Thread Rating:
  • 30 Vote(s) - 3.6 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
এই মানষিক ভারসাম্য রক্ষা করা অতিব কঠিন, দেখা যাক।
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
২৯।
মানুষের জীবনে অপেক্ষার চেয়ে ভয়ংকর কোনো শাস্তি পৃথিবীতে নেই। বিশেষ করে সেই অপেক্ষা যদি হয় অনিশ্চয়তার, আর তার সাথে যদি মিশে থাকে চরম আতঙ্ক। গ্রিক পুরাণে প্রমিথিউসের একটা গল্প আছে। তাকে পাহাড়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল, আর প্রতিদিন একটা ঈগল এসে তার কলিজা ঠুকরে খেত। রাতে সেই কলিজা আবার জোড়া লাগত, পরদিন আবার ঈগল আসত। আমার মনে হয়, প্রমিথিউসের এই শাস্তিটা নেহাতই ছেলেখেলা। তাকে যদি বলা হতো— "ভাই প্রমিথিউস, তোমার প্রেমিকার মোবাইল বন্ধ, সে কোথায় আছে তুমি জানো না, আর তার স্বামী হয়তো তাকে খুন করে স্যুটকেসে ভরে ফেলেছে"— তাহলে প্রমিথিউস বলত, "তার চেয়ে বরং ঈগলকে পাঠাও, কলিজা খাওয়াটাই আরামের।"

বসুন্ধরা সিটির সেই বাথরুমের উদ্দাম মিলনের পর কেটে গেছে পাক্কা আটচল্লিশ ঘণ্টা। দুটো দিন এবং দুটো রাত। এই দুই দিনে আমার অবস্থা আক্ষরিক অর্থেই পাগলপ্রায়। আমি মোবাইল হাতে নিয়ে বসে থাকি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠাই। 

"আনিকা, তুমি ঠিক আছো?"
"আনিকা, প্লিজ একটা রিপ্লাই দাও।"
"তোমার কি কোনো বিপদ হয়েছে? আমি কি আসব?"

গত দুই দিনে আমি আনিকাকে অন্তত একশোটা মেসেজ দিয়েছি। একটা মেসেজও সিন হয়নি। ডাবল টিক পড়ে না, শুধু একটা সিঙ্গেল টিক হয়ে খঞ্জরের মতো আমার বুকের ভেতর বিঁধে থাকে। হোয়াটসঅ্যাপে অসংখ্যবার অডিও এবং ভিডিও কল দিয়েছি। স্ক্রিনে শুধু 'Calling...' লেখাটা ওঠে, 'Ringing...' হয় না। এর মানে খুব পরিষ্কার— উনার ফোনে ইন্টারনেট কানেকশন নেই।

শেষে আমি ডিরেক্ট সেলুলার নেটওয়ার্কে কল দিয়েছি। ওপাশ থেকে একটা যান্ত্রিক নারী কণ্ঠ নির্লিপ্তভাবে বলেছে, "দুঃখিত, আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি এই মুহূর্তে বন্ধ আছে।" আমি কারওয়ান বাজারের অফিসে ল্যাপটপের সামনে বসে থাকি একটা জ্যান্ত লাশের মতো। আমি যন্ত্রের মতো আন্তর্জাতিক খবর অনুবাদ করছি। 'পুতিনের নতুন পারমাণবিক হুমকি', 'গাজায় বোমা হামলা'— এসব টাইপ করছি, কিন্তু আমার মাথার ভেতর চলছে অন্য একটা থ্রিলার সিনেমা।

আমার মনে প্রচণ্ড ভয়। আনিকার কী হলো!

সেদিন বসুন্ধরা সিটির বাথরুমের সেই তীব্র, পারমাণবিক মিলনের খবর কি বেলাল সাহেব কোনোভাবে বুঝে গিয়েছিলেন? আমরা যখন বের হচ্ছিলাম, তখন কি উনি আমাদের দেখে ফেলেছিলেন? নাকি আনিকা যখন বাথরুম থেকে বেরিয়ে উনার স্বামীর কাছে গিয়েছিলেন, তখন বেলাল সাহেব উনার স্ত্রীর শরীরের ওই বন্য ঘ্রাণ, ওই এলোমেলো অবস্থা দেখে কিছু সন্দেহ করেছিলেন? পুরুষ মানুষের ইনস্টিংক্ট খুব মারাত্মক হয়। নিজের স্ত্রীর শরীরে অন্য পুরুষের আঁচড় পড়লে সেটা স্বামীরা ঠিকই টের পায়।

বেলাল সাহেব কি আনিকাকে ধানমন্ডির ওই ফ্ল্যাটে বন্দি করে ফেলেছেন? উনার ফোন কি কেড়ে নিয়েছেন? নাকি... নাকি... ওহ গড! এই চিন্তাটা আমি কল্পনাতেও আনতে চাই না। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক একটা আস্ত শয়তান। সে সবচেয়ে খারাপ জিনিসটাই সবার আগে আপনাকে দেখাবে।

আমার চোখের সামনে ভাসতে শুরু করল, বেলাল সাহেব রাগের মাথায় কিচেন থেকে ছুরি এনে আনিকাকে জবাই করে দিয়েছেন। উনার সেই ডালিমের দানার মতো ঠোঁট, তরমুজের মতো স্তন, আর ওই নিখুঁত ৩৬-২৮-৩৬-এর শরীরটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বেলাল সাহেব লাশটা টুকরো টুকরো করে উনার ওই বিশাল লাগেজে ভরছেন।

আমি শিউরে উঠে চোখ খুলি। আমি এখন কী করব? এই দুই দিন ধরে আনিকার সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। মেয়েটা বেঁচে আছে, নাকি মরে গেছে, নাকি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে— কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমার কি পুলিশে যাওয়া উচিত? কিন্তু পুলিশে গিয়ে আমি কী বলব? "হ্যালো ওসি সাহেব, আমি রাশেদ। আমি পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের একজন অনুবাদক। আমি গত এক মাস ধরে এক লন্ডনপ্রবাসী বিলিয়নিয়ার ইঞ্জিনিয়ারের বউয়ের সাথে শুয়েছি। এখন তার বউকে পাওয়া যাচ্ছে না, একটু খুঁজে দেবেন?"

পুলিশ আমাকে আনিকাকে খোঁজার আগে রিমান্ডে নিয়ে বাঁশডলা দেবে। আমি কি ওই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে গিয়ে চেক করে আসব? কিন্তু সেখানে গেলে যদি বেলাল সাহেব দরজা খোলেন? উনি যদি আমাকে দেখেই চিনে ফেলেন, আর আমাকে ফ্ল্যাটের ভেতর টেনে নিয়ে আমারও কোনো ক্ষতি করেন? আমি তো বডিবিল্ডার না যে উনার সাথে মারামারি করে জিতব। আমি তো দুই থাপ্পড় খেলেই অজ্ঞান হয়ে যাব।
এই সীমাহীন দোটানা, আতঙ্ক আর একাকিত্বের মাঝে আমি না পারছি খেতে, না পারছি ঘুমাতে। মিরপুরের মেসে আমি একটা পাগলা কুকুরের মতো এপাশ-ওপাশ করি। আমার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে।

তৃতীয় দিন। দুপুরবেলা।

আমি অফিসে বসে একটা নিউজ এডিট করছি, আমার চোখ লাল হয়ে আছে। ঠিক দুপুর একটার সময় আমার ফোনটা স্ক্রিনে একটা ভাইব্রেশন দিল। আমি ছোঁ মেরে ফোনটা তুললাম। হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন। এবং নামটা— 'Anika Nawhar'! আমার শ্বাস আটকে গেল। আমি দ্রুত মেসেজটা ওপেন করলাম।

"তুমি কি অফিসে? একটা ঝামেলা হয়েছে। তোমার সাথে কথা বলা প্রয়োজন। ধানমন্ডির গ্লোরিয়া জিন্স কফিতে আসো। কুইক।"

মেসেজটা পড়ার পর আমার বুক থেকে যেন এক টন ওজনের একটা পাথর নেমে গেল। আনিকা বেঁচে আছে! আমার অপ্সরী বেঁচে আছে! কিন্তু পরক্ষণেই আরেকটা ভয় এসে চেপে বসল। "একটা ঝামেলা হয়েছে!" কী ঝামেলা? বেলাল সাহেব কি সব জেনে গেছেন? উনি কি ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছেন? আমি আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে কল দিলাম। রিং হলো। কিন্তু আনিকা কলটা সাথে সাথে কেটে দিলেন। একটু পরেই আরেকটা মেসেজ এল: "কল দিও না। তুমি আসো। সব খুলে বলব।"

আমি ল্যাপটপটা ধাপ করে বন্ধ করে দিলাম। এহসান ভাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন, আমি উনার দিকে একবারও না তাকিয়ে, কাউকে কিছু না বলে, ব্যাগটা ঘাড়ে ঝুলিয়ে অফিস থেকে পাগলের মতো ছুটে বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় নেমে একটা উবার মোটো নিলাম। "মামা, ধানমন্ডি গ্লোরিয়া জিন্স। যত জোরে পারেন টানেন।" কারওয়ান বাজার থেকে ধানমন্ডি যাওয়ার এই পথটুকুতে আমার মনে হলো আমার আয়ু দশ বছর কমে গেছে।

গ্লোরিয়া জিন্সের কাঁচের দরজা ঠেলে যখন আমি ভেতরে ঢুকলাম, তখন দুপুর পৌনে দুইটা। কফিশপটার ভেতরটা বেশ শান্ত, এসি চলছে, সুন্দর একটা কফির অ্যারোমা ভাসছে বাতাসে। আমি এদিক-সেদিক তাকালাম। এবং আমি উনাকে দেখলাম। কফিশপের একদম কর্নারের একটা টেবিলে, জানালার পাশে বসে আছেন আনিকা নাওহার।

উনাকে দেখে আমি আক্ষরিক অর্থেই বোকা বনে গেলাম। আমি গত দুই দিন ধরে ভেবেছি, উনি হয়তো নির্যাতিতা, বিধ্বস্ত, মুখ-চোখ ফোলা অবস্থায় বসে থাকবেন। কিন্তু আমার সামনে যিনি বসে আছেন, তিনি যেন সদ্য পার্লার থেকে বের হওয়া কোনো রানীর মতো। উনার পরনে একটা খুব এলিগ্যান্ট, হালকা পেস্তা রঙের সালোয়ার কামিজ। চুলগুলো খুব সুন্দর করে ব্লো-ড্রাই করা। চোখে হালকা আইলাইনার, ঠোঁটে ন্যুড লিপস্টিক। উনার চেহারায় বিন্দুমাত্র কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো পাগলামি নেই। একদম স্নিগ্ধ, অপরূপ এবং নিখুঁত একটা রূপ নিয়ে উনি কফির মগ হাতে বসে আছেন।

আর আমার নিজের অবস্থা? আমি গত তিন দিন ধরে ঠিকমতো শেভ করিনি, চুল উসকোখুস্কো, চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল, শার্টটা কুঁচকে আছে। আমাকে দেখে মনে হচ্ছে আমি রিফিউজি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা কোনো লোক, আর উনি কোনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য। আমি হনহন করে হেঁটে উনার টেবিলের সামনে গিয়ে দপ করে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লাম। আমার ভেতরে তখন রাগের একটা আগ্নেয়গিরি ফুটছে।

"হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস আনিকা!" আমি প্রায় হিসহিস করে, চাপা রাগে ফেটে পড়ে বললাম। "এই দুই দিন তুমি কই ছিলে? তোমার ফোন বন্ধ কেন?" আনিকা উনার কফির মগটা খুব শান্তভাবে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলেন। উনার চোখের দৃষ্টিতে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং এক ধরনের অদ্ভুত কাঠিন্য।

"চুপ।" আনিকা খুব নিচু, কিন্তু অত্যন্ত কড়া গলায় বললেন। "কোনো কথা না। আমি সব বলব তো বলেছি।"

"সব খুলে বলবে! সব খুলে বলবে তো করছ গত কয়েকদিন ধরে!" আমি রাগে গরগর করতে করতে বললাম। "কিন্তু কিছুই তো বলছ না। এই সাসপেন্সের মানে কী? তুমি কি সাইকোপ্যাথ? এই দুই দিনে আমার মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা!"

আনিকা উনার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে উনার কফির মগের কিনারাটা খুব আলতো করে ঘষতে লাগলেন। উনার ঠোঁটের কোণে একটা খুব সূক্ষ্ম, বাঁকা এবং ঘাতক হাসি ফুটে উঠল। উনি একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। উনার সেই মোহনীয়, ফিসফিস করা গলায়, একদম সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন—"মাথা নাকি বাঁড়া? কোনটা পাগলপ্রায়?"

কথাটা শোনার পর আমার মনে হলো গ্লোরিয়া জিন্সের ছাদটা আমার মাথার ওপর ভেঙে পড়ল। এই চরম সিরিয়াস, ক্রাইসিস একটা মুহূর্তে, একটা পাবলিক কফিশপে বসে এই নারী আমাকে এই লেভেলের একটা স্ল্যাং, একটা চূড়ান্ত সেক্সুয়াল এবং উসকানিমূলক কথা বলতে পারল! আমি রাগে, অপমানে এবং একই সাথে এক অদ্ভুত উত্তেজনায় গরগর করতে লাগলাম। আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। আনিকা উনার হাসিটা আরেকটু চওড়া করলেন।

"আচ্ছা ঠিক আছে বাবা, রাগ কোরো না," আনিকা খুব আদুরে গলায় বললেন। "আমি আদর করে আমার পাগলকে সুস্থ করে দেব। একটু অপেক্ষা করো।"

আমি জ্বলন্ত চোখে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আনিকা উনার হাত তুলে ওয়েটারকে ইশারা করলেন।
এক মিনিটের মধ্যে ওয়েটার এসে দুটো কফি আর এক প্লেট স্টিমড ওনথন( Wonton) দিয়ে গেল। "নাও, খাও। খেতে খেতে শোনো," আনিকা একটা ওনথন কাঁটাচামচে গেঁথে মুখে দিতে দিতে বলা শুরু করলেন।

"সেদিন বসুন্ধরা সিটি থেকে ফেরার পর আমার রিয়েলাইজেশন হলো," আনিকা খুব শান্ত গলায়, যেন কোনো সিনেমার রিভিউ দিচ্ছেন, এমনভাবে বললেন। "আমি বুঝতে পারলাম, আমার আর বেলালের সম্পর্কটা আসলে ডেড। এই মরা সম্পর্কটা টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। আমি ডিসাইড করলাম, আমি আজ রাতেই বেলালকে সব খুলে বলব। আমি ওকে বলব যে আমি ডিভোর্স চাই।"

আমি অবাক হয়ে উনার দিকে তাকালাম। "তুমি বেলাল সাহেবকে সব বলে দিতে চেয়েছিলে?"

"হ্যাঁ। আমি চেয়েছিলাম সবকিছু ক্লিয়ার করে দিতে। কিন্তু সেই বলার সুযোগটা আর হলো না।"

"কেন?" আমি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম।

আনিকা কফিতে একটা চুমুক দিয়ে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "আমরা যখন ডিনার করছিলাম, রাত আটটার দিকে, তখন বেলালের ফোনে একটা কল আসে। ও ফোনটা ধরে একটু ড্রয়িংরুমের দিকে যায়। তারপর ফিরে এসে বলে, ওর একটা খুব ইমার্জেন্সি কাজ পড়েছে, ওকে একটু বের হতে হবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কোথায় যাচ্ছে, ও শুধু বলল— 'আমি এক ঘণ্টার মধ্যে আসছি'। তারপর ও বেরিয়ে যায়।" আনিকা একটু থামলেন। উনার চোখের দৃষ্টিটা এবার একটু গম্ভীর হলো।

"এরপর আর ও বাসায় ফিরে আসেনি রাশেদ। আজ তিন দিন হতে চলল, বেলাল নিখোঁজ।"

"হোয়াট!" আমি প্রায় চিৎকার করে উঠতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলাম। আমি চারদিকে তাকিয়ে গলার স্বর নামিয়ে বললাম, "বলছ কী এসব? নিখোঁজ মানে কী? কী হয়েছে উনার?"

আনিকা একটা চরম বিরক্তিকর মুখ করে আমার দিকে তাকালেন। "আরে, আমি জানলে কি আর এখানে বসে কফি খেতাম? আমি যতোভাবে যোগাযোগ করা যায় করার চেষ্টা করেছি। ওর ফোন বন্ধ। ওর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব— সবাইকে কল করেছি। কেউ কিচ্ছু জানে না। ওর লন্ডনের কলিগদেরও ফোন করেছি, তারা ভেবেছে ও আমার সাথেই আছে।"

আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। বেলাল সাহেব নিখোঁজ! ঢাকা শহরের মতো জায়গায় একজন লন্ডনপ্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার নিখোঁজ হয়ে গেল! "তাহলে... তাহলে এখন কী হবে?" আমি আমতা আমতা করে বললাম।

"আজ সকালে বেলালের ভার্সিটি লাইফের দুই বন্ধুকে ডেকে এনেছিলাম। ওদের সাথে নিয়ে ধানমন্ডি থানায় গিয়েছিলাম। বেলালের নামে একটা মিসিং রিপোর্ট বা জিডি ফাইল করে এসেছি।" আনিকা খুব শান্তভাবে কথাটা বললেন। আমার মাথার ভেতর তখন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

"এক মিনিট দাঁড়াও," আমি হঠাৎ একটা খুব লজিক্যাল প্রশ্ন করে বসলাম। "বেলাল সাহেব যদি নিখোঁজ হয়ে থাকেন, তুমি যদি টেনশনে থাকো, তাহলে গত দুই দিন ধরে তোমার ফোন বন্ধ দেখাচ্ছিল কেন? তুমি আমাকে একটা মেসেজও দিলে না কেন?" আনিকা আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গাধা। "আরে বুদ্ধু!" আনিকা উনার কাঁটাচামচটা টেবিলে রেখে বললেন। "তুমি কি আসলেই এত বোকা, নাকি বোকা সাজার ভান করো? তুমি যে নাম্বারে আমাকে ফোন দাও, সেটা আমার সেকেন্ড নাম্বার। ওই নাম্বারটা আমি শুধু তোমার সাথে যোগাযোগ করার জন্যই কিনেছিলাম। আমার ফ্যামিলি, ফ্রেন্ডস, আর অফিশিয়াল কাজের জন্য আমার মেইন নাম্বার আলাদা, যেটা সবসময় খোলা থাকে।"

আমার চোখ কপালে উঠে গেল। একটা নারী কতটা ধূর্ত, কতটা ক্যালকুলেটিভ হলে পরকীয়া করার জন্য আলাদা একটা বার্নার সিম ব্যবহার করতে পারে!"আর তুমি আমাকে মেসেজ দিতে বলছ?" আনিকা একটু ঝাঁঝালো গলায় বললেন। "আমার স্বামী নিখোঁজ! আমি থানায় দৌড়াচ্ছি, বেলালের বন্ধুদের সাথে কথা বলছি। এই অবস্থায় আমি যদি ওই ফোনটা অন রাখতাম, আর তুমি যদি অনবরত আমাকে কল করতে থাকতে, তাহলে ব্যাপারটা কেমন হতো? যদি বেলালের কোনো বন্ধু বা পুলিশ আমার সেকেন্ড ফোনটা দেখে ফেলত? স্বামীর নিখোঁজের সময় একজন নারী তার গোপন প্রেমিকের সাথে চ্যাটিং করছে— এটা দেখলে পুলিশের সন্দেহ সবার আগে কার ওপর পড়ত, বুঝতে পারছ না?"

আমি আনিকার এই সাইকোলজিক্যাল আর লজিক্যাল ব্যাখ্যার সামনে একদম বোবা হয়ে গেলাম। উনার কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু উনার এই নিখুঁত, কোল্ড-ব্লাডেড হিসাব-নিকাশ আমাকে মানসিকভাবে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা দিল। "কিন্তু আনিকা," আমি একটু রুক্ষ গলায় বললাম, "তুমি থানায় গেলে, বেলালের বন্ধুরা তোমার ফ্ল্যাটে এল। আমি তো গত পঁচিশ দিন ধরে ওই ফ্ল্যাটে ছিলাম। বিল্ডিংয়ের দারোয়ান মফিজ থেকে শুরু করে আশেপাশের দোকানদার— সবাই তো আমাকে চেনে। পুলিশ বা বেলালের বন্ধুরা যদি দারোয়ানকে জেরা করে, দারোয়ান তো আমার কথা বলে দেবে। তখন কী হবে?"

আনিকা একটা খুব তৃপ্তির হাসি হাসলেন। উনার চোখে একটা শয়তানি ঝিলিক। "আমি কি এতটা কাঁচা কাজ করতে পারি রাশেদ? আমি জানি দারোয়ান তোমাকে চেনে। তাই আমি থানায় তোমার কথা লুকাইনি। আমি নিজেই পুলিশের কাছে তোমার কথা বলেছি।"

"কী!" আমি প্রায় লাফিয়ে উঠলাম। "তুমি পুলিশকে আমার কথা বলেছ? তুমি কি আমাকে ফাঁসাচ্ছ আনিকা?"

"আহ! চিল্লাচ্ছ কেন?" আনিকা আমাকে ইশারা করে বসতে বললেন। "শোনো আমি পুলিশকে কী বলেছি। আমি বলেছি, তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। তুমি একজন অনুবাদক আর প্রুফরিডার। আমার নতুন উপন্যাসের কাজে আমাকে হেল্প করার জন্য তুমি গত কয়েকদিন আমার বাসায় গেস্ট হিসেবে ছিলে। বেলাল দেশে আসার পর তুমি চলে গেছ। ব্যাস! এতে সন্দেহের কী আছে?"

আমি আনিকার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। আমি উনার ছোট ভাই! যে নারীর যোনির প্রতিটি ভাঁজ আমার জিভের স্পর্শে ভিজেছে, যে নারীর স্তন আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুষেছি, যে নারীর সাথে আমি বাথরুম থেকে শুরু করে বেডরুম পর্যন্ত আদিম পশুর মতো সঙ্গম করেছি— সেই নারী এখন আমাকে বানিয়েছে উনার ছোট ভাই!

আমার বুকের ভেতর একটা প্রচণ্ড কালো রসবোধ বা ডার্ক হিউমার জেগে উঠল। "আমি তোমার ছোট ভাই?" আমি একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বললাম। "তুমি কি আমাকে গেম অফ থ্রোনস-এর গল্প শোনাচ্ছ? তুমি কে? তুমি সার্সেই ল্যানিস্টার, আর আমি জেমি ল্যানিস্টার? ভাই-বোনের এই পবিত্র ইনসেস্ট কি ঢাকা শহরের পুলিশ বিশ্বাস করবে?"

আনিকা আমার এই তীক্ষ্ণ এবং সারকাস্টিক রেফারেন্সটা সাথে সাথে ধরে ফেললেন। উনার মুখটা একটু শক্ত হলো। "মজা করবে না রাশেদ। পরিস্থিতি সিরিয়াস।"

"মজার ব্যাপার কী!" আমি এবার আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না। আমার ভেতরের সমস্ত ফ্রাস্ট্রেশন আর অপমান একটা গালি হয়ে বেরিয়ে এল। "আমি তো দেখছি আমি সত্যিই বাঞ্চোদ! আক্ষরিক অর্থেই বেহেঞ্চুদ!"

কথাটা খুব আস্তে বললেও, শব্দটা গ্লোরিয়া জিন্সের মতো জায়গায় বসে একজন নারীর মুখের ওপর বলাটা চরম অসভ্যতা। কিন্তু আমার তখন কোনো হুশ ছিল না। আনিকা টেবিলের ওপর দিয়ে উনার হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। "চুপ!" উনার গলায় এবার একটা ভয়ংকর কর্তৃত্ব। "আগে শোনো আমি কী বলছি। পুলিশ হয়তো ইনভেস্টিগেশনের জন্য তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। তোমাকে থানায় ডাকতে পারে। ভয়ের কিচ্ছু নেই। পুলিশকে তোমার সার্সেই আর জেমি ল্যানিস্টারের ফ্যান্টাসি শোনানোর কোনো দরকার নেই। আমি যা বলেছি, তুমি জাস্ট সেটাই রিপিট করবে। বলবে তুমি প্রুফরিডিংয়ের জন্য ছিলে। আর সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট কথা— পুলিশকে বলবে, বেলাল জানত যে তুমি ওই ফ্ল্যাটে ছিলে। বেলাল আসার পর তুমি চলে এসেছ। আন্ডারস্টুড?"

আমি উনার হাতের মুঠো থেকে আমার হাতটা ছাড়িয়ে নিলাম। আমার মাথার ভেতর তখন একটা সাইরেন বাজছে। আমি একটা নিখোঁজ ব্যক্তির কেসে পুলিশের খাতায় ঢুকে গেছি! আমার জীবনটা এখন একটা সুতোর ওপর ঝুলছে। আমাদের কফি খাওয়া শেষ হলো। আনিকা বিল পেমেন্ট করলেন।

আমরা গ্লোরিয়া জিন্স থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে কড়া রোদ। আনিকা উনার সানগ্লাসটা চোখে পরলেন। উনার জন্য একটা উবার অপেক্ষা করছিল। উনি গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার আগে আমার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। আমি উনার দিকে তাকিয়ে একটা বিষণ্ণ, তিক্ত হাসি দিয়ে বললাম, "কী ব্যাপার আনিকা? আমার ওই পাগল বাঁড়াটা সুস্থ করবে না? নাকি এখন আমি শুধুই ছোট ভাই?"

আনিকা গাড়ির দরজা ধরে আমার দিকে একটু ঝুঁকলেন। উনার ঠোঁটে সেই পুরোনো, ঘাতক আর মোহনীয় হাসিটা আবার ফিরে এল। উনি উনার সানগ্লাসের ওপর দিয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু, আবেদনময়ী গলায় ফিসফিস করে বললেন— "আর কটা দিন সময় দাও মিস্টার। পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হোক। তোমার ওই পাগলকে আমি এমন সুস্থ করব... যে সে চিরদিনের জন্য পাগল হয়ে যাবে!"

কথাটা বলে আনিকা গাড়িতে উঠে বসলেন। দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
গাড়িটা আমার চোখের সামনে দিয়ে ধানমন্ডির জ্যামের ভেতর হারিয়ে গেল। আমি ফুটপাতে একা দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার মাথার ওপর ঢাকা শহরের কাঠফাঁটা রোদ। আমার ভেতরে এখন একটা খুনের মামলার আতঙ্ক, আর একই সাথে একটা চরম, বন্য কামনার আগুন জ্বলছে। আমি জানি না বেলাল সাহেবের কী হয়েছে। আমি জানি না আনিকা নাওহার নামের এই ভয়ংকর, সুন্দরী নারীটি আসলে কে।
Like Reply
অসাধারণ, রেপু দিলাম



Quote:যুক্তি যেখানে শেষ হয়, অনুভূতির অরণ্য সেখান থেকেই শুরু।
Like Reply
কাহিনী যে কোথায় থেকে কোথায় যাচ্ছে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। বেলাল সাহেব কি নিখোঁজ হয়েছে নাকি আনিকা
তাকে নিখোঁজ করিয়েছে নাকি ঘটনা অন্যকিছু। সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। দারুন একটা উত্তেজনাপূর্ণ পর্বের জন্য ধন্যবাদ। শো
Like Reply
ওয়াও! কোন কাহিনী কই চলে আসলো?!!! গল্পটা এরকম থ্রিলার হবে সেটা ভাবিনি।
Like Reply
Darun darun... Arejta twist... Thrilling lagche.. Ager golpo takeo chalia jache sera egoche
Like Reply
suspense after suspense. Eagerly waiting for new bigger update
Like Reply
Darun
Like Reply
Porimoni ke niye story ta ar holo na... Waiting for the same
Like Reply
৩০।
মানুষের শরীরে অ্যাড্রেনালিন হরমোনটা এক অদ্ভুত জাদুকরের মতো কাজ করে। যখন এই হরমোন রক্তে মিশে যায়, তখন মানুষের ভয়ডর, ক্লান্তি, এমনকি ব্যথা বোধও কিছুক্ষণের জন্য পুরোপুরি উধাও হয়ে যায়। তখন একটা ছাপোষা কেরানিও মনে মনে নিজেকে জেমস বন্ড ভাবতে শুরু করে। তখন তার মনে হয়, সে একাই পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যেতে পারবে।

গ্লোরিয়া জিন্স থেকে বেরিয়ে কারওয়ান বাজারের অফিসে ফেরা পর্যন্ত আমার ধমনিগুলোতে সেই অ্যাড্রেনালিন হরমোনের একটা তীব্র, জ্বলন্ত প্রবাহ ছিল। আনিকার সাথে ওই ফেস-টু-ফেস কনফ্রন্টেশন, উনার সেই বরফশীতল পরিকল্পনা এবং সার্সেই ল্যানিস্টারের মতো ডায়ালগবাজি— সবকিছু মিলিয়ে আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত ঘোরের সৃষ্টি হয়েছিল। আমি যেন কোনো হলিউড থ্রিলারের মেইন প্রোটাগনিস্ট হয়ে গেছি, যে এইমাত্র ভিলেনের চোখের দিকে তাকিয়ে এক চরম সত্যের মুখোমুখি হয়ে ফিরে এসেছে। বাসে ওঠার পর কন্ডাক্টর যখন ভাড়া চাইল, আমি এমন একটা ভাব নিয়ে তাকে টাকাটা দিলাম, যেন আমি তাকে বকশিশ দিচ্ছি। আমার চোখের দৃষ্টি তখন তীক্ষ্ণ, চোয়াল শক্ত।

কিন্তু জাদুকরের ম্যাজিক যেমন একসময় শেষ হয়, হরমোনের মেয়াদও ফুরিয়ে আসে। আর সেই হরমোনের প্রভাব যখন রক্ত থেকে নামতে শুরু করে, তখন বাস্তবতার নগ্ন রূপটা এমনভাবে হামলে পড়ে যে, মানুষের তখন নিজের ছায়াকে দেখলেও হার্ট অ্যাটাক হওয়ার উপক্রম হয়।

বাস থেকে কারওয়ান বাজারে নামার সাথে সাথেই আমার সেই জেমস বন্ড ভাবটা কর্পূরের মতো উড়তে শুরু করল। ঢাকা শহরের কড়া রোদ, ধুলোবালি, আর সিএনজির কালো ধোঁয়া আমাকে খুব দ্রুত মনে করিয়ে দিল যে আমি আসলে কে। আমি কোনো হলিউড হিরো নই। আমি রাশেদ আহমেদ। পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের এক সামান্য অনুবাদক, যে একটা চরম ভয়াবহ, নোংরা এবং প্রাণঘাতী ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে।

অফিসে ঢুকে নিজের ডেস্কে বসার সাথে সাথেই আমার সেই ঘোরটা দপ করে কেটে গেল। অফিসে ঢুকতেই প্রথম যে ধাক্কাটা খেলাম, সেটা এহসান ভাইয়ের কাছ থেকে। "রাশেদ! তোমার সমস্যাটা কী বলতে পারো?" এহসান ভাই উনার চশমার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন আমি ল্যাপটপ চুরি করে পালিয়ে যাচ্ছিলাম। উনার কপালে তিনটে গভীর ভাঁজ, যা শুধু চরম বিরক্তির সময়ই ফুটে ওঠে।

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। 

"কাউকে কিছু না বলে, কোনো ইনফর্ম না করে তুমি মাঝ-অফিসে গায়েব হয়ে গেলে! আমি তোমাকে আধা ঘণ্টা ধরে খুঁজছি। পুতিনের স্পিচের অনুবাদটা কে করবে? তোমার কি মনে হয় অফিসটা তোমার শ্বশুরবাড়ি? যখন খুশি আসবে, যখন খুশি যাবে?"

শ্বশুরবাড়ি!’ শব্দটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। এহসান ভাই সাধারণ একটা উপমা দিয়েছেন মাত্র, কিন্তু আমার কাছে শব্দটা একটা জ্বলন্ত চাবুকের মতো শোনাল। আমি তো গত এক মাস আনিকা নাওহারের ফ্ল্যাটে আক্ষরিক অর্থেই ঘরজামাই হয়ে ছিলাম! আমার মনে হলো এহসান ভাই কি কোনোভাবে কিছু জেনে গেছেনআমি দ্রুত নিজেকে সামলে নিলাম।

"সরি ভাই," আমি আমতা-আমতা করে, চরম অপরাধী মুখে বললাম। "আসলে... আমার মেসের এক ছোট ভাই হঠাৎ করে বাইক অ্যাকসিডেন্ট করে পঙ্গু হাসপাতালে... আমাকে একটু ইমার্জেন্সি ছুটতে হয়েছিল। মাথা এত ব্ল্যাঙ্ক ছিল যে আপনাকে বলে যাওয়ার কথাও মনে ছিল না। এক্সট্রিমলি সরি ভাই। আমি এক্ষুনি নিউজটা নামিয়ে দিচ্ছি।"

বাংলাদেশে বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ইনভেন্টরি বা রেডিমেড মিথ্যা কথা বলা। মানুষের বিপদে মানুষ যতটা না সহানুভূতি দেখায়, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি সহানুভূতি দেখায় মেডিকেল ইমার্জেন্সিতে। আপনি যদি বলেন আপনার প্রেমিকা পালিয়েছে, বস আপনাকে ঘাড় ধাক্কা দেবে। কিন্তু আপনি যদি বলেন আপনার মামাতো ভাইয়ের অ্যাপেন্ডিসাইটিস ফেটে গেছে, বস সাথে সাথে গলে পানি হয়ে যাবে।

এহসান ভাই 'পঙ্গু হাসপাতাল' শুনে একটু নরম হলেন। উনার কপালের ভাঁজগুলো কিছুটা সমতল হলো। "অ্যাকসিডেন্ট? খুব সিরিয়াস নাকি?"

"জি ভাই, পা ভেঙে দুই টুকরো হয়ে গেছে। রড ঢোকাতে হবে," আমি অবলীলায় আমার কাল্পনিক ছোট ভাইয়ের পা ভেঙে দিলাম।

"
আহারে! সাবধানে থাকতে বলবা পোলাপানদের। ঠিক আছে, বসো। আর নেক্সট টাইম এটলিস্ট একটা টেক্সট করে যাবে। দিস ইজ নট এ জোক। আমরা নিউজ ডেস্কে কাজ করি, এখানে প্রতিটা সেকেন্ড ইম্পর্ট্যান্ট," বলে উনি উনার কাজে মন দিলেন।

আমি আমার ল্যাপটপটা ওপেন করলাম। পুতিনের স্পিচের ভিডিওটা প্লে করলাম। কিন্তু আমার চোখ বা কান— কোনোটিই স্ক্রিনে নেই। স্ক্রিনে পুতিন অত্যন্ত গম্ভীর মুখে নিউক্লিয়ার ওয়ার বা পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছেন। পুরো বিশ্ব হয়তো সেই হুমকিতে কাঁপছে, কিন্তু আমার তাতে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। আমার নিজের জীবনের ওপর দিয়ে যে পারমাণবিক বোমাটা ফাটতে যাচ্ছে, তার সামনে পুতিনের হুমকিকে আমার কাছে ছোট বাচ্চাদের পটকা ফোটানো বলে মনে হলো।

অ্যাড্রেনালিন হরমোনটা ততক্ষণে পুরোপুরি আমার শরীর থেকে নেমে গেছে। আর তার শূন্যস্থানটা দখল করে নিয়েছে একটা বরফশীতল, হাড়-কাঁপানো, প্যাথলজিক্যাল আতঙ্ক।

ভয়!

খাঁটি, নির্ভেজাল ভয়।

কী হচ্ছে এসব আমার জীবনে? আমি কোথায় এসে ফেঁসে গেছিআমার মাথার ভেতরে এখন পুলিশের সাইরেন বাজতে শুরু করেছে। আনিকা থানায় গিয়ে মিসিং রিপোর্ট বা জিডি ফাইল করে এসেছে। আর সেই জিডিতে আমার নাম আছে। আমি নাকি উনার 'ছোট ভাই', 'প্রুফরিডার', এবং 'গেস্ট'!

বাংলাদেশ পুলিশের তদন্ত করার ধরন সম্পর্কে আমার খুব ভালো ধারণা আছে। এই দেশের পুলিশকে যতটা বোকা ভাবা হয়, তারা আসলে ততটা বোকা নয়। তাদের কাছে হয়তো উন্নত বিশ্বের মতো ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ডিএনএ এনালাইসিসের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নেই, কিন্তু তাদের কাছে যেটা আছে, সেটা হলো 'সোর্স' এবং 'জেরা করার ক্ষমতা'

একটা লোক নিখোঁজ হয়েছে। তার বেডরুমে গত পঁচিশ দিন ধরে একটা অচেনা, ভিনদেশি (মানে মিরপুরের) যুবক ছিল। পুলিশ যখন তদন্ত শুরু করবে, তখন কি তারা শুধু আনিকার মুখের কথার ওপর ভরসা করে বসে থাকবেকক্ষনোই না। তারা প্রথমেই আমার কল লিস্ট চেক করবে। তারা দেখবে আমি আনিকাকে দিনে কতবার ফোন দিয়েছি, কতক্ষণ কথা বলেছি। তারা আমার হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজ রিকভার করবে। তারা ওই ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করবে। বিল্ডিংয়ের মেইন গেটে, লবিতে, লিফটে— সব জায়গায় সিসি ক্যামেরা বসানো। তারা খুব সহজেই দেখতে পাবে আমি কীভাবে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আনিকার সাথে ওই ফ্ল্যাটে ঢুকতাম, আর পরদিন সকালে কীভাবে একটা ভেজা বিড়ালের মতো বেরিয়ে আসতাম।

আর বিল্ডিংয়ের দারোয়ান মফিজ? ওই লোকটাকে তো আমি চিনি! ওকে ধরে যখন পুলিশ দুইটা ধমক দেবে, কিংবা হাতে পাঁচশো টাকার একটা কড়কড়ে নোট গুঁজে দেবে, মফিজ তখন গড়গড় করে সব বলে দেবে। "স্যার, এই পোলারে তো ম্যাডাম রোজ রাইতে বাসায় নিয়া ঢুকতো। আমরা তো ভাবছিলাম এরা স্বামী-স্ত্রী! ম্যাডামের জামাই তো বিদেশে থাহে, আর এই পোলা তো ম্যাডামের লগেই আঠার মতো লাইগা থাকতো। এরা তো স্বামী-স্ত্রীর লাহানই আছিল!"

মফিজের এই একটা কথাই আমাকে সোজা ফাঁসির দড়ির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। পুলিশ যদি একবার, জাস্ট একবার আনিকার আর আমার আসল সম্পর্কের কথাটা টের পায়, তাহলে আমার কী হবেআমার চোখের সামনে ভাসতে শুরু করল একটা ভয়াবহ দৃশ্য।

পুলিশ আমাকে আমার মেস থেকে, অথবা এই কারওয়ান বাজারের অফিস থেকেই হাতকড়া পরিয়ে ধরে নিয়ে গেছে। থানার অন্ধকার একটা রুমে আমাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। সিলিং ফ্যানের সাথে আমাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমার পরনে শুধু একটা আন্ডারওয়্যার। আমার সারা গায়ে কালশিটে দাগ। একজন ষণ্ডামার্কা, কালো, গোঁফওয়ালা পুলিশ অফিসার হাতে একটা মোটা, তেল মাখানো লাঠি নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দুটো জবা ফুলের মতো লাল।

অফিসারটা লাঠি দিয়ে আমার হাঁটুতে একটা সজোরে বাড়ি মারল। "কইয়া ফ্যাল শুয়োরের বাচ্চা!" অফিসারটা গর্জে উঠবে। "বেলাল সাহেবরে তুই আর ওই মাগি মিইলা কই গুম করছস? লাশ কই পুঁইতা রাখছস? ওই লন্ডনি সাহেবের এত টাকার সম্পত্তি তুই একা খাইতে চাস? কইয়া ফ্যাল, নাইলে আজকে তোর হাড়ের মজ্জা বাইর কইরা দিমু!"

আমি ব্যথায় চিৎকার করতে করতে বলব, "স্যার, আমি কিচ্ছু জানি না! আমি সত্যি বলছি স্যার, আমি শুধু উনার সাথে শুয়েছি, আমি কাউকে খুন করিনি!"

"চুপ কর হারামি! তুই কি ভাবছস আমরা ঘাস খাই? তুই আর ওই আনিকা মিইলা প্ল্যান কইরা জামাইরে দুনিয়া থেইকা সরাইয়া দিছস। এখন সাধু সাজতেছস!"

রিমান্ডের এই কল্পনাটা এতই জীবন্ত আর এতই রিয়েলিস্টিক ছিল যে, অফিসের এসির মধ্যেও আমার কপাল ঘেমে উঠল। আমি আমার হাতের আঙুলগুলোর দিকে তাকালাম। এই আঙুলগুলো দিয়ে আমি ল্যাপটপে টাইপ করি, এই আঙুলগুলো দিয়ে আমি আনিকার শরীর ছুঁয়েছি। আর এই আঙুলগুলোতেই হয়তো পুলিশ প্লাস দিয়ে চেপে ধরে আমার নখ উপড়ে ফেলবে!

আর আনিকা? আনিকার মতো হাই-সোসাইটির বিলিয়নিয়ার নারী কি পুলিশের সামনে আমার হয়ে ঢাল ধরবেউঁহু। কোনো চান্স নেই। শূন্য পারসেন্ট চান্স। আনিকা নাওহার হচ্ছে সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্টের এক চরম উদাহরণ। উনি নিজের স্বার্থের জন্য, নিজের স্কিন বাঁচানোর জন্য পৃথিবীর যেকোনো কিছু করতে পারেন। পুলিশের জেরার মুখে পড়লে, আনিকা যদি দেখে যে তার নিজের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে, তখন সে এক সেকেন্ডও সময় নেবে না আমাকে বলি দিতে। সে আমাকে একটা ব্যবহৃত টিস্যু পেপারের মতো ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলবে।

আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, কোর্টের কাঠগড়ায় আনিকা দাঁড়িয়ে আছেন। উনার পরনে একটা ধবধবে সাদা শাড়ি। চোখে জল। উনাকে দেখতে একদম স্বর্গের কোনো নিষ্পাপ, দুঃখী পরীর মতো লাগছে। বিচারক থেকে শুরু করে কোর্টের পিয়ন পর্যন্ত সবাই উনার রূপ আর উনার কান্নায় গলে পানি হয়ে যাচ্ছে।

উনি চোখের পানি মুছতে মুছতে ম্যাজিস্ট্রেটকে বলবেন, "ইয়োর অনার, আমি তো অসহায় একটা মেয়ে। আমার স্বামী বিদেশে থাকত। আমি একা থাকতাম। এই রাশেদ লোকটা একটা সাইকোপ্যাথ। সে আমার প্রুফরিডার ছিল। কিন্তু সে আমার প্রেমে পাগল হয়ে আমার পিছে পিছে ঘুরত। সে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করত। আমার স্বামী বেলাল যেদিন দেশে ফেরে, তখন এই রাশেদ ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি। সে-ই হয়তো আমার স্বামীকে কিছু করেছে! ইয়োর অনার, আমি কিচ্ছু জানি না। আমার স্বামীকে আপনারা ফিরিয়ে দিন!"

ব্যাস! দুই পুরুষের লড়াইয়ে এক অসহায় নারীর করুণ গল্প! বাংলার মিডিয়া আর পাবলিক এই ধরনের গল্প লুফে নেবে। আমাদের দেশের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় বিনোদন হলো অন্যের স্ক্যান্ডাল। পরকীয়া, খুন, আর লন্ডনপ্রবাসী নারী— এই তিনটা উপাদান একসাথে পেলে মিডিয়া যা করবে, তা কল্পনা করলেও আমার গা শিউরে উঠছে।

পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় লাল কালিতে হেডলাইন হবে—

"পরকীয়ার বলি লন্ডনপ্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার: ঘাতক অনুবাদক রাশেদ রিমান্ডে!"

"লেখিকা স্ত্রীর গোপন প্রেমিক: কে এই রাশেদ?"

"
প্রেমিকের হাতে স্বামী খুন: ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে কী ঘটেছিল সেই রাতে?"


আর সোশ্যাল মিডিয়া? ফেসবুক আর ইউটিউবে তো আমাকে নিয়ে রীতিমতো উৎসব শুরু হয়ে যাবে। বড় বড় ইউটিউবাররা আমার ছবি, আনিকার ছবি আর বেলালের ছবি দিয়ে থাম্বনেইল বানাবে। লাল গোল্লা দিয়ে আমার মুখটা মার্ক করে ক্যাপশন দেবে— "দেখুন এই নরপিশাচের আসল চেহারা!" টক শোগুলোতে বড় বড় সমাজবিজ্ঞানীরা আমার চারিত্রিক অবক্ষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকবক করবেন। আমার মেসের রুমমেট তুহিন আর রাজুকে টিভিতে ইন্টারভিউ দিতে দেখা যাবে। তারা বলবে— "রাশেদ ভাই তো সারাদিন চুপচাপ থাকত। আমরা তো ভাবতেও পারিনি সে এত বড় একটা খুনি আর লুইচ্চা!"

আমার বাবা... নওগাঁর সেই সাধারণ ভুসিমাল ব্যবসায়ী। যিনি গ্রামের দোকানে বসে বুক ফুলিয়ে বলেন তার ছেলে ঢাকা পেপারসে চাকরি করে। তিনি যখন টিভিতে এই খবর দেখবেন, তখন তার কী হবে? আমার মা তো লজ্জায়, অপমানে হয়তো গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করবেন। আমার ছোট ভাই নিহাদকে কেউ আর সম্মান করবে না। আমার পুরো পরিবারটার মুখে চুনকালি মেখে যাবে।

ভয়ে আমার পুরো শরীর ঠাণ্ডা হতে লাগল। অফিসের সেন্ট্রাল এসি আজ চলছে চব্বিশ ডিগ্রিতে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমি সাইবেরিয়ার কোনো বরফ ঢাকা পাহাড়ে বসে আছি। শীত আর ভয়ের ঠাণ্ডা মিলে আমার গা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করল। আমি দুই হাত দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ধরে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে, চারপাশের বাতাস ক্রমশ কমে আসছে।

আমি কি সত্যিই কোনো খুনের সাথে জড়িত? না। আমি তো শুধু একটা লোভের বশবর্তী হয়ে একটা মেয়ের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিলাম। আমার অপরাধ তো শুধু কামনার। কিন্তু আইন আর সমাজ তো আমার সেই ফ্যান্টাসিকে বিবেচনা করবে না। তারা দেখবে ফ্যাক্ট। আর ফ্যাক্ট হলো, বেলাল যেদিন নিখোঁজ হয়, সেদিন আমি ওই ফ্ল্যাটে ছিলাম।

আমার মাথার ভেতর আরেকটা অমীমাংসিত প্রশ্ন একটা ড্রিলের মতো ঘুরতে লাগল। সেদিন সকালে, মানে ২রা এপ্রিল, বেলাল সাহেব যখন লাগেজ নিয়ে আনিকার ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন, তখন আসলে কী ঘটেছিল?

আমি তো নিজের প্রাণ বাঁচাতে খালি পায়ে দৌড়ে ইমার্জেন্সি সিঁড়ি দিয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আনিকা? আনিকা তো তখনো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় মাস্টার বেডরুমে ঘুমাচ্ছিল। বেলাল সাহেব কি সরাসরি বেডরুমে ঢুকেছিলেনএকজন স্বামী মাসের পর মাস বিদেশে থাকার পর যখন দেশে ফিরে আসে, তখন সে তো সর্বপ্রথম তার স্ত্রীর কাছেই যায়। বেলাল সাহেব নিশ্চয়ই বেডরুমে ঢুকেছিলেন। উনি কি উনার স্ত্রীর ওই এলোমেলো, সদ্য-সঙ্গম-করা শরীর দেখে কিচ্ছু বুঝতে পারেননি?

আমাদের সেই উদ্দাম রাতের পর বিছানার চাদরের যে অবস্থা ছিল, বাতাসে যে তীব্র আদিম গন্ধটা ভাসছিল, সেটা তো যেকোনো সাধারণ মানুষেরও বুঝে ফেলার কথা। তার ওপর আমি ছিলাম। আমি যে একটা পরপুরুষ ওই ফ্ল্যাটে ছিলাম, সেটার চিহ্ন তো সব জায়গায় ছড়ানো ছিল। আমার ফেলে যাওয়া আড়ংয়ের শার্ট, আমার জুতো, আমার ছাইদানিতে ফেলে রাখা সিগারেটের ফিল্টার!

বেলাল সাহেব কি এগুলো কিছুই দেখেননিনাকি আনিকা জাদুকর? কীভাবে একটা লোক, তার নিজের বেডরুম থেকে একজন অচেনা যুবককে ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে আসতে দেখে, এবং তারপর ড্রয়িংরুমে সেই যুবকের সাথে বসে হাসিমুখে কফি খায়! "কী ব্যাপার, নাশতা আনতে গিয়েছিলেন?"— এটা কি কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক, আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন স্বামীর কথা হতে পারে?

এই মহিলা কি কোনো মায়াবিনী? উনার কাছে কি এমন কোনো ব্ল্যাকম্যাজিক বা সম্মোহনবিদ্যা আছে যা দিয়ে উনি উনার স্বামীকে হিপনোটাইজ করে ফেলেছিলেন? নাকি বেলাল সাহেব নিজেই কোনো অদ্ভুত সাইকোলজিক্যাল রোগে ভুগছিলেন? উনি কি ওপেন ম্যারেজ বা কাকোল্ড (Cuckold) ফ্যান্টাসিতে বিশ্বাসী ছিলেন, যেখানে নিজের স্ত্রীকে অন্যের সাথে দেখতে আনন্দ পান?

না, এটা অসম্ভব। বেলাল সাহেবের চোখের দৃষ্টিতে আমি সেদিন কোনো বিকারগ্রস্ত মানুষের ছায়া দেখিনি। উনি একজন সাধারণ, ভদ্র এবং শিক্ষিত মানুষের মতোই আচরণ করছিলেন। তাহলে আনিকা উনাকে কী বলেছিলেন? কীভাবে উনি পরিস্থিতিটা এত ঠান্ডা মাথায় ম্যানেজ করেছিলেন? এবং সবচেয়ে বড় কথা, বেলাল সাহেব এখন কোথায়?

যদি বেলাল সাহেবকে খুন করা হয়ে থাকে, তবে সেটা কে করেছে? আনিকা নিজে? একজন নারী একা একটা সুঠামদেহী পুরুষকে কীভাবে গুম করতে পারে? নাকি আনিকার সাথে আরও কেউ জড়িত আছেএসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। কিন্তু এই প্রশ্নগুলো আমার মগজটাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। আমার মাথার ভেতর একটা ব্লেন্ডার মেশিন চলছে, যেটা আমার সমস্ত লজিক, সমস্ত ভাবনাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলছে।

আমি এখন কী করব?

আমার তো এখনই পালানো উচিত। বাংলাদেশ ছেড়ে, বর্ডার ক্রস করে ইন্ডিয়া বা নেপালে পালিয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু আমার পকেটে তো টাকা নেই। আমার পাসপোর্ট নেই। আমি কোথায় পালাববিপদে পড়লে মানুষ সাধারণত তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বা পরিবারের সাথে শেয়ার করে। মানুষ চায় কারো কাঁধে মাথা রেখে একটু কাঁদতে, একটু সান্ত্বনা পেতে। কিন্তু আমার এই বিপদটা এতটাই নোংরা, এতটাই কদর্য এবং এতটাই অবিশ্বাস্য যে, এটা কারো সাথে শেয়ার করার উপায় নেই।

আমি যদি আমার বাবা-মাকে বলি যে আমি অন্যের স্ত্রীর সাথে শুতে গিয়ে এখন গুমের মামলায় ফেঁসে যাচ্ছি, বাবা হার্ট অ্যাটাক করবেন আর মা বিষ খাবেন। মেসের তুহিন বা রাজুকে বললে ওরা আমাকে রাতেই মেস থেকে বের করে দেবে। ওরা তো ভদ্র ফ্যামিলির ছেলে, ওরা তো কোনো মার্ডার সাসপেক্টকে নিজেদের রুমে থাকতে দেবে না।

আমার এমন একজনকে দরকার, যে এই দুনিয়ার অন্ধকার গলিঘুঁজি খুব ভালো করে চেনে। যে পুলিশ, ক্রাইম, আন্ডারওয়ার্ল্ড আর থানা-পুলিশের সাইকোলজি বোঝে। যে বুঝতে পারবে পুলিশ কীভাবে চিন্তা করে, আর ক্রিমিনালরা কীভাবে ফাঁদ পাতে। এবং সবচেয়ে বড় কথা, আমার এমন কাউকে দরকার যে আমার এই ঘটনা শুনে আমাকে জাজ করবে না। যে আমাকে নীতিবাক্য শোনাবে না বা নৈতিকতার লেকচার দেবে না।

আমি শূন্য দৃষ্টিতে নিউজ রুমের দিকে তাকালাম। হঠাৎ করে আমার মাথায় একটা নাম বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল।

আশিক ভাই!
Like Reply
চমৎকার ❤️❤️
Like Reply
রাশেদতো ভালই সমস্যার মধ্যে পড়ে গেল। ঘটনার গতি প্রকৃতি কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। আনিকা কি পরিকল্পিত ভাবে বেলালকে ঘুম করে রাশেদকে বলির পাঠা বানিয়ে বেলাল এর সম্পত্তি গ্রাস করতে চাচ্ছে। সামনে হয়ত সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। একটা সুন্দর পর্বের জন্য ধন্যবাদ।
Like Reply
দারুণ, রেপু দিলাম।



Quote:যুক্তি যেখানে শেষ হয়, অনুভূতির অরণ্য সেখান থেকেই শুরু।
[+] 1 user Likes The.Real.Whispers's post
Like Reply
ঘটনা কোন দিকে যাচ্ছে বুঝতে পারছিনা। বড় একটা আপডেটে গল্পের গতি-প্রকৃতি ক্লিয়ার করার অনুরোধ
Like Reply
পোস্ট আরও বড় হলে ভালো হয়।ছোট হওয়ায় প্রতি ক্ষেত্রেই অতৃপ্তি বেশি হচ্ছে।
Like Reply
(14-07-2026, 04:36 PM)Rasel3333 Wrote: পোস্ট  আরও বড় হলে ভালো হয়।ছোট হওয়ায় প্রতি ক্ষেত্রেই অতৃপ্তি বেশি হচ্ছে।

ভাই, এটাও দেখো আপডেট কত দ্রুত আসছে, প্রায় প্রতিদিন নতুন আপডেট আসছে।
Like Reply
Gr8 update
Like Reply
নতুন চরিত্রের আগমন!! দেখা যাক কী হয়।
Like Reply
৩১।

আশিক ভাই!

আশিক ভাই আমাদের 'ঢাকা পেপারস'-এর ক্রাইম বিটের চিফ রিপোর্টার। উনার বয়স পঁয়ত্রিশের মতো হবে। উনার চেহারাটা সবসময় একটা রুক্ষ, রাফ-অ্যান্ড-টাফ লুক দেয়। উনাকে কখনো ফর্মাল শার্ট বা ইন-করা প্যান্ট পরতে দেখিনি। উনার সিগনেচার ড্রেস হলো একটা উসকোখুস্কো, ফেডেড জিন্স আর একটা চেক শার্ট, যার ওপরের দুটো বোতাম সবসময় খোলা থাকে। উনার গলায় পত্রিকার প্রেস কার্ডটা একটা মাদুলি বা তাবিজের মতো ঝোলে।

আশিক ভাইয়ের চোখ দুটো সব সময় লাল থাকে। কেউ বলে উনি রাত জেগে সোর্স মেইনটেইন করেন বলে এই অবস্থা, আবার অফিসে এমন গুজবও আছে যে উনি নাকি গাঁজা বা অন্য কোনো নেশা করেন। তবে কারণ যাই হোক, উনার চোখের ওই লালচে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে দাঁড়ালে মনে হয় উনি আপনার পেটের ভেতরের কথাটাও স্ক্যান করে ফেলছেন।

বাংলাদেশের সংবাদ পাড়ায় আশিক ভাই বেশ নামি দামি একটা চরিত্র। ঢাকা শহরের বড় বড় থানার ওসি থেকে শুরু করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অনেক গডফাদারের সাথে উনার ডিরেক্ট কানেকশন। ডিবি পুলিশ, র‍্যাব, সিআইডি— সব জায়গায় উনার সোর্স আছে। কোথায় কোন মার্ডার হলো, কোন পলিটিশিয়ান কার সাথে ঘুষের ডিল করল, কোন মডেলকে কোন ব্যবসায়ী ফ্ল্যাট কিনে দিল— এই সমস্ত খবর আশিক ভাইয়ের নখদর্পণে। ক্রাইম রিপোর্টিংয়ে উনি একাই একশো।

উনার সাথে আমার সম্পর্কটা খুব একটা গভীর না। একই অফিসে কাজ করার সুবাদে জাস্ট 'হাই-হ্যালো' টাইপ সম্পর্ক। আমি থাকি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে, বিশ্বের পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, হোয়াইট কলার খবর নিয়ে। আর উনি থাকেন দেশের ড্রেন, নর্দমা আর রক্তের খবরের মধ্যে। আমাদের দুজনের পৃথিবীটা সম্পূর্ণ আলাদা। মাঝে মাঝে অফিসের নিচে টং দোকানে চা খাওয়ার সময় বা স্মোকিং লাউঞ্জে সিগারেট টানার সময় দেখা হলে একটু কুশল বিনিময় হয়।

"কী অবস্থা রাশেদ? বাইডেনের খবর কী?" উনি হয়তো সিগারেট ধরাতে ধরাতে বাঁকা হেসে জিজ্ঞেস করেন।

"এই তো ভাই, চলছে। আপনার এলাকার খবর কী? আজ কয়টা খুন হলো?" আমি পাল্টা মজা করি।

উনি আমাকে খুব একটা পাত্তা দেন না, কারণ উনার চোখে আমি তো নিরামিষ অনুবাদক। আমার জীবনে তো কোনো থ্রিল নেই, কোনো রহস্য নেই। কিন্তু আজ... আজ আমার এই নিরামিষ জীবনে যে পরিমাণ আমিষ মসলা, যে পরিমাণ রক্ত আর অপরাধের ছায়া ঢুকেছে, তাতে আশিক ভাই ছাড়া আমাকে আর কেউ উদ্ধার করতে পারবে না।

আশিক ভাই হয়তো আমাকে একটা গালি দেবেন। হয়তো বলবেন, "শালা, তুই দেখতে তো খুব ভদ্র, আর ভেতরে ভেতরে এত বড় প্লেয়ার! অন্যের বউয়ের সাথে বিছানায় যাস!" কিন্তু গালি দেওয়ার পরও উনি আমাকে পুলিশের সাইকোলজিটা অন্তত বুঝিয়ে বলতে পারবেন। উনি বলতে পারবেন আনিকা নাওহারের এই জিডি ফাইল করার পেছনে আসল উদ্দেশ্যটা কী হতে পারে। উনি আমাকে একটা পথ দেখাতে পারবেন, যাতে আমি এই ফাঁদ থেকে বের হতে পারি।

আমি ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরালাম। পুতিন তখনো স্পিচ দিয়ে যাচ্ছেন। পুতিন সাহেব, আপনার যুদ্ধ আপনি করুন। আমাকে এখন আমার নিজের বিশ্বযুদ্ধে নামতে হবে। আমি ল্যাপটপটা লক করলাম। একটা গভীর শ্বাস নিয়ে আমি আমার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম।

আশিক ভাইয়ের ডেস্কটা নিউজ রুমের একদম শেষ মাথায়। সেখানে সবসময় একটা বিশৃঙ্খল অবস্থা থাকে। চায়ের খালি কাপ, প্রিন্ট করা কাগজ, আর ছাইদানিতে সিগারেটের স্তূপ। আমি বুক দুরুদুরু অবস্থায় উনার ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আশিক ভাই তখন কানে ইয়ারফোন দিয়ে একটা ভয়েস রেকর্ড শুনছেন, আর খুব দ্রুত কিছু টাইপ করছেন। উনার মুখের এক পাশে একটা আধা-খাওয়া সিগারেট জ্বলছে।

"আশিক ভাই? একটু ডিস্টার্ব করি?" আমি খুব মিনমিন করে বললাম।

আশিক ভাই ইয়ারফোনটা এক কান থেকে খুলে আমার দিকে চোখ কুঁচকে তাকালেন। উনার লালচে চোখে একটা বিরক্তি আর কৌতূহলের মিশ্রণ। "আরে রাশেদ সাহেব! কী খবর? পুতিন আর ট্রাম্প কি সন্ধি কইরা ফেলল নাকি? তুমি ক্রাইম ডেস্কে কী মনে করে?"

"ভাই, সন্ধি তো দূরের কথা, আমার নিজের জীবনেই থার্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার শুরু হয়ে গেছে। আপনার সাথে একটু জরুরি কথা ছিল। একান্ত ব্যক্তিগত। পাঁচটা মিনিট সময় দেওয়া যাবে?" আমি খুব অসহায় একটা মুখ করে বললাম।

আমার গলার স্বর আর মুখের এক্সপ্রেশন দেখে আশিক ভাইয়ের রিপোর্টার ইনস্টিংক্ট হয়তো কিছু একটা আঁচ করতে পারল। উনি টাইপিং থামিয়ে উনার চেয়ারটা একটু ঘুরিয়ে আমার দিকে ফিরলেন। "বসো," উনি সামনের খালি চেয়ারটা দেখিয়ে বললেন। "বলো, কী এমন ওয়ার্ল্ড ওয়ার শুরু হইলো তোমার লাইফে?"

আমি চেয়ারটায় বসলাম। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস নিলাম। আমাকে খুব সাবধানে কথা বলতে হবে। এমনভাবে গল্পটা সাজাতে হবে যাতে আমার ইনভলভমেন্টটা থাকে, কিন্তু আমার আর আনিকার শারীরিক বা যৌন সম্পর্কের বিষয়টা পুরোপুরি আড়ালে থাকে। ক্রাইম রিপোর্টাররা খুব শার্প হয়, একটু এদিক-সেদিক হলেই তারা আসল ঘটনা ধরে ফেলবে।

"ভাই, ব্যাপারটা হচ্ছে..." আমি গলা পরিষ্কার করে শুরু করলাম। "আমার এক পরিচিত বড় আপু আছেন। উনি একজন লেখিকা। লন্ডন থাকেন। আমি উনার বইয়ের প্রুফরিডিংয়ের কাজ করি। তো, উনি গত এক মাস ধরে দেশে আছেন। উনার একটা ফ্ল্যাট আছে ধানমন্ডিতে। উনি আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিলেন কয়েকদিনের জন্য উনার ফ্ল্যাটে থেকে উনার নতুন উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিটা এডিট করে দিতে। আমি গত কয়েকদিন ওই ফ্ল্যাটেই ছিলাম।"

আশিক ভাই পকেট থেকে একটা নতুন সিগারেট বের করে ধরিয়ে বললেন, "হুম। তারপর? প্রুফরিডিং করতে গিয়া কি কোনো ঝামেলা পাকাইছ?"

"না না ভাই, সে রকম কিছু না!" আমি দ্রুত বললাম। "ঝামেলাটা অন্য জায়গায়। ওই আপুর হাসব্যান্ড সপ্তাহখানেক আগে লন্ডন থেকে ঢাকায় আসেন। কিন্তু গত পরশু রাত থেকেই উনার হাসব্যান্ডকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উনি নিখোঁজ।"

আশিক ভাই সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা ওপরের দিকে ছাড়লেন। উনার চোখে এখন একটা পেশাদার কৌতূহল। "লন্ডনপ্রবাসী হাসব্যান্ড নিখোঁজ? হুম। তারপর?"

"তারপর ভাই, ওই আপু আজ সকালে থানায় গিয়ে মিসিং রিপোর্ট মানে জিডি করেছেন। আর জিডিতে উনি আমার নামটাও দিয়েছেন। উনি বলেছেন যে উনার স্বামী নিখোঁজ হওয়ার আগে আমি ওই বাসায় গেস্ট হিসেবে ছিলাম।"

আমি কথাগুলো বলে একটু থামলাম। আমার বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে। আমি আশিক ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, "ভাই, আমি তো এসব থানা-পুলিশের কিচ্ছু বুঝি না। পুলিশ যদি এখন আমাকে ডাকে? আমাকে যদি সাসপেক্ট করে বসে? আমি তো ভাই একজন নিরীহ অনুবাদক। আমার তো ভয়ে হাত-পা পেটের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।"

আশিক ভাই কোনো কথা বললেন না। উনি উনার লালচে, তীক্ষ্ণ চোখ দুটো দিয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। উনার ঠোঁটে একটা বাকা হাসি। "রাশেদ," আশিক ভাই খুব ধীর, চিবিয়ে চিবিয়ে বলা গলায় শুরু করলেন, "আমি ক্রাইম রিপোর্টিং করতে করতে মানুষের চোখ পড়া শিখে গেছি। তুমি আমার কাছে কিছু একটা লুকাচ্ছ।"

আমার হৃৎপিণ্ডটা একটা লাফ দিল। "কই না তো ভাই! যা সত্যি তা-ই বললাম।" আশিক ভাই একটু সামনে ঝুঁকে এলেন। উনার গলার স্বরটা আরও নিচু হলো। "স্টোরিটা পুরোপুরি মিলছে না রাশেদ। আমাকে সত্যি কথাটা বলো তো ভাই, ওই আপুর সাথে তোমার কি 'ভাবি-দেবর' টাইপ কোনো রোমান্স চলছিল নাকি? চক্কর আছে কোনো?"

আমি ঢোঁক গিললাম। আমার কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললাম
, "আস্তাগফিরুল্লাহ ভাই! কী যে বলেন! উনি আমার বড় বোনের মতো। প্রুফরিডিংয়ের বাইরে উনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।"

"শিওর?" আশিক ভাই চোখ সরু করলেন। "লন্ডনপ্রবাসী মহিলা। ধানমন্ডির ফ্ল্যাট। টাকার তো অভাব নাই। সম্পত্তির লোভে কি মহিলা নিজের জামাইরে দুনিয়া থেকে সরাইয়া দিছে বলে তোমার মনে হয়? এই নিখোঁজের পেছনে ওই মহিলার কোনো হাত আছে?"

"আমি কীভাবে বলব ভাই? আমি তো কিছুই জানি না," আমি বোকা সাজার ভান করলাম।

আশিক ভাই এবার উনার সিগারেটের ছাইটা অ্যাশট্রেতে ঝেড়ে ফেলে খুব তীক্ষ্ণ একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন। "আর তুমি? তুমি এই গুমের পেছনে জড়িত নাই তো? মানে, সত্যি করে বলো, তুমি তো আর ওই লোকটাকে ড্রয়িংরুমে একা পেয়ে অ্যাশট্রে দিয়ে মাথায় বাড়ি মারো নাই?"

"ভাই!" আমি আক্ষরিক অর্থেই চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠলাম। "আমি একটা মশাও মারতে পারি না, আর আপনি বলছেন মানুষ খুন! আমি ওই লোকটাকে জীবনে ওইদিন সকালেই ফার্স্ট টাইম দেখেছি। আমি জাস্ট আমার কাজ শেষ করে চলে এসেছি। ট্রাস্ট মি ভাই, আমি কিচ্ছু জানি না।"

আশিক ভাই আমার মুখের আতঙ্কের ছাপটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। তারপর হঠাৎ করে উনার সেই গম্ভীর, ইন্টারোগেটিভ চেহারাটা পাল্টে গেল। উনি একটা খুব তাচ্ছিল্য মেশানো, ডন্ট-কেয়ার মার্কা হাসি হাসলেন। "আরে ধুর মিয়া! রিল্যাক্স! আমি তো জাস্ট চেক করতেছিলাম তুমি কদ্দুর কী জানো," আশিক ভাই হাসতে হাসতে বললেন। "এইটুক বিষয় নিয়া তুমি এমন শুকাইয়া যাইতেছ? আমি তো ভাবলাম তুমি সত্যি সত্যিই কারো মাথা ফাটায়া আসছ। মিসিং জিডিতে নাম দিছে, এতে এত প্যারা খাওয়ার কী আছে? তুমি যখন গুম করো নাই, তখন চিল।"

"ভাই, পুলিশ তো পুলিশই। তারা যদি আমাকে থানায় বসিয়ে রাখে? যদি আজেবাজে জেরা করে?" আমি তবুও আমার ভয়টা প্রকাশ করলাম।
আশিক ভাই একটু হাসলেন। "আচ্ছা, জিডিটা কোন থানায় করছে, জানো কিছু?" আমি দ্রুত বললাম, "কলাবাগান থানায়। আপুর ফ্ল্যাটটা ধানমন্ডি আর কলাবাগানের বর্ডারের দিকে তো, তাই কলাবাগান থানায় করেছে।"

কলাবাগান থানার নামটা শোনার সাথে সাথেই আশিক ভাইয়ের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। উনি এমন একটা ভাব করলেন যেন আমি উনার নিজের বাড়ির কোনো ড্রয়িংরুমের নাম বলেছি। 
"কলাবাগান থানা! আরে ধুর মিয়া! তুমি তো আগেই বলবা!" আশিক ভাই উনার টেবিল চাপড়ে বললেন। "কলাবাগান থানার ওসি হইলো শাহাদাত ভাই। শাহাদাত ভাই আমার নিজের এলাকার বড় ভাই, আমার খুব ক্লোজ পরিচিত। আমরা সপ্তাহে দুই দিন একসাথে বইসা আড্ডা দিই। তোমার কোনো প্যারা নাই রাশেদ।"

আমার কানকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ঢাকা শহরে বিপদের সময় একজন ওসি যদি পরিচিত বের হয়
, তার চেয়ে বড় জ্যাকপট আর কিছু হতে পারে না। আশিক ভাই একটা কাগজ টেনে নিয়ে তাতে একটা নাম্বার লিখলেন। "শোনো রাশেদ," আশিক ভাই খুব প্রটেক্টিভ গলায় বললেন, "তোমাকে যদি থানা থেকে ডাকে, তুমি একদম বুক ফুলায়া যাবা। কোনো ভয় পাওয়ার কিছু নাই। তুমি গিয়া ডিরেক্ট ওসি শাহাদাত ভাইয়ের রুমে ঢুকবা। বলবা, 'আমি ঢাকা পেপারসের আশিকের কলিগ।' শাহাদাত ভাই আমার নাম শুনলে তোমারে চা-বিস্কুট খাওয়াইয়া, স্যালুট দিয়া বিদায় করব। কেউ তোমার দিকে চোখ তুইল্যাও তাকানোর সাহস পাইব না। শুধু যা সত্যি তা-ই বলবা। বলবা তুমি প্রুফরিডার, কাজ শেষ করে চলে আসছ।"

আমার মনে হলো, আশিক ভাই এই মুহূর্তে আমার কাছে কোনো সাধারণ রিপোর্টার নন, উনি যেন সাক্ষাৎ কোনো ত্রাণকর্তা ফেরেশতা হয়ে আকাশ থেকে নেমে এসেছেন। "ভাই... আপনাকে যে কীভাবে ধন্যবাদ দেব!" আমি প্রায় আবেগে কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা করে বললাম। "আমি আসলেই খুব ভয়ে ছিলাম।"

আশিক ভাই হাসলেন। "আরে বোকা! আমরা একই অফিসে চাকরি করি, আমরা তো ফ্যামিলির মতো। তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মতো। তোমার কোনো সমস্যা হইলে আমি দেখব না তো কে দেখবে? আর শোনো, তারপরও যদি তোমার একা থানায় যাইতে অস্বস্তি লাগে, তুমি জাস্ট আমাকে একটা কল দিবা। আমি তোমার সাথে থানায় যামু। শাহাদাত ভাইয়ের রুমে বইসা একসাথে চা খাইয়া আসমু। যাও, গিয়া টেনশন ফ্রি হইয়া কাম করো।"

আমি আশিক ভাইয়ের হাতটা ধরে একটা আন্তরিক ঝাঁকুনি দিলাম। "থ্যাংক ইউ ভাই! থ্যাংক ইউ সো মাচ।" আমি উনার ডেস্ক থেকে যখন ফিরে আসছিলাম, তখন আমার পায়ের নিচের মাটিটা আবার শক্ত মনে হচ্ছিল। 

হ্যাঁ, আমার ভেতরে একটা বিশাল নোংরা গোপন সত্য লুকিয়ে আছে। আমি আনিকার সাথে শুয়েছি, আমি বেলালের বিছানায় দাগ ফেলেছি। পুলিশ যদি কখনো সেই সত্যটা খুঁড়ে বের করে, তাহলে হয়তো আশিক ভাই বা ওসি শাহাদাত কেউই আমাকে বাঁচাতে পারবে না। কিন্তু আপাতত... আপাতত অন্তত আমার মাথার ওপর থেকে সেই রিমান্ডের, সেই সিলিং ফ্যানে ঝোলানোর ভয়টা কেটে গেছে। আশিক ভাইয়ের ওই একটা 'প্যারা নাই' শব্দ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় লাইফ জ্যাকেট হয়ে আমাকে ভাসিয়ে রেখেছে।

আমি আমার ডেস্কে এসে বসলাম। পুতিনের স্পিচের ভিডিওটা আবার অন করলাম। আমার হাত এখন আর কাঁপছে না। আনিকা নাওহারের সেই মায়াবী, ঘাতক ফাঁদে আমি জড়িয়ে গেছি ঠিকই, কিন্তু আমি রাশেদ আহমেদ এত সহজে হার মানার পাত্র নই। আমি পরিস্থিতি দেখতে চাই। আমি দেখতে চাই এই গল্পের শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

আমি কি-বোর্ডে আবার টাইপ করতে শুরু করলাম।

আনিকার সাথে গ্লোরিয়া জিন্স কফিশপে সেই নার্ভ-কাঁপানো সাক্ষাৎ, উনার স্বামী বেলাল সাহেবের নিখোঁজ হওয়ার খবর, এবং ক্রাইম রিপোর্টার আশিক ভাইয়ের কাছে গিয়ে আমার সেই করুণ আত্মসমর্পণ— এই সবকিছুর পর চোখের পলকে কেটে গেছে তিনটে দিন।

আজ এপ্রিল মাসের ১৩ তারিখ। সোমবার।

সাধারণত আমার জীবনে সোমবার মানেই ছুটির দিন। সোমবার মানেই কাঁটাবনে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর অফিসে গিয়ে চা খাওয়া, উদীয়মান কবি-সাহিত্যিকদের সাথে আড্ডা দেওয়া, আর ফরাসি সাহিত্য বা জাদুবাস্তবতা নিয়ে বড় বড় তাত্ত্বিক আলোচনা করা। কিন্তু আজ আমার চন্দ্রবিন্দুতে যাওয়ার কোনো মানসিক বা শারীরিক শক্তি নেই। মিরপুরের মেসে নিজের দশ ফুট বাই দশ ফুট রুমের ভেতর আমি একটা ইঁদুরের মতো লুকিয়ে আছি।

গত তিন দিন আমার কেটেছে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের ভেতর দিয়ে। আমি না পেরেছি ঠিকমতো ঘুমাতে, না পেরেছি খেতে, না পেরেছি অফিসের কাজে মনোযোগ দিতে। আমার মাথার ভেতর একটা অদৃশ্য টাইমবোমা টিকটিক করছে, যেটা যেকোনো সময় ফাটতে পারে।

এই তিন দিনের মধ্যে আনিকার সাথে আমার কয়েকবার ফোনে কথা হয়েছে। প্রথমবার যখন আনিকার কলটা আমার ফোনে আসে, তখন স্ক্রিনে একটা আননোন নাম্বার দেখে আমার বুকটা ধক করে উঠেছিল। আমি ভয়ে ভয়ে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে আনিকার সেই চিরচেনা, রেশমি কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, "কী গো অনুবাদক সাহেব, কেমন আছো?"

আমি আনিকার গলা শুনে যতটা না স্বস্তি পেয়েছিলাম, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি আতঙ্কিত হয়েছিলাম। আমি প্রায় ফিসফিস করে, চরম প্যানিক করা গলায় বলেছিলাম, "আনিকা! তুমি আমাকে কল করছ কেন? তোমার স্বামী নিখোঁজ, তুমি থানায় জিডি করেছ! তুমি কি জানো না মিসিং কেসে পুলিশ সবার আগে স্বামী-স্ত্রীর কল লিস্ট চেক করে? তারা তোমার ফোন ট্যাপ করে বসে আছে! তুমি আমাকে এই অবস্থায় ফোন করছ, আমরা তো দুজনেই ফেঁসে যাব!"

আমার এই রুদ্ধশ্বাস আতঙ্কের কথা শুনে আনিকা ওপাশ থেকে খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "আরে বোকা!" আনিকা হাসতে হাসতেই বললেন, "তুমি কি আমাকে এতই কাঁচা খেলোয়াড় ভেবেছ? আমি কি আমার রেগুলার নাম্বার থেকে তোমাকে ফোন দিচ্ছি নাকি? ট্রু-কলারে চেক করে দেখো, এটা কার নাম্বার।"

আমি ফোনটা কান থেকে নামিয়ে স্ক্রিনে দেখলাম। ট্রু-কলারে নাম ভাসছে— 'মজিদ মিয়া, কাওরান বাজার'। "মজিদ মিয়া কে?" আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। "কে জানে কে মজিদ মিয়া!" আনিকা খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন, "লন্ডন থেকে আসার পর এয়ারপোর্টের বাইরে এক ভাসমান সিম বিক্রেতার কাছ থেকে এই সিমটা কিনেছিলাম। কার ফিঙ্গারপ্রিন্ট, কার এনআইডি দিয়ে এই সিম তোলা, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। এটা একটা ঘোস্ট সিম বা বেনামি নাম্বার। এই নাম্বার আমি শুধু ইন্টারনেট ডেটা আর তোমাকে কল করার জন্যই ইউজ করি। পুলিশের বাপের সাধ্য নেই এই নাম্বার ট্রেস করে আমার আসল পরিচয় বের করার।"

আমি তবুও আশ্বস্ত হতে পারলাম না। "কিন্তু আনিকা, পুলিশ যদি কোনোভাবে ট্র্যাক করে ফেলে? যদি তারা আমাদের কথাবার্তা শুনে ফেলে?" আনিকা খুব তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, "আর জানলেই বা কী? আমরা কি কোনো অপরাধ করেছি নাকি? আমরা কি বেলালকে খুন করেছি? আমরা দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, ফোনে কথা বলছি, এতে পুলিশের কী করার আছে?"

উনার এই অদ্ভুত কনফিডেন্স আমাকে কিছুটা শান্ত করলেও, পুরোপুরি চিন্তামুক্ত করতে পারল না। আমি এই তিন দিনে উনার সাথে যতবার কথা বলেছি, ততবারই আমি চেষ্টা করেছি আসল সত্যটা খুঁড়ে বের করার। আমার মাথার ভেতর ওই ২রা এপ্রিল সকালের ঘটনাটা একটা ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজছিল।

"আনিকা, আমাকে সত্যি করে বলো তো," আমি একদিন রাতে উনাকে ফোনে ধরলাম, "আসলে বেলাল সাহেবের কী হতে পারে? তোমার কী সন্দেহ? উনার কি কোনো ব্যবসায়িক শত্রু ছিল? নাকি লন্ডনে কারো সাথে কোনো ঝামেলা ছিল?"

আনিকা প্রতিবারই এই প্রশ্নগুলো খুব নিপুণভাবে এড়িয়ে গেছেন। "আমি জানি না রাশেদ। আমি সত্যিই কিছু বুঝতে পারছি না। বেলালের তো এমন কোনো শত্রু থাকার কথা না। হয়তো রাস্তায় কোনো ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছে, অথবা অন্য কিছু। পুলিশ খুঁজছে, দেখা যাক কী হয়।"

উনার গলার স্বরে কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো টেনশন নেই। নিজের স্বামী নিখোঁজ, অথচ উনি কথা বলছেন এমনভাবে যেন উনার হাতের একটা সস্তা ছাতা হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা ছিল অন্য জায়গায়।

"আনিকা, একটা কথা আমি কিছুতেই মেলাতে পারছি না," আমি মরিয়া হয়ে জানতে চাইলাম। "সেদিন সকালে... যেদিন বেলাল সাহেব লন্ডন থেকে ফিরে লাগেজ নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। আমি দরজা খুলে দিলাম। একটা অচেনা লোক, সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমার ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দিচ্ছে, আর বেলাল সাহেব সেটা দেখে কোনো রিঅ্যাক্ট করলেন না? উনি আমাকে হাসিমুখে বললেন— 'কী ব্যাপার, নাশতা আনতে গিয়েছিলেন?' এটা কীভাবে সম্ভব আনিকা? উনি কীভাবে আমাকে এত স্বাভাবিকভাবে মেনে নিলেন? উনি কি কিছুই সন্দেহ করেননি?"

এই প্রশ্নটা করার পর আনিকা ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। আমি শুনতে পাচ্ছিলাম উনার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ। আমি ভেবেছিলাম, এবার হয়তো উনি সত্যটা বলবেন। হয়তো বলবেন বেলাল সাহেবের কোনো মানসিক সমস্যা আছে, অথবা অন্য কোনো গোপন চুক্তির কথা।

কিন্তু আনিকা সেই প্রশ্নটাও বরাবরের মতোই এড়িয়ে গেলেন। "রাশেদ, তুমি তো জানোই বেলাল একটু অন্যরকম মানুষ। ও হয়তো ভেবেছে তুমি আমার আইটি ফার্মের কোনো এমপ্লয়ি, রাত জেগে কাজ করেছো। ওর মাথা তখন লম্বা জার্নির কারণে টায়ার্ড ছিল। বাদ দাও তো বেলালের কথা। ও কোথায় গেছে, কী হয়েছে, সব পুলিশ দেখবে। তুমি শুধু আমার কথা ভাবো।"

এই 'বাদ দাও তো' বলার পরেই আনিকা উনার আসল রূপে ফিরে আসতেন। উনার ভেতরের সেই কর্পোরেট, প্র্যাকটিক্যাল নারীটা মুহূর্তের মধ্যে যেন উধাও হয়ে যেত, আর তার জায়গা নিত এক কামুক, বন্য এবং তৃষ্ণার্ত নারী। এই তিন দিনে উনার সাথে আমার ৩-৪ বার কথা হয়েছে। এবং প্রত্যেকটা ফোন কলের শেষের দিকে আনিকা আমাকে উনার কথার জাদুতে, উনার কামুক ফিসফিসানিতে এমনভাবে উত্তেজিত করেছেন, যা কোনো সুস্থ পুরুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন।

"রাশেদ..." আনিকা হঠাৎ গলা নামিয়ে, একদম ফিসফিস করে, একটা ভেজা এবং স্যাঁতস্যাঁতে গলায় কথা বলা শুরু করতেন। "আমার না এখন খুব ইচ্ছা করছে..." "কীসের ইচ্ছা করছে আনিকা?" আমি সতর্ক গলায় বলতাম, কিন্তু আমার শরীরের ভেতরের রক্ত চলাচলের গতি ততক্ষণে বেড়ে যেত।

"তোমার ওই শক্ত, গরম শরীরটার জন্য আমার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে রাশেদ। উমমম... জানো, আমি এখন বিছানায় শুয়ে আছি। আমার গায়ে কোনো কাপড় নেই। আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাচ্ছি তুমি আমার ওপর ঝুঁকে আছো..."

"আনিকা, প্লিজ... পরিস্থিতি তো এখন এসব ভাবার মতো না। তোমার স্বামী নিখোঁজ!"

"চুলোয় যাক স্বামী! চুলোয় যাক দুনিয়া!" আনিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কামনায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলতেন, "আহহ... রাশেদ... তোমার আদর পেতে আমার শরীরটা নিশপিশ করছে। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি কি বুঝতে পারছ না আমার কতটা কষ্ট হচ্ছে? ওইদিন বাথরুমের কমোডের ওপর তুমি আমাকে যেভাবে... ইসসস... আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে ওই ধাক্কাগুলো ফিল করতে পারি। আমার মনে হচ্ছে তুমি এখনো আমার ভেতরে আছো।"

উনার গলা দিয়ে তখন 'উহু... আহা... উমমম...' ধরনের এমন সব আদিম, বন্য শব্দ বের হতো, যা শুনে আমি আমার মেসের অন্ধকার রুমে শুয়ে শুয়ে ঘামতে শুরু করতাম।

"রাশেদ... তুমি কি আমাকে মিস করছ না?" আনিকা ফোনে উনার নিজের শরীরের কোনো একটা অংশে হাত বুলানোর শব্দ করতেন। "আমি কিন্তু এখন আমার আঙুল দিয়ে তোমাকে ফিল করার চেষ্টা করছি। আহহ... রাশেদ... তুমি কবে আসবে আমার কাছে? কবে আমাকে আবার ওইভাবে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে? আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে তোমার জন্য..."

এই ধরনের নোংরা, চরম সেক্সুয়াল এবং উত্তেজক কথাগুলো উনি এমন একটা সময় বলতেন, যখন উনার স্বামী নিখোঁজ, পুলিশ তদন্ত করছে, আর আমি রিমান্ডের ভয়ে কাঁপছি! কিন্তু মানুষের শরীর বড়ই বেইমান। আমার মস্তিষ্ক আমাকে বলত— "রাশেদ, ফোনটা কেটে দে। এই মহিলা একটা সাইকোপ্যাথ।" কিন্তু আমার অবদমিত পুরুষাঙ্গটি আনিকার ওই 'উহু-আহা' শুনে চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো শক্ত হয়ে যেত। আমি মেসের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতাম।

আমি বুঝতে পারছিলাম, আনিকা নাওহার শুধু আমার শরীরটাকেই নয়, আমার মনস্তত্ত্বটাকেও উনার হাতের পুতুলে পরিণত করেছেন।
[+] 8 users Like Orbachin's post
Like Reply
(08-07-2026, 09:37 PM)Orbachin Wrote:
অনেকেই কমেন্টে বড় আপডেট দেওয়ার কথা বলেন। তাঁরা সম্ভবত ফোরামে কখনো গল্প লেখেননি। এই সাইটের থ্রেডে রিপ্লাই (আপডেট) দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট ওয়ার্ড লিমিট (শব্দসীমা) থাকে। তাই চাইলেও আমি এর চেয়ে বড় করতে পারব না। বেশি বড় করলে বারবার এরর (error) মেসেজ আসে। আশা করি বিষয়টি বুঝতে পেরেছেন
 

(14-07-2026, 04:36 PM)Rasel3333 Wrote: পোস্ট  আরও বড় হলে ভালো হয়।ছোট হওয়ায় প্রতি ক্ষেত্রেই অতৃপ্তি বেশি হচ্ছে।
Like Reply




Users browsing this thread: darkman@, 2 Guest(s)