22-06-2026, 09:21 PM
**পর্ব ১২**
দুইদিন কেটে গেছে। সকালের নাস্তার টেবিলে আমি, নেহা, মি. রহমান আর মিসেস জোহরা বসে ছিলাম। নেহা চুপচাপ ছিল। সে তার বাবাকে কোনো প্রশ্ন করেনি, কিন্তু তার চোখে এখন আর আগের মতো শ্রদ্ধা ছিল না। সে জেনে গিয়েছিল তার বাবা কতটা নির্মম।
তবু তার মনে একটা দ্বন্দ্ব চলছিল — নিরঞ্জনও তো তাকে জোর করে কাজের লোক হিসেবে রেখেছিল। হয়তো সেজন্যই বাবা এতটা বাড়াবাড়ি করেছে। কিন্তু তারপরেও সাত বছরের ছোট্ট তুলসীকে সে খুব মিস করছিল। মেয়েটার হাসি, “নতুন মা” বলে ডাকা — সবকিছু তার মনে বারবার ভেসে উঠছিল।
মি. রহমান নেহার প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কী রে নেহা, খাচ্ছিস না কেন?”
নেহা তার কথা শুনতে পায়নি। পরে মিসেস জোহরা তার কাঁধে হাত রেখে আস্তে করে বললেন,
“খেয়ে নে মা।”
নেহা যেন ঘোর কাটিয়ে উঠল,
“হ্যাঁ… খাচ্ছি।”
হঠাৎ বাড়ির বাইরে জোরে ব্যান্ড বাজনা শুরু হল। ঢোল, করতাল আর সানাইয়ের আওয়াজ। আমি অবাক হয়ে বললাম,
“এখন কিসের আওয়াজ? কোনো ফাংশন নাকি?”
মি. রহমান ভুরু কুঁচকে বললেন,
“আজ তো কোনো অনুষ্ঠান নেই। কারা এই ব্যান্ড বাজনা নিয়ে এসেছে?”
কেউ কোনো উত্তর দিল না। আমরা সবাই বাইরে বেরিয়ে গেলাম।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নিরঞ্জন। তার পরনে একটা সস্তা সাদা শেরওয়ানি, যেটা তার কালো, রোদে-পোড়া চেহারার সাথে বেমানান লাগছিল। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, শরীরে রিকশা চালানোর কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। সে ব্যান্ডের তালে তালে নাচছিল। তার পাশে তুলসি, খুশিতে লাফাচ্ছে।
তুলসি নেহাকে দেখেই দৌড়ে এসে তার কোমর জড়িয়ে ধরল,
“নতুন মা! আমি এসে গেছি!”
নেহার চোখে পানি চলে এল। সে তুলসিকে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
মি. রহমান রেগে গিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
“এসব কী হচ্ছে? ছোটলোকের বাচ্চা এখানে কী করছিস তুই?”
নিরঞ্জন ব্যান্ডওয়ালাদের হাত তুলে থামিয়ে দিল। তারপর এগিয়ে গিয়ে মি. রহমানের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে গেল। মি. রহমান দ্রুত পা সরিয়ে নিলেন।
“এসব কী করছো তুমি?” মি. রহমানের গলায় ঘৃণা আর রাগ মিশে ছিল।
নিরঞ্জন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“কী করছি মানে? আপনি আমার স্ত্রীকে মেরেছেন, আমার মাকে মেরেছেন, আমাকে ট্রাক দিয়ে মারার চেষ্টা করেছেন। তবু আমি আপনাকে মাফ করে দিতাম — শুধু আপনার মেয়ের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু গতকাল আপনি গুন্ডা পাঠিয়ে আমার বাড়ি ভাঙলেন কেন? আমার একমাত্র আয়ের উৎস নতুন রিকশাটাও ভেঙে দিলেন?”
মি. রহমানের মুখ লাল হয়ে গেল।
“কী বলছিস তুই? তুই আমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে কথা বলার সাহস পাস কী করে?”
নিরঞ্জন তার পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে এগিয়ে দিল। কাগজটা একটা আইনি নোটিশের মতো। তাতে লেখা ছিল — যদি নিরঞ্জন অথবা তার মেয়ে তুলসীর কোনো ক্ষতি হয়, তার পুরো দায় মি. রহমানের উপর বর্তাবে। এছাড়া তার স্ত্রীর মৃত্যুর সময় মি. রহমানের গাড়ির প্রমাণ, ট্রাক ড্রাইভারের সাথে যোগসাজশের কথা — সব উল্লেখ ছিল।
মি. রহমান কাগজটা ছিনিয়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললেন।
“What do you want, bastard?”
নিরঞ্জন শান্ত গলায় বলল,
“ঘরে চলুন। ঘরে বসে কথা বলি।”
বাতাসে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। নেহা তুলসিকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, তার চোখে জল আর বিস্ময়। আমি পাশে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিলাম। নিরঞ্জনের চোখে আর কোনো ভয় ছিল না — শুধু দৃঢ়তা আর ক্ষতের গভীরতা।
আমরা সবাই বড় হলঘরের চেয়ার-টেবিলে বসলাম। বাতাস ভারী হয়ে আছে। নিরঞ্জন শান্তভাবে চারপাশে তাকিয়ে মেইডকে ডেকে বলল,
“আপা, তুলসিকে একটু ঘরটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আসুন। ও তো এত বড় বাড়ি দেখেনি।”
কথাটা বলল সে সরাসরি মি. রহমানের সামনে দাঁড়িয়ে। মি. রহমানের মুখ কালো হয়ে গেল। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি আর ঘৃণা। এই “ছোটলোক” লোকটা তার বাড়িতে বসে মেইডকে আদেশ দিচ্ছে — এটা তিনি একদম সহ্য করতে পারছিলেন না।
মেইড মিসেস জোহরার দিকে তাকাল। মিসেস জোহরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা নেড়ে অনুমতি দিলেন।
তুলসি নেহার কাছে দৌড়ে এসে তার গালে জোরে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“নতুন মা, আমি আসছি। বাড়িটা দেখে আসি!”
নেহা জোর করে হাসার চেষ্টা করল। তুলসি চলে যাওয়ার পর ঘরের পরিবেশ আরও থমথমে হয়ে উঠল।
মিসেস জোহরা ঠান্ডা গলায় বললেন,
“কী চাও? দ্রুত বলে বিদায় হও।”
নিরঞ্জন হালকা হেসে বলল,
“এত তাড়া কিসের? মাত্র তো শুরু।”
মি. রহমান ধমক দিয়ে বললেন,
“কাহিনী না করে সোজা বলো।”
নিরঞ্জন সোজা হয়ে বসে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“আগামী ছয় মাস আমি আর আমার মেয়ে তুলসী এই বাসায় থাকব। ছয় মাস পর আমি চলে যাব। আমাকে আপনার কোম্পানিতে জব দিবেন। আমি কোথায় যাব, কী করব — সেটা আপনারা খোঁজ নেবেন না।”
মি. রহমানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
“তোমার খোঁজ নেওয়ার জন্য আমরা এখানে বসিনি।”
নিরঞ্জন এবার আমার দিকে তাকিয়ে একটা চাপা হাসি দিল।
“আমার মেয়ে তুলসিকে আপনি আর নেহা মেমসাহেবের মেয়ে বানাবেন। ও আপনাদের নাম নিয়ে বড় হবে। এই বাসার উত্তরাধিকারী হবে।”
ঘরের সবাই চমকে উঠল। মি. রহমান প্রায় চিৎকার করে উঠলেন,
“কী বলতে চাস তুই? তোর নোংরা রক্ত আমাদের নামের সাথে মেশাবি?”
নিরঞ্জন হাসল। তার হাসিতে তিক্ততা আর প্রতিশোধের ছায়া।
“এত দ্রুত রাগলে চলবে না। আরও শুনুন। এই ছয় মাসের প্রতি মাসে একবার নেহা মেম আমার সাথে রাত কাটাবে। আর যদি এই ছয় মাসে সে আমার সন্তানের মা হয়, তাহলে সেই সন্তানও এই ঘরের নাম পাবে।”
আমি রেগে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলাম,
“কী বলতে চাস তুই?!”
নেহার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে শুরু করল। তার গলা কাঁপছিল,
“নিরঞ্জন… কী বলছ তুমি এসব?”
মি. রহমান আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি উঠে নিরঞ্জনের কলার চেপে ধরলেন,
“কুত্তার বাচ্চা!”
নিরঞ্জন একটুও ভয় না পেয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে উকিলকে ফোন করার অভিনয় করল।
“হ্যাঁ, স্যার… এখনই পুলিশে যান…”
মি. রহমানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। জেলের ভয় তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তিনি ধীরে ধীরে নিরঞ্জনের কলার ছেড়ে দিলেন।
নিরঞ্জন একটা প্রিন্ট করা কাগজ বের করে টেবিলের উপর রাখল।
“এটা চুক্তিপত্র। নেহা আর আমি স্বেচ্ছায় ছয় মাসের জন্য বিয়ে করব।”
আমি ক্ষিপ্ত হয়ে বললাম,
“নেহা আমার স্ত্রী। তুমি ভালো করেই জানো!”
নিরঞ্জন হা হা করে হেসে উঠল। তার হাসিতে একটা পাগলামি আর বিজয়ের সুর ছিল।
“হ্যাঁ, আমি জানি। আমরা সতীন হয়ে যাব। এই প্রথম বাংলাদেশে পুরুষ সতীন হবে। কেমন মজা, না?”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। নেহা ফ্যাকাশে মুখে চুপ করে বসে কাঁদছিল। মি. রহমানের হাত কাঁপছিল। আমার বুকের ভেতরে ঝড় চলছিল। আর নিরঞ্জন শান্তভাবে বসে ছিল — যেন সে এতদিনের সব অপমানের প্রতিশোধ একসাথে নিচ্ছে।
আজ রাতে আমি একা শুয়ে আছি। বিছানাটা অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা আর খালি লাগছে। নেহার জায়গাটা ফাঁকা। তার বালিশটা এখনও তার সুগন্ধে ভরা, কিন্তু সে নেই। সে থাকবেই বা কেন?
নেহা আজ বাধ্য হয়ে নিরঞ্জনের সেই কাগজে সই করেছে। তার হাত কাঁপছিল, চোখে জল ছিল, কিন্তু বাবার জেলের ভয় আর তুলসীর ভবিষ্যতের চাপে সে আর কোনো উপায় দেখেনি। এখন সে আইনত দুজনের স্ত্রী — আমারও, আর সেই রিকশাওয়ালা নিরঞ্জনেরও।
আজ এই মাসের প্রথম রাত। আজ রাতটা তাকে নিরঞ্জনের সাথে কাটাতে হবে। পরের পাঁচ মাসেও প্রতি মাসে একটা করে রাত — মোট ছয়টা রাত। ছয়টা রাত, যেখানে সে আমার স্ত্রী হয়েও অন্য একজনের বিছানায় শোবে।
আমি চোখ বন্ধ করে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাথার ভেতরে ঝড় চলছে। নেহা… যে সেক্সকে সবসময় অপরিচ্ছন্ন, নোংরা আর ঘৃণ্য মনে করত। যে আমার সাথে সম্পর্কের সময়ও চোখ বন্ধ করে, মুখ ফিরিয়ে থাকত। শারীরিক স্পর্শকে সে সহ্য করত কিন্তু উপভোগ করত না। আর আজ সেই নেহাকে বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে একটা অশিক্ষিত, ঘামে-ভেজা, কালো, রুক্ষ শরীরের কাছে। নিরঞ্জন — যাকে সে একসময় ঘৃণায় থুতু ফেলত।
**নেহা এখন কী ভাবছে?**
আমি কল্পনা করছিলাম তার মানসিক অবস্থা। সে নিরঞ্জনের ঘরে গিয়ে হয়তো শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরে আছে। তার শরীর কাঁপছে। মনে মনে বারবার বলছে — “এটা নোংরা… এটা অপরিচ্ছন্ন… আমি পারব না।” কিন্তু তারপরও তুলসীর মুখ, বাবার মুখ, আর সেই চুক্তির কাগজ তার সামনে ভেসে উঠছে। সে হয়তো চোখ বন্ধ করে নিজেকে বোঝাচ্ছে — “শুধু ছয়টা রাত… শুধু ছয়টা রাত…”
কিন্তু নিরঞ্জন কি তাকে ছাড়বে? সেই লোকটা তো তার শরীরের প্রতিটা অংশ চিনবে। তার রুক্ষ হাত নেহার নরম ত্বকে বুলিয়ে দেবে, তার ভারী নিঃশ্বাস নেহার গলায় লাগবে। নেহা যতই ঘৃণা করুক, তার শরীর হয়তো অজান্তেই সাড়া দেবে — যেমন আগেও কয়েকবার দিয়েছিল। এই চিন্তাটা আমার বুকের ভেতরটা জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। আমার স্ত্রী, যাকে আমি কখনো জোর করে স্পর্শ করিনি, আজ একটা অন্য পুরুষের কাছে বাধ্য হয়ে শুতে যাচ্ছে।
আমি পাশ ফিরে শুয়ে তার বালিশটা জড়িয়ে ধরলাম। নেহার গন্ধ এখনও লেগে আছে। কিন্তু আজ রাতে সেই গন্ধের সাথে নিরঞ্জনের ঘাম, তার পুরুষালি গন্ধ মিশে যাবে। নেহা কি কাঁদবে? নাকি চুপ করে সহ্য করবে? নাকি তার ভেতরের সেই লুকানো অংশটা আবার জেগে উঠবে, যেটা আগের কয়েকটা রাতে জেগে উঠেছিল?
আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। রাগ, অসহায়তা, ঈর্ষা আর একটা অদ্ভুত, অসুস্থ আকর্ষণ — সব মিলেমিশে আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল।
নেহা এখন কোথায়? নিরঞ্জনের ঘরে? নাকি এখনও বাথরুমে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছে? তার মনে কী চলছে — ঘৃণা? ভয়? নাকি একটা অস্বীকার করা আকুলতা?
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। আজ রাতটা আমার জন্য অনেক লম্বা হবে। আর নেহার জন্য… হয়তো আরও অনেক বেশি কষ্টের।
দুইদিন কেটে গেছে। সকালের নাস্তার টেবিলে আমি, নেহা, মি. রহমান আর মিসেস জোহরা বসে ছিলাম। নেহা চুপচাপ ছিল। সে তার বাবাকে কোনো প্রশ্ন করেনি, কিন্তু তার চোখে এখন আর আগের মতো শ্রদ্ধা ছিল না। সে জেনে গিয়েছিল তার বাবা কতটা নির্মম।
তবু তার মনে একটা দ্বন্দ্ব চলছিল — নিরঞ্জনও তো তাকে জোর করে কাজের লোক হিসেবে রেখেছিল। হয়তো সেজন্যই বাবা এতটা বাড়াবাড়ি করেছে। কিন্তু তারপরেও সাত বছরের ছোট্ট তুলসীকে সে খুব মিস করছিল। মেয়েটার হাসি, “নতুন মা” বলে ডাকা — সবকিছু তার মনে বারবার ভেসে উঠছিল।
মি. রহমান নেহার প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কী রে নেহা, খাচ্ছিস না কেন?”
নেহা তার কথা শুনতে পায়নি। পরে মিসেস জোহরা তার কাঁধে হাত রেখে আস্তে করে বললেন,
“খেয়ে নে মা।”
নেহা যেন ঘোর কাটিয়ে উঠল,
“হ্যাঁ… খাচ্ছি।”
হঠাৎ বাড়ির বাইরে জোরে ব্যান্ড বাজনা শুরু হল। ঢোল, করতাল আর সানাইয়ের আওয়াজ। আমি অবাক হয়ে বললাম,
“এখন কিসের আওয়াজ? কোনো ফাংশন নাকি?”
মি. রহমান ভুরু কুঁচকে বললেন,
“আজ তো কোনো অনুষ্ঠান নেই। কারা এই ব্যান্ড বাজনা নিয়ে এসেছে?”
কেউ কোনো উত্তর দিল না। আমরা সবাই বাইরে বেরিয়ে গেলাম।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নিরঞ্জন। তার পরনে একটা সস্তা সাদা শেরওয়ানি, যেটা তার কালো, রোদে-পোড়া চেহারার সাথে বেমানান লাগছিল। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, শরীরে রিকশা চালানোর কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। সে ব্যান্ডের তালে তালে নাচছিল। তার পাশে তুলসি, খুশিতে লাফাচ্ছে।
তুলসি নেহাকে দেখেই দৌড়ে এসে তার কোমর জড়িয়ে ধরল,
“নতুন মা! আমি এসে গেছি!”
নেহার চোখে পানি চলে এল। সে তুলসিকে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
মি. রহমান রেগে গিয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
“এসব কী হচ্ছে? ছোটলোকের বাচ্চা এখানে কী করছিস তুই?”
নিরঞ্জন ব্যান্ডওয়ালাদের হাত তুলে থামিয়ে দিল। তারপর এগিয়ে গিয়ে মি. রহমানের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে গেল। মি. রহমান দ্রুত পা সরিয়ে নিলেন।
“এসব কী করছো তুমি?” মি. রহমানের গলায় ঘৃণা আর রাগ মিশে ছিল।
নিরঞ্জন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“কী করছি মানে? আপনি আমার স্ত্রীকে মেরেছেন, আমার মাকে মেরেছেন, আমাকে ট্রাক দিয়ে মারার চেষ্টা করেছেন। তবু আমি আপনাকে মাফ করে দিতাম — শুধু আপনার মেয়ের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু গতকাল আপনি গুন্ডা পাঠিয়ে আমার বাড়ি ভাঙলেন কেন? আমার একমাত্র আয়ের উৎস নতুন রিকশাটাও ভেঙে দিলেন?”
মি. রহমানের মুখ লাল হয়ে গেল।
“কী বলছিস তুই? তুই আমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে এভাবে কথা বলার সাহস পাস কী করে?”
নিরঞ্জন তার পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে এগিয়ে দিল। কাগজটা একটা আইনি নোটিশের মতো। তাতে লেখা ছিল — যদি নিরঞ্জন অথবা তার মেয়ে তুলসীর কোনো ক্ষতি হয়, তার পুরো দায় মি. রহমানের উপর বর্তাবে। এছাড়া তার স্ত্রীর মৃত্যুর সময় মি. রহমানের গাড়ির প্রমাণ, ট্রাক ড্রাইভারের সাথে যোগসাজশের কথা — সব উল্লেখ ছিল।
মি. রহমান কাগজটা ছিনিয়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেললেন।
“What do you want, bastard?”
নিরঞ্জন শান্ত গলায় বলল,
“ঘরে চলুন। ঘরে বসে কথা বলি।”
বাতাসে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। নেহা তুলসিকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, তার চোখে জল আর বিস্ময়। আমি পাশে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিলাম। নিরঞ্জনের চোখে আর কোনো ভয় ছিল না — শুধু দৃঢ়তা আর ক্ষতের গভীরতা।
আমরা সবাই বড় হলঘরের চেয়ার-টেবিলে বসলাম। বাতাস ভারী হয়ে আছে। নিরঞ্জন শান্তভাবে চারপাশে তাকিয়ে মেইডকে ডেকে বলল,
“আপা, তুলসিকে একটু ঘরটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আসুন। ও তো এত বড় বাড়ি দেখেনি।”
কথাটা বলল সে সরাসরি মি. রহমানের সামনে দাঁড়িয়ে। মি. রহমানের মুখ কালো হয়ে গেল। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি আর ঘৃণা। এই “ছোটলোক” লোকটা তার বাড়িতে বসে মেইডকে আদেশ দিচ্ছে — এটা তিনি একদম সহ্য করতে পারছিলেন না।
মেইড মিসেস জোহরার দিকে তাকাল। মিসেস জোহরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা নেড়ে অনুমতি দিলেন।
তুলসি নেহার কাছে দৌড়ে এসে তার গালে জোরে একটা চুমু খেয়ে বলল,
“নতুন মা, আমি আসছি। বাড়িটা দেখে আসি!”
নেহা জোর করে হাসার চেষ্টা করল। তুলসি চলে যাওয়ার পর ঘরের পরিবেশ আরও থমথমে হয়ে উঠল।
মিসেস জোহরা ঠান্ডা গলায় বললেন,
“কী চাও? দ্রুত বলে বিদায় হও।”
নিরঞ্জন হালকা হেসে বলল,
“এত তাড়া কিসের? মাত্র তো শুরু।”
মি. রহমান ধমক দিয়ে বললেন,
“কাহিনী না করে সোজা বলো।”
নিরঞ্জন সোজা হয়ে বসে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“আগামী ছয় মাস আমি আর আমার মেয়ে তুলসী এই বাসায় থাকব। ছয় মাস পর আমি চলে যাব। আমাকে আপনার কোম্পানিতে জব দিবেন। আমি কোথায় যাব, কী করব — সেটা আপনারা খোঁজ নেবেন না।”
মি. রহমানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
“তোমার খোঁজ নেওয়ার জন্য আমরা এখানে বসিনি।”
নিরঞ্জন এবার আমার দিকে তাকিয়ে একটা চাপা হাসি দিল।
“আমার মেয়ে তুলসিকে আপনি আর নেহা মেমসাহেবের মেয়ে বানাবেন। ও আপনাদের নাম নিয়ে বড় হবে। এই বাসার উত্তরাধিকারী হবে।”
ঘরের সবাই চমকে উঠল। মি. রহমান প্রায় চিৎকার করে উঠলেন,
“কী বলতে চাস তুই? তোর নোংরা রক্ত আমাদের নামের সাথে মেশাবি?”
নিরঞ্জন হাসল। তার হাসিতে তিক্ততা আর প্রতিশোধের ছায়া।
“এত দ্রুত রাগলে চলবে না। আরও শুনুন। এই ছয় মাসের প্রতি মাসে একবার নেহা মেম আমার সাথে রাত কাটাবে। আর যদি এই ছয় মাসে সে আমার সন্তানের মা হয়, তাহলে সেই সন্তানও এই ঘরের নাম পাবে।”
আমি রেগে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলাম,
“কী বলতে চাস তুই?!”
নেহার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়তে শুরু করল। তার গলা কাঁপছিল,
“নিরঞ্জন… কী বলছ তুমি এসব?”
মি. রহমান আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি উঠে নিরঞ্জনের কলার চেপে ধরলেন,
“কুত্তার বাচ্চা!”
নিরঞ্জন একটুও ভয় না পেয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে উকিলকে ফোন করার অভিনয় করল।
“হ্যাঁ, স্যার… এখনই পুলিশে যান…”
মি. রহমানের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। জেলের ভয় তাঁর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। তিনি ধীরে ধীরে নিরঞ্জনের কলার ছেড়ে দিলেন।
নিরঞ্জন একটা প্রিন্ট করা কাগজ বের করে টেবিলের উপর রাখল।
“এটা চুক্তিপত্র। নেহা আর আমি স্বেচ্ছায় ছয় মাসের জন্য বিয়ে করব।”
আমি ক্ষিপ্ত হয়ে বললাম,
“নেহা আমার স্ত্রী। তুমি ভালো করেই জানো!”
নিরঞ্জন হা হা করে হেসে উঠল। তার হাসিতে একটা পাগলামি আর বিজয়ের সুর ছিল।
“হ্যাঁ, আমি জানি। আমরা সতীন হয়ে যাব। এই প্রথম বাংলাদেশে পুরুষ সতীন হবে। কেমন মজা, না?”
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এল। নেহা ফ্যাকাশে মুখে চুপ করে বসে কাঁদছিল। মি. রহমানের হাত কাঁপছিল। আমার বুকের ভেতরে ঝড় চলছিল। আর নিরঞ্জন শান্তভাবে বসে ছিল — যেন সে এতদিনের সব অপমানের প্রতিশোধ একসাথে নিচ্ছে।
আজ রাতে আমি একা শুয়ে আছি। বিছানাটা অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা আর খালি লাগছে। নেহার জায়গাটা ফাঁকা। তার বালিশটা এখনও তার সুগন্ধে ভরা, কিন্তু সে নেই। সে থাকবেই বা কেন?
নেহা আজ বাধ্য হয়ে নিরঞ্জনের সেই কাগজে সই করেছে। তার হাত কাঁপছিল, চোখে জল ছিল, কিন্তু বাবার জেলের ভয় আর তুলসীর ভবিষ্যতের চাপে সে আর কোনো উপায় দেখেনি। এখন সে আইনত দুজনের স্ত্রী — আমারও, আর সেই রিকশাওয়ালা নিরঞ্জনেরও।
আজ এই মাসের প্রথম রাত। আজ রাতটা তাকে নিরঞ্জনের সাথে কাটাতে হবে। পরের পাঁচ মাসেও প্রতি মাসে একটা করে রাত — মোট ছয়টা রাত। ছয়টা রাত, যেখানে সে আমার স্ত্রী হয়েও অন্য একজনের বিছানায় শোবে।
আমি চোখ বন্ধ করে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাথার ভেতরে ঝড় চলছে। নেহা… যে সেক্সকে সবসময় অপরিচ্ছন্ন, নোংরা আর ঘৃণ্য মনে করত। যে আমার সাথে সম্পর্কের সময়ও চোখ বন্ধ করে, মুখ ফিরিয়ে থাকত। শারীরিক স্পর্শকে সে সহ্য করত কিন্তু উপভোগ করত না। আর আজ সেই নেহাকে বাধ্য হয়ে যেতে হচ্ছে একটা অশিক্ষিত, ঘামে-ভেজা, কালো, রুক্ষ শরীরের কাছে। নিরঞ্জন — যাকে সে একসময় ঘৃণায় থুতু ফেলত।
**নেহা এখন কী ভাবছে?**
আমি কল্পনা করছিলাম তার মানসিক অবস্থা। সে নিরঞ্জনের ঘরে গিয়ে হয়তো শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরে আছে। তার শরীর কাঁপছে। মনে মনে বারবার বলছে — “এটা নোংরা… এটা অপরিচ্ছন্ন… আমি পারব না।” কিন্তু তারপরও তুলসীর মুখ, বাবার মুখ, আর সেই চুক্তির কাগজ তার সামনে ভেসে উঠছে। সে হয়তো চোখ বন্ধ করে নিজেকে বোঝাচ্ছে — “শুধু ছয়টা রাত… শুধু ছয়টা রাত…”
কিন্তু নিরঞ্জন কি তাকে ছাড়বে? সেই লোকটা তো তার শরীরের প্রতিটা অংশ চিনবে। তার রুক্ষ হাত নেহার নরম ত্বকে বুলিয়ে দেবে, তার ভারী নিঃশ্বাস নেহার গলায় লাগবে। নেহা যতই ঘৃণা করুক, তার শরীর হয়তো অজান্তেই সাড়া দেবে — যেমন আগেও কয়েকবার দিয়েছিল। এই চিন্তাটা আমার বুকের ভেতরটা জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। আমার স্ত্রী, যাকে আমি কখনো জোর করে স্পর্শ করিনি, আজ একটা অন্য পুরুষের কাছে বাধ্য হয়ে শুতে যাচ্ছে।
আমি পাশ ফিরে শুয়ে তার বালিশটা জড়িয়ে ধরলাম। নেহার গন্ধ এখনও লেগে আছে। কিন্তু আজ রাতে সেই গন্ধের সাথে নিরঞ্জনের ঘাম, তার পুরুষালি গন্ধ মিশে যাবে। নেহা কি কাঁদবে? নাকি চুপ করে সহ্য করবে? নাকি তার ভেতরের সেই লুকানো অংশটা আবার জেগে উঠবে, যেটা আগের কয়েকটা রাতে জেগে উঠেছিল?
আমার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। রাগ, অসহায়তা, ঈর্ষা আর একটা অদ্ভুত, অসুস্থ আকর্ষণ — সব মিলেমিশে আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল।
নেহা এখন কোথায়? নিরঞ্জনের ঘরে? নাকি এখনও বাথরুমে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করছে? তার মনে কী চলছে — ঘৃণা? ভয়? নাকি একটা অস্বীকার করা আকুলতা?
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। আজ রাতটা আমার জন্য অনেক লম্বা হবে। আর নেহার জন্য… হয়তো আরও অনেক বেশি কষ্টের।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)