ুতন্ত্রে যে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয় এবং শেষে যে তরল স্খলনের মাধ্যমে শরীর শান্ত হয়— এর বাইরে সেক্সের আর কোনো দার্শনিক বা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা নেই।

আমি আনিকার ঘর্মাক্ত, এলিয়ে থাকা শরীরটার দিকে তাকালাম। আমার মনে হলো, একটু আগে যে নারীটিকে আমি দেবী মনে করে পূজা করছিলাম, এখন সে আমার কাছে শুধুই একটা শরীর। আর আমিও উনার কাছে শুধুই আরেকটা শরীর, যে শরীরটা উনার ভেতরের জৈবিক তৃষ্ণা মেটাতে ব্যবহৃত হয়েছে। ভালোবাসা, রোমান্স, আভিজাত্য— সব কিছু ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে। এখন অবশিষ্ট আছে শুধু ঘামের গন্ধ, ব্যবহৃত বিছানার চাদর আর এক চরম জৈবিক রিক্ততা।

হয়তো এই রিক্ততা থেকেই বাঁচতে মানুষ মিলনের পর সিগারেট ধরায়, অথবা ঘুমিয়ে পড়ে।

আমরা প্রায় দশ মিনিট এই রোবোটিক স্তব্ধতার মধ্যে বসে রইলাম।

তারপর আনিকা একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে নামলেন। উনার হাঁটার মধ্যে আগের সেই লাস্যময়ী বা বন্য ভঙ্গিটা নেই। একটা চরম ক্লান্ত, তৃপ্ত নারীর হাঁটা। "চলো রাশেদ, শাওয়ার নিয়ে নিই। শরীরটা ঘামে চ্যাটচ্যাট করছে," আনিকা বাথরুমের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বললেন।

আমিও যন্ত্রের মতো উঠে দাঁড়ালাম। আমরা দুজনে বাথরুমের রেইন-শাওয়ারের নিচে দাঁড়ালাম। ঠান্ডা পানির ধারা আমাদের শরীর বেয়ে নামতে শুরু করল। এই গোসলের ভেতর কোনো যৌনতা ছিল না। আমরা কেউ কাউকে ছুঁয়ে দেওয়ার বা আদর করার চেষ্টা করলাম না। পানি দিয়ে আমরা শুধু আমাদের শরীরের ঘাম, লালা আর কামনার চিহ্নগুলোকে ধুয়ে ড্রেনে ভাসিয়ে দিচ্ছিলাম। যেন আমরা আবার আমাদের সেই 'সভ্য' মানুষের মুখোশটা পরার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি।

শাওয়ার শেষে আমরা তোয়ালে দিয়ে গা মুছে ভিআইপি সুইটে ফিরে এলাম। কাপড় পরার পালা।

আনিকা উনার ব্যাগ থেকে সেই কালো রঙের সুতির কামিজ আর সাদা রঙের সালোয়ারটা বের করে পরে নিলেন। চুলগুলো একটা তোয়ালে দিয়ে পেঁচিয়ে মুছে, খুব সাধারণ একটা খোঁপা করে ক্লিপ দিয়ে আটকে নিলেন। চোখে সেই কালো ফ্রেমের চশমাটা আবার পরে নিলেন। মুহূর্তে উনার সেই বন্য, আদিম রূপটা উধাও হয়ে গিয়ে সেখানে আবার সেই ইন্টেলেকচুয়াল, আভিজাত্যে মোড়ানো লন্ডনপ্রবাসী নারীর চেহারা ফিরে এল।


আমিও আমার ক্যাজুয়াল গ্যাবার্ডিন প্যান্ট আর সাধারণ একটা সুতির টি-শার্ট গায়ে চাপালাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে।

লঞ্চের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। দিনের আলো পুরোপুরি নিভে গিয়ে চারপাশের নদীতে এখন একটা ঘুটঘুটে, রহস্যময় অন্ধকার নেমে এসেছে। "আর ঘণ্টা দুই-তিনের মধ্যেই হয়তো আমরা ঢাকা পৌঁছে যাব," আমি আমার ভেজা চুল মুছতে মুছতে বললাম।

আনিকা উনার ভ্যানিটি ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে বললেন, "চলো, বাইরের ডেক থেকে একটু ঘুরে আসি। ভেতরে খুব গুমোট লাগছে। একটু খোলা বাতাস দরকার।" আমরা সুইটের দরজা লক করে লঞ্চের তিন তলার খোলা ডেকে এসে দাঁড়ালাম।

সন্ধ্যার পর নদীর রূপ সম্পূর্ণ বদলে যায়। চারদিক নিকষ কালো। শুধু লঞ্চের নিজস্ব আলো আর দূরে নদীর তীরে টিমটিম করে জ্বলা দু-একটা কুপি বাতির আলো ছাড়া আর কোনো আলো নেই। আমি রেলিং ধরে দাঁড়ালাম। আনিকা আমার ঠিক পাশেই এসে দাঁড়ালেন। উনার কনুইটা আমার হাতের সাথে হালকা ছুঁয়ে আছে। আমি পকেট থেকে বেনসনের প্যাকেট বের করে দুটো সিগারেট ধরালাম। একটা আনিকার হাতে দিলাম।

আমরা দুজনেই লঞ্চের রেলিংয়ে কনুই ঠেকিয়ে, হাতে সিগারেট আর লঞ্চের ক্যানটিন থেকে আনানো দুই কাপ গরম চা নিয়ে অন্ধকার নদীর দিকে তাকিয়ে রইলাম। লঞ্চটা দুরন্ত গতিতে নদীর কালো, গভীর জল চিরে ঢাকার দিকে ছুটে যাচ্ছে। বিশাল ইঞ্জিনের সেই একটানা, গম্ভীর 'ভুমমমম' শব্দটা পুরো ডেকে একটা অদ্ভুত কম্পন তৈরি করছে।

আমি নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার অনুবাদক এবং সাহিত্যিক মস্তিষ্কটা আবার জেগে উঠল। একটু আগের সেই রোবোটিক শূন্যতা কেটে গিয়ে সেখানে আবার মেটাফোর বা রূপকের খেলা শুরু হলো।

লঞ্চের এই ছুটে চলাটা আমার কাছে এক নিখুঁত, আদিম যৌনতার রূপক বলে মনে হতে লাগল। এই যে বিশাল, ইস্পাতের তৈরি লঞ্চটার শক্ত, তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ— এটা যেন একটা পুরুষালি অহংকার। সে প্রবল শক্তিতে, এক বুনো আক্রোশে নদীর সেই কালো, রহস্যময়, কুমারী বুকটাকে চিরে ভেতরে প্রবেশ করছে। নদীটা যেন এক অসীম, শান্ত নারী। সে লঞ্চের এই শক্ত, তীক্ষ্ণ আঘাতকে কোনো বাধা দিচ্ছে না, বরং দুপাশে সরে গিয়ে তাকে নিজের গভীরে পথ করে দিচ্ছে।

লঞ্চের অগ্রভাগ যখন নদীর পানিকে চিরে সামনে এগোচ্ছে, তখন দুই পাশে প্রবল বেগে সাদা ফেনা ছিটকে উঠছে। ওই সাদা ফেনাগুলো দেখে আমার মনে হলো, চরম ঘর্ষণ আর মিলনের পর শরীর থেকে ছিটকে বের হওয়া সেই কামনার তরলের মতোই ওরা নদীর বুকে আছড়ে পড়ছে। পানির 'ছলাৎ... ছলাৎ...' শব্দটা এই নৈশ নিস্তব্ধতায় ঠিক সেই ভেজা, পিচ্ছিল শব্দের মতো শোনাচ্ছে, যা একটু আগে আমাদের বিছানায় তৈরি হয়েছিল।

আর এই যে লঞ্চের ইঞ্জিনের একটানা, ছন্দময় কম্পন! এই কম্পনটা তো কোনো সাধারণ যান্ত্রিক শব্দ নয়। এটা যেন চরম উত্তেজনার মুহূর্তে একটা পুরুষ এবং নারীর বুকের ভেতর চলা হৃৎপিণ্ডের সেই পাগলাটে ধুকপুকানি। নদীটা লঞ্চটাকে নিজের বুকে ধারণ করে তরঙ্গের পর তরঙ্গ তৈরি করছে, আর লঞ্চটা তার সমস্ত ইঞ্জিন-পাওয়ার দিয়ে নদীর সেই গভীরতায় নিজেকে বারবার আছড়ে ফেলছে।

কী অদ্ভুত এক মিল! প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির মাঝেই যেন এই আদিম সঙ্গমের চিত্র লুকিয়ে আছে। শুধু দেখার মতো চোখ থাকতে হয়। "কী ভাবছ এত মন দিয়ে?" আনিকা হঠাৎ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন।

"ভাবছি, প্রকৃতিও আমাদের মতো," আমি নদীর দিকে ইশারা করে, খুব দার্শনিক একটা হাসি দিয়ে বললাম। "দেখো, লঞ্চটা কীভাবে নদীর বুক চিরে ভেতরে ঢুকছে। আর নদীটা কীভাবে দুপাশে সরে গিয়ে তাকে জায়গা করে দিচ্ছে। ঠিক যেন একটু আগের তুমি আর আমি।"

আনিকা আমার রূপকটা বুঝতে পেরে একটা শব্দহীন, মিষ্টি হাসি হাসলেন। উনার চোখ দুটো অন্ধকারের মধ্যেও চকচক করে উঠল। "তোমার মাথার ভেতর সারাক্ষণ এইসব অদ্ভুত, দুষ্টু ফিলোসফি ঘোরে, তাই না রাশেদ?" আনিকা উনার কাঁধটা আমার কাঁধের সাথে আরেকটু শক্ত করে ঠেকিয়ে বললেন। "তবে হ্যাঁ, তোমার মেটাফোরটা খুব সুন্দর। আসলেই, নদীর এই কালো পানির মতো আমার ভেতরটাও তোমার এই বন্য আঘাতের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকে।"

আমরা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি, আর মাঝে মাঝে টুকটাক কথা বলছি। লন্ডনের কথা, আনিকার উপন্যাসের কথা, আমার অনুবাদের কথা। মাঝে মাঝে নদীর কনকনে ঠান্ডা বাতাস এসে আনিকার খোলা চুলগুলোকে আমার মুখের ওপর আছড়ে দিচ্ছিল। আমি সেই চুলের সুবাসে আবার যেন একটা নতুন নেশায় ডুবে যাচ্ছিলাম।
এভাবেই চা, সিগারেট, আর অলস আড্ডায় কেটে গেল প্রায় আড়াই ঘণ্টা।

রাত যখন ঠিক দশটা বাজে, তখন লঞ্চের সাইরেনটা একটা দীর্ঘ, তীক্ষ্ণ শব্দ করে বেজে উঠল। দূরে ঢাকা শহরের আলোর রোশনাই চোখে পড়তে শুরু করেছে। বুড়িগঙ্গার দূষিত, পচা গন্ধটা নাকে এসে জানান দিল যে, আমরা আমাদের সেই যান্ত্রিক, দমবন্ধ করা পৃথিবীতে আবার ফিরে এসেছি।

লঞ্চ সদরঘাটে এসে ভিড়ল।

ভিড় ঠেলে, মানুষের ধাক্কা খেয়ে আমরা যখন লঞ্চ থেকে নেমে মেইন রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম, তখন রাত সোয়া দশটার কাছাকাছি। আমি পকেট থেকে ফোন বের করে একটা উবার ডাকলাম। গাড়িতে উঠে বসার পর আমি আনিকার দিকে ফিরে বললাম, "উবারের ডেস্টিনেশন তো তোমার ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের অ্যাড্রেস দিলাম। আমি তোমাকে তোমার বিল্ডিংয়ের গেটে নামিয়ে দিয়ে, এই গাড়ি নিয়েই সোজা মিরপুরে আমার মেসে চলে যাব। আজ রাতটা আমার নিজের বিছানায় ঘুমানো দরকার।"

কথাটা শোনার সাথে সাথেই আনিকার মুখের সেই শান্ত, তৃপ্ত ভাবটা মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেল। উনার ভ্রু কুঁচকে গেল, আর চোখের দৃষ্টিতে একটা জেদি, একরোখা ভাব ফুটে উঠল। "মেসে যাবে মানে?" আনিকা খুব তীক্ষ্ণ, কড়া গলায় বললেন। "তুমি আমার ফ্ল্যাটে যাবে। তুমি আমার সাথেই থাকবে।"

আমি একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই নারী আবার উনার সেই মালিকানা আর জেদের জায়গায় ফিরে গেছেন। "আনিকা, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো," আমি উনার হাতটা ধরে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। "বেলাল সাহেব নিখোঁজ। তুমি গতকাল থানায় গিয়েছিলে। পুলিশ হয়তো তোমার ফ্ল্যাটের আশেপাশে সাদা পোশাকে নজর রাখছে। আজ মানববন্ধনে তুমি ছিলে, মিডিয়ার লোকজন হয়তো তোমার বাসার সামনে ঘুরঘুর করতে পারে। এই অবস্থায় আমি যদি তোমার সাথে তোমার ফ্ল্যাটে রাত কাটাই, আর কেউ যদি দেখে ফেলে— তুমি বুঝতে পারছ কী কেলেঙ্কারি হবে? পুরো ঢাকা শহরে ঢিঢি পড়ে যাবে! আমি চাই না এই নিখোঁজের ঝামেলার মধ্যে আমরা কোনো নতুন স্ক্যান্ডাল তৈরি করি।"

আমার লজিকগুলো ছিল একদম সলিড, প্র্যাকটিক্যাল। যেকোনো সাধারণ মানুষ এই যুক্তি মেনে নিত। কিন্তু আনিকা নাওহার তো সাধারণ মানুষ নন। "চুলায় যাক তোমার পুলিশ! আর চুলায় যাক সমাজের লোকজন!" আনিকা উনার হাতটা আমার হাত থেকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে হিসহিস করে উঠলেন। "আমি কার সাথে আমার ফ্ল্যাটে থাকব, সেটা দেখার অধিকার পুলিশেরও নেই, ওই সস্তা মিডিয়ারও নেই। আমি একজন স্বাধীন নারী। আমার ফ্ল্যাট, আমার জীবন। তুমি আমার ফ্ল্যাটে যাবে, দ্যাটস ইট!"

"কিন্তু আনিকা..."

"কোনো কিন্তু না রাশেদ!" আনিকা আমাকে থামিয়ে দিলেন। উনার গলার স্বর এখন আদেশের মতো। "যতদিন বেলালের এই নিখোঁজের কেসটা সলভ না হচ্ছে, যতদিন এই পুলিশ আর মিডিয়ার ঝামেলা শেষ না হচ্ছে, আমি একা একা বাইরে যেতে পারব না। আমাকে ঘরের ভেতর বন্দি হয়ে থাকতে হবে। আর এই টেনশনের সময়, এই বন্দি জীবনে আমি একা ওই বিশাল ফ্ল্যাটে থাকতে পারব না। তুমি আমার সাথে থাকবে। আমাকে সঙ্গ দেবে। আমি তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাতে চাই।"

উনার এই জেদ আর অসহায়ত্বের অদ্ভুত সংমিশ্রণ আমাকে আবার দুর্বল করে দিল। আমি জানি, আমি যদি এখন জোর করে মেসে চলে যাই, উনি হয়তো সারা রাত আমাকে ফোন করে পাগল করে দেবেন, অথবা কাল সকালেই উবার নিয়ে মিরপুরের মেসে এসে হাজির হবেন।

আমি আর তর্ক বাড়ালাম না। একজন অনুবাদক হিসেবে আমি জানি, যুক্তির চেয়ে ইমোশন সবসময় শক্তিশালী। আমি উনার জেদের কাছে মাথা নত করলাম। "ঠিক আছে। আমি থাকব," আমি হার-মানা গলায় বললাম।

আনিকার মুখে আবার সেই বিজয়ী, স্নিগ্ধ হাসি ফিরে এল। উনি আমার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলেন।

রাত এগারোটার দিকে আমাদের উবার এসে ধানমন্ডির সেই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের মেইন গেটে থামল।

আমি আর আনিকা গাড়ি থেকে নামলাম। গেটটা বন্ধ ছিল। পকেট গেট দিয়ে আমাদের ঢুকতে হবে। আমি যখন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছি, দেখলাম দারোয়ান মফিজ উনার ডিউটি রুমের সামনে একটা টুল পেতে বসে আছেন। উনার চেহারায় একটা অদ্ভুত, থমথমে ভাব।

আনিকা উনার ব্যাগ থেকে চাবি বের করতে করতে মফিজের দিকে তাকিয়ে খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন, "কী মফিজ, সব ঠিকঠাক তো? আজকে তো আর পুলিশ-টুলিশ আসেনি?"

মফিজ খুব নার্ভাস ভঙ্গিতে টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। উনার চোখদুটো একটু বড় বড় হয়ে গেল। উনি একবার আনিকার দিকে, আরেকবার আমার দিকে আড়চোখে তাকালেন।

"ম্যাডাম... একটা ঝামেলা তো হইয়া গেছে," মফিজ খুব নিচু, ফিসফিস করা গলায়, এদিক-ওদিক তাকিয়ে বললেন।

আনিকা থমকে দাঁড়ালেন। উনার ভ্রু কুঁচকে গেল। "ঝামেলা? কীসের ঝামেলা?"

আমিও সতর্ক হয়ে গেলাম। আমার বুকের ভেতর সেই পুরোনো ভয়টা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।

মফিজ একটু আমতা-আমতা করে, গলাটা আরও খাদে নামিয়ে বলল, "ম্যাডাম, আইজকা বিকেলের দিকে একটা সিভিল গাড়িতে কইরা কা দুই-তিনজন পুলিশ আইছিল। হেরা আইসা সোজা পাঁচ তলার ওই ফ্ল্যাটে গেছে..."

"পাঁচ তলার ফ্ল্যাট? কেন?" আনিকার গলার স্বরটা একটু তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।

"হ ম্যাডাম। ওই যে... ওই যে ময়না আছে না? পাঁচ তলার ভাবির কাজের মাইয়া... পুলিশ আইসা ওই ময়নারে অ্যারেস্ট কইরা নিয়া গেছে!"

কথাটা শোনার সাথে সাথেই আমার মনে হলো, বিল্ডিংয়ের ষোলো তলার ছাদটা যেন ভেঙে আমার মাথার ওপর পড়ল। ময়নাকে অ্যারেস্ট করেছে!

ময়না! সেই কাজের মেয়ে, যার সাথে বেলাল সাহেবের অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের কথা আনিকা আমাকে রবীন্দ্র সরোবরের পাড়ে বসে বলেছিলেন। যে মেয়েটা বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার পেছনের অনেক অন্ধকার রহস্য জানে। সেই ময়নাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে!
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে আনিকার দিকে তাকালাম।

আনিকার মুখের রঙ নিমেষের মধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। উনার চোখের মণি দুটো স্থির। উনি শক্ত করে উনার ভ্যানিটি ব্যাগের চেইনটা খামচে ধরে আছেন। "ময়নাকে ধরে নিয়ে গেছে?" আনিকা কোনোমতে শব্দগুলো উচ্চারণ করলেন।

"জি ম্যাডাম," মফিজ মাথা নাড়ল। "পুলিশ যাওয়ার সময় আমারে বইলা গেছে— 'আনিকা ম্যাডাম ঢাকায় ফিরলেই যেন সাথে সাথে থানায় যোগাযোগ করে। ওসি স্যার উনার লগে কথা কইব।' পুলিশ কিন্তু খুব কড়া ধমক দিয়া গেছে ম্যাডাম।"

আমার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসতে শুরু করেছে। পুলিশ ময়নাকে গ্রেপ্তার করেছে মানে, তারা বেলাল সাহেবের সেই অন্ধকার চরিত্রের কথা জেনে গেছে। আর ময়নাকে জেরা করলে তো সে সব গরগর করে উগরে দেবে। সে হয়তো এ-ও বলে দেবে যে আনিকা ম্যাডাম সব জানতেন!

"আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি দেখছি ব্যাপারটা," আনিকা খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে, একটা কৃত্রিম শান্ত গলা তৈরি করে মফিজকে বললেন।

তারপর উনি আমার হাত ধরে প্রায় হ্যাঁচকা টান দিয়ে লিফটের দিকে নিয়ে গেলেন। লিফটে ওঠার পর আমরা কেউ কোনো কথা বললাম না। লিফটের যান্ত্রিক শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, আনিকার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। উনার চোয়াল শক্ত।

সাত তলায় লিফট থামল।

আনিকা চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকলেন। আমিও উনার পেছন পেছন ঢুকলাম। দরজাটা বন্ধ করে লক করে দিলাম। ফ্ল্যাটের ভেতরটা নিস্তব্ধ। আনিকা ড্রয়িংরুমের সোফায় উনার ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেললেন। তারপর বাথরুমে ঢুকে চোখেমুখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হলেন। আমি ড্রয়িংরুমের একটা চেয়ারে বসে পাথরের মূর্তির মতো অপেক্ষা করছি।

মিনিট পাঁচেক পর আনিকা ড্রয়িংরুমে এলেন। উনার মুখটা ভেজা। উনার চোখ দুটো এখন আর ভয় পাওয়া হরিণীর মতো নেই, সেখানে এখন জ্বলছে একটা ঠান্ডা, হিসেবি, কর্পোরেট সিইও-র কাঠিন্য। 
উনি সোফায় বসে উনার ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোনটা বের করলেন।

তারপর আমার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে, কোনো রকম ভণিতা বা দ্বিধা ছাড়া, উনার কন্টাক্ট লিস্ট থেকে একটা নাম্বার ডায়াল করলেন।
আমি রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছি। ফোন রিং হচ্ছে। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।

"হ্যালো, ওসি শাহাদাত সাহেব?" আনিকা অত্যন্ত কনফিডেন্ট, স্থির এবং একটু কড়া গলায় বললেন। "আমি আনিকা নাওহার বলছি। হ্যাঁ... আমি মাত্র ঢাকায় ফিরলাম। আমার বিল্ডিংয়ের গার্ড আমাকে বলল যে আপনারা নাকি ময়না নামের একটা মেয়েকে অ্যারেস্ট করেছেন, আর আমাকে যোগাযোগ করতে বলেছেন। হোয়াট ইজ গোয়িং অন ওসি সাহেব? আমার স্বামীর নিখোঁজের সাথে একটা সামান্য কাজের মেয়ের কী সম্পর্ক? আপনারা কি আসল কালপ্রিটদের বাদ দিয়ে এখন কাজের মেয়ে ধরে টানাটানি করছেন?"

আমি চেয়ারে বসে আক্ষরিক অর্থেই বোবা হয়ে গেলাম। কী ভয়ংকর কনফিডেন্স! কী নিখুঁত অভিনয়! পুলিশকে ভয় পাওয়ার বদলে, উনি উল্টো পুলিশকেই আক্রমণ করছেন! আমি আমার চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, আনিকা নাওহার নামের এই মায়াবিনী নারী কীভাবে আইনের রক্ষকদের সাথে এক চরম মানসিক দাবার চাল চালতে শুরু করেছেন। আর আমি, রাশেদ আহমেদ, সেই দাবার বোর্ডের এক কোণায় বসে আমার নিজের জীবনের ধ্বংস কিংবা মুক্তির প্রহর গুনছি।

Like Reply
দারুণ
Like Reply
সেই সেই!
Like Reply
সাসপেন্স...
Like Reply
darun



Quote:যুক্তি যেখানে শেষ হয়, অনুভূতির অরণ্য সেখান থেকেই শুরু।
Like Reply
Just great update... Outstanding.. Khub bhalo hoche.. Chalia jan..
Like Reply
(12-08-2026, 01:09 AM)Orbachin Wrote:
৪৭।
 আমি, রাশেদ আহমেদ, সেই দাবার বোর্ডের এক কোণায় বসে আমার নিজের জীবনের ধ্বংস কিংবা মুক্তির প্রহর গুনছি।


Joss.... horseride horseride horseride sex sex sex
"Dare to dive deep into the adult realm!"
[size=medium]



Like Reply
৪৮।

টেলিফোনে কথা বলা শেষ করে আনিকা ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।



উনার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, একটু আগে যিনি এক দাপুটে, কর্পোরেট সিইও-র মতো গলা উঁচিয়ে কথা বলছিলেন, উনার সেই আত্মবিশ্বাসের বেলুনটা যেন এক সেকেন্ডে চুপসে গেছে। উনার কাঁধ দুটো ঝুলে পড়েছে, চোখের দৃষ্টিতে একটা শূন্য, হতভম্ব ভাব।

"কী হলো আনিকা? কী বললেন ওসি সাহেব?" আমি সোফা থেকে একটু উনার দিকে ঝুঁকে গিয়ে রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলাম।

আনিকা একটা ঢোঁক গিললেন। উনার গলা শুকিয়ে গেছে। উনি ফিসফিস করে বললেন, "পুলিশ কেস সলভ করে ফেলেছে রাশেদ। ওরা আসল কালপ্রিটদের ধরেছে।"

আমার বুকের ভেতর থেকে একটা বিশাল পাথর যেন ধপ করে নেমে গেল। যাক! অন্তত পুলিশের খাতায় আমি বা আনিকা আর সাসপেক্ট লিস্টে নেই। কিন্তু সেই স্বস্তির পরপরই একটা অজানা আতঙ্ক এসে ভর করল।

"কালপ্রিট কারা? বেলাল সাহেব কোথায়? উনাকে কি পেয়েছে?" আনিকা মাথা নাড়লেন। "ফোনে কিছু ডিটেইলস বলেননি ওসি সাহেব। 

উনি বললেন
, কাল দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে পুলিশ একটা বড় প্রেস ব্রিফিং করবে। তার আগে, কাল সকাল নয়টায় উনি আমাকে থানায় যেতে বলেছেন। উনি আমাকে সামনাসামনি বসে সব বুঝিয়ে বলবেন। আর... আর উনি বললেন, আমি চাইলে কালকের ওই প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত থাকতে পারি।"

"প্রেস ব্রিফিং!" আমি প্রায় আঁতকে উঠলাম।

বাংলাদেশের পুলিশ যখন কোনো চাঞ্চল্যকর মামলার পর প্রেস ব্রিফিং করে, তখন সেখানে কী হয়, তা আমি একজন নিউজ ডেস্কের কর্মী হিসেবে খুব ভালো করেই জানি। ডজন ডজন টিভির ক্যামেরা, বুম হাতে সাংবাদিকরা হামলে পড়ে। একটা বিশাল টেবিলের পেছনে পুলিশ কর্মকর্তারা বসেন, আর সামনে আসামিদের হেলমেট পরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। আর যদি ভিকটিমের পরিবারের কেউ সেখানে থাকে, তবে সাংবাদিকরা এমন সব অবান্তর, ব্যক্তিগত আর নোংরা প্রশ্ন করা শুরু করে যে মানুষটার মান-সম্মান ধুলোয় মিশে যায়।

"আনিকা, একদম না!" আমি খুব শক্ত গলায়, প্রায় ধমক দিয়ে বললাম। 

"তুমি কোনোভাবেই ওই প্রেস ব্রিফিংয়ের সামনে যাবে না। মিডিয়ার সামনে যাওয়া মানে নিজেকে একটা সস্তা তামাশার পাত্র বানানো। কাল সকালের পত্রিকায় আর টিভির স্ক্রলে তোমার মুখ ভাসবে। হেডলাইন হবে— 'নিখোঁজ ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রীর কান্নায় ভারী হলো মিডিয়া সেন্টার'। তুমি কি চাও তোমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে মানুষ চা খেতে খেতে জাজমেন্ট পাস করুক?"

আনিকা অসহায় চোখে আমার দিকে তাকালেন। "তাহলে কী করব?"

"তুমি কাল সকালে ঠিক নয়টায় থানায় যাবে। ওসি সাহেবের রুমে বসে উনার কাছ থেকে বিস্তারিত জানবে। কেসটা কী, বেলাল সাহেবের কী হয়েছে, কারা এর পেছনে— সব ইনফরমেশন কালেক্ট করবে। তারপর পুলিশ যখন মিডিয়ার সামনে যাবে, তুমি তার আগেই থানার পেছনের গেট দিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে আসবে। এরপর কী করতে হবে, সেটা আমরা ঠান্ডা মাথায় বসে ঠিক করব। কিন্তু ক্যামেরার সামনে এক মুহূর্তের জন্যও না।"

আমার এই কনফিডেন্ট, গোছানো এবং প্রটেক্টিভ কথাগুলো শুনে আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় হেলান দিলেন। উনি শুধু বললেন, "ঠিক আছে। তুমি যা ভালো বোঝো।"

সেই রাতটা আমাদের কাটল এক অদ্ভুত, দমবন্ধ করা মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে। মানুষের শরীর আর মন যে কতটা অদ্ভুতভাবে একে অপরের সাথে কানেক্টেড, তা আমি সেই রাতে বুঝতে পারলাম। এই তো গতকাল রাতেও আমরা লঞ্চের কেবিনে একে অপরের শরীরটাকে একটা ক্ষুধার্ত পশুর মতো ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছিলাম। আর আজ? আজ এই বিশাল ফ্ল্যাটের নরম বিছানায় আমরা দুজন পাশাপাশি শুয়ে আছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের মাঝখানে যেন একটা অদৃশ্য, হিমশীতল দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে।

সেক্স তো বহুদূর, আমাদের মধ্যে সামান্যতম কোনো শারীরিক স্পর্শও হলো না।

আমরা দুজন ছাদের দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছি। ঘরের এসি চলছে বাইশ ডিগ্রিতে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি একটা বদ্ধ ওভেনের ভেতর আটকে আছি। আমার মাথার ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন— বেলাল সাহেবের কী হয়েছে? পুলিশ কাকে ধরেছে?

মাঝে মাঝে আনিকা উসখুস করছিলেন। উনিও ঘুমাতে পারছিলেন না। এই চরম টেনশন, ভয়, আর 'কী হয়েছে'— এই সাসপেন্সটা আমাদের দুজনের স্নায়ুকে আক্ষরিক অর্থেই ব্লেন্ডারে দিয়ে ঘুরিয়ে দিচ্ছিল।

ভোর হলো। আমরা কেউই ঘুমাইনি।

সকাল সাতটায় আমরা উঠে পড়লাম। আনিকা একটা খুব সাধারণ, ছাই রঙের সালোয়ার কামিজ পরলেন। চোখে কোনো কাজল বা মেকআপ নেই। নির্ঘুম রাতের কারণে উনার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, যা উনাকে সত্যিই একজন শোকাহত স্ত্রীর পারফেক্ট লুক দিচ্ছিল। আমিও একটা সাধারণ শার্ট আর প্যান্ট পরে নিলাম।

সকাল আটটা চল্লিশ মিনিটে আমরা একটা উবার নিয়ে কলাবাগান থানায় পৌঁছালাম। থানায় ঢোকার পর দেখলাম, পরিবেশটা অন্য দিনের চেয়ে একটু ভিন্ন। বেশ কিছু পুলিশ সদস্য দৌড়াদৌড়ি করছে। ডিউটি অফিসার আনিকাকে দেখেই চিনে ফেললেন।

"ম্যাডাম, আপনি আসছেন? ওসি স্যার তো আপনার জইন্যই ওয়েট করতাছে। সোজা দোতলায় চইলা যান," ডিউটি অফিসার বেশ সম্মানের সাথেই বললেন।

আমাকে দেখেও কয়েকজন পুলিশ সদস্য মাথা নাড়ল। আমি যে ঢাকা পেপারসের আশিক ভাইয়ের লোক, সেটা থানার অনেকেই ইতিমধ্যে জেনে গেছে। আমরা দোতলায় উঠে ওসি শাহাদাত সাহেবের রুমের সামনে গেলাম। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম।

ওসি শাহাদাত সাহেবের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। উনার চেহারাটা খুব রাশভারী, গোঁফওয়ালা, কিন্তু চোখের দৃষ্টিটা খুব তীক্ষ্ণ। উনি বিশাল একটা টেবিলের ওপাশে বসে ছিলেন। আমাদের দেখে উনি উঠে দাঁড়ালেন।

"আসুন ম্যাডাম। বসুন," ওসি সাহেব সামনের দুটো চেয়ার দেখিয়ে বললেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আপনি রাশেদ সাহেব না? আশিকের কলিগ?"

"জি স্যার," আমি বিনীতভাবে মাথা নেড়ে আনিকার পাশের চেয়ারটায় বসলাম। ওসি শাহাদাত সাহেব ইন্টারকমে কল দিয়ে দু কাপ চা দিতে বললেন। তারপর উনি উনার দুই হাত টেবিলের ওপর জড়ো করে
, খুব গভীর একটা নিশ্বাস ফেলে আনিকার দিকে তাকালেন।

"ম্যাডাম," ওসি সাহেব খুব ধীর, গম্ভীর গলায় শুরু করলেন, "আপনাকে সকালে কষ্ট করে আসতে বললাম, কারণ ব্যাপারটা ফোনে বলার মতো ছিল না। আর দুপুর বেলা মিডিয়াকে সব জানানোর আগে, ভিকটিমের স্ত্রী হিসেবে আপনার পুরো সত্যিটা জানার অধিকার আছে।"

আনিকার দুই হাত কোলের ওপর শক্ত হয়ে মুঠি পাকিয়ে আছে। উনার গলা শুকিয়ে কাঠ। উনি কোনোমতে বললেন, "আমার স্বামী কোথায় ওসি সাহেব? ও কি বেঁচে আছে?"

ওসি শাহাদাত সাহেব উনার দৃষ্টিটা টেবিলের একটা ফাইলের ওপর নামিয়ে নিলেন। কয়েক সেকেন্ডের এক নীরবতা, যা পুরো রুমের বাতাসকে ভারী করে দিল।

"আই অ্যাম সরি ম্যাডাম," ওসি সাহেব মুখ তুলে আনিকার চোখের দিকে তাকালেন। "আপনার স্বামী, ইঞ্জিনিয়ার বেলাল সাহেব আর বেঁচে নেই। উনাকে খুব ব্রুটালি, খুব নির্মমভাবে মার্ডার করা হয়েছে।"

কথাটা শোনার সাথে সাথেই আনিকার মুখ থেকে একটা তীক্ষ্ণ, চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। উনি দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেললেন। আমিও সিটের ওপর জমে গেলাম। খুন! বেলাল সাহেবকে খুন করা হয়েছে! আমার মাথার ভেতর আশিক ভাইয়ের সেই কথাগুলো বাজতে লাগল— 'ফিন্যান্সিয়াল বা প্রফেশনাল শত্রুতা হতে পারে।'

"কিন্তু কে মারল উনাকে? কেন মারল? ওর তো কোনো শত্রু ছিল না!" আনিকা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন। ওসি শাহাদাত সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উনার চোখের দৃষ্টিতে এখন এক অদ্ভুত, তাচ্ছিল্য আর করুণা মেশানো একটা ভাব।

"ম্যাডাম, মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরের কেউ হয় না। মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তার নিজের চরিত্র, আর তার অনিয়ন্ত্রিত লোভ," ওসি সাহেব বলতে শুরু করলেন। "আপনাকে একটা তেতো সত্য কথা আজ হজম করতে হবে। আপনার স্বামী লন্ডনে যতই বড় ইঞ্জিনিয়ার হোন না কেন, দেশে উনার একটা খুব অন্ধকার এবং নোংরা জীবন ছিল। আপনার এই ফ্ল্যাটের যে কাজের মেয়েটা, ময়না, তাকে আমরা অ্যারেস্ট করেছি। এবং তাকে জেরা করার পর যে জঘন্য কাহিনিটা বেরিয়ে এসেছে, তা শুনলে আপনি শিউরে উঠবেন।"

আনিকা উনার মুখ থেকে হাত সরালেন। উনার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে, কিন্তু উনি চুপ করে রইলেন। কারণ এই 'তেতো সত্যটা' উনি আগেই জানতেন। কিন্তু আমি তো জানতাম না যে এই সত্যটা বেলাল সাহেবকে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাবে!

ওসি সাহেব একটা ক্রাইম থ্রিলারের চরম ক্লাইম্যাক্সের মতো করে ঘটনাটা বর্ণনা করতে শুরু করলেন।
"এই ময়না মেয়েটার সাথে আপনার স্বামী গত কয়েক বছর ধরেই দেশে আসলে ফিজিক্যাল রিলেশন করত। টাকার লোভ দেখিয়ে, ব্ল্যাকমেইল করে সে এই গরিব মেয়েটার শরীর ভোগ করত। কিন্তু সমস্যাটা হলো অন্য জায়গায়। এই ময়নার একটা প্রেমিক আছে। নাম কালু। হাজারীবাগ এলাকার একটা লোকাল ছিঁচকে মাস্তান। সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় চাঁদাবাজি করে, টং দোকান থেকে টাকা তোলে। এই কালুর সাথে ময়নার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক।"

আমি রুদ্ধশ্বাসে শুনছি। থানার রুমের এসি চলা সত্ত্বেও আমার কপাল ঘেমে উঠছে।

"তো, মাসখানেক আগে কালু কোনোভাবে সন্দেহ করে ফেলে যে ময়নার কাছে এত টাকা কোত্থেকে আসে। সে একদিন ময়নাকে ধরে কয়েকটা চড়-থাপ্পড় লাগায়। মেয়ে মানুষ, মাইরের চোটে সে সব গরগর করে স্বীকার করে ফেলে। সে কালুকে বলে দেয় যে ধানমন্ডির এক বড়লোক সাহেব দেশে আসলে তার সাথে শুয়ে তাকে অনেকগুলো টাকা দেয়।"

ওসি সাহেব উনার টেবিলের ওপর রাখা একটা কলম নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, "এই কথা শোনার পর কালুর মাথা খারাপ হয়ে যায়। নিজের প্রেমিকা অন্য একটা লোকের বিছানায় যাচ্ছে, এটা কোনো পুরুষই সহজে মেনে নিতে পারে না। কিন্তু কালু হলো রাস্তার মাস্তান। তার কাছে ইগোর চেয়ে টাকার দাম বেশি। সে ময়নাকে একটা বুদ্ধি দেয়। সে বলে, 'ওই সাহেব তো অনেক টাকার মালিক। তুই ওকে ব্ল্যাকমেইল কর। বলবি যে তুই পুলিশে গিয়ে রেপ কেস করে দিবি, যদি সে তোকে পাঁচ লাখ টাকা না দেয়।'"

"ব্ল্যাকমেইল!" আমি অজান্তেই ফিসফিস করে উঠলাম।

"হ্যাঁ," ওসি সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন। "ময়না ঠিক তাই করেছিল। বেলাল সাহেব তখন লন্ডনে। ময়না উনাকে ফোন করে এই রেপ কেসের হুমকি দেয়। কিন্তু বেলাল সাহেব তো আর সাধারণ পাবলিক না। উনি উল্টো ময়নাকে ধমক দেন। বলেন, 'তুই জানিস আমি কে? আমি পুলিশের আইজিকে ফোন দিয়ে তোদের মতো বস্তির পোকাদের ক্রসফায়ারে দিয়ে দেব। টাকা তো পাবিই না, জেলের ভাত খাবি।' বেলাল সাহেবের এই ওভার-কনফিডেন্স আর অ্যারোগেন্সটাই উনার কাল হলো।"

রুমের ভেতর একজন কনস্টেবল চা দিয়ে গেল। কিন্তু আমাদের কারো চা খাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।

"এরপর কী হলো?" আনিকা ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

"এরপর আপনার স্বামী দেশে এলেন। দেশে এসে উনি নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনলেন," ওসি সাহেবের গলায় এখন পেশাদারি কাঠিন্য। "উনি ময়নাকে ডেকে পাঠান। ময়না যায়। কিন্তু ময়নার সাথে কালুও যায়। কালু বেলাল সাহেবকে চেপে ধরে। কিন্তু বেলাল সাহেব তখনো উনার সেই এলিট ক্লাসের অহংকারে অন্ধ। উনি কালুকে গালিগালাজ করেন, পুলিশের ভয় দেখান, এমনকি কালুকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে চান। কালু একটা পাতি গুন্ডা হতে পারে, কিন্তু তখন তার ইগোতে চরম আঘাত লাগে। সে ডিসাইড করে, এই লোকটাকে সে শিক্ষা দেবে।"

ওসি সাহেব একটু থামলেন। চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিলেন।

"যে রাতে আপনার স্বামী নিখোঁজ হন, সেদিন সন্ধ্যায় ময়না একটা নতুন, বেনামি সিম থেকে বেলাল সাহেবকে ফোন দেয়। সে বেলাল সাহেবকে সেক্সের লোভ দেখিয়ে হাজারীবাগের পেছনের দিকের একটা বস্তিতে আসতে বলে। বেলাল সাহেবও উনার সেই পুরোনো লোভের বশবর্তী হয়ে, কাউকে কিছু না জানিয়ে একা ওই বস্তিতে চলে যান।"

আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। এই সেই ৪০ সেকেন্ডের ফোন কল, যার কথা এসআই তৌহিদ আমাকে বলেছিলেন!

"বেলাল সাহেব ওই বস্তির একটা ভাঙাচোরা ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই কালু আর তার দুজন সাগরেদ উনাকে ঘিরে ধরে। তাদের হাতে ছিল ধারালো অস্ত্র আর রামদা। তারা বেলাল সাহেবকে জিম্মি করে উনার কাছে থাকা এটিএম কার্ড, পিন নাম্বার আর ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডিটেইলস চায়। কিন্তু বেলাল সাহেব তখনো উনার জেদ ধরে বসেন। উনি পিন নাম্বার দিতে অস্বীকার করেন এবং চিল্লাচিল্লি করে বস্তির লোক জড়ো করার হুমকি দেন। কালু তখন রাগের মাথায় আর কোনো চিন্তাভাবনা না করেই উনার মাথায় লোহার রড দিয়ে একটা চরম আঘাত করে।"

আনিকা একটা তীক্ষ্ণ শব্দ করে দুই হাতে নিজের মুখটা ঢেকে ফেললেন। উনার শরীরটা ফুলে ফুলে কেঁপে উঠতে লাগল।

"প্রথম আঘাতেই বেলাল সাহেব ফ্লোরে লুটিয়ে পড়েন," ওসি সাহেবের বর্ণনায় কোনো ইমোশন নেই, নিখাদ পুলিশের রিপোর্ট। "এরপর কালু আর তার সাগরেদরা মিলে উনাকে রামদা দিয়ে কুপিয়ে মার্ডার করে। কিন্তু লাশ তো গুম করতে হবে! হাজারীবাগের ওই এলাকায় অনেক পুরোনো ট্যানারির পরিত্যক্ত জায়গা আছে। তারা লাশটাকে বস্তায় ভরে এরকমই একটা পরিত্যক্ত জায়গায় নিয়ে যায়। তারপর লাশের ওপর কয়েক গ্যালন কেরোসিন আর অ্যাসিড ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।"

আমি দুই হাতে আমার চেয়ারের হাতল শক্ত করে চেপে ধরলাম। অ্যাসিড আর কেরোসিন দিয়ে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারা! আমার পেটের ভেতরটা কেমন যেন গুলিয়ে উঠল।

"আগুন নিভে যাওয়ার পর," ওসি সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "তারা লাশের যে কয়টা আধপোড়া হাড়গোড় আর ছাই অবশিষ্ট ছিল, সেগুলো একটা বস্তায় ভরে হাজারীবাগের পেছনের একটা খালে ফেলে দেয়। আমরা ময়না, কালু এবং তার দুই সাগরেদ— চারজনকেই গতকাল রাতে অ্যারেস্ট করেছি। তারা রিমান্ডে সব কনফেস করেছে।"

"উনার... উনার ডেডবডি..." আনিকা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন।

"আই অ্যাম সরি ম্যাডাম," ওসি সাহেব মাথা নাড়লেন। "কাল রাত থেকে আমাদের ডাইভিং টিম আর ফায়ার সার্ভিসের টিম ওই খালে তল্লাশি চালিয়েছে। কিন্তু আপনারা তো জানেন ঢাকা শহরের খালের কী অবস্থা! ময়লা, পলিথিন আর স্রোতের কারণে ওই হাড়গোড়গুলো হয়তো ভেসে বুড়িগঙ্গায় চলে গেছে, অথবা কাদার নিচে তলিয়ে গেছে। আমরা কিছুই উদ্ধার করতে পারিনি। তবে আসামিদের কনফেশন আর মার্ডার ওয়েপন (অস্ত্র) আমাদের কাছে আছে। ওদের ফাঁসি কেউ আটকাতে পারবে না।"

ওসি শাহাদাত সাহেব কথা শেষ করে নীরব হলেন।

রুমের ভেতর শুধু আনিকার ফুঁপিয়ে কাঁদার শব্দ শোনা যাচ্ছে।

আমি পাথরের মতো বসে আছি। আমার মাথার ভেতর একটা ব্লেন্ডার চলছে। একজন মানুষ, যিনি লন্ডনের একটা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর, যিনি ধানমন্ডির ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের মালিক— তার শেষ পরিণতি হলো হাজারীবাগের একটা নোংরা বস্তিতে রামদার কোপ খাওয়া আর অ্যাসিডে পুড়ে ছাই হয়ে ড্রেনের পানিতে ভেসে যাওয়া! মানুষের জীবনের কী কোনো মূল্য আছে? মানুষের অহংকার, আভিজাত্য আর ক্ষমতার শেষ গন্তব্য কি এতটা কদর্য হতে পারে?

আর এই সবকিছুর মূলে কী? সেই একই আদিম, বন্য যৌনতার লোভ। যে লোভের বশবর্তী হয়ে বেলাল সাহেব একজন কাজের মেয়ের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। আর আমি? আমিও তো সেই একই লোভের বশবর্তী হয়ে আনিকা নাওহারের বিছানায় গিয়েছিলাম! আমার আর বেলাল সাহেবের মধ্যে পার্থক্য কী? পার্থক্য শুধু এতটুকুই যে, উনি মারা গেছেন, আর আমি বেঁচে আছি।

"ম্যাডাম, আপনি শক্ত হোন," ওসি সাহেব আনিকাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। "আমরা দুপুর বারোটায় মিডিয়াকে সব জানাব। আপনি কি থাকবেন?"

আমি আনিকার দিকে তাকালাম। আনিকা চোখ মুছতে মুছতে মাথা নাড়লেন। "না ওসি সাহেব। আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। আমি... আমি এই মুহূর্তে কোনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারব না। আপনারা আপনাদের মতো করে প্রেস ব্রিফিং করুন। আমি বাসায় যাচ্ছি।"

"ঠিক আছে ম্যাডাম। রাশেদ সাহেব, আপনি উনাকে সাবধানে বাসায় নিয়ে যান। কোনো দরকার হলে আমাকে জানাবেন।"

আমরা থানা থেকে বেরিয়ে এলাম।

বাইরে এপ্রিলের কড়া রোদ। কিন্তু আনিকার শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। উনি থানার সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। উনার হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা। 
আমরা থানার গেট পার হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। আমি একটা সিএনজি বা উবার ডাকার জন্য ফোন বের করব, ঠিক সেই মুহূর্তে...

আনিকা হঠাৎ করে ফুটপাতের একপাশে, একটা ডাস্টবিনের কাছে ছুটে গেলেন। উনি উনার দুই হাত দিয়ে হাঁটুতে ভর দিয়ে নিচু হলেন। এবং পরক্ষণেই উনার পেটের ভেতর থেকে একটা ভয়ংকর, বুক-চেরা ওয়াক তোলার শব্দ বেরিয়ে এল।

উনি বমি করতে শুরু করলেন। আমি দৌড়ে গিয়ে উনার পিঠে হাত রাখলাম। উনার খোলা চুলগুলো এক হাতে ধরে পেছনের দিকে সরিয়ে রাখলাম, যাতে বমিতে মাখামাখি না হয়। আনিকা অনর্গল বমি করছেন। উনার পেটে হয়তো সকাল থেকে কোনো খাবার পড়েনি, তাই শুধু হলুদ রঙের পিত্তি আর টক পানি বেরিয়ে আসছে। উনার পুরো শরীরটা একটা অসুস্থ পাখির মতো কাঁপছে।

খুন হওয়া, অ্যাসিডে পুড়ে যাওয়া আর খালের পানিতে স্বামীর হাড়গোড় ভেসে যাওয়ার এই বীভৎস, নগ্ন বর্ণনা উনার স্নায়ুকে পুরোপুরি বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। উনি যতই প্র্যাকটিক্যাল বা কর্পোরেট নারী হোন না কেন, এই ভয়াবহ রিয়েলিটি নেওয়ার মতো ক্ষমতা উনার ছিল না।

বমি করা শেষ হলে উনি একটা টিস্যু দিয়ে মুখ মুছলেন। আমি পাশের একটা দোকান থেকে এক বোতল মিনারেল ওয়াটার কিনে উনার হাতে দিলাম। উনি পানি দিয়ে কুলকুচি করে মুখ ধুলেন। কয়েক ঢোঁক পানি খেলেন।

উনার চোখের চারপাশ লাল হয়ে আছে, কপালে ঘামের বিন্দু। উনি আমার দিকে তাকালেন। উনার সেই মোহনীয়, শিকারি বা আভিজাত্যময় দৃষ্টির আজ কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে আজ শুধু এক চরম রিক্ত, বিধ্বস্ত এবং নিঃস্ব একজন নারীর অসহায়ত্ব।

"রাশেদ..." আনিকা অত্যন্ত দুর্বল, কাঁপা গলায় বললেন।

"আমি আছি আনিকা। আমি আছি," আমি উনার হাতটা ধরে বললাম।

"আমাকে... আমাকে বাসায় নিয়ে চলো। আমি আর এক মুহূর্তও এই রাস্তায় দাঁড়াতে পারছি না। আমাকে বাসায় নিয়ে চলো।"

আমি একটা সিএনজি ডাকলাম। আনিকাকে নিয়ে সেই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখন ঘুরছে— এই ঘটনার পর আমাদের এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী হবে? এই মৃত্যু, এই রক্ত আর এই বীভৎস সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা কি আর কোনোদিন সেই পুরনো ফ্যান্টাসির জগতে ফিরে যেতে পারব?

আমি জানি না। হয়তো এই উত্তরটা সময়ই বলে দেবে।
[+] 11 users Like Orbachin's post
Like Reply
গল্পটা লিখতে লিখতে আমার হিসাবের চেয়ে অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে। ?

মূল গল্পটা যেখানে ২৪-৩০টা অধ্যায়ের মধ্যে শেষ করার কথা ভেবেছিলাম, এখন দেখছি সেটা ইতিমধ্যে ৪৭ অধ্যায়ে চলে গেছে।

এখন চাইলে,  আনিকা–রাশেদের বিয়ে দেখানো যেতে পারে। এরপর তাদের নতুন সংসার, দাম্পত্য জীবনের নানা টানাপোড়েন, ঘোরাঘুরি, নিয়মিত সেক্স—সব মিলিয়ে গল্পটা আরও কিছুটা এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

এরপর চাইলে তাদের নিয়ে রাশেদের গ্রামের বাড়িতেও যেতে পারি। সেখানে একেবারে ভিন্ন পরিবেশে আনিকার সঙ্গে গ্রামের সাধারণ মানুষের পরিচয় হতে পারে। গ্রামের একজন দরিদ্র ইলেকট্রিশিয়ান কিংবা মাছওয়ালার পরিশ্রমে গড়া তামাটে, শক্ত শরীর আনিকার মনে নতুন ধরনের আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে সম্পর্কের জটিলতা তৈরি হতে পারে এবং একসময় সেই সম্পর্ক আনিকার জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে। এমনকি এক পর্যায়ে সে রাশেদকে ছেড়ে সেই দরিদ্র মানুষটির সংসারে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারে।

কিন্তু গল্প সেখানেও থামবে না। ওই গ্রামের প্রভাবশালী ও কুখ্যাত মেম্বারের নজর আনিকার ওপর পড়তে পারে। তার লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আনিকাকে জোর করে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা—এসব নিয়ে গল্প আরও নতুন একটি মোড় নিতে পারে।

অর্থাৎ, চাইলে গল্পটাকে এভাবে একের পর এক নতুন চরিত্র, নতুন সম্পর্ক, নতুন সংঘাত এবং নতুন মোড়ের দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো—এটার আসলে কোনো নির্দিষ্ট শেষ নেই। একটা ঘটনা থেকে আরেকটা ঘটনা, একটা সম্পর্ক থেকে আরেকটা সম্পর্ক—এভাবেই গল্প অনন্তকাল চালিয়ে নেওয়া যায়।

তাই এখন আপনাদের মতামতটাই জানতে চাই।

গল্পটা কি আরও বড় করে, একের পর এক নতুন মোড় দিয়ে এগিয়ে নেওয়া উচিত? নাকি মূল গল্পের একটা সুন্দর সমাপ্তি টেনে ২–৩টা অধ্যায়ের মধ্যেই শেষ করে দেওয়া ভালো হবে?
[+] 10 users Like Orbachin's post
Like Reply




Users browsing this thread: 4 Guest(s)