৩২।
আজ সোমবার। সকাল থেকে আমি মেসের রুমেই আছি। রাজু আর তুহিন দুজনেই বাইরে গেছে। মেস একদম ফাঁকা। আমি সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে জীবনের হিসেব মেলাচ্ছিলাম। দুপুর ঠিক বারোটা বেজে বিশ মিনিট। আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। অলস ভঙ্গিতে ফোনটা হাতে নিলাম। স্ক্রিনে একটা আননোন নাম্বার। আমার বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। আননোন নাম্বার মানেই এখন আমার কাছে একটা সাইরেনের মতো মনে হয়। আমি একটু দ্বিধা করে কলটা রিসিভ করলাম।
"হ্যালো?" আমি যতটা সম্ভব স্বাভাবিক গলার স্বর রাখার চেষ্টা করে বললাম।
ওপাশ থেকে অত্যন্ত ভরাট, গম্ভীর এবং একটা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল।"রাশেদ আহমেদ বলছেন?"
"হ্যাঁ, আমি রাশেদ আহমেদ বলছি। আপনি কে?"
"আমি কলাবাগান থানা থেকে সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ বলছি।"
কথাটা আমার কানে পৌঁছানোর সাথে সাথে আমার মনে হলো, আমার মাথার ওপর কেউ একটা দশ টন ওজনের হাতুড়ি দিয়ে সজোরে বাড়ি মারল। আমার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল, বরফগলা বাতাস যেন নিচের দিকে নেমে গেল। আমার হাত কাঁপতে শুরু করল। আমার চারপাশের পৃথিবীটা এক মুহূর্তের জন্য যেন স্থির হয়ে গেল।
"হ্যালো? শুনতে পাচ্ছেন?" ওপাশ থেকে এসআই তৌহিদের গলা আবার ভেসে এল।
আমি ঢোঁক গিললাম। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কোনোমতে আমার ভোকাল কর্ড থেকে শব্দ বের করলাম, "জি... জি, শুনতে পাচ্ছি। বলুন।"
"আপনাকে একটু আমাদের থানায় আসতে হবে।" এসআই তৌহিদ খুব ফ্ল্যাট, ইমোশনহীন গলায় বললেন।
আমার বুকের ভেতর তখন ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি, এই মুহূর্তে প্যানিক করা যাবে না। আমাকে এমন একটা ভান করতে হবে যেন আমি কিছুই জানি না। "থানায় আসতে হবে?" আমি অত্যন্ত অবাক হওয়ার এবং কিছুই না বোঝার ভান করে বললাম। "কিন্তু কেন? কী কারণে আমাকে থানায় যেতে হবে? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।"
ওপাশ থেকে এসআই তৌহিদ একটু বিরক্তির সুরে বললেন, "থানায় আসুন, বিস্তারিত জানবেন। ফোনে তো আর সব কথা বলা যায় না। আপনার নামে একটা ইনকোয়ারি আছে।"
"কিন্তু স্যার, আমি তো একজন সাধারণ চাকরিজীবী। আমার তো কোনো মামলা বা..."
"আরে ভাই, আপনাকে তো কেউ অ্যারেস্ট করছে না। জাস্ট একটা ইনফরমেশনের ব্যাপারে কথা বলার জন্য ডাকা হয়েছে। দেরি করবেন না। আজ বিকেলের আগেই থানায় চলে আসবেন।"
"আচ্ছা স্যার... আমি আসছি। কিন্তু কলাবাগান থানায় গিয়ে আমি কাকে খুঁজব?"
"থানায় এসে ডিউটি অফিসারকে বলবেন সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ ডাকছে। আমি দোতলায় ইনভেস্টিগেশন রুমে থাকি। ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের মোড় পার হয়ে একটু সামনে গেলেই কলাবাগান থানা। চিনে আসতে পারবেন তো?"
"জি স্যার, চিনে আসতে পারব।"
"ঠিক আছে। বিকেলের মধ্যে চলে আসুন।"
খট। ফোনটা কেটে গেল।
আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বিছানার ওপর বসে রইলাম। আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। ঘরের ফ্যানটা ঘুরছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমার চারপাশে কোনো বাতাস নেই। থানা থেকে কল চলে এসেছে! তার মানে পুলিশ তদন্ত শুরু করে দিয়েছে। তারা আনিকার জিডির সূত্র ধরে আমার নাম্বার জোগাড় করেছে। এখন আমাকে যেতে হবে থানায়। একটা জ্যান্ত পুলিশ স্টেশনে!
বাঙালি মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনে পুলিশের থানা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা। ভূত, প্রেত, ডাকাত— এদের চেয়েও বেশি ভয়ংকর হলো থানা। সেখানে একবার ঢুকলে একটা সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষও দাগি আসামির মতো অনুভব করতে শুরু করে। আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। আমার এখন একজনকে খুব দরকার।
আমি দ্রুত আমার কন্টাক্ট লিস্ট বের করে আশিক ভাইয়ের নাম্বারে ডায়াল করলাম। একবার, দুইবার... তিনবারের মাথায় আশিক ভাই কল রিসিভ করলেন। "হ্যালো, রাশেদ? কী খবর ব্রাদার?" আশিক ভাইয়ের গলায় সেই চিরচেনা, ডন্ট-কেয়ার মার্কা রিল্যাক্সড ভাব। ব্যাকগ্রাউন্ডে রাস্তায় গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা যাচ্ছে, হয়তো উনি কোনো অ্যাসাইনমেন্টে বাইরে আছেন।
"আশিক ভাই... সর্বনাশ হয়ে গেছে!" আমি প্রায় কেঁদে দেওয়ার মতো গলায় বললাম।
"আরে, কী হইলো আবার? এত প্যানিক করতেছ ক্যান?"
"ভাই, কলাবাগান থানা থেকে ফোন করেছিল। সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ। আমাকে আজ বিকেলের মধ্যে থানায় দেখা করতে বলেছে। ভাই, আমার তো ভয়ে হাত-পা কাঁপছে। পুলিশ আমাকে ডাকছে মানে তো আমাকে সাসপেক্ট করছে! এখন আমি কী করব ভাই?"
আমি এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে হাঁপাতে লাগলাম। আশিক ভাই ওপাশ থেকে খুব জোরে একটা হাসি দিলেন। উনার হাসির শব্দ শুনে আমার মনে হলো, আমি কি কোনো জোকস বললাম নাকি! "আরে মিয়া, তুমি তো দেখি এক্কেবারে বাচ্চা পোলাপান! পুলিশ ডাকছে তো কী হইছে? পুলিশ তো আর বাঘ-ভাল্লুক না যে তোমারে ধইরা খাইয়া ফেলব!" আশিক ভাই খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন।
"ভাই, আপনি তো ক্রাইম রিপোর্টার। আপনার কাছে থানা-পুলিশ ডালভাত। কিন্তু আমি তো জীবনে থানার বারান্দাও মাড়াইনি! আমাকে যদি ওরা রিমান্ডে নেয়? যদি মারে?"
"আরে ধুর! তুমি জিডির ইনকোয়ারিতে গেছ, মার্ডার কেসের আসামি হিসেবে যাও নাই যে তোমারে রিমান্ডে নিব। শোনো রাশেদ, একদম ভয়ের কিছু নাই। তুমি একাই যাও। নরমাল মানুষের মতো গিয়া কথা বইলা আসো। এসআই তৌহিদরে আমি চিনি, লোকটা একটু ঘাড়ত্যাড়া, কিন্তু সুবিধার লোক। তুমি জাস্ট গিয়ে যা সত্যি তাই বলবা। বলবা যে তুমি প্রুফরিডার, কাজ শেষ করে চলে আসছ। এর বাইরে তুমি আর কিচ্ছু জানো না।"
"কিন্তু ভাই, আমি একা যাব? আপনি কি আমার সাথে একটু..." আমি খুব মিনমিন করে বললাম।
"আমার তো এখন একটা জরুরি কাজে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে যাইতে হইতেছে ব্রাদার," আশিক ভাই বললেন। "তুমি একাই যাও। কনফিডেন্টলি কথা বলবা। আর শোনো, যদি দেখো যে পরিস্থিতি বেগতিক, বা তৌহিদ তোমার সাথে বেশি তেড়িবেড়ি করতেছে, তাইলে জাস্ট বলবা— 'আমি ঢাকা পেপারসের আশিক ভাইয়ের কলিগ। আপনি চাইলে ওসির সাথে কথা বলতে পারেন।' আর যদি গিয়ে তোমার বেশি ভয় লাগে বা কোনো ঝামেলা মনে হয়, আমারে ডিরেক্ট ফোন দিও। আমি সাথে সাথে কোর্ট থাইকা চইলা যামু। কোনো প্যারা নাই। রিল্যাক্স!"
আশিক ভাইয়ের এই 'প্যারা নাই' শব্দটা আমার কাছে সাময়িকভাবে একটা লাইফ জ্যাকেটের মতো মনে হলো। উনি যেভাবে কথা বলেন, তাতে মনে হয় দুনিয়ার কোনো কিছুই উনার কাছে সিরিয়াস না। "আচ্ছা ভাই। আমি যাচ্ছি বিকেলে। আমার জন্য দোয়া করবেন," আমি করুণ গলায় বললাম।
"দোয়া করার কী আছে! যাও, বীরদর্পে গিয়া ঘুরে আসো। আর ঝামেলা হইলে তো আমি আছিই।"
ফোনটা রেখে আমি বিছানা থেকে উঠলাম। আমাকে থানায় যেতে হবে। আমি আলমারি থেকে একটা খুব সাধারণ, ক্যাজুয়াল ফুলহাতা শার্ট আর একটা জিন্সের প্যান্ট বের করলাম। আমি চাই না পুলিশ আমাকে দেখে খুব স্মার্ট বা খুব আনস্মার্ট ভাবুক। আমাকে এমন একটা লুক তৈরি করতে হবে, যাতে আমাকে দেখলে নিতান্তই একটা গোবেচারা, ছাপোষা মানুষ মনে হয়।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। আমি মেস থেকে বেরিয়ে মিরপুর ১০ নাম্বার গোলচত্বরে এসে একটা সিএনজি নিলাম।
"মামা, কলাবাগান যাব। ধানমন্ডি ৩২ এর মোড়ে," আমি সিএনজিওয়ালাকে বললাম। সিএনজি চলতে শুরু করল।
এপ্রিল মাসের তপ্ত বিকেল। ঢাকা শহরের রাস্তায় তখন রোদের তেজ কিছুটা কমলেও, একটা ভ্যাপসা, গুমোট গরম চারপাশ ঘিরে আছে। সিএনজির ভেতরে বসে আমি ঘামছি। আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।
সিএনজিটা আগারগাঁও, ফার্মগেট, পান্থপথ হয়ে কলাবাগানের দিকে এগোচ্ছে। রাস্তার এই চেনা দৃশ্যগুলো আজ আমার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা মনে হচ্ছে। চারপাশের মানুষগুলো কত স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যাচ্ছে, হাসছে, কথা বলছে। তারা জানে না, এই সিএনজিতে বসে থাকা একটা মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়া খেলতে একটা পুলিশের থানায় যাচ্ছে।
আমার মাথার ভেতর তখন শুধু আনিকার কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। উনি বলেছিলেন, "আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না। আমার একটা প্ল্যান আছে।" কী সেই প্ল্যান? এই পুলিশের ইনকোয়ারি কি সেই প্ল্যানের কোনো অংশ? নাকি আনিকা নিজেই কোনো বড় ফাঁদে পড়ে গেছেন?
আমার বুকটা ধকধক করছে। আমি মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে শুরু করলাম। আমি জীবনে খুব একটা ধর্মকর্ম করিনি, কিন্তু বিপদে পড়লে মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল হলো ওই ওপরওয়ালা। "হে আল্লাহ, আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো। আমি আর কোনোদিন অন্যের বউয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাব না। আমাকে জাস্ট আজকের মতো বাঁচিয়ে দাও।"
সিএনজি এসে ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের মোড় পার হয়ে একটা হলুদ রঙের, দোতলা বিল্ডিংয়ের সামনে থামল।
বিল্ডিংয়ের সামনে বড় করে সাইনবোর্ড লাগানো— "কলাবাগান মডেল থানা, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।"
সামনে কয়েকটা পুলিশের পিকআপ ভ্যান, একটা ভাঙাচোরা লেগুনা আর কয়েকটা সিজ করা মোটরসাইকেল রাখা আছে। কিছু পুলিশ সদস্য অস্ত্র হাতে ডিউটি করছে। ভেতরে একটা অদ্ভুত কোলাহল আর গুমোট পরিবেশ।
আমি সিএনজির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে থানার গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম।
আমার পা দুটো কাঁপছে। আমার গলার ভেতরটা একদম শুকিয়ে গেছে। আমি একটা বড় করে শ্বাস নিলাম। "প্যারা নাই রাশেদ। প্যারা নাই," আমি আশিক ভাইয়ের কথাটা মনে মনে আওড়ালাম। কিন্তু আমার ভেতরের আত্মাটা তখনো চিৎকার করে বলছে— "পালাও রাশেদ! এখনো সময় আছে, পালাও!"
আমি পালানোর চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে, বুকের সমস্ত সাহস একত্র করে কলাবাগান থানার মেইন গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখলাম।
পৃথিবীতে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে ঢুকলে মানুষের মনে হয় সে তার সমস্ত আত্মসম্মান, কনফিডেন্স আর অহংকার বাইরে পাপোশে মুছে রেখে ভেতরে ঢুকেছে। বাংলাদেশের যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের থানা হলো ঠিক সেরকমই একটা জায়গা। আপনি যতই সৎ, নিরীহ আর করদাতা নাগরিক হোন না কেন, থানার চৌকাঠে পা রাখার সাথে সাথেই আপনার সাবকনশাস মাইন্ড আপনাকে সিগন্যাল দিতে শুরু করবে— "তুই একটা অপরাধী! তুই নির্ঘাত কোনো না কোনো পাপ করেছিস!"
কলাবাগান মডেল থানার মেইন গেট দিয়ে যখন আমি ভেতরে ঢুকলাম, তখন আমার অবস্থা একটা খাঁচায় আটকে পড়া ইঁদুরের মতো। চারপাশের পরিবেশটাই এমন একটা গুমোট আর অস্বস্তিকর যে দম বন্ধ হয়ে আসে। একপাশে ডিউটি অফিসারের বিশাল টেবিল, সেখানে দুজন পুলিশ বসে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে একটা মোটা খাতায় কী যেন লিখছেন। থানার ভেতরে একটা অদ্ভুত গন্ধ— ফিনাইল, পুরোনো কাগজ, মানুষের ঘাম আর একটা চাপা আতঙ্কের গন্ধ মিলেমিশে একাকার।
আমি কাঁপা কাঁপা পায়ে এগিয়ে গিয়ে কনস্টেবল গোছের একটা লোককে বললাম, "ভাই, আমাকে সাব-ইন্সপেক্টর তৌহিদ সাহেব আসতে বলেছিলেন। উনার সাথে একটু দেখা করা দরকার।"
লোকটার পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম, কিন্তু পেটের বোতামগুলো এমনভাবে টানটান হয়ে আছে যে যেকোনো সময় ছিটকে আমার চোখে এসে লাগতে পারে। সে আমার দিকে এমন একটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাল, যেন আমি মশা বা মাছির মতো তুচ্ছ কোনো প্রাণী।
"তৌহিদ স্যার তো এখন নাই। বাইরে গ্যাছে একটা ডিউটিতে। আপনে ওই কোণার রুমটায় গিয়া বসেন। স্যার আইলে কথা কইবেন," কনস্টেবল লোকটা একটা আধখোলা দরজার দিকে ইশারা করে বলল।
আমি বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নেড়ে ওই রুমটার দিকে এগিয়ে গেলাম। রুমটা সম্ভবত ওয়েটিং রুম বা ছোটখাটো ইন্টারোগেশন রুম। মাঝখানে একটা পুরোনো কাঠের টেবিল, তার চারপাশে তিনটে প্লাস্টিকের চেয়ার। দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, আর এক কোণায় মাকড়সার জাল। সিলিংয়ে একটা ফ্যান ঘুরছে, তবে সেটা বাতাস দেওয়ার চেয়ে 'ক্যাঁচ... ক্যাঁচ...' শব্দ করে মানুষের স্নায়ুর ওপর চাপ তৈরি করার কাজটাই বেশি নিষ্ঠার সাথে পালন করছে।
আমি একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসলাম। এবং শুরু হলো আমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে ভয়াবহ এবং স্নায়ুক্ষয়ী আধা ঘণ্টার অপেক্ষা। ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, আর আমার মাথার ভেতর শত শত ভয়ংকর চিন্তার ডালপালা গজাচ্ছে। এই আধা ঘণ্টা সময় আমার কাছে মনে হলো আস্ত একটা শতাব্দী। মানুষ যখন চরম উৎকণ্ঠায় থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক পৃথিবীর সবচেয়ে নেতিবাচক আর ভয়াবহ দৃশ্যগুলো কল্পনা করতে শুরু করে।
আমি ভাবতে লাগলাম, এসআই তৌহিদ বাইরে গেছেন মানে কোথায় গেছেন? উনি কি আনিকার ফ্ল্যাটে গেছেন আমাকে ফাঁসানোর জন্য কোনো এভিডেন্স কালেক্ট করতে? উনি কি আমার মেস থেকে আমার ল্যাপটপ সিজ করে নিয়ে আসছেন?
একটু পরেই হয়তো দরজা খুলে চার-পাঁচজন ষণ্ডামার্কা পুলিশ ঢুকবে। তারা কোনো কথা না বলে সোজা আমার কলার চেপে ধরে আমাকে ফ্লোরে ফেলে দেবে। তারপর শুরু হবে রিমান্ডের সেই বিখ্যাত 'ডিম থেরাপি' বা 'ওয়াটার বোর্ডিং'। আমি কি পুলিশের মার সহ্য করতে পারব? আমার তো একটা মশারি টানাতে গেলেই হাত ব্যথা হয়ে যায়, আমি পুলিশের ওই তেল মাখানো লাঠির বাড়ি খাব কীভাবে? প্রথম বাড়িতেই তো আমি হাউমাউ করে সব বলে দেব!
আমি কি বলব যে, আমি আনিকার সাথে শুয়েছি? যদি বলি, তাহলে তো আমাকে জেনেশুনে অন্যের বউকে ফুঁসলিয়ে গুম করার দায়ে ফাঁসিয়ে দেবে। আর আনিকা? সে তো পরিষ্কার বলে দেবে— "আমি এই ছেলেকে চিনিই না। ও আমার বাসায় প্রুফরিডিংয়ের নাম করে ঢুকে আমার স্বামীকে কিডন্যাপ করেছে!"
ভয়ে আমার পেটের ভেতরটা রীতিমতো মোচড় দিয়ে উঠল। গলা শুকিয়ে মরুভূমি। টেবিলের ওপর রাখা একটা কাঁচের গ্লাসে পানি ছিল, কিন্তু সেটা খাওয়ার সাহস হলো না। কে জানে, হয়তো পুলিশের পানিতে কোনো ট্রুথ সিরাম বা সত্য বলানোর ওষুধ মেশানো থাকে! (ভয়ের চোটে আমার মাথার ভেতর হলিউডের সায়েন্স ফিকশন মুভির প্লটও ঢুকে যাচ্ছিল)।
আমি আমার পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের ম্যাড়ম্যাড়ে জীবনের কথা ভাবলাম। এই তো কদিন আগেও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল বিকল্প বাসে সিট পাওয়া আর এহসান ভাইয়ের বকা খাওয়া। আমি কেন ওই আনিকা নাওহারের ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতির মোহে পড়ে নিজের জীবনটা এভাবে ধ্বংস করতে গেলাম? ওই নারীর শরীরের একটুখানি সুখের জন্য কি নিজের জীবনটা এভাবে রিমান্ডের লাঠির নিচে সঁপে দেওয়াটা খুব জরুরি ছিল?
হায় রে পুরুষ মানুষ! একটা ফুটো পাত্রের মতো আমাদের চরিত্র। একটু রূপ আর একটু সম্মোহনী হাসির কাছে আমাদের সমস্ত ফিলোসফি, সমস্ত নৈতিকতা ধুলোয় মিশে যায়।
প্রায় বত্রিশ মিনিট পর।
দরজার হাতলটা সশব্দে ঘুরে গেল। আমার হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে এসে একটা বিশাল লাফ দিল। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম, যেন লাঠির প্রথম বাড়িটা খাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছি। "আপনি রাশেদ সাহেব?"
খুব নরম, মার্জিত এবং বিনীত একটা কণ্ঠস্বর। আমি চমকে চোখ খুললাম। আমার কল্পনায় ছিল গোঁফওয়ালা, লাল চোখ, আর বিশাল ভুঁড়িওয়ালা কোনো পুলিশ অফিসার। কিন্তু আমার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তার পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম থাকলেও, উনাকে দেখে কোনোভাবেই পুলিশ বলে মনে হচ্ছে না।
এসআই তৌহিদের বয়স হয়তো ৩৪-৩৬-এর কাছাকাছি। খুব ছিপছিপে, স্মার্ট একটা ফিগার। মুখে ক্লিন শেভ করা, আর চুলগুলো খুব পরিপাটি করে আঁচড়ানো। উনাকে দেখে মনে হচ্ছে উনি কোনো পাবলিক ইউনিভার্সিটির নিউলি জয়েন করা লেকচারার বা কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এক্সিকিউটিভ। উনার চেহারায় একটা অদ্ভুত স্নিগ্ধতা আর বুদ্ধিবৃত্তিক আভা আছে।
আমি ধড়ফড় করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। "জি... " এসআই তৌহিদ হাসিমুখে ভেতরে ঢুকে আমার সামনের চেয়ারটায় বসলেন। উনার হাতে একটা পাতলা ফাইল। "বসুন। দাঁড়িয়ে থাকছেন কেন?" উনি হাতের ইশারায় আমাকে বসতে বললেন। তারপর খুব আন্তরিক গলায় বললেন, "আপনাকে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো, সরি ভাই। একটা অন্য কেইসের জরুরি কাজে একটু বাইরে যেতে হয়েছিল। জ্যামের কারণে ফিরতে লেট হয়ে গেল। "
আমি হাঁ করে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। পুলিশ! বাংলাদেশের পুলিশ আমাকে 'সরি' বলছে! আমাকে 'ভাই' বলে সম্বোধন করছে! আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের ধারণা হলো, পুলিশ মানেই ঘুষের লোভে জিহ্বা বের করে রাখা কোনো ক্ষুধার্ত নেকড়ে। যাদের কাছে সাধারণ মানুষের কোনো সম্মান নেই। কিন্তু এই লোকটাকে দেখে তো আমার ধারণা পুরোপুরি উল্টে যাচ্ছে। এই লোক তো দেখি আমার চেয়েও বেশি ভদ্র!
আমি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে একটু নার্ভাস গলায় বললাম, "না না, ঠিক আছে স্যার। কোনো অসুবিধা হয়নি।"
"স্যার বলার দরকার নেই, ভাই বললেই হবে। আমরা তো কাছাকাছি বয়সেরই হব," এসআই তৌহিদ খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে ফাইলটা টেবিলের ওপর রাখলেন। " জাস্ট একটা ইনফরমেশন গ্যাপ ক্লিয়ার করার জন্য আপনাকে ডাকা। তা, আপনি কী করেন?"
উনি খুব স্বাভাবিক, আড্ডার ছলে প্রশ্নটা করলেন। আমি আমার পকেট থেকে খুব সাবধানে আমার মানিব্যাগটা বের করলাম। আনিকার কিনে দেওয়া সেই দামি চামড়ার মানিব্যাগ। সেখান থেকে আমার একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে উনার দিকে এগিয়ে দিলাম। এসআই তৌহিদ কার্ডটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ মন দিয়ে দেখলেন।
"রাশেদ আহমেদ। ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক, ঢাকা পেপারস।" উনি কার্ড থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে একটা খুব সুন্দর, বাঁকা হাসি দিলেন।
"ওরে বাবা! এই সেরেছে! আপনি তো দেখি সাংঘাতিক মানে সাংবাদিক!" উনি হাসতে হাসতে বললেন। "ভাই, আমাদের পুলিশের এমনিতেই দুর্নামের শেষ নাই। আপনি আবার আমার নামে পত্রিকায় কোনো উল্টাপাল্টা রিপোর্ট করে দিয়েন না! আমরা কিন্তু ভাই খুব গরিব মানুষ।"
উনার এই জোকসটা শোনার পর আমার বুকের ওপর চেপে থাকা কয়েক টন ওজনের পাথরটা যেন এক নিমিষেই নেমে গেল। পরিবেশটা মুহূর্তের মধ্যে হালকা হয়ে গেল। আমিও একটু হাসার চেষ্টা করে বললাম, "আরে ভাই, কী যে বলেন! আমি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে থাকি। আমি তো বিদেশের খবর অনুবাদ করি। দেশি খবর নিয়ে আমার কোনো কাজ নেই। আর আপনাদের নামে রিপোর্ট করার সাহস আমার কই!"
"গুড গুড," এসআই তৌহিদ কার্ডটা উনার ফাইলের ভেতর যত্ন করে রাখলেন। উনার মুখের হাসিটা তখনও লেগে আছে, কিন্তু গলার স্বরটা এবার একটু সিরিয়াস হলো। "এবার তাহলে আসল কথায় আসি। রাশেদ ভাই, আনিকা নাওহার নামের একজন লেখিকাকে তো আপনি চেনেন, তাই না?"
আমি মনে মনে আমার প্রস্তুত করা স্ক্রিপ্টটা রিহার্সাল করে নিলাম। "জি, চিনি।" আমি খুব স্বাভাবিক, নির্লিপ্ত গলায় বললাম।
"হুম। উনার হাসব্যান্ড বেলাল সাহেবকে কি আপনি চেনেন? উনার সাথে কি আপনার কখনো কথা হয়েছে?"
আমি এক মুহূর্তের জন্য থমকালাম। আমার চোখের সামনে ২রা এপ্রিল সকালের সেই দৃশ্যটা ভেসে উঠল। হাতে লাগেজ নিয়ে হতভম্ব বেলাল সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন, আর আমি উনাকে বলছি, 'আনিকা তো ঘুমাচ্ছে, আপনি আসুন, বসুন!' এই জীবনে ওই একবারই তো কথা হয়েছে উনার সাথে!
আমি আমার কণ্ঠস্বর একদম নিখুঁত রেখে বললাম, "চিনি। অল্প পরিচয়। একবারই কথা হয়েছে।" এসআই তৌহিদ উনার ফাইল থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। উনার দৃষ্টিতে একটা সূক্ষ্ম জিজ্ঞাসু ভাব। "উনার স্ত্রীর সঙ্গেও কি আপনার এরকম হালকা পরিচয়?"
"না," আমি খুব প্রফেশনাল একটা টোন এনে বললাম। "আনিকা আপুর সঙ্গে আমার কাজের সূত্রে পরিচয়। উনার একটা বইয়ের প্রুফ রিড আমি করেছি, যেটা এবার মেলায় বেরিয়েছে। আরেকটা উপন্যাসের কাজ করছিলাম। এটা উনি এবার লন্ডনে ফেরার আগেই প্রকাশনীকে দিয়ে যেতে চাইছিলেন। তাই কাজটায় একটু তাড়াহুড়া ছিল।"
এসআই তৌহিদ উনার চশমাটা ডান হাতের তর্জনী দিয়ে একটু ঠেলে ঠিক করলেন। উনার চোখের দৃষ্টি এখন আগের চেয়ে একটু বেশি ফোকাসড। জোকস করা সেই ভদ্রলোক থেকে উনি এখন পুরোপুরি একজন ইনভেস্টিগেটিং পুলিশ অফিসারে পরিণত হয়েছেন।
"আনিকা ম্যাডাম গতকাল থানায় এসে একটা মিসিং জিডি করেছেন," এসআই তৌহিদ শান্ত গলায় বললেন। "উনার স্বামী বেলাল সাহেব সপ্তাহখানেক আগে লন্ডন থেকে ঢাকায় আসেন। কিন্তু তিন দিন আগের রাত থেকে উনাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উনার ফোন বন্ধ। তো, আনিকা ম্যাডাম বলেছেন, বেলাল সাহেব দেশে ফেরার আগের কয়েকটা দিন আপনি উনাদের ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে গেস্ট হিসেবে ছিলেন। আপনার পাণ্ডুলিপির কাজ ছিল বলে উনি আপনাকে থাকতে দিয়েছিলেন।"
"জি, কথা সত্য," আমি খুব কনফিডেন্টলি বললাম। "আপু আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিলেন। উনার কাজটা একটু তাড়া ছিল, আর আমি মিরপুরের মেস থেকে প্রতিদিন যাতায়াত করে কাজটা করতে পারছিলাম না বলে উনি কয়েকদিনের জন্য উনার গেস্ট রুমে আমাকে থাকতে দিয়েছিলেন।"
এসআই তৌহিদ আমাকে থামিয়ে দিয়ে খুব দ্রুত একটা প্রশ্ন করলেন, "আপনি কবে ওই ফ্ল্যাট থেকে বের হয়েছেন?"
"সপ্তাহখানেক আগেই," আমি একদম সত্য কথাটা বললাম। আমি আসলেই সপ্তাহখানেক আগে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়েছি, যদিও আমার বের হওয়ার কনটেক্সট আর পুলিশের ভাবা কনটেক্সট সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।
এসআই তৌহিদ একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। পুলিশ কাকতালীয় বিষয়গুলোতে বিশ্বাস করে না, তারা সবকিছুর মধ্যে একটা যোগসূত্র খোঁজে।
"সপ্তাহখানেক আগে বেলাল সাহেব দেশে এলেন, আর আপনি সপ্তাহখানেক আগেই বাসা ছাড়লেন। কী কারণ?" উনার গলার স্বরে একটা প্রচ্ছন্ন জেরা করার সুর।
আমি মনে মনে হাসলাম। মধ্যবিত্ত বাঙালি ছেলেদের একটা বড় গুণ হলো, তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে একটা চমৎকার, বিশ্বাসযোগ্য পারিবারিক বা সামাজিক লজিক দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারে। আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে একটু হেসে বললাম, "তেমন স্পেসিফিক কোনো কারণ নাই ভাই। একে তো পাণ্ডুলিপির কাজটা শেষ হয়ে আসছিল। আর আনিকা আপু জানিয়েছিলেন যে উনার হাজব্যান্ড আসবেন। আমি তখন নিজে থেকেই উনাকে বললাম, কাজ যে অল্প বাকি আছে তা আমি আমার মেসেই করতে পারব। উনারা স্বামী-স্ত্রী, অনেক দিন পর বিদেশ থেকে দেখা হবে, আমি খামোখা উনাদের মাঝখানে 'কাবাব মে হাড্ডি' হতে চাই না। তাই আমি নিজের জিনিসপত্র নিয়ে মেসে চলে আসি।"
আমার এই 'কাবাব মে হাড্ডি' লজিকটা একটা মাস্টারস্ট্রোকের মতো কাজ করল। এসআই তৌহিদের চোখের সেই তীক্ষ্ণ, সন্দেহজনক দৃষ্টিটা নিমেষেই নরম হয়ে গেল। যেকোনো সাধারণ মানুষের কাছেই এই যুক্তিটা শতভাগ পারফেক্ট মনে হবে।
"হুম," এসআই তৌহিদ একটা কলম দিয়ে ফাইলের ওপর হালকা টোকা দিতে লাগলেন। আমার যুক্তিটা উনি পুরোপুরি গ্রহণ করেছেন। "আপনি তো ওই ফ্ল্যাটে প্রায় সপ্তাহ তিনেক ছিলেন। একটা মানুষ যখন এত কাছ থেকে কাউকে দেখে, তখন অনেক কিছুই তার চোখে পড়ে। রাশেদ ভাই, আপনি কি আনিকা ম্যাডাম আর উনার স্বামীর মধ্যে ফোনে কোনো ঝগড়াঝাঁটি বা অশান্তি হতে দেখেছেন? মানে, উনাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন ছিল বলে আপনার মনে হয়েছে?"
প্রশ্নটা খুব ট্রিকি। আমি যদি বলি সম্পর্ক খারাপ ছিল, তাহলে পুলিশের সন্দেহ আনিকার দিকে যাবে। আর যদি বলি খুব ভালো ছিল, তাহলে পুলিশ নিখোঁজ হওয়ার অন্য মোটিভ খুঁজবে।