22-06-2026, 12:05 PM
এই মুহুর্তে এই সাইটের সবচেয়ে সুন্দর গল্প এটা। উফফ যা লিখছেন না!!!
|
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
|
|
22-06-2026, 12:05 PM
এই মুহুর্তে এই সাইটের সবচেয়ে সুন্দর গল্প এটা। উফফ যা লিখছেন না!!!
22-06-2026, 12:32 PM
দারুণ লিখছেন।
22-06-2026, 01:40 PM
Awasome writing.. Great great
Yesterday, 02:02 AM
১২।
আনিকা মাস্টার বেডরুমের দিকে চলে গেলেন। আমি গেস্টরুমের বিছানায় বোকার মতো বসে রইলাম। একটু পর আনিকা ফিরে এলেন। উনার হাতে গাঢ় নীল রঙের একটা ফোল্ড করা কাপড়। উনি সেটা আমার বিছানায় রেখে বললেন, "এটা বেলালের স্লিপিং গাউন। ধোয়াই আছে। সাইজে আপনার চেয়ে একটু বড় হতে পারে, বেলাল তো বেশ লম্বা আর চওড়া। তবে রাতে ঘুমানোর সময় গায়ে জড়িয়ে নিলে আরাম পাবেন। আপনি শার্ট-প্যান্ট খুলে এটা পরে নিন।"
আমি গাউনটার দিকে তাকিয়ে একটা ঢোঁক গিললাম। আনিকা নাওহারের স্বামীর ব্যবহৃত স্লিপিং গাউন! আমি কি এটা পরব? এটা পরা কি ঠিক হবে? একটা অদ্ভুত মানসিক বাধা কাজ করছিল। "কী হলো? নিন," আনিকা তাড়া দিলেন। "ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমি ডাইনিংয়ে ওয়েট করছি। আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে।"
আনিকা চলে যাওয়ার পর আমি বাথরুমে ঢুকলাম। চোখেমুখে পানি দিয়ে, শার্ট আর প্যান্ট খুলে সেই গাঢ় নীল সিল্কের গাউনটা গায়ে জড়ালাম। আনিকা ঠিকই বলেছিলেন, বেলাল সাহেব মানুষ হিসেবে আমার চেয়ে বেশ স্বাস্থ্যবান। গাউনটা আমার গায়ে একটু ঢলঢল করছে। কিন্তু সিল্কের কাপড়টা গায়ের সাথে লাগতেই একটা দারুণ আরামদায়ক অনুভূতি হলো। কাপড়ে কোনো লন্ড্রির ডিটারজেন্ট বা দামি ফেব্রিক সফটনারের একটা খুব অভিজাত ঘ্রাণ লেগে আছে। আমি গাউনের বেল্টটা কোমরে বেঁধে ডাইনিং স্পেসে এলাম।
আনিকা ততক্ষণে ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ারে বসে উনার আইফোন টিপছেন। উনাকে এই বিশাল ডাইনিং টেবিলে খুব ছোট দেখাচ্ছিল। "ক্ষুধা পেয়েছে বলছিলেন," আমি উনার সামনের চেয়ারটায় বসতে বসতে বললাম। "আমি তো ভাবলাম আপনি এত রাতে রান্নাঘরে গিয়ে খুটখাট করে কিছু একটা বানাবেন।"
আনিকা ফোন থেকে চোখ না তুলেই হেসে উঠলেন। "রাশেদ, আমি আর যাই করি, রান্নাবান্না একদমই করি না। আমার দ্বারা এসব হয় না। আমি ডিম ভাজতে গেলেও পুড়িয়ে ফেলি। লন্ডনেও আমি রান্না করি না, বেলাল মাঝে মাঝে উইকেন্ডে কিছু একটা বানায়, বাকি সময় আমরা বাইরে খাই বা অর্ডার করি।" আমি একটু অবাক হলাম। আমাদের দেশের মেয়েদের, সে যত বড় আইটি ফার্মেরই মালিক হোক না কেন, রান্নাঘরে তাদের একটা আলাদা অস্তিত্ব থাকে। কিন্তু আনিকা সেই ছাঁচের একদম বাইরে।
"তাহলে এখানে কীভাবে ম্যানেজ করেন? এই যে এত বড় ফ্ল্যাট ক্লিন রাখা, খাওয়া দাওয়া?" আমি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। "ওহ, দ্যাটস ইজি," আনিকা ফোনটা টেবিলে রেখে বললেন। "নিচে পাঁচ তলায় এক ভাবি থাকেন, উনার একজন কাজের মেয়ে আছে। আমি যখন দেশে আসি, ওই মেয়েটার সাথে এক মাসের জন্য একটা চুক্তি করে নিই। ও সকালে এসে পুরো বাসা ক্লিন করে, ফার্নিচার মুছে, কাপড় ধোয়ার থাকলে ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে চলে যায়। ব্যাস, আমার তো এর চেয়ে বেশি কিছু লাগে না। আর খাওয়ার ব্যাপারটা তো ফুডপান্ডা আছেই। আমি জাস্ট অর্ডার করে দিই।"
উনার এই প্র্যাকটিক্যাল, ইমোশনহীন এবং হাই-ক্লাস জীবনযাপন দেখে আমি মনে মনে একটু দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমাদের দেশের সাধারণ মায়েরা তাদের মেয়েদের রান্না শেখানোর জন্য কত বকাঝকা করে, আর এখানে একজন নারী রান্না না জানাটাকে কত সাবলীলভাবে তার লাইফস্টাইলের অংশ বানিয়ে নিয়েছেন! "তাহলে এখন কী খাবেন?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। "আমি অলরেডি অর্ডার করে দিয়েছি। মাটন বিরিয়ানি। এই ধানমন্ডিতেই একটা ভালো রেস্টুরেন্ট আছে, ওদের মাটনটা খুব সফট হয়। অর্ডার করলাম।“
বিশ মিনিটের মধ্যেই কলিংবেল বাজল। ফুডপান্ডার ডেলিভারি বয়।
আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে খাবারটা নিলাম। আনিকা বিল পেমেন্ট করে দিয়েছিলেন অনলাইনেই। আমি খাবারটা নিয়ে ডাইনিং টেবিলে এলাম। আনিকা কিচেন থেকে দুটো দামি সিরামিকের প্লেট, চামচ আর কাঁটাচামচ নিয়ে এলেন। বিরিয়ানির প্যাকেট খুলতেই একটা দারুণ সুবাস ছড়াল। গরম ধোঁয়া উঠছে। আনিকা খুব পরিপাটি করে প্লেটে বিরিয়ানি বাড়লেন। তারপর চামচ আর কাঁটাচামচ দিয়ে খুব সাবধানে, শব্দ না করে খেতে শুরু করলেন। উনার খাওয়ার ভঙ্গিটাও উনার শাড়ি পরার স্টাইলের মতোই অভিজাত। আমি প্রথমে চামচ দিয়ে খাওয়ার কথা ভাবলাম। কিন্তু মাটন বিরিয়ানি চামচ দিয়ে খাওয়াটা আমার কাছে সবসময় শিল্পের অবমাননা বলে মনে হয়। বিরিয়ানির আসল স্বাদ তো হাতের আঙুলে। আমি চামচটা একপাশে সরিয়ে রেখে ডান হাত দিয়ে বিরিয়ানি মাখাতে শুরু করলাম। আনিকা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। "আপনি হাত দিয়েই খাচ্ছেন?"
আমি মাংসের একটা টুকরো ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললাম, "বাঙালি হিসেবে বিরিয়ানি চামচ দিয়ে খাওয়াটা আমার কাছে একটা কালচারাল ক্রাইম মনে হয়। বিরিয়ানির মাংস হাত দিয়ে না ছিঁড়লে কি তার আত্মা শান্তি পায়?"
আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "ইউ আর সো ফানি রাশেদ! বাট ইউ আর রাইট। লন্ডনে থাকতে থাকতে আমার হাত দিয়ে খাওয়ার অভ্যাসটা প্রায় চলেই গেছে। ওখানে তো সবকিছুই ফর্ক আর নাইফ দিয়ে খেতে হয়। মাঝে মাঝে দেশের খাবারের জন্য খুব ক্রেভিং হয়।"
"বিদেশে যারা থাকে, তাদের এই একটা বড় সমস্যা," আমি এক লোকমা বিরিয়ানি মুখে দিয়ে বললাম। "তারা বিদেশে বসে শেক্সপিয়র পড়ে, মোজার্ট শোনে, কিন্তু রাতে ঘুমানোর সময় স্বপ্নে ঠিকই কাচ্চি বিরিয়ানি আর সরিষা ইলিশ দেখে।"
আমার কথায় আনিকা এত জোরে হাসলেন যে উনার চোখ দিয়ে প্রায় পানি চলে এল। হাসার সময় উনার ঢিলেঢালা টি-শার্টের ভেতর দিয়ে উনার শারীরিক মুভমেন্টগুলো খুব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। আমি খুব দ্রুত আমার চোখ প্লেটের দিকে নামিয়ে নিলাম।
খাবার খেতে খেতে আমাদের আরও অনেক বিষয় নিয়ে কথা হলো। খাবার, সংস্কৃতি, দেশ এবং বিদেশ। আনিকা খুব চমৎকার কথা বলেন। উনার কথার ভেতর কোনো অহংকার নেই, কিন্তু একটা আভিজাত্য আছে, যা উনার বংশ এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশকে প্রমাণ করে।
খাবার শেষ করে আমরা বেসিনে হাত ধুয়ে আবার ডাইনিংয়ে এসে দাঁড়ালাম।
রাত তখন একটা বেজে পনেরো মিনিট। পুরো ফ্ল্যাটটা একদম নিস্তব্ধ। ঢাকা শহরের সব কোলাহল যেন এই ১৬ তলা বিল্ডিংয়ের নিচে এসে থেমে গেছে। "তাহলে রাশেদ, আপনি এখন রেস্ট নিন। অনেক রাত হয়েছে," আনিকা উনার ভেজা হাতটা একটা ছোট তোয়ালেতে মুছতে মুছতে বললেন। "হ্যাঁ, আপনারও তো ঘুমানো দরকার। কাল তো আবার মেলায় যাবেন," আমি বললাম।
আনিকা আমার চোখের দিকে তাকালেন। উনার সেই বাদামি চোখের স্থির দৃষ্টি। "গুড নাইট রাশেদ।" "গুড নাইট আনিকা।"
উনি ঘুরে উনার মাস্টার বেডরুমের দিকে চলে গেলেন। আমি দেখলাম উনার ঘরের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। কোনো লক করার শব্দ পেলাম না, শুধু দরজাটা ভেজিয়ে দেওয়ার একটা নরম শব্দ হলো।
আমি আমার গেস্টরুমে এসে দরজাটা ভেজিয়ে দিলাম। লাইট অফ করে শুধু বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে রাখলাম। তারপর এই বিশাল বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। এবং তারপর থেকেই শুরু হলো আমার মাথার ভেতরকার এই দার্শনিক এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
আমি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছি। আমার পরনের সিল্কের গাউনটা আমার শরীরের সাথে ঘষা খাচ্ছে। এসি চলছে, কিন্তু আমার শরীরের ভেতর একটা প্রচণ্ড উত্তাপ তৈরি হচ্ছে। আনিকা কি দরজাটা লক করেছেন? আমি যখন উনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তখন তো কোনো ‘ক্লিক’ শব্দ শুনিনি। তার মানে দরজাটা শুধু ভেজানো আছে। কেন ভেজানো আছে? একজন নারী একা একটা ফ্ল্যাটে আছেন, উনার পাশের রুমে একজন পুরুষ কলিগ বা পরিচিত কেউ রাত কাটাচ্ছে। একজন স্বাভাবিক নারীর কি ঘুমানোর সময় নিজের বেডরুমের দরজা ভেতর থেকে লক করে দেওয়ার কথা না? নাকি উনি ইচ্ছে করেই দরজাটা খোলা রেখেছেন?
আমার মাথার ভেতরকার সেই ‘পর্নোগ্রাফিক লজিক’ বা যৌন নেশাগ্রস্ত সত্তাটা আমাকে ক্রমাগত উসকানি দিচ্ছে।"রাশেদ, তুই এত বোকা কেন? একজন সুন্দরী, বিবাহিতা নারী তোকে রাত বারোটার সময় তার ফ্ল্যাটে থেকে যাওয়ার অফার দিল। তোকে তার স্বামীর গাউন পরতে দিল। তারপর সে নিজের বেডরুমের দরজা লক না করেই শুতে গেল। এর মানে তুই বুঝিস না? এর মানে হলো গ্রিন সিগন্যাল! সে চাইছে তুই উদ্যোগ নে।"
আমি বালিশে মাথা চেপে ধরলাম। নারীদের সাইকোলজি বড়ই অদ্ভুত। সমাজ তাদের শিখিয়েছে, কোনো সেক্সুয়াল ইনিশিয়েটিভ নারী নিজে থেকে নিতে পারবে না। নিলে তাকে ‘খারাপ নারী’ বলা হবে। তাই তারা সব সময় ‘পরিস্থিতি’ তৈরি করে। তারা পরিবেশটাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে পুরুষকে মনে করতে হয় যে সে-ই সব করছে।
আনিকা কি চাইছেন আমি একটু সাহসী হয়ে আজ রাতে উনাকে সঙ্গমের আমন্ত্রণ জানাই? উনি কি চাইছেন আমি এখন চুপিসারে, খালি পায়ে উনার বেডরুমের দরজা ঠেলে ভেতরে যাই? উনার বিছানায় গিয়ে উনার পাশে বসি? উনি হয়তো প্রথমে একটু চমকে ওঠার ভান করবেন। বলবেন, "রাশেদ! আপনি এখানে? কী করছেন?" তারপর আমি যখন উনার ঠোঁটে ঠোঁট রাখব, উনি হয়তো খুব দুর্বলভাবে একটু বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবেন, এবং পরক্ষণেই উনার সমস্ত সত্তা নিয়ে আমার কাছে সারেন্ডার করবেন।
সতী সেজে থাকার, বা অপরাধবোধ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার এর চেয়ে চমৎকার উপায় আর কী হতে পারে? পরদিন সকালে উনি নিজের বিবেকের কাছে বলতে পারবেন— "আমি তো কিছু করিনি। রাশেদই তো জোর করে আমার রুমে ঢুকে এল। পুরুষ মানুষ, পশুর মতো আচরণ করল। আমি তো পরিস্থিতির শিকার মাত্র!" পুরুষ করবে পাপ, আর নারী হবে পরিস্থিতির শিকার!
আমার বুকের স্পন্দন ড্রামের মতো বাজছে। আমার সুখের দণ্ডটি এই সিল্কের গাউনের নিচে চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো কঠিন হয়ে আছে। আমার শুধু একবার উঠে দাঁড়িয়ে করিডোর পার হয়ে উনার দরজার হাতলটা ঘোরাতে হবে। ব্যাস! তারপর আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ রাতটা আমি পেয়ে যাব। সেই রূপ, সেই আভিজাত্য— সব কিছু আজ রাতে আমার হবে। আমি বিছানা থেকে ওঠার জন্য এক পা মেঝেতে নামালাম।
এবং ঠিক তখনই আমার ভেতরের ‘রাশেদ আহমেদ’— সেই পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের অনুবাদক— আমাকে টেনে ধরল। "দাঁড়া! পাগল হয়েছিস তুই?" আমার লজিক আমাকে ধমক দিল। "তুই কি শিওর যে আনিকা তোর জন্য অপেক্ষা করছে? তুই কি শিওর যে এটা কোনো গ্রিন সিগন্যাল? এমন তো হতে পারে যে উনি নিতান্তই একজন আধুনিক, ব্রডমাইন্ডেড নারী। উনার কাছে একজন কলিগকে বাসায় থাকতে দেওয়াটা কোনো ট্যাবু না। উনি তোকে জাস্ট একজন বন্ধু ভেবেছেন, একজন নিরাপদ মানুষ ভেবেছেন। আর তুই তোর ওই নোংরা, সস্তা এবং যৌন-বিকারগ্রস্ত মস্তিষ্ক দিয়ে উনার বন্ধুত্বের একটা বিকৃত অর্থ তৈরি করছিস!"
আমি থমকে গেলাম।
হ্যাঁ, এমন তো হতেই পারে! আমি যদি এখন উনার রুমে যাই, আর উনি যদি সত্যিই চমকে গিয়ে চিৎকার করে ওঠেন? উনি যদি পুলিশ কল করেন? উনি যদি বলেন, "হাউ ডেয়ার ইউ! আমি আপনাকে বিশ্বাস করে বাসায় জায়গা দিলাম, আর আপনি আমার সাথে এই জঘন্য কাজ করতে এলেন?"
আমার পুরো জীবন ধ্বংস হয়ে যাবে। আমার চাকরি যাবে, জেলে পচতে হবে, বাবা-মায়ের সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। আমি কি সাহস দেখাব, নাকি এটা হবে আমার জীবনের চরম পাগলামি?
খালি পায়ে পাহাড়ে চড়াটা যদি পাগলামি হয়, তবে আনিকা নাওহারের ওই ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকাটাও কি একই রকম পাগলামি নয়? আমি কি এভারেস্ট জয় করার আশায় খালি পায়ে বরফের ওপর পা রাখছি?
আমার মস্তিষ্ক আর কাজ করছে না। সাহস আর পাগলামির এই সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি চরম ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমার শরীরের উত্তেজনাটা আস্তে আস্তে একটা হতাশায় রূপ নিচ্ছে।
আমি বুঝতে পারছি, আমি আসলে কোনো সাহসী পুরুষ নই। আমি একটা কাপুরুষ। আমি শুধু দূর থেকে কল্পনা করতে পারি, বাথরুমের দরজা বন্ধ করে মাস্টারবেট করতে পারি, কিন্তু বাস্তবের একটা সম্ভাবনা যখন আমার নাকের ডগায় এসে হাজির হয়েছে, তখন আমি পরিণতির ভয়ে কাঁপছি।
আমি পা-টা আবার বিছানায় তুলে নিলাম। কমফোর্টারটা গলা পর্যন্ত টেনে দিলাম। রাত তিনটার কাছাকাছি বাজে। ফ্ল্যাটের ভেতরটা শ্মশানের মতো নিস্তব্ধ। আমি জানি, ওপাশের বেডরুমে আনিকা নাওহার হয়তো ঘুমাচ্ছেন, অথবা উনার বেডসাইড ল্যাম্প জ্বেলে কোনো বই পড়ছেন। হয়তো উনিও অপেক্ষা করছেন আমার একটা সাহসী পদক্ষেপের। অথবা হয়তো উনি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছেন এই ভেবে যে, রাশেদ একটা খুব ভালো ছেলে।
এই চরম অনিশ্চয়তা, এই অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আর সারাদিনের শারীরিক ক্লান্তির ভারে আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসতে লাগল। আমি চোখ বন্ধ করলাম।
সাহস আর পাগলামির এই খেলায় আজ রাতে আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না। আমার অবচেতন মন আমাকে ঘুমের অতল গহ্বরে টেনে নিয়ে গেল। ঘুম ঠিক কী কারণে ভাঙল, জানি না। মানুষের শরীরের ভেতরে একটা অদৃশ্য অ্যালার্ম ঘড়ি বসানো থাকে, যেটাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’ বা জৈবিক ঘড়ি। আপনি যদি প্রতিদিন সকাল আটটায় ঘুম থেকে ওঠেন, তবে কোনো একদিন ছুটির দিনে আপনি যতই চান না কেন দশটা পর্যন্ত ঘুমাবেন— আপনার ওই বদমাশ ঘড়িটা ঠিক সকাল আটটাতেই আপনাকে জাগিয়ে দেবে। আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে সিগন্যাল দেবে, "ওঠো ব্যাটা!!"
আমি চোখ মেলে তাকালাম। চারপাশটা অচেনা। মিরপুরের মেসের সেই ড্যাম্প ধরা ছাদ, রাজুর পড়ার আওয়াজ, কিংবা জানালার বাইরে থেকে আসা সিএনজির হর্ন— কিছুই নেই। ঘরের ভেতরটা ভীষণ শান্ত। সেন্ট্রাল এসির একটা খুব মোলায়েম গুঞ্জন ছাড়া পৃথিবীতে যেন আর কোনো শব্দ নেই।
বালিশের পাশ থেকে আমার পুরোনো শাওমি ফোনটা হাতে নিলাম। স্ক্রিন অন করতেই দেখলাম, সকাল ঠিক আটটা বাজে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমার শরীর হয়তো জানে না যে আজ আমি মিরপুরের মেসে নেই, আজ আমি ধানমন্ডির এক রাজকীয় ফ্ল্যাটের নরম তুলতুলে বিছানায় শুয়ে আছি। আমার উচিত ছিল আজ অন্তত দুপুর বারোটা পর্যন্ত রাজকীয় একটা ঘুম দেওয়া। কিন্তু ওই যে, অভ্যাসের দাস!
আমি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করলাম। রেশমি চাদরের স্পর্শটা গায়ের চামড়ায় একটা অদ্ভুত আরাম দিচ্ছে। মিনিট পাঁচেক চোখ বন্ধ করে আবার ঘুমানোর বৃথা চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। ঘুম একবার ভেঙে গেলে তাকে জোর করে ফিরিয়ে আনা আর চলে যাওয়া প্রেমিকাকে জোর করে ফিরিয়ে আনা— দুটোই সমান অসম্ভব কাজ। আমি উঠে পড়লাম।
বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হলাম। বেসিনের বড় আয়নায় নিজের মুখটা দেখলাম। চোখেমুখে একটা অদ্ভুত ক্লান্তি, আবার একই সাথে একটা প্রচ্ছন্ন উত্তেজনা। গত রাতের সেই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, সেই 'যাব কি যাব না' দোটানা আমাকে ভেতরে ভেতরে বেশ ক্লান্ত করে দিয়েছে। আমি বেলাল সাহেবের সেই দামি সিল্কের স্লিপিং গাউনটা শরীর থেকে খুলে ফেললাম। গাউনটা হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রেখে আমি আবার আমার নিজের শার্ট আর প্যান্ট পরে নিলাম। শার্টের বোতাম লাগানোর সময় আমার মনে হলো, আমি যেন আবার আমার সেই পুরোনো, সাধারণ, 'রাশেদ আহমেদ' সত্তায় ফিরে যাচ্ছি। এই প্যান্ট-শার্টই আমার আসল পরিচয়। স্লিপিং গাউনটা ছিল একটা ফ্যান্টাসি মাত্র।
আমি পা টিপে টিপে গেস্টরুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে এসে দাঁড়ালাম। পুরো ফ্ল্যাটটা একদম নিস্তব্ধ। আনিকার কোনো সাড়াশব্দ নেই। তার মানে উনি এখনো ঘুমাচ্ছেন। করিডোর ধরে আনিকার মাস্টার বেডরুমের দিকে তাকালাম। উনার ঘরের দরজাটা গত রাতে যেমন ভেজানো ছিল, ঠিক তেমনই আছে। এক ইঞ্চিও এদিক-ওদিক হয়নি। আমার পায়ের পেশিগুলো হঠাৎ করেই যেন একটা নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি পেয়ে গেল। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো আনিকার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার বুকের স্পন্দন আবার বাড়তে শুরু করেছে। আমি দরজার নবটার ওপর হাত রাখলাম। খুব সাবধানে, নিঃশব্দে নবটা একটু ঘোরাতেই বুঝলাম— না, দরজা লক করা নেই।
আমার মাথার ভেতরের সেই আদিম, সুযোগসন্ধানী পুরুষটা আবার ফিসফিস করে উঠল, "রাশেদ, দরজা খোলা! জাস্ট একটু ধাক্কা দে। তুই শুধু দেখবি। একজন ঘুমন্ত নারীর চেয়ে সুন্দর দৃশ্য পৃথিবীতে আর কী হতে পারে? উনি তো আর জানতে পারছেন না।"
আমি আমার শ্বাস আটকে রেখে দরজাটা খুব সামান্য, হয়তো দুই-তিন ইঞ্চি পরিমাণ ফাঁক করলাম। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। ভারী, দামি পর্দা টেনে দেওয়া থাকায় সকালের আলো ভেতরে ঢুকতে পারেনি। শুধু নাইট ল্যাম্পের একটা খুব মায়াবী, আবছা আলো ঘরের ভেতর ছড়িয়ে আছে। আমার চোখ গিয়ে পড়ল বিশাল কিং-সাইজ বিছানাটার ওপর।
আনিকা ঘুমাচ্ছেন।
উনার শোয়ার ভঙ্গিটা এতটাই এলোমেলো এবং স্বাভাবিক যে, আমার দম আটকে এল। উনার গায়ের কমফোর্টারটা বুকের নিচ পর্যন্ত নামানো। উনার এক পা কমফোর্টারের বাইরে বেরিয়ে আছে। গাউনটা হাঁটুর ওপরে উঠার উপক্রম। উনার সেই নিখুঁত, জ্যামিতিক শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি বাঁক এই আবছা আলোতে এক অভূতপূর্ব, বন্য এবং ঐশ্বরিক সৌন্দর্যের সৃষ্টি করেছে। ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের মুখের পেশিগুলো সবচেয়ে রিল্যাক্সড থাকে। উনার মুখটা এখন একদম শিশুর মতো শান্ত দেখাচ্ছে, কিন্তু উনার শরীরের আবেদনটা তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি আদিম এবং তীব্র।
আমার প্রচণ্ড, আক্ষরিক অর্থেই প্রচণ্ড ইচ্ছে করল, আমি দরজাটা খুলে ভেতরে যাই। ওই বিছানার পাশে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসি। উনার ওই এলোমেলো, ঘুমন্ত শরীরটার দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকি। উনার উন্মুক্ত কাঁধে আমার ঠোঁটটা খুব আলতো করে ছুঁইয়ে দিই। কিন্তু পারলাম না।
আমার ভেতরের সেই 'ভদ্রলোক' বা 'কাপুরুষ' (যে নামেই ডাকা হোক না কেন) আমাকে প্রবল বেগে পেছনের দিকে টেনে ধরল। একজন ঘুমন্ত, অসহায় নারীর ব্যক্তিগত পরিসরে এভাবে উঁকি দেওয়াটা চরম একটা অপরাধ। উনি আমাকে বিশ্বাস করে নিজের ফ্ল্যাটে থাকতে দিয়েছেন, আর আমি উনার সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে একটা সস্তা, চোর-টাইপ পারভার্টের মতো উঁকিঝুঁকি মারছি!
আমার নিজের ওপরই প্রচণ্ড রাগ হলো। আমি খুব সাবধানে, কোনো রকম শব্দ না করে দরজাটা আবার আগের মতো ভেজিয়ে দিয়ে করিডোর থেকে ড্রয়িংরুমে চলে এলাম। ড্রয়িংরুমের বিশাল সোফায় এসে বসে রইলাম।
কী করব বুঝতে পারছি না। এই ফ্ল্যাটের কোনো কিছুই আমার পরিচিত না। আমি চাইলেই এখন কিচেনে গিয়ে নিজের জন্য এক কাপ চা বানাতে পারি না, কারণ আমি জানি না চা-পাতা কোথায় রাখা, আর চিনিই বা কোথায়। আমি চাইলেই টিভি অন করে ভলিউম বাড়িয়ে দেখতে পারি না। অন্যের বাড়িতে মেহমান হয়ে থাকার চেয়ে অস্বস্তিকর আর বোরিং কাজ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। আপনি না পারবেন জোরে কাশতে, না পারবেন নিজের মতো করে হাই তুলতে।
প্রায় বিশ মিনিট আমি ওই সোফায় একটা বোকার মতো বসে থেকে বিরক্ত হলাম। তারপর উঠে গিয়ে ফ্ল্যাটের মেইন দরজাটা খুললাম। দরজার ঠিক বাইরে, পাপোশের ওপর আজকের খবরের কাগজটা পড়ে আছে। আমি যেন হাতে চাঁদ পেলাম। অন্তত সময় কাটানোর একটা চমৎকার উপায় পাওয়া গেছে। আমি পত্রিকাটা তুলে নিয়ে আবার সোফায় এসে বসলাম।
আমার কাজই হলো সারাদিন ল্যাপটপে আন্তর্জাতিক খবর পড়া আর অনুবাদ করা। কিন্তু নিজের দেশের ছাপানো পত্রিকা পড়ার মধ্যে একটা আলাদা গন্ধ আছে, একটা আলাদা মজা আছে। আমি হেডলাইনগুলোতে চোখ বোলাতে লাগলাম।
‘রাজনৈতিক অস্থিরতা: বিরোধী দলের কঠোর হুশিয়ারি’। ‘শেয়ারবাজারে আবার ধস, নিঃস্ব হাজারো বিনিয়োগকারী’।
‘ফরিদপুরে জমি নিয়ে বিরোধে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন’।
আমি পত্রিকাটা নিয়ে পাতার পর পাতা উল্টাতে লাগলাম। আমাদের দেশের পত্রিকাগুলো আসলে এক একটা বিশাল ট্র্যাজেডির সংকলন। এখানে হত্যা, ;.,, দুর্নীতি আর দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু ছাপা হয় না। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে ভেতরের পাতার একটা অদ্ভুত খবর পড়লাম— "ঝিনাইদহে ছাগলে গাছ খাওয়াকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামবাসীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, আহত ২০।"
আমি মনে মনে হাসলাম। বিদেশে বসে মানুষ রকেট বানিয়ে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার চিন্তা করছে, আর আমাদের দেশে মানুষ ছাগলে গাছ খাওয়া নিয়ে বর্শা আর রামদা নিয়ে যুদ্ধ করছে! এই হলো আমার দেশ।
এভাবে পত্রিকা পড়ে, ক্রসওয়ার্ড পাজলটা অর্ধেক সমাধান করে, আর সোফায় বসে হাই তুলতে তুলতে যখন আমি দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম, তখন দেখি সকাল ৯টা ১৫ বাজে। আমার বুকটা ধক করে উঠল। ৯টা ১৫! দশটায় আমার অফিস!
ধানমন্ডি থেকে কারওয়ান বাজার যেতে অন্তত পয়তাল্লিশ মিনিট লাগবে। আমি যদি এখনই বের না হই, আমার লেট হওয়া নিশ্চিত। কিন্তু আমি আনিকাকে না বলে কীভাবে বের হব? উনি ঘুমাচ্ছেন। উনাকে ডেকে তুলে বলা— "আমি অফিসে যাচ্ছি"— এটা খুব অভদ্রতা হবে। আবার না বলে চলে যাওয়াটা হবে আরও বড় অভদ্রতা। আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম।
অফিসের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ঢুকলাম। এহসান ভাইয়ের ইনবক্সে গিয়ে একটা মেসেজ ড্রাফট করতে শুরু করলাম। "এহসান ভাই, আমার খুব ক্লোজ একজন রিলেটিভ হঠাৎ করে স্ট্রোক করে হাসপাতালে অ্যাডমিট হয়েছেন। আমাকে এখনই সেখানে ছুটতে হচ্ছে। আজকের দিনটা আমি কোনোভাবেই অফিসে আসতে পারব না। প্লিজ, আমার লিভটা একটু কনসিডার করবেন।"
মেসেজটা টাইপ করে আমি সেন্ড করে দিলাম।
মানুষ কতটা অবলীলায় মিথ্যা বলতে পারে! আর সেই মিথ্যার পেছনে যদি একজন সুন্দরীর সংস্পর্শ পাওয়ার সুযোগ থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। আমার কোনো রিলেটিভ স্ট্রোক করেনি, কিন্তু আনিকা নাওহারের এই ফ্ল্যাটে বসে আমার নিজেরই স্ট্রোক করার মতো অবস্থা। আমি ফোনটা পকেটে রেখে দিয়ে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। যাক, আজকের দিনের জন্য কিম জং উন আর ভ্লাদিমির পুতিন থেকে মুক্তি!
সাড়ে নয়টার দিকে আনিকার বেডরুমের ভেতর থেকে একটা হালকা খটখট শব্দ এল। আমি সোজা হয়ে বসলাম। আমার ভেতরে একটা তীব্র স্বস্তি কাজ করতে লাগল। অবশেষে উনি উঠছেন! কিছুক্ষণ পর করিডোরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। এবং তাকিয়েই আমাকে আবার একটা জোরদার ধাক্কা খেতে হলো। আনিকা উনার বেডরুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে আসছেন। উনার পরনে একটা সিল্কের স্লিপ গাউন। গাউনটা হাঁটু পর্যন্ত লম্বা, আর এর পুরোটাই এত পাতলা এবং মসৃণ যে, উনার শরীরের প্রতিটি বাঁক যেন সেই কাপড়ের ভেতর দিয়ে চিৎকার করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
সকালের ঘুম-ভাঙা একজন নারী যে কতটা বন্য আর মোহনীয় হতে পারে, সেটা আনিকাকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। উনার চুলগুলো পুরোপুরি এলোমেলো। মুখের পেশিগুলোতে একটা আলস্য জড়ানো। কিন্তু উনার শরীরের সেই আদিম জ্যামিতিটা স্লিপ গাউনের কাপড়ের সাথে এমনভাবে লেপ্টে আছে যে, উনার ভরাট বক্ষদেশ আর সরু কোমরের পার্থক্যটা একটা পাহাড় আর খাদের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হাঁটার সময় গাউনটা উনার ফর্সা, সুডৌল ঊরুর সাথে ঘষা খাচ্ছে।
কী অদ্ভুতভাবে উনার শরীরটা নিজেকে ফুলে-ফেঁপে বের করে নিয়ে আসতে চাইছে! আমার চোখের পলক পড়ছে না। আনিকা আমাকে সোফায় বসে থাকতে দেখে একটু চমকে গেলেন। উনার ঘুম-ঘুম চোখে একটা হালকা বিস্ময়। "আরে রাশেদ! আপনি উঠে গেছেন? কখন উঠলেন?" উনি হাই তুলতে তুলতে জিজ্ঞেস করলেন। আমি আমার দৃষ্টিকে উনার চোখের ওপর ধরে রাখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতে বললাম, "এই তো, বেশিক্ষণ হয়নি। আটটার দিকে।"
"ওহ মাই গড!" আনিকা কপালে হাত দিয়ে একটা অপরাধী ভঙ্গি করলেন। "আটটা থেকে উঠে বসে আছেন? আর আমাকে ডাকেননি কেন? আপনি তো সকাল থেকে খালি পেটে বসে আছেন! আই অ্যাম সো সরি রাশেদ। আমার আসলে রাতে খুব দেরিতে ঘুম এসেছিল, তাই সকালে উঠতে লেট হয়ে গেল।"
আমি হাসিমুখে বললাম, "আরে, সরি বলার কী আছে! আপনি ঘুমাচ্ছিলেন, আপনাকে ডিস্টার্ব করাটা কি ঠিক হতো? আর আমার তো সকাল সকাল ওঠার অভ্যাস। কোনো অসুবিধা হয়নি।"
"অসুবিধা হয়নি মানে? আপনি আমার বাসায় গেস্ট, আর আপনি না খেয়ে বসে আছেন! আপনি একটু বসুন, আমি এক্ষুনি চা বানাচ্ছি," আনিকা দ্রুত কিচেনের দিকে পা বাড়ালেন।
আমি সোফা থেকে উঠে উনার পিছু পিছু কিচেনের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। "আনিকা, আপনি মাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন। আপনি যান, চোখেমুখে পানি দিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন। চা-টা বরং আমি বানাই।"
আনিকা কিচেনের ক্যাবিনেট খুলতে খুলতে ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। উনার ঠোঁটে একটা মিষ্টি হাসি। "আপনি বানাতে পারবেন? চিনি-চা-পাতা কোথায় রাখা আছে, খুঁজে পাবেন?"
"পাব না কেন? আমি একজন আন্তর্জাতিক মানের অনুবাদক। আমি কিম জং উনের মিসাইলের রেঞ্জ খুঁজে বের করতে পারি, আর আপনার কিচেনের চা-পাতা খুঁজে পাব না? আপনি যান, ফ্রেশ হয়ে নিন।"
আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। চা-পাতা ওই ডান দিকের ওপরের ক্যাবিনেটে। আর ফ্রিজে পাউরুটি আর মাখন আছে, বের করে নিন।"
আনিকা বাথরুমের দিকে চলে গেলেন। আমি কিচেনে ঢুকে চায়ের পানি বসালাম। এই যে আমি উনার কিচেনে দাঁড়িয়ে উনার জন্য চা বানাচ্ছি— এই অনুভূতিটা অদ্ভুত রকম সুন্দর। মনে হচ্ছে, আমি যেন উনার খুব কাছের কেউ, উনার সংসারেরই একজন। ব্যাচেলর মেসের গ্যাসের চুলায় নিজের জন্য চা বানানো আর ধানমন্ডির এই মডুলার কিচেনে আনিকা নাওহারের জন্য চা বানানোর মধ্যে একটা আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে।
Yesterday, 09:19 AM
Once again great update.. Carry on..
Yesterday, 02:01 PM
দারুন লিখছেন ভাই। কিপ ইট আপ
Yesterday, 02:07 PM
অসাধারণ
3 hours ago
আপডেট
54 minutes ago
১৩।
আমি চা বানাতে শুরু করলাম। মিনিট দশের মধ্যেই আনিকা ফিরে এলেন। উনি কাপড় পাল্টেছেন। একটা নীল রঙের ডেনিম জিন্স আর একটা সাদা টপস পরেছেন। চুলগুলো খুব সুন্দর করে একটা ক্লিপ দিয়ে পেছনের দিকে আটকানো। মুখে হালকা একটু পাউডার আর ঠোঁটে একদম হালকা পিংক রঙের একটা লিপবাম দেওয়া।
উনাকে এখন এত সতেজ আর প্রাণবন্ত লাগছে যে, আমার মনে হলো এইমাত্র বুঝি একটা আস্ত সকাল আমার ড্রয়িংরুমে হেঁটে এল। আমি ততক্ষণে দুটো মগে চা ঢেলে ডাইনিং টেবিলে এনে রেখেছি। সাথে কয়েক পিস পাউরুটিতে মাখন লাগিয়ে প্লেটে সাজিয়ে দিয়েছি। "ওয়াও! আপনি তো দেখি দারুণ গুছিয়ে কাজ করেন রাশেদ!" আনিকা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললেন। আমি উনার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে চায়ের মগটা হাতে নিলাম। "ব্যাচেলরদের গুছিয়ে কাজ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না আনিকা। আমাদের কেউ মাখন মাখিয়ে রুটি খাইয়ে দেয় না।" আনিকা চায়ে চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। "উমমম... চা-টা কিন্তু দারুণ হয়েছে। কাল রাতে আমার বানানো চায়ের চেয়েও বেটার।" হঠাৎ করে আনিকা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেন। উনার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। "রাশেদ! দশটা তো প্রায় বাজে! আপনার তো দশটায় অফিস! আপনি অফিসে যাবেন না?" "এই তো চা খেয়েই বের হব। আপনাকে একটা দিন বেশ যন্ত্রণা দিয়ে দিলাম।" আমি যে অলরেডি ছুটি নিয়েছি এটা আর বললাম না। নয়তো মনে হবে, আমি আগে থেকেই আজ সারাদিন উনার সঙ্গে থাকার প্ল্যান করে ফেলছি। আনিকা বেশ অধিকার নিয়ে বললেন, "এসব যন্ত্রণা-ফন্ত্রনা বলে এড়ানো যাবে না।" আমি বললাম, "কি করতে বলছেন?" আনিকা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, "আজকের দিনটা ছুটি নেন। আমি দেশে আসার পর প্রতিদিন মেলায় যাওয়া ছাড়া সারাদিন এক প্রকার ঘরবন্দি। আজ আপনাকে নিয়ে ঘুরব।" "ঘুরবেন! কই যাবেন?" "প্রথমে একটা সিনেমা দেখব। তারপর টিএসসি। তারপর বিকেলে মেলায়।" আমি তো এমন কিছুর অপেক্ষাতেই ছিলাম। বললাম, "তা করা যায়। আমার ছুটি অনেক জমে আছে। মেইল করে দিব ইমার্জেন্সির দোহাই দিয়ে।" আমার কথায় আনিকার মুখে একটা অদ্ভুত, নরম হাসি ফুটে উঠল। উনার সেই হাসিতে একটা স্পষ্ট প্রশ্রয়ের ছাপ ছিল। "পারফেক্ট।" আনিকা হঠাৎ করে খুব এক্সাইটেড গলায় বলে উঠলেন। সকাল এগারোটার দিকে আমরা বাসা থেকে বের হলাম। আনিকা উনার সেই নীল জিন্স আর সাদা টপসের সাথে একটা হালকা কার্ডিগান চাপিয়ে নিলেন। চোখে একটা বড় সানগ্লাস। উনাকে দেখতে একদম কোনো হলিউড মুভির হিরোইনের মতো লাগছিল। আমরা লিফট দিয়ে নিচে নামলাম। আনিকা উবার অ্যাপ দিয়ে একটা উবার প্রিমিয়াম গাড়ি ডাকলেন। গাড়িটা আসার পর আমরা দুজনে পেছনের সিটে পাশাপাশি বসলাম। উবারের এসির ঠান্ডা বাতাস, গাড়ির এয়ার ফ্রেশনারের হালকা গন্ধ আর আনিকার গায়ের সেই চিরচেনা শ্যানেল পারফিউমের সুবাস— সবকিছু মিলে গাড়ির ভেতরটা একটা অদ্ভুত রোমান্টিক বুদবুদ তৈরি করল। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। ঢাকা শহরের সকাল এগারোটার জ্যাম মানেই একটা স্থির, স্থবির পৃথিবী। বাসের হর্ন, রিকশার টুংটাং, মানুষের চিৎকার— বাইরে এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা। কিন্তু এই কাঁচ-বন্ধ এসি গাড়ির ভেতর আমি আর আনিকা যেন সম্পূর্ণ একটা বিচ্ছিন্ন গ্রহে বসে আছি। আনিকা উনার সানগ্লাসটা মাথার ওপরে তুলে দিয়ে আমার দিকে ফিরে বসলেন। "আচ্ছা রাশেদ, আপনার কি কখনো মনে হয় না যে এই ঢাকা শহরটা একটা বিশাল পাগলাগারদ?" আনিকা বাইরের জ্যামের দিকে তাকিয়ে বললেন। "মনে হয় তো। কিন্তু এই পাগলাগারদেরও একটা নিজস্ব সিস্টেম আছে। আমরা সবাই এখানে পাগল, কিন্তু আমরা সবাই জানি আমাদের পাগলামির লিমিট কতটুকু।" আনিকা হাসলেন। উনার হাঁটুটা আমার হাঁটুর সাথে খুব হালকাভাবে লেগে আছে। গাড়ির ঝাঁকুনিতে মাঝে মাঝেই সেই স্পর্শটা একটু গাঢ় হচ্ছে। প্রতিটা স্পর্শে আমার শরীরে একটা বিদ্যুতের তরঙ্গ বয়ে যাচ্ছে। আমরা বসুন্ধরা সিটিতে পৌঁছালাম প্রায় সোয়া বারোটার দিকে। স্টার সিনেপ্লেক্সের ফ্লোরে উঠে আমি বললাম, "আপনি দাঁড়ান, আমি টিকিট কেটে আনছি।" কাউন্টারে গিয়ে 'ইটারনিটি (২০২৫)' নামের একটা ইংলিশ মুভির দুটো টিকিট কেটে আনলাম। মুভিটা একটা সাই-ফাই রোমান্টিক ড্রামা। এরমধ্যে আনিকা বড় সাইজের পপকর্ন আর দুটো কোক নিয়ে ফেলেছেন। আমরা যখন হলে ঢুকলাম, তখনো শো শুরু হয়নি। স্ক্রিনে অ্যাডভার্টাইজমেন্ট চলছে। হলের ভেতরটা প্রায় অন্ধকার। এই দুপুরবেলা, তাও আবার কর্মব্যস্ত দিনে সিনেমা হলে দর্শক নেই বললেই চলে। পুরো বিশাল হলটার ভেতর গুনে গুনে হয়তো ১৪-১৬ জন মানুষ হবে। তারা সবাই এদিক-ওদিক ছড়ানো-ছিটানো সিটে বসে আছে। আমাদের সিটটা একদম পেছনের দিকের কর্নারে। আমরা পাশাপাশি সিটে গিয়ে বসলাম। সিটের হাতলের ওপর রাখা আনিকার ফর্সা, নরম হাতটার দিকে আমার চোখ পড়ল। হলের আলো আস্তে আস্তে নিভে গেল। স্ক্রিনে মুভি শুরু হওয়ার কাউন্টডাউন শুরু হলো। চারপাশটা একটা ঘুটঘুটে, মায়াবী অন্ধকারে ঢেকে গেল। এই বিশাল অন্ধকার হলে, এই ১৪-১৬ জন মানুষের ভিড়ে, আনিকা নাওহার আমার ঠিক এত কাছে বসে আছেন যে, আমি উনার শ্বাস-প্রশ্বাসের ওঠানামার শব্দটাও শুনতে পাচ্ছি। আমার বুকের ভেতরকার সেই অবদমিত, আদিম নেকড়েটা অন্ধকারে যেন তার চোখ মেলে তাকাল। ঢাকা শহরের আধুনিক সিনেমা হলগুলো আসলে কেবল সিনেমা দেখার জায়গা নয়। এগুলো হচ্ছে কংক্রিটের এই বিশাল জঙ্গলে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত কিছু ফ্যান্টাসি, কিছু অবদমিত বাসনা আর লুকোচুরি খেলার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। আপনি যদি একটা সাধারণ পার্কের বেঞ্চে বসে বিপরীত লিঙ্গের কারো হাত ধরেন, তাহলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে কোনো নীতিপুলিশ এসে আপনাকে সমাজ, ধর্ম আর কালচারের ক্লাস নেওয়া শুরু করবে। কিন্তু চারশ-পাঁচশো টাকা দিয়ে একটা মাল্টিপ্লেক্সের টিকিট কেটে আপনি যখন অন্ধকার হলের ভেতর ঢুকে যাবেন, তখন আপনি যেন একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন গ্রহে চলে গেলেন। সেখানে কোনো নীতিপুলিশ নেই, কোনো সিসি ক্যামেরা নেই (থাকলেও অন্ধকারে তা অন্ধ), আর সবচেয়ে বড় কথা— সেখানে কেউ কারো দিকে তাকানোর সময় পায় না। সবাই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। অন্তত, তাত্ত্বিকভাবে সেটাই হওয়ার কথা। কিন্তু স্বভাবজাত পর্যবেক্ষক, স্ক্রিনের চেয়ে স্ক্রিনের বাইরের নাটক দেখতেই বেশি অভ্যস্ত। এই যেমন টিকিট কাটার সময় আমার ঠিক সামনেই একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। বয়স বাইশ বা তেইশ হবে। পরনে একটা স্টাইলিশ টি-শার্ট আর ডেনিম। ছেলেটার সঙ্গে একজন মহিলা। আমি অনুবাদক মানুষ, আমার চোখ খুব দ্রুত স্ক্যান করে। মহিলাটার বয়স চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশের মধ্যে হবে। পরনে একটা গাঢ় মেরুন রঙের সালোয়ার কামিজ। চোখেমুখে একটা দারুণ সাজগোজের আভা। সত্যি কথা বলতে কী, পুরো স্টার সিনেপ্লেক্সের লবিতে যদি সুন্দরীদের একটা র্যাংকিং করা হতো, তবে আনিকা নাওহার থাকতেন এক নাম্বারে, আর এই মহিলা থাকতেন ঠিক দুই নাম্বারে। উনার শারীরিক গড়নটা একটু ভারী, কিন্তু সেই ভারী গড়নের মধ্যে একটা অদ্ভুত, পরিপক্ব মাদকতা আছে। আমি খেয়াল করলাম, ছেলেটা টিকিট কাটার সময় মহিলাটার খুব কাছে ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। "এই তন্ময়, পপকর্ন নিবি না?" মহিলাটা খুব মোলায়েম গলায় ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল। তন্ময় নামের ছেলেটা ঘাড় ঘুরিয়ে এমন একটা দৃষ্টিতে মহিলাটার দিকে তাকাল, যে দৃষ্টিতে আর যাই হোক, কোনো ভক্তি বা শ্রদ্ধা ছিল না। সে হাসিমুখে বলল, "হ্যাঁ আন্টি, নিচ্ছি। তুমি যাও, ভেতরে গিয়ে বসো।" 'আন্টি!' শব্দটা আমার কানের পর্দায় একটা অদ্ভুত ধাক্কা দিল। আমার সাংবাদিক আর অনুবাদক মস্তিষ্ক সাথে সাথে অ্যালার্ম বাজিয়ে উঠল। এটা কোনোভাবেই খালা-ভাগ্নে বা ফুফু-ভাতিজার সম্পর্ক হতে পারে না! খালা বা ফুফুর সাথে কোনো বাইশ বছরের তরুণ যখন সিনেমা দেখতে আসে, তখন তাদের মাঝখানে একটা স্বাভাবিক, অদৃশ্য দেয়াল থাকে। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ হয় খুব ক্যাজুয়াল। কিন্তু এই তন্ময় আর তার 'আন্টি'র বডি ল্যাঙ্গুয়েজ একদম অন্যরকম। ছেলেটার হাত বারবার কথা বলার ছলে মহিলাটার কোমরের খুব কাছাকাছি গিয়ে স্পর্শ করছে। আর মহিলাটাও সেটা এড়িয়ে যাওয়ার বদলে এমনভাবে একটু হেসে গা এলিয়ে দিচ্ছেন, যেটা কোনো 'আন্টি' তার ভাতিজা বা ভাগ্নের সামনে করেন না। আমি মনে মনে হাসলাম। ঢাকা শহর বড়ই বিচিত্র জায়গা! কে কার আন্টি, আর কে কার কী— সেটা বোঝার কোনো উপায় নেই। মানুষের সম্পর্কের মাঝেও কত রকম সাবটাইটেল লুকিয়ে থাকে! আমরা টিকিট কেটে, পপকর্ন আর কোক নিয়ে হলের ভেতর ঢুকলাম। হলটা প্রায় অন্ধকার। মাত্র চৌদ্দ-ষোলো জন দর্শক। বিশাল একটা হলরুমে এত কম মানুষ থাকলে একটা ভূতুড়ে, অথচ দারুণ রোমান্টিক পরিবেশ তৈরি হয়। আমার ঠিক পাশেই আনিকা। উনার কার্ডিগানের হালকা উলের ছোঁয়া আমার খালি কনুইয়ে লাগছে। উনার পারফিউমের সেই রিফ্রেশিং গন্ধটা অন্ধকারের মধ্যে যেন আরও বেশি তীব্র হয়ে আমার স্নায়ুতে আঘাত করছে। আমি পপকর্নের বক্সটা আমাদের দুজনের সিটের মাঝখানের হাতলটায় রাখলাম। স্ক্রিনে তখনো বিজ্ঞাপন চলছে। আমার চোখ অভ্যাসবশত হলের ভেতর একটা চক্কর দিল। এবং আমি দেখলাম, আমাদের থেকে দুই সারি সামনে, একটু কোনাকুনি ডান দিকের সিটগুলোতে সেই তন্ময় আর তার 'আন্টি' বসেছে। মুভি শুরু হলো। কিন্তু মুভি শুরুর দশ মিনিট পর থেকেই আমি বুঝতে পারলাম, আমার ফোকাস স্ক্রিনের চেয়ে স্ক্রিনের বাইরের ড্রামার দিকে বেশি চলে যাচ্ছে। সিনেমা হলের অন্ধকার চোখ সয়ে আসার পর চারপাশের অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমি আড়চোখে দেখলাম, সামনের ওই সিটগুলোতে তন্ময় আর তার আন্টির বসার ভঙ্গিটা আর সাধারণ নেই। মাঝখানের হাতলটা তারা তুলে দিয়েছে। তন্ময় প্রায় পুরোটা হেলে পড়েছে মহিলাটার দিকে। আমি ঢোঁক গিললাম। আমার চোখ বারবার স্ক্রিন থেকে সরে গিয়ে ওই দুই সারি সামনের সিটে আটকে যাচ্ছে। অন্ধকার হলেও, স্ক্রিনের আলো যখন হলের ওপর পড়ছে, তখন সিল্যুয়েটের মতো তাদের নড়াচড়াগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। তন্ময়ের একটা হাত মহিলাটার কাঁধ জড়িয়ে ধরে আছে, আর অন্য হাতটা খুব সাবধানে, সাপের মতো মহিলাটার কোলের ওপর দিয়ে উনার কোমরের কাছে ঘোরাঘুরি করছে। মহিলাটার মাথা তন্ময়ের কাঁধে রাখা। আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ধুকপুকানি শুরু হলো। মানুষের ভয়েরিজম বা অন্যের গোপন মুহূর্ত দেখার যে একটা আদিম, নিষিদ্ধ আনন্দ আছে, সেটা আমাকে গ্রাস করতে শুরু করল। আমি আড়চোখে আমার পাশে বসা আনিকার দিকে তাকালাম। আনিকা স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। মুভির গল্পে উনি পুরোপুরি ডুবে গেছেন। উনি স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই, অন্ধকারের মধ্যে হাত বাড়িয়ে পপকর্নের বক্স থেকে পপকর্ন নিচ্ছেন। উনার আঙুলগুলো পপকর্ন নেওয়ার সময় মাঝে মাঝেই আমার আঙুলের সাথে ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা স্পর্শে আমি চমকে উঠছি, কিন্তু উনি এতটাই মগ্ন যে ওদিকে উনার কোনো খেয়ালই নেই। আমি আবার মুভিতে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলাম। স্ক্রিনে নায়ক তখন একটা ল্যাবরেটরির ভেতর দাঁড়িয়ে তার প্রেমিকাকে বলছে, "আমি যদি তোমাকে ভুলে যাই, তাহলে এই অনন্তকাল বেঁচে থেকে আমার লাভ কী? স্মৃতি ছাড়া মানুষের জীবন তো একটা পাথরের মতো।" ডায়লগটা বেশ ভারী। আমি মনে মনে ভাবলাম, কথাটা তো সত্যি। স্মৃতি ছাড়া মানুষ আর পাথর তো একই। কিন্তু আমার এই দার্শনিক চিন্তাটা মাত্র এক মিনিট টিকল। আমার চোখ আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডান দিকের ওই সিটগুলোর দিকে চলে গেল। এবার যা দেখলাম, তাতে আমার আক্ষরিক অর্থেই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। তন্ময় আর তার আন্টি এখন আর শুধু কাঁধে মাথা রেখে বসে নেই। খেলা অনেক দূর গড়িয়েছে। মহিলাটার একটা হাত তন্ময়ের কোলের ওপর। শুধু কোলের ওপর বললে ভুল হবে, হাতটা তন্ময়ের প্যান্টের ওপর দিয়ে তার পুরুষাঙ্গের ওপর রাখা। এবং হাতটা স্থির নেই। অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে হাতটা খুব ধীর, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট ছন্দে ওঠানামা করছে। আর তন্ময়ের হাতটা এখন আর মহিলাটার কোমরে নেই, সেটা সালোয়ার কামিজের ওপর দিয়ে মহিলাটার বক্ষদেশের ওপর চেপে বসে আছে। আমার পুরো শরীরে যেন কেউ একশো ভোল্টের কারেন্ট সাপ্লাই দিয়ে দিল। আমি নিজে একজন পুরুষ। একজন স্বাস্থ্যবান, উনত্রিশ বছর বয়সী পুরুষ। আমার ঠিক পাশে একজন অপ্সরী নারী বসে আছে, যার শরীরের ঘ্রাণ আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। আর আমার চোখের সামনে আরেক জোড়া নারী-পুরুষ অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে চরম একটা আদিম খেলায় মত্ত হয়ে আছে। এই দৃশ্য দেখার পর কোনো সুস্থ পুরুষের শরীর শান্ত থাকতে পারে না। আমার প্যান্টের ভেতর আমার অবদমিত পুরুষাঙ্গটি মুহূর্তের মধ্যে ফুঁসে উঠল। উত্তেজনায় সেটা পাথরের মতো কঠিন হয়ে, আক্ষরিক অর্থেই একটা 'কুতুব মিনার' হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। প্যান্টের কাপড়ের ভেতর সেই প্রচণ্ড চাপ আর অস্বস্তি আমি স্পষ্ট অনুভব করতে লাগলাম। আমার শ্বাস ভারী হয়ে এল। আমি দুই পা ক্রস করে, একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বসে আমার এই উত্তেজনাকে ঢাকার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার মাথার ভেতর তখন হাজারটা আফসোস আর আক্ষেপের সাইরেন বাজছে। শালা, জীবনটা আসলেই খুব আনফেয়ার! ওই বাইশ বছরের পিচ্চি ছেলে তন্ময়, সে তার চেয়ে দশ বছরের বড় একটা আন্টিকে নিয়ে সিনেমা হলে এসে অন্ধকারে রীতিমতো স্বর্গসুখ ভোগ করছে। মহিলাটাও কীভাবে অবলীলায় ছেলেটার প্যান্টের ওপর দিয়ে তাকে উত্তেজিত করে তুলছে! আর আমার কপালে কী জুটল? আমার পাশে বসে আছে আনিকা নাওহারের মতো একটা মাস্টারপিস নারী। যার শুধু একটা চোখের ইশারাতেই আমি হয়তো আমার সারা জীবনের অনুবাদকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বনবাসে যেতে রাজি আছি। আর সেই নারী আমার পাশে বসে, আমার আঙুলের সাথে আঙুল ছুঁইয়ে পপকর্ন খাচ্ছে, কিন্তু তার মাথার ভেতর চলছে একটা সাই-ফাই মুভির রোমান্টিক থিওরি! "আফসোস! আমার কপালে এসব নেই!" আমি মনে মনে নিজের ভাগ্যকে গালি দিলাম। আমি যদি একটু সাহসী হতাম! আমি যদি এখন অন্ধকারে আমার হাতটা আনিকার কোলের ওপর রাখতাম? উনি কি চমকে উঠতেন? উনি কি আমাকে চড় মারতেন? নাকি ওই আন্টির মতো উনিও আমাকে প্রশ্রয় দিতেন? এইসব ভাবতে ভাবতে আমার শরীরের উত্তাপ আরও বেড়ে গেল। আমার কুতুব মিনার তখনো স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি চোখ নামিয়ে আবার মুভিতে ফোকাস করার চেষ্টা করলাম। পর্দায় নায়ক-নায়িকা এখন একটা সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। সমুদ্রের ঢেউ এসে তাদের পায়ে লাগছে। আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি ঠিকই, কিন্তু আমার চোখের কোণ দিয়ে আমি তন্ময়দের সিটের দিকে নজর রাখছি। মানুষের চোখের পেরিফেরাল ভিশন খুব পাওয়ারফুল একটা জিনিস। আপনি সোজা তাকিয়ে থেকেও আশপাশের অনেক কিছু দেখতে পান। কিছুক্ষণ পর আমার চোখ আবার পুরোপুরি সেদিকে ঘুরে গেল। এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। অন্ধকার হল। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। মুভির একটা খুব ইমোশনাল আর সাইলেন্ট সিন চলছে। আর সেই সুযোগে তন্ময় ছেলেটা তার হাতটা মহিলাটার কামিজের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। মহিলাটার মাথা পেছনের সিটে হেলানো। কী অদ্ভুত! ঢাকা শহরের মানুষ এত সাহসী হয় কীভাবে? এই পাবলিক প্লেসে, সিসি ক্যামেরা থাকতে পারে জেনেও, এরা কীভাবে এই মাত্রার একটা চরম ঝুঁকি নিচ্ছে? নাকি এই ঝুঁকির মধ্যেই আসল থ্রিল লুকিয়ে আছে? আমি রুদ্ধশ্বাসে দৃশ্যটা দেখার চেষ্টা করছিলাম। আমার ভেতরের ভয়েরিজম বা দর্শক-সত্তা তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার কানের খুব কাছে, একদম ঘাড়ের ওপর একটা উষ্ণ নিশ্বাসের স্পর্শ টের পেলাম। আমি চমকে ডান দিকে তাকালাম। আনিকা নাওহার আমার দিকে ঝুঁকে এসেছেন। উনার মুখটা আমার কানের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে। অন্ধকারের মধ্যেও আমি উনার বাদামি চোখের মণি দুটো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। উনি খুব নিচু, ফিসফিস করা একটা গলায় বললেন, "রাশেদ, বারবার ওদিকে তাকাচ্ছেন কেন?" আমার বুকটা ধক করে উঠল। মনে হলো আমি যেন চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছি। আমার সমস্ত শরীরের রক্ত যেন এক মুহূর্তে মাথায় উঠে এল। আমি আমতা-আমতা করে বললাম, "ওহ... হ্যাঁ... মানে, না তো! আমি তো মুভিই দেখছি।" "মিথ্যে বলবেন না," আনিকা আগের মতোই ফিসফিস করে বললেন। উনার গলার স্বরে কোনো রাগ নেই, বরং এক ধরনের অদ্ভুত, রহস্যময় গাম্ভীর্য আছে। "আমি খেয়াল করছি। আপনি মুভি শুরুর পর থেকে অন্তত দশবার ওই সামনের সিটের দিকে তাকিয়েছেন। অন্যের প্রাইভেট মোমেন্ট এভাবে দেখতে নেই রাশেদ। এটা আনসিভিলাইজড।" আমার কান-মাথা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। আনিকা আমাকে ধরে ফেলল আমি একটা চিপ পারভার্টের মতো অন্যের রোমান্স দেখছি! আমি দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য খুব অপরাধী গলায় ফিসফিস করে বললাম, "ওহ, হ্যাঁ। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি আনিকা। আসলে... মানে, চোখটা বারবার ওইদিকে চলে যাচ্ছিল। আমি আর তাকাব না। সরি।" আনিকা সোজা হয়ে উনার সিটে বসলেন। তারপর উনি এমন একটা কথা বললেন, যেটা আমার বুকের ভেতর একটা বিশাল হাতুড়ির বাড়ি মারল। উনি স্ক্রিনের দিকে দৃষ্টি রেখেই, খুব শান্ত, নির্লিপ্ত গলায় বললেন, "আপনার তো শুধু চোখই যায় রাশেদ। আর তো কিছু যায় না। আপনি সিনেমা দেখেন।" কথাটা শোনার পর আমার মনে হলো, হলের এসিটা যেন হঠাৎ করে মাইনাস ফাইভ ডিগ্রিতে নেমে গেছে। কী বললেন উনি? "আপনার শুধু চোখই যায়!" এই সাধারণ, নিরীহ শোনানো বাক্যটার ভেতরে যে কী পরিমাণ তাচ্ছিল্য, কী পরিমাণ উসকানি আর কী পরিমাণ চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে আছে, সেটা বুঝতে আমার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না। এর মানে কী? উনি কি বলতে চাইছেন যে আমি শুধু দূর থেকে অন্যের রোমান্স দেখার মতো একজন কাপুরুষ দর্শক? আমার নিজের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার, বা নিজের কোনো মুভ নেওয়ার সাহস নেই? আমি কি শুধুই একজন 'ভয়েয়ার'? উনি কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছেন? উনি কি চাইছেন যে আমি আমার চোখকে শাসন না করে, আমার হাতকে শাসন করি? আমার হাতটা কি উনার দিকে বাড়িয়ে দিই? আমার মাথার ভেতর জট পাকিয়ে গেল। আনিকা নাওহারের মতো একজন ক্লাসি, ইন্টেলেকচুয়াল নারী কি সত্যিই এত চিপ একটা ইঙ্গিত দিতে পারেন? নাকি আমি আমার এই বিকৃত, যৌন-নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক দিয়ে উনার একটা সাধারণ কথার ভুল অর্থ বের করছি? আমি পুরোপুরি আড়ষ্ট হয়ে সিটে বসে রইলাম। আমার প্যান্টের ভেতরের সেই কুতুব মিনার এখন আর শুধু ফিজিক্যাল উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে নেই, সেটা এখন সাইকোলজিক্যাল একটা প্রেশারে আরও শক্ত হয়ে গেছে। আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু স্ক্রিনের নায়ক-নায়িকা কী বলছে, তার একটা শব্দও আমার কানে ঢুকছে না। আমার কানের ভেতর শুধু আনিকার সেই ফিসফিসানিটা ইকো হচ্ছে— "আপনার তো শুধু চোখই যায় রাশেদ..." আমি কি এখন একটা মুভ নেব? আমি কি এখন অন্ধকারে আমার ডান হাতটা খুব ধীরে ধীরে সরিয়ে নিয়ে আনিকার সিটের হাতলে রাখা উনার নরম, ফর্সা হাতের ওপর রাখব? যদি উনি আমার হাতটা সরিয়ে দেন? যদি উনি বলেন, "রাশেদ! আপনি এটা কী করছেন?" কিন্তু উনি তো নিজেই আমাকে উসকে দিলেন! আমার মনের ভেতর সাহস আর পাগলামির সেই দোটানা আবার শুরু হয়ে গেল। আমার হাত ঘামছে। আমি আমার ডান হাতটা আমার কোলের ওপর থেকে সামান্য একটু তুললাম। আনিকার হাতটা আমার থেকে মাত্র দুই ইঞ্চি দূরে। এই দুই ইঞ্চি দূরত্ব পার হতে আমার মনে হচ্ছে যেন আমাকে দুই হাজার কিলোমিটার পার হতে হবে। আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। আমি আমার হাতটা আনিকার হাতের দিকে এগোতে শুরু করলাম। অন্ধকারে খুব ধীর গতিতে। আমার হার্টবিট তখন প্রতি মিনিটে একশো কুড়ি। ঠিক সেই মুহূর্তে...
47 minutes ago
Darun
|
|
« Next Oldest | Next Newest »
|