Posts: 55
Threads: 3
Likes Received: 77 in 32 posts
Likes Given: 60
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
31-03-2026, 06:05 PM
পর্ব ১
রাতের শেষ অংশটুকু সবসময় অদ্ভুত। এটা পুরো রাতও না, আবার সকালও না। মানুষের ভেতরের যে কথাগুলো দিনের বেলায় মুখ খুঁজে পায় না, সেগুলো এই সময়ে মাথা তোলে।
নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ঘরের বাতি নিভানো। শুধু বাইরে হালকা ফ্যাকাশে আলো। তার চোখে ঘুম নেই। বহুদিন ধরেই নেই। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই তার ঘুম পাতলা হয়ে গেছে। ছোটবেলায় সে ভয় পেত অন্ধকারকে। এখন সে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে স্বেচ্ছায়। কারণ অন্ধকার বিচার করে না।
তার বাবা পাশের ঘরে শুয়ে। তার ঘুম শব্দ করে না, কিন্তু নিঃশ্বাস ভারী। বয়স বাড়লে মানুষ শব্দ না করে ক্লান্ত হয়। নীলার মাথায় আজ একটা অদ্ভুত চাপ। তিনদিন ধরে রাফিকে ঠিকমতো দেখা হয়নি। ছাদে দাঁড়ানোও কমে গেছে। নীলা জানে, রাফির ইন্টারভিউ ছিল, এখন তো নীলার সামনে আসতেও রাফি ভয় পায়। এটাও জানে—এই ভয়কে সে কাউকে দেখায় না।
হঠাৎ খুব হালকা একটা শব্দ হলো পেছনের দিক থেকে। এমন শব্দ, যা নিশ্চিত না হলে মানুষ উপেক্ষা করে। নীলা শুনেছিল কি?
হয়তো শুনেছিল। কিন্তু মানুষের ভেতরে যখন অন্য শব্দ বেশি জোরে বাজে, বাইরের শব্দ তখন দূরে সরে যায়। পেছনের গলিতে একটা ছায়া নড়ল। লোহার গ্রিলের গায়ে চাপা ঘষা। তারপর খুব ছোট একটা ভাঙার শব্দ। কেউ ভেতরে ঢুকছে।
আব্দুল কাদেরের ঘুম ভাঙলো ভোরের একটু আগে। তার একটা অভ্যাস আছে—সকালে উঠে আলমারি দেখে নেন। যেন কোনো অদৃশ্য ভয় তাকে তাড়া করে। আলমারিটা তার কাছে শুধু কাঠ আর লোহার জিনিস না। সেখানে তার জীবনের হিসাব থাকে। জমির দলিল, ব্যাংকের কাগজ, আর একটা ফাইল—যেটা তিনি কাউকে দেখান না। আজ আলমারির দরজাটা পুরো বন্ধ ছিল না। তিনি প্রথমে ভাবলেন, ভুলে গেছেন।
হাত বাড়িয়ে ঠেলতেই দরজাটা হেলে পড়ল। ভাঙা কাঠের শব্দ হলো।
ভেতরের জিনিস এলোমেলো। যেন আলমারি না তার বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে।
“সব শেষ!”
এই চিৎকারে পাড়ার সকাল বদলে গেল।
শিউলি আপা জানালা খুলে তাকালেন। তার চোখে কৌতূহল আগে আসে, সহানুভূতি পরে। তিনি চিৎকার করে খবর দিলেন। খবর ছড়াতে সময় লাগে না, কারণ মানুষের ভেতরে গল্পের জন্য জায়গা সবসময় থাকে। ভিড় জমতে লাগল। কেউ লুঙ্গি সামলাচ্ছে, কেউ চশমা খুঁজছে, কেউ ফোন হাতে নিয়ে ভিডিও করতে চাইছে কিন্তু সাহস পাচ্ছে না। নীলা সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে। তার মাথার ভেতর অদ্ভুত শান্তি। হয়তো ধাক্কা এত বড় যে কান্না আসছে না।
শুধু নীলা জানে ওর চোখ ভিড়ের মধ্যে কাউকে খুঁজছে।
"রাফি।"
রাফি যখন এল, তার হাঁটার ভেতর একটা অপরাধবোধ ছিল। কেন ছিল—সে নিজেও জানে না। যেন কোনো অঘটনের সময় উপস্থিত না থাকলে সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না। তাদের চোখ মিলল। এই মিলনে হাজার কথা ছিল।
“তুমি ঠিক আছো তো?”
“আমি আছি।”
“সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করো না”
“জানি না।”
কাদের সাহেব ফাইল খুঁজছেন।
“সবুজ ফাইলটা… এখানে ছিল…” এই ফাইলের কথা কেউ জানে না। এই ফাইলের ভেতরে ছিল তার স্ত্রীর লেখা কয়েকটা চিঠি। তাদের প্রেমের সময়কার। তিনি কখনও সেগুলো ফেলে দেননি। আজ মনে হলো—অতীতও কি চুরি হয়ে যায়? পুলিশ এলো। প্রশ্ন করলো। সন্দেহ জানতে চাইল। এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কাদের সাহেব বুঝলেন—বিশ্বাস মানে কী ভঙ্গুর জিনিস।
তিনি বললেন, “আমাদের কারও সাথে শত্রুতা নাই।”
কিন্তু তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য পাড়ার মানুষের ওপর ঘুরে গেল। মানুষের ভিড় মানেই সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকতার তালিকা। রহিম চাচা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার চোখে বিচার কম, পর্যবেক্ষণ বেশি। তার পাশে বাপ্পি দাঁড়িয়ে। বাপ্পির হাত দুটো পকেটে ঢোকানো। তার চোখ নিচু। রহিম চাচা লক্ষ্য করলেন—ছেলেটা আজ চুপচাপ। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। কারণ তিনি জানেন, কিছু নীরবতা জোর করে ভাঙলে শব্দ বের হয় না, কান্না বের হয়। ভিড় ছড়িয়ে গেলে পাড়ার ভেতরে গুঞ্জন রয়ে গেল। শিউলি আপা বললেন, “ভেতরের লোক।” হাশেম কাকু বললেন, “বাইরের।” মিজান স্যার সমাজ নিয়ে বক্তৃতা দিলেন। প্রতিটা মানুষ নিজের মতামত দিয়ে স্বস্তি পেল। কারণ মতামত মানে নিরাপত্তা...
রাফির ইন্টারভিউ ছিল। সে যায়নি। তার মা জিজ্ঞেস করলে সে চোখ নামিয়ে বলল, “আজ মন ছিল না।” মা চুপ করে গেলেন। তিনি জানেন—এই ছেলের মন আর বাস্তবতা একসাথে হাঁটে না। তিনি মাঝে মাঝে ভাবেন, ছেলেকে বেশি স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন কি না।
সন্ধ্যায় নীলা ছাদে উঠল। আকাশে হালকা কমলা রঙ। চুরি হওয়া বাড়ির ওপরও সূর্য একইভাবে আলো ফেলে—এই নির্লিপ্ততায় তার কষ্ট হয়। রাফি পাশের ছাদে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
“তুমি ঠিক আছো?” রাফি জিজ্ঞেস করল।
নীলা উত্তর দিল না সঙ্গে সঙ্গে।—ঠিক থাকা মানে কী? যদি ভেতরে অস্থিরতা থাকে, তবু বাইরে শান্ত থাকি—তাহলে কি ঠিক? শুধু বলল-“আমি জানি না।”
রাফি হঠাৎ বলল, “আমি চাকরি পেলে সব বদলে যাবে।”
এই বাক্যে তার ভেতরের অসহায়তা ছিল। রাফি মনে করে, চাকরি মানেই সম্মান। সম্মান মানেই সাহস ।আর সাহস মানেই নীলাকে নিজের বলা।
নীলা- “সব?”
রাফি থেমে গেল। সব বদলানো যায় না। কিছু জিনিস শুধু সহ্য করা যায়।
রাতে কাদের সাহেব একা বসে রইলেন। ভাঙা আলমারি সামনে। তার মনে হলো, এই পাড়া আর আগের মতো নিরাপদ না। তার মেয়েকে তিনি কেমন ভবিষ্যৎ দিতে পারবেন? তার নিজের প্রেমের বিয়ে ছিল। কিন্তু জীবনের চাপে সেই প্রেম শুকিয়ে গেছে। তিনি চান না মেয়ের জীবন অনিশ্চিত হোক। কিন্তু তিনি এটাও জানেন না—অতিরিক্ত নিরাপত্তা মানুষকে শ্বাসরুদ্ধ করে।
ওদিকে চা দোকানের পেছনে বাপ্পি একা বসে আছে। তার পকেটে ছোট একটা সোনার চেইন। সে সেটা বের করে আলোতে ধরল। তার চোখে জল নেই। কারণ তার কাছে এটা চুরি না—প্রয়োজন। তার মা তিনদিন ধরে জ্বরে। ডাক্তার বলেছে ওষুধ লাগবে। সে ফিসফিস করে বলল, “আমি খারাপ না।” এই বাক্য সে নিজেকেই বলছে। পাড়ার বাতি একে একে নিভে যায়। সবাই ভাবে দিন শেষ।
কিন্তু আসলে আজ একটা ফাঁক তৈরি হয়েছে। বিশ্বাসের ফাঁক। ভবিষ্যতের ফাঁক। দুজন মানুষের মাঝের নীরবতার ফাঁক। এই ফাঁকের ভেতর দিয়েই গল্প ঢুকবে। আর কেউ এখনও বুঝতে পারছে না সবচেয়ে বড় ভাঙন আলমারিতে না, মানুষের ভেতরে শুরু হয়েছে।
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Posts: 1,071
Threads: 0
Likes Received: 511 in 486 posts
Likes Given: 1,135
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
•
Posts: 1,291
Threads: 2
Likes Received: 2,346 in 1,041 posts
Likes Given: 1,669
Joined: Jul 2021
Reputation:
668
বাহ্ খুব সুন্দর starting লাইক আর রেপু দিয়ে সঙ্গে রইলাম
•
Posts: 58
Threads: 1
Likes Received: 15 in 12 posts
Likes Given: 114
Joined: Jun 2019
Reputation:
0
একটা পুরনো গল্প old xossip এ পড়েছিলাম। এক জমিদারের পুত্র তার জমিদার পিতা থেকে দূরে আদিবাসীদের গ্রামে বেড়াতে যায়। সেখানে ফুলিয়া নামক এক বয়স্কা সাঁওতাল রমণীর সাথে যুবকের পরিচয় ও প্রণয় ঘটে। ফুলিয়ার আদিম বন্য রূপে আকৃষ্ট হয়ে যুবক তার প্রেমে পড়ে, এবং লোকচক্ষু এড়িয়ে জঙ্গলে গিয়ে সঙ্গম করে। ফুলিয়ার মাতাল বর বুধিয়ার নালিশে সাঁওতাল গ্রামবাসীরা দু'জনকে ধরে বিয়ে দেয়। কিন্তু গ্রামের জ্যেষ্ঠ বুড়ীমা শর্ত দেয় - তাদেরকে মারাং বুরু দেবতাকে তুষ্ট করতে হবে, সেজন্য বোঙ্গা দেবতার মন্দিরে যৌন উত্তেজক হাঁড়িয়া মদ, বন্য শূকরের মাংস, আর পাঁঠার মাংস খেয়ে রাতভর ওরা এনাল সেক্সের মাধ্যমে বাসর উদযাপন করে। ফুলিয়া তার যুবক নাগরকে বাবু সম্বোধন করে, বাড়াকে নুড়া ডাকে, সাঁওতালী আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে .. দুর্দান্ত এক গল্প ছিল। প্লিজ কেউ খুঁজে দিন।
Posts: 94
Threads: 0
Likes Received: 41 in 39 posts
Likes Given: 125
Joined: Dec 2025
Reputation:
3
01-04-2026, 08:06 PM
(This post was last modified: 01-04-2026, 08:06 PM by BiratKj. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
Waiting for next update... Great start
•
Posts: 3,360
Threads: 0
Likes Received: 1,472 in 1,311 posts
Likes Given: 45
Joined: May 2019
Reputation:
34
•
Posts: 55
Threads: 3
Likes Received: 77 in 32 posts
Likes Given: 60
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
02-04-2026, 01:07 PM
(This post was last modified: 02-04-2026, 01:11 PM by Dead people. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
পর্ব ২
চুরির ঘটনার পর পাড়ার বাতাস কখনও আগের মতো স্বাভাবিক হলো না। বাইরে তাকালে মনে হয় সব আগের মতো—চা দোকানে ভিড়, মুদি দোকানের কাঁচের জানালায় ঝলক, বিকেলের ছাদে কাপড় শুকানো। কিন্তু মানুষের চোখে এক ধরণের হিসাব ঢুকে গেছে। কেউ কারও বাড়িতে ঢোকার সময় একটু খেয়াল করে, কেউ হাসে, কিন্তু মনে মনে ভাবে—এটা কি সত্যি হাসি, নাকি শুধু ভান। এই অদৃশ্য হিসাবের মধ্যে নীলা সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে। ছোটবেলায় সে ছিল কথা বলার মানুষ, হাসির মানুষ, কখনও কাঁদতেও দ্বিধা হতো না। মা মারা যাওয়ার পর তার হাসি ধীরে ধীরে কমে গেছে। কাঁদতে গিয়ে মনে হয়, চোখের জল পড়ে না—অভ্যাস হয়ে গেছে।
নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছে, অথচ সে জানে আকাশ তার কথাগুলো শুনবে না। ভোরের আলো আসার আগে আকাশ সবসময় ধূসর, আকাশের দিকে তাকালেই মনে হয়, কোন জায়গায় সময় থেমে গেছে। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ, যেন সব কিছু ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ তা দেখছে না। রাফি তিনদিন ধরে দেখা হয়নি। ইন্টারভিউর কথা মনে আছে, ফোন আসেনি। সে নিজেই ফোন করতে সাহস পায় না, কারণ স্পষ্ট “না” শুনতে ভয় পায়। ভয় একটা অদৃশ্য ছায়া, যা তাকে ছাদে দাঁড় করায়, বারান্দায় দাঁড় করায়, নিজেকে একাকী অনুভব করতে বাধ্য করে।
তার বাবা, সাদেক সাহেব, এখনও প্রতিদিন সকালে পত্রিকা পড়েন। ব্যাংকে কাজ করতেন এক সময়, হিসাবরক্ষক ছিলেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত। প্রতিদিন পত্রিকা পড়ে চাকরির বিজ্ঞাপন ঘিরে রাখেন, কিন্তু ছেলেকে বলেন না—“এইটায় আবেদন কর।” ভেতরে ভাঙা একটি গ্লাসের মতো। ছেলের স্বপ্নকে জোরে চাপ দিতে চান না, কিন্তু ভিতরে ভেঙে যাচ্ছে। পাড়ায় চুরি হয়েছে—তাও শুধু আলমারির নয়। বিশ্বাসও চুরি হয়েছে।
চা দোকানেই রহিম চাচা বসে আছেন। আজকাল বাপ্পি কম কথা বলে। চোখে অপরাধবোধ, কিন্তু এখনও তার হাতে আছে ছোট্ট সোনার চেইন। মা অসুস্থ। বাপ্পি জানে—ধরা পড়লে সমস্যা। কিন্তু এখন সময় আছে। রহিম চাচা বুঝতে পারছেন। মানুষের ভাঙা শব্দ সবসময় শব্দের মধ্যে থাকে না। অনেক সময় মানুষ ভাঙে নীরবভাবে, নিজের ভেতরে।
এদিকে ছোট কাকা গ্রাম থেকে এসেছে। হঠাৎ আগমন পাড়ার মধ্যে হাহাকার তৈরি করছে। সে বলল, “একটা ভালো সম্বন্ধ আছে। ছেলেটা ব্যাংকে চাকরি করছে। এখনই কথা বললে ভালো।” কাদের সাহেব চুপ করে শুনলেন। মাথায় হিসাব চলছে। ব্যাংকের চাকরি মানে স্থায়িত্ব, স্থায়িত্ব মানে নিরাপত্তা। ভেতরের শান্তি নেই, কিন্তু অস্থিরতাও শুয়ে নেই। নীলা ঘরে চুপচাপ। বুকের ভেতর ব্যথা। জানে, তার জীবনের উপর কথা হচ্ছে, কিন্তু তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে না।
নীলা ডায়েরি খুলল। লিখতে পারল না। শুধু কলম ধরে রাখল। শব্দগুলো লিখে ফেলার আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। বাইরে বাতাস বইছে, ভেতরের চুপচাপ শব্দ ভেঙে পড়ছে না। বুকের অদ্ভুত অস্থিরতা। মনে হচ্ছে, যা হারানো হয়েছে তা শুধুই জিনিস নয়, বিশ্বাস, নিরাপত্তা, স্বপ্ন—সব মিলিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি করেছে।
রাত হলে নীলা সাদা সালোয়ার পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের মুখ দেখল, কোথাও যেন একটা ফাটল আছে। ছাদে এলো সাইফ। ভদ্র, শান্ত। খুব মেপে কথা বলে। “আপনি কী পড়েন?” সে জিজ্ঞেস করল।
নীলা - “বাংলা।”
“ভালো। সাহিত্য মানুষকে গভীর করে।” নীলার মনে হলো—সে কি সত্যিই বোঝে?
কিছুক্ষণ পরে সবাই একা বসে আছে। সাইফ বলল, “আমি খুব সাধারণ জীবন চাই। ঝামেলা পছন্দ করি না।”
নীলা জিজ্ঞেস করল, “ঝামেলা মানে?”
সে হেসে বলল, “অপ্রয়োজনীয় আবেগ।” বাতাসে ঝুলে থাকা বাক্য।
নীলার মনে হলো, তার আবেগ কি অপ্রয়োজনীয়? সে কিছু বলল না।
রাফি খবরটা শুনে ছাদে উঠল। নীলা এলো না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে নিচে নেমে গেল। রাতে বাবার ঘরে ঢুকল। বাবা পত্রিকা পড়ছিলেন। “বাবা,” সে বলল, “চাকরি পেলে কি সব ঠিক হয়ে যায়?” বাবা চশমা খুলে তাকালেন। “সব না। কিন্তু অনেক কিছু সহজ হয়।”
এই উত্তর অর্ধেক। অর্ধেকের ভেতর দুশ্চিন্তা।
কাদের সাহেব রাতের অন্ধকারে একা। ভাঙা আলমারির দিকে তাকিয়ে। জানেন—পাড়ায় চুরি হয়েছে, মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা আছে। অতিরিক্ত নিরাপত্তা মেয়ের জীবন শ্বাসরুদ্ধ করতে পারে।
নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আকাশে চাঁদ নেই। মনে হলো—সে যেন দুই দিক থেকে টানছে। একদিকে প্রেম, একদিকে নিরাপত্তা। জানে না কোনটা বেছে নিলে কম ভাঙবে। বাতাস স্থির, কিন্তু ভেতরের বাতাস বইছে। অপূর্ণ অপেক্ষা চাপা আতঙ্ক।
পাড়ার অন্য প্রান্তে হাসেম কাকু বসে। পাড়ার ঘটনাগুলো একদম খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। তার চোখে গোপন খবর পড়ে, কিন্তু মুখে কিছু আসে না। জানে—ভয়ের শুরু, আগের মতো নয়, মানুষের ভেতরে।
রাত্রি গভীর। দোকান বন্ধ। পাড়ার অন্ধকার। তবে বাতাসে শব্দ। কখনও চুপচাপ, কখনও হালকা কন্ঠ। রাস্তায় কারও পদচাপ, কোথাও একটি দরজার চিল। এই শব্দগুলোর ভেতর মানুষ নিজের ভেতরের গল্পে ডুবে।
রাফি একা বসে ছাদে। মনে মনে ভাবছে—চাকরি, নীলা, বিশ্বাস, নিরাপত্তা। তার ভেতরে সব মিলিয়ে একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে, একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো জীবনকে ভেঙে দিতে পারে।
নীলা ঘরে। তার চোখে নিঃশব্দ কষ্ট। মনে হয়, জীবনের সব সম্ভাব্য আশা একটি ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ভেতর চাপ। মনে হয়, যদি কেউ জানতে চায়, সে বলতে পারবে না।
ছোট কাকার কথার আওয়াজ এখনও বাতাসে। “এটা ভালো সম্বন্ধ। স্থায়িত্ব।” কিন্তু নীলা জানে, স্থায়িত্বের সঙ্গে প্রেম কখনও একসাথে চলে না।
চা দোকানের পেছনে বাপ্পি বসে। চোখে অপরাধবোধ। পকেটে সোনার চেইন। মনে হচ্ছে, যা হচ্ছে, তার সবই অদৃশ্য।
পাড়ায় বাতি একে একে নিভে যায়। মানুষ ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু ভিতরে বাতাস বইছে। ধীরে ধীরে। গভীরভাবে। অপূর্ণ।
এই ফাঁক আর শান্ত নয়। দুজনের ভেতরের ফাঁক, পাড়ার ফাঁক, ভবিষ্যতের ফাঁক—সব মিলেছে। কেউ এখনও বুঝতে পারছে না—এই নীরবতার ভেতরেই আসল ভাঙন তৈরি হচ্ছে।
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Posts: 73
Threads: 0
Likes Received: 32 in 29 posts
Likes Given: 112
Joined: Dec 2025
Reputation:
2
Bhalo cholche... Waiting for next update
•
Posts: 1,071
Threads: 0
Likes Received: 511 in 486 posts
Likes Given: 1,135
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
Posts: 55
Threads: 3
Likes Received: 77 in 32 posts
Likes Given: 60
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
04-04-2026, 05:18 PM
পর্ব ৩
বিকেলের আলোটা আজ অদ্ভুত রকমের নরম। রোদের তেজ নেই, তবু আলো আছে—ম্লান, ধুলোমাখা, একটু কুয়াশার মতো ঝাপসা। গলির মুখে দাঁড়িয়ে শামসুর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার সামনে সেই একই পাড়া—দুই পাশে টিনের ঘর, কোথাও রঙ উঠে যাওয়া দেয়াল, কোথাও নতুন করে লাগানো সিমেন্টের প্যাচ। কিন্তু সবকিছুর মাঝেও একটা পরিবর্তনের গন্ধ।
আট বছর আগে সে এই গলি ছেড়েছিল পুলিশের গাড়িতে। সেদিন তার হাতে হ্যান্ডকাফ ছিল, মুখে রক্তের শুকনো দাগ, আর চোখে ছিল একধরনের আগুন। আজ সে ফিরেছে হেঁটে। পায়ে ধুলো, কাঁধে ছোট ব্যাগ, চোখে আগের মতোই তীক্ষ্ণতা—তবে আগুনের জায়গায় এখন ঠান্ডা ধোঁয়া। সেই ধোঁয়া অনেক কিছু ঢেকে রাখে।
মানুষের মুখ বদলে যায়। চুল পাকে, শরীর মোটা হয় বা শুকিয়ে যায়। কিন্তু চোখ বদলায় না। শামসুর জানে—এই পাড়ার মানুষ তার চোখ চিনবে।
প্রথমে কেউ খেয়াল করেনি। রাস্তায় কয়েকজন বাচ্চা ক্রিকেট খেলছিল, বল গিয়ে পড়ল তার পায়ের কাছে। সে ঝুঁকে বল তুলে ছুঁড়ে দিল। বাচ্চারা ধন্যবাদ না দিয়ে শুধু তাকিয়ে রইল। তারপর ফিসফিসানি—
“ওইটা কি…?”
“না রে…?”
“দাঁড়া, দ্যাখ, দাড়িটা কেমন…”
খবর আগুনের মতো ছড়ায়। অল্প সময়েই কয়েকটা দরজা আধখোলা হলো, কয়েকটা জানালার পর্দা সরে গেল। এক মহিলার গলা শোনা গেল—“শামসুর আইছে।”
এই তিনটা শব্দে আট বছরের ইতিহাস, গুজব, ভয়, ঘৃণা আর কৌতূহল একসাথে জড়িয়ে আছে।
পাড়ার জানা গল্প—সে খুন করেছিল। কেন? কার? কীভাবে? এসবের উত্তর কেউ জানে না। কেউ জানতে চায়ও না। মানুষের দরকার শুধু একটা নাম আর একটা অপরাধ। বাকিটা কল্পনা নিজে থেকে বানিয়ে নেয়।
শামসুর ধীরে ধীরে হাঁটে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে তাড়াহুড়ো নেই। যেন সে জানে, এই রাস্তা তাকে এড়াতে পারবে না। চা দোকানের সামনে এসে সে থামে। টিনের চালের নিচে পুরনো কাঠের বেঞ্চ, পাশে একটা ভাঙা কাচের জার, যার ভেতরে বিস্কুট। কেটলিতে চা ফুটছে।
রহিম চাচা চা ছাঁকছেন। তার চুল আগের চেয়ে বেশি পেকে গেছে। মুখে ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু হাতের গতি আগের মতোই অভ্যস্ত। তিনি প্রথমে তাকাননি। কিন্তু যখন দোকানের সামনে একটা ছায়া এসে থামল, তিনি মাথা তুললেন।
দুই জোড়া চোখের মিলন।
কয়েক সেকেন্ড সময় থেমে থাকল। তারপর শামসুর শান্ত গলায় বলল, “চাচা, এক কাপ চা দেন।”
রহিম চাচা হাত থামালেন। খুব সামান্য সময়ের জন্য। তারপর যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে বললেন, “চিনি কম দিব?”
শামসুরের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটল। “আগের মতো।”
এই “আগের মতো” শব্দের ভেতরে আট বছর জমে আছে। আগের মতো মানে কী? আগের মতো চিনি? আগের মতো সম্পর্ক? আগের মতো সম্মান? নাকি আগের মতো ভয়?
চা এগিয়ে দিলেন রহিম চাচা। তাদের হাত এক মুহূর্ত ছুঁয়ে গেল। স্পর্শটা নিরপেক্ষ, কিন্তু ভেতরে অনেক কথা।
পাড়ায় একটা অস্বস্তি নেমে আসে। কারণ অপরাধ করে ফিরে আসা মানুষকে সবাই দেখে—কিন্তু কেউ জানে না কীভাবে আচরণ করতে হয়। দূরে দাঁড়িয়ে কয়েকজন তরুণ ফিসফিস করছে। রকি, যে এই কয়েক বছরে নিজেকে পাড়ার অঘোষিত নেতা ভাবতে শুরু করেছে, সেও দোকানের বিপরীত পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছে। তার চোখে বিরক্তি।
শামসুর চুপচাপ চা খায়। চায়ের ভাপ তার মুখে উঠে গিয়ে মিলিয়ে যায়। সে বলে, “এলাকায় এখন শান্তি আছে তো?”
রহিম চাচা একটু তাকিয়ে থাকেন। তারপর ধীরে বলেন, “শান্তি বাইরে থাকে না। ভেতরে থাকে।”
শামসুর হেসে ফেলে। কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই। “ভেতরটা কেমন আছে, চাচা?”
রহিম চাচা উত্তর দেন না। শুধু চুলায় আরও চা চাপান।
চা শেষ করে শামসুর চলে যায়। কিন্তু তার পায়ের শব্দে বোঝা যায়—সে ফিরে এসেছে থাকতে। শুধু থাকা না, নিজের জায়গা ফেরত নিতে।
এই পাড়ায় পরিবর্তন শুধু শামসুরের ফেরা না। রহিম চাচার জীবনেও গত মাসে বড় পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বিয়ে করেছেন।
প্রথম পক্ষের স্ত্রী পাঁচ বছর আগে চলে গিয়েছিল। কেউ বলেছিল, অন্য কারও সাথে। কেউ বলেছিল, দারিদ্র্য সহ্য করতে পারেনি। রহিম চাচা কাউকে দোষ দেননি। শুধু একদিন দোকানের পেছনে বসে অনেকক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। কেউ তাকে কাঁদতে দেখেনি, কিন্তু তার চোখের লালচে ভাব দেখে সবাই বুঝেছিল—কিছু ভেঙে গেছে।
তারপর তিনি একা থাকতে শিখেছিলেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চা বানানো, বিস্কুট বিক্রি, হিসাব রাখা—এইসবের ভেতর দিয়ে দিন কেটে যেত। কিন্তু রাতের বেলা ঘরে ঢুকলে নীরবতা তাকে গিলে ফেলত।
মানুষ পুরোপুরি একা থাকতে পারে না। সে যতই অভ্যাস করুক, বুকের ভেতর কোথাও একটা ফাঁকা জায়গা থেকে যায়।
এই ফাঁকাটার মাঝেই এল মমতা।
মমতা বিধবা। বয়সে কম। মুখে স্থায়ী লজ্জার ছাপ। তার চোখে একটা সংযত দূরত্ব—যেন সে সবসময় একটু পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। আগের স্বামীর বয়স ছিল প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি। বিয়ের পর যৌবনের রস তো দূর, যৌবনের রঙই দেখতে পারেনি। তিন মাসের মাথায়, এক রাতে সে নেশা করে এসেছিল। রাতটা মমতার জন্য একটু অন্যরকম ছিল। হয়তো এটাই যৌবনের রঙ। হয়তো এটাকে যৌবন বলে। কিন্তু মমতা বুঝতে পারেনি, পরের দিন তার সমস্ত রং মুছে সাদা হয়ে যাবে। ও হ্যাঁ বলা হয়নি, মমতা * ছিল। পাড়ার কিছু শকুনের চোখ এড়াতেই তার এই বিয়ে। বাপের বাড়ি বলতে কোনোকালেই কিছু ছিল না। এ পাড়ায় অবশ্য রহিমের সাথে বিয়ের পর কেউ জানে না যে সে * ছিল। রহিম নিজেই লুকিয়ে রাখতে বলেছিল। পাড়ায় ফিসফাস শুরু হলো—
“এই বয়সে বিয়া?”
“মেয়েটা এত ছোট!”
“চা দোকানদার কই পাইলো?”
রহিম চাচা শুনে শুধু হাসেন। কিন্তু রাতে ঘরে ঢোকার সময় তার বুক ধড়ফড় করে। তিনি জানেন, মানুষের কথা থামে না। কিন্তু ঘরের দরজা বন্ধ হলে দুজন মানুষকে মুখোমুখি হতে হয় নিজেদের সঙ্গে।
প্রথমদিকে মমতা দূরত্ব রেখে চলত। এক বিছানায় দুজন মানুষ, কিন্তু মাঝখানে অদৃশ্য দেয়াল। কথা কম। চোখাচোখি কম।
এক রাতে বিদ্যুৎ ছিল না। ঘর গরম। টিনের ছাদ যেন আগুন হয়ে আছে। মমতা হাতে পাখা নিয়ে বাতাস করছে। তার কপালে ঘাম জমেছে। রহিম চাচা চুপচাপ তাকিয়ে আছেন।
“তোমার কষ্ট হচ্ছে?” তিনি জিজ্ঞেস করেন।
মমতা মাথা নাড়ে। “না।” কিন্তু গলায় কাঁপন।
রহিম চাচার ভেতরে একটা ভয় কাজ করে—তিনি কি এখনও যথেষ্ট? তিনি কি শুধু একজন চা-ওয়ালা? একজন বয়স্ক মানুষ? মমতা কি তাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারবে?
মমতারও ভয় আছে। তার আগের সংসার ছিল কঠিন, রুক্ষ। এখানে মানুষটা নরম। এই নরমত্বে সে অস্বস্তি পায়—কারণ সে অভ্যস্ত না।
সেই রাতে হঠাৎ বৃষ্টি এল। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির শব্দ ছন্দ তুলল। মমতা বলল, “আপনি এত চুপ কেন?”
রহিম চাচা হালকা হেসে বললেন, “চুপ থাকলে শব্দ কম হয়।”
মমতা প্রথমবার খোলা হাসি হাসল। সেই হাসি ঘর ভরিয়ে দিল।
ধীরে ধীরে তাদের মাঝের দেয়াল পাতলা হতে লাগল। রহিম চাচা কখনও তাড়াহুড়ো করেন না। স্পর্শ করার আগে চোখে অনুমতি খোঁজেন। এক রাতে মমতা নিজেই তার হাত ধরল। শব্দ ছিল না। কিন্তু সেই স্পর্শে এতদিনের একাকীত্ব কেঁপে উঠল।
এই স্পর্শে কামনার চেয়ে বেশি ছিল নিরাপত্তা। ছিল স্বস্তি।
এদিকে শামসুর নিজের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করেছে। মুদি দোকানে দাঁড়িয়ে বলছে, “কোনো সমস্যা হলে আমারে বলবেন।” তার আশেপাশে কয়েকটা তরুণ ছেলেপুলে ঘোরে। তাদের চোখে মুগ্ধতা। একজন শক্তিশালী মানুষের পাশে থাকার একটা নেশা আছে।
রকি অস্বস্তিতে। এতদিন সে-ই ছিল পাড়ার অঘোষিত নিয়ন্ত্রক। এখন বাতাস বদলাচ্ছে। দুই ক্ষমতার সংঘর্ষের আগে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।
রাফি দূর থেকে সব দেখে। তার নিজের ভেতরেও ঝড়। চাকরির ইমেইল এসেছে—ইন্টারভিউর জন্য শর্টলিস্টেড। সে কাউকে বলেনি। তার মনে হয়, যদি বলে ফেলে, স্বপ্ন ভেঙে যাবে।
নীলার বাড়িতে সম্বন্ধ এগোচ্ছে। নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবে—পাড়া বদলাচ্ছে। মানুষ বদলাচ্ছে। সে কি পারবে? সে কি নিজের জীবন নিজের মতো বেছে নিতে পারবে?
রাতে রহিম চাচা মমতার পাশে শুয়ে বৃষ্টির শব্দ শোনেন। টিনের ওপর ফোঁটার টুপটাপ। তিনি ভাবেন—এই জীবনে কি সত্যি দ্বিতীয় সুযোগ থাকে?
মমতা ঘুমানোর আগে আস্তে করে তার কাঁধে মাথা রাখে। এই স্পর্শে কোনো দাবী নেই। আছে ভরসা।
বাইরে পাড়ায় গুজব, ভয়, ক্ষমতার খেলা।
ভেতরে—দুজন মানুষের ধীরে ধীরে কাছে আসা।
(চলবে)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Posts: 344
Threads: 3
Likes Received: 398 in 205 posts
Likes Given: 241
Joined: Jul 2025
Reputation:
50
খুব সুন্দর গুছানো লেখা
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
Posts: 53
Threads: 0
Likes Received: 18 in 16 posts
Likes Given: 91
Joined: Sep 2023
Reputation:
0
Khub sundar apnar lekhani.
Waiting for next update
Posts: 1,071
Threads: 0
Likes Received: 511 in 486 posts
Likes Given: 1,135
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
Posts: 55
Threads: 3
Likes Received: 77 in 32 posts
Likes Given: 60
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
06-04-2026, 07:16 PM
পর্ব ৪
রাতটা শুরু থেকেই অস্বাভাবিক ছিল। এমন না যে আকাশে বজ্রপাত হচ্ছিল, বা ঝড় উঠেছিল। বরং উল্টো—আকাশ ছিল পরিষ্কার, চাঁদ আধখানা, তার আলো টিনের চাল আর ভেজা দেয়ালে পড়ে কেমন ফ্যাকাশে সাদা আভা তৈরি করছিল। তবু বাতাসে একটা টান ছিল। যেন কোথাও কিছু জমে আছে। একটা অদৃশ্য স্ফুলিঙ্গ, যা হাওয়ার ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে—কোনো এক মুহূর্তে আগুন ধরাবে।
গলির ভেতর হঠাৎ দৌড়ের শব্দ। তারপর চিৎকার—
“ধর! ধর! চোর!”
শব্দটা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ল, যেন শুকনো খড়ের ওপর আগুন। এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, এক জানালা থেকে আরেক দরজা—মুহূর্তের মধ্যে পাড়া জেগে উঠল। যারা ঘুমাচ্ছিল তারা উঠে বসল, যারা খাচ্ছিল তারা প্লেট ফেলে বেরিয়ে এল। কেউ লাঠি হাতে, কেউ হাতে টর্চ, কেউ শুধু রাগ নিয়ে।
বাপ্পিকে ধরা হয়েছে পাশের গলির আজিম সাহেবের বাড়ির বারান্দা থেকে নামতে গিয়ে। সে নিচে লাফ দিয়েছিল, কিন্তু পা হড়কে পড়ে গেছে। উঠতে না উঠতেই দুই-তিনজন তাকে চেপে ধরেছে। তার গায়ে ধুলো, শার্ট ছিঁড়ে গেছে কাঁধের কাছে, বুক উঠানামা করছে দ্রুত। চোখে আতঙ্ক—শুধু ধরা পড়ার না, আরও গভীর কিছু।
চারদিক থেকে লোকজন ঘিরে ধরেছে। প্রথম চড়টা কে মারল বোঝা গেল না। তারপর যেন নিয়ম হয়ে গেল। একের পর এক থাপ্পড়, লাথি। কেউ চুল ধরে টানছে, কেউ কলার চেপে ধরেছে।
“চুরি করস?”
“এলাকার নাম ডুবাইছিস!”
“এদের না মারলে ঠিক হয় না!”
বাপ্পির ঠোঁট ফেটে গেছে। মুখের কোণে রক্তের সরু রেখা নেমে এসেছে থুতনিতে। সে কাঁপা গলায় বলছে, “ভাই, আমার কথা শোনেন… আমি ইচ্ছা করে করি নাই… আমার মা… আমার মায়ের ওষুধ…”
কিন্তু জনতার কানে তখন যুক্তি ঢোকে না। ভিড়ের রাগ একবার জেগে উঠলে তা যুক্তির ভাষা বোঝে না। রাগেরও একটা নেশা আছে—একসাথে মারার, একসাথে চেঁচানোর, একসাথে বিচার করার নেশা।
রহিম চাচা দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। তার হাতে কেটলি নেই, লাঠিও নেই। শুধু চোখ। সেই চোখে এক ধরনের ক্লান্ত দুঃখ। তিনি জানেন, এই ছেলেটাকে তিনি চেনেন। বাপ্পি ছোটবেলায় তার দোকান থেকে বাকিতে বিস্কুট নিয়ে যেত। হাসত। মাঝে মাঝে চা বানাতে সাহায্য করত। তার বাবার মৃত্যুর পর সে বদলে গেছে—কিন্তু পুরোপুরি না। কোথাও একটা ভাঙা আলো ছিল এখনও।
“পুলিশে দে! অনেক হয়েছে!”
“এরা না মার খাইলে মানুষ হবে না!”
ভিড়ের উত্তেজনা বাড়ছে। বাপ্পি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার কণ্ঠ ভেঙে গেছে। “আমার মা তিনদিন ধরে ঠিকমতো খায় নাই। ডাক্তার বলছে ইনজেকশন লাগবো। টাকা নাই। আমি কী করমু?”
এক মুহূর্তের জন্য ভিড়ের মধ্যে একটা থেমে যাওয়া নিঃশ্বাস। কেউ ফিসফিস করে বলল, “এই ছেলেটা আগে ভালো আছিল…” কিন্তু সেই কণ্ঠ চাপা পড়ে গেল আরেকটা থাপ্পড়ের শব্দে।
ঠিক তখনই শামসুর এল।
সে খুব দ্রুত হাঁটেনি। বরং ধীরে। যেন সে জানত, এই দৃশ্য তার জন্য অপেক্ষা করছে। তার মুখে রাগ নেই, কিন্তু চোখে কঠিন স্থিরতা। সে ভিড় ঠেলে সামনে এল। তার উপস্থিতিতেই যেন একটু নীরবতা নামল।
“থামেন,” সে বলল। কণ্ঠস্বর নিচু, কিন্তু দৃঢ়।
অদ্ভুতভাবে ভিড় একটু থামল। কেউ কেউ হাত নামিয়ে নিল। শামসুর বাপ্পির সামনে দাঁড়াল।
“তুই চুরি করছিস?”
বাপ্পি মাথা নিচু করল। “হ, ভাই… কিন্তু…”
“কিন্তু কী?”
“মা… মা মরতেছে ভাই…”
এই কথাটা বলার সময় তার গলা ভেঙে গেল। যেন লজ্জা, ভয়, অসহায়তা সব একসাথে বেরিয়ে এলো।
শামসুর ভিড়ের দিকে তাকাল। তার চোখ একেকজনের মুখে থামল।
“আজ যদি এই ছেলেটারে পুলিশে দেন, কাল সে জেল থেকে বের হইয়া কী হইবো জানেন? চোর না, ডাকাত হইবো। তখন আপনার বাসায় ঢুকবো, আপনার গলায় ছুরি ধরবো। আজও সময় আছে—এরে মানুষ বানান।”
একজন বলল, “তাহলে ছাইড়া দিমু? চুরি করছে!”
শামসুর কোন উত্তর দেয়নি। শুধু তার অগ্নি চোখ দিয়ে পিছন ফিরে একবার তাকিয়ে দেখেছিল। পুরো পাড়া শান্ত হয়ে গেছিল এক মুহূর্তের মধ্যে।
এদিকে রাফির জীবনে যেন হঠাৎ করেই অন্যরকম একটা আলো ঢুকে পড়ল। অনেকদিন ধরে সে আলো খুঁজছিল—অন্ধকারের ভেতর হাতড়ে হাতড়ে। ব্যাংকের খামটা যখন তার হাতে এলো, প্রথমে সে খুলতেই পারেনি। বুকের ভেতর ধুকপুকানি এত জোরে হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল আশেপাশের মানুষও শুনতে পাচ্ছে। এতবার ব্যর্থ হয়েছে, এতবার “দুঃখিত, আপনি নির্বাচিত হননি” পড়েছে—তার ভেতরে একধরনের ভয় জমে ছিল। আবার যদি না হয়?
তবু খুলল। ধীরে, সাবধানে। সাদা কাগজটা বের করল। প্রথম লাইনে নিজের নাম দেখে তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড সে শব্দগুলো পড়তে পারেনি। তারপর আবার পড়ল। “নিয়োগপত্র”—শব্দটা যেন কাগজ থেকে বেরিয়ে এসে তার বুকের ভেতর বসে গেল।
সে বসে পড়ল খাটে। এতদিনের চেষ্টা, রাত জেগে পড়া, বন্ধুর বিয়েতে না যাওয়া, আত্মীয়দের প্রশ্ন এড়িয়ে চলা—সব একসাথে মাথায় ভিড় করল। তার মনে হলো, এই একটা কাগজ শুধু চাকরি না, একটা পরিচয়। “বেকার রাফি” থেকে “ব্যাংকার রাফি”—এই বদলটা সমাজের চোখে যত বড়, তার নিজের ভেতরে তার চেয়েও বড়।
সে উঠে দাঁড়াল। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের চোখের দিকে তাকাল। একই মানুষ—কিন্তু দৃষ্টি আলাদা। সেখানে ক্লান্তি আছে, কিন্তু তার ভেতর দিয়ে আলো ফুটছে। সে আস্তে করে বলল, “আমি পারছি…” যেন নিজেকেই শুনিয়ে।
তার হাঁটার ভঙ্গি বদলে গেল। কথা বলার সময় কণ্ঠে দৃঢ়তা এল। মনে হচ্ছিল—এখন সে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে পারে, শুধু স্বপ্ন না, পরিকল্পনা করতে পারে।
প্রথমেই তার মনে পড়ল নীলার কথা।
ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কল করবে? নাকি একটু পরে? শেষ পর্যন্ত কল দিল।
“হ্যালো?” নীলার কণ্ঠে স্বাভাবিক কোমলতা।
“চল, আজ বাইরে যাই,” রাফির গলায় চাপা উত্তেজনা।
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। যেন নীলা তার কণ্ঠের ভেতর কিছু পড়ে নিতে চাইছে। “কোথায়?”
“চমক আছে,” সে হেসে বলল।
নীলা খুব বেশি প্রশ্ন করল না। শুধু বলল, “ঠিক আছে।”
সন্ধ্যায় তারা শহরের একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্টে গেল। জায়গাটা খুব সাধারণ। কাঠের টেবিল, সাদা টিউবলাইট, কোণায় একটা কৃত্রিম মানি প্ল্যান্ট। কিন্তু সেদিন সেই সাধারণ জায়গাটাই তাদের কাছে বিশেষ হয়ে উঠল। কারণ তারা শুধু খেতে যায়নি—স্বপ্ন দেখতে গিয়েছিল।
নীলা হালকা নীল সালোয়ার পরেছিল। চুল খোলা, চোখে সামান্য কাজল। রাফি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার চোখে নতুন আত্মবিশ্বাস থাকলেও, নীলাকে দেখলে সে এখনও একটু কেঁপে ওঠে।
“কি?” নীলা হেসে বলল।
“তুমি জানো, আমি আজকে নিজেকে আলাদা লাগতেছে।”
“চাকরি মানুষকে বদলাইয়া দেয়?” তার চোখে দুষ্টু ঝিলিক।
রাফি মাথা নাড়ল। “না। আত্মবিশ্বাস বদলাইয়া দেয়। মনে হচ্ছে—আমি তোমারে কিছু দিতে পারব।”
“আমি তো কিছু চাই না,” নীলা নিচু গলায় বলল।
“চাও। নিরাপত্তা চাও। সম্মান চাও। নিজের মতো করে বাঁচার সুযোগ চাও। আমি চাই—এইগুলো তোমারে দিতে।”
তারা কফির কাপ হাতে অনেকক্ষণ বসে থাকল। ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলল। একটা ছোট্ট বাসা—বড় কিছু না। দুই রুম। বারান্দায় কয়েকটা গাছ। সন্ধ্যায় দুজন একসাথে বসে চা খাবে। ঝগড়া করবে, আবার মিটমাট করবে। খুব সাধারণ জীবন—কিন্তু নিজের।
“আমি চাই তোমারে নিয়ে শান্ত একটা জীবন,” রাফি বলল।
নীলা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “শান্তি কি আমাদের কপালে আছে?”
তার কণ্ঠে ছিল বাস্তবতার ছায়া। তারা দুজনেই জানত—এই ভালোবাসা শুধু তাদের দুজনের না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ, সম্মান, অহংকার।
দূরে কোণার একটা টেবিলে বসে শিউলি তাদের দেখছিল। সে আসলে এখানে এসেছিল তার এক বান্ধবীর সঙ্গে। কিন্তু বান্ধবী চলে যাওয়ার পরও সে বসে রইল। তার চোখ আটকে ছিল রাফির দিকে। রাফির হাসি, হাতের ভঙ্গি, নীলার দিকে ঝুঁকে কথা বলা—সব তার বুকের ভেতর কেমন করে তুলছিল।
সে অনেকদিন ধরে রাফিকে পছন্দ করে। কলেজ থেকে চিনে। কখনও বলেনি। ভাবত, সময় আসবে। একদিন হয়তো রাফি নিজেই বুঝবে। কিন্তু আজ সে বুঝল—সময় অপেক্ষা করে না। কেউ কারও জন্য থেমে থাকে না।
তার ভেতরে হিংসা, কষ্ট, অপমান—সব একসাথে জমল। সে নিজেকে বলল—“আমি কি দোষ করছিলাম?” কিন্তু উত্তর পেল না।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে অনেকক্ষণ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল—সেখানে ভাঙা স্বপ্নের দাগ। হঠাৎ তার মাথায় একটা চিন্তা এল। যদি সে কিছু বলে? যদি সে পরিস্থিতিটা বদলে দেয়?
সন্ধ্যায় কাদের সাহেব বারান্দায় বসে ছিলেন। শিউলি ভদ্রভাবে কড়া নাড়ল।
“কাকা, একটা কথা ছিল…”
কথা শুরু হলো খুব শান্তভাবে। “আমি জানি না বলা ঠিক হইবো কিনা…”—এই ধরনের ভূমিকা দিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে সে বলল—নীলা আর রাফি নিয়মিত দেখা করে, বাইরে যায়, ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করে। “মানুষজন কথা বলতেছে…”—এই কথাটা সে একটু জোর দিয়ে বলল। যেন বিষয়টা শুধু ব্যক্তিগত না, সামাজিক।
কাদের সাহেবের মুখ শক্ত হয়ে গেল। তার ভেতরে বাবা কম, সমাজ বেশি জেগে উঠল। তিনি ভাবলেন—পাড়া কী বলবে? তার মেয়ের নামে কথা উঠবে? তার সম্মান?
তিনি নীলাকে ডাকলেন।
“এইসব কি সত্যি?”
নীলা প্রথমে কিছু বলল না। তার বুক ধড়ফড় করছিল। কিন্তু সে জানত—আজ চুপ থাকলে সে নিজেকেই হারাবে।
“আমি ওরে ভালোবাসি, আব্বা।”
এই স্বীকারোক্তি যেন ঘরে বিস্ফোরণ ঘটাল।
“তোর সাহস কত বড় হইছে?” কাদের সাহেবের গলা কেঁপে উঠল—রাগে, অপমানে, ভয়ে।
তর্ক শুরু হলো। নীলা বলল, “আমি মানুষ। আমার নিজের পছন্দ আছে।”
কাদের সাহেব বললেন, “তোর জীবন মানে আমার সম্মান!”
কান্না, চিৎকার, দরজা ধাক্কা। বাড়ির ভেতর বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা হলো—নীলার বিয়ে সাইফের সাথে ঠিক। সাইফ বিদেশে থাকে, প্রতিষ্ঠিত। “মেয়ের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত”—এই যুক্তিতে সব চাপা পড়ল। নীলার অসম্মতি অগ্রাহ্য। আর বিয়ের আগ পর্যন্ত সে বাইরে যেতে পারবে না।
নীলা নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আকাশে তখন চাঁদ উঠেছে। সে ভাবল—এই আকাশ কি তার? নাকি এটাও নিয়ন্ত্রিত? তার ভালোবাসা কি অপরাধ? তার স্বপ্ন কি এতটাই তুচ্ছ?
ওদিকে রাফি খবরটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। যেন কেউ তার বুক থেকে হাওয়া বের করে দিয়েছে। যে আত্মবিশ্বাস কয়েক ঘণ্টা আগে তাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তা হঠাৎ মাটিতে পড়ে গেল।
সে ভাবল—চাকরি কি সব বদলাতে পারে? টাকা? সম্মান? সমাজের চোখ?
সে আয়নার সামনে আবার দাঁড়াল। একই মানুষ। কিন্তু চোখে এবার আলো কম। সেখানে প্রশ্ন বেশি।
স্বপ্ন দেখা সহজ। স্বপ্ন বাঁচানো কঠিন।
আর ভালোবাসা?
ভালোবাসা শুধু দুজন মানুষের না—অনেক সময় পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নাম।
বাপ্পি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে।
এই খবর শুধু একটা ঘটনা না, একটা পরিচয়।
বাপ্পি যখন বাড়ি ফিরল, তার শরীর ব্যথায় ভরা। মুখ ফুলে গেছে। চোখের কোণে শুকনো রক্ত। সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। তার মা খাটে শুয়ে ছিলেন। শ্বাসকষ্টে বুক উঠানামা করছে ধীরে।
কেউ আগে থেকেই এসে বলে গেছে—“আপনার ছেলে চুরি করতে গিয়া ধরা পড়ছে।”
মায়ের চোখে তখন কী ছিল? অপমান? না কষ্ট? না নিজের ব্যর্থতার বোধ? তিনি ছেলেকে ডাকলেন না। শুধু ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার চোখের কোণে পানি জমল, কিন্তু গড়াল না।
বাপ্পি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মায়ের পাশে। “মা, আমি তোমার জন্যই…”
কিন্তু সব কথা শোনা যায় না। কিছু কথা দেরিতে আসে।
সেই রাতেই তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেল। বাপ্পি পানি ধরল, কাঁদল, ডাক্তার ডাকতে দৌড়াল। কিন্তু ভোরের আগে তিনি চলে গেলেন।
নিঃশব্দে।
বাপ্পি বসে রইল মায়ের নিথর শরীরের পাশে। তার মাথায় একটাই কথা ঘুরছে—সে পুলিশে যায়নি ঠিকই, কিন্তু তার চেয়ে বড় শাস্তি সে পেয়েছে।
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
•
Posts: 55
Threads: 3
Likes Received: 77 in 32 posts
Likes Given: 60
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
04-06-2026, 12:46 AM
(This post was last modified: 04-06-2026, 12:47 AM by Dead people. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
পর্ব ৫
ব্যাংকের ভবনটা বাইরে থেকে খুবই সাধারণ। সাদা রঙের দেয়াল, মাঝখানে কাঁচের দরজা, সামনে ছোট্ট একটা বাগান—দুটো বক্সে মানিপ্ল্যান্ট, পাশে ঝরাপাতা। বাইরে থেকে দেখলে বোঝাই যায় না, ভেতরে কত স্বপ্ন ঢোকে প্রতিদিন, কত হিসাব মেলে, কত জীবন নতুন করে শুরু হয়।
কিন্তু রাফির কাছে এই ভবনটা ছিল শুধু একটা অফিস না—একটা দরজা। পুরোনো জীবন থেকে নতুন জীবনে পা রাখার দরজা।
প্রথম দিন সকালে সে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল বেশ কিছুক্ষণ। সাদা শার্টটা আগের রাতে নিজে ইস্ত্রি করেছে। প্যান্টে ভাঁজ ঠিক আছে কিনা বারবার দেখে নিয়েছে। চুল আঁচড়াতে গিয়ে হাত কেঁপে যাচ্ছিল। সে নিজের বুকের ভেতর শ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল—দ্রুত, ভারী।
সে জানত, আজ থেকে তার পরিচয় বদলাবে। “বেকার” শব্দটা মুছে যাবে। কিন্তু একটা নতুন দায়িত্ব তার কাঁধে চেপে বসবে। সে কি পারবে? সে কি এই নতুন জায়গায় টিকে থাকতে পারবে? নাকি আবারও কোথাও হোঁচট খাবে?
ব্যাংকের কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকার সময় তার মনে হলো, যেন সে কোনো পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকছে। ভেতরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঠান্ডা বাতাস। কাউন্টারে ব্যস্ত মানুষ। কম্পিউটারের শব্দ। একটা পেশাদার পরিবেশ—যেখানে ভুল করলে তা চোখে পড়ে, আর সঠিক করলে তা হিসাবের খাতায় উঠে যায়।
রিসেপশন থেকে তাকে বলা হলো—ম্যানেজমেন্ট অফিসারের কেবিনে যেতে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করল। তারপর নক করল।
ভেতর থেকে ভদ্র, স্থির কণ্ঠ—
“Come in.”
রাফি দরজা খুলে ঢুকল।
চেয়ারে বসে থাকা মানুষটা ফাইল থেকে চোখ তুলে তাকাল।
সাইফ।
মুহূর্তটা যেন থেমে গেল। ঘরের ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। দুই জোড়া চোখ স্থির হয়ে রইল একে অপরের দিকে।
রাফির বুকের ভেতর ধক করে উঠল। সে যেন আবার সেই সন্ধ্যায় ফিরে গেল—যেদিন নীলার বিয়ের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। যেদিন সে শুনেছিল, সাইফই সেই পাত্র। যে ছেলেটা প্রতিষ্ঠিত, ভদ্র, পরিবারের পছন্দের।
সেই মানুষটাই এখন তার সামনে বসে—তার বস হিসেবে।
সাইফের চোখেও প্রথমে বিস্ময় ফুটে উঠেছিল। কিন্তু সে খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। ঠোঁটে হালকা হাসি এনে হাত বাড়িয়ে দিল।
“আপনি রাফি, তাই তো? Welcome.”
কণ্ঠে অদ্ভুত স্বাভাবিকতা। যেন কোনো অতীত নেই। কোনো প্রতিযোগিতা নেই।
রাফির হাত কাঁপছিল, কিন্তু সে হাত বাড়াল।
“জি, স্যার।”
সাইফ একটু হেসে বলল, “স্যার বলবেন না। এখানে আমরা টিম। সাইফ বললেই হবে।”
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—যে মানুষটা তার প্রেমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে-ই এখন তার পেশাগত ভবিষ্যতের দায়িত্বে। প্রথম কয়েকদিন রাফির ভেতরে অস্বস্তি কাজ করছিল। সে প্রতিটা ফাইল ধরার আগে দুবার ভাবত। ভুল করলে কি সেটা ইচ্ছে করে বড় করে দেখা হবে? তার কি চাকরি থাকবে?
মনে হচ্ছিল—যেকোনো মুহূর্তে একটা ঠান্ডা ইমেইল আসবে, “আপনার সেবা আর প্রয়োজন নেই।” কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। সাইফ অদ্ভুতভাবে সহযোগী। ফাইল বুঝিয়ে দেয়, ধৈর্য ধরে ভুল ধরিয়ে দেয়। একদিন তো নিজেই কফির জন্য ডাকল। “রাফি, কফি খাবেন? কাজের ফাঁকে একটু ব্রেক দরকার।” রাফি প্রথমে দ্বিধায় ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝল—এখানে অন্তত সাইফ পেশাদার। ব্যক্তিগত সম্পর্ককে অফিসে টেনে আনছে না।
সাত দিনের মাথায় তাদের মধ্যে অদ্ভুত একটা স্বস্তি তৈরি হলো। কাজের আলোচনা থেকে কথা চলে গেল সিনেমা, বই, জীবনের গল্পে। এক বিকেলে, অফিস প্রায় ফাঁকা। জানালার বাইরে সূর্য ডুবছে। আলো কমে আসছে। সাইফ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে হঠাৎ বলল— “আপনি নীলাকে ভালোবাসেন, তাই না?”
রাফির বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল। প্রশ্নটা সে আশা করেনি। এতদিন ধরে না বলা একটা সত্য হঠাৎ শব্দ হয়ে বেরিয়ে এলো। কয়েক সেকেন্ড সে চুপ। তারপর ধীরে বলল—“হ্যাঁ।”
ঘরটা ভারী হয়ে গেল। সাইফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল- “ও আপনাকে খুব ভালোবাসে। পাগলের মতো।” এই স্বীকারোক্তি রাফিকে আরও অস্বস্তিতে ফেলল। সে বুঝতে পারছিল না—এটা সহানুভূতি, না কোনো অদৃশ্য কৌশল?
তার মাথায় ভয়ংকর কল্পনা জন্মাল—
সাইফ বাইরে হাসছে, ভেতরে প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে।
চাকরি থাকবে না। সম্মান থাকবে না।
সে ভাবতে শুরু করল—
“আমাকে বেছে নিতে হবে। চাকরি? না নীলা?”
কিন্তু সাইফের চোখে শত্রুতা ছিল না। ছিল ক্লান্তি। জটিল, দ্বিধাগ্রস্ত ক্লান্তি। “আমি ওরে বিয়া করতে চাই না,” সাইফ ধীরে বলল। “কিন্তু পরিবার… চাপ… আপনি বুঝবেন।”
¬¬রাফি চুপ করে শুনছিল। জীবনে প্রথমবার সে বুঝল—শত্রু ভাবা মানুষটাও হয়তো নিজের লড়াইয়ে ক্লান্ত।
এদিকে পাড়ায় অন্য এক ঝড় তৈরি হচ্ছিল। বাপ্পির মায়ের জানাজা।
লোক কম। খুব কম। চোরের মায়ের জানাজায় কারো আগ্রহ থাকে না। মানুষ মুখে সহানুভূতি দেখায়, কিন্তু পায়ে রাখে দূরত্ব। কেউ কেউ শুধু কানে ফিসফিস করে—“দুঃখজনক ঘটনা।” কেউ আবার লাজুকভাবে চোখ নামিয়ে চলে যায়। কিন্তু যে সত্যি বোঝে, সে জানে—এই শূন্যতা, এই নিঃসঙ্গতা, তা শুধু মায়ের নয়, পুরো ছেলের জীবনকে ছুঁয়ে গেছে।
রহিম চাচা এসেছিলেন। গম্ভীর মুখ, চোখে দুঃখের রেখা। তিনি জানতেন, মানুষ ঠিক সময়ে আসে, কিন্তু কিছু মানুষ কেবল দেখে—কেউ বোঝে না। নতুন বউ মমতা একটু দূরে দাঁড়িয়ে। মাথায় ওড়না টানা। চোখে লজ্জা, মুখে আতঙ্কের ছায়া। সে জানে, এই চোখগুলো তার প্রতি আগ্রহী, কিন্তু সতর্ক। নতুন জীবন, নতুন দায়িত্ব, নতুন আশঙ্কা—সব একসাথে।
রকি ছিল, কিন্তু অস্বস্তিতে। সে জানে, আজকের দিন তার শক্তি প্রমাণের দিন নয়। এখানে উপস্থিত থাকা শুধু তার প্রভাব বাড়ায় না, বরং তার দুর্বলতাকেও প্রকাশ করে।
আর শামসুর।
মাটি দেওয়ার সময় বাপ্পির চোখ শুকনো। কান্না শেষ হয়ে গেছে। শোকও একসময় শুকিয়ে যায়। তখন শুধু শূন্যতা থাকে। শুধু সেই নিঃশব্দ বাতাস, মৃতদেহের পাশে থাকা ধুলো, এবং মানুষের চোখের অদ্ভুত, বিরক্তিকর দৃষ্টি। কিন্তু শামসুরের চোখ অন্যদিকে।
মমতার দিকে।
সেই দৃষ্টি শিকারীর। হিসাবি। লোভী। যেন সে মানুষ না—একটা সুযোগ দেখছে। সে এই পরিস্থিতি পড়ে চিন্তা করছে, কে কোথায় দুর্বল। তার চোখে আগ্রহ, কৌশল, ধৈর্য। বাপ্পি খেয়াল করেছিল। কিছু বলেনি। কিন্তু ভেতরে একটা আগুন জ্বলল। সেই আগুন ছিল—ভয়, ক্ষোভ, প্রতিরোধের মিশ্রণ।
শামসুর অনেক আগেই রকিকে নিজের দলে টেনেছে। এখন তার দরকার বাপ্পি। একটা ভাঙা ছেলে—যার হারানোর কিছু নেই। যে কাঁদে, কাঁপে, ভয় পায়, কিন্তু প্রয়োজন হলে নিজের অস্ত্র নিজেই ধরতে পারে। শামসুর জানে—বাপ্পির ভেতর সেই আগুন আছে, এবং যখন তা সঠিকভাবে চালু হবে, সে শক্তিশালী হবে।
কয়েকদিন পরের ঘটনা।
রহিম চাচা দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছিলেন। রাতের অন্ধকার হালকা বৃষ্টি নিয়ে এসেছে। রাস্তার পিচ্ছিল মাটিতে বাতাসে ঠান্ডা নরম ঘাম। দরজা আধখোলা। কণ্ঠে কোন শব্দ নেই, শুধু তেমন এক অস্থিরতা।
ভেতরে ঢুকে দেখলেন—শামসুর বসে আছে। মমতার সাথে গল্প করছে। নরম গলায় কথা, মুখে হাসি। এমন হাসি যা মনে হয় তাতেই কোনো ভয় নেই, কোনো বাধা নেই।
মমতার চোখে অস্বস্তি স্পষ্ট। সে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল। যেন চেষ্টা করছে—“আমি কি নিরাপদ?” কিন্তু সেই নির্ভরতা, সেই ভয়—শামসুরে আগ্রহ জন্মাচ্ছিল। তার উপস্থিতি সহজ ছিল না, প্রভাবশালী ছিল।
রহিম ঢুকতেই শামসুর উঠে দাঁড়াল।
“এইদিকে আসছিলাম ভাই, ভাবির সাথে একটু পরিচয় করা দরকার আছিল।”
কথাটা হালকা। ভেতরে বিষ। এমন ভয়, এমন শক্তি—যার মোকাবিলা করা সহজ নয়। রহিমের চোখে অস্বস্তি। ভেতরে ভয়, অপমান, রাগ—সব একসাথে জমল। বুক ভারী। শ্বাস কষ্টকর।
শামসুর বের হওয়ার সময় রহিমের কানে কানে বলল—
“বয়স তো অনেক হইছে ভাই। এই বয়সে বিয়া মাশাল্লাহ ভালোই করছেন। কাল দোকানে গিয়া চাঁদা না পাইলে, মাঝেমধ্যে ভাবির সাথে আইসা গল্প কইরা উসুল কইরা নিবো।”
রহিমের শরীর কেঁপে উঠল। কণ্ঠ হারিয়ে গেছে। কিছু বলতে পারেনি। তার ভেতর ধুয়ে গেছে এক অদ্ভুত বিরক্তি, হঠাৎ টানে ভয়, অপমান। মনে হলো, সময় থমকে গেছে।
এই কথাটা খুব দ্রুত ছড়াল না। কিন্তু বাপ্পির কানে গেল।
রাত গভীর। বাতাসে আর্দ্রতার সাথে এক অদ্ভুত শীত। রহিম চাচার ছোট্ট দোকানের সামনের রাস্তায় আড়ম্বর নেই, শুধু শূন্যতা এবং অস্থিরতা। লাইট ফ্লিকার করছে—একটা অদ্ভুত ছায়া খেলা করছে দেওয়ালে।
শামসুর দাঁড়িয়ে আছে। পাশে রকি। ধূসর রাতের আলোয় শামসুরের মুখ অদ্ভুতভাবে দৃঢ়, চোখে অদ্ভুত স্বচ্ছ, কণ্ঠে আভা—কঠোর এবং নির্ধারিত। রকির চেয়ে সে আরও বড়। সে জানে, প্রতিটি মুহূর্তই তার নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা। সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে মিশছে, চকচকে রোদ বা ফ্ল্যাশ নেই, শুধু রাতের নীরবতা আর সিগারেটের সাদা লম্বা রেখা। বাপ্পি এগিয়ে আসে। চোখ লাল। চোয়াল শক্ত। সে জানে—এই রাত তার জীবনের মোড়। শ্বাস নিয়েছে, পায়ের তলায় শক্তি।
“আপনি ভাবির নাম নিয়া কথা কইছেন কেন?”—কণ্ঠে কম্পন, কিন্তু ভয় লুকানো নেই।
শামসুর ঠোঁট বাঁকাল। চোখে ঝলক—“তোর সমস্যা কী?”
বাপ্পি হালকা পিছনে হেলান, কিন্তু ভেতরের ঘৃণা তাকে থামতে দিচ্ছে না।
“আমি খারাপ হইছি ঠিক, কিন্তু ওই মানুষগুলা আমার।” শব্দগুলো বাতাসে ভেসে যায়, কিন্তু বোঝা যায়—ভয়, প্রতিরোধ, আবেগ সব মিশে আছে।
কথা থেকে ধাক্কা। ধাক্কা থেকে হাতাহাতি। রকি ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার চোখে আতঙ্ক। সে জানে—শামসুরের সাথে সে খেলতে পারবে না। কিন্তু বাপ্পি? সে শক্ত। সে ক্ষোভে পূর্ণ। তিনজনের ধস্তাধস্তি শুরু হলো। চেয়ার উল্টে গেল, কাঁচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল। রক্তের গন্ধ বাতাসে মিশে গেছে। বাপ্পির হাতে একটা ছোট ছুরি ছিল—ভয় দেখানোর জন্য, আর শূন্যতার ভেতর লুকানো প্রহরের মতো। সে রকির দিকে ছুড়ে মারল।
রকি সরে গেল, হাত কাঁপছে। এক মুহূর্ত। ছুরিটা… ঠিক সোজা চলে গেল। শামসুরের চোখের ভেতর দিয়ে। সবকিছু থেমে গেল। কোনো নাটকীয় শব্দ না। শুধু ভারী শরীরের ধপ করে পড়া। রক্ত। চোখ। নীরবতা। শামসুর মাটিতে পড়ে রইল। নিঃশ্বাস নেই। রকি দৌড় দিল। অন্ধকার গলি তাকে গিলে ফেলল। বাপ্পি দাঁড়িয়ে। হাত কাঁপছে। চোখ বিস্ফারিত। মনে হচ্ছে সময় থমকে গেছে। সে বুঝতে পারছে না—সে কী করেছে। তার ভেতরে ভয়, লজ্জা, পাপের বোঝা একসাথে জেগে উঠেছে।
পাড়ায় বাতাস কেঁপে উঠল। লোক জড়ো হতে শুরু করল। ফিসফিস। চিৎকার। “কী হলো?” “কেন?” “ছুরি!” সবাই ভয়, বিস্ময়, উত্তেজনার মিশ্রণে ভেসে যাচ্ছে। পুলিশ এসেছে। হঠাৎ আলো। রেড ব্লুজ ফ্ল্যাশ। ব্যারিকেড। লোকেরা ধীরে ধীরে সরিয়ে নেয় রাস্তা। কেউ কানে ফিসফিস করে—“এই কি সত্যি? শামসুর?” কেউ চোখ নামিয়ে তাকায়, কেউ মাথা নাড়ে।
রহিম চাচা সব দেখেছেন। মুখ গম্ভীর, চোখে অশ্রু, ভেতরে অজানা ব্যথা। সে জানে—এই রাত তার জীবন পরিবর্তন করেছে। বাপ্পি মাথা নিচু করে বলল— “আমি পালামু না।”
তার কণ্ঠে ক্লান্তি। আত্মসমর্পণ। শুধু একটি সত্যি শব্দ—“আমি।” ভয়, দায়িত্ব, ভুল, পাপ—সব মিলিয়ে।পুলিশ তাকে নিয়ে গেল। পড়ে থাকা রক্ত, ভাঙা কাচ, ছিঁড়ে যাওয়া চেয়ার—সবই রাতের স্মৃতি হয়ে রইল।
পাড়ায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছে। যে বাপ্পি রহিমের সংসার বাঁচাতে শামসুরকে মারল— রহিম কি আদালতে সত্য বলবে? নাকি বলে দেবে—বাপ্পি ইচ্ছা করে হত্যা করেছে? তার সামনে দুই পথ।
সত্য।
না হয় ঋণ শোধ।
(চলবে...)
[As a writer, I sincerely apologize to everyone. I had my semester finals recently, so I suddenly stopped updating the story. I hope from now the story will be going on without any interruption. Please stay with me and keep supporting.]
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Posts: 55
Threads: 3
Likes Received: 77 in 32 posts
Likes Given: 60
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
08-06-2026, 12:15 AM
পর্ব ৬
আদালত চত্বরের বাতাসে একধরনের অদ্ভুত ক্লান্তি লেগে থাকে—যেন এই জায়গাটা বছরের পর বছর ধরে মানুষের দুশ্চিন্তা, ভয়, আশা আর হতাশা নিজের ভেতরে জমিয়ে রেখেছে। পুরনো লালচে ইটের দালানগুলো দূর থেকে দেখলে যেন স্থির মনে হয়, কিন্তু কাছে এলে বোঝা যায়—এদের দেয়ালের ভেতর কত মানুষের গল্প আটকে আছে। কোথাও হাহাকার, কোথাও স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস, কোথাও আবার নীরব পরাজয়।
সকালের রোদ তখন ধীরে ধীরে উঠছে। আদালত ভবনের দেয়ালে সোনালি আলো পড়ে আবার সরে যাচ্ছে। করিডোরে ভিড় বাড়ছে ধীরে ধীরে। কেউ ফাইল হাতে দ্রুত হাঁটছে, কেউ বেঞ্চে বসে মাথা নিচু করে অপেক্ষা করছে। কিছু মানুষ বারবার ঘড়ি দেখছে। কারও মুখে টানটান উৎকণ্ঠা, আবার কারও চোখে হালকা স্বস্তি—হয়তো আজ তাদের মামলার একটা ভালো খবর আছে।
কিন্তু সেদিন চত্বরটায় যারা ছিল, তাদের মধ্যে কয়েকজনের ভেতরে চলছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম এক অস্থিরতা।
বাপ্পির মামলার বিচার শুরু হয়েছে।
সকালের দিকে নীলা আর শিউলি আদালত চত্বরে এসে দাঁড়িয়েছিল। আসলে তাদের এখানে থাকার খুব একটা প্রয়োজন ছিল না। তারা এই মামলার সাক্ষী নয়, আইনের চোখে সরাসরি জড়িতও নয়। তবু তারা এসেছে। কারণ মানুষের জীবনে কিছু ঘটনা থাকে যেগুলো থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। নিজের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও সেই ঘটনার ভার যেন নিজের বুকেও এসে পড়ে।
শিউলি আদালতের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকাচ্ছিল। তার চোখে কৌতূহল আর অস্বস্তির মিশ্র ছায়া। সে ছোটবেলা থেকে তার বাবাকে অনেকবার আদালতে যেতে দেখেছে, কিন্তু এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে পুরো পরিবেশটা দেখার সুযোগ খুব কমই হয়েছে। আজ যেন সবকিছু নতুন করে অনুভব করছে।
তার পাশে নীলা দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু নীলাকে আজ অন্যরকম লাগছে। কয়েকদিনের মধ্যে যেন মেয়েটা অনেক বদলে গেছে। তার চোখে ঘুম নেই, মুখে অদ্ভুত এক নীরবতা। মাঝে মাঝে সে দূরে কোথাও তাকিয়ে থাকে, যেন তার মাথার ভেতরে একসাথে অনেকগুলো চিন্তা ঘুরছে।
শিউলি একবার তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি ঠিক আছো?”
নীলা একটু দেরি করে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ… আছি।”
কিন্তু তার কণ্ঠে এমন একটা ফাঁপা শূন্যতা ছিল, যা শুনলে সহজেই বোঝা যায়—সে ঠিক নেই।
আজকের দিনটা শুধু বাপ্পির মামলার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়। নীলার নিজের জীবনেও যেন একটা অদ্ভুত অনিশ্চয়তা জমে আছে। তার বাবার সিদ্ধান্ত—সাইফের সাথে তার বিয়ে—এখনও ঝুলে আছে। অথচ তার মন অন্য জায়গায় আটকে আছে।
রাফির কাছে।
শিউলির বাবা মাসুদ রহমান আজ বাপ্পির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। আদালতের করিডোর দিয়ে যখন তিনি ভেতরে ঢুকছিলেন, তখন তার পরনে ছিল সেই পরিচিত কালো কোট। এই পোশাকটা পরলেই মানুষটা যেন বদলে যায়। সাধারণ অবস্থায় তিনি খুব সহজ মানুষ—হালকা হাসি, মোলায়েম কথা। কিন্তু আদালতের ভেতরে ঢুকলেই তার চোখে একধরনের কঠোর মনোযোগ চলে আসে।
আজও ঢোকার আগে তিনি একবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলি আর নীলার দিকে তাকালেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার মুখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
সেই হাসিতে আশ্বাস ছিল। আবার অদ্ভুত এক ক্লান্তিও ছিল।
কারণ তিনি জানেন—এই মামলা সহজ না।
বেলা বাড়তে লাগল।
আদালত চত্বরের ভিড়ও বাড়তে লাগল। চা-ওয়ালার দোকানে লোকজন জমছে, কেউ সিগারেট ধরাচ্ছে, কেউ দাঁড়িয়ে গল্প করছে। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যেও নীলা আর শিউলি যেন আলাদা একটা দ্বীপের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
ঠিক দুপুরের দিকে আদালত চত্বরের ভিড় একটু অন্যরকম হয়ে ওঠে। সকালের তাড়াহুড়োটা তখন ধীরে ধীরে কমে এসেছে, কিন্তু ক্লান্তি জমতে শুরু করেছে মানুষের মুখে। রোদ একটু তীব্র হয়েছে। পুরনো ভবনের দেয়ালে আলো পড়ে যেন গরম হয়ে উঠেছে চারপাশ।
এই সময়েই হঠাৎ গেটের বাইরে একটা মোটরসাইকেলের শব্দ শোনা গেল। আদালতের ভিড়ের মধ্যে মোটরসাইকেলের শব্দ খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়, তবু শব্দটা যেন একটু বেশি স্পষ্ট লাগল।
গেটের সামনে এসে মোটরসাইকেলটা ধীরে থামল।
হেলমেট পরা দুজন মানুষ নামল।
রাফি আর সাইফ।
দুজনেই অফিস থেকে সরাসরি এসেছে। তাদের পোশাকেই বোঝা যায়—সকালের কাজ শেষ করেই তাড়াহুড়ো করে এখানে এসেছে। রাফির শার্টের হাতা একটু গুটানো, কপালে হালকা ঘাম। সাইফের মুখেও ক্লান্তি আছে, কিন্তু সে সেটা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
রাফি প্রথমে হেলমেট খুলল। তারপর চারপাশে তাকাল। তার চোখ যেন কাউকে খুঁজছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে নীলাকে দেখতে পেল। গেটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে নীলা আর শিউলি। দূর থেকেই বোঝা যায়—ওরা অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে। নীলাকে দেখার মুহূর্তে রাফির চোখে এক ঝলক কোমলতা ফুটে উঠল। সেটা খুব ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু লুকোনো গেল না। সে দ্রুত এগিয়ে গেল।
রাফি- “সকাল থেকে আছো?”
নীলা একটু ধীরে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ।”
তার কণ্ঠে খুব বেশি আবেগ নেই। কিন্তু সেই সংক্ষিপ্ত উত্তরের মধ্যেও ক্লান্তি ছিল। রাফি আর কিছু বলতে চাইল। মনে হচ্ছিল তার ভেতরে অনেক কথা জমে আছে। কিন্তু চারপাশে এত মানুষ, আদালতের গেট, পুলিশের আনাগোনা—এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যক্তিগত কথা বলা যায় না। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। এদিকে সাইফ মোটরসাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে হালকা হাসি নিয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার চোখে একটা অদ্ভুত শান্ত ভাব ছিল। সে এগিয়ে এসে বলল, “তোমরা কি কিছু খেয়েছো?”
শিউলি মাথা নাড়ল। “খাওয়ার কথা মাথায়ই ছিল না।”
সাইফ নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল। “এইভাবে কেউ আদালতে আসে?”
তার কণ্ঠে হাসি ছিল, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে যেন অন্য কিছু লুকিয়ে আছে। হয়তো সে ইচ্ছে করেই পরিবেশটা একটু হালকা করতে চাইছিল। কিন্তু কেউই তেমন হাসল না। চারপাশের বাতাসেই যেন একটা চাপা ভার।
কিছুক্ষণ পরে সাইফ বলল, “চলো, চা খাই।”
কথাটা এমনভাবে বলল যেন এটা খুব স্বাভাবিক একটা প্রস্তাব। কিন্তু রাফি একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল না—নীলাকে রেখে সে যাবে কি না। এই কয়েকদিনে নীলার সাথে তার সম্পর্কটা অদ্ভুতভাবে জটিল হয়ে গেছে। কথা বলতে গেলেই মনে হয় কিছু একটা আটকে আছে। ঠিক তখন সাইফ যেন ইচ্ছে করেই বলল, “তুমি থাকো। আমি শিউলিকে নিয়ে যাই।”
শিউলি সঙ্গে সঙ্গে অবাক হয়ে তাকাল। “আমি কেন যাব?”
সাইফ- “কারণ তুমি না গেলে আমি একা চা খাব।” তার কণ্ঠে এমন স্বাভাবিকতা ছিল যে না বলাটা অদ্ভুত শোনাত। শিউলি কয়েক সেকেন্ড নীলার দিকে তাকিয়ে রইল। নীলা কিছু বলল না। শেষ পর্যন্ত শিউলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাইফের সাথে হাঁটতে শুরু করল। আদালতের গেট থেকে একটু দূরে একটা পুরনো চা-দোকান আছে। কাঠের বেঞ্চ, টিনের ছাউনি। সেখানেই তারা হাঁটতে লাগল।
হাঁটতে হাঁটতে শিউলি হঠাৎ বলল, “তুমি ইচ্ছে করে ওদের একা রেখে দিলে।”
সাইফ কিছুক্ষণ চুপ করে হাঁটতে লাগল।তার মুখে কোনো বিরক্তি নেই। কিছুটা দূরে গিয়ে সে বলল, “খারাপ কি?”
শিউলি ভ্রু কুঁচকাল। “তোমার সাথে নীলার বিয়ে ঠিক।”
এই কথাটা শোনার পর সাইফ থেমে গেল। চা-দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সে কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না। চা-ওয়ালা কাপ এগিয়ে দিল। সাইফ কাপটা হাতে নিল। গরম চা থেকে ধোঁয়া উঠছে। সে অনেকক্ষণ সেই ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব ধীরে বলল, “সব ঠিক মানেই সব ঠিক হয় না।”
শিউলি প্রথমে বুঝতে পারল না। “মানে?”
সাইফ হালকা হাসল। কিন্তু সেই হাসির ভেতরে একটা ক্লান্তি ছিল।
“কিছু সিদ্ধান্ত বাইরে থেকে খুব ঠিক মনে হয়। কিন্তু ভেতরে… ঠিক না।”
শিউলি এবার আর কিছু বলল না। তার মনে হল—এই মানুষটা হয়তো নিজের ভেতরে এমন একটা লড়াই লড়ছে, যার কথা সে কাউকে বলতে পারছে না।
এদিকে আদালতের ভেতরে শুনানি শুরু হয়ে গেছে। বড় কোর্টরুমের ভেতরে মানুষে ভরা। কাঠের বেঞ্চগুলোতে বসে আছে বিভিন্ন মামলার লোকজন। কোথাও চাপা ফিসফাস, কোথাও আইনজীবীদের তর্ক। বাপ্পিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। কয়েকদিন আগেও যে ছেলেটা পাড়ায় দাপিয়ে বেড়াত, হাসত, ঝগড়া করত, রাগ করত—আজ সে যেন অন্য মানুষ। তার চোখের নিচে গভীর কালি পড়েছে। মুখ শুকনো। দাড়ি এলোমেলোভাবে গজিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বদলে গেছে তার চোখ। সেখানে আর আগের মতো বেপরোয়া আগুন নেই। বরং আছে এক ধরনের ক্লান্ত স্বীকারোক্তি। মনে হচ্ছে—সে বুঝে গেছে, তার জীবন এখন আর আগের জায়গায় নেই। তার সামনে এখন একটা দীর্ঘ অন্ধকার পথ। তবু সে পালায়নি।
সে দাঁড়িয়ে আছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে শুরু করলে আদালতের করিডোরে একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। এই সময় মানুষজন একটু কমে যায়। যারা সকাল থেকে অপেক্ষা করছিল তাদের কেউ কেউ চলে যায়, কেউ বেঞ্চে বসে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। করিডোরের এক কোণে রহিম চাচা বসে ছিলেন। তার মাথা নিচু। গত কয়েকদিনে মানুষটা যেন হঠাৎ বুড়ো হয়ে গেছে। চা-দোকানের সেই হাসিখুশি মানুষটাকে এখন চেনাই কঠিন। তার দোকান এখন প্রায় বন্ধই থাকে। সন্ধ্যার আড্ডা নেই, হাসি নেই, কাপে কাপে চায়ের শব্দ নেই। শুধু খালি বেঞ্চ। ঠিক তখনই মাসুদ রহমান এসে তার সামনে দাঁড়ালেন। তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন, “রহিম ভাই, একটু কথা ছিল।”
রহিম চাচা মাথা তুললেন। তার চোখে ভয় আর দ্বিধা। মাসুদ রহমান পাশে বসে বললেন, “আপনি ঘটনাটা সামনে থেকে দেখেছেন।” রহিম চাচা কিছু বললেন না। করিডোরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
মাসুদ রহমান শান্ত কণ্ঠে বললেন, “আপনি যদি সত্যি বলেন, বাপ্পি হয়তো বাঁচবে।”
রহিম চাচা ধীরে বললেন, “আমি গরিব মানুষ সাহেব। আমার একটা দোকান। ওইটাই আমার সব।”
- “আমি জানি।”
- “শামসুরের লোকজন আছে।”
কথাটা বলেই তিনি চারদিকে তাকালেন। যেন দেয়ালও শুনে ফেলতে পারে। মাসুদ রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আপনি কি জানেন বাপ্পি কেন রেগে গিয়েছিল?”
এই প্রশ্ন শুনে রহিম চাচার চোখের সামনে হঠাৎ সেই বিকেলের দৃশ্য ভেসে উঠল। শামসুর বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কুৎসিত হাসি দিয়ে বলছে—“কাল দোকানে চাঁদা না পাইলে ভাবির সাথে আইসা গল্প কইরা উসুল করমু।” কথাটা মনে পড়তেই রহিম চাচার বুকের ভেতর আবার আগুন জ্বলে উঠল। তিনি খুব ধীরে বললেন, “সে শুনেছিল।”
মাসুদ রহমান জিজ্ঞেস করলেন, “তারপর?”
- “তারপর ঝগড়া।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ। তারপর মাসুদ রহমান বললেন, “আপনি যদি সত্যি বলেন, এটা প্রমাণ হবে—এটা পরিকল্পিত খুন না।”
রহিম চাচা নিচু গলায় বললেন,- “কিন্তু আমি যদি বলি… আমার সংসার কে বাঁচাবে?”
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। মাসুদ রহমান অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর ধীরে বললেন, “কিছু সাক্ষী আদালতের জন্য না… নিজের বিবেকের জন্য দেয়।” এই কথা বলে তিনি উঠে চলে গেলেন। রহিম চাচা বেঞ্চে বসে রইলেন। তার মাথার ভেতর তখন যুদ্ধ চলছে। একদিকে ভয়। অন্যদিকে ঋণ। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সত্য।
বিকেলের দিকে আদালতের কাজ শেষ হল। আজ কোনো সিদ্ধান্ত হল না। পরের তারিখ পড়েছে। বাইরে বেরিয়ে চারজন আবার একসাথে হাঁটতে লাগল—নীলা, রাফি, শিউলি আর সাইফ। আকাশ তখন ধীরে ধীরে মেঘে ঢেকে যাচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সাইফ বলল,- “মানুষ মাঝে মাঝে ভুল মানুষকে বিয়ে করে ফেলে।”
শিউলি তাকাল।- “মানে?”
সাইফ হালকা হাসল।- “কিছু না।” কিন্তু তার মাথার ভেতর তখন একটা সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সে জানে— এই বিয়ে হলে কেউ সুখী হবে না। দূরে আকাশে কালো মেঘ জমছে। মনে হচ্ছে ঝড় আসবে। কিন্তু সেই ঝড় শুধু আকাশে নয়। মানুষের জীবনেও আসতে চলেছে। পরের তারিখে আদালত আবার বসবে।
(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Posts: 1,071
Threads: 0
Likes Received: 511 in 486 posts
Likes Given: 1,135
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
Posts: 55
Threads: 3
Likes Received: 77 in 32 posts
Likes Given: 60
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
পর্ব ৭
রাত অনেকটাই নেমে এসেছে। পাড়ার দোকানপাট একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। দিনের শেষে যে সামান্য শব্দগুলো চারদিকে ভেসে থাকে—কোথাও থালা ধোয়ার শব্দ, কোথাও দূরের কোনো বাড়িতে টিভির আওয়াজ, কোথাও কোনো বাচ্চার কান্না—সেগুলোও ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে। রাস্তার বাতিগুলো কুয়াশার মতো ম্লান আলো ছড়িয়ে রেখেছে চারদিকে। আলো আছে, কিন্তু শক্ত নয়; যেন অন্ধকারের সাথে লড়াই করার শক্তিটুকুও তাদের নেই। এই সময়টায় সাধারণত এই এলাকায় আর তেমন কেউ থাকে না। দিনের ব্যস্ততা শেষ হলেই সবাই দ্রুত বাড়ি ফিরে যায়।
কিন্তু রহিম চাচা এখনো তার ছোট্ট দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। দোকানটা খুব বড় কিছু নয়—টিনের ছাউনি, সামনে কাঠের বেঞ্চ, একটা পুরোনো চুলা আর কাচের বয়ামে রাখা বিস্কুট। তবুও এই ছোট দোকানটাই তার পুরো পৃথিবী। এখানেই তার দিনের শুরু, এখানেই দিনের শেষ। তিনি টিনের ঝাঁপটা ধীরে ধীরে নামিয়ে তালা লাগাচ্ছেন। কাজটা খুবই সাধারণ, বছরের পর বছর ধরে প্রতিদিনই তিনি এই কাজটা করে আসছেন। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যেন এই সাধারণ কাজটাও একটু বেশি সময় নিচ্ছে। তালাটা লাগিয়ে আবার টেনে দেখেন, আবার লাগান, আবার একটু দাঁড়িয়ে থাকেন। যেন ঝাঁপটা বন্ধ হলেই তাকে একা একটা অন্ধকার রাস্তা ধরে হাঁটতে হবে, আর সেই অন্ধকারে কি অপেক্ষা করছে তিনি জানেন না।
কিছুদিন আগেও এই দোকানটা সন্ধ্যার পর সবচেয়ে জমজমাট জায়গা ছিল। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠত, বেঞ্চে বসে মানুষ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করত, ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে চিৎকার করত। কেউ হেসে উঠত, কেউ গালাগালি করত, আবার পাঁচ মিনিট পর সবাই একই কাপ থেকে চা খেত। সেই আড্ডাগুলোর মাঝখানে বাপ্পি সবসময় থাকত। ছেলেটা যেন এই দোকানের প্রাণ ছিল। চা বানাতে বানাতে সে খদ্দেরদের সাথে গল্প করত, কারো সাথে তর্ক লাগলে গলা চড়িয়ে বলত—“এইটা কিন্তু ভুল কইতেছেন চাচা!” আবার একটু পরে নিজেই হেসে ফেলত। রহিম চাচা মাঝে মাঝে মজা করে বলতেন, “তুই যদি একটু কম ঝামেলা করতি, দোকানটা একদিন তোকে দিয়ে দিতাম।” বাপ্পি হেসে বলত, “তাহলে তো আপনি বেকার হয়ে যাবেন চাচা।”
কিন্তু সেই হাসিগুলো এখন যেন অন্য জীবনের গল্প। শামসুর মারা যাওয়ার পর থেকে পাড়াটা অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। আগে রাত হলেই কোথাও না কোথাও ঝগড়া, মোটরসাইকেলের গর্জন বা চিৎকার শোনা যেত। এখন সেসব নেই। অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এসেছে। কিন্তু সেই নীরবতা শান্তির না—বরং আরও ভয়ের। কারণ সবাই জানে, গল্পটা এখনো শেষ হয়নি। বাপ্পি এখন জেলে। যে ছেলেটা একসময় এই দোকানে বসে চা বানাত, সেই ছেলেটাই এখন খুনের আসামি। মাঝে মাঝে রহিম চাচা ভাবেন—ঘটনাটা কি সত্যিই এমন হওয়ার কথা ছিল? বাপ্পি কি সত্যিই খুনি? নাকি সে শুধু একটা ভুল মুহূর্তে ভুল জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল?
তালা লাগিয়ে তিনি ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করলেন। বাড়ি খুব দূরে নয়, তবুও এখন এই পথটা অদ্ভুতভাবে দীর্ঘ মনে হয়। গলির মুখে ঢুকতেই তিনি টের পেলেন বাতাসটা যেন একটু ভারী। ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এল—“কেমন আছেন রহিম চাচা?” কণ্ঠটা শুনেই তার বুকটা কেঁপে উঠল। তিনি থেমে গেলেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা ছায়া বেরিয়ে এল। রকি।
যে ছেলেটা শামসুর মারা যাওয়ার রাতেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল।
রহিম চাচার গলা শুকিয়ে গেল। রকি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল। তার মুখে একটা ঠান্ডা হাসি। হঠাৎ সে খুব দ্রুত এগিয়ে এসে রহিম চাচার তলপেটে একটা ছুরি ঠেকিয়ে দিল। ধাতব ঠান্ডা স্পর্শে রহিম চাচার শরীর কেঁপে উঠল।
“ভয় পাবেন না চাচা,” রকি ফিসফিস করে বলল। “এখনো কিছু করিনি।”
তার চোখের দৃষ্টি ছিল ভয়ঙ্কর ঠান্ডা। যেন কোনো আবেগ নেই সেখানে। সে খুব ধীরে বলল, “একটা কথা বলতে এসেছি। আদালতে কি বলবেন, সেটা ভালো করে ভেবে বলবেন।”
রহিম চাচা কিছু বললেন না। তার বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা এত জোরে ধকধক করছিল যে মনে হচ্ছিল রকি হয়তো শুনতে পাচ্ছে।
রকি বলল, “যদি বলেন বাপ্পি শামসুর ভাইকে মেরেছে—তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু যদি বাপ্পিকে বাঁচানোর জন্য মিথ্যা বলেন…”
সে ছুরিটা একটু চাপ দিল।
“তাহলে কিন্তু ভালো হবে না।”
তারপর যেন হঠাৎ কিছু মনে পড়ল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “শুনেছি আপনার বউ মা হতে চলেছে।”
এই কথাটা শুনে রহিম চাচার বুকটা ধক করে উঠল। মমতা দুইদিন আগে খুব লজ্জা আর আনন্দ নিয়ে তাকে বলেছিল—“তুমি বাবা হতে যাচ্ছো।” সেই মুহূর্তে রহিম চাচার মনে হয়েছিল, জীবন হয়তো আবার একটু ভালো হতে পারে। কিন্তু এখন সেই খবরটাই যেন ভয় হয়ে দাঁড়াল।
রকি ঠান্ডা গলায় বলল, “নতুন বাচ্চা আসবে। সুন্দর সংসার। তাই না চাচা?”
তারপর ফিসফিস করে বলল, “সাবধানে কথা বলবেন আদালতে।”
রকি ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। রহিম চাচা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরছে—সত্য বলবেন, না সংসার বাঁচাবেন?
ঠিক সেই সময় শহরের অন্য প্রান্তে একেবারে অন্য এক সকাল শুরু হচ্ছিল। ঢাকার ধানমন্ডির এক পুরোনো কিন্তু অভিজাত বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সাইফ রহমান। বাড়িটার সামনে একটা বড় আমগাছ, ভোরের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে বারান্দায় পড়ছে। সাইফের হাতে একটা কফির মগ, কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে গেছে সে সেটা খায়নি। সে যেন কফির স্বাদও টের পাচ্ছে না। তার চোখ আকাশের দিকে, কিন্তু মন অন্য কোথাও।
সাইফ রহমান ছোটবেলা থেকেই একটু আলাদা ধরনের ছেলে ছিল। তার বাবা রাশেদ রহমান ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা—কঠোর নিয়মানুবর্তী মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন জীবনে সফল হতে হলে নিয়মই সবচেয়ে বড় শক্তি। সকাল ছয়টায় ঘুম থেকে ওঠা, নিয়ম করে পত্রিকা পড়া, সময়মতো অফিস, সময়মতো খাবার—সবকিছু নির্দিষ্ট। তিনি কখনো খুব বেশি আবেগ দেখাতেন না। সাইফ যখন কলেজে প্রথম হয়েছিল, তখন তিনি শুধু বলেছিলেন, “ভালো করেছো। কিন্তু আরও ভালো করতে হবে।”
অন্যদিকে সাইফের মা সুলতানা রহমান ছিলেন একেবারে অন্যরকম মানুষ। নরম, আবেগী, পরিবারের প্রতি ভীষণ যত্নশীল। সাইফ ছোটবেলায় অসুস্থ হলে তিনি রাত জেগে বসে থাকতেন। মাঝরাতে ছেলেটা ঘুম ভেঙে গেলে তাকে কোলে বসিয়ে গল্প বলতেন। এই দুই ভিন্ন স্বভাবের মানুষের মাঝেই সাইফ বড় হয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই সে খুব শান্ত ছিল। অন্য বাচ্চাদের মতো খুব হৈচৈ করত না। কলেজে তার খুব বেশি বন্ধু ছিল না, কিন্তু তার ফলাফল সবসময় ভালো ছিল। শিক্ষকরা বলতেন—ছেলেটা খুব চিন্তাশীল।
সাইফের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বছরটা খুব শান্ত, স্বাভাবিক, এমনকি রুটিনময়ই বলা যায়। সে ছিল চুপচাপ, মিতভাষী, নিজের মধ্যে ডুবে থাকা ধরনের ছেলে। ক্লাস করে, লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ে, তারপর বাসায় ফিরে যেত—জীবন যেন একধরনের স্বাভাবিক ছন্দে চলছিল। বন্ধু ছিল, কিন্তু খুব ঘনিষ্ঠ কেউ না। মানুষজন তাকে ভদ্র, শান্ত, একটু দূরের মানুষ হিসেবেই চিনত। যেন তার চারপাশে অদৃশ্য কোনো দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে, যা তাকে বাইরে থেকে দেখা হলেও স্পর্শ করা যায় না।
আরিবার সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল এক বিকেলের লাইব্রেরিতে। বৃষ্টি পড়ছিল, জানালার কাঁচে ফোঁটা পড়ার শব্দ বাতাসে মিশে গিয়েছিল। সাইফ কোণের একটি টেবিলে বসে একটি মোটা বই পড়ছিল। খোলা নোটবুক, কলম হাতে, কিন্তু তার মন পুরোপুরি বইয়ের ভেতরে হারিয়ে গেছে। হঠাৎ কেউ এসে তার টেবিলের সামনে দাঁড়াল। “একটু বসতে পারি?” কণ্ঠটা মিষ্টি, আর হাসিটা স্বাভাবিক। সাইফ অবাক হয়ে মাথা নাড়ল। “জি… বসুন,” বলল সে।
মেয়েটির নাম আরিবা। ভিজে চুল, চোখে ক্লান্তি, মুখে উজ্জ্বলতা—সবকিছুই এমন যেন সাইফের শান্ত জীবনটাতে হঠাৎ আলো ঢেলে দিয়েছে। প্রথম দিন তাদের কথোপকথন খুব বেশি হয়নি। তারা শুধু পড়াশোনা করেছে, বই নিয়ে চোখে চোখ রেখেছে, মাঝে মাঝে ছোট মন্তব্য করেছে—বৃষ্টি, লাইব্রেরি, শিক্ষক, ক্যাম্পাসের সাধারণ ঘটনা নিয়ে। তবুও সেই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই একটা অদৃশ্য বন্ধন গড়ে উঠেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের দেখা বেড়েছে। কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো ক্যান্টিনে, কখনো ক্লাসের করিডোরে। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আরিবা ছিল জীবন্ত, প্রাণবন্ত, কথা বলার আনন্দে ভরা। সে ছোট ছোট বিষয়কেও হাসি খুঁজে পেত। একদিন ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছিল তারা, আরিবা হঠাৎ বলল, “তুমি সবসময় এত সিরিয়াস থাকো কেন?” সাইফ ভ্রু কুঁচকাল। “আমি সিরিয়াস?” “হ্যাঁ। মনে হয় যেন তুমি সবসময় কোনো বড় দায়িত্ব নিয়ে ঘুরছ,” আরিবা হেসে বলল। সাইফ হালকা করে হাসল, “আমি তো শুধু পড়াশোনা করছি।” আরিবা চুপচাপ তাকাল, তারপর বলল, “না, তোমার চোখের ভেতর বোঝা যায় অনেক কিছু ঘুরছে।” সেই মুহূর্তে সাইফ প্রথমবার অনুভব করল যে কেউ সত্যিই তার ভেতরের জগৎটা পড়তে পারছে।
ক্যাম্পাসের পেছনে বড় গাছের তলে তাদের জন্য একটা ছোট জায়গা হয়ে উঠল। তারা সেখানে বসত, কখনো পড়াশোনা করত, কখনো শুধু একে অপরের সাথে গল্প করত। এক বিকেলে, আরিবা হঠাৎ প্রশ্ন করল, “তুমি কি কখনো কাউকে খুব মিস করেছ?” সাইফ কিছুক্ষণ চুপ করল, “হয়তো না।” “তাহলে তুমি জানো না, কাউকে মিস করা কত অদ্ভুত অনুভূতি।” সে হেসে বলল, “কারণ তখন মানুষটা সামনে না থাকলেও মনে হয় সে ঠিক পাশেই আছে।” সাইফ কিছু বলেনি, কিন্তু সেই দিন তার ভেতরে একটা অদৃশ্য অনুভূতি জেগে উঠল।
সময়ের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠল। তারা একসাথে নোট তৈরি করত, পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা করত, ক্যাম্পাসের নতুন খাবারের দোকান ট্রাই করত। কখনো কখনো শুধু হাঁটত—কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়া। আরিবা তার সঙ্গে ছোটখাটো তর্ক করত, হেসে বলত, “তুমি এত ধীরে কথা বলো কেন?” সাইফ হাসত, “তুমি এত দ্রুত কথা বলো কেন?” এই ছোটখাটো মুহূর্তগুলোই তাদের ভালোবাসাকে ধীরে ধীরে গভীর করে তুলছিল।
কিন্তু সুখের সময়গুলো কখনো কখনো খুব দ্রুত শেষ হয়। এক সন্ধ্যায় আরিবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। খবরটা পৌঁছতেই সাইফের পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যায়। সে হাসপাতালে ছুটে যায়, করিডরের সাদা আলো, ডাক্তারদের ব্যস্ত মুখ—সবকিছু যেন দূরের দৃশ্য। কেউ বলে, “আমরা দুঃখিত…” কিন্তু সাইফ ঠিক শুনতে পারে না। সেই মুহূর্তে যেন তার ভেতরের এক অংশ ছিঁড়ে বের হয়ে যায়।
এরপরের কয়েক মাস সাইফের জীবন একদম নিস্তব্ধ। সে ক্লাসে যায় না, বন্ধুদের ফোন ধরতে চায় না। রাতের অন্ধকারে বারান্দায় বসে থাকে। মাঝে মাঝে তার হাতে পুরনো নোটবুক থাকে, যেখানে আরিবার লেখা কিছু লেখা। সময় কেটে যায়, কিন্তু ক্ষত থেকে যায়। মানুষ বেঁচে থাকে, তবে স্মৃতি কখনো মুছে যায় না।
ধীরে ধীরে সাইফ নিজেকে কাজে ডুবিয়ে রাখে। ব্যাংকের চাকরিতে ঢুকে দক্ষ হয়ে ওঠে। সহকর্মীরা তাকে সম্মান করে, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সে দূরত্ব বজায় রাখে। জীবনের সেই উজ্জ্বল মুহূর্তগুলো—লাইব্রেরির বৃষ্টি, ক্যাম্পাসের পুরনো গাছ, আরিবার হাসি—সবকিছু যেন অদূরের কোনো স্মৃতিতে পরিণত হয়। তবে সেই স্মৃতি তাকে কখনো ভুলে যেতে দেয় না, এবং সেই আলো এখনও কোথাও তার ভেতরে ম্লানভাবে জ্বলছে, অপেক্ষা করছে নতুন জীবনের জন্য। তার বাবা মা বহুবার বিয়ের কথা বলেছেন, কিন্তু সে সবসময় এড়িয়ে গেছে।
অবশেষে নীলার সাথে তার বিয়ের কথা ওঠে। সে খুব আপত্তি করেনি। ভেবেছিল—এটাই হয়তো ঠিক পথ। কিন্তু নীলাকে প্রথম দেখেই সে বুঝেছিল—মেয়েটার চোখে অন্য কারো নাম লেখা আছে। সেই নাম রাফি।
তারপর শুরু হয় আদালতের দিনগুলো। সেখানে সে শিউলিকে দেখে—একটা আলাদা ধরনের মেয়ে। সরাসরি কথা বলে, কোনো ভয় নেই। একদিন শিউলি তাকে বলেছিল, “আপনি খুব অদ্ভুত মানুষ।”
সাইফ হেসে জিজ্ঞেস করেছিল, “কেন?”
শিউলি বলেছিল, “আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে নীলার সাথে। অথচ নিজেই তাদের একা থাকতে দেন।”
সাইফ বলেছিল, “মানুষকে সুখী হতে সাহায্য করা খারাপ নাকি?”
শিউলি তখন শান্ত গলায় বলেছিল, “কিন্তু নিজের সুখ?”
সেই প্রশ্নটা আজও সাইফের মাথার ভেতর ঘুরছে। ড্রয়িংরুম থেকে রাশেদ ডাকলেন। কিছুক্ষন পর সাইফ ভেতরে ঢুকল। তার বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “আজও আদালতে যাবে?”
সাইফ মাথা নাড়ল।
তার মা ধীরে বললেন, “নীলার ব্যাপারটা কি ভেবেছ?”
সাইফ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল।তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “হয়তো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসে গেছে।”
আর সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তটা খুব শিগগিরই তাকে নিতে হবে। কারণ একদিকে আছে একটা ঠিক হয়ে যাওয়া সম্পর্ক, আর অন্যদিকে আছে এক নতুন অনুভূতি—যেটা বহু বছর পর তার হৃদয়কে আবার জাগিয়ে তুলছে।
(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Posts: 55
Threads: 3
Likes Received: 77 in 32 posts
Likes Given: 60
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
পর্ব ৮
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি জেলের ভেতরে ঢোকেনি। উঁচু দেয়াল আর কাঁটাতারের ঘেরাটোপের কারণে সূর্যের আলো এখানে পৌঁছাতে দেরি হয়। বাইরে হয়তো শহর ধীরে ধীরে জেগে উঠছে—মানুষ ঘুম থেকে উঠছে, রাস্তায় রিকশা নামছে, দোকানের শাটার ওপরে উঠছে, কোনো এক চায়ের দোকানে কেটলি চাপানো হয়েছে, আর সেই ফুটন্ত পানির সঙ্গে মিশে উঠছে আদা আর চায়ের পাতা। কিন্তু জেলের ভেতরে সকালটা শুরু হয় একেবারেই অন্যরকমভাবে—এখানে দিনের শুরুটা মানুষের ইচ্ছায় নয়, নিয়মে বাঁধা।
হঠাৎ করেই লোহার দরজায় লাঠি দিয়ে ঠকঠক করে আঘাত করল একজন গার্ড। শব্দটা ধাতব দেয়ালে প্রতিধ্বনির মতো ছড়িয়ে পড়ল, যেন পুরো কারাগারের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছে।
“উঠো! উঠো! সবাই উঠো!”
সেই শব্দেই বাপ্পির ঘুম ভাঙল। তবে সত্যি বলতে গেলে, তার ঘুম আসলে খুব গভীর ছিল না। সারারাত সে আধোঘুমে কাটিয়েছে। মাঝরাতে কয়েকবার ঘুম ভেঙে গেছে। কখনো মনে হয়েছে কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকছে। কখনো মনে হয়েছে সে আবার সেই রাতটায় ফিরে গেছে—অন্ধকার গলি, উত্তেজিত কণ্ঠস্বর, ধস্তাধস্তি, আর এক মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু বদলে যাওয়া। চোখ খুলতেই সে কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না সে কোথায়। মাথার ভেতর যেন একটা কুয়াশা। তারপর ধীরে ধীরে বাস্তবটা ফিরে এল—সে জেলের ভেতরে।
মেঝেতে পাতলা একটা কম্বলের ওপর শুয়ে ছিল সে। উঠে বসতেই ঠান্ডা সিমেন্টের স্পর্শ তার শরীরের ভেতর দিয়ে একধরনের শীতলতা ছড়িয়ে দিল। এই ঠান্ডাটা শুধু শরীরে নয়, যেন মনেও এসে লাগছে। সেলের ভেতরে আরও চারজন বন্দি আছে। কেউ উঠে বসছে, কেউ হাত পা টানছে, কেউ ঘুমজড়ানো চোখে চারদিকে তাকাচ্ছে। জেলের সকালটা যেন ধীরে ধীরে একটা যন্ত্রের মতো চালু হচ্ছে।
এক কোণায় বসে থাকা একটা বুড়ো মানুষ চুপচাপ বাপ্পির দিকে তাকিয়ে ছিল। লোকটার চুল প্রায় পুরো সাদা, চোখে অদ্ভুত শান্ত একটা দৃষ্টি। সেই দৃষ্টিটা এমন, যেন সে জীবনে অনেক কিছু দেখে ফেলেছে—এতটাই যে আর অবাক হওয়ার কিছু নেই।
বাপ্পি মাথা নিচু করে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল সে যেন নিজের শরীরের ভেতরেও পুরোপুরি নেই। যেন দূর থেকে নিজেকে দেখছে—একটা ছেলে, যার চারপাশে এখন লোহার শিক আর পুরু দেয়াল ছাড়া আর কিছু নেই। সেলের বাইরে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় গার্ড আবার বলল, “তারাতারি কর। নাস্তার সময়।”
লোকজন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াতে লাগল। বাপ্পিও দাঁড়াল, কিন্তু তার পা যেন ভারী হয়ে আছে। সে কখনো ভাবেনি তার জীবন একদিন এখানে এসে দাঁড়াবে। একসময় যে গলিগুলোতে সে হাঁটত, যেসব মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হতো—সবকিছু যেন অন্য একটা পৃথিবীর অংশ হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর সেই বুড়ো মানুষটা ধীরে ধীরে এসে তার পাশে বসে পড়ল।- “নতুন?”
বাপ্পি একটু তাকাল। তারপর খুব ছোট করে বলল, “হুম।”
লোকটা মাথা নাড়ল। তার গলায় কোনো বিস্ময় নেই, যেন এটা খুব স্বাভাবিক একটা প্রশ্ন।- “প্রথম কয়দিন এমনই লাগে। মনে হবে পৃথিবী শেষ হয়ে গেছে। পরে দেখবি মানুষ সবকিছুর সাথেই মানিয়ে নিতে পারে।”
বাপ্পি চুপ করে রইল। লোকটা আবার বলল, “কিসের কেস?”
বাপ্পি এবার চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে ক্লান্তি আর অদ্ভুত এক শূন্যতা।- “খুন।”
লোকটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর খুব সাধারণ গলায় বলল, “এখানে অর্ধেক মানুষ খুনের কেসেই আছে।”
বাপ্পি ধীরে বলল, “আমি করি নাই।”
বুড়ো মানুষটা হালকা হাসল। সেই হাসিটা ঠান্ডা নয়—বরং ক্লান্ত।- “এই কথাটাই এখানে সবাই বলে।”
বাপ্পি আর কিছু বলল না। সে মাথা নিচু করে বসে রইল। তার মনে হচ্ছিল—এই পৃথিবীতে এখন কেউ তার কথা বিশ্বাস করবে না। তার মাথার ভেতর আবার সেই রাতটার ছবি ভেসে উঠল। শামসুরের চিৎকার। হট্টগোল। রক্ত। তার বুকের ভেতরটা শক্ত হয়ে গেল। বাপ্পি চোখ বন্ধ করে বসে রইল। তার মাথার ভেতর সেই রাতটার দৃশ্য যেন আবার ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠছিল। অন্ধকার গলি, উত্তেজিত গলার শব্দ, ধাক্কাধাক্কি, আর তারপর এক মুহূর্ত—যে মুহূর্তটা তার পুরো জীবন বদলে দিয়েছে। শামসুরের সেই শেষ চিৎকারটা যেন এখনও কোথাও বাতাসে ভাসছে।
সে হঠাৎ চোখ খুলে ফেলল। বুকের ভেতরটা অস্বস্তিতে শক্ত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন শ্বাসটা ঠিকমতো নিতে পারছে না। জেলের উঠোনে তখন বন্দিদের সারি করে দাঁড় করানো হয়েছে। একজন গার্ড বড় অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে প্লাস্টিকের বাটিতে করে পাতলা ডাল ঢালছে। আরেকজন শুকনো রুটির মতো কিছু একটা দিচ্ছে।
বাপ্পি বাটিটা হাতে নিয়ে এক পাশে দাঁড়াল। খাবারটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার পেট খালি, কিন্তু তবু খেতে ইচ্ছে করছে না। গলায় যেন একটা শক্ত পাথর আটকে আছে। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা ঘুরছে। রহিম চাচা। লোকটা কি ভালো আছে? গত কয়েকদিনে আদালতে কী হয়েছে, কে কী বলেছে—সবকিছু ঠিকমতো সে জানে না। জেলের ভেতরে খবর পৌঁছায় দেরিতে, আর পৌঁছালেও সেটা পুরোটা নয়।
তার মনে পড়ে যায় সেই ছোট্ট দোকানটার কথা। বিকেলের দিকে দোকানের সামনে কয়েকটা কাঠের বেঞ্চ থাকত। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠত। কেউ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করত, কেউ ক্রিকেট নিয়ে চিৎকার করত। আর রহিম চাচা সবসময় একটা শান্ত হাসি নিয়ে চা ঢালতেন।
বাপ্পি ছোটবেলায় কতবার সেখানে দাঁড়িয়ে থেকেছে। পকেটে টাকা নেই, তবু চায়ের গন্ধে টেনে নিয়ে যেত তাকে। রহিম চাচা তখন বলতেন— “এই যে বাপ্পি, দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আয়।”
তারপর তাকে এক কাপ চা আর একটা বিস্কুট এগিয়ে দিতেন।
বাপ্পি লজ্জা পেয়ে বলত, “চাচা, টাকা নাই।”
রহিম চাচা হেসে বলতেন, “টাকা দিয়ে কি সবকিছু হয় নাকি?”
সেই মানুষটার কথা ভাবতেই বাপ্পির বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। ঠিক তখনই একজন গার্ড এসে তার সামনে দাঁড়াল।
- “বাপ্পি!”
সে মাথা তুলল।
- “তোকে কেউ দেখতে এসেছে।”
বাপ্পির ভ্রু কুঁচকে গেল। কেউ তাকে দেখতে এসেছে? কে আসবে?
তার জীবনে এখন এমন কেউ নেই যে জেলের দরজা পেরিয়ে তার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। কিছুক্ষণ পরে তাকে একটা ছোট্ট ঘরের দিকে নিয়ে যাওয়া হল। ঘরটা খুব সাধারণ। মাঝখানে একটা পুরোনো টেবিল, দুই পাশে দুইটা লোহার চেয়ার। জানালায় মোটা লোহার গ্রিল। দরজার পাশে একজন গার্ড দাঁড়িয়ে আছে।
বাপ্পি ভেতরে ঢুকতেই থমকে গেল। টেবিলের ওপারে বসে আছে শিউলি। কয়েক সেকেন্ড সে কিছুই বলতে পারল না। যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। শিউলি ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু সেই পরিচিত দৃঢ়তা এখনও আছে। “বসো,” সে নরম গলায় বলল।
বাপ্পি ধীরে ধীরে এসে চেয়ারে বসে পড়ল। তার মুখে দাড়ি উঠেছে, চোখের নিচে ক্লান্তির দাগ। কয়েকদিনের মধ্যেই যেন সে অনেকটা বদলে গেছে। কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। এই নীরবতার মধ্যে যেন অনেক কথা লুকিয়ে আছে। অবশেষে বাপ্পি নিজেই প্রথম কথা বলল- “রহিম চাচা কেমন আছে?”
প্রশ্নটা এত হঠাৎ এল যে শিউলি একটু থমকে গেল। সে ভেবেছিল বাপ্পি হয়তো নিজের কথা জিজ্ঞেস করবে—মামলার কথা, আদালতের কথা, ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু সে প্রথমেই অন্য একজন মানুষের খবর জানতে চাইল। শিউলি ধীরে বলল, “ভালো আছে।”
বাপ্পি যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার কাঁধটা একটু ঢিলে হয়ে গেল।
“ওনার কিছু হয় নাই তো?”
“না,” শিউলি মাথা নাড়ল। কিছুক্ষণ আবার নীরবতা। তারপর বাপ্পি নিচু গলায় বলল, “ওনার খেয়াল রাখবেন।”
এই কথাটা শুনে শিউলির বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। এই ছেলে নিজের জীবন নিয়ে এমন একটা অন্ধকার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তবু তার চিন্তা অন্য একজন মানুষকে নিয়ে।
শিউলি ধীরে বলল, - “তোমার কথা বলো।”
বাপ্পি একটু হাসল। সেই হাসিটা খুব ক্লান্ত। “আমার কথা?” সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর মাথা নিচু করল- “আমার কথা বলার কি আছে?”
শিউলি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,- “আমি জানি তুমি শামসুরকে মারোনি।”
বাপ্পি এবার তার দিকে তাকাল। তার চোখে অবিশ্বাস আর ক্লান্তি একসাথে- “জানলে কি হবে?”
সে ধীরে বলল- “সত্যি সবসময় জেতে না।” শিউলি একটু সামনে ঝুঁকল। তার গলাটা নরম হয়ে এল- “আদালতে রহিম চাচা… সব সত্যি বলেননি।”
বাপ্পির ভ্রু কুঁচকে গেল- “মানে?”
শিউলি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। যেন কথাগুলো বলার আগে নিজের মনকে প্রস্তুত করছে। “তুমি জানো, সেই রাতে উনি সব দেখেছিলেন।” বাপ্পি ধীরে মাথা নাড়ল। “কিন্তু আদালতে তিনি পুরোটা বলেননি।”
বাপ্পির বুকের ভেতরটা আবার শক্ত হয়ে উঠল,- “কেন?”
শিউলি নিচু গলায় বলল,- “কারণ উনি ভয় পেয়েছেন… তাদের প্রথম সন্তান হতে যাচ্ছে। কয়েক মাসের মধ্যে।”
সে একটু থামল।- “কেউ তাকে হুমকি দিয়েছে। বলেছে যদি তিনি সত্যিটা বলেন… তাহলে তার পরিবারের ক্ষতি হবে।”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। বাপ্পি কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না। তার চোখ ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেল। শিউলি ভেবেছিল সে হয়তো রাগ করবে। হয়তো কষ্ট পাবে। কিন্তু বাপ্পি শুধু খুব আস্তে করে মাথা নাড়ল।তার গলাটা শান্ত।- “ঠিকই করছে।”
শিউলি অবাক হয়ে তাকাল।- “কি?”
বাপ্পি ধীরে বলল,- “একটা বাচ্চার জীবনের চেয়ে বড় কিছু না।” তার চোখে তখন অদ্ভুত এক ক্লান্ত শান্তি।“আমি চাই না আমার জন্য আর কারো ক্ষতি হোক।”
শিউলির বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। এই পৃথিবীতে সত্যি আর ন্যায় সবসময় এক জায়গায় দাঁড়ায় না। ঠিক তখনই দরজার পাশে দাঁড়ানো গার্ড বলল,- “সময় শেষ।”
শিউলি ধীরে উঠে দাঁড়াল। যাওয়ার আগে সে একবার বাপ্পির দিকে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা।- “আমি চেষ্টা করব,” সে ধীরে বলল।
বাপ্পি কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ বসে রইল। কিন্তু তার চোখে প্রথমবারের মতো খুব ক্ষীণ একটা আলো জ্বলে উঠেছিল—যেন অন্ধকারের ভেতরেও কোথাও একটা ছোট সম্ভাবনা এখনও বেঁচে আছে।
সাইফের জীবনের বেশিরভাগ সকালই ছিল খুব নিয়মমাফিক। অনেকটা যন্ত্রের মতো। বহু বছর ধরে সে নিজের জীবনকে এমন একটা ছকে বেঁধে ফেলেছিল যেখানে অনিশ্চয়তার খুব বেশি জায়গা নেই। সকাল সাতটার অ্যালার্ম বাজত, সে উঠে বসত, জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের আকাশটা একবার দেখত। তারপর ধীরে ধীরে রান্নাঘরে গিয়ে নিজের জন্য কফি বানাত। কফির ধোঁয়া উঠতে উঠতে সে খবরের কাগজের শিরোনামগুলো চোখ বুলিয়ে নিত। এরপর গোসল, অফিসের পোশাক, গাড়ির চাবি—সবকিছু যেন এক নির্দিষ্ট তাল মেনে চলত।
এই নিয়মটা সে নিজেই তৈরি করেছিল। কারণ সে জানত, নিয়ম মানুষকে নিরাপদ রাখে। নিয়ন্ত্রণ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। জীবনের সবকিছু যদি হিসেবমতো চলে, তাহলে অন্তত অপ্রত্যাশিত আঘাতগুলো কিছুটা দূরে রাখা যায়।
কিন্তু আজকের সকালটা সেই পরিচিত ছকের মধ্যে পড়ছে না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সাইফ কফির কাপটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কফি ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে সেটা খেয়ালই করছে না। তার চোখ সামনে ছড়িয়ে থাকা শহরের দিকে, কিন্তু তার মন কোথাও অন্য জায়গায় আটকে আছে।
তার মাথার ভেতর বারবার একটা মুখ ভেসে উঠছে।
শিউলি।
সে নিজেও অবাক হয়ে ভাবছে—এই মেয়েটা ঠিক কখন তার চিন্তার ভেতরে এতটা জায়গা করে নিল? সে তো এমন মানুষ না যে সহজে কাউকে নিজের ভেতরে ঢুকতে দেয়। বহু বছর ধরে সে নিজের ভেতরের দরজাগুলো বন্ধ করে রেখেছে।
প্রথম দিন আদালতে শিউলিকে দেখার কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠল। সে দিনটা খুব সাধারণ একটা দিনই হওয়ার কথা ছিল। একটা মামলা, কয়েকটা নথি, কয়েকজন মানুষ—এর বেশি কিছু না। কিন্তু সেই করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখেই সে বুঝেছিল, এই মানুষটা একটু আলাদা। শিউলির চোখে একটা অদ্ভুত স্বচ্ছতা ছিল। যেন সে কোনো কিছু লুকানোর চেষ্টা করে না। তার কথা বলার ভঙ্গিও অন্যরকম—সোজাসাপ্টা, কোনো ঘুরপথ নেই।
সেই দিনই প্রথম সে বলেছিল, “আপনি খুব অদ্ভুত মানুষ।”
কথাটা শুনে সাইফ হেসেছিল ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে অবাক হয়েছিল। কারণ মানুষ সাধারণত তাকে নিয়ে এমন মন্তব্য করে না। বেশিরভাগ মানুষ তাকে ভদ্র, সংযত, দায়িত্বশীল—এইসব শব্দে বর্ণনা করে। কেউ তাকে “অদ্ভুত” বলে না।
সে তখন জিজ্ঞেস করেছিল, “কেন?”
শিউলি একটু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিল, যেন বিষয়টা তার কাছে খুব স্পষ্ট। “আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছে নীলার সাথে। অথচ আপনি নিজেই তাদের একা থাকতে দেন।”
সেই মুহূর্তে সাইফ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর হালকা হাসি দিয়ে বলেছিল, “মানুষকে সুখী হতে সাহায্য করা খারাপ নাকি?”
শিউলি তখন কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই দৃষ্টিটা আজও সাইফের মনে আছে। সেখানে কোনো বিদ্রুপ ছিল না, কোনো তর্কও না—শুধু একটা শান্ত প্রশ্ন।
“কিন্তু নিজের সুখ?”
সেই প্রশ্নটা যেন তার ভেতরের কোথাও গিয়ে আটকে গেছে। আজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সে বুঝতে পারছে, সেই একটাই প্রশ্ন তাকে গত কয়েকদিন ধরে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
আরিবার মৃত্যুর পর সাইফ নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে ফেলেছিল। সেটা কেউ দেখতে পেত না, কিন্তু সে নিজে খুব ভালো করেই জানত সেই দেয়াল আছে। সেই দেয়ালের ভেতরে ছিল কাজ, দায়িত্ব, শৃঙ্খলা—সবকিছু নিয়ন্ত্রিত। ভালোবাসা, আবেগ, অপ্রত্যাশিত আনন্দ—এসব যেন সেই দেয়ালের বাইরে রেখে দিয়েছিল সে।
কারণ সে ভয় পেয়েছিল। কাউকে হারানোর যন্ত্রণা সে একবার দেখেছে। আরেকবার সেই পথ দিয়ে হাঁটার সাহস তার ছিল না। কিন্তু শিউলির সঙ্গে কথা বলার সময় সেই দেয়ালটা কোথাও যেন একটু কেঁপে উঠেছিল। মেয়েটার মধ্যে এমন কিছু ছিল যা তাকে অস্বস্তিতেও ফেলত, আবার একই সঙ্গে অদ্ভুতভাবে শান্তও করত। কখনো সে রাগ করে কথা বলে, কখনো হঠাৎ করেই খুব নরম হয়ে যায়। কখনো সরাসরি চোখে চোখ রেখে কথা বলে, আবার কখনো কোনো কিছু না বলেই অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়।
সাইফ বুঝতে পারছে—এই অনুভূতিটা তাকে ভয়ও দেখাচ্ছে। কারণ সে জানে, যদি সে সত্যিই আবার হৃদয়ের দরজা খুলে দেয়, তাহলে সেটা তাকে কোথায় নিয়ে যাবে সে জানে না। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুম থেকে তার বাবার কণ্ঠ ভেসে এল।
রাশেদ রহমান সোফায় বসে পত্রিকা পড়ছেন। তার চোখে চশমা, মুখে সেই চিরচেনা কঠোরতা। এই মানুষটা সাইফের জীবনে সবসময় একটা দৃঢ় উপস্থিতি। শৃঙ্খলা, দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত—এই তিনটা জিনিস তিনি সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন। সাইফ ভেতরে ঢুকে সোফায় বসল। ঘরের ভেতর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তার মা রান্নাঘর থেকে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখে কৌতূহল আর হালকা উদ্বেগ।
অবশেষে সাইফ খুব শান্ত গলায় বলল, “নীলার সাথে বিয়েটা আমি করতে পারব না।”
কথাটা যেন ঘরের বাতাসকে থামিয়ে দিল। মা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। বাবা ধীরে ধীরে পত্রিকাটা ভাঁজ করলেন। “কেন?”
সাইফ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন নিজের ভেতরের কথাগুলো ঠিকভাবে সাজিয়ে নিতে চাইছে। তারপর ধীরে বলল, “কারণ সে অন্য কাউকে ভালোবাসে।”
রাশেদ রহমানের চোখ একটু সংকুচিত হল। তার গলায় কঠোরতা নেমে এল। “এটা তোর ভাবার বিষয় না।”
সাইফ এবার মাথা তুলে বাবার দিকে তাকাল। তার গলাটা শান্ত, কিন্তু দৃঢ়। “এটা আমার জীবন।”
এই কথাটা বলার সময় তার মাথার ভেতর আবার সেই কণ্ঠটা ভেসে উঠল— “নিজের সুখ?”
বহু বছর ধরে সে নিজের সুখ নিয়ে ভাবেনি। মনে করেছিল, মানুষ দায়িত্ব নিয়েই বাঁচে। পরিবার, কাজ, সমাজ—এইসবই যথেষ্ট। কিন্তু এখন সে বুঝতে পারছে, মানুষের হৃদয় এত সহজ না। কিছু অনুভূতি আছে যেগুলোকে অস্বীকার করা যায় না। শিউলির মুখটা আবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। আদালতের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটা। চোখে দৃঢ়তা, কথায় সরলতা, আর কোথাও গভীরে লুকিয়ে থাকা একটা কোমলতা।
সাইফ হঠাৎ বুঝতে পারল—অনেক বছর পরে তার ভেতরে আবার কিছু নড়ে উঠছে। হয়তো এটা ভালোবাসা নয়। হয়তো শুধু একটা সম্ভাবনা। কিন্তু এতদিন পরে সেই সম্ভাবনাটাও তার কাছে খুব বড় কিছু মনে হচ্ছে। সে জানালার বাইরে তাকাল। শহরটা এখন পুরোপুরি জেগে গেছে। রাস্তায় গাড়ি চলছে, মানুষ কাজের দিকে যাচ্ছে, দোকানের সামনে ভিড় বাড়ছে। জীবন থেমে থাকে না। আর সাইফের নিজের জীবনের ভেতরেও যেন একটা নতুন সকাল শুরু হতে যাচ্ছে। একটা সকাল, যেখানে তাকে প্রথমবারের মতো সত্যি সত্যি নিজের হৃদয়ের দিকে তাকাতে হবে।
(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
Posts: 55
Threads: 3
Likes Received: 77 in 32 posts
Likes Given: 60
Joined: Sep 2022
Reputation:
21
পর্ব ৯:
সকালের আলোটা সেদিন অদ্ভুতভাবে নরম ছিল। এমন না যে দিনটা বিশেষ কোনো কারণে আলাদা, তবু চারপাশে একটা অচেনা স্থিরতা ছড়িয়ে ছিল। রাস্তায় রিকশা চলছে, একটার পর একটা, ঘণ্টার টুংটাং শব্দ যেন শহরের সকালের পরিচিত সুর। ফুটপাত ধরে মানুষজন হাঁটছে—কারও হাতে অফিস ব্যাগ, কারও হাতে বাজারের থলে। দূরে একটা চায়ের দোকানে কেটলির ঢাকনা ঠকঠক করে উঠছে, ধোঁয়া উঠছে ধীরে ধীরে। সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক, তবু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেও কোথাও একটা চাপা অস্বস্তি লুকিয়ে আছে—যেন প্রত্যেকে নিজের ভেতরে একটা অদৃশ্য বোঝা বয়ে নিয়ে হাঁটছে, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাকে ভারী করে রাখে।
শিউলি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে একটা মগ, চা অনেকক্ষণ আগেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে খেয়ালই করেনি। তার চোখ নিচের রাস্তায়, কিন্তু মন যেন অন্য কোথাও। মানুষগুলোকে দেখতে দেখতে তার মনে হচ্ছিল—প্রতিটা মুখের পেছনে একটা গল্প আছে। কেউ হয়তো চাকরির দুশ্চিন্তায় আছে, কেউ পরিবারের চাপ নিয়ে, কেউ হয়তো ভালোবাসার টানাপোড়েনে। বাইরে থেকে সবকিছুই এত সহজ, এত স্বাভাবিক লাগে—কিন্তু ভেতরে ভেতরে জীবন কখনোই এত সহজ না।
সে নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হালকা বাতাস এসে তার চুল উড়িয়ে দিল, কিন্তু সেই বাতাসেও যেন স্বস্তি নেই। যেন শহরটা আজ একটু বেশি চুপচাপ, একটু বেশি ভারী।
ভেতর থেকে তার বাবার কাশি শোনা গেল। শব্দটা খুব জোরে না, কিন্তু এমন যে শুনলেই বোঝা যায়—ক্লান্তি আছে সেখানে। শিউলি একটু চমকে উঠল, যেন নিজের ভাবনা থেকে হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এল। সে দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেল।
ড্রয়িংরুমের পাশে ছোট্ট একটা কাজের ঘর। সেখানে টেবিলের ওপর ফাইল ছড়িয়ে বসে আছেন মাসুদ রহমান। চশমাটা নাকের ডগায় নেমে এসেছে, চোখ দুটো লালচে ক্লান্ত। সামনে কাগজের স্তূপ—বাপ্পির কেসের নথি, সাক্ষ্য, রিপোর্ট, আইনগত ধারার কপি। একটা কলম তার হাতে, কিন্তু কিছুক্ষণ ধরে তিনি একই জায়গায় তাকিয়ে আছেন।
শিউলি চুপচাপ পাশে এসে দাঁড়াল। কিছু বলল না। সে জানে, এই সময়ে তার বাবা সাধারণত কথাবার্তা পছন্দ করেন না। কিন্তু আজকে সে লক্ষ্য করল—তার বাবার হাতটা খুব সামান্য কাঁপছে। এতটাই সামান্য যে অন্য কেউ হয়তো খেয়ালই করত না, কিন্তু তার চোখ এড়াল না।
“বাবা,” সে আস্তে করে ডাকল।
মাসুদ রহমান মাথা তুললেন না। শুধু বললেন, “চা ঠান্ডা হয়ে গেছে?”
কথাটা এমনভাবে বললেন, যেন সবকিছু স্বাভাবিক। যেন কোনো অস্থিরতা নেই।
শিউলি হালকা হাসল। “হ্যাঁ। আবার করে দিই?”
“না, থাক,” তিনি বললেন। “এখন এসবের দিকে মন নেই।”
এই ‘এসব’ কথাটার ভেতরে কত কিছু লুকিয়ে আছে—শিউলি সেটা বোঝে। শুধু চা না, স্বাভাবিক জীবনটাই যেন এখন তাদের কাছে ‘এসব’ হয়ে গেছে। খাওয়া, ঘুম, ছোট ছোট কথা—সবকিছুই যেন এখন গুরুত্বহীন।
কিছুক্ষণ নীরবতা। ঘরের ঘড়িটার টিকটিক শব্দটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।
তারপর হঠাৎ মাসুদ রহমান নিজেই বললেন, “তুই কি জানিস, আইন আর ন্যায়—এই দুইটা জিনিস এক না?”
শিউলি কিছু বলল না। সে জানে, এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর নেই।
“আইন কাগজ দেখে,” তিনি ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন। “প্রমাণ দেখে। সাক্ষী দেখে। কিন্তু ন্যায়? সেটা মানুষের ভেতরে থাকে। অনেক সময় আইন জিতে, কিন্তু ন্যায় হেরে যায়।”
তার গলায় একটা গভীর ক্লান্তি। বহু বছরের অভিজ্ঞতা, অনেক না-পারা, অনেক না-বলা কথার ভার যেন জমে আছে সেখানে।
শিউলি আস্তে করে বলল, “তাহলে আপনি লড়ছেন কেন?”
প্রশ্নটা বাতাসে ঝুলে রইল। মাসুদ রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে চশমাটা খুলে টেবিলে রাখলেন। চোখ দুটো কিছুটা ভেজা মনে হল, যদিও তিনি সেটা আড়াল করার চেষ্টা করলেন।
“কারণ আমি আগেও হেরেছি,” তিনি বললেন। “অনেক বছর আগে… একটা কেস ছিল। আমি জানতাম লোকটা নির্দোষ। কিন্তু প্রমাণ করতে পারিনি। কোর্ট তাকে দোষী সাব্যস্ত করল।”
শিউলি নিঃশব্দে শুনছে।
“সে জেলে গেল,” তিনি বললেন। “আমি শুধু দাঁড়িয়ে দেখলাম।”
তার চোখে তখন দূরের একটা দৃষ্টি। যেন সেই পুরনো দিনের দিকে ফিরে গেছেন।
“তারপর?” শিউলি খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল।
তিনি হালকা হাসলেন। সেই হাসির ভেতরে ব্যথা লুকানো।
“তারপর আর কিছু না। কিছু বছর পরে শুনলাম লোকটা জেলেই মারা গেছে। তখন বুঝলাম—সব হারানোর পর মানুষ আর কিছু নিয়ে বাঁচতে পারে না।”
ঘরের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল। যেন বাতাসও থমকে গেছে।
“এইবার আমি হারতে চাই না,” তিনি খুব ধীরে বললেন।
শিউলি তার বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হল—মানুষ আসলে শুধু অন্যের জন্য লড়ে না, নিজের ভেতরের অপরাধবোধের সাথেও লড়ে।
মাসুদ সাহেব উঠে যাওয়ার সময় বললেন, "তোর ওই ফ্রেন্ড নীলার খবর কি? বিয়েটা কার সাথে করবে? শুনলাম রাফির নাকি চাকরি হয়েছে।"
শিউলি- আমি অত কিছু জানিনা বাবা। শুধু এটা জানি কোন কিছু আর আগের মত নেই।
বাবা- নীলা হয়তো আগে এমন ছিল না। তুইও তো আগের মত নাই।
---
নীলা আগে এমন ছিল না—এই কথাটা শিউলির মাথায় এখন প্রায় প্রতিদিনই ফিরে আসে। একসময় এই মেয়েটা যেন চারপাশে আলো ছড়িয়ে দিত। ক্লাসে ঢুকেই হাসত, ছোট ছোট বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়ত, কখনো হুট করে কোনো মজার গল্প শুরু করত, আর আশেপাশের মানুষগুলো অজান্তেই সেই গল্পের অংশ হয়ে যেত। কিন্তু এখন যেন সেই আলোটা কোথাও গিয়ে নিভে গেছে। নীলা কথা বলে, কিন্তু খুব কম। হাসে, কিন্তু সেটা যেন মুখে আটকে থাকা একটা অভ্যাস, ভেতর থেকে আসা কোনো অনুভূতি নয়। তার চোখের নিচে হালকা কালি পড়েছে, আর তার ভেতরে যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে—যার ভেতরে কেউ ঢুকতে পারে না।
সেদিন কলেজে যাওয়ার পথে রিকশায় বসে শিউলি বারবার নীলার দিকে তাকাচ্ছিল। রাস্তায় আগের মতোই ভিড়, হর্নের শব্দ, মানুষের তাড়াহুড়ো—সবকিছু একই আছে, কিন্তু তাদের দুজনের মাঝখানে একটা চাপা নীরবতা জমে ছিল। এই নীরবতা শুধু কথার অভাব না, এটা এমন এক দূরত্ব, যা একই জায়গায় বসে থেকেও তৈরি হয়। শিউলি বুঝতে পারছিল—নীলা তার পাশে আছে, কিন্তু তার মন অনেক দূরে কোথাও আটকে আছে, এমন এক জায়গায় যেখানে সে একা।
কলেজের গেটে ঢোকার সময় শিউলি একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। সে হালকা গলায় বলল, “আজ ক্লাসে যাবি তো?” প্রশ্নটা খুব সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে একটা উদ্বেগ লুকিয়ে ছিল। যেন সে জানতে চাইছে—“তুই ঠিক আছিস তো?”
নীলা একটু তাকাল তার দিকে। সেই দৃষ্টিটা ক্লান্ত, নিস্তেজ। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে শুধু মাথা নাড়ল। কোনো বাড়তি কথা নেই, কোনো ব্যাখ্যা নেই। যেন তার ভেতরে এত কিছু জমে আছে যে, সে আর শব্দ খুঁজে পায় না।
ক্লাসরুমে ঢুকে তারা আগের মতোই পিছনের বেঞ্চে বসল। এই বেঞ্চটা তাদের অনেক দিনের—এখানে বসে তারা একসাথে কত গল্প করেছে, কত হাসাহাসি, কত পরিকল্পনা। আজ সেই একই জায়গা, কিন্তু পরিবেশটা পুরো আলাদা। ম্যাডাম বোর্ডে লিখছেন, ক্লাস নিচ্ছেন, ছাত্রছাত্রীরা খাতায় নোট নিচ্ছে। সবকিছু খুব স্বাভাবিক, নিয়মমাফিক। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার ভেতরেই নীলার মন যেন কোথাও নেই। সে খাতার দিকে তাকিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু কিছু লিখছে না। তার চোখ যেন বোর্ডের ওপর দিয়ে কোথাও দূরে চলে যাচ্ছে।
হঠাৎ ম্যাডামের কণ্ঠ ভেসে এল, “নীলা, তুমি বলো তো—এই প্রশ্নের উত্তর কী?”
এই ডাকটা যেন হঠাৎ করে তাকে বাস্তবে টেনে আনল। নীলা চমকে উঠল, ধীরে ধীরে দাঁড়াল। পুরো ক্লাসের চোখ এখন তার দিকে। কিন্তু তার মাথা যেন ফাঁকা। শব্দগুলো সে শুনছে, কিন্তু তার অর্থ ধরতে পারছে না। যেন তার ভেতরে কোনো সংযোগ কাজ করছে না। কয়েক সেকেন্ড সে দাঁড়িয়ে রইল—নিঃশব্দ, স্থির। ক্লাসের ভেতরে ফিসফাস শুরু হলো। কেউ কেউ তাকিয়ে আছে কৌতূহল নিয়ে, কেউ হয়তো একটু মজা পাচ্ছে। কিন্তু শিউলির বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। সে বুঝতে পারছিল—এই কয়েক সেকেন্ড নীলার জন্য কতটা কঠিন।
অবশেষে ম্যাডাম বললেন, “বসো।” গলায় বিরক্তি খুব বেশি ছিল না, কিন্তু সেই শব্দটা যেন একটা ছোট আঘাতের মতো লাগল। নীলা ধীরে ধীরে বসে পড়ল। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু শিউলি বুঝতে পারছিল—ভেতরে ভেতরে সে ভেঙে যাচ্ছে। এই ভেঙে পড়াটা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়।
লাঞ্চ ব্রেকে শিউলি আর দেরি করল না। সে নীলার হাত ধরে তাকে ছাদের দিকে নিয়ে গেল। এই ছাদটা তাদের দুজনের জন্য একটা আলাদা জায়গা—এখানে তারা আগে অনেক সময় কাটিয়েছে। রোদে দাঁড়িয়ে গল্প করা, হাওয়ায় চুল উড়তে দেওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন দেখা—সবকিছু যেন এই ছাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
কিন্তু আজ সেই ছাদে দাঁড়িয়ে দুজনই চুপ। হালকা বাতাস বইছে, দূরে শহরের অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসছে। আকাশটা ফাঁকা, তবুও মনে হচ্ছে কিছু একটা ভারী হয়ে আছে।
শিউলি অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর হঠাৎ বলল, “তুই কাঁদিস না কেন?” প্রশ্নটা হঠাৎ, কিন্তু খুব গভীর। সে অনেকদিন ধরে এটা ভাবছিল।
নীলা একটু তাকাল তার দিকে। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “কাঁদলে কি হয়?” এই প্রশ্নের মধ্যে একটা ক্লান্তি ছিল—যেন সে অনেক কিছু চেষ্টা করে দেখেছে, কিন্তু কোনো কিছুতেই স্বস্তি পায়নি।
“হালকা লাগে,” শিউলি বলল, খুব স্বাভাবিকভাবে। তার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলা।
নীলা মাথা নাড়ল। “আমার লাগে না।” এই কথাটা সে এমনভাবে বলল, যেন এটা একটা চূড়ান্ত সত্য। তার কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা নেই, কোনো আবেগের প্রকাশ নেই—শুধু একটা ফাঁকা স্বীকারোক্তি।
শিউলির বুকটা কেঁপে উঠল। সে বুঝতে পারছিল—এটা শুধু কান্না না পারার কথা না, এটা এমন এক জায়গা যেখানে মানুষ এতটাই ভেতরে আটকে যায় যে, চোখের পানি বের হওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়।
“আমি পারি না,” নীলা আবার বলল, এবার একটু নিচু গলায়। যেন এই স্বীকারোক্তিটা বলতে তার কষ্ট হচ্ছে।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সে খুব ধীরে বলল, “যদি বাপ্পি ছাড়া না পায়… সব বদলে যাবে।” এই কথাটা বলার সময় তার গলায় ভয় ছিল। ভবিষ্যতের ভয়, অনিশ্চয়তার ভয়।
শিউলি তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু বলার মতো কথা খুঁজে পেল না।
“সবাই জড়ায়া গেছে,” নীলা বলল। “রাফি… সাইফ… আমার বাপ…” প্রতিটা নামের সঙ্গে একটা আলাদা টান, আলাদা দায়িত্ব জড়িয়ে আছে। যেন এই একটা ঘটনায় তাদের সবার জীবন কোনো না কোনোভাবে আটকে গেছে।
“সবাই নিজের মতো করে বাঁচতে চায়,” সে ধীরে বলল। “কিন্তু সবসময় কি পারা যায়?” এই প্রশ্নটা বাতাসে ঝুলে রইল। এর কোনো সহজ উত্তর নেই।
সন্ধ্যায় নিজের রুমে ফিরে শিউলি অনেকক্ষণ জানালার পাশে বসে ছিল। বাইরে আলো ধীরে ধীরে কমছে, আকাশের রঙ বদলাচ্ছে। শহরের শব্দ একটু একটু করে অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। দিনের কোলাহল থেকে রাতের নীরবতায় ঢুকে পড়ছে সবকিছু।
সে হঠাৎ আয়নার দিকে তাকাল। নিজের চোখের দিকে। সেই চোখে সে কী দেখছে—এটা বোঝার চেষ্টা করল।
“আমি কি খারাপ মানুষ?” সে খুব আস্তে বলল। প্রশ্নটা যেন নিজের কাছেই ছুড়ে দিল।
তার মনে পড়ল—একসময় সে রাফিকে পছন্দ করত। সেই অনুভূতিটা খুব স্পষ্ট না হলেও, ছিল। অপেক্ষা ছিল, ছোট ছোট আশা ছিল, না পাওয়ার একটা কষ্টও ছিল।
এখন সেই জায়গায় অন্য একটা অনুভূতি এসে দাঁড়িয়েছে। সাইফ। এই মানুষটা তার ভেতরে এমনভাবে ঢুকে গেছে, যেটা সে নিজেও বুঝতে পারেনি কখন।
সে ভাবতে লাগল—এটা কি ভুল? একজন মানুষকে ভুলে অন্য কারো দিকে টান অনুভব করা কি বিশ্বাসঘাতকতা? নাকি এটাই স্বাভাবিক?
সে আলমারির ভেতর থেকে পুরনো একটা ডায়েরি বের করল। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটা জায়গায় থেমে গেল। সেখানে লেখা—“আজ রাফি আমাকে দেখেও দেখল না।”
এই লাইনটা পড়ে সে হালকা হাসল। সেই হাসির ভেতরে একটা কষ্টও ছিল, কিন্তু সেই কষ্ট এখন আর আগের মতো তীব্র না। সময় সেটাকে নরম করে দিয়েছে।
সে ডায়েরিটা বন্ধ করল। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল, “আমি আবার ভালোবাসতে পারি?”
এই প্রশ্নটা তার নিজের কাছেই। উত্তর সে জানে না। কিন্তু সে বুঝতে পারছে—তার ভেতরে কিছু একটা বদলাচ্ছে। একটা নতুন অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে, যেটা তাকে আবার ভয়ও দেখাচ্ছে, আবার টানও দিচ্ছে।
বাইরে শহর জ্বলে উঠছে—একটা একটা করে আলো। প্রতিটা আলো যেন একটা গল্প, একটা জীবন। আর সেই আলোদের মাঝেই শিউলি বসে আছে—নিজের ভেতরের অন্ধকার আর আলো নিয়ে, বুঝতে চেষ্টা করছে সে আসলে কোন পথে যাবে।
(চলবে...)
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
|