Thread Rating:
  • 49 Vote(s) - 3.18 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
Gr8 update
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
Darun
[+] 1 user Likes Saj890's post
Like Reply
আপডেটের জন্য অনেক ধন্যবাদ ভাই। তবে অনেস্টলি বলি,আপডেট নিয়ে সত্যিই হতাশ। আপডেটের সাইজ ছোট বাট অপ্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বেশি। আবার ১টা ঘটনা বর্ণনা করতেও একাধিক আপডেট লাগছে। গল্প মনে হচ্ছে ৭-৮ পর্ব ধরে ১ জায়গায় আটকে আছে।
আপনার গুণমুগ্ধ পাঠক হিসেবে সবসময় প্রশংসা করি। এবারে হালকা সমালোচনা করলাম। আশা করি সমালোচনাটা সহজ ভাবেই নিবেন।
[+] 1 user Likes Rahat123's post
Like Reply
আপডেটের জন্য ধন্যবাদ। ঘটনার জট মনে হয় ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে। সামনেই হয়তো আমরা প্রকৃত ঘটনা জানতে পারব।
[+] 1 user Likes skam4555's post
Like Reply
Khub valo laglo
[+] 1 user Likes chndnds's post
Like Reply
Update?
Like Reply
(21-07-2026, 09:36 AM)Rahat123 Wrote: আপডেটের জন্য অনেক ধন্যবাদ ভাই। তবে অনেস্টলি বলি,আপডেট নিয়ে সত্যিই হতাশ। আপডেটের সাইজ ছোট বাট অপ্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা বেশি। আবার ১টা ঘটনা বর্ণনা করতেও একাধিক আপডেট লাগছে। গল্প মনে হচ্ছে ৭-৮ পর্ব ধরে ১ জায়গায় আটকে আছে।
আপনার গুণমুগ্ধ পাঠক হিসেবে সবসময় প্রশংসা করি। এবারে হালকা সমালোচনা করলাম। আশা করি সমালোচনাটা সহজ ভাবেই নিবেন।

লেখক কিভাবে গল্প বিল করবেন? গল্প বরণ করার জন্য সেখানে মাঝে মাঝে অন্য কাহিনী দিয়ে বিরতি দিবেন।

আমার মনে হয়, এটা সম্পূর্ণ লেখকের চাহিদা উচিত। পাঠক হিসেবে আমাদের discouraging সমালোচনা করা উচিত না আপডেটের সাইজ নিয়ে। আমিও হতাশ। কিন্তু এটা নিয়েও কিছু বলার নাই। কারণ, এই লেখা লেখার জন্য ওনারা কোন payment পান না।

তো যেটা করতে পারেন, আমার মতো আমি আপডেটটা পড়ি নাই। এরকম কয়েকটা আপডেট মিলে একসাথে পড়বো।
--------------------
xossip picture adda - https://photos.app.goo.gl/dSKFGuGLQv1vThtf8

Like Reply
আপডেটের অপেক্ষায়।
[+] 1 user Likes skam4555's post
Like Reply
৩৬।
অফিসের কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমি হোয়াটসঅ্যাপে আনিকার সাথে চ্যাট করছিলাম।


আমি: "শুভ সকাল। ঘুম ভাঙল?"

আনিকা: "হ্যাঁ, একটু আগে উঠলাম। তুমি অফিসে?"

আমি: "জি ম্যাডাম। বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে পড়ে আছি। আচ্ছা আনিকা, গতকাল শাহবাগে তুমি একটা কথা বলেছিলে। মনে আছে?"

আনিকা: "কোন কথাটা
? আমি তো কাল অনেক কথাই বলেছি। রাগের মাথায় কত কিছুই তো বকেছি।"

আমি: "তুমি বলেছিলে, বেলাল সাহেব এসব আগে শুরু করেছিলেন। তুমি উনার তুলনায় কমই করেছ। এই কথাটা আমাকে খুব ভাবাচ্ছে। কী শুরু করেছিলেন বেলাল সাহেব? উনার দিক থেকে কী এমন হয়েছিল?"
 
মেসেজটা পাঠানোর পর আমি দেখলাম আনিকা টাইপিং করছেন। তারপর আবার থেমে গেলেন। আবার টাইপিং। প্রায় দুই মিনিট পর উনার মেসেজ এল।
 
আনিকা: "রাশেদ, আমি তোমাকে সব বলব। কিছুই লুকাব না। কিন্তু, আমাকে একটু সময় দাও। এই মুহূর্তে আমি মেন্টালি খুব ট্রমাটাইজড আর কনফিউজড একটা অবস্থার মধ্যে আছি। একদিকে বেলালের নিখোঁজ হওয়া, পুলিশের জেরা, আরেকদিকে আমার নিজের ভেতরের কিছু জমা কষ্ট। আমি নিজে আগে একটু ধাতস্থ হই। আমার ব্রেনটাকে একটু শান্ত হতে দাও। আমি প্রমিজ করছি, আমি নিজে বসে তোমাকে বেলালের ওই দিকের সব সত্যি কথা খুলে বলব। জাস্ট গিভ মি সাম টাইম।"
 
আমি মেসেজটা পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মানুষের জীবনে এমন কিছু অন্ধকার দিক থাকে, যা সহজে কাউকে বলা যায় না। আমি আনিকাকে আর চাপ দিলাম না।
 
আমি লিখলাম: "ঠিক আছে। টেক ইওর টাইম। আমি ওয়েট করব।
 
আনিকা একটা হার্ট ইমোজি দিয়ে রিপ্লাই দিলেন।
 
বিকেল পাঁচটায় অফিস শেষ করে আমি মিরপুরের মেসে ফিরলাম। মেসে ফিরে আমার মাথার ভেতর একটা অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করতে শুরু করল। আমি বুঝতে পারছিলাম, ঢাকা শহরের এই বদ্ধ পরিবেশ, এই মেস, আর এই প্রতিদিনের রুটিন আমার স্নায়ুর ওপর একটা মারাত্মক চাপ ফেলছে। গত এক মাসের এই বিশাল মানসিক রোলারকোস্টার, আনিকার সাথে সেই উদ্দাম দিনগুলো, বেলালের নিখোঁজ হওয়া, পুলিশের থানা— সবকিছু মিলিয়ে আমার ব্রেন এখন ওভারলোডেড হয়ে গেছে।
 
আমার একটু বিশ্রাম দরকার। একটু শান্তি দরকার। আমার মনে হলো, আমি যদি এখন কয়েকটা দিন নওগাঁয় আমার গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে থাকি, তাহলে হয়তো আমি এই মানসিক অবসাদ থেকে একটু মুক্তি পাব। গ্রামের সেই খোলা বাতাস, মায়ের হাতের রান্না, আর বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়— এগুলো ছাড়া আমাকে এখন আর কেউ শান্ত করতে পারবে না। কিন্তু আমি কি এখন ঢাকা ছেড়ে যেতে পারব? পুলিশের কোনো বিধিনিষেধ আছে কি না, সেটা জানা দরকার। আমি মোবাইলটা বের করে এসআই তৌহিদের সেই পার্সোনাল নাম্বারে কল দিলাম।
 
"হ্যালো? তৌহিদ ভাই বলছেন?"

"জি বলছি। কে বলছেন?" ওপাশ থেকে উনার ভদ্র গলা ভেসে এল।

"ভাই, আমি রাশেদ। ওই যে, ঢাকা পেপারসের সাংবাদিক। গতকাল আপনার সাথে কলাবাগান থানায় কথা হলো।"

"হ্যাঁ হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। বলুন, কী খবর? আনিকা ম্যাডামের ফ্ল্যাটের কিছু কি মনে পড়ল?"

"না ভাই, সেরকম কিছু না," আমি খুব স্বাভাবিক গলায় বললাম। "আসলে ভাই, আমি একটু গ্রামের বাড়িতে যেতে চাচ্ছিলাম। আমার বাবা-মা নওগাঁয় থাকে। গত কয়েকদিনের অফিসের প্রেসার আর এই থানার ঝামেলার কারণে মেন্টালি খুব আপসেট হয়ে আছি। তো ভাবলাম, দুই-চার দিনের জন্য একটু গ্রাম থেকে ঘুরে আসি। আপনাদের পুলিশের দিক থেকে কি কোনো বিধিনিষেধ আছে? মানে, আমি তো ওই জিডির একটা রেফারেন্স..."
 
এসআই তৌহিদ ওপাশ থেকে হেসে উঠলেন। "আরে না না ভাই! আপনি তো কোনো সাসপেক্ট না বা কোনো অ্যারেস্টেড পার্সন না যে আপনাকে শহর ছাড়তে বারণ করব। আপনি তো জাস্ট একজন উইটনেস বা গেস্ট ছিলেন। আপনার যেখানে খুশি যেতে পারেন। কোনো রেস্ট্রিকশন নেই। তবে হ্যাঁ, আপনার ফোন নাম্বারটা তো আমাদের কাছে আছেই। যদি কখনো কোনো ইনফরমেশনের জন্য কল দিই, তাহলে একটু রিসিভ করবেন। এইটুকুই।"
 
আমার বুকের ভেতর থেকে যেন এক মণ ওজনের একটা বোঝা নেমে গেল। "অনেক ধন্যবাদ তৌহিদ ভাই। আমি অবশ্যই ফোন খোলা রাখব।"
 
ফোন রেখে আমি আমার ল্যাপটপটা ওপেন করলাম। এখন সবচেয়ে কঠিন কাজটা করতে হবে। এহসান ভাইয়ের কাছ থেকে ছুটি আদায় করা। কয়েকদিন আগেই আমি আনিকার সাথে সময় কাটানোর জন্য ৭-৮ দিনের একটা লম্বা ছুটি নিয়েছি। কর্পোরেট অফিসে, বিশেষ করে নিউজ ডেস্কে, এক মাসে দুইবার লম্বা ছুটি চাওয়াটা রীতিমতো একটা ক্যাপিটাল ক্রাইম। এহসান ভাই হয়তো আমার মেইল দেখেই আমাকে চাকরি থেকে টার্মিনেট করার হুমকি দেবেন।
 
কিন্তু আমার তো উপায় নেই। আমাকে যেতেই হবে। আমি মেইল অপশন ওপেন করে কম্পোজ করতে বসলাম।
 
আমি জানি, বাঙালি বসদের ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল না করলে ছুটি পাওয়া যায় না। তাই আমি একটা খুব ইমোশনাল, প্রফেশনাল এবং একই সাথে অসহায়ত্বে ভরপুর একটা মেইল ড্রাফট করতে শুরু করলাম।
 
এহসান ভাই,
আমি খুব চরম একটা মানসিক এবং শারীরিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যে কারণে বাধ্য হয়ে আমাকে এই মেইলটা লিখতে হচ্ছে। গত বেশ কিছুদিন ধরে আমি ব্যক্তিগত জীবনে কিছু অপ্রত্যাশিত এবং ভয়াবহ মানসিক ট্রমার শিকার হয়েছি (যেটা আমি আপনাকে মৌখিকভাবে কিছুটা বুঝিয়েছিলাম)। এর পাশাপাশি অফিসের টানা শিফট এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের প্রেসার— সবকিছু মিলিয়ে আমি বর্তমানে সিভিয়ার মেন্টাল ব্রেকডাউন (Severe Mental Breakdown) ফেস করছি। আমার পক্ষে এখন ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
 
আমি জানি, কিছুদিন আগেই আমি আমার পাওনা ছুটি থেকে ৭-৮ দিনের একটা লিভ কাটিয়েছি। একটা নিউজ ডেস্কে কাজ করে, মাসের মধ্যে এভাবে আবারও ছুটি চাওয়াটা চরম অন্যায় এবং অপেশাদারিত্ব। আমি এটা খুব ভালো করেই উপলব্ধি করছি। কিন্তু ভাই, আমি আক্ষরিক অর্থেই নিরুপায়।
 
আমার এখন কয়েকটা দিনের জন্য আমার পরিবারের কাছে, আমার গ্রামের বাড়ি নওগাঁয় যাওয়াটা খুব জরুরি। আমি জানি, বাবা-মায়ের কাছে গেলে, একটু মানসিক শান্তি পেলে আমি হয়তো আবার আমার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে পারব। আমি যদি এই মুহূর্তে এই ব্রেকটা না নিই, তাহলে হয়তো আমি ডিপ্রেশনে চলে যাব, যা আমার কাজের ওপর আরও বেশি খারাপ প্রভাব ফেলবে।
 
আমাকে আগামী এক সপ্তাহের জন্য (আগামীকাল থেকে) ছুটি মঞ্জুর করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। যেহেতু আমার ক্যাজুয়াল লিভ হয়তো শেষ, তাই এইচআর ডিপার্টমেন্ট যদি মনে করে, তবে এই ছুটির দিনগুলোর জন্য আমার বেতন থেকে 'লিভ উইদাউট পে' (LWP) হিসেবে টাকা কেটে নিতে পারে। আমি তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি করব না। আমার কাছে এখন টাকার চেয়ে আমার মানসিক সুস্থতাটা বেশি প্রয়োজন।
 
আমি আশা করি, আমার এই মানবিক এবং অসহায় পরিস্থিতিটা আপনারা একটু সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখবেন এবং আমাকে এই ছুটিটুকু দিয়ে আমার জীবনটাকে একটু গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেবেন।
 
সিন্-সিয়ার্লি, রাশেদ আহমদ (সাব-এডিটর)
 
আমি মেইলটা একবার রিডিং পড়লাম।  চালাকি করে এইচআর এবং এডিটরকে সিসি (CC) করে দিয়েছি, যাতে এহসান ভাই একা আমাকে আটকে না রাখতে পারেন। এইচআর দেখবে যে একটা ছেলে বিনা বেতনে (LWP) ছুটি নিতে চাচ্ছে তার মানসিক অবস্থার কারণে, তারা নিশ্চয়ই সেটা আটকাতে যাবে না। আমি একটা গভীর শ্বাস নিয়ে 'Send' বাটনে ক্লিক করলাম। মেইলটা চলে গেল। আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনটা বন্ধ করে দিলাম। ঘরের লাইটটা নিভিয়ে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম।
 
বাইরে মিরপুরের রাস্তায় তখন রাতের কোলাহল কমতে শুরু করেছে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। আমার মাথার ভেতর তখন শুধু একটাই চিন্তা— আগামী কয়েকটা দিন আমি আমার মায়ের হাতের রান্না খাব, বাবার সাথে চা খাব, আর আনিকা নাওহারের এই পুরো আখ্যানটা থেকে নিজেকে একটু ডিটক্স করব। আমি চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম। আমার জীবনটা এখন একটা ট্রানজিট পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে, যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অজানা সব বিস্ময় আর আতঙ্ক।

মানুষ যখন কোনো চরম মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যায়, তখন তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে তার শেকড়। ঢাকা শহরের এই কংক্রিটের জঙ্গল, কারওয়ান বাজারের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস, কিংবা ধানমন্ডির ষোলো তলা বিলাসবহুল ফ্ল্যাট— এসব কিছুই তখন আর শান্তি দিতে পারে না। তখন মনে পড়ে মায়ের হাতের গন্ধ, বাবার চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ, আর গ্রামের বাড়ির উঠোনের ধুলোমাখা বাতাসের কথা।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমি একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। আমি বাড়ি যাব। আমার মস্তিষ্ক এখন একটা হ্যাং হয়ে যাওয়া কম্পিউটারের মতো আচরণ করছে। একে রিস্টার্ট দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। বিছানায় বসেই আমি আনিকার সেই 'ঘোস্ট' নাম্বারে ডায়াল করলাম। 

"হ্যালো," ওপাশ থেকে আনিকার ঘুম-জড়ানো, রেশমি গলা ভেসে এল।


"শুভ সকাল। আমি তোমাকে ঘুম থেকে তুলে দিলাম নাকি?" আমি নরম গলায় বললাম।

"না, জেগেই ছিলাম। বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিলিং দেখছিলাম। বলো, কী খবর তোমার?"

"খবর খুব একটা ভালো না আনিকা। আমি কয়েকদিনের জন্য ঢাকা ছাড়ছি। ১০-১৫ দিনের জন্য আমি নওগাঁ যাচ্ছি, আমার গ্রামের বাড়িতে।"

কথাটা শোনার পর ওপাশে কয়েক সেকেন্ডের একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল। আমি বুঝতে পারছিলাম আনিকা কথাটা হজম করার চেষ্টা করছেন। "হঠাৎ গ্রামের বাড়ি?" আনিকার গলায় এবার একটা স্পষ্ট বিস্ময় আর চাপা অভিমান। "আমাকে কিছু না বলেই এমন একটা ডিসিশন নিয়ে নিলে?"

"আমার আর কোনো উপায় ছিল না আনিকা," আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম। "গত এক মাসের এই মানসিক রোলারকোস্টার, তোমার স্বামীর নিখোঁজ হওয়া, পুলিশের জেরা, আমার ভেতরের এই অপরাধবোধ আর আতঙ্ক— সবকিছু মিলিয়ে আমার মেন্টাল ব্রেকডাউন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমি যদি এখন কয়েকটা দিন ঢাকা থেকে দূরে, আমার বাবা-মায়ের কাছে গিয়ে একটু শান্তিতে না থাকি, আমি হয়তো সত্যি সত্যিই পাগল হয়ে যাব। আমার এই যান্ত্রিক শহরটাকে এখন একটা দমবন্ধ করা গ্যাস চেম্বার বলে মনে হচ্ছে।"

আনিকা আমার কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনলেন। কোনো বাধা দিলেন না। কিছুক্ষণ পর উনার গলা থেকে একটা গভীর, উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ভেসে এল। "যাও," আনিকা খুব শান্ত, মায়াবী গলায় বললেন। "কবে যাচ্ছ?"

"আজ রাতেই। বাসের টিকিট কাটব একটু পরে।"

"রাশেদ..." আনিকা হঠাৎ গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন। উনার কণ্ঠে এখন একটা অদ্ভুত, শিশুলভ হাহাকার। "তোমার সাথে যদি আমি যেতে পারতাম! যদি সবকিছু ফেলে তোমার হাত ধরে ওই গ্রামে চলে যেতে পারতাম, হয়তো আমি একটু শান্তি পেতাম। এই আইটি ফার্ম, এই বিশাল ফ্ল্যাট, পুলিশের জেরা, এই নোংরা সমাজ— সবকিছু থেকে পালিয়ে ওই সবুজ ঘাসের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতাম। একটা মাটির ঘরে থাকতাম, তুমি বাজার থেকে চাল-ডাল নিয়ে আসতে, আমি হয়তো চুলার ধোঁয়ায় চোখ লাল করে তোমার জন্য রাঁধতাম... খুব সহজ, সাধারণ একটা জীবন! কিছুক্ষণের জন্য হলেও হয়তো একটা স্বর্গীয় সুখ হতো।"

আমি আনিকার কথাগুলো শুনছিলাম আর মনে মনে হাসছিলাম। উচ্চবিত্ত, বিলাসী নারীদের এই এক অদ্ভুত রোমান্টিসিজম! তারা এসি রুমে, শ্যানেল পারফিউম মেখে, কিং-সাইজ বিছানায় শুয়ে শুয়ে মাটির ঘর আর চুলার ধোঁয়ার স্বপ্ন দেখে। তারা জানে না, চুলার ধোঁয়ায় চোখ লাল হওয়াটা কোনো রোমান্স নয়, ওটা একটা চরম শ্বাসকষ্টকর দারিদ্র্য। গ্রামে এক রাত কারেন্ট না থাকলে, আর মশার কামড় খেলে তাদের এই 'সবুজ আর সহজ জীবনের' রোমান্স জানালা দিয়ে পালাবে। কিন্তু এসব রূঢ় বাস্তবতা বলে আমি উনার ফ্যান্টাসিটা নষ্ট করলাম না।

"কী আর করার আনিকা," আমি খুব দরদ দিয়ে বললাম। "এই অবস্থায় তো তোমার যাওয়া সম্ভব না। পুলিশ তোমাকে ঢাকা ছাড়তে দেবে না। তুমি এখানেই থাকো। আমি দশ-পনেরো দিন একটু ঘুরে, মাথাটা ঠান্ডা করে আসি। তারপর তো আবার এই ঢাকাতেই ফিরতে হবে।"

"হুম। সাবধানে থেকো। আর আমার সাথে যোগাযোগ রেখো কিন্তু। আমাকে ভুলে যেও না," আনিকার গলায় একটা নির্ভরতার সুর।

"ভুলব না। রাখছি এখন। অফিসে যেতে হবে।"

ফোন রেখে আমি দ্রুত তৈরি হয়ে নিলাম।
 
সকাল সাড়ে দশটায় আমি কারওয়ান বাজারের অফিসে ঢুকলাম। আমার বুকের ভেতর একটু ধুকপুকানি। গত রাতে এহসান ভাই, এইচআর আর এডিটরকে সিসি করে যে ইমোশনাল মেইলটা দিয়েছিলাম, তার ফল কী হবে সেটা জানার অপেক্ষায় আছি। ডেস্কে বসে ল্যাপটপটা সবে অন করেছি, এমন সময় আমাদের অফিসের পিয়ন মোতালেব এসে আমার সামনে দাঁড়াল।

"রাশেদ ভাই, আপনেরে এডিটর স্যার উনার রুমে ডাকতাছে।"

এডিটর স্যারের রুম! সাংবাদিকতার লাইনে এডিটর বা সম্পাদকের রুমে ডাক পড়া মানেই হলো দুটো জিনিস— হয় আপনার প্রমোশন হচ্ছে, নয়তো আপনার চাকরি যাচ্ছে। আমার বর্তমান যে অবস্থা, তাতে প্রমোশনের সম্ভাবনা শূন্যের নিচে। আমি ঢোঁক গিলে এডিটর স্যারের রুমের দিকে পা বাড়ালাম। কাঁচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম, এডিটর স্যার উনার বিশাল চামড়ার রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন। উনার ঠিক সামনের একটা চেয়ারে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বসে আছেন এহসান ভাই। ঘরের তাপমাত্রা সম্ভবত আঠারো ডিগ্রিতে নামানো, কনকনে ঠান্ডা।

"আসসালামু আলাইকুম স্যার। আসতে পারি?" আমি খুব বিনীত গলায় বললাম।

"এসো রাশেদ, বোসো," এডিটর স্যার উনার চশমাটা একটু ঠিক করে বললেন। উনার সামনে আমার সেই মেইলের একটা প্রিন্টআউট রাখা।

আমি এহসান ভাইয়ের পাশের খালি চেয়ারটায় আড়ষ্ট হয়ে বসলাম। "রাশেদ," এডিটর স্যার খুব শান্ত, ভারিক্কি গলায় শুরু করলেন, "আমরা তোমার মেইলটা পড়লাম। তুমি লিখেছ তুমি সিভিয়ার মেন্টাল ব্রেকডাউনের মধ্যে আছো। ফ্যামিলি ইমার্জেন্সি আছে। আচ্ছা, তুমি কি চাকরিটা ছেড়ে দিতে চাচ্ছ? যদি ফ্র্যাঙ্কলি বলো, তাহলে আমরা সেই অনুযায়ী পেপারওয়ার্ক রেডি করি।"

আমি রীতিমতো আঁতকে উঠলাম। চাকরি ছেড়ে দেওয়া! আমি তো জাস্ট কয়েকটা দিনের ছুটি চেয়েছি! "না না স্যার!" আমি প্রায় লাফিয়ে উঠে বললাম। "আমি চাকরি ছাড়তে যাব কেন? এই ঢাকা পেপারস তো আমার পরিবারের মতো। আমি জাস্ট দশ-পনেরো দিনের একটা ব্রেক চাচ্ছিলাম। আমার মানসিক অবস্থাটা আসলেই খুব খারাপ স্যার। আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাতে পারছি না। একটু গ্রামে গিয়ে বাবা-মায়ের সাথে থাকলে আমি আবার পুরো এনার্জি নিয়ে ফিরে আসতে পারব।"

এহসান ভাই এবার মুখ খুললেন। "কিন্তু রাশেদ, তুমি তো কয়েকদিন আগেই আট দিনের একটা লিভ কাটালে। ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে এখন কাজের যা প্রেসার, তুমি এভাবে হুটহাট দশ-পনেরো দিনের জন্য উধাও হয়ে গেলে আমরা ডেস্ক চালাব কীভাবে? এটা তো কোনো প্রফেশনালিজম হতে পারে না।"

"
আমি জানি এহসান ভাই। আমার এটা চাওয়াটা একদমই অন্যায় হচ্ছে। কিন্তু মানুষ তো কখনো কখনো পরিস্থিতির কাছে নিরুপায় হয়ে যায়। আপনারা চাইলে আমার এই ছুটির দিনগুলোর বেতন কেটে নিতে পারেন। আমার কোনো আপত্তি নেই," আমি আমার সবচেয়ে করুণ চেহারাটা সামনে আনলাম।

এডিটর স্যার কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কর্পোরেট বসরা মানুষের সাইকোলজি খুব ভালো বোঝেন। উনি হয়তো বুঝতে পারলেন যে
, এই ছেলেকে জোর করে ডেস্কে বসিয়ে রাখলে সে নিউজ করার চেয়ে নিউজে ভুল করবে বেশি। "শোনো রাশেদ," এডিটর স্যার উনার হাত দুটো টেবিলের ওপর জড়ো করে বললেন, "আমরা আমাদের কর্মীদের মেন্টাল হেলথকে ভ্যালু দিই। তুমি যখন বলছ তুমি কাজ করার মতো অবস্থায় নেই, তখন আমরা তোমাকে জোর করব না। কিন্তু দশ-পনেরো দিন বলে কোনো রুলস নেই। তুমি যেহেতু লিভ উইদাউট পে (LWP) নিতে রাজি আছো, আমি তোমাকে পুরো এক মাসের আনপেইড লিভ গ্রান্ট করছি।"

"এক মাস!" আমি এবং এহসান ভাই দুজনেই একসাথে চমকে উঠলাম।

"হ্যাঁ, এক মাস," এডিটর স্যার এহসান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এহসান, তুমি এই এক মাসের জন্য অন্য ডেস্ক থেকে একজন সাব-এডিটরকে টেম্পোরারি তোমার ডেস্কে নিয়ে নাও। আর রাশেদ, তুমি এক মাস পুরোপুরি অফিশিয়াল কাজ থেকে দূরে থাকো। গ্রামে যাও, রেস্ট নাও, মাথা ঠান্ডা করো। ঠিক এক মাস পর তুমি আবার তোমার ডেস্কে জয়েন করবে। আর যদি এক মাসের মধ্যে তুমি না ফেরো, তবে আমরা ধরে নেব তুমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছ। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?"

আমার মনের ভেতর একই সাথে একটা আনন্দ আর বিষাদের সুর বাজল। এক মাসের ছুটি! এক মাস আমাকে কিম জং উন আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখ দেখতে হবে না! কিন্তু এক মাসের বেতন কাটা যাবে, মানে পঁচিশ হাজার টাকার একটা বিশাল ধাক্কা। তবে আমার সেভিংসের টাকায় আপাতত চলে যাবে। আমার এখন টাকার চেয়ে মানসিক মুক্তিটা বেশি প্রয়োজন।

"জি স্যার। আমি এক মাস পর অবশ্যই জয়েন করব। অনেক ধন্যবাদ স্যার," আমি মাথা নিচু করে সম্মতি দিলাম।

অফিস থেকে বেরিয়ে আমি পান্থপথে শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টারে গেলাম। রাত সাড়ে দশটার নওগাঁর একটা এসি বাসের টিকিট কাটলাম। বিকেল গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। 

আমি মেসে ফিরে আমার একটা ছোট ট্রাভেল ব্যাগে কিছু জামাকাপড় আর দরকারি জিনিসপত্র গোছাচ্ছিলাম
, এমন সময় আনিকার ফোন এল। "রাশেদ, তোমার বাস কয়টায়?"

"রাত সাড়ে দশটায়। পান্থপথ থেকে।"

"এখন তো মাত্র ছ'টা বাজে। তুমি যাওয়ার আগে আমার সাথে একটু দেখা করে যাবে না?" আনিকার গলায় একটা মিষ্টি, আকুল আবেদন।

আমিও চাচ্ছিলাম উনাকে একবার দেখে যেতে। আগামী এক মাস তো উনার এই শরীর, এই সুবাস থেকে আমাকে দূরে থাকতে হবে। 

"
অবশ্যই দেখা করব। কিন্তু কোথায়? আমি তো পান্থপথের দিকে আসব, তুমি ধানমন্ডিতে আছো। মাঝামাঝি কোথাও বসা যায়?"
"রবীন্দ্র সরোবরে চলে এসো," আনিকা বললেন। "আমি ওখানে থাকব। ওখান থেকে তুমি ইজিলি পান্থপথে চলে যেতে পারবে।"
Like Reply
Darun
[+] 1 user Likes Saj890's post
Like Reply
চমৎকার হয়েছে কিন্তু ভাই অনেক স্লো হয়ে যাচ্ছে।
Like Reply
Update hobe
Like Reply
৩৭।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমি রবীন্দ্র সরোবরের কাছাকাছি পৌঁছালাম।
 দিনের বেলার ভ্যাপসা গরমটা এখন আর নেই। লেকের দিক থেকে একটা খুব স্নিগ্ধ, ঠান্ডা বাতাস বইছে। চারপাশের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো লেকের কালো পানিতে পড়ে একটা মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। সরোবরের সিঁড়িগুলোতে কপোত-কপোতীরা বসে আছে, বাদাম আর চটপটির দোকানের হাঁকডাক, গিটার হাতে কয়েকজন ছেলে গান গাইছে। ঢাকা শহরের এই চিরচেনা সন্ধ্যার একটা নিজস্ব রোমান্টিকতা আছে।


আমি লেকের পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে আনিকাকে খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ একটা গাছের নিচে, একটু আধো-অন্ধকার জায়গায় উনাকে দেখতে পেলাম। আমি আক্ষরিক অর্থেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেলাম। আনিকা নাওহারের শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গেলে আসলে ডিকশনারির শব্দভাণ্ডার কম পড়ে যায়। উনাকে আমি শাড়িতে দেখেছি, স্লিপিং গাউনে দেখেছি, সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থাতেও দেখেছি। কিন্তু আজ উনার ক্যাজুয়াল, ওয়েস্টার্ন লুকটা আমাকে যেন নতুন করে আবার প্রেমে ফেলে দিল।

উনার পরনে একটা স্কাই-ব্লু রঙের ডেনিম জিন্স, যেটা উনার নিখুঁত, সুডৌল পা এবং নিতম্বের সাথে একেবারে লেপ্টে আছে। ওপরে একটা ধবধবে সাদা রঙের লিনেন কাপড়ের কুর্তি। কুর্তিটা ঢিলেঢালা হলেও, বাতাস যখন উনার গায়ে এসে লাগছিল, তখন কাপড়টা উনার সেই ভরাট, উদ্ধত বক্ষদেশের সাথে সেঁটে গিয়ে একটা মারাত্মক আবেদন তৈরি করছিল। উনার ঘাড়ের ওপর দিয়ে একটা কালো রঙের পাতলা শাল খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে জড়ানো।

চুলগুলো আজ কোনো পার্লার স্টাইলে সাজানো নেই, বরং একটা খুব সাধারণ 'মেসি বান' বা অগোছালো খোঁপা করে মাথার ওপরে আটকানো। কয়েক গোছা অবাধ্য চুল উনার ফর্সা গলার কাছে এসে পড়ছে। মুখে মেকআপের কোনো লেয়ার নেই, শুধু চোখে গাঢ় কাজল আর ঠোঁটে একটা হালকা পিংক কালারের লিপবাম।

এই সাধারণ সাজেও উনাকে এত বেশি সুন্দর, এত বেশি আভিজাত্যপূর্ণ এবং একই সাথে এত বেশি আবেদনময়ী লাগছিল যে, আমার মনে হলো আমি উনার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ি। আমি উনার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালাম।

"অনেকক্ষণ অপেক্ষা করালাম?" আমি একটা মুগ্ধ হাসি দিয়ে বললাম।

আনিকা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। "না
, এই তো জাস্ট এলাম। চলো, ওই দিকটায় বসি। ওখানে ভিড় কম।" আমরা লেকের পাড়ের একটা ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। একটা পিচ্চি ছেলের কাছ থেকে মাটির ভাঁড়ে দু কাপ চা নিলাম। আমি পকেট থেকে বেনসন বের করে একটা ধরালাম।

আমাদের দুজনের মাঝখানে একটা অদ্ভুত, ভারী নীরবতা। আমি বাসে করে গ্রামে চলে যাচ্ছি। আনিকা হয়তো আর কিছুদিন পর লন্ডনে ফিরে যাবেন। আমাদের এই অদ্ভুত, নিষিদ্ধ এবং বন্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী, সেটা আমরা কেউই জানি না। আমি চায়ের ভাঁড়ে একটা চুমুক দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়াটা বাতাসে ছাড়লাম।

"আনিকা," আমি নীরবতা ভেঙে, খুব শান্ত, কিন্তু গভীর গলায় বললাম। "আমি তো চলে যাচ্ছি। এক মাসের জন্য। আমি জানি না ফিরে আসার পর তোমাকে আর পাব কি না। কিন্তু যাওয়ার আগে, আমার মন একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য খুব ছটফট করছে। আমার মস্তিষ্ক শান্তিতে নেই।"

আনিকা চায়ের ভাঁড়টা দুই হাত দিয়ে ধরে লেকের কালো পানির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। উনি আমার দিকে ঘাড় ফেরালেন না, শুধু বললেন, "কী প্রশ্ন?"

আমি উনার চোখের দিকে সরাসরি তাকালাম।
 "সেদিন শাহবাগে তুমি বলেছিলে... বেলাল সাহেব নাকি সবকিছু জানতেন। তুমি বলেছিলে, এসব নাকি উনিই শুরু করেছিলেন! আমার সাথে তোমার এই সম্পর্ক, এই উন্মাদনা— এগুলোর পেছনে নাকি উনারই কোনো হাত আছে। আনিকা, আমি গত কয়েকদিন ধরে এই কথাটা নিয়ে ভেবে ভেবে পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি আমাকে অর্ধেক কথা বলে অন্ধকারে ফেলে রেখেছ।"

আমি একটু দম নিলাম। উনার মুখের দিকে তাকিয়ে উনার রিয়্যাকশন বোঝার চেষ্টা করলাম। উনার মুখটা একদম শান্ত, কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে একটা অদ্ভুত শীতলতা। "আনিকা, প্লিজ। আজ আমাকে সত্যি কথাটা বলো। কী শুরু করেছিলেন বেলাল সাহেব? উনি কী জানতেন? তোমাদের এই পারফেক্ট, হাই-সোসাইটির বিয়ের পেছনের আসল সত্যিটা কী?"

আমার প্রশ্নগুলো রাতের বাতাসে একটা ভারী পাথরের মতো গিয়ে পড়ল। আনিকা নাওহার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। উনি উনার চায়ের ভাঁড়টা বেঞ্চের ওপর রাখলেন। তারপর উনার কালো শালটা দুই হাত দিয়ে নিজের শরীরের চারপাশে একটু ভালো করে জড়িয়ে নিলেন, যেন উনি ভেতরের কোনো শীত বা কোনো অতীত স্মৃতি থেকে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন।

উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেই দীর্ঘশ্বাসের সাথে উনার বুকের সেই ভরাট স্ফীতিটা একবার ওপরে উঠল এবং নিচে নামল। উনি উনার সেই গভীর, বাদামি চোখ দুটো সোজা আমার চোখের ওপর স্থাপন করলেন। উনার দৃষ্টিতে এখন কোনো কামুকতা নেই, কোনো খেলা নেই। সেখানে এখন একটা নগ্ন, রূঢ় এবং ভয়ংকর সত্যের ছায়া।

"তুমি সত্যিটা জানতে চাও রাশেদ?" আনিকা খুব নিচু, ফিসফিস করা, কিন্তু ইস্পাতের মতো কঠিন গলায় বললেন। 
"তুমি আমার আর বেলালের এই পারফেক্ট বিয়ের পেছনের নোংরা, কদর্য আর কুৎসিত সত্যিটা শুনতে চাও?"

আমি ঢোঁক গিলে শুধু মাথা নাড়লাম। "হ্যাঁ। আমি শুনতে চাই।"

আনিকা উনার ঠোঁটটা একটু কামড়ে ধরলেন। উনার চোখ দুটো লেকের পানির দিকে নিবদ্ধ হলো।
 "তাহলে শোনো..." আনিকা উনার জীবনের সেই বন্ধ দরজার তালাটা খুলতে শুরু করলেন। "সবাই ভাবে বেলাল একজন জিনিয়াস ইঞ্জিনিয়ার, একজন লাভিং হাসব্যান্ড। কিন্তু বেলালের আসল রূপটা তুমি জানো না রাশেদ। ও কোনো সাধারণ পুরুষ নয়। ওর মাথার ভেতর যে বিকৃতি কাজ করে, সেটা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না..."

"আমাদের সংসারটা শুরুতে খুব সুন্দর ছিল, রাশেদ," আনিকা বলতে শুরু করলেন। উনার কণ্ঠস্বরটা রাতের এই মৃদু বাতাসে কেমন যেন একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনাল। "বেলাল মানুষ হিসেবে খুব চমৎকার ছিল। অন্তত প্রথম তিন বছর। লন্ডনে আমাদের ছোট্ট ফ্ল্যাটটা ছিল আমাদের নিজেদের একটা স্বর্গ। ও সারাদিন ওর ইউনিভার্সিটি আর রিসার্চ নিয়ে ব্যস্ত থাকত, আর আমি আমার কাজ নিয়ে। কিন্তু দিন শেষে যখন আমরা ওই বাসায় ফিরতাম, তখন আমাদের মাঝখানে কোনো দূরত্ব থাকত না। আমরা দুজনে একসাথে রান্না করতাম, গান শুনতাম... আর আমাদের প্রাইভেট মুহূর্তগুলো ছিল খুব সাধারণ, কিন্তু ভীষণ উষ্ণ।"

আমি উনার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। আমি কোনো অস্থিরতা দেখালাম না। আমি পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালাম। সিগারেটের ধোঁয়াটা আমাদের মাঝখানের শূন্যতায় রিং তৈরি করে বাতাসে মিলিয়ে যেতে লাগল।

"কিন্তু তিন বছর পর," আনিকা উনার গলার স্বরটা আরেকটু নামিয়ে নিলেন, "আমি প্রথম খেয়াল করলাম, বেলালের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসছে। খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তন। ও যখন আমার কাছে আসত, তখন সেই পুরোনো মনোযোগটা থাকত না। ও যেন একটা দায়িত্ব পালন করছে, এমন একটা ভাব। আমাকে স্যাটিসফাই করার জন্য ও খুব তাড়াহুড়ো করত, কিন্তু নিজের কোনো সম্পৃক্ততা থাকত না। ও যেন শারীরিকভাবে আমার সাথে থাকত, কিন্তু মানসিকভাবে ও অন্য কোথাও হারিয়ে যেত।"

আমি সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কিছু জিজ্ঞেস করোনি?"

"করেছিলাম," আনিকা উনার ঠোঁটটা একটু কামড়ে ধরে বললেন। উনার ফর্সা গলার পেশিগুলো একটু শক্ত হয়ে উঠল। "ও বলত কাজের খুব প্রেসার। ইউনিভার্সিটির প্রমোশনের চাপ, রিসার্চের টেনশন। আমিও ভাবলাম, হ্যাঁ, হয়তো এটাই সত্যি। একটা মানুষ যখন ক্যারিয়ার নিয়ে এত স্ট্রাগল করে, তখন শারীরিক সক্ষমতা বা আগ্রহ একটু কমে যেতেই পারে। আমি স্পেস দিয়েছিলাম। প্রায় এক বছর আমি এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছি। আমি  কখনো কোনো প্রেশার দিইনি।"

আমি আনিকার দিকে তাকালাম। এই সুন্দরী, পরিণত নারীটি উনার জীবনের সেই একাকীত্বের দিনগুলোতে কতটা কষ্ট পেয়েছিলেন, তা উনার চোখের কোণের সেই হালকা পানির বিন্দু দেখেই বোঝা যাচ্ছে। উনার কাপড়ের নিচ দিয়ে উনার বুকের সেই ভরাট গঠনটা প্রতিটা নিশ্বাসের সাথে ভারী হয়ে উঠছিল।

"কিন্তু এক বছর পর," আনিকা বলতে থাকলেন, উনার কণ্ঠস্বরটা এবার একটু শক্ত হয়ে উঠল, "পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। বেলাল আমাকে স্পর্শ করাই বন্ধ করে দিল। ও দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ আমার পাশে শুয়ে থাকত, কিন্তু  কোনো সাড়াশব্দ থাকত না। আমি যদি গায়ের ওপর হাত রাখতাম, ও খুব ভদ্রভাবে  শরীরটা সরিয়ে নিত। বলত, 'আজ খুব টায়ার্ড লাগছে আনিকা, চলো ঘুমাই।' শেষমেশ পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, আমার নিজের ভেতরের শারীরিক তাড়নায়, নিজের ক্ষুধার কারণে আমাকেই ইনিশিয়েটিভ নিতে হতো।"

আমি উনার দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা অনুভব করলাম। এই অপরূপা নারী, যার একটি ইশারায় যেকোনো পুরুষ উনার পায়ে লুটিয়ে পড়তে পারে, তাকে উনার নিজের স্বামীর কাছে এভাবে হাত পাততে হতো!

"এবং যখন আমি ওর কাছে যেতাম," আনিকা উনার চোখ বন্ধ করে ফেললেন, যেন উনার অতীতের সেই চরম অপমানের স্মৃতিটা উনি আবার দেখতে পাচ্ছেন, "ও বিছানায় একটা পাথরের মূর্তির মতো পড়ে থাকত। কোনো রিয়্যাকশন থাকত না, কোনো রেসপন্স থাকত না। ও শুধু শুয়ে থাকত, আর আমাকেই সবকিছু করতে হতো। মনে হতো আমি কোনো প্রাণহীন, ঠাণ্ডা লাশের সাথে জড়িয়ে আছি। শরীরটা আমার ছোঁয়ায় একটুও সাড়া দিত না। পুরুষাঙ্গ আমার হাতের মুঠোয় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে থাকত। এক বছর... পুরো এক বছর আমি এই নরক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছি রাশেদ। আমার নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত এবং সবচেয়ে অপাংক্তেয় নারী বলে মনে হতো।"

আনিকার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। উনার সেই ফর্সা গালে অশ্রুবিন্দুটি ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় একটা মুক্তোর দানার মতো জ্বলজ্বল করতে লাগল। আমার উনার হাতটা ধরতে ইচ্ছে করল, কিন্তু আমি উনাকে ডিস্টার্ব করলাম না। আমি উনার গল্প শুনতে লাগলাম।

"একদিন আমি আর পারলাম না," আনিকার গলার স্বরটা এখন রাগে আর অপমানে কাঁপছে। "আমি জাপটে ধরলাম। চেপে ধরে বললাম, 'বেলাল, কী হয়েছে তোমার? সত্যি করে বলো। তুমি কেন আমার সাথে এমন করছ? তোমার কি কোনো রোগ হয়েছে?' ও প্রথমে কিছু বলল না। চুপ করে রইল। আমি যখন অনেক জোরাজুরি করলাম, ডিভোর্সের হুমকি দিলাম, তখন ও খুব শান্ত গলায়  মাথাটা বালিশে হেলিয়ে দিয়ে একটা কথা বলল।"

"কী বলল?" আমি খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলাম।

"ও বলল, 'আনিকা, আমি তোমার শরীরে আর কোনো থ্রিল পাই না। তোমার সাথে শোয়াটা এখন আমার কাছে একটা রুটিন ওয়ার্কের মতো মনে হয়। এই রিলেশনশিপটা আমার জন্য একটা বোঝা।'"

আনিকা একটু থামলেন। উনার শ্বাস এখন খুব দ্রুত ওঠানামা করছে। পরনের কাপড়ের সামনের অংশটা সেই নিশ্বাসের ধাক্কায় ফুলে উঠছে। আমি উনার এই তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও উনার শারীরিক গঠনের সেই মারাত্মক আকর্ষণটা এড়াতে পারছিলাম না। উনার কোমরটা বেঞ্চের ওপর একটা সুন্দর ধনুকের মতো বাঁক তৈরি করেছিল।

"আমি তো অবাক!" আনিকা বলতে থাকলেন। "আমি বললাম, 'থ্রিল পাও না মানে? আমি তোমার স্ত্রী!' ও বলল, 'তাতে কী? মানুষের রুচি তো বদলাতেই পারে।' আমি যখন আরও প্রেশার দিলাম, জিজ্ঞেস করলাম ওর কি অন্য কোনো চয়েস আছে কি না, তখন ও খুব ঠান্ডা মাথায় একটা স্বীকারোক্তি দিল। ও বলল, ওর ইউনিভার্সিটির এক সাদা চামড়ার কলিগ, নাম ক্যাথরিনের সাথে ও গত কয়েক মাস ধরে রেগুলার সেক্স করছে।"

আমি চমকে উঠলাম। আনিকা একটা বিষাক্ত হাসি হাসলেন। 

"আমি বেলালকে বললাম
, 'কিন্তু আমার প্রতি তোমার এই অনিহা তো গত কয়েক মাসের না, এটা তো প্রায় দুই বছর ধরে চলছে! তাহলে তার আগে কী হয়েছিল?' বেলাল তখন ওর ডিকশনারির সবচেয়ে নোংরা পাতাটা খুলল। ও স্বীকার করল, ক্যাথরিনের আগে, ওর খুব ভালো বন্ধু রাসেল— রাসেলও আমাদের সাথে ইউকেতেই থাকে— রাসেলের বউ তানিষার সাথে ও নিয়মিত ফিজিক্যাল রিলেশনে ছিল। রাসেল যখন অফিসে থাকত, বেলাল তখন রাসেলের বাসায় গিয়ে তানিষার সাথে বিছানায় মেতে উঠত।"

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। বেলাল সাহেব লোকটা তো আস্ত একটা সাইকোপ্যাথ! তার নিজের খুব ভালো বন্ধুর স্ত্রীর সাথে সে নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক রাখছিল!

"শুধু তানিষা আর ক্যাথরিনই নয়," আনিকার চোখ দুটো এখন প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে। "ও জানাল, গত আড়াই-তিন বছরে ও আরও অন্তত তিন-চারজন ভিন্ন ভিন্ন নারীর সাথে শুয়েছে। ওদেশে ওয়ান-নাইট স্ট্যান্ড বা ক্যাজুয়াল সেক্স তো খুব সহজ। ও বলল, এই কাজগুলোতে খুব ভালো লাগে।  কোনো গিল্ট ফিলিং হয় না, কোনো অপরাধবোধ বা লজ্জা নেই। ও জীবনটাকে এনজয় করতে চায়।"

আমি নিচু, বিষণ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করলাম, "তুমি কিছু বললে না? তুমি কি উনাকে ডিভোর্সের কথা বললে না?"

"বলেছিলাম," "অনেক রাগারাগি করেছি, অনেক কেঁদেছি,  পায়ে পর্যন্ত ধরেছি যে আমাদের বিয়েটা যেন ও এভাবে নষ্ট না করে। কিন্তু ও বলল, 'আনিকা, আমাদের বিয়েটা একটা সোশ্যাল স্ট্যাটাস। আমরা সমাজকে দেখাতে পারি যে আমরা খুব সুখে আছি। কিন্তু আমাদের পার্সোনাল লাইফে আমরা স্বাধীন। তোমার যদি শারীরিক চাহিদা থাকে, তুমিও অন্য কোনো পুরুষের সাথে ঘুমাতে পারো। আমার কোনো আপত্তি থাকবে না। আমরা চাইলে ওপেন ম্যারেজ ট্রাই করতে পারি। আর তোমার যদি এতে আপত্তি থাকে, আমরা সোজা ডিভোর্সের দিকে এগোতে পারি।'"

আমি আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। আনিকা নাওহারের মতো একজন ক্লাসি, রূপবতী এবং অহংকারী নারীকে উনার নিজের স্বামী একটা ওপেন ম্যারেজের প্রস্তাব দিচ্ছেন! উনাকে বলছেন— "তুমি চাইলে অন্য পুরুষের বিছানায় যাও, আমার আপত্তি নেই।" এই অপমানের চেয়ে বড় কোনো অপমান একজন নারীর জীবনে হতে পারে না।

"আমি ডিভোর্স চাইনি রাশেদ," আনিকা উনার চোখের পানি মুছে খুব শান্ত গলায় বললেন। "আমি চেয়েছিলাম বেলালকে একটু সময় দিতে। আমি ভেবেছিলাম, আমি যদি এইবার একটু বেশি দিনের জন্য দেশে আসি, ও যদি ওই ফ্যান্টাসির বাইরে একা থাকে, হয়তো একাকিত্বের ভয়ে  আমার কাছে ফিরে আসবে। অনুতাপ হবে। ভুল বুঝতে পারবে। আমি ডিভোর্স দিয়ে আমাদের সুন্দর অতীতটাকে ভেঙে ফেলতে চাইনি। আর বেলালের ওপর রেগে গিয়ে, নিজের সতীত্ব অন্য কোনো সস্তা পুরুষের বিছানায় গিয়ে বিসর্জন দিতেও আমার ইগোতে লেগেছে।"

আমি আনিকার দিকে তাকালাম। উনার চোখের মণি দুটো এখন লেকের পানির অন্ধকারে আরও বেশি গভীর আর রহস্যময় মনে হচ্ছে। উনার এই সরল, সততা মেশানো স্বীকারোক্তি আমার ভেতরের সমস্ত অবিশ্বাসকে ঝেড়ে ফেলে দিল।

"
কিন্তু..." আনিকা হঠাৎ উনার বসার ভঙ্গিটা পাল্টালেন। উনার গলার স্বরটা এখন একটা বরফের মতো শীতল। 

"আমার সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল এই দেশে এসে।"

"কেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। আমার বুকটা আবার ধকধক করছে। "দেশে এসে কী হলো?"

"দেশে এসে আমি বেলালের এমন একটা খবর পেলাম, এমন একটা নোংরা ঘটনা জানতে পারলাম, যা জানার পর আমার ভেতরের ওই সতী নারীটা চিরতরে মরে গেল। আমার মনে হলো, আমি বেলালের জন্য যে আত্মত্যাগ করছি, সেটা একটা চরম বোকামি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, বেলালকে আমি ওর ভাষাতেই জবাব দেব।"

আনিকা একটু থামলেন।

"
কী খবর পেয়েছিলে তুমি?" আমি উনার দিকে একটু ঝুঁকে এসে জিজ্ঞেস করলাম।

আনিকা নাওহারের ঠোঁটে একটা খুব শীতল, ম্লান হাসি ফুটে উঠল। "রাশেদ, উত্তরটা দেওয়ার আগে আমাকে একটা সিগারেট ধরাও তো," আনিকা বললেন। উনার গলার স্বরটা খুব শান্ত, কিন্তু তার গভীরে একটা দীর্ঘশ্বাসের কাঁপুনি ছিল।

আমি পকেট থেকে বেনসনের প্যাকেট বের করলাম। একটা ম্যাচ কাঠি জ্বালিয়ে আগুনটা উনার ঠোঁটে ধরা সিগারেটের ডগায় ধরলাম। আগুনের সেই ক্ষণস্থায়ী আলোয় আমি আনিকার চোখের মণি দুটো দেখলাম। সেই বাদামি চোখে আজ কোনো মায়া নেই, সেখানে শুধু জমে আছে এক বিষাক্ত অতীত।

আমি নিজের জন্যও একটা সিগারেট ধরালাম। ধোঁয়াটা ফুসফুসে টেনে নিয়ে বাতাসের দিকে ছুঁড়ে দিলাম। আনিকা সিগারেটে একটা দীর্ঘ টান দিলেন। ধোঁয়াটা কিছুক্ষণ নিজের ভেতরে আটকে রেখে উনি খুব রিল্যাক্সড ভঙ্গিতে বাতাসে ছাড়লেন। উনার ফর্সা, মসৃণ মুখমণ্ডলের ওপর ধোঁয়ার একটা পাতলা আস্তরণ তৈরি হয়ে আবার মিলিয়ে গেল।

"রাশেদ, দেশে আসার পর তোমার সঙ্গে যখন আমার প্রথম পরিচয় হলো," আনিকা বলতে শুরু করলেন। উনার গলার স্বর খুব নিচু, যেন উনি নিজের সাথেই কথা বলছেন। "আমি কিন্তু প্রথম দিন থেকেই খেয়াল করেছিলাম যে তোমার ভেতরে একটা অদ্ভুত ছটফটানি কাজ করছে। তুমি তোমার ওই তীক্ষ্ণ, শিকারি চোখ জোড়া দিয়ে আড়চোখে আমার শাড়ির কুঁচি, আমার কোমর, আমার বক্ষদেশ যেভাবে তারিয়ে তারিয়ে চুষে খাচ্ছিলে— তা দেখেই আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে তুমি আমার প্রেমে বা আমার শরীরের নেশায় হাবুডুবু খাচ্ছ।"

আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। আমার গাল দুটো একটু গরম হয়ে উঠল।

আনিকা উনার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন, "কিন্তু আমি তো তখনো সতী সেজেছিলাম। বেলাল আমাকে এত বড় একটা আঘাত দেওয়ার পরও আমি আমার মনে বেলালের জন্য একটা ছোট জায়গা বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, না, আমি বেলালের মতো নোংরা হব না। আমি আমার সতিত্ব আগলে রাখব। তাই প্রথম প্রথম আমি তোমাকে খুব একটা পাত্তা দিইনি। তোমার ওই লোলুপ দৃষ্টি আমি খুব উপভোগ করতাম ঠিকই, কিন্তু আমি তোমাকে একটা সীমারেখার ওপাশে আটকে রেখেছিলাম।"

আমি উনার কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে একটু অধৈর্য গলায় বললাম, "আহা! আমি আমার নিজের গল্প শুনতে এখানে আসিনি আনিকা। আমার ওই ক্ষুধার্ত চোখের কথা তো আমি নিজেই জানি। তুমি আমাকে বলো— কী এমন জানতে পারলে তুমি? কার কাছ থেকে জানতে পারলে যে তোমার ওই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল?"

আনিকা সিগারেটের ছাইটা লেকের পানিতে ঝেড়ে ফেলে একটা লম্বা নিশ্বাস নিলেন। উনার সাদা লিনেনের কুর্তিটা সেই নিশ্বাসের ধাক্কায় ফুলে উঠে আবার নেমে গেল।

"দেশে আসার ঠিক দুই সপ্তাহের মাথায় ঘটনাটা ঘটল," আনিকা বলতে লাগলেন। "আমার এই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটটা তো অনেক দিন ধরে তালাবন্ধ থাকে। ফ্ল্যাটটা ক্লিন করার জন্য আর আমাকে টুকটাক হেল্প করার জন্য ঐযে কাজের মেয়েটা আসত। মনে আছে না তোমার?মেয়েটার নাম ময়না। বয়স বড়জোর উনিশ বা বিশ হবে। খুব সাদাসিধে, গ্রাম্য একটা মেয়ে।"

আমি মাথা নাড়লাম। হ্যাঁ, ওই মেয়েটার কথা আমি জানি। আমি যখন ফ্ল্যাটে ছিলাম, মেয়েটা সকালে এসে ক্লিন করে দিয়ে যেত।


"তো, একদিন ময়না ঘর মুছতে মুছতে আমাকে খুব ক্যাজুয়াল একটা প্রশ্ন করল," আনিকা বললেন। "সে বলল— 'ম্যাডাম, এইবার স্যার আইবেন না?' আমি প্রশ্নটাকে খুব সাধারণ একটা কৌতূহল বলেই ধরে নিয়েছিলাম। কারণ আমরা তো এর আগে যখনই দেশে এসেছি, দুজনে একসাথেই এসেছি। আমি হাসিমুখে বললাম— 'না ময়না, তোমার স্যার তো এবার আসবে না। ও ওখানে খুব ব্যস্ত।' ময়না একটু চুপ করে থেকে বলল— 'স্যার মানুষটা অনেক ভালো ম্যাডাম।' আমি  কথা শুনে একটু হাসলাম। বললাম— 'হ্যাঁ, ও মানুষ হিসেবে ভালোই।' কিন্তু ময়না সেখানেই থামল না। সে  ঘর মোছার বালতিটা একপাশে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল— 'স্যার যখন গতবার আইছিলেন, আপনি তো আসেন নাই। তখন আমার মায়ের খুব কঠিন অসুখ আছিল। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার দরকার আছিল। স্যার আমারে অনেক টাকা দিয়া সাহায্য করছেন। স্যার বড় ভালা মানুষ।'

আনিকা একটু থামলেন। উনার চোখের মণি দুটো এখন বরফের মতো ঠাণ্ডা।

আমি উনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "তারপর? তুমি অবাক হলে?"

"অবাক মানে?" আনিকা একটা বিষাক্ত হাসি হাসলেন। "আমার মাথার ভেতরের সমস্ত লজিক যেন এক সেকেন্ডে জ্যাম হয়ে গেল। আমি মনে মনে হিসাব করতে লাগলাম— বেলাল গতবার একলা দেশে এসেছিল? কখন এসেছিল? ও তো আমাকে কোনোদিন বলেনি যে ও একলা বাংলাদেশে গিয়ে ঘুরে এসেছে! আমি আমার স্মৃতি হাতড়ে দেখলাম, আমি দেশে আসার ঠিক তিন-চার মাস আগে বেলাল আমাকে বলেছিল যে ও একটা বৈজ্ঞানিক সেমিনারের কাজে ফ্রান্স যাচ্ছে। ১০-১২ দিনের জন্য। আমার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হতে শুরু করল। বেলাল আসলে ফ্রান্স যায়নি। ও উনার ওই বৈজ্ঞানিক সেমিনারের মিথ্যা গল্প সাজিয়ে সোজা ঢাকায় চলে এসেছিল! একলা!"

আমি খুব মনোযোগ দিয়ে উনার কথা শুনছিলাম। আমার মনের ভেতর একটা অদ্ভুত বিস্ময় কাজ করছে। বেলাল সাহেব উনার স্ত্রীকে লুকিয়ে দেশে এসেছিলেন!

"আমার হঠাৎ করে এক তীব্র সন্দেহ হলো," আনিকা বললেন। উনার গলার স্বর এখন কাঁপছে। "বেলাল এই ফ্ল্যাটে একলা এসে থেকেছে, অথচ আমার কাছে সেই খবরটা ও লুকিয়ে গেছে। কেন? আর তার চেয়েও বড় কথা— বেলাল মানুষ হিসেবে কখনো মানবদরদী ছিল না। ও লন্ডনে কোনো চ্যারিটিতে এক পাউন্ড টাকা দিতে গেলেও দশবার হিসাব করে। সেই বেলাল হঠাৎ করে আমাদের ফ্ল্যাটের এক সাধারণ কাজের মেয়েকে  মায়ের চিকিৎসার জন্য অনেক  টাকা দিয়ে দিল? এটা কোনোভাবেই বেলালের চরিত্রের সাথে মেলে না। আমি ময়নাকে একপ্রকার রিমান্ডে নিলাম।"

"তুমি ময়নাকে জেরা করলে?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।

"হ্যাঁ। খুব শান্ত গলায় বললাম— 'ময়না, তোমার স্যার তোমাকে কত টাকা দিয়েছিল?' ময়না একটু ঘাবড়ে গেল। বলল— 'ম্যাডাম, অনেক টাকা দিছিল। প্রায় লাখখানেক।' আমি বললাম— 'তোমার স্যার তো কখনো কাউকে এক টাকাও ফ্রি দেয় না ময়না। ও তোমাকে এত টাকা কেন দিল? সত্যি করে বলো তো, ও কি এমনি এমনি টাকাটা দিয়েছিল?' ময়না আমার গলার স্বরের কাঠিন্য দেখে ভয় পেয়ে গেল। ও কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে শুরু করল। আমি আর একটু চেপে ধরতেই, উনি সোজা আমার পায়ের কাছে বসে পড়ল। ও কাঁদতে কাঁদতে স্বীকার করল— 'ম্যাডাম, আমার খুব ভুল হইয়া গেছে। স্যার টাকা দিছিল ঠিকই, কিন্তু উনার লগে শুইতে কইছে।'"

আনিকার কথাগুলো শোনার পর আমার নিজের শরীরের ভেতর দিয়েও একটা অদ্ভুত অস্বস্তির হাওয়া বয়ে গেল। নিজের ফ্ল্যাটে, নিজের বিছানায়, নিজের কাজের মেয়ের সাথে স্বামী শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে!

Like Reply
Here we go....
Like Reply
Bah bhalo update chilo.. Khub bhalo... Chalia jan
Like Reply
Khub valo laglo
Like Reply
Fatafati
Like Reply
Reputation dilam ?



Quote:যুক্তি যেখানে শেষ হয়, অনুভূতির অরণ্য সেখান থেকেই শুরু।
Like Reply
৩৮।

আনিকার মুখে কথাটা শোনার পর থেকে আমার পেটের ভেতর একটা বমি বমি ভাব শুরু হলো। আনিকা উনার সুন্দর, সাদা হাত দিয়ে কপালটা জোরে চেপে ধরলেন। উনার আঙুলগুলো কাঁপছিল। চোখের কোণে জল চিকচিক করছিল, কিন্তু সেটা কান্নার জল নয়—রাগের, অপমানের আগুনের ফুলকি। "আমার রাগে, অপমানে সারা শরীর রি রি করতে লাগল," উনি বললেন। উনার গলার স্বরটা ভেঙে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই ভাঙা স্বরের মধ্যেও একটা তীক্ষ্ণ ধার ছিল।

যে স্বামী লন্ডনের ওই বিলাসবহুল বেডরুমে আমার মতো একজন সুন্দরী, শিক্ষিতা, রূপবতী স্ত্রীকে ছুড়ে ফেলে রেখেছিল, যে স্বামী দাবি করেছিল তার নাকি আমার শরীরে আর কোনো থ্রিল বা আগ্রহ নেই—সেই একই স্বামী আমারই কেনা বিছানায়, আমারই ফ্ল্যাটের কাজের মেয়েকে নিয়ে শুয়েছে! কল্পনাটা মাথায় আসতেই আমার শরীরের রক্ত যেন জমে বরফ হয়ে গেল। আনিকা ময়নাকে চুল ধরে টেনে তুলেছিলেন। উনার হাতের আঙুলগুলো ময়নার চুলের গোড়ায় কড়া হয়ে বসেছিল। "সত্যি করে বল শুয়োরের বাচ্চা! ও আর কী কী করেছে? ও কবার এসেছে তোর কাছে?" উনার গলায় তখন আর মানুষের স্বর ছিল না, যেন কোনো আহত বাঘিনীর গর্জন।

ময়না কাঁদতে কাঁদতে
, ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সবকিছু উগরে দিল। ও বলল, বেলাল এই ফ্ল্যাটে সাত দিন ছিল। আর এই সাত দিনের প্রায় প্রতিটি রাতেই সে ময়নাকে নিজের বিছানায় ডেকে নিত। ময়না বলল—'স্যার তো আমার লগে অনেক খারাপ কাজ করছে ম্যাডাম। উনি আমারে কাপড় খুইলা বিছানায় ফালাইয়া রাখত। উনি উনার মুখে আমার...'

আনিকা একটু থামলেন। উনার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। উনি সিগারেটের বাটটা সজোরে লেকের পানিতে ছুড়ে ফেললেন। পানির উপর ছোট ছোট ঢেউ তৈরি হলো, যেন সেই ঢেউগুলোও উনার অপমানের সাক্ষী। উনার মুখমণ্ডলে এক চরম ঘৃণা আর বিতৃষ্ণার অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। উনার ঠোঁট দুটো কাঁপছিল, চোখের পাতা ভারী হয়ে নেমে এসেছিল। লেকের পাড়ের হালকা বাতাসে উনার ভেজা চুল উড়ছিল, আর সেই চুল থেকে একটা মিষ্টি, ভেজা ফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। আমি উনার দিকে তাকিয়ে আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা অনুভব করলাম। এই অপমান কোনো নারীর পক্ষেই সহ্য করা সম্ভব নয়। কোনো স্ত্রীর পক্ষে এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নেওয়া তো দূরের কথা, কল্পনা করাও কষ্টকর।

কিন্তু ধাক্কাটা শুধু এখানেই শেষ হয়নি। আনিকা উনার গলার স্বর আরও নিচে নামিয়ে আনলেন। উনার চোখ দুটো এখন একদম কালো হয়ে গেছে, যেন কোনো গভীর অন্ধকার কুয়ো। "ময়না আমাকে আরেকটা তথ্য দিল, যা শোনার পর আমার ভেতরের শেষ সতী নারীটা চিরকালের জন্য মারা গেল।" উনার কথাগুলো বলতে বলতে উনার শরীরটা যেন শক্ত হয়ে গেল। "ময়না বলল, শুধু সে একাই বেলালের বিছানায় যায়নি। এই বিল্ডিংয়ের চার তলার আরেকটা ফ্ল্যাটের কাজের মেয়ে আছে, তার নাম রহিমা। বেলাল ওই সাত দিনের মধ্যে চার দিন ময়না আর রহিমাকে একসাথে উনার বেডরুমে ডাকত।"

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল। হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল। 


"একসাথে
? মানে থ্রি-সাম?" আমার গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিল না।

"হ্যাঁ!" আনিকা একটা বন্য, পাগলাটে হাসি হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না—শুধু বিষ, ঘৃণা আর ভাঙা আত্মার আর্তনাদ। "ময়না বলল—'ম্যাডাম, আমি যখন একদিন স্যাররে কইলাম রহিমারে ডাকছেন ক্যান? স্যার হাসল। স্যার আমাগো দুইলারে একসাথে কাপড়া খুলতে কইল। উনি আমাগো দুইলারে নিয়া একসাথে ফুর্তি করছে। স্যার আমাগো দুইলারে একসাথে বিছানায় শোয়াইয়া উনার জিনিস আমাগো মুখে...'"

আমি আর শুনতে পারলাম না। আমার নিজেরই গা গুলিয়ে উঠল। বমি আসার মতো অনুভূতি। লেকের পানি, পাখির ডাক, দূরের গাড়ির শব্দ—সবকিছু যেন মিলিয়ে গেল। শুধু আনিকার কথাগুলো আমার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল। বেলাল সাহেব লোকটা তো আস্ত একটা জানোয়ার! সে লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় প্রফেসরের মুখোশ পরে থাকে, সভ্য সমাজের সামনে নিজেকে শিক্ষিত, সংস্কৃতিমান মানুষ হিসেবে প্রচার করে, আর নিজের দেশে এসে নিজের ফ্ল্যাটে দুজন কাজের মেয়েকে একসাথে নিয়ে উনার বিছানায় নোংরা, পশুর মতো খেলায় মেতে ওঠে! কল্পনায় যখন সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠল—দুজন অসহায় মেয়ে, একজন শিক্ষিত, ক্ষমতাবান পুরুষের লালসার শিকার—আমার হাতের মুঠো আপনা-আপনি শক্ত হয়ে গেল।

আনিকা আরও বললেন। ময়না নাকি বলেছে, বেলাল তাদের দুজনকে একসাথে জড়িয়ে ধরে বলত—'তোদের এই কালো, নোংরা শরীরগুলোর যে গন্ধ, এই গন্ধের যে থ্রিল, এটা আমার ওই মেমসাহেব বরের শরীরে নাই।' সে তাদের উনার ইচ্ছেমতো ব্যবহার করত। তাদের মুখে উনার বীর্য স্খলন করত, আর উনারা সেটা নিতে বাধ্য হতো টাকার লোভে, চাকরি হারানোর ভয়ে। আনিকা উনার কথা শেষ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উনার বুকটা উঠানামা করছিল। উনার কুর্তির কাপড়টা সামান্য সরে গিয়ে উনার ফর্সা, মসৃণ ঘাড় আর কলারবোনের অংশটা দেখাচ্ছিল।

উনার চোখের সামনে এখন আর কোনো কান্নার জল নেই। উনার চোখ দুটো এখন সম্পূর্ণ পাথরের মতো শক্ত, ঠান্ডা। "এই কথাগুলো শোনার পর আমি আমার ড্রয়িংরুমে বসে প্রায় দুই ঘণ্টা চুপচাপ কাঁদলাম," আনিকা বললেন। উনার কণ্ঠস্বরে সেই দুই ঘণ্টার যন্ত্রণা এখনও লেগে ছিল। "আমার মনে হলো, আমি বেলালের জন্য যে নিজেকে এতদিন ধরে খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিলাম, আমি যে নিজের কামনার আগুনটাকে চেপে ধরে সতী সেজেছিলাম—তা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বোকামি। আমি কার জন্য সতিত্ব আগলে রাখছি? যে লোকটা আমার বিছানায় দাঁড়িয়ে দুজন নোংরা কাজের মেয়েকে নিয়ে ফুর্তি করছে! যে লোকটা আমার শরীরকে 'বোরিং' বলে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, সে নিজে কত নোংরা, কত নিচু স্তরের লালসায় ডুবে আছে!"

আমি আনিকার হাতটা আমার হাতের মুঠোয় নিলাম। উনার হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু ভেতরে একটা কাঁপুনি ছিল। আমি আলতো করে উনার আঙুলগুলোতে চাপ দিলাম, যেন বলতে চাইলাম—আমি এখানে আছি।

"আমি সেদিনই সিদ্ধান্ত নিলাম," আনিকা আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন। উনার চোখে এখন এক বন্য, সর্বগ্রাসী জিঘাংসা জ্বলছিল। "অনেক হয়েছে। আমি আর সতী সেজে থাকব না। বেলালের এই বিশ্বাসঘাতকতার দাম আমি আমার একাকিত্ব দিয়ে দেব না। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়েই ওকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেব। আমাদের এই বিয়ের কোনো মানে নেই। আর যেদিন আমি এই সিদ্ধান্ত নিলাম, ঠিক সেদিন থেকেই আমি তোমাকে পাত্তা দেওয়া শুরু করলাম। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার শরীরটা আমি সেই পুরুষকে দেব, যে আমার রূপের কদর বোঝে, যে আমার এই সুধার স্বাদ নেওয়ার জন্য পাগল হয়ে থাকে।"

আমি উনার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনার এই কথাগুলো আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, আদিম উত্তেজনার জন্ম দিচ্ছিল। আমার শরীরের প্রতিটি রোমকূপ জেগে উঠছিল। আমি রাশেদ আহমেদ। একজন পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের অনুবাদক। সাধারণ জীবন। কিন্তু আজ আমি বুঝতে পারছি, আনিকা নাওহারের এই বন্য রূপের পেছনে কতটা বড় একটা ক্ষত লুকিয়ে আছে। উনি উনার স্বামীর ওই নোংরা বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ নিচ্ছেন উনার নিজের শরীর দিয়ে। আর উনার সেই প্রতিশোধের মাধ্যম হিসেবে উনি বেছে নিয়েছেন আমাকে। এই চিন্তাটা আমার মধ্যে একইসাথে গর্ব আর দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলল।

আমি উনার ফর্সা, মসৃণ কাঁধের ওপর আমার হাত রাখলাম। উনার ত্বকটা ছিল নরম, উষ্ণ। "আনিকা..." আমি খুব নিচু গলায় বললাম।

"হুম?"

"তুমি ঠিকই করেছ। ওই জানোয়ারটার জন্য তোমার এই শরীরটাকে বন্দি করে রাখার কোনো মানেই হয় না। আই অ্যাম উইথ ইউ।"

আনিকা উনার মাথাটা আমার কাঁধের ওপর এলিয়ে দিলেন। উনার ভেজা চুলের সেই মিষ্টি সুবাস আবার আমার নাকে এসে ধাক্কা দিল। উনার কুর্তির সামনের অংশটা আমার বুকের সাথে লেপ্টে আছে। আমি উনার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলাম, ধীরে ধীরে। লেকের পানি শান্ত হয়ে গেছে। চারপাশে নীরবতা। শুধু দুটো হৃদয়ের ধুকধুক শব্দ।

আনিকা একটা অভিমানী সুরে বললেন, তাহলে এভাবে আমাকে একা রেখে পালাচ্ছ কেন!

মানুষের মনস্তত্ত্ব এক বিশাল গোলকধাঁধা। এই গোলকধাঁধার ভেতরে কখন যে কোন্ অনুভূতির জন্ম হয়, আর কখন যে কোনটা হারিয়ে যায়, তা পৃথিবীর তাবৎ বাঘা বাঘা দার্শনিকরাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।

রবীন্দ্র সরোবরের অন্ধকার লেকের পাড়ে বসে আনিকা নাওহারের মুখ থেকে উনার স্বামী বেলাল সাহেবের নোংরা, কদর্য এবং বিকৃত জীবনের গল্প শোনার পর আমার মাথার ভেতরে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা নেমে এসেছিল। আমি ভাবছিলাম, এই যে আমরা বাইরে থেকে মানুষের দামি গাড়ি, ব্র্যান্ডের শার্ট, আর নিখুঁত হাসিমুখ দেখে তাদের জীবনের বিচার করি, তার ভেতরটা আসলে কতটা পচা আর দুর্গন্ধযুক্ত হতে পারে!

মাটির ভাঁড়ের চা ততক্ষণে জুড়িয়ে বরফ হয়ে গেছে। আমি আনিকার ফর্সা, নরম হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব আলতো করে একটু চাপ দিলাম। উনার আঙুলগুলো বরফের মতো ঠান্ডা। "আনিকা," আমি খুব শান্ত কিন্তু গভীর গলায় বললাম, "আমি পালাচ্ছি না। আর তোমাকে পাশ কাটানোর তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তুমি আমাকে ভুল বুঝো না। আমি আসলে গত এক মাসের এই বিশাল মানসিক রোলারকোস্টার, তোমার স্বামীর নিখোঁজ হওয়া, পুলিশের জেরা— সবকিছু মিলিয়ে মানসিকভাবে চরম এলোমেলো হয়ে আছি। আমার মস্তিষ্ক এখন কোনো লজিক্যাল সিগন্যাল প্রসেস করতে পারছে না।"

আনিকা আমার কাঁধে মাথা রেখে চুপচাপ শুনছিলেন। উনার নিঃশ্বাসের একটা মৃদু গরম ভাপ আমার গলার কাছে এসে লাগছিল।

"আমি গ্রামে গেলে হয়তো একটু শান্তি পাব," আমি বলতে থাকলাম। "খোলা বাতাস, বাবা-মায়ের মুখ, আর আমার ওই পুরোনো ঘরটা আমাকে হয়তো আবার স্বাভাবিক হতে সাহায্য করবে। আমি আশা করছি, এর মধ্যে পুলিশ বেলাল সাহেবকে খুঁজে বের করতে পারবে। উনি কোথায় গেছেন, কী হয়েছেন— সেই সত্যিটা সামনে আসা খুব দরকার। একবার এই মেঘটা কেটে গেলে, তারপর আমরা দুজনে খুব শান্ত মাথায় আমাদের ফিউচার নিয়ে ভাবব।আমাদের সম্পর্কটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটা তখন ঠিক করা যাবে।"

আমি ভেবেছিলাম, আমার এই অত্যন্ত পরিণত, যৌক্তিক এবং দায়িত্বশীল কথাবার্তা শুনে আনিকা হয়তো খুশি হবেন। হয়তো বলবেন— "হ্যাঁ রাশেদ, তুমি ঠিকই বলেছ।"

কিন্তু নারীদের লজিক আর পুরুষদের লজিক কখনো এক সরলরেখায় হাঁটে না। আনিকা হঠাৎ উনার মাথাটা আমার কাঁধ থেকে তুললেন। উনার চোখদুটো লেকের ওই ঘোলাটে অন্ধকারেও অদ্ভুত এক বন্যতায় চকচক করে উঠল। উনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনার কালো শালটা একটু সরিয়ে দিলেন।

"রাশেদ," আনিকা খুব নিচু, কিন্তু কেমন যেন একটা স্যাঁতস্যাঁতে, ভেজা গলায় ফিসফিস করে উঠলেন। "আমি এই কারণেই এই ভারিক্কি আলাপগুলো করতে চাইনি। এসব অতীত, স্বামী, সমাজ, পুলিশ— এসব নিয়ে কথা বলতে গেলে আমার মাথা ধরে যায়।"

উনি একটু থামলেন। উনার দৃষ্টি আমার ঠোঁট থেকে নেমে আমার কলারবোনের কাছে স্থির হলো। 
"জানো," আনিকা উনার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে আমার শার্টের বোতামের ওপর একটা অদৃশ্য বৃত্ত আঁকতে আঁকতে বললেন, "এইসব সিরিয়াস আলাপ করতে গিয়ে আমার শরীরের ভেতরে কেমন যেন করছে। আমার শরীরে রসে টানছে রাশেদ। আমার পুরো শরীরটা তোমার একটুখানি আদরের জন্য নিশপিশ করছে। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।"

আনিকার কথাগুলো শোনার পর আমার বুকের ভেতর যেন এক হাজার ওয়াটের একটা জেনারেটর স্টার্ট নিল। আমি ঢোঁক গিলে নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলাম।


"আনিকা... প্লিজ," আমি একটু নার্ভাস গলায় বললাম। "এটা আসলে আমাদের দুজনের জন্যই একটা পরীক্ষা। আমাদের আপাতত কিছুদিন আলাদা থাকার পরীক্ষা দিতে হবে। এই দূরত্বটা আমাদের সম্পর্কটাকে হয়তো আরও স্ট্রং করবে।"

আনিকা উনার ঠোঁটটা একটু কামড়ে ধরে আমার দিকে আরও একটু ঝুঁকে এলেন। উনার স্তনযুগলের সেই ভরাট, মোহনীয় স্ফীতিটা আমার বাহুর সাথে হালকা ঘষা খেল। "পরীক্ষা দেব। অবশ্যই পরীক্ষা দেব," আনিকা একটা ঘাতক হাসি দিয়ে বললেন। "কিন্তু আজকের পর থেকে পরীক্ষা দিই না! আজকে, এই মুহূর্তে আমাকে একটু আদর করো রাশেদ। প্লিজ।"

"আরে, কী বলছ এসব!" আমি প্রায় আঁতকে ওঠার ভান করলাম। "আমি একটু পরে গাড়িতে উঠব। আমার সাড়ে আটটায় পান্থপথ থেকে নওগাঁর বাস। টিকিট কাটা হয়ে গেছে। আমি এখন তোমাকে আদর করতে যাব কীভাবে?"

আনিকা উনার হাত দিয়ে আমার শার্টের কলারটা খামচে ধরলেন। "চুলোয় যাক তোমার গাড়ি! চুলোয় যাক তোমার পান্থপথ!" আনিকা প্রায় হিসহিস করে উঠলেন। "সকালের গাড়িতে যাবে। কী সমস্যা? একটা টিকিটের টাকাই তো নষ্ট হবে। ওই টিকিটের ডাবল টাকা আমি তোমাকে এখনই গুগল পে-তে ট্রান্সফার করে দিচ্ছি। প্লিজ রাশেদ... আজ রাতে আমাকে একটু আদর করো। প্লিজ!"

উনার গলার স্বরে এখন আর কোনো জেদ নেই, আছে একটা তীব্র, অসহায় হাহাকার। "এই গত কয়েকদিনের ব্যস্ততা, পুলিশের জেরা, বেলালের নিখোঁজ হওয়া— এই সাসপেন্স আর টেনশন আমি আর নিতে পারছি না রাশেদ। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমার মনে হচ্ছে আমার ব্রেনের শিরাগুলো ছিঁড়ে যাবে। তুমি যদি আজ রাতে আমাকে একটু আদর করো, তোমার ওই শক্ত বাহুর বাঁধনে যদি আমাকে একটু পিষে ফেলো, তাহলে আমি হয়তো সব কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকতে পারব। আমাকে এই যন্ত্রণা থেকে একটু মুক্তি দাও।"

উনার এই কাতর অনুনয় শোনার পর আমার ভেতরের সেই পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের 'ভদ্রলোক' সত্তাটা আর টিকতে পারল না। আমি নিজেও তো ভেতরে ভেতরে এই শরীরটার জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিলাম। "আরে, সে না হয় বুঝলাম," আমি একটু নরম হয়ে, প্র্যাকটিক্যাল পয়েন্টে ফিরে এলাম। "কিন্তু এখন জায়গা পাব কোথায়? আমরা যাব কোথায়?"

"কেন? আমার বাসায় চলো!" আনিকা সাথে সাথে বললেন।


"পাগল হয়েছ!" আমি চোখ কপালে তুলে বললাম। "তোমার বাসায় তো এখন পুলিশের পাহারা থাকার কথা। তোমার স্বামী নিখোঁজ। কে জানে, হয়তো সাদা পোশাকে গোয়েন্দারা তোমার ফ্ল্যাটের নিচে নজর রাখছে। তুমি কোথায় যাচ্ছ, কার সাথে মিশছ— সব হয়তো তারা নোট করছে। আমি যদি এখন তোমার সাথে তোমার ফ্ল্যাটে ঢুকি, কাল সকালেই আমাকে ডিবি অফিসে উল্টো করে ঝুলিয়ে জেরা করবে। আমি পুলিশকে ভয় পাই আনিকা।"

আনিকা একটু বিরক্তি নিয়ে মুখ বাঁকালেন। "তাতে কী যায় আসে! আমি কি তোমাকে লুকাতে চাই? আমি কি আমার প্রেমিকের আদরের অধিকার রাখি না? পুলিশ জানলে জানবে। আমরা তো কোনো খুন করিনি!"

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। "আরে আনিকা, সেটা তো তুমি আর আমি বুঝি। আমাদের প্রেম হয়তো আমাদের কাছে পবিত্র, আমরা হয়তো কোনো আইনি অন্যায় করছি না। কিন্তু সমাজ তো এভাবে দেখে না! পুলিশ তো এটাকে 'পবিত্র প্রেম' বলবে না, তারা এটাকে বলবে 'পরকীয়ার জেরে স্বামীকে গুম'। খামোখা একটা জঘন্য স্ক্যান্ডাল হবে। তোমার আর আমার— দুজনেরই সম্মান রাস্তায় লুটোপুটি খাবে।"

আনিকা বুঝতে পারলেন আমার লজিকটা অকাট্য। উনি একটু দমে গেলেন। "তাহলে চলো কোনো হোটেলে যাই। ফাইভ স্টার কোনো হোটেলে চেক-ইন করি," আনিকা বিকল্প প্রস্তাব দিলেন।

"হোটেল? ঢাকা শহরের হোটেলে কোনো ব্যাগেজ ছাড়া, একজন বিবাহিত নারী আর একজন অবিবাহিত পুরুষ গিয়ে বলবে আমাদের একটা রুম দেন? রিসিপশনিস্ট তো আমাদের আওয়ার-বেসিসে আসা কাস্টমার ভাববে! তাছাড়া এনআইডি কার্ড স্ক্যান করার ঝামেলা আছে।"

"তাহলে তোমার মেসে চলো! তোমার রুমমেটদের দশ হাজার টাকা দিয়ে বলব আজ রাতে অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে!" আনিকার পাগলামি যেন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল।

আমি হেসে ফেললাম। "আমার মেস! আনিকা, আমার মেসে রাজু নামের যে ছেলেটা থাকে, সে এখন বাংলাদেশ বিষয়াবলি মুখস্থ করছে। আমি যদি তোমাকে নিয়ে মেসে ঢুকি, সে হয়তো মনে করবে আমি বিসিএস ভাইভার কোনো নারী অধিকার বিষয়ক প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা দিতে এসেছি! মেসে সম্ভব না।"

"তাহলে ঢাকার বাইরে চলো। গাজীপুর বা পূর্বাচলের কোনো রিসোর্টে।"

"ওখানে যেতে যেতেই রাত বারোটা বাজবে। কাল সকালে আবার আমাকে গ্রামের বাসে উঠতে হবে। সেটাও প্র্যাকটিক্যাল না।"

আনিকা হতাশ হয়ে বেঞ্চের ওপর হেলান দিয়ে বসলেন। উনার মুখটা কালো হয়ে গেল। 
আমি চুপচাপ সিগারেটের শেষ অংশটুকু টানছিলাম। আমার মাথার ভেতর তখন একটা ডিরেক্টরের মতো নানা সিনারিও প্লে হচ্ছে। কোথায় যাওয়া যায়? এমন কোনো জায়গা, যেখানে কোনো পুলিশের নজরদারি নেই, কোনো এনআইডির ঝামেলা নেই, অথচ একটা বিলাসবহুল, চলন্ত, রোমান্টিক বিছানা পাওয়া যাবে?

হঠাৎ করে আমার মাথার ভেতর একটা বিদ্যুতের মতো আইডিয়া খেলে গেল। আমি আনিকার দিকে ঘুরে বসলাম। আমার চোখে একটা বুনো, অ্যাডভেঞ্চারাস ঝিলিক। "আনিকা... একটা আইডিয়া আছে," আমি খুব নিচু, রহস্যময় গলায় বললাম।

"কী আইডিয়া?" আনিকা একটু সোজা হয়ে বসলেন।

"একটু রিস্কি, একটু আনপ্রেডিক্টেবল। কিন্তু দারুণ মজা হবে। এমন একটা অ্যাডভেঞ্চার, যা তুমি হয়তো জীবনেও করোনি।"

"কী সেটা? বলো না!" আনিকা অধৈর্য হয়ে আমার হাত চেপে ধরলেন।

আমি উনার চোখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললাম, "চলো, বরিশাল যাই!"

"বরিশাল!" আনিকার চোখ দুটো আক্ষরিক অর্থেই রসগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে গেল। "বরিশাল মানে? তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?"

"একদম পাগল হইনি। খুব ঠান্ডা মাথায় বলছি," আমি আমার প্ল্যানটা ছকতে শুরু করলাম। "আমরা সদরঘাট যাব। সেখান থেকে বরিশালগামী কোনো একটা বিলাসবহুল লঞ্চের টিকিট কাটব। ধরো 'এমভি মানামি' বা 'সুন্দরবন'-এর মতো কোনো লঞ্চ। লঞ্চের একদম টপ ফ্লোরে একটা ডিলাক্স সুইট বা ভিআইপি কেবিন নেব। রাত আটটা বা নয়টায় লঞ্চ ছাড়বে।"


আমি আনিকার মুখের দিকে তাকালাম। উনার চোখের সেই হতাশা কেটে গিয়ে সেখানে এখন একটা তীব্র, বন্য রোমাঞ্চের ছায়া। "আমরা কেবিনের দরজা ভেতর থেকে লক করে দেব," আমি ফিসফিস করে বলতে লাগলাম। "লঞ্চ চলবে বুড়িগঙ্গা, মেঘনা আর কীর্তনখোলার বুক চিরে। নদীর কনকনে ঠান্ডা বাতাস, লঞ্চের ইঞ্জিনের সেই মৃদু ভাইব্রেশন, আর বিশাল একটা বিছানা। আমি সদরঘাট থেকে শুরু করে বরিশাল পৌঁছানো পর্যন্ত সারা রাত ধরে তোমাকে আদর করব। তোমার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি আমি আমার জিভ দিয়ে ছুঁয়ে দেব।"

আনিকার শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হতে শুরু করেছে। উনার বুকটা ওঠানামা করছে। "তারপর?" উনি রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলেন।

"তারপর সকালে বরিশাল নেমে আমরা কিছুক্ষণ নদীর পাড়ে ঘুরব। ব্রেকফাস্ট করব। তারপর দিনের বেলায় যে লঞ্চটা ঢাকার দিকে ব্যাক করে, আমরা সেটার আরেকটা ভিআইপি কেবিন নেব। বরিশাল থেকে ঢাকা ফেরার পুরোটা পথ, আমি আবারও তোমাকে আমার বাহুডোরে আটকে রাখব। তোমাকে আদর করতে করতে আমি আবার ঢাকায় ফিরব। বিকেলে তোমাকে ঢাকায় নামিয়ে দিয়ে, আমি রাতের বাসে সোজা নওগাঁ চলে যাব।"

আমার এই মাস্টারপ্ল্যান শোনার পর আনিকা কয়েক সেকেন্ড কোনো কথাই বলতে পারলেন না। উনার মুখটা হাঁ হয়ে আছে। "মাই গড রাশেদ!" আনিকা হঠাৎ একটা চাপা, বন্য আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। "তুমি সত্যি বলছ? এমন করা যাবে? এটা তো একটা আস্ত মুভির প্লট! নদীর বুকে, ভাসমান একটা রুমে সারা রাত... ওহ গড! আমার এখনই শরীর কাঁপছে।"

"অবশ্যই করা যাবে," আমি একটা কনফিডেন্ট হাসি দিলাম। "চল দেখি, কতদূর কী হয়।"

আমাদের প্ল্যান খুব দ্রুত সেট হয়ে গেল।

"আমরা একসাথে সদরঘাট যাব না," আমি গোয়েন্দাদের মতো নির্দেশ দিতে শুরু করলাম। "তুমি এখান থেকে একটা উবার নিয়ে সোজা সদরঘাট চলে যাবে। আমি যাব আরেকটা বাহনে। আমরা লঞ্চ ঘাটে গিয়ে মিট করব। তারপর একসাথে উঠে সোজা আমাদের সুইটে ঢুকে যাব।"

আনিকা একটু চিন্তিত মুখে বললেন, "কিন্তু রাশেদ, লঞ্চের বুকিংয়ের সময় যদি আমাদের পরিচয় জানতে চায়? আমরা কী পরিচয় দেব? স্বামী-স্ত্রী?"

আমি হো হো করে হেসে উঠলাম। "স্বামী-স্ত্রী! আরে দূর! কী বলছ তুমি? তুমি কি আয়নায় নিজেকে দেখেছ? তোমার মতো এমন একজন আভিজাত্যে মোড়ানো, হাই-ক্লাস, বিলিয়নিয়ার নারীর সাথে আমার মতো একটা পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের ম্যাড়ম্যাড়ে ছেলেকে দেখে কেউ জীবনেও স্বামী-স্ত্রী ভাববে না। বাংলাদেশের মানুষ এত বোকা না। তারা ভাববে আমি হয়তো কোনো পালিত প্রেমিক বা গিগলো, যে বড়লোকের বউ ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে!"

আনিকা আমার কথায় শব্দ করে হেসে ফেললেন। "খুব ফাজিল হয়েছ তুমি! তাহলে কী বলবে?"

"সেটা আর তোমার জানা লাগবে না," আমি চোখ টিপে বললাম। "তুমি লঞ্চে ওঠার পর ওই আইডিয়া আমি ম্যানেজ করে নেব। তুমি শুধু একটা কাজ করবে।"


"কী?"

"তুমি এখন সোজা তোমার ধানমন্ডির বাসায় যাও। খুব দ্রুত একটা ফ্রেশ শাওয়ার নাও। তারপর একদম সাধারণ, ক্যাজুয়াল একটা বাঙালি পোশাক পরো। একটা সিম্পল সালোয়ার কামিজ। কোনো দামি গয়না বা মেকআপ না। আর হ্যাঁ, সাথে কোনো লাগেজ, ভ্যানিটি ব্যাগ বা ট্রলি কিচ্ছু নেবে না।"

"লাগেজ নেব না? কিন্তু আমার তো কিছু চেঞ্জিং ক্লথস বা দরকারি জিনিস লাগবে!" আনিকা অবাক হয়ে বললেন।


আমি খুব সিরিয়াস গলায় বললাম, "একদম না আনিকা। তোমার বাসার নিচে হয়তো পুলিশের সোর্স দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। তারা যদি দেখে যে বেলালের নিখোঁজ হওয়ার পর তুমি হাতে লাগেজ বা ট্রলি নিয়ে বাসা থেকে বের হচ্ছ, তারা সাথে সাথে সন্দেহ করবে যে তুমি পালাচ্ছ। তখন গোপনে তোমার পিছু নিতে পারে।  তুমি জাস্ট খালি হাতে, একটা ছোট পার্স নিয়ে বের হবে। যেন তুমি জাস্ট নিচে কোনো সুপারশপে বা একটু হাঁটতে বের হয়েছ। পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়ার এটাই একমাত্র পথ।"

আনিকা মুগ্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।


"কিন্তু আমার কাপড়চোপড়? ব্রাশ? তোয়ালে?"

আমি উনার দিকে একটু ঝুঁকে এসে উনার কানের খুব কাছে ফিসফিস করে বললাম, "আমার ট্রাভেল ব্যাগে তোয়ালে, ব্রাশ, সব আছে। আর কাপড়ের কথা বলছ? আনিকা, একবার লঞ্চের ওই ভিআইপি সুইটে ঢুকে দরজাটা লক করার পর... তোমার আর কোনো কাপড়ের দরকার হবে না। পুরো বরিশাল ট্রিপে তোমাকে কোনো কাপড় পরতেই হবে না। আমিই তোমার কাপড়।"

কথাটা শোনার পর আনিকার সারা শরীরটা একটা প্রবল শিহরণে কেঁপে উঠল। উনার চোখের মণি দুটো কামনায় কালো হয়ে গেল। "তুমি সত্যিই একটা জাদুকর রাশেদ," আনিকা একটা চাপা, ভেজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন।

"আর কোনো কথা না," আমি উঠে দাঁড়ালাম। "প্ল্যান অনুযায়ী কাজ শুরু করো। তুমি বাসায় যাও, ফ্রেশ হয়ে সদরঘাটের জন্য উবার নাও। আর আমি এখান থেকে ডিরেক্ট সদরঘাট চলে যাচ্ছি লঞ্চের টিকিট ম্যানেজ করতে।"

আনিকাও উঠে দাঁড়ালেন। উনার চোখে এখন একটা বন্য, আদিম রোমাঞ্চের নেশা। আমি আমার ট্রাভেল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে রিকসার খোঁজে মোড়ের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম, আর আনিকা উনার ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের দিকে।
আমাদের সামনে এখন বুড়িগঙ্গার কালো জল, একটা ভাসমান বিলাসবহুল কেবিন, আর একটা অনন্ত কামনার রাত অপেক্ষা করছে। আমি জানি না এই অ্যাডভেঞ্চারের শেষ কোথায়, কিন্তু এই মুহূর্তের রোমাঞ্চটা পৃথিবীর যেকোনো থ্রিলার মুভিকে হার মানানোর জন্য যথেষ্ট।

Like Reply
Mind-boggling
Like Reply




Users browsing this thread: 1 Guest(s)