Posts: 13
Threads: 1
Likes Received: 52 in 13 posts
Likes Given: 1
Joined: Jun 2026
Reputation:
5
গল্প: আমার স্ত্রী নেহা
পর্ব ১: সূচনা
আমি সৈকত। বয়স ছাব্বিশ।
আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, ২০ জুন ২০২৫ সালে, আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির সাথে আমি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলাম। সেই দিনটাকে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন হিসেবে মনে রাখার কথা ছিল। কিন্তু আজ, এই এক বছর পর, সেই দিনটাকে ঘিরে আমার মনে শুধুই এক অদ্ভুত খালি ভাব। কোনো উৎসব নেই, কোনো আনন্দ নেই। শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে—কেন এমন হলো?
চলুন, আপনাদের সবকিছু খুলে বলি।
আমার জন্ম বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা বাগেরহাটের এক ছোট্ট গ্রাম ডেমায়। গ্রামটা এতটাই নিরীহ যে, মানচিত্রে খুঁজে পাওয়াও কষ্টকর। আট বছর আগে আমি সেই গ্রাম ছেড়ে এসেছিলাম। বাবা দুটো গরু পালতেন, মা ছিলেন সাধারণ গৃহিণী। আর ছিল আমার ছোট বোন। আমাদের সংসার ছিল অত্যন্ত সাধারণ, প্রায় দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি। কিন্তু আমি ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ছিলাম একেবারে মগ্ন। বই ছিল আমার একমাত্র বন্ধু আর স্বপ্ন ছিল আমার একমাত্র সম্বল।
স্থানীয় কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ২০১৮ সালে আমি ঢাকায় আসি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েও ইতিহাস বিভাগে পড়তে হবে বলে ভর্তি হইনি। বরং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ভর্তি হই। সেখানেই প্রথমবার দেখা হয়েছিল নেহার সাথে।
নেহা।
শুধু নামটা উচ্চারণ করলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। সে ছিল আমাদের বিভাগের সবচেয়ে আলোচিত মেয়ে। তার রূপের কথা বলে শেষ করা যাবে না। লম্বা চুল, তীক্ষ্ণ চোখ, আর একটা স্বাভাবিক অহংকার—যা তাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলত। ভার্সিটির প্রায় সব ছেলেই তার পেছনে ঘুরত। এমনকি একজন মন্ত্রীর ছেলেও তাকে প্রপোজ করেছিল। কিন্তু নেহা তাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেই ঘটনা পুরো ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়েছিল।
আমি প্রথম বর্ষে তার থেকে অনেক দূরে থাকতাম। সে যেন অন্য এক জগতের মানুষ। আমি গ্রামের ছেলে, সে শহরের। আমি সাধারণ, সে অসাধারণ। তাই দূর থেকেই দেখতাম। শুধু দেখতাম।
কিন্তু পরীক্ষার আগে একদিন সবকিছু বদলে গেল। সে আমার কাছে এসে অনুরোধ করল তার একটা অ্যাসাইনমেন্ট করে দিতে। সেই মুহূর্ত থেকে শুরু হয়েছিল আমাদের আলাপ। আস্তে আস্তে কথা বাড়ল, সময় বাড়ল, বিশ্বাস বাড়ল। আমি দেখলাম, তার বাইরের অহংকারের আড়ালে একটা নরম, দয়ালু, আর সংবেদনশীল মেয়ে লুকিয়ে আছে। যে মেয়েটা শুধু আমার সাথেই নিজেকে খুলে দেখাত।
তারপর ধীরে ধীরে সেই পরিচয় প্রেমে রূপ নিল। প্রেম থেকে বিয়ে। আর বিয়ে থেকে… আজকের এই জটিল বাস্তবতায়।
বিয়ের পরপরই নেহার বাবা, মি. রহমান, আমাকে তাঁদের বড় বাড়িতে ঘরজামাই হিসেবে রাখার প্রস্তাব দিলেন। সেই প্রস্তাবটা শুনে আমার আত্মসম্মানে তীব্র আঘাত লেগেছিল। আমি স্পষ্টভাবে না করে দিয়েছিলাম। আমি গ্রামের ছেলে—নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সংসার চালাতে চেয়েছিলাম, কারও দয়ায় নয়।
কিন্তু মি. রহমান মানুষটি ছিলেন চতুর ও বাস্তববাদী। তিনি আমার বাবাকে তিনটি উন্নত জাতের গরু উপহার দিলেন এবং আমার ছোট বোনের বিয়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে তাকে সুন্দরভাবে বিয়ে দিয়ে দিলেন। গ্রামের সেই সাধারণ সংসারে এই উপহারগুলো ছিল বিশাল। বাবা-মা খুশিতে আত্মহারা হয়ে আমাকে চাপ দিতে শুরু করলেন। “তুই না করলে আমরা সব হারাবো,” “মেয়েটার ভবিষ্যৎ নষ্ট করবি?”—এমন সব কথায় আমি শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে রাজি হয়ে গেলাম।
এভাবেই আমি নেহার বড় বাড়িতে ঘরজামাই হয়ে গেলাম।
বিয়ের পর আস্তে আস্তে আমি নেহার আসল চেহারাটা দেখতে পেলাম। বাইরের সেই মোহময়ী, দয়ালু মেয়েটি আর ছিল না। নেহা অসম্ভব পরিষ্কারপরায়ণ—যাকে বলে অতিরিক্ত ফুঁসকা। ঘরের কোনো টুকিটাকি কাজই সে করতে পারত না। রান্না, ঘর গোছানো, এমনকি নিজের কাপড় গুছিয়ে রাখা—কোনোটাই তার অভ্যাসে ছিল না। আমি কখনো তাকে বলতেও পারিনি, “এক কাপ চা বানিয়ে দাও।” লজ্জায়, অস্বস্তিতে মুখ বন্ধ করে রাখতাম। শেষে বাড়ির মেইডকেই ডাকতে হতো।
আরও গভীর ক্ষত ছিল অন্তরঙ্গ জীবনে।
বিয়ের পর আমরা খুব কমবারই শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছি। নেহার এসবে কোনো আগ্রহই ছিল না। সে সবকিছুকে “অপরিষ্কার” মনে করত। একদিন সামান্য গালে চুমু খেতে গিয়েছিলাম, সে তাৎক্ষণিকভাবে বাথরুমে গিয়ে বারবার সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলেছিল। সেই দৃশ্যটা আজও আমার মনে গেঁথে আছে। আমি চুপ করে সহ্য করতাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা তীব্র অসুখী, অপূর্ণতার অনুভূতি জমতে থাকত। এই বিয়ে কি শুধু নামকাওয়াস্তে?
নেহা বাচ্চাও নিতে চায় না। একেবারেই না।
বাচ্চা জন্ম দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটাকে সে ঘৃণার চোখে দেখে। এমনকি কথাটা উঠলেই তার মুখে একটা তীব্র অস্বস্তি ফুটে ওঠে। একদিন রাতে, যখন আমি ভবিষ্যতের কথা তুলেছিলাম, সে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলেছিল,
“কয়েক বছর পর, তুমি আর আমি দুই বছরের জন্য সুইজারল্যান্ড চলে যাব। সেখানে আমরা একটা বাচ্চা অ্যাডপ্ট করব। ওখানকার অনাথাশ্রমে নাকি অনেক বাঙালি বাচ্চা আছে। কেউ সন্দেহ করবে না। সবাই ভাববে আমরা বিদেশে গিয়ে বাচ্চা নিয়েছি। এটাই সবচেয়ে পরিষ্কার উপায়।”
সে কথা বলার সময় তার চোখে কোনো মাতৃত্বের স্বপ্ন ছিল না। শুধু একটা পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন সমাধান। আমি চুপ করে শুনেছিলাম। ভেতরে ভেতরে একটা ঠান্ডা শূন্যতা ছড়িয়ে পড়ছিল। যে মেয়েকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম, সে যেন ক্রমশ আরও দূরে সরে যাচ্ছে। আমার শরীর, আমার আকাঙ্ক্ষা, আমার সন্তানের স্বপ্ন—সবকিছুই তার কাছে “অপরিষ্কার” বলে মনে হয়।
ইতিমধ্যে আমি একটা বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো চাকরি পেয়ে গিয়েছিলাম। নিজের যোগ্যতায়। কিন্তু মি. রহমান চাইতেন আমি তাঁর নিজের কোম্পানিতে যোগ দিই। যাতে ভবিষ্যতে যখন নেহার হাতে বিজনেস হ্যান্ডওভার করবেন, তখন আমি তার পাশে থেকে সবকিছু সামলাতে পারি। আমার কোনো উপায় ছিল না। চারপাশ থেকে চাপ, পরিবারের প্রত্যাশা, আর নেহার নীরব উদাসীনতা—সব মিলিয়ে আমাকে মুখ বন্ধ করে সবকিছু মেনে নিতে হয়েছে।
ভেতরে ভেতরে আমি প্রতিদিন একটু একটু করে মরছিলাম। কিন্তু বাইরে হাসিমুখে সব সামলে চলছিলাম।
Posts: 333
Threads: 1
Likes Received: 255 in 153 posts
Likes Given: 472
Joined: May 2019
Reputation:
15
সুন্দর শুরু.....
চলিয়ে যান...
•
Posts: 14
Threads: 1
Likes Received: 6 in 5 posts
Likes Given: 2
Joined: Jun 2026
Reputation:
0
@Mohshinkhan01 cuckold husband
•
Posts: 13
Threads: 1
Likes Received: 52 in 13 posts
Likes Given: 1
Joined: Jun 2026
Reputation:
5
পর্ব ২: অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা
আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী। এক বছর।
আমি একা বসে আছি শোয়ার ঘরের বিছানায়। জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকার আকাশ দেখছি। আজকের এই দিনটাকে ঘিরে কোনো মোমবাতি, কোনো ফুল, কোনো হাসি নেই। নেহা সারাদিন আমার সাথে একবারও ভালো করে কথা বলেনি। সকালে শুধু একটা শুষ্ক “হ্যাপি অ্যানিভার্সারি” বলে দিয়েছিল, যেন কোনো ফর্মালিটি সেরে ফেলা। তারপর থেকে সে তার মায়ের সাথে ড্রয়িং রুমে বসে আছে। নতুন ড্রেসের ক্যাটালগ দেখছে, কোনটা কিনবে, কোনটা তার গায়ে মানাবে—এসব নিয়ে মগ্ন। আমি যেন এই বাড়ির একজন অতিথি মাত্র, কোনো স্বামী নই।
বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠছিল। আর সহ্য করতে না পেরে আমি উঠে পড়লাম। ধীর পায়ে ড্রয়িং রুমের দিকে গেলাম।
সেখানে দৃশ্যটা দেখে আমার হৃদয় আরও খানিকটা ভেঙে গেল। নেহা আর তার মা জোহরা বেগম দুজন মিলে সোফায় বসে টেবিলের উপর ছড়ানো নানা রঙের ড্রেসের ছবি দেখছেন। হাসি-ঠাট্টা, মেয়েলি আলোচনায় ঘর মুখরিত। আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলাম। কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাল না।
ঠিক তখনই—
**দিং-দং! দিং-দং! দিং-দং!**
কলিং বেলটা হঠাৎ জোরে জোরে বেজে উঠল। একবার নয়, পরপর। যেন কেউ অধৈর্য হয়ে, জরুরি কোনো খবর নিয়ে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে।
আমার ভুরু কুঁচকে গেল। এখন শ্বশুর সাহেবের আসার কথা ছিল, কিন্তু তিনি কখনো এতটা অধৈর্য হন না। তাঁর ড্রাইভারও আজ ছুটিতে। যদি থাকতোও তবুও ত ওর সাহস হয় না, এভাবে কলিং বেল বাজাবে। তাহলে এমন অভদ্রের মতো বেল বাজাচ্ছে কে?
জোহরা বেগম একটু বিরক্ত হয়ে মেইডকে ডাকলেন,
“পপি! পপি, শোন! গেইটটা খুলে দেখ তো কে এমন করে বেল বাজাচ্ছে? কান ঝালাপালা হয়ে গেল!”
পপি দৌড়ে গেল। কিন্তু বেল বাজতেই থাকল—**দিং-দং! দিং-দং!** প্রতিটা শব্দ যেন বুকের ভেতর ধাক্কা মারছে।
অবশেষে গেইট খুলতেই বাইরের আলোয় দেখা গেল—শ্বশুর মি. রহমান। কিন্তু কী অবস্থা তাঁর! মুখ ফ্যাকাশে, চুল এলোমেলো, শার্টের কলার খোলা, হাঁপাচ্ছেন জোরে জোরে। যেন অনেক দূর থেকে দৌড়ে এসেছেন। চোখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক।
জোহরা বেগম তাঁকে দেখেই ছুটে গেলেন।
“ওগো! কী হয়েছে তোমার? এরকম অবস্থা কেন? কথা বলো!”
মি. রহমান কিছু বলছেন না। শুধু হাঁপাচ্ছেন। দুই হাতে হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘামে ভেজা কপাল।
নেহা উঠে দাঁড়াল। তার মুখেও উদ্বেগ ফুটে উঠেছে। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বাবার কাঁধে হাত রাখল।
“বাবা! কী হয়েছে? বলো কিছু! কথা বলো না কেন? কোনো অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে? অফিসে কিছু?”
মি. রহমান কোনোমতে মাথা তুললেন। তাঁর চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। গলা শুকিয়ে কাঁপছে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে তিনি ফিসফিস করে বললেন,
“নেহা… সৈকত… সবাই… ভেতরে চলো।
এখনই।”
তাঁর কণ্ঠস্বরে এমন একটা ভয় আর জরুরি ভাব ছিল যে, পুরো ড্রয়িং রুমের বাতাস যেন ভারী হয়ে গেল। আমি দরজার কাছ থেকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। হৃদয়ের ধুকপুকানি বেড়ে গেছে।
কী হয়েছে?
কোনো খারাপ খবর?
নাকি এই বাড়ির জীবন আরও একটা বড় ঝড়ের মুখে পড়তে চলেছে?
পপি দৌড়ে এসে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে দাঁড়াল। তার হাত কাঁপছিল।
“সাহেবকে পানি দেন, ম্যাডাম।”
জোহরা বেগম কাঁপা হাতে গ্লাসটা নিয়ে মি. রহমানের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। তিনি অর্ধেক পানি এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেললেন। তারপর বাকিটা জোহরা বেগমের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়লেন সোফায়।
ঘরের ভেতরের বাতাস যেন জমে গিয়েছিল। কেউ কোনো কথা বলছিল না। শুধু মি. রহমানের জোরে জোরে হাঁপানোর শব্দ আর ঘড়ির টিকটিক।
অবশেষে তিনি আস্তে আস্তে মুখ খুললেন। গলা শুকনো, ভাঙা।
“আমি… অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি।”
জোহরা বেগমের চোখ বড় হয়ে গেল।
“ভুল? কী ভুল? কী হয়েছে বলো তো!”
নেহা বাবার পাশে বসে পড়ল। তার গলায় উদ্বেগ আর অধৈর্য মিশে আছে।
“বাবা, খুলে বলো। কিছু লুকিয়ে রেখ না।”
মি. রহমান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন। তারপর কাঁপা গলায় বললেন,
“গাড়ি চালাচ্ছিলাম… রাস্তা প্রায় ফাঁকাই ছিল। হঠাৎ… সামনে একটা মহিলা এসে পড়ল। আমি ব্রেক চাপতে চেয়েছিলাম, কিন্তু… সময় পাইনি।”
সবাই চমকে উঠল।
আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেছে।
“কী বলছেন বাবা? ওই মহিলা কোথায়? সে কেমন আছে?”
মি. রহমান মাথা নিচু করে রইলেন। ঘামে ভেজা কপাল, চোখ দুটো লাল।
“আমি… জানি না। আমি ভয়ে গাড়ি থামাইনি। সোজা বাড়ির দিকে চলে এসেছি।”
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল। শুধু জোহরা বেগমের ফিসফিস করে কান্নার মতো শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নেহার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার চোখে ভয়, বিস্ময় আর কিছুটা রাগ মিশে আছে।
আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। এটা শুধু একটা “ভুল” নয়। এটা একটা দুর্ঘটনা—যার পরিণতি ভয়ংকর হতে পারে। আমি নেহার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“নেহা, চলো। আমরা এখনই ওখানে যাই। দেখি কী অবস্থা। হয়তো এখনও কিছু করা যাবে।”
নেহা কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর তার মায়ের কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
“আম্মা, আমরা বাইরে যাচ্ছি। তুমি বাবার সাথে থাকো। চিন্তা কোরো না।”
জোহরা বেগম শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তাঁর চোখে পানি জমে আছে।
আমরা দুজন দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। বাইরের রাতের অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। গাড়িতে উঠতে উঠতে আমার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
এই “ভুল”-এর দাম কতটা হতে পারে?
আর এই ঘটনার পর আমাদের জীবন কোন দিকে মোড় নেবে?
রাতের অন্ধকার রাস্তায় নেহা আর আমি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কোনো কথা বলছিলাম না দুজনেই। শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ আর আমাদের দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস। নেহার মুখ ফ্যাকাশে, হাত দুটো শক্ত করে মুঠো করা। আমার মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—যদি মহিলা মারা যায়, তাহলে কী হবে?
ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমরা অনেক কষ্টে খবর নিলাম। স্থানীয় লোকজন ভয়ে কথা বলতে চাইছিল না। শেষে একজন দোকানদার ফিসফিস করে বলল, “মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। অবস্থা ভালো না।”
আমরা সোজা হাসপাতালের দিকে ছুটলাম।
হাসপাতালের বাইরের মর্গের সামনে পৌঁছাতেই দৃশ্যটা চোখে পড়ল। একটা সাদা চাদরে ঢাকা লাশ শুইয়ে রাখা হয়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে একজন লম্বা, অসম্ভব রোগা মানুষ। শরীরে যেন মাংস বলতে কিছুই নেই—শুধু হাড় আর চামড়া। চোখ দুটো শূন্য, চেহারায় গভীর শোক আর হতবিহ্বলতা। তার পাশে ছোট্ট একটা মেয়ে—বয়স সাত কি আট। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, মায়ের চাদর ধরে টানছে।
আমার পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেল।
এই সেই মহিলা। যাকে বাবা অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন।
আমি নেহার দিকে তাকালাম। তার চোখেও একই ভয়। আমি চুপচাপ ভাবলাম—লোকটাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে কোনো কেস করার সামর্থ্য রাখে। হয়তো বাবাকে চিনতেও পারবে না। এখান থেকে চুপচাপ চলে যাওয়াই ভালো।
আমরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসছিলাম, ঠিক তখনই একজন ডাক্তার এসে লোকটার কাঁধে হাত রাখলেন।
“চিন্তা করো না, ভাই। আমি পুলিশে ফোন দিয়েছি। তারা আসছে।” ডাক্তার গম্ভীর গলায় বললেন, “তুমি কি লোকটাকে চিনতে পারবে? গাড়ির নম্বর দেখেছিলে?”
ছোট মেয়েটা কান্না থামিয়ে মুখ তুলল। তার চোখে অদ্ভুত একটা দৃঢ়তা।
“আমি জানি, ডাক্তার কাকু। আমার গাড়ির নাম্বার মনে আছে।”
ডাক্তার মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“তাই নাকি? খুব ভালো। পুলিশ এলে সব বলবে, ঠিক আছে? তোমার মায়ের জন্য।”
মেয়েটা ছোট্ট মাথা নেড়ে বলল, “আচ্ছা।”
এই কথাগুলো শুনে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। নেহার দিকে তাকালাম। সে-ও আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমাদের চোখে চোখ পড়তেই একটা নীরব বোঝাপড়া হলো।
হাসপাতালের বাইরের সেই নিস্তব্ধ করিডরে দাঁড়িয়ে আমরা দুজন একে অপরের দিকে তাকালাম। নেহার চোখে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত। আমার বুকের ভেতরটা তখনও ধুকপুক করছিল। আমি একজন নার্সকে ডেকে চুপিসাড়ে কয়েকটা টাকা হাতে গুঁজে দিয়ে বললাম, “ওই ভদ্রলোককে একটু একান্তে ডেকে দিতে পারবেন? জরুরি দরকার।”
নার্সটি কিছুক্ষণ আমাদের দেখে নিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর লোকটাকে নিয়ে ফিরে এল। আমরা তাকে হাসপাতালের পেছনের একটা নির্জন বারান্দায় নিয়ে গেলাম। রাতের ঠান্ডা বাতাসে তার রোগা শরীরটা আরও ভঙ্গুর লাগছিল।
কাছ থেকে দেখে মনে হচ্ছিল তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, কিন্তু দারিদ্র্য আর দুঃখের ভারে তাকে পঞ্চাশের ওপরে মনে হচ্ছিল। চোখের নিচে কালি, গাল বসা, চুলে পাক ধরেছে।
আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম,
“আপনার নাম কী?”
লোকটি আমাদের দুজনকে সন্দেহের চোখে দেখে ধীরে ধীরে বলল,
“নিরঞ্জন। আপনারা কারা? আমার সাথে কী দরকার?”
আমি এক মুহূর্ত থেমে, যতটা সম্ভব নরম গলায় বললাম,
“দেখুন নিরঞ্জন দাদা, আপনার স্ত্রী যে চলে গেছেন, তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমরা জানি এটা আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। কিন্তু আপনার আর আপনার মেয়ের ভবিষ্যৎ যদি সুন্দর করতে চান, তাহলে আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারি।”
নিরঞ্জনের চোখ সরু হয়ে গেল। সে কিছু বুঝতে পারছিল না।
“কী বলতে চাইছেন আপনি?”
এবার নেহা আর অপেক্ষা করল না। সে সরাসরি, ঠান্ডা ও দৃঢ় গলায় বলে উঠল,
“আপনি ভালোই বুঝতে পারছেন। আপনি কোনো কেস করতে পারবেন না। পুলিশি ঝামেলা, মামলা, কোর্ট—এসব আপনার মতো মানুষের জন্য শুধু কষ্ট বাড়াবে। আমরা দেখে নেব আপনার কী কী লাগবে। টাকা, চাকরি, মেয়ের পড়াশোনা—যা যা দরকার।”
নিরঞ্জন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে প্রথমে বিস্ময়, তারপর তীব্র ঘৃণা ফুটে উঠল।
“মানে… আপনারা আমাকে কিনতে এসেছেন? আমার স্ত্রীর লাশের দাম দিয়ে আমাকে চুপ করিয়ে দিতে চান?”
নেহা কোনো ইতস্তত না করে বলল,
“হ্যাঁ, ঠিক তাই বলেছেন।”
বাতাস যেন জমে গিয়েছিল। নিরঞ্জনের রোগা শরীরটা কাঁপছিল—রাগে, না দুঃখে, বোঝা যাচ্ছিল না।
ঠিক তখনই দূর থেকে পুলিশের সাইরেনের শব্দ ভেসে এল। নিরঞ্জন আমাদের দিকে আরেকবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কোনো কথা না বলে চলে গেল মর্গের দিকে।
আমরা দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। নেহার নখ আমার হাতের তালুতে বিঁধছিল। পুলিশ এসে নিরঞ্জনের সাথে কথা বলতে শুরু করল। আমরা একটু দূরে থেকে সব শুনছিলাম। প্রতিটা মুহূর্ত যেন একেকটা যুগ।
নিরঞ্জন প্রথমে চুপচাপ ছিল। পুলিশ যখন জিজ্ঞাসা করল গাড়ির নম্বর বা লোকটাকে চেনে কি না, তখন সে তার মেয়ের দিকে তাকাল। ছোট মেয়েটা মুখ খুলতে যাচ্ছিল—“আমি চিনি কাকু, সাদা গাড়ি…”—ঠিক তখনই নিরঞ্জন তার মেয়ের হাতে চিমটি কেটে দিল। মেয়েটা কেঁদে উঠলেও চুপ করে গেল।
নিরঞ্জন শান্ত গলায় পুলিশকে বলল,
“অন্ধকারে ভালো করে দেখতে পাইনি স্যার। গাড়ির নম্বরও মনে নেই। আর মনে হয় না এটা উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ছিল।”
পুলিশ কিছুক্ষণ জেরা করলেও নিরঞ্জন আর কিছু বলল না।
আমরা দূর থেকে সব দেখছিলাম। নেহার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। আমার কপালে ঘাম জমেছে।
এই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম—একটা ভয়ংকর খেলা শুরু হয়ে গেছে। নিরঞ্জন আজ চুপ করেছে, কিন্তু এই চুপ করা কতদিন চলবে? আর তার চোখের সেই ঘৃণার দৃষ্টিটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছে।
কিছুক্ষণ পর, হাসপাতালের পেছনের সেই অন্ধকার বারান্দায় নিরঞ্জন আবার ফিরে এল। তার চোখে এক অদ্ভুত মিশ্রণ—শোক, ঘৃণা আর একটা হিসাবি ঠান্ডা ভাব। আমরা দুজন তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাতাস ভারী হয়ে আছে।
আমি প্রথমে কথা বললাম, গলা যথাসম্ভব নরম করে।
“ধন্যবাদ দাদা। আপনি আমাদের অনেক উপকার করলেন।”
নেহা আমাকে থামিয়ে দিয়ে সরাসরি এগিয়ে গেল। তার কণ্ঠস্বরে একটা অস্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস।
“কী লাগবে আপনার? চিন্তা করবেন না। যা যা দরকার, নির্দ্বিধায় বলে ফেলুন। টাকা, জমি, চাকরি—আমরা যতটা সম্ভব সাহায্য করব।”
নিরঞ্জন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে আমাদের দেখল। তার রোগা শরীরটা রাতের আলোয় আরও ভঙ্গুর দেখাচ্ছিল। তারপর ধীরে ধীরে, ভাঙা গলায় বলতে শুরু করল,
“আমি অত্যন্ত গরিব মানুষ। রিকশা চালাই। সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কোনোমতে দুটো পয়সা জোগাড় করি। আমার একমাত্র বউ… সে-ই ছিল সংসারের সব। ঘরদোর দেখাশোনা, রান্না, আমার মেয়ের লেখাপড়া, আমার বৃদ্ধ মায়ের সেবা—সব সে করত।”
সে একটু থেমে গেল। তার চোখ দুটো জ্বলছে। তারপর হঠাৎ করে সোজা নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি চাই… আমার স্ত্রীর জায়গায় আপনি সব কাজ করবেন। আমার ঘরের দেখাশোনা করবেন। রান্না করবেন। আমার মেয়ে আর মায়ের সেবা করবেন।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো জায়গাটা নীরব হয়ে গেল।
নেহার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। তার শরীর কাঁপছিল রাগে। পরের মুহূর্তেই সে সামনে এগিয়ে গিয়ে নিরঞ্জনের গালে জোরে একটা চড় মেরে বসল।
**চড়!**
“কী বলতে চাস তুই? অসভ্য কোথাকার! তোর সাহস কত বড়!”
আমি চমকে উঠেলাম আর নিরঞ্জনকে বললাম
“তোমার খেয়াল আছে তুমি কী বলছ?”
নিরঞ্জন গালে হাত দিয়ে পিছিয়ে গেল। তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই, শুধু একটা ঠান্ডা, প্রতিশোধস্পৃহা ভাব। গাল লাল হয়ে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে বলল,
“যদি তা না হয়… তাহলে আগামীকাল সকাল দশটায় আমি পুলিশের কাছে যাব। সব বলে দেব। আপনারা যদি রাজি থাকেন, তাহলে আগামীকাল দশটায় বস্তির শেষ কোনায় আসবেন। যদি মানেন।”
কথা শেষ করে নিরঞ্জন আর একবারও পেছন ফিরে তাকাল না। সে ধীর পায়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। তার রোগা শরীরটা যেন ছায়ার মতো হারিয়ে গেল।
আমি আর নেহা সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। নেহার হাত এখনও কাঁপছে। আমার মাথার ভেতরটা ঘুরছে। এই লোকটা সত্যিই কী চায়? প্রতিশোধ? নাকি শুধুই একটা অসম্ভব দাবি করে আমাদের আরও গভীর গর্তে ঠেলে দিতে চায়?
রাতটা আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। আর আমাদের সামনে একটা ভয়ংকর সিদ্ধান্তের দরজা খুলে গেছে।
Posts: 13
Threads: 1
Likes Received: 52 in 13 posts
Likes Given: 1
Joined: Jun 2026
Reputation:
5
**পর্ব ৩: নিরুপায়**
রাত তখন একটা বাজে। শহরের রাস্তা প্রায় ফাঁকা। আমরা দুজন কথা বলতে বলতে বাড়িতে ফিরলাম। গাড়ি থেকে নামতেই জোহরা বেগম নিজে গেইট খুলে দিলেন। তাঁর চোখে ঘুমের চিহ্ন নেই—শুধু উদ্বেগ আর অস্থিরতা।
আমি ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞাসা করলাম,
“বাবা কোথায়?”
জোহরা বেগম ফিসফিস করে বললেন,
“এই তো একটু আগে ঘুমিয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে জানতে চাইছিলেন তোমরা কী করলে, কী অবস্থা। আমি কিছু বলতে পারিনি।”
তিনি আবার উৎকণ্ঠিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
“কী হয়েছে ওখানে? বলো তো সৈকত!”
আমি কিছু বলতে পারলাম না। গলা আটকে গিয়েছিল। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
নেহা আর সহ্য করতে পারল না। তার গলায় রাগ আর ঘৃণা মিশে উঠল।
“ও কেস করবে না, আম্মা। ও চায় আমি ওর বাসায় কাজ করি। রান্না করব, ঘরদোর দেখব, ওর মেয়ে আর বুড়ি মায়ের সেবা করব। বাস্টার্ডটা! আমি ওকে খুন করে ফেলব!”
জোহরা বেগমের চোখ কপালে উঠে গেল। তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়লেন,
“কী সাহস ওই ছোটলোকটার! আমার মেয়ে—যে কিনা এই বাড়ির একমাত্র আদরের সন্তান—তাকে কিনা ছোটলোকটার বাড়িতে কাজের লোক বানাতে চায়? এত বড় স্পর্ধা!”
ঠিক তখনই ড্রয়িং রুমের দরজায় শ্বশুর মি. রহমান এসে দাঁড়ালেন। ঘুম ভেঙে উঠে এসেছেন। চোখ লাল, মুখ ফ্যাকাশে। তিনি কাঁপা গলায় বললেন,
“তা না কী হলে করবে নেহা? উপায় কী?”
নেহা আর আমি চুপ করে রইলাম। ঘরের ভেতরে একটা ভারী নীরবতা নেমে এল।
আমি শেষ চেষ্টা করলাম পরিস্থিতি শান্ত করতে।
“বাবা, আপনি ঘুমাতে যান। চিন্তা করবেন না। আমরা সামলে নেব।”
কিন্তু মি. রহমান আর শান্ত হলেন না। তিনি নেহার কাছে এগিয়ে এসে জোর দিয়ে বললেন,
“নেহা, বল সব। লুকাস না।”
নেহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কঠিন গলায় বলল,
“ও কেস করবে বাবা। তার স্ত্রীর হত্যার দায়ে। পুলিশে সব বলবে।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো বাড়িটা যেন থেমে গেল।
পরের দৃশ্যটা আমি কখনো ভুলব না। মি. রহমান—যিনি শহরের একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যাঁর সামনে অনেকে মাথা নত করে—তিনি হঠাৎ নেহার পায়ে আছড়ে পড়লেন। দুই হাত দিয়ে নেহার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“নেহা… মা… আমাকে বাঁচা। আমি জেলে যেতে চাই না। আমার বয়স হয়েছে… আমি পারব না… তোরা যা করার কর, কিন্তু আমাকে বাঁচা…”
নেহা চমকে উঠে পিছিয়ে গেল।
“বাবা! কী করছ তুমি? উঠে দাঁড়াও!”
কিন্তু মি. রহমান উঠলেন না। তিনি মেঝেতে বসে কাঁদতে থাকলেন। সেই দৃশ্য দেখে আমার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। এই একই মানুষ একদিন আমাকে ঘরজামাই হতে বাধ্য করেছিলেন, নিজের ক্ষমতা আর টাকার জোর দেখিয়েছিলেন। আজ সেই মানুষটাই নিজের মেয়ের পায়ে পড়ে প্রাণ ভিক্ষা চাইছেন।
এই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম—টাকা, ক্ষমতা আর অহংকার কতটা ভঙ্গুর। নেহার বাইরের শক্ত অবয়বের আড়ালে এখন ভয় আর অসহায়তা। আমি, যে গ্রামের সাধারণ ছেলে, আজ এই পরিবারের সবচেয়ে বড় সংকটের সাক্ষী। আর নিরঞ্জন—যে একজন সাধারণ রিকশাওয়ালা—সে আজ আমাদের সবার জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। একটা দুর্ঘটনা পুরো একটা শক্তিশালী পরিবারকে নিরুপায় করে ফেলেছে।
এই রাতটা ভয়ংকরভাবে কেটেছিল। কেউ ঘুমাতে পারেনি। শুধু চিন্তা, ভয়, অপরাধবোধ আর আসন্ন বিপদের ছায়া।
পরদিন সকাল সাতটায় আমার ঘুম ভাঙল। জানালা দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে, কিন্তু ঘরের ভেতরটা এখনও অন্ধকার মনে হচ্ছিল। পাশ ফিরে দেখি নেহা বিছানায় নেই। আমার পরনের শার্টটা এখনও ভেজা। গত রাতে নেহা আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল—এমনভাবে যে তার চোখের পানিতে আমার কাপড় ভিজে গিয়েছিল।
আমি কখনো নেহাকে এতটা ভেঙে পড়তে দেখিনি। সেই অহংকারী, আত্মবিশ্বাসী মেয়েটা, যে কখনো কারও সামনে দুর্বলতা দেখায় না—সে গত রাতে আমার বুকে মুখ গুঁজে শিশুর মতো কেঁদেছিল। আমার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। আমি তাকে অনেক ভালোবাসি। সত্যিই ভালোবাসি। কিন্তু এই বিপদের মুহূর্তে আমি তার কোনো সাহায্যই করতে পারছি না। শুধু অসহায়ের মতো পাশে দাঁড়িয়ে দেখছি।
একটু পর রুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখি নেহা ড্রয়িং রুমের সোফায় একা চুপচাপ বসে আছে। চুল এলোমেলো, চোখ ফোলা। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কিন্তু কিছুই দেখছে না।
আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। সে কোনো কথা না বলে আমার কাঁধে মাথা রেখে দিল। তার শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা। কয়েক মিনিট নীরবে কাটার পর সে ফিসফিস করে বলল,
“বাবাকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় আছে, সৈকত?”
আমি কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু তার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখলাম। কী বলব? সত্যি কথা বললে তো সে আরও ভেঙে পড়বে।
একটু পর জোহরা বেগম ঘুম থেকে উঠে এলেন। তাঁর চেহারাও রাত জাগা। তিনি নেহার সামনে এসে দাঁড়ালেন। গলা কাঁপছিল।
“নেহা, কী ভাবলি মা?”
নেহা আমার হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার নখ আমার তালুতে বিঁধছিল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে সে দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি যাব মা। বাবাকে বাঁচাতে হবে।”
জোহরা বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। তিনি নেহাকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
“মা… সাবধানে যাস। আর আমাদের মাফ করে দিস। এই বিপদে তোকে এত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে…”
নেহা কিছু বলল না। শুধু চুপ করে মায়ের বুকে মাথা রেখে রইল। সেই দৃশ্য দেখে আমার গলা বন্ধ হয়ে আসছিল। এই পরিবারের অহংকার, টাকা, ক্ষমতা—সবকিছু আজ একজন সাধারণ রিকশাওয়ালার সামনে নত হয়ে গেছে।
আমরা দুজন গাড়িতে উঠলাম। পুরো রাস্তায় প্রায় কোনো কথা হলো না। বস্তির দিকে যাওয়ার পথে আমি শেষ চেষ্টা করলাম তাকে সান্ত্বনা দিতে।
“নেহা, চিন্তা কোরো না। তুমি দিনের বেলা যা যা করতে হয় করে রেখো। আমি রাতে এসে তোমাকে নিয়ে আসব।”
নেহা একটু অদ্ভুতভাবে হাসল। তার হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না—শুধু একটা কালো, তিক্ততা।
“আজ ওই রিকশাওয়ালার খবর আছে।”
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
“কেন? কী করবে?”
নেহা জানালার বাইরে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“দেখবে… আজকের পর আর ডাকবে না।”
আমরা দুজনেই হেসে উঠলাম। কিন্তু সেই হাসি কান্নার চেয়েও ভয়ংকর ছিল। কষ্টের মাঝে এই হাসিটা যেন আমাদের দুজনের মধ্যে একটা অন্ধকার বন্ধন তৈরি করল।
গাড়িটা বস্তির দিকে এগিয়ে চলল। সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা কেউ জানে না।
সকাল দশটার কিছু আগে আমরা বস্তির একদম শেষ কোনায় পৌঁছালাম। চারপাশে তেমন কোনো বাড়িঘর নেই—শুধু কয়েকটা ছড়ানো-ছিটানো টিনের চালা আর কাঁচা রাস্তা। সরকারি অনুদানে তৈরি ছোট্ট একটা ঘর। ঘরের পাশেই নিরঞ্জনের রিকশাটা দাঁড়িয়ে আছে, মাটিতে কাদা লেগে।
আমি গাড়ি থেকে নেমে ঘরের সামনে গিয়ে ডাকলাম,
“কেউ আছেন?”
কয়েক সেকেন্ড পর নিরঞ্জন বেরিয়ে এল। গায়ে কোনো জামা নেই—শুধু একটা পুরোনো ধুতি কোমরে জড়ানো। তার রোগা শরীরে ঘাম চকচক করছে। সে আমাদের দেখে একটু হাসল, যেন এটাই স্বাভাবিক।
“আরে আপনারা! আসুন, ঘরে আসুন।”
আমি আর নেহা ঘরের ভেতর ঢুকলাম। তীব্র একটা গন্ধ নাকে এসে লাগল—ভেজা মাটি, পুরোনো কাপড়, রান্নার ধোঁয়া আর দারিদ্র্যের মিশ্রিত গন্ধ। নেহার মুখটা তৎক্ষণাৎ বিকৃত হয়ে গেল। সে যে অতিরিক্ত পরিষ্কারপরায়ণ, এখানে কীভাবে টিকবে তা ভেবেই আমার বুক কেঁপে উঠল।
নিরঞ্জন আমাদের বসতে বলে একটা প্লেটে কয়েকটা সন্দেশ আর দুই গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। আমার তো দেখেই ঘৃণা লাগছিল, নেহার তো কথাই নেই। সে শুধু চুপ করে বসে রইল। সে তার বাবার জন্য এই ত্যাগ করছে।
নিরঞ্জন গলা পরিষ্কার করে বলল,
“আপনারা অনেক ভালো করেছেন যে এসেছেন। সকালেই আমার বউয়ের চিতা পুড়িয়েছি। ওই যে দরজার উপরে তার ছবি—প্রতিদিন সকালে এসে ধূপ দিবেন।”
তারপর সে নেহার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“আচ্ছা, আপনার নামটা কী?”
নেহা তার স্বভাবসুলভ অহংকার নিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“আমাকে ম্যাডাম বলে ডাকবে। আমার নাম জেনে তোমার কী দরকার?”
নেহার অহংকার এখনও পুরোপুরি যায়নি। কিন্তু নিরঞ্জনের মুখে একটা চাপা হাসি ফুটে উঠল। সে শান্তভাবে বলল,
“আপনি তো আমার বাসায় কাজ করতে এসেছেন। তাহলে তো আপনাকে ‘খালা’ বলেই ডাকব। আপনারা তো কাজের বুয়াদের এভাবেই ডাকেন, তাই না?”
আমার ঠোঁটের কোণে একটু হাসি খেলে গেল। যে নেহা সারাজীবন দাম্ভিকতা আর অহংকার দেখিয়ে এসেছে, আজ একজন রিকশাওয়ালা তাকে “খালা” বলে সম্বোধন করে মজার পাত্রী বানিয়ে দিল। নেহার মুখ লাল হয়ে উঠল, কিন্তু সে কিছু বলতে পারল না।
নেহা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমার নাম নেহা। আচ্ছা, তোমার মেয়ে কোথায়? তার নাম কী?”
নিরঞ্জন উত্তর দিল,
“তুলসি। ও এখন কলেজে গেছে।”
“আসুন নেহা জি, আপনাকে পুরো ঘরটা দেখাই।”
ঘর বলতে মাত্র দুটো ছোট ছোট রুম। একটা রুমে নিরঞ্জনের অসুস্থ বৃদ্ধ মা শুয়ে আছেন। সেখানেই তুলসি দাদির সাথে ঘুমায়। আরেকটা রুমে নিরঞ্জন আর তার স্ত্রী থাকতেন। বারান্দায় একটা পুরোনো চৌকি পাতা। বারান্দায় একটা গ্যাসের চুলা সেখানেই রান্না করা হয়।
সব ঘর ঘুরে দেখানোর সময় আমি চুপিসাড়ে ছোট ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন লাগিয়ে দিয়েছি। নেহাও বিষয়টা জানে না। যদি কোনো নির্যাতন বা অসম্মান হয় নেহার, তাহলে প্রমাণ থাকবে। পুলিশকে দেখাতে পারব।
সব দেখানো শেষ হলে আমি চলে আসার জন্য উঠলাম। নেহা আমাকে গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিল। তার চোখে ভয়, ঘৃণা আর অসহায়তা মিশে আছে। আমি তার কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বললাম,
“সাবধানে থেকো। রাতে এসে নিয়ে যাব।”
নেহা কিছু বলল না। শুধু মাথা নেড়ে ঘরের দিকে ফিরে গেল।
গাড়িতে উঠে আমি রিয়ার ভিউ মিররে তাকালাম। ছোট্ট টিনের ঘরটা যেন নেহার স্বপ্নের প্রাসাদকে গিলে খাচ্ছে।
এই ত্যাগ কতদিন চলবে? আর কতটা নামবে আমাদের অহংকার?
Posts: 13
Threads: 1
Likes Received: 52 in 13 posts
Likes Given: 1
Joined: Jun 2026
Reputation:
5
**পর্ব ৪: নতুন দুয়ার**
নেহা কখনো নিজের হাতে এক গ্লাস পানিও ঢেলে খায়নি। তার জীবন ছিল বাবার প্রাসাদোপম বাড়ি, মেইড, ড্রাইভার আর বিলাসিতার মাঝে। আজ সেই নেহাকে একটা ছোট্ট, দরিদ্র টিনের ঘর সামলাতে হচ্ছে। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছিল। মাথায় কিছুই আসছিল না।
নিরঞ্জন ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল,
“ভাত বসিয়ে দিন। তুলসি কলেজ থেকে এলে খেয়ে আবার যাবে।”
কথা বলেই সে তার রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেল। নেহা একা দাঁড়িয়ে রইল। তার মাথার ভেতর ঘুরছিল হাজারটা চিন্তা। রান্না? সে কীভাবে করবে? শেষমেশ তার মাথায় একটা আইডিয়া এল। সে দ্রুত ফুডপান্ডা অ্যাপ খুলে ভাত আর তরকারি অর্ডার দিয়ে দিল। টাকা দিয়ে সমস্যা সমাধান—এটাই তো তার চিরকালের অভ্যাস।
দুপুরের দিকে নিরঞ্জনের রিকশায় চড়ে তুলসি বাসায় ফিরল। রিকশা থেকে নামতেই তার চোখ পড়ল নেহার উপর। সাত বছরের ছোট্ট মেয়েটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এত সুন্দর, ফর্সা, সাজানো-গোছানো একজন মহিলা সে আগে কখনো দেখেনি। যেন সিনেমা থেকে নেমে এসেছে।
নিরঞ্জন হাসতে হাসতে বলল,
“নেহাজি, তাড়াতাড়ি ভাত বেড়ে দাও।”
তুলসি নেহার দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“বাবা, ইনি কে?”
নিরঞ্জন তার হলুদ দাঁত বের করে হাসল। চোখে একটা বিদ্রূপের ঝিলিক।
“উনি আমাদের ঘরের নতুন কাজের লোক।”
নেহা আড়চোখে তার দিকে তাকাল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
আমি অফিসে বসে মোবাইলের স্ক্রিনে সবকিছু দেখছিলাম। ছোট ক্যামেরাটা সব ধরছে। নিরঞ্জনের সেই হাসি, তার চোখের দৃষ্টি—যেন আমার সুন্দরী বউয়ের সাথে ফ্লার্ট করছে। আমার শরীরের ভেতর আগুন জ্বলে উঠল। হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল। এই ছোটলোকটা কী ভাবছে নিজেকে?
তুলসি হঠাৎ দৌড়ে এসে নেহাকে জড়িয়ে ধরল। তার ছোট্ট হাত দুটো নেহার কোমরের চারপাশে। মিষ্টি গলায় বলল,
“বাবা, তুমি মিথ্যা বলছ! উনি তো আমার নতুন মা, তাই না?”
নেহার শরীর শক্ত হয়ে গেল। তার খুব বিরক্ত লাগছিল। এই আদর, এই “মা” ডাক—সবকিছু তার কাছে অসহ্য। কিন্তু সে নিরুপায়। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সে ভাবল—কাজের লোকের চেয়ে হয়তো “নতুন মা” ডাকটা অনেক সহনীয়। অন্তত সম্মানের মতো লাগে।
এরপর নেহা খাবার বেড়ে দিল। ফুডপান্ডার ভাত আর তরকারি। অদ্ভুতভাবে খাবারটা বেশ সুস্বাদু হয়েছিল। তুলসি খেতে খেতে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠল,
“নতুন মা, তোমার রান্না অনেক ভালো! তাই না বাবা?”
নিরঞ্জন কিছু বলতে চাইছিল না, কিন্তু মেয়ের সামনে মুখে হাসি এনে বলল,
“হ্যাঁ… ভালোই।”
খাওয়া শেষ হলে নিরঞ্জন আবার রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। ঘরে শুধু নেহা আর তুলসি রইল। ছোট মেয়েটা নেহার কাছে ঘেঁষে বসল, তার নতুন মায়ের সাথে গল্প করতে চায়।
নেহা জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে অশ্রু জমে আছে। এই নতুন দুয়ার তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। কিন্তু এই অধ্যায় কতদিন চলবে, আর কী কী পরীক্ষা তার জন্য অপেক্ষা করছে—তা কেউ জানে না।
আমি মোবাইলের স্ক্রিনে সব দেখে বুকের ভেতর জ্বালা নিয়ে বসে রইলাম।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর তুলসি নেহার কাছে আরও ঘেঁষে বসল। তার ছোট্ট চোখ দুটোতে কৌতূহল আর বিস্ময় মিশে আছে। সে মিষ্টি গলায় ডাকল,
“নতুন মা?”
নেহা প্রথমবার এই ডাকে সাড়া দিল না। তার কানে এখনও “ম্যাডাম” বা “নেহা আপা”র অভ্যাস। “নতুন মা” শুনে তার শরীরটা অস্বস্তিতে কুঁকড়ে গেল। সে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল।
তুলসি আবার ডাকল, একটু জোরে।
“নতুন মা?”
নেহা এবার ঘুরে তাকাল। তার চোখে বিরক্তি আর ক্লান্তি।
তুলসি হাসিমুখে বলল,
“এই খাবার তুমি রান্না করোনি, তাই না?”
নেহা একটু অবাক হয়ে গেল। সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“কেন? আমিই তো রান্না করেছি।”
তুলসি তার ছোট্ট মাথা নেড়ে হাসল।
“না নতুন মা। তুমি যে রান্না করলে, ঘরে তো ওই তরকারি ছিলই না। দাদি তো বলে, বাবা যা কিনে আনে তাই দিয়েই রান্না হয়। তুমি কীভাবে করলে?”
নেহা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। ধরা পড়ে গেছে। সে কোনোমতে বলল,
“আসলে… আমি…”
তুলসি তার ছোট্ট হাত দিয়ে নেহার হাত ধরে ফেলল। তার চোখে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু সরলতা।
“চিন্তা করো না নতুন মা। আমি তোমাকে সব শিখিয়ে দেব। রান্না, ঘর গোছানো, দাদির ওষুধ দেওয়া—সব। তুমি খুব সুন্দর, তাই আমি তোমাকে সব শেখাব।”
সেই মুহূর্ত থেকে ছোট্ট তুলসি আর নেহার মধ্যে একটা অদ্ভুত বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে শুরু করল। একজন সাত বছরের শিশু আর একজন ২৫ বছরের অহংকারী নারীর মধ্যে।
---
দিনগুলো আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছিল। প্রথম কয়েকদিন নেহা একেবারে অসহায় ছিল। ভাতের হাঁড়ি চড়াতে গিয়ে পুড়ে যাচ্ছিল হাত, বাসন মাজতে গিয়ে নখ ভেঙে যাচ্ছিল। কিন্তু তুলসি প্রতিদিন কলেজ থেকে ফিরে তার “নতুন মা”কে হাতে ধরে শেখাত। কখনো হাসতে হাসতে, কখনো গল্প বলতে বলতে।
“এভাবে কাঁচা মরিচ দিলে স্বাদ ভালো হয় নতুন মা…”
“দাদিকে ঔষধ দেবার সময় ঔষধ টা একটু ঝাঁকাতে হবে …”
নেহা প্রথমে খুব বিরক্ত হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারছিল—এই ছোট মেয়েটার সরলতা তার কষ্টকে অনেকটা লাঘব করছে। তুলসির চোখের আড়ালে, যখন সে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ত, নেহা তখন চুপিসাড়ে বেরিয়ে যেত। আমি গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতাম। রাতের অন্ধকারে তাকে নিয়ে বাড়ি ফিরতাম।
সময়ের সাথে সাথে নেহা টুকিটাকি কাজে পটু হয়ে উঠছিল। সে এখন ভাত রান্না করতে পারে, ঘর ঝাড়ু দিতে পারে, বৃদ্ধ মায়ের সেবা করতে পারে। সংসার তাকে যা শেখাতে পারেনি, জীবনের এই নির্মম পরীক্ষা তা শিখিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু প্রতি রাতে, যখন সে বাড়ি ফিরত, তার শরীর ভেঙে পড়ত।
এক রাতে বিছানায় শুয়ে সে আমার বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,
“সৈকত… আর কতদিন এভাবে চলবে? আমার খুব ক্লান্ত লাগে। শরীরে ব্যথা, মনে অপমান… আমি আর পারছি না।”
আমি তার চুলে হাত বুলিয়ে আস্তে করে বলতাম,
“খুব দ্রুত আমি একটা উপায় বের করে ফেলব। বিশ্বাস করো। এটা শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
কিন্তু আমি নিজেও জানতাম না—সেই উপায় আসলে কী। প্রতিদিন নিরঞ্জনের সেই হলুদ দাঁতের হাসি আর তুলসির “নতুন মা” ডাক আমাদের জীবনকে আরও জটিল করে তুলছিল।
নেহা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল। তার অহংকার ভাঙছিল, তার হাত শক্ত হচ্ছিল, আর তার চোখে এক নতুন ধরনের ক্লান্তি জমছিল। আমি আমার স্ত্রীর দম্ভ ভাংতে চাই, কিন্তু এতোটা কঠোর হতে চাই না।
Posts: 13
Threads: 1
Likes Received: 52 in 13 posts
Likes Given: 1
Joined: Jun 2026
Reputation:
5
**পর্ব ৫: অনুমতি **
ভোরের আলো ফোটার আগেই নেহা চলে যেত। তুলসি যেন জেগে না ওঠে, সেজন্য সে চুপিসাড়ে উঠে পড়ত। টিনের ঘরের ছোট্ট রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে সে এখন রুটি বানাতে শিখেছে। হাতে আটা মাখা, কপালে ঘাম। যে নেহা একদিন সকালে বিছানায় শুয়ে মেইডের হাতে চা খেত, আজ সে নিজের হাতে রুটি সেঁকছে।
নিরঞ্জন আর তুলসি ঘুম থেকে উঠে খেতে বসল। ছোট্ট টেবিলের সামনে তুলসি খুশিতে বসে আছে। নিরঞ্জন রুটি ছিঁড়ে মুখে দিয়ে বলল,
“নেহা জি, আরেকটা দেন তো।”
নেহা নীরবে আরেকটা গরম রুটি তার প্লেটে দিয়ে দিল। তার চোখে এখন আর তীব্র ঘৃণা নেই—শুধু একটা অভ্যস্ত ক্লান্তি।
তুলসি হঠাৎ উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল,
“বাবা, আমাদের কলেজ থেকে ঘুরতে নিয়ে যাবে। একজনের জন্য এক হাজার টাকা করে। সবাই যাচ্ছে।”
নিরঞ্জন ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“ঘোরাঘুরির কী দরকার? বাসায় বসে থাক। পড়াশোনা কর।”
তুলসির মুখটা হঠাৎ বিষাদে ভরে গেল। সে অনুনয়ের সুরে বলল,
“বাবা, প্লিজ… আমি যাই না। সবাই যাবে।”
নিরঞ্জন বিরক্ত হয়ে বলল,
“কলেজে খালি টাকাই লাগে? এদিকে ঘরে চাল-ডালের টাকা জোগাড় করতে পারি না, আর তুই ঘুরতে যেতে চাস?”
নেহা আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে রান্না করতে করতে বলে উঠল,
“মানে কী? ছেলেমেয়েরা অবশ্যই ঘুরাঘুরি করবে, নতুন জায়গা দেখবে, শিখবে। এটা তো তাদের বড় হওয়ার অংশ।”
নিরঞ্জন একটু রেগে,
“আমি কোনো টাকা দিতে পারব না।”
নেহা শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
“আপনাকে কোনো টাকা দিতে হবে না। আমি দেখে নেব।”
নিরঞ্জন কয়েক মুহূর্ত নেহার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“যা ভালো বুঝেন তাই করেন। আমি কিছু জানি না।”
কথা শেষ করে সে রুটি শেষ করে উঠে পড়ল। রিকশা নিয়ে বেরিয়ে গেল।
তুলসি খুশিতে নেহার দিকে তাকাল। তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
“নতুন মা, তুমি সত্যি নিয়ে যাবে?”
নেহা হালকা হাসল। এই হাসিতে তার নিজের অবাক লাগছিল। কয়েক সপ্তাহ আগেও সে ভাবতে পারত না যে একদিন সে একটা গরিব ঘরের মেয়েকে কলেজ ট্রিপে নিয়ে যাওয়ার কথা বলবে। কিন্তু তুলসির সেই নির্দোষ আনন্দ দেখে তার মনটা নরম হয়ে যাচ্ছিল।
আমি বাসায় বসে ক্যামেরায় সব দেখছিলাম। নেহার এই পরিবর্তনটা আমাকে অবাক করছিল। সে যে শুধু বেঁচে থাকার জন্য কাজ করছে তা নয়—সে ধীরে ধীরে এই ছোট্ট পরিবারের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। আর এই জড়িয়ে পড়াটা আমাদের দাম্পত্য জীবনকেও নতুন করে নাড়া দিচ্ছিল।
কিন্তু প্রশ্নটা রয়েই গেল—এই নতুন সম্পর্ক কতদূর গড়াবে? আর নিরঞ্জনের এই নীরব আধিপত্য কবে শেষ হবে?
রাতে ঘরে ফিরে নেহা আমাকে বলল, “আমি তুলসিকে নিয়ে সোনারগাঁ ঘুরতে যাব। কলেজের ট্রিপ।”
আমি ভুরু কুঁচকে বললাম, “কী দরকার এসবের? তুমি কি এখন ওদের পরিবারের সদস্য হয়ে গেছ?”
নেহা একটু চুপ করে থেকে বলল,
“ছোট বাচ্চাটা একটু ঘুরুক। আর আমি একা নিয়ে গেলে যদি কোনো সমস্যা হয়, নিরঞ্জন তাহলে আমাদের আরও চাপ দেবে। এটা শুধু সাবধানতা।”
আমি আর কী বলব? শুধু ফিসফিস করে বললাম, “সাবধানে যেও। খেয়াল রেখো।”
---
সেদিন সকালে নেহা খুব সুন্দর করে সেজেছিল। অনেকদিন পর তার সেই পুরোনো আভা ফিরে এসেছিল। হালকা মেকআপ, সুন্দর শাড়ি, চুল খোলা। তুলসির জন্যও নতুন ড্রেস কিনে এনেছিল। ছোট মেয়েটা ড্রেস পরে আয়নার সামনে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। কিন্তু তার মুখটা খুশি খুশি নয়।
নেহা জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে তুলসি? ঘুরতে যাচ্ছ না, দুখি কেন তবে?”
তুলসি মাথা নিচু করে বলল, “বাবা যাচ্ছে না তাই মন খারাপ।”
নেহা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর আস্তে করে বলল,
“তুমি চাও তোমার বাবা যাক?”
তুলসি উজ্জ্বল চোখে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ নতুন মা।”
নেহা নিরঞ্জনের রুমের দরজায় টোকা দিল।
“আসতে পারি?”
ভেতর থেকে নিরঞ্জনের গলা ভেসে এল, “হ্যাঁ, আসুন।”
নিরঞ্জন জামা পরছিল। তার রোগা শরীরে পুরোনো শার্ট। নেহা দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,
“কোথাও যাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ, রিকশা চালাতে। টাকা না আনলে চলবে কী করে?”
নেহা নরম গলায় বলল,
“আজ না গেলে হয় না? মেয়ের সাথে একটু ঘুরতে গেলেন। সে খুব খুশি হবে।”
নিরঞ্জন একটু হাসল। সেই হাসিতে তিক্ততা।
“না, হবে না। আপনাদের মতো বড়লোকদের কাছে টাকা আয় করা সহজ। আমরা গরিব মানুষ। আর আপনি তুলসির যে খারাপ অভ্যাস করছেন, আপনি চলে গেলে পরে দেখব কী হয়।”
নেহার মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সে তুলসিকে আপন করে ফেলেছে। ছোট মেয়েটার সেই নির্দোষ ভালোবাসা তার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু নিরঞ্জনের কথায় সে বুঝতে পারল—এই সম্পর্ক স্থায়ী নয়।
তবু নেহা নাছোড়বান্দা। সে হঠাৎ এগিয়ে গিয়ে নিরঞ্জনের হাত থেকে শার্টটা টেনে নিল।
“না, আজ আপনি যাবেন। যদি আমার কাছ থেকে শার্ট নিতে পারেন, তাহলে রিকশা চালাতে যান।”
নিরঞ্জন অবাক হয়ে দৌড় দিল শার্টের জন্য। কিন্তু নেহা দ্রুত বেরিয়ে দরজায় খিল লাগিয়ে দিল।
নিরঞ্জন দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল,
“খুলুন! কী করছেন?”
নেহা দরজার ওপাশ থেকে একটু ভয় পেয়ে বলল,
“কী করছেন আপনি? দরজা ভেঙে যাব ত।”
নিরঞ্জনের গলায় একটা অদ্ভুত সুর।
“ভয় পেলেন নাকি?”
নেহা দরজায় হাত রেখে দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি ভয় পাব? আর আপনাকে?”
ঘরের ভেতরে একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। নিরঞ্জনের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নেহার হৃদয় দ্রুত ধুকপুক করছিল। সে বুঝতে পারছিল না—এই খেলাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
আমি বাসায় বসে ক্যামেরায় সব দেখছিলাম। আমার হাত শক্ত হয়ে গিয়েছিল। নেহা এখন কতটা এগিয়ে গেছে। আর নিরঞ্জনের সাথে এই নতুন ধরনের সম্পর্ক আমার ভেতরে এক অদ্ভুত জ্বালা তৈরি করছিল।
দরজায় খিল লাগানোর পর ঘরের ভেতরের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছিল। নিরঞ্জনের গলায় একটা চ্যালেঞ্জিং সুর। নেহার হৃদয় দ্রুত ধুকপুক করছিল, কিন্তু সে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল।
ঠিক তখনই পাশের রুম থেকে নিরঞ্জনের অন্ধ মা বেরিয়ে এলেন। বয়স্ক, ভঙ্গুর শরীর, চোখ দুটো সাদা। তিনি অস্থির গলায় বললেন,
“আরে কী করছ তোমরা? এত চেঁচামেচি কেন?”
বৃদ্ধা হাতড়ে হাতড়ে এসে দরজার খিল খুলে দিলেন। তারপর আর কিছু না বলে নিজের রুমের দিকে ফিরে গেলেন।
নিরঞ্জন দরজা খুলে বেরিয়ে এসে নেহার দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসল।
“এখন কে বাঁচাবে আপনাকে?”
নেহা কিছু বলার আগেই তুলসি ওয়াশরুম থেকে ছুটে এল। তার চোখে উত্তেজনা।
“বাবা, তুমি চলো না! প্লিজ!”
নেহা তুলসির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নিরঞ্জনের দিকে তাকাল। তার গলায় একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“তোমার বাবা অবশ্যই যাবে। কেন যাবে না?”
তুলসির মুখটা তৎক্ষণাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
“সত্যি বাবা? তুমি যাবে? ইয়াহু!”
নেহা সরাসরি নিরঞ্জনের চোখে চোখ রেখে বলল,
“হ্যাঁ, উনি যাবেন। আমি বলছি।”
নিরঞ্জন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার চোখে বিরক্তি, বিস্ময় আর একটা অদ্ভুত আত্মসমর্পণ মিশে ছিল। শেষমেশ সে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “ঠিক আছে।”
---
বাসে ওঠার আগে আমি নেহার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সে তুলসির হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি তার কাছে গিয়ে চাপা গলায় বললাম,
“সাবধানে যেও। কোনো সমস্যা হলে আমাকে ফোন করো।”
নেহা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমিও চলো না।”
আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম। কী পরিচয়ে যাব? নেহার স্বামী? নাকি শুধু একজন অপরিচিত? এই জটিলতার মধ্যে আমি জড়াতে চাইছিলাম না। আমি শুধু মাথা নেড়ে বললাম, “তুমি সাবধানে থেকো।”
নেহা আর জোর করল না।
বাসে উঠে নেহা আর তুলসি পাশাপাশি বসল। তুলসি খুশিতে নেহার কোলে মাথা রেখে বসে আছে। নেহা তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পুরো বাসটা কলেজের বাচ্চাদের হাসি-চিৎকারে মুখরিত। কলেজ পার্টি শুরু হয়েছে।
নিরঞ্জন একটু দূরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। তার মুখে কোনো হাসি নেই। আর নেহা? সে প্রথমবারের মতো এই ছোট্ট মেয়েটির সাথে এতটা স্বাভাবিকভাবে মিশে যাচ্ছে যে, আমি দূর থেকেও অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম।
কিন্তু আমার ভেতরে একটা প্রশ্ন ঘুরছিল—এই ঘনিষ্ঠতা কি শুধুই তুলসির জন্য? নাকি নেহার ভেতরেও কিছু বদলে যাচ্ছে? আর নিরঞ্জনের সাথে এই নতুন সম্পর্ক কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের সবাইকে?
Posts: 13
Threads: 1
Likes Received: 52 in 13 posts
Likes Given: 1
Joined: Jun 2026
Reputation:
5
**পর্ব ৬: সোনারগাঁও**
আমি নেহার শাড়ির কুঁচিতে ছোট্ট একটা মাইক্রোফোন লাগিয়ে দিয়েছিলাম। সে জানত না। যা কিছু ঘটবে, আমি দূরে বসে সব শুনতে পাব। তার শ্বাস-প্রশ্বাস, তার কথা, তার ভয়—সব।
সোনারগাঁয়ের সবুজ মাঠে কলেজের পিকনিক চলছিল। বাচ্চারা হাসছে, ছুটছে, খেলছে। শিক্ষকরা গল্প করছেন। নেহা তুলসির হাত ধরে একটু দূরে বসে ছিল। নিরঞ্জন একা একা একটা গাছের নিচে বসে সিগারেট টানছিল।
হঠাৎ চারপাশে হইচই পড়ে গেল।
“রাহাত কোথায়? রাহাতকে দেখা যাচ্ছে না!”
সবাই ছড়িয়ে পড়ল খুঁজতে। নেহার মনে হঠাৎ করে একটা কথা ভেসে উঠল। কিছুক্ষণ আগে পুকুরপাড় থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনেছিল—যেন কিছু একটা পানিতে পড়েছে। তার বুকটা ধড়াস করে উঠল।
সে তুলসির কাঁধে হাত রেখে বলল,
“তুমি এখানে বসো। আমি পুকুরপাড়ে দেখে আসছি। কোথাও যেও না।”
তুলসি মাথা নেড়ে বলল, “আচ্ছা নতুন মা।”
নেহা দ্রুত পুকুরপাড়ের দিকে ছুটল। ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে পুকুরের কিনারায় পৌঁছে সে দেখল—একটা ছোট ছেলে হাবুডুবু খাচ্ছে। তার হাত দুটো পানির উপরে উঠছে-নামছে, মুখ থেকে শুধু গলগল করে পানি ঢুকছে। ছেলেটা আর চিৎকারও করতে পারছে না।
নেহার পা দুটো যেন মাটিতে আটকে গেল। সে সাঁতার জানে না। কী করবে বুঝতে পারছিল না। শুধু চিৎকার করে উঠল, “কে আছো! এদিকে আসো! বাচ্চাটা ডুবে যাচ্ছে!”
ঠিক তখনই নিরঞ্জন তাকে দেখতে পেল। সে দৌড়ে এল। নেহা হাত দিয়ে পুকুরের দিকে দেখিয়ে বলল, “ওখানে! দেখো!”
নিরঞ্জন এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। তার রোগা শরীর নিয়ে সে সোজা পুকুরে লাফিয়ে পড়ল। পানি ছিটকে উঠল। সে দ্রুত সাঁতরে ছেলেটার কাছে পৌঁছে তার কলার চেপে ধরল। ছেলেটা তখন প্রায় অচেতন। নিরঞ্জন তাকে জড়িয়ে ধরে কিনারার দিকে টেনে আনতে লাগল।
নেহা কিনারায় দাঁড়িয়ে পড়ে দুই হাত বাড়িয়ে ছেলেটাকে ধরার চেষ্টা করছিল। তার শাড়ি কাদায় ভিজে যাচ্ছিল। অবশেষে নিরঞ্জন ছেলেটাকে কিনারায় তুলে দিল। নেহা তাকে দুই হাতে টেনে তুলল। ছেলেটা তখনও অচেতন, মুখ দিয়ে পানি বেরোচ্ছে।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে নেহার পা পিছলে গেল। কাদায় ভরা কিনারায় সে হড়কে পড়ল। তার কোমরে প্রচণ্ড আঘাত লাগল। তীব্র যন্ত্রণায় তার মুখ দিয়ে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল।
নিরঞ্জন পানি থেকে উঠে দ্রুত এসে নেহাকে হাত ধরে তুলল। তার শরীর ভিজে, কাদায় মাখামাখি। নেহার কোমরে হাত, তার খুব ব্যাথা লাগছে।
নেহা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ব্যথা করছে… কিন্তু বাচ্চাটা…?”
চারপাশ থেকে লোকজন ছুটে আসছিল। ছেলেটাকে কোনোমতে জ্ঞান ফিরিয়ে আনা হলো। সবাই নিরঞ্জনকে ধন্যবাদ দিচ্ছিল। কিন্তু নেহার কোমরের ব্যথায় তার চোখে পানি।
আমি মাইক্রোফোনে সব শুনছিলাম। নেহার আর্তনাদ, নিরঞ্জনের গলা, বাচ্চাদের কান্না—সব। আমার হাত শক্ত হয়ে গিয়েছিল। নেহা আবার আহত হয়েছে। আর এবার সে নিরঞ্জনের হাতে ধরা পড়েছে।
স্বার্থপর, অহংকারী নেহা যে একদিন শুধু নিজের আরাম আর পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ভাবত, সে অনেক বদলে গেছে। এখন সে অন্যের জন্য ভাবে। তুলসির হাসির জন্য, একটা অচেনা বাচ্চার জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজে আহত হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের দাম যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা সে তখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
রাত গভীর হয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ সোনারগাঁয়ের একটা সুন্দর রিসোর্ট ভাড়া করেছে। ছোট ছোট টিনের কটেজগুলো দেখতে খুবই মনোরম—লাল-সবুজ আলোয় সাজানো, চারপাশে গাছপালা। একটা টিনের ঘরে নেহা আর তুলসির থাকার কথা ছিল।
নেহা উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। তার কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা। একজন মহিলা ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করছেন। বাইরে তুলসি আর নিরঞ্জন চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
ডাক্তার তাদের ভেতরে ডেকে নিলেন।
তুলসি ছুটে এসে নেহার কাছে বসে পড়ল। তার চোখে পানি।
“নতুন মা, তুমি ঠিক আছো তো?”
নেহা ব্যথা লুকিয়ে হাসার চেষ্টা করল।
“হ্যাঁ, ঠিক আছি ত। আমার আবার কী হবে?”
ডাক্তার নিরঞ্জনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
“উনি কি আপনার স্বামী?”
নেহার বুকটা ধক করে উঠল। এখানে সত্যি বলা খুব কঠিন। চারপাশে সবাই তাদেরকে একটা পরিবার হিসেবেই দেখছে। নেহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে মাথা নেড়ে বলল,
“জি… হ্যাঁ।”
ডাক্তার তুলসির দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,
“বাবু, তুমি এখন ঘুমাতে যাও। আমি তোমার বাবা-মায়ের সাথে একটু কথা বলব।”
নিরঞ্জন তুলসিকে বলল,
“যা, আমার ঘরের বিছানায় গিয়ে ঘুমা। আমি পরে আসছি।”
তুলসি চলে যাওয়ার পর ডাক্তার গম্ভীর হয়ে বললেন,
“কোমরের ব্যথাটা খুব সিরিয়াস না, কিন্তু হতে পারে। ভেতরের মাসলগুলোতে চাপ পড়েছে। একটু মালিশ লাগবে।”
নিরঞ্জন অবাক হয়ে বলল,
“ভেতরে মানে?”
ডাক্তার সরাসরি বললেন,
“আজ রাতে আপনি নেহাকে অ্যানাল সেক্স দিন। এতে ভেতরের চাপ কমবে, রক্ত চলাচল বাড়বে।”
নেহার মুখ একেবারে লাল হয়ে গেল। লজ্জায়, অপমানে আর অবিশ্বাসে তার শরীর কাঁপতে শুরু করল। সে উঠতে চেষ্টা করল,
“কী বলছেন ডাক্তার! আমি ঠিক আছি। এসবের কোনো দরকার নেই!”
কিন্তু উঠতে গিয়েই তীব্র ব্যথায় সে “উহহ্” করে কেঁদে উঠল। শরীরটা আবার বিছানায় পড়ে গেল।
নিরঞ্জন এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারছে না। তার মুখে বিভ্রান্তি।
ডাক্তার নেহার যন্ত্রণা দেখে বললেন,
“দেখলেন তো? আজ রাতেই করুন। এই কনডম আর এই জেল লাগিয়ে নিন—জায়গাটা পিচ্ছিল হয়ে যাবে। প্রথমে একটু ব্যথা লাগবে, কিন্তু পরে অনেক আরাম পাবেন। না করলে পরে আরও বড় সমস্যা হতে পারে।”
কথা বলে ডাক্তার চলে গেলেন।
ঘরে শুধু নেহা আর নিরঞ্জন রইল। নীরবতা ভয়ংকর হয়ে উঠল।
আমি মাইক্রোফোনে সব শুনছিলাম। আমার শরীরের ভেতর আগুন জ্বলছিল। যে নেহা একদিন সামান্য চুমুকেও “অপরিষ্কার” বলে সাবান দিয়ে ঘষত, আজ সে একজন রিকশাওয়ালার সাথে অ্যানাল সেক্স করবে—এই চিন্তাটাই আমার মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছিল। আমি ফুঁসছিলাম। হাতের মোবাইলটা প্রায় ভেঙে ফেলার মতো চেপে ধরেছিলাম।
নেহা বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। তার মুখ লাল, শ্বাস ভারী। নিরঞ্জন তার দিকে তাকিয়ে আছে।
এই রাতটা কীভাবে কাটবে, তা আমি ভাবতেও পারছিলাম না।
নিরঞ্জন ডাক্তারের কথা পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। ইংরেজি শব্দগুলো তার মাথার উপর দিয়ে চলে গিয়েছিল। সে দ্রুত ডাক্তারের পিছু নিল।
“ডাক্তার, একটু দাঁড়ান। আমি কিছুই বুঝিনি। কী করতে হবে?”
ডাক্তার থেমে নিরঞ্জনকে আলাদা করে বুঝিয়ে দিলেন। নিরঞ্জনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। তার মুখে একটা অদ্ভুত মিশ্রণ — বিস্ময়, লজ্জা আর লুকানো লোভ।
এদিকে নেহার কোমরের জ্বালা ক্রমশ বাড়ছিল। প্রতিটা নড়াচড়ায় যেন ছুরি বিঁধছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিছানায় শুয়ে ছিল।
নিরঞ্জন ফিরে এসে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর রুমের আলো নিভিয়ে দিয়ে একটা মৃদু ডিমলাইট জ্বালাল। হালকা হলুদ আলোয় ঘরটা আরও ঘনিষ্ঠ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠল।
নিরঞ্জন কনডমের প্যাকেট খুলে নিজের ধনে লাগিয়ে নিল। নেহা সব দেখছিল। তার বুকের ভেতরটা যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল। সে বুঝতে পারছিল — এখন আর কোনো উপায় নেই। এই মুহূর্তে সে নিরঞ্জনের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য।
তার চোখ থেকে দু’ফোঁটা গরম পানি গড়িয়ে পড়ল। যে নেহা একদিন সামান্য চুমুকেও নিজেকে অপরিষ্কার মনে করে বারবার সাবান দিয়ে ধুত, আজ তাকে এই অবস্থায় পড়তে হবে।
নিরঞ্জন পুরোপুরি উলঙ্গ হয়ে গেল। তার রোগা, কালো শরীর ডিমলাইটে চকচক করছিল। সে নেহার পায়জামার দড়িতে হাত দিল, কিন্তু খুলতে পারছিল না। অস্থির হয়ে বলল,
“একটু কোমর উঁচু করুন।”
নেহার কোনো অপশন ছিল না। সে যন্ত্রণার সাথে কোমর উঁচু করে দিল। নিরঞ্জন তার পায়জামা আর অন্তর্বাস খুলে নিল।
তারপর সে ডাক্তারের দেওয়া পিচ্ছিল মলমটা নেহার পায়ুছিদ্রে ভালো করে লাগিয়ে দিল। ঠান্ডা অনুভূতিতে নেহার শরীর কেঁপে উঠল। নিরঞ্জন তার নিজের ধনটা নেহার পায়ুছিদ্রের ঠিক সামনে রেখে তার পিঠের উপর শুয়ে পড়ল। তার গরম নিঃশ্বাস নেহার ঘাড়ে পড়ছিল।
নিরঞ্জন কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে মাফ করবেন…”
এরপর সে জোরে একটা ঠেলা দিল।
নেহার মুখ দিয়ে একটা তীব্র আর্তনাদ বেরিয়ে এল, “আআআহ্…!”
তার শরীরটা শক্ত হয়ে গেল। অসহ্য যন্ত্রণায় তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগল। নিরঞ্জনের শক্ত ধনটা ধীরে ধীরে তার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। নেহা বালিশ কামড়ে ধরল। তার হাতের আঙুলগুলো চাদর চেপে ধরেছে।
নিরঞ্জন একটু থেমে, তারপর আবার ধীরে ধীরে নড়াচড়া শুরু করল।
আমি মাইক্রোফোনে সব শুনছিলাম। নেহার সেই কষ্টের আর্তনাদ, নিরঞ্জনের ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস, বিছানার খটখট শব্দ — প্রতিটা শব্দ যেন আমার বুকে ছুরি বিঁধিয়ে দিচ্ছিল।
যে নেহা আমার সাথেও শারীরিক সম্পর্ককে “অপরিষ্কার” মনে করে দূরে সরিয়ে রাখত, আজ সে একজন রিকশাওয়ালার কাছে এভাবে আত্মসমর্পণ করছে। আমার শরীরে আগুন জ্বলছিল, চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল রাগে আর অসহায়তায়।
কিন্তু আমি কিছুই করতে পারছিলাম না। শুধু শুনতে হচ্ছিল।
Posts: 13
Threads: 1
Likes Received: 52 in 13 posts
Likes Given: 1
Joined: Jun 2026
Reputation:
5
**পর্ব ৭**
সকালের নরম আলো টিনের ঘরের ফাঁক দিয়ে ঢুকছে। নেহা গোসল সেরে বেরিয়ে এসেছে। তার ভেজা চুল পিঠের উপর ছড়ানো, শাড়ির আঁচল কোমরে জড়ানো। অদ্ভুত ব্যাপার — কাল রাতের তীব্র ব্যথা প্রায় চলে গেছে। শরীর এখন অনেক হালকা লাগছে।
বিছানায় নিরঞ্জন এখনও ঘুমিয়ে আছে। তার উপর শুধু একটা পাতলা কাঁথা। গায়ে কোনো জামা নেই। তার রোগা, কালো শরীরটা আলোয় কাঁথায় ঢাকা । দেখে মনে হচ্ছে সে অনেক ক্লান্ত।
নেহা বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে গত রাতের কথা মনে করছিল। তার শরীর এখনও কাঁপছিল সেই স্মৃতিতে।
---
**গত রাত…**
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর ঘরে নীরবতা নেমে এসেছিল। নিরঞ্জন দরজা বন্ধ করে দিয়ে ধীরে ধীরে নেহার কাছে এগিয়ে এসেছিল।
নেহা উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল। তার চোখ বন্ধ, ঠোঁট কাঁপছে। নিরঞ্জন তার পাশে বসে প্রথমে নরম করে তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে নেহার শাড়ি সরিয়ে পায়জামা খুলে ফেলেছিল।
নেহার সাদা, নরম নিতম্ব দুটো ডিমলাইটে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। নিরঞ্জন পিচ্ছিল জেলটা তার পায়ুছিদ্রে ভালো করে লাগিয়ে দিয়েছিল। ঠান্ডা স্পর্শে নেহার শরীর শিউরে উঠেছিল।
নিরঞ্জন তার নিজের শক্ত, কালো ধনটা কনডম পরিয়ে নেহার পায়ুছিদ্রের ঠিক সামনে রেখে তার উপর শুয়ে পড়ল। তার ভারী শ্বাস নেহার ঘাড়ে পড়ছিল।
“আমাকে মাফ করবেন…” বলে সে জোরে একটা ঠেলা দিয়েছিল।
“আআআহ্…!” নেহার মুখ দিয়ে তীব্র আর্তনাদ বেরিয়ে এসেছিল। তার শরীরটা কুঁকড়ে গিয়েছিল। নিরঞ্জনের মোটা ধনটা তার টাইট পায়ুছিদ্র ভেদ করে অনেকটা ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। যন্ত্রণায় নেহার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছিল।
নিরঞ্জন একটু থেমে, তারপর ধীরে ধীরে নড়াচড়া শুরু করেছিল। প্রতিটা ঠেলায় নেহার শরীর কেঁপে উঠছিল। যন্ত্রণার সাথে সাথে একটা অদ্ভুত অনুভূতিও তৈরি হচ্ছিল। নিরঞ্জন ক্রমশ গতি বাড়াতে থাকল। তার কোমর জোরে জোরে নেহার নিতম্বে আঘাত করছিল — **থাপ থাপ থাপ** শব্দে ঘর ভরে যাচ্ছিল।
সে ১০-১২ বার জোরে জোরে ধাক্কা দিয়েছিল। প্রতিবারেই নেহা কাঁপছিল, কাঁদছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে তার কোমরের ব্যথা কমে আসছিল। নিরঞ্জনের শ্বাস আরও ভারী হয়ে উঠেছিল। সে নেহার কোমর দুটো শক্ত করে ধরে আরও গভীরে ঢুকছিল। তার ঘাম নেহার পিঠে পড়ছিল।
নিরঞ্জনের ইচ্ছা ছিল অনেকক্ষণ ধরে চালিয়ে যাওয়ার। সে নেহার ভেতরে আরও জোরে, আরও দ্রুত ঠেলছিল। কিন্তু নেহা আর সহ্য করতে পারছিল না। কান্না জড়ানো গলায় বলে উঠেছিল,
“থামুন… প্লিজ… আর পারছি না…আমার ব্যথা চলে গেছে।”
নিরঞ্জন অনিচ্ছাসত্ত্বেও থেমে গিয়েছিল। সে শেষবারের মতো গভীরে ঢুকে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে থেকে তারপর বেরিয়ে এসেছিল।
নেহা তখনও কাঁপছিল। তার শরীর ঘামে ভেজা, চোখ লাল। নিরঞ্জন তার পাশে শুয়ে পড়েছিল।
---
সকালে নেহা সেই রাতের কথা মনে করে শিউরে উঠল। তার শরীর এখন সুস্থ, কিন্তু মন ভেঙে আছে।
আমি গত রাতের পুরো অডিও ক্লিপ শুনেছি। নেহার আর্তনাদ, নিরঞ্জনের ভারী শ্বাস, প্রতিটা শব্দ। কিন্তু এই ক্লিপ দিয়ে নিরঞ্জনকে ফাঁসানো যাবে না। কারণ সে “ডাক্তারের পরামর্শে” নেহাকে সাহায্য করেছে। পুলিশ এটাকে অন্যভাবে দেখবে।
আমার আরও সময় লাগবে। আরও শক্ত প্রমাণ লাগবে।
নেহা জানালার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে জানে না — এই ত্যাগের শেষ কোথায়।
নেহা রাতে বাসায় ফিরল। তার চোখে একটা অদ্ভুত শূন্যতা। সে আমাকে পিকনিকের ঘটনা কিছুই বলল না। আমিও জিজ্ঞাসা করলাম না। কিন্তু আমি সব জানি। প্রতিটা আর্তনাদ, প্রতিটা শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রতিটা ধাক্কার শব্দ আমার কানে এখনও বাজছে। তবু আমি তাকে বুঝতে দিলাম না। শুধু চুপ করে তার পাশে বসে রইলাম।
ডিনার টেবিলে মি. রহমান নেহার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
“কেমন যাচ্ছে মা?”
নেহা মাথা নিচু করে একটু হাসার চেষ্টা করল।
“এই তো বাবা… অনেক ভালো।”
মি. রহমানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তাঁর চোখে ঘৃণা আর প্রতিশোধের আগুন।
“একটু অপেক্ষা কর। ওই ছোটলোকটাকে খুব দ্রুত মজা দেখাব। আমার মেয়েকে এভাবে অপমান করার সাহস দেখিয়েছে…”
নেহা কিছু বলল না। শুধু চুপ করে খেয়ে যেতে লাগল।
নেহার মা জোহরা বেগম চোখের পানি চেপে বললেন,
“হ্যাঁ, দ্রুত কিছু করো। আমার মেয়েটাকে কী পেয়েছে ওই ছোটলোকটা? এ কেমন শাস্তি…”
নেহা নীরবে খেয়ে উঠে গেল। তার মুখে কোনো কথা নেই। কিন্তু তার চোখ বলছিল — এই শাস্তি শুধু নিরঞ্জনের নয়, তার নিজেরও।
---
পরদিন সকালে আমি নেহাকে নিরঞ্জনের বাসায় নামিয়ে দিলাম। তুলসি তখনও ঘুমাচ্ছিল। নিরঞ্জন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে আমাকে ঘরে আসতে বলল, কিন্তু আমি গেলাম না। তার মুখের দিকে তাকাতেই আমার শরীরে আগুন জ্বলে উঠছিল। রাগ, ঘৃণা, অসহায়তা — সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। তবু আমি কিছু বুঝতে দিলাম না। শুধু “বিদায়” বলে চলে এলাম।
নেহা প্রথমে রান্না করল। তুলসি ঘুম থেকে উঠে খেয়ে কলেজে চলে গেল। নিরঞ্জনও রিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
আজ আকাশ অনেকক্ষণ ধরে ডাকাডাকি করছিল। কালো মেঘে ঢেকে গেছে চারপাশ। দুপুরের দিকে হঠাৎ ঝড় শুরু হলো। তারপর প্রবল বৃষ্টি। টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ — ঝমঝম, ঝমঝম। নেহা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সেই শব্দ শুনছিল। ছোট টিনের ঘর, বাইরে প্রবল বৃষ্টি, আর ভেতরে শুধু সে। এটা তার কাছে নতুন অভিজ্ঞতা। এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি লাগছিল তার। যেন এই বৃষ্টি তার ভেতরের ঝড়টাকেও ধুয়ে দিচ্ছে।
একটু পর ভিজে ভিজে নিরঞ্জন ফিরে এল। তার পুরো শরীর পানিতে ভেসে যাচ্ছে। চুল থেকে পানি ঝরছে। সে ঘরে ঢুকে বলল,
“আমার রুমের বিছানার উপর থেকে গামছাটা দেন তো।”
নেহা গিয়ে একটা পুরোনো, ছেঁড়া আর নোংরা গামছা এনে দিল। নিরঞ্জন কোনো ইতস্তত না করে তার ভেজা জামা-কাপড় সব খুলে ফেলল। শুধু সেই ছেঁড়া গামছাটা কোমরে জড়িয়ে নিল। তার রোগা, কালো, ভেজা শরীরটা ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে।
নেহা লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিল। তার গাল লাল হয়ে উঠল। সে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। কিন্তু তার মাথার ভেতর গত রাতের সেই দৃশ্য বারবার ভেসে উঠছিল।
নিরঞ্জন পেছন থেকে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। বৃষ্টির শব্দ আরও জোরে হয়ে উঠল। যেন এই ঝড় তাদের দুজনের মধ্যে আরেকটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।
আমি বাসায় বসে সবকিছু ভাবছিলাম। নেহার এই নতুন জীবন, তার পরিবর্তন, আর নিরঞ্জনের সাথে এই অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতা — সবকিছু আমাকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছিল।
নিরঞ্জন ভেজা শরীর মুছে একটা পুরোনো লুঙ্গি পরে এল। তার চুল এখনও ভেজা, পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে কপাল বেয়ে। সে খেতে বসল। নেহা চুপচাপ তার সামনে খাবার পরিবেশন করল — ভাত, ডাল, আলু ভাজি। দৃশ্যটা দেখলে মনে হবে যেন স্বামী-স্ত্রী। নেহা নিজেও এই চিন্তায় অস্বস্তি বোধ করছিল।
নেহা জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই বৃষ্টিতে তুলসি আসবে কীভাবে?”
নিরঞ্জন মুখ ভর্তি ভাত নিয়ে বলল,
“ও নাকি ওর বান্ধবীর বাসায় গেছে। আজ আর আসবে না।”
নেহা “ও আচ্ছা” বলে চুপ করে গেল।
নিরঞ্জন একটু থেমে বলল,
“আপনিও খেয়ে নিন।”
নেহা মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, খাচ্ছি।”
খাওয়া শেষ হলে নিরঞ্জন তার রুমে শুতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ থেমে গেল। সে নেহার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি আমার রুমে ঘুমাতে পারেন। আমি এখানে শুয়ে নেব।”
নেহা দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
“না, না। আমি এখানেই ঠিক আছি।”
নিরঞ্জন কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“এখানে বৃষ্টি আরও বাড়লে ভিজে যাবেন। ঠিক আছে, আমিই এখানে শুচ্ছি।”
কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই বৃষ্টি আরও প্রবল হয়ে উঠল। বারান্দা দিয়ে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। নেহা আর নিরঞ্জন দুজনেই দৌড়ে ভেতরের রুমে চলে এল। নিরঞ্জন দরজায় খিল লাগিয়ে দিল। বাইরের বৃষ্টির ছাঁট ভেতরেও আসছিল।
বিদ্যুৎ চলে গেছে অনেকক্ষণ আগে। ঘরটা একেবারে অন্ধকার। হাতড়ে হাতড়ে চলাফেরা করতে হচ্ছে। নেহার মোবাইলটা বারান্দায় ব্যাগের মধ্যে পড়ে আছে। সে আর বেরোতে সাহস পেল না।
নিরঞ্জন তার পুরোনো বাটন মোবাইলের টর্চ জ্বালাল। হালকা আলোয় ঘরটা আংশিক দেখা যাচ্ছে। সে নেহাকে বলল,
“আপনি বিছানায় শুয়ে পড়ুন। আমি নিচে শুচ্ছি।”
নিরঞ্জন একটা বালিশ নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। নেহা কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল।
বাইরে বৃষ্টি প্রবল হয়ে ঝরছে। টিনের ছাদে অবিরাম শব্দ — যেন হাজারটা ঢোল বাজছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি আর বজ্রপাতের আওয়াজে ঘর কেঁপে উঠছে।
নেহা অন্ধকারে চোখ খুলে শুয়ে আছে। তার হৃদয় দ্রুত ধুকপুক করছে। গত রাতের স্মৃতি, নিরঞ্জনের শরীরের উষ্ণতা, তার ভারী শ্বাস — সবকিছু মনে পড়ছে। এখন ঘরে শুধু তারা দুজন। কেউ কাউকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু উপস্থিতি অনুভব করছে।
নিরঞ্জন মেঝেতে শুয়ে নড়াচড়া করছে। তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ নেহা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। বৃষ্টির শব্দের মাঝেও সেই শব্দটা তার কানে বাজছিল।
নেহা চোখ বন্ধ করে ফেলল। কিন্তু ঘুম আসছিল না। তার শরীরে এক অদ্ভুত অস্বস্তি, লজ্জা আর একটা অজানা ভয় মিশে যাচ্ছিল। বাইরের ঝড় যেন তার ভেতরের ঝড়কে আরও উসকে দিচ্ছিল।
আর নিরঞ্জন? সে চুপ করে শুয়ে আছে, কিন্তু তার চোখ ঘুমিয়ে নেই।
বৃষ্টির শব্দ আর বজ্রপাতের আওয়াজে ঘরের নীরবতা আর সহ্য হচ্ছিল না নেহার। অন্ধকারে চোখ খুলে সে অনেকক্ষণ শুয়ে ছিল। শেষমেশ কাঁপা গলায় ডেকে উঠল,
“আপনি কি ঘুমিয়ে পড়েছেন?”
নিচ থেকে নিরঞ্জনের গলা ভেসে এল,
“না। কিছু লাগবে?”
নেহা কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে বলল,
“আপনি উপরে এসে শুতে পারেন। আমি এক কোণায় শুয়ে আছি, আপনি আরেক কোণায়। বিছানাটা তো বড়ই আছে।”
আসলে নেহার খুব ভয় করছিল। একা অন্ধকারে, প্রবল বৃষ্টি আর বজ্রপাতের মাঝে তার শরীর কাঁপছিল।
নিরঞ্জন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বুঝতে পারল। সে উঠে বিছানায় উঠে এল এবং একদম অন্য কোণায় শুয়ে পড়ল। এখন ঘরে নীরবতা আরও গাঢ় হয়ে উঠল। শুধু বৃষ্টির শব্দ আর তাদের দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাস।
কিছুক্ষণ পর নিরঞ্জন আস্তে করে বলল,
“আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? যদি আপনি কিছু মনে না করেন……”
সে থেমে গেল। আর কিছু বলল না।
নেহা ফিসফিস করে বলল,
“হ্যাঁ… আমার অনেক ভয় লাগছে।”
নিরঞ্জন আর দেরি করল না। সে হাত বাড়িয়ে নেহাকে তার দিকে টেনে নিল। নেহাকে তার বুকের উপর শুইয়ে দিল। তার শক্ত, উষ্ণ বুকের সাথে নেহার নরম শরীর লেগে গেল।
নেহা চমকে উঠে লজ্জায় বলে উঠল,
“আরে! আপনি কী করছেন?”
নিরঞ্জন তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“শুয়ে থাকুন। সমস্যা নেই। কেউ দেখবে না। এই ঘরে শুধু আমি আর আপনি। আর এটা কোনো খারাপ কিছু না।”
নেহা প্রথমে শক্ত হয়ে ছিল। কিন্তু নিরঞ্জনের গলার স্বরে, তার হাতের নরম স্পর্শে, আর বুকের স্থির হার্টবিট শুনে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল — এই মুহূর্তে নিরঞ্জনকে বিশ্বাস করা যায়। এটা কোনো জোরজবরদস্তি নয়, শুধু একটা নিরাপত্তার আশ্রয়।
নেহা তার বুকে মাথা রেখে শুয়ে রইল। তার কানে নিরঞ্জনের হৃদয়ের দ্রুত স্পন্দন শোনা যাচ্ছিল — ধুকধুক, ধুকধুক। বাইরে বৃষ্টি আর বজ্রপাত চলছেই। কিন্তু ভেতরে, এই অন্ধকার ঘরে, নেহা প্রথমবারের মতো এক অদ্ভুত নিরাপত্তা অনুভব করছিল। তার শরীর ধীরে ধীরে নিরঞ্জনের শরীরের সাথে মিশে যাচ্ছিল।
নিরঞ্জন এক হাত দিয়ে তার পিঠে আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছিল। কোনো কথা বলছিল না। শুধু নীরবে জড়িয়ে রেখেছিল।
নেহা চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার মনে হচ্ছিল — এই ঝড়ের দিন্টা হয়তো তার জীবনের আরেকটা অধ্যায় শুরু করছে।
আমি বাসায় বসে অডিও শুনছিলাম। নেহার শ্বাস, নিরঞ্জনের হার্টবিট, তাদের নীরব ঘনিষ্ঠতা — সবকিছু আমার বুকে ছুরির মতো বিঁধছিল।
Posts: 13
Threads: 1
Likes Received: 52 in 13 posts
Likes Given: 1
Joined: Jun 2026
Reputation:
5
পর্ব ৮
নিরঞ্জনের বুকের উষ্ণতা আর তার হৃদয়ের স্থির স্পন্দন নেহাকে এক অদ্ভুত নিরাপত্তায় ঘিরে ধরেছিল। বাইরের প্রবল বৃষ্টি আর বজ্রপাতের মাঝেও সে ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল। নিরঞ্জনও নেহার নরম শরীরের উষ্ণতা পেয়ে অনেকদিন পর শান্তিতে চোখ বন্ধ করল।
ঘুম ভাঙল যখন রাত অনেক হয়ে গেছে। নেহা নিজেকে নিরঞ্জনের বুকের উপর শুয়ে থাকতে দেখে চমকে উঠল। নিরঞ্জনের একটা হাত তার পিঠের উপর আলতো করে রাখা। কিন্তু তার চোখে ঘুম।।
নিরঞ্জন চোখ খুলে ফিসফিস করে বলল,
“উঠে গেছেন?”
নেহা ঘুম-ঘুম চোখে বলল,
“হ্যাঁ… বৃষ্টি থেমে গেছে মনে হয়।”
হঠাৎ তার খেয়াল হলো সে এখনও নিরঞ্জনের বুকে শুয়ে আছে। সে দ্রুত উঠে বসল।
“কতক্ষণ ঘুমিয়েছি? বাজে কয়টা?”
নেহা উঠে বারান্দায় গেল। বাইরে অন্ধকার ঘন হয়ে আছে। সে বুঝতে পারল — রাত অনেক হয়ে গেছে। ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে দেখল রাত ১টা বেজে গেছে। স্ক্রিনে ২৪টা মিসড কল — সব আমার।
নেহা আমাকে কল করল। আমি ঘুম-জড়ানো গলায় বললাম,
“হ্যালো নেহা? কোথায় ছিলে? তোমাকে নিতে গিয়েছিলাম, পাইনি।”
নেহা একটু থেমে বলল,
“ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আচ্ছা, তুমি ঘুমাও। আমি বাসায় আসছি।”
আমার চোখে অনেক ঘুম থাকায় আমি খেয়াল করিনি কয়টা বাজে।
ফোন রাখতেই নেহার মনে পড়ল তুলসির কথা। নেহা নিরঞ্জনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“তুলসি আজ আসেনি?”
নিরঞ্জন তার পুরোনো মোবাইলটা দেখিয়ে বলল,
“একটা মেসেজ এসেছে। কী লিখেছে পড়তে পারি না।”
নেহা মোবাইলটা নিয়ে পড়ল:
“নতুন মা, আমি আজ বাসায় আসব না। অনেক বৃষ্টি। আমি আমার বান্ধবীর বাসায় ঘুমাব। আমি জানি বাবা পড়তে পারে না, তাই তোমাকে বললাম।”
নেহা নিরঞ্জনকে বলল,
“তুলসি আজ আসবে না। বান্ধবীর বাসায় ঘুমাবে।”
নিরঞ্জন শান্তভাবে বলল, “ও আচ্ছা।”
নেহা উঠে বলল,
“আচ্ছা, আমি যাই।”
নিরঞ্জন তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“এত রাতে? বাইরে এখন অন্ধকার। আপনি আমার রুমে ঘুমান, আমি বাইরে শুয়ে নেব।”
ঠিক তখনই বাইরে শিয়ালের কর্কশ ডাক ভেসে এল। নেহার শরীর কেঁপে উঠল।
নিরঞ্জন আবার বলল,
“আপনি একা ঘুমাতে ভয় পেলে… আমরা দুপুরের মতোই ঘুমাই। এটা কেউ দেখবে না। আর আমরা তো খারাপ কিছু করছি না।”
নেহা চুপ করে রইল। আজ সে নিরঞ্জনের বুকে যে নিরাপদ ঘুমটা ঘুমিয়েছে, সেই অনুভূতিটা এখনও তার শরীরে লেগে আছে। কিন্তু তবুও… সে তো পরপুরুষ।
আবার শিয়ালের ডাক শোনা গেল। নেহা ভয়ে কেঁপে উঠে আস্তে করে বলল,
“আচ্ছা…”
নিরঞ্জন কোনো কথা না বলে বিছানায় উঠে এল। নেহাও ধীরে ধীরে তার পাশে শুয়ে পড়ল। বাইরে বৃষ্টির অবশিষ্ট ফোঁটা আর শিয়ালের ডাক চলছেই।
দরজায় খিল দেওয়া। বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। নেহা আর নিরঞ্জন আবার সেই একই অবস্থায় শুয়ে আছে। নেহা নিরঞ্জনের বুকে মাথা রেখে, আর নিরঞ্জনের একটা হাত তার পিঠের উপর আলতো করে বুলিয়ে যাচ্ছে।
নিরঞ্জন ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল,
“ঘুম আসছে আপনার?”
নেহা তার বুকের উষ্ণতায় মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না তো… আপনার?”
নিরঞ্জন নরম গলায় বলল,
“না।”
বাইরে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি থেকে ধীরে ধীরে জোরালো বৃষ্টি শুরু হলো। টিনের ছাদে শব্দ বেড়ে উঠছে। নেহা নিরঞ্জনের বুক থেকে মাথা তুলে বলল,
“আবার শুরু হলো বৃষ্টি।”
নিরঞ্জন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“হ্যাঁ। এই বৃষ্টির কারণে আজ আয় প্রায় শূন্য। কাল বাজারে যেতে হবে। চাল-ডাল কিছুই নেই। টাকা-পয়সাও নেই। কী যে আনব…”
কথা বলতে বলতে নিরঞ্জনের হাত ধীরে ধীরে নেহার পিঠ থেকে নেমে তার নিতম্বের উপর চলে গেল। নরম করে বুলিয়ে দিতে লাগল। নেহার শরীর শক্ত হয়ে গেল। সে দ্রুত হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,
“কত টাকা লাগবে?”
নিরঞ্জন আবার হাতটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল। নেহা আবারও হাত সরিয়ে দিল।
নিরঞ্জন নিচু গলায় বলল,
“কেন, আপনি জেনে কী করবেন?”
নেহা একটু জোর দিয়ে বলল,
“কেন আমি জানতে পারি না?”
এবার নিরঞ্জন আরও স্পষ্টভাবে নেহার নিতম্বে চাপ দিল। নেহা “উহ্” করে উঠল। তার শরীর কেঁপে উঠেছিল।
নিরঞ্জন শান্ত গলায় বলল,
“না, আমিই কাল যোগাড় করে নেব।”
নেহা আর কিছু বলল না। সে বুঝতে পারছিল — এই মুহূর্তে পরিস্থিতি অন্য রকম হয়ে যেতে পারে। তাই সে নিরঞ্জনের খারাপ স্পর্শ নিয়ে আর কথা বাড়াল না। অন্য কথা বলতে থাকল।
দুজনে কথা বলছিল। নেহা এখনও নিরঞ্জনের বুকে শুয়ে আছে। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আর মাঝে মাঝে বজ্রপাত। নিরঞ্জনের হাত মাঝে মাঝে তার শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু নেহা মাঝেমধ্যে প্রতিবাদ করছে । সে শুধু চুপ করে শুয়ে আছে। তার মনে হচ্ছিল — এটা যেন একটা অদ্ভুত সহাবস্থান। ভয় আর নিরাপত্তার মাঝে আটকে পড়া এক অস্বস্তিকর সম্পর্ক।
নিরঞ্জনের হাত আবার তার নিতম্বে চলে গেল। এবার নেহা শুধু চুপ করে রইল। তার চোখ বন্ধ। বাইরের বৃষ্টি যেন তাদের এই ঘনিষ্ঠতাকে আরও গাঢ় করে তুলছিল।
বৃষ্টির শব্দ আরও জোরে হয়ে উঠেছে। ঘরের অন্ধকারে শুধু তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস আর বাইরের ঝমঝম শব্দ। নিরঞ্জনের হাত নেহার নিতম্বের উপর আরও জোরে চেপে বসল। নরম, কিন্তু দখলদারী স্পর্শ। নেহা আর প্রতিবাদ করল না। তার শরীর শক্ত হয়ে ছিল, কিন্তু সে চুপ করে রইল। যেন এটাই এখন তার নিয়তি।
সে অন্য কথা বলার চেষ্টা করল, গলা কাঁপছে।
“তুলসিকে একটা ভালো কলেজে দাও। মনে হয় না এই কলেজে পড়ে তার ভালো হবে।”
নিরঞ্জন তার নিতম্ব চেপে ধরে আস্তে আস্তে মালিশ করতে করতে বলল,
“আসলে টাকাই তো আয় করতে পারি না। মায়ের ওষুধেই কত টাকা লাগে প্রতি মাসে…”
নেহা তার বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল,
“হ্যাঁ… কিন্তু তুমি চাইলে আমি সাহায্য করতে পারি।”
নিরঞ্জনের হাত থেমে গেল। সে নেহার কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু গলায় বলল,
“পাছাটা একটু উঁচু করো।”
নেহার খেয়াল অন্যদিকে ছিল। সে পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। কিন্তু নিরঞ্জনের কণ্ঠস্বরে একটা আদেশের সুর ছিল। নেহা অনিচ্ছাসত্ত্বেও কোমরটা একটু উঁচু করে দিল। এবার নিরঞ্জন তার নিতম্বটা আরও সহজে, আরও জোরে চেপে ধরতে পারল। তার আঙুলগুলো নেহার নরম মাংসে গেঁথে যাচ্ছিল।
নিরঞ্জন গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
“তুমি শুধু ঘরের কাজ করো। অন্য সাহায্য করতে হবে না।”
নেহা তার বুকে মুখ গুঁজে রেখে আস্তে করে বলল,
“আচ্ছা…”
ঘরে শুধু বৃষ্টির শব্দ। নিরঞ্জনের হাত তার নিতম্বের উপর ঘুরে বেড়াচ্ছে — কখনো চাপ দিয়ে, কখনো আলতো করে। নেহা চুপ করে আছে। তার মনে হচ্ছিল, এই স্পর্শ আর প্রতিবাদ না করাটাই এখন তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। সে শুধু নিরঞ্জনের বুকের উষ্ণতায় মাথা রেখে শুয়ে রইল। তার চোখ বন্ধ। কিন্তু ঘুম আসছে না।
নিরঞ্জনের হাত থেমে থেমে আবার শুরু করছে। অন্ধকারে তার চোখে একটা অদ্ভুত ক্ষুধা জ্বলছে। আর নেহা — সে আর কিছু বলছে না। শুধু মেনে নিচ্ছে।
বাইরের বৃষ্টি যেন তাদের এই নীরব, অন্ধকার ঘনিষ্ঠতাকে আরও গভীর করে তুলছিল।
Posts: 3,395
Threads: 78
Likes Received: 2,537 in 1,536 posts
Likes Given: 781
Joined: Nov 2018
Reputation:
130
•
Posts: 498
Threads: 0
Likes Received: 270 in 218 posts
Likes Given: 760
Joined: Jan 2019
Reputation:
6
darun... natun concept....update pls
•
Posts: 13
Threads: 1
Likes Received: 52 in 13 posts
Likes Given: 1
Joined: Jun 2026
Reputation:
5
পর্ব ৯
সকালে উঠে নেহা গোসল করতে গেল। ছোট্ট, অন্ধকার, নোংরা গোসলখানায় পানি ঢেলে গোসল করতে তার খুব ঘৃণা লাগছিল। পুরোনো বালতি, ভাঙা মগ, আর সেই তীব্র গন্ধ — সবকিছু তার শরীর শিউরিয়ে তুলছিল। কিন্তু কিছু করার ছিল না। এখানে তার কোনো অপশন নেই।
সারারাত সে নিরঞ্জনের বুকে শুয়ে ছিল। তার গায়ের গন্ধ এখনও নেহার শরীরে লেগে আছে — ঘাম, ধুলো আর পুরুষালি গন্ধের মিশ্রণ। আর নিরঞ্জন সারারাত তার নিতম্বে হাত বুলিয়েছে, চেপে ধরেছে, আদর করেছে। নেহা চুপ করে সহ্য করেছে। এখন সেই স্পর্শের স্মৃতি তার শরীরে এখনও জ্বলজ্বল করছে।
গোসল সেরে বেরিয়ে এসে সে দেখল তুলসি বান্ধবীর বাসা থেকে ফিরে এসেছে। ছোট মেয়েটা খুশিতে নেহাকে জড়িয়ে ধরল। নেহা হাসার চেষ্টা করল। তারপর রান্না করল, খাবার বেড়ে দিল। তুলসি খেয়ে কলেজে চলে গেল। নিরঞ্জনও রিকশা নিয়ে বেরোবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
একটু পর আমি নেহাকে নিতে গেলাম। দেখলাম নিরঞ্জন রিকশা নিয়ে বের হতে যাচ্ছে। আমরা দুজন কথা বলছিলাম। ঠিক তখন নেহা এদিকে এসে পড়ল।
নেহা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“তোমরা কী বিষয়ে কথা বলছ?”
আমি স্বাভাবিকভাবে বললাম,
“তোমার দুই দিন ছুটির ব্যাপারে।”
নিরঞ্জন মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, আপনার দুই দিন ছুটি লাগে। আপনি হয়তো অনেক ক্লান্ত। বিশ্রাম নিন।”
নেহার মুখটা তৎক্ষণাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তার চোখে স্পষ্ট আনন্দ।
“তাই নাকি? খুব ভালো।”
আমি নেহাকে নিয়ে বাসায় ফিরলাম। বাড়িতে ঢুকতেই নেহা হাঁফ ছেড়ে বলে উঠল,
“ওয়াও… দুইদিন ছুটি! কী মজা!”
সে হাসছিল। কিন্তু আমি তার হাসির ভেতরে একটা অদ্ভুত ক্লান্তি আর স্বস্তি দেখতে পাচ্ছিলাম। যেন এই দুই দিনের ছুটি তার কাছে একটা বড় স্বস্তি। আমার বুকের ভেতরটা আবার মুচড়ে উঠল। নেহা কতটা বদলে যাচ্ছে, আর আমি কতটা অসহায় — এই চিন্তাটা প্রতিদিন আরও ভারী হয়ে উঠছে।
নেহা ঘরে ঢুকে জামা বদলাতে বদলাতে আবার বলল,
“দুইদিন… সত্যি খুব ভালো লাগছে।”
আমি চুপ করে তাকিয়ে রইলাম। তার কথার ভেতরে লুকানো সেই অন্ধকার রাতগুলোর ছায়া আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম।
বাসায় ফিরে নেহা যেন হঠাৎ করে আবার তার পুরনো জগতে ফিরে এসেছে। বড় বাথরুম, গরম পানি, সুগন্ধি সাবান, নরম তোয়ালে — সবকিছু তার শরীরকে আদর করছিল। সে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে গোসল করল। বারবার সাবান মাখল, যেন নিরঞ্জনের শরীরের গন্ধ, তার হাতের স্পর্শ, তার ঘাম — সবকিছু ধুয়ে ফেলতে পারবে।
কিন্তু পানির নিচে দাঁড়িয়েও তার মনে বারবার সেই রাতের ছবি ভেসে উঠছিল। নিরঞ্জনের কালো, শক্ত শরীর। তার রুক্ষ হাত নেহার নিতম্ব চেপে ধরে রাখা। তার ভারী শ্বাসের শব্দ। আর সেই অদ্ভুত অনুভূতি — ভয়, ঘৃণা আর একটা অজানা আকুলতার মিশ্রণ।
গোসল শেষে নেহা একটা হালকা নাইটি পরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। তার চুল এখনও ভেজা। আমি পাশে বসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম।
“কেমন লাগছে?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
নেহা চোখ বন্ধ করে বলল,
“অনেক ভালো। যেন জেল থেকে ছাড়া পেয়েছি।”
কথাটা বলার সময় তার গলায় একটা তিক্ততা ছিল। কিন্তু সেই তিক্ততার ভেতরেও কোথায় যেন একটা স্বস্তি লুকিয়ে ছিল। দুইদিনের ছুটি তার কাছে সত্যিই বড় উপহার হয়ে উঠেছিল।
সারাদিন সে বাড়িতে ঘুরে বেড়াল। টিভি দেখল, ফোন ঘাঁটল, মায়ের সাথে অনেকক্ষণ গল্প করল। কিন্তু আমি লক্ষ্য করছিলাম — সে অন্যমনস্ক। কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যাচ্ছে। কখনো কখনো তার হাতটা অজান্তেই তার নিতম্বের কাছে চলে যাচ্ছে, যেন সেই রুক্ষ স্পর্শের স্মৃতি এখনও শরীরে লেগে আছে। হয়ত একটু ভয়।
রাতে খাওয়ার পর আমরা শুতে গেলাম। অনেকদিন পর নেহা আমার কাছে এল। তার শরীরটা আমার শরীরের সাথে লেপটে গেল। কিন্তু আমি যখন তাকে আদর করতে শুরু করলাম, সে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তার শরীর সাড়া দিচ্ছিল, কিন্তু মনটা অনেক দূরে।
আমি তার কানের কাছে ফিসফিস করে বললাম,
“কী হয়েছে নেহা? কিছু মনে পড়ছে?”
নেহা চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর খুব আস্তে বলল,
“সৈকত… সেখানে সবকিছু এত নোংরা… এত ছোট… কিন্তু সেখানে কোনো লুকোছাপা নেই। কেউ কিছু চায় না, কেউ কোনো অভিনয় করে না।”
আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। নেহা এই প্রথম এভাবে কথা বলল।
পরের দিনও একইরকম কাটল। নেহা বাইরে বেরোল না। বাড়িতে বসে রইল। কিন্তু সন্ধ্যার পর তার মেজাজটা কেমন যেন চড়া হয়ে গেল। সে অস্থির হয়ে ঘুরছিল। একবার বলল, “শরীরটা ভালো লাগছে না।” আরেকবার বলল, “ঘরটা গরম লাগছে।”
রাতে আবার আমি তার কাছে যেতে চাইলাম। এবার নেহা আমাকে থামিয়ে দিল।
“আজ না, সৈকত। মাথা ব্যথা করছে।”
কিন্তু আমি দেখলাম, তার শরীরটা লাল হয়ে আছে। তার নিশ্বাস ভারী। সে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, কিন্তু তার একটা হাত অজান্তেই তার উরুর ভেতরে চলে গিয়েছিল।
আমি চুপ করে পাশ ফিরে শুয়ে রইলাম। আমার মাথার ভেতরে ঘুরছিল — দুইদিনের ছুটি শেষ হতে আর মাত্র একটা দিন বাকি। কাল দিনে আবার নেহাকে নিরঞ্জনের ঘরে ফিরে যেতে হবে।
আর এই দুইদিনে নেহা যে পরিবর্তনটা দেখিয়েছে, তা আমাকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল। সে আর আগের মতো ঘৃণায় থুতু ফেলছে না। বরং কোথাও যেন একটা অদ্ভুত অভ্যস্ততা তৈরি হচ্ছে।
পরের দিন সকালে নেহা যখন চা খাচ্ছিল, হঠাৎ বলে উঠল,
“তুলসিটা নিশ্চয়ই আমার জন্য অপেক্ষা করছে…”
আমি চুপ করে তাকিয়ে রইলাম।
নেহা নিজেও যেন তার কথাটা শুনে নিজেকে সামলাল। তারপর দ্রুত বলল,
“মানে… কাজটা তো শেষ করতে হবে।”
কিন্তু তার চোখে সেই পুরনো অহংকার আর ছিল না। বদলে একটা জটিল, অস্বস্তিকর আকর্ষণের ছায়া দেখতে পেলাম।
Posts: 13
Threads: 1
Likes Received: 52 in 13 posts
Likes Given: 1
Joined: Jun 2026
Reputation:
5
পর্ব ১০
ছুটির দুইদিন খুব দ্রুত কেটে গেল। সকালে নেহা চুপচাপ তৈরি হচ্ছিল। তার মুখে আর আগের মতো তীব্র ঘৃণা বা অস্বস্তি ছিল না, বরং একটা অদ্ভুত স্থিরতা।
আমি বললাম, “তোমার যদি খারাপ লাগে তাহলে আরেকটা দিন ছুটি নাও। নিরঞ্জন ভালো লোক, চাইলে নিশ্চয়ই দিয়ে দেবে।”
নেহা মাথা নেড়ে বলল,
“না থাক। ভালো মানুষ বলে আমরা সুযোগ নেব? কাজ তো শেষ করতেই হবে।”
আমি আর কথা বাড়ালাম না। তাকে নিয়ে গেলাম নিরঞ্জনের বাড়িতে।
তুলসি আজ কলেজে যাই নি, নেহা না থাকায় বাড়ির সব কাজ তুলসি করে, তাই আর কলেজ্ব যাওয়া হয় নি।
নেহা ঘরে ঢুকতেই তুলসি দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
“নতুন মা! তুমি এসে পড়েছ! আমি ভেবেছিলাম আরও পরে আসবে!”
নেহা হেসে তুলসির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“কেন? তুমি কি ভেবেছিলে আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাব?”
তুলসি খুশিতে লাফাতে লাফাতে বলল, “আমি তোমাকে অনেক মিস করেছি নতুন মা!”
নেহা আস্তে করে বলল,
“আমিও তোমাকে অনেক মিস করেছি।”
সে তার ব্যাগ থেকে একটা সুন্দর ছোট পুতুল বের করে তুলসির হাতে দিল। তুলসির চোখ চকচক করে উঠল। নেহা থালা-বাসন ধোয়ার কাজে হাত লাগাল, আর তুলসি পাশে বসে গল্প করতে থাকল। দুজনের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা চলছিল। আমি দেখে অবাক হয়ে গেলাম—নেহা এখন এই ছোট মেয়েটার সাথে কত সহজে মিশে যাচ্ছে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। আমার অফিসে সত্যিই অনেক কাজ ছিল। আমি নেহাকে ফোন করে বললাম,
“আজ একটু লেট হবে। তুমি একা চলে এসো না, ভয় পাবে। আমি কাজ শেষ করে গিয়ে তোমাকে নিয়ে আসব।”
নেহা সংক্ষেপে বলল, “ঠিক আছে।”
সন্ধ্যার একটু পর নিরঞ্জন রিকশা চালিয়ে ফিরল। ঘামে ভেজা শরীর, ধুলো-মাখা জামা। ঘরে ঢুকেই দেখল নেহা আর তুলসি মেঝেতে বসে গল্প করছে।
তুলসি উত্তেজিত হয়ে বলল,
“বাবা দেখো! নতুন মা আমার জন্য কত সুন্দর পুতুল এনেছে!”
নিরঞ্জন হেসে বলল, “খুব সুন্দর হয়েছে। এখন যা, পড়তে বস।”
তুলসি নেহার গালে একটা চুমু দিয়ে বলল, “নতুন মা, আমি পড়তে যাচ্ছি। পরে আবার গল্প করব।”
তুলসি চলে যাওয়ার পর ঘরে শুধু নেহা আর নিরঞ্জন রইল। বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
নেহা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনি বিশ্রাম নিন। আমি বাইরে আছি।”
নিরঞ্জন তার রুক্ষ গলায় বলল,
“বসুন। সমস্যা নেই।”
নেহা এক মুহূর্ত ইতস্তত করল, তারপর আস্তে আস্তে বসে পড়ল। নিরঞ্জন তার জামা খুলে রাখল। তার কালো, শক্ত শরীর ঘামে চকচক করছিল। সে পাশের চেয়ারে বসে পানি খেতে খেতে নেহার দিকে তাকিয়ে রইল।
নেহা চোখ নামিয়ে নিল। কিন্তু তার শরীরের ভেতরে সেই পরিচিত অস্বস্তি আবার জেগে উঠছিল। দুইদিনের ছুটিতে সে যতটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল, এখন আবার সেই ঘরে ফিরে আসায় সবকিছু যেন আবার গুলিয়ে যাচ্ছিল।
নিরঞ্জন আস্তে করে বলল,
“দুইদিন পর ফিরলে বেশি ভালো লাগে, না?”
নেহা কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার আঙুলগুলো নিজের কাপড়ের কিনারা চেপে ধরল।
নেহা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার হাতের আঙুলগুলো নিজের শাড়ির কুঁচি চেপে ধরে ছিল। ঘরের ভেতরে হালকা একটা আলো জ্বলছিল, বাইরে থেকে রিকশার শব্দ আর দূরের কুকুরের ডাক ভেসে আসছিল। নিরঞ্জনের শরীর থেকে এখনও ঘাম আর ধুলোর তীব্র পুরুষালি গন্ধ বেরোচ্ছিল — সেই গন্ধটা নেহার নাকে ঢুকে তার শরীরের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে গুলিয়ে দিচ্ছিল।
নেহা শুকনো গলায় জিজ্ঞাসা করল,
“আপনার এই দুই দিন কেমন কাটল?”
নিরঞ্জন তার কালো, শক্ত চেহারায় একটা হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“ভালোই গেল। খারাপ না। তবে... আপনাকে ছাড়া ঘরটা খালি খালি লাগছিল।”
নেহা চোখ নামিয়ে নিল। তার গাল দুটো অল্প লাল হয়ে উঠল।
“তাহলে তো ভালোই।”
কথাটা বলার পর ঘরে আবার সেই ভারী নীরবতা নেমে এল। নিরঞ্জন আর চুপ করে থাকতে পারছিল না। তার চোখ দুটো নেহার মুখের উপর স্থির হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে তার গোলাপি, নরম, পাতলা ঠোঁটের দিকে। কী অপূর্ব সুন্দর! ধনী বাড়ির নরম, লালিত-পালিত ঠোঁট — যা কখনো রোদে পোড়েনি, কখনো কষ্ট পায়নি। নিরঞ্জনের শরীরের ভেতরে আগুন জ্বলে উঠল। দুইদিন ধরে সে এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিল। তার লিঙ্গ কাপড়ের ভেতরে শক্ত হয়ে উঠতে শুরু করল।
সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
নিরঞ্জন চেয়ার থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। তার শক্তিশালী শরীরটা এক লাফে নেহার খুব কাছে চলে এল। নেহা চমকে মুখ তুলতেই দেখল নিরঞ্জনের মুখ তার মুখের খুব কাছে। তার গরম, ভারী নিশ্বাস নেহার ঠোঁটে লাগছিল।
“কী করছেন! ছাড়ুন আমাকে!” নেহা ভয়ে পেছনে সরে যেতে চাইল।
কিন্তু নিরঞ্জনের চোখে তখন শুধু লালসা। তার গলা রুক্ষ ও ভাঙা শোনাল,
“আমি আর পারছি না...”
সে দুই হাতে নেহার কাঁধ চেপে ধরল এবং ঝুঁকে পড়ে তার নরম গোলাপি ঠোঁটে জোর করে চুমু খেতে গেল। তার পুরু, গরম ঠোঁট নেহার ঠোঁটের উপর চেপে বসল। নিরঞ্জনের জিভ নেহার ঠোঁট ফাঁক করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছিল। তার একটা হাত নেহার পিঠ বেয়ে নিচে নেমে তার নিতম্ব চেপে ধরল, শক্ত করে।
নেহার শরীর কেঁপে উঠল। সে জোরে ধাক্কা দিল নিরঞ্জনের বুকে।
“আঃ! ছাড়ুন বলছি!!”
ধাক্কার চাপে নিরঞ্জন একটু পিছিয়ে গেল, কিন্তু তার হাত এখনও নেহার কোমর আঁকড়ে ধরে ছিল। ঠিক তখনই একটা শব্দ হল — চেয়ারটা উলটে পড়ার আওয়াজ।
দরজার কাছে দৌড়ে এল তুলসি। তার চোখে ভয় আর বিস্ময়।
“কী হয়েছে নতুন মা?!”
তুলসিকে দেখে নিরঞ্জনের শরীরটা শক্ত হয়ে গেল। তার হাত দুটো নেহার কাঁধ থেকে আস্তে করে সরে গেল। নেহা দ্রুত পিছিয়ে গিয়ে শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে উঠে দাঁড়াল। তার শ্বাস এখনও ভারী, চোখে ভয় আর অপমান মিশ্রিত।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে আমার গলা ভেসে এল — জোরে, উদ্বিগ্ন।
“নেহা! নেহা!!”
নেহা যেন জীবনের শেষ সুযোগ পেয়েছে এমনভাবে দরজার দিকে দৌড়ে গেল। নিরঞ্জন কিছু বলার আগেই সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। আমি গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নেহা সোজা দৌড়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। তার চুল এলোমেলো, ঠোঁট ফুলে আছে, শাড়ির আঁচল অগোছালো। কিন্তু আমি কোনো প্রশ্ন করলাম না। চুপচাপ গাড়ি স্টার্ট দিলাম।
ঘরের ভেতরে তুলসি বারবার জিজ্ঞাসা করছিল,
“বাবা, নতুন মা কোথায় যাচ্ছে? কী হয়েছে বাবা? নতুন মা কেন এত তাড়াহুড়ো করে চলে গেল?”
নিরঞ্জন কোনো উত্তর দিল না। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, তার মুখ শক্ত হয়ে আছে। তার শরীর এখনও উত্তেজনায় ভরা, কিন্তু সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে গেছে।
গাড়িতে নেহা জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে বসে ছিল। আমি আড়চোখে দেখলাম — তার চোখে পানি চিকচিক করছে। এক ফোঁটা গাল বেয়ে নেমে এল। সে চুপ করে কাঁদছিল, কিন্তু কোনো শব্দ করছিল না। আমি এখনও কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না। শুধু গাড়ি চালিয়ে বাড়ির দিকে যেতে থাকলাম। আমার বুকের ভেতরে ঝড় চলছিল।
বাসায় ফিরে নেহা সোজা বাথরুমে চলে গেল। অনেকক্ষণ ধরে গোসল করল। আমি বাইরে অপেক্ষা করছিলাম। রাতে খাওয়ার পর সে খুব তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল। আমি তার পাশে শুয়ে অপেক্ষা করছিলাম। যখন নিশ্চিত হলাম যে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে, তখন আমি উঠে ল্যাপটপ খুললাম।
অডিও ক্লিপটা প্লে করলাম। নিরঞ্জনের রুক্ষ গলা, নেহার ভয়ার্ত প্রতিবাদ, চুমুর শব্দ, ধাক্কাধাক্কি, চেয়ার উলটে পড়ার আওয়াজ — সবকিছু পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। ভিডিওটাও চেক করলাম। ছবিটা একটু ঝাপসা হলেও যথেষ্ট স্পষ্ট। নিরঞ্জনের জোর করে চুমু খাওয়া, নেহাকে শুইয়ে দেওয়ার চেষ্টা — সব রেকর্ড হয়েছে।
এবার নিরঞ্জনকে ফাঁসানো যাবে। পুলিশে দেওয়া যাবে, শ্বশুরকে বাঁচানো যাবে, সবকিছু শেষ করা যাবে।
কিন্তু...
আমি নেহার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে যদি জানতে পারে যে আমি ঘরে ক্যামেরা-মাইক্রোফোন লাগিয়ে রেখেছিলাম? যে আমি পুরো ঘটনা রেকর্ড করছিলাম? সে তো আমাকে কিছুই বলেনি। যদি সে জানতে পারে যে আমি সবকিছু দেখেছি এবং শুনেছি, তাহলে কি সে উলটো আমার উপরই রাগ করবে? আমাকে বিশ্বাসঘাতক ভাববে?
আমার হাত কাঁপছিল। এই প্রমাণগুলো শক্তিশালী, কিন্তু এর পেছনে আমার নিজের লুকানো অপরাধও রয়েছে। নেহা যদি জানে যে আমি তাকে এভাবে নজরদারিতে রেখেছি, তাহলে হয়তো সবকিছু আরও জটিল হয়ে যাবে।
আমি ল্যাপটপ বন্ধ করে তার পাশে শুয়ে পড়লাম। নেহার চোখের পানির দাগ এখনও তার গালে শুকিয়ে আছে। আমি চুপ করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।
Posts: 77
Threads: 0
Likes Received: 54 in 41 posts
Likes Given: 59
Joined: Sep 2019
Reputation:
1
দারুণ হয়েছে। পরবর্তীতে নেহা কি করবে? নেহা কি নিরঞ্জনের প্রেমে পড়ে যাবে? তার সাথে ধীরে ধীরে অবাধ যৌনতায় মেতে উঠবে? এসব সাসপেন্স দেখার উপেক্ষায় থাকলাম। শুভাশিস রইল।
•
Posts: 6
Threads: 0
Likes Received: 1 in 1 posts
Likes Given: 0
Joined: Oct 2025
Reputation:
0
অসাধারণ চালিয়ে যান সাথে আছি
•
Posts: 338
Threads: 3
Likes Received: 328 in 155 posts
Likes Given: 664
Joined: Apr 2021
Reputation:
12
অসাধারণ তবে নিয়মিত আপডেটের অনুরোধ রইল।
•
Posts: 498
Threads: 0
Likes Received: 270 in 218 posts
Likes Given: 760
Joined: Jan 2019
Reputation:
6
•
Posts: 144
Threads: 0
Likes Received: 47 in 37 posts
Likes Given: 5
Joined: Jul 2024
Reputation:
0
•
Posts: 13
Threads: 1
Likes Received: 52 in 13 posts
Likes Given: 1
Joined: Jun 2026
Reputation:
5
পর্ব ১১
পরের দিন সকালে বাসায় ডাইনিং টেবিলে আমি, নেহা, মি. রহমান এবং মিসেস জোহরা বসে ডিনার করছিলাম। নেহা চুপচাপ খাচ্ছিল। তার চোখের নিচে হালকা কালি, মুখটা ফ্যাকাশে। গত রাতের ঘটনার পর থেকে সে খুব কম কথা বলছে।
হঠাৎ মি. রহমানের ফোন বেজে উঠল। তিনি ফোনটা তুলে লাউড স্পিকারে দিলেন।
“হ্যালো স্যার।”
ওপাশ থেকে একটা ভারী, ঠান্ডা গলা ভেসে এল,
“আজ রাতে সব প্রস্তুত। আপনি নির্দেশ দিলে আজ রাতেই লোকটাকে শেষ করে দিব।”
টেবিলের সবাই চুপ হয়ে গেল। নেহার হাতের চামচটা থেমে গেল। আমি তার মুখের দিকে তাকালাম।
মি. রহমান শান্ত গলায় বললেন,
“ঠিক আছে। রাতে যখন সে রিকশা নিয়ে বাসায় ফিরবে, তখন কাজটা সেরে ফেলো।”
ফোন রেখে তিনি নেহার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
“তুই আর চিন্তা করিস না নেহা মা। আজ রাতেই ওই রিকশাওয়ালার খবর করে দিব।”
নেহা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তার গলা কেঁপে গেল,
“কী করবেন বাবা?”
মি. রহমান নির্লিপ্তভাবে বললেন,
“আজ রাতে ওর রিক্সা যখন বাসায় ফিরবে, তখন একটা ট্রাক ধাক্কা মারবে। আর ওর জীবন শেষ। সহজ, পরিষ্কার। কেউ কিছু বুঝতেও পারবে না।”
নেহার মুখটা সাদা হয়ে গেল। সে দ্রুত বলে উঠল,
“বাবা… লোকটার পরিবার আছে। একটা ছোট মেয়ে আছে। তুলসী…”
মি. রহমান নেহার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন,
“তুইও তো আমার মেয়ে। আমার একমাত্র মেয়েকে ও দাসী বানিয়ে রেখেছে, আমার কি সহ্য হয়? তোর অপমান আমি সহ্য করতে পারি না নেহা। তুই শুধু চুপ করে থাক। সব আমি সামলাব।”
নেহা আর কোনো কথা বাড়াল না। সে মাথা নিচু করে বসে রইল। তার হাত কাঁপছিল। মিসেস জোহরা কিছু বললেন না, শুধু চিন্তিত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সারাদিন নেহা মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়াল। কখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকছে, কখনো জানালার কাছে চুপ করে বসে আছে। তার চোখে একটা অস্থিরতা। কখনো কখনো সে যেন কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু বলতে পারছে না। আমি তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম,
“কী হয়েছে নেহা?”
সে শুধু মাথা নেড়ে বলল, “কিছু না।”
অন্যদিকে, নিরঞ্জনের ঘরে তুলসি বাবার কাছে বারবার জিজ্ঞাসা করছিল,
“বাবা, নতুন মা কোথায়? উনি আজ আসবেন না? আমার খুব মনে পড়ছে।”
নিরঞ্জন রাগ দেখিয়ে,
“সময় হলে আসবে। তুই এখন কলেজে যা। দেরি হয়ে যাবে।”
তুলসি মন খারাপ করে কলেজের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল। নিরঞ্জন একা ঘরে বসে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। গতকাল রাতের ঘটনাটা তার মাথায় ঘুরছিল। তারপর রিকশাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। সকালের রোদে তার কালো শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছিল। সে জানেও না, আজ রাতে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে।
রাত হয়ে গিয়েছিল। আমি অফিসের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে দেখি নেহা নেই। তার ফোনও বন্ধ। ঘরের আলো জ্বলছে, কিন্তু সে কোথাও নেই। আমি পুরো বাড়ি খুঁজলাম। শেষে মিসেস জোহরার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
“মা, নেহা কোথায়?”
মিসেস জোহরা শান্ত গলায় বললেন,
“ও তার এক বান্ধবীর বাসায় গেছে। তুমি চিন্তা কোরো না। একটু পরেই ফিরে আসবে।”
কথাটা শুনে আমার মনে খটকা লাগল। নেহা আজ সারাদিন এত মনমরা ছিল, হঠাৎ বান্ধবীর বাসায় যাবে? আমার ভেতরটা অস্বস্তিতে ভরে গেল। কিন্তু আমি আর কিছু বললাম না। চুপ করে বসে রইলাম, অপেক্ষা করতে থাকলাম।
---
অন্যদিকে, নেহা তখন বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। তার মাথার ভেতরে শুধু একটা চিন্তা ঘুরছিল — **নিরঞ্জনকে বাঁচাতে হবে**। বাবার কথা, ট্রাকের পরিকল্পনা, তুলসীর মুখ — সব মিলিয়ে সে আর চুপ করে থাকতে পারেনি।
সে অটো রিকশা নিয়ে নিরঞ্জনের বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছিল। রাস্তায় অন্ধকার, রাতের হাওয়া তার চুল উড়িয়ে দিচ্ছিল। অনেক খুঁজে অবশেষে সে নিরঞ্জনকে দেখতে পেল। নিরঞ্জন রিকশা চালিয়ে ধীরে ধীরে তার বাড়ির দিকে যাচ্ছে। তার পেছনে একটা বড় ট্রাক আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছিল — যেন শিকারের জন্য তৈরি।
নেহার বুকটা ধড়াস করে উঠল। সে দৌড়ে গিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“নিরঞ্জন! পিছে দেখো!!”
নিরঞ্জন চমকে সামনে তাকাল। অন্ধকারে নেহাকে দেখে তার চোখ বড় হয়ে গেল।
নেহা আবার জোরে চিৎকার করল,
“পিছে দেখো! পেছনে ট্রাক আসছে!!”
নিরঞ্জন পেছনে তাকিয়ে দেখল — একটা বিশাল ট্রাক তার খুব কাছে চলে এসেছে, হেডলাইট জ্বলছে। সে মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিল। রিকশাটা ছেড়ে দিয়ে জোরে লাফ দিয়ে রাস্তার পাশের খালের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
**ধুম!!**
ট্রাকটা প্রচণ্ড শব্দে রিকশাটাকে দুমড়ে-মুচড়ে চাপা দিয়ে চলে গেল। রিকশার চাকা, হ্যান্ডেল সব ছিটকে পড়ল। ট্রাকের ড্রাইভার হয়তো খেয়ালই করেনি যে নিরঞ্জন রিকশা থেকে লাফিয়ে নেমে গেছে। ট্রাকটা গতি না কমিয়ে দ্রুত পালিয়ে গেল অন্ধকারে।
নিরঞ্জন মাটিতে পড়ে কয়েক সেকেন্ড শুয়ে রইল। তারপর উঠে বসল। তার কনুই কেটে গেছে, জামা ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু সে বেঁচে গেছে।
নেহা দৌড়ে তার কাছে চলে এল। তার চোখে পানি।
“আপনি ঠিক আছেন? আহত হয়েছেন?”
নিরঞ্জন ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে বিস্ময় আর কৃতজ্ঞতা মিশে ছিল।
“তুমি… তুমি না থাকলে ত!”
নেহা কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু কাঁপা গলায় বলল,
“চলুন, আপনার ঘরে যাই।”
নিরঞ্জনের ছোট্ট, অন্ধকার ঘরে ঢুকে নেহা দ্রুত কাজে লেগে গেল। তার কনুইয়ের ক্ষতস্থান থেকে এখনও রক্ত ঝরছিল। নেহা পুরোনো কাপড় ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ বানিয়ে সাবধানে তার কনুইয়ে বেঁধে দিচ্ছিল। নিরঞ্জন চুপ করে বসে ছিল, তার চোখ দুটো নেহার মুখের উপর স্থির।
তুলসি একপাশে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। ছোট মেয়েটার চোখ ফুলে গেছে।
“নতুন মা… বাবা কি খুব ব্যথা পেয়েছে?”
নিরঞ্জন হালকা হেসে বলল,
“কান্না করছিস কেন? তোর বাবা মরছে নাকি? দেখ, আমি তো ঠিক আছি।”
নেহা ভুরু কুঁচকে তাকাল।
“এরকম কথা না বললেও পারেন? মেয়েটা এমনিতেই ভয় পেয়েছে।”
নিরঞ্জন মাথা নিচু করে বলল,
“আচ্ছা… ভুল হয়েছে।”
নেহা যখন হাত বাঁধছিল, নিরঞ্জনের শরীরের তাপমাত্রা বুঝতে পারে,
“একটু জ্বর জ্বর শরীর আপনার। একটা নাপা খেয়ে নিন।”
কাজ শেষ করে নেহা উঠে দাঁড়াল।
“আচ্ছা, আমি এখন আসি।”
তুলসি তৎক্ষণাৎ তার কোমর জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
“নতুন মা, তুমি কই যাও? আমাকে ছেড়ে যেও না… আমি ভয় পাচ্ছি।”
নেহা থমকে দাঁড়াল। তার চোখ নিরঞ্জনের দিকে চলে গেল। নিরঞ্জনও তার দিকে তাকিয়ে ছিল। ঘরের ম্লান আলোয় তাদের চোখাচোখি হল। নিরঞ্জনের চোখে একটা অনুরোধ, একটা আবেদন। সে চোখ দিয়ে যেন বলে দিল — **আজ রাতটা থেকে যাও**।
নেহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। আর কোনো অসম্মতি দেখাল না।
সে তুলসির মাথায় হাত বুলিয়ে আস্তে করে বলল,
“ঠিক আছে। এই তো, দেখি তোমার আর তোমার বাবার জন্য ভাত রান্না করি।”
নেহা ছোট উনুনে ভাত চড়াল। সামান্য ডাল আর আলু ভাজা করল। তিনজনে একসাথে খেয়ে নিল। খাওয়ার সময় খুব কম কথা হল। তুলসি নেহার পাশে বসে ছিল।
খাওয়া শেষে রাত গভীর হয়ে গেল। তিনজনকেই একই বিছানায় শুতে হল। মাঝখানে তুলসি, একপাশে নিরঞ্জন, অন্যপাশে নেহা। নেহার শরীরে অস্বস্তি আর অপরাধবোধ দুটোই কাজ করছিল। এত কাছাকাছি শোয়া, নিরঞ্জনের শরীরের গন্ধ, তার উষ্ণতা — সবকিছু তার মনে অদ্ভুত অনুভূতি জাগাচ্ছিল। কিন্তু কিছু করার ছিল না। তুলসি মাঝখানে শুয়ে পড়ায় সে নড়াচড়াও করতে পারছিল না।
এর আগে নেহা আমাকে ফোন করে বলেছিল,
“সৈকত, আজ রাতে আমি আমার বান্ধবীর বাসায় থাকব। তুমি চিন্তা কোরো না। কাল সকালে ফিরব।”
আমি ফোনে “ঠিক আছে” বললাম, কিন্তু আমি সব জানি নেহা, তুমি কোথায় আছ।
ঘরের বাতি নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। গভীর অন্ধকারে ডুবে আছে ছোট্ট ঘরটা। শুধু বাইরের রাস্তার একটা ভাঙা স্ট্রিট লাইটের ম্লান আলো জানালার ফাঁক দিয়ে এসে পড়ছে, যা তিনজনের শরীরের উপর হালকা ছায়া ফেলছে। তুলসি মাঝখানে শুয়ে গভীর ঘুমে। তার নিঃশ্বাসের সাথে সাথে নেহার আর নিরঞ্জনের নিঃশ্বাস মিশে এক অদ্ভুত নীরবতা তৈরি করেছে। বাইরে মাঝে মাঝে রিকশার ঘণ্টা বা কুকুরের ডাক ভেসে আসছে।
নিরঞ্জন চিত হয়ে শুয়ে ছিল। তার মনে এখনও রিকশা দুমড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা ঘুরছিল, কিন্তু সে সেটাকে শুধুই কাকতালীয় দুর্ঘটনা ভাবছিল। নেহা পাশ ফিরে শুয়ে ছিল, তার মাথায় ঘুরছিল একটাই চিন্তা — **যদি নিরঞ্জন জানতে পারে যে তার বাবাই এই হামলার পেছনে, তাহলে সে হয়তো পুলিশে যাবে, সবকিছু শেষ হয়ে যাবে**। তার বুকের ভেতরটা অস্বস্তিতে ভারী হয়ে আছে।
অন্ধকারে নিরঞ্জনের গলা ফিসফিস করে ভেসে এল,
“নেহা… তুলসি ঘুমিয়েছে?”
নেহা খুব আস্তে করে বলল,
“হ্যাঁ… তুলসি ঘুমিয়েছে।”
কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর নিরঞ্জনের গলায় একটা অনুশোচনা মিশে গেল,
“আমি ওইদিন… তোমার সাথে জোরজবরদস্তি করেছিলাম। আমি খুবই দুঃখিত, নেহা।”
নেহা চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার গলা শুকনো,
“কোন দিন? আমি সব ভুলে গেছি। মনে করানোর দরকার নেই।”
নিরঞ্জনের হাতটা আস্তে করে বিছানার উপর দিয়ে এগিয়ে এল এবং নেহার নরম পেটের উপর রাখল। তার আঙুলগুলো হালকা চাপ দিয়ে বুলিয়ে দিতে চাইল। নেহার শরীরটা কেঁপে উঠল। সে দ্রুত হাতটা সরিয়ে দিল।
নেহা কথা ঘোরানোর চেষ্টা করল,
“তোমার রিকশা তো ভেঙে গেছে। এখন কী করবে?”
নিরঞ্জন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“দেখি… মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেব।”
নেহা আস্তে করে বলল,
“মহাজনরা তো শুনেছি অনেক টাকা খায়। সুদে-আসলে শেষ করে দেবে।”
নিরঞ্জন বিষাদের সাথে হাসল,
“তা খায়। কিন্তু কী করার আছে?”
নেহা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল,
“আমি দিব।”
নিরঞ্জন অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল,
“তোমাকে দিতে হবে না।”
নেহা আর কথা বাড়াল না। চুপ করে শুয়ে রইল। অন্ধকারে তার শরীর থেকে হালকা সুগন্ধি আর নিরঞ্জনের ঘাম মিশ্রিত গন্ধ বাতাসকে ভারী করে তুলছিল।
হঠাৎ নিরঞ্জন খুব আদরের সুরে, প্রায় ফিসফিস করে ডাকল,
“নেহা…”
নেহার শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেল।
“হুম… বলো।”
নিরঞ্জনের গলায় একটা গভীর, লোভাতুর আবেগ ফুটে উঠল,
“জানো… আমার সবচেয়ে সুখের সময় কোনটা ছিল?”
নেহা লজ্জায় গলা নামিয়ে বলল,
“কোনটা?”
নিরঞ্জন একটু কাছে সরে এসে ফিসফিস করে বলল,
“একবার মনে আছে… আমরা যে অনাল সেক্স করেছিলাম?”
নেহার গাল দুটো লজ্জায় আর উত্তেজনায় গরম হয়ে উঠল। সে কিছু বলতে পারল না, শুধু চুপ করে রইল। তার মনে সেই রাতের স্মৃতি ভেসে উঠল — যেদিন তার কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা ছিল, ডাক্তার বলেছিল আনাল সেক্স করলে উপকার হবে। তার আর কোনো উপায় ছিল না। সেদিন নিরঞ্জনের সাথে সে প্রথমবারের মতো সেই অপরিচিত, নিষিদ্ধ অনুভূতির মধ্যে ডুবেছিল।
নিরঞ্জন আরও নিচু গলায় বলল,
“অনাল সেক্সটা তোমার সাথে খুব ভালো লেগেছিল। আমার বউয়ের সাথেও করেছিলাম, কিন্তু তোমারটা অনেক টাইট… অনেক গরম… খুব সুন্দর লেগেছিল।”
নেহা লজ্জায় মুখ লুকাতে চাইল, কিন্তু কিছু বলল না। তার শরীরের ভেতরটা অজান্তেই গরম হয়ে উঠছিল।
নিরঞ্জন আবার বলল,
“কিছু বলো না যে…”
নেহা লজ্জায়, অস্বস্তিতে আর একটু উত্তেজনায় গলা কাঁপিয়ে বলল,
“অনাল… না আনাল হবে।”
অন্ধকারে নিরঞ্জনের ঠোঁটে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। তুলসি মাঝখানে ঘুমিয়ে থাকায় দুজনের মাঝে একটা অদ্ভুত, নিষিদ্ধ টান তৈরি হয়েছিল। নেহার শ্বাস ভারী হয়ে আসছিল, তার শরীর অজান্তেই নিরঞ্জনের দিকে একটু সরে এসেছিল।
অন্ধকার ঘরে নীরবতা আরও গাঢ় হয়ে উঠেছিল। তুলসির নরম নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না। নেহার শরীরটা অজান্তেই গরম হয়ে উঠছিল। নিরঞ্জনের কথাগুলো তার কানে বারবার বাজছিল — সেই নিষিদ্ধ স্মৃতি, আনাল সেক্সের তীব্র অনুভূতি। তার ভেতরে একটা দ্বন্দ্ব চলছিল। শরীর ডাক দিচ্ছিল, কিন্তু মন অনড়। **না। আর না। এই নোংরা, রিকশাওয়ালা পরপুরুষের সাথে আর কখনো না।**
নিরঞ্জন ফিসফিস করে বলল, তার গলায় লোভ আর আকুতি মিশে,
“নেহা… আসো না। আবার করি।”
নেহা চুপ করে রইল। তার শ্বাস ভারী হয়ে আসছিল, কিন্তু সে কোনো সাড়া দিল না।
নিরঞ্জন আরও কাছে সরে এসে নিচু গলায় বলল,
“আমার বাড়া খাড়া হয়ে আছে… খুব শক্ত। আসো, মজা পাবে। তোমার শরীরটা এখনও আমার হাতে মনে আছে।”
সে হাত বাড়িয়ে নেহার কোমর স্পর্শ করতে চাইল। নেহা তীক্ষ্ণভাবে তার হাত সরিয়ে দিল। তার শরীর কেঁপে উঠল, কিন্তু সে দৃঢ় গলায় কিছু না বলে চুপ করে রইল। তবে তার ভেতরের একটা অংশ — লুকানো, লজ্জিত অংশটা — চাইছিল নিরঞ্জন আরও নোংরা কথা বলুক। সেই কথাগুলো তার শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল।
নিরঞ্জন থামল না। তার গলা আরও ভারী, রুক্ষ হয়ে উঠল,
“তোমার টাইট যোনিতে আমার সোনাটা ঢুকাতে চাই… খুব জোরে… গভীরে। তোমার ভেতরটা এখনও আমার মনে আছে, কত গরম, কত আঁটোসাঁটো…”
নেহার গাল লাল হয়ে উঠল। তার উরুর মাঝে একটা অস্বস্তিকর ভেজা অনুভূতি হচ্ছিল। সে চোখ বন্ধ করে ফেলল, লজ্জায় আর উত্তেজনায় শ্বাস আটকে আসছিল। কিন্তু সে এখনও চুপ।
ঠিক তখনই — **ধপ্!**
ঘরের বাইরে থেকে একটা ভারী শব্দ এল। যেন কেউ বিছানা থেকে পড়ে গেছে।
নেহা চমকে উঠে ফিসফিস করে বলল,
“কী হলো?”
নিরঞ্জনও সতর্ক হয়ে উঠে বসল।
“দাঁড়াও, দেখছি।”
সে আস্তে করে উঠে পাশের ছোট্ট রুমে গেল, যেখানে তার বৃদ্ধ মা শুয়ে ছিল। নেহা অন্ধকারে শুয়ে অপেক্ষা করতে লাগল, তার হৃদস্পন্দন দ্রুত।
কয়েক মিনিট পর নিরঞ্জন ফিরে এল। তার মুখ ফ্যাকাশে, হাত কাঁপছে। সে খাটের কাছে এসে বসে পড়ল।
নেহা চিন্তিত গলায় জিজ্ঞাসা করল,
“কী হয়েছে?”
নিরঞ্জন গলা ভেঙে বলল,
“মা… বিছানা থেকে পড়ে গিয়েছিল। আমি শ্বাস চেক করলাম… আর নেই। মা চলে গেছে, নেহা।”
ঘরের অন্ধকার যেন আরও গভীর হয়ে গেল। নেহার বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। কয়েক মুহূর্ত আগের সেই কামুক, নিষিদ্ধ আবেগ হঠাৎ করে শোকের ভারী ছায়ায় ঢেকে গেল। তুলসি এখনও ঘুমিয়ে আছে, অজান্তে।
পরের দিন সকালে নিরঞ্জন তার মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করল। ছোট একটা চিতায় আগুন জ্বলছিল। নিরঞ্জন চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল, তার চোখ শুকনো কিন্তু মুখে গভীর শোকের ছায়া। সারাদিন তার মন খারাপ ছিল। সে কারো সাথে কথা বলছিল না।
আমি নেহাকে ফোনে বলেছিলাম,
“নেহা, এখন বাসায় চলে এসো। ওখানে আর থেকো না।”
কিন্তু নেহা আসেনি। সে সারাদিন নিরঞ্জনের ঘরেই রয়ে গেল। সে নিরামিষ রান্না করল — ভাত, ডাল, আলু সেদ্ধ, আর কয়েকটা সবজি। নিরঞ্জনের মায়ের একটা ছোট পুরোনো ছবি খুঁজে বের করে দেওয়ালে টাঙিয়ে দিল। ছবির উপর সে একটা মালা পরিয়ে দিল। তুলসি যখন দাদির জন্য কাঁদতে শুরু করল, নেহা তাকে বুকে জড়িয়ে অনেকক্ষণ বোঝাল, তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিল।
সারাদিন নেহা অনেক কাজ করল — ঘর ঝাড়ু দিল, বাসন মাজল, তুলসির জামা কাচল। যেন এইভাবে সে তার অপরাধবোধ কমাতে চাইছিল।
রাতে খাওয়ার সময় তুলসিকে তার পিসির বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হল, যাতে মেয়েটা এখানে থেকে আরও মন খারাপ না করে।
খাওয়ার পর নিরঞ্জন একা বিছানায় বসে ছিল। নেহা তার পাশে বসে আস্তে আস্তে বলতে শুরু করল,
“তুমি চিন্তা করো না। মানুষের জীবন এমনই। কেউ চিরকাল থাকে না। সময়ের সাথে সাথে সব সহ্য হয়ে যায়…”
নেহা অনেক কথা বলছিল — সান্ত্বনা, উপদেশ, ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু হঠাৎ নিরঞ্জন তার কথা থামিয়ে দিয়ে রুক্ষ গলায় বলে উঠল,
“চুপ করুন মেমসাব। আর কত ভালো হবার নাটক করবেন?”
নেহা থমকে গেল।
নিরঞ্জনের চোখে আগুন জ্বলছিল। তার গলা কাঁপছিল রাগে আর বেদনায়,
“আপনার বাবা আমার স্ত্রীকে মেরেছে। তারপর আমাকে ট্রাক দিয়ে মারার চেষ্টা করেছে। আর আমার মায়ের জন্য যে ওষুধ আমি এনেছিলাম, সেটাতে ভুল ওষুধ দিয়ে দিয়েছে। আমি পড়তে পারি না, তাই আমার হাত দিয়েই আমার মাকে মেরে ফেলেছে আপনার বাবা।”
নেহার মুখ সাদা হয়ে গেল। সে হতভম্ব হয়ে বলল,
“কী বলছ তুমি? আমি… আমি এসব কিছুই জানতাম না…”
নিরঞ্জন উঠে দাঁড়াল। তার চোখ লাল,
“বের হয়ে যান আপনি আমার বাসা থেকে। আপনি যদি এখানে থাকেন, তুলসির ক্ষতি হবে। চলে যান। এখান থেকে চলে যান!”
নেহা কাঁদতে শুরু করল। তার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ছিল। সে কিছু বলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু নিরঞ্জন তার হাত ধরে টেনে নিয়ে ঘরের বাইরে বের করে দিল। ভাঙা গেটটা জোরে বন্ধ করে দিল।
নেহা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। তার শরীর কাঁপছিল।
আমি তখন কাছাকাছি ছিলাম। দ্রুত গাড়ি নিয়ে গিয়ে তাকে তুলে নিলাম। নেহা গাড়িতে উঠে আমার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে লাগল। সে কিছু বলছিল না, কিন্তু আমি তার চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম — সে প্রথমবারের মতো বুঝতে পারছে তার বাবা কতটা নির্মম, কতটা নিষ্ঠুর।
|