Thread Rating:
  • 31 Vote(s) - 3.58 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
আনিকা কি একজন স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক মহিলা। রাশেদ কোনো সাইকোর ফাঁদে পড়ল কি না? এরূপ অনেক ভাবনাই চিন্তায় আসে। লেখক একটা রোমান্টিক গল্পকে মনে হয় পুরোপুরি থ্রিলার গল্পে রূপান্তর করে ফেলেছেন। এটা অবশ্যই লেখকের কৃতিত্ব এবং একই সাথে ধন্যবাদ প্রাপ্য। দেখি সামনে কি চমক আসে। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম।
[+] 2 users Like skam4555's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
এই আপডেটেও রহস্য খোলাসা হলোনা। দারুন থ্রিল। প্রতিদিন আপনার এই গল্পের আপডেটের জন্য একাধিকবার সাইটে আসি। নিয়মিত আপডেটের জন্য কৃতজ্ঞতা।
[+] 1 user Likes Rahat123's post
Like Reply
৩২।
আজ সোমবার। সকাল থেকে আমি মেসের রুমেই আছি। রাজু আর তুহিন দুজনেই বাইরে গেছে। মেস একদম ফাঁকা। আমি সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে জীবনের হিসেব মেলাচ্ছিলাম। দুপুর ঠিক বারোটা বেজে বিশ মিনিট। আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। অলস ভঙ্গিতে ফোনটা হাতে নিলাম। স্ক্রিনে একটা আননোন নাম্বার। আমার বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। আননোন নাম্বার মানেই এখন আমার কাছে একটা সাইরেনের মতো মনে হয়। আমি একটু দ্বিধা করে কলটা রিসিভ করলাম।


"হ্যালো?" আমি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলার স্বর রাখার চেষ্টা করে বললাম।

ওপাশ থেকে অত্যন্ত ভরাট, গম্ভীর এবং একটা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল।"রাশেদ আহমেদ বলছেন?"

"হ্যাঁ, আমি রাশেদ আহমেদ বলছি। আপনি কে?"


"আমি কলাবাগান থানা থেকে সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ বলছি।"

কথাটা আমার কানে পৌঁছানোর সাথে সাথে আমার মনে হলো, আমার মাথার ওপর কেউ একটা দশ টন ওজনের হাতুড়ি দিয়ে সজোরে বাড়ি মারল। আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল, বরফগলা বাতাস যেন নিচের দিকে নেমে গেল। আমার হাত কাঁপতে শুরু করল। আমার চারপাশের পৃথিবীটা এক মুহূর্তের জন্য যেন স্থির হয়ে গেল।
"হ্যালো? শুনতে পাচ্ছেন?" ওপাশ থেকে এসআই তৌহিদের গলা আবার ভেসে এল।

আমি ঢোঁক গিললাম। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কোনোমতে আমার ভোকাল কর্ড থেকে শব্দ বের করলাম, "জি... জি, শুনতে পাচ্ছি। বলুন।"

"আপনাকে একটু আমাদের থানায় আসতে হবে।" এসআই তৌহিদ খুব ফ্ল্যাট, ইমোশনহীন গলায় বললেন।

আমার বুকের ভেতর তখন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি, এই মুহূর্তে প্যানিক করা যাবে না। আমাকে এমন একটা ভান করতে হবে যেন আমি কিছুই জানি না। "থানায় আসতে হবে?" আমি অত্যন্ত অবাক হওয়ার এবং কিছুই না বোঝার ভান করে বললাম। "কিন্তু কেন? কী কারণে আমাকে থানায় যেতে হবে? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।"

ওপাশ থেকে এসআই তৌহিদ একটু বিরক্তির সুরে বললেন, "থানায় আসুন, বিস্তারিত জানবেন। ফোনে তো আর সব কথা বলা যায় না। আপনার নামে একটা ইনকোয়ারি আছে।"

"কিন্তু স্যার, আমি তো একজন সাধারণ চাকরিজীবী। আমার তো কোনো মামলা বা..."


"আরে ভাই, আপনাকে তো কেউ অ্যারেস্ট করছে না। জাস্ট একটা ইনফরমেশনের ব্যাপারে কথা বলার জন্য ডাকা হয়েছে। দেরি করবেন না। আজ বিকেলের আগেই থানায় চলে আসবেন।"

"আচ্ছা স্যার... আমি আসছি। কিন্তু কলাবাগান থানায় গিয়ে আমি কাকে খুঁজব?"

"থানায় এসে ডিউটি অফিসারকে বলবেন সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ ডাকছে। আমি দোতলায় ইনভেস্টিগেশন রুমে থাকি। ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের মোড় পার হয়ে একটু সামনে গেলেই কলাবাগান থানা। চিনে আসতে পারবেন তো?"

"জি স্যার, চিনে আসতে পারব।"

"ঠিক আছে। বিকেলের মধ্যে চলে আসুন।"

খট। ফোনটা কেটে গেল।

আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বিছানার ওপর বসে রইলাম। আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। ঘরের ফ্যানটা ঘুরছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমার চারপাশে কোনো বাতাস নেই। থানা থেকে কল চলে এসেছে! তার মানে পুলিশ তদন্ত শুরু করে দিয়েছে। তারা আনিকার জিডির সূত্র ধরে আমার নাম্বার জোগাড় করেছে। এখন আমাকে যেতে হবে থানায়। একটা জ্যান্ত পুলিশ স্টেশনে!

বাঙালি মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে পুলিশের থানা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা। ভূত, প্রেত, ডাকাত— এদের চেয়েও বেশি ভয়ংকর হলো থানা। সেখানে একবার ঢুকলে একটা সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষও দাগি আসামির মতো অনুভব করতে শুরু করে। আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। আমার এখন একজনকে খুব দরকার।

আমি দ্রুত আমার কন্টাক্ট লিস্ট বের করে আশিক ভাইয়ের নাম্বারে ডায়াল করলাম। একবার, দুইবার... তিনবারের মাথায় আশিক ভাই কল রিসিভ করলেন। "হ্যালো, রাশেদ? কী খবর ব্রাদার?" আশিক ভাইয়ের গলায় সেই চিরচেনা, ডন্ট-কেয়ার মার্কা রিল্যাক্সড ভাব। ব্যাকগ্রাউন্ডে রাস্তায় গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা যাচ্ছে, হয়তো উনি কোনো অ্যাসাইনমেন্টে বাইরে আছেন।

"আশিক ভাই... সর্বনাশ হয়ে গেছে!" আমি প্রায় কেঁদে দেওয়ার মতো গলায় বললাম।

"আরে, কী হইলো আবার? এত প্যানিক করতেছ ক্যান?"

"ভাই, কলাবাগান থানা থেকে ফোন করেছিল। সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ। আমাকে আজ বিকেলের মধ্যে থানায় দেখা করতে বলেছে। ভাই, আমার তো ভয়ে হাত-পা কাঁপছে। পুলিশ আমাকে ডাকছে মানে তো আমাকে সাসপেক্ট করছে! এখন আমি কী করব ভাই?"

আমি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে হাঁপাতে লাগলাম। আশিক ভাই ওপাশ থেকে খুব জোরে একটা হাসি দিলেন। উনার হাসির শব্দ শুনে আমার মনে হলো, আমি কি কোনো জোকস বললাম নাকি! "আরে মিয়া, তুমি তো দেখি এক্কেবারে বাচ্চা পোলাপান! পুলিশ ডাকছে তো কী হইছে? পুলিশ তো আর বাঘ-ভাল্লুক না যে তোমারে ধইরা খাইয়া ফেলব!" আশিক ভাই খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন।

"ভাই, আপনি তো ক্রাইম রিপোর্টার। আপনার কাছে থানা-পুলিশ ডালভাত। কিন্তু আমি তো জীবনে থানার বারান্দাও মাড়াইনি! আমাকে যদি ওরা রিমান্ডে নেয়? যদি মারে?"

"আরে ধুর! তুমি জিডির ইনকোয়ারিতে গেছ, মার্ডার কেসের আসামি হিসেবে যাও নাই যে তোমারে রিমান্ডে নিব। শোনো রাশেদ, একদম ভয়ের কিছু নাই। তুমি একাই যাও। নরমাল মানুষের মতো গিয়া কথা বইলা আসো। এসআই তৌহিদরে আমি চিনি, লোকটা একটু ঘাড়ত্যাড়া, কিন্তু সুবিধার লোক। তুমি জাস্ট গিয়ে যা সত্যি তাই বলবা। বলবা যে তুমি প্রুফরিডার, কাজ শেষ করে চলে আসছ। এর বাইরে তুমি আর কিচ্ছু জানো না।"

"কিন্তু ভাই, আমি একা যাব? আপনি কি আমার সাথে একটু..." আমি খুব মিনমিন করে বললাম।

"আমার তো এখন একটা জরুরি কাজে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে যাইতে হইতেছে ব্রাদার," আশিক ভাই বললেন। "তুমি একাই যাও। কনফিডেন্টলি কথা বলবা। আর শোনো, যদি দেখো যে পরিস্থিতি বেগতিক, বা তৌহিদ তোমার সাথে বেশি তেড়িবেড়ি করতেছে, তাইলে জাস্ট বলবা— 'আমি ঢাকা পেপারসের আশিক ভাইয়ের কলিগ। আপনি চাইলে ওসির সাথে কথা বলতে পারেন।' আর যদি গিয়ে তোমার বেশি ভয় লাগে বা কোনো ঝামেলা মনে হয়, আমারে ডিরেক্ট ফোন দিও। আমি সাথে সাথে কোর্ট থাইকা চইলা যামু। কোনো প্যারা নাই। রিল্যাক্স!"

আশিক ভাইয়ের এই 'প্যারা নাই' শব্দটা আমার কাছে সাময়িকভাবে একটা লাইফ জ্যাকেটের মতো মনে হলো। উনি যেভাবে কথা বলেন, তাতে মনে হয় দুনিয়ার কোনো কিছুই উনার কাছে সিরিয়াস না। "আচ্ছা ভাই। আমি যাচ্ছি বিকেলে। আমার জন্য দোয়া করবেন," আমি করুণ গলায় বললাম।

"দোয়া করার কী আছে! যাও, বীরদর্পে গিয়া ঘুরে আসো। আর ঝামেলা হইলে তো আমি আছিই।"

ফোনটা রেখে আমি বিছানা থেকে উঠলাম। আমাকে থানায় যেতে হবে। আমি আলমারি থেকে একটা খুব সাধারণ, ক্যাজুয়াল ফুলহাতা শার্ট আর একটা জিন্সের প্যান্ট বের করলাম। আমি চাই না পুলিশ আমাকে দেখে খুব স্মার্ট বা খুব আনস্মার্ট ভাবুক। আমাকে এমন একটা লুক তৈরি করতে হবে, যাতে আমাকে দেখলে নিতান্তই একটা গোবেচারা, ছাপোষা মানুষ মনে হয়।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। আমি মেস থেকে বেরিয়ে মিরপুর ১০ নাম্বার গোলচত্বরে এসে একটা সিএনজি নিলাম।
"মামা, কলাবাগান যাব। ধানমন্ডি ৩২ এর মোড়ে," আমি সিএনজিওয়ালাকে বললাম। সিএনজি চলতে শুরু করল।

এপ্রিল মাসের তপ্ত বিকেল। ঢাকা শহরের রাস্তায় তখন রোদের তেজ কিছুটা কমলেও, একটা ভ্যাপসা, গুমোট গরম চারপাশ ঘিরে আছে। সিএনজির ভেতরে বসে আমি ঘামছি। আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।

সিএনজিটা আগারগাঁও, ফার্মগেট, পান্থপথ হয়ে কলাবাগানের দিকে এগোচ্ছে। রাস্তার এই চেনা দৃশ্যগুলো আজ আমার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা মনে হচ্ছে। চারপাশের মানুষগুলো কত স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যাচ্ছে, হাসছে, কথা বলছে। তারা জানে না, এই সিএনজিতে বসে থাকা একটা মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়া খেলতে একটা পুলিশের থানায় যাচ্ছে।

আমার মাথার ভেতর তখন শুধু আনিকার কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। উনি বলেছিলেন, "আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না। আমার একটা প্ল্যান আছে।" কী সেই প্ল্যান? এই পুলিশের ইনকোয়ারি কি সেই প্ল্যানের কোনো অংশ? নাকি আনিকা নিজেই কোনো বড় ফাঁদে পড়ে গেছেন?

আমার বুকটা ধকধক করছে। আমি মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করলাম। আমি জীবনে খুব একটা ধর্মকর্ম করিনি, কিন্তু বিপদে পড়লে মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হলো ওই ওপরওয়ালা। "হে আল্লাহ, আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো। আমি আর কোনোদিন অন্যের বউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাব না। আমাকে জাস্ট আজকের মতো বাঁচিয়ে দাও।"

সিএনজি এসে ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের মোড় পার হয়ে একটা হলুদ রঙের, দোতলা বিল্ডিংয়ের সামনে থামল।

বিল্ডিংয়ের সামনে বড় করে সাইনবোর্ড লাগানো— "কলাবাগান মডেল থানা, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।"

সামনে কয়েকটা পুলিশের পিকআপ ভ্যান, একটা ভাঙাচোরা লেগুনা আর কয়েকটা সিজ করা মোটরসাইকেল রাখা আছে। কিছু পুলিশ সদস্য অস্ত্র হাতে ডিউটি করছে। ভেতরে একটা অদ্ভুত কোলাহল আর গুমোট পরিবেশ।
আমি সিএনজির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে থানার গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম।

আমার পা দুটো কাঁপছে। আমার গলার ভেতরটা একদম শুকিয়ে গেছে। আমি একটা বড় করে শ্বাস নিলাম। "প্যারা নাই রাশেদ। প্যারা নাই," আমি আশিক ভাইয়ের কথাটা মনে মনে আওড়ালাম। কিন্তু আমার ভেতরের আত্মাটা তখনো চিৎকার করে বলছে— "পালাও রাশেদ! এখনো সময় আছে, পালাও!"

আমি পালানোর চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে, বুকের সমস্ত সাহস একত্র করে কলাবাগান থানার মেইন গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখলাম।
 
পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে ঢুকলে মানুষের মনে হয় সে তার সমস্ত আত্মসম্মান, কনফিডেন্স আর অহংকার বাইরে পাপোশে মুছে রেখে ভেতরে ঢুকেছে। বাংলাদেশের যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের থানা হলো ঠিক সেরকমই একটা জায়গা। আপনি যতই সৎ, নিরীহ আর করদাতা নাগরিক হোন না কেন, থানার চৌকাঠে পা রাখার সাথে সাথেই আপনার সাবকনশাস মাইন্ড আপনাকে সিগন্যাল দিতে শুরু করবে— "তুই একটা অপরাধী! তুই নির্ঘাত কোনো না কোনো পাপ করেছিস!"

কলাবাগান মডেল থানার মেইন গেট দিয়ে যখন আমি ভেতরে ঢুকলাম, তখন আমার অবস্থা একটা খাঁচায় আটকে পড়া ইঁদুরের মতো। চারপাশের পরিবেশটাই এমন একটা গুমোট আর অস্বস্তিকর যে দম বন্ধ হয়ে আসে। একপাশে ডিউটি অফিসারের বিশাল টেবিল, সেখানে দুজন পুলিশ বসে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে একটা মোটা খাতায় কী যেন লিখছেন। থানার ভেতরে একটা অদ্ভুত গন্ধ— ফিনাইল, পুরোনো কাগজ, মানুষের ঘাম আর একটা চাপা আতঙ্কের গন্ধ মিলেমিশে একাকার।

আমি কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে গিয়ে কনস্টেবল গোছের একটা লোককে বললাম, "ভাই, আমাকে সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ সাহেব আসতে বলেছিলেন। উনার সাথে একটু দেখা করা দরকার।"

লোকটার পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম, কিন্তু পেটের বোতামগুলো এমনভাবে টানটান হয়ে আছে যে যেকোনো সময় ছিটকে আমার চোখে এসে লাগতে পারে। সে আমার দিকে এমন একটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাল, যেন আমি মশা বা মাছির মতো তুচ্ছ কোনো প্রাণী।

"তৌহিদ স্যার তো এখন নাই। বাইরে গ্যাছে একটা ডিউটিতে। আপনে ওই কোণার রুমটায় গিয়া বসেন। স্যার আইলে কথা কইবেন," কনস্টেবল লোকটা একটা আধখোলা দরজার দিকে ইশারা করে বলল।

আমি বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নেড়ে ওই রুমটার দিকে এগিয়ে গেলাম। রুমটা সম্ভবত ওয়েটিং রুম বা ছোটখাটো ইন্টারোগেশন রুম। মাঝখানে একটা পুরোনো কাঠের টেবিল, তার চারপাশে তিনটে প্লাস্টিকের চেয়ার। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, আর এক কোণায় মাকড়সার জাল। সিলিংয়ে একটা ফ্যান ঘুরছে, তবে সেটা বাতাস দেওয়ার চেয়ে 'ক্যাঁচ... ক্যাঁচ...' শব্দ করে মানুষের স্নায়ুর ওপর চাপ তৈরি করার কাজটাই বেশি নিষ্ঠার সাথে পালন করছে।

আমি একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসলাম। এবং শুরু হলো আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে ভয়াবহ এবং স্নায়ুক্ষয়ী আধা ঘণ্টার অপেক্ষা। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, আর আমার মাথার ভেতর শত শত ভয়ংকর চিন্তার ডালপালা গজাচ্ছে। এই আধা ঘণ্টা সময় আমার কাছে মনে হলো আস্ত একটা শতাব্দী। মানুষ যখন চরম উৎকণ্ঠায় থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক পৃথিবীর সবচেয়ে নেতিবাচক আর ভয়াবহ দৃশ্যগুলো কল্পনা করতে শুরু করে।

আমি ভাবতে লাগলাম, এসআই তৌহিদ বাইরে গেছেন মানে কোথায় গেছেন? উনি কি আনিকার ফ্ল্যাটে গেছেন আমাকে ফাঁসানোর জন্য কোনো এভিডেন্স কালেক্ট করতে? উনি কি আমার মেস থেকে আমার ল্যাপটপ সিজ করে নিয়ে আসছেন?

একটু পরেই হয়তো দরজা খুলে চার-পাঁচজন ষণ্ডামার্কা পুলিশ ঢুকবে। তারা কোনো কথা না বলে সোজা আমার কলার চেপে ধরে আমাকে ফ্লোরে ফেলে দেবে। তারপর শুরু হবে রিমান্ডের সেই বিখ্যাত 'ডিম থেরাপি' বা 'ওয়াটার বোর্ডিং'। আমি কি পুলিশের মার সহ্য করতে পারব? আমার তো একটা মশারি টানাতে গেলেই হাত ব্যথা হয়ে যায়, আমি পুলিশের ওই তেল মাখানো লাঠির বাড়ি খাব কীভাবে? প্রথম বাড়িতেই তো আমি হাউমাউ করে সব বলে দেব!

আমি কি বলব যে, আমি আনিকার সাথে শুয়েছি? যদি বলি, তাহলে তো আমাকে জেনেশুনে অন্যের বউকে ফুঁসলিয়ে গুম করার দায়ে ফাঁসিয়ে দেবে। আর আনিকা? সে তো পরিষ্কার বলে দেবে— "আমি এই ছেলেকে চিনিই না। ও আমার বাসায় প্রুফরিডিংয়ের নাম করে ঢুকে আমার স্বামীকে কিডন্যাপ করেছে!"

ভয়ে আমার পেটের ভেতরটা রীতিমতো মোচড় দিয়ে উঠল। গলা শুকিয়ে মরুভূমি। টেবিলের ওপর রাখা একটা কাঁচের গ্লাসে পানি ছিল, কিন্তু সেটা খাওয়ার সাহস হলো না। কে জানে, হয়তো পুলিশের পানিতে কোনো ট্রুথ সিরাম বা সত্য বলানোর ওষুধ মেশানো থাকে! (ভয়ের চোটে আমার মাথার ভেতর হলিউডের সায়েন্স ফিকশন মুভির প্লটও ঢুকে যাচ্ছিল)।

আমি আমার পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের ম্যাড়ম্যাড়ে জীবনের কথা ভাবলাম। এই তো কদিন আগেও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল বিকল্প বাসে সিট পাওয়া আর এহসান ভাইয়ের বকা খাওয়া। আমি কেন ওই আনিকা নাওহারের ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতির মোহে পড়ে নিজের জীবনটা এভাবে ধ্বংস করতে গেলাম? ওই নারীর শরীরের একটুখানি সুখের জন্য কি নিজের জীবনটা এভাবে রিমান্ডের লাঠির নিচে সঁপে দেওয়াটা খুব জরুরি ছিল?

হায় রে পুরুষ মানুষ! একটা ফুটো পাত্রের মতো আমাদের চরিত্র। একটু রূপ আর একটু সম্মোহনী হাসির কাছে আমাদের সমস্ত ফিলোসফি, সমস্ত নৈতিকতা ধুলোয় মিশে যায়।

প্রায় বত্রিশ মিনিট পর।

দরজার হাতলটা সশব্দে ঘুরে গেল। আমার হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে এসে একটা বিশাল লাফ দিল। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম, যেন লাঠির প্রথম বাড়িটা খাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছি। "আপনি রাশেদ সাহেব?"

খুব নরম, মার্জিত এবং বিনীত একটা কণ্ঠস্বর। আমি চমকে চোখ খুললাম।  আমার কল্পনায় ছিল গোঁফওয়ালা, লাল চোখ, আর বিশাল ভুঁড়িওয়ালা কোনো পুলিশ অফিসার। কিন্তু আমার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তার পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম থাকলেও, উনাকে দেখে কোনোভাবেই পুলিশ বলে মনে হচ্ছে না।

এসআই তৌহিদের বয়স হয়তো ৩৪-৩৬-এর কাছাকাছি। খুব ছিপছিপে, স্মার্ট একটা ফিগার। মুখে ক্লিন শেভ করা, আর চুলগুলো খুব পরিপাটি করে আঁচড়ানো। উনাকে দেখে মনে হচ্ছে উনি কোনো পাবলিক ইউনিভার্সিটির নিউলি জয়েন করা লেকচারার বা কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউটিভ। উনার চেহারায় একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা আর বুদ্ধিবৃত্তিক আভা আছে।

আমি ধড়ফড় করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। "জি... " এসআই তৌহিদ হাসিমুখে ভেতরে ঢুকে আমার সামনের চেয়ারটায় বসলেন। উনার হাতে একটা পাতলা ফাইল। "বসুন। দাঁড়িয়ে থাকছেন কেন?" উনি হাতের ইশারায় আমাকে বসতে বললেন। তারপর খুব আন্তরিক গলায় বললেন, "আপনাকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো,  সরি ভাই। একটা অন্য কেইসের জরুরি কাজে একটু বাইরে যেতে হয়েছিল। জ্যামের কারণে ফিরতে লেট হয়ে গেল। "

আমি হাঁ করে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। পুলিশ! বাংলাদেশের পুলিশ আমাকে 'সরি' বলছে! আমাকে 'ভাই' বলে সম্বোধন করছে! আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের ধারণা হলো, পুলিশ মানেই ঘুষের লোভে জিহ্বা বের করে রাখা কোনো ক্ষুধার্ত নেকড়ে। যাদের কাছে সাধারণ মানুষের কোনো সম্মান নেই। কিন্তু এই লোকটাকে দেখে তো আমার ধারণা পুরোপুরি উল্টে যাচ্ছে। এই লোক তো দেখি আমার চেয়েও বেশি ভদ্র!

আমি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে একটু নার্ভাস গলায় বললাম, "না না, ঠিক আছে স্যার। কোনো অসুবিধা হয়নি।"

"স্যার বলার দরকার নেই, ভাই বললেই হবে। আমরা তো কাছাকাছি বয়সেরই হব," এসআই তৌহিদ খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখলেন। " জাস্ট একটা ইনফরমেশন গ্যাপ ক্লিয়ার করার জন্য আপনাকে ডাকা। তা, আপনি কী করেন?"

উনি খুব স্বাভাবিক, আড্ডার ছলে প্রশ্নটা করলেন। আমি আমার পকেট থেকে খুব সাবধানে আমার মানিব্যাগটা বের করলাম। আনিকার কিনে দেওয়া সেই দামি চামড়ার মানিব্যাগ। সেখান থেকে আমার একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে উনার দিকে এগিয়ে দিলাম। এসআই তৌহিদ কার্ডটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ মন দিয়ে দেখলেন।

"রাশেদ আহমেদ। ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক, ঢাকা পেপারস।" উনি কার্ড থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে একটা খুব সুন্দর, বাঁকা হাসি দিলেন।

"ওরে বাবা! এই সেরেছে! আপনি তো দেখি সাংঘাতিক মানে সাংবাদিক!" উনি হাসতে হাসতে বললেন। "ভাই, আমাদের পুলিশের এমনিতেই দুর্নামের শেষ নাই। আপনি আবার আমার নামে পত্রিকায় কোনো উল্টাপাল্টা রিপোর্ট করে দিয়েন না! আমরা কিন্তু ভাই খুব গরিব মানুষ।"

উনার এই জোকসটা শোনার পর আমার বুকের ওপর চেপে থাকা কয়েক টন ওজনের পাথরটা যেন এক নিমিষেই নেমে গেল। পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে হালকা হয়ে গেল। আমিও একটু হাসার চেষ্টা করে বললাম, "আরে ভাই, কী যে বলেন! আমি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে থাকি। আমি তো বিদেশের খবর অনুবাদ করি। দেশি খবর নিয়ে আমার কোনো কাজ নেই। আর আপনাদের নামে রিপোর্ট করার সাহস আমার কই!"

"গুড গুড," এসআই তৌহিদ কার্ডটা উনার ফাইলের ভেতর যত্ন করে রাখলেন। উনার মুখের হাসিটা তখনও লেগে আছে, কিন্তু গলার স্বরটা এবার একটু সিরিয়াস হলো। "এবার তাহলে আসল কথায় আসি। রাশেদ ভাই, আনিকা নাওহার নামের একজন লেখিকাকে তো আপনি চেনেন, তাই না?"

আমি মনে মনে আমার প্রস্তুত করা স্ক্রিপ্টটা রিহার্সাল করে নিলাম। "জি, চিনি।" আমি খুব স্বাভাবিক, নির্লিপ্ত গলায় বললাম।

"হুম। উনার হাসব্যান্ড বেলাল সাহেবকে কি আপনি চেনেন? উনার সাথে কি আপনার কখনো কথা হয়েছে?"

আমি এক মুহূর্তের জন্য থমকালাম। আমার চোখের সামনে ২রা এপ্রিল সকালের সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠল। হাতে লাগেজ নিয়ে হতভম্ব বেলাল সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন, আর আমি উনাকে বলছি, 'আনিকা তো ঘুমাচ্ছে, আপনি আসুন, বসুন!' এই জীবনে ওই একবারই তো কথা হয়েছে উনার সাথে!

আমি আমার কণ্ঠস্বর একদম নিখুঁত রেখে বললাম, "চিনি। অল্প পরিচয়। একবারই কথা হয়েছে।" এসআই তৌহিদ উনার ফাইল থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। উনার দৃষ্টিতে একটা সূক্ষ্ম জিজ্ঞাসু ভাব। "উনার স্ত্রীর সঙ্গেও কি আপনার এরকম হালকা পরিচয়?"

"না," আমি খুব প্রফেশনাল একটা টোন এনে বললাম। "আনিকা আপুর সঙ্গে আমার কাজের সূত্রে পরিচয়। উনার একটা বইয়ের প্রুফ রিড আমি করেছি, যেটা এবার মেলায় বেরিয়েছে। আরেকটা উপন্যাসের কাজ করছিলাম। এটা উনি এবার লন্ডনে ফেরার আগেই প্রকাশনীকে দিয়ে যেতে চাইছিলেন। তাই কাজটায় একটু তাড়াহুড়া ছিল।"

এসআই তৌহিদ উনার চশমাটা ডান হাতের তর্জনী দিয়ে একটু ঠেলে ঠিক করলেন। উনার চোখের দৃষ্টি এখন আগের চেয়ে একটু বেশি ফোকাসড। জোকস করা সেই ভদ্রলোক থেকে উনি এখন পুরোপুরি একজন ইনভেস্টিগেটিং পুলিশ অফিসারে পরিণত হয়েছেন।

"আনিকা ম্যাডাম গতকাল থানায় এসে একটা মিসিং জিডি করেছেন," এসআই তৌহিদ শান্ত গলায় বললেন। "উনার স্বামী বেলাল সাহেব সপ্তাহখানেক আগে লন্ডন থেকে ঢাকায় আসেন। কিন্তু তিন দিন আগের রাত থেকে উনাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উনার ফোন বন্ধ। তো, আনিকা ম্যাডাম বলেছেন, বেলাল সাহেব দেশে ফেরার আগের কয়েকটা দিন আপনি উনাদের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে গেস্ট হিসেবে ছিলেন। আপনার পাণ্ডুলিপির কাজ ছিল বলে উনি আপনাকে থাকতে দিয়েছিলেন।"

"জি, কথা সত্য," আমি খুব কনফিডেন্টলি বললাম। "আপু আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিলেন। উনার কাজটা একটু তাড়া ছিল, আর আমি মিরপুরের মেস থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করে কাজটা করতে পারছিলাম না বলে উনি কয়েকদিনের জন্য উনার গেস্ট রুমে আমাকে থাকতে দিয়েছিলেন।"

এসআই তৌহিদ আমাকে থামিয়ে দিয়ে খুব দ্রুত একটা প্রশ্ন করলেন, "আপনি কবে ওই ফ্ল্যাট থেকে বের হয়েছেন?"

"সপ্তাহখানেক আগেই," আমি একদম সত্য কথাটা বললাম। আমি আসলেই সপ্তাহখানেক আগে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়েছি, যদিও আমার বের হওয়ার কনটেক্সট আর পুলিশের ভাবা কনটেক্সট সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।

এসআই তৌহিদ একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। পুলিশ কাকতালীয় বিষয়গুলোতে বিশ্বাস করে না, তারা সবকিছুর মধ্যে একটা যোগসূত্র খোঁজে।

"
সপ্তাহখানেক আগে বেলাল সাহেব দেশে এলেন, আর আপনি সপ্তাহখানেক আগেই বাসা ছাড়লেন। কী কারণ?" উনার গলার স্বরে একটা প্রচ্ছন্ন জেরা করার সুর।

আমি মনে মনে হাসলাম। মধ্যবিত্ত বাঙালি ছেলেদের একটা বড় গুণ হলো, তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে একটা চমকার, বিশ্বাসযোগ্য পারিবারিক বা সামাজিক লজিক দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারে। আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে একটু হেসে বললাম, "তেমন স্পেসিফিক কোনো কারণ নাই ভাই। একে তো পাণ্ডুলিপির কাজটা শেষ হয়ে আসছিল। আর আনিকা আপু জানিয়েছিলেন যে উনার হাজব্যান্ড আসবেন। আমি তখন নিজে থেকেই উনাকে বললাম, কাজ যে অল্প বাকি আছে তা আমি আমার মেসেই করতে পারব। উনারা স্বামী-স্ত্রী, অনেক দিন পর বিদেশ থেকে দেখা হবে, আমি খামোখা উনাদের মাঝখানে 'কাবাব মে হাড্ডি' হতে চাই না। তাই আমি নিজের জিনিসপত্র নিয়ে মেসে চলে আসি।"

আমার এই 'কাবাব মে হাড্ডি' লজিকটা একটা মাস্টারস্ট্রোকের মতো কাজ করল। এসআই তৌহিদের চোখের সেই তীক্ষ্ণ, সন্দেহজনক দৃষ্টিটা নিমেষেই নরম হয়ে গেল। যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছেই এই যুক্তিটা শতভাগ পারফেক্ট মনে হবে।

"হুম," এসআই তৌহিদ একটা কলম দিয়ে ফাইলের ওপর হালকা টোকা দিতে লাগলেন। আমার যুক্তিটা উনি পুরোপুরি গ্রহণ করেছেন। "আপনি তো ওই ফ্ল্যাটে প্রায় সপ্তাহ তিনেক ছিলেন। একটা মানুষ যখন এত কাছ থেকে কাউকে দেখে, তখন অনেক কিছুই তার চোখে পড়ে। রাশেদ ভাই, আপনি কি আনিকা ম্যাডাম আর উনার স্বামীর মধ্যে ফোনে কোনো ঝগড়াঝাঁটি বা অশান্তি হতে দেখেছেন? মানে, উনাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন ছিল বলে আপনার মনে হয়েছে?"
প্রশ্নটা খুব ট্রিকি। আমি যদি বলি সম্পর্ক খারাপ ছিল, তাহলে পুলিশের সন্দেহ আনিকার দিকে যাবে। আর যদি বলি খুব ভালো ছিল, তাহলে পুলিশ নিখোঁজ হওয়ার অন্য মোটিভ খুঁজবে।
[+] 12 users Like Orbachin's post
Like Reply
Fatafati
[+] 1 user Likes Saj890's post
Like Reply
একেবারে পুরোদস্তুর একটা গোয়েন্দা কাহিনী। লেখক গোয়েন্দা কাহিনী লিখতেও যে এত সিদ্ধহস্ত তা ভালই অনুধাবন করলাম। রাশেদের মনের অস্থিরতা আর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কাহিনীর মধ্যে টান টান উত্তেজনাও বজায় রয়েছে। একটি সুন্দর পর্বের জন্য ধন্যবাদ।
[+] 1 user Likes skam4555's post
Like Reply
Great update... Bes thrilling... Chalia jan
[+] 1 user Likes Akhilaa's post
Like Reply
Darun darun... Ak kothai osadharon ... Next update er opekhai
[+] 1 user Likes Slayer@@'s post
Like Reply
Valo hocche. Chaliye jan
Like Reply
৩৩।
আমি খুব সাবধানে, মেপে মেপে বললাম, "ভাই, আমি তো থাকতাম আমার গেস্ট রুমে। সারাদিন ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। আপু উনার রুমে থাকতেন। উনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানোর তো আমার কোনো রাইট ছিল না। তবে যতদূর দেখেছি, আপুকে তো বেশ হাসিখুশিই মনে হতো। ফোনে কথা বলার সময় কখনো চিল্লাচিল্লি বা ঝগড়া করতে শুনিনি। আমার তো মনে হয়েছে উনাদের সম্পর্ক খুব ভালো।"

"আনিকা ম্যাডামের কোনো আচরণে কি আপনার কখনো কিছু সন্দেহজনক মনে হয়েছে? ধরুন, উনি হয়তো খুব গোপনে কারো সাথে কথা বলতেন, বা হঠাৎ করে রাতে বাইরে যেতেন?"

"না ভাই, একদমই না," আমি মাথা নেড়ে বললাম। "আপু তো সারাদিন উনার লেখালেখি আর উনার আইটি ফার্মের রিমোট কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। উনি খুব প্রফেশনাল একজন মানুষ। আমার অন্তত কোনো কিছু সন্দেহজনক মনে হয়নি।"

আমি এত সুন্দর করে, এত নিখুঁতভাবে মিথ্যাগুলো বলে যাচ্ছিলাম যে আমার নিজেরই মাঝে মাঝে অবাক লাগছিল। মানুষের বাঁচার তাগিদ তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বানিয়ে দিতে পারে। আমার কথাগুলো এসআই তৌহিদ উনার একটা ছোট নোটবুকে টুক করে লিখে নিলেন।

এর মধ্যেই একজন কনস্টেবল দুটো লাল রঙের প্লাস্টিকের কাপে করে চা দিয়ে গেল। "চা খান রাশেদ ভাই। থানার চা, খুব একটা ভালো হবে না, তবে গলা ভেজানো যায়," এসআই তৌহিদ হাসিমুখে নিজের কাপটা হাতে নিলেন। আমি চায়ের কাপে একটা চুমুক দিলাম। চায়ে আদার কড়া একটা ফ্লেভার। আমার স্নায়ুগুলো এখন অনেকটাই রিল্যাক্সড।

চা খেতে খেতে এসআই তৌহিদ হঠাৎ একটু ব্যক্তিগত সুরে জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা রাশেদ ভাই, আপনি তো একজন বুদ্ধিমান মানুষ, সাংবাদিক। আপনার সিক্সথ সেন্স কী বলে? আপনার কী মনে হয়, এই বেলাল সাহেব লোকটা কই নিখোঁজ হলো? কীভাবে নিখোঁজ হলো?"

আমি চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে একটু ভাবার ভান করলাম। "ভাই, আমি তো আসলে উনাকে চিনিই না। তবে ঢাকা শহরের যা অবস্থা! হয়তো এয়ারপোর্ট থেকে আসার পথে, বা ওইদিন রাতে বাইরে বের হওয়ার পর কোনো ছিনতাইকারী বা মলম পার্টির পাল্লায় পড়েছেন। উনারা তো এলিট ক্লাসের মানুষ, হাতে দামি ফোন, পকেটে পাউন্ড-ডলার থাকে। সন্দেহ করার মতো কোনো নির্দিষ্ট কাউকে তো আমি দেখছি না।"

এসআই তৌহিদ শুধু মাথা নাড়লেন। কিছু বললেন না। আমি বুঝলাম, এই লোকটা আমাকে জাস্ট একটা রুটিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই ডেকেছে। আমার ওপর উনার বিন্দুমাত্র কোনো সন্দেহ নেই। আমি এখন পুরোপুরি সেফ জোনে আছি। আর এই সেফ জোনে থাকার কনফিডেন্স থেকেই আমি আমার ট্রাম্প কার্ডটা খেলার সিদ্ধান্ত নিলাম। আশিক ভাই আমাকে যে কার্ডটা দিয়েছিলেন।

"আচ্ছা তৌহিদ ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করি?" আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললাম।
"জি, বলুন।"
"আপনাদের থানার ওসি শাহাদাত সাহেবের সাথে কি একটু দেখা করা যাবে? উনি কি আছেন থানায়?"

ওসি শাহাদাত সাহেবের নাম শোনার সাথে সাথেই এসআই তৌহিদের চোখের দৃষ্টিতে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন এল। উনি কাপ থেকে মুখ তুলে একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। "স্যার তো উনার রুমে আছেন। কিন্তু কেন? উনাকে চিনেন কীভাবে?"

আমি খুব শান্তভাবে, একটু হালকা হাসি দিয়ে বললাম, "না, তেমন কোনো দরকার নেই। আসলে ওসি শাহাদাত সাহেব আমার এক বড় ভাইয়ের খুব ক্লোজ বন্ধু। আমাদের ঢাকা পেপারসের ক্রাইম রিপোর্টার আশিক ভাই। আশিক ভাই বললেন, কলাবাগান থানায় যখন যাচ্ছি, তখন শাহাদাত ভাইকে যেন একটা সালাম দিয়ে আসি।"

আশিক ভাইয়ের নাম আর ওসি সাহেবের বন্ধুত্বের রেফারেন্সটা একটা ম্যাজিকের মতো কাজ করল। এমনিতেই এসআই তৌহিদ আমার সাথে খুব ভদ্র আচরণ করছিলেন, কিন্তু এই কথাটা শোনার পর উনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এক নিমেষে আরও বেশি নম্র, আরও বেশি বন্ধুসুলভ হয়ে গেল। পুলিশ ডিপার্টমেন্টে উপর মহলের রেফারেন্স বা ক্রাইম রিপোর্টারদের কানেকশন খুব বিশাল একটা ব্যাপার।

"ওহ! আপনি আশিক ভাইয়ের কলিগ! উনি তো আমাদের থানার রেগুলার গেস্ট।"

আমার ভেতরের সাংবাদিক এবং কৌতূহলী সত্তাটা এবার একটু নড়েচড়ে বসল। পরিস্থিতি যখন এতটা আমার অনুকূলে, তখন এই সুযোগে কেসটার আসল আপডেট জেনে নেওয়াটা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে না?

"তৌহিদ ভাই, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?" আমি একটু গলা নামিয়ে বললাম।
"জি, সিওর।"
"এই বেলাল সাহেবের মিসিং কেসটা আসলে কতদূর আগাল? মানে, পুলিশ কি কোনো ক্লু পেয়েছে?"

এসআই তৌহিদ একটু ইতস্তত করলেন। উনার পেশাদারি আচরণ উনাকে বাধা দিচ্ছিল।
"দেখুন রাশেদ ভাই, কেস রিলেটেড কারও সঙ্গে তথ্য শেয়ার করাটা ঠিক হবে না।  রুলসের বাইরে।"

আমি একটু হাসলাম। "ভাই, আমি তো সাংবাদিক। আপনি না বললেও আমিও জেনে যাব। আমার আসলে জাস্ট কৌতূহল থেকে জানতে চাওয়া। তাছাড়া, বলা তো যায় না, হয়তো আপনাদের ইনভেস্টিগেশনে আমার কোনো কথা বা কোনো ধারণা হেল্পও হতে পারে।"

এসআই তৌহিদ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। "মিডিয়াতে যতটুকু ব্রিফ করা যায়, আমি আপনাকে ততটুকুই বলছি। বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার প্যাটার্নটা খুব অদ্ভুত। আমরা উনার ফোন কল হিস্ট্রি আর লোকেশন ট্র্যাকিং করে দেখেছি। ওইদিন রাতে, মানে যে রাতে উনি নিখোঁজ হন, উনার নাম্বারে একটা আননোন নাম্বার থেকে কল এসেছিল। কথা হয়েছিল মাত্র চল্লিশ সেকেন্ড।"

আমি রুদ্ধশ্বাসে শুনছিলাম।

"সমস্যাটা হলো," এসআই তৌহিদ কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, "যেই নাম্বার থেকে কল এসেছিল, সেই নাম্বারটা ওইদিন রাতেই প্রথম অন হয়েছে। একটা বার্নার বা ফেক সিম। আমরা সিমের বায়োমেট্রিক আর এনআইডি চেক করে দেখেছি। ওই সিমটা যার নামে কেনা হয়েছে, সেই লোক আজ থেকে তিন বছর আগে মারা গেছে! মানে, সম্পূর্ণ ভুয়া ডকুমেন্ট দিয়ে সিমটা তোলা।"

আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নেমে গেল। ভুয়া ডকুমেন্টে তোলা সিম! মৃত মানুষের এনআইডি! এগুলো তো কোনো সাধারণ ছিনতাইকারী বা মলম পার্টির কাজ নয়! এগুলো তো হাই-লেভেলের, প্রি-প্ল্যানড প্রফেশনাল ক্রিমিনালদের কাজ।

"তারপর?" আমি শুকনা গলায় জিজ্ঞেস করলাম।

"তারপর আর কী! ওই চল্লিশ সেকেন্ড কথা বলার পর বেলাল সাহেব সম্ভবত ফ্ল্যাট থেকে নিচে নামেন। আর ফ্ল্যাট থেকে বের হওয়ার ঠিক দশ মিনিটের মাথায় উনার ফোনটা সুইচড অফ হয়ে যায়। চিরতরের জন্য। ওই লাস্ট লোকেশনটা দেখাচ্ছে ধানমন্ডি লেকের কাছাকাছি। তারপর আর কোনো ট্র্যাকিং করা যায়নি। সিমটা কেউ হয়তো খুলে ফেলে দিয়েছে।"

এসআই তৌহিদ একটা হতাশার নিশ্বাস ফেললেন। "আমরা আত্মীয়স্বজন, ওই বিল্ডিংয়ের দারোয়ান, উনার স্ত্রী আনিকা ম্যাডাম, এবং এই যে আপনি— সবার সাথেই কথা বললাম। কিন্তু কেইসটা এক ইঞ্চিও আগায়নি ভাই। কোনো মোটিভ পাচ্ছি না। কোনো মুক্তিপণের দাবিও আসেনি। এদিকে বেলাল সাহেব হলেন একদম এলিট ক্লাসের লোক, ইংল্যান্ডের সিটিজেন। ওপর মহল থেকে প্রচণ্ড প্রেসার আসছে কেইসটা সলভ করার জন্য। আমরা রীতিমতো ঘামছি।"

আমি এসআই তৌহিদের দিকে তাকিয়ে একটা সমবেদনা জানানোর ভান করলাম। "ভালোই তো গ্যাঞ্জামে পড়েছেন আপনারা ভাই। কেইসটা তো দেখছি বেশ জটিল।"

"আর বইলেন না! দেখি কতদূর কী হয়। আমাদের টেকনিক্যাল টিম কাজ করছে," এসআই তৌহিদ উঠে দাঁড়ালেন।

আমাদের কথাবার্তা শেষ। উনি আমাকে দরজার দিকে এগিয়ে দিতে এলেন। "রাশেদ ভাই, আপনি তাহলে এখন আসতে পারেন। আপনার যদি ওই ফ্ল্যাটের কোনো ঘটনা বা কোনো কথা হঠাৎ মনে পড়ে, যেটা আমাদের হেল্প করতে পারে, তাহলে আমাকে কাইন্ডলি জানাবেন," উনি পকেট থেকে উনার একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে আমাকে দিলেন। "এটা আমার পার্সোনাল নাম্বার। যেকোনো সময় কল করতে পারেন।"

আমি কার্ডটা সযত্নে আমার মানিব্যাগে রেখে দিলাম। "অবশ্যই ভাই। আর সাংবাদিক হিসেবে আমি যদি কোনো হেল্প করতে পারি, আমাকে জানাবেন। শুধু এই কেইসই হতে হবে এমন না, যেকোনো ব্যাপারেই। আশিক ভাইয়ের ছোট ভাই হিসেবে আমাকে সবসময় পাশে পাবেন।"

"থ্যাংক ইউ ভাই। ভালো থাকবেন।"

আমি থানা থেকে বেরিয়ে এলাম।

বিকেলের রোদের তেজ কমে এসেছে। কলাবাগানের রাস্তায় তখন জ্যাম শুরু হয়ে গেছে। আমি থানার গেট থেকে বেরিয়ে একটা বুকভরে শ্বাস নিলাম। মনে হলো, আমি যেন একটা জ্বলন্ত চুল্লি থেকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছি। আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। পকেট থেকে ফোন বের করে সরাসরি আশিক ভাইকে কল দিলাম।

"হ্যালো, রাশেদ? কী অবস্থা? বাইর হইছস থানা থাইকা?" আশিক ভাইয়ের গলা শুনে মনে হলো উনি জেনেই বসে আছেন আমি সেফলি বের হয়েছি।

"জি ভাই, এইমাত্র বের হলাম। আপনার কথা অক্ষরে অক্ষরে কাজে লেগেছে ভাই। ওসি শাহাদাত সাহেবের নাম বলতেই এসআই তৌহিদ একদম গলে পানি হয়ে গেছে। আমাকে রীতিমতো সম্মান করে বিদায় দিয়েছে।" আমি সব খুলে বললাম।

আশিক ভাই ওপাশ থেকে একটা সন্তুষ্ট হাসি দিলেন। "আমি তো তোমারে আগেই কইছিলাম প্যারা নাই! তুমি স্মার্ট ছেলে, ভালো সামাল দিয়া আসছ। পুলিশরে কখনো বুঝতে দিবা না যে তুমি ভয় পাইতেছ। এখন যাও, আরামে গিয়া মেসে ঘুমাও।"

"থ্যাংক ইউ ভাই। আপনার এই ঋণ আমি জীবনেও শোধ করতে পারব না।"

ফোন রেখে আমি মিরপুরের বাসে উঠলাম।

বাসের জানালার পাশে বসে আমি বাইরের ছুটে চলা ঢাকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার ওপর থেকে পুলিশের রিমান্ডের ভয়টা হয়তো কেটে গেছে, কিন্তু আমার মাথার ভেতর একটা ভয়াবহ, কালো মেঘ ঘনীভূত হতে শুরু করেছে। এসআই তৌহিদের বলা কথাগুলো আমার মগজে একটা হাতুড়ির মতো বাড়ি মারছিল। মৃত মানুষের আইডি দিয়ে তোলা ভুয়া সিম! চল্লিশ সেকেন্ডের একটা ফেক কল! ফোন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া! এগুলো কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটা একটা নিখুঁত, প্রি-প্ল্যানড গুমের ছক।

আর আনিকা
?

আনিকা নাওহার কি সত্যিই এসবের কিচ্ছু জানেন না? উনি কি সত্যিই একজন সাধারণ, শোকাহত স্ত্রী? নাকি... নাকি এই পুরো মাস্টারপ্ল্যানটা উনারই মস্তিষ্কপ্রসূত? বেলাল সাহেবকে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এই ভুয়া সিম, এই ফেক কল— সব কি উনারই সাজানো নাটক?

আর যদি তাই হয়, তবে আমি, রাশেদ আহমেদ, একজন পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের বোকা অনুবাদক, কি উনার এই ভয়ংকর, রক্তমাখা দাবা খেলার একটা সাধারণ ঘুঁটি মাত্র? আমার পুরো শরীরটা বাসের সিটের ওপর একটা অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল।

বাস থেকে মিরপুর দশ নাম্বারে নেমে আমি সোজা মেসে ঢুকলাম না।

আমাদের মেসের নিচে একটা টং দোকান আছে। মজিদ মামার চায়ের দোকান। আমি সেখানে গিয়ে একটা কাঠের বেঞ্চে ধপ করে বসে পড়লাম। "মামা, কড়া করে এক কাপ চা দাও তো। আর একটা বেনসন।" সিগারেটটা ধরিয়ে আমি গভীর একটা টান দিলাম। নিকোটিনের ধোঁয়াটা ফুসফুসে গিয়ে ধাক্কা মারতেই মনে হলো, আমার শরীরের অবশ হয়ে যাওয়া স্নায়ুগুলো আবার একটু একটু করে কাজ করতে শুরু করেছে। ঢাকা শহরের এই ধুলোমাখা বিকেলে, রাস্তার পাশের একটা টং দোকানে বসে চা আর সিগারেট খাওয়ার মধ্যে একটা অদ্ভুত দার্শনিক প্রশান্তি আছে। মানুষ যখন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসে, কিংবা থানা-পুলিশের মতো কোনো ভয়াবহ বিপদ থেকে বেঁচে ফেরে, তখন তার চারপাশের এই অতি সাধারণ, রুটিনমাফিক পৃথিবীটাকেও অনেক বেশি সুন্দর এবং মায়াময় বলে মনে হয়।

রাস্তা দিয়ে রিকশাগুলো টুংটাং বেল বাজিয়ে যাচ্ছে, মানুষ হৈচৈ করছে, বাসের হেলপাররা গলা ফাটিয়ে যাত্রী ডাকছে। আমি এই সাধারণ, কোলাহলময় পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার তো এই সাধারণ পৃথিবীতেই থাকার কথা ছিল! আমি কেন ওই আনিকা নাওহার নামের এক মায়াবিনী, বিলিয়নিয়ার নারীর চক্রব্যূহে নিজেকে জড়াতে গেলাম?

দুটো সিগারেট আর এক কাপ চা শেষ করে আমি মেসের সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠলাম। মেসের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই একটা গুমোট, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ নাকে এসে লাগল। রাজু আর তুহিন রুমে নেই। হয়তো বাইরে কোথাও গেছে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এখন এই মুহূর্তে কারো জেরার মুখে পড়ার মতো মানসিক অবস্থা আমার নেই।

আমি সোজা বাথরুমে ঢুকে গেলাম। মিরপুরের মেসের এই দশ ফুট বাই চার ফুটের বাথরুম। শ্যাওলা ধরা দেয়াল, কল ছাড়লে পানি পড়ার চেয়ে ঘড়ঘড় শব্দটাই বেশি হয়। আমি জামাকাপড় খুলে বালতি থেকে মগে করে ঠান্ডা পানি মাথায় ঢালতে শুরু করলাম। ঠান্ডা পানি গায়ের ওপর পড়তেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল ধানমন্ডির সেই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার ফ্ল্যাটের মাস্টার বাথরুমের দৃশ্য।

কোথায় এই বালতির পানি, আর কোথায় সেই রেইন-শাওয়ার! চোখ বন্ধ করতেই আমার কল্পনার ক্যানভাসে আনিকা নাওহারের সেই ভেজা, অনাবৃত শরীরটা জীবন্ত হয়ে উঠল। আমার মনে পড়ল, কীভাবে শাওয়ারের গরম পানির নিচে দাঁড়িয়ে উনি আমাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরেছিলেন। উনার সেই ফর্সা, মসৃণ পিঠের ওপর দিয়ে কীভাবে পানির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে উনার সুডৌল নিতম্বের খাঁজে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছিল। আমি আমার দুই হাত দিয়ে উনার কোমর চেপে ধরেছিলাম। উনার ভেজা ঠোঁটের সেই বন্য, আদিম চুম্বন— যার মধ্যে কোনো ভণিতা ছিল না, ছিল শুধু এক সর্বগ্রাসী ক্ষুধা।

গোসল করতে করতে আমি আনিকার শরীরের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি স্পর্শ নতুন করে স্মরণ করতে লাগলাম। আমার মনে পড়ল, কীভাবে আমি উনার গলার কাছে মুখ গুঁজে উনার পারফিউম আর ঘামের সেই মাতাল করা গন্ধটা টেনে নিয়েছিলাম। উনার স্তনের সেই উদ্ধত চূড়াগুলো যখন আমার বুকের সাথে ঘষা খাচ্ছিল, তখন উনার গলা দিয়ে বেরিয়ে আসা সেই চাপা, তীক্ষ্ণ দীর্ঘশ্বাসগুলো আমার কানে একটা নেশাধরা সিম্ফনির মতো বাজত। আমি উনার ভেজা চুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে উনার মুখটা আমার দিকে টেনে নিতাম, আর উনি উনার দুই পা দিয়ে আমার কোমরটা এমনভাবে পেঁচিয়ে ধরতেন যেন উনি আমার শরীরের ভেতরেই মিশে যেতে চাইছেন।

এই স্মৃতিগুলো এতই জীবন্ত আর এতই তীব্র ছিল যে, মেসের বাথরুমের কনকনে ঠান্ডা পানির নিচে দাঁড়িয়েও আমার শরীরের ভেতর দিয়ে একটা উষ্ণ, বৈদ্যুতিক স্রোত বয়ে গেল। আমার নিস্তেজ হয়ে থাকা শরীরটা আবার নতুন করে উত্তেজনায় টানটান হয়ে উঠতে শুরু করল। আনিকা নাওহার শুধু আমার শরীরকেই নয়, আমার মন, আমার কল্পনা, আমার পুরো অস্তিত্বটাকেই উনার হাতের মুঠোয় বন্দি করে ফেলেছেন।

গোসল শেষ করে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে আমি নিজের রুমে এলাম। একটা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে বিছানায় বসলাম। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। থানা থেকে ফিরে আনিকাকে একটা আপডেট দেওয়া দরকার। কিন্তু সরাসরি ফোন করাটা কি ঠিক হবে? পুলিশ যদি সত্যিই বেলাল সাহেবের কল লিস্ট চেক করে আনিকার ফোন ট্যাপ করে বসে থাকে?

আমি বারান্দায় গিয়ে বসলাম। বিকেলের রোদটা এখন বেশ নরম হয়ে এসেছে। আমি খুব সতর্ক হয়ে হোয়াটসঅ্যাপটা ওপেন করলাম।

অফিসিয়াল, দূরত্ব বজায় রাখা একটা মেসেজ ড্রাফট করলাম: "আপু, একটু কথা ছিল। ফ্রি হয়ে কল দিয়েন।"

'আপু' শব্দটা টাইপ করার সময় আমার নিজেরই হাসি পেল। যে নারীর শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি আমি আমার জিভ দিয়ে মুখস্থ করেছি, তাকে আমি 'আপু' বলে মেসেজ দিচ্ছি! কিন্তু এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। পুলিশের নজরদারি এড়াতে গেলে এমন ভণ্ডামি করা ছাড়া গতি নেই।
মেসেজটা সেন্ড করার ঠিক এক মিনিটের মাথায় আমার হোয়াটসঅ্যাপটা বেজে উঠল।

আনিকা কল করেছেন!

আমার বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। এত দ্রুত কল দিলেন? আমি একটু ইতস্তত করে, এদিক-ওদিক তাকিয়ে কলটা রিসিভ করলাম। "হ্যালো?" আমি খুব নিচু, সতর্ক গলায় বললাম।

"কী ব্যাপার? হঠাৎ 'আপু' বলে মেসেজ দিলে যে?" ওপাশ থেকে আনিকার সেই পরিচিত, মোহনীয় এবং একটু কৌতুক মেশানো গলা ভেসে এল। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। কীভাবে বোঝাব উনাকে যে আমি কতটা আতঙ্কের মধ্যে আছি!

"আনিকা... আমি তো ভেবেছিলাম পুলিশ হয়তো তোমার ফোন ট্যাপ করে রেখেছে," আমি ফিসফিস করে বললাম। "আজকে বিকেলে আমাকে কলাবাগান থানায় ডেকেছিল।"

আমার কথা শুনে আনিকা একটুও চমকালেন না। বরং ওপাশ থেকে একটা দমকা হাসির শব্দ এল। "হা হা হা! ও আচ্ছা! তুমি ফোন ট্যাপের ভয় পাচ্ছ? তুমি তো দেখছি হলিউডের জেমস বন্ডের সিনেমা একটু বেশিই দেখো রাশেদ!" আনিকা হাসতে হাসতেই বললেন।

"হাসছ কেন আনিকা? এটা কোনো জোকস না। পুলিশ যদি সত্যিই আমাদের কথা শোনে?"

"আরে বোকা!" আনিকা হাসি থামিয়ে একটু সিরিয়াস, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী গলায় বললেন। "এটা সাধারণ লোকাল কল না। এটা হোয়াটসঅ্যাপ কল। হোয়াটসঅ্যাপ এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপ্টেড। বাংলাদেশ সরকার চাইলেই আমার বা তোমার হোয়াটসঅ্যাপের ডেটা বা কল রেকর্ড নিতে পারবে না। এটার জন্য একমাত্র হোয়াটসঅ্যাপ কোম্পানি বা মেটার অনুমতি লাগবে। আর মেটা কোনো থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির পুলিশকে এত সহজে এসব ডেটা দেয় না।"

আনিকার এই টেকনিক্যাল জ্ঞান আমাকে একটু অবাক করল। উনি বলে চললেন, "আর তাছাড়া, আমার এই হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটা তো বাংলাদেশের না। এটা আমার ইংল্যান্ডের নাম্বার দিয়ে খোলা। আমার এই অ্যাকাউন্টের কোনো ডেটা বের করতে গেলে বাংলাদেশ পুলিশকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে ইংল্যান্ডের কোর্টের অর্ডার নিয়ে আসতে হবে। একটা সাধারণ নিখোঁজ ডায়েরির জন্য পুলিশ এত কাঠখড় পোড়াবে বলে তোমার মনে হয়?"

উনার যুক্তিগুলো বেশ অকাট্য। কিন্তু আমি তো বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষ। আমার ভয় তো এত সহজে যাওয়ার নয়। "তোমার ডেটা না হয় ইংল্যান্ডের কোর্টের অর্ডারে আটকে থাকবে," আমি একটু খুকখুক করে কেশে বললাম। "কিন্তু আমারটা তো আর ইংল্যান্ডের কোর্ট দেখবে না। আমি তো এই দেশেই থাকি। পুলিশ তো চাইলে আমার ডিভাইস ট্র্যাক করতেই পারে।"

আমার এই পালটা যুক্তিতে আনিকা একটু বিরক্ত হলেন বলে মনে হলো। "রাশেদ, তুমি না বেশি চিন্তা করো। পুলিশ তোমার ডিভাইস ট্র্যাক করে কী পাবে? তুমি আমার প্রুফরিডার, আমি তোমার ক্লায়েন্ট। আমরা কাজ নিয়ে কথা বলি। এর বাইরে তো কিছু প্রমাণ করার নেই। বাদ দাও এসব পুলিশের কথা। থানায় কী হলো, সেটা তো বললে না।"

আমি সংক্ষেপে এসআই তৌহিদের সাথে আমার কনভারসেশনটা জানালাম। আশিক ভাইয়ের রেফারেন্সের কথাটাও বললাম। "গুড। তুমি খুব স্মার্টলি ডিল করেছ। আমি জানতাম তুমি পারবে," আনিকা খুব শান্ত গলায় বললেন।

"আচ্ছা, এসব বাদ দাও," আনিকা হঠাৎ উনার গলার স্বরটা পাল্টে ফেললেন। উনার গলায় এখন একটা অদ্ভুত, কোমল অথচ দাবিদার সুর। "কাল বিকেলে একটু শাহবাগ মোড়ে আসবে?"

শাহবাগ মোড়ে!

কথাটা শোনার সাথে সাথেই আমার বুকের ভেতর একটা আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। আমার মনে হলো, থানার এই সব প্যারা, বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার টেনশন— সব কিছু হয়তো আনিকা আমাকে ভুলিয়ে দিতে চাইছেন। কাল বিকেলে শাহবাগ মোড়ে দেখা করা মানে হয়তো আমরা কোনো নিরিবিলি জায়গায় যাব। হয়তো উনি আমাকে উনার কোনো গোপন ডেরায় নিয়ে যাবেন, যেখানে আমরা আবার আগের মতো একে অপরকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে পারব।

"শাহবাগ মোড়ে? কটায় আসব?" আমি আমার গলার উচ্ছ্বাসটা লুকানোর চেষ্টা করেও পারলাম না। কিন্তু আমার এই আনন্দকে এক বালতি বরফ-ঠান্ডা পানি দিয়ে নিমেষেই নিভিয়ে দিলেন আনিকা।

"বিকেল চারটার দিকে এসো," আনিকা খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন। "আসলে কালকে শাহবাগে বেলালের বন্ধু আর পরিচিতরা মিলে একটা মানববন্ধন করবে। তুমিও এসো।"

"কিসের মানববন্ধন?" আমি হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

"আরে, জাস্ট একটা সামাজিকতা। বেলালের ভার্সিটির কিছু বন্ধু আর ওর প্রাক্তন কলিগরা মিলে এই ইভেন্টটা দাঁড় করিয়েছে। ব্যানার নিয়ে দাঁড়াবে— 'ইঞ্জিনিয়ার বেলালের খোঁজ চাই', 'প্রশাসন জবাব দাও'— এই টাইপের কিছু লোকদেখানো ফাঁকা বুলি আরকি। তুমি তো জানোই আমাদের দেশের মানুষ হুজুগে কতটা মাতাল হয়।" আনিকা খুব তাচ্ছিল্যের সুরে কথাগুলো বললেন।

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। এই নারীটা আসলে কী! নিজের স্বামী নিখোঁজ, তার বন্ধুরা তাকে খোঁজার জন্য মানববন্ধন করছে, আর উনি বলছেন এটা 'লোকদেখানো ফাঁকা বুলি'!

"তাতে আমার যাওয়ার কী দরকার?" আমি বিরক্তি নিয়ে বললাম। "আমি তো বেলাল সাহেবকে চিনিই না।"

"আরে, এই জন্যই তো যেতে বলছি," আনিকা হেসে উঠলেন। "ওইসব বন্ধুরা ওখানে দাঁড়িয়ে মিডিয়ার সামনে বড় বড় নীতিবাক্য আর লোকদেখানো মায়াকান্না কাঁদবে। এরপর মানববন্ধন শেষ হলে, আমার টাকায় শাহবাগের কোনো রেস্টুরেন্টে গিয়ে চা-শিঙাড়া গিলে যে যার বাসায় কেটে পড়বে। এটাই তো রিয়েলিটি। আমি চাই তুমি সেখানে থাকো। তুমি আমার পরিচিত একজন হয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যাপারটা খুব ন্যাচারাল দেখাবে।"

"কিন্তু এতে লাভ কী আনিকা?"

"লাভ আছে। মিডিয়া কভারেজ পেলে পুলিশ প্রশাসন একটু নড়েচড়ে বসবে। তারা বুঝতে পারবে যে বেলালের ফ্যামিলি আর বন্ধুরা চুপ করে বসে নেই। এতে করে পুলিশ কেসটা সিরিয়াসলি নেবে।"

আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমার মাথার ভেতর তখন লজিকের একটা ভয়ংকর দ্বন্দ্ব চলছে। "পুলিশ যদি কেসটা সিরিয়াসলি নেয়, তাহলে তো বিপদটা তোমারই বেশি আনিকা!" আমি একটু চড়া গলায় বলে ফেললাম। "পুলিশ যদি একটু বেশি গভীরে গিয়ে তদন্ত করে, আর যদি দেখে যে বেলালের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তোমারই কোনো..."

আমি বাক্যটা শেষ করতে পারলাম না।

ওপাশ থেকে আনিকার নিশ্বাস নেওয়ার শব্দটা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা হিমশীতল, পিনপতন নীরবতা। আমি বুঝতে পারলাম, আমি এমন একটা কথা বলে ফেলেছি, যেটা উনার ইগোতে এবং উনার আত্মসম্মানে একটা ভয়ংকর আঘাত করেছে।

"রাশেদ," আনিকার গলাটা এখন আর রেশমি বা মোহনীয় নেই। উনার কণ্ঠস্বরটা এখন একটা ধারালো ব্লেডের মতো হয়ে গেছে। "আমি বেশ কয়েকদিন ধরেই খেয়াল করছি, বেলালের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে তুমি আমাকেই এক প্রকার দায়ী করে ফেলছ। তুমি কোথায় কোথায়, কথায় কথায় ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করছ, আমি কিছু করেছি কি না। আমি বেলালের সাথে কিছু ঘটিয়েছি কি না!"

"আনিকা, আমি আসলে তা বোঝাতে চাইনি..." আমি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

"শাট আপ রাশেদ!" আনিকা হিসহিস করে উঠলেন। "আমার প্রতি তোমার এইটুকুও বিশ্বাস নেই? আমি যদি বেলালকে কিছু করতামই, তাহলে কি আমি নিজে গিয়ে থানায় জিডি করে পুলিশকে ডাকতাম? তোমার কি মনে হয় আমি এত বড় একটা বোকা? আর সবচেয়ে বড় কথা— যখন তুমি আমার ফ্ল্যাটে, আমার বিছানায় বসে আমার শরীরটা একটা পশুর মতো খুবলে খাচ্ছিলে, তখন তো তোমার চোখে এই অবিশ্বাস দেখিনি! তখন তো তুমি আমার প্রতিটা ইঞ্চি শরীর ভোগ করার জন্য লালা ঝরিয়েছ। আর এখন, একটু বিপদের গন্ধ পেয়েই তুমি আমাকে খুনি বানাতে চাইছ?"

আনিকার কথাগুলো একটা চাবুকের মতো আমার মুখে এসে লাগল। আমি অপমানে আর অপরাধবোধে একদম কুঁকড়ে গেলাম। "সরি আনিকা... আই অ্যাম রিয়েলি সরি। আমি আসলে টেনশনে উল্টাপাল্টা বকে ফেলেছি," আমি একদম মিনমিন করে বললাম।

আনিকা কয়েকটা গভীর শ্বাস নিলেন। উনার রাগটা কিছুটা কমল বলে মনে হলো। "শোনো রাশেদ," আনিকা এবার খুব ধীর, কিন্তু অত্যন্ত প্র্যাকটিক্যাল এবং রূঢ় একটা গলায় বললেন। "আমি বেলালকে গুম বা খুন— কিছুই করিনি। আর বাংলাদেশে বলে, এই সমাজব্যবস্থার কারণে আমি তোমার আর আমার ব্যাপারটা গোপন রাখছি। আমি খামোখা একটা সস্তা স্ক্যান্ডালের অংশ হতে চাই না।"

উনি একটু থামলেন। তারপর এমন একটা কথা বললেন
, যা শুনে আমার শরীরের পশম খাড়া হয়ে গেল। "এটা যদি ইংল্যান্ড হতো, তাহলে বেলাল নিখোঁজ হলো নাকি খুন হলো, তাতে আমার কিচ্ছু যেত আসত না। আমি বুক ফুলিয়ে সবাইকে বলতাম— হ্যাঁ, আমি রাশেদকে আমার বিছানায় জায়গা দিয়েছি। আমার শরীরের প্রত্যেক জাগায় ওর স্পর্শের দাগ আছে। আমার একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছায় আমি তোমার সাথে উদ্দাম বন্যতায় মেতে উঠেছি! তাতে কার বাপের কী? কিন্তু এটা বাংলাদেশ রাশেদ। এখানে এমন কিছুর ইশারা পেলে মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়া আমাকে একদম ন্যাংটো করে রাস্তায় নামাবে। আমি জানি এখানকার পুরুষদের সাইকোলজি। আমার ফ্ল্যাটের ওই দারোয়ান মফিজও তখন আমার দিকে তাকিয়ে জিভের রস ফেলবে। ওর ভাবটা এমন হবে যেন— 'এই মহিলা যখন একটা সাধারণ অনুবাদককে নিজের শরীরে জায়গা দিয়েছে, তাহলে তো সুযোগ পেলে সে আমাকেও ভোগ করতে দেবে!' এই নোংরা সমাজ, এই সস্তা মানসিকতার মানুষদের ঝামেলার কারণেই আমি তোমার ব্যাপারটা কাউকে বলছি না।"

আমি স্তব্ধ হয়ে উনার কথাগুলো শুনছিলাম। এই নারীর মানসিকতা, উনার সাহস আর উনার এই অকাট্য যুক্তি আমাকে পুরোপুরি বোবা করে দিল। "নয়তো তোমাকে নিয়ে আমার কোনো দ্বিধা নেই রাশেদ। তুমি আমার জীবনে আসা অন্যতম সেরা একটা এক্সপেরিয়েন্স," আনিকা উনার গলার স্বরটা আবার একটু নরম করে বললেন।

"আমি বুঝতে পেরেছি আনিকা। আমাকে ক্ষমা করো। আমি আর কখনো তোমাকে সন্দেহ করব না," আমি খুব আন্তরিকভাবেই বললাম।

"ঠিক আছে। কাল শাহবাগে থেকো। বাই," বলে আনিকা কলটা কেটে দিলেন।

আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইলাম। আনিকা নাওহার আমাকে এমন একটা ঘোরের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা আমার জানা নেই। এই নারীটা একাধারে একটা রহস্যময়ী ধাঁধা, একটা নিষ্ঠুর কর্পোরেট মাইন্ড, আর একটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। আমি বারান্দা থেকে উঠে আবার আমার রুমে এলাম। রুমে ঢুকে আমি সোজা বাথরুমের দিকে পা বাড়ালাম। বাথরুমের ছিটকিনিটা ভেতর থেকে আটকে দিলাম। আমার মাথার ভেতর তখন আনিকার বলা কথাগুলো ইকো হচ্ছে।

"আমার শরীর নিয়ে, আমার একান্ত ব্যক্তিগত ইচ্ছায় আমি তোমার সাথে উদ্দাম বন্যতায় মেতে উঠেছি..."

"তুমি আমার শরীরটাকে একটা পশুর মতো খুবলে খাচ্ছিলে..."

এই কথাগুলো আমার শরীরের ভেতরের নিভে যাওয়া আগুনটাকে আবার দাউদাউ করে জ্বালিয়ে দিল। আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। আমার গ্যালারির একটা হিডেন ফোল্ডার ওপেন করলাম। সেখানে আনিকার দেওয়া সেই গোপন ছবিগুলো সেভ করা আছে। আমি সেই মিরর সেলফিটা ওপেন করলাম, যেটা উনি আমাকে পাঠিয়েছিলেন।

ছবিতে উনার নগ্ন
, ফর্সা শরীর। উনার এক হাত উনার সেই ভরাট, সুডৌল স্তনের ওপর রাখা। উনার চোখ দুটো কামনায় আধবোজা। আমি আমার ট্রাউজারটা নিচে নামিয়ে ফেললাম। আমার পুরুষাঙ্গটি তখন চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। আমি আমার ডান হাত দিয়ে সেটাকে মুঠি করে ধরলাম।

আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার কল্পনায় আমি এখন আর এই স্যাঁতস্যাঁতে মেসের বাথরুমে নেই। আমি এখন আনিকার সেই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের বিশাল বিছানায়। আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, আনিকা আমার নিচে শুয়ে আছেন। উনার সেই ফর্সা পা দুটো আমার কোমর জড়িয়ে আছে। আমি উনার সেই গোলাপের পাপড়ির মতো নরম, রহস্যময় কেন্দ্রের ভেতর নিজেকে সজোরে সঞ্চালিত করছি। আমার হাতের মুঠির গতি বাড়তে লাগল।

আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বাথরুমের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। আমি আনিকার ছবিটার দিকে তাকাচ্ছি, আর আমার মনে হচ্ছে আমি যেন উনার স্তনদুটো খামচে ধরে আছি। উনার সেই ঘাতক, রেশমি কণ্ঠস্বর আমার কানের কাছে ফিসফিস করছে— "আমি বুক ফুলিয়ে বলতাম, আমি তোমাকে আমার শরীরে জায়গা দিয়েছি..." এই বন্য, আদিম বাক্যগুলো আমাকে চরম উন্মাদনার দিকে ঠেলে দিল।

"আনিকা... আহহহ... আনিকা..." আমি একটা চাপা গোঙানি দিয়ে উঠলাম।
[+] 6 users Like Orbachin's post
Like Reply
দারুন আপডেট। মি: বেলাল এর অন্তর্ধান এখনো একটা রহস্যের মধ্যে থেকে গেল। আনিকা যে কি সেটাও বুঝা যাচ্ছে না। পুরো কাহিনীটাই একটা ধূঁয়াশার মধ্যে আছে।
Like Reply
বেলালের কি হয়েছে আনিকা ভাল করেই জানে। হয় আনিকা ঘটিয়েছে নাহয় দুজনে প্লান করে করছে। যাহোক,পাঠক হিসেবে টানটান উত্তেজনা ভালই উপভোগ করছি।
Like Reply




Users browsing this thread: alamin@, 9 Guest(s)