Thread Rating:
  • 7 Vote(s) - 3.86 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
#41
Rashed should click some pictures of Anika secretly, then tribute on her ..
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#42
Darun
Like Reply
#43
৯।
পুরুষেরা নারীর শরীরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এটা জগতের সবচেয়ে আদিম, নগ্ন এবং অকাট্য সত্য। আপনি যদি হাজারটা পুরুষকে ধরে এনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করান এবং তাদের বুকের ভেতর এক্সরে মেশিন বা লাই-ডিটেক্টর লাগিয়ে জিজ্ঞেস করেন— "ভাই, আপনি কি কোনো নারীকে শুধু তার মন, তার বুদ্ধিমত্তা বা তার আত্মার সৌন্দর্যের জন্য ভালোবাসেন?"

আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, হাজারে একজন পুরুষ পাওয়াও দুষ্কর হবে, যে বলবে, "হ্যাঁ, আমি নারীর শরীর দেখি না, আমি তার আত্মা দেখি।" যে এই কথা বলবে, সে হয় চরম মিথ্যুক, নয়তো সে শারীরিকভাবে অক্ষম, অথবা সে কোনো পীর-দরবেশ। পুরুষের মস্তিষ্ক প্রোগ্রাম করা হয়েছে খুব সহজ একটা অ্যালগরিদম দিয়ে। এটা একটা ভিজ্যুয়াল হার্ডওয়্যার। রাস্তা দিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পুরুষের চোখ এক ন্যানোসেকেন্ডের মধ্যে মেয়েটার শরীরের একটা স্ক্যান করে ফেলে। মেয়েটার মুখটা কি সুন্দর? তার বক্ষদেশ কি ভরাট? তার কোমর কি সরু? তার নিতম্ব কি আকর্ষণীয়? এই জ্যামিতিক হিসাবগুলো মিলে গেলেই পুরুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন রিলিজ হয়। তার ভেতর আদিম বাসনা জেগে ওঠে। এই বাসনার কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নেই, এর উদ্দেশ্য স্রেফ দখল করা এবং ভোগ করা।

কিন্তু আমার মাথায় গত কয়েকদিন ধরে একটা অদ্ভুত দার্শনিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। পুরুষ নাহয় নারীর শরীরের লোভে পাগল হয়, কিন্তু একজন নারী কেন একজন পুরুষের প্রেমে পড়ে? নারীরা কিসে আকৃষ্ট হয়? পুরুষের শরীরে? আমি বাথরুমের আয়নায় নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে এই কথাটা ভাবছিলাম আর হাসছিলাম। পুরুষের শরীর আবার সুন্দর হয় নাকি? পুরুষ প্রজাতিটা দেখতে চরম কুৎসিত একটা প্রাণী। সারা গায়ে লোম, খসখসে চামড়া, এবড়োখেবড়ো পেশি, কর্কশ কণ্ঠস্বর। পৃথিবীতে লাখো-কোটি পুরুষের মধ্যে হয়তো হাতেগোনা কয়েকজন ব্র্যাড পিট বা টম ক্রুজ আছেন, যাদের দেখে মনে হতে পারে, "হ্যাঁ, লোকটা সুন্দর।" কিন্তু বাদবাকি ৯৯.৯৯% পুরুষই তো আমার বা আপনার মতো নিতান্তই সাধারণ, ম্যাড়ম্যাড়ে এবং আলুথালু।

তাহলে এত এত সুন্দরী নারী এই সাধারণ, কুৎসিত পুরুষগুলোর প্রেমে পড়ে কীভাবে? তারা এই পুরুষদের জন্য কাঁদে কেন? তাদের সাথে জীবন পার করে দেয় কীভাবে? নারীর আসলে আগ্রহটা কিসে? বিবর্তনবাদ বা ইভোলিউশনারি বায়োলজি বলে, আদিম যুগে নারীদের টিকে থাকার জন্য এমন একজন পুরুষের দরকার ছিল, যে পেশিশক্তিতে বলীয়ান, যে শিকার করে আনতে পারবে, এবং যে গুহার সামনে দাঁড়িয়ে বন্য প্রাণীর হাত থেকে নারীকে রক্ষা করতে পারবে। অর্থাৎ, নারীর কাছে আকর্ষণীয় ছিল পুরুষের ‘নিরাপত্তা দেওয়ার ক্ষমতা’।

যুগ পাল্টেছে। মানুষ এখন আর গুহায় থাকে না, বন্য প্রাণীও আক্রমণ করে না। কিন্তু নারীর মস্তিষ্কের সেই আদিম সফটওয়্যারটা আজও আপডেট হয়নি। শুধু ‘পেশিশক্তি’র জায়গাটা দখল করে নিয়েছে ‘সামাজিক ও আর্থিক ক্ষমতা’। আধুনিক যুগে একজন নারী একজন পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয় তার ক্ষমতা, তার প্রতিপত্তি, তার ব্যাংক ব্যালেন্স এবং তার সামাজিক অবস্থান দেখে। কারণ এই জিনিসগুলো তাকে একটা সাবকনশাস সিগন্যাল দেয়— "এই লোকটার সাথে থাকলে আমি এবং আমার অনাগত সন্তান সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকব।" একজন বিলিয়নিয়ার বৃদ্ধ, যার মাথায় চুল নেই, পেট মোটা— তার পাশেও দেখবেন একজন বিশ্বসুন্দরী তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। এটা কোনো ম্যাজিক নয়, এটা বিবর্তনের খেলা। নারীরা পুরুষের টাকা বা ক্ষমতাকে ভালোবাসে, কারণ টাকাটাই এখন আধুনিক যুগের ‘শিকার করে আনা হরিণের মাংস’।

কিন্তু শুধু টাকাই কি সব? না। সাইকোলজি বলে অন্য কথা। পুরুষ প্রেমে পড়ে চোখ দিয়ে, আর নারী প্রেমে পড়ে কান দিয়ে। নারীরা আকৃষ্ট হয় পুরুষের বুদ্ধিমত্তায়, তার রসবোধে (Sense of humor), তার কণ্ঠস্বরে এবং তার কনফিডেন্সে। একজন পুরুষ যখন খুব গুছিয়ে কথা বলে, যখন তার কথার ভেতর একটা রহস্য থাকে, যখন সে একজন নারীকে অনুভব করাতে পারে যে "তুমি স্পেশাল"— তখন নারী সেই পুরুষের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। নারীরা চায় এমন কাউকে, যে তার কথা মন দিয়ে শুনবে, যে তার চোখের দিকে তাকিয়ে তার আত্মার ভেতরে ঢুকতে পারবে।

একজন নারী আসলে পুরুষের শরীর চায় না, সে চায় পুরুষের মনোযোগ। সে চায় একজন পুরুষ তাকে জয় করুক, তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে, তার রসবোধ দিয়ে, তার ব্যক্তিত্বের সেই আলফা-মেল (Alpha male) অরা দিয়ে। আমি নিজের কথা ভাবলাম। আমি রাশেদ আহমেদ। মিরপুরের মেসে থাকি। বেতন পঁচিশ হাজার টাকা। দেখতে চরম সাধারণ। আমার না আছে ক্ষমতা, না আছে টাকা, না আছে কোনো গ্ল্যামার।

তাহলে আনিকা নাওহারের মতো একজন নিখুঁত, আভিজাত্যে মোড়ানো, লন্ডনপ্রবাসী বড়লোক নারী আমার সাথে প্রতিদিন মেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটছেন কেন? উনি আমাকে রাত জেগে মেসেজ দিচ্ছেন কেন? উত্তরটা খুব সোজা। 

আমি হয়তো উনার কাছে একটা ‘নভেলটি’ বা নতুনত্ব। ইংল্যান্ডের যান্ত্রিক জীবনে উনার স্বামী হয়তো সারাদিন আইটি ফার্মের ব্যালেন্স শিট নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। উনাকে হয়তো কেউ উনার কবিতার শূন্যতা নিয়ে এত সুন্দর করে লেকচার দেয় না। উনার চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ হয়তো এত মনোযোগ দিয়ে উনার কথা শোনে না।

আমি উনার সেই ইন্টেলেকচুয়াল খিদেটা মেটাচ্ছি। আমি খুব গুছিয়ে কথা বলি, একটু রহস্য করে হাসি, উনার রূপের প্রশংসা করি খুব সাবধানে, একটু ঘুরিয়ে। উনার মনে হচ্ছে, আমি একজন গভীর বোধসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু উনি জানেন না, আমার এই বুদ্ধিবৃত্তিক মুখোশের পেছনে কতটা বন্য, কতটা ক্ষুধার্ত এবং কতটা ইতর একটা পুরুষ লুকিয়ে আছে। উনি জানেন না, উনার সাথে আমি যখন স্প্যানিশ সাহিত্য নিয়ে কথা বলি, তখন আমার চোখ উনার শাড়ির কুঁচির নিচে উনার নাভির গভীরতা মাপতে ব্যস্ত থাকে। উনি জানেন না, রাতে উনার মেসেজ পেয়ে আমি বাথরুমের ফ্লোরে উনার ছবি দেখে আমার অবদমিত পশুকে শান্ত করি। নারীরা হয়তো পুরুষের মন খোঁজে। কিন্তু আমি একজন খাঁটি পুরুষ। আমি আনিকা নাওহারের মন চাই না। আমি উনার ওই স্বর্গীয় শরীরটা চাই।

২৫ ফেব্রুয়ারি।
 দিনটা আগের দিনগুলোর মতোই শুরু হলো। সেই একই একঘেয়ে রুটিন। সকালে রহিমা খালার বাসি রুটি, বিকল্প বাসের কনুই-যুদ্ধ, আর কারওয়ান বাজারের অফিস। অফিসে এসে আমি কিম জং উনের খবর বাদ দিয়ে সিরিয়ার খবর অনুবাদ করতে বসলাম। এহসান ভাই আজ একটু বেশি চিল্লাচিল্লি করছেন। মামুন তার ডেস্কে বসে "পুতিনের নতুন প্রেমিকা" নিয়ে একটা চটকদার খবর বানাচ্ছে। সবকিছু একদম নরমাল।

কিন্তু আমার মাথার ভেতর সারাদিন ধরে একটা ঘড়ি টিকটিক করছিল। কখন ছয়টা বাজবে! পাঁচটা চল্লিশ মিনিটে আমি বাথরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে এলাম। চুলটা একটু চিরুনি দিয়ে ভিজিয়ে আঁচড়ালাম। চোখে-মুখে একটা ফ্রেশ ভাব আনার চেষ্টা করলাম। পাঁচটা পঞ্চাশ মিনিটে আমি আমার ডেস্ক থেকে আনিকাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলাম। 

আমি: "কোথায় আপনি
?" এক মিনিটের মধ্যেই রিপ্লাই এল।
আনিকা: "মেলায়। আজ একটু আগেই চলে এসেছি। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে লেকের পাড়ে বসে আছি। আপনি বের হয়েছেন?"
আমি: "জাস্ট বের হচ্ছি। জ্যাম না থাকলে সিক্স ফর্টির ভেতর পৌঁছে যাব। ওয়েট ফর মি।"
আনিকা: "ওয়েটিং।"

ছয়টা বাজার সাথে সাথেই আমি ল্যাপটপ শাটডাউন করে এহসান ভাইকে একটা সালাম দিয়ে দৌড় দিলাম। নিচে নেমে উবার মোটো ডাকলাম। আজকের বাইকারটা মনে হয় আগে কোনোকালে রেসিং ট্র্যাকে রেস করত। সে কারওয়ান বাজার থেকে শাহবাগ পৌঁছাল মাত্র পঁচিশ মিনিটে। ছয়টা পঁয়ত্রিশ মিনিটে আমি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের লেকের পাড়ে এসে দাঁড়ালাম।

আনিকা একটা কংক্রিটের বেঞ্চে বসে ছিলেন। উনাকে দেখেই আমার বুকের ভেতরকার সেই চিরচেনা ধাক্কাটা নতুন করে লাগল। 
আজ উনার পরনে একটা কুচকুচে কালো রঙের শাড়ি। কালো শাড়িতে যেকোনো নারীকে সুন্দর লাগে, কিন্তু আনিকা নাওহারকে কালো শাড়িতে দেখে মনে হচ্ছিল, উনি যেন সাক্ষাৎ রাতের দেবী ‘নিক্স’। ব্লাউজটাও কালো, স্লিভলেস এবং পিঠের দিকটা বেশ গভীর করে কাটা। উনার ফর্সা, মসৃণ পিঠের অনেকটা অংশ উন্মুক্ত। শীতের শেষ দিকের এই হালকা বাতাসে উনার খোলা চুলগুলো উড়ছে। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক।


আমি উনার পাশে গিয়ে বসলাম। "লেট হয়ে গেল?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। উনি আমার দিকে ফিরে হাসলেন। "একদম না। ইউ আর অন টাইম।" আমরা আড্ডা দিতে শুরু করলাম। প্রতিদিনের মতোই। মেলার ভিড়, মানুষের কোলাহল, মাইকে ভেসে আসা নতুন বইয়ের ঘোষণা— সবকিছুর বাইরে আমরা দুজন যেন একটা আলাদা দ্বীপে বসে আছি।

আনিকা উনার নতুন উপন্যাসের প্লট নিয়ে কথা বলছিলেন। আমি মাথা নেড়ে নেড়ে সায় দিচ্ছিলাম। কিন্তু আমার চোখ উনার সারা শরীরে একটা রাডারের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কালো শাড়ির ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে উনার ভরাট, উদ্ধত বক্ষদেশের যে রূপরেখাটা বোঝা যাচ্ছিল, তা আমার স্নায়ুতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিল। উনি যখন কথা বলার সময় হাত নাড়ছিলেন, উনার উন্মুক্ত ফর্সা বাহুর পেশিগুলো একটা অদ্ভুত সম্মোহনী ছন্দের সৃষ্টি করছিল।

আমি উনার কথা গিলছিলাম না, আমি উনার রূপ গিলছিলাম। উনার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি বাঁক আমি আমার চোখের তৃষ্ণা দিয়ে পান করছিলাম। এত সুন্দর, এত আকর্ষণীয়, এত স্বর্গীয় একটা শরীর কীভাবে হতে পারে! আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এই শরীরটা যদি একবার, শুধু একবারের জন্য আমার বিছানায়, আমার দুই হাতের নিচে আসত— তাহলে হয়তো আমি হাসতে হাসতে মরে যেতে পারতাম।

রাত পৌনে নয়টা বাজল। মেলায় ভিড় কমতে শুরু করেছে। "চলুন, ওঠা যাক। মেলা তো বন্ধ হয়ে যাবে," আনিকা বললেন। আমরা মেলা থেকে বেরিয়ে এলাম। প্রতিদিনের মতোই আমি উনাকে ধানমন্ডি ড্রপ করার জন্য একটা রিকশা নিলাম। রাত নয়টা। ঢাকা শহরের রাস্তায় তখন গাড়ির স্রোত। নিওন আলো, সোডিয়াম বাতি আর হেডলাইটের আলো মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ। রিকশায় আমরা পাশাপাশি বসেছি। রিকশার ছোট্ট পরিসরে উনার শরীরটা আমার শরীরের সাথে খুব হালকাভাবে লেপ্টে আছে।

আমি আমার বাঁ হাতটা রিকশার হুডের রডের ওপর এমনভাবে রাখলাম, যেন আনিকা আমার হাতের বলয়ের ভেতর নিরাপদ আছেন। রিকশা যখনই স্পিডব্রেকার পার হচ্ছিল বা গর্তে পড়ছিল, উনার নরম শরীরটা এসে আমার কাঁধে আর বাহুতে ধাক্কা খাচ্ছিল। উনার গায়ের সেই দামি শ্যানেল পারফিউমের গন্ধটা রাতের শীতল বাতাসে মিশে একটা মাতাল করা ঘ্রাণ তৈরি করেছে। আমি চোখ বন্ধ করে একটা গভীর শ্বাস নিলাম। এই ঘ্রাণটা, এই স্পর্শটা আমার ভেতরে একটা আদিম বিস্ফোরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

আমি আড়চোখে উনার দিকে তাকালাম। রাস্তার আলো-আঁধারিতে উনার কালো শাড়িতে ঢাকা শরীরটাকে একটা রহস্যময়ী ভাস্কর্যের মতো মনে হচ্ছিল। উনার ঘাড়ের কাছে চুলগুলো একটু সরে যাওয়ায় গলার ফর্সা অংশটা দেখা যাচ্ছে। আমার প্রচণ্ড ইচ্ছে করছিল, আমি আমার মুখটা ওখানে গুঁজে দিই। উনার ঘাড়ের ওই জায়গাটায় আমি আমার দাঁত বসিয়ে দিই। কিন্তু আমি তো রাশেদ আহমেদ। ভদ্র, অনুবাদক। আমি আমার পশুকে শিকল পরিয়ে রাখলাম।

ধানমন্ডির ২ নাম্বার রোডের ভেতরে একটা সুউচ্চ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের সামনে এসে রিকশা থামল। এই বিল্ডিংটা আমি গত কয়েকদিন ধরে দেখছি। পনেরো-ষোল তলা হবে। গ্লাস আর স্টিলের তৈরি অত্যাধুনিক একটা টাওয়ার। সামনে বিশাল লোহা আর কাঠের তৈরি মেন গেট। ভেতরে সিকিউরিটি গার্ডদের জন্য আলাদা রুম। সিসি ক্যামেরা বসানো।

এই ধরনের বিল্ডিংয়ে ঢাকা শহরের এলিট ক্লাসরা থাকে। মিরপুরের মেসের একজন ব্যাচেলর হিসেবে এই বিল্ডিংয়ের দিকে তাকালেই আমার এক ধরনের হীনম্মন্যতা কাজ করে। এখানে ব্যাচেলরদের কেউ ফ্ল্যাট ভাড়া দেবে না, তা তো শতভাগ নিশ্চিত। আর দিলেও, এই বিল্ডিংয়ের এক মাসের মেইনটেন্যান্স বা সার্ভিস চার্জই হয়তো আমার সারা মাসের বেতনের সমান। আমি রিকশা থেকে নেমে আনিকাকে নামতে সাহায্য করলাম। "থ্যাংক ইউ রাশেদ," আনিকা শাড়িটা একটু ঠিক করে নিয়ে বললেন। প্রতিদিন এই জায়গাতেই আমাদের বিদায় পর্ব সম্পন্ন হয়। উনি ভেতরে ঢুকে যান, আর আমি আরেকটা রিকশা বা সিএনজি নিয়ে মিরপুরের দিকে রওনা দিই।

কিন্তু আজ আনিকা গেটের দিকে না গিয়ে আমার দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। "রাশেদ, আপনি প্রতিদিন এত কষ্ট করে আমাকে নামিয়ে দিয়ে যান। আর এখান থেকে আপনাকে আবার সেই মিরপুর ফিরতে হয়। আমি সত্যিই খুব গিল্টি ফিল করি," আনিকা নরম গলায় বললেন। আমি বীরদর্পে মুচকি হাসলাম। "গিল্টি ফিল করার কী আছে আনিকা? আমি তো আগেই বলেছি, এই জ্যামের শহরে আপনাকে একা ছেড়ে দেওয়াটা আমার বিবেকে বাধে। ইটস মাই প্লেজার।"

আনিকা একটু চুপ করে রইলেন। তারপর উনার সেই বাদামি চোখ জোড়া আমার চোখের ওপর স্থির করে বললেন, "আজকে আর এখান থেকে ফিরে যাবেন না। আজকে বাসায় আসুন। এক কাপ চা খেয়ে যান।" অফারটা শোনার সাথে সাথে আমার বুকের ভেতর যেন একটা হাতুড়ি দিয়ে কেউ প্রচণ্ড জোরে বাড়ি মারল। বাসায় আসুন! এক কাপ চা খেয়ে যান!

এই রাত নয়টার সময় একজন বিবাহিতা নারী আমাকে তার ফ্ল্যাটে ডাকছেন! আমার শরীরের ভেতরের রক্ত চলাচলের গতি তিনগুণ বেড়ে গেল। আমার মাথার ভেতরকার আদিম পুরুষটা আনন্দে চিৎকার করে উঠল— "যা ব্যাটা! ভেতরে যা! আজ তোর কপাল খুলে গেছে!" কিন্তু আমার বাইরের ভদ্র, বুদ্ধিবৃত্তিক মুখোশটা সাথে সাথে অন হলো। আমি জানি, নারীরা খুব সহজে রাজি হওয়া পুরুষদের পছন্দ করে না। একটু 'প্লে হার্ড টু গেট' খেলতে হয়।

আমি মুখে একটা বিনয়ী
, অনিচ্ছুক ভাব ফুটিয়ে তুলে বললাম, "আরে না না! আজ আর চা খাব না। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। কাল তো আবার অফিস আছে। আরেক দিন খাব।" আমার মনে মনে তখন দোয়া দরুদ পড়া শুরু হয়ে গেছে— 'হে আল্লাহ, উনি যেন জোড়াজুরি করেন! উনি যেন আমার এই 'না' টাকে মেনে নিয়ে চলে না যান! উনি যদি এখন চলে যান, আমি হয়তো রিকশার চাকার নিচে মাথা দিয়ে মরে যাব!'

আমার দোয়া কবুল হলো।

আনিকা একটু জেদের সুরে বললেন, "আরে না। কোনো কথা শুনব না। আজ আপনাকে চা খেতেই হবে। আপনি প্রতিদিন আমাকে ড্রপ করেন, আর আমি আপনাকে এক কাপ চা না খাইয়েই বিদায় দিই— এটা খুব আনসিভিলাইজড দেখায়। চলুন, ভেতরে চলুন।" আমি আর দ্বিতীয়বার না করলাম না। আমি অত্যন্ত 'নিরুপায়' ভঙ্গিতে একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "আপনি যখন এত করে বলছেন... ঠিক আছে, চলুন। তবে খুব বেশিক্ষণের জন্য নয় কিন্তু।"

আনিকা হাসলেন। "আচ্ছা বাবা, বেশিক্ষণ আটকে রাখব না আপনাকে।" আমরা মেইন গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। সিকিউরিটি গার্ড আনিকাকে দেখে স্যালুট দিল। আমার দিকে একবার আড়চোখে তাকাল, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না।

ভেতরে ঢুকে দেখলাম বিশাল এক লবি। মার্বেল পাথরের ফ্লোর। এক কোণায় একটা ফোয়ারা, যদিও সেটা এখন বন্ধ। দুটো অত্যাধুনিক লিফট। আমরা লিফটে গিয়ে দাঁড়ালাম। আনিকা ৭ নাম্বার বাটনটা চাপলেন। লাকি সেভেন। লিফট খুব নিঃশব্দে ওপরে উঠতে লাগল। লিফটের ভেতরের আয়নায় আমি আনিকার পাশে নিজেকে দেখলাম। পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের রাশেদ আহমেদ, একজন বিলিয়নিয়ার, অপরূপা নারীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এটা কি কোনো স্বপ্ন, নাকি সত্যিই ঘটছে? সাত তলায় লিফট থামল। একটা ফ্লোরে মাত্র দুটো ফ্ল্যাট। আনিকা ডান দিকের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে উনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে চাবি বের করলেন। দরজা খুলে উনি আমাকে ভেতরে ইশারা করলেন। "আসুন।"

আমি ভেতরে পা রাখলাম।

এবং সাথে সাথে আমি বুঝতে পারলাম, আমি একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে এসে পড়েছি। ফ্ল্যাটটা বিশাল। আমার মিরপুরের চার রুমের পুরো মেসটা হয়তো এই ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমটার সমান হবে। বিশাল স্পেস। ফ্লোরে কাঠের টেক্সচার দেওয়া দামি টাইলস। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাস আমাকে ছুঁয়ে গেল। সিলিংয়ে ফলস সিলিং করা, সেখান থেকে ওয়ার্ম হোয়াইট স্পটলাইটের আলো পুরো ঘরটাকে একটা মায়াবী রূপ দিয়েছে।

এক পাশে বিশাল এল-প্যাটার্নের একটা লেদার সোফা। দেয়ালে বড় বড় সব পেইন্টিং। এক কোণায় একটা ইনডোর প্ল্যান্ট। সামনের দিকে ডাইনিং স্পেস, আর তার ওপাশে হয়তো বেডরুমগুলো। আমি আন্দাজ করলাম, এই ফ্ল্যাটে অন্তত চারটা বা পাঁচটা বিশাল রুম আছে। আমি সোফার পাশে একটা সিঙ্গেল কাউচে আড়ষ্ট হয়ে বসলাম। আনিকা উনার ভ্যানিটি ব্যাগটা একটা টেবিলের ওপর রেখে আমার দিকে ঘুরলেন। "আপনার ফ্ল্যাটটা তো দারুণ সুন্দর," আমি চারদিকে তাকাতে তাকাতে বললাম। 

আনিকা একটু হাসলেন। উনার সেই হাসিতে এক ধরনের অদ্ভুত রহস্য লুকিয়ে ছিল। "আমার ফ্ল্যাট না রাশেদ, আমার মামার ফ্ল্যাট। আমি যখন বছরে একবার দেশে আসি, তখন আমি এখানেই থাকি।" আমার বুকের স্পন্দন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। "মানে... আপনি এই এত বড় ফ্ল্যাটে... একাই থাকেন?"

"হ্যাঁ। আমি একাই থাকি।" আনিকা খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললেন। আমার মাথার ভেতরে এখন আর কোনো লজিক কাজ করছে না। রাত সাড়ে নয়টা। ১৬ তলা বিল্ডিংয়ের সাত তলার একটা বিশাল, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটে আমি আর আনিকা নাওহার ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই। সম্পূর্ণ একা। আমি একজন ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো উনার দিকে তাকালাম।

আনিকা উনার কালো শাড়ির আঁচলটা একটু ঢিলা করে দিলেন। উনার সেই মোহনীয় , ফর্সা, মসৃণ কাঁধ এবং পিঠের অংশটুকু স্পটলাইটের আলোয় যেন চকচক করে উঠল।"আপনি বসুন রাশেদ। আমি কিচেন থেকে চা নিয়ে আসছি," এই বলে আনিকা কিচেনের দিকে পা বাড়ালেন। আমি সোফায় জমে গিয়ে উনার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

এই পুরো সময়টা— সেই রিকশা থেকে শুরু করে লিফট হয়ে এই কিচেন অব্দি যাওয়ার সময়টুকু— আমি উনার রূপ, উনার আকর্ষণ, উনার শারীরিক বাঁকগুলোকে আমার চোখ দিয়ে গিলেছি। উনার সেই কালো শাড়ি পরা ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতি যখন হেঁটে যাচ্ছিল, উনার নিতম্বের সেই মোহনীয় দুলুনি, উনার সরু কোমরের সেই ছন্দ— সবকিছু আমি পান করছিলাম। উনার শরীরের প্রতিটি নড়াচড়া যেন আমাকে নেশাগ্রস্ত করে দিচ্ছিল। আমি যেন এক ফোঁটা সুধা পান করছিলাম, যা আমাকে আরও বেশি তৃষ্ণার্ত করে তুলছে।

আনিকা কিচেনের দরজার কাছে গিয়ে একটু থামলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে উনার সেই রহস্যময় হাসিটা হাসলেন। "রাশেদ, ডান দিকের করিডোর দিয়ে প্রথম দরজাটা বাথরুম। আপনি চাইলে ফ্রেশ হয়ে নিতে পারেন। আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি।" উনি কিচেনের ভেতর ঢুকে গেলেন। আমি সোফা থেকে উঠলাম। আমার পা দুটো কাঁপছে। আমার শরীরের ভেতরের সেই অবদমিত, বন্য পুরুষটা এখন শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার জন্য উন্মাদ হয়ে আছে।

আমি ডান দিকের করিডোর ধরে বাথরুমের দিকে এগোলাম। আমার মাথার ভেতর শুধু একটাই বাক্য প্রতিধ্বনিত হচ্ছে— "উনি একা থাকেন। এই ফ্ল্যাটে উনি সম্পূর্ণ একা।" আমি বাথরুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। আমার মুখমণ্ডল ঘামে ভিজে গেছে। রাশেদ আহমেদ, পঁচিশ হাজার টাকার অনুবাদক, আজ হয়তো এমন একটা কিছু অনুবাদ করতে যাচ্ছে, যার ভাষা পৃথিবীর কোনো ডিকশনারিতে লেখা নেই। আমি বাথরুমের আয়নায় নিজের বন্য চোখের দিকে তাকালাম।
[+] 9 users Like Orbachin's post
Like Reply
#44
বাহ্ বাহ্ দারুন হচ্ছে  Iex চালিয়ে যান 

[Image: Images-2-2-1.jpg]

Like Reply
#45
Khub bhalo cholche... Awasome
Like Reply
#46
Darun
Like Reply
#47
Update please
Like Reply
#48
দারুন।
Like Reply
#49
You are truly a suspense writer. You love to keep up the suspense till the end. kudos to you.
Like Reply
#50
দারুন হচ্ছে , next
Like Reply
#51
দুর্দান্ত লেখার হাত আপনার। মুগ্ধ হয়ে এক বসায় পড়লাম।
Like Reply
#52
আমার মনে হয়না আমি আগে কখনও এত সুন্দর বাংলা লেখা এই ফোরামে পড়েছি। মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পরের আপডেটের অপেক্ষায়।
Like Reply
#53
১০।
আমি চোখেমুখে একটু পানি দিলাম। ধানমন্ডির এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাথরুমের বেসিনের পানির তাপমাত্রাও মনে হচ্ছে নিখুঁতভাবে সেট করা। পানিটা খুব বেশি ঠান্ডাও না, আবার গরমও না। একটা মোলায়েম, স্নিগ্ধ পরশ।

মুখে পানি ছিটিয়ে ঢাকা শহরের রাস্তার ধুলোবালি আর সারাদিনের ক্লান্তিটা খানিকটা ধুয়ে ফেলার চেষ্টা করলাম। তোয়ালে স্ট্যান্ডে ঝোলানো ধবধবে সাদা, সুগন্ধি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। আমার ভেতরের সেই আদিম, ক্ষুধার্ত নেকড়েটা আয়নার ওপাশ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে যেন দাঁত বের করে হাসছে। আমি মনে মনে তাকে ধমক দিলাম, "চুপ করে থাক ব্যাটা! এটা মিরপুরের মেস না, এটা একটা ভদ্রলোকের ফ্ল্যাট।"

বাথরুম থেকে বেরিয়ে আমি আবার ড্রয়িংরুমের সেই বিশাল লেদার সোফায় এসে বসলাম। সেন্ট্রাল এসির ঠান্ডা বাতাসে শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। কিচেন থেকে খুব মৃদু একটা টুংটাং শব্দ আসছে। আনিকা নাওহার চা বানাচ্ছেন।

আমি গলাটা একটু চড়িয়ে বললাম, "আনিকা, আপনি চাইলে আমি চা বানাতে হেল্প করতে পারি।" কিচেন থেকে আনিকার সেই মোহনীয় কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "আরে না না, আপনাকে হেল্প করতে হবে না। আমার বানানো প্রায় শেষ।"

আমি সোফায় হেলান দিয়ে বসে রইলাম। একটু পরেই আনিকা একটা কাঠের ট্রে হাতে নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। ট্রে-তে দুটো ধবধবে সাদা সিরামিকের মগ। মগগুলো দেখে দামি মনে হচ্ছে। উনি ট্রে-টা আমার সামনের গ্লাস-টপ সেন্ট্রাল টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর নিজের মগটার ওপর একটা ছোট পিরিচ দিয়ে সেটা ঢেকে দিলেন।

"রাশেদ, আপনি চা খান। গরম আছে। আমি জাস্ট একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।" 
"ঠিক আছে।"

আনিকা ঘুরে দাঁড়ালেন এবং নিজের বেডরুমের দিকে পা বাড়ালেন।
আমি সোফায় স্থির হয়ে বসে রইলাম, কিন্তু আমার চোখ জোড়া যেন আঠা দিয়ে উনার শরীরের সাথে সেঁটে গেল। আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম উনার হেঁটে যাওয়ার ভঙ্গির দিকে। কী অদ্ভুত একটা ছন্দ উনার হাঁটায়! কালো শাড়ির কুঁচিগুলো উনার প্রতিটি কদমের সাথে একটা মায়াবী ঢেউ তুলছে। উনার সেই নিখুঁত, সরু কোমর আর তার ঠিক নিচেই প্রশস্ত, আকর্ষণীয় নিতম্বের আন্দোলন— সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল আমি যেন কোনো ক্লাসিক্যাল ড্যান্সারের পারফরম্যান্স দেখছি। হাইহিল ছাড়া খালি পায়ে হাঁটছেন উনি, তবুও উনার হাঁটার মধ্যে এক ধরনের রাজকীয় আভিজাত্য। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে একটু খসে পড়েছে, আর উনার ফর্সা, মসৃণ পিঠের অনেকটা অংশ করিডোরের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। আমি যেন সম্মোহিত হয়ে গেলাম। এত সুন্দর, এত অপরূপ একটা মানবদেহ কীভাবে হতে পারে!

আনিকা বেডরুমে ঢুকে গেলেন। এরপর করিডোরের শেষের দিক থেকে একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল। আমি শব্দ শুনে বুঝলাম, উনি বাথরুমে ঢুকেছেন। এবং ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মস্তিষ্কের ভেতরে একটা ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আমার মাথার ভেতরে থাকা সেই আদিম পুরুষটা ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, "রাশেদ, যা না! একটু এগিয়ে গিয়ে করিডোরের দেয়ালের আড়াল থেকে উঁকি দে। হয়তো বাথরুমের দরজাটা পুরোপুরি ভেজানো নেই। হয়তো একটু ফাঁক আছে। তুই দেখতে পাবি উনি কীভাবে ওই কালো শাড়িটা শরীর থেকে খসিয়ে ফেলছেন। জাস্ট একবার ভাব, ওই কালো আবরণের নিচে উনার সেই ফর্সা, রোদ-পোহানো শরীরটা..."

আমার বুকের ভেতরটা ধকধক করতে লাগল। আমি সোফা থেকে প্রায় এক ইঞ্চি উঠেও পড়েছিলাম। আমার পায়ের পেশিগুলো উন্মুখ হয়ে আছে করিডোরের দিকে এগোতে। কিন্তু পরক্ষণেই আমার ভেতরের 'ভদ্র অনুবাদক' সত্তাটা কষে একটা থাপ্পড় মারল আমাকে। "রাশেদ! তুই কি পাগল হয়ে গেলি? তুই একজন শিক্ষিত ছেলে। তুই যদি এখন উঁকি দিস, আর উনি যদি কোনোভাবে বুঝতে পারেন, তোর আর কোনো সম্মান থাকবে? উনি তোকে পুলিশে না দিক, অন্তত ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেবেন। তোর এই ছ্যাঁচড়ামির কোনো ক্ষমা নেই।"

আমি নিজেকে দমিয়ে ধপ করে আবার সোফায় বসে পড়লাম। দুই হাত দিয়ে নিজের মাথাটা চেপে ধরলাম। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি মন থেকে এই দৃশ্যগুলো সরাতে। আমি লজিক্যালি চিন্তা করার চেষ্টা করলাম— কিম জং উনের মিসাইল, ইউক্রেনের যুদ্ধ, মিরপুরের মেস, নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ। কিন্তু হায় রে! আমার এই মন এত বেহায়া কেন!

আমার সমস্ত লজিককে লাথি মেরে আমার কল্পনার ক্যানভাসে বারবার আনিকা নাওহারের নগ্ন শরীরের ছবি ভেসে উঠতে লাগল। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, উনি বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উনার কালো ব্লাউজের হুকগুলো খুলছেন। উনার সেই ভরাট, উদ্ধত বক্ষদেশ মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। পানি ছেড়ে উনি যখন শাওয়ারের নিচে দাঁড়াচ্ছেন, পানির ফোঁটাগুলো উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতিক শরীরের প্রতিটি বাঁক বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। উনার ভেজা চুলগুলো পিঠে লেপ্টে আছে।

আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। আমার শরীরের নিচের দিকে একটা প্রচণ্ড চাপ আর উত্তেজনা তৈরি হতে শুরু করেছে। আমি দ্রুত টেবিল থেকে চায়ের মগটা তুলে নিলাম। গরম চা খেলে হয়তো আমার এই নোংরা, অবাধ্য স্নায়ুগুলো একটু শান্ত হবে।

আমি চা হাতে নিয়েই বসে রইলাম। কতক্ষণ বসে ছিলাম জানি না। ঢাকা শহরের এই কোলাহলমুক্ত, এসি-চলা ফ্ল্যাটের ভেতর সময় যেন থমকে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পর, আমি যখন চায়ের মগে চুমুক দেওয়ার জন্য মগটা ঠোঁটের কাছে নিয়ে গেছি, ঠিক তখনই বেডরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো।

আমি চোখ তুলে তাকালাম। আনিকা বেডরুম থেকে বেরিয়ে আসছেন।উনাকে দেখে আমি চায়ের মগে এমনভাবে বিষম খেলাম যে, গরম চা আমার গলায় আটকে গেল। আমি "খক খক" করে কাশতে শুরু করলাম। কোনোমতে মগটা টেবিলে নামিয়ে রেখে আমি চোখ বড় বড় করে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি আউলে গেলাম। আমার মস্তিষ্ক শর্টসার্কিট হয়ে গেল।

একটু আগে যে নারীকে আমি একটা কুচকুচে কালো শাড়িতে গ্রিক দেবীর মতো রাজকীয় আর রহস্যময়ী রূপে দেখেছি, সেই নারী এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপে আমার সামনে দাঁড়িয়ে। উনার পরনে এখন একটা খুব ঢিলেঢালা সাদা রঙের টি-শার্ট (যাকে আমরা ব্যাচেলররা বাংলায় সোজাসাপ্টা ‘গেঞ্জি’ বলি)। টি-শার্টটার সামনে ইংরেজিতে কী যেন লেখা। আর নিচে একটা ঢিলেঢালা শর্ট প্যান্ট বা প্লাজো টাইপের কিছু, যেটা উনার হাঁটুর ঠিক নিচ পর্যন্ত এসে শেষ হয়েছে।

উনার মুখে মেকআপের কোনো লেশমাত্র নেই। ঠোঁটের সেই গাঢ় লাল লিপস্টিক ধুয়ে ফেলা হয়েছে। মুখটা একদম ফ্রেশ, সতেজ। চুলগুলো একটা তোয়ালে দিয়ে মোছা হয়েছে, তবে এখনো আগায় হালকা ভেজা ভাব লেগে আছে। সব মিলিয়ে উনাকে এখন আর কোনো ছত্রিশ বছর বয়সী, লন্ডনপ্রবাসী, আইটি ফার্মের মালকিন মনে হচ্ছে না। উনাকে দেখে মনে হচ্ছে, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে পড়া কোনো তরুণী, যে মাত্রই ক্লাস শেষ করে হলে ফিরে ক্যাজুয়াল কাপড় পরেছে।

আমার দম আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো। একটা নারী শাড়িতে এত আবেদনময়ী হতে পারে
, সেটা আমি জানতাম। কিন্তু একটা সাধারণ ঢিলেঢালা গেঞ্জি আর শর্ট প্লাজোতে যে একজন নারী এত বেশি ভয়ংকর সুন্দর আর আকর্ষণীয় হতে পারে, সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। ঢিলেঢালা টি-শার্টের ভেতর দিয়ে উনার শরীরের সেই নিখুঁত ভরাট গঠনটা সরাসরি বোঝা না গেলেও, উনার হাঁটার সময় টি-শার্টের কাপড়ের ভেতর দিয়ে উনার বক্ষদেশের যে একটা সূক্ষ্ম মুভমেন্ট আমি খেয়াল করলাম, তা আমার রক্তচাপ বাড়িয়ে দিল। উনার হাঁটুর নিচ থেকে ফর্সা, মসৃণ পায়ের পাতা পর্যন্ত উন্মুক্ত।

"কী হলো রাশেদ? বিষম খেলেন নাকি?" আনিকা হাসিমুখে আমার সামনের সোফায় এসে বসলেন। বসার সময় উনার প্লাজোটা আরেকটু ওপরে উঠে গিয়ে উনার ফর্সা হাঁটুর কিছুটা অংশ বের হয়ে পড়ল।

আমি কোনোমতে কাশি থামিয়ে বললাম, "হ্যাঁ... মানে চা-টা একটু বেশি গরম তো, তাই গলায় লেগে গেছে। এখন ঠিক আছে।" আনিকা উনার মগের ওপর থেকে পিরিচটা সরিয়ে চায়ের মগটা হাতে নিলেন। উনার গা থেকে এখন আর সেই শ্যানেল পারফিউমের গন্ধ আসছে না। বরং একটা খুব রিফ্রেশিং, সাবান বা শাওয়ার জেলের হালকা, সতেজ ঘ্রাণ আসছে। এই ঘ্রাণটা আরও বেশি অন্তরঙ্গ, আরও বেশি ব্যক্তিগত।

"শাড়িতে আসলে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। ঢাকা শহরের যা ধুলাবালি আর গরম! তাই একবারে শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। কিছু মনে করেননি তো?" আনিকা চায়ে চুমুক দিয়ে খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললেন।

"না না, মনে করার কী আছে! আপনি আপনার বাসায় আছেন, আপনি কমফোর্টেবল থাকবেন, এটাই তো স্বাভাবিক," আমি আমার চোখের দৃষ্টিকে অত্যন্ত ভদ্রভাবে উনার মুখের ওপর স্থির রাখার চেষ্টা করে বললাম। যদিও আমার চোখ বারবার বিদ্রোহী হয়ে উনার টি-শার্টের গলার কাছের ফাঁকা অংশটার দিকে চলে যেতে চাইছিল।

আনিকা সোফায় একটা পা মুড়ে খুব আয়েশ করে বসলেন। এই বসার ভঙ্গিটা এতটাই ইনফর্মাল এবং অন্তরঙ্গ যে, আমার মনে হলো আমি যেন উনার খুব কাছের কেউ।

"জানেন রাশেদ, এই বাসাটা আসলে আমার মামার," আনিকা নিজে থেকেই গল্প শুরু করলেন। আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। "তাই নাকি? আপনার মামা কী করেন?"

আনিকা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। "মামা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। পিডব্লিউডি বা ওইরকম কোনো একটা ডিপার্টমেন্টে খুব বড় পোস্টে ছিলেন। সোজাসাপ্টা বাংলায় বললে, আমার মামা ছিলেন একজন প্রচণ্ড দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ। সারা জীবন দুই হাত ভরে নিজের ইচ্ছেমতো ঘুষ খেয়েছেন। ঢাকা শহরের গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি মিলিয়ে উনার অনেকগুলো ফ্ল্যাট আছে। এই বিল্ডিংয়ের এই ফ্ল্যাটটাও উনার।"

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, "উনি এখন কোথায় থাকেন? দেশেই?"

"আরে না!" আনিকা হো হো করে হেসে উঠলেন। "বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজ আমলাদের শেষ গন্তব্য কোথায় হয়, আপনি জানেন না? রিটায়ারমেন্টের পর মামা উনার অবৈধ টাকার পাহাড় নিয়ে সোজা ইউএসএ চলে গেছেন। এখন নিউইয়র্কে বসে বসে মসজিদে নামাজ পড়েন, আর ফেসবুকে বাংলাদেশের রাজনীতি আর ইসলামিক মূল্যবোধ নিয়ে বড় বড় জ্ঞানগর্ভ স্ট্যাটাস দেন। এটা একটা খুব ক্লাসিক প্যাটার্ন, তাই না?"

আমিও হাসলাম। "একদম। হালাল দুর্নীতির খুব সুন্দর একটা রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান। তো এই ফ্ল্যাটটা কি তাহলে পড়েই থাকে?"

"হ্যাঁ, পড়েই থাকে। মামার তো আর টাকার অভাব নেই যে ভাড়া দিয়ে দুই পয়সা কামাতে হবে। বরং ভাড়া দিলে ফ্ল্যাট নষ্ট হবে, এই ভয়ে তালা মেরে রেখেছেন। আমি বা আমার হাসব্যান্ড, অথবা আমার কাজিনরা যখন বিদেশ থেকে দেশে আসি, তখন আমরা কয়েকদিনের জন্য এই ফ্ল্যাটগুলো ব্যবহার করি। মামা আমাদের কাছে চাবি দিয়ে রেখেছেন।"

"আপনার হাসব্যান্ড..." আমি খুব সতর্কভাবে সুযোগটা লুফে নিলাম। "আপনার হাসব্যান্ড তো মনে হয় দেশে আসেন না খুব একটা?"

আনিকা চায়ের মগটা দুই হাত দিয়ে ধরে একটু উদাস ভঙ্গিতে বললেন, "ও খুব ব্যস্ত থাকে। ওর তো ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর পাশাপাশি নিজের রিসার্চের অনেক প্রজেক্ট থাকে। বছরে হয়তো দুই-এক সপ্তাহের জন্য একবার দেশে আসে। আমার মতো এত লম্বা ছুটি ম্যানেজ করতে পারে না।"

"আপনাদের বিয়ে হয়েছে কতদিন?" আমি খুব স্বাভাবিক একটা কৌতূহল দেখানোর ভান করে জিজ্ঞেস করলাম।

আনিকা একটু পেছনের দিকে হেলান দিলেন। উনার চোখ দুটো একটু ওপরের দিকে উঠল, যেন স্মৃতির পাতা হাতড়াচ্ছেন। "আমাদের বিয়ের বয়স তো প্রায় ছয় বছর হয়ে গেল।"

"আপনাদের কি লাভ ম্যারেজ ছিল?" আমি জিজ্ঞেস করলাম। আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত মাসোকিজম কাজ করছিল। যে নারীকে আমি মনে মনে এত তীব্রভাবে কামনা করছি, তার অন্য একজন পুরুষের সাথে ভালোবাসার গল্প শুনতে আমার বুকের ভেতরটা পুড়ছিল ঠিকই, কিন্তু আমি তবুও শুনতে চাইছিলাম।

আনিকা হাসলেন। সেই হাসিতে একটু নস্টালজিয়া ছিল। "হ্যাঁ, লাভ ম্যারেজ। আমাদের পরিচয় ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। আমি পড়তাম ইংলিশে, আর বেলাল— মানে আমার হাসব্যান্ড— ছিল আমার তিন ব্যাচ সিনিয়র। ইকোনোমিক্সে পড়ত। টিএসসিতে একটা কালচারাল প্রোগ্রামে আমাদের প্রথম পরিচয়। আমি সেদিন একটা আবৃত্তি করছিলাম, আর ও ছিল অর্গানাইজারদের একজন।"

"তারপর প্রেম?"

"তারপর তো ঢাকা ভার্সিটির চিরচেনা প্রেমের গল্প। হাকিম চত্বরে বসে চা খাওয়া, চারুকলায় আড্ডা, শাহবাগে রিকশায় ঘোরা। বেলাল খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল। অনার্স-মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। ওর লক্ষ্যই ছিল বাইরে গিয়ে পিএইচডি করা। আমি যখন থার্ড ইয়ারে, তখন ও স্কলারশিপ নিয়ে ইউকে চলে গেল।"

"লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ?" আমি মন্তব্য করলাম। "এটা তো খুব কঠিন জিনিস।"

"কঠিন তো বটেই," আনিকা একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "প্রায় চার বছর আমরা লং ডিসট্যান্সে ছিলাম। তখন তো আর হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের যুগ এত সহজ ছিল না। স্কাইপিতে কথা হতো। ও ওখানে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত, আমি এখানে। অনেক চড়াই-উতরাই ছিল। অনেকবার মনে হয়েছে এই সম্পর্ক টিকবে না। কিন্তু বেলাল মানুষ হিসেবে খুব স্টেডি। ওর ইমোশন কম, কিন্তু কমিটমেন্ট খুব স্ট্রং। ও পিএইচডি শেষ করে ওখানেই একটা ইউনিভার্সিটিতে টিচিং পজিশন পেয়ে গেল।"

আমি চুপচাপ শুনছিলাম। আনিকার টি-শার্টের গলার অংশটা একটু ঢিলা থাকায়, উনি যখন নড়াচড়া করছিলেন, তখন উনার ফর্সা বুকের উপরিভাগের একটা ছোট অংশ আমার চোখে পড়ছিল। আমি আমার দৃষ্টিকে উনার চোখের ওপর ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ যুদ্ধ করছিলাম।

"তারপর ও দেশে ফিরে এল," আনিকা বলে চললেন। "এসে অফিশিয়ালি আমাকে প্রপোজ করল। আমাদের দুই পরিবার রাজি হলো। খুব ধুমধাম করে আমাদের বিয়ে হলো। বিয়ের মাস ছয়েক পর আমি স্পাউস ভিসায় ইউকে চলে গেলাম। তারপর থেকে তো ওখানেই আছি।"

"আপনার কি ওখানে গিয়ে একা লাগত না? নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ।"

"প্রথমে একটু লাগত। বেলাল তো সারাদিন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে থাকত। আমি বাসায় একা। তখন আমি একটা আইটি ফার্মে জব শুরু করলাম। কাজ শিখলাম। এরপর ধীরে ধীরে আমি নিজেই একটা ছোট আইটি ফার্ম দাঁড় করালাম। লেখালেখিটাও সিরিয়াসলি শুরু করলাম। আসলে মানুষ যখন খুব একা হয়ে যায়, তখন সে হয়তো টাকার পেছনে ছোটে, নয়তো শিল্পের পেছনে। আমি দুটোই করার চেষ্টা করেছি।"

আমি আনিকার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনার কথাগুলোর মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত বাস্তববোধ আছে। কোনো রোমান্টিক ন্যাকামি নেই। ছয় বছরের বিবাহিত জীবন উনাকে অনেক বেশি প্র্যাকটিক্যাল করে তুলেছে। "ছয় বছর তো অনেক সময়," আমি হঠাৎ করেই কথাটা বলে ফেললাম।

"হ্যাঁ, দেখতে দেখতে সময় চলে যায়," আনিকা চায়ের শেষ চুমুকটা দিলেন। আমাদের মাঝখানে একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। ড্রয়িংরুমের সেন্ট্রাল এসির মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

আমি উনার চোখের দিকে তাকালাম। এই নারী, যিনি এত সুন্দর, এত বুদ্ধিমতী, যার একটা সেটেলড লাইফ আছে— উনার ভেতরে কি কোনো শূন্যতা নেই? উনার লেখা কবিতাগুলোতে যে এত আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের কথা, এত একাকিত্বের কথা— সেটা কি শুধুই সাহিত্যের জন্য, নাকি উনার দাম্পত্য জীবনে কোনো ফাঁকি আছে?

আমার সাংবাদিক এবং অনুবাদক মস্তিষ্কের কৌতূহলটা হঠাৎ করে আমার ভদ্রতার সীমানাটা অতিক্রম করে গেল। আমি জানি, এই প্রশ্নটা করা আমার উচিত হচ্ছে না। এটা অত্যন্ত ব্যক্তিগত, এমনকি একটু অভদ্রোচিত একটা প্রশ্ন। কিন্তু আমার ভেতরের সেই অবদমিত ঈর্ষা, সেই অধিকারবোধ এবং উনার সম্পর্কে সবকিছু জানার একটা বন্য আগ্রহ আমাকে প্রশ্নটা করতে বাধ্য করল।

আমি চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে, উনার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, একটু নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বললাম—"আনিকা, আপনাদের বিয়ের ছয় বছর হয়ে গেছে। আপনাদের তো সেটেলড লাইফ। ছেলে-মেয়ে না থাকাটা কি আপনাদের কোনো কনশাস ডিসিশন?"

কথাটা বাতাস কেটে আনিকার কানে পৌঁছানোর পর, ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা যেন মুহূর্তের জন্য বরফ হয়ে গেল। আমি দেখলাম, আনিকার মুখের সেই ক্যাজুয়াল, সতেজ হাসিটা হঠাৎ করেই থেমে গেল। উনার বাদামি চোখের তারায় একটা অদ্ভুত অস্বস্তি আর বিব্রতকর ছায়া ফুটে উঠল। উনি উনার খালি চায়ের মগটার দিকে দৃষ্টি নামিয়ে নিলেন। উনার হাত দুটো একটু শক্ত হয়ে মগটাকে আঁকড়ে ধরল।আনিকা চুপ করে আছেন। উনার নীরবতা ফ্ল্যাটের বাতাসকে ভারী করে তুলছে। 
[+] 11 users Like Orbachin's post
Like Reply
#54
Thanks
Like Reply
#55
লাইক রেপু ডান, একটু বড় করে তাড়াতাড়ি আপডেট দিবেন
Like Reply
#56
Darun
Like Reply
#57
Great update.. Chalia jan
Like Reply
#58
১১।
প্রশ্নটা করেই আমি বুঝলাম, কাজটা ঠিক হলো না। একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ড্রয়িংরুমে বসে, তার দামি সোফায় হেলান দিয়ে, তার বৈবাহিক জীবনের সবচেয়ে সেনসিটিভ একটা বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করাটা স্রেফ অভদ্রতা নয়, রীতিমতো গণ্ডমূর্খের কাজ। আমি একজন অনুবাদক হতে পারি, কিন্তু তাই বলে অন্যের জীবনের এমন একটা প্রাইভেট চ্যাপ্টার নিজের ভাষায় অনুবাদ করার অধিকার আমার নেই। আনিকার মুখের ওপর নেমে আসা সেই বিব্রতকর ছায়াটা দেখে আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আমি যে খুব সুকৌশলে উনার মনে আমার সম্পর্কে একটা ‘ম্যাচিউর’ আর ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ ইমেজ দাঁড় করিয়েছিলাম, একটা মাত্র বোকা প্রশ্নে সেটা এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম।
আমি আর এক সেকেন্ডও দেরি করলাম না। দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললাম, "আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি আনিকা। আমার আসলে এই প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি। প্লিজ, ইগনোর দা কোয়েশ্চেন।" আনিকা উনার চায়ের খালি মগটা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আবার আমার চোখের দিকে তাকালেন। উনার মুখের পেশিগুলো একটু রিল্যাক্সড হলো। উনি একটা হালকা, ক্যাজুয়াল হাসি দিয়ে বললেন, "আরে না না, ইটস ওকে রাশেদ। এত অ্যাপোলজাইটিক হওয়ার কিছু নেই। জানতে চাইতেই পারেন। এটা তো আর কোনো স্টেট সিক্রেট না।"

উনি সোফায় নিজের বসার ভঙ্গিটা একটু পরিবর্তন করলেন। পা মুড়ে বসার কারণে উনার ঢিলেঢালা প্লাজোটা হাঁটুর ওপর থেকে আরেকটু সরে গেল। ফর্সা
, মোলায়েম ঊরুর একটা সামান্য অংশ আলোয় আমার চোখের সামনে উঁকি দিল। আমি অনেক কষ্টে দৃষ্টিটা ওখান থেকে সরিয়ে উনার মুখের ওপর স্থির রাখলাম। "আসলে কী জানেন," আনিকা খুব শান্ত গলায় বলতে শুরু করলেন, "আমাদের সমাজের একটা কমন পারসেপশন হলো, বিয়ে হলেই বছর দুয়েকের মধ্যে একটা বাচ্চা নিতে হবে। কিন্তু লন্ডন বা ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিগুলোর রিয়েলিটি একটু ভিন্ন। আমি আর বেলাল— আমরা দুজনেই আমাদের ক্যারিয়ার নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত। বেলাল ওর ইউনিভার্সিটির টেনিউর ট্র্যাক, রিসার্চ, পাবলিকেশন— এসব নিয়ে দৌড়াচ্ছে। আর আমি আমার আইটি ফার্মটা মাত্র দাঁড় করালাম। এর পাশাপাশি আমার লেখালেখি আছে।"

আমি খুব বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নাড়লাম। "বুঝতে পারছি।"


"বাচ্চা নেওয়াটা তো শুধু বায়োলজিক্যাল একটা প্রসেস না রাশেদ," আনিকা একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ইটস আ হিউজ প্রজেক্ট। বাচ্চা হলে তাকে সামলানো, তার রেসপনসিবিলিটি নেওয়া, প্রপার প্যারেন্টিং— এগুলো খুব টাফ জব। আমরা মনে করি, একটা শিশুকে পৃথিবীতে আনার আগে নিজেদের মানসিক, আর্থিক এবং পারিপার্শ্বিক প্রস্তুতি শতভাগ থাকা উচিত। আমরা দুজনেই এখন যে ফেজে আছি, একটা বাচ্চা আমাদের দুজনের ক্যারিয়ারকেই চরমভাবে হ্যাম্পার করবে। তাছাড়া, প্যারেন্টিংয়ের জন্য যে সময়টা দেওয়া দরকার, সেটা আমরা এখন দিতে পারব না।"

আমি বললাম, "তা ঠিক। এখনকার দিনের প্যারেন্টিং আর আমাদের বাবা-চাচাদের আমলের প্যারেন্টিং এক না। আমাদের বাবা-মায়েরা দশটা বাচ্চা জন্ম দিয়ে মাঠে ছেড়ে দিতেন, বাচ্চারা প্রকৃতির নিয়মে বড় হয়ে যেত। এখন একটা বাচ্চার পেছনে যে পরিমাণ ইনভেস্টমেন্ট আর অ্যাটেনশন লাগে, সেটা একটা স্টার্টআপ কোম্পানি দাঁড় করানোর চেয়ে কোনো অংশে কম না।" আমার কথা শুনে আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। উনার হাসির শব্দটা এই বিশাল ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধতায় একটা মধুর সিম্ফনির মতো শোনাল। "এক্সাক্টলি!" আনিকা হাসতে হাসতেই বললেন। "স্টার্টআপ কোম্পানির সাথে খুব সুন্দর তুলনা দিয়েছেন। তো আমাদের প্ল্যান হলো, ক্যারিয়ারটা যখন একটা একদম সলিড, স্টেবল জায়গায় পৌঁছাবে, তখন আমরা এই ‘প্রজেক্টে’ হাত দেব। আপাতত আমাদের প্ল্যান হলো, চল্লিশের কোঠায় পৌঁছালে তারপর একটা বাচ্চা নেওয়ার ট্রাই করা। তখন আমাদের হাতে সময় থাকবে, ম্যাচুরিটি থাকবে।"

আমি মাথা নাড়লাম। লজিকটা খুব আধুনিক, খুব ক্যালকুলেটেড এবং আপার-মিডল ক্লাস ক্যাপিটালিস্ট সমাজের সাথে একদম মানানসই। সবকিছু এক্সেল শিটে ফেলে হিসাব করা। কখন প্রেম, কখন বিয়ে, কখন বাচ্চা, কখন রিটায়ারমেন্ট। কিন্তু আমার মাথার ভেতরে সেই বন্য, আদিম পুরুষটা তখনো ফিসফিস করে যাচ্ছিল। সে বলছিল— "রাশেদ, এই নারী একটা পারফেক্ট উর্বরতার প্রতীক। এর শরীরটা সৃষ্টি হয়েছে একটা নতুন প্রাণ ধারণ করার জন্য। আর তুই বসে বসে উনার সাথে প্যারেন্টিং প্রজেক্ট নিয়ে কথা বলছিস!" আমি আমার আদিম সত্তাকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে রাখলাম।

"আচ্ছা রাশেদ, একটা কথা বলুন তো।" আনিকা হঠাৎ উনার সোফা থেকে একটু আমার দিকে ঝুঁকে এলেন। উনার ঢিলেঢালা টি-শার্টের গলার কাছে যে শূন্যতা তৈরি হলো, আমি সচেতনভাবে সেদিকে তাকালাম না। আমি আমার অনুবাদক মস্তিষ্কের পুরোটা ফোকাস উনার প্রশ্নের দিকে দিলাম। 

"কী কথা?"

"
মানুষ আসলে কেন বাচ্চা চায়? হোয়াই ডু উই ওয়ান্ট টু রিপ্রোডিউস? আমি অনেককে দেখেছি, নিজে খেতে পারছে না, থাকার জায়গা নেই, কিন্তু ঠিকই বছর বছর বাচ্চা জন্ম দিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেক বড় বড় ধনী মানুষ, যাদের সব আছে, তারাও পাগল হয়ে থাকে একটা সন্তানের জন্য। মানুষ কেন তার নিজের একটা প্রজন্ম পৃথিবীতে রেখে যেতে চায়?" প্রশ্নটা দারুণ। একটা আড্ডা যখন ব্যক্তিগত স্তর থেকে দার্শনিক স্তরে উন্নীত হয়, তখন সেই আড্ডার গভীরতা অন্য রকম হয়ে যায়। আনিকা নাওহার শুধু রূপবতীই নন, উনার মস্তিষ্কটাও খুব শার্প। আমি সোফায় একটু সোজা হয়ে বসলাম। গলাটা পরিষ্কার করে নিলাম। "এটা নিয়ে তো প্রচুর থিওরি আছে আনিকা। আপনি যদি রিচার্ড ডকিন্সের কথা ধরেন, তাহলে উত্তর খুব সহজ— আমাদের জিনগুলো অত্যন্ত স্বার্থপর। 'দ্য সেলফিশ জিন'। তারা শুধু চায় বেঁচে থাকতে এবং নিজেদের রেপ্লিকেট করতে। আমরা মানুষরা হলাম সেই জিনগুলোকে বহন করার একটা গাড়ি মাত্র। জিনের কমান্ডেই আমরা রিপ্রোডিউস করি।"

আনিকা মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। উনার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।


আমি বলতে থাকলাম, "কিন্তু আপনি যদি ফিলোসফিক্যাল অ্যাঙ্গেল থেকে দেখেন, তাহলে ব্যাপারটা অন্যরকম। মানুষ আসলে মৃত্যুভয়ে ভীত। আমরা সবাই জানি, আমরা একদিন মরে যাব। আমাদের এই অস্তিত্ব, এই নাম, এই পরিচয়— সব একদিন মাটির নিচে পচে যাবে। মানুষ অবচেতনভাবে এই মৃত্যুকে অস্বীকার করতে চায়। তারা চায় অমরত্ব বা ইমমর্টালিটি।" 

"ইমমর্টালিটি?" আনিকা একটু ভ্রু কুঁচকালেন।

"
হ্যাঁ। মানুষ যখন নিজের একটা সন্তান পৃথিবীতে রেখে যায়, তখন সে সাবকনশাসলি ভাবে যে— 'আমি মরে গেলেও আমার রক্তের একটা অংশ, আমার ডিএনএ-র একটা অংশ এই পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াবে। আমি আমার সন্তানের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকব।' এটা মানুষের এক ধরনের অমরত্ব প্রজেক্ট। সাইকোলজিস্ট আর্নেস্ট বেকার তার 'দ্য ডিনায়াল অফ ডেথ' বইয়ে বলেছেন, মানুষের সমস্ত কর্মকাণ্ডের মূলে হলো এই মৃত্যুভয়। আমরা পিরামিড বানাই, বই লিখি, সাম্রাজ্য দখল করি, অথবা সন্তান জন্ম দিই— শুধু একটাই কারণে, মৃত্যুর পর যেন আমরা একেবারে মুছে না যাই।" আনিকা মুগ্ধ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

আমি মনে মনে হাসলাম। ঢাকা শহরের মেসে থাকা ব্যাচেলরদের দুটো জিনিস খুব স্ট্রং থাকে— এক, গ্যাস্ট্রিক; আর দুই, ফিলোসফি। মাস শেষে পকেটে যখন টাকা থাকে না, তখন দার্শনিক হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায়ও থাকে না। "আমার কিন্তু আরেকটা থিওরি মনে হয়," আনিকা বললেন। উনার গলার স্বরে এখন গভীর চিন্তার ছাপ।

"
কী থিওরি?"

"আমার মনে হয়, সন্তান জন্ম দেওয়াটা মানুষের চরম স্বার্থপরতার একটা রূপ। একটু আগে আপনি নিজেই বলছিলেন না, বাবা-মায়েরা চায় শেষ বয়সে সন্তান তাদের দেখভাল করুক? মানুষ আসলে এমন একজনকে পৃথিবীতে আনতে চায়, যে তাকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসবে, যে তাকে 'মা' বা 'বাবা' বলে ডাকবে, যাকে নিজের মতো করে ছাঁচে ফেলে গড়া যাবে। আমরা আসলে একটা নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে ডাকি আমাদের নিজেদের শূন্যতা পূরণের জন্য। এটা কি খুব সেলফিশ একটা কাজ না?" আমি আনিকার দিকে তাকিয়ে রইলাম। উনার কথাগুলোতে একটা অদ্ভুত শূন্যতা আছে, যেটা উনার কবিতায় পাওয়া যায়। এই নারী উনার উপন্যাসের ভাষা নিয়ে যতটা না চিন্তিত, তার চেয়েও বেশি চিন্তিত মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে। "আপনি ঠিকই বলেছেন আনিকা," আমি মৃদু স্বরে বললাম। "স্বার্থপরতা তো বটেই। পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ বলে আসলে কিছু নেই। আপনি যে সন্তানকে জন্ম দিয়ে তাকে নিজের মতো গড়তে চাইছেন, সেখানেও আপনি আপনার ইগোকে স্যাটিসফাই করছেন।" 

এভাবেই আমাদের আড্ডা চলতে লাগল।

বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে। আমরা সন্তান জন্ম দেওয়ার দর্শন থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকার সাহিত্য
, স্প্যানিশ ভাষার অনুবাদ, ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যাম, লন্ডনের বৃষ্টি, এবং মানুষের একাকিত্ব— সব কিছু নিয়ে কথা বলতে লাগলাম। আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, এই নারীর সাথে কথা বলার সময় আমার কোনো মেকি আবরণ পরতে হচ্ছে না। আমি যেমন, আমি ঠিক সেভাবেই কথা বলছি। উনার উপস্থিতিতে আমার ভেতরের সেই আদিম, ক্ষুধার্ত পুরুষটা এখন একটা শান্ত, সমঝদার শ্রোতার রূপ নিয়েছে। উনার ঢিলেঢালা টি-শার্টের নিচে উনার শারীরিক আকর্ষণ আমাকে তখনো চুম্বকের মতো টানছে ঠিকই, কিন্তু উনার মাথার ভেতরের সৌন্দর্যটা আমাকে যেন আরও বেশি মোহগ্রস্ত করে ফেলল।

সময় কীভাবে কেটে যাচ্ছিল, আমি টেরই পাইনি।

আনিকার ফ্ল্যাটের সেন্ট্রাল এসি, নিস্তব্ধ পরিবেশ, ড্রয়িংরুমের এই মায়াবী স্পটলাইটের আলো আর উনার এই রিফ্রেশিং উপস্থিতি— সবকিছু মিলিয়ে আমি যেন একটা টাইম মেশিনের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলাম, যেখানে ঘড়ির কাঁটা কাজ করে না। হঠাৎ আনিকা কথা বলতে বলতে উনার হাতের আইফোনটার স্ক্রিন অন করে সময় দেখলেন। আমারও হঠাৎ হুঁশ হলো। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালাম।

রাত প্রায় বারোটা বাজে!

বারোটা!

আমার চোখের সামনে থেকে নিমেষেই দর্শন, সাহিত্য, ইমমর্টালিটি প্রজেক্ট এবং আনিকা নাওহারের মোহনীয় মুখমণ্ডল মুছে গিয়ে সেখানে ভেসে উঠল মিরপুর দশ নাম্বারের সেই চারতলা মেস বাড়ির লোহায় জং ধরা বিশাল গেটটা। এবং সেই গেটের পাশে ডিউটি করা মফিজ দারোয়ানের পান খাওয়া মুখটা। আমি যেন কারেন্ট শট খেয়েছি, এমনভাবে সোফা থেকে ছিটকে উঠে দাঁড়ালাম।
"সর্বনাশ!" আমার মুখ দিয়ে অজান্তেই শব্দটা বেরিয়ে এল। আনিকা আমার এই হঠাৎ লাফিয়ে ওঠায় চমকে গেলেন। উনিও সোজা হয়ে বসে বললেন, "কী হলো রাশেদ? এনিথিং রং?"

আমি আমার প্যান্টের পকেট হাতড়ে ফোনটা বের করতে করতে বললাম, "প্রচুর রং! রাত বারোটা বেজে গেছে আনিকা! আড্ডা দিতে দিতে আমি তো সময়ের খেয়ালই করিনি। আমাকে এক্ষুনি বের হতে হবে। এক্ষুনি!" আনিকা অবাক হয়ে বললেন, "বারোটা বেজেছে তো কী হয়েছে? আপনি তো ছেলে মানুষ। আপনার তো আর ঢাকা শহরে কোনো কার্ফ্যু নেই। যাবেন রিকশা বা সিএনজি নিয়ে।"

"
আপনি বুঝবেন না আনিকা," আমি হতাশ গলায় বললাম। "আমার কার্ফ্যু নেই, কিন্তু আমার মেসের কার্ফ্যু আছে। আমাদের মেসের গেট রাত সাড়ে এগারোটায় বন্ধ হয়ে যায়। আমি যদি এখন না যাই, আমি আজ রাতে আর মেসে ঢুকতে পারব না।" আনিকা হেসে উঠলেন। "আরে, গেট বন্ধ হয়ে গেলে কী হয়েছে? দারোয়ান নেই? দারোয়ানকে নক করবেন, খুলে দেবে।"

"আমাদের দারোয়ানের নাম মফিজ। সে কানে কম শোনে, আর একবার ঘুমালে কেয়ামতের শিঙা ফুঁকলেও সে ওঠে না। তাকে ডেকে তোলা আর মরা মানুষকে কবর থেকে তোলা একই কথা।"
"তাহলে আপনার রুমমেটদের ফোন দেবেন। ওরা তো নামতে পারে।" আনিকা খুব লজিক্যাল সমাধান দিলেন। আমি অসহায় ভঙ্গিতে আনিকার দিকে তাকালাম। "আনিকা, আপনি ব্যাচেলর মেসের সাইকোলজি জানেন না। আমার মেসে তিনজন থাকে। রাজু, যে বিসিএস পরীক্ষার্থী। সে রাত জেগে পড়ে আর দিনে ঘুমায়। এখন যদি আমি তাকে ফোন দিই, সে হয়তো আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম মুখস্থ করছে, সে ফোন ধরবে না। আরেকজন তুহিন, যে আইইএলটিএস দেয়। সে হয়তো কানে হেডফোন লাগিয়ে ব্রিটিশ এক্সেন্ট শুনছে। আর তিন নম্বর জন তো রাত দশটায় ঘুমিয়ে যায়। এই রাত বারোটার সময় চারতলা থেকে নেমে এসে, তালা খুলে আমাকে উদ্ধার করবে— এমন মানবদরদী একটাও নেই আমার মেসে। গতবার একবার বারোটায় ফিরেছিলাম, আমাকে রাস্তার ধারের টং দোকানে বসে রাত পার করতে হয়েছিল।"

আমার এই করুণ এবং অতি বাস্তব বর্ণনা শুনে আনিকা এবার শব্দ করে হেসে উঠলেন। উনার হাসি থামছেই না। "ওহ গড! রাশেদ, আপনাদের মেসের অবস্থা তো খুব ভয়াবহ! এটা তো রীতিমতো জেলখানা!" আমি চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম, "জেলখানার চেয়েও খারাপ। জেলখানায় অন্তত সকালের নাশতাটা ফ্রি দেয়, আমাদের সেটাও দেয় না। আমাকে বের হতে হবে আনিকা। আমি নিচে গিয়ে দেখি যদি কোনো উবার বা সিএনজি পাই। মফিজকে যদি দুই-তিনশ টাকা ঘুষের অফার দিই জানলার ফাঁক দিয়ে, হয়তো খুলতে পারে।"

আমি দরজার দিকে পা বাড়ালাম। আমার মাথার ভেতর তখন টেনশন। এই ধানমন্ডি থেকে মিরপুর দশ নাম্বার যেতে অন্তত চল্লিশ মিনিট লাগবে। রাত পৌনে একটায় গেট ধাক্কাধাক্কি করলে মেস মালিক কাল সকালেই আমাকে নোটিশ ধরিয়ে দেবে। আমি যখন ফ্ল্যাটের মেন দরজার হাতল ধরতে যাব, ঠিক তখন আনিকার কণ্ঠস্বর আমাকে থামিয়ে দিল। উনার গলাটা এখন আর হাসিখুশি নেই। খুব শান্ত, খুব ধীর, কিন্তু অত্যন্ত স্পষ্ট।

"রাশেদ, দাঁড়ান।"

আমি দরজার হাতল ধরে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। আনিকা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন। উনার সেই ঢিলেঢালা টি-শার্ট আর প্লাজো পরা শরীরটা নিয়ে উনি খুব ধীর পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। উনার খালি পায়ের পাতাগুলো কাঠের ফ্লোরে কোনো শব্দ করছে না। উনি আমার থেকে মাত্র দুই হাত দূরে এসে দাঁড়ালেন। উনার সেই রিফ্রেশিং, ব্যক্তিগত সুবাসটা আমার নাকে এসে ধাক্কা দিল। উনার চোখের দৃষ্টিতে এখন আর কোনো সাহিত্য বা দর্শন নেই। সেখানে এক অদ্ভুত, স্থির, এবং অবর্ণনীয় কিছু একটা লেখা আছে। আমি উনার দিকে তাকিয়ে আক্ষরিক অর্থেই পাথর হয়ে গেলাম। আনিকা উনার ডান হাতটা আলতো করে তুললেন। উনার আঙুলগুলো আমার শার্টের কলারে একবার ছুঁয়ে গেল। তারপর উনি আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, কোনো ধরনের জড়তা বা ভণিতা ছাড়াই, খুব সহজ এবং ক্যাজুয়াল গলায় বললেন—

"আজকে থেকে যা। এই ফ্ল্যাটে রুমের তো অভাব নেই।"

এই একটা বাক্য।

মাত্র কয়েকটা শব্দ।

কিন্তু এই শব্দগুলো আমার কানের পর্দা ভেদ করে আমার মস্তিষ্কে এমন একটা প্রলয়ঙ্করী বিস্ফোরণ ঘটাল যে, আমার মনে হলো ধানমন্ডির এই ১৬ তলা বিল্ডিংটা একটা প্রচণ্ড ভূমিকম্পে কাঁপতে শুরু করেছে। রাত বারোটা বাজে। আমি একটা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আমার স্বপ্নের, আমার ফ্যান্টাসির, আমার অবদমিত কামনার সেই অপরূপা নারী। এবং সে আমাকে রাতটা তার ফ্ল্যাটে থেকে যাওয়ার অফার দিচ্ছে। আমার পুরো নার্ভাস সিস্টেম, আমার এক্সেল শিট, আমার জীবনের সমস্ত লজিক— নিমেষের মধ্যে শাটডাউন হয়ে গেল।


সাহস আর পাগলামির মধ্যে আসলে পার্থক্য কীখুব সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য আছে। ধরুন, আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন আপনি এভারেস্ট জয় করবেন। আপনি বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নিলেন, অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনলেন, শেরপা ভাড়া করলেন, আবহাওয়া দপ্তর থেকে রিপোর্ট নিলেন, তারপর একদিন পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিলেন। পৃথিবীর মানুষ আপনাকে বলবে— ‘কী অসীম সাহসী একজন মানুষ!’

এবার ধরুন, আপনি একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে, পরনের লুঙ্গিটা একটু শক্ত করে গিঁট দিয়ে, খালি পায়ে হাঁটা শুরু করলেন। আপনার পকেটে কোনো টাকা নেই, সাথে কোনো অক্সিজেন নেই, এমনকি একটা সোয়েটারও নেই। আপনি বললেন, ‘আমি খালি পায়ে হিমালয় জয় করব।’ আপনি হয়তো হিমালয়ের বেসক্যাম্প পর্যন্তও যেতে পারবেন না, তার আগেই ঠান্ডায় জমে আপনার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। পৃথিবীর মানুষ তখন আপনার মৃতদেহ দেখে বলবে— ‘কী পাগল একটা লোক! আস্ত একটা আহাম্মক!’ লজিকটা খুব পরিষ্কার। আপনি যখন কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করবেন, তার পেছনে যদি একটা শক্ত যুক্তি থাকে এবং কাজটা যদি সফল হয়, তাহলে সেটা ‘সাহসিকতা’। আর কাজটা যদি সম্পূর্ণ যুক্তির বাইরে হয় এবং তার ফলাফল যদি হয় নিশ্চিত ধ্বংস, তাহলে সেটা ‘পাগলামি’। আমি, রাশেদ আহমেদ, বর্তমানে এই সাহস এবং পাগলামির ঠিক মাঝখানের একটা সীমারেখায় শুয়ে আছি।

সময় রাত দুইটা বেজে পনেরো মিনিট।

আমি একটা বিশাল, নরম, স্প্রিংয়ের ম্যাট্রেস দেওয়া কিং-সাইজ বিছানায় শুয়ে আছি। ঘরের তাপমাত্রা বাইশ ডিগ্রিতে সেট করা। এসির একটা খুব মৃদু, ঘুমপাড়ানি শব্দ হচ্ছে। আমার গায়ের ওপর একটা দামি কমফোর্টার টানা। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত এবং পরাবাস্তব ব্যাপারটা হলো আমার পরনের পোশাক। আমার গায়ে এখন একটা সিল্কের স্লিপিং গাউন। গাউনটা গাঢ় নীল রঙের। এর ফেব্রিকটা এতই মোলায়েম যে গায়ের চামড়ার সাথে লাগলে মনে হয় পানির ওপর দিয়ে হাত বুলিয়ে নিচ্ছি। এই স্লিপিং গাউনটা আমার নয়। এটা আনিকা নাওহারের স্বামী, লন্ডনপ্রবাসী ইঞ্জিনিয়ার বেলাল সাহেবের।

লন্ডনে বসে বেলাল সাহেব হয়তো এখন তার কোনো পিএইচডি থিসিস বা আইটি ফার্মের ব্যালেন্স শিট নিয়ে ব্যস্ত। আর এদিকে ঢাকা শহরের ধানমন্ডির ষোলো তলা বিল্ডিংয়ের এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে, তার কেনা দামি বিছানায় শুয়ে, তারই ব্যবহৃত স্লিপিং গাউন পরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে মিরপুরের মেস নিবাসী পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের এক সাধারণ অনুবাদক। পরিস্থিতিটা এতই অবাস্তব আর হাস্যকর যে, আমার নিজেরই একবার জোরে হেসে উঠতে ইচ্ছে করল। কিন্তু আমি হাসলাম না। আমার মাথার ভেতর এখন জট পাকানো অনেকগুলো চিন্তা। 

ঠিক দেড় ঘণ্টা আগের কথা।

আমি ফ্ল্যাটের মেন দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার মাথার ভেতর মেসের কার্ফ্যু
, দারোয়ান মফিজের ঘুম এবং ঢাকা শহরের রাতের জ্যাম নিয়ে একটা বিশাল টেনশন চলছিল। আর ঠিক তখনই আনিকা নাওহার আমাকে বললেন— ‘আজকে থেকে যা। রুমের তো অভাব নেই।’ অফারটা শোনার পর প্রথম কয়েক সেকেন্ড আমি আক্ষরিক অর্থেই পাথর হয়ে গিয়েছিলাম। একজন বিবাহিতা, রূপবতী নারী রাত বারোটার সময় আমাকে তার ফ্ল্যাটে থেকে যাওয়ার অফার দিচ্ছেন! আমার ভেতরের আদিম পুরুষটা তখন আনন্দে ব্রেক ড্যান্স দেওয়া শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু আমার সামাজিক, ভদ্র এবং ‘ভালো ছেলে’ সত্তাটা সাথে সাথে অ্যাকটিভ হয়ে গেল।

আমি খুব নার্ভাস গলায় বলেছিলাম, "আরে না না আনিকা! এটা কী বলছেন! আমি এখানে থেকে যাব মানে? এটা কোনো কথা হলো? আমি ম্যানেজ করে চলে যেতে পারব।" আনিকা সোফা থেকে উঠে আমার দিকে আরেকটু এগিয়ে এসেছিলেন। উনার চোখেমুখে কোনো সংকোচ বা দ্বিধা ছিল না। উনি খুব স্বাভাবিক, প্র্যাকটিক্যাল গলায় বললেন, "রাশেদ, বাচ্চাদের মতো করবেন না তো। রাত বারোটা বাজে। আপনি নিজে একটু আগে বললেন আপনার মেসের দারোয়ান কানে শোনে না, আপনার রুমমেটরা দরজা খুলবে না। আপনি কি আজ রাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবেন? নাকি কোনো থানার বেঞ্চে বসে রাত পার করবেন? আমার এখানে চারটা বেডরুম। তিনটা একদম খালি পড়ে আছে। একটা রুমে আপনি চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়বেন, সকালে উঠে যে যার কাজে চলে যাব। এতে এত প্যানিক করার কী আছে?"

উনার যুক্তিগুলো এতই অকাট্য ছিল যে, আমি আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। আসলেই তো! আমি তো কোনো অবিবাহিত তরুণীর মেসে বা হোস্টেলে থাকছি না। এটা একটা বিশাল ফ্ল্যাট। আমি একটা গেস্টরুমে ঘুমাব। এতে তো মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার কিছু নেই। ইউরোপ-আমেরিকায় এটা ডালভাত। একজন বন্ধু আরেকজন বন্ধুর বাসায় কাউচে বা গেস্টরুমে রাত কাটাতেই পারে।
আমি যখন আমার এই ‘ভদ্র’ লজিকগুলো দিয়ে নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম, আমার অবচেতন মন তখন মিটিমিটি হাসছিল। সে জানত, আমি আসলে মেসের ভয়ে এখানে থাকছি না। আমি থাকছি এই নারীর কাছাকাছি, একই ছাদের নিচে একটা রাত কাটানোর তীব্র লোভ থেকে।

আমি একটা দুর্বল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলাম, "ঠিক আছে। কিন্তু আপনাকে আমি মিছামিছি একটা ঝামেলার মধ্যে ফেলে দিলাম।"
"কোনো ঝামেলা না," আনিকা হাসিমুখে বললেন। "আপনি আসুন। আমি আপনাকে রুম দেখিয়ে দিচ্ছি।"

আমি উনার পিছু পিছু করিডোর দিয়ে ভেতরে গেলাম। উনি আমাকে একটা বিশাল বেডরুমে নিয়ে গেলেন। অ্যাটাচড বাথ
, বিশাল জানালা, দামি পর্দা। "আপনি ফ্রেশ হয়ে নিন। তোয়ালে বাথরুমে দেওয়াই আছে," আনিকা বললেন। তারপর হঠাৎ কী যেন একটা মনে করে উনি থামলেন। আমার দিকে আপাদমস্তক একবার তাকিয়ে বললেন, "রাশেদ, আপনি তো সারাদিন অফিস করে এসেছেন। এই ফরমাল শার্ট আর প্যান্ট পরে তো ঘুমাতে পারবেন না। খুব অস্বস্তি হবে।" আমি একটু কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, "অসুবিধা নেই। আমি এভাবেই ম্যানেজ করে নেব। একদিনের তো ব্যাপার।"

"আরে না, পাগল নাকি!" আনিকা খুব অধিকার খাটানোর সুরে বললেন। "এভাবে কেউ ঘুমাতে পারে? আপনি দাঁড়ান, আমি আসছি।"
[+] 7 users Like Orbachin's post
Like Reply
#59
Uff darun egoche... Ebar dekhkar next ki hoi
Like Reply
#60
Darun
Like Reply




Users browsing this thread: 4 Guest(s)