২৫।
আবার বিল্ডিংয়ের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। লিফটে করে আমি আবার সাত তলায় উঠলাম। আমার হার্টবিট তখন প্রতি মিনিটে হয়তো দুইশো। আমি কাঁপাকাঁপা হাতে কলিংবেল বাজালাম। কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলল।
দরজার ওপাশে আনিকা নাওহার দাঁড়িয়ে আছেন। উনার পরনে তখনো সেই মেরুন রঙের স্লিপিং গাউন। উনার মুখে কোনো ভয়, কোনো কান্না বা কোনো আতঙ্কের চিহ্নমাত্র নেই। উল্টো উনার চেহারায় একটা চরম বিরক্তি।
আমাকে দেখে আনিকা খুব নিচু কিন্তু ঝাঁঝালো গলায় বললেন, "এভাবে রকেটের মতো পালানোর কী আছে রাশেদ? তুমি কি বাচ্চা ছেলে?" কথাটা শুনে আমার আক্ষরিক অর্থেই ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হলো। আমি মনে মনে বললাম— "কী বলে এই মহিলা! আমি আপনার সাথে গত এক মাস ধরে রঙ্গরস করে বেড়াচ্ছি, আপনার বিছানায় ঘুমাচ্ছি, আর এই অবস্থায় আপনার স্বামীর কাছে আমি হাতেনাতে ধরা পড়েছি! আমি পালাব না তো কী করব? ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে কি আমি মুজরা নাচ নাচব? নাকি আপনার স্বামীকে বলব, 'আসেন ভাই, হ্যান্ডশেক করি। আমি আপনার শিফট পার্টনার'!"
আমি কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করে ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকলাম। ড্রয়িংরুম পেরিয়ে ডাইনিং স্পেসে ঢোকার পর আমার বিস্ময়ের মাত্রা দশের স্কেল ছাড়িয়ে গেল। ডাইনিং টেবিলের এক প্রান্তে বসে আছেন বেলাল সাহেব। উনার সামনে এক মগ ধোঁয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি। আমাকে দেখেই মুখ তুলে তাকালেন। উনার ঠোঁটের কোণে একটা খুব ভদ্র, পরিশীলিত এবং অমায়িক হাসি।
"কী ব্যাপার রাশেদ সাহেব!" বেলাল সাহেব খুব ক্যাজুয়াল গলায় বললেন। "যেভাবে দৌড়ে গেলেন, আমি তো ভাবলাম আপনি হয়তো সকালের নাশতা আনতে নিচে গেছেন। আসুন, বসুন।"
আমি ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার ধরে পাথরের মতো জমে গেলাম। কী হচ্ছে এসব? এই লোকটা কি পাগল? নাকি আস্ত একটা আহাম্মক? তার অনুপস্থিতিতে তার নিজের ফ্ল্যাটে, তার নিজের বিছানায়, তার স্ত্রীকে আমি আক্ষরিক অর্থেই ভোগ করেছি। তার পুরো সংসারটাকে আমি একটা প্লেটের মতো চেটেপুটে খেয়েছি। আর সেই লোকটা আমাকে দেখে হাসিমুখে বলছে— 'ভাবলাম নাশতা আনতে গেছেন'!
আমি একটা বড়সড় ঢোঁক গিললাম। আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। "না... মানে... আসলে একটা ইমার্জেন্সি..." আমি আমতা আমতা করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলাম।
"আরে ঠিক আছে, ইটস ওকে। আনিকা আমাকে সব বলেছে," বেলাল সাহেব কফিতে চুমুক দিয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন।
আনিকা সব বলেছে! কী বলেছে আনিকা? আমি আড়চোখে আনিকার দিকে তাকালাম। আনিকা ততক্ষণে কিচেন থেকে আমার জন্য এক মগ কফি নিয়ে এসেছেন। উনি কফির মগটা আমার সামনে রেখে আমার পাশের চেয়ারটায় বসলেন। উনার চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আমি জানি না এই নারী উনার স্বামীকে কী গাঁজাখুরি গল্প বুঝিয়েছেন। হয়তো বলেছেন, "ও হচ্ছে রাশেদ। আমার প্রুফরিডার। ওর মেসে কাল রাতে ডাকাতি হয়েছে, তাই বেচারা ভয়ে আমার এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল।" কিংবা হয়তো এমন কোনো হাই-লেভেলের সাইকোলজিক্যাল মিথ্যা বলেছেন, যেটা ধরার মতো ক্ষমতা বেলাল সাহেবের এই ইঞ্জিনিয়ারিং মস্তিষ্কের নেই।
আমরা তিনজন একটা ডাইনিং টেবিলে বসে কফি খাচ্ছি। দৃশ্যটা যদি কেউ দূর থেকে দেখত, তার মনে হতো এটা খুব সাধারণ একটা পারিবারিক আড্ডা। কিন্তু আমার কাছে এই নীরবতাটা ছিল একটা ইলেকট্রিক চেয়ারে বসে থাকার মতো। কফির মগে চামচ নাড়ার 'টুং টাং' শব্দটা আমার কানের ভেতর বোমার মতো ফাটছিল। আমি গরম কফিটা প্রায় এক নিশ্বাসে গিলে ফেললাম। আমার জিহ্বা পুড়ে গেল, কিন্তু আমি কোনো রিঅ্যাকশন দেখালাম না।
কফি শেষ হতেই বেলাল সাহেব আনিকার দিকে তাকিয়ে খুব নরম গলায় বললেন, "অনেক টায়ার্ড লাগছে আনিকা। জার্নিটা খুব হেকটিক ছিল। চলো, একটু রেস্ট নিই।" আনিকা উনার দিকে তাকিয়ে সেই মোহনীয় হাসিটা দিলেন। "চলো।"
তারপর আনিকা আমার দিকে ফিরলেন। "রাশেদ, তুমি গেস্ট রুমে গিয়ে রেস্ট নাও। পরে কথা হবে।" আমি একটা ঘোরের মধ্যে মাথা নাড়লাম। আমার চোখের সামনেই, আনিকা নাওহার উনার স্বামী বেলাল সাহেবের হাত ধরে মাস্টার বেডরুমের দিকে পা বাড়ালেন।
উনারা বেডরুমে ঢুকলেন। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। এবার আর ভেজানো নয়, খুব স্পষ্ট একটা 'ক্লিক' শব্দ করে দরজাটা ভেতর থেকে লক হলো। আমি ডাইনিং টেবিলে একা বসে রইলাম। হঠাৎ করে আমার বুকের ভেতর এমন একটা প্রচণ্ড, তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে উঠল, যার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না।
আমি ধীর পায়ে উঠে গেস্ট রুমের দিকে গেলাম। এই সেই গেস্ট রুম, যেখানে গত ২২ দিন আমি আনিকার কিনে দেওয়া জামাকাপড় রাখতাম। কিন্তু আজ এই ঘরটা আমার কাছে একদম অচেনা, ভিনগ্রহের কোনো জায়গার মতো মনে হচ্ছে। একইসঙ্গে এক অদ্ভুত বিভ্রান্তি। এই ভদ্রলোক কিভাবে আমার উপস্থিতি এতো সহজে মেনে নিলেন। আনিকা তাঁকে কি বুঝিয়েছে। এরকম শান্তশিষ্ট গোবেচারা স্বামী পাতি বাংলা উপন্যাসে দেখা যায়! বাস্তবে হয় নাকি।
আমি ভাবনায় ছেদ পড়ল মোবাইলের ভাইব্রেশনে। আনিকার মেসেজ। "কোনো ঝামেলা নেই। আমি আপাতত সামাল দিয়ে দিয়েছি। বেলাল ভেবেছে তুমি আমার আইটি ফার্মের ঢাকার লোকাল রেপ্রেজেন্টেটিভ, কাল রাত পর্যন্ত আমার সাথে মিটিং করে এখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলে। তবে তোমার আর এখানে থাকার দরকার নেই। আমি কিছুক্ষণ পর আমার রুম থেকে তোমার যা যা জিনিস আছে, সব একটা ব্যাগে ভরে দরজার বাইরে রেখে দিচ্ছি। তুমি বাকি জিনিসপত্র নিয়ে আস্তে করে কেটে পড়ো। বাকি প্ল্যান-পরিকল্পনা আমরা পরে দুজনে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।"
আমি মেসেজটা পড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কী নিখুঁত, কী নিপুণ, কী কর্পোরেট একটা মেসেজ! তবুও আমার অস্বস্তিটা গেলো না। বেলাল সাহবে দেখেছেন আমি তাঁর বেডরুমের থেকে নিজের মানিব্যাগ ও ফোন নিয়ে বের হইছি। রাত হয়ে গেছে বলে যদি বাসায় থেকেও যাই, তাহলে থাকব গেস্টরুমে। বেডরুমে থাকব কেমনে! এই বিষয়টা আনিকার তাঁর স্বামীকে কি করে বুঝলো! কী বলে বুঝ দিল। দূর, আমার মাথা কাজ করছে না।
"আস্তে করে কেটে পড়ো।" এই একটা বাক্য আমাকে আমার আসল অবস্থানটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিল। আমি আসলে কে? আমি একজন খেলনা। আমি একজন সাবস্টিটিউট। মেইন প্লেয়ার যখন মাঠে থাকে না, তখন আমি ওয়ার্ম-আপ করি। আর মেইন প্লেয়ার মাঠে ফিরলেই আমাকে আবার সেই সাইডলাইনে, রিজার্ভ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
আমি খুব দ্রুত নিজেকে রেডি করলাম। আমার নিজের শার্ট, প্যান্ট পরলাম। আনিকার কিনে দেওয়া আড়ংয়ের জামাকাপড়গুলো গোছাতে শুরু করলাম। প্রায় পনেরো মিনিট পর।
আমি আমার ব্যাগটা নিয়ে গেস্ট রুম থেকে বের হলাম। মাস্টার বেডরুমের দরজার সামনে গিয়ে দেখলাম, আনিকা সত্যিই একটা শপিং ব্যাগে আমার শেভিং কিট, আমার ঘড়ি আর কয়েকটা ছোটখাটো জিনিস ভরে দরজার বাইরে রেখে দিয়েছেন।
আমি ব্যাগটা হাতে নিলাম। আমি এখন এই ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যাব। ঠিক সেই মুহূর্তে... মাস্টার বেডরুমের ওই বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে একটা শব্দ আমার কানে এল।
থপ... থপ... থপ... শব্দটা খুব রিদমিক। একটা ভারী, মাংসল শব্দ। আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। আমার চোখের সামনে যেন একটা কালো পর্দা নেমে এল। এই শব্দটা আমার খুব চেনা। গত ২২ দিন ধরে আমি এই শব্দটা খুব কাছ থেকে শুনেছি। যখন মিশনারি পজিশনে (Missionary Position) আনিকা নাওহারের সেই নরম, ফর্সা উরু দুটো ফাঁক করে আমি আমার শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে উনার গভীরে আঘাত করতাম, তখন ঠিক এই শব্দটাই হতো। উনার নিতম্বের সাথে আমার শরীরের ঘর্ষণে এই থপ... থপ... শব্দটা তৈরি হতো। আমি পাথরের মতো জমে গেলাম।
দরজার ওপাশ থেকে এবার আনিকার একটা খুব মৃদু, চাপা গোঙানির শব্দ এল। "উমমম... বেলাল... ইয়েস..." আমার মনে হলো, কেউ যেন আমার বুকের খাঁচাটা হাত দিয়ে চিরে আমার হৃৎপিণ্ডটা বের করে এনে সেটাকে একটা নোংরা ড্রেনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।
হায় রে কপাল! আমার বউ, আমার রানী, আমার প্রেমিকা, আমার স্বর্গ— আজ অন্য কোনো পুরুষ লুট করে নিয়ে যাচ্ছে! আমার চোখের সামনে, মাত্র একটা কাঠের দরজার ওপাশে, আমার সেই অপ্সরী নারীর শরীরটাকে অন্য কেউ ভোগ করছে।
আমার ভেতরে এক চরম, অন্ধ ঈর্ষা আর ক্ষোভ ফুঁসে উঠল। আমার ইচ্ছে করল, আমি ওই দরজাটা লাথি মেরে ভেঙে ফেলি। ভেতরে ঢুকে ওই বেলাল সাহেবের কলার চেপে ধরে বলি, "খবরদার! ওই শরীরে হাত দিবি না। ওই শরীরটা আমার। ওই শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিতে আমার অধিকার!"
কিন্তু... পরক্ষণেই একটা চরম, নগ্ন এবং নিষ্ঠুর সত্য আমার মুখের ওপর একটা চড় কষিয়ে দিল। অন্য পুরুষ লুট করছে? না তো। অন্য পুরুষ নয়। সেই লোকটাই তো আনিকার আসল পুরুষ। সে-ই তো আনিকার স্বামী, তার লিগ্যাল পার্টনার। এই বিছানা তার, এই ফ্ল্যাট তার, এই নারীও তার।
আমি কে? আমি তো একজন অনাহূত অতিথি। আমি তো একটা চোর, যে মালিকের অনুপস্থিতিতে তার ঘরে ঢুকে চুরি করে খাচ্ছিলাম। আজ মালিক ফিরে এসেছে, আর চোরকে তার পাততাড়ি গুটিয়ে পালাতে হচ্ছে। লুট তো বেলাল সাহেব করছেন না, লুট তো আমি করছিলাম!
এই সত্যটা উপলব্ধি করার পর আমার ভেতরের সমস্ত রাগ, সমস্ত ইগো এক মুহূর্তে ধুলোয় মিশে গেল। তার জায়গা নিল এক চরম, প্যাথলজিক্যাল হাহাকার আর একটা তীব্র অপমানবোধ। আমি আর এক সেকেন্ডও ওই দরজার সামনে দাঁড়ালাম না।
আমি আমার পরাজিত, লজ্জিত আর পরিত্যক্ত সত্তাটাকে দুটো শপিং ব্যাগের ভেতর ভরে ফ্ল্যাটের মেইন দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। দরজাটা খুব সাবধানে, নিঃশব্দে টেনে বন্ধ করে দিলাম। নিচে নেমে একটা উবার কার ডাকলাম। গাড়িতে উঠে যখন বসলাম, তখন সকাল ৯টা ২০ মিনিট বাজে।
গাড়ির এসি চলছে। আমি কাঁচের জানালার বাইরে তাকালাম। ঢাকা শহর তার চেনা ব্যস্ততায় জেগে উঠেছে। মানুষজন ছুটছে। রিকশা, বাস, সিএনজি— সব কিছু আগের মতোই আছে। শুধু আমার ভেতরের পৃথিবীটা একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে গেছে।
আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে এহসান ভাইকে একটা মেসেজ টাইপ করলাম। "এহসান ভাই, আজকে অফিসে আসতে ঘণ্টা দুয়েক দেরি হবে। জ্যামে আটকা পড়েছি। আমি এক্সট্রা টাইম করে আমার কাজ পুষিয়ে দেব।" মেসেজটা সেন্ড করে আমি ফোনটা সিটের ওপর ফেলে রাখলাম।
উবারের গাড়িতে বসে আছি। বাইরে কড়া রোদ, কিন্তু আমার চোখে শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকার। কী হচ্ছে আমার জীবনে? কী হবে এরপর? আনিকা কি আর কোনোদিন আমার সাথে যোগাযোগ করবে? আমি কি এই ফ্ল্যাট সার্কেলের ঘোর থেকে বের হতে পারব? নাকি এই অপমানের বোঝা নিয়ে আমাকে বাকি জীবন পার করতে হবে?
আমি কিচ্ছু জানি না। আমার মাথার ভেতর শুধু একটা শব্দ ইকো হচ্ছে— থপ... থপ... থপ...
মিরপুরের মেসে যখন এসে পৌঁছালাম, ঘড়িতে তখন সকাল নয়টা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। পঁচিশ দিন পর নিজের চেনা ডেরায় ফিরে আসার অনুভূতিটা কেমন হওয়া উচিত? একজন স্বাভাবিক মানুষের মনে হওয়ার কথা— ‘যাক, অবশেষে নিজের ঠিকানায় ফেরা গেল। কী শান্তি!’
কিন্তু আমার সেরকম কিছুই মনে হলো না। মেসের লোহায় জং ধরা বিশাল গেট, সিঁড়ির কোণায় জমে থাকা পানের পিক, আর বাতাসে ভাসা একটা স্যাঁতস্যাঁতে, গুমোট গন্ধ আমাকে যেন উপহাস করতে লাগল। মনে হলো, আমি যেন কোনো রাজপ্রাসাদ থেকে নির্বাসিত হয়ে আবার আস্তাকুঁড়ে এসে পড়েছি।
দরজায় টোকা দিতেই দরজা খুলে দিল তুহিন। আমাকে দেখে তার চোখের তারা আক্ষরিক অর্থেই কপালে উঠে গেল। সে এমন একটা লাফ দিল যেন সে কোনো জ্যান্ত ভূত দেখেছে। "রাশেদ ভাই! আপনি! আপনি জিন্দা আছেন?" তুহিন প্রায় চিৎকার করে উঠল।
তার চিৎকারে রাজুও রুম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এল। তার হাতে বাংলাদেশ বিষয়াবলির একটা গাইড বই। আমাকে দেখে সেও হাঁ হয়ে গেল। "ভাই, আপনি শেষমেশ আসলেন? কই ছিলেন এই এক মাস? আমরা তো ভাবছিলাম আপনি নির্ঘাত গুম হয়ে গেছেন, অথবা কোনো বড়লোকের মাইয়া বিয়া করে বিদেশে সেটেল হয়ে গেছেন!"
আমি ওদের কথার কোনো জবাব দিলাম না। আমার মাথায় তখনো ধানমন্ডির সেই ষোলো তলা ফ্ল্যাটের দৃশ্যগুলো একটা ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজছে। বেলাল সাহেবের সেই কফি খাওয়ার দৃশ্য, আর মাস্টার বেডরুমের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে আসা সেই ‘থপ... থপ...’ শব্দ।
"ভাই, কথা কন না ক্যান? ঘটনা কী?" তুহিন নাছোড়বান্দা।
আমি খুব ক্লান্ত, বিরক্ত গলায় বললাম, "তুহিন, আমি খুব টায়ার্ড। আমাকে একটু ফ্রেশ হতে দে।"
আমি আমার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। রুমের ভেতরে ধুলোর আস্তরণ জমে আছে। আমি একটা গামছা নিয়ে সোজা বাথরুমে চলে গেলাম। মিরপুরের মেসের বাথরুম। বালতিতে জমানো ঠান্ডা পানি। মগে করে সেই পানি মাথায় ঢালার সময় আমার মনে পড়ল আনিকার সেই রেইন-শাওয়ার আর বাথটাবের কথা। কোথায় সেই গরম পানির আরামদায়ক স্পর্শ, আর কোথায় এই কনকনে ঠান্ডা পানি! বাস্তবতার এই রূঢ় পতন মেনে নেওয়াটা খুব কঠিন।
গোসল শেষ করে, নিজের একটা পুরনো, সুতির শার্ট আর প্যান্ট পরে আমি মেস থেকে বের হলাম। রাস্তার মোড়ে ‘বিসমিল্লাহ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’। সেখানে বসে একটা প্লাস্টিকের প্লেটে ডালভাজি আর দুটো তেলচিটচিটে পরোটা খেলাম। গত পঁচিশ দিন আমি আনিকার সাথে কী খেয়েছি? ফুডপান্ডার চিকেন স্টেক, মাটন বিরিয়ানি, পিৎজা! আর আজ এই ডালভাজির স্বাদ যেন আমার মুখে ছাইয়ের মতো লাগছিল।
খাওয়া শেষ করে, বাসে ঝুলে ঝুলে যখন কারওয়ান বাজারের অফিসে পৌঁছালাম, তখন ঘড়িতে এগারোটা ছেচল্লিশ। এহসান ভাই আমার দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিলেন। "কী ব্যাপার রাশেদ? আজকে কি হাফ ডে লিভ নাকি? এগারোটা ছেচল্লিশে অফিসে আসছ!"
"জ্যাম ছিল ভাই। রাস্তায় খুব জ্যাম," আমি একটা রেডিমেড মিথ্যা বলে আমার ডেস্কে গিয়ে বসলাম।
ল্যাপটপটা ওপেন করেই আমি আমার পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত যন্ত্রণা কাজ করছে। আনিকা কী করছে এখন? বেলাল সাহেব কি আনিকাকে সন্দেহ করছেন? আনিকা কি বিপদে আছে?
আমি হোয়াটসঅ্যাপ ওপেন করে আনিকাকে একটা মেসেজ টাইপ করলাম: "কী হয়, কী হচ্ছে, আমাকে জানিও। তোমার জন্য খুব টেনশন হচ্ছে আনিকা।"
মেসেজটা পাঠিয়ে আমি ল্যাপটপে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলাম। আমেরিকার পলিটিক্স, জো বাইডেন, ইউক্রেন যুদ্ধ— সবকিছু আমার চোখের সামনে ভাসছে, কিন্তু আমার মস্তিষ্ক সেগুলো প্রসেস করতে পারছে না।
প্রায় আধঘণ্টা পর, একটা নিউজ শেষ করে আমি একটা সিগারেট খাওয়ার জন্য অফিসের স্মোকিং লাউঞ্জে গেলাম। লাউঞ্জে কেউ নেই। আমি সিগারেট ধরিয়ে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। হোয়াটসঅ্যাপে নোটিফিকেশন এসেছে। আনিকার রিপ্লাই।
আমি দ্রুত মেসেজটা ওপেন করলাম। এবং মেসেজটা পড়ার সাথে সাথে আমার হাতের সিগারেটটা প্রায় ছিটকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আনিকা লিখেছেন: "কী আর করব, তুমি নাই তাই নিজের আঙুল দিয়ে গুদ শান্ত করি।"
আমার চোখ কপালে উঠে গেছে। কী বলছে এই মহিলা? এই মহিলা কি আস্ত পাগল? আজ সকালে উনার হাসব্যান্ড ইংল্যান্ড থেকে এসে হাজির হয়েছেন। আমি কোনোমতে জান নিয়ে পালিয়ে এসেছি। উনার হাসব্যান্ড হয়তো পাশের রুমে বা ড্রয়িংরুমেই বসে আছেন। আর এই অবস্থায়, এই ভরদুপুরে উনি আমাকে এই লেভেলের একটা স্ল্যাং, একটা চরম নোংরা এবং উত্তেজক মেসেজ পাঠাচ্ছেন!
আমি মেসেজটার দিকে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে রইলাম। কী রিপ্লাই দেব আমি? আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, আনিকা উনার পাগলামির চূড়ান্ত রূপটা দেখালেন। হোয়াটসঅ্যাপে আরেকটা নোটিফিকেশন এল। একটা ছবি। আমি কাঁপাকাঁপা হাতে ছবিটা ডাউনলোড করলাম। ছবিটা একটা মিরর সেলফি। আনিকার সেই ধানমন্ডির ফ্ল্যাটের মাস্টার বাথরুমের বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তোলা। আনিকা সম্পূর্ণ নগ্ন। উনার এক হাত উনার সেই ভরাট বক্ষদেশের একটা স্তন খামচে ধরে আছে, আর অন্য হাতে ফোন ধরে উনি আয়নায় ছবি তুলছেন। উনার পা দুটো সামান্য ফাঁকা করা। উনার চোখদুটো কামনায় আধবোজা।
আমি স্মোকিং লাউঞ্জের কাঁচের দরজার দিকে তাকালাম। কেউ আসছে কি না। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে গেছে। আমি দ্রুত টাইপ করলাম: "কী শুরু করলে এসব আনিকা? তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? ভুলে গেছ আজ সকালে কী হয়েছে? তোমার স্বামী তো বাসায়!"
এক সেকেন্ডের মধ্যেই আনিকার রিপ্লাই এল: "বাদ দাও তো। শুয়োরটা দেশে আসার আর কোনো সময় পেল না!"
আমি পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। 'শুয়োরটা!' নিজের স্বামীকে একজন নারী এভাবে বলছে! এই আনিকা নাওহার কি কোনো সাইকোপ্যাথ? উনার কি কোনো ইমোশন, কোনো অপরাধবোধ, কোনো ভয়ভীতি নেই? উনার কাছে কি উনার স্বামী স্রেফ একটা বিরক্তিকর আপদ, যে উনার আর আমার আদিম খেলায় বাধা দিতে এসেছে?
আমি সত্যিই ভেবে পেলাম না কী বলব। আমি ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দ্রুত লাউঞ্জ থেকে বেরিয়ে এলাম। এভাবে কেটে গেল দুটো দিন। ৩রা এপ্রিল আর ৪থা এপ্রিল। এই দুটো দিন ছিল আমার জীবনের অন্যতম ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতনের দিন। আনিকা আমাকে যতভাবে সম্ভব, ততভাবে হর্নি (horny) বা উত্তেজিত করার চেষ্টা চালিয়ে গেলেন।
উনার স্বামী হয়তো ড্রয়িংরুমে টিভি দেখছেন, আর উনি বাথরুমে ঢুকে আমাকে উনার স্তনের ছবি পাঠাচ্ছেন। মাঝে মাঝে পাঠাতেন ভয়েস নোট। আমি অফিসে বসে ইয়ারফোন কানে দিয়ে সেই ভয়েস নোটগুলো শুনতাম আর আমার শরীরের রক্ত মাথায় উঠে যেত।
ভয়েস নোটে উনার গলাটা থাকত চরম সেক্সুয়াল , ভেজা এবং হাঁপানো।"রাশেদ... উমমম... তোমার কথা খুব মনে পড়ছে। তোমার ওই শক্ত জিনিসটা ছাড়া আমার এক মুহূর্তও ভালো লাগছে না। আমার সারা শরীর তোমার জন্য পুড়ে যাচ্ছে জান। কাল রাতে বেলাল আমাকে ছুঁতে এসেছিল, আমি ওকে সরিয়ে দিয়েছি। আমার শরীরটা শুধু তোমার... উমমম... ইসসস..."
এই ধরনের ভয়েস নোট আর মেসেজগুলো আমাকে আক্ষরিক অর্থেই পাগল করে দিচ্ছিল। আমি মিরপুরের মেসে রাতে শুয়ে শুয়ে উনার ওই ছবিগুলো দেখতাম আর যন্ত্রণায় ছটফট করতাম। কিন্তু যখনই আমি উনাকে জিজ্ঞেস করতাম— "বাসার কী অবস্থা? তোমার স্বামীকে কীভাবে ম্যানেজ করলে? উনি কি কিছু সন্দেহ করছেন?"
আনিকা অত্যন্ত কৌশলে এড়িয়ে যেতেন। উনি বলতেন, "আরে ওসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। আমি ম্যানেজ করে নিয়েছি। তুমি শুধু বলো, আমাকে তোমার কতটা মনে পড়ছে।" উনার এই এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখে আমি শেষে বিরক্ত হয়ে উনাকে উনার স্বামীর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করাই বাদ দিলাম। আমি বুঝতে পারলাম, এই নারী শুধু বর্তমানের উত্তেজনাটা উপভোগ করতে চান।
৫ই এপ্রিল। বিকেলবেলা।
অফিসে বসে আমি একটা নিউজ এডিট করছি। ঘড়িতে তখন বিকেল তিনটে বেজে পঞ্চাশ মিনিট। হঠাৎ আনিকার মেসেজ এল। "আমি আর বেলাল বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সে আসছি। তুমি চার তলার বাথরুমের আশেপাশে এসে একটু লুকিয়ে থাকো। আমাকে দেখলে মেসেজ দেবে।"
মেসেজটা পড়ার পর আমার ব্রেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স! চার তলার বাথরুম! তার মানে আনিকা সেখানে আমার সাথে দেখা করতে চান? তাও আবার উনার স্বামীর উপস্থিতিতে? আমি বুঝে গেলাম আনিকা কী চাইছেন। উনার ওই বন্য, আদিম মাথাটায় এখন একটা চরম উত্তেজনাকর ফ্যান্টাসি ঘুরছে। উনি চান উনার স্বামী শপিং মলের কোথাও ব্যস্ত থাকুক, আর উনি বাথরুমে ঢুকে আমার সাথে...
ভাবতেই আমার শরীরের প্রতিটি রোমকূপ খাড়া হয়ে গেল। এটা পাগলামির চূড়ান্ত পর্যায়। ধরা পড়লে আজ বসুন্ধরা সিটির ফ্লোরে আমাকে আর আনিকাকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হবে। কিন্তু মানুষের কামনার কাছে ভয় সবসময় হেরে যায়।
আমি ল্যাপটপটা শাটডাউন করলাম। এহসান ভাই তখন ডেস্কে নেই, বাথরুমে গেছেন হয়তো। আমি উনাকে কিছু না বলেই, ব্যাগটা ঘাড়ে ঝুলিয়ে অফিস থেকে আক্ষরিক অর্থেই চোরের মতো পালিয়ে গেলাম। নিচে নেমে একটা সিএনজি নিলাম।
"মামা, বসুন্ধরা সিটি। জলদি চলেন।"