Thread Rating:
  • 11 Vote(s) - 2.55 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Adultery ২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল...
#21
পর্ব ১০: 

আদালতের সেই দিনটা শুরু থেকেই যেন অদ্ভুতভাবে ভারী ছিল। আকাশ একদম পরিষ্কার, নীলচে রঙে ভরা, কোথাও একটুও মেঘ নেই—তবুও যেন চারপাশে একটা চাপা অস্বস্তি ছড়িয়ে আছে। রোদ পড়ছে লালচে ইটের দালানের গায়ে, কিন্তু সেই আলোতেও কোনো উষ্ণতা নেই। আদালত চত্বরে প্রতিদিনের মতোই ভিড়—মানুষ আসছে, যাচ্ছে, কেউ কাগজ হাতে দৌড়াচ্ছে, কেউ করিডোরে দাঁড়িয়ে কথা বলছে, আইনজীবীদের কালো কোট বাতাসে দুলছে। চায়ের দোকানের সামনে ভিড়, ধোঁয়া উঠছে কাপে কাপে, কেউ চুপচাপ চা খাচ্ছে, কেউ উত্তেজিত গলায় আলোচনা করছে কোনো মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে।
সবকিছুই যেন খুব স্বাভাবিক, প্রতিদিনের মতোই। তবুও আজকের দিনের ভেতরে একটা অদ্ভুত টান আছে—যেন অদৃশ্যভাবে কেউ সবার গলার কাছে হাত রেখে ফিসফিস করে বলছে, “আজ কিছু একটা হবে।” এই অনুভূতিটা স্পষ্ট করে বোঝানো যায় না, কিন্তু যারা সেখানে ছিল, তারা প্রত্যেকেই সেটা কোনো না কোনোভাবে অনুভব করছিল।
রহিম চাচার দিনটা শুরু হয়েছিল আরও আগে—আসলে দিন শুরু হওয়ার আগেই। কারণ তিনি ঠিকমতো ঘুমোতেই পারেননি। সারারাত বিছানায় শুয়ে ছিলেন, কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই একটার পর একটা ছবি ভেসে উঠেছে। কখনো বাপ্পির ছোটবেলার মুখ—ময়লা জামা পরে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, লজ্জা পাচ্ছে, তবুও চা খেতে চাইছে। কখনো সেই সন্ধ্যার দৃশ্য—ধস্তাধস্তি, চিৎকার, আর এক মুহূর্তে সবকিছু বদলে যাওয়া।
তার পাশে মমতা ঘুমিয়ে ছিল। ঘুমের ভেতরেও তার মুখে ক্লান্তির ছাপ। এক হাত আলতো করে পেটের ওপর রাখা। সেই পেটের ভেতরে একটা নতুন জীবন—যে এখনও পৃথিবীর কিছুই জানে না, তবুও যার ভবিষ্যৎ আজকের দিনের ওপর নির্ভর করছে।
রহিম চাচা অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিলেন সেই দৃশ্যের দিকে। তার মনে হচ্ছিল—এই ছোট্ট মানুষটা, যে এখনও জন্মায়নি, তার নিরাপত্তা, তার ভবিষ্যৎ—সবকিছু আজ তার একটা কথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। একটা শব্দ, একটা বাক্য—সেইটুকুই হয়তো ঠিক করবে সব।
বের হওয়ার আগে মমতা আস্তে করে তাকে ডাকল। “শুনেন…”
রহিম চাচা থেমে তাকালেন।
মমতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখে একধরনের ভয়, কিন্তু সেই ভয়ের ভেতরে লুকানো ছিল একটুকরো অনুরোধও। তারপর সে ধীরে বলল, “আপনি… সাবধানে থাকবেন।”
এই ‘সাবধানে’ শব্দটার ভেতরে কত কিছু লুকিয়ে ছিল—রহিম চাচা খুব ভালো করেই বুঝলেন। রকির সেই রাতের কথা, ছুরির ঠাণ্ডা ধার, ফিসফিস করে বলা হুমকি—সবকিছু এই একটা শব্দের ভেতরে গিয়ে জমে আছে। তিনি কিছু বললেন না, শুধু মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেলেন। কারণ কিছু কিছু জবাব মুখে বলা যায় না—সেগুলো শুধু ভেতরে অনুভব করা যায়।
আদালত চত্বরে ঢোকার সময়ই তিনি তাকে দেখলেন—রকি। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তবুও আলাদা করে চোখে পড়ে। তার শরীরটা খুব সাধারণভাবে দাঁড়ানো, কিন্তু চোখদুটো সরাসরি রহিম চাচার দিকে। ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি।
এই হাসিটা রাগের না, আবার পুরোপুরি হুমকিরও না। এটা এমন এক হাসি, যেখানে নিশ্চিততা আছে। যেন সে আগেই জানে কী হতে যাচ্ছে। যেন সে আগেই জেনে গেছে—মানুষ শেষ পর্যন্ত কী বেছে নেয়।
রহিম চাচার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। তিনি চোখ সরিয়ে নিলেন, কিন্তু সেই দৃষ্টি যেন তার পিঠে লেগে রইল। যতক্ষণ না তিনি ভেতরে ঢুকলেন, ততক্ষণ সেই অনুভূতি তাকে ছাড়ল না।
অন্যদিকে কোর্টরুমের ভেতরে মাসুদ রহমান বসে আছেন। সামনে ফাইল খোলা, পাতার পর পাতা নথি, দাগ দেওয়া লাইন, নোট—সবকিছু গোছানো, তবুও যেন অসম্পূর্ণ। তার চোখে ক্লান্তি স্পষ্ট, কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতরেও একটা তীক্ষ্ণ মনোযোগ আছে।
গত রাতটা তিনি ঘুমাননি। বারবার কেসটা মাথায় ঘুরিয়েছেন। কোথায় কী ফাঁক আছে, কোথায় কীভাবে যুক্তি দাঁড় করানো যায়—সব খুঁজে দেখেছেন। শামসুরের অতীত তিনি খুঁটিয়ে দেখেছেন—মারামারি, চাঁদাবাজি, আগের কেস, থানায় নাম থাকা—সবই আছে। আর রকির সঙ্গে তার সম্পর্ক—সেটাও স্পষ্ট।
তার মনে একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছে—এই ঘটনাটা হঠাৎ করে হয়নি। এটা এমন কিছু, যেটা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে, ঠেলে দেওয়া হয়েছে, এমন এক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যেখানে বিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী।
কিন্তু সমস্যা হলো—এই সবকিছু অনুভূতির স্তরে যতই পরিষ্কার হোক, আইনের কাছে তার মূল্য খুব কম। আইন অনুভূতি দেখে না। আইন শুধু দেখে—প্রমাণ আছে কিনা।

কোর্টরুমের দরজা খুলে যখন ভেতরে ঢোকানো হলো বাপ্পিকে, তখন মুহূর্তের জন্য যেন চারপাশের সব শব্দ থেমে গেল। বাইরে মানুষের কোলাহল, করিডোরে জুতোর শব্দ, আইনজীবীদের কথাবার্তা—সব যেন দরজার ওই এক চৌকাঠে এসে থেমে রইল। ভেতরে শুধু একটা ভারী নীরবতা। সেই নীরবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাপ্পি—কাঠগড়ায়।
কয়েকদিন আগেও যে ছেলেটা পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে হাসত, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিত, নিজের মতো করে জীবনটা চালাত—আজ তাকে দেখে মনে হয় যেন সে বহু বছরের ক্লান্তি বয়ে বেড়াচ্ছে। তার মুখ শুকিয়ে গেছে, গালে দাড়ি এলোমেলোভাবে গজিয়েছে, চোখের নিচে কালি জমে আছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বদলে গেছে তার চোখ। সেখানে আর আগের সেই আগুন নেই, সেই বেপরোয়া চাহনি নেই। বরং একধরনের নীরব স্বীকারোক্তি—যেন সে বুঝে গেছে, জীবনের একটা বড় অংশ এখন তার হাতের বাইরে।
যে মানুষ সব হারানোর কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তার চোখে এমন একটা অদ্ভুত স্থিরতা আসে—যেখানে আর তর্ক থাকে না, চিৎকার থাকে না, শুধু একটা চুপচাপ মেনে নেওয়া থাকে। বাপ্পির চোখেও ঠিক সেই রকম একটা শান্ত, কিন্তু ভীষণ ক্লান্ত আলো।
সে একবার ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাল। যেন নিশ্চিত হতে চাইছে—কে কে আছে এখানে। শিউলি, নীলা, রাফি—সবাই। প্রত্যেকের চোখে আলাদা আলাদা অনুভূতি—চিন্তা, ভয়, অপরাধবোধ, অসহায়তা। কিন্তু তার চোখ শেষ পর্যন্ত এসে থামল এক জায়গায়—রহিম চাচা।
দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
সেই মুহূর্তটা খুব ছোট। হয়তো এক সেকেন্ডও না। কিন্তু সেই এক সেকেন্ডের ভেতরে যেন বছরের পর বছর জমে থাকা সম্পর্ক, বিশ্বাস, স্নেহ, আর না-বলা হাজারটা কথা একসাথে ভেসে উঠল। বাপ্পির মনে পড়ে গেল ছোটবেলার সেই দিনগুলো—দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, রহিম চাচার হাসিমুখ, “এই যে বাপ্পি, আয়”—বলে ডেকে নেওয়া, বিনা পয়সায় চা আর বিস্কুট দিয়ে দেওয়া।
আর রহিম চাচার চোখে ভেসে উঠল অন্য ছবি—একটা ছোট্ট ছেলেকে বড় হতে দেখা, তার হাসি, তার রাগ, তার দৌড়ঝাঁপ। সেই ছেলেটাই আজ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে।
কিন্তু সেই মুহূর্তটা বেশিক্ষণ টিকল না। রহিম চাচা হঠাৎ করেই চোখ নামিয়ে নিলেন। যেন সেই দৃষ্টি সহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব না। যেন বাপ্পির চোখে তাকালেই তিনি ভেঙে পড়বেন।
কোর্টের কর্মচারীর কণ্ঠ সেই নীরবতাকে ছিন্ন করে দিল—
“সাক্ষীকে কাঠগড়ায় আসতে বলা হচ্ছে।”
এই ডাকটা যেন রহিম চাচার বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করল। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তার পা ভারী। এমন ভারী, যেন প্রতিটা পদক্ষেপে তিনি মাটির ভেতরে ঢুকে যাচ্ছেন। হাঁটার সময় তার মনে হচ্ছিল—এই কয়েকটা পা ফেলা মানে শুধু একটা জায়গা থেকে আরেকটা জায়গায় যাওয়া না, বরং একটা জীবনের সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর পর তিনি একবার চারপাশে তাকালেন। সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। এই দৃষ্টিগুলো আলাদা—কেউ আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে, কেউ সন্দেহ নিয়ে, কেউ নির্লিপ্তভাবে। কিন্তু প্রত্যেকটা দৃষ্টি যেন তাকে চাপ দিচ্ছে—“বলুন… সত্য বলুন…”
বিচারকের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—
“আপনি যা দেখেছেন, তা সত্য করে বলবেন।”
‘সত্য’ শব্দটা তার কানে গিয়ে অদ্ভুতভাবে বাজল। যেন এই একটা শব্দই তাকে দুই টুকরো করে ফেলছে। একদিকে দাঁড়িয়ে আছে সত্য—যেটা সে জানে, যেটা সে দেখেছে। আর অন্যদিকে দাঁড়িয়ে আছে তার পরিবার—মমতা, তার অনাগত সন্তান, তাদের ভবিষ্যৎ।
তিনি চোখ বন্ধ করলেন এক মুহূর্তের জন্য।
তার মাথার ভেতর একসাথে অনেকগুলো ছবি ভেসে উঠল—
বাপ্পির হাসি,
মমতার ক্লান্ত মুখ,
তার পেটের ওপর রাখা হাত,
আর রকির সেই ঠাণ্ডা, অনুভূতিহীন চোখ।
সেই চোখ, যেটা তাকে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছিল—ভুল করলে কী হবে।
তার গলা শুকিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা চেপে ধরল। মনে হচ্ছিল শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
তিনি ধীরে বললেন—
“ঝগড়া হইছিল…”
কোর্টরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ নড়ছে না। সবাই শুনছে।
“অনেক বড় ঝগড়া…”
তার কণ্ঠে কাঁপুনি নেই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবকিছু ভেঙে পড়ছে। তিনি থামলেন। এই থামাটা খুব ছোট, কিন্তু তার ভেতরে চলছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধ—সত্য বলবেন, না বাঁচবেন?
তারপর তিনি বললেন—
“কিন্তু… আমি ঠিক দেখি নাই ছুরিটা কে মারছে…”
এই কথাটা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। যেন একটা অদৃশ্য ঢেউ পুরো কোর্টরুমে ছড়িয়ে গেল। ফিসফাস শুরু হলো। কেউ তাকাচ্ছে, কেউ মাথা নাড়ছে।
এই কথাটা পুরো সত্য না। আবার পুরো মিথ্যাও না।
এটা সেই জায়গা, যেখানে মানুষ নিজের ভেতরের সত্য আর বাইরের ভয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটা সমঝোতা করে। একটা অদ্ভুত, অসম্পূর্ণ সত্য—যেটা কাউকে পুরোপুরি বাঁচায় না, আবার পুরোপুরি ডোবায়ও না।
মাসুদ রহমান মাথা তুলে তাকালেন। তার চোখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ। তিনি বুঝলেন—কিছু একটা বদলে গেছে। কিন্তু তিনি থামলেন না।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন।
“মাই লর্ড, আমি একটা বিষয় উপস্থাপন করতে চাই।”
তার কণ্ঠ শান্ত, নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু সেই শান্তির ভেতরে একটা দৃঢ়তা আছে।
তিনি শামসুরের অতীত তুলে ধরলেন—তার সহিংসতা, তার অপরাধ, তার চাঁদাবাজি। কোর্টরুমে আবার গুঞ্জন উঠল। কিছু মানুষ মাথা নাড়ল, যেন তারা এই গল্প আগে থেকেই জানত।
তারপর তিনি বললেন—
“এই ঘটনাটা সরল কোনো মারামারি না। এখানে তৃতীয় একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আছে—রকি।”
রকির মুখ মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। তার চোখে এক ঝলক বিরক্তি, কিন্তু সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল।
মাসুদ রহমান থামলেন। তারপর বললেন—
“আমাদের কাছে একজন সাক্ষী ছিল… যিনি ঘটনাটা খুব কাছ থেকে দেখেছেন।”
সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছে।
বিচারক বললেন—
“তিনি কোথায়?”
একটা ছোট্ট নীরবতা।
“তিনি আজ উপস্থিত নেই।”
এই কথাটা শোনার সাথে সাথে যেন কোর্টরুমের ভেতরে একটা হতাশার ঢেউ বয়ে গেল। যেন কেউ শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিল।
তবুও মাসুদ রহমান থামলেন না। তিনি বললেন—
“ছুরিটা সরাসরি মৃত ব্যক্তির দিকে যায়নি… বরং অন্য একজনের দিকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল।”
এই কথাটা যেন বাতাস চিরে বেরিয়ে গেল।
বাপ্পির চোখ বড় হয়ে গেল। যেন সে প্রথমবারের মতো একটা সম্ভাবনা দেখল।
শিউলি নিঃশ্বাস আটকে রাখল। তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে।
নীলা ধীরে রাফির দিকে তাকাল—তার চোখে ভয় আর আশার মিশ্রণ।
কিন্তু এই সত্যটা দাঁড়িয়ে আছে একা। কোনো প্রমাণ নেই। কোনো সাক্ষী নেই।
বিচারক শান্ত গলায় বললেন—
“কোর্ট প্রমাণ চায়। শুধু বক্তব্য যথেষ্ট না।”
এই একটা বাক্যে যেন সবকিছু আবার ভেঙে পড়ল।
সত্যি আছে—কিন্তু ধরা যাচ্ছে না।
জানা আছে—কিন্তু প্রমাণ করা যাচ্ছে না।
রহিম চাচা কাঠগড়া থেকে নামলেন। তার পা কাঁপছে। তিনি নিজেই বুঝতে পারছেন না—তিনি কী করলেন।
তিনি কি বাপ্পিকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন?
নাকি তাকে আরও গভীরে ঠেলে দিলেন?
তার মাথা নিচু। তিনি হাঁটছেন, কিন্তু যেন কিছুই দেখছেন না।
হঠাৎ পাশ থেকে খুব আস্তে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
“ভালো করলেন না…”
তিনি তাকালেন না। কিন্তু বুঝলেন—রকি।
সেই কণ্ঠে কোনো রাগ নেই। বরং একটা ঠাণ্ডা সতর্কতা।
কোর্টরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে রাফি, নীলা, শিউলি আর সাইফ। চারজন, কিন্তু চারটা আলাদা জগত। কেউ কথা বলছে না। কারণ তারা সবাই বুঝে গেছে—এই লড়াই এখন শুধু আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না।
এটা এখন তাদের ভেতরের লড়াই।
কে কী বেছে নেবে—
সত্য, না নিরাপত্তা…
ভালোবাসা, না দায়িত্ব…
এই সিদ্ধান্তগুলোই এখন সবকিছু বদলে দেবে।
দূরে দাঁড়িয়ে রকি একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া ছেড়ে আকাশের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটে সেই হালকা, নিশ্চিন্ত হাসি।
যেন সে জানে—মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ভয়। আর সেই ভয়কে কীভাবে কাজে লাগাতে হয়, সেটা সে খুব ভালো করেই জানে। আকাশ তখনও একদম পরিষ্কার। সূর্যের আলো তীব্র হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। তবুও মনে হচ্ছিল—ঝড়টা এখনো শুরুই হয়নি। আসল ঝড়টা এখনও

(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#22
 পর্ব: ১১
আদালত চত্বরের ভেতরে মানুষের ভিড়, কৌতূহলী দৃষ্টি, ফিসফাস—সবকিছু মিলিয়ে একটা টানটান পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলছে না, কিন্তু প্রত্যেকে জানে—আজ এমন একটা কথা শোনা যাবে, যা কারও জীবনে স্বস্তি এনে দেবে, আবার কারও জীবনে একটা দীর্ঘ অন্ধকারের শুরু হয়ে যাবে।
কোর্টরুমের ভেতরে বসে থাকা মানুষগুলোর মুখে আলাদা আলাদা ভাব। কেউ কাগজ উল্টাচ্ছে, কেউ নিচু গলায় কথা বলছে, কেউ শুধু চুপচাপ সামনে তাকিয়ে আছে। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে একটা অদৃশ্য অপেক্ষা কাজ করছে—যেন সময়টা একটু থমকে আছে, ঠিক সেই মুহূর্তটার জন্য। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে বাপ্পি। তার মুখে কোনো স্পষ্ট অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু চোখদুটো বলে দিচ্ছে—সে অনেক দূর চলে এসেছে। কয়েকদিন আগেও যে ছেলেটা সহজে রেগে যেত, হাসত, চিৎকার করত—আজ তার ভেতরে সেই তাড়না নেই। বরং একটা ক্লান্ত স্থিরতা, একটা মেনে নেওয়া নীরবতা। এতদিন ধরে প্রতিটা দিন তাকে ভেঙেছে, আবার গড়েছে—শেষ পর্যন্ত সে বুঝে গেছে, এখানে আশা ধরে রাখা মানে নিজেকে প্রতিদিন একটু করে ভাঙা। তাই সে এখন আর আশার ওপর দাঁড়িয়ে নেই—সে দাঁড়িয়ে আছে ফলাফলের সামনে, যেটা আসবে, সেটাকেই মেনে নেবে।
বিচারক যখন রায় পড়া শুরু করলেন, তখন পুরো কোর্টরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শব্দগুলো ধীরে ধীরে বাতাসে ভেসে উঠতে লাগল—প্রতিটা শব্দ যেন আলাদা করে শোনা যাচ্ছে, যেন প্রতিটা শব্দের আলাদা ওজন আছে। কেউ নড়ছে না, কেউ কাশছে না, এমনকি শ্বাস নেওয়ার শব্দও যেন কমে গেছে। এই কয়েকটা মুহূর্তের ভেতরেই একটা জীবনের দিক নির্ধারিত হবে—এই বোধটা সবাইকে একসাথে চুপ করিয়ে দিয়েছে।
“…অভিযুক্ত বাপ্পি… ইচ্ছাকৃত খুন নয়… ঘটনাটি আকস্মিক…”
এই কথাগুলো শোনার সাথে সাথে কোর্টরুমের ভেতরে একটা অদ্ভুত ঢেউ বয়ে গেল। কেউ একটু সামনে ঝুঁকল, কেউ চোখ তুলে তাকাল। আশার একটা ক্ষীণ আলো যেন হঠাৎ কোথাও জ্বলে উঠল—কিন্তু সেটা পুরোপুরি আলো না, আবার অন্ধকারও না। মাঝামাঝি একটা জায়গা, যেখানে মানুষ ঠিক বুঝে উঠতে পারে না—খুশি হবে, নাকি ভয় পাবে।
“…আত্মরক্ষামূলক পরিস্থিতি বিবেচনায়…”
বাপ্পির বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল। সে মাথা নিচু করল না, আবার পুরোপুরি সোজাও হয়ে দাঁড়াল না। যেন শরীরটা মাঝখানে আটকে আছে। তার মনে হচ্ছিল—এই কথাগুলো তার জন্য, কিন্তু তবুও পুরোপুরি তার না। যেন কেউ তার জীবনের গল্পটা বলে দিচ্ছে, কিন্তু তার ভেতরের সত্যিটা কেউ পুরোটা জানে না।
তারপর এল সেই শব্দগুলো—যেগুলোর জন্য সবাই অপেক্ষা করছিল।
“…১২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড…”
এই কথাটা শোনার পর সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। কেউ চিৎকার করল না, কেউ হাততালি দিল না, কেউ প্রতিবাদ করল না। কারণ এই রায়টা এমন—যেখানে পুরোপুরি খুশি হওয়া যায় না, আবার পুরোপুরি ভেঙেও পড়া যায় না। এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে মানুষ শুধু চুপ করে যায়।
বাপ্পি ধীরে মাথা নিচু করল। তার ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল—যেটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। সেখানে দুঃখ আছে, কিন্তু পুরো দুঃখ না। স্বস্তি আছে, কিন্তু পুরো স্বস্তি না। যেন সে নিজের ভেতরে বলছে—“এইটাই হওয়ার ছিল।” তার চোখ একবার উঠে বাইরে গেল। রহিম চাচা দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখ ভেজা, ঠোঁট শক্ত করে চেপে রাখা। কিছু বলতে পারছেন না, কিন্তু সবকিছু তার চোখেই লেখা। দুইজনের চোখ আবার একবার মিলল। এইবার কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো অভিযোগ নেই। শুধু একটা নীরব স্বীকারোক্তি—সবকিছু বদলে গেছে। আর আগের মতো কিছুই ফিরবে না।
কোর্টরুম থেকে বের হওয়ার পর মানুষজন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। কেউ বলছে—“কম হইছে।” কেউ বলছে—“এইটাই ঠিক।” বিচার সবসময় সবার কাছে একরকম মনে হয় না। প্রত্যেকেই নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচারকে দেখে, নিজের মতো করে মাপ দেয়। কিন্তু এই কথাগুলোর বাইরে, আসল ভারটা পড়ে অন্য জায়গায়—যেখানে এই রায়ের প্রভাব গিয়ে লাগে। রকিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। 

সেদিন সন্ধ্যায় নীলার বাড়িটা এমনভাবে নিঃশব্দ ছিল, যেন সেই নীরবতা শুধু শব্দের অনুপস্থিতি না—বরং একটা ভেঙে পড়া জীবনের প্রতিধ্বনি। এই নীরবতা ঝড়ের আগের না, বরং ঝড় চলে যাওয়ার পরের, যখন সবকিছু ভেঙে পড়ে আছে, কিন্তু কেউ এখনো সেই ভাঙনের হিসাব করতে বসেনি। ঘরের ভেতরে বাতাসও যেন ভারী হয়ে আছে—চলছে, কিন্তু চাপা। ড্রয়িংরুমের মাঝখানে সোফায় বসে আছেন কাদের সাহেব। তার সামনে খবরের কাগজ খোলা, পাতাগুলো অল্প বাতাসে নড়ছে, কিন্তু তিনি পড়ছেন না। চোখ কাগজের ওপর স্থির, অথচ মন অনেক দূরে—সম্ভবত এমন এক জায়গায়, যেখানে তিনি নিজের সিদ্ধান্তগুলোকে বারবার যাচাই করছেন, কিন্তু স্বীকার করতে পারছেন না যে কোথাও কিছু ভেঙে গেছে।
তার মুখে যে শক্ত ভাবটা, সেটা আসলে রাগের না—বরং একধরনের জোর করে ধরে রাখা নিয়ন্ত্রণ। মানুষ যখন ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে, তখন অনেক সময় সে বাইরে আরও শক্ত হয়ে ওঠে। যেন নিজেকে বোঝাতে চায়—“আমি ঠিক আছি।” কিন্তু সেই শক্ত মুখের নিচে একটা অদৃশ্য চাপা আতঙ্ক লুকিয়ে থাকে—যদি সবকিছু হাতের বাইরে চলে যায়?
নীলা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। ভেতরে ঢোকার আগে সে নিজেকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আসলে প্রস্তুত হওয়ার মতো কিছু আর বাকি নেই তার ভেতরে। তার চোখদুটো ফাঁকা, যেন সে অনেক কিছু দেখেছে, কিন্তু এখন আর কিছু অনুভব করতে পারছে না। ধীরে ধীরে সে ভেতরে ঢুকল, পায়ের শব্দও যেন খুব মৃদু—যেন সে নিজেই নিজের উপস্থিতি লুকাতে চাইছে। কাদের সাহেব তাকালেন না। যেন তিনি জানেন—কে এসেছে, কেন এসেছে, কী বলবে—সবই আগেই ঠিক করা। তিনি শুধু বললেন, “মামলা শেষ।” কথাটা এমনভাবে বলা, যেন এটা কোনো আবেগহীন তথ্য, কিন্তু এই দুইটা শব্দের ভেতরে একটা চূড়ান্ততা আছে। একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। আরেকটা খুলতে যাচ্ছে—কিন্তু সেটা আলোয় না, অন্ধকারে।
তিনি একটু থামলেন, তারপর খুব ঠাণ্ডা, স্থির গলায় বললেন, “এইবার তোর বিয়া। এইবার আর কোনো কথা নাই।” এই কথাটার ভেতরে কোনো অনুরোধ নেই, কোনো প্রশ্ন নেই—শুধু নির্দেশ। যেন একজন বাবা তার মেয়ের সাথে কথা বলছেন না, বরং একজন বিচারক তার রায় ঘোষণা করছেন। নীলা চুপ করে রইল। তার ভেতরে যে ঝড় ওঠার কথা—রাগ, কান্না, প্রতিবাদ—কিছুই হলো না। সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল, যেন তার শরীর এখানে, কিন্তু মন অনেক আগেই এই ঘর ছেড়ে চলে গেছে। তার মনে হচ্ছিল, এই কথাগুলো সে নিজের জীবনের জন্য শুনছে না—কেউ যেন অন্য কারও জন্য সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, আর সে শুধু সেই গল্পের একটা চরিত্র।
কাদের সাহেব এবার তাকালেন। তার চোখে অস্থিরতা, বিরক্তি—“চুপ কইরা থাকলে চলবো না। যা বলতেছি, সেইটাই হইবো।” তার কণ্ঠে এমন একটা চাপা তাড়না, যেন তিনি ভয় পাচ্ছেন—যদি এই মেয়ে এখন কিছু বলে, কিছু ভেঙে পড়ে। নীলা ধীরে বলল, “আচ্ছা।” এই শব্দটা তার নিজের মনে হলো না। যেন সে বাইরে থেকে নিজের কণ্ঠ শুনছে। যেন তার ভেতরের মানুষটা চুপ করে আছে, আর বাইরে কেউ তার হয়ে কথা বলছে। এই “আচ্ছা” কোনো সম্মতি না—এটা আত্মসমর্পণ।
এই এক মুহূর্তে কাদের সাহেব নিজেও একটু থমকে গেলেন। তিনি হয়তো আশা করেছিলেন—নীলা কিছু বলবে, তর্ক করবে, কাঁদবে। কারণ সেই প্রতিক্রিয়াগুলো স্বাভাবিক। কিন্তু এই নিঃশব্দ মেনে নেওয়াটা অস্বাভাবিক। এটা ভয়ংকর। কারণ যখন মানুষ আর প্রতিবাদ করে না, তখন বুঝতে হয়—সে ভেতরে ভেতরে সব ছেড়ে দিয়েছে।
রাতে নিজের ঘরে বসে ছিল নীলা। আলো নিভানো। জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে। শহর ঠিক আগের মতোই চলছে—লাইট জ্বলছে, গাড়ি যাচ্ছে, দূরে কোথাও হাসির শব্দ ভেসে আসছে। এই স্বাভাবিকতা তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। মনে হচ্ছে—কিভাবে সবকিছু এত স্বাভাবিক থাকতে পারে, যখন তার ভেতরে সবকিছু থেমে গেছে?
সে নিজের হাতের দিকে তাকাল। হাতদুটো খুব চেনা, অথচ আজ অচেনা লাগছে। খুব আস্তে করে সে বলল, “আমি কি কারও জীবন নষ্ট করে দিচ্ছি?” প্রশ্নটা সে কারও কাছে করছে না। নিজের কাছেই। কিন্তু উত্তর নেই। শুধু নীরবতা। তার মাথায় একে একে কয়েকটা মুখ ভেসে উঠল—রাফি, যার চোখে সে একসময় নিজের ভবিষ্যৎ দেখেছিল; বাপ্পি, যে আজ জেলের ভেতরে, আর তার জীবনের একটা অংশ হয়ে থেকেও কিছুই ধরে রাখতে পারেনি; আর তার নিজের বাবা, যিনি তাকে ভালো রাখতে চান, কিন্তু সেই ভালো রাখার পথটাই তাকে ভেঙে দিচ্ছে।
এই তিনটা মানুষ, তিনটা আলাদা গল্প—কিন্তু কোথাও গিয়ে তারা সবাই তার সাথে জড়িয়ে গেছে। আর সেই জড়িয়ে যাওয়াটাই এখন তাদের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে ভাবল—“আমি না থাকলে হয়তো সহজ হইতো…” এই চিন্তাটা হঠাৎ আসে, আবার মিলিয়ে যায়। কিন্তু পুরোপুরি যায় না। একটা ছায়ার মতো থেকে যায়। অন্ধকারে, চুপচাপ। তার চোখে পানি আসে না। কাঁদতে পারছে না সে। এই না-কাঁদতে পারাটা আরও ভয়ংকর। কারণ কষ্ট যখন বের হতে পারে না, তখন সেটা ভেতরে জমে জমে মানুষকে ভেতর থেকেই ফাঁকা করে দেয়।
সাইফের বাড়ি। ড্রয়িংরুমের আলো জ্বলছে, কিন্তু পরিবেশ ভারী। তার বাবা সামনে বসে আছেন, মুখ গম্ভীর, চোখে একধরনের কঠোরতা—যেটা আসলে অভ্যাসের, বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা।
“তুই কি বললি?”—তার কণ্ঠে অবিশ্বাস, যেন তিনি ঠিক শুনতে চাননি।
সাইফ শান্তভাবে বলল, “আমি এই বিয়াটা করব না।” কথাটা বলার সময় তার গলা কাঁপেনি। কিন্তু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত টান অনুভব করছিল। কারণ সে জানে—এই একটা বাক্য তার জীবনের অনেক কিছু বদলে দেবে।
তার মা আস্তে বললেন, “কেন? সমস্যা কী?” তার কণ্ঠে উদ্বেগ, আবার একটু ভয়ও।
সাইফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “কারণ সে অন্য কাউরে ভালোবাসে।” এই কথাটা বলার সময় তার মনে হচ্ছিল—সে শুধু নীলার কথা বলছে না, নিজের কথাও বলছে। কারণ সে জানে—ভালোবাসা জোর করে হয় না।
তার বাবা ধীরে বললেন, “বিয়া মানে শুধু ভালোবাসা না। দায়িত্ব আছে, সম্মান আছে।” এই কথাটা তিনি বিশ্বাস করেন। তার কাছে জীবন মানে নিয়ম, কাঠামো, সামাজিক অবস্থান। সাইফ মাথা নাড়ল—“আমি জানি।” তারপর একটু থেমে বলল, “কিন্তু আমি আরেকটা মানুষরে ভাঙতে পারব না।” এই কথাটার ভেতরে তার নিজের অতীত লুকিয়ে আছে—আরিবার স্মৃতি, সেই দুর্ঘটনা, সেই হারিয়ে যাওয়া মুহূর্ত, যেটা সে আজও ভুলতে পারেনি।
তার মনে পড়ে—আরিবার হাসি, তার চোখের ভেতরের স্বপ্ন। আর তারপর হঠাৎ একদিন সব শেষ হয়ে যাওয়া। সেই দিন থেকে তার ভেতরে একটা অপরাধবোধ বাসা বেঁধে আছে। সে নিজেকে বারবার প্রশ্ন করে—“আমি যদি একটু বেশি কেয়ারফুল হতাম?” এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই, কিন্তু এটা তাকে ছাড়ে না। রাত গভীর হলে সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। শহরের আলো নিচে ছড়িয়ে আছে—ছোট ছোট বিন্দুর মতো। তার মাথায় বারবার একটা মুখ ভেসে উঠছে—শিউলি। তার সরলতা, তার সরাসরি কথা বলা, তার চোখের ভেতরের অদ্ভুত শক্তি। সাইফ বুঝতে পারে—এই মেয়েটার সাথে থাকলে তার আবার বাঁচতে ইচ্ছে করে। আবার হাসতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সেই সাথে একটা ভয়ও কাজ করে—সে কি আবার কাউকে হারাবে? আবার কাউকে কষ্ট দেবে? এই ভয়টা তার পিছু ছাড়ে না।
রাতটা খুব লম্বা। সময় এগোচ্ছিল, কিন্তু যেন ধীরে। একদিকে জেলের ভেতরে বাপ্পি চুপচাপ শুয়ে ছিল। ১২ বছর—সংখ্যাটা ছোট না। কিন্তু সে তবুও মেনে নিয়েছে। কারণ কখনো কখনো মানুষ বাঁচার জন্য না, মেনে নেওয়ার জন্য বাঁচে। অন্যদিকে, একটা অন্ধকার ঘরে নীলা বসে আছে—নিজেকে হারিয়ে ফেলছে ধীরে ধীরে। তার ভেতরে আলো নিভে যাচ্ছে, কিন্তু বাইরে কেউ সেটা দেখতে পাচ্ছে না। আরেকটা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সাইফ ভাবছে—সে কি নিজের সত্যিটা বেছে নেবে, নাকি আবার চুপ করে থাকবে? তিনটা আলাদা জায়গা, তিনটা আলাদা মানুষ—কিন্তু তাদের গল্পগুলো একসাথে বাঁধা। অদৃশ্য সুতোয়।
(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Like Reply
#23
পর্ব ১২ঃ

বারো বছর—সংখ্যাটা মুখে বললে যতটা হালকা লাগে, বেঁচে থাকলে ততটাই ভারী হয়ে বসে থাকে মানুষের ভেতরে। এই বারো বছরে সময় শুধু ক্যালেন্ডারের পাতায় এগোয় না, মানুষের ভেতরেও অনেক কিছু সরিয়ে দেয়, অনেক কিছু ভেঙে ফেলে, আবার নতুন কিছু গড়ে তোলে। যে মানুষটা একসময় ছিল, সে আর থাকে না—তার জায়গায় অন্য কেউ এসে দাঁড়ায়, যাকে বাইরে থেকে চিনলেও ভেতর থেকে চিনে ওঠা যায় না। এই সময়ের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে মানুষ শিখে ফেলে কীভাবে নিজের কষ্ট লুকাতে হয়, কীভাবে কিছু প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বেঁচে থাকতে হয়, আর কীভাবে কিছু অনুভূতিকে নিজের ভেতরের এক কোণে তালা মেরে রাখতে হয়। কিন্তু সব অনুভূতি কি তালা মেনে চলে? কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো সময়ের হিসাব মানে না। সেগুলো ঠিক থেকে যায়—পুরনো দেয়ালের ফাঁকে জমে থাকা ধুলোর মতো, চোখে পড়ে না, কিন্তু আঙুল দিয়ে ছুঁলেই বোঝা যায়, সেগুলো কখনো হারায়নি। নীলা গাড়ির ভেতরে বসে এই কথাগুলো ভাবছিল কি না, সেটা সে নিজেও জানে না, কিন্তু তার বুকের ভেতরে যে চাপা ভার, সেটা তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল—এই ফিরে আসাটা শুধু একটা জায়গায় ফেরা না, এটা একসাথে অনেকগুলো অসমাপ্ত গল্পের সামনে দাঁড়িয়ে পড়া।

পাড়াটা এখন আর আগের মতো নেই—এই কথাটা শুধু দেখেই বোঝা যায় না, অনুভব করলেই বোঝা যায়। যে গলিটা একসময় বিকেলের রোদে ধুলো উড়িয়ে দিত, সেই জায়গায় এখন পাকা রাস্তা, যেখানে ধুলো নেই, কিন্তু সেই পুরনো দিনের গন্ধও নেই। টিনের চালের ঘরগুলো একে একে ভেঙে গেছে, জায়গা নিয়েছে রঙ করা বিল্ডিং, যেগুলো দেখতে সুন্দর, কিন্তু ভেতরে সেই পুরনো উষ্ণতা নেই। দেয়ালে নতুন পোস্টার, ছাদে ডিশ অ্যান্টেনা, বারান্দায় ঝুলে থাকা কাপড়—সব মিলিয়ে একটা আধুনিকতার ছাপ, কিন্তু এই আধুনিকতার ভেতরেও কোথাও একটা শূন্যতা লুকিয়ে আছে। নীলা গাড়ির কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে করল, এই গলির বাঁকটা একসময় কত পরিচিত ছিল—এখানেই দাঁড়িয়ে তারা গল্প করত, হাসত, ঝগড়া করত, আবার মিটেও যেত। সেই চায়ের দোকানটা এখন নেই, কিন্তু জায়গাটা দেখলেই মনে হয়, যেন এখনো কেটলির ভেতর পানি ফুটছে, ধোঁয়া উঠছে, আর কেউ একজন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ডাকছে—“এই, চা খাইয়া যা।” এই স্মৃতিগুলো এত জীবন্ত, এত কাছের, যে মনে হয়, সময় এগোয়নি, সবকিছু ঠিক আগের মতোই আছে—শুধু মানুষগুলো নেই।

গাড়িটা যখন পাড়ার সামনে এসে থামল, তখন নীলার বুকের ভেতরে একবার কেমন করে উঠল। দরজা খুলে বাইরে নামার আগে সে এক সেকেন্ড চোখ বন্ধ করে নিল—নিজেকে প্রস্তুত করার মতো। তারপর ধীরে পা বাড়াল বাইরে। সাদা শাড়ি পরা, চুল পেছনে বাঁধা, তবুও কয়েকটা আলগা গোছা বাতাসে উড়ে এসে তার গালে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তার চোখের নিচে হালকা কালি—এই কালি শুধু ক্লান্তির না, এটা সময়ের চিহ্ন, রাত জেগে থাকা ভাবনার চিহ্ন, আর না বলা কষ্টের ছাপ। সে শিখে গেছে—সব অনুভূতি প্রকাশ করা যায় না, কিছু অনুভূতি শুধু নিজের ভেতরে বয়ে নিয়ে যেতে হয়, নিঃশব্দে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে একটা ধীরতা আছে, যেন সে তাড়াহুড়া করতে চায় না, আবার থেমেও থাকতে চায় না—মাঝামাঝি একটা জায়গায় আটকে আছে। গাড়ির অন্য পাশ থেকে রাফি নামল। তার চেহারায় এখন একটা পরিণত ভাব—যে ছেলেটা একসময় আবেগে সবকিছু ভাসিয়ে দিত, সে এখন হিসেব করে হাঁটে, ভেবে কথা বলে। কিন্তু তার চোখে এখনো একটা জায়গা আছে—যেটা নরম, ভঙ্গুর, আর সেটা সে কাউকে দেখায় না, শুধু নীলার সামনে ছাড়া। এই দুইজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে—দেখতে শান্ত, স্থির, কিন্তু ভেতরে দুজনেরই আলাদা আলাদা ঢেউ চলছে।

গাড়ির ভেতর থেকে শুভ্রের ছোট্ট কণ্ঠটা যখন ভেসে এলো—“মা… নামবো?”—তখন সেই ভারী পরিবেশের ভেতরেও একটা নরম মুহূর্ত তৈরি হলো। নীলা একটু ঝুঁকে ভেতরে তাকাল, তার মুখে খুব হালকা একটা হাসি এল—যেটা সে চাইলেও পুরোপুরি লুকাতে পারে না। “আয়, শুভ্র,” সে বলল, খুব নরম গলায়। ছেলেটা নেমে এলো, চারপাশে তাকাতে লাগল কৌতূহলী চোখে। এই জায়গাটা তার কাছে নতুন, কিন্তু সে বুঝতে পারছে—এই জায়গাটা তার মায়ের কাছে অন্যরকম। তার প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক—“এইটা কি নানুর বাসা?” কিন্তু এই স্বাভাবিক প্রশ্নটাই নীলার বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল—এই কয়েক সেকেন্ডের ভেতরে কত স্মৃতি, কত না বলা কথা, কত অভিমান ভেসে উঠল, আবার ডুবে গেল। তারপর খুব আস্তে বলল, “হ্যাঁ…” এই ‘হ্যাঁ’-এর ভেতরে শুধু একটা উত্তর না, একটা ইতিহাস আছে—যেটা শুভ্র এখনো বোঝে না।

বাড়ির সামনে ভিড়টা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল—এটা শোকের ভিড়। এই ভিড় সব জায়গায় একইরকম হয়—কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, যেন কী বলবে বুঝতে পারছে না; কেউ ফিসফিস করে কথা বলে, যেন অন্যের কষ্টটাও একটা গল্প হয়ে গেছে; কেউ চোখে পানি এনে সহানুভূতি দেখায়, আবার কেউ কৌতূহল লুকাতে পারে না। নীলা ভেতরে ঢুকতেই কয়েকটা মুখ ঘুরে গেল তার দিকে—কেউ চিনে ফেলেছে, কেউ নিশ্চিত না, কেউ পুরনো গল্প মনে করে ফিসফিস করছে। কিন্তু এই শব্দগুলো যেন তার কানে ঢুকছে না। তার চোখ শুধু এক জায়গায় গিয়ে থামল—ঘরের মাঝখানে, সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা শরীর। তার বাবা। এই একটা দৃশ্য দেখার জন্য সে কি প্রস্তুত ছিল? হয়তো না। হয়তো মানুষ কখনোই এই দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত হতে পারে না। তার পা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল, যেন সে সামনে এগোতে চাইছে, কিন্তু শরীর সাড়া দিচ্ছে না। তার ভেতরে একটা টান—একদিকে যেতে চায়, অন্যদিকে থেমে থাকতে চায়। এই দ্বিধাটা কয়েক সেকেন্ডের, কিন্তু অনুভূতিটা অনেক বড়।

রাফি তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, খুব চুপচাপ। সে জানে—এই মুহূর্তে কোনো কথা কাজে আসে না। সে শুধু খুব আস্তে করে নীলার হাতটা ধরল। এই স্পর্শে কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো বড় প্রতিশ্রুতি নেই—শুধু একটা নীরব নিশ্চয়তা, “আমি আছি।” এই একটা স্পর্শেই নীলা বুঝল—সে একা না, যদিও এই মুহূর্তটা তাকে একাই পার হতে হবে। সে ধীরে ধীরে সামনে এগোল, প্রতিটা পদক্ষেপ যেন ভারী হয়ে উঠছে। চাদরটা সরানোর আগে তার হাত কেঁপে উঠল—যেন সে ভয় পাচ্ছে, এই শেষ সত্যিটাকে সামনে থেকে দেখতে। তারপর যখন সে চাদরটা সরাল, তখন তার বাবার মুখটা চোখে পড়ল—চোখ বন্ধ, ঠোঁট শুকনো, মুখে একটা অদ্ভুত শান্তি। এই মানুষটা জীবনে কখনো সহজ ছিল না, কখনো নরম ছিল না, সবসময় কঠিন, নিয়ন্ত্রণে রাখা—কিন্তু আজ তার মুখে যে শান্তি, সেটা যেন সব হিসাব মিটিয়ে ফেলার পরের নীরবতা।

নীলার বুকটা তখন হঠাৎ ভেঙে গেল। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না—মাটিতে বসে পড়ল। তার হাত কাঁপতে কাঁপতে বাবার কপালে ছুঁল—ঠান্ডা। এই ঠান্ডাটা শুধু শরীরের না, এটা একটা শেষ হওয়ার ঠান্ডা, একটা চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার স্পর্শ। সে খুব আস্তে করে বলল, “আব্বা…” এই একটা শব্দের ভেতরে কত বছরের জমে থাকা অভিমান, রাগ, না বলা কথা, ভালোবাসা—সব একসাথে বেরিয়ে এলো। তার কান্না শব্দ করে না, কিন্তু পুরো শরীর কেঁপে উঠছে। এই কান্না শুধু আজকের না—এটা বহু বছরের, জমে থাকা, আটকে থাকা কান্না, যেটা বের হওয়ার সুযোগ খুঁজছিল। আশেপাশের মানুষজন চুপ করে তাকিয়ে আছে, কেউ কিছু বলছে না—কারণ এই মুহূর্তে কোনো কথাই যথেষ্ট না।

শুভ্র তখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখছিল। সে পুরোটা বুঝতে পারছে না, কিন্তু সে বুঝতে পারছে—তার মা ভেঙে পড়েছে। সে ধীরে ধীরে কাছে এসে মায়ের কাঁধে হাত রাখল—ছোট্ট, নরম একটা হাত। “মা… তুমি কাঁদো না…”—এই ছোট্ট বাক্যটা এত সরল, কিন্তু এর ভেতরে যে ভালোবাসা, যে নির্ভরতা, সেটা নীলার বুককে আরও ভারী করে দিল। সে ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরল—এই ছোট্ট মানুষটাই যেন তার বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ, সবচেয়ে বড় শক্তি। তার মাথায় একটা চিন্তা এল—যে ভালোবাসাটা সে তার বাবার কাছ থেকে পুরোপুরি পায়নি, সেটা কি সে তার ছেলেকে দিতে পারবে? এই প্রশ্নটা তাকে ভেতরে ভেতরে নেড়ে দিল।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল, আর মানুষজন ধীরে ধীরে চলে যেতে লাগল। বাড়িটা একটু ফাঁকা হলো, শব্দ কমে গেল, শুধু কিছু ফিসফাস আর দূরের আওয়াজ। নীলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। আকাশে হালকা চাঁদ উঠেছে—একই চাঁদ, যেটা সে ছোটবেলায় দেখত, একই আলো, একই আকাশ। কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা আর আগের মতো নেই। সে রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকল, ঠান্ডা লোহার স্পর্শ অনুভব করল। পেছন থেকে রাফির কণ্ঠ এলো—“চা খাবা?” সে ফিরে তাকাল—রাফির হাতে দুইটা কাপ। এই ছোট্ট প্রস্তাবের ভেতরে একটা স্বাভাবিকতা আছে, একটা চেষ্টা—সবকিছু আবার একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা। নীলা হালকা হাসল, “দাও…” তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে চা খেতে লাগল। কোনো বড় কথা নেই, কোনো প্রশ্ন নেই—তবুও এই নীরবতাটা অস্বস্তিকর না। বরং এই নীরবতার ভেতরে একটা নিরাপত্তা আছে।

রাফি ধীরে বলল, “এই বাড়িটা আগের মতোই আছে…”—এই কথাটা বলার সময় তার গলায় একটা স্মৃতি মেশানো সুর। নীলা একটু হেসে বলল, “হ্যাঁ… শুধু মানুষগুলো বদলাইছে…” এই একটা বাক্যের ভেতরে একটা গভীর সত্য লুকিয়ে আছে—সময় জায়গাকে বদলায়, কিন্তু মানুষকে আরও বেশি বদলায়। কিছুক্ষণ চুপ থেকে রাফি জিজ্ঞেস করল, “তুমি ঠিক আছো তো?”—প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে যে যত্ন, যে উদ্বেগ, সেটা নীলা স্পষ্ট বুঝতে পারে। সে তার দিকে তাকাল—এই মানুষটা, যাকে সে একসময় হারাতে বসেছিল, আজ তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তার স্বামী হয়ে, তার জীবনের অংশ হয়ে। সে বলল, “আমি ঠিক আছি…”—এই কথাটা পুরো সত্য না, আবার মিথ্যেও না। এটা একটা মাঝামাঝি জায়গা—যেখানে মানুষ নিজেকে সামলে রাখতে শেখে।

ভেতর থেকে শুভ্র ডাকল—“বাবা!”—এই ডাকটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু এর ভেতরে একটা পরিবার, একটা সম্পর্কের বাস্তবতা আছে। রাফি হাসল, “কি হইছে?”—“আমি ঘুমাবো…”—সে এগিয়ে গিয়ে শুভ্রকে কোলে তুলে নিল। এই দৃশ্যটা খুব সাধারণ—একজন বাবা তার ছেলেকে কোলে নিচ্ছে। কিন্তু নীলা এই দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে একটা অদ্ভুত শান্তি এল। এই মানুষটা—তার ছেলের বাবা, তার জীবনের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা, সবচেয়ে বড় ভরসা। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাকে মনে করিয়ে দেয়—সে একা না।

রাত আরও গভীর হলো। সবকিছু ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেল। নীলা তার পুরনো ঘরে বসে আছে। এই ঘরটা একসময় তার ছিল—এখানে তার শৈশব, তার স্বপ্ন, তার কষ্ট—সবকিছু জমা আছে। সে আলমারি খুলে একটা পুরনো ডায়েরি বের করল। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে, কিন্তু শব্দগুলো এখনো জীবিত। সে আঙুল দিয়ে পাতাগুলো ছুঁয়ে দেখল—যেন সে নিজের পুরনো সত্তাকে ছুঁতে চাইছে, সেই মেয়েটাকে, যে একসময় এত সহজ ছিল, এত নির্ভার ছিল। পেছন থেকে দরজার শব্দ হলো। রাফি ঢুকল, খুব আস্তে। “ঘুমাও নাই?”—তার গলায় ক্লান্তি, কিন্তু সাথে একটা যত্নও আছে। নীলা মাথা নাড়ল, “ঘুম আসতেছে না…”—এই কথাটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে অনেক কিছু আছে। রাফি পাশে এসে বসল, বলল, “চেষ্টা করো…”—তারপর একটু থামল। নীলা খুব আস্তে বলল, “তুমি থাকলে… সহজ লাগে…”—এই কথাটা শুনে রাফি তার হাতটা ধরল। “আমি তো আছিই…”—এই একটা বাক্যের ভেতরে একটা প্রতিশ্রুতি আছে, একটা স্থিরতা, যেটা বারো বছরেও ভাঙেনি। আর এই মুহূর্তে, এই নীরব ঘরের ভেতরে, এই ছোট্ট কথাগুলোই তাদের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

অন্যদিকে, অন্য এক শহরের একদম মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আলো ঝলমলে একটা অ্যাপার্টমেন্ট—বাইরে থেকে দেখলে যেন সবকিছু নিখুঁত। কাঁচের বারান্দায় শহরের আলো প্রতিফলিত হচ্ছে, দূরের গাড়ির হেডলাইটগুলো ছোট ছোট চলমান তারার মতো মনে হচ্ছে, আর ভেতরে সাজানো-গোছানো ড্রয়িংরুম, নরম সোফা, দেয়ালে ফ্রেম করা হাসিমুখের ছবি—সব মিলিয়ে একটা পরিপাটি, সফল, শান্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেই ঘরের মাঝখানে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে শিউলি। সে খুব মন দিয়ে নিজের চুল ঠিক করছে, একটা গোছা বারবার কানের পেছনে গুঁজে দিচ্ছে, আবার খুলে যাচ্ছে। তার মুখে একটা হাসি আছে—যেটা প্রথম দেখায় খুব স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়, এই হাসিটা পুরোপুরি নিজের না; এটা একটা অভ্যাস, একটা শেখা ভদ্রতা, একটা সামাজিক মুখোশ, যেটা মানুষ পরে নেয় যখন ভেতরের সবকিছু বাইরে দেখাতে চায় না। তার চোখে হালকা ক্লান্তি, কিন্তু সেই ক্লান্তিটাও সে লুকিয়ে রাখতে শিখেছে। পেছন থেকে সাইফ এসে দাঁড়ায়, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে, “রেডি?”—এই একটা প্রশ্নের ভেতরে কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো বিশেষ অনুভূতিও নেই, যেন প্রতিদিনের মতোই একটা দিন। শিউলি আয়নার ভেতর দিয়ে তার দিকে তাকায়, এক সেকেন্ডের জন্য মনে হয় সে কিছু বলতে চায়, হয়তো কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শুধু বলে, “হ্যাঁ…”। এই ‘হ্যাঁ’-এর ভেতরে কোনো গল্প নেই, কোনো প্রশ্ন নেই—শুধু একটা মেনে নেওয়া আছে। ঘরের বাতাসটা তখন খুব শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতরেই একটা চাপা টান লুকিয়ে আছে, যেটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতরে ধীরে ধীরে জমে ওঠে।

সবকিছু যেন ঠিকঠাকভাবেই এগোচ্ছিল, যতক্ষণ না সাইফ ওয়াশরুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়। দরজাটা বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই ঘরের শব্দগুলো একটু বদলে যায়—পানির শব্দ, টাইলসে প্রতিফলিত হওয়া হালকা প্রতিধ্বনি, আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলির নিঃশ্বাসের শব্দ। ঠিক তখনই টেবিলের ওপর রাখা ফোনটার স্ক্রিন হঠাৎ জ্বলে ওঠে। একটা ছোট্ট আলো, কিন্তু সেই আলো যেন পুরো ঘরটাকে আলাদা করে দেয়। শিউলির চোখ অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেদিকে চলে যায়। প্রথমে সে তাকাতে চায় না—নিজেকে বোঝায়, “না, এটা আমার দেখার বিষয় না।” কিন্তু মানুষের কৌতূহল কখনো কখনো যুক্তির চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়, ফোনটার কাছে দাঁড়ায়, স্ক্রিনে চোখ পড়ে—একটা মেসেজ। খুব ছোট, মাত্র তিনটা শব্দ—“Miss you today.” কোনো নাম নেই, শুধু একটা অচেনা নম্বর। এই ছোট্ট বাক্যটা যেন মুহূর্তের মধ্যে তার বুকের ভেতরে একটা ভারী পাথর বসিয়ে দেয়। তার শ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসে, আঙুলগুলো কাঁপতে চায়, কিন্তু সে নিজেকে থামিয়ে রাখে। কয়েক সেকেন্ড—খুব ছোট একটা সময়, কিন্তু তার ভেতরে অনেক কিছু ঘটে যায়। সে ভাবতে থাকে—এটা কে? কেন? কতদিন ধরে? কিন্তু কোনো প্রশ্নই সে জোরে বলে না। সে শুধু ফোনটা আবার আগের জায়গায় রেখে দেয়, ঠিক যেভাবে ছিল, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু আসলে সবকিছু হয়ে গেছে। তার ভেতরের সেই ছোট্ট, নীরব বিশ্বাসের জায়গাটায় একটা চিড় ধরেছে—শব্দহীন, কিন্তু গভীর।

সাইফ যখন ওয়াশরুম থেকে বের হয়, তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। সে স্বাভাবিকভাবেই তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বলে, “চলো?”—এই ‘চলো’ শব্দটা যেন একটা অভ্যাস, একটা রুটিন, কোনো আবেগ ছাড়াই বলা। শিউলি তার দিকে তাকায়, খুব স্বাভাবিক একটা হাসি দেয়—যে হাসিটা সে আয়নার সামনে অনুশীলন করছিল, আর বলে, “চলো…”। এই দুইটা শব্দের ভেতরে যে কতটা না-বলা কথা আটকে থাকে, সেটা কেউ বুঝতে পারে না। তারা দুজন একসাথে দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়—দেখতে একদম পারফেক্ট একটা দম্পতি। বাইরে থেকে দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না, কয়েক মিনিট আগে একটা ছোট্ট মেসেজ তাদের ভেতরের পৃথিবীটাকে একটু নড়িয়ে দিয়ে গেছে। লিফটে নামার সময় তারা দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু তাদের মাঝখানে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়—যেটা কেউ চোখে দেখতে পায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। সাইফ হয়তো কিছু বলতে চায়, আবার থেমে যায়। শিউলি কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়, কিন্তু নিজের ভেতরেই আটকে রাখে। এই না-বলা কথাগুলোই ধীরে ধীরে মানুষের সম্পর্কের ভেতরে জমে ওঠে—একসময় দেয়াল হয়ে যায়।

রাত আরও গভীর হতে থাকে, আর শহরটা ধীরে ধীরে তার নিজের ছন্দে ডুবে যায়। রাস্তার আলো জ্বলে থাকে, দূরের গাড়ির শব্দ কমে আসে, মানুষের ভিড় পাতলা হয়ে যায়। এই একই সময়ে, অন্য এক শহরে, অন্য এক ঘরে দাঁড়িয়ে আছে নীলা। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে বাইরে তাকিয়ে আছে—তার সামনে একটা সম্পূর্ণ জীবন। তার পাশে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে রাফি আর তাদের ছেলে শুভ্র। এই দৃশ্যটা এতটাই পূর্ণ, এতটাই শান্ত, যে বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে—এই তো সুখ, এই তো সম্পূর্ণতা। শুভ্র ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে নড়ে ওঠে, তার ছোট্ট হাতটা গিয়ে রাফির বুকে পড়ে, রাফি অজান্তেই সেই হাতটা ধরে ফেলে—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই একটা পরিবারের আসল ছবি। নীলা সেই দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে থাকে, তার চোখে একটা নরম আলো আসে, কিন্তু সেই আলোর ভেতরেও একটা প্রশ্ন লুকিয়ে থাকে। সে ধীরে ধীরে জানালার কাঁচে হাত রাখে—ঠান্ডা কাঁচ, বাইরে ঠান্ডা হাওয়া। তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করে, যেটা সে নিজেও পুরোপুরি বুঝতে পারে না। সে ভাবতে থাকে—সবকিছু তো ঠিক আছে, তাহলে এই অস্বস্তিটা কেন? এই হালকা চাপটা কেন? এই প্রশ্নগুলো সে কাউকে করে না—নিজেকেই করে, আর উত্তর না পেয়ে চুপ করে থাকে।

এইদিকে আবার শিউলি রাতের শেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বাড়িতে ফিরে এসেছে তারা, সবকিছু আবার স্বাভাবিক। সাইফ বিছানায় শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ, কিন্তু তার শ্বাসপ্রশ্বাস বলে দেয়—সে ঘুমায়নি। শিউলি আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকায়—গভীর, ক্লান্ত, একটু প্রশ্নবোধক। সে নিজের প্রতিচ্ছবিকে দেখে মনে করার চেষ্টা করে—এই মেয়েটা কে? সে কি সেই আগের শিউলি? যে সরাসরি কথা বলত, যে ভয় পেত না, যে নিজের অনুভূতিকে লুকাত না? নাকি সে এখন একটা নতুন মানুষ, যে সবকিছু বুঝেও না-বোঝার ভান করে? তার মাথার ভেতরে বারবার সেই তিনটা শব্দ ঘুরতে থাকে—“Miss you today.” এই শব্দগুলো এত ছোট, কিন্তু এত ভারী। সে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে, যেন নিজেকে থামাতে চায়। তারপর খুব আস্তে, প্রায় শোনা যায় না এমন একটা কণ্ঠে সে নিজেকেই জিজ্ঞেস করে—“আমি কি সুখী?” এই প্রশ্নটা এত সাধারণ, এত ছোট, কিন্তু এর উত্তর খুঁজতে গেলে মানুষ নিজের ভেতরের গভীরে ডুবে যায়। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, কোনো উত্তর আসে না। শুধু নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনে।

একই সময়ে, অন্য শহরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নীলাও একই রকম একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। সে খুব আস্তে ভাবে—“এইবার কি সব ঠিক আছে?” তার সামনে যে জীবনটা আছে, সেটা সে অনেক কষ্টে পেয়েছে। হারিয়েছে, লড়েছে, মেনে নিয়েছে—তারপর এই জায়গায় এসেছে। কিন্তু তবুও কেন মনে হয় কিছু একটা বাকি? কেন মনে হয়, সবকিছু থাকার পরেও কোথাও একটা ফাঁক থেকে গেছে? সে পেছনে তাকায়—রাফি আর শুভ্র ঘুমিয়ে আছে, শান্তভাবে। এই দৃশ্যটা তাকে একটা নিরাপত্তা দেয়, একটা নিশ্চয়তা দেয়, কিন্তু সেই সাথে একটা অদ্ভুত ভয়ও জাগায়—যদি এই শান্তিটা একদিন ভেঙে যায়? যদি এই সম্পূর্ণতাটা আসলে ভেতরে ভেতরে অসম্পূর্ণ হয়? সে জানে না। সে শুধু জানে, এই প্রশ্নগুলোর কোনো সহজ উত্তর নেই।

রাত তখন আরও গভীর। দুইটা আলাদা শহর, দুইটা আলাদা ঘর, চারজন মানুষ—সবাই তাদের নিজ নিজ জায়গায় আছে। বাইরে থেকে সবকিছু ঠিকঠাক, সবকিছু সাজানো, সবকিছু স্থির। কিন্তু ভেতরে? ভেতরে চারটা আলাদা মন, চারটা আলাদা লড়াই, চারটা আলাদা প্রশ্ন। কেউ জোরে কিছু বলছে না, কেউ কাঁদছে না, কেউ ভেঙে পড়ছে না—তবুও ভেতরে ভেতরে অনেক কিছু ঘটছে। কারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো সবসময় শব্দ করে হয় না। কিছু পরিবর্তন নিঃশব্দে আসে, ধীরে ধীরে জায়গা নেয়, আর একসময় মানুষ বুঝতে পারে—সে আগের মতো নেই। সেই রাতটা এমনই একটা রাত। যেখানে কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো বড় ঘটনা নেই, তবুও সবকিছু বদলে যাচ্ছে। আর সেই বদলটা কেউ থামাতে পারছে না।

শেষ পর্যন্ত, কেউ কোনো উত্তর পায় না। শিউলির প্রশ্নটা বাতাসে ঝুলে থাকে—“আমি কি সুখী?” নীলার প্রশ্নটাও হারিয়ে যায় রাতের ভেতরে—“এইবার কি সব ঠিক আছে?” আর এই প্রশ্নগুলোর কোনো জবাব আসে না। শুধু সময় এগিয়ে যায়, রাত ফুরোয়, ভোর আসে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন থাকে—যেগুলো সময়ও মুছে দিতে পারে না। কারণ সুখ কখনো শুধু পাওয়া দিয়ে মাপা যায় না—কখনো কখনো সুখ নিজেই একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, আর মানুষ সারা জীবন ধরে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকে।

(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Like Reply
#24
পর্ব ১৩:

পাড়াটা এখন আর আগের মতো নেই—এই কথাটা প্রায় সবাই বলে, কিন্তু এই “না থাকা”টার ভেতরেই আসলে সবচেয়ে বড় ভুলটা লুকিয়ে আছে। পাড়াটা একই আছে, শুধু তার শরীরটা বদলেছে, তার গায়ের চামড়াটা নতুন হয়েছে, কিন্তু ভেতরের হাড়গোড়, ভেতরের স্মৃতিগুলো, ভেতরের চাপা শব্দগুলো—সব আগের মতোই রয়ে গেছে। যেন একটা মানুষ, যে বাইরে থেকে নতুন জামা পরে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার ভেতরে পুরনো ক্ষতগুলো এখনও শুকায়নি। যে গলিটার ভেতর দিয়ে একসময় বিকেলের দিকে হাঁটলে পায়ের নিচে শুকনো মাটির ধুলো কচমচ শব্দ করত, সেই গলিটা এখন পাকা, মসৃণ, চকচকে—কিন্তু এই মসৃণতার ভেতরেও কোথাও একটা খসখসে অস্বস্তি লুকিয়ে আছে। যারা আগে এই গলি চিনত, তারা হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে যায়—কারণ তাদের মনে হয়, এই জায়গাটা ঠিক একই না, আবার পুরোপুরি আলাদাও না। গলির শুরুতে যে টিনের চায়ের দোকানটা ছিল, যার ছাউনি বৃষ্টির সময় টপটপ করে পানি পড়ত, আর ভেতরে বসে লোকজন গালাগালি করতে করতে চা খেত—এখন সেটা আধা-পাকা হয়েছে। টিনের ওপর প্লাস্টিকের শেড, পাশে একটা ছোট ফ্রিজ, ভেতরে ঠান্ডা পানীয়, সামনে ঝুলছে মোবাইল রিচার্জের সাইনবোর্ড—সব মিলিয়ে একটা আধুনিকতার ছাপ। তবুও সেই পুরনো কাঠের বেঞ্চটার এক কোণ এখনও বাঁকা, সেখানে বসলে শরীর একটু হেলে যায়, আর সেই হেলে যাওয়ার অনুভূতিটা যেন বলে—“সব ঠিক হয় নাই।” বাতাসে এখন সিমেন্টের গন্ধ, নতুন রঙের তীব্রতা, কিন্তু মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টির পর যখন মাটির গন্ধ ওঠে, তখন মনে হয়—এই জায়গাটা এখনও তার পুরনো গল্পগুলো ভুলে যায়নি, শুধু একটু লুকিয়ে রেখেছে।
দুপুরের দিকে কয়েকটা ছেলে এসে জড়ো হয় ওই দোকানের সামনে, নতুন প্রজন্ম, নতুন ভাব, নতুন রঙ—কিন্তু ভেতরের গল্পটা খুব আলাদা না। তাদের চুলের স্টাইল আলাদা, হাতে দামি স্মার্টফোন, চোখে এমন এক ধরনের আত্মবিশ্বাস, যেটা কখনো কখনো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে, কারণ তারা ভাবে তারা সব বুঝে গেছে, সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তারা জোরে কথা বলে, হাসে, একে অপরকে ঠাট্টা করে, আবার হঠাৎ চুপ হয়ে যায়—যেন তাদের ভেতরে একটা অদৃশ্য সেন্সর কাজ করে, “এখন চুপ থাক, কেউ শুনতেছে।” একজন সিগারেট ধরায়, ধোঁয়াটা একটু বেশি স্টাইল করে ছাড়ে, যেন সে নিজের একটা ইমেজ তৈরি করছে। আরেকজন বলে—“এইখানে দাঁড়াইস না, ক্যামেরা আছে”—এই কথাটা বলার সময় তার চোখে একটা অদ্ভুত সতর্কতা, যেন সে জানে কোথায় দাঁড়ালে ধরা পড়তে হয়, আর কোথায় দাঁড়ালে অদৃশ্য থাকা যায়। কিন্তু সিগারেটটা নিভায় না—কারণ তার ভেতরে একটা বিদ্রোহ আছে, একটা “আমারে কিছু হবে না” টাইপের বিশ্বাস। তাদের কথাবার্তার ভেতর দিয়ে বোঝা যায়—সময় বদলেছে, অপরাধের ভাষা বদলেছে, কিন্তু ইচ্ছাটা বদলায়নি। আগে চুরি মানে ছিল কারও ঘরে ঢুকে জিনিস নিয়ে আসা, এখন চুরি মানে কারও ফোন হ্যাক করা, কারও ব্যক্তিগত ছবি নিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা, কারও বিশ্বাসকে অস্ত্র বানানো। কাজ একই—মানুষকে ব্যবহার করা—শুধু হাতিয়ারটা এখন স্ক্রিনের ভেতরে চলে গেছে। এই ছেলেগুলোর চোখে মাঝে মাঝে একটা ভয় ঝলক দেয়—কিন্তু তারা সেটাকে সঙ্গে সঙ্গে চাপা দিয়ে ফেলে, কারণ তারা শিখে গেছে, ভয় দেখানো যাবে না, ভয়কে শক্তি বানিয়ে দেখাতে হবে।
এই ছেলেদের কথার ভেতর একটা নাম বারবার উঠে আসে—রকি। নামটা উচ্চারণ করার সময় তারা একটু নিচু গলায় বলে, একটু সাবধানে বলে, যেন নামটার ভেতরেই একটা অদৃশ্য নিয়ম আছে। রকি এখন আর সেই আগের ছেলেটা নেই, যে হুটহাট রেগে যেত, যার চোখে সবসময় আগুন জ্বলত। এখন সে ধীর, ভারী, হিসেবি—একটা শিকারি প্রাণীর মতো, যে দৌড়ায় না, অপেক্ষা করে। তার গলায় মোটা সোনার চেইন, শরীরটা একটু ভারী হয়েছে, হাঁটার ভঙ্গিতে একটা অলস ক্ষমতা—যেন সে জানে, তাকে তাড়াহুড়ো করতে হবে না, কারণ সময় নিজেই তার জন্য থেমে থাকে। সে দোকানের সামনে এসে দাঁড়াতেই ছেলেগুলোর হাসি থেমে যায়, কেউ আর জোরে কথা বলে না, একটা চাপা নীরবতা নেমে আসে। “কী খবর?”—সে জিজ্ঞেস করে, গলায় কোনো রাগ নেই, কিন্তু সেই শান্ত স্বরের ভেতরেই একটা চাপা হুমকি থাকে। একজন বলে—“ভালো ভাই”—আরেকজন একটু এগিয়ে এসে বলে—“কালকের কাজটা সেট হইছে।” রকি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, এমনভাবে তাকায় যেন সে শুধু কথাটা শুনছে না, কথার পেছনের উদ্দেশ্যটাও বুঝে ফেলছে। তারপর ধীরে মাথা নাড়ে—“কাজ করবি, ঠিক আছে। কিন্তু মাথা ব্যবহার করবি। এখনকার সময় আগের মতো না।” তার গলার স্বর নিচু, কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন ভেতরে ঢুকে বসে যায়। সে সিগারেট ধরায়, ধোঁয়াটা ধীরে ছাড়ে, তারপর বলে—“আগে লোকজন ভয় পাইত। এখন ভয় পায় না—কারণ ভয় দেখতে পায় না। ভয়টারে invisible করতে হয়।” এই কথাটা বলার সময় তার চোখে একটা ঠান্ডা স্থিরতা, যেন সে এই খেলার নিয়ম অনেক আগেই শিখে ফেলেছে। ছেলেগুলো চুপ করে শোনে, কেউ হাসে না, কেউ কিছু বলে না—কারণ তারা বুঝে গেছে, এই কথাগুলো মজা না, এই কথাগুলো নিয়ম।
দোকানের ভেতরে মমতা চা ঢালছিল, তার হাত থামে না, কিন্তু তার কান একটাও শব্দ মিস করে না। তার মুখে আগের সেই কোমলতা নেই, চোখের নিচে কালি জমেছে, চুলে কিছু সাদা রেখা দেখা যাচ্ছে। সময় তাকে শুধু বয়স দেয়নি, তাকে শক্ত করেছে, তাকে শিখিয়েছে কিভাবে চুপ করে থাকতে হয়। সে চা এগিয়ে দেয়—“নাও”—রকি কাপটা নেয়, একটু তাকায় তার দিকে—“আপা, দোকানটা ভালো চালাইতেছেন।” মমতা হালকা হাসে, কিন্তু সেই হাসিটা খুব দ্রুত মরে যায়—“চালাইতেই তো হইবো।” এই একটা লাইনের ভেতর তার পুরো জীবনটা লুকিয়ে আছে—কেউ নেই, থামার জায়গা নেই, শুধু চালিয়ে যেতে হবে। রহিম চাচা এখন আর দোকানে বসেন না, দোকানের পেছনের ঘরে শুয়ে থাকেন। দুপুরের দিকে তার কাশি বেড়ে যায়, রাতে ঘুম আসে না, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়—মনে হয় প্রতিটা শ্বাস তার শরীর থেকে কিছু একটা নিয়ে যাচ্ছে। মমতা মাঝে মাঝে গিয়ে দেখে—তার বুক ধীরে উঠছে-নামছে, যেন প্রতিটা নিঃশ্বাস একটা লড়াই। একদিন বিকেলে বৃষ্টি হচ্ছিল, দোকানে লোক কম, মমতা ভেতরে গিয়ে দেখে—রহিম চাচা জানালার দিকে তাকিয়ে আছে, তার চোখে একটা ফাঁকা দৃষ্টি, যেন সে কিছু দেখছে না, তবুও তাকিয়ে আছে। “কিছু লাগবো?”—মমতা জিজ্ঞেস করে। “না”—তিনি বলেন, ছোট, ক্লান্ত একটা উত্তর। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেই বলেন—“রকি আছিল?” এই প্রশ্নটার ভেতরে একটা ভয় আছে, একটা অজানা আশঙ্কা। মমতা একটু থেমে বলে—“ছিল।” এই এক শব্দের ভেতরে কত কিছু—অভ্যাস, ভয়, মেনে নেওয়া। রহিম চাচা চোখ বন্ধ করেন, তার মুখে একটা ক্লান্তি নেমে আসে, যেন তিনি জানতেন—এই উত্তরটাই আসবে, তবুও শুনে নিতে হলো।
বাইরে বৃষ্টি থেমে যায়, কিন্তু বাতাসে একটা ভেজা গন্ধ রয়ে যায়, মাটির গন্ধ, স্মৃতির গন্ধ, আর কোথাও একটা অদৃশ্য অস্বস্তি। এই পাড়াটা বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু ভেতরের গল্পগুলো বদলায়নি—শুধু নতুন চরিত্র এসেছে, পুরনো চরিত্রগুলো একটু চুপ হয়ে গেছে। আর এই চুপ করে থাকা জায়গাগুলোই সবচেয়ে বিপজ্জনক—কারণ সেখানেই গল্প জমে, সেখানেই বিস্ফোরণ হয়, সেখানেই মানুষ বদলে যায়।

সন্ধ্যার আলোটা ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে, যেন আকাশ নিজেই রঙ পাল্টে একটা নতুন মেজাজ নিচ্ছে, আর ঠিক সেই সময়েই পাড়ার ভেতর হঠাৎ করে একটা খবর ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে—“বাপ্পি আইছে।” প্রথমে কথাটা কেউ ঠিক বিশ্বাস করে না, কারণ কিছু নাম আছে যেগুলো একবার হারিয়ে গেলে মানুষ নিজের মনকে বোঝায়—ওগুলো আর ফিরবে না। কিন্তু তবুও, মানুষের কৌতূহল কখনো মরে না। কেউ একজন চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলে—“আমি নিজের চোখে দেখছি”—আর এই একটা বাক্যই যথেষ্ট। তারপর খবরটা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে, গলির ভেতর থেকে ছাদে, ছাদ থেকে দোকানে, দোকান থেকে ঘরের ভেতরে—যেন বাতাস নিজেই এই নামটা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যারা একসময় বাপ্পির সাথে বসে আড্ডা দিয়েছে, তারা হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। যারা তাকে ভয় পেত, তারা একটু অস্বস্তিতে পড়ে। আর যারা তাকে ভুলে যেতে চেয়েছিল, তাদের বুকের ভেতরটা হালকা করে কেঁপে ওঠে। কারণ কিছু মানুষকে ভুলে থাকা যায়, কিন্তু তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনাটাকে কখনো পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না।
রাত একটু গভীর হওয়ার পর তাকে দেখা গেল—চা দোকানের সামনে, একা দাঁড়িয়ে। তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটা অদ্ভুতভাবে শান্ত, যেন সে কোথাও তাড়াহুড়ো করে পৌঁছাতে চায় না, বরং সময়কে নিজের দিকে আসতে দিচ্ছে। তার চেহারায় সময়ের ছাপ স্পষ্ট—চুল ছোট করে কাটা, মুখে খসখসে দাড়ি, শরীর আগের থেকে শুকনো কিন্তু তার ভেতরে একটা শক্ত ভাব জমে উঠেছে, যেটা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বদলেছে তার চোখ। আগে সেই চোখে একটা অস্থিরতা ছিল, একটা দৌড় ছিল—ভয়, লজ্জা, রাগ, সবকিছু মিশে থাকত। এখন সেখানে শুধু স্থিরতা। ঠান্ডা, হিসেবি, অদ্ভুতভাবে ফাঁকা একটা স্থিরতা—যেন সে সবকিছু দেখে, কিন্তু কিছুই তাকে আর নাড়িয়ে দিতে পারে না। এই ধরনের চোখ সাধারণত সেই মানুষদের হয়, যারা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলে, তারপর একসময় বুঝে যায়—আর কিছু হারানোর নেই।
সে ধীরে দোকানের ভেতরে ঢোকে। মমতা তখন চা ঢালছিল, তার হাতের গতি এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়, কিন্তু সে সেটা লুকানোর চেষ্টা করে। বাপ্পি নিচু গলায় বলে—“এক কাপ চা দিবেন?” এই কণ্ঠে কোনো চাপ নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কিন্তু একটা পরিষ্কার দৃঢ়তা আছে—যেন সে জানে, তার কথার জন্য কেউ না বলবে না। মমতা তাকায় তার দিকে, আর তাদের চোখে চোখ পড়ে। সেই এক মুহূর্তে সময়টা যেন একটু থেমে যায়। বহু বছর আগের একটা রাত, কিছু অসমাপ্ত কথা, কিছু না বলা অনুভূতি—সব একসাথে ফিরে আসে, আবার মিলিয়েও যায়। সে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করে—“চিনি কম?” বাপ্পি হালকা মাথা নাড়ে—“আগের মতো।” এই “আগের মতো” কথাটা যেন বাতাসে ঝুলে থাকে, কারণ দুজনেই জানে—কিছুই আর আগের মতো নেই, তবুও এই ছোট্ট অভ্যাসগুলো মানুষ ধরে রাখে, যেন নিজেকে মনে করাতে পারে—সবকিছু পুরোপুরি বদলায়নি।
দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলো চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তারা জানে না পুরো গল্পটা, কিন্তু তারা বুঝতে পারে—এই মানুষটা আলাদা। অন্যরকম। তাদের চোখে একটা মিশ্র অনুভূতি—কৌতূহল, ভয়, আর আকর্ষণ। কারণ তারা এমন কাউকে দেখছে, যে তাদের মতো না, কিন্তু তারা যেরকম হতে চায়—অথবা ভয় পায় হয়ে যেতে। দূরে দাঁড়িয়ে রকি সবকিছু দেখছিল। তার চোখে একটা হিসেবি দৃষ্টি, যেন সে পরিস্থিতিটাকে মাপছে, বুঝতে চাইছে—এই ফিরে আসাটা তার জন্য সুযোগ, না ঝুঁকি। সে ধীরে এগিয়ে আসে, তার উপস্থিতিতেই চারপাশের বাতাস একটু ভারী হয়ে ওঠে। “কেমন আছিস?”—সে জিজ্ঞেস করে, গলায় একটা হালকা হাসি, কিন্তু চোখে না। বাপ্পি তাকায় তার দিকে, কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে, যেন সে এই মানুষটাকে নতুন করে পড়ছে। তারপর বলে—“ভালো।” এই “ভালো” শব্দটা এমনভাবে বের হয়, যেন এটা কোনো উত্তর না, শুধু একটা দরজা বন্ধ করার উপায়।
রকি বুঝতে পারে—এই মানুষটা আগের বাপ্পি না। আগের সেই আবেগী, ভুল করা ছেলেটা কোথাও নেই। তার জায়গায় এসেছে এমন একজন, যে চুপচাপ থাকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে হিসাব করে। “কিছু করবি?”—রকি জিজ্ঞেস করে, কথাটা হালকা, কিন্তু এর ভেতরে একটা অফার আছে, একটা প্রলোভন আছে। বাপ্পি হালকা হাসে—একটা ছোট, অদ্ভুত হাসি—যেটা পুরোপুরি বোঝা যায় না। “দেখি”—সে বলে। এই “দেখি” শব্দটা অন্যরকম। এর ভেতরে দ্বিধা নেই, ভয় নেই—বরং একটা অদৃশ্য পরিকল্পনা আছে, যেটা সে কাউকে দেখাচ্ছে না। রকি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে, তারপর বুঝতে পারে—এই মানুষটাকে ব্যবহার করা সহজ হবে না। আর এই উপলব্ধিটাই তাকে একটু অস্বস্তিতে ফেলে।
রাতটা অদ্ভুতভাবে শান্ত থাকে, কিন্তু সেই শান্তি স্বস্তির না, বরং ঝড়ের আগের থেমে থাকা বাতাসের মতো। নতুন ছেলেগুলো ছাদে জড়ো হয়, মোবাইলের আলো তাদের মুখে পড়ে, তারা ফিসফিস করে কথা বলে—“ওই বাপ্পি ভাই কি আবার নামবে?” একজন বলে—“ওর চোখ দেখছিস? ওরে দিয়ে অনেক কিছু করা যাবে।” তাদের কণ্ঠে উত্তেজনা আছে, তারা ভাবে—সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায়, মানুষকে ব্যবহার করা যায়। তারা এখনো বোঝে না—যে মানুষ নিজের ভেতরে হিসাব করতে শিখে গেছে, যে মানুষ নিজের ভয়কে মেরে ফেলেছে, তাকে আর কেউ ব্যবহার করতে পারে না। সে নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়, নিজেই পথ বেছে নেয়, আর সেই পথ কখনো কখনো অন্যদের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।
ওদিকে বাপ্পি একা হাঁটছে গলির ভেতর দিয়ে। এই গলিটা তার চেনা, প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা মোড় তার মনে আছে। একটা জায়গায় এসে সে থামে—দেয়ালের পাশে। এই জায়গায় একসময় তার হাত কাঁপত, শ্বাস দ্রুত হয়ে যেত, বুকের ভেতরটা ধুকপুক করত। সেই রাতটা তার মনে পড়ে—অস্থিরতা, ভয়, আর একটা ভুল সিদ্ধান্ত, যেটা তার জীবন বদলে দিয়েছিল। কিন্তু আজ—সবকিছু স্থির। তার শ্বাস ধীর, চোখ শান্ত। সে পকেট থেকে একটা পুরনো কয়েন বের করে, আঙুলের মধ্যে ঘোরাতে থাকে। এই ছোট্ট কাজটা যেন তার নিজের সাথে একটা সংযোগ—একটা অভ্যাস, যা তাকে মনে করিয়ে দেয়—সে এখনও মানুষ, পুরোপুরি পাথর হয়ে যায়নি।
তার চোখে কোনো আবেগ নেই, কিন্তু তার ভেতরে কিছু চলছে—একটা ঠান্ডা, স্পষ্ট হিসাব। কে কোথায় আছে, কে কী চায়, কে কীভাবে ব্যবহার করে—সব সে দেখছে, মেপে নিচ্ছে। তার মাথার ভেতর যেন একটা বোর্ড গেম চলছে, যেখানে প্রতিটা মানুষ একটা ঘুঁটি। কিন্তু সে জানে—এই খেলাটা সে এবার নিজের নিয়মে খেলবে। বৃষ্টি আবার পড়তে শুরু করে, হালকা, ধীরে, টিনের ছাদে টুপটাপ শব্দ করে। এই শব্দটা একসময় তাকে অস্থির করত, এখন শান্ত করে। পাড়ার বাতিগুলো একে একে নিভে যায়, অন্ধকার ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।
সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, দরজা বন্ধ করে, নিজেদের নিরাপত্তার ভেতরে ঢুকে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ আছে—যারা ঘুমায় না। তারা অন্ধকারে বসে থাকে, অপেক্ষা করে। কারণ তারা জানে—সময় সবসময় একই থাকে না, একটা সময় আসে, যখন সবকিছু বদলায়। আর যারা সেই সময়টার জন্য প্রস্তুত থাকে, তারাই জিতে যায়। বাপ্পি দাঁড়িয়ে থাকে সেই অন্ধকার গলির ভেতরে, বৃষ্টির ফোঁটা তার কাঁধে পড়ে, আর তার চোখে ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত আলো জ্বলে ওঠে—না রাগের, না দুঃখের—শুধু সিদ্ধান্তের। সে জানে—তার গল্প শেষ হয়নি। বরং, আসল গল্পটা এখন শুরু হতে যাচ্ছে।

(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Like Reply
#25
পর্ব ১৪: 

পাড়ার ভেতর এমন এক ধরনের অস্বস্তি ধীরে ধীরে জমে উঠছিল, যেটা কেউ সরাসরি দেখতে পায় না, কিন্তু সবাই আলাদা আলাদাভাবে অনুভব করে—যেন হঠাৎ করে বাতাস একটু ভারী হয়ে গেছে, নিঃশ্বাস নিতে গেলে বুকের ভেতর অচেনা একটা চাপ পড়ে। মানুষজন ঠিক আগের মতোই চলাফেরা করছে, চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে, হাসছে, গল্প করছে, কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে, একটা থেমে যাওয়া মুহূর্ত, যেখানে শব্দ নেই—শুধু অনুভূতি। এই অনুভূতিটা কেউ নাম দিতে পারছে না, তবুও সেটা আছে, এবং দিন যত যাচ্ছে, ততই সেটা গভীর হচ্ছে। বাপ্পি এই অদৃশ্য অনুভূতিটাকেই গড়ে তুলছিল, যেন একজন চিত্রশিল্পী ধীরে ধীরে একটা ছবি আঁকে—প্রথমে হালকা রেখা, তারপর রঙ, তারপর ছায়া—আর শেষে এমন একটা দৃশ্য তৈরি হয়, যেটা দেখে মানুষ থমকে যায়, কিন্তু বুঝতে পারে না কেন। সে আর আগের মতো তাড়াহুড়া করে না, তার চোখে আর সেই বেপরোয়া আগুন নেই—এখন সেখানে আছে হিসেব, ঠান্ডা, ধীর, এবং খুব নির্ভুল। সে জানে কোথায় আঘাত করতে হয়, কখন করতে হয়, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কীভাবে এমনভাবে করতে হয়, যেন কেউ বুঝতেই না পারে। রকির সাম্রাজ্যটা বাইরে থেকে যতটা শক্ত মনে হয়, ভেতরে সেটা ততটাই ভঙ্গুর—যেন একটা সুন্দর শরীর, যেটার চামড়া মসৃণ, আকর্ষণীয়, কিন্তু ভেতরে কোথাও কোথাও জমে আছে ক্লান্তি, জমে আছে ক্ষত। বাপ্পি সেই ক্ষতগুলো খুঁজে বের করছিল, খুব সাবধানে, যেন আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে দেখছে—কোথায় চাপ দিলে মানুষ কেঁপে ওঠে। একটা দোকান হঠাৎ করে টাকা দিতে চায় না, একটা লোক হঠাৎ করে গা ঢাকা দেয়, একটা এলাকায় হঠাৎ করে পুলিশ দেখা যায়—সবকিছু যেন আলাদা আলাদা ঘটনা, কিন্তু আসলে সবকিছু একটা সুতোয় বাঁধা, আর সেই সুতোটা কার হাতে আছে—সেটা কেউ দেখতে পাচ্ছে না। এই না-দেখাটাই ভয়ঙ্কর, কারণ মানুষ যেটা দেখতে পায় না, সেটাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। বাপ্পি এই ভয়টাকেই নিজের অস্ত্র বানাচ্ছিল, ধীরে ধীরে, নিশ্চিতভাবে, যেন সে জানে—শেষটা তার দিকেই যাবে।
রকির লোক সুমন ছিল এমন একজন, যার উপস্থিতি আলাদা করে বোঝা যেত—তার হাঁটার ভঙ্গি, তার কথা বলার ধরন, তার হাসি—সবকিছুতেই একটা আত্মবিশ্বাস ছিল, যেন সে নিজেই নিজের ছায়াকে ভয় পায় না। সে যখন রাতে টাকা তুলতে বের হতো, তখন পাড়ার বাতাস একটু বদলে যেত—দোকানদাররা চোখ নামিয়ে ফেলত, কেউ কেউ ব্যস্ত হয়ে যেত, যেন হঠাৎ করে খুব জরুরি কিছু মনে পড়ে গেছে। সুমনের একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল—সে একই সঙ্গে ভয় দেখাতে পারত, আবার হাসতেও পারত, আর এই দুইয়ের মাঝামাঝি কোথাও সে মানুষকে আটকে রাখত। কিন্তু সেই মানুষটাই এক রাতে আর ফিরল না—কোনো শব্দ নেই, কোনো চিৎকার নেই, শুধু হঠাৎ করে তার না-থাকা। প্রথমে কেউ খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি, কারণ এই লাইনের মানুষজন মাঝে মাঝেই হারিয়ে যায়, আবার ফিরে আসে। কিন্তু যখন পরদিন সকালে তার ফোনটা ড্রেনের পাশে পাওয়া গেল, স্ক্রিন ভাঙা, সিম উধাও—তখন একটা ঠান্ডা শূন্যতা ছড়িয়ে পড়ল। এই ঘটনাটা আর সাধারণ রইল না, এটা হয়ে গেল একটা বার্তা। কেউ জোরে কিছু বলল না, কিন্তু খুব আস্তে একটা নাম উচ্চারণ করা হলো—“বাপ্পি…” এই নামটা বলার সময় মানুষ চারপাশে তাকায়, যেন শব্দটাই বিপদ ডেকে আনতে পারে। এই ভয়টা সরাসরি না, এটা শরীরের খুব কাছে এসে দাঁড়ানো ভয়—যেটা সরাতে ইচ্ছে করে, কিন্তু সাহস হয় না। কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না, কেউ নিশ্চিত না, কিন্তু সবার ভেতরে একটা বিশ্বাস তৈরি হয়ে গেল—এটা কাকতালীয় না। এই অদৃশ্য আঘাত মানুষকে সবচেয়ে বেশি ভাঙে, কারণ তারা বুঝতে পারে—যে মারছে, সে সামনে আসছে না। আর এই অদৃশ্য শত্রুর সাথে লড়াই করা মানে নিজের ছায়ার সাথে লড়াই করা—যেখানে প্রতিটা আঘাতের উৎস অজানা। সুমনের না-ফেরাটা শুধু একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া না, এটা একটা সূচনা—একটা পরিবর্তনের, যেটা আর থামবে না।
রকি প্রথমে এই পরিবর্তনটাকে অস্বীকার করেছিল, কারণ সে অভ্যস্ত ছিল সরাসরি লড়াইয়ে—যেখানে প্রতিপক্ষ সামনে দাঁড়ায়, চোখে চোখ রাখে, কথা বলে। কিন্তু এখানে কেউ সামনে আসছে না, শুধু তার চারপাশটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকায়—তার চোখে এখনো সেই আগের শক্তি আছে, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা অস্বস্তি ঢুকে গেছে, যেটা সে চেনে না। সে হিসাবের খাতা খুলে বসে, প্রতিটা সংখ্যা দেখে, আর হঠাৎ করে তার আঙুল থেমে যায়—সংখ্যা মিলে না। এই না-মেলা সংখ্যার ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটা সত্যি, যেটা সে এড়িয়ে যেতে পারবে না। সে আবার হিসাব করে, আবার দেখে, কিন্তু ভুল নেই—মানে সমস্যা আছে। তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে ওঠে, কিন্তু বাইরে থেকে সে শান্ত থাকে, কারণ সে জানে—তার কাজই হচ্ছে নিজের ভয়কে লুকিয়ে রাখা। “বাপ্পি…” নামটা সে আস্তে করে বলে, যেন সে নিজের সাথে কথা বলছে। তার ঠোঁটের কোণায় একটা হাসি আসে, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে একটা ক্লান্তি আছে, একটা চাপা ভয়ও আছে—যেটা সে কাউকে দেখাবে না। সে জানে—এই খেলাটা আগের মতো না, এখানে ভুল করার সুযোগ নেই। তার মাথার ভেতর দ্রুত হিসাব চলতে থাকে—কে, কেন, কীভাবে—আর শেষে একটা নামেই এসে থামে। সে বুঝতে পারে—এটা কোনো এলোমেলো ঘটনা না, এটা পরিকল্পনা। আর এই পরিকল্পনার পেছনে যে আছে, সে এখন আর আগের মতো আবেগ দিয়ে চলে না—সে হিসাব দিয়ে চলে। রকি এই উপলব্ধিটা অনুভব করে, কিন্তু সেটা মেনে নিতে তার কষ্ট হয়। কারণ এর মানে—তার সামনে এমন একজন দাঁড়িয়ে আছে, যে তাকে ভেতর থেকে ভাঙতে জানে।
অন্যদিকে বাপ্পি বসে আছে একটা ছোট, অন্ধকার ঘরে, যেখানে আলোটা নরম, একটু কাঁপা কাঁপা—যেন বাতাসের সামান্য নড়াচড়ায়ও সেটা বদলে যায়। তার সামনে টেবিলে ছড়িয়ে আছে কিছু কাগজ—প্রতিটা কাগজে নাম, জায়গা, সময়—সবকিছু এত নিখুঁতভাবে সাজানো যে, সেটা দেখে বোঝা যায়—এটা কোনো হঠাৎ করা কাজ না, এটা দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি। সে প্রতিটা নামের দিকে তাকায়, যেন সেই নামের ভেতর ঢুকে পড়তে চাইছে, বুঝতে চাইছে—কার দুর্বলতা কোথায়। তার আঙুল ধীরে ধীরে একটা নামের ওপর থামে—“রকি।” সে নামটার ওপর একটু চাপ দেয়, যেন এই চাপের ভেতরেই কোনো সিদ্ধান্ত লুকানো আছে। তার মুখে কোনো রাগ নেই, কোনো উত্তেজনা নেই—শুধু একটা স্থিরতা, যেটা ভাঙা কঠিন। বাইরে কুকুর ডাকে, দূরে কোথাও একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ আসে, কিন্তু সে নড়ে না। তার শ্বাস ধীর, তার চোখ স্থির, যেন সে অনেক দূরের কিছু দেখছে। মাঝে মাঝে সে পকেট থেকে একটা পুরনো কয়েন বের করে, আঙুলের মধ্যে ঘোরায়—এই ছোট্ট অভ্যাসটাই তাকে ধরে রাখে, তাকে মনে করিয়ে দেয়—সে এখনো মানুষ। এই মানুষটাকে ধরে রাখাটাই তার জন্য সবচেয়ে কঠিন, কারণ সে জানে—এই পথে যত এগোবে, ততই সে নিজেকে হারাবে। তবুও সে থামে না, কারণ তার কাছে ফিরে যাওয়ার পথ নেই। তার ভেতরে একটা অনুভূতি কাজ করছে—শেষ করার, সবকিছু শেষ করার। আর এই অনুভূতিটা এতটাই গভীর যে, সেটা তাকে আর অন্য কিছু ভাবতে দেয় না।
মমতা দোকানে বসে থাকে, তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, তবুও তার ভেতরে একটা অদ্ভুত কোমলতা আছে—যেটা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। বাপ্পি যখন দোকানে ঢোকে, তাদের চোখে চোখ পড়ে, আর সেই দৃষ্টির ভেতরে অনেক কথা ভাসতে থাকে—যেগুলো তারা কখনো বলেনি, হয়তো বলবেও না। মমতার হাত কাপে চা ঢালতে ঢালতে একটু কাঁপে, কিন্তু সে সেটা সামলে নেয়—কারণ সে জানে, এই কাঁপুনি দেখালে বাপ্পি কিছু বুঝে যাবে। “তুই কি করতেছিস?”—তার প্রশ্নটা খুব আস্তে, কিন্তু তাতে একটা স্পর্শ আছে, যেন সে বাপ্পির খুব কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বাপ্পি তাকায়, তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য নরম কিছু আসে, যেটা সে খুব দ্রুত লুকিয়ে ফেলে। “কিছু না”—সে বলে, কিন্তু এই মিথ্যাটা এতটাই পরিষ্কার যে, সত্য বললেও এর চেয়ে বেশি পরিষ্কার হতো না। মমতা কাপটা এগিয়ে দেয়, আর তাদের আঙুল এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে যায়—একটা ছোট স্পর্শ, কিন্তু তার ভেতরে অদ্ভুত একটা উষ্ণতা আছে, যেটা দুজনেই অনুভব করে, কিন্তু কেউ কিছু বলে না। “আমারে মিথ্যা বলিস না”—তার গলায় অনুরোধ, আর সেই অনুরোধের ভেতরে একটা অদ্ভুত ভালোবাসা লুকানো, যেটা কখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি। বাপ্পি কিছুক্ষণ চুপ থাকে, তারপর খুব ধীরে বলে—“সব শেষ না করলে কিছুই শেষ হয় না।” এই কথাটা শুধু যুক্তি না, এটা তার বিশ্বাস, তার পথ। মমতা তাকিয়ে থাকে, তার চোখে পানি জমে, কিন্তু সে সেটা ফেলে না—কারণ কিছু কষ্ট আছে, যেগুলো দেখালে ছোট হয়ে যায়। “শান্তিতে থাকতে পারিস না?”—সে জিজ্ঞেস করে, আর এই প্রশ্নটা যেন তার নিজের জন্যও। বাপ্পি হালকা হাসে, একটু কাছে এসে দাঁড়ায়, এতটাই কাছে যে তাদের শ্বাস একে অপরকে ছুঁয়ে যায়—“শান্তি কই?” তার কণ্ঠ নরম, কিন্তু তার ভেতরে একটা ভাঙা সত্যি লুকিয়ে আছে। এই মুহূর্তটা থেমে থাকে, একটু বেশি সময় ধরে, যেন তারা দুজনেই জানে—এটা এমন কিছু, যেটা তারা কখনো পুরোপুরি পাবে না।
এইসব ঘটনার ভেতর দিয়ে পাড়ার মানুষ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল, যদিও তারা নিজেরা সেটা বুঝতে পারছিল না। আগে যেখানে তারা নির্দ্বিধায় কথা বলত, এখন সেখানে একটু থামে, চারপাশে তাকায়, তারপর বলে। আগে যেখানে হাসি সহজ ছিল, এখন সেখানে একটা চাপা ভাব আছে—যেন কেউ দেখছে। এই দেখা না-যাওয়া উপস্থিতিটাই তাদের ভেতরে একটা অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি করছে, যেটা একই সঙ্গে ভয় আর আকর্ষণ—যেন অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা, যেখানে কিছু দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। এই অনুভূতিটা মানুষের ভেতরে ঢুকে যায়, ধীরে ধীরে, এবং একসময় সেটা তাদের আচরণ বদলে দেয়। বাপ্পি এই পরিবর্তনটাকেই চাইছিল, কারণ সে জানে—মানুষকে বাইরে থেকে ভাঙা কঠিন, ভেতর থেকে ভাঙা সহজ। আর সে এই ভেতরের ভাঙাটাই তৈরি করছিল, খুব ধীরে, খুব নিখুঁতভাবে। রকি এখনো লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত, কিন্তু সে বুঝতে পারছে—এই লড়াইটা অন্যরকম, এখানে শক্তির চেয়ে বেশি দরকার ধৈর্য। আর বাপ্পির কাছে সেই ধৈর্য আছে, সেই অপেক্ষা করার ক্ষমতা আছে। এই দুই মানুষের মধ্যে এখন যে খেলা চলছে, সেটা শুধু দখলের না—এটা বেঁচে থাকার, অস্তিত্বের। আর এই খেলায় যে হারবে, সে শুধু জায়গা হারাবে না—সে নিজেকেও হারাবে।
অন্যদিকে, শিউলি এখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে একটা হাসি আছে, কিন্তু সেটা যেন বহুদিন ধরে পরা কোনো পোশাক—যেটা গরম লাগলেও খুলে ফেলা যায় না। ভেতর থেকে উঠে আসা কোনো আনন্দ নয়, বরং সমাজের সামনে ঠিক থাকার জন্য শেখা একটা অভ্যাস। আয়নার কাচে নিজের প্রতিফলন দেখে তার মাঝে মাঝে মনে হয়, সে যেন নিজেকেই পুরোপুরি চেনে না। পেছনে সাইফ ব্যস্ত, টেবিলে ছড়ানো কাগজপত্র গুছাচ্ছে, মাঝে মাঝে ফোনে কারও সাথে খুব ছোট, খুব প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলছে। কিন্তু সেই কথাগুলোর ভেতরেও কোথাও একটা দূরত্ব লুকিয়ে আছে—যেন দুজন মানুষ একই ঘরে থাকে, অথচ তাদের চিন্তা দুই আলাদা শহরের রাস্তায় হাঁটে। শিউলি কখনো কখনো চায় কিছু জিজ্ঞেস করতে, কিন্তু শব্দগুলো গলায় আটকে যায়। সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে, নিজের হাসিটাকে আবার ঠিক করে নেয়, যেন সেটাই সবচেয়ে নিরাপদ কাজ।
হঠাৎ সাইফের ফোনে একটা মেসেজ আসে। অচেনা নম্বর থেকে। লেখা—“আজকে তুমি আসবে তো? এটা আরিবার জন্মদিন…” সাইফ কয়েক সেকেন্ড থমকে থাকে। আঙুলটা স্ক্রিনের ওপরেই স্থির হয়ে যায়, যেন মস্তিষ্ক বুঝতে পারছে না এই তথ্যটা কোথায় রাখবে। আরিবা—একটা নাম, যেটা তার জীবনের এক পুরনো অধ্যায়ে কোথাও ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হারিয়ে গেছে। স্মৃতির ধুলো জমে গেছে সেই নামের ওপর। কিন্তু আজ হঠাৎ সেই নাম আবার আলো জ্বালিয়ে ফিরে এসেছে। সে কিছু না বলে ফোনটা নামিয়ে রাখে, কিন্তু পরের মুহূর্তেই আরেকটা মেসেজ আসে।
এবার নাম দেখা যায়—আদিরা।
আদিরা আরিবার ছোট বোন। সাইফ তাকে সবসময়ই খুব সাধারণভাবে দেখেছে—একটা শান্ত, ভদ্র, একটু লাজুক মেয়ে, যে বড়দের কথার মাঝখানে খুব একটা আসে না। সে কখনো ভাবেনি, আদিরা আলাদা কোনো উপস্থিতি বহন করতে পারে। কিন্তু মেসেজটা এইবার অন্যরকম। সেখানে কোনো নাটক নেই, কোনো জোর নেই—শুধু একটা নরম অনুরোধ, যেন অনেক কষ্ট করে লেখা—“তুমি কি আসবে? সবাই থাকবে…” এই বাক্যটা পড়তে পড়তে সাইফের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ তৈরি হয়, যেটা সে ঠিক বুঝতে পারে না। এটা দুঃখ না, আবার আনন্দও না—একটা অজানা টান, যেটা মানুষকে অস্থির করে তোলে।
সে জানে না, আদিরার এই সহজ প্রশ্নের ভেতরে কতটা অনুচ্চারিত অনুভূতি লুকানো আছে। বহুদিন ধরে আদিরা এই মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কখনো সরাসরি কিছু বলেনি। সে নিজের অনুভূতিকে শব্দে পরিণত করতে শেখেনি। শুধু ছোট ছোট মুহূর্তে থেকে গেছে—একটা হাসি, একটা দৃষ্টি, একটু বেশি সময় ধরে কথা বলার চেষ্টা, অথবা কোনো অজুহাতে তার সামনে এসে দাঁড়ানো। এগুলোকে সাইফ কখনো গুরুত্ব দেয়নি। তার কাছে আদিরা শুধু আরিবার ছোট বোন, যেটা একটা পরিচয়ের সীমা শেষ করে দেয়। কিন্তু আদিরার কাছে সেই সীমাটা কখনো ছিল না। তার ভেতরে সাইফ অনেক আগেই একটা আলাদা জায়গা দখল করে ফেলেছে, যেখানে সে প্রতিদিন নীরবে অপেক্ষা করে।
সাইফ ফোনটা টেবিলে রেখে দেয়। বুকের ভেতর অস্থিরতা বাড়তে থাকে, কিন্তু সে সেটাকে নাম দিতে পারে না। সে উঠে দাঁড়ায়, জানালার দিকে যায়, বাইরে তাকায়। শহরের আলো নিভে আসছে ধীরে ধীরে, কিন্তু তার ভেতরের চিন্তাগুলো আরো জেগে উঠছে। সে নিজেকে প্রশ্ন করে—সে যাবে কি না? কিন্তু এই প্রশ্নের কোনো পরিষ্কার উত্তর আসে না। কারণ এই আমন্ত্রণটা শুধু একটা জন্মদিনের ডাক না, এটা যেন কোনো অদৃশ্য সম্পর্কের দরজা খুলে দেওয়ার চেষ্টা, যেটা সে কখনো খেয়ালই করেনি।
রাত গভীর হলে শিউলি ঘুমিয়ে পড়ে। সাইফ তখন আবার ফোনটা হাতে নেয়। স্ক্রিনের আলো অন্ধকার ঘরে একমাত্র জেগে থাকা জিনিস। সে আবার মেসেজটা পড়ে—“আরিবার জন্মদিন…” শব্দগুলো এবার আরো ভারী লাগে, যেন প্রত্যেকটা শব্দে আলাদা করে কিছু স্মৃতি আটকে আছে। সে জানে না, এই জন্মদিনে যাওয়া মানে কী হবে—পুরনো সম্পর্কগুলো আবার জেগে উঠবে কি না, বা নতুন কোনো জটিলতা তৈরি হবে কি না। কিন্তু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত কৌতূহল কাজ করে—যেন কিছু অসমাপ্ত কথা আছে, যেগুলো একসময় না একসময় মুখে আসতেই হবে।
অন্যদিকে নীলা এখন বসে আছে তার ঘরে। দরজা বন্ধ, জানালার পর্দা অর্ধেক টানা, বাইরে থেকে আসা আলো মেঝেতে কেটে কেটে পড়ছে, যেন কোনো ভাঙা গল্প। তার সামনে খোলা একটা পুরনো ডায়েরি। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে, তবুও শব্দগুলো এখনো তীক্ষ্ণ। সে অনেকক্ষণ ধরে একটা পাতার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আসলে সে পড়ছে না—সে ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে ধীরে ধীরে, নীরবে।
লেখাটা তার বাবার। এতদিন সে বাবাকে শুধু কঠোর, রাগী, নিয়ন্ত্রণপ্রিয় মানুষ হিসেবে চিনেছে। এমন একজন মানুষ, যে সবকিছু নিজের মতো করে চায়, যে আবেগ দেখায় না, যে সবসময় দূরে থাকে। কিন্তু এই ডায়েরিতে সে এক অন্য মানুষকে দেখতে পাচ্ছে—যে ভয় পায়, যে সন্দেহ করে, যে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েও দ্বিধায় থাকে। এই পরিবর্তনটা নীলার জন্য সহজ নয়। কারণ মানুষ যাকে পুরোপুরি একরকম ভেবে বড় হয়, তাকে হঠাৎ অন্যভাবে দেখা গেলে ভিতরের পৃথিবী কেঁপে ওঠে।
সে একটা লাইন পড়ে—“রাফি খারাপ ছেলে না… কিন্তু আমি ওকে বিশ্বাস করতে পারি না…” নীলার হাত কেঁপে ওঠে। সে ডায়েরিটা আরও শক্ত করে ধরে, যেন না ধরলে কিছু ভেঙে যাবে। তার বুকের ভেতর একটা চাপা ভয় জন্ম নেয়। সে পড়ে যায় পরের লাইনগুলোতে—“ওই দিন আমি রকি আর রাফিকে একসাথে দেখেছিলাম…” রকি—এই নামটা তার জীবনে শুধু ভয় আর গল্প হিসেবে ছিল। পাড়ার ছায়াময় চরিত্র, যার কথা শুনলেই মানুষ নিচু গলায় কথা বলত। কিন্তু রাফি আর রকি একসাথে—এই সম্পর্কটা নীলার কল্পনার বাইরে ছিল।
সে পাতা উল্টায়। আরেকটা বাক্য—“ওদের দেখা ছিল নিয়মিত… আমি নিশ্চিত ছিলাম না, কিন্তু কিছু একটা ঠিক ছিল না…” নীলার শ্বাস একটু ভারী হয়ে আসে। তার মাথায় রাফির মুখ ভেসে ওঠে—তার হাসি, তার শান্ত ব্যবহার, তার স্বাভাবিক কথা বলার ভঙ্গি। সে সবসময় ভেবেছিল রাফি খুব সাধারণ একজন ছেলে, হয়তো একটু শান্ত, একটু আলাদা, কিন্তু খারাপ কিছু নেই। কিন্তু এখন এই লেখাগুলো সেই ধারণার ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
আরেকটা লাইন—“আমি ভেবেছিলাম এটা শুধু বন্ধুত্ব… কিন্তু রকি যেভাবে ওকে টেনে নিচ্ছিল, সেটা বন্ধুত্ব না…” এই বাক্যটা পড়ার পর নীলার মাথা একটু ঘুরে যায়। তার বাবার নিষেধ, তার রাগ, তার কঠোরতা—সবকিছুর ভেতর হঠাৎ করে নতুন অর্থ জন্ম নেয়। সে এতদিন ভাবত এগুলো শুধু জেদ, কন্ট্রোল করার চেষ্টা। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সেখানে ভয় ছিল, অভিজ্ঞতা ছিল, আর এমন কিছু দেখা ছিল যেটা সে কখনো বলেনি।
নীলা চুপ করে বসে থাকে। তার চোখে পানি জমে, কিন্তু সে কাঁদে না। সে শুধু স্থির থাকে, যেন তার ভেতরের পৃথিবী একসাথে অনেক জায়গায় ভেঙে যাচ্ছে, আর সে কিছুই করতে পারছে না। সে বুঝতে শুরু করে—রাফির জীবনটা সে যেমন ভেবেছিল, তেমন ছিল না। কোথাও না কোথাও রকি আর রাফির মধ্যে একটা অন্ধকার সংযোগ ছিল, যেটা তার বাবা আগে থেকেই টের পেয়েছিল। আর সেই কারণেই তার বাবা রাফিকে বিশ্বাস করতে পারেনি।
বাইরের শহরে শিউলি এখনো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু এবার তার হাসি নেই। শুধু একটা ক্লান্ত মুখ। সাইফ অন্য ঘরে বসে আছে, ফোন হাতে, সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। আর আদিরা—একটা অদৃশ্য অপেক্ষার মধ্যে—তার মেসেজের দিকে তাকিয়ে আছে, উত্তর আসার অপেক্ষায়।
আর নীলা ধীরে ধীরে ডায়েরিটা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সত্য কি বন্ধ হয়? না। সেটা শুধু আরও গভীরে ঢুকে যায় মানুষের ভেতরে, নীরবে, ধীরে, এবং স্থায়ীভাবে।
(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Like Reply
#26
পর্ব ১৫ (১)

সাইফ অনেকদিন পর সেই ঠিকানাটার সামনে এসে দাঁড়াল, আর দাঁড়ানোটা শুধু শারীরিক না—মনে হচ্ছিল সে যেন নিজের পুরনো একটা জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেটাকে সে বহুদিন ধরে এড়িয়ে গেছে, পাশ কাটিয়ে গেছে, কখনো ব্যস্ততার অজুহাতে, কখনো নিজের ভেতরের ভয়কে যুক্তি বানিয়ে। গেটটা আগের মতোই আছে—কালচে রঙ উঠে গিয়ে জায়গায় জায়গায় মরিচা ধরেছে, লোহার ফাঁকগুলো দিয়ে ভেতরের অন্ধকার বাগানটা দেখা যায়, যেখানে আলো ঢোকে ঠিকই কিন্তু পুরোটা না, যেন জায়গাটাও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে শিখে গেছে। তার চোখে পড়ে—মাটিতে ছড়িয়ে থাকা শিউলি ফুল, সাদা পাপড়ি আর কমলা ডাঁটা—অদ্ভুতভাবে পরিচিত, অদ্ভুতভাবে শান্ত, অথচ সেই শান্তির ভেতরেই একটা চাপা কষ্ট লুকানো। এই দিনটা—আরিবার জন্মদিন—সে বছরের পর বছর এড়িয়ে গেছে, যেন এই একটা দিনকে এড়িয়ে গেলে বাকি দিনগুলো সহজ হয়ে যাবে। সে ফোন বন্ধ রেখেছে, বন্ধুদের এড়িয়ে গেছে, এমনকি নিজের ভেতরেও একটা দেয়াল তুলে রেখেছে, যাতে এই নাম, এই স্মৃতি, এই অনুভূতিগুলো ঢুকতে না পারে। কিন্তু আজ সেই দেয়ালটা কোথাও ভেঙে গেছে। সে নিজেও বুঝতে পারছে না—কেন আজ সে এখানে এসেছে, কেন আজ সে পালাতে পারেনি। মনে হচ্ছিল—যে জিনিস থেকে এতদিন পালিয়েছে, সেটার সামনে দাঁড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, কারণ পালিয়ে থাকা মানে বাঁচা না, শুধু সময় পার করা।
গেটটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই একটা গন্ধ তাকে থামিয়ে দিল—পুরোনো বইয়ের, হালকা ধুলোর, আর খুব মৃদু একটা পারফিউমের স্মৃতি, যেটা এখন আর কেউ ব্যবহার করে না, কিন্তু তবুও বাতাসে কোথাও আটকে আছে। এই গন্ধটা এমন, যেটা সরাসরি মনে আঘাত করে না, বরং ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে যায়, আর তারপর একসময় বুঝতে পারো—তুমি ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছো। ড্রয়িংরুমে কয়েকজন বসে আছে, কিন্তু সেই বসাটা কোনো জমায়েতের মতো না, বরং একটা অপেক্ষার মতো—যেখানে কেউ আসবে না, তবুও সবাই বসে আছে। কারও মুখে হাসি নেই, কেউ উচ্চস্বরে কথা বলছে না, কেক কাটার কোনো আয়োজন নেই, বেলুন নেই, গান নেই। এটা কোনো জন্মদিন না—এটা একটা স্মরণ, একটা অনুপস্থিত মানুষকে ঘিরে থাকা উপস্থিত মানুষের নিঃশব্দ আয়োজন, যেখানে প্রত্যেকেই নিজের মতো করে শোক বহন করছে, কিন্তু কেউ কাউকে দেখাচ্ছে না। সাইফের মনে হলো, এই ঘরের প্রতিটা জিনিস তাকে চিনে ফেলেছে—সোফার কোণ, টেবিলের ওপর রাখা বই, দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিগুলো—সব যেন তাকে জিজ্ঞেস করছে, “এতদিন কোথায় ছিলে?”
ঠিক তখনই আদিরা এগিয়ে এল। সে আগের মতোই আছে, আবার আগের মতো না। তার চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতরেও একটা কোমলতা আছে—যেটা সহজে চোখে পড়ে না, কিন্তু অনুভব করা যায়। সে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকল, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে—এই মানুষটা সত্যিই এসেছে। তারপর খুব আস্তে বলল, “তুমি আসবা ভাবিনি।” এই কথাটার ভেতরে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো চাপ নেই—শুধু একটা সত্য, যেটা সে অনেকদিন ধরে মেনে নিয়েছে। সাইফ হালকা মাথা নাড়ল, “আমিও ভাবিনি।” এই দুইটা ‘ভাবিনি’ শব্দের ভেতরে এত বছর জমে আছে—অপেক্ষা, এড়িয়ে যাওয়া, না বলা কথা, আর কিছু ভুল সিদ্ধান্ত, যেগুলোর জন্য কেউ কাউকে পুরোপুরি দোষ দিতে পারে না। তারা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, আর সেই নীরবতাটা অস্বস্তিকর না, বরং ভারী—যেন দুজনেই জানে, এই নীরবতার ভেতর অনেক কথা লুকিয়ে আছে, যেগুলো বলার সময় এখনো আসেনি।
কিছুক্ষণ পর আদিরা তাকে নিয়ে গেল একটা ছোট্ট রুমে। দরজাটা খোলার সাথে সাথে সময় যেন থেমে গেল। রুমটা ঠিক আগের মতোই রাখা—টেবিলে বইগুলো একই জায়গায়, দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিগুলো অপরিবর্তিত, জানালার পাশে সেই চেয়ারটা—যেখানে বসে কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করত, হাসত, রাগ করত, আবার ঠিক হয়ে যেত। মনে হচ্ছিল—এই রুমটা সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, এখানে কিছুই বদলায়নি, শুধু মানুষটা নেই। এই ‘না থাকা’-টাই সবচেয়ে বেশি চোখে লাগে। সাইফ ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকে, হাত দিয়ে টেবিলটা ছুঁয়ে দেখে, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে—এটা সত্যিই আছে। তার ভেতরে একটা চাপা কম্পন শুরু হয়, যেটা সে লুকানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পুরোপুরি পারে না।
আদিরা আলমারি খুলে একটা খাম বের করল। খামের ওপর হাতের লেখা—আরিবার। সেই বাঁকা, একটু তাড়াহুড়ো করা অক্ষর, যেটা সাইফ একসময় চোখ বন্ধ করেও চিনতে পারত। এই অক্ষরগুলো দেখে তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে শক্ত হয়ে যায়, যেন কেউ ভেতর থেকে কিছু চেপে ধরেছে। “এটা ও তোমার জন্য লিখেছিল,” আদিরা বলল, কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা নেই, শুধু একটা দায়িত্ব শেষ করার অনুভূতি। “কখনো দিতে পারিনি।” এই ‘পারিনি’ শব্দটার ভেতরে কত পরিস্থিতি, কত বাধা, কত নীরবতা জমে আছে—সেটা কেউ আলাদা করে বলে না, কিন্তু বোঝা যায়।
সাইফ খামটা হাতে নেয়। তার আঙুল কাঁপছে, খুব হালকা, কিন্তু স্পষ্ট। সে বুঝতে পারে—এই কাগজের ওজন কাগজের না, এটা স্মৃতির, অসমাপ্ত কথার, আর সেই সব অনুভূতির যেগুলো সে বহুদিন ধরে চাপা দিয়ে রেখেছে। খামটা খুলতে তার একটু সময় লাগে, যেন সে প্রস্তুত না, আবার প্রস্তুত হওয়ার সময়ও নেই। ভেতরে একটা ছোট্ট চিঠি। খুব বড় না, কয়েকটা লাইন মাত্র। কিন্তু প্রতিটা লাইনের ভেতরে থেমে যেতে হয়, কারণ এগুলো শুধু লেখা না—এগুলো একটা মানুষের শেষ চাওয়া, শেষ বোঝাপড়া, শেষ ভালোবাসা।
“তুমি যদি কখনো আমাকে হারাও, চেষ্টা করো নিজেকে হারাইও না।” এই লাইনটা পড়ার সাথে সাথে সাইফের শ্বাস একটু ভারী হয়ে যায়। সে থামে, চোখ বন্ধ করে, আবার পড়ে। “আমি চাই না, আমার অভাব তোমাকে অন্য কারও কাছে নিয়ে যাক শুধু ফাঁকা জায়গা ভরতে।” তার আঙুল কাগজের ওপর শক্ত হয়ে ওঠে। “ভালোবাসা কারও জায়গা ভরার জন্য না—ভালোবাসা নতুন জায়গা তৈরি করে।” এই লাইনটা তার মাথার ভেতর বারবার ঘুরতে থাকে। “তুমি যদি আবার কাউকে ভালোবাসো, নিশ্চিত হয়ে নিও—তুমি তাকে ভালোবাসছ, আমাকে না।” শেষ লাইনে কোনো স্বাক্ষর নেই, শুধু একটা ছোট্ট দাগ—যেটা হয়তো চোখের পানির।
সাইফ অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। সময় কত কেটে যায়, সে জানে না। মনে হচ্ছিল—তার ভেতরের অনেকগুলো দরজা একসাথে খুলে যাচ্ছে, আর প্রতিটা দরজার পেছনে একটা করে প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। সে কি সত্যিই শিউলিকে ভালোবেসেছে? নাকি সে শুধু একটা ফাঁকা জায়গা ঢাকতে চেয়েছে? সে কি নিজের অনুভূতিকে বুঝেছে, নাকি শুধু পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়েছে? এই প্রশ্নগুলো তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়, কারণ এগুলোর উত্তর সহজ না, আর হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
আদিরা চুপচাপ তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে কোনো চাপ নেই, কিন্তু একটা গভীর বোঝাপড়া আছে। সে খুব আস্তে বলল, “তুমি ওকে খুব ভালোবাসতা, আমি জানি।” এই কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো ঈর্ষা নেই, কোনো অভিযোগ নেই—শুধু একটা সত্যের স্বীকারোক্তি। “কিন্তু ভালোবাসা কখনো কারও জায়গা না।” সে একটু থামে, যেন শব্দগুলো ঠিকভাবে বসাতে চাইছে। “তুমি কি নিজেকে ঠিকমতো জিজ্ঞেস করছ?” এই প্রশ্নটা খুব সাধারণ শোনায়, কিন্তু এর ভেতরে একটা চাপ আছে—নিজেকে সত্যি করে দেখার চাপ।
সাইফ কোনো উত্তর দেয় না। সে শুধু বসে থাকে, চিঠিটা হাতে, চোখ কোথাও দূরে। তার মাথার ভেতর একটা শব্দ বারবার ফিরে আসছে—“নতুন জায়গা তৈরি করে।” সে বুঝতে পারছে—ভালোবাসা মানে শুধু ধরে রাখা না, কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়াও। কিন্তু সে কি পারবে? সে কি নিজেকে নতুন করে গড়তে পারবে, নাকি পুরনো স্মৃতির ভেতরেই আটকে থাকবে?
বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। লাইট জ্বলছে, কিন্তু আলোটা পুরো উজ্জ্বল না—একটু নরম, একটু ক্লান্ত। লোকজন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে, ঘর ফাঁকা হয়ে আসছে। সাইফ উঠে দাঁড়ায়, চিঠিটা আবার খামে ঢোকায়, কিন্তু সে জানে—এই কথাগুলো আর কখনো খামের ভেতর থাকবে না, এগুলো এখন তার ভেতরে ঢুকে গেছে। বের হওয়ার আগে সে একবার পিছনে তাকায়। মনে হয়—এই বাড়িটা তাকে অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছে, শুধু সে নিজেই নিজেকে ছাড়তে পারেনি।


শহরের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল, কিন্তু সেই নরম আলোয়ও একটা অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা ছিল—যেন প্রতিটা আলো ছায়ার ভেতরে কিছু লুকিয়ে রাখছে। সেই ছায়ার ভেতরেই নীলা নিজের জন্য একটা দেয়াল তুলছিল, খুব নিঃশব্দে, খুব ধীরে, যেন কেউ টের না পায়। বাইরে থেকে তাকে দেখলে সবকিছু স্বাভাবিক—সে হাসছে, প্রশ্ন করছে, মাথা নেড়ে কথা শুনছে—কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই একটা হিসেবি দূরত্ব জমে উঠছে। এই দূরত্বটা এমন না যে হঠাৎ চোখে পড়ে, বরং এমন যে একটু বেশি সময় একসাথে থাকলে, একটু গভীরভাবে তাকালে বোঝা যায়—এখানে কিছু নেই, বা যা আছে সেটা পুরোটা খোলা না। রাফি প্রথমে এই পরিবর্তনটা ধরতে পারেনি, কারণ সে অভ্যস্ত ছিল নীলার নীরবতাকে ভালোবাসা হিসেবে দেখতে, তার চুপচাপ থাকা মানেই সে কাছে আছে—এই বিশ্বাসে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে বুঝতে শুরু করল, এই চুপ থাকা আগের মতো না। আগের চুপ থাকা ছিল আশ্রয়, এখনকার চুপ থাকা যেন একটা দূরত্ব তৈরি করে, একটা সীমারেখা টেনে দেয়। সে মাঝে মাঝে কথা বলতে গিয়ে থেমে যায়, কারণ বুঝতে পারে—এই কথাগুলো হয়তো আর আগের জায়গায় পৌঁছাবে না। তার মনে হতে থাকে—একই টেবিলে বসে থেকেও তারা যেন আলাদা আলাদা জায়গায় বসে আছে। আর এই অদৃশ্য আলাদা হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়, কারণ এর কোনো নির্দিষ্ট কারণ ধরা যায় না, কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় আঙুল দিয়ে বলা যায় না—“এইখানে সমস্যা।” তবুও সমস্যা আছে, খুব স্পষ্টভাবে আছে।
ক্যাফেটা আগের মতোই—কাঠের টেবিলের ওপর হালকা দাগ, কোণার প্ল্যান্টটার পাতায় একটু ধুলো জমে আছে, আর পেছনে বাজছে সেই পরিচিত মিউজিক, যেটা একসময় তাদের কাছে একটা স্মৃতি ছিল। এই জায়গাটায় তারা কতবার বসেছে—হাসাহাসি করেছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছে, ছোট ছোট প্ল্যান করেছে—কিন্তু আজ সেই একই জায়গাটা যেন অন্যরকম লাগছে। নীলা বসে আছে সোজা হয়ে, তার হাতটা টেবিলের ওপর রাখা, আঙুলগুলো মাঝে মাঝে নড়ছে—একটা অস্থিরতা আছে, কিন্তু সে সেটা লুকানোর চেষ্টা করছে। রাফি তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করছে—এই মেয়েটা কি সেই একই মানুষ, নাকি তার ভেতরে কিছু বদলে গেছে? “কাজ কেমন চলছে?”—নীলার প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা দূরত্ব আছে, যেন সে শুধু একটা তথ্য জানতে চাইছে, কোনো অনুভূতি না। রাফি একটু অবাক হয়, কারণ এই প্রশ্নটা অনেকদিন পর এসেছে, আর সে নিজেও জানে না—সে কীভাবে উত্তর দেবে। “ভালো… অনেক প্রেসার, কিন্তু ম্যানেজ করে নিচ্ছি”—সে হেসে বলে, কিন্তু তার হাসিটা পুরোপুরি স্বাভাবিক না। নীলা মাথা নাড়ে, কিন্তু তার চোখ রাফির মুখে স্থির থাকে, যেন সে কোনো পরিবর্তন খুঁজছে, কোনো ফাঁক খুঁজছে। “তুমি এখন বদলাইছ”—সে বলে, খুব শান্ত গলায়। এই কথাটা অভিযোগ না, কিন্তু প্রশংসাও না—এটা একটা পর্যবেক্ষণ, যেটার ভেতরে প্রশ্ন লুকিয়ে আছে।
রাফি একটু হালকা করার চেষ্টা করে—“ভালো না খারাপ?”—কিন্তু সে নিজেও বুঝতে পারে, এই মজাটা জায়গামতো বসছে না। নীলা সরাসরি উত্তর দেয় না, সে শুধু তাকিয়ে থাকে—গভীরভাবে, একটু বেশি সময় ধরে, যেন সে শুধু মুখ দেখছে না, ভেতরটা পড়ার চেষ্টা করছে। এই দৃষ্টিটা রাফির অচেনা লাগে, কারণ আগে এই চোখে সে এক ধরনের নির্ভরতা দেখত, এখন সেখানে একটা হিসেব আছে। “কি দেখতেছ?”—সে জিজ্ঞেস করে, একটু অস্বস্তি নিয়ে। নীলা খুব আস্তে বলে—“তোমাকে।” কথাটা খুব ছোট, কিন্তু তার ভেতরে একটা ভার আছে, যেন এই ‘তোমাকে’ শব্দটার ভেতরে অনেকগুলো স্তর আছে—পুরোনো তুমি, নতুন তুমি, আর মাঝখানে কোথাও হারিয়ে যাওয়া একটা মানুষ। রাফির বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে ওঠে, কারণ সে বুঝতে পারে—নীলা শুধু তাকে দেখছে না, তাকে বিচার করছে। এই বিচারটা শব্দে বলা না হলেও, তার ওজন অনুভব করা যায়। সে কিছু বলতে চায়—নিজেকে ব্যাখ্যা করতে চায়, বলতে চায় যে সে বদলেছে কারণ বদলানো দরকার ছিল, কারণ জীবন তাকে বাধ্য করেছে—কিন্তু শব্দগুলো ঠিকঠাক আসে না। তার মনে হয়, যেটা সে বলবে, সেটা হয়তো যথেষ্ট হবে না।
নীলার মাথার ভেতর তখন একসাথে অনেক কিছু চলছে। ডায়েরির সেই লাইনগুলো, তার বাবার সেই সন্দেহ, রকির নাম—সবকিছু মিশে একটা অস্পষ্ট কিন্তু ভারী অনুভূতি তৈরি করেছে। সে রাফির মুখের দিকে তাকিয়ে চেষ্টা করছে—এই মানুষটা কি সেই মানুষ, যাকে সে এতদিন ধরে চিনেছে? নাকি এই মানুষটার ভেতরে আরেকটা গল্প আছে, যেটা সে জানে না? তার মনে পড়ে—কিছু পুরোনো মুহূর্ত, যেখানে রাফি হঠাৎ করে চুপ হয়ে যেত, কিছু প্রশ্ন এড়িয়ে যেত, কিছু জায়গায় যেতে চাইত না। তখন এগুলো ছোট ছোট ব্যাপার মনে হয়েছিল, এখন মনে হচ্ছে—এই ছোট ছোট ব্যাপারগুলোর ভেতরেই হয়তো বড় কিছু লুকানো ছিল। সে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে, কিন্তু করে না—কারণ সে জানে, উত্তর পেলেও সেটা পুরোটা হবে না। কিছু সত্য আছে, যেগুলো মানুষ মুখে বলে না, শুধু আচরণে প্রকাশ পায়। আর সেই আচরণটাই এখন তার সামনে বসে আছে, কিন্তু সে নিশ্চিত না—সে ঠিক কী দেখছে।
রাফি হঠাৎ অনুভব করে—তার শরীরের ভেতর একটা টান তৈরি হচ্ছে। সে তার হাতটা একটু এগিয়ে দিতে চায়, নীলার হাত ছুঁতে চায়—আগের মতো, স্বাভাবিকভাবে—কিন্তু থেমে যায়। কারণ সে বুঝতে পারে, এই স্পর্শটা হয়তো এখন আর আগের মতো গ্রহণ করা হবে না। তাদের মাঝে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যেটা শুধু জায়গার না, অনুভূতির। সে নিজের আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরে, যেন নিজেকে ধরে রাখছে। “সব ঠিক আছে তো?”—সে শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করে, খুব আস্তে। নীলা তাকায়, কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকে, তারপর বলে—“হ্যাঁ, সব ঠিক।” এই ‘সব ঠিক’ কথাটা এতটাই নিখুঁত যে, সেটা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যায়। কারণ যেখানে সব সত্যিই ঠিক থাকে, সেখানে এই কথাটা এত হিসেব করে বলা লাগে না। এই কথার ভেতরে একটা দূরত্ব আছে, একটা দরজা বন্ধ থাকার শব্দ আছে।
ক্যাফের ভেতরে তখনও সেই একই গান বাজছে, কিন্তু তারা আর সেটা শুনছে না। তাদের দুজনের ভেতরে আলাদা আলাদা শব্দ চলছে—প্রশ্ন, সন্দেহ, অস্বস্তি। বাইরে লোকজন আসছে, যাচ্ছে, কেউ তাদের দিকে তাকাচ্ছে না, কেউ তাদের গল্প জানে না। কিন্তু তাদের টেবিলের ওপর একটা অদৃশ্য ভার বসে আছে, যেটা কেউ সরাতে পারছে না। নীলা ধীরে ধীরে তার কফির কাপটা ঠোঁটে তোলে, কিন্তু সে বুঝতে পারে—সে আসলে কফির স্বাদ নিচ্ছে না, সে শুধু একটা অভ্যাস পূরণ করছে। তার চোখ মাঝে মাঝে রাফির দিকে যায়, আবার সরে যায়—যেন সে নিজেকেই সময় দিচ্ছে, কীভাবে এই মানুষটাকে দেখবে, কীভাবে এই সম্পর্কটাকে বুঝবে। রাফি এই দৃষ্টি লক্ষ্য করে, কিন্তু কিছু বলে না—কারণ সে জানে, এই মুহূর্তে বলা কোনো কথাই যথেষ্ট হবে না। কিছু নীরবতা আছে, যেগুলো ভাঙা যায় না, শুধু পার করে যেতে হয়।
শেষ পর্যন্ত তারা উঠে দাঁড়ায়, বিল দেয়, বাইরে বের হয়। রাস্তায় হালকা বাতাস, কিন্তু সেই বাতাসও যেন ভারী লাগে। তারা পাশাপাশি হাঁটে, কিন্তু মাঝখানে একটা ফাঁক থাকে—খুব ছোট, কিন্তু খুব স্পষ্ট। এই ফাঁকটাই বলে দেয়—সবকিছু আগের মতো নেই। নীলা সামনে তাকিয়ে হাঁটে, রাফি তার পাশে, কিন্তু দুজনের চিন্তা আলাদা দিকে চলে যায়। এই সম্পর্কটা এখন একটা মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কিছু একটা বলা দরকার, কিছু একটা জানা দরকার—কিন্তু কেউই প্রথম শব্দটা উচ্চারণ করতে পারছে না। আর এই না-বলা শব্দগুলোর ভেতরেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা ঘটে যাচ্ছে—ধীরে, নিঃশব্দে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে।

ঘটনাটা প্রায় ১৫-১৬ বছরের পুরানো…
বাস্তবতা কখনো গল্পের মতো সরল হয় না; তার ভেতরে সবসময় একটা জটিলতা থাকে, একটা অদৃশ্য ভাঁজ, যেটা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। রাফির জীবনের সেই ভাঁজটা তৈরি হয়েছিল খুব ধীরে, এতটাই ধীরে যে সে নিজেই বুঝতে পারেনি—কখন তার ভেতরে একটা ফাঁকা জায়গা জন্ম নিয়েছে। বেকারত্ব তাকে শুধু অর্থহীন করেনি, তাকে ভেতর থেকে নরম করে দিয়েছিল, দুর্বল করে দিয়েছিল। প্রতিটা ইন্টারভিউ থেকে ফেরার সময় তার মনে হতো—সে যেন একটু একটু করে ছোট হয়ে যাচ্ছে, তার আত্মবিশ্বাসটাও যেন কেউ ধীরে ধীরে খুলে নিয়ে যাচ্ছে। বাসায় ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়ালে সে নিজের চোখে একটা অচেনা ক্লান্তি দেখত, যেটা সে আগে কখনো দেখেনি। আর এই ক্লান্তির ভেতরেই যখন নীলার বিয়ের কথা উঠল, তখন সেই ফাঁকা জায়গাটা হঠাৎ করেই গভীর হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল—সে শুধু পিছিয়ে নেই, সে আটকে গেছে, আর সবাই সামনে চলে যাচ্ছে। এই আটকে থাকার অনুভূতিটা খুব কষ্টের, কারণ এখানে কেউ তোমাকে ধাক্কা দেয় না, আবার কেউ টেনে তুলেও না—তুমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকো, আর সময় তোমার পাশ দিয়ে চলে যায়। এই অবস্থাতেই রকি তার জীবনে ঢুকে পড়েছিল, খুব স্বাভাবিকভাবে, যেন কোনো পুরনো পরিচিত মানুষ হঠাৎ করে এসে পাশে দাঁড়িয়েছে। রকি তাকে কোনো বড় স্বপ্ন দেখায়নি, কোনো জোরালো প্রস্তাব দেয়নি—সে শুধু একটা ছোট, সহজ রাস্তার কথা বলেছিল, “একটু নে, মাথা হালকা হইবো।” এই কথাটার ভেতরে কোনো চাপ ছিল না, বরং একটা স্বস্তি ছিল, একটা সহজ সমাধানের ইঙ্গিত ছিল। রাফি প্রথমে না বলেছিল, কারণ তার ভেতরে তখনও একটা সীমা ছিল, একটা ভয় ছিল—সে জানত, এই রাস্তাটা ঠিক না। কিন্তু জীবনে এমন কিছু দিন আসে, যেদিন মানুষ নিজের সেই সীমাটাকে আর ধরে রাখতে পারে না, কারণ ভেতরের চাপটা বাইরে থেকে বেশি হয়ে যায়। সেই একদিন—খুব খারাপ একটা দিন—যেদিন সে আর না বলতে পারেনি।
সেই প্রথমবারটা খুব ছোট ছিল, খুব নিরীহ মনে হয়েছিল। সে ভেবেছিল—এটা শুধু একটা মুহূর্ত, একটা সাময়িক পালানো। কিন্তু এই পালানোর ভেতরেই একটা অদ্ভুত আরাম ছিল, একটা হালকা হয়ে যাওয়ার অনুভূতি, যেটা সে অনেকদিন ধরে খুঁজছিল। ধীরে ধীরে সেই একবারটা দুইবার হলো, তারপর নিয়মিত হয়ে গেল। সে বুঝতেই পারল না—কখন এই “মাঝে মাঝে” জিনিসটা তার জীবনের অংশ হয়ে গেল। সে নিজেকে বোঝাত—এটা কোনো খারাপ কিছু না, এটা শুধু একটা উপায়, নিজের মাথাটা একটু শান্ত রাখার একটা চেষ্টা। কিন্তু সে খেয়াল করেনি—এই শান্তিটা আসলে ধার করা, যেটার জন্য পরে তাকে আরও বড় মূল্য দিতে হবে। তার আচরণে ছোট ছোট পরিবর্তন আসতে শুরু করল—সে হঠাৎ করে চুপ হয়ে যেত, কিছু প্রশ্ন এড়িয়ে যেত, কিছু জায়গায় যেতে চাইত না। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো এতটাই সূক্ষ্ম ছিল যে, সে নিজেই সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়নি। তার মনে হতো—সব ঠিক আছে, সে নিয়ন্ত্রণে আছে। সে জানত না—মানুষ যখন ভাবে সে পুরো নিয়ন্ত্রণে আছে, তখনই আসলে সে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। এই অবস্থাতেই একদিন কাদের সাহেব তাকে দেখেছিলেন—একটা অপ্রস্তুত মুহূর্তে, যেখানে রাফি নিজেও জানত না, কেউ তাকে দেখছে। কাদের সাহেব কিছু বলেননি, কোনো প্রশ্ন করেননি—কিন্তু তার চোখে যে দৃষ্টি ছিল, সেটা রাফি এড়িয়ে যেতে পারেনি। সেই দৃষ্টিতে ছিল অবিশ্বাস, একটা সন্দেহ, আর একটা অদ্ভুত হতাশা—যেন তিনি কিছু বুঝে গেছেন, কিন্তু বলতে চাইছেন না।
রাফি সেই দৃষ্টিটা অনুভব করেছিল, কিন্তু সে সেটাকে গুরুত্ব দেয়নি। সে ভেবেছিল—একটা ভুল বোঝাবুঝি, একটা ছোট্ট ঘটনা, যেটা সময়ের সাথে মিলিয়ে যাবে। সে জানত না—কিছু দৃষ্টি আছে, যেগুলো কথার থেকেও বেশি শক্তিশালী, যেগুলো মানুষের ভেতরে ঢুকে যায়, আর সেখানে থেকে যায়। কাদের সাহেবের সেই নীরব সন্দেহটা ঠিক সেখানেই থেমে থাকেনি, সেটা ধীরে ধীরে নীলার ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। প্রথমে খুব ছোট একটা প্রশ্ন হিসেবে—“রাফি কি ঠিক আছে?”—তারপর সেই প্রশ্নটা বড় হতে হতে একটা ভয় হয়ে দাঁড়াল—“সে কি বদলে যাচ্ছে?” কাদের সাহেব হয়তো পুরো সত্য জানতেন না, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা তাকে একটা ইঙ্গিত দিয়েছিল, আর সেই ইঙ্গিতটাই তিনি নীলার ভেতরে রেখে গিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর সেই ইঙ্গিতটা আর কেউ থামানোর ছিল না, সেটা ধীরে ধীরে শেকড় গেড়ে বসে গেল। নীলা তখন একা—চারপাশে মানুষ আছে, কিন্তু তার প্রশ্নগুলো শেয়ার করার মতো কেউ নেই। সে রাফিকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারত, কিন্তু সে করেনি—কারণ সে ভয় পেত, যদি উত্তরটা তার ভয়কে সত্যি করে দেয়? এই ভয়টাই তাকে চুপ করে রেখেছিল, আর এই চুপ থাকার ভেতরেই সে নিজের ভেতরে একটা দেয়াল তৈরি করতে শুরু করল।
এই দেয়ালটা কোনো একদিনে তৈরি হয়নি, এটা তৈরি হয়েছে ছোট ছোট মুহূর্তের ভেতর দিয়ে। যখন রাফি তার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চাইত, আর সে চোখ সরিয়ে নিত। যখন রাফি হাসত, আর সে সেই হাসির ভেতরে আগের উষ্ণতা খুঁজে পেত না। যখন রাফি তার হাত ধরতে চাইত, আর সে খুব আস্তে করে হাতটা সরিয়ে নিত—যেন সেটা খুব স্বাভাবিক একটা কাজ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেটা একটা বড় দূরত্ব তৈরি করত। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠে, একটা সম্পর্কের ভেতর ফাঁক তৈরি করে। রাফি প্রথমে এই পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারেনি, কারণ সে অভ্যস্ত ছিল নীলাকে কাছের মানুষ হিসেবে দেখতে, যে কখনো দূরে যাবে না। সে ভাবত—সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে, এই চুপচাপ সময়টা কেটে যাবে, আবার আগের মতো হয়ে যাবে। কিন্তু সে খেয়াল করেনি—এই সময়টাই আসলে তাদের মাঝে দূরত্ব তৈরি করছে। সে বুঝতে পারেনি—নীলার চুপ থাকা এখন আর শান্তি না, এটা একটা সিদ্ধান্ত, একটা নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা।
আজ ক্যাফে তে রাফি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ভেতরের অস্বস্তিটা এতটাই বেড়ে গেল যে, সে সরাসরি জিজ্ঞেস করেই ফেলল—“আমাদের মধ্যে কিছু বদলাইছে?” এই প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা ভয় ছিল, একটা অনিশ্চয়তা ছিল। নীলা একটু তাকাল তার দিকে—খুব বেশি সময় না, কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডেই অনেক কিছু বোঝা যায়। তারপর সে খুব শান্ত গলায় বলল—“সবকিছুই তো বদলায়।” এই কথাটা শুনতে সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা শেষ লুকিয়ে আছে। এখানে কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো সমাধান নেই—শুধু একটা মেনে নেওয়া আছে। রাফির মনে হলো—এই উত্তরটা একটা দরজা বন্ধ করে দিল, যেটা সে খুলতে চেয়েছিল। সে বুঝতে পারল না—কীভাবে এই জায়গায় এসে পৌঁছাল তারা, কোথায় ভুল হলো, কখন থেকে সব বদলাতে শুরু করল। তার মনে হতে লাগল—সে যেন একটা গল্পের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, যার শুরুটা সে জানে, কিন্তু শেষটা তার নিয়ন্ত্রণে নেই।
নীলা সেই কথাটা বলার পর আর কিছু যোগ করল না। সে আবার চুপ হয়ে গেল, কিন্তু এই চুপ থাকা আগের মতো না—এটা স্থির, সিদ্ধান্ত নেওয়া চুপ থাকা। তার ভেতরে একটা লড়াই চলছে—একদিকে তার ভালোবাসা, অন্যদিকে তার ভয়। সে জানে—রাফি পুরোটা খারাপ না, সে জানে—রাফির ভেতরে একটা ভালো মানুষ আছে, যাকে সে একসময় ভালোবেসেছিল। কিন্তু সে এটাও জানে—মানুষ শুধু তার ভালো দিক দিয়ে তৈরি হয় না, তার অন্ধকার দিকটাও তাকে গড়ে। আর সেই অন্ধকার দিকটাই এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেটাকে সে পুরোপুরি বুঝতে পারছে না। এই না-বোঝাটাই তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, কারণ যেখানে বোঝা যায় না, সেখানে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যায়। আর যেখানে বিশ্বাস ভেঙে যায়, সেখানে ভালোবাসা টিকে থাকতে চাইলেও পারে না।
রাফি বসে থাকে, কিছু বলতে পারে না। তার মনে হয়—সে যদি এখন সবকিছু খুলে বলতে পারত, সব ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে পারত—কিন্তু সে নিজেই জানে না, কোথা থেকে শুরু করবে। সে কি বলবে—সে দুর্বল ছিল? সে কি বলবে—সে পালাতে চেয়েছিল? সে কি বলবে—সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিল কিছু সময়ের জন্য? এই কথাগুলো কি যথেষ্ট হবে? নাকি এগুলো শুনে নীলা আরও দূরে চলে যাবে? এই দ্বিধাটাই তাকে চুপ করে রাখে। আর এই চুপ থাকার ভেতরেই তাদের মাঝে দূরত্বটা আরও পাকা হয়ে যায়। তারা পাশাপাশি বসে থাকে, কিন্তু তাদের ভেতরের পৃথিবী আলাদা হয়ে যায়—একটা পৃথিবী যেখানে প্রশ্ন আছে, আরেকটা পৃথিবী যেখানে উত্তর নেই।
---
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Like Reply
#27
পর্ব ১৫ (২)

বাইরে তখন রাত নেমে এসেছে, শহরের আলো জ্বলছে, কিন্তু তাদের ভেতরে একটা অন্ধকার জমে উঠছে—যেটা কেউ দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু তারা দুজনেই অনুভব করছে। এই অন্ধকারটা হঠাৎ করে আসেনি, এটা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে—ভুল বোঝাবুঝি, না-বলা কথা, আর অর্ধেক সত্যের ভেতর দিয়ে। আর এখন তারা সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সামনে যাওয়ার রাস্তা আছে, কিন্তু সেটা দেখতে পাচ্ছে না। পিছনে ফেরার সুযোগও আছে, কিন্তু সেটা আর সম্ভব না। তারা শুধু দাঁড়িয়ে আছে—একটা অদৃশ্য দূরত্বের দুই পাশে, যেখানে হাত বাড়ালেও ছোঁয়া যায় না।
অন্যদিকে; সাইফদের বাড়িতে যেন সময় থেমে গেছে। রুমের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নীরব ছিল, যেন শব্দগুলো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, ভেতরে ঢুকতে পারছে না। সাইফ টেবিলের সামনে বসে, হাতের আঙুলে চিঠিটার কাগজটা চেপে ধরে আছে, যেন একটু ঢিলে হলেই সেটা উড়ে যাবে—বা হয়তো ভেঙে যাবে ভেতরের কিছু। আরিবার হাতের লেখা—একটা সময় এই লেখাগুলো তার কাছে ছিল খুব পরিচিত, প্রায় নিজের মতোই। এখন সেই একই অক্ষরগুলো তার কাছে অপরিচিত না, কিন্তু দূরের—যেন কেউ খুব কাছ থেকে কথা বলছে, অথচ ছোঁয়া যাচ্ছে না। সে বারবার পড়ে, একই লাইন, একই শব্দ—“আমার অভাব দিয়ে কাউকে ভরাইও না…”—এই একটা বাক্য যেন তার মাথার ভেতর প্রতিধ্বনির মতো ঘুরতে থাকে। শব্দগুলো থামে না, বরং প্রতিটা পড়ার সাথে সাথে আরও ভারী হয়ে ওঠে, যেন কাগজের ওপর লেখা না, তার বুকের ভেতরে খোদাই করা। তার চোখে কখনো শিউলির মুখ ভেসে ওঠে—হালকা হাসি, খুব সাধারণভাবে কথা বলা, এমনভাবে পাশে থাকা যেন কোনো দাবি নেই—আবার হঠাৎ সেই মুখের জায়গায় আরিবার সেই চুপচাপ দৃষ্টি এসে দাঁড়ায়। সে বুঝতে পারে, তার ভেতরে দুটো সময় একসাথে বেঁচে আছে—একটা যেটা শেষ হয়ে গেছে, আরেকটা যেটা শুরু হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু এই দুই সময় একসাথে থাকলে মানুষ টিকে থাকতে পারে না, কারণ একটা সবসময় অন্যটাকে প্রশ্ন করে। তার বুকের ভেতরে একটা টান তৈরি হয়—একদিকে এগোতে চায়, অন্যদিকে পেছনে টানে। সে নিজেকে জিজ্ঞেস করে—“আমি কি সত্যিই শিউলিকে ভালোবাসি?”—কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর কোনো শব্দে আসে না, শুধু একটা অস্বস্তি আসে, একটা অদ্ভুত চুপচাপ কষ্ট। ভালো লাগা তো আছে—শিউলির সাথে থাকলে একটা স্বস্তি আসে, একটা শান্তি—কিন্তু সেই শান্তিটা কি ভালোবাসা, নাকি শুধু ক্লান্তি থেকে পাওয়া বিশ্রাম? সে বোঝার চেষ্টা করে, কিন্তু যত বেশি বোঝার চেষ্টা করে, তত বেশি জড়িয়ে যায়।
তার মনে পড়ে—শিউলির সাথে প্রথম কিছু দিন, যখন সবকিছু সহজ ছিল, কোনো প্রশ্ন ছিল না, কোনো অতীত ছিল না, শুধু বর্তমান ছিল। সেই দিনগুলোতে সে নিজেকে হালকা লাগত, যেন সে আবার নতুন করে শুরু করতে পারবে। শিউলি কখনো তাকে চাপ দেয়নি, কখনো কিছু জানতে চায়নি, সে শুধু পাশে ছিল—একটা নরম, উষ্ণ উপস্থিতির মতো। সেই উপস্থিতিটা সাইফকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সে সেটা অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু এখন, যখন সে এই চিঠিটার সামনে বসে আছে, তখন সে বুঝতে পারছে—এই বেঁচে থাকা কি সত্যিই নতুন কিছু, নাকি পুরোনো কষ্টকে ঢেকে রাখার একটা উপায়? সে নিজের ভেতরে খুঁজতে থাকে—শিউলির প্রতি তার টানটা কি শিউলির জন্য, নাকি আরিবার অনুপস্থিতির জন্য? এই প্রশ্নটা যতবার মাথায় আসে, ততবার সে অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নেয়, যেন নিজের কাছ থেকেই পালাতে চায়। কারণ সত্যিটা যদি এমন হয়, যেটা সে শুনতে চায় না? সে কি প্রস্তুত সেটা মেনে নিতে? তার মনে হয়—ভালোবাসা যদি সত্যিই নতুন জায়গা তৈরি করে, তাহলে সে কেন বারবার পুরোনো জায়গায় ফিরে যাচ্ছে? কেন শিউলির সাথে থাকা অবস্থাতেও সে আরিবার কথা ভাবে? এই দ্বন্দ্বটা তাকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে দেয়, কিন্তু সে এই ক্লান্তি কাউকে দেখাতে পারে না। বাইরে থেকে সব ঠিক—সে কাজ করছে, কথা বলছে, স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে—কিন্তু ভেতরে একটা টানাপোড়েন চলতেই থাকে।
শিউলি এই পরিবর্তনটা খুব ধীরে বুঝতে শুরু করে, এমনভাবে যে প্রথমে সে নিজেই নিশ্চিত হতে পারে না—এটা সত্যিই বদল, নাকি তার নিজের ভেতরের কোনো ভয়। সাইফ আগের মতো কথা বলে না, মাঝেমধ্যে কথার মাঝখানে থেমে যায়, যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেছে, অথবা কিছু ভুলে গেছে। তার চোখে একটা অদ্ভুত দূরত্ব আসে—যেন সে সামনে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আসলে অন্য কোথাও দেখছে। শিউলি প্রথমে এটাকে ক্লান্তি ভেবেছিল, কাজের চাপ ভেবেছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে বুঝতে পারে—এই দূরত্বটা শুধু বাইরের না, এটা ভেতরের। সে লক্ষ্য করে—সাইফ তার কথা শুনছে, কিন্তু আগের মতো প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে না, তার হাসিটা ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না, তার উপস্থিতিটা যেন পুরোপুরি অনুভূত হচ্ছে না। এই ছোট ছোট জিনিসগুলোই ধীরে ধীরে একটা বড় অনুভূতিতে পরিণত হয়—সে যেন কারও জীবনে পুরোটা নেই, শুধু আংশিক আছে। এই আংশিক থাকার অনুভূতিটা খুব কষ্টের, কারণ এখানে কোনো স্পষ্ট অভিযোগ নেই, কিন্তু একটা অদৃশ্য শূন্যতা আছে। সে মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে তাকায়—হাসে, আবার হাসিটা মিলিয়ে যায়—যেন সে বুঝতে চাইছে, কোথায় ভুল হচ্ছে। তার মনে হয়—সে কি যথেষ্ট না? নাকি সে এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার জায়গাটাই আসলে কারও জন্য বানানো না?
একটা বিকেলে, আলোটা একটু নরম ছিল, জানালার পর্দা দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল ছায়া-ছায়া হয়ে, তখন শিউলি খুব সাধারণভাবে জিজ্ঞেস করেছিল—“তুমি কি কিছু ভাবতেছ?” প্রশ্নটা এমনভাবে বলা, যেন কোনো চাপ নেই, শুধু একটা জানার ইচ্ছে। সাইফ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল—এই চুপ থাকার ভেতরেই অনেক কিছু ছিল—তারপর বলেছিল, “সবাই কিছু না কিছু ভাবতেছে।” এই উত্তরটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা এড়িয়ে যাওয়া ছিল। শিউলি হালকা হেসেছিল—একটা ছোট, নিয়ন্ত্রিত হাসি—“সবাই না, তুমি।” এই কথাটা খুব নরমভাবে বলা, কিন্তু এটা সরাসরি। এই সরলতা, এই সরাসরি হওয়াটা সাইফকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়, কারণ সে বুঝতে পারে—এই মেয়ে তাকে খুব সহজভাবে দেখে, কিন্তু সেই সহজতার ভেতরে একটা গভীর বোঝাপড়া আছে। সে জানে, সে লুকাতে পারছে না পুরোটা। তার মনে হয়—সে যদি এখন সত্যিটা বলে দেয়, তাহলে কী হবে? সে কি প্রস্তুত সেই কথোপকথনের জন্য? সে কি নিজেই জানে তার সত্যিটা কী? এই প্রশ্নগুলো তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে, আর সে কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। তাই সে চুপ থাকে, আর সেই চুপ থাকাটাই সব বলে দেয়।
শিউলি আর কিছু জিজ্ঞেস করে না, কারণ সে বুঝে গেছে—কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর মানুষ তখনই দেয়, যখন সে নিজে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু তার ভেতরে একটা নতুন অনুভূতি জন্ম নেয়—একটা ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা উপলব্ধি—সে হয়তো এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার উপস্থিতি পুরোটা না। সে ভাবতে শুরু করে—সে কি সত্যিই সাইফের জীবনে নিজের একটা জায়গা তৈরি করেছে, নাকি সে শুধু একটা ফাঁকা জায়গা পূরণ করছে? এই ভাবনাটা প্রথমে খুব ছোট ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বড় হতে থাকে। সে বুঝতে পারে—কাউকে ভালোবাসা মানে শুধু তার পাশে থাকা না, বরং তার ভেতরের জায়গাটায় থাকা। আর যদি সেই জায়গাটা আগেই কারও জন্য ভরা থাকে, বা কারও স্মৃতিতে দখল করা থাকে, তাহলে সেখানে নতুন করে জায়গা বানানো খুব কঠিন। তার বুকের ভেতরে একটা হালকা ব্যথা হয়—তীব্র না, কিন্তু স্থায়ী—যেন কেউ খুব আস্তে করে চাপ দিয়ে রেখেছে।
রাত নামলে এই অনুভূতিগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাইফ নিজের ভেতরে ডুবে থাকে, শিউলি নিজের ভেতরে। একই ঘরে থেকেও তারা আলাদা আলাদা ভাবনায় ডুবে থাকে। মাঝে মাঝে তাদের চোখে চোখ পড়ে, কিন্তু সেই চোখের ভেতরে আগের মতো উষ্ণতা নেই—বরং একটা প্রশ্ন আছে, একটা দ্বিধা আছে। এই নীরবতা কোনো ঝগড়ার মতো না, এটা আরও গভীর—কারণ এখানে শব্দ নেই, শুধু অনুভূতি আছে। সাইফ চিঠিটা আবার হাতে নেয়, আবার পড়ে—যেন সে কোনো উত্তর খুঁজছে, কোনো নির্দেশনা খুঁজছে—কী করা উচিত, কীভাবে বোঝা উচিত। আর শিউলি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ দেখে—এই মুখটা কি সত্যি? নাকি এটা একটা অভ্যাস? তারা দুজনেই নিজেদের মতো করে লড়ছে—একজন অতীতের সাথে, আরেকজন বর্তমানের সাথে।
ধীরে ধীরে একটা সত্য স্পষ্ট হতে শুরু করে—ভালোবাসা কখনো শুধু থাকা না, এটা বোঝা, গ্রহণ করা, আর সত্যের মুখোমুখি হওয়া। সাইফ বুঝতে পারে—সে যদি সত্যিই শিউলির সাথে থাকতে চায়, তাহলে তাকে নিজের ভেতরের এই দ্বন্দ্বটা শেষ করতে হবে, তাকে ঠিক করতে হবে—সে কী অনুভব করছে, কেন অনুভব করছে। আর শিউলি বুঝতে পারে—সে যদি এই সম্পর্কে থাকে, তাহলে তাকে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে দেওয়া যাবে না। এই দুই উপলব্ধির মাঝখানেই তাদের সম্পর্কটা দাঁড়িয়ে আছে—একটা সূক্ষ্ম জায়গায়, যেখানে একটু এগোলেই বদলে যাবে সবকিছু। আর এই বদলটা হঠাৎ করে আসবে না—এটা আসবে ধীরে, নিঃশব্দে, কিন্তু একবার এলে আর আগের জায়গায় ফেরা যাবে না।

(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Like Reply
#28
পর্ব ১৬ 

রাফির ফোনে অচেনা নম্বর থেকে কলটা আসার আগেই দুপুরটা একধরনের নির্লিপ্ত ক্লান্তিতে ভরা ছিল—অফিসের ঘড়ির কাঁটা যেন এগোচ্ছিল, কিন্তু সময় এগোচ্ছিল না। তার সামনে ফাইলের স্তূপ, মনিটরের আলোয় চোখ শুকিয়ে আসছে, আর টেবিলের পাশে রাখা কফিটা অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে—তবুও সে খেয়াল করেনি। এই ধরনের দিনগুলোতে মানুষ নিজের ভেতরটাকে একটু বন্ধ করে রাখে, যেন কিছুই তাকে ছুঁতে না পারে। কিন্তু জীবন কখনো কখনো এমন মুহূর্ত বেছে নেয়, যখন সবকিছু একসাথে খুলে যায়। ফোনটা কেঁপে উঠতেই সে একবার তাকাল—অচেনা নম্বর। খুব সাধারণ একটা দৃশ্য, প্রতিদিনই এমন কল আসে। কিন্তু আজকের এই নম্বরটার দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর হালকা একটা টান লাগল, যেন কোনো অদৃশ্য হাত তাকে সতর্ক করে দিল। সে ধরতে চায়নি, সত্যি বলতে একটু ভয়ই পেয়েছিল—যে ভয়টার কোনো স্পষ্ট কারণ নেই, কিন্তু তবুও খুব বাস্তব। তারপরও সে ধরল। “হ্যালো…” বলতেই ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। সেই নীরবতা অস্বস্তিকর না—বরং ভয়ংকর। যেন কেউ ইচ্ছে করে চুপ করে আছে, শুধু তার শ্বাসের শব্দ শুনছে। তারপর হঠাৎ একটা হাসি। শুকনো, ধীর, আর অদ্ভুতভাবে পরিচিত। “অনেক দিন পর তোর নাম্বারটা পাইলাম…”—এই একটা বাক্যই যথেষ্ট ছিল তার শরীরের সব রক্ত যেন এক মুহূর্তে জমে যাওয়ার জন্য।
কথাটা কানে ঢোকার সাথে সাথে তার আঙুল কীবোর্ডের ওপর থেমে গেল, স্ক্রিনের অক্ষরগুলো হঠাৎ ঝাপসা হয়ে উঠল। তার বুকের ভেতর একটা ধাক্কা লাগল, তারপর সেই ধাক্কাটা ধীরে ধীরে নেমে গেল—যেন শরীর নিজেই বুঝে নিচ্ছে, সামনে একটা ঝড় আসছে, আর তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সে কথা বলল না, শুধু শ্বাস নিচ্ছিল—গভীর, ভারী শ্বাস। ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠটা এল, এবার একটু নরম, একটু খেলাচ্ছলে—“শুনলাম ভালো আছিস, চাকরি করিস… ব্যাংকের লোক হইছিস। বাহ…” এই “বাহ” শব্দটার ভেতরে কোনো প্রশংসা ছিল না, বরং একটা তিরস্কার, একটা তাচ্ছিল্য, একটা পুরনো হিসাবের গন্ধ। তারপর হালকা বিরতি। সেই বিরতিটা ইচ্ছাকৃত—যেন সে জানে, ঠিক এই জায়গাতেই রাফির বুক কেঁপে উঠবে। “কিন্তু পুরোনো কথা মনে আছে না?”—এই প্রশ্নটা ছিল না, এটা ছিল একটা দরজা খুলে দেওয়া, যেটা রাফি অনেক কষ্টে বন্ধ করে রেখেছিল।
রাফির গলা শুকিয়ে গেল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু শব্দ আটকে গেল গলার কোথাও। তার সামনে অফিসের স্বাভাবিক দৃশ্যটা হঠাৎ অচেনা লাগতে শুরু করল—লোকজন টাইপ করছে, ফোনে কথা বলছে, কেউ হাসছে—সবকিছু ঠিকঠাক, কিন্তু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলো। যেন সে এই জায়গার অংশ না, বরং বাইরে থেকে দেখছে। “যখন বেকার ছিলি, তখন আমার কাছেই তো আসতি…”—ওপাশের কণ্ঠটা এবার একটু গভীর হলো। এই একটা লাইনে কতগুলো রাত লুকিয়ে আছে—অন্ধকার গলি, ক্লান্তি, হতাশা, আর সেই ছোট ছোট ভুল, যেগুলো তখন খুব ছোট মনে হয়েছিল। রাফির আঙুল ফোনের চারপাশে শক্ত হয়ে গেল। সে বলতে চাইল—“আমি এখন ওইসব করি না…” কিন্তু সে জানে, এই কথাটা বলার কোনো মানে নেই। কারণ এই মানুষটার সামনে “এখন” বলে কিছু নেই—সবকিছু একসাথে, একই রকম বাস্তব।
রকি হেসে উঠল—সেই একই হাসি, যেটা কখনো জোরে হয় না, কিন্তু শুনলে মনে হয় ভেতরে কিছু একটা ফেটে যাচ্ছে। “জানতে চাচ্ছি না যে এখন করিস কি না,” সে বলল, খুব ধীরে, খুব স্বাভাবিকভাবে। “মানুষ বদলায়, না? তুই তো বদলাইছিস… জামা-জুতা, অফিস, গাড়ি… সব।” কথাগুলো শুনতে সাধারণ, কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন সূচের মতো ঢুকছিল। রাফির চোখের সামনে ভেসে উঠল তার নতুন জীবন—পরিপাটি অফিস, পরিচ্ছন্ন পোশাক, ব্যাংকের সম্মানজনক পদ—সবকিছু। আর ঠিক তার পাশেই আরেকটা ছবি—অন্ধকার গলি, সিগারেটের ধোঁয়া, আর একটা ছায়া, যেটা সে কখনো পুরোপুরি পেছনে ফেলতে পারেনি। “তোর বউ জানলে কেমন নেয়?”—এই প্রশ্নটা আসার সাথে সাথে তার বুকের ভেতর যেন কেউ ছুরি ঢুকিয়ে দিল। সে হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল, চারপাশে তাকাল—কেউ শুনছে না, কেউ জানে না। তবুও তার মনে হচ্ছিল—সবাই জানে, সবাই দেখছে, সবাই বুঝে ফেলেছে।
“তোর শ্বশুর মরার আগে সন্দেহ করছিল,” রকি বলল, এবার তার কণ্ঠে একটা ঠান্ডা নিশ্চয়তা। “কিন্তু পুরোটা জানে না… আমি তো রেখেই দিয়েছিলাম তোর ওই ছোট্ট অভ্যাসটা।” এই কথাটা শুধু হুমকি না—এটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, একটা নিয়ন্ত্রণ। রাফির ঠোঁট কেঁপে উঠল—“চুপ…” সে বলতে চাইল, কিন্তু শব্দ এত আস্তে বের হলো যে নিজেই ঠিকমতো শুনতে পেল না। তার কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে, হাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, শরীরের ভেতরে একটা অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। “চিন্তা করিস না,” রকি আবার বলল, এবার কণ্ঠটা নরম। “আমি তোরে ফাঁসাইতে চাই না। তুই আমার লোক ছিলি… আছিসও। আমি একটু সাহায্য চাই। চাপ নিস না।” এই “চাপ নিস না” কথাটার ভেতরেই সবচেয়ে বেশি চাপ ছিল—যে চাপের কোনো শব্দ নেই, কিন্তু ওজন আছে।
রাফির বুকের ভেতর ধকধক শব্দ উঠতে লাগল—একটা ছন্দ, যেটা সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। “কিসের সাহায্য?”—সে অবশেষে বলতে পারল, গলা শুকনো, কণ্ঠ কাঁপা। রকি একটু থামল, যেন শব্দগুলো বেছে নিচ্ছে। “ব্যাংকের ভেতরে একটা জিনিস…” সে বলল। “বিস্তারিত পরে বলুম। তুই চিন্তা করে বলবি। তাড়াহুড়া নাই।” এই “তাড়াহুড়া নাই” শব্দটা যেন সময়কে আরও ভারী করে দিল। কারণ যখন কেউ বলে তাড়াহুড়া নাই, তখন আসলে সে জানে—সময় তার হাতেই আছে। রাফি আর কিছু বলল না। ফোন কেটে দিল। কিন্তু কলটা শেষ হলেও কথাগুলো শেষ হলো না—ওগুলো তার মাথার ভেতর ঘুরতে থাকল, বারবার, থামল না।
ফোন কেটে যাওয়ার পরও সে দাঁড়িয়ে রইল, যেন শরীরটা ভুলে গেছে বসতে হয়। অফিসের ভেতর সবকিছু আগের মতোই চলছে—কেউ হাসছে, কেউ কাজ করছে, কেউ চা খাচ্ছে। কিন্তু তার কাছে মনে হচ্ছে—এই জায়গাটা বদলে গেছে। যেন কেউ একটা অদৃশ্য ফাটল তৈরি করে দিয়েছে, যেটা শুধু সে দেখতে পাচ্ছে। সে ধীরে ধীরে বসে পড়ল, কিন্তু হাত এখনও কাঁপছে। মাউস ধরতে গিয়ে বুঝল—তার আঙুল ঠিকমতো কাজ করছে না। তার মাথার ভেতর একটার পর একটা দৃশ্য ভেসে উঠছে—রাতের গলি, অন্ধকার কোণ, রকির হাসি, সিগারেটের ধোঁয়া, আর সেই ছোট ছোট প্যাকেট। সে চোখ বন্ধ করল, নিজেকে বলল—“শেষ… সব শেষ হয়ে গেছে…” কিন্তু ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ উঠল—“শেষ হয়নি।” সেই কণ্ঠটা তার নিজের না, তবুও খুব পরিচিত।
সারাদিন সে ঠিকমতো কাজ করতে পারল না। একটা রিপোর্ট তিনবার লিখে আবার মুছল, একটা মেইল পাঠাতে গিয়ে দশবার পড়ল। তার সহকর্মী জিজ্ঞেস করল—“সব ঠিক আছে?” সে হেসে বলল—“হ্যাঁ।” এই “হ্যাঁ” শব্দটা খুব হালকা, কিন্তু ভেতরে একটা ঝড় চলছিল—অস্থির, অদৃশ্য, কিন্তু ভাঙার মতো শক্তিশালী। সন্ধ্যায় সে বাড়ি ফিরল, দরজা খুলতেই ভেতর থেকে রান্নার গন্ধ এল—ভাত, ডাল, ভাজি। এই গন্ধটা সবসময় তার কাছে নিরাপত্তার মতো ছিল, একটা আশ্রয়। কিন্তু আজ সেই একই গন্ধের ভেতরেও অস্বস্তি। যেন এই ঘরের ভেতরেও তার অতীত ঢুকে পড়েছে, নিঃশব্দে, কারও অজান্তে।
নীলা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিল, পিঠ দেখা যাচ্ছে, চুল বাঁধা, হাতের ভঙ্গি শান্ত। “আইছো?”—সে বলল, না ঘুরেই। “হুম…”—রাফির গলায় ক্লান্তি, না, ক্লান্তি না—ভয়। সে জুতা খুলে বসে পড়ল, ফোনটা টেবিলে রাখল। ঠিক তখনই ফোনটা আবার কেঁপে উঠল। একই নম্বর। রাফি তাকাল, কিন্তু ধরল না। নীলা একবার তাকাল, কিছু বলল না। এই না-বলা জিনিসগুলোই সবচেয়ে ভারী—কারণ এগুলোর ভেতরে প্রশ্ন থাকে, সন্দেহ থাকে, আর একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়।
রাতের খাবারের সময় তিনজন বসে। শুভ্র পাশে বসে গল্প করছে—কলেজে কী হয়েছে, কে কী বলেছে, সে হাসছে, হাত নেড়ে দেখাচ্ছে। রাফি মাথা নেড়ে শুনছে, কিন্তু কিছুই শুনছে না। তার মাথার ভেতর শুধু একটা কণ্ঠ ঘুরছে—“তোর বউ জানলে কেমন নেয়…” নীলা ধীরে ধীরে খাচ্ছে, তার চোখ মাঝে মাঝে রাফির দিকে যাচ্ছে। সে কিছু জিজ্ঞেস করছে না, কিন্তু দেখছে—খুব গভীরভাবে। এই দেখাটার ভেতরেই একটা প্রশ্ন আছে, একটা সন্দেহ, একটা অজানা অনুভূতি। রাফির মনে হচ্ছে—সে যেন ধরা পড়ে গেছে, যদিও কেউ কিছু বলেনি।
রাত গভীর হলে সে বিছানায় গেল, কিন্তু ঘুম এল না। সে এপাশ-ওপাশ করছে, চোখ বন্ধ করলেই সেই কণ্ঠ ফিরে আসে। “তোর বউ জানলে কেমন নেয়…”—এই লাইনটা বারবার ফিরে আসে, যেন কেউ ইচ্ছে করে তার মাথার ভেতরে বাজাচ্ছে। সে উঠে বসে পানি খেল, হাত এখনও কাঁপছে। পাশে নীলা শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ। কিন্তু সে ঘুমাচ্ছে না। সে শুধু কিছু বলছে না। এই না-বলা, না-ঘুমানো, না-প্রশ্ন করা—সবকিছু মিলে একটা চাপা বিস্ফোরণের মতো। রাফি বুঝতে পারে—তার জীবনটা এখন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে এই শান্ত, নিরাপদ ঘর। আরেকদিকে সেই অন্ধকার, যেটা সে ভেবেছিল পেছনে ফেলে এসেছে। কিন্তু অন্ধকারের একটা স্বভাব আছে—ওটা কখনো পুরোপুরি যায় না, শুধু অপেক্ষা করে। ঠিক সময়ের জন্য।


কিছু কিছু নীরবতা থাকে যেগুলো শব্দের থেকেও বেশি জোরে কথা বলে—সাইফ সেই নীরবতার ভেতরেই দিন কাটাচ্ছিল। আরিবার চিঠিটা পড়ার পর তার ভেতরের পৃথিবীটা যেন একটু একটু করে সরে গেছে, জায়গা বদলেছে, কিন্তু বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না। অফিসে সে আগের মতোই যায়, চেয়ারে বসে, ফাইল খোলে, কল রিসিভ করে, মিটিংয়ে মাথা নাড়ে—সবকিছু নিখুঁত, সবকিছু ঠিকঠাক। তবুও মাঝেমাঝে সে হঠাৎ থেমে যায়, যেন মাথার ভেতর কোনো অদৃশ্য শব্দ তাকে ডেকে ওঠে। লিফটের আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে—এই চোখ তার চেনা না, এখানে একটা ক্লান্তি আছে, একটা অদ্ভুত অপরাধবোধ, যেন সে নিজের কাছেই কিছু লুকিয়ে রেখেছে। রাতে ঘুমানোর আগে সে চিঠিটার লাইনগুলো মনে মনে পড়ে—একই শব্দ, একই অনুভূতি, বারবার। “আমার অভাব দিয়ে কাউকে ভরাইও না…” এই বাক্যটা তার ভেতরে আটকে থাকে, যেন একটা সূক্ষ্ম কাঁটা। সে চেষ্টা করে ভুলে যেতে, কিন্তু যতই ভুলতে চায়, ততই সেটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তার মনে হয়—সে কি সত্যিই শিউলিকে ভালোবেসেছে, নাকি শুধু নিজের ভেতরের শূন্যতাকে ঢাকতে একটা সম্পর্ক ধরে রেখেছে? এই প্রশ্নটা এতটাই ব্যক্তিগত, এতটাই কাঁচা যে সে নিজেকেও পুরোপুরি উত্তর দিতে পারে না। দিনগুলো চলে যায়, কিন্তু ভেতরের এই টান থামে না—বরং ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আরও ভারী হয়। অবশেষে একদিন বিকেলে, যখন সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে আলোটা একটু নরম হয়ে আসে, সে বুঝতে পারে—আর পালিয়ে থাকা যাবে না, এবার তাকে বলতে হবে, যেটা এতদিন এড়িয়ে গেছে।
সেদিন বাসায় ঢোকার সময় তার হাতটা হালকা কেঁপে উঠেছিল, দরজার হাতলটা ধরতে গিয়ে সে একটু থেমে গিয়েছিল, যেন এই দরজার ওপাশেই তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন কথাগুলো অপেক্ষা করছে। ঘরের ভেতর ঢুকতেই সে বুঝতে পারল—আজ নীরবতাটা অন্যরকম, ভারী, স্থির। টিভি বন্ধ, রান্নাঘরে কোনো শব্দ নেই, শুধু দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দটা অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট। শিউলি ড্রয়িংরুমে বসে ছিল, কোলে একটা বই—পাতা খোলা, কিন্তু চোখ বইয়ের ওপর নেই, দূরে কোথাও আটকে আছে। তার মুখে একটা শান্ত ভাব, কিন্তু সেই শান্তির ভেতরে ক্লান্তি মিশে আছে, যেটা শুধু খুব কাছে গেলে বোঝা যায়। সাইফ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ধীরে গিয়ে তার সামনে বসে পড়ল। “একটু কথা আছে,” সে বলল, গলা একটু শুকনো, শব্দগুলো বের হতে কষ্ট হচ্ছিল। শিউলি বইটা বন্ধ করল, কোনো প্রশ্ন করল না, শুধু তাকাল—সোজা, স্থির, অপেক্ষা নিয়ে। এই দৃষ্টি সাইফকে আরও অস্বস্তিতে ফেলল, কারণ এখানে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো তাড়াহুড়া নেই—শুধু শোনা। সে কথা শুরু করল—ধীরে, থেমে থেমে, যেন প্রতিটা শব্দ বের করতে তাকে নিজের ভেতর থেকে টেনে আনতে হচ্ছে। আরিবার কথা, সেই বাড়ি, সেই জন্মদিন, সেই চিঠি—সবকিছু একে একে বের হতে লাগল, আর প্রতিটা কথার সাথে তার বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা একটু একটু করে বাইরে আসতে লাগল।
সে বলছিল, কিন্তু বলতে বলতে নিজেই বুঝতে পারছিল—সে এতদিন কতটা নিজেকে এড়িয়ে গেছে। শিউলির পাশে থেকেও সে পুরোটা উপস্থিত ছিল না, তার চোখে তাকিয়েও অন্য কাউকে খুঁজেছে, তার স্পর্শে থেকেও একটা দূরত্ব রেখে দিয়েছে। সে নিজের অপরাধবোধের কথা বলল—কীভাবে প্রতিটা রাতে সে নিজেকে প্রশ্ন করেছে, কিন্তু উত্তর দেয়নি। বলল সেই ভয়টার কথা—যে ভয় তাকে সামনে এগোতে দেয় না, আবার পেছনেও ফিরতে দেয় না। মাঝে মাঝে সে থেমে যাচ্ছিল, শ্বাস নিচ্ছিল, চোখ নামিয়ে ফেলছিল—কারণ কিছু কিছু কথা এতটাই নগ্ন যে সেগুলো বলা মানে নিজেকে সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া। ঘরের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল, ফ্যান ঘুরছিল, কিন্তু সেই হাওয়া যেন তাদের ছুঁতে পারছিল না। শিউলি চুপ করে শুনছিল, তার মুখে কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো অশ্রু নেই—শুধু একটা গভীর মনোযোগ। সাইফ যখন শেষ করল, তখন তার গলা একেবারে শুকিয়ে গেছে, শরীর ক্লান্ত, কিন্তু ভেতরে একটা অদ্ভুত হালকা ভাবও আছে—যেন অনেকদিন পর সে সত্যি কথা বলেছে। কিন্তু সেই হালকা ভাবের ভেতরেও একটা ভয় আছে—এই কথাগুলোর পর কী হবে, কীভাবে সব বদলাবে।
শিউলি অনেকক্ষণ কিছু বলল না। তার চোখ স্থির, মুখ শান্ত, কিন্তু তার ভেতরে কী চলছে সেটা বোঝা যায় না। তারপর খুব ধীরে তার ডান হাতটা নিজের তলপেটের ওপর চলে গেল—একটা স্বাভাবিক, প্রায় অচেতন ভঙ্গি, কিন্তু এই ছোট্ট নড়াচড়াটাই যেন পুরো ঘরের ভারসাম্য বদলে দিল। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা—এমন নীরবতা, যেখানে শব্দ থাকলে সহজ হতো। তারপর সে খুব আস্তে বলল, “জানো, আরো কিছু আছে…” তার গলার স্বর নরম, কিন্তু তার ভেতরে একটা দৃঢ়তা। সাইফ তাকাল, বুকের ভেতর আবার সেই ধকধক শুরু হলো। “আমি মা হতে চলেছি,”—এই তিনটা শব্দ বের হতে সময় লাগল না, কিন্তু শোনার পর সময় থেমে গেল। এই কথাটা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল, দেয়ালে লেগে রইল, তাদের মাঝখানে একটা নতুন বাস্তবতা তৈরি করল। সাইফ প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না—শব্দগুলো মাথায় ঢুকছে, কিন্তু অর্থ বসছে না। তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু পরিষ্কার হতে লাগল—মা… বাচ্চা… তাদের ভবিষ্যৎ… তার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল, চোখ ঝাপসা হয়ে গেল, সে বুঝতে পারল না এটা ভয়, না আনন্দ, না দুটো একসাথে।
সে শিউলির দিকে তাকাল—এই মেয়েটাকে সে এতদিন ধরে চেনে, তবুও আজ যেন প্রথমবার দেখছে। এতদিন সে শিউলির ভেতর দিয়ে অন্য কাউকে খুঁজেছে, আজ বুঝল—এই মানুষটা আলাদা, সম্পূর্ণ, নিজের মতো করে দাঁড়িয়ে আছে। শিউলি বলল, “আমি জানি, তুমি এখনো ঠিক করোনি আমার জায়গাটা কোথায়।” তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, কোনো তীক্ষ্ণতা নেই—শুধু একধরনের স্বচ্ছ ক্লান্তি, যেটা অনেক ভাবার পর আসে। “কিন্তু আমি ঠিক করেছি,” সে বলল, “আমার ভেতরে যে বাচ্চা আসছে, তার কাছে আমি কখনো ছায়া হতে চাই না।” এই কথাটা বলার সময় তার চোখে হালকা একটা শক্ত ভাব আসে—একটা সিদ্ধান্তের ছাপ। “তুমি যদি অতীতেই আটকে থাকো… তবে আমি একাই ওকে মানুষ করব,”—এই বাক্যটা খুব নরম, কিন্তু ভেতরে লোহার মতো শক্ত। “কিন্তু যদি সত্যি ফিরতে চাও… তবে এই মুহূর্তটাকে ধরে চলো।” এই কথার ভেতরে কোনো চাপ নেই, শুধু একটা দরজা খোলা—যেটা দিয়ে সে চাইলে ঢুকতে পারে, না চাইলে বাইরে থাকতে পারে।
সাইফ কিছু বলতে পারল না। তার মাথার ভেতর যেন দুইটা জগত লড়াই করছে—একদিকে সেই অতীত, যেখানে আরিবার স্মৃতি, অপরাধবোধ, আর অসমাপ্ত অনুভূতি। অন্যদিকে এই বর্তমান—যেখানে একটা নতুন জীবন শুরু হতে যাচ্ছে, যেখানে তার একটা ভূমিকা আছে, দায়িত্ব আছে, ভালোবাসার নতুন সুযোগ আছে। সে ধীরে ধীরে উঠে এসে হাঁটু গেড়ে বসল শিউলির সামনে, তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু সে থামল না। সে হাত বাড়িয়ে শিউলির পেটের ওপর রাখল—সেখানে এখনো কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই, কোনো স্পষ্টতা নেই। তবুও মনে হলো—একটা সম্পূর্ণ ভবিষ্যৎ সেখানে লুকিয়ে আছে, নীরবে, অপেক্ষা করছে। তার গলা শুকিয়ে গেল, সে বলল, “আমি ভয় পাই…”—এই স্বীকারোক্তিটা তার নিজের কাছেও নতুন। “হয়তো আবার কাউকে হারাব… হয়তো ঠিকমতো ভালোবাসতে পারব না…” এই ভয়টা সত্যি, কাঁচা, আর একেবারে মানুষের মতো। শিউলি তার দিকে তাকাল, তারপর খুব ধীরে বলল, “ভয় থাকবেই… কিন্তু ভালোবাসা মানে ভয় না থাকা না—ভয় থাকার পরও পাশে থাকা।” সে তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল—এই স্পর্শে কোনো নাটকীয়তা নেই, শুধু উষ্ণতা, বাস্তবতা।
পরের কয়েকটা দিন বাইরে থেকে খুব বেশি বদল আনেনি, কিন্তু ভেতরে ছোট ছোট পরিবর্তন শুরু হলো—যেগুলো চোখে পড়ে না, কিন্তু অনুভব করা যায়। সকালে তারা একসাথে চা খায়, যেখানে আগে নীরবতা ছিল, এখন ছোট ছোট কথাবার্তা—“চিনি কম হয়েছে?” “আজকে ডাক্তার কয়টায়?”—এই সাধারণ প্রশ্নগুলোই নতুন হয়ে ওঠে। একদিন সাইফ নিজে থেকে বলে—“চলো, ডাক্তারের কাছে যাই।” শিউলি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে, তারপর মাথা নাড়ে—এই ছোট্ট সম্মতিটাও একটা বিশ্বাসের মতো। তারা রিকশায় যায়—রাস্তার ধুলো, হর্ন, মানুষের ভিড়—সব আগের মতো, কিন্তু তাদের মাঝে একটা নীরব বোঝাপড়া তৈরি হয়। ডাক্তারের চেম্বারে বসে থাকতে থাকতে সাইফ মাঝে মাঝে শিউলির দিকে তাকায়—তার মনে হয়, এই মানুষটাকে সে নতুন করে চিনছে। তার ভেতরের ভয় পুরো যায়নি, দ্বিধাও আছে, কিন্তু এবার সে পালাচ্ছে না। আরিবার চিঠিটা এখনও টেবিলের কোণে রাখা—কেউ সেটা সরায় না, কেউ সেটা নিয়ে কথা বলে না। তবুও সেটা আর আগের মতো ভারী না—এখন সেটা একটা স্মৃতি, যেটা আছে, কিন্তু শ্বাস নিতে দেয়।
একদিন সন্ধ্যায়, যখন আকাশে হালকা লালচে রং ছড়িয়ে পড়ে, শিউলি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। দূরে একটা পাখি উড়ছিল—ধীরে, একা, কিন্তু স্থির। সাইফ পেছন থেকে এসে একটা শাল তুলে তার কাঁধে জড়িয়ে দিল—শালটা নরম, উষ্ণ। শিউলি একটু ঘুরে তাকাল, তার চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতরে আলোও আছে। “তুমি কি ঠিক আছো?”—সে জিজ্ঞেস করল, খুব সহজভাবে। এই প্রশ্নটা ছোট, কিন্তু ভেতরে অনেক কিছু—দুশ্চিন্তা, আশা, আর একটু ভয়। সাইফ একটু হাসল—এই হাসিটা পুরো না, কিন্তু সত্যি। “আমি জানি না… কিন্তু আমি আছি,”—সে বলল। এই “আমি আছি” কথাটা বাতাসে ভেসে রইল—একটা প্রতিশ্রুতি না, কিন্তু একটা শুরু। শিউলি কিছু বলল না, শুধু আবার আকাশের দিকে তাকাল। তার মনে হলো—সবকিছু একসাথে ঠিক হয়ে যায় না, কিন্তু কিছু শুরু হয়। ধীরে, নিঃশব্দে, কিন্তু সত্যি করে। এবার—বাস্তবের মাটিতে পা রেখে।



ঘরের ভেতর নীরবতা এমনভাবে বসে আছে যেন সে এই বাড়ির আরেকজন সদস্য। দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা এখন আর শুধু সময়ের শব্দ না, সেটা যেন কারও শ্বাসের মতো শোনাচ্ছে—একটা অদৃশ্য উপস্থিতি, যে সবকিছু দেখছে কিন্তু কিছু বলছে না। রাফি টেবিলের এক পাশে বসে আছে, কিন্তু তার ভেতরের মানুষটা যেন অনেক আগেই উঠে দাঁড়িয়েছে। নীলা তার বিপরীতে বসে, চুপচাপ, কিন্তু এই চুপ থাকা কোনো শান্তি না—এটা একটা অপেক্ষা, যেটা ধীরে ধীরে মানুষকে খালি করে দেয়। টেবিলের ওপর থাকা কাগজটা এখন আর শুধু কাগজ না, সেটা যেন একটা দরজা—যেটা খুললেই ভেতরের সবকিছু বের হয়ে আসবে, আর বন্ধ করার কোনো উপায় থাকবে না। শুভ্র পাশের ঘরে খেলছে, তার ছোট ছোট শব্দ এই বড় অস্থিরতার সাথে অদ্ভুতভাবে মিশে যাচ্ছে, যেন সে জানেই না পৃথিবীর কোথাও কিছু ভাঙছে। বাইরের জানালা দিয়ে খুব হালকা আলো ঢুকছে, কিন্তু সেটা ঘরের অন্ধকার কমাতে পারছে না, বরং আরও স্পষ্ট করছে ভেতরের ভার। রাফির হাত টেবিলের নিচে কাঁপছে, সে সেটা লুকানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু নীলা ঠিকই বুঝতে পারছে। নীলা তাকিয়ে আছে, কিন্তু সেই তাকানোতে কোনো চিৎকার নেই, শুধু একটা স্থির দেখার অভ্যাস—যেটা মানুষ তখনই শেখে যখন সে আর অন্ধ থাকতে চায় না। আর এই দেখার ভেতরেই ধীরে ধীরে একটা সিদ্ধান্ত জন্ম নিচ্ছে, যেটা কেউ উচ্চারণ করেনি, কিন্তু ঘরটা সেটা আগেই বুঝে গেছে।
রাফির মুখ খোলা নেই অনেকক্ষণ, কিন্তু তার ভেতরে শব্দ জমে আছে—অগোছালো, টুকরো টুকরো, অসম্পূর্ণ। সে একসময় ভাবে কিছু বলবে না, আবার পরের মুহূর্তে মনে হয় না বললে সে নিজেকেই হারিয়ে ফেলবে। নীলা তাকে চাপ দেয় না, কিন্তু এই না-চাপ দেওয়াটাই সবচেয়ে ভারী চাপ, কারণ এতে পালানোর কোনো পথ থাকে না। রাফি শেষমেশ মাথা নিচু করে নেয়, যেন সেই অবস্থানেই সে নিজের অতীতকে দেখতে পারবে কম কষ্টে। তার গলা শুকিয়ে আসে, কিন্তু তবুও সে শুরু করে—প্রথমে ভাঙা ভাঙা, তারপর একটু একটু করে স্পষ্ট। বেকারত্বের দিনগুলো তার কণ্ঠে ফিরে আসে, যেভাবে মানুষ নিজের পুরোনো দাগ ছুঁয়ে দেখে কিন্তু ছিঁড়ে ফেলতে পারে না। সে বলে কীভাবে প্রতিদিন নিজেকে ব্যর্থ মনে হতো, কীভাবে আয়নায় তাকালে নিজের চোখের দিকে তাকাতে পারত না। নীলা শোনে, কিন্তু তার চোখে কোনো নাটকীয় প্রতিক্রিয়া নেই—শুধু বোঝার চেষ্টা আছে, যেন সে কারও ভেতরের ধ্বংসাবশেষ পড়ছে। রাফি থেমে থেমে বলে, মাঝে মাঝে শব্দ খুঁজে পায় না, কারণ কিছু জিনিস শব্দে ধরা যায় না, শুধু ভার হয়ে বসে থাকে। আর এই বলার ভেতরেই ধীরে ধীরে একটা সত্য বের হয়ে আসে—যেটা শুধু ঘটনা না, একটা ভাঙা সময়ের ইতিহাস।
রাফি যখন রকির নামটা আনে না, তখনও রকি সেখানে থাকে—তার কথার ফাঁকে, তার শ্বাসের মাঝে, তার থেমে যাওয়ার ভেতরে। নীলা প্রথমে কিছু বলে না, কারণ সে বুঝতে চায় এই গল্পটা শেষ পর্যন্ত কতটা সত্যি হতে চায়। রাফি বলে “পালাইতাম”—এই শব্দটা বলার সময় তার চোখে কোনো নাটক নেই, শুধু ক্লান্তি আছে, যেটা অনেকদিন ধরে জমে আছে। নীলা তখন প্রথমবার অনুভব করে, এটা শুধু একটা ভুল না, এটা একটা অভ্যাস হয়ে যাওয়া বেঁচে থাকা। মানুষ কখনো কখনো ভুলের ভেতরে এত গভীরভাবে ঢুকে যায় যে সেটাই তার শ্বাস নেওয়ার উপায় হয়ে দাঁড়ায়। রাফি ব্যাখ্যা করে না, নিজেকে রক্ষা করে না, শুধু স্বীকার করে যায়, আর এই স্বীকারোক্তির ভেতরেই তার মুখোশ একটু একটু করে খুলে পড়ে। নীলা তার বাবার ডায়েরির কথা মনে করে, সেই লাইনগুলো যা এতদিন সন্দেহ ছিল, এখন হঠাৎ করে ভিন্নভাবে দাঁড়িয়ে যায়। তার মাথায় একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ঘুরতে থাকে—সবাই কি শুধু “খারাপ” না, বরং কোথাও না কোথাও ভাঙা? এই প্রশ্নের উত্তর নেই, কিন্তু এই প্রশ্নটাই তাকে বদলে দিতে শুরু করে। ঘরের ভেতর বাতাস ভারী হয়ে যায়, কিন্তু সেই ভার এখন আর শুধু ভয় না, বরং বোঝার ভার।
রাফি যখন শেষ করে, তখন মনে হয় ঘরের ভেতর কিছু একটা শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু আসলে শুরু হয়েছে। নীলা অনেকক্ষণ চুপ থাকে, তার চোখে কোনো অতি আবেগ নেই, শুধু একটা স্থির গভীরতা আছে, যেন সে নতুন কোনো সত্যকে জায়গা দিচ্ছে নিজের ভেতরে। সে ধীরে ধীরে বলে “আর কোনো মিথ্যা না”—এই বাক্যটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা শর্ত আছে, একটা সীমা আছে, একটা নতুন নিয়ম। রাফি মাথা নিচু করে “বেরোব” বলে, কিন্তু এই শব্দটা বলার সময় তার কণ্ঠে কোনো বিজয় নেই, বরং একটা ভয় আছে—কারণ বের হওয়া মানে শুধু জায়গা বদলানো না, নিজেকে বদলানো। নীলা এই “বেরোব” শব্দটাকে বিশ্বাস করার আগে আরও অনেক কিছু দেখতে চায়, কারণ সে জানে শব্দ অনেক কিছু বলে, কিন্তু কাজ সবকিছু প্রমাণ করে। শুভ্র পাশের ঘরে হঠাৎ হাসে, সেই হাসি যেন এই ভারী ঘরকে এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে যায়, তারপর আবার চলে যায়। নীলা রাফির দিকে তাকায়, আর এই তাকানোর ভেতর এখন আর শুধু সন্দেহ নেই, আছে একটা নিয়ন্ত্রণ—যেটা সে নিজের ভেতরেই তৈরি করছে। রাফি প্রথমবার বুঝতে পারে, সে শুধু রকির সাথে লড়ছে না, সে এখন নিজের বানানো জীবনের সাথেও লড়ছে। ঘড়ির টিকটিক শব্দটা আবার শোনা যায়, কিন্তু এবার সেটা আর বিরক্তিকর না, বরং মনে হয় সময়ও অপেক্ষা করছে।
ঘরের বাইরে রাত আরও গভীর হয়ে যায়, কিন্তু ভেতরে একটা অদ্ভুত স্থিরতা জন্ম নেয়। টেবিলের ওপর থাকা খামটা এখনো আছে, কিন্তু তার ওজন আর আগের মতো নেই—এটা এখন প্রশ্ন না, এটা সম্ভাবনা। নীলা বুঝতে পারে, সে এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে পুরোনো জীবন আর নতুন জীবনের মাঝখানে একটা পাতলা রেখা আছে। রাফি সেই রেখার এক পাশে দাঁড়িয়ে, কিন্তু সে জানে অন্য পাশে যাওয়া মানে নিজেকে হারিয়ে ফেলা না, বরং নতুন করে খুঁজে পাওয়া। দুজনের কেউই আর আগের মতো নেই, কিন্তু কেউই পুরোপুরি নতুনও না—এই মাঝামাঝি অবস্থাটাই সবচেয়ে অস্থির। ঘরের বাতাস ধীরে ধীরে হালকা হয়, কিন্তু সেই হালকা হওয়া শান্তি না, বরং একটা প্রস্তুতি। নীলা শেষবারের মতো রাফির দিকে তাকায়, আর এই তাকানোতে আর প্রশ্ন নেই, শুধু অপেক্ষা আছে। কারণ সে জানে, এই গল্প এখন কথায় না, কাজে লেখা হবে। আর বাইরে অন্ধকার যত গভীরই হোক, ভেতরে একটা ছোট্ট সিদ্ধান্ত জেগে উঠেছে—যেটা আর সহজে ঘুমাবে না।

(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Like Reply
#29
পর্ব ১৭ 

শীত এখনো পুরোপুরি নামে নাই, তবুও সন্ধ্যার পর বাতাসে একটা কাঁচা ঠান্ডা এসে জমতে শুরু করেছে। এই ঠান্ডা শরীরের আগে মনে লাগে—মানুষকে অকারণে চুপ করিয়ে দেয়, পুরোনো কথা মনে করিয়ে দেয়, আর একা থাকলে বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি করে। সাইফ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে ধরা এক কাপ চা, যেটা অনেক আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে খেয়ালই করেনি। নিচের রাস্তায় মানুষের ভিড়, পাশের ফুচকার দোকান থেকে ভেসে আসা টক-মসলার গন্ধ, কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের হালকা হাসির শব্দ—সবকিছু খুব সাধারণ, খুব জীবন্ত। কিন্তু এই জীবন্ত পৃথিবীর মাঝেও সাইফের ভেতরে যেন একটা বন্ধ ঘর পড়ে আছে, যেখানে বাতাস ঢোকে না। তার মাথার মধ্যে বারবার সেই চিঠির লাইনগুলো ফিরে আসে। “ভালোবাসা কারও জায়গা ভরার জন্য না…” কথাটা এমনভাবে আটকে গেছে যেন কেউ ভেতর থেকে ধীরে ধীরে পেরেক ঠুকছে। সে নিচে তাকিয়ে দেখে, রাস্তার একপাশে একটা বাচ্চা মেয়েকে তার বাবা হাত ধরে রাস্তা পার করাচ্ছে। দৃশ্যটা এত সাধারণ যে কষ্ট লাগে। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ব্যথা পায় তখনই, যখন খুব সাধারণ কিছু জিনিস তার কাছে অসম্ভব মনে হয়। ভেতরের ঘর থেকে হঠাৎ শিউলির হাসির শব্দ ভেসে এল। খুব ছোট্ট, নরম একটা হাসি। কিন্তু সেই হাসির ভেতরে এখন সাইফ এমন একটা উষ্ণতা খুঁজে পায়, যেটা তাকে একই সাথে শান্তও করে, আবার অপরাধবোধেও ভরিয়ে দেয়।
সে ঘুরে তাকাল। শিউলি ফোনে কথা বলছে, সম্ভবত কোনো আত্মীয়ের সাথে। তার ডান হাতটা অজান্তেই তলপেটের ওপর রাখা। এখনও খুব বেশি বোঝা যায় না, কিন্তু সাইফ এখন প্রায়ই সেই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, ওই ছোট্ট অদৃশ্য জায়গাটার ভেতর শুধু একটা শিশু না—তার ভবিষ্যৎ, তার ভয়, তার বাঁচার নতুন কারণ সবকিছু একসাথে ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও সে এতটা অনুভব করত না। তখন সবকিছু শুধু দায়িত্বের মতো লাগত। এখন কখনো কখনো গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে সে হাত বাড়িয়ে শিউলির পেটের ওপর হাত রাখে, তারপর নিজেই ভয় পেয়ে যায়। কারণ সেই মুহূর্তে সে বুঝতে পারে—সে হারানোর ভয় পাচ্ছে। আবার। শিউলি এখন আগের মতো চুপচাপ না। সে মাঝেমধ্যে হঠাৎ করে বাচ্চার নাম নিয়ে কথা বলে, কোন রঙের জামা ভালো লাগবে সেটা নিয়ে হাসে, এমনকি একদিন বলেছিল—“যদি মেয়ে হয়, ওর চুলে ছোট্ট ক্লিপ লাগাবো।” সাইফ তখন হেসেছিল, কিন্তু তার বুকের ভেতর কোথাও একটা ব্যথা উঠেছিল। কারণ এই মেয়েটা ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শিখে গেছে, আর সে এখনো অতীতের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আছে। শিউলি মাঝে মাঝে সেটা বুঝতেও পারে। তাই সে ইচ্ছে করেই আরও বেশি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। যেন স্বাভাবিকতার অভিনয় করতে করতে একসময় সত্যিই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
কিন্তু রাতের অন্ধকার মানুষকে মিথ্যা বলতে দেয় না। দিনের বেলা যত সহজ অভিনয় করা যায়, গভীর রাতে সব মুখোশ আলগা হয়ে আসে। শিউলি অনেক রাতেই টের পায়, সাইফ ঘুমাচ্ছে না। সে পাশ ফিরে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, মাঝে মাঝে খুব ধীরে শ্বাস নেয়। যেন কোনো শব্দ তাকে ভেতর থেকে তাড়া করছে। “ঘুমাও নাই?” শিউলি এক রাতে জিজ্ঞেস করেছিল। সাইফ একটু চমকে উঠেছিল, যেন হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলেছিল—“না… এমনি।” এই “এমনি” কথাটার ভেতরেই সমস্যা। কারণ শিউলি এখন বুঝতে শিখেছে, মানুষ যখন “এমনি” বলে, তখন ভেতরে অনেক কিছু থাকে। অনেক না বলা ভয়, অনেক লুকানো স্মৃতি। সেই রাতে শিউলি আর কিছু বলেনি। কিন্তু তার ভেতরে একটা ধীরে জমতে থাকা ঠান্ডা অনুভূতি জন্ম নেয়। সে অনুভব করে—সাইফ তার সাথে আছে ঠিকই, কিন্তু পুরোপুরি না। যেন তার একটা অংশ সবসময় কোথাও ফিরে যায়, এমন এক জায়গায় যেখানে শিউলির কোনো প্রবেশাধিকার নেই।
এক রাতে পানি খেতে উঠে শিউলি দেখল, ড্রয়িংরুমের আলো বন্ধ। শুধু ফোনের নীলচে আলো অন্ধকারের মধ্যে একটা মুখকে আলাদা করে রেখেছে। সাইফ সোফায় বসে আছে। তার কাঁধ একটু ঝুঁকে আছে, মুখে এমন এক ধরনের নিঃসঙ্গতা যা মানুষ কাউকে দেখাতে চায় না। শিউলি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল। স্ক্রিনে একটা ছবি। আরিবা। ছবিতে আরিবা হাসছে—চোখে সেই পুরোনো উজ্জ্বলতা, যেটা মৃত মানুষের ছবিতে আরও বেশি জীবন্ত লাগে। সাইফ ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে এমনভাবে, যেন সে সত্যিই কারও সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে। শিউলির বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ঠান্ডা কিছু জমতে শুরু করল। হিংসা না। রাগও না। বরং একধরনের অসহায়তা। কারণ সে বুঝতে পারল, মৃত মানুষের সাথে প্রতিযোগিতা করা যায় না। যারা নেই, তারা অনেক সময় যারা আছে তাদের থেকেও বেশি জায়গা দখল করে রাখে। শিউলি কোনো শব্দ না করে ফিরে গেল। কিন্তু বিছানায় শুয়ে তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের জীবনেই ধীরে ধীরে অতিথি হয়ে যাচ্ছে।
পরদিন সকালে সে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। বরং আরও বেশি স্বাভাবিক হয়ে উঠল। সাইফের জন্য চা বানাল, শার্ট আয়রন করে রাখল, নাস্তার প্লেটে ডিমটা সুন্দর করে সাজিয়ে দিল। কিন্তু এই যত্নের ভেতরে একটা ক্লান্তি ঢুকে গেছে। যেন সে প্রতিদিন নিজেকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—“আমি বর্তমান। আমি বাস্তব। আমি এখনো এখানে আছি।” মানুষ যখন কাউকে হারানোর ভয় পায়, তখন সে অদ্ভুতভাবে আরও যত্নশীল হয়ে যায়। যেন ভালোবাসা দিয়ে ভাঙা জায়গাগুলো আটকানো যায়। সাইফ মাঝে মাঝে সেটা টের পায়। তাই তার অপরাধবোধ আরও বাড়ে। সে কখনো কখনো শিউলির দিকে তাকিয়ে ভাবে—এই মেয়েটা এত সহজভাবে তাকে ভালোবাসতে পারছে কীভাবে? আর সে কেন এত জটিল? কেন তার ভেতরে এখনও একটা মৃত মানুষের স্মৃতি বেঁচে আছে, এত স্পষ্টভাবে? এই প্রশ্নগুলো তাকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে দিচ্ছিল।
আদিরার বদলটা হঠাৎ করে হয়নি। মানুষ আসলে একদিনে বদলায় না—ধীরে ধীরে বদলায়, নিজের অজান্তে, নিজের ভেতরের কোনো অন্ধকার বা শূন্য জায়গাকে লুকাতে লুকাতে বদলায়। প্রথমদিকে সে নিজেও বুঝতে পারেনি ঠিক কী হচ্ছে তার সঙ্গে। সাইফকে মেসেজ করা তার কাছে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ছিল। “খেয়েছেন?” “আজ খুব বৃষ্টি…” “আপু এই গানটা অনেক শুনত…” এই ধরনের ছোট ছোট কথা। কিন্তু সমস্যা হলো—কিছু অনুভূতি খুব সাধারণ অভ্যাসের ভেতর জন্ম নেয়। এত নরমভাবে জন্ম নেয় যে মানুষ বুঝতেই পারে না, কখন সেটা মনের এক কোণ থেকে পুরো হৃদয়ের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। আদিরার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হয়েছিল। সে প্রথমে শুধু কথা বলতে চাইত। তারপর অপেক্ষা করতে শুরু করল। সাইফ রিপ্লাই দিতে দেরি করলে তার খারাপ লাগত। রাতে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকত। “Last seen” দেখে বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপা কষ্ট হতো। তারপর আবার নিজেকেই বকত—“এটা ভুল… এটা শুধু আপুর স্মৃতি…” কিন্তু অনুভূতি কখনো যুক্তির কথা শোনে না। বিশেষ করে সেই অনুভূতি যদি দীর্ঘদিনের নীরবতা থেকে জন্ম নেয়।
সেদিন বিকেলে যখন সাইফ ওদের বাসার সামনে দাঁড়াল, আদিরা পর্দার আড়াল থেকেই তাকে দেখে ফেলেছিল। সে প্রায় পাঁচ মিনিট দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল, নিজের শ্বাস ঠিক করার চেষ্টা করছিল। তার বুকের ভেতর তখন এত জোরে ধকধক করছিল যে মনে হচ্ছিল দরজার ওপাশ থেকেও শোনা যাবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে তিনবার চুল ঠিক করেছে। লিপবাম লাগিয়ে আবার মুছে ফেলেছে। কারণ সে নিজেই ভয় পাচ্ছিল—সে কি সাজছে? কার জন্য? নিজের মৃত বোনের ভালোবাসার মানুষের সামনে দাঁড়ানোর আগে কেন তার হাত কাঁপছে? দরজা খোলার মুহূর্তে সে জোর করে স্বাভাবিক একটা হাসি আনল মুখে। “আপনি আসবেন, জানতাম,” বলার সময় তার গলার ভেতর শুকনো কাঁটার মতো কিছু আটকে ছিল। সাইফ হয়তো খেয়াল করেনি, কিন্তু আদিরা লক্ষ্য করেছিল—সে ভেতরে ঢোকার আগে একবার থেমে দেয়ালে টাঙানো আরিবার ছবিটার দিকে তাকিয়েছে। সেই এক সেকেন্ডের দৃষ্টিতে এত পুরোনো ভালোবাসা ছিল যে আদিরার বুক হঠাৎ টনটন করে উঠেছিল। কারণ সে বুঝল—সে যতই চেষ্টা করুক, এই মানুষটার ভেতরে এখনও আরিবা বেঁচে আছে। এবং সেই বেঁচে থাকা স্মৃতির মাঝখানে জায়গা বানাতে চাওয়াটা কতটা নিষ্ঠুর, সেটা বুঝেও সে নিজেকে থামাতে পারছে না।
ঘরের ভেতরটা আগের মতোই ছিল, কিন্তু তবুও যেন কিছু বদলে গেছে। বাতাসে পুরোনো পারফিউমের গন্ধের সঙ্গে এখন আরেকটা গন্ধ মিশে আছে—অপেক্ষার গন্ধ। সোফার পাশে রাখা ফুলদানিতে শুকিয়ে যাওয়া ফুল। দেয়ালে আরিবার হাসিমাখা ছবি। সেই হাসি আজও পুরো ঘরটাকে দখল করে আছে। সাইফ বসে পড়তেই আদিরা রান্নাঘরে চলে গেল চা বানাতে। কিন্তু চা বানানোর সময়ও তার হাত স্থির ছিল না। কাপ তুলতে গিয়ে একবার পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। চামচের শব্দে সে নিজেই চমকে উঠছিল। তার মনে হচ্ছিল—আজ কিছু একটা বদলে যাবে। যদিও সে জানত না কী। চা নিয়ে ফিরে আসার সময় সে নিজের হাঁটার শব্দ পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিল। কাপটা সাইফের হাতে দিতে গিয়ে তার আঙুল ছুঁয়ে গেল। খুব সাধারণ একটা স্পর্শ। কয়েক সেকেন্ডেরও কম সময়। কিন্তু সেই মুহূর্তে আদিরার মনে হলো, কেউ যেন তার বুকের ভেতর জমে থাকা গোপন কথাগুলো হঠাৎ ছুঁয়ে ফেলেছে। সে ইচ্ছে করেই হাত সরাতে দেরি করেছিল কি না—এই প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও জানত না। শুধু জানত, সেই এক সেকেন্ড তার পুরো শরীর কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আর সাইফ? সে হয়তো খেয়ালই করেনি। অথবা খেয়াল করেও নিজের ভেতরে চেপে ফেলেছে। কারণ কিছু মানুষ সত্যি দেখেও না দেখার অভিনয় করে—নিজেদের বাঁচানোর জন্য।
“আপু আপনাকে খুব ভালোবাসত,” আদিরা যখন কথাটা বলল, তখন তার চোখ সাইফের মুখে ছিল না। সে কাপের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে ছিল। যেন সরাসরি তাকালে নিজের ভেতরের সত্যিটা ধরা পড়ে যাবে। সাইফ চুপ করে ছিল। সেই চুপ থাকার ভেতরে এত ভার ছিল যে ঘরের বাতাস আরও ধীর হয়ে গেল। আদিরা আস্তে বলল, “আমি ছোট ছিলাম… কিন্তু বুঝতাম।” তার মাথার ভেতর তখন একটার পর একটা পুরোনো দৃশ্য ঘুরছিল। আরিবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। হঠাৎ লজ্জা পেয়ে হাসছে। ডায়েরির ভেতর শুকনো ফুল লুকিয়ে রাখছে। আর সে—ছোট্ট আদিরা—দূর থেকে সব দেখছে। তখন সে বুঝত না ভালোবাসা কী। শুধু বুঝত, সাইফ নামের একটা মানুষ তার আপুকে অন্যরকম করে দেয়। কিন্তু আজ এত বছর পর সেই একই মানুষকে সামনে বসে থাকতে দেখে তার নিজের বুকেও সেই অদ্ভুত পরিবর্তন হচ্ছে। এটা কি বিশ্বাসঘাতকতা? নাকি একাকিত্ব? নাকি মানুষ আসলে ভালোবাসার গন্ধ চিনে ফেললে নিজেও অজান্তে তার দিকে হাঁটতে শুরু করে? “কখনো কখনো মনে হয়…” সে থেমে গেল। কারণ পরের কথাটা বলা মানে নিজের ভেতরের দরজা খুলে দেওয়া। “আপনার জায়গাটা খালি রয়ে গেছে।” কথাটা বের হওয়ার পরই তার বুক ধক করে উঠল। যেন সে নিজের কাছেই ধরা পড়ে গেছে। সাইফ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। “মানে?” তার প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু আদিরার মনে হলো, এই একটা “মানে” শব্দের ভেতরেই বিচার লুকিয়ে আছে। তাই সে হেসে বলল, “কিছু না।” অথচ সেই “কিছু না”-এর ভেতরেই সবকিছু ছিল।
সেদিন রাতে আদিরা ঘুমাতে পারেনি। পুরো বাসা নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ার পরও সে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে বসে ছিল। সামনে পুরোনো অ্যালবাম খোলা। ছবিগুলোর ওপর ধুলো জমে গেছে। কিন্তু একটা ছবিতে এসে তার হাত থেমে গেল। আরিবা আর সাইফ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। দুজনেই হাসছে। সেই হাসিতে ভবিষ্যৎ ছিল। পরিকল্পনা ছিল। বেঁচে থাকার নিশ্চিন্ত বিশ্বাস ছিল। আদিরা ছবিটার ওপর আঙুল বুলাতে লাগল। খুব ধীরে। যেন ছুঁলেই ছবির ভেতরের মানুষগুলো নড়ে উঠবে। তার বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত এক অপরাধবোধ জমছে। কারণ সে জানে—এই জায়গাটার দিকে তাকানো তার উচিত না। মৃত মানুষের স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়ে নিজের অনুভূতি তৈরি করা নিষ্ঠুর। তবুও সে পারছে না। মানুষ সবসময় নৈতিকতার ভেতরে বাঁচে না। কিছু অনুভূতি এত গভীর হয় যে মানুষ নিজেকেই ঘৃণা করতে করতে সেটা অনুভব করে যায়। আদিরা খুব আস্তে বলল, “ও জায়গাটা তো তোমার ছিল আপু…” কথাটা বলেই তার চোখ জ্বালা করে উঠল। তারপর আরও নিচু গলায় বলল, “কিন্তু তুমি তো নাই…” এই “নাই” শব্দটার ভেতর এত শূন্যতা ছিল যে সে নিজেই কেঁপে উঠল। কারণ এই প্রথম সে নিজের মনের গোপন কথাটাকে শব্দ দিল। আর শব্দে চলে এলে অনুভূতিগুলো আর পুরোপুরি নিরাপদ থাকে না।
এরপর থেকেই তার বদলটা স্পষ্ট হতে শুরু করল। খুব সূক্ষ্মভাবে। এত সূক্ষ্ম যে বাইরে থেকে কেউ বুঝবে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সব বদলে যাচ্ছে। সে এখন সাইফের পছন্দের রং পরে। আগে যেসব গান শুনত না, এখন সেগুলো চালায় শুধু কারণ আরিবা শুনত। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চা বানানোর সময় মনে রাখে—চিনি কম। সাইফ আসবে শুনলেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। আবার নিজেকেই বোঝায়—“আমি শুধু ঠিকঠাক থাকতে চাই।” কিন্তু সে জানে, এটা শুধু ঠিকঠাক থাকার চেষ্টা না। এটা নজরে পড়ার চেষ্টা। একদিন সে শিউলির সামনে খুব স্বাভাবিক গলায় বলে ফেলল, “আপু বলত, সাইফ ভাই চায়ে চিনি কম খায়।” মুহূর্তটা খুব ছোট ছিল। কিন্তু সেই ছোট মুহূর্তের ভেতরে একটা ধারালো অস্বস্তি লুকিয়ে ছিল। শিউলি থেমে গেল। কারণ সে সত্যিই জানত না এই ছোট্ট তথ্যটা। অথচ অন্য একটা মেয়ে জানে। এমন একটা মেয়ে, যার সঙ্গে সাইফের অতীত জড়িয়ে আছে। সাইফ একটু অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বলল, “অনেক পুরোনো কথা মনে রাখছো দেখতেছি।” আদিরা তার দিকে তাকিয়ে বলল, “সবাই তো ভুলে যায় না।” কথাটা খুব আস্তে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেটা যেন সরাসরি গিয়ে শিউলির বুকের ভেতর বসে গেল।
শিউলি সেই রাতেই প্রথমবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অন্যভাবে দেখল। তার শরীর বদলাচ্ছে। চোখের নিচে হালকা ক্লান্তি। ঘুম কম হচ্ছে। পেটের ভেতরে একটা নতুন জীবন ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই নতুন জীবনের মাঝেও তার মনে হচ্ছে—সে কি এখনও কারও অতীতের সঙ্গে যুদ্ধ করছে? সে কি এমন একটা জায়গা ধরে রাখতে চাইছে, যেটা কখনো পুরোপুরি তার ছিল না? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হলো, মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় হারানো না—বরং কখনো পুরোপুরি পাওয়া না। সাইফ তাকে ছুঁয়ে থাকে, তার পাশে ঘুমায়, তার সন্তানের বাবা হতে চলেছে। তবুও কোথাও একটা দূরত্ব রয়ে গেছে। আর আজ সেই দূরত্বের ওপাশে সে আরেকজন মেয়ের ছায়া দেখতে পাচ্ছে। আদিরা। যে কিছু বলেনি, কিন্তু যার চোখে অদ্ভুত এক নীরব দাবি জমে উঠছে। শিউলির বুকের ভেতর ঠান্ডা একটা ভয় নামল। কারণ সে হঠাৎ বুঝল—ভালোবাসার সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিদ্বন্দ্বী সবসময় অন্য কোনো সম্পর্ক না। কখনো কখনো সেটা হয় স্মৃতি। আর স্মৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অসম্ভব প্রায়।
সেই রাত গভীর হলে সাইফ ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার শ্বাস ধীর। মুখে ক্লান্তি। শিউলি অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষ ঘুমিয়ে গেলে খুব অসহায় লাগে। তখন তারা কোনো মুখোশ পরে না। কোনো অভিনয় থাকে না। শুধু সত্যিটা থেকে যায়। শিউলির মনে হচ্ছিল—এই মানুষটা এখনও কোথাও হারিয়ে আছে। হয়তো তার পাশে শুয়ে থেকেও পুরোপুরি এখানে নেই। সে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল, “তুমি কি এখনও ওকেই ভালোবাসো?” প্রশ্নটা এত নিচু গলায় বলা হয়েছিল যে বাতাসও হয়তো পুরো শুনতে পায়নি। সাইফ নড়ল না। ঘুমের ভান করল কি না, বোঝা গেল না। কিন্তু উত্তরও দিল না। আর সেই না-দেওয়া উত্তরটাই শিউলির বুকের ভেতর আরও ভারী হয়ে বসে রইল। কারণ কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে স্পষ্ট উত্তর।



বিকেলের আলোটা সেদিন শহরের গায়ে খুব ধীরে ধীরে মরছিল। কাঁচের বিল্ডিংগুলোর জানালায় শেষ রোদের কমলা রঙ এমনভাবে আটকে ছিল, যেন দিনের শরীর থেকে কেউ একটু একটু করে উষ্ণতা খুলে নিচ্ছে। অফিসের লিফট থেকে বের হওয়ার সময় রাফির মনে হচ্ছিল, সে যেন একটা বড় অ্যাকুয়ারিয়ামের ভেতর হাঁটছে—চারপাশে মানুষ আছে, শব্দ আছে, কিন্তু সবকিছু কেমন পানির নিচের মতো দূরের আর বিকৃত। তার হাতে ফাইল ছিল, কাঁধে ব্যাগ, মুখে সেই বহুদিনের অভ্যাস করা স্বাভাবিক ভাব। কিন্তু ভেতরে সে ক্লান্ত। শুধু ক্লান্ত না—ভাঙা। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সে ঠিকমতো ঘুমাতে পারছে না। রাতের অন্ধকারে কখনো হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়, তখন মনে হয় কেউ তার বুকের ওপর বসে আছে। পাশে নীলা ঘুমিয়ে থাকে, শুভ্র মায়ের গা জড়িয়ে শুয়ে থাকে, আর সেই দৃশ্য দেখে তার ভেতরে আরও বেশি ভয় জমে। কারণ মানুষ যখন কিছু হারানোর মতো জিনিস পায়, তখনই সে সত্যিকার অর্থে ভয় পাওয়া শুরু করে। আগে তার হারানোর কিছু ছিল না—একটা ব্যর্থ জীবন, বেকার দিন, সস্তা সিগারেটের ধোঁয়া আর কিছু নষ্ট রাত। এখন আছে একটা পরিবার। একটা ছোট্ট ছেলে, যে তাকে “আব্বু” বলে ডাকলে তার বুকের ভেতর নরম কিছু গলে যায়। আর সেই কারণেই রকির প্রতিটা ফোনকল এখন তার কাছে শুধু হুমকি না—মৃত্যুর মতো।
অফিসের ভেতরে বসেও সে শান্তি পায় না। ফোনটা সাইলেন্টে রাখলেও বারবার স্ক্রিনের দিকে তাকায়। কোনো অচেনা নম্বর দেখলেই বুক ধক করে ওঠে। সহকর্মীরা যখন পাশের ডেস্কে বসে হাসে, ক্রিকেট নিয়ে তর্ক করে, কিংবা নতুন সিনেমার কথা বলে, রাফি তখন মাঝে মাঝে জোর করে হেসে ওঠে। কিন্তু নিজের হাসিটা তার কাছে অদ্ভুত লাগে। যেন সেটা তার মুখে লাগানো অন্য কারও মুখোশ। একদিন মিটিং চলার সময় ফোনটা কেঁপে উঠেছিল। স্ক্রিনে শুধু একটা নম্বর। নাম নেই। কিন্তু সে বুঝেছিল। তার হাত ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে। ম্যানেজার তখন প্রজেক্টরের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, “ব্যাংকের ভেতরের তথ্য বাইরে যাওয়া মানে শুধু চাকরি শেষ না… ক্যারিয়ার শেষ।” “শেষ” শব্দটা কানে যেতেই তার মাথার ভেতর রকির কণ্ঠ ভেসে উঠেছিল—“তোর বউ জানলে কেমন নেয়?” সেই মুহূর্তে তার মনে হয়েছিল, অফিসের সবাই যেন তার দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই জানে। সবাই বুঝে ফেলেছে। অথচ বাস্তবে কেউ কিছুই জানত না। মানুষ অনেক সময় নিজের অপরাধবোধের ভেতর এমনভাবে ডুবে যায়, যে পৃথিবীর প্রতিটা নির্দোষ চোখকেও বিচারকের চোখ মনে হয়।
সেদিন অফিস থেকে বের হওয়ার সময় আকাশে আলো কমে আসছিল। ফুটপাথে লোকজনের ভিড়, রিকশার ঘণ্টি, বাসের কালো ধোঁয়া, ভাজা বাদামের গন্ধ—সবকিছু আগের মতোই ছিল। তবুও রাফির মনে হচ্ছিল, আজ শহরটা তাকে অন্যভাবে দেখছে। সে দু-তিনবার পেছনে তাকাল। কেউ কি অনুসরণ করছে? একটা সাদা মাইক্রোবাস রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, একজন লোক ফোনে কথা বলছিল, আরেকজন সিগারেট ধরাচ্ছিল। সব সাধারণ। তবুও তার বুকের ভেতর অস্বস্তিটা কমল না। ঠিক তখনই সে লোকটাকে দেখল। কালো শার্ট। মুখে হালকা দাড়ি। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে চিনতে পারেনি। বরং পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। তারপর লোকটা বলল, “কেমন আছো?” কণ্ঠটা শুনেই রাফির পায়ের নিচে যেন মাটি একটু সরে গেল। বাপ্পি। অনেক বছর পর। কিন্তু এই মানুষটা আগের সেই বাপ্পি না। আগে তার চোখে আগুন ছিল, রাগ ছিল, একধরনের বেপরোয়া ক্ষুধা ছিল। এখন চোখদুটো শান্ত। ভয়ংকর শান্ত। যেন অনেক কান্না, অনেক রক্ত, অনেক রাত পেরিয়ে মানুষটা এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে আর চিৎকার করার শক্তিও নেই। আর ঠিক সেই কারণেই তাকে আরও বিপজ্জনক লাগছিল। কারণ রাগী মানুষকে বোঝা যায়। কিন্তু যে মানুষ চুপচাপ সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে বোঝা যায় না।
বাপ্পি খুব সাধারণ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল। যেন বহুদিন পর কোনো পুরোনো বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে। কিন্তু তার চোখের ভেতরে এমন কিছু ছিল, যেটা রাফিকে স্থির থাকতে দিচ্ছিল না। “তোমার সাথে একটু কথা ছিল,” সে বলল। রাফি চারপাশে তাকাল। অফিসের গ্লাস ডোর। নিরাপত্তারক্ষী। সহকর্মীরা কেউ বের হচ্ছে কি না। তার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। “এখানে?” সে জিজ্ঞেস করল। বাপ্পি মাথা নেড়ে শুধু বলল, “চলো।” কোনো তাড়া নেই। কোনো নাটকীয়তা নেই। এই স্বাভাবিকতাই আরও ভয়ংকর। কারণ ভয় সবসময় চিৎকার করে আসে না, কখনো কখনো খুব শান্ত গলায় বলে—“চলো।” দুজন হাঁটতে শুরু করল। রাস্তার শব্দ তাদের চারপাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। একসময় একটা পুরনো চায়ের দোকানের সামনে এসে থামল তারা। টিনের চাল। ভাঙা বেঞ্চ। দেয়ালে পুরনো পোস্টারের ছেঁড়া অংশ। একটা ফ্যান ঘুরছে, কিন্তু বাতাসের চেয়ে শব্দ বেশি করছে। দোকানের ভেতরে চায়ের সঙ্গে দুধ পোড়ার গন্ধ মিশে আছে। সেই গন্ধটা রাফির কাছে অদ্ভুতভাবে পরিচিত লাগল। যেন বহুদিন আগের কোনো নষ্ট সন্ধ্যা ফিরে এসেছে।
দুজন মুখোমুখি বসল। দোকানদার চা দিয়ে গেল। ধোঁয়া উঠছিল কাপ থেকে। কিন্তু কেউ হাত দিল না। কিছুক্ষণ শুধু শব্দ ছিল—রেডিওতে পুরনো গান, দূরে বাসের হর্ন, ফ্যানের কর্কশ ঘর্ষণ। তারপর বাপ্পি খুব আস্তে বলল, “রকিরে নামাইতে হইবো।” কথাটা এত শান্তভাবে বলা হয়েছিল যে প্রথম কয়েক সেকেন্ড রাফি বুঝতেই পারেনি। তারপর হঠাৎ তার বুকের ভেতর কিছু শক্ত হয়ে গেল। “আমি পারুম না,” সে সঙ্গে সঙ্গে বলে ফেলল। এত দ্রুত উত্তর দেওয়া আসলে সাহস না—ভয়। যে মানুষ ভেতরে ভেতরে ভয় পায়, সে প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই না বলে দেয়। বাপ্পি তাকিয়ে রইল তার দিকে। চোখ সরাল না। “শুনে তো নাও,” সে বলল। রাফি এবার নিচু গলায় বলল, “আমি আর ওইসবের মধ্যে নাই।” তার কণ্ঠে রাগ ছিল না। বরং ক্লান্তি। এমন ক্লান্তি, যেটা বহুদিন ধরে নিজেকে স্বাভাবিক প্রমাণ করতে করতে আসে। বাপ্পি ধীরে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, “কিন্তু ও এখনো তোর মধ্যে আছে।” কথাটা এসে সোজা বসল রাফির বুকের ওপর। কারণ সে জানে—এটা মিথ্যে না।
কিছু অতীত মানুষকে ছেড়ে যায় না। মানুষ শুধু শার্ট পাল্টায়, ঠিকানা বদলায়, চাকরি পায়, সংসার করে—কিন্তু অতীত ভেতরে কোথাও বসে থাকে। মাঝে মাঝে নিঃশ্বাস নেয়। মাঝে মাঝে শুধু নাম ধরে ডাকে। বাপ্পি সামনে একটু ঝুঁকল। তার চোখে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতর একটা স্থির সিদ্ধান্তও ছিল। “ও ব্যাংকের ভেতরে ঢুকতে চায়,” সে বলল। “তোরে ব্যবহার করবো। তারপর শেষ হইলে ফালাইয়া দিবো।” রাফির বুক কেঁপে উঠল। কারণ সে রকিকে চেনে। খুব কাছ থেকে চেনে। রকি কখনো কাউকে বন্ধু ভাবে না। শুধু দরকারি মানুষ ভাবে। দরকার শেষ, মানুষ শেষ। “পুলিশের হাতে ধরাইতে হইবো,” বাপ্পি বলল। “আমার কাছে কিছু তথ্য আছে। কিন্তু ব্যাংকের ভেতরের জিনিস লাগবো।” ব্যাংক। ম্যানেজমেন্ট। চাকরি। এই তিনটা শব্দ একসাথে এসে রাফির মাথার ভেতর এমনভাবে ঘুরতে লাগল, যেন কেউ হাতুড়ি মারছে। সে কল্পনা করল—ম্যানেজারের রুম। ফাইল। প্রশ্ন। “আপনি আগে এসবের সাথে জড়িত ছিলেন?” সে কল্পনা করল সহকর্মীদের চোখ। ফিসফাস। দূরত্ব। তারপর নীলার মুখ। শুভ্রের কলেজ। মানুষের কথা। “ওই লোকটা নাকি…” তার বুকের ভেতর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল ধীরে ধীরে।
চায়ের দোকানের ভেতর তখন অদ্ভুত এক ভারী নীরবতা ঝুলে ছিল। উপরের পুরনো ফ্যানটা ঘুরছিল ঠিকই, কিন্তু বাতাসের চেয়ে শব্দই বেশি দিচ্ছিল—ঘড়ঘড়, ঘড়ঘড়—যেন কোনো ক্লান্ত যন্ত্র শেষ শক্তিটুকু দিয়ে টিকে আছে। রাস্তার পাশ দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে, রিকশার ঘণ্টা বাজছে, দূরে কোথাও একটা বাচ্চা কাঁদছে, কিন্তু এই সব শব্দ যেন দোকানের ভেতরে ঢুকতে পারছিল না। এখানে সময় অন্যরকম হয়ে গেছে। ধীর। ভারী। আটকে থাকা। রাফি কাপের দিকে তাকিয়ে ছিল। চায়ের ওপরে পাতলা সর জমেছে। এতক্ষণে ধোঁয়াও নেই। ঠিক তার জীবনের মতো—একসময় গরম ছিল, চলছিল, এখন শুধু জমে থাকা একটা স্তর। “যদি কিছু হয়?” সে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল। গলার স্বর এমন ছিল যেন শব্দটা মুখ থেকে বের হওয়ার আগেই ভেঙে যাচ্ছে। এই “কিছু” শব্দটার ভেতরে অনেকগুলো ভয় একসাথে জড়ানো ছিল। চাকরি চলে যাওয়া। ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অতীতের ব্যাখ্যা দিতে না পারা। সহকর্মীদের চোখে বদলে যাওয়া দৃষ্টি। নীলার মুখে সেই নীরব হতাশা দেখা। শুভ্র বড় হয়ে একদিন শুনছে—তার বাবা “ওইসব” করত। একটা ছোট্ট পরিবার, যেটা সে এত কষ্ট করে গড়েছে, সেটা ভেঙে ধুলো হয়ে যাওয়া। সে কল্পনা করল—বাসার দরজার সামনে দুজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। নিচু গলায় প্রতিবেশীরা কথা বলছে। কেউ বলছে, “লোকটা নাকি ক্রিমিনালদের সাথে জড়িত আছিল…” তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ঠান্ডা ভয় জমে উঠল।
বাপ্পি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। সেই চুপ থাকার ভেতরেও অদ্ভুত ক্লান্তি ছিল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “হবেই।” একটা মাত্র শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের ভেতরে এমন নির্মম সত্যি ছিল যে রাফির মনে হলো কেউ তার বুকের মাঝখানে পাথর বসিয়ে দিয়েছে। বাপ্পি এবার জানালার বাইরে তাকাল। রাস্তার আলো জ্বলেছে। ধুলো উড়ছে। কয়েকটা কুকুর রাস্তার পাশে ঘুরছে। শহর নিজের মতো চলেই যাচ্ছে। যেন কারও ভয়, কারও ভেঙে পড়া, কারও অতীত—এসবের কোনো দাম নেই। “কিন্তু না করলে আরও খারাপ হবে,” বাপ্পি বলল। তার চোখের নিচে কালি। মুখে বয়সের চেয়ে বেশি ক্লান্তি। এই ক্লান্তি শুধু জেল খাটার না। মানুষ মরে যেতে দেখার ক্লান্তি। ভুল মানুষকে বিশ্বাস করার ক্লান্তি। নিজের জীবনকে বারবার নোংরা অন্ধকারে ডুবে যেতে দেখার ক্লান্তি। “রকি আগে পাড়ার মাস্তানি করত,” সে ধীরে বলল। “এখন টাকার গন্ধ পাইছে। ব্যাংকের ভেতর ঢুকতে পারলে আর থামবো না।” রাফির বুক ধক করে উঠল। কারণ সে জানে—রকি যখন কোনো কিছু চায়, তখন সেটা শুধু “চাওয়া” থাকে না। সেটা আস্তে আস্তে মানুষের ঘাড়ে বসে যায়। নিঃশ্বাসের ভেতর ঢুকে পড়ে। ঘুমের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
রাফি মাথা নিচু করে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল সে অসম্ভব ক্লান্ত। এমন ক্লান্তি, যেটা ঘুমিয়ে কাটে না। সে মনে করার চেষ্টা করল—শেষ কবে সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছে? শেষ কবে রাতে ঘুমানোর আগে বুকের ভেতর ভয় ছিল না? হয়তো শুভ্র জন্মানোর আগে। হয়তো চাকরি পাওয়ার আগের কোনো সন্ধ্যায়, যখন জীবন এত জটিল হয়নি। একসময় তার স্বপ্ন খুব ছোট ছিল। সত্যি খুব ছোট। একটা স্থায়ী চাকরি। মাস শেষে নিয়মিত বেতন। নীলাকে নিয়ে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে থাকা। শুক্রবারে বাজার করা। শুভ্রকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে অফিসে যাওয়া। রাতে ফিরে দরজা খুলতেই রান্নার গন্ধ পাওয়া। এত সাধারণ, এত ছোট একটা জীবন। অথচ সেই জীবনটাকেই এখন তার কাছে অসম্ভব দূরের মনে হচ্ছে। মানুষ ভাবে বড় স্বপ্ন ভাঙলে কষ্ট বেশি হয়। আসলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় ছোট স্বপ্ন ভাঙলে। কারণ মানুষ বিশ্বাস করে—অন্তত এতটুকু তো পাওয়ার কথা ছিল। রাফির চোখের সামনে হঠাৎ একটা দৃশ্য ভেসে উঠল। শুভ্র ডাইনিং টেবিলে বসে আঁকছে। নীলা রান্নাঘর থেকে বলছে, “খাবার ঠান্ডা হইতেছে।” আর সে হাসতে হাসতে বলছে, “আসতেছি।” এই দৃশ্যটা এত সাধারণ, এত ছোট—তবুও সে বুঝল, সে এই সাধারণ জিনিসটাকেই হারানোর ভয় পাচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
বাপ্পি অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর খুব আস্তে বলল, “তুই জানোস, জেল থেকে বাইর হওয়ার পর মমতা আপা আমারে কী বলছিল?” রাফি তাকাল না। তার মাথা এখনও নিচু। “বলছিল—আর রক্ত না।” বাপ্পি হালকা হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। সেটা এমন হাসি, যেটা মানুষ কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে গেলে মুখে আসে। “আমি চেষ্টা করছিলাম,” সে বলল। “সত্যি।” কিছুক্ষণ সে বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “কিন্তু কিছু মানুষ বাঁচে অন্য মানুষরে শেষ করতে করতে। রকি ওই রকম।” কথাটা বলার সময় তার চোখে ভয় ছিল না। বরং নিশ্চিত একটা ক্লান্ত সত্যি ছিল। যেন সে অনেক আগেই মেনে নিয়েছে—কিছু মানুষকে বদলানো যায় না। রাফির গলা শুকিয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল না কী করবে। ভয় একদিকে টানছে। অপরাধবোধ অন্যদিকে। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তার পরিবার। তার মনে হচ্ছিল—সে যেন দুই দিক থেকে টানা একটা দড়ি, যেটা যে কোনো সময় ছিঁড়ে যাবে। সে জানে, রকিকে যদি এখন থামানো না যায়, তাহলে একদিন সেই আগুন তার নিজের ঘরেও পৌঁছাবে। শুভ্রের ঘুমন্ত মুখের কাছে। নীলার শান্ত চোখের ভেতরে। তাদের ছোট্ট নিরাপদ ডাইনিং টেবিলের ওপর। হয়তো কোনোদিন রাতের বেলা দরজায় কড়া নাড়বে পুলিশ। হয়তো কোনোদিন শুভ্র কলেজে গিয়ে শুনবে—“তোর বাবা খারাপ লোক আছিল।” এই কল্পনাগুলো এত স্পষ্ট হয়ে উঠল যে তার বুক ব্যথা করতে শুরু করল।
সে হঠাৎ মনে করতে লাগল সেই সময়টার কথা, যখন সে প্রথম রকির সঙ্গে জড়িয়েছিল। বেকারত্ব মানুষকে শুধু দরিদ্র করে না, ভেতর থেকেও খেয়ে ফেলে। প্রতিটা ইন্টারভিউ থেকে ফিরে এসে সে নিজেকে আয়নায় দেখতে পারত না। নীলার বাবার চোখের ভেতরে হতাশা দেখত। আত্মীয়দের কথা শুনত—“ছেলেটা কিছু করতে পারতেছে না?” সেই সময় রকি তার সামনে একটা “সহজ রাস্তা” খুলে দিয়েছিল। “একটু নে, মাথা হালকা হইবো।” প্রথমদিন রাফি না বলেছিল। দ্বিতীয়দিনও। কিন্তু তৃতীয়দিন? মানুষ সবসময় খারাপ হতে চায় না। কখনো কখনো শুধু একটু শান্তি চায়। আর সেই শান্তির দরজা দিয়েই অন্ধকার ঢুকে পড়ে। সে মনে করতে পারল—রাতের গলি। সিগারেটের ধোঁয়া। রকির ধীর হাসি। মাথার ভেতরের চাপ কয়েক ঘণ্টার জন্য হালকা হয়ে যাওয়া। তারপর ধীরে ধীরে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো। সে কাঁপতে লাগল। কারণ এতদিন পর সে বুঝছে—রকি শুধু তাকে নেশা দেয়নি। তাকে নিজের ভেতর দুর্বল করে ফেলেছিল। যেন দরকার পড়লে ব্যবহার করতে পারে।
বাপ্পি উঠে দাঁড়াল ধীরে। চায়ের কাপ তখন পুরো ঠান্ডা। দোকানের টেবিলে ছোট ছোট পানির দাগ। “ভাবো,” সে বলল। “কিন্তু বেশি দেরি কইরো না।” তার গলার ভেতর কোনো চাপ ছিল না। বরং অদ্ভুত শান্তি। এই শান্তিটাই ভয়ঙ্কর। কারণ বাপ্পি এমনভাবে কথা বলছে যেন সে আগেই বুঝে গেছে—রাফি শেষ পর্যন্ত এই লড়াই থেকে পালাতে পারবে না। বাপ্পি টাকা মিটিয়ে বাইরে বের হয়ে গেল। রাস্তার আলো তার মুখে পড়ে আবার সরে গেল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। যেন ছিলই না কখনো। কিন্তু তার কথাগুলো রয়ে গেল। “রকিরে নামাইতে হইবো।” শব্দগুলো দোকানের টিনের চালের নিচে আটকে রইল। রাফির মনে হচ্ছিল, সে একা না। তার পাশে এখন ভয় বসে আছে। অপরাধবোধ বসে আছে। আর একটা অদৃশ্য সময়সীমা বসে আছে।
সে ধীরে ফোন বের করল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল। নীলার মেসেজ—“কখন আসবা?” খুব ছোট্ট একটা প্রশ্ন। কিন্তু এই ছোট্ট প্রশ্নের ভেতরেই তার পুরো জীবন দাঁড়িয়ে আছে। এই একটা মেসেজের ভেতরে বাসার গন্ধ আছে। শুভ্রের হাসি আছে। রাতের খাবারের টেবিল আছে। নীলার অপেক্ষা আছে। সে অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল। সে কল্পনা করল—নীলা এখন হয়তো রান্নাঘরে। ভাত নামাচ্ছে। মাঝে মাঝে দরজার দিকে তাকাচ্ছে। শুভ্র হয়তো খেলতে খেলতে জিজ্ঞেস করছে, “আব্বু আইবো কবে?” এই ছোট ছোট দৃশ্যগুলোই তাকে ভেঙে দিচ্ছিল। কারণ সে জানে—সে শুধু নিজের জন্য ভয় পাচ্ছে না। সে ভয় পাচ্ছে তাদের জন্য। মানুষ যখন একা থাকে, তখন ধ্বংস হওয়া সহজ। কিন্তু পরিবার থাকলে ভয় অনেক গভীর হয়। কারণ তখন নিজের পতনের সঙ্গে অন্যদেরও ডুবিয়ে দেওয়ার ভয় থাকে।
দূরে আজানের শব্দ ভেসে এলো। সন্ধ্যার বাতাসে ধুলো উড়ল। দোকানের সামনে একটা রিকশা থামল আবার চলে গেল। জীবন থামেনি। কিন্তু রাফির মনে হচ্ছিল—তার ভেতরে কিছু থেমে গেছে। সে হঠাৎ বুঝতে পারল, মানুষের জীবন সবসময় বড় বড় সিদ্ধান্তে বদলায় না। কখনো কখনো একটা ফোনকল, একটা পুরনো নাম, একটা চায়ের দোকান—এসবই মানুষকে আবার সেই অন্ধকারের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখান থেকে সে ভেবেছিল অনেক দূরে চলে এসেছে। সে চোখ বন্ধ করল। আর চোখ বন্ধ করতেই একটার পর একটা মুখ ভেসে উঠল। নীলার মুখ। শুভ্রের ঘুমন্ত মুখ। বাপ্পির ক্লান্ত চোখ। আর রকির ধীর হাসি। সে বুঝল—এটা শুধু পুলিশে খবর দেওয়ার ব্যাপার না। এটা তার অতীতের সঙ্গে শেষবারের মতো মুখোমুখি হওয়ার সময়। আর সে ভয় পাচ্ছে। অসম্ভব ভয় পাচ্ছে। কারণ মানুষ যতই পালাক, কিছু লড়াই শেষ পর্যন্ত তার দরজায় এসে দাঁড়ায়। আর তখন আর লুকানোর জায়গা থাকে না।


(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Like Reply
#30
পর্ব ১৮

শীতটা এবার একটু দেরিতে নামছিল। ক্যালেন্ডার বলছিল ডিসেম্বর চলে এসেছে, কিন্তু বাতাস এখনও পুরোপুরি কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো ঠান্ডা হয়নি। তবুও সকালের রোদে একটা নরম সোনালি বিষণ্নতা ছিল—যেন বছরটা ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। বারান্দায় সেই রোদ এসে পড়েছে। শুভ্র মেঝেতে পা মুড়ে বসে কলেজের জুতা পালিশ করছে। তার ছোট্ট আঙুলে কালো পালিশ লেগে গেছে, কিন্তু সে খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করছে। মাঝেমধ্যে জুতাটা চোখের সামনে তুলে ধরে দেখে চকচক করছে কিনা। তারপর আবার ঘষে। তার জিভ একটু বের হয়ে আছে মনোযোগের চাপে। বাচ্চাদের একটা অদ্ভুত গুণ আছে—ওরা ছোট কাজগুলোও এমন গুরুত্ব দিয়ে করে, যেন সেটার ওপর পুরো পৃথিবীর ভার রাখা। রাফি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার বুকের ভেতর হঠাৎ খুব অদ্ভুত একটা ব্যথা উঠল। কারণ কয়েক মাস আগেও সে নিশ্চিত ছিল না—এই দৃশ্যগুলো সে ধরে রাখতে পারবে কিনা। এই সকাল, এই রোদ, এই বাচ্চাটার নির্ভার মুখ—সবকিছু হারিয়ে যেতে পারে ভেবে কত রাত সে ঘুমাতে পারেনি। এখন শুভ্র জুতার ফিতা বাঁধতে বাঁধতে হঠাৎ মাথা তুলে বলল, “আব্বু, আমি বড় হইলে ব্যাংকে চাকরি করব না।” রাফি একটু চমকে তাকাল। “ক্যান?” শুভ্র খুব সিরিয়াস গলায় বলল, “তুমি সবসময় টেনশনে থাকো।” কথাটা বলেই আবার জুতার দিকে মন দিল সে। কিন্তু কথাটা এসে রাফির বুকের কোথাও আটকে গেল। কারণ বাচ্চারা অনেক সময় এমন সত্যি দেখে ফেলে, যেটা বড়রা আয়নার সামনেও দেখতে পারে না।
ভেতরে রান্নাঘরে নীলা ডিম ভাজছে। তেলের শব্দ উঠছে—ছটছট করে। পেঁয়াজ পোড়ার গন্ধ পুরো ঘরে ছড়িয়ে গেছে। রেডিওতে পুরনো একটা গান বাজছে, মাঝেমধ্যে সিগন্যাল কেটে গিয়ে শব্দ ভেঙে যাচ্ছে। এই সাধারণ শব্দগুলো একসময় রাফির কাছে খুব বিরক্তিকর লাগত। এখন এই শব্দগুলোই তার কাছে নিরাপত্তা। কারণ সে জানে, মানুষ যখন ভয় পেতে পেতে বাঁচে, তখন সবচেয়ে সাধারণ জিনিসগুলোই আশ্রয় হয়ে ওঠে। নীলা রান্নাঘর থেকে বলল, “শুভ্র, দেরি করো না।” তারপর একটু থেমে আবার বলল, “রাফি, কাগজটা পড়ে থাকলে চা ঠান্ডা হইয়া যাবে।” রাফি খবরের কাগজের দিকে তাকাল। পাতা খোলা, কিন্তু সে অনেকক্ষণ ধরেই একই জায়গায় চোখ রেখে বসে আছে। সে পড়ছে না। তার মাথার ভেতর এখনও কিছু শব্দ আটকে আছে। “ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন।” “সাসপেনশন।” “কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট।” এই শব্দগুলো গত কয়েক মাসে তার ঘুমের ভেতর ঢুকে গেছে। রাতে ঘুমাতে গেলেও মনে হতো কেউ দরজায় কড়া নাড়বে। কেউ এসে বলবে—সব শেষ। চাকরি শেষ। সম্মান শেষ। সংসার শেষ। মাঝে মাঝে সে ঘুম থেকে উঠে নিজের বুকের ওপর হাত রাখত, শুধু এটা বোঝার জন্য যে সে এখনও এখানে আছে কিনা।
রকিকে ধরা হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। কিন্তু সেটা সিনেমার মতো দ্রুত কিছু ছিল না। সেখানে কোনো হিরোইজম ছিল না, কোনো নাটকীয় বন্দুকযুদ্ধও না। ছিল শুধু লম্বা ক্লান্তিকর ভয়। একটার পর একটা রাত। অচেনা নম্বর। চুপচাপ অনুসরণ করা। পুলিশের সাথে গোপনে দেখা করা। ব্যাংকের কিছু ফাইল কপি করা। সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট পাঠানো। রাফি যখন প্রথমবার বাপ্পির হাতে সেই পেনড্রাইভটা দিয়েছিল, তখন তার হাত এত কাঁপছিল যে পেনড্রাইভটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। বাপ্পি শুধু বলেছিল, “এখন পিছে ফিরার রাস্তা নাই।” সেই রাতে বাড়ি ফিরে শুভ্রকে ঘুমাতে দেখেছিল রাফি। ছেলেটা ঘুমের মধ্যে নাক ডাকছিল হালকা করে। নীলা তার পাশে শুয়ে ছিল। অন্ধকারে তাদের দেখে রাফির মনে হয়েছিল—সে যেন একটা কাঁচের ঘর নিয়ে হাঁটছে। বাইরে আগুন। আর একটু ভুল হলেই সব ভেঙে যাবে। সেই রাতেই সে প্রথমবার বুঝেছিল—মানুষ নিজের জন্য যতটা না বাঁচতে চায়, তার চেয়ে বেশি বাঁচতে চায় অন্যদের হারানোর ভয় থেকে।
ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশনের দিনগুলো ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। অফিসের করিডোরগুলো তখন তার কাছে আদালতের মতো লাগত। সহকর্মীদের চোখে সন্দেহ আছে কিনা, সেটা বোঝার চেষ্টা করত সে। কেউ স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও তার মনে হতো—লোকটা সব জানে। একদিন তাকে আলাদা রুমে ডেকে বসানো হয়েছিল। টেবিলের ওপরে কয়েকটা প্রিন্টেড রিপোর্ট। ম্যানেজার চশমা খুলে বলেছিলেন, “আপনি কিছু জানেন?” এই “কিছু” শব্দটার ভেতর এত সম্ভাবনা ছিল যে রাফির বুক শুকিয়ে গিয়েছিল। সে বুঝতে পারছিল না কতটা বলবে, কতটা লুকাবে। কারণ সত্যি বললে সে নিজেও ডুবে যেতে পারে। আর মিথ্যা বললে আবার সেই পুরনো অন্ধকারে ফিরে যাবে। বাড়ি ফিরে সে অনেকক্ষণ বাথরুমে বসে ছিল। কল খুলে রেখেছিল যাতে কান্নার শব্দ বাইরে না যায়। আয়নায় নিজের মুখ দেখে তার মনে হয়েছিল—এই মানুষটাকে সে চেনে না। চোখের নিচে কালি, দাড়ি না কাটা, ঠোঁট শুকনো। মনে হচ্ছিল কেউ তার ভেতর থেকে একটু একটু করে রক্ত বের করে নিয়েছে। তখন দরজার বাইরে নীলা খুব আস্তে বলেছিল, “রাফি?” শুধু নামটা। তবুও সেই ডাকের ভেতর এমন কিছু ছিল, যেটা তাকে আবার বাইরে আসতে বাধ্য করেছিল।
এক রাতে নীলা ঘুম থেকে উঠে দেখেছিল বারান্দায় আলো জ্বলছে। শীতের রাত। বাতাসে হালকা কুয়াশা। রাফি চেয়ারে বসে ছিল। তার হাতে সিগারেট নেই, ফোন নেই, কিছুই নেই। শুধু বসে আছে। এমনভাবে বসে, যেন সে নিজের ভেতরের শব্দ শুনছে। নীলা ধীরে গিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল। অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলেনি। নিচে রাস্তার কুকুর ডাকছিল। দূরে কোথাও ট্রেনের শব্দ ভেসে আসছিল। তারপর রাফি খুব আস্তে বলেছিল, “আমি যদি চাকরিটা হারাই?” কথাটা বলার সময় তার গলায় এমন এক ভয় ছিল, যেটা নীলা আগে খুব কম শুনেছে। এটা শুধু টাকার ভয় না। এটা একজন মানুষের নিজের প্রয়োজনীয়তা হারানোর ভয়। সে ভয় পাচ্ছিল—চাকরি গেলে হয়তো নীলা তার দিকে আগের মতো তাকাবে না। শুভ্র হয়তো কলেজে শুনবে—তার বাবা খারাপ মানুষ। সমাজ মানুষকে যতটা না অপরাধ দিয়ে মাপে, তার চেয়ে বেশি মাপে ব্যর্থতা দিয়ে। নীলা তার পাশে বসে খুব আস্তে হাত ধরেছিল। খুব শক্ত করে না। শুধু এমনভাবে, যেন কাউকে ডুবে যাওয়ার সময় ছুঁয়ে দেখে—এখনও মানুষটা আছে কিনা। তারপর বলেছিল, “চাকরি গেলে আবার শুরু করবা। কিন্তু যদি আবার মিথ্যা বলো… তখন হয়তো আর কিছু থাকবে না।” কথাটা খুব শান্ত ছিল। কিন্তু সেই শান্তির ভেতর একটা সীমা ছিল। একটা শেষ সতর্কতা।
সেই রাতের পর থেকে রাফি বদলাতে শুরু করেছিল। পুরোপুরি না। মানুষ একদিনে বদলায় না। কিন্তু সে প্রথমবার নিজের ভয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছিল। আগে সে সবকিছু লুকিয়ে রাখত। পুরুষদের একটা অদ্ভুত শিক্ষা দেওয়া হয়—চুপ থাকো, সব একা সামলাও। কিন্তু সেই চুপ থাকা একসময় মানুষকে ভেতর থেকে পচিয়ে দেয়। এখন মাঝেমধ্যে রাতে সে নিজেই নীলাকে বলে, “আজকে আবার ওইসব মনে পড়তেছিল।” অথবা “আজ অফিসে একটা কল আসছিল, বুক ধক কইরা উঠছিল।” নীলা শোনে। সবসময় উত্তর দেয় না। কিন্তু শোনে। আর কখনো কখনো শুধু শোনা জিনিসটাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। একদিন শুভ্র কলেজে রচনা লিখেছিল—“আমার পরিবার।” সে লিখেছিল, “আমার আব্বু আগে খুব চুপচাপ ছিল। এখন বেশি হাসে।” লাইনটা পড়ে রাফি অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারেনি। তারপর সে বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করেছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। খুব শব্দ করে না। শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। কারণ কিছু কান্না মানুষ সন্তানের সামনে কাঁদতে পারে না। তবুও সেই কান্নার ভেতর একটা স্বস্তি ছিল। যেন সে অনেকদিন পর নিজের ভেতরের জমে থাকা কিছু বের হতে দিচ্ছে।
কিন্তু সব ঠিক হয়ে যায়নি। কিছু ভয় থেকে গেছে। এখনও যদি রাতের বেলা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে, নীলার বুক ধক করে ওঠে। এখনও রাফি মাঝে মাঝে হঠাৎ চুপ হয়ে যায়। একদিন বাজার থেকে ফিরতে একটু দেরি হয়েছিল তার। ফোন ধরেনি। নীলা তখন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। তার মাথায় সবচেয়ে আগে কী এসেছিল জানে? পুলিশ। দুর্ঘটনা। অথবা রকি পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই কেউ প্রতিশোধ নিয়েছে। রাফি ফিরে এসে দেখেছিল নীলা খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু তার হাত কাঁপছে। তখন সে প্রথমবার বুঝেছিল—তার অতীত শুধু তাকে না, পুরো পরিবারকে অসুস্থ করে দিয়েছে। সেই রাতেই সে নীলাকে বলেছিল, “আমি জানি না সব ঠিক করতে পারব কিনা।” নীলা তখন অনেকক্ষণ চুপ ছিল। তারপর বলেছিল, “সব ঠিক করতে হবে না। শুধু আবার ভাঙবা না।” এই লাইনটা রাফির মাথায় আটকে গিয়েছিল। কারণ মানুষ আসলে পুরোপুরি সুস্থ হয় না। শুধু শেখে কোথায় ভাঙলে আবার জোড়া লাগানো যায়।
শীত আরও নেমে এলো ধীরে ধীরে। একদিন সন্ধ্যায় লোডশেডিং হলো। পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকার। জানালার বাইরে অন্য বিল্ডিংগুলোর কিছু কিছু আলো জ্বলছে। দূরে কোথাও জেনারেটরের শব্দ। শুভ্র অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তার কম্বলের ভেতর থেকে শুধু মাথাটা দেখা যাচ্ছে। নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। ঠান্ডা বাতাসে তার চুল একটু উড়ছিল। রাফি এসে পাশে দাঁড়াল। অন্ধকারে মানুষের মুখ পুরো দেখা যায় না। শুধু উপস্থিতি বোঝা যায়। অনেকক্ষণ কেউ কিছু বলল না। তারপর রাফি খুব আস্তে বলল, “তুমি কি এখনও ভয় পাও?” প্রশ্নটা করার সময় তার নিজের গলাও কেঁপে উঠছিল। কারণ সে উত্তরটা জানত। তবুও শুনতে চাচ্ছিল। নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। দূরে কুকুর ডাকছিল। পাশের ফ্ল্যাটে কেউ মোমবাতি জ্বালিয়েছে, সেই আলো হালকা এসে পড়ছে। তারপর নীলা বলল, “হুম।” একটা ছোট্ট শব্দ। কিন্তু সেই শব্দের ভেতর এত সত্যি ছিল যে রাফির বুক কেঁপে উঠল। নীলা আবার বলল, “কিন্তু ভয় পাওয়ার পরও পাশে থাকা যায়।” কথাটা শুনে রাফির মনে হলো—এই লাইন সে আগে কোথাও শুনেছে। তারপর মনে পড়ল—শিউলি একদিন সাইফকে একই কথা বলেছিল। তখন সে বুঝল, মানুষ আসলে একে অপরের কাছ থেকে ভালোবাসার ভাষা ধার করে বাঁচে। কেউ পুরো নতুন কিছু বলতে পারে না। শুধু পুরনো সত্যিগুলো নতুন মানুষের মুখে আবার জন্ম নেয়।
রাফি ধীরে নীলার দিকে তাকাল। অন্ধকারে তার চোখ পুরো দেখা যাচ্ছিল না। তবুও সে বুঝতে পারছিল—সন্দেহ পুরো শেষ হয়নি। ভয়ও না। কিন্তু তবুও এই মানুষটা এখনও পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এই দাঁড়িয়ে থাকাটাই ভালোবাসা। সবকিছু জেনে, সব ভয় নিয়েও থেকে যাওয়া। সে খুব আস্তে নীলার হাত ধরল। হাত ঠান্ডা ছিল। কিন্তু সেই ঠান্ডার ভেতরেও জীবন ছিল। দূরে কোথাও আবার বিদ্যুৎ এলো। কয়েকটা বিল্ডিং একসাথে আলোয় ভরে উঠল। তাদের ঘর এখনও অন্ধকার। তবুও সেই অন্ধকার আগের মতো ভয়ঙ্কর লাগছিল না। কারণ এবার তারা দুজন একই দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর অনেক সময় মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।

রকিকে ধরার পর পাড়া কয়েকদিন যেন নিজের শব্দ হারিয়ে ফেলেছিল। যে গলিটা আগে রাত দুটাতেও মোটরসাইকেলের শব্দে কাঁপত, যেখানে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেরা সিগারেটের ধোঁয়ার ভেতর রাজনীতি, মারামারি আর টাকার গল্প করত, সেই গলিতে এখন সন্ধ্যা নামলেই শাটার পড়ে যায়। দোকানিরা আগের মতো জোরে ডাকাডাকি করে না। চায়ের কাপে চামচ নেড়ে শব্দ করতেও মানুষ যেন ভয় পায়। রাস্তার কুকুরগুলো পর্যন্ত অস্বাভাবিক চুপ হয়ে গেছে, যেন তারাও বুঝে গেছে—এলাকার বাতাস বদলে গেছে। মানুষ সরাসরি কিছু বলে না, কিন্তু ফিসফিস করে। কারও মুখে নাম আসে না, কিন্তু সবাই জানে কার কথা হচ্ছে। “ওই রাতটার” কথা এখন একটা ছায়ার মতো ছড়িয়ে আছে পুরো এলাকায়। কেউ বলে রকিকে ধরাটা ছিল সময়ের ব্যাপার। কেউ বলে—না, এত সহজ না, বড় কেউ পেছনে ছিল। আর এইসব কথার মাঝখানে রাফির বুকের ভেতর প্রতিদিন নতুন একটা ভয় জন্ম নিতে থাকে। কারণ সে জানে, রকি ধরা পড়লেও রকির তৈরি ভয় পুরোপুরি মরে যায় না। ভয় কখনো একজন মানুষের মধ্যে থাকে না; সেটা ছড়িয়ে যায় মানুষের স্মৃতিতে, মানুষের চোখে, মানুষের অভ্যাসে। রাতে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাফির এখনো মনে হয় কেউ তাকে অনুসরণ করছে। লিফটের আয়নায় নিজের পেছনে কাউকে না দেখলেও সে কয়েকবার ঘুরে তাকায়। বাসার সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় নক করার আগে তার বুক ধকধক করে—যদি কোনোদিন দরজা না খুলে? যদি কোনোদিন নীলা আর শুভ্রকে নিরাপদ না পায়? এই ভয়গুলো সে কাউকে বলে না। কারণ কিছু ভয় মুখে আনলে আরও বাস্তব হয়ে যায়।
বাপ্পির ভেতরেও শান্তি আসেনি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে—সে জিতে গেছে। রকির মতো একজন মানুষকে নামানো সহজ না। পুলিশ যেটা বছরের পর বছর পারেনি, সেটা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বিজয়ের পরও মানুষের ভেতর সবসময় আলো নামে না। কখনো কখনো যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই মানুষ বুঝতে পারে, তার ভেতরে কতটা ধ্বংস হয়ে গেছে। বাপ্পি এখন আগের চেয়ে কম কথা বলে। পাড়ার ছেলেরা সামনে পড়লে এখনও সম্মান নিয়ে দাঁড়ায়, “বাপ্পি ভাই” বলে, কিন্তু সে আগের মতো হেসে পিঠ চাপড়ে দেয় না। তার চোখে এখন অদ্ভুত এক শূন্যতা। যেন সে প্রতিটা মানুষের মুখের পেছনে আরেকটা মুখ দেখতে পায়। সে জানে, রকি শুধু একজন অপরাধী না। সে একটা পথ ছিল, যেই পথে একবার নামলে মানুষ নিজের ভেতরকার অন্ধকারকে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করে। রকির জায়গায় কাল অন্য কেউ আসবে। অন্য নামে, অন্য চেহারায়। কারণ ভয় কখনো খালি থাকে না। আর এই উপলব্ধিটা বাপ্পিকে ভেতর থেকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। রাতে বাসায় ফিরে মমতা যখন জিজ্ঞেস করে, “খাবা দিব?” তখনও সে কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন বাসার ভেতরে ঢুকতে গেলেও তাকে নিজের শরীরটাকে টেনে আনতে হয়। কখনো কখনো সে আয়নায় নিজের মুখ দেখে ভয় পায়। কারণ তার চোখের নিচের ক্লান্তি এখন রহিম চাচার চোখের মতো হয়ে গেছে—যে মানুষটা একসময় সারারাত দোকানে বসে গল্প করত, আর এখন হাসপাতালের সাদা বিছানায় শুয়ে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট পায়।
রহিম চাচাকে দেখতে গেলে বাপ্পির বুকের ভেতর অদ্ভুত ভার জমে। হাসপাতালের করিডোরে সেই চেনা গন্ধ—ডেটল, ওষুধ, ঘাম, আর অসহায়তার মিশ্রণ। সাদা দেয়ালের দিকে তাকালে মনে হয় এখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের শক্তি জমা দিয়ে যায়। রহিম চাচাকে প্রথম যেদিন অক্সিজেন মাস্কে দেখেছিল, বাপ্পির বুকের ভেতর হঠাৎ অপরাধবোধ উঠেছিল। কারণ তার মনে হয়েছিল—এই মানুষটার দোকানের সামনেই তো তাদের বড় হওয়া। সেই দোকানের বেঞ্চে বসেই প্রথম সিগারেট খাওয়া, প্রথম মারামারির পরিকল্পনা, প্রথম রাত জাগা। আর এখন সেই মানুষটা হাত তুলতেও কষ্ট পাচ্ছে। রহিম চাচার হাত আগের মতো মোটা আর শক্ত না। চামড়া কুঁচকে গেছে, শিরা বের হয়ে এসেছে। একদিন তিনি খুব কষ্টে চোখ খুলে বাপ্পির দিকে তাকিয়েছিলেন। সেই চোখে আগের মতো কঠোরতা ছিল না। ছিল শুধু ক্লান্তি। “তুই ক্লান্ত না?” তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন। খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন। কিন্তু বাপ্পি উত্তর দিতে পারেনি। কারণ সে সত্যিই ক্লান্ত। জেল খাটতে খাটতে, রাতের পর রাত পালাতে পালাতে, মানুষ মরতে দেখতে দেখতে তার ভেতরের বয়স শরীরের বয়সের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে গেছে। কখনো কখনো তার মনে হয়, সে যদি এখন ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে হয়তো আর উঠতে চাইবে না।
এই সময়গুলোতে মমতা এখনও তার পাশে থাকে। কিন্তু সেই পাশে থাকাটার ভেতরেও এখন ভয় মিশে গেছে। আগে মমতা রাগ করত, ঝগড়া করত, কাঁদত। এখন সে অনেক শান্ত। আর এই শান্তিটাই বাপ্পিকে আরও বেশি ভয় দেখায়। কারণ মানুষ যখন চিৎকার করা ছেড়ে দেয়, তখন বুঝতে হয় সে ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে গেছে। মমতা এখন মাঝরাতে উঠে দরজা চেক করে। বাপ্পি বাসায় ফিরতে দেরি করলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। ফোন ধরতে দেরি হলেই তার হাত ঠান্ডা হয়ে যায়। এক রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল। বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল। মোমবাতির আলোয় ঘরটা আধা অন্ধকার। মমতা হঠাৎ বলেছিল, “তুমি যদি একদিন না ফিরো?” প্রশ্নটা করার সময় তার গলা কাঁপছিল না। কিন্তু চোখের ভেতর জমে থাকা ভয়টা স্পষ্ট ছিল। বাপ্পি প্রথমে হেসেছিল। খুব ছোট্ট একটা হাসি। তারপর নিচু গলায় বলেছিল, “আমি তো অনেক আগেই হারাইছি।” এই কথাটা শুনে মমতার বুক ভেঙে গিয়েছিল। কারণ সে বুঝেছিল—এই মানুষটা নিজের জীবনের দাম ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলেছে। আর যেদিন মানুষ নিজের জীবনের দাম কমিয়ে ফেলে, সেদিন সে মৃত্যুকেও ভয় পায় না। মমতা সেদিন কেঁদেছিল। খুব চুপচাপ। যেন কান্নার শব্দ করলেও মানুষটা ভেঙে যাবে।
সেদিন রাতে, যেদিন সব শেষ হয়ে গেল, শহরে ভারী বৃষ্টি হচ্ছিল। রাস্তার ওপর স্ট্রিটলাইটের আলো কাঁপছিল, যেন পানির ভেতর কেউ আগুন ধরে রেখেছে। বাপ্পি একা মোটরসাইকেল চালিয়ে ফিরছিল। তার জ্যাকেট ভিজে গেছে। হেলমেটের কাচে পানি জমে রাস্তা ঝাপসা লাগছিল। ফোনে তখনও মমতার তিনটা মিসড কল। সে দেখেছিল। কিন্তু থামেনি। কারণ তার মাথার ভেতর সেই পুরনো ক্লান্তি আবার ঘুরছিল। কখনো কখনো মানুষ বাসায় ফিরতে দেরি করে শুধু এই কারণে যে, বাসায় ফিরলে তাকে বেঁচে থাকার অভিনয় করতে হবে। রাস্তার মোড়ে একটা কালো মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে ছিল। খুব সাধারণ দৃশ্য। শহরে প্রতিদিন এমন গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কিছু দৃশ্যের ভেতরে মৃত্যু লুকিয়ে থাকে। প্রথম গুলির শব্দটা বাপ্পি ঠিকমতো শুনতেই পারেনি। শুধু বুকের ভেতর প্রচণ্ড একটা ধাক্কা অনুভব করেছিল। তারপর দ্বিতীয়টা। তৃতীয়টা। চতুর্থটা। মোটরসাইকেলটা পিছলে রাস্তার ওপর পড়ে গেল। ভেজা রাস্তায় তার রক্ত পানির সাথে মিশে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়ছিল। যেন শহরটা তার রক্ত ধুয়ে ফেলতে চাইছে।
পরদিন খুব সকালে পুরো পাড়া জেগে উঠেছিল। মানুষের ভিড়। ফিসফিসানি। মোবাইল ফোনে ছবি। কেউ বলছিল পুরনো শত্রু। কেউ বলছিল রকির বাকি লোকজন। কেউ বলছিল—“এটাই হওয়ার ছিল।” মানুষ মৃত্যুর পর খুব সহজে গল্প বানিয়ে ফেলে। যেন গল্প বানালে ভয়টা কম লাগে। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছে মমতা কোনো গল্প শোনেনি। সে শুধু সাদা চাদরের নিচে বাপ্পির মুখ দেখেছিল। অদ্ভুত শান্ত লাগছিল তাকে। যেন বহুদিন পর সে সত্যি ঘুমিয়েছে। মমতা হাত বাড়িয়ে খুব আস্তে তার গাল ছুঁয়েছিল। ঠান্ডা। সম্পূর্ণ ঠান্ডা। তখন তার হঠাৎ মনে হয়েছিল—এই মানুষটা কোনোদিন ঠিকভাবে বাঁচতেই শিখল না। সে শুধু লড়াই করতে শিখেছিল। ভালোবাসতেও শিখেছিল ভুলভাবে। এত শক্ত করে ভালোবাসত যে শেষ পর্যন্ত সবকিছু ভেঙে যেত। মমতা তখন কাঁদেনি। কারণ কিছু শোক আছে যেগুলো এত গভীর হয় যে চোখে পানি আসে না। শুধু বুকের ভেতর একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, যেটা সারাজীবন থেকে যায়।
বাপ্পির মৃত্যুর খবর শুনে রাফি দীর্ঘসময় চুপ হয়ে ছিল। সে অফিসে ছিল তখন। ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মাথার ভেতর একটার পর একটা স্মৃতি ঘুরছিল। ছোটবেলার গলি। বাপ্পির চিৎকার। মারামারির পর রক্তমাখা শার্ট। আবার সেই একই মানুষ রাতের শেষে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বলছে—“খালাম্মারে কিছু কইস না।” মানুষ কখনো পুরো খারাপ হয় না। আবার পুরো ভালোও না। বাপ্পির কথা ভাবতে গিয়ে রাফির বুকের ভেতর অদ্ভুত অপরাধবোধ উঠল। কারণ শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেছে সে। আর বাপ্পি পারেনি। বাসায় ফিরে সে শুভ্রকে ঘুমাতে দেখেছিল। বাচ্চাটা পাশ ফিরে শুয়ে আছে, হাতের মুঠোয় খেলনা গাড়ি। নীলা এসে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করেছিল, “খবর পাইছ?” রাফি শুধু মাথা নেড়েছিল। তারপর অনেকক্ষণ শুভ্রের পাশে বসে ছিল। তার মনে হচ্ছিল—এই ছোট্ট জীবনের জন্যই তাকে যেকোনো অন্ধকার থেকে দূরে থাকতে হবে। কারণ একটা ভুল শুধু একজন মানুষকে না, পুরো পরিবারকে টেনে নিয়ে ডুবে যায়।
অনেক পরে, পাড়ার ছেলেরা এখনও মাঝে মাঝে বাপ্পির কথা বলে। চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে কেউ বলে, “বাপ্পি ভাই ওইদিন একা পাঁচজনের সামনে দাঁড়াইছিল।” কেউ বলে, “বাপ্পি ভাই না থাকলে রকি আরও আগেই পুরো এলাকা খাইয়া ফেলত।” গল্পগুলো বদলায়। বাড়ে। মানুষ ধীরে ধীরে কিংবদন্তি হয়ে যায়। কিন্তু কিংবদন্তির ভেতর মানুষের আসল ক্লান্তি থাকে না। তার ভয় থাকে না। তার রাতের নিঃসঙ্গতা থাকে না। মমতার কাছে বাপ্পি কোনো গল্প না। কোনো হিরো না। সে শুধু একটা মানুষ, যে খুব ভুলভাবে ভালোবাসতে শিখেছিল। আর রাফির কাছে বাপ্পি একটা সতর্কতা। একটা আয়না। সে মাঝে মাঝে রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভাবে—যদি সেদিন সে অন্য সিদ্ধান্ত নিত? যদি রকির পাশে দাঁড়িয়ে যেত? তাহলে হয়তো আজ শুভ্রের ঘরে আলো জ্বলত না। নীলা তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত না। মানুষের জীবন আসলে খুব পাতলা সুতোয় ঝুলে থাকে। একটা ভুল ফোনকল। একটা ভুল বন্ধুত্ব। একটা ভুল রাত। আর সবকিছু বদলে যায়।





সাত মাস পর, বাসার ভেতরের সময়টা আর আগের মতো চলে না। এখন সময় ঘড়ি দেখে না—মেহর দেখে। সে কখন কাঁদবে, কখন ঘুমাবে, কখন হঠাৎ মাঝরাতে বুকভরা চিৎকারে পুরো ঘর কাঁপিয়ে তুলবে, তার ওপরই যেন পুরো সংসারের শ্বাসপ্রশ্বাস নির্ভর করে। ভোর পাঁচটায় কখনো তার কান্নায় ঘুম ভাঙে, কখনো আবার রাত তিনটায় ছোট ছোট হাত ছুঁড়ে উঠে বসে সে। শিউলির এখন টানা ঘুম বলতে কিছু নেই। তার চোখের নিচে কালি পড়েছে, ঠোঁট শুকনো থাকে, চুল প্রায় সবসময় এলোমেলো খোঁপায় বাঁধা। তবুও তাকে অন্যরকম সুন্দর লাগে। এই সৌন্দর্য সাজের না, বিশ্রামের না—এটা টিকে থাকার সৌন্দর্য। একটা মানুষ যখন নিজের শরীর, নিজের ঘুম, নিজের সময় সবকিছু ধীরে ধীরে অন্য এক ছোট্ট জীবনের জন্য বিলিয়ে দেয়, তখন তার ভেতরে আলাদা একটা আলো জন্মায়। সাইফ মাঝেমধ্যে গভীর রাতে জেগে উঠে শুধু শিউলির দিকে তাকিয়ে থাকে। দেখে—মেয়েটা আধা ঘুমের ভেতরেও মেহরকে বুকের কাছে টেনে রাখে, যেন পৃথিবীর সব ভয় থেকে ওকে আড়াল করতে চায়। তার বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত কষ্ট হয়। কারণ সে জানে, শিউলি শুধু মা হওয়ার লড়াই করছে না। সে নিজের সংসারটাকেও বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। আর সেই লড়াইয়ের একটা অংশের নাম—আদিরা।
মেহর আসার পর বাসার ভেতর দুধের গন্ধ স্থায়ী হয়ে গেছে। বিছানার কোণায় ছোট ছোট জামা, ড্রেসিং টেবিলের ওপর বেবি অয়েল, সোফার পাশে ঝুলে থাকা নরম গোলাপি কম্বল। রান্নাঘরে আগের মতো শুধু রান্নার শব্দ হয় না; এখন মাঝেমধ্যে শিশুর কান্না, হাসি, কাশির ছোট্ট শব্দ সবকিছু মিশে থাকে। সাইফ সত্যি চেষ্টা করছে। খুব অদ্ভুতভাবে চেষ্টা করছে। আগে যে মানুষটা নিজের ভেতরের অনুভূতিগুলো নিয়েই গুছিয়ে উঠতে পারত না, সে এখন ইউটিউব দেখে ডায়াপার পাল্টানো শেখে। মাঝরাতে মেহর কাঁদলে শিউলির আগে উঠে কোলে নেয়। ছোট্ট শরীরটাকে বুকে চেপে ঘরের ভেতর হাঁটে। কখনো কখনো ক্লান্তিতে তার নিজের চোখ বন্ধ হয়ে আসে, তবুও হাঁটে। শিউলি ঘুমিয়ে পড়লে খুব আস্তে তার গায়ের ওপর কম্বল টেনে দেয়। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে যায়। বাইরে থেকে দেখলে একটা সুন্দর, স্বাভাবিক পরিবার। কিন্তু সুখের ভেতরেও কখনো কখনো খুব সূক্ষ্ম ফাটল থাকে। বাইরে থেকে দেখা যায় না। শুধু ভেতরের মানুষ টের পায়। শিউলি সেই ফাটলটা টের পায়। কারণ সে বুঝতে পারে—সাইফ চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু কিছু জায়গায় সে এখনও পুরোপুরি পৌঁছাতে পারেনি। যেন তার একটা অংশ এখনও কোথাও আটকে আছে।
আর সেই “কোথাও”-এর একটা নাম আছে—আদিরা। প্রথম প্রথম শিউলি নিজেকে বোঝাত, সে বেশি ভাবছে। একটা মেয়ে তার মৃত বোনের প্রেমিকের খোঁজ নিতেই পারে। তার উপর তারা ফ্যামেলি ফ্রেন্ড। এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কিন্তু ধীরে ধীরে ছোট ছোট জিনিস বদলাতে শুরু করল। আদিরা এখন প্রায়ই আসে। কখনো মেহরের জন্য খেলনা নিয়ে, কখনো ছোট জামা, কখনো বেবি লোশন। সে খুব যত্ন করে মেহরকে কোলে নেয়। এমনভাবে তাকায়, যেন বাচ্চাটার ভেতর সে হারানো কিছু খুঁজে পায়। শিউলি লক্ষ্য করে—মেহর কাঁদলে আদিরা অদ্ভুত দ্রুত উঠে আসে। সাইফ যদি হাসে, আদিরার চোখে সেই হাসির প্রতিফলন পড়ে। কখনো কখনো সে সাইফের কথার আগেই বুঝে যায় সে কী চাইছে। এই বোঝাপড়াটা খুব পুরনো মানুষের মধ্যে হয়। শিউলির বুকের ভেতর তখন হালকা ঠান্ডা কিছু নড়ে ওঠে। কারণ সে জানে, ভালোবাসা সবসময় স্পষ্ট না। কখনো কখনো সেটা যত্নের ভেতর লুকায়, অভ্যাসের ভেতর লুকায়, কিংবা কারও প্রিয় চায়ের কাপ মনে রাখার ভেতরও লুকিয়ে থাকে।
একদিন দুপুরে শিউলি ঘুমিয়ে ছিল। মেহর অনেকক্ষণ কাঁদার পর একটু আগে ঘুমিয়েছে। পুরো বাসা তখন অদ্ভুত নীরব। জানালার ফাঁক দিয়ে রোদ এসে বিছানার একপাশে পড়ছে। শিউলির শরীর এত ক্লান্ত ছিল যে চোখ বন্ধ করতেই ঘুম এসে গেছে। সেই সময় সাইফ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে চায়ের কাপ। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। নিচে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল সে। তখন আদিরা এসে পাশে দাঁড়াল। সে প্রথমে কিছু বলল না। শুধু একই দিকে তাকিয়ে রইল। বাতাসে শ্যাম্পুর হালকা গন্ধ ছিল। দূরে কোথাও একটা ফেরিওয়ালা হাঁক দিচ্ছিল। অনেকক্ষণ পর আদিরা খুব আস্তে বলল, “আপনি সুখী?” প্রশ্নটা এত হঠাৎ ছিল যে সাইফ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে পারেনি। সে শুধু তাকিয়ে রইল। আদিরা হালকা হাসল। সেই হাসিটা আনন্দের না। বরং এমন, যেন মানুষ নিজের ভেতরের কষ্ট লুকাতে গিয়ে হাসে। তারপর বলল, “সবচেয়ে খারাপ কী জানেন?” সাইফ চুপ। আদিরা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “কারও জায়গা নিতে নিতে একসময় মানুষ নিজের জায়গাটাই হারিয়ে ফেলে।” কথাটা বলার সময় তার চোখে পানি ছিল না। কিন্তু এমন এক ক্লান্তি ছিল, যেটা কান্নার চেয়েও ভারী।
সেই মুহূর্তে সাইফ প্রথমবার স্পষ্ট বুঝল—আদিরা শুধু আরিবার স্মৃতিকে ধরে নেই। সে নিজেও ডুবে গেছে। খুব ধীরে, খুব নিঃশব্দে। আর এই উপলব্ধিটা তাকে ভয় পাইয়ে দিল। কারণ সে জানে, মানুষের অনুভূতি সবসময় নৈতিক হয় না। কিছু টান আছে যেগুলো ভুল, তবুও সত্যি। সেই রাতে সে ঘুমাতে পারেনি। শিউলি পাশে ঘুমিয়ে। মেহর মাঝেমধ্যে ছোট ছোট শব্দ করছে। ঘরের অন্ধকারে সাইফের মনে হচ্ছিল, সে যেন দুই জীবনের মাঝখানে আটকে আছে। একদিকে বাস্তব—যেখানে একটা শিশু তার ওপর নির্ভর করে, একটা স্ত্রী প্রতিদিন নিজেকে ভেঙে সংসার গড়ে। অন্যদিকে অসমাপ্ত অনুভূতি—যেগুলো কখনো পুরোপুরি মরে না, শুধু রূপ বদলায়। সে নিজের মাথায় হাত চাপা দিয়ে বসে ছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে যদি এখন কোনো ভুল করে, তাহলে শুধু একটা সম্পর্ক না—পুরো একটা পরিবার ভেঙে যাবে। মেহরের ভবিষ্যৎও সেই ভাঙনের মধ্যে বড় হবে। আর এই ভয়টাই তাকে আরও বেশি চুপচাপ করে দিল।
শিউলি ধীরে ধীরে সব বুঝতে শুরু করল। কেউ তাকে কিছু বলেনি। তবুও সে বুঝল। কারণ একজন নারী যখন পরিবার হারানোর ভয় পায়, তখন তার চোখ অন্যরকম তীক্ষ্ণ হয়ে যায়। সে ছোট ছোট জিনিস খেয়াল করে। আদিরা এলে সাইফের চুপ হয়ে যাওয়া। কথার মাঝখানে থেমে যাওয়া। চোখ সরিয়ে নেওয়া। আবার আদিরার সেই অদ্ভুত দৃষ্টি—যেটা খুব বেশি সময় ধরে থাকে। যেন মানুষ কোনো হারানো ঘরকে আবার ছুঁয়ে দেখতে চাইছে। শিউলি প্রথমে নিজেকে বোঝাল—না, এগুলো তার মাথার ভ্রম। সন্তান হওয়ার পর মানুষ সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু যত সময় গেল, তত সে অনুভব করল—না, কিছু একটা সত্যিই বদলাচ্ছে। একদিন আদিরা মেহরকে কোলে নিয়ে বলছিল, “ওর চোখ একদম সাইফ ভাইয়ের মতো।” কথাটা খুব সাধারণ। তবুও শিউলির বুক হঠাৎ কেঁপে উঠেছিল। কারণ “সাইফ ভাই” বলার ভেতরেও অদ্ভুত কোমলতা ছিল। সেই রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শিউলি নিজেকে দেখছিল। চোখের নিচে কালি। শরীর বদলে গেছে। কাঁধে ঘুমন্ত মেহর। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন ধীরে ধীরে নিজের জায়গাটা হারিয়ে ফেলছে।
সাইফ পেছন থেকে এসে জিজ্ঞেস করেছিল, “কী ভাবছো?” শিউলি আয়নার ভেতর তার দিকে তাকিয়েছিল। অনেকক্ষণ। তারপর খুব আস্তে বলেছিল, “তুমি কি কখনো পুরোপুরি আমার হবে?” প্রশ্নটা শুনে সাইফের বুকের ভেতর ধক করে উঠেছিল। কারণ এই প্রশ্নের উত্তর সহজ না। আর সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যি হলো—কিছু প্রশ্নের পুরো সৎ উত্তর মানুষ উচ্চারণ করতে পারে না। সে জানে, সে শিউলিকে ভালোবাসে। মেহরকে কোলে নিলে তার বুক নরম হয়ে যায়। বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করে। কিন্তু একই সাথে সে এটাও জানে, আরিবার স্মৃতি এখনও তার ভেতরে বেঁচে আছে। আর এখন সেই স্মৃতির ছায়ার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে আদিরা। সে কিছু বলতে পারেনি। শুধু শিউলির দিকে তাকিয়ে ছিল। আর এই নীরবতাই শিউলিকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিল। কারণ কখনো কখনো “না” শোনার চেয়েও খারাপ হলো—উত্তর না পাওয়া।
এরপর থেকে শিউলি বদলে যেতে শুরু করল। খুব চুপচাপভাবে। আগে সে আদিরা এলে খুশি হতো। এখন অদ্ভুত অস্বস্তি লাগে। কিন্তু সে সেটা প্রকাশ করে না। বরং আরও ভদ্র হয়। আরও স্বাভাবিক। কারণ সে ভয় পায়—যদি সে সন্দেহপ্রবণ স্ত্রী হয়ে যায়? যদি সাইফ ভাবে, সে বাড়াবাড়ি করছে? কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার মাথার মধ্যে ভয় জমতে থাকে। সে মাঝরাতে উঠে মেহরের পাশে বসে থাকে। বাচ্চাটার ছোট্ট হাত ধরে ভাবে—এই পরিবারটা কি সত্যিই নিরাপদ? একটা শিশুর জন্য সবচেয়ে দরকারি জিনিস কী? ভালোবাসা? নাকি স্থিরতা? সে নিজের শৈশবের কথা ভাবে। বাবার-মায়ের ঝগড়া। বন্ধ দরজার ওপাশের কান্না। সে চায় না মেহর সেই পরিবেশে বড় হোক। তাই সে আরও বেশি চুপ হয়ে যায়। কারণ অনেক নারী সংসার বাঁচানোর জন্য নিজের কষ্টকে ধীরে ধীরে অভ্যাস বানিয়ে ফেলে।
আদিরাও নিজের ভেতরে বদলাচ্ছিল। সে জানে—এই অনুভূতি ভুল। তবুও থামাতে পারছে না। রাতে নিজের ঘরে ফিরে সে অপরাধবোধে ভোগে। আরিবার ছবি সামনে নিয়ে বসে থাকে। মাঝেমধ্যে ফিসফিস করে বলে, “আমি ইচ্ছা করে করি নাই আপু…” তারপর কাঁদে। কারণ সে জানে, মানুষ সবসময় খারাপ হয়ে খারাপ কিছু করে না। কখনো কখনো খুব একা হয়ে গেলেও ভুল জায়গায় হৃদয় আটকে যায়। সাইফ যখন মেহরকে কোলে নেয়, আদিরার বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা হয়। তার মনে হয়, এই দৃশ্যটার ভেতরে সে থাকার কথা না। তবুও সে বারবার ফিরে আসে। যেন নিজের কষ্টটাকেই ছুঁয়ে দেখতে চায়। একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিল—“আমি কি আপুর জীবনটা চুরি করতে চাই?” প্রশ্নটার উত্তর সে দিতে পারেনি। কারণ তার অনুভূতির ভেতরে ভালোবাসাও আছে, লজ্জাও আছে, আর ভয়ও আছে।
বৃষ্টির সেই সন্ধ্যাটা খুব ধীরে নেমে এসেছিল। আকাশ কালো। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। আদিরা বাসার সামনে দাঁড়িয়ে। তার হাতে মেহরের জন্য কেনা ছোট্ট গোলাপি জামা। অনেকক্ষণ সে কলিংবেল চাপেনি। শুধু উপরের বারান্দার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেখানে শিউলি দাঁড়িয়ে। তার কোলে মেহর। বাচ্চাটা আধা ঘুমে মাথা কাঁধে রেখে আছে। ভেতরে ঘরের আলো জ্বলছে। আর সেই আলোর ভেতরে সাইফের ছায়া দেখা যাচ্ছে। মুহূর্তটা খুব সাধারণ হতে পারত। কিন্তু হয়নি। কারণ তিনজন মানুষ একই সাথে বুঝে ফেলেছিল—তাদের সম্পর্ক আর সরল নেই। আদিরা মাথা তুলে তাকাল। শিউলির সাথে তার চোখাচোখি হলো। কেউ কিছু বলল না। তবুও হাজারটা কথা পেরিয়ে গেল। শিউলি সেই চোখে অপরাধবোধ দেখল। আবার টানও দেখল। আদিরা শিউলির চোখে ভয় দেখল। নিজের পরিবার হারানোর ভয়। আর সেই মুহূর্তে দুজনেই বুঝে গেল—এই গল্প এখনও শেষ হয়নি। কারণ কিছু ভালোবাসা শেষ হয় না। শুধু মানুষকে ধীরে ধীরে ভেঙে বদলে দেয়।

(সমাপ্ত?)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Like Reply




Users browsing this thread: 1 Guest(s)