Posts: 48
Threads: 3
Likes Received: 67 in 27 posts
Likes Given: 58
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
31-03-2026, 06:05 PM
পর্ব ১
রাতের শেষ অংশটুকু সবসময় অদ্ভুত। এটা পুরো রাতও না, আবার সকালও না। মানুষের ভেতরের যে কথাগুলো দিনের বেলায় মুখ খুঁজে পায় না, সেগুলো এই সময়ে মাথা তোলে।
নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘরের বাতি নিভানো। শুধু বাইরে হালকা ফ্যাকাশে আলো। তার চোখে ঘুম নেই। বহুদিন ধরেই নেই। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই তার ঘুম পাতলা হয়ে গেছে। ছোটবেলায় সে ভয় পেত অন্ধকারকে। এখন সে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে স্বেচ্ছায়। কারণ অন্ধকার বিচার করে না।
তার বাবা পাশের ঘরে শুয়ে। তার ঘুম শব্দ করে না, কিন্তু নিঃশ্বাস ভারী। বয়স বাড়লে মানুষ শব্দ না করে ক্লান্ত হয়। নীলার মাথায় আজ একটা অদ্ভুত চাপ। তিনদিন ধরে রাফিকে ঠিকমতো দেখা হয়নি। ছাদে দাঁড়ানোও কমে গেছে। নীলা জানে, রাফির ইন্টারভিউ ছিল, এখন তো নীলার সামনে আসতেও রাফি ভয় পায়। এটাও জানে—এই ভয়কে সে কাউকে দেখায় না।
হঠাৎ খুব হালকা একটা শব্দ হলো পেছনের দিক থেকে। এমন শব্দ, যা নিশ্চিত না হলে মানুষ উপেক্ষা করে। নীলা শুনেছিল কি?
হয়তো শুনেছিল। কিন্তু মানুষের ভেতরে যখন অন্য শব্দ বেশি জোরে বাজে, বাইরের শব্দ তখন দূরে সরে যায়। পেছনের গলিতে একটা ছায়া নড়ল। লোহার গ্রিলের গায়ে চাপা ঘষা। তারপর খুব ছোট একটা ভাঙার শব্দ। কেউ ভেতরে ঢুকছে।
আব্দুল কাদেরের ঘুম ভাঙলো ভোরের একটু আগে। তার একটা অভ্যাস আছে—সকালে উঠে আলমারি দেখে নেন। যেন কোনো অদৃশ্য ভয় তাকে তাড়া করে। আলমারিটা তার কাছে শুধু কাঠ আর লোহার জিনিস না। সেখানে তার জীবনের হিসাব থাকে। জমির দলিল, ব্যাংকের কাগজ, আর একটা ফাইল—যেটা তিনি কাউকে দেখান না। আজ আলমারির দরজাটা পুরো বন্ধ ছিল না। তিনি প্রথমে ভাবলেন, ভুলে গেছেন।
হাত বাড়িয়ে ঠেলতেই দরজাটা হেলে পড়ল। ভাঙা কাঠের শব্দ হলো।
ভেতরের জিনিস এলোমেলো। যেন আলমারি না তার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে।
“সব শেষ!”
এই চিৎকারে পাড়ার সকাল বদলে গেল।
শিউলি আপা জানালা খুলে তাকালেন। তার চোখে কৌতূহল আগে আসে, সহানুভূতি পরে। তিনি চিৎকার করে খবর দিলেন। খবর ছড়াতে সময় লাগে না, কারণ মানুষের ভেতরে গল্পের জন্য জায়গা সবসময় থাকে। ভিড় জমতে লাগল। কেউ লুঙ্গি সামলাচ্ছে, কেউ চশমা খুঁজছে, কেউ ফোন হাতে নিয়ে ভিডিও করতে চাইছে কিন্তু সাহস পাচ্ছে না। নীলা সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে। তার মাথার ভেতর অদ্ভুত শান্তি। হয়তো ধাক্কা এত বড় যে কান্না আসছে না।
শুধু নীলা জানে ওর চোখ ভিড়ের মধ্যে কাউকে খুঁজছে।
"রাফি।"
রাফি যখন এল, তার হাঁটার ভেতর একটা অপরাধবোধ ছিল। কেন ছিল—সে নিজেও জানে না। যেন কোনো অঘটনের সময় উপস্থিত না থাকলে সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না। তাদের চোখ মিলল। এই মিলনে হাজার কথা ছিল।
“তুমি ঠিক আছো তো?”
“আমি আছি।”
“সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করো না”
“জানি না।”
কাদের সাহেব ফাইল খুঁজছেন।
“সবুজ ফাইলটা… এখানে ছিল…” এই ফাইলের কথা কেউ জানে না। এই ফাইলের ভেতরে ছিল তার স্ত্রীর লেখা কয়েকটা চিঠি। তাদের প্রেমের সময়কার। তিনি কখনও সেগুলো ফেলে দেননি। আজ মনে হলো—অতীতও কি চুরি হয়ে যায়? পুলিশ এলো। প্রশ্ন করলো। সন্দেহ জানতে চাইল। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কাদের সাহেব বুঝলেন—বিশ্বাস মানে কী ভঙ্গুর জিনিস।
তিনি বললেন, “আমাদের কারও সাথে শত্রুতা নাই।”
কিন্তু তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য পাড়ার মানুষের ওপর ঘুরে গেল। মানুষের ভিড় মানেই সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকতার তালিকা। রহিম চাচা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার চোখে বিচার কম, পর্যবেক্ষণ বেশি। তার পাশে বাপ্পি দাঁড়িয়ে। বাপ্পির হাত দুটো পকেটে ঢোকানো। তার চোখ নিচু। রহিম চাচা লক্ষ্য করলেন—ছেলেটা আজ চুপচাপ। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। কারণ তিনি জানেন, কিছু নীরবতা জোর করে ভাঙলে শব্দ বের হয় না, কান্না বের হয়। ভিড় ছড়িয়ে গেলে পাড়ার ভেতরে গুঞ্জন রয়ে গেল। শিউলি আপা বললেন, “ভেতরের লোক।” হাশেম কাকু বললেন, “বাইরের।” মিজান স্যার সমাজ নিয়ে বক্তৃতা দিলেন। প্রতিটা মানুষ নিজের মতামত দিয়ে স্বস্তি পেল। কারণ মতামত মানে নিরাপত্তা...
রাফির ইন্টারভিউ ছিল। সে যায়নি। তার মা জিজ্ঞেস করলে সে চোখ নামিয়ে বলল, “আজ মন ছিল না।” মা চুপ করে গেলেন। তিনি জানেন—এই ছেলের মন আর বাস্তবতা একসাথে হাঁটে না। তিনি মাঝে মাঝে ভাবেন, ছেলেকে বেশি স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন কি না।
সন্ধ্যায় নীলা ছাদে উঠল। আকাশে হালকা কমলা রঙ। চুরি হওয়া বাড়ির ওপরও সূর্য একইভাবে আলো ফেলে—এই নির্লিপ্ততায় তার কষ্ট হয়। রাফি পাশের ছাদে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
“তুমি ঠিক আছো?” রাফি জিজ্ঞেস করল।
নীলা উত্তর দিল না সঙ্গে সঙ্গে।—ঠিক থাকা মানে কী? যদি ভেতরে অস্থিরতা থাকে, তবু বাইরে শান্ত থাকি—তাহলে কি ঠিক? শুধু বলল-“আমি জানি না।”
রাফি হঠাৎ বলল, “আমি চাকরি পেলে সব বদলে যাবে।”
এই বাক্যে তার ভেতরের অসহায়তা ছিল। রাফি মনে করে, চাকরি মানেই সম্মান। সম্মান মানেই সাহস ।আর সাহস মানেই নীলাকে নিজের বলা।
নীলা- “সব?”
রাফি থেমে গেল। সব বদলানো যায় না। কিছু জিনিস শুধু সহ্য করা যায়।
রাতে কাদের সাহেব একা বসে রইলেন। ভাঙা আলমারি সামনে। তার মনে হলো, এই পাড়া আর আগের মতো নিরাপদ না। তার মেয়েকে তিনি কেমন ভবিষ্যৎ দিতে পারবেন? তার নিজের প্রেমের বিয়ে ছিল। কিন্তু জীবনের চাপে সেই প্রেম শুকিয়ে গেছে। তিনি চান না মেয়ের জীবন অনিশ্চিত হোক। কিন্তু তিনি এটাও জানেন না—অতিরিক্ত নিরাপত্তা মানুষকে শ্বাসরুদ্ধ করে।
ওদিকে চা দোকানের পেছনে বাপ্পি একা বসে আছে। তার পকেটে ছোট একটা সোনার চেইন। সে সেটা বের করে আলোতে ধরল। তার চোখে জল নেই। কারণ তার কাছে এটা চুরি না—প্রয়োজন। তার মা তিনদিন ধরে জ্বরে। ডাক্তার বলেছে ওষুধ লাগবে। সে ফিসফিস করে বলল, “আমি খারাপ না।” এই বাক্য সে নিজেকেই বলছে। পাড়ার বাতি একে একে নিভে যায়। সবাই ভাবে দিন শেষ।
কিন্তু আসলে আজ একটা ফাঁক তৈরি হয়েছে। বিশ্বাসের ফাঁক। ভবিষ্যতের ফাঁক। দুজন মানুষের মাঝের নীরবতার ফাঁক। এই ফাঁকের ভেতর দিয়েই গল্প ঢুকবে। আর কেউ এখনও বুঝতে পারছে না সবচেয়ে বড় ভাঙন আলমারিতে না, মানুষের ভেতরে শুরু হয়েছে।
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Posts: 973
Threads: 0
Likes Received: 464 in 440 posts
Likes Given: 1,005
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
•
Posts: 1,292
Threads: 2
Likes Received: 2,344 in 1,041 posts
Likes Given: 1,669
Joined: Jul 2021
Reputation:
667
বাহ্ খুব সুন্দর starting লাইক আর রেপু দিয়ে সঙ্গে রইলাম
•
Posts: 56
Threads: 1
Likes Received: 11 in 8 posts
Likes Given: 105
Joined: Jun 2019
Reputation:
0
একটা পুরনো গল্প old xossip এ পড়েছিলাম। এক জমিদারের পুত্র তার জমিদার পিতা থেকে দূরে আদিবাসীদের গ্রামে বেড়াতে যায়। সেখানে ফুলিয়া নামক এক বয়স্কা সাঁওতাল রমণীর সাথে যুবকের পরিচয় ও প্রণয় ঘটে। ফুলিয়ার আদিম বন্য রূপে আকৃষ্ট হয়ে যুবক তার প্রেমে পড়ে, এবং লোকচক্ষু এড়িয়ে জঙ্গলে গিয়ে সঙ্গম করে। ফুলিয়ার মাতাল বর বুধিয়ার নালিশে সাঁওতাল গ্রামবাসীরা দু'জনকে ধরে বিয়ে দেয়। কিন্তু গ্রামের জ্যেষ্ঠ বুড়ীমা শর্ত দেয় - তাদেরকে মারাং বুরু দেবতাকে তুষ্ট করতে হবে, সেজন্য বোঙ্গা দেবতার মন্দিরে যৌন উত্তেজক হাঁড়িয়া মদ, বন্য শূকরের মাংস, আর পাঁঠার মাংস খেয়ে রাতভর ওরা এনাল সেক্সের মাধ্যমে বাসর উদযাপন করে। ফুলিয়া তার যুবক নাগরকে বাবু সম্বোধন করে, বাড়াকে নুড়া ডাকে, সাঁওতালী আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে .. দুর্দান্ত এক গল্প ছিল। প্লিজ কেউ খুঁজে দিন।
Posts: 82
Threads: 0
Likes Received: 39 in 37 posts
Likes Given: 101
Joined: Dec 2025
Reputation:
2
01-04-2026, 08:06 PM
(This post was last modified: 01-04-2026, 08:06 PM by BiratKj. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
Waiting for next update... Great start
•
Posts: 3,278
Threads: 0
Likes Received: 1,451 in 1,290 posts
Likes Given: 45
Joined: May 2019
Reputation:
34
•
Posts: 48
Threads: 3
Likes Received: 67 in 27 posts
Likes Given: 58
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
02-04-2026, 01:07 PM
(This post was last modified: 02-04-2026, 01:11 PM by Dead people. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
পর্ব ২
চুরির ঘটনার পর পাড়ার বাতাস কখনও আগের মতো স্বাভাবিক হলো না। বাইরে তাকালে মনে হয় সব আগের মতো—চা দোকানে ভিড়, মুদি দোকানের কাঁচের জানালায় ঝলক, বিকেলের ছাদে কাপড় শুকানো। কিন্তু মানুষের চোখে এক ধরণের হিসাব ঢুকে গেছে। কেউ কারও বাড়িতে ঢোকার সময় একটু খেয়াল করে, কেউ হাসে, কিন্তু মনে মনে ভাবে—এটা কি সত্যি হাসি, নাকি শুধু ভান। এই অদৃশ্য হিসাবের মধ্যে নীলা সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে। ছোটবেলায় সে ছিল কথা বলার মানুষ, হাসির মানুষ, কখনও কাঁদতেও দ্বিধা হতো না। মা মারা যাওয়ার পর তার হাসি ধীরে ধীরে কমে গেছে। কাঁদতে গিয়ে মনে হয়, চোখের জল পড়ে না—অভ্যাস হয়ে গেছে।
নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছে, অথচ সে জানে আকাশ তার কথাগুলো শুনবে না। ভোরের আলো আসার আগে আকাশ সবসময় ধূসর, আকাশের দিকে তাকালেই মনে হয়, কোন জায়গায় সময় থেমে গেছে। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ, যেন সব কিছু ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ তা দেখছে না। রাফি তিনদিন ধরে দেখা হয়নি। ইন্টারভিউর কথা মনে আছে, ফোন আসেনি। সে নিজেই ফোন করতে সাহস পায় না, কারণ স্পষ্ট “না” শুনতে ভয় পায়। ভয় একটা অদৃশ্য ছায়া, যা তাকে ছাদে দাঁড় করায়, বারান্দায় দাঁড় করায়, নিজেকে একাকী অনুভব করতে বাধ্য করে।
তার বাবা, সাদেক সাহেব, এখনও প্রতিদিন সকালে পত্রিকা পড়েন। ব্যাংকে কাজ করতেন এক সময়, হিসাবরক্ষক ছিলেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত। প্রতিদিন পত্রিকা পড়ে চাকরির বিজ্ঞাপন ঘিরে রাখেন, কিন্তু ছেলেকে বলেন না—“এইটায় আবেদন কর।” ভেতরে ভাঙা একটি গ্লাসের মতো। ছেলের স্বপ্নকে জোরে চাপ দিতে চান না, কিন্তু ভিতরে ভেঙে যাচ্ছে। পাড়ায় চুরি হয়েছে—তাও শুধু আলমারির নয়। বিশ্বাসও চুরি হয়েছে।
চা দোকানেই রহিম চাচা বসে আছেন। আজকাল বাপ্পি কম কথা বলে। চোখে অপরাধবোধ, কিন্তু এখনও তার হাতে আছে ছোট্ট সোনার চেইন। মা অসুস্থ। বাপ্পি জানে—ধরা পড়লে সমস্যা। কিন্তু এখন সময় আছে। রহিম চাচা বুঝতে পারছেন। মানুষের ভাঙা শব্দ সবসময় শব্দের মধ্যে থাকে না। অনেক সময় মানুষ ভাঙে নীরবভাবে, নিজের ভেতরে।
এদিকে ছোট কাকা গ্রাম থেকে এসেছে। হঠাৎ আগমন পাড়ার মধ্যে হাহাকার তৈরি করছে। সে বলল, “একটা ভালো সম্বন্ধ আছে। ছেলেটা ব্যাংকে চাকরি করছে। এখনই কথা বললে ভালো।” কাদের সাহেব চুপ করে শুনলেন। মাথায় হিসাব চলছে। ব্যাংকের চাকরি মানে স্থায়িত্ব, স্থায়িত্ব মানে নিরাপত্তা। ভেতরের শান্তি নেই, কিন্তু অস্থিরতাও শুয়ে নেই। নীলা ঘরে চুপচাপ। বুকের ভেতর ব্যথা। জানে, তার জীবনের উপর কথা হচ্ছে, কিন্তু তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে না।
নীলা ডায়েরি খুলল। লিখতে পারল না। শুধু কলম ধরে রাখল। শব্দগুলো লিখে ফেলার আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। বাইরে বাতাস বইছে, ভেতরের চুপচাপ শব্দ ভেঙে পড়ছে না। বুকের অদ্ভুত অস্থিরতা। মনে হচ্ছে, যা হারানো হয়েছে তা শুধুই জিনিস নয়, বিশ্বাস, নিরাপত্তা, স্বপ্ন—সব মিলিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি করেছে।
রাত হলে নীলা সাদা সালোয়ার পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের মুখ দেখল, কোথাও যেন একটা ফাটল আছে। ছাদে এলো সাইফ। ভদ্র, শান্ত। খুব মেপে কথা বলে। “আপনি কী পড়েন?” সে জিজ্ঞেস করল।
নীলা - “বাংলা।”
“ভালো। সাহিত্য মানুষকে গভীর করে।” নীলার মনে হলো—সে কি সত্যিই বোঝে?
কিছুক্ষণ পরে সবাই একা বসে আছে। সাইফ বলল, “আমি খুব সাধারণ জীবন চাই। ঝামেলা পছন্দ করি না।”
নীলা জিজ্ঞেস করল, “ঝামেলা মানে?”
সে হেসে বলল, “অপ্রয়োজনীয় আবেগ।” বাতাসে ঝুলে থাকা বাক্য।
নীলার মনে হলো, তার আবেগ কি অপ্রয়োজনীয়? সে কিছু বলল না।
রাফি খবরটা শুনে ছাদে উঠল। নীলা এলো না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে নিচে নেমে গেল। রাতে বাবার ঘরে ঢুকল। বাবা পত্রিকা পড়ছিলেন। “বাবা,” সে বলল, “চাকরি পেলে কি সব ঠিক হয়ে যায়?” বাবা চশমা খুলে তাকালেন। “সব না। কিন্তু অনেক কিছু সহজ হয়।”
এই উত্তর অর্ধেক। অর্ধেকের ভেতর দুশ্চিন্তা।
কাদের সাহেব রাতের অন্ধকারে একা। ভাঙা আলমারির দিকে তাকিয়ে। জানেন—পাড়ায় চুরি হয়েছে, মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা আছে। অতিরিক্ত নিরাপত্তা মেয়ের জীবন শ্বাসরুদ্ধ করতে পারে।
নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আকাশে চাঁদ নেই। মনে হলো—সে যেন দুই দিক থেকে টানছে। একদিকে প্রেম, একদিকে নিরাপত্তা। জানে না কোনটা বেছে নিলে কম ভাঙবে। বাতাস স্থির, কিন্তু ভেতরের বাতাস বইছে। অপূর্ণ অপেক্ষা চাপা আতঙ্ক।
পাড়ার অন্য প্রান্তে হাসেম কাকু বসে। পাড়ার ঘটনাগুলো একদম খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। তার চোখে গোপন খবর পড়ে, কিন্তু মুখে কিছু আসে না। জানে—ভয়ের শুরু, আগের মতো নয়, মানুষের ভেতরে।
রাত্রি গভীর। দোকান বন্ধ। পাড়ার অন্ধকার। তবে বাতাসে শব্দ। কখনও চুপচাপ, কখনও হালকা কন্ঠ। রাস্তায় কারও পদচাপ, কোথাও একটি দরজার চিল। এই শব্দগুলোর ভেতর মানুষ নিজের ভেতরের গল্পে ডুবে।
রাফি একা বসে ছাদে। মনে মনে ভাবছে—চাকরি, নীলা, বিশ্বাস, নিরাপত্তা। তার ভেতরে সব মিলিয়ে একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে, একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো জীবনকে ভেঙে দিতে পারে।
নীলা ঘরে। তার চোখে নিঃশব্দ কষ্ট। মনে হয়, জীবনের সব সম্ভাব্য আশা একটি ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ভেতর চাপ। মনে হয়, যদি কেউ জানতে চায়, সে বলতে পারবে না।
ছোট কাকার কথার আওয়াজ এখনও বাতাসে। “এটা ভালো সম্বন্ধ। স্থায়িত্ব।” কিন্তু নীলা জানে, স্থায়িত্বের সঙ্গে প্রেম কখনও একসাথে চলে না।
চা দোকানের পেছনে বাপ্পি বসে। চোখে অপরাধবোধ। পকেটে সোনার চেইন। মনে হচ্ছে, যা হচ্ছে, তার সবই অদৃশ্য।
পাড়ায় বাতি একে একে নিভে যায়। মানুষ ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু ভিতরে বাতাস বইছে। ধীরে ধীরে। গভীরভাবে। অপূর্ণ।
এই ফাঁক আর শান্ত নয়। দুজনের ভেতরের ফাঁক, পাড়ার ফাঁক, ভবিষ্যতের ফাঁক—সব মিলেছে। কেউ এখনও বুঝতে পারছে না—এই নীরবতার ভেতরেই আসল ভাঙন তৈরি হচ্ছে।
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Posts: 64
Threads: 0
Likes Received: 31 in 28 posts
Likes Given: 98
Joined: Dec 2025
Reputation:
1
Bhalo cholche... Waiting for next update
•
Posts: 973
Threads: 0
Likes Received: 464 in 440 posts
Likes Given: 1,005
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
Posts: 48
Threads: 3
Likes Received: 67 in 27 posts
Likes Given: 58
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
04-04-2026, 05:18 PM
পর্ব ৩
বিকেলের আলোটা আজ অদ্ভুত রকমের নরম। রোদের তেজ নেই, তবু আলো আছে—ম্লান, ধুলোমাখা, একটু কুয়াশার মতো ঝাপসা। গলির মুখে দাঁড়িয়ে শামসুর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার সামনে সেই একই পাড়া—দুই পাশে টিনের ঘর, কোথাও রঙ উঠে যাওয়া দেয়াল, কোথাও নতুন করে লাগানো সিমেন্টের প্যাচ। কিন্তু সবকিছুর মাঝেও একটা পরিবর্তনের গন্ধ।
আট বছর আগে সে এই গলি ছেড়েছিল পুলিশের গাড়িতে। সেদিন তার হাতে হ্যান্ডকাফ ছিল, মুখে রক্তের শুকনো দাগ, আর চোখে ছিল একধরনের আগুন। আজ সে ফিরেছে হেঁটে। পায়ে ধুলো, কাঁধে ছোট ব্যাগ, চোখে আগের মতোই তীক্ষ্ণতা—তবে আগুনের জায়গায় এখন ঠান্ডা ধোঁয়া। সেই ধোঁয়া অনেক কিছু ঢেকে রাখে।
মানুষের মুখ বদলে যায়। চুল পাকে, শরীর মোটা হয় বা শুকিয়ে যায়। কিন্তু চোখ বদলায় না। শামসুর জানে—এই পাড়ার মানুষ তার চোখ চিনবে।
প্রথমে কেউ খেয়াল করেনি। রাস্তায় কয়েকজন বাচ্চা ক্রিকেট খেলছিল, বল গিয়ে পড়ল তার পায়ের কাছে। সে ঝুঁকে বল তুলে ছুঁড়ে দিল। বাচ্চারা ধন্যবাদ না দিয়ে শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর ফিসফিসানি—
“ওইটা কি…?”
“না রে…?”
“দাঁড়া, দ্যাখ, দাড়িটা কেমন…”
খবর আগুনের মতো ছড়ায়। অল্প সময়েই কয়েকটা দরজা আধখোলা হলো, কয়েকটা জানালার পর্দা সরে গেল। এক মহিলার গলা শোনা গেল—“শামসুর আইছে।”
এই তিনটা শব্দে আট বছরের ইতিহাস, গুজব, ভয়, ঘৃণা আর কৌতূহল একসাথে জড়িয়ে আছে।
পাড়ার জানা গল্প—সে খুন করেছিল। কেন? কার? কীভাবে? এসবের উত্তর কেউ জানে না। কেউ জানতে চায়ও না। মানুষের দরকার শুধু একটা নাম আর একটা অপরাধ। বাকিটা কল্পনা নিজে থেকে বানিয়ে নেয়।
শামসুর ধীরে ধীরে হাঁটে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে তাড়াহুড়ো নেই। যেন সে জানে, এই রাস্তা তাকে এড়াতে পারবে না। চা দোকানের সামনে এসে সে থামে। টিনের চালের নিচে পুরনো কাঠের বেঞ্চ, পাশে একটা ভাঙা কাচের জার, যার ভেতরে বিস্কুট। কেটলিতে চা ফুটছে।
রহিম চাচা চা ছাঁকছেন। তার চুল আগের চেয়ে বেশি পেকে গেছে। মুখে ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু হাতের গতি আগের মতোই অভ্যস্ত। তিনি প্রথমে তাকাননি। কিন্তু যখন দোকানের সামনে একটা ছায়া এসে থামল, তিনি মাথা তুললেন।
দুই জোড়া চোখের মিলন।
কয়েক সেকেন্ড সময় থেমে থাকল। তারপর শামসুর শান্ত গলায় বলল, “চাচা, এক কাপ চা দেন।”
রহিম চাচা হাত থামালেন। খুব সামান্য সময়ের জন্য। তারপর যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে বললেন, “চিনি কম দিব?”
শামসুরের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। “আগের মতো।”
এই “আগের মতো” শব্দের ভেতরে আট বছর জমে আছে। আগের মতো মানে কী? আগের মতো চিনি? আগের মতো সম্পর্ক? আগের মতো সম্মান? নাকি আগের মতো ভয়?
চা এগিয়ে দিলেন রহিম চাচা। তাদের হাত এক মুহূর্ত ছুঁয়ে গেল। স্পর্শটা নিরপেক্ষ, কিন্তু ভেতরে অনেক কথা।
পাড়ায় একটা অস্বস্তি নেমে আসে। কারণ অপরাধ করে ফিরে আসা মানুষকে সবাই দেখে—কিন্তু কেউ জানে না কীভাবে আচরণ করতে হয়। দূরে দাঁড়িয়ে কয়েকজন তরুণ ফিসফিস করছে। রকি, যে এই কয়েক বছরে নিজেকে পাড়ার অঘোষিত নেতা ভাবতে শুরু করেছে, সেও দোকানের বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছে। তার চোখে বিরক্তি।
শামসুর চুপচাপ চা খায়। চায়ের ভাপ তার মুখে উঠে গিয়ে মিলিয়ে যায়। সে বলে, “এলাকায় এখন শান্তি আছে তো?”
রহিম চাচা একটু তাকিয়ে থাকেন। তারপর ধীরে বলেন, “শান্তি বাইরে থাকে না। ভেতরে থাকে।”
শামসুর হেসে ফেলে। কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই। “ভেতরটা কেমন আছে, চাচা?”
রহিম চাচা উত্তর দেন না। শুধু চুলায় আরও চা চাপান।
চা শেষ করে শামসুর চলে যায়। কিন্তু তার পায়ের শব্দে বোঝা যায়—সে ফিরে এসেছে থাকতে। শুধু থাকা না, নিজের জায়গা ফেরত নিতে।
এই পাড়ায় পরিবর্তন শুধু শামসুরের ফেরা না। রহিম চাচার জীবনেও গত মাসে বড় পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বিয়ে করেছেন।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী পাঁচ বছর আগে চলে গিয়েছিল। কেউ বলেছিল, অন্য কারও সাথে। কেউ বলেছিল, দারিদ্র্য সহ্য করতে পারেনি। রহিম চাচা কাউকে দোষ দেননি। শুধু একদিন দোকানের পেছনে বসে অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। কেউ তাকে কাঁদতে দেখেনি, কিন্তু তার চোখের লালচে ভাব দেখে সবাই বুঝেছিল—কিছু ভেঙে গেছে।
তারপর তিনি একা থাকতে শিখেছিলেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চা বানানো, বিস্কুট বিক্রি, হিসাব রাখা—এইসবের ভেতর দিয়ে দিন কেটে যেত। কিন্তু রাতের বেলা ঘরে ঢুকলে নীরবতা তাকে গিলে ফেলত।
মানুষ পুরোপুরি একা থাকতে পারে না। সে যতই অভ্যাস করুক, বুকের ভেতর কোথাও একটা ফাঁকা জায়গা থেকে যায়।
এই ফাঁকাটার মাঝেই এল মমতা।
মমতা বিধবা। বয়সে কম। মুখে স্থায়ী লজ্জার ছাপ। তার চোখে একটা সংযত দূরত্ব—যেন সে সবসময় একটু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। আগের স্বামীর বয়স ছিল প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি। বিয়ের পর যৌবনের রস তো দূর, যৌবনের রঙই দেখতে পারেনি। তিন মাসের মাথায়, এক রাতে সে নেশা করে এসেছিল। রাতটা মমতার জন্য একটু অন্যরকম ছিল। হয়তো এটাই যৌবনের রঙ। হয়তো এটাকে যৌবন বলে। কিন্তু মমতা বুঝতে পারেনি, পরের দিন তার সমস্ত রং মুছে সাদা হয়ে যাবে। ও হ্যাঁ বলা হয়নি, মমতা * ছিল। পাড়ার কিছু শকুনের চোখ এড়াতেই তার এই বিয়ে। বাপের বাড়ি বলতে কোনোকালেই কিছু ছিল না। এ পাড়ায় অবশ্য রহিমের সাথে বিয়ের পর কেউ জানে না যে সে * ছিল। রহিম নিজেই লুকিয়ে রাখতে বলেছিল। পাড়ায় ফিসফাস শুরু হলো—
“এই বয়সে বিয়া?”
“মেয়েটা এত ছোট!”
“চা দোকানদার কই পাইলো?”
রহিম চাচা শুনে শুধু হাসেন। কিন্তু রাতে ঘরে ঢোকার সময় তার বুক ধড়ফড় করে। তিনি জানেন, মানুষের কথা থামে না। কিন্তু ঘরের দরজা বন্ধ হলে দুজন মানুষকে মুখোমুখি হতে হয় নিজেদের সঙ্গে।
প্রথমদিকে মমতা দূরত্ব রেখে চলত। এক বিছানায় দুজন মানুষ, কিন্তু মাঝখানে অদৃশ্য দেয়াল। কথা কম। চোখাচোখি কম।
এক রাতে বিদ্যুৎ ছিল না। ঘর গরম। টিনের ছাদ যেন আগুন হয়ে আছে। মমতা হাতে পাখা নিয়ে বাতাস করছে। তার কপালে ঘাম জমেছে। রহিম চাচা চুপচাপ তাকিয়ে আছেন।
“তোমার কষ্ট হচ্ছে?” তিনি জিজ্ঞেস করেন।
মমতা মাথা নাড়ে। “না।” কিন্তু গলায় কাঁপন।
রহিম চাচার ভেতরে একটা ভয় কাজ করে—তিনি কি এখনও যথেষ্ট? তিনি কি শুধু একজন চা-ওয়ালা? একজন বয়স্ক মানুষ? মমতা কি তাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারবে?
মমতারও ভয় আছে। তার আগের সংসার ছিল কঠিন, রুক্ষ। এখানে মানুষটা নরম। এই নরমত্বে সে অস্বস্তি পায়—কারণ সে অভ্যস্ত না।
সেই রাতে হঠাৎ বৃষ্টি এল। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ ছন্দ তুলল। মমতা বলল, “আপনি এত চুপ কেন?”
রহিম চাচা হালকা হেসে বললেন, “চুপ থাকলে শব্দ কম হয়।”
মমতা প্রথমবার খোলা হাসি হাসল। সেই হাসি ঘর ভরিয়ে দিল।
ধীরে ধীরে তাদের মাঝের দেয়াল পাতলা হতে লাগল। রহিম চাচা কখনও তাড়াহুড়ো করেন না। স্পর্শ করার আগে চোখে অনুমতি খোঁজেন। এক রাতে মমতা নিজেই তার হাত ধরল। শব্দ ছিল না। কিন্তু সেই স্পর্শে এতদিনের একাকীত্ব কেঁপে উঠল।
এই স্পর্শে কামনার চেয়ে বেশি ছিল নিরাপত্তা। ছিল স্বস্তি।
এদিকে শামসুর নিজের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করেছে। মুদি দোকানে দাঁড়িয়ে বলছে, “কোনো সমস্যা হলে আমারে বলবেন।” তার আশেপাশে কয়েকটা তরুণ ছেলেপুলে ঘোরে। তাদের চোখে মুগ্ধতা। একজন শক্তিশালী মানুষের পাশে থাকার একটা নেশা আছে।
রকি অস্বস্তিতে। এতদিন সে-ই ছিল পাড়ার অঘোষিত নিয়ন্ত্রক। এখন বাতাস বদলাচ্ছে। দুই ক্ষমতার সংঘর্ষের আগে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
রাফি দূর থেকে সব দেখে। তার নিজের ভেতরেও ঝড়। চাকরির ইমেইল এসেছে—ইন্টারভিউর জন্য শর্টলিস্টেড। সে কাউকে বলেনি। তার মনে হয়, যদি বলে ফেলে, স্বপ্ন ভেঙে যাবে।
নীলার বাড়িতে সম্বন্ধ এগোচ্ছে। নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবে—পাড়া বদলাচ্ছে। মানুষ বদলাচ্ছে। সে কি পারবে? সে কি নিজের জীবন নিজের মতো বেছে নিতে পারবে?
রাতে রহিম চাচা মমতার পাশে শুয়ে বৃষ্টির শব্দ শোনেন। টিনের ওপর ফোঁটার টুপটাপ। তিনি ভাবেন—এই জীবনে কি সত্যি দ্বিতীয় সুযোগ থাকে?
মমতা ঘুমানোর আগে আস্তে করে তার কাঁধে মাথা রাখে। এই স্পর্শে কোনো দাবী নেই। আছে ভরসা।
বাইরে পাড়ায় গুজব, ভয়, ক্ষমতার খেলা।
ভেতরে—দুজন মানুষের ধীরে ধীরে কাছে আসা।
(চলবে)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Posts: 336
Threads: 3
Likes Received: 393 in 202 posts
Likes Given: 238
Joined: Jul 2025
Reputation:
49
খুব সুন্দর গুছানো লেখা
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
Posts: 52
Threads: 0
Likes Received: 18 in 16 posts
Likes Given: 85
Joined: Sep 2023
Reputation:
0
Khub sundar apnar lekhani.
Waiting for next update
Posts: 973
Threads: 0
Likes Received: 464 in 440 posts
Likes Given: 1,005
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
Posts: 48
Threads: 3
Likes Received: 67 in 27 posts
Likes Given: 58
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
06-04-2026, 07:16 PM
পর্ব ৪
রাতটা শুরু থেকেই অস্বাভাবিক ছিল। এমন না যে আকাশে বজ্রপাত হচ্ছিল, বা ঝড় উঠেছিল। বরং উল্টো—আকাশ ছিল পরিষ্কার, চাঁদ আধখানা, তার আলো টিনের চাল আর ভেজা দেয়ালে পড়ে কেমন ফ্যাকাশে সাদা আভা তৈরি করছিল। তবু বাতাসে একটা টান ছিল। যেন কোথাও কিছু জমে আছে। একটা অদৃশ্য স্ফুলিঙ্গ, যা হাওয়ার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে—কোনো এক মুহূর্তে আগুন ধরাবে।
গলির ভেতর হঠাৎ দৌড়ের শব্দ। তারপর চিৎকার—
“ধর! ধর! চোর!”
শব্দটা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ল, যেন শুকনো খড়ের ওপর আগুন। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, এক জানালা থেকে আরেক দরজা—মুহূর্তের মধ্যে পাড়া জেগে উঠল। যারা ঘুমাচ্ছিল তারা উঠে বসল, যারা খাচ্ছিল তারা প্লেট ফেলে বেরিয়ে এল। কেউ লাঠি হাতে, কেউ হাতে টর্চ, কেউ শুধু রাগ নিয়ে।
বাপ্পিকে ধরা হয়েছে পাশের গলির আজিম সাহেবের বাড়ির বারান্দা থেকে নামতে গিয়ে। সে নিচে লাফ দিয়েছিল, কিন্তু পা হড়কে পড়ে গেছে। উঠতে না উঠতেই দুই-তিনজন তাকে চেপে ধরেছে। তার গায়ে ধুলো, শার্ট ছিঁড়ে গেছে কাঁধের কাছে, বুক উঠানামা করছে দ্রুত। চোখে আতঙ্ক—শুধু ধরা পড়ার না, আরও গভীর কিছু।
চারদিক থেকে লোকজন ঘিরে ধরেছে। প্রথম চড়টা কে মারল বোঝা গেল না। তারপর যেন নিয়ম হয়ে গেল। একের পর এক থাপ্পড়, লাথি। কেউ চুল ধরে টানছে, কেউ কলার চেপে ধরেছে।
“চুরি করস?”
“এলাকার নাম ডুবাইছিস!”
“এদের না মারলে ঠিক হয় না!”
বাপ্পির ঠোঁট ফেটে গেছে। মুখের কোণে রক্তের সরু রেখা নেমে এসেছে থুতনিতে। সে কাঁপা গলায় বলছে, “ভাই, আমার কথা শোনেন… আমি ইচ্ছা করে করি নাই… আমার মা… আমার মায়ের ওষুধ…”
কিন্তু জনতার কানে তখন যুক্তি ঢোকে না। ভিড়ের রাগ একবার জেগে উঠলে তা যুক্তির ভাষা বোঝে না। রাগেরও একটা নেশা আছে—একসাথে মারার, একসাথে চেঁচানোর, একসাথে বিচার করার নেশা।
রহিম চাচা দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। তার হাতে কেটলি নেই, লাঠিও নেই। শুধু চোখ। সেই চোখে এক ধরনের ক্লান্ত দুঃখ। তিনি জানেন, এই ছেলেটাকে তিনি চেনেন। বাপ্পি ছোটবেলায় তার দোকান থেকে বাকিতে বিস্কুট নিয়ে যেত। হাসত। মাঝে মাঝে চা বানাতে সাহায্য করত। তার বাবার মৃত্যুর পর সে বদলে গেছে—কিন্তু পুরোপুরি না। কোথাও একটা ভাঙা আলো ছিল এখনও।
“পুলিশে দে! অনেক হয়েছে!”
“এরা না মার খাইলে মানুষ হবে না!”
ভিড়ের উত্তেজনা বাড়ছে। বাপ্পি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার কণ্ঠ ভেঙে গেছে। “আমার মা তিনদিন ধরে ঠিকমতো খায় নাই। ডাক্তার বলছে ইনজেকশন লাগবো। টাকা নাই। আমি কী করমু?”
এক মুহূর্তের জন্য ভিড়ের মধ্যে একটা থেমে যাওয়া নিঃশ্বাস। কেউ ফিসফিস করে বলল, “এই ছেলেটা আগে ভালো আছিল…” কিন্তু সেই কণ্ঠ চাপা পড়ে গেল আরেকটা থাপ্পড়ের শব্দে।
ঠিক তখনই শামসুর এল।
সে খুব দ্রুত হাঁটেনি। বরং ধীরে। যেন সে জানত, এই দৃশ্য তার জন্য অপেক্ষা করছে। তার মুখে রাগ নেই, কিন্তু চোখে কঠিন স্থিরতা। সে ভিড় ঠেলে সামনে এল। তার উপস্থিতিতেই যেন একটু নীরবতা নামল।
“থামেন,” সে বলল। কণ্ঠস্বর নিচু, কিন্তু দৃঢ়।
অদ্ভুতভাবে ভিড় একটু থামল। কেউ কেউ হাত নামিয়ে নিল। শামসুর বাপ্পির সামনে দাঁড়াল।
“তুই চুরি করছিস?”
বাপ্পি মাথা নিচু করল। “হ, ভাই… কিন্তু…”
“কিন্তু কী?”
“মা… মা মরতেছে ভাই…”
এই কথাটা বলার সময় তার গলা ভেঙে গেল। যেন লজ্জা, ভয়, অসহায়তা সব একসাথে বেরিয়ে এলো।
শামসুর ভিড়ের দিকে তাকাল। তার চোখ একেকজনের মুখে থামল।
“আজ যদি এই ছেলেটারে পুলিশে দেন, কাল সে জেল থেকে বের হইয়া কী হইবো জানেন? চোর না, ডাকাত হইবো। তখন আপনার বাসায় ঢুকবো, আপনার গলায় ছুরি ধরবো। আজও সময় আছে—এরে মানুষ বানান।”
একজন বলল, “তাহলে ছাইড়া দিমু? চুরি করছে!”
শামসুর কোন উত্তর দেয়নি। শুধু তার অগ্নি চোখ দিয়ে পিছন ফিরে একবার তাকিয়ে দেখেছিল। পুরো পাড়া শান্ত হয়ে গেছিল এক মুহূর্তের মধ্যে।
এদিকে রাফির জীবনে যেন হঠাৎ করেই অন্যরকম একটা আলো ঢুকে পড়ল। অনেকদিন ধরে সে আলো খুঁজছিল—অন্ধকারের ভেতর হাতড়ে হাতড়ে। ব্যাংকের খামটা যখন তার হাতে এলো, প্রথমে সে খুলতেই পারেনি। বুকের ভেতর ধুকপুকানি এত জোরে হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল আশেপাশের মানুষও শুনতে পাচ্ছে। এতবার ব্যর্থ হয়েছে, এতবার “দুঃখিত, আপনি নির্বাচিত হননি” পড়েছে—তার ভেতরে একধরনের ভয় জমে ছিল। আবার যদি না হয়?
তবু খুলল। ধীরে, সাবধানে। সাদা কাগজটা বের করল। প্রথম লাইনে নিজের নাম দেখে তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড সে শব্দগুলো পড়তে পারেনি। তারপর আবার পড়ল। “নিয়োগপত্র”—শব্দটা যেন কাগজ থেকে বেরিয়ে এসে তার বুকের ভেতর বসে গেল।
সে বসে পড়ল খাটে। এতদিনের চেষ্টা, রাত জেগে পড়া, বন্ধুর বিয়েতে না যাওয়া, আত্মীয়দের প্রশ্ন এড়িয়ে চলা—সব একসাথে মাথায় ভিড় করল। তার মনে হলো, এই একটা কাগজ শুধু চাকরি না, একটা পরিচয়। “বেকার রাফি” থেকে “ব্যাংকার রাফি”—এই বদলটা সমাজের চোখে যত বড়, তার নিজের ভেতরে তার চেয়েও বড়।
সে উঠে দাঁড়াল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের চোখের দিকে তাকাল। একই মানুষ—কিন্তু দৃষ্টি আলাদা। সেখানে ক্লান্তি আছে, কিন্তু তার ভেতর দিয়ে আলো ফুটছে। সে আস্তে করে বলল, “আমি পারছি…” যেন নিজেকেই শুনিয়ে।
তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেল। কথা বলার সময় কণ্ঠে দৃঢ়তা এল। মনে হচ্ছিল—এখন সে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে পারে, শুধু স্বপ্ন না, পরিকল্পনা করতে পারে।
প্রথমেই তার মনে পড়ল নীলার কথা।
ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কল করবে? নাকি একটু পরে? শেষ পর্যন্ত কল দিল।
“হ্যালো?” নীলার কণ্ঠে স্বাভাবিক কোমলতা।
“চল, আজ বাইরে যাই,” রাফির গলায় চাপা উত্তেজনা।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। যেন নীলা তার কণ্ঠের ভেতর কিছু পড়ে নিতে চাইছে। “কোথায়?”
“চমক আছে,” সে হেসে বলল।
নীলা খুব বেশি প্রশ্ন করল না। শুধু বলল, “ঠিক আছে।”
সন্ধ্যায় তারা শহরের একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্টে গেল। জায়গাটা খুব সাধারণ। কাঠের টেবিল, সাদা টিউবলাইট, কোণায় একটা কৃত্রিম মানি প্ল্যান্ট। কিন্তু সেদিন সেই সাধারণ জায়গাটাই তাদের কাছে বিশেষ হয়ে উঠল। কারণ তারা শুধু খেতে যায়নি—স্বপ্ন দেখতে গিয়েছিল।
নীলা হালকা নীল সালোয়ার পরেছিল। চুল খোলা, চোখে সামান্য কাজল। রাফি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার চোখে নতুন আত্মবিশ্বাস থাকলেও, নীলাকে দেখলে সে এখনও একটু কেঁপে ওঠে।
“কি?” নীলা হেসে বলল।
“তুমি জানো, আমি আজকে নিজেকে আলাদা লাগতেছে।”
“চাকরি মানুষকে বদলাইয়া দেয়?” তার চোখে দুষ্টু ঝিলিক।
রাফি মাথা নাড়ল। “না। আত্মবিশ্বাস বদলাইয়া দেয়। মনে হচ্ছে—আমি তোমারে কিছু দিতে পারব।”
“আমি তো কিছু চাই না,” নীলা নিচু গলায় বলল।
“চাও। নিরাপত্তা চাও। সম্মান চাও। নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ চাও। আমি চাই—এইগুলো তোমারে দিতে।”
তারা কফির কাপ হাতে অনেকক্ষণ বসে থাকল। ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলল। একটা ছোট্ট বাসা—বড় কিছু না। দুই রুম। বারান্দায় কয়েকটা গাছ। সন্ধ্যায় দুজন একসাথে বসে চা খাবে। ঝগড়া করবে, আবার মিটমাট করবে। খুব সাধারণ জীবন—কিন্তু নিজের।
“আমি চাই তোমারে নিয়ে শান্ত একটা জীবন,” রাফি বলল।
নীলা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “শান্তি কি আমাদের কপালে আছে?”
তার কণ্ঠে ছিল বাস্তবতার ছায়া। তারা দুজনেই জানত—এই ভালোবাসা শুধু তাদের দুজনের না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ, সম্মান, অহংকার।
দূরে কোণার একটা টেবিলে বসে শিউলি তাদের দেখছিল। সে আসলে এখানে এসেছিল তার এক বান্ধবীর সঙ্গে। কিন্তু বান্ধবী চলে যাওয়ার পরও সে বসে রইল। তার চোখ আটকে ছিল রাফির দিকে। রাফির হাসি, হাতের ভঙ্গি, নীলার দিকে ঝুঁকে কথা বলা—সব তার বুকের ভেতর কেমন করে তুলছিল।
সে অনেকদিন ধরে রাফিকে পছন্দ করে। কলেজ থেকে চিনে। কখনও বলেনি। ভাবত, সময় আসবে। একদিন হয়তো রাফি নিজেই বুঝবে। কিন্তু আজ সে বুঝল—সময় অপেক্ষা করে না। কেউ কারও জন্য থেমে থাকে না।
তার ভেতরে হিংসা, কষ্ট, অপমান—সব একসাথে জমল। সে নিজেকে বলল—“আমি কি দোষ করছিলাম?” কিন্তু উত্তর পেল না।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে অনেকক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল—সেখানে ভাঙা স্বপ্নের দাগ। হঠাৎ তার মাথায় একটা চিন্তা এল। যদি সে কিছু বলে? যদি সে পরিস্থিতিটা বদলে দেয়?
সন্ধ্যায় কাদের সাহেব বারান্দায় বসে ছিলেন। শিউলি ভদ্রভাবে কড়া নাড়ল।
“কাকা, একটা কথা ছিল…”
কথা শুরু হলো খুব শান্তভাবে। “আমি জানি না বলা ঠিক হইবো কিনা…”—এই ধরনের ভূমিকা দিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে সে বলল—নীলা আর রাফি নিয়মিত দেখা করে, বাইরে যায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করে। “মানুষজন কথা বলতেছে…”—এই কথাটা সে একটু জোর দিয়ে বলল। যেন বিষয়টা শুধু ব্যক্তিগত না, সামাজিক।
কাদের সাহেবের মুখ শক্ত হয়ে গেল। তার ভেতরে বাবা কম, সমাজ বেশি জেগে উঠল। তিনি ভাবলেন—পাড়া কী বলবে? তার মেয়ের নামে কথা উঠবে? তার সম্মান?
তিনি নীলাকে ডাকলেন।
“এইসব কি সত্যি?”
নীলা প্রথমে কিছু বলল না। তার বুক ধড়ফড় করছিল। কিন্তু সে জানত—আজ চুপ থাকলে সে নিজেকেই হারাবে।
“আমি ওরে ভালোবাসি, আব্বা।”
এই স্বীকারোক্তি যেন ঘরে বিস্ফোরণ ঘটাল।
“তোর সাহস কত বড় হইছে?” কাদের সাহেবের গলা কেঁপে উঠল—রাগে, অপমানে, ভয়ে।
তর্ক শুরু হলো। নীলা বলল, “আমি মানুষ। আমার নিজের পছন্দ আছে।”
কাদের সাহেব বললেন, “তোর জীবন মানে আমার সম্মান!”
কান্না, চিৎকার, দরজা ধাক্কা। বাড়ির ভেতর বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা হলো—নীলার বিয়ে সাইফের সাথে ঠিক। সাইফ বিদেশে থাকে, প্রতিষ্ঠিত। “মেয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত”—এই যুক্তিতে সব চাপা পড়ল। নীলার অসম্মতি অগ্রাহ্য। আর বিয়ের আগ পর্যন্ত সে বাইরে যেতে পারবে না।
নীলা নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে। সে ভাবল—এই আকাশ কি তার? নাকি এটাও নিয়ন্ত্রিত? তার ভালোবাসা কি অপরাধ? তার স্বপ্ন কি এতটাই তুচ্ছ?
ওদিকে রাফি খবরটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। যেন কেউ তার বুক থেকে হাওয়া বের করে দিয়েছে। যে আত্মবিশ্বাস কয়েক ঘণ্টা আগে তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তা হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেল।
সে ভাবল—চাকরি কি সব বদলাতে পারে? টাকা? সম্মান? সমাজের চোখ?
সে আয়নার সামনে আবার দাঁড়াল। একই মানুষ। কিন্তু চোখে এবার আলো কম। সেখানে প্রশ্ন বেশি।
স্বপ্ন দেখা সহজ। স্বপ্ন বাঁচানো কঠিন।
আর ভালোবাসা?
ভালোবাসা শুধু দুজন মানুষের না—অনেক সময় পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নাম।
বাপ্পি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে।
এই খবর শুধু একটা ঘটনা না, একটা পরিচয়।
বাপ্পি যখন বাড়ি ফিরল, তার শরীর ব্যথায় ভরা। মুখ ফুলে গেছে। চোখের কোণে শুকনো রক্ত। সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। তার মা খাটে শুয়ে ছিলেন। শ্বাসকষ্টে বুক উঠানামা করছে ধীরে।
কেউ আগে থেকেই এসে বলে গেছে—“আপনার ছেলে চুরি করতে গিয়া ধরা পড়ছে।”
মায়ের চোখে তখন কী ছিল? অপমান? না কষ্ট? না নিজের ব্যর্থতার বোধ? তিনি ছেলেকে ডাকলেন না। শুধু ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখের কোণে পানি জমল, কিন্তু গড়াল না।
বাপ্পি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মায়ের পাশে। “মা, আমি তোমার জন্যই…”
কিন্তু সব কথা শোনা যায় না। কিছু কথা দেরিতে আসে।
সেই রাতেই তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেল। বাপ্পি পানি ধরল, কাঁদল, ডাক্তার ডাকতে দৌড়াল। কিন্তু ভোরের আগে তিনি চলে গেলেন।
নিঃশব্দে।
বাপ্পি বসে রইল মায়ের নিথর শরীরের পাশে। তার মাথায় একটাই কথা ঘুরছে—সে পুলিশে যায়নি ঠিকই, কিন্তু তার চেয়ে বড় শাস্তি সে পেয়েছে।
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
•
|