Thread Rating:
  • 22 Vote(s) - 2.64 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Romance কিছু সম্পর্ক
(07-02-2026, 08:15 PM)Ra-bby Wrote: কই, আমি শুনতে পেলাম না যে

ইউটিউবে গিয়ে দেখন তো ভাই , এখন থেকেই যাবেন , একটু কস্ত করে দেখেন
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
(07-02-2026, 08:23 PM)gungchill Wrote: ইউটিউবে গিয়ে দেখন তো ভাই , এখন থেকেই যাবেন , একটু কস্ত করে দেখেন

youtube  a thik ase. but aikhane amar device theke sound aschena.....janina amr device problem kina

অসমাপ্ত আত্মজীবনী
party2.gif 
খেলা যে চলছে কোন লেবেলে
[+] 1 user Likes Ra-bby's post
Like Reply
কিছু সম্পর্কঃ ৯ ()  এর বাকি অংশ  

আয়শা আর রানী যখন করিডর দিয়ে হেটে আসছিলো , তখনো রাজিব কোরিডরে বসা , ও নাস্তা আনতে যায়নি , কারন ও জানতো বাসা থেকে খাবার কিছুক্ষনের মাঝেই পৌঁছে যাবে । আয়শার সাথে ওর কথা হয়েছিলো । ওদের দেখে রাজিব উঠে দাড়ায়, হাসি মুখে সামনে এগিয়ে জেতে নেয় , ঠিক তখনি পেছনে জয়ের আবির্ভাব হয় , হাতে টিফিন ক্যারিয়ার । এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় রাজিব , চোখাচোখি হয় জয়ের সাথে । চোখাচোখি হতেই দুজনেই প্রায় একসাথে চোখ সরিয়ে নেয়যেন কেউ প্রথমে থামলে অন্যজনের ভেতরের কথা বেরিয়ে পড়বে

রাজিব নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকে, আর সামনে এগোয় নাজয়ের মুখটা দেখেই রাজিবের পা দুটো থমকে যায়ঠিক ভয় নয়, ঠিক রাগও নয়একটা পুরোনো পরিচিত অনুভূতি, যেটা এখন আর পরিচিত লাগে না একসময় যাদের দূরত্ব বোঝারই কথা ছিল না, তাদের মাঝখানে এখন কয়েক কদম ফাঁক পড়ে গেছেআর সেই ফাঁকটা পেরোতে রাজিবের অদ্ভুত লাগে

জয় নিজেও একটু থমকে দাড়ায় , হাতে ধরে টিফিন ক্যারিয়ারের উপর হাতের চাপ আরো কিছুটা বারে , চোখে রাগ নেইআছে একটা ছোট্ট ভুলহয়তো ভুলও নয়, কিন্তু ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা 

রাজিব , জয়ের দিকটা উপেক্ষা করেই রানী আর আয়শার দিকে তাকায়হাঁটার সময় আয়শা রানীর একটা হাত ধরে রেখেছেরাজিব একটা ছোট শ্বাস ফেলেরানীকে স্বাভাবিকই লাগছে তার কাছেএতে একটু স্বস্তি পায় রাজিব

সকালে রানীকে ফোন করে সে ডাক্তাররা রহিম সম্পর্কে যতটা ভালো খবর বলেছিল, তার চেয়েও একটু বাড়িয়ে বলেছিলরানী যেন দুশ্চিন্তামুক্ত থাকে
রানী একবার রাজিবের দিকে তাকিয়ে আবার স্বাভাবিকভাবেই চোখ ফিরিয়ে নেয়ঠিক তখনই রাজিবের চোখে একটা ব্যাপার ধরা পড়েরানী শুধু ভারমুক্তই নয়ওর চোখের কোণে যেন একটা হালকা উজ্জ্বলতা লেগে আছে, আর ঠোঁটের কোণে একটা চেপে রাখা হাসি 
রাজিব একটু অবাক হয়অনেক দিন পর রানীর মুখে এমন একটা সহজ ভাব দেখছে সেতবে বিষয়টা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবে নাবরং ভালোই লাগেগতকাল ওকে এমন ভয় পেতে দেখার পর, আজ এই মুখটাই রাজিবের জন্য যথেষ্ট

আয়শার দিকে তাকিয়ে ওর মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠেআয়শা যেমন এখনো রানীর হাত ধরে আছে, রাজিবের বুঝতে অসুবিধা হয় নাকেন রানী এতটা ভারমুক্তনিশ্চয়ই আয়শা আর জান্নাতই গত রাত আর আজকের সকালটা ওর পাশে থেকে ওকে এই অবস্থায় এনে দিয়েছে
 
কিরে তুই এখানে দাড়িয়ে কেনো?” কাছে আসতেই আয়শা জিজ্ঞাসা করে ,  
 
হাল্কা হাসে রাজিব , বলে বড় আব্বু নাস্তা কিনতে পাঠিয়েছে , হেব্বি রেগে আছে তোমাদের দেরি দেখে
 
রাজিবের কথা শুনে রানী চেপে রাখা হাসি ফিক করে বেরিয়ে আসে , আয়শা ভ্রূকুটি করে আর পেছনে জয়  নিসব্দে আই রোল করে ।
 
বাদ দে তোর বড় আব্বুর কথা , সে তো মনে করে , আমি মেশিন , রান্না হও বলবে আর রান্না হয়ে যাবে , চল ভেতরে
 
রাজিব ও মুচকি হাসল , তারপর ওদের নিয়ে ভেতরে গেলো ,
 
******
 
ভেতরে গিয়েই রানীর নজর প্রথমে পড়ে ওর আব্বুর উপরগাড়ির ভেতরে জয়ের সঙ্গে খুনসুটির রেশ ধরে এতক্ষণ চোখের কোণে যে ঝিলিকটা ছিল, সেটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে যায়তার জায়গা নেয় এক ধরনের শান্ত দৃষ্টি

হ্যাঁ, রানী দেখতে পাচ্ছেরহিম এখন ভালো আছেবন্ধু জয়নালের সঙ্গে গল্প করছে

রানীর বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা শ্বাস খুব ধীরে বেরিয়ে আসেতার সঙ্গে প্রায় ফিসফিস করে বেরিয়ে আসে শব্দটা—“আব্বু…”

এটা ডাকার ডাক নাযেন একটা পরীক্ষামানুষটা সত্যিই আছে কি না, সেটুকু যাচাই করে নেওয়া

গতকাল এই মানুষটাকে হারিয়ে ফেলবে ভেবে পুরো পৃথিবীটা হঠাৎ খুব কঠিন লেগেছিলতাই এই একটুকু শব্দ দিয়ে রানী যেন নিজেকে বুঝিয়ে নেয়মানুষটা এখনো আছে
 
রহিম মেয়ের দিকে তাকায়প্রথমেই ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে ওঠেতারপর নজর যায় রানীর নরম দৃষ্টির দিকেঠিক তখনই বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে রহিমেরএই প্রথম একটু ভয় পায় সেভয়টা নিজের জন্য নয়আবার পুরোপুরি নিজের জন্যও

নিচের ঠোঁটে হালকা একটা কাঁপুনি দেখা দেয়, এতটাই ক্ষীণ যে চোখে পড়ার কথা নয়

আব্বু…”
মেয়ের মুখে শব্দটা শুনেই রহিম বুঝে নেয়এই ডাক বলে দেয়, গতকাল রানী কতটা ভয় পেয়েছিল

রহিম হাত বাড়ায়রানী হেঁটে আসেএই হাঁটার মধ্যেও একটা অনিশ্চয়তা চোখে পড়ে রহিমেরযেন সে নিজেও ঠিক জানে না, সত্যিই আব্বুর কাছেই আসছে কি না

কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেবিনের বাতাস ভারী হয়ে যায়রহিম নিজেই সেটা হালকা করার চেষ্টা করেরানীর হাত ধরে নরম গলায় বলে,খুব ভয় পেয়েছিলি রে মাভয় নেই, আমি এত তাড়াতাড়ি যাচ্ছি না

রানীর চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে

আধশোয়া ভঙ্গিতে রহিম মেয়েকে বুকে টেনে নেয়তখন সে টের পায় সেই উষ্ণতারক্তের উষ্ণতাযে উষ্ণতা কোনো ডাক্তারের ওষুধ, কোনো নার্সের সেবা এনে দিতে পারে না

এই উষ্ণতা রহিমের একার নয়, রানীর শরীরের একারও নয়দুজনের শরীরে বয়ে চলা একই রক্তই এই উষ্ণতা তৈরি করেছেযার কোনো বিকল্প নেই, যা আর কেউ তৈরি করতে পারে না

চোখ তুলে রহিম তাকায় রাজিবের দিকেছেলেটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেশরীর আর পোশাকে ক্লান্তির ছাপ, সারারাত না ঘুমানোর চিহ্ন স্পষ্টসেই সব ক্লান্তির চিহ্ন ছাপিয়ে উঠেছে তৃপ্তিআর তার ছায়া হয়ে আছে, তৃপ্তির আড়ালে চাপা পড়া ভয়

রহিম ভেবে পায় নাকীভাবে সে এখনো নিজের ছেলে-মেয়ের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছেএদের জন্য সে আসলে কী করেছে, আর কী করতে পারেনি কান্নাটা আর ঠোঁটের কাঁপুনিতে সীমাবদ্ধ থাকে না , ছোট্ট দুফোঁটা জল হয়ে চোখে চিকচিক করতে থাকে ।  
 
*****  
 
কেবিনের ভেতরটা এখন ভেজা আবেগে ভরপুররহিম জড়িয়ে রেখেছে রানীকেচোখে জমে আছে জলের ফোঁটারানী বাবার বুকে মিশে নিঃশব্দে কাঁদছেরাজিব একটু দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে দেখছেতার মনে কী চলছে, বোঝা খুব মুশকিল নয়এখন সব ঠিক আছে, কিন্তু একটা ঝড় এলেই সব ওলটপালট হতে পারেপাশে বসে জয়নাল নীরবে দেখছেআয়শা দাঁড়িয়ে আছে, মুখে মৃদু হাসিজয় সবার পেছনেওর দৃষ্টি শুধু রানীর হালকা হালকা কেঁপে ওঠা পিঠের ওপর নিবদ্ধ

প্রথম নীরবতা ভাঙলো আয়শাহাসিমুখে একটু এগিয়ে এসে, রানীর পিঠে হাত রেখে রহিমকে জিজ্ঞেস করলো,এখন কেমন আছেন ভাই?”

একই সময় জয়নাল পাশ থেকে হাত রাখলো রহিমের কাঁধে

আয়শা আর জয়নালের নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া যেন রহিমকে নিজের আবেগ কন্ট্রোলের শক্তি যোগান দিলোরানীকে ছেড়ে সে ওকে সোজা করে দাঁড় করালোঠোঁট চেপে সাহসী হাসিতে দুবার হালকা ঝাঁকুনি দিলো রানীর দুবাহু ধরেযেন বলতে চাইছে, আব্বু এখনো আছেতারপর হাসিমুখে আয়শার দিকে তাকিয়ে বলল,এখন ভালো আছিআপনাদের অনেক কষ্ট দিলাম, ভাবি”—বলে একটু হাসার চেষ্টা করল

এই কষ্টের সুদেআসলে শোধ নেবো ভাইএকদম নিয়ম মেনে চলবেন, আর ক্লাস করা বন্ধএকদম টোটাল অফ,”বলে আয়শা এখনো হালকা কাঁদতে থাকা রানীর কাঁধ এক বাহুতে জড়িয়ে ধরলোরানীর দিকে তাকিয়ে আবার বলল,কি বলিস মা, তুই, আমি আর সবাই মিলে কঠিন সাজা দেবো তোর আব্বুকে

বলবার সময় আয়শার গলাও ধরে এলোবারবার আফরোজার কথা মনে পড়ছেএই সময় আফরোজা থাকলে কী করতো, সেই ভাবটাই ভেসে উঠছে মনে
আয়শার এই মৃদু শাসনে জয়নালের কণ্ঠে একটু কঠোরতা এলোবলল,শালা, যদি আর কোচিংয়ের নাম নিবি, আমি তোর ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো

কথাটা শুনে রানী আয়শার বুকে মুখ গুঁজেই হালকা হেসে ওঠেচোখের কোণটা আঙুলের ডগায় মুছে নেয় সেকান্না থামেনি, কিন্তু এখন আর ভাঙন নেই

একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজিব ধীরে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়েএতক্ষণ যে চাপা ভয়টা বুকের ভেতর আটকে ছিল, সেটা আর নেইসে দেয়ালের দিকে হেলান দেয়মাথাটা হালকা পেছনে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্যভাবটা এমন, পরে কী হবে দেখা যাবেএই মুহূর্তটা থাক

জয় সবার শেষে একটু এগিয়ে এলোচোখেমুখে হালকা দুষ্টুমি ধরে রেখে বলল,
কি ব্যাপার ছোট আব্বু, কিছুদিন আগে আমাকে খুব সাহস দিচ্ছিলেনএখন নিজেই চিতপটাং!”

রহিম হেসে উঠলোবলল,মাঝে মাঝে তোদের ইয়াংম্যানদের একটু খাটিয়ে নিতে ইচ্ছে হয় রে

আগের গুমোট ভাবটা কেটে গেছেতবে কেবিনের ভেতরটা এখনো উষ্ণএই উষ্ণতা ছড়াচ্ছে সম্পর্কগুলোএভাবেই কিছু সম্পর্ক আমাদের জীবনকে, শরীরকে উষ্ণতা দেয়নির্জীব শীতলতা থেকে দূরে সরিয়ে আনে

বেঁচে থাক এই সম্পর্কগুলোবেঁচে থাক এই উষ্ণতা 
 
*****  
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 1 user Likes gungchill's post
Like Reply
Darun
[+] 1 user Likes Saj890's post
Like Reply
Video 
(09-02-2026, 08:00 PM)gungchill Wrote:
আগের গুমোট ভাবটা কেটে গেছেতবে কেবিনের ভেতরটা এখনো উষ্ণএই উষ্ণতা ছড়াচ্ছে সম্পর্কগুলোএভাবেই কিছু সম্পর্ক আমাদের জীবনকে, শরীরকে উষ্ণতা দেয়নির্জীব শীতলতা থেকে দূরে সরিয়ে আনে

বেঁচে থাক এই সম্পর্কগুলোবেঁচে থাক এই উষ্ণতা

❤️

অসমাপ্ত আত্মজীবনী
party2.gif 
খেলা যে চলছে কোন লেবেলে
[+] 1 user Likes Ra-bby's post
Like Reply
(10-02-2026, 05:54 PM)Ra-bby Wrote: ❤️?

ভালোবাসা গ্রহন করলাম , কিন্তু প্রশ্নবোধক চিহ্ন টা ঠিক বুঝলাম না ?
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


Like Reply
[Image: afroja-prototype.png]
সম্পূর্ণ AI জেনারেটেড , জীবিত অথবা মৃত কারো সাথে কোন সম্পর্ক নেই ।
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 1 user Likes gungchill's post
Like Reply
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 1 user Likes gungchill's post
Like Reply
কিছু সম্পর্কঃ ৯ ()
 
কেবিন যেন এখন পারিবারিক মিলনমেলাঅ্যান্টিসেপটিকের হালকা ঝাঁঝালো গন্ধের ভেতরেও একধরনের ঘরোয়া উষ্ণতা মিশে আছেরহিম আধশোয়া হয়ে বেডে হেলান দেওয়ারানী পাশে বসে আছেজয়নাল অপর পাশেজয় রহিমের পায়ের কাছে বসেআয়শা একটা চেয়ার বেডের কাছে টেনে এনে বসেছেআর রাজিব সোফায়জয়নাল, রহিম আর রাজিব খাচ্ছেপ্লাস্টিকের কন্টেইনার খুলে ভাততরকারির হালকা বাষ্প উঠছে

অনুপস্থিত শুধু একজনসে হচ্ছে জান্নাতরহিম একবার ওর কথা জিজ্ঞাসা করেছিলআয়শা বলেছে, বিকেলের দিকে আসবে

কথাগুলো এখন আর নিচু স্বরে হচ্ছে নাহাসপাতালের নিয়মের চেয়ে কিছুটা উঁচুতেই চলছেতার সঙ্গে মাঝেমাঝেই জয়নালের হা-হা করে হাসি যোগ হচ্ছে, শব্দটা সাদা দেওয়ালে ঠেকে ফিরে আসছেএকমাত্র চুপচাপ রাজিবগত রাতের ক্লান্তি আর গতদিনের মানসিক ধকল এখনো পুরো কাটিয়ে ওঠেনিচোখের নিচে হালকা কালি, কাঁধের পেশিতে টানতবে সেটা এখন আর বোঝা যাচ্ছে নানিজের চিরচেনা অদৃশ্য বর্মটা পরে নিয়েছে যেন

এর মাঝেই নার্স চলে এলোকেবিনের অবস্থা দেখে নার্সের চোখ কপালে উঠলকড়া গলায় জানিয়ে দিলএটা হাসপাতাল, বাসা নয়রহিমের ভাইটাল চেক আর ওষুধগুলো বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় আবার বলে গেল, এত মানুষ একসাথে থাকা যাবে না

নার্স চলে যেতেই কেবিন আবার গমগমে হয়ে উঠল আলোচনায়তবে এবার বাদ সাধল আয়শাযেন নার্সেরই প্রতিনিধি হয়েজয়নালকে কয়েকবার নিচু স্বরে কথা বলতে বললতার কণ্ঠে ক্লান্তি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণও আছে

রাজিবের খাওয়া শেষ হতেই আয়শা ওকে বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হতে আর একটু রেস্ট নিতে বললকারণ রাজিবের শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্টআঙুলের ফাঁকে চামচটা কয়েক সেকেন্ড স্থির ছিলপ্রথমে রাজিব রাজি হচ্ছিল নাকিন্তু আয়শা নাছোড়একপ্রকার ধমকেই রাজিবকে রাজি করাল

রহিমও একবার নরম করে বললঠিক বাবার নির্দেশ নয়, বরং অনেকটা অনুরোধের সুরেযেন ছেলেকে কিছু বলতে গিয়ে রহিম নিজেই একটু সংকোচ বোধ করছেগলার স্বর নিচু, তবু ভারী

রহিমের কথা শুনে রাজিব একবার কেবিনের দিকে তাকায়রহিম, রানী, আয়শাসবার দিকে চোখ যায়রানীর দিকে দৃষ্টিটা কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়; সেখানে একঝলক নীরব বোঝাপড়াকিন্তু জয়কে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়তারপর ধীরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগোয়পেছন থেকে শরীরটা দেখে বোঝা যায়, সামান্য সামনে ঝুঁকে আছেক্লান্তি আর অবসন্নতার ওজন কাঁধে নিয়েহাঁটার সময় জুতোর তলায় মেঝের হালকা ঘষাঘষির শব্দ শোনা যায়

আয়শা রানী আর জয়কেও থাকতে দিল নাওদের পাঠাল ক্লাস করতেরানী একদুবার প্রতিবাদ করলকথার ফাঁকে সে ঠোঁট চেপে ধরে এক মুহূর্তের জন্য; আঙুলগুলো ওড়নার কিনারায় শক্ত হয়ে ওঠে, তারপর আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায়

কিন্তু জয় সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেলকথা বলার সময় সে এক ফাঁকে রানীর দিকে তাকায়তাকানোটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরে যেন কিছু ঠিক করে নেওয়ার তাড়াহুড়া আছেওর চেহারা এখনো হাস্যোজ্জ্বলতবে সেই হাসির স্তরের নিচে একটা দৃঢ় সংকল্পের উপস্থিতি চোখে পড়েচোয়ালটা অল্প শক্ত, চোখের দৃষ্টি স্থির
গত রাতে নিজের সঙ্গে করা সংকল্পের দ্বিতীয় ধাপের জন্য রানীকে একা পাওয়া এখন ওর কাছে খুব জরুরি
*****  
 
হাসপাতালের বাইরে বেরুতেই রাজীবের চোখে সূর্যের আলো সুঁইয়ের মতো বিধলগতকাল থেকে আর সূর্য দেখা হয়নিআলো নাকি শক্তির উৎসকিন্তু রাজীবের বেলায় উল্টো হলোবাইরে পা দিতেই মনে হলো শরীরের সব শক্তি যেন একসাথে ঝরে গেছেকপালে হালকা ঘাম চিকচিক করছে, তবু ভেতরটা ঠান্ডা
হাঁটার সময় পায়ে জোর নেইমাথা ধরেছেচোখ জ্বালা করছে ঘুমের অভাবেশরীরটা হালকা টলছেহাঁটুর ভেতরে যেন ফাঁপা শব্দ, পায়ের তলায় মাটি একটু নরম হয়ে আসছে

বাইকটা হাসপাতালের বাইরেই পড়ে আছেগতকাল সকালে রেখে গিয়েছিল, তারপর আর খেয়াল করা হয়নিসিটে ধুলো জমেছে, পাখির মল শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছেরোদে গরম হয়ে চামড়াটা কড়াবসার মতো অবস্থাও নেইতবে পরিষ্কার থাকলেও রাজীব হয়তো উঠতে পারত নাবাইকের দিকে তাকিয়ে ইচ্ছাই হলো না হাত দেওয়াররিকশা নেওয়াই সহজ মনে হলো

রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে রইলসামনে তিনচারটা রিকশাকেউ যাবে নারাজীব আর জোর করল নাশরীরের অবসাদ ওকে মাধ্যাকর্ষণের মতো টেনে নিচে নামিয়ে দিচ্ছেকাঁধ দুটো একটু একটু করে ঝুলে পড়ছে

গতকাল সে ভয় পেয়েছিলসত্যিকারের ভয়বুকের ভেতরটা তখন কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিলআগে আব্বুর উপস্থিতির মূল্য বুঝত নাঅবহেলা করেনি কোনোদিন, কিন্তু গুরুত্বও পুরোপুরি বোঝেনিগতকালের ধাক্কা তাকে বুঝিয়েছেকিছু না করেও রহিম ওর আর রানীর জন্য কত বড় আশীর্বাদবাবা হারানোর মুখে গিয়েই সে বুঝেছে, আসলে কতটা নির্ভর করে আছে

হাসপাতালে থাকতে এই অবসাদ টের পায়নিতখন স্নায়ু টানটান ছিলমন শুধু একটা দিকেই কাজ করছিলআব্বুর কী দরকার, কখন কী লাগবেদায়িত্ব ওকে ধরে রেখেছিলহাত ব্যস্ত থাকলে ভেতরের শূন্যতা বোঝা যায় না

কিন্তু এখন দায়িত্ব থেকে কয়েক কদম দূরে আসতেই শরীর আর মন দুটোই ভেঙে পড়ছেবুকের মাঝখানে হালকা চাপ অনুভব হচ্ছে, নিঃশ্বাস একটু ভারী
হঠাৎ রাজীবের মনে একটা প্রশ্ন জাগলপ্রশ্ন না, অনুধাবন

এই অবসাদ কি নতুন?

নাকি এটা সবসময়ই ছিল?সম্ভবত ছিল

কিন্তু দায়িত্বগুলো সেটাকে ঢেকে রাখত

কারও না কারও দরকার ছিল বলে সে টিকে ছিল

দায়িত্ব ছাড়া রাজীব ঠিক কে?

যদি একদিন দায়িত্বগুলোর অবসান হয়

যদি আশেপাশের মানুষদের কাছে তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়

তাহলে কি এই অবসাদই তার একমাত্র সঙ্গী হয়ে থাকবে?

এই ভাবনাটা এই মুহূর্তে রাজীবকে একটা আয়নার সামনে এনে দাঁড় করায়যে আয়নায় নিজের চোখের ভেতরের শূন্যতা দেখতে রাজীব ভয় পায়

*****  
 
রাজীব যখন এসব ভাবছিল, ঠিক তখনই হাসপাতালের গেট থেকে জয় আর রানী বেরিয়ে এলোদুজনেই হাসিমুখে কথা বলতে বলতেদুপুরের রোদে তাদের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছেরাজীবের দিকে প্রথম দৃষ্টি যায় রানীরওদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজীবরোদে তার শার্টের কাপড়টা একটু ফিকে দেখাচ্ছে

রানীর হাসিমুখটা একটু নরম হয়ে যায়ম্লান নয় ঠিক, তবে একটা অন্যরকম ভাবযেন সে চাইছে না রাজীব ওর হাসিটা দেখুকঠোঁটের কোণ একটু থেমে যায়
ব্যাপারটা জয়ের চোখ এড়ায় নারানীর দৃষ্টি লক্ষ করে জয় তাকায় রাজীবের দিকেচোয়ালটা সামান্য শক্ত হয়ে যায়ইচ্ছাকৃত নয়, যেন স্বাভাবিক রিফ্লেক্সআঙুলগুলো চাবির রিমে অল্প চাপ দেয়জয় বলে,তুই দাঁড়া, আমি গাড়ি নিয়ে আসছিএই বলে সে পার্কিং লটের দিকে চলে যায়তার পায়ের শব্দ কংক্রিটে ঠকঠক করে ওঠে

রানী ছোট্ট করে একটা হাসি দেয়জয় চলে গেলে আবার রাজীবের পিঠের দিকে তাকায়রাজীব সামান্য কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেকাঁধ দুটো একটু নুয়েশারীরিক অবসাদটা বোঝা যাচ্ছেরানী টের পায়মনে মনে ভাবেসারারাত হাসপাতালে ছিল, ঘুম হয়নি নিশ্চয়ই
রানী এগিয়ে যায়পেছনে দাঁড়িয়ে বলে,ভাইয়া, এখনো দাড়িয়ে আছিস কেনো?” 

রাজীবের চিন্তার সুতো কেটে যায়পেছনে ফিরে তাকায়রানী দাঁড়িয়ে আছে, কপালের উপর হাত দিয়ে রোদ থেকে চোখ বাঁচানোর চেষ্টা করছেরোদের আলোয় ওর চোখ চিকচিক করছে

তুই আবার এই রোদে বেরিয়ে এলি কেন?”রাজীব জিজ্ঞেস করেজিজ্ঞাসায় অভিভাবকসুলভ শাসনের চেয়ে উৎকণ্ঠাই বেশিগতকাল রানীর উপর খুব চাপ গেছেএখন আবার রোদে দাঁড়িয়ে মাথা ঘুরে যায় কিনা সেই চিন্তা মাথায় ঘুরছে

রানী বলে,বড় আম্মু পাঠালোবলল এখানে থেকে রুমে ভিড় না বাড়াতেনার্স বেশি লোক থাকতে দিচ্ছে নাতাই ক্লাসে যাচ্ছি

ক্লাস করতে পারবি? না হলে আমার সাথে চলআজ রোদ খুব বেশি
রাজীব বলেতার কণ্ঠে ক্লান্তির ভেতরেও টান আছে

না না, সমস্যা হবে নাআমি জয়এর সাথে যাচ্ছিও গাড়ি নিয়ে আসতে গেছে
জয়ের নাম নিতে গিয়ে রানীর মুখ একটু নিচু হয়ে যায়গালের পাশ দিয়ে চুলের গোছা নড়ে ওঠেএক মুহূর্তের জন্য জয় ভাইয়াপ্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সামলে নেয়কোনোদিন জয়কে ভাই ডাকেনি সেবললে হয়তো অন্যরকম হয়ে যেত

সত্যি পারবি তো? এখন শরীর কেমন লাগছে? আয়, একটু ছায়ায় দাঁড়া
রাজীব ছায়ার দিকে সরে গিয়ে রানীর জন্য জায়গা করে দেয়গরম বাতাসের মধ্যে ছায়াটা একটু ঠান্ডা লাগে
রানী ছায়ায় এসে দাঁড়ায়তারপর জিজ্ঞেস করে,তোর বাইক কই? রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”

বাইকের অবস্থা খারাপময়লা হয়ে আছেআর ঘুম পেয়েছেবাইক চালানোর অবস্থায় নেইনির্লিপ্তভাবে বলে রাজীবচোখের পাতা ভারী হয়ে নেমে আসে আবার ওঠে

রানী ভালো করে একবার রাজীবের দিকে তাকালোএলোমেলো চুল, চোখ দুটো হালকা লাল হয়ে আছেবারবার হাই তুলছে, চোখে পানি জমছেরানীর চোখের দৃষ্টি একটু নরম হলোবুকের ভেতর হালকা কেমন একটা টান অনুভব করেসকালে একবার ফোনে কথা হয়েছিলহাসপাতালে এসে আর কথা হয়নি রাজীবের সাথেওর শরীরের অবস্থা জিজ্ঞেস করার সময় হয়নিএখনো করলো নাআসলে কেমন যেন একটা বাধা কাজ করছে ভেতরেশুধু ছোট করে একটা শ্বাস বের হলো বুক থেকেতারপর ইতস্তত করে বলল,তুইও চল আমাদের সাথেগাড়িতেজয় তোকে নামিয়ে দেবে

রাজীব হেসে বলল,আরে না, রিকশা নিলেই হবেতুই যা

রানী জানে জয়ের সাথে রাজীবের সম্পর্ক আর আগের মতো নেইআগের মতো নেই তো নয়ই, উল্টো আগের ঠিক বিপরীত হয়ে গেছেকী কারণে হয়েছে সেটা রানী জানে নারাজীব কোনোদিন বলেনিরানীও জিজ্ঞেস করার সাহস করেনি

রানীর মাঝে মাঝে মনে হয়, রাজীবের সামনে জয়কে নিয়ে বেশি কথা বললেই হয়তো রাজীব ওর মনের কিছু ধরে ফেলবেআর রানীও সেই সময় পুরো স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল নাজয়কে নিয়ে ঝামেলা, রাজীবের সাথে সম্পর্কের শীতলতাসব মিলিয়ে একটা চাপা টান তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নিঅন্তত রানীর দিক থেকে

রাজীবও আজকাল মেপে কথা বলেযেন ভয় পায়কিছু বেশি না হয়ে যায়ঠোঁটের কোণে অর্ধেক কথা এসে থেমে থাকে

এমন সময় গাড়ি নিয়ে আসে জয়হর্ন দেয়শব্দটা একটু তীক্ষ্ণ শোনায়সরাসরি তাকায় না রাজীব আর রানীর দিকে

রানী একবার রাজীবের দিকে তাকায়, একবার জয়ের দিকেকী যেন ভাবেচোখে এক মুহূর্তের দ্বিধাতারপর বলে,ঠিক আছে, তুই বাসায় গিয়ে রেস্ট নেআমি বিকেলে আবার হাসপাতালে আসবোতুই আসিস না

রাজীব কিছু বলে নারানীর চলে যাওয়া দেখেগাড়ির সামনে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবে রানী, একবার পেছনে তাকিয়ে রাজীবকে দেখে, তারপর পেছনের দরজা খুলে পেছনের সিটে বসেদরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা শুকনোগাড়ি ছেড়ে দেয়ধুলো একটু উড়ে উঠে আবার বসে যায়রাজীব বুঝতেই পারে নাকিছুক্ষণ আগের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে করা ভাবনাগুলো কোথায় মিলিয়ে গেছে

এখন তার চিন্তা একটাইরানী ক্লাস আর হাসপাতালের চাপে আবার অসুস্থ হয়ে যায় কিনাবুকের ভেতর হালকা অস্বস্তি জমে থাকে

তার সঙ্গে আরেকটা চিন্তাসে গুরুত্ব দিতে চায় নাকিন্তু সরিয়েও রাখতে পারে না

জয়ের কাছ থেকে রানীকে দূরে রাখা উচিত কি না

কিছুদিন আগে যেদিন জয় তাকে মেরেছিল, সেদিন রানী নিয়ে খুব খারাপ ইঙ্গিত করেছিলকথাগুলো এখনো কানের ভেতর বাজেজয়কে সে ছোটবেলা থেকে চেনেতবু আজকাল মাঝে মাঝে মনে হয়সবকিছু কি আগের মতো আছে?

মনটা যেন ইচ্ছে করেই সেই প্রশ্নটা আঁকড়ে ধরে আছেবুকের ভেতর অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে জমাট বাঁধে
 
*****  
 
কিছুদূর যেতেই জয় গাড়ি ব্রেক করলরানী একটু আনমনা ছিল বলে এই হঠাৎ ব্রেকে চমকে উঠল, শরীরটা সামান্য সামনে দুলে গিয়ে আবার সোজা হলো, সামনে তাকাল

ম্যাডাম আপনি কই যাইবেন সেইটা তো বললেন নাজয় ইয়ার্কি করে ড্রাইভারের ভাষায় বলল, ওদের বাড়ির ড্রাইভারও ঠিক এরকম করেই কথা বলেগলায় বাড়তি ভণিতা, ঠোঁটে টানা হাসি

রানী প্রথমে বুঝতে পারে না, জিজ্ঞাসা করে, “এই তুমি এভাবে কথা বলছো কেন? ড্রাইভার চাচার মতো?”

তুই তো আমাকে ড্রাইভারই বানিয়ে দিয়েছিস, আমি সামনে গাড়ি চালাচ্ছি তুই পেছনে বসে ম্যাডাম সেজেছিসজয় রাগত স্বরে বললকিন্তু রাগের ভেতরেও খুনসুটির রেশ স্পষ্ট

জয়ের কথা শুনে রানী হেসে ওঠে, হাসির শব্দে গাড়ির ভেতরটা হালকা হয়ে যায়মজা করে বলে, “ড্রাইভার, ক্যাম্পাসে যাওএকদম গম্ভীর ভাব নিয়ে বলে, ঠোঁট চেপে গাম্ভীর্য ধরার চেষ্টা করে

দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা, একা পেয়ে নেই আবার তোকেজয় কপট রাগ দেখিয়ে বলে, চোখ দুটো সরু করে তাকায়

কি করবে একা পেলে, হ্যা?” রানীও দুষ্টুমি করে জিজ্ঞাসা করে, ভ্রু সামান্য তুলে

তুই কি সামনে আসবি? নাকি আমি গাড়ি নিয়ে এক টানে হাইওয়ে ধরবো?” জয় হুমকি দেয়, স্টিয়ারিংয়ে আঙুল ঠুকঠুক করে

আসছি বাবা আসছিরানী পেছনের দরজা খুলে সামনে এসে বসে, কারণ জয়ের পক্ষে এই পাগলামি করা অসম্ভব কিছু নয়, তারপর বলে, “এই যে হলোসিটবেল্ট টানতে টানতে তার চুলের গোছা কাঁধে পড়ে

জয় হাসে, তারপর রানীর হাত ধরে বলে, “এই যে এখন হলোদুজনের চোখ একত্র হয়, কয়েক সেকেন্ড স্থিরজয়ের ঠোঁটে মুচকি হাসি, কিন্তু চোখের হাসিটা অনেক বেশি ঝলমলেরানী হালকা করে নিজের চোখ নামিয়ে নেয়, গাড়ির ভেতরে এসির ঠাণ্ডা বাতাসেও গালে হালকা উষ্ণতা অনুভূত হয়, আঙুলের ডগায় কেমন একটা কাঁপুনি লাগে

কিন্তু পরক্ষণেই জয় নিজের স্বভাবে ফিরে যায়, বলে, “এর চেয়ে বেশি ভালো হত তুই যদি আমার কোলে বসতি, হা হা হাবলে নিজেই হেসে ওঠে

রানী দ্রুত হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জয়ের বাহুতে প্লেফুলি আঘাত করে, বলে, “সব সময় তুমি এমন করো কেন?” আঘাতটা নরম, কিন্তু স্পর্শটা টের পাওয়া যায়

রানীর গালে উষ্ণতার সাথে লালিমাও যোগ হয়, চোখে একসাথে লজ্জা আর হাসির ঝিলিক খেলে যায়
 

*****  
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 1 user Likes gungchill's post
Like Reply
কিছু সম্পর্ক ৯ (চ) এর বাকি অংশ.........



জয়, রানী আর আয়শা বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরই জান্নাত বের হয়েছিলোগত রাতে জয়ের কাছ থেকে রাখা ওর কার্ডটা কাজে লাগিয়েছে প্রথমেনিজের ভিডিও স্টুডিওর জন্য কিছু ডেকোরেশন কিনেছেউষ্ণ আলো ছোড়ানো ল্যাম্প, একটা কাঠের ফ্রেম, আর দেয়ালে ঝোলানোর জন্য কালো ব্যাকড্রপ কাপড় 


এর পর সোজা ক্যাম্পাসেএকটা জরুরি ক্লাস ছিলো 

ক্লাস শেষে ক্যাম্পাস-লাগোয়া পার্কের গেটে চা খাচ্ছিল কয়েকজন বন্ধুর সাথে দুপুরের কড়া রোদ গাছের ঘন ছায়ায় এসে যেন একটু থেমে গেছেশুকনো পাতার ওপর হাওয়া বইলে খসখস শব্দ উঠছেপাশের টং দোকানের কাঁচের বয়ামে বিস্কুটের স্তর, আর কাপে ধোঁয়া উঠছে পাতলা দুধচায়ের
জান্নাত চশমাটা নাকের ওপর একটু তুলে নিয়ে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিল

ঠিক তখনই এলো আবরারজান্নাতকে দেখে হেসে এগিয়ে এলোএসেই জিজ্ঞাস করলো,ভাই ছালা (পাট দিয়ে বানানো ভারি বস্তা) এনেছো?”

জান্নাত চায়ের গ্লাসটা হাত বদল করে বলল,
কাজ শেষ করো, তারপর দেখি কয়েটা লাগবেতখন ব্যবস্থা করে দেবো

জান্নাতের বলা শেষ হয়তেই দুজনেই এক সাথে হেঁসে উঠলো এর পর জান্নাত আবরারকে চা অফার করলোদুজনে চা খেতে খেতে স্ক্রিপ্ট নিয়ে আরো বিস্তারিত আলাপ করতে লাগলোআবরার বেশ ভালো কিছু সাক্রাস্টিক আইডিয়া দিলোজান্নাত নিজেও কিছু যোগ করলোকাগজে পয়েন্ট লিখতে লিখতে আঙুলে কালি লেগে গেল, তবু খেয়াল করলো না

মনে মনে জান্নাত খুশিআবরার কাজের ছেলেবেশ উন্নত স্যাটায়ার করেছেস্যাটায়ারের সাথে রাজনৈতিক খোঁচা বেশ গভিরে লাগবে

তবে জান্নাত দ্বিতীয় বারের মত সাবধান করে দিলোরাজীব যেন এখানে রানী আর জয়ের ইনভলভমেন্ট না বোঝেকারণ এডিটিং তো রাজীবই করবে

আরে না না, কিছুতেই বুঝবে নাএক জয় সাহেবকে শত্রু বানিয়েই লাইফ হেল হয়ে গেলোসাথে সাথে রাজীব ভাই কেও ক্ষেপাতে চাই না
আবরার হালকা মাথা নাড়িয়ে বললচায়ের কাপে শেষ চুমুকটা নিয়ে একটু থামল

তারপর সিরিয়াস হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলজান্নাত ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলো
আবরার, তুমি শুধু স্ক্রিপ্ট দেখোআমি বাকিটা দেখছি

ওকে বস হয়ে যাবেতুমি শুধু আমার চটের বস্তার ব্যবস্থা রেখো

সেটা আমি দেখবো জান্নাত মুখ টিপে হেঁসে বললতবে ওর চোখে কিসের যেন একটা ছায়াদৃঢ়তা, নাকি আসন্ন ঝড়ের জন্য প্রস্তুতিবোঝা গেল না
 
কিছুক্ষণ পর আবরার রহিম এর খবর জানতে চাইলে জান্নাত বলল,ছোট আব্বু এখন ভালোকেবিনে দিয়েছেআমি লাঞ্চের পর যাবোতুমি চাইলে আমার সাথে যেতে পারো

প্রথমে আবরার রাজি হয়ে গেলো

কিন্তু পরক্ষণেই কাপে জমে থাকা চায়ের আস্তরণটা আঙুল দিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,সেখানে কি কেষ্ট সাহেব থাকবে?”

জান্নাত হেঁসে বলল,থাকতেও পারে


ওরে বাবা, আমার দরকার নেইতুমি আমার পক্ষ থেকে কন্ডোলেন্স দিয়ে দিয়ো আঙ্কেলকেআর রাধাকেও

জান্নাত ভ্রু নাচিয়ে বলল,জয়ের সামনেই দেবো?”

আবরার নাটকীয় কাতরতায় বলল,ভাই, আমি মরলে তোমাকে কে এতো সুন্দর করে স্ক্রিপ্ট লিখে দেবে?”
 
*****  
 
এদিকে রাজীব , রানী আর জয় চলে জাওয়ার পর আর রিক্সার জন্য ওয়েট করেনি । নিজেই এক টুকরো কাপর আর বাইকের সিট পরিস্কার করেছে । বাইক নিয়েই বাড়ি ফিরেছে। বাসায় ফিরে বেশ লম্বা সময় নিয়ে সাওয়ার নিয়েছে।  নির্ঘুম রাত আর মানসিক উত্তেজনায় শরীর তেতে ছিলো , শীতল পানির স্পর্শ অনেকটাই সেই তাপ দূর করতে সক্ষম হয়েছে । কিন্তু একটা ব্যাপার কিছুতেই মন থেকে মুছতে পারছে না । জয়ের সাথে রানীর মেলামেশা , ঠিক অপছন্দ নয় , কিন্তু মনের মাঝে একটা খচখচ রয়েই জাচ্ছে । রাজীব জয় কে চেনে , জয় রানীকে অন্য চোখে দেখবে না। কিন্তু আবার এও মনে আসে , ও কি জয় কে পুরোপুরি চেনে? সেই রাতে জয় যেই ধরনের নোংরা ইঙ্গিত করেছিল । সেটা ওর চেনা জয়ের পক্ষে সম্ভব ছিলো না ।
 
তবে রানীর আচরন ওকে কিছুটা সস্তি দিচ্ছে , ও জয়ের সাথে সামনে বসেনি , বসেছে পেছনে । নিরাপদ দূরত্ব রেখেই চলছে । আর রাজীবের বিশ্বাস আছে রানীর উপরে । জয়কে ছোট বেলা থেকে চেনার পর ও জয়ের দিকে ঝুকবে না।
 
গোসলের পর শরীরের ক্লান্তি যেন হঠাৎ করেই জেঁকে বসেশীতল পানি শরীরটাকে একরকম আদুরে করে ফেলেছেপেশিগুলো ঢিলে হয়ে গেছে, চোখের পাতা ভারীএখন আর সহ্য হচ্ছে না নরম বিছানার ছোঁয়া পাওয়ার অপেক্ষা

ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতেই বিছানায় গা এলিয়ে দেয় রাজীবগদি নরমচাদরে ধোয়া কাপড়ের হালকা গন্ধশরীরটা ধীরে ধীরে ডুবে যায়

কিন্তু মনে সেই অস্বস্তি

জয়ের সাথে রানীর মেলামেশা
সেই রাতের নোংরা ইঙ্গিত

রানীর পেছনে বসাএকটা ছোট্ট স্বস্তি

আবারও প্রশ্নসে কি জয়কে পুরো চেনে?

গতকাল থেকে ঘটে যাওয়া একটার পর একটা ঘটনা রাজীবের মস্তিষ্ককে আরও কিছুক্ষণ জাগিয়ে রাখেভাবনাগুলো মাথার ভেতর গোল হয়ে ঘুরতে থাকে
তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে

ক্লান্তি শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়

রাজীব হার মানে
 
*******  
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 1 user Likes gungchill's post
Like Reply
Darun
[+] 1 user Likes Saj890's post
Like Reply
R kono update asbe nah ???
Like Reply
(11-05-2026, 11:26 PM)পোস্ট বক্স Wrote: R kono update asbe nah ???

হ্যা  আসবে , তবে নির্দিষ্ট টাইম বলতে পারছি না ।আমার কোন ব্যস্ততা নেই ,কিন্তু তবুও লেখা হয়ে উঠছে না ।  

আপনার কমেন্ট এর আগে  অথবা পরে যদি গল্প সম্পর্ক দুই একটা লাইন  থাকত তাহলে আমি আরো খুসি হতাম ,ধন্যবাদ।
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


Like Reply
কিছু সম্পর্কঃ ৯ () এর শেষ অংশ



ক্যাম্পাসের একটা নিরিবিলি কোণে গাড়ি রেখেছে জয়। জায়গাটায় প্রচুর গাছগাছালি, এই অংশে গাড়ি তেমন আসে না, তাই পাখপাখালির ডাক এখানে বড় তীব্র শোনা যায়। দূরে কোথাও শুকনো পাতার ওপর হালকা বাতাসের শব্দ। শতবর্ষী পুরোনো গাছের কাছে দুপুরের কড়া রোদও হার মেনেছে; ছায়াটা ঘন, ঠান্ডা, একটু স্যাঁতসেঁতে।
রানী একটু অবাক হয়েই জয়ের দিকে তাকায়। কারণ এখানে ওর ক্লাস নয়।
কি ব্যাপার, এখানে এলে যে?”
কিন্তু জয়ের দিকে তাকিয়েই রানী জয়ের ভেতরের শিফট টের পায়। কিছুক্ষণ আগের সেই প্লেফুল, চুটকি মারা ভাবটা নেই। স্টিয়ারিংয়ে রাখা হাতটা স্থির। চোখ দুটো সরু, কিন্তু এবার তাতে খেলা নেইগভীর, ভারী। ঠোঁটের কণে সব সময় যে শিহরণ তোলা চুটিল হাসিটা থাকে সেটাও উধাও।
গাড়ির ভেতরের নীরবতা হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এটতাই নিরব যে বাইরের পাখির ডেয়াক গুলো আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে , রানী নিজের হৃদ স্পন্দন আরো জোরে শুনতে পায় । দুজনের কেউই কিছু বলে না কিছুক্ষন । রানী একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে , ওর কাজল টানা চোখ দুটতে জিজ্ঞাসা আর কিছুটা অস্বস্তি । রানীর জয়ের কাছে থাকতে রানী কখনো অস্বস্তি পায়নি। বরং সে বরাবর স্বচ্ছন্দ ছিল। আজ অস্বস্তিটা এসেছে অন্য জায়গা থেকেজয়ের হালকা স্বভাবের অনুপস্থিতি থেকে।
 
রানী ধীরে ধীরে হাত তুলে জয়ের কাঁধে রাখল। আঙুলের ডগা ঠান্ডা।
গাড়ির ভেতরের ছায়া যেন আরও ঘন হয়ে আছে।
খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল,
কি হলো, জয়?”
জয় চুপ থাকলে রানীর ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি জমে।
চুপ জয়কে সে চেনে না।
রানীর স্পর্শ পেয়ে জয় তাকাল।
ঠোঁটে একটুখানি হাসি এল, কিন্তু সেটা দুষ্টুমি নয়।
হাসিটা যেন নিজের অস্বস্তি ঢাকার চেষ্টা।
চোখ দুটো স্থির। পলক কম।
রাগ নেই।
বরং এমন এক তীব্রতা, যেন সে এবার লুকাতে পারছে না।
সে একবার গভীর শ্বাস নিল। বুকটা উঠল-নামল স্পষ্টভাবে।
তারপর নিচু স্বরে বলল,
রানীকালকের কথা তোর মনে আছে? যখন তুই প্যানিক করলি?”
বাইরে হঠাৎ একটা পাখি ডানা ঝাপটাল।
শব্দটা গাড়ির কাঁচে এসে থেমে গেল।
রানী চোখ নামাল না, কিন্তু তার আঙুল কাঁধ থেকে সরে এসে ওড়নার প্রান্তে গিয়ে থামল।
তেমন কিছু না…”
শব্দগুলো বেরোতে গিয়ে একটু আটকে গেল।
শুধুদরজা খুলতে পারছিলাম না। আর কেউ একজনআমাকে আব্বুর কাছে যেতে দিচ্ছিল না।
শেষের শব্দটা ফিসফিসের মতো নরম হয়ে গেল।
তার গলার ভেতর শুকনো একটা কাঁপুনি ছিল
সেই ওয়াশরুমের আটকে থাকা বাতাস যেন এক মুহূর্তের জন্য আবার বুকের ভেতর ঢুকে পড়েছে।
জয় চোখ সরাল না।
চোয়াল শক্ত হলো না, বরং ঢিলে।
তার গলার স্বর এবার আরও নিচু।
রানী…”
এক সেকেন্ড থামল।
সেই মানুষটা আমি ছিলাম।
গাড়ির ভেতরের বাতাস যেন আরও ভারী হয়ে গেল।
আমরা রেস্তোরায় ছিলামতুই আমাকে চিনতে পারছিলি না। আর আমিআমি তোকে জোর করছিলাম।
রানীর চোখ এক মুহূর্তের জন্য বড় হলো।
তারপর আবার স্বাভাবিক।
মাথা আস্তে নেড়ে সায় দিল।
শব্দ বেরোল না।
জয় এবার নিচের ঠোঁট ভেতরে টেনে নিল একবার।
তারপর ধীরে বলল
আমি কাল থেকে নিজের কাছেই ছোট হয়ে আছি। তার গলার স্বর কাঁপেনি, কিন্তু ভেতরে একটা ভারি কিছু যেন আটকে দিতে চাইছিলো কথা গুলো
তোর মাথার ভেতরতোর অবচেতনেআমি যদি ওই মানুষটার মতো থাকি
যে তোকে থামাচ্ছিল
আমি সেটা নিতে পারছি না।
তার চোখে এবার স্পষ্ট অনুরোধ।
কোনো নাটক নেই।
কোনো হাসি নেই।
শুধু দাঁড়িয়ে থাকা অপরাধবোধ।
 
রানী তখনও মাথা নিচু করে আছে।
তার ভেতর দিয়ে টুকরো টুকরো স্মৃতি ভেসে উঠছে।
ওয়াশরুমের শীতল ফ্লোর।
ধাতব দরজার নব।
হাতের তালুতে এখনো যেন সেই ঠান্ডা স্পর্শ লেগে আছে।
আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর স্মৃতিটা
কেউ একজন তার হাত শক্ত করে চেপে ধরছে।
বারবার।
ছাড়তে দিচ্ছে না।
রানীর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না
সেটা জয় হতে পারে।
কিন্তু বিশ্বাস না করারও কোনো অবকাশ নেই।
জয় নিজেই বলছে।
আর সে সময় সে জয়ের সাথেই ছিল।
গাড়ির ভেতরে বাতাস ভারী হয়ে আছে।
জয় ধীরে বলল,
আমি ভেবেছিলাম তুই দুষ্টুমি করছিস।
পরে যখন দেখলাম তুই সিরিয়াসতখনও আমি বুঝতে পারছিলাম না তুই অমন কেন করছিস।
সত্যি বলছি, আমার মাথায়ই আসেনি কোনো সমস্যা হতে পারে।
সে একবার ঠোঁট ভেতরে টেনে নিল।
আমি ভেবেছিলামতোর মনে সেকেন্ড থট এসেছে।
না কেউ তোকে কিছু বলেছে।
তাই তুই অমন করছিস।
শেষ কথাগুলো বলার সময় তার গলার স্বর শক্ত হয়ে এল।
আর হোটেলের লোকগুলো…”
এখানে এসে তার চোয়াল টান টান হয়ে গেল।
গালের পেশি শক্ত।
সে একবার জানালার বাইরে তাকাল
দূরের গাছের ছায়ায় চোখ থামিয়ে রাখল কয়েক সেকেন্ড।
তার আঙুলগুলো অজান্তেই মুঠো হয়ে গেছে।
 
 
“ ওরা খুব খারাপ ইঙ্গিত করছিলো , তাই আমি আরো বেশি নিয়ন্ত্রন হারাই, ……আমি তোকে ওই অবস্থায় ছেড়ে ছিয়েছিলাম”
এবার রানী মুখ তুলে তাকায় , জয়ের চোখ দুটোতে খুব ভালো করে তাকায় , সেখানে রানী জয়ের ভতরের ছবি দেখতে পায় , ওর ভেতরের জ্বলন , অপমান , আর অসহায়ত্ব সব ছবি  হয়ে ফুটে উঠেছে ওর দুই চোখের মনিতে। রানী নিজের হাত খুব ধিরে ধিরে   স্টেয়ারিং এর উপর রাখা জয়ের হাত এর উপরে রাখে , মৃদু চাপ দেয় । জয়ের ভেতরের উত্তাপ যেন ওর ত্বকের উপরে ফুটে উঠছে । মৃদু হাসে রানী , তারপর বলে “ আমি বুঝতে পারছি , হয়ত আমিও তাই করতাম যা তুমি করেছো, এটা নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই , আমি তোমাকে চিনি , তুমি কেমন সেতাও জানি”
 
জয় চোখ বন্ধ করে লিছুক্ষন রানীর শীতল হাতের স্পর্শ অনুভব করলো , এসির বাতাসে রানীর হাত বরফ শীতল হয়ে আছে । কিন্তু সেই শীতলতা ওর স্পর্শের উষ্ণতা কেড়ে নিতে পারেনি। জয় রানীর স্পর্শের সেই উষ্ণতা টের পাচ্ছে সেই সাথে এও টের পাচ্ছে এই উষ্ণতা  কতটা নির্ভেজাল।  
 
তবুও ওর মন থেকে কাঁটা পুরোপুরি বের হলো না। যেন কোথাও একটা সরু কাঁটা হৃদপিণ্ডের  ভেতরে ভেঙে রয়ে গেছে। রানীর হাতের স্পর্শে ব্যথা কমছে, কিন্তু কাঁটাটা আছে।
জয় চোখ খুলল। রানীর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর খুব নিচু স্বরে বলল,
তুই যত সহজে বললি এতো সহজে কি ভোলা যায়?  ভেতরে যদি থেকে যায়?”
রানী একটু অবাক হলো।
“কি থেকে যাবে?”
“আমি।” জয় থামল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “ তোর সামনে দাঁড়ানো গতকালের লোকটা আমি না। আমি চাই না তুই ঘুমের মধ্যে, ভয় পেলে, বা কখনো ওই মুহূর্তটা মনে করলে আমাকে ওই লোকটার মতো ভাবিস।” 
রানীর বুকের ভেতর হালকা কেঁপে উঠল।
জয় এমন ভাবছে!
ওর ভেতরে নিজের জায়গা নিয়ে এত ভয় পাচ্ছে!
রানীর মনে অদ্ভুত একটা সুখ ছড়িয়ে গেল। সুখের সাথে সাথে মায়া। খুব গভীর মায়া। মনে হলো, এই মানুষটাকে সবাই ভুল বোঝে। জয়ের হাসি, দাপট, রাগ, এসবের আড়ালে যে এমন ভয় আছে, সেটা কেউ দেখে না। শুধু সে দেখছে।
রানী জয়ের হাতের উপর নিজের হাতের চাপ আরেকটু বাড়াল।
“থাকবে না।”
“কিভাবে জানিস?”
“কারণ আমি জানি।”
“কি জানিস?”
রানী এবার সামান্য হাসল।
“তুমি কেমন।”
জয় তাকিয়ে রইল। তারপর বলল
 সত্যি খুব  ভালো করে  জানিস?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে বল, আমি কেমন? আমাকে যারা জানে কেউ তো ভালো কিছু বলে না জয় এবার রানীর দিকে সরাসরি তাকালো , রানী দেখলো জয়ের চোখে সেই জয় সুলভ দুষ্টুমি কিছুটা  ফিরে এসেছে , যা রানীর সবচেয়ে প্রিয় ।  
রানী মুখ ফস্কে বলে ফেলতে যাচ্ছিলো এমন কিছু যা  হয়তো একটু পর রিগ্রেট করতো। যা ব্যাবহার করে  জয় হয়তো পরে ওকে জালিয়ে ভাজা ভাজা করে ফেলতো আজকের সকালের মতন। তাই রানী একটু থেমে গেল। এই প্রশ্নের উত্তর মুখে বলা যায় না।
 
জয় কেমন? রানী খুব ভালো করেই জানে জয় কেমন, জজয় একটা বাজে ছেলে, যাকে মানুষ ভাদাইম্মা বলে। ভীষণ দুষ্টু। বেশি বেশি। রাগী, জেদি। মেয়ে দেখলে ফ্লার্ট করা ছাড়তে পারে না। তবু এই ছেলেটার একটু কষ্ট দেখলেই রানীর বুকের ভেতরটা নরম হয়ে যায়।    
কিন্তু এত কিছু বলা যায় না। আজকে সকালে রানীর শিক্ষা হয়ে গেছে তাই রানী  শুধু বলল,
“তুমি খারাপ না, মোটামুটি ভদ্রলোক।” 
জয়ের ঠোঁটে খুব হালকা হাসি ফুটল।
“এইটা সার্টিফিকেট?”
“হ্যাঁ।”
“মহারানীর সিল আছে?”
রানীর মুখে এবার সত্যি হাসি ফুটে উঠল।
“তুমি না একদম…”
“কি?”
“বেশি কথা বলো।”
“এইটা কি আজকে  নতুন জানলি?”
রানী মাথা নাড়ল। কিন্তু হাসিটা থামাতে পারল না।
জয় সেই হাসিটা দেখল। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারটা একটু সরে গেল। এতক্ষণ যে ভয়টা ওকে ভিতর থেকে কামড়ে ধরেছিল, সেটা পুরো যায়নি, কিন্তু রানীর হাসি দেখে মনে হলো, ও এখনো জায়গা হারায়নি।
রানী এখনো তার হাত ছাড়েনি।
এই একটুকুতেই জয়ের ভেতরের আহত অহংকার একটু মাথা তুলল।
সে হারায়নি।
রানী তাকে ঠেলে দেয়নি।
বরং তার হাতের উপর হাত রেখেছে।
জয় খুব আস্তে বলল,
“তুই আমার উপর রাগ করতে পারিস। কিন্তু আমাকে  কোন দিন ভয় পাবি না। আমি কোনদিন জেনেশুনে তোর ক্ষতি করবো না।”
রানী এবার কোনো দেরি না করে বলল,
“পাই না।” 
“মিথ্যা বলিস না।”
“পাই না বললাম তো।”
“তাহলে কাল গাড়িতে আমার দিকে ওইভাবে তাকাচ্ছিলি কেন?”
রানী চোখ নামিয়ে ফেলল।
“আমি তখন কাউকেই ঠিকমতো চিনতে পারছিলাম না।”
“আমাকেও না?”
রানী একটু থেমে চোখ নামিয়ে বলল,
“না।” 
   জয়ের মনে পরে গেলো কিভাবে রানী কাউকেই চিন্তে পারছি লো না , এমন কি জান্নাত কেও না । সুধু একজন কে ছাড়া , সেই দৃশ্য আবার জয়ের চোখের সামনে ভেসে  উঠলো , নিজেকে কতটা অসহায় মনে হচ্ছিলো তখন , মনে পরে মনটা শিউরে উঠলো। সেই সাথে ওর চোয়াল শক্ত হলো। খুব সামান্য।
 
কিন্তু রানী টের পেল। তার বুকের ভেতর আবার মায়া উঠল।
সে ধীরে বলল,
“কিন্তু এখন তো চিনছি।”
জয় তাকাল।
রানী এবার চোখ সরাল না।
“এখন জানি তুমি, তুমি-ই।” রানী হাসলো মিষ্টি করে ।
এই কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু জয়ের ভেতরে গিয়ে অন্যরকম লাগল। যেন কেউ ভিতরের একটা দরজা খুলে দিয়েছে। সে কয়েক মুহূর্ত কিছু বলল না।
রানীও চুপ।
তার ভেতরে তখন অদ্ভুত একটা শান্তি। খুব নিরাপদ লাগছে। Joy তার সামনে এটতা নরম হয়েছে। নিজের কথা খুলেছে। নিজের ভয় বলেছে। রানীর মনে হলো, সে জয়ের কাছে কতটা আলাদা! কতটা দরকারি! 
এই অনুভূতি তাকে ভাসিয়ে দিল।
অদ্ভুতভাবে, এই মুহূর্তে হাসপাতালের সাদা দেয়াল, আব্বুর অসুস্থ মুখ, ভাইয়ার ক্লান্ত চোখ, জান্নাতের অস্থিরতা, সব যেন একটু দূরে সরে গেল। হারিয়ে গেল না, কিন্তু ঝাপসা হলো। সামনে শুধু জয়। তার চোখ। তার হাত। তার ভেতরের সেই দগদগে জায়গা, যেটা সে রানীর সামনে খুলে রেখেছে।
রানী জানল না, এই এক মুহূর্তে তার ভেতরের কেন্দ্র একটু নড়ে গেল।
শুধু মনে হলো, জয়ের হাতটা আরও একটু সময় ধরে রাখতে ইচ্ছে করছে।
 
জয় তখন হঠাত বলল , তাহলে আজকে গাড়ির ব্যাক সিটে কেনো উঠলি? এখনো চোয়াল কিছুটা  শক্ত, জয় জানে এখনো সময় হয়নি । তবে গতকালের সেই দৃশ্য আর আজকের এই পেছনে সিটে বসাটা একই সুত্রে গাঁথা বলে , জয় ভেতরে জেদ এখনো ধরে আছে।
রানী এবার হাত সরিয়ে নিলো , বলল “ তখন বড় আম্মু ছিল না সাথে ? আমি কি ভাবে তোমার সাথে বসি?”

” তখন নয়? একটু আগে, এখানে আসার সময়?” জয় রানীর দিকে স্থির ভাবে তাকিয়ে বলল , দেখতে চায় রানীর চোখের ভাষা।
 
রানী এবার একটু মাথা  নিচু করলো , আস্তে করে বলল “ ভাইয়া  তো আশেপাশে ছিলো, কি মনে করে, তাই……”
 
জয় উত্তর জানতো , কিন্তু নিজের ইগো কে আরো একটু শান দেয়ার জন্যই হয়তো জিজ্ঞাসা করেছিলো। এবং তা কাজ ও করেছে । জয় মনে মন প্রতিজ্ঞা করলো আর বেসিদিন এই লুকোচুরি ও চলতে দেবে না। কারন ও আজকে জেনে গেছে রানীর মনে ওর অবস্থান কি। দুনিয়ার আর কাউকে ও ওদের মাঝে দাড়াতে দেবে না।
 
জয় গাড়ির কাঁচের বাইরে তাকিয়ে বলল,
“চল?”
রানী কিছু না বুঝেই জিজ্ঞাস করলো ,
“কোথায়?”
“ক্লাসে। নাকি আজকে আমার সাথে বসেই ডিগ্রি নেবি?” জয় নিজের মাথা বিপদজনক ভাবে রানীর কাছে এনে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
রানীর বুকের ভেতর ধক করে উঠলো , এই বদ্ধ এসি গাড়ির ঠান্ডা পরিবেশে জয়ের তপ্ত নিশ্বাস প্র নাকে মুখে এসে লেগেছে । একটু পিছিয়ে গিয়ে রানী নিজের কণ্ঠ সহজ করার চেষ্টা সহ বলল
“তুমি, তুমি না  খুব অসভ্য।”
জয় হেসে ফেলল। এবার হাসিটা আরো একটু বেশি চেনা।
“এইটা শুনে শান্তি লাগল।”
“কেন?”
“মানে তুই এখন  normal আছিস।”
রানী জানালার বাইরে তাকাল। ঠোঁটে হাসি।
“আমি normal-ই ছিলাম।”
“না, ছিলি না।” জয় বলতে বলতে স্টার্ট দিলো
“তুমিও না।” রানী ফিস্ফিস করে বলল ওর মুখ থেকে বের হওয়া  বাস্প জানালার কাচ ঘোলা করে দিলো।

“আমার normal হওয়া নিয়ে তোর এত চিন্তা কেন?” জয় হালকা  করে স্টেয়ারিং ঘোরাতে শুরু করলো।
রানী উত্তর দিল না।
কিন্তু মনে মনে বলল,
কারণ তুমি এমন না  থাকলে আমার কষ্ট হয়।
মুখে না বললেও কথাটা রানীর ভেতরে নরম হয়ে বসে রইল। গাড়ি ধীরে ধীরে গাছের ছায়া ছেড়ে রোদের দিকে এগোল। বাইরে আলো তীব্র। কিন্তু রানীর মনে হলো, ছায়া থেকে আলোয় আসছে না সে; বরং জয়ের ভেতরের কোনো অন্ধকার জায়গায় সে নিজের হাত রেখে এসেছে।
আর সেই জায়গাটা এখন ওর ও না না , রানী মনে মনে নিজেকে শুধরে দিলো , জায়গাটা সুধুই ওর। রানীর ঠোঁট দুটো একটু প্রসারিত হলো ।  
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 1 user Likes gungchill's post
Like Reply
After a long time
Like Reply
(26-05-2026, 10:23 PM)Saj890 Wrote: After a long time

হ্যা ভাই ,আসলে ফিডব্যাক না  পেলে সমস্যা হয় । সমস্যা বলতে এই না  যেআমার গল্প কে কেউ মূল্য দিলো না বা আমার গল্পে ভিউ নেই , বা আমার গল্প পছন্দ করছে না।  সমস্যা হচ্ছেআমিআসলে শুনতে চাই পাঠক কি ভাবে , কি চিন্তা করে । বা আদৌ চিন্তা করে  কিনা?
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


Like Reply
কিছু সম্পর্কঃ ৯ (ছ)


আয়শা, জয় আর রানীকে নিয়ে বেরিয়ে গেলে জান্নাত অল্প কিছুক্ষণ বাড়িতে একাই ছিল। এই একা সময়টা জান্নাত আজকের সকালটা ভেবে কাটাল। সত্যিই অন্যরকম ছিল সকালটা। অনেক দিন পর চৌধুরী বাড়ির ভেতর এমন প্রাণের শব্দ উঠেছিল। হাসি, খোঁচাখুঁচি, রানীর লজ্জা, জয়ের অস্বাভাবিক ভদ্রতা, বড় আম্মুর ব্যস্ততা, সব মিলিয়ে বাড়িটা আজ সকালে খুব জীবন্ত লাগছিল।
এখন অবশ্য বাড়িটা চুপচাপ। কাজের মানুষও আজ আসেনি, তাই নিচতলা থেকে কোনো হাঁকডাক নেই, রান্নাঘরের বাসন নড়ার শব্দ নেই। বারান্দা দিয়ে দুপুরের আগের আলো ঢুকে মেঝের এক পাশে স্থির হয়ে পড়ে আছে। এই নীরবতার ভেতরেই সকালটার শব্দগুলো যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ফিরে আসে জান্নাতের মনে।
কিন্তু বেশিক্ষণ জান্নাত এই ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে বসে থাকল না। গত রাতে জয়ের কাছ থেকে নেওয়া ক্রেডিট কার্ড তখনো ওর পকেটে ছিল। পকেটের ভেতর কার্ডের পাতলা শক্ত শরীরটা বারবার টের পাচ্ছিল ও।
তাই জান্নাত তৈরি হয়ে সোজা মার্কেটে চলে গেল।
মার্কেট তখন বেশ জমে উঠেছে। দোকানের সামনে কাপড় ঝুলছে, কোথাও লাইট টেস্ট করা হচ্ছে, কোথাও ছোট ছোট শোপিস সাজানো। দোকানদারদের ডাকাডাকি আর ক্রেতাদের দরদামের ভেতর জান্নাত এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরল।
সেখান থেকে নিজের চ্যানেলের শুটিং কর্নারের জন্য টুকটাক কিছু জিনিস কিনল। ভালো একটা কার্টেন, ব্যাকড্রপের জন্য কিছু লাইট, আর এমনি কিছু ছোটখাটো সাজানোর জিনিস। কার্টেনের কাপড় হাতে নিয়ে একবার চোখের সামনে মেলে ধরল, আলো পড়লে কেমন লাগবে ভাবল। খুব বড় কিছু নয়, কিন্তু নিজের ছোট্ট জায়গাটাকে একটু নিজের মতো করে বানানোর আনন্দ।
জয়ের কাছ থেকে যা চেয়েছিল, তার চেয়ে কিছু বেশিই খরচ করল জান্নাত। তবে এই নিয়ে ওর মধ্যে কোনো অনুশোচনা হলো না। বরং অদ্ভুত একটা তৃপ্তি অনুভব করল। গত মাসখানেক জয় ওকে যত মানসিক অশান্তি দিয়েছে, তার সামান্য সুদ-আসলে ফেরত গেছে বলেই মনে হলো জান্নাতের। তা ছাড়া জান্নাত যতবার কার্ড সোয়াইপ করেছে, ওর ঠোঁটের কোণায় একটা হাসি ফুটে উঠছে।
মেশিনে কার্ড ঢোকানোর ছোট্ট শব্দ, তারপর পিন দেওয়ার সময় দোকানদারের ভদ্রভাবে অন্যদিকে তাকানোর অভিনয়, রসিদ বেরোনোর খসখসে শব্দ, সবকিছুতেই জান্নাতের অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছিল। প্রথমে হাসিটা নিজের কাছেই ভিলেনের মতো লাগছিল। যে জয়ের বিরুদ্ধে ভিডিও বানাতে জয়ের টাকা দিয়েই স্টুডিও সাজাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়েছে, না, ভিডিওও জয়ের বিরুদ্ধে নয়, সিস্টেমের বিরুদ্ধে বানাচ্ছে, আর টাকা সিস্টেমের নয়, এই টাকা ওর ভাইয়ের; ভাইটা যদিও একটু ত্যাড়া টাইপ।
শপিং শেষে জান্নাত সরাসরি ক্যাম্পাসে গেল। কেনাকাটাগুলো ওদের মাসিক পত্রিকার অফিসে রেখে একটা ক্লাস করল। পত্রিকার অফিসের ছোট ঘরটায় পুরোনো কাগজ, ধুলো আর প্রিন্টারের কালি মেশানো একটা গন্ধ থাকে। জান্নাত জিনিসগুলো এক কোণে রেখে দিল, যেন নিজের গোপন যুদ্ধের অস্ত্র সাময়িকভাবে জমা রাখল। তারপর ক্লাসে ঢুকল, কিন্তু পুরো মনটা ক্লাসে ছিল না। নোট নিচ্ছিল, মাথা নেড়ে শুনছিল, তবু ভেতরে ভেতরে হিসাব করছিল পরের কাজটা কীভাবে এগোবে।
ক্লাস শেষে আবরারকে কল দিল।
আবরারের ভয়েসগুলো শুনে জান্নাত বুঝেছিল, ছেলেটা রাজি হলেও পুরোপুরি রাজি হয়নি। কথার ফাঁকে ফাঁকে যতই শহীদ হওয়ার ঘোষণা দিক, ভেতরে ভেতরে জয় নামের দুর্যোগটার ভয় এখনো কাটেনি।
জান্নাতের মনে হলো, শুধু টেক্সট মেসেজে কাজ হবে না। আবরারকে সামনাসামনি মোটিভেট করতে হবে। নইলে হয়তো ও কাজটা করতে ভয় পাবে। এতে অবশ্য জান্নাত আবরারকে দোষ দেয় না, গ্রামের গরিব ছেলে শহরে এসেছে লেখাপড়া করতে। জান্নাত আর জয়ের মতো বিলাসিতা ওদের নেই।
ক্যাম্পাস চত্বরের সেই চায়ের দোকানে জান্নাত আসার কয়েক মিনিট পরেই এলো আবরার। দোকানটা রাস্তার ধারের পরিচিত বিশৃঙ্খলা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টিনের ছাউনি, কাঠের বেঞ্চ, কাচের বয়ামে বিস্কুট, পাশে ফুটন্ত কেটলি। চায়ের ধোঁয়া আর ধুলোর গন্ধ মিশে বাতাসে একটা আলাদা ক্যাম্পাসি স্বাদ বানিয়েছে। দোকানের সামনে দু-একটা রিকশা দাঁড়িয়ে, একটু দূরে কয়েকজন ছাত্র তর্ক করছে, আর মাঝেমধ্যে রাস্তা থেকে বাসের হর্ন এসে কথাবার্তার উপর ধাক্কা মেরে যাচ্ছে।
আবরার সেই পরিচিত চেক শার্ট, ব্লু ডেনিম, পায়ে চটি পরে এসেছে। হাঁটার ভঙ্গিতে একটু সতর্কতা আছে, যেন চারপাশের বাতাসও আগে যাচাই করে নেয়। জয়ের মতো ড্যাশিং ভাব নেই, রাজীবের মতো শুদ্ধ সৌন্দর্যও ওর নেই। আছে শুধু চোখের মাঝে একটা ঝিলিক, আর কথা বলার একটা ব্যক্তিগত প্যাটার্ন। আর এসেই সেই প্যাটার্ন অনুযায়ী বলল, “আরে বস, আমি তো বললামই লিখব, কিন্তু লেখার আগে একটা লাস্ট উইশ লেখার চান্স তো দিবেন।”
“তোমার লাস্ট উইশ যদি এক কাপ মালাই চা হয়, সেটা এখনই আমি পূরণ করে দিতে পারি,” বলে জান্নাত হেসে ফেলল। হাসিটা দরকারও ছিল। একটু আগেই রাজীবকে মনে মনে “শুদ্ধ সৌন্দর্য” বলে বসার পর ওর গালে যে অকারণ লালিমা উঠেছিল, এই হাসি সেটা কিছুটা আড়াল করে দিল।
“বস, আপনি তো আমার লাস্ট উইশের দৈর্ঘ্য বাড়ায়া দিলেন, মালাই চা খারাপ না,” আবরার হাসিতে যোগ দিয়ে বলল।
“মামা, একটা মালাই চা। আপনার ওই গুঁড়া দুধের মালাই না, গরুর দুধের মালাই দিয়েন,” জান্নাত চা বিক্রেতাকে উদ্দেশ্য করে বলল, যদিও ওর জানা এখানে সব গুঁড়া দুধের কারবার।
চা বিক্রেতা কথাটা শুনে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে হাঁ করে হাসল, যেন এই ধরনের দাবি সে প্রতিদিনই শোনে, প্রতিদিনই মানে না। কেটলির মুখ থেকে ধোঁয়া উঠছে। দুধের ওপর পাতলা সর জমে আবার ভেঙে যাচ্ছে চামচের নাড়াচাড়ায়। জান্নাত বেঞ্চের এক পাশে বসল, আবরার একটু সাবধানে সামনে।
“না, ভাবলাম তুমি আমার বিছানাপত্তর নিয়া ভাগলে নাকি? তাই সামনাসামনি একটু মোটিভেট করতে এলাম। ভয় নাই, জয় গুন্ডা হলে আমি আমার গুন্ডার বাপ, জয় ভূত হলে আমি মামদো ভূত, তোমার কিচ্ছু হবে না,” জান্নাত যখন এই কথাগুলো বলল, তখন দেখল হঠাৎ করেই আবরার একটু নিচু হয়ে গেল, আর মেইন রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।
জান্নাত কপাল কুঁচকে বলল, “এই আবরার, কী হয়েছে, এমন চোরের মতো করতেস কেনো?”
“ভাই, যম নিয়ে কথার মাঝে যম হাজির। ওই দেখ জয় সাহেব, সাথে রানীও আছে। জয় সাহেব গাড়ি কিনলো কবে?” আবরার মাথা নিচু রেখেই বলল।
জান্নাত আবরারের দেখানো দিকে তাকাতেই দেখল, জয় ওদের গাড়িটা ড্রাইভ করছে। দুপুরের আলোতে গাড়ির কাঁচে রোদের ঝিলিক পড়ে এক মুহূর্ত চোখে লাগল। ভেতরে রানী। দুজনেই কিছু একটা নিয়ে হাসাহাসি করছে। গাড়িটা কয়েকটা ধীরগতির রিকশার পেছনে আটকে পড়েছে।
রিকশাগুলোর ঘণ্টা, রাস্তার ধুলা, গরমে বিরক্ত চালকদের মুখ, সবকিছুর মাঝেও গাড়ির ভেতরের ওই হাসিটা আলাদা করে চোখে পড়ছিল। বাইরে দুপুরের শুকনো তাপ, ভেতরে যেন ওদের দুজনের আলাদা ছোট পৃথিবী।
তবে জয়কে বেশিক্ষণ আটকে রাখা যায় না। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়িটা রিকশাগুলোকে পাশ কাটিয়ে ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের দিকে চলে গেল। গাড়ির পেছনের ধুলো কয়েক সেকেন্ড বাতাসে ভাসল। আবরার আরও কয়েক সেকেন্ড মাথা নিচু করে বসে রইল, যেন গাড়ির শব্দটা পুরোপুরি মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত মাথা তুললে বিপদ হতে পারে।
জান্নাত সেটা দেখে হেসে বলল, “ওটা জয়ের না, আব্বুর। জয় আজকে দায়িত্বশীল বয়ফ্রেন্ড হওয়ার জন্য বাইক রেখে গাড়ি নিয়েছে।”
কথাটা বলেই ওর হাসিটা এক পলকের জন্য একটু মলিন হয়ে গেল। মলিন হলো, কারণ নিজের ভাইকে ও চেনে। আগের রাতের জয়ের মুখটা মনে পড়ে গেল। সেই দৃঢ় চোখ, সেই অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। রানীর পুরো জগত জুড়ে শুধু নিজেকে রাখার কথা বলেছিল ও।
চা এসে গেল। কাচের গ্লাসের গায়ে গরমে পাতলা বাষ্প জমেছে। চা বিক্রেতা গ্লাসটা নামিয়ে দিতেই টেবিলের ওপর ছোট্ট টুং শব্দ হলো। আবরার গ্লাসটা হাতে নিতেই জান্নাত হঠাৎ বলল, “আচ্ছা আবরার, তুমি কোনোদিন এমন লড়াই লড়েছো, যেখানে শত্রুটা ঠিক সামনে নেই? না, সামনে নেই বললেও ভুল হবে। শত্রু নেই-ই?”
আবরার গ্লাস মুখের কাছে নিয়ে থেমে গেল। “মানে?”
“মানে ধরো, তুমি লড়ছো। খুব সিরিয়াসলি লড়ছো। কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে লড়ছ, তারা হয়তো জানেই না যে যুদ্ধ চলছে। জানলেও হয়তো বলত, ভাই, এই যুদ্ধ আমাদের না।”
আবরার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার সামনে চায়ের ধোঁয়া সরু সাদা সাপের মতো উঠে বাতাসে মিশে যাচ্ছে। রাস্তার শব্দ যেন ওই কয়েক মুহূর্তে একটু দূরে সরে গেল। তারপর একটু হেসে বলল, “এটা তো খুবই ক্লান্তিকর লড়াই, বস।”
“কেন?”
“কারণ সামনে মানুষ থাকলে অন্তত বোঝা যায়, ঘুষি মারব, না পালাব। কিন্তু শত্রু যদি হাওয়ার মতো হয়, তখন মানুষ নিজের সাথেই কুস্তি করে। জেতে না, হারেও না, শুধু হাঁপিয়ে যায়।”
জান্নাত চায়ের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। ধোঁয়াটা একটু উঠে ভেঙে যাচ্ছে, ঠিক যেমন কিছু কথা মুখে আসার আগেই ভেঙে যায়।
“হুম,” ও আস্তে বলল। “এই লাইনটা খারাপ না।”
কথাটা বলে জান্নাত একটু চুপ করে রইল। ওর এই মৌনতা ভাঙল আবরারের পরের কথায়।
আবরার বলল, “ভাই, স্ক্রিপ্ট কি একটু পিছিয়ে দেবো?”
জান্নাত চট করে আবরারের দিকে তাকাল। অতি সাধারণ দেখতে ছেলেটার আরও একটা গুণ আছে, মানুষের মন বুঝতে পারে। চায়ের দোকানের কোলাহলের মাঝেও ও জান্নাতের ভেতরের হালকা থেমে যাওয়া শুনে ফেলেছে। তাই জান্নাত জানে, আবরার কেন কথাটা বলেছে। কিন্তু সেদিকে গেল না। উল্টো নিজের স্বাভাবিক স্বরে বলল, “কেন, যম দেখে ভয় পেলে নাকি?”
“তা তো লাগবেই,” আবরারও হালকা স্বরে বলল, নিজের প্রশ্নের আসল কারণ এড়িয়ে গিয়ে। “মানুষ বিপদে পা দেওয়ার আগে বিধাতা সাইন দেখায়। এইটা তো, বস, আমার জন্য সাইনই ছিল। হা হা হা।”
“জয়ের চেয়ে বড় বিপদ তোমার সামনে বসে আছে। সময়মতো লেখা শেষ করো। আর এখন চা খাও, শহীদ আবরার।”
চা শেষ করতে করতে জান্নাত আবরারকে আরও কিছু ইন্সট্রাকশন বুঝিয়ে দিল। কথা বলতে বলতে ও মাঝে মাঝে হাত দিয়ে বাতাসে লাইন কাটছিল, যেন স্ক্রিপ্টের গঠন সামনে দেখতে পাচ্ছে। আবরার মাথা নাড়ছিল, কখনো সিরিয়াস, কখনো ভেতরে ভেতরে ভয় পাওয়া হাসি। চায়ের দোকানের কাঁচের বয়ামের ভেতর বিস্কুট কমতে থাকল, কেটলি আবার চড়ল চুলায়, আশেপাশে ছাত্রদের ভিড় একটু বদলে গেল, কিন্তু ওদের কথার ভিতরটা ধীরে ধীরে কাজের দিকে সোজা হয়ে গেল।
তারপর জান্নাত বলল, “আমি একটু ছোট আব্বুর কাছে যাব। তুমি আসবা?”
আবরার কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, “নাহ, তুমি আমার পক্ষ থেকে কন্ডোলেন্স দিয়ে দিও।”
জান্নাত আবরারকে বিদায় দিয়ে চায়ের বিল মিটিয়ে একটা রিকশা নিল, হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।
এখনও গরম পুরোপুরি পড়েনি, কিন্তু দুপুরের রোদ বেশ চড়া। রাস্তার ওপর রোদের পাতলা কাঁপুনি উঠছে। ফুটপাতের পাশে শুকনো ধুলো জমে আছে, মাঝে মাঝে গাড়ির চাকা সেটা উড়িয়ে দিচ্ছে। বাতাসেও গরমের একটা শুকনো তাপ মিশে আছে। রিকশার সিটে বসতেই পিঠে পুরোনো কৃত্রিম চামড়ার গরম ভাব লাগল। রিকশাওয়ালা প্যাডেলে চাপ দিতেই চাকা ধীরে ধীরে ঘুরল, তারপর শহরের ভাঙাচোরা ছন্দে এগোতে শুরু করল।
রিকশা চলার সঙ্গে সঙ্গে জান্নাতের চুল উড়ছে, কপালের পাশের কয়েকটা এলোমেলো গোছা বারবার চোখের কাছে এসে পড়ছে। জান্নাত হাত তুলে সেগুলো সরাল না। রাস্তার পাশে দোকান, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ, দূরের হর্ন, গরমে হাঁপানো মানুষ, সব মিলিয়ে দুপুরটা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠছে।
সামনের উত্তাপটা ও বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছে।
তবু গরম দেখলেই ছায়া খোঁজার মেয়ে জান্নাত নয়। শীত, বর্ষা, গরম, যা-ই থাকুক, নিজের রাস্তা নিজের গতিতেই পার হওয়া ওর স্বভাব।
***    


জান্নাত যখন হসপিটালে পৌঁছল, তখন রুমে দারুণ আড্ডা জমেছে, রহিম, জয়নাল আর আয়শা। কেবিনে ঢুকতেই নাকে লাগল হসপিটালের পরিচিত অ্যান্টিসেপটিক গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে আছে এসির ঠান্ডা বাতাস আর কোথাও থেকে আসা ওষুধের হালকা গন্ধ। বিছানার পাশে ছোট মনিটরের আলো জ্বলছে, স্যালাইনের স্ট্যান্ডটা এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু রুমের ভেতরের কথাবার্তায় অসুস্থতার ভারটা যেন একটু পিছিয়ে গেছে। হসপিটালের কেবিনটা অচেনা, কিন্তু আড্ডাটা বড় চেনা। ছোটবেলা থেকেই এমন আড্ডা দেখেই বড় হয়েছে জান্নাত।
জান্নাত ঢুকেই যেন আগের জান্নাতের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন জান্নাত হয়ে গেল। দরজার কাছে দাঁড়িয়েই চপল কিশোরীর মতো বলল, “কী ব্যাপার, এটা হসপিটালের কেবিন, না কি ভার্সিটির ক্যানটিন?”
তিনজনই জান্নাতের দিকে তাকাল। জয়নাল বলে উঠল, “এতক্ষণ কোথায় ছিলি, তোর ছোট আব্বু অসুস্থ আর তুই এলি দুপুরের পর?”
“আহ, জয়নাল থাম তো,” রহিম তৎক্ষণাৎ থামিয়ে দিল জয়নালকে। অবশ্য জান্নাত জয়নালের কথার উত্তর দিল না। কথাটা যেন কানে গেল, কিন্তু সে কথার দিকে না ঘুরে সোজা রহিমের কাছে গেল। বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “ছোট আব্বু, তুমি তো পুরো ফিট আছো, চলো তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাই।”
রহিম মৃদু হেসে বলল, “এটা তোর বাপকে বোঝা রে মা। ও তো চাইছিল আমি আরও দুদিন আইসিইউতে থাকি। আমাকে সুস্থ হতে দিতেই চায় না। তুইই আমার আসল মা, তুই বুঝলি আমি কী চাই।”
জান্নাত রহিমের হাতটা ধরল। হাতটা গরম, কিন্তু দুর্বলতা আছে। এই দুর্বলতা রহিমের মুখের হাসির সঙ্গে মিলছে না। জান্নাত আঙুলের চাপটা একটু নরম করল। তারপর বলল, “তাহলে তো এই মায়ের কথাও তোমাকে আরও ভালো করে শুনতে হবে। এখন থেকে কোচিংয়ের ক্লাস করা কমিয়ে দিতে হবে।”
যদিও জান্নাত কথাগুলো হাসিমুখে বলছে, কিন্তু ওর মনের ভেতরে উঁকি দিচ্ছে গতকাল এই হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে রাজীবের অসহায় কান্না। আর রানীর সেই অসহায় চাহনি, বিড়বিড় করে বলা, “আমার আব্বু কি মরে গেছে?”
আয়শা পাশেই বসা ছিল। এতক্ষণ জান্নাত আর অন্যদের কথা চুপ করে শুনছিল। রহিমের কথা শেষ হতেই আয়শা বলে উঠল, “মা বললেন যেহেতু, এখন কিন্তু ভাই মায়ের কথামতো চলতেও হবে। আমাদের কথা তো শুনলেন না, মায়ের কথা শুনেন।”
কথাটা বলে আয়শা জান্নাতের দিকে তাকায়। আয়শার চোখে জয়নালের মতো শাসন বা দেরি করে আসার প্রশ্ন নেই, আছে স্নেহমিশ্রিত স্বীকৃতি। যেন মেয়েটাকে সে শুধু মেয়ে হিসেবে না, একটু দূর থেকে বড় হয়ে ওঠা একজন মানুষ হিসেবেও দেখছে।
জয়নাল পাশ থেকে বলে উঠল, “শুধু কমানো কী রে, ওকে বল ক্লাস পুরো বন্ধ। নইলে আমি ওকে এই হসপিটাল থেকে বের হতে দেবো না।”
এই কথা শুনে রহিম জান্নাতের দিকে এমন করে তাকাল, যেন এক বন্ধু আরেক বন্ধুর নামে নালিশ করছে। মুখে কিছু বলল না, কিন্তু চোখ বলল, দেখলি তো, আমাকে কী অবস্থায় রেখেছে?
জান্নাত তা দেখে হেসে বলল, “তোমরা চা খেয়েছো? আর রাজীব কোথায়?”
“রাজীবকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি,” উত্তর দিল আয়শা।
শুনে জান্নাত মনে মনে ভাবল, ভালোই হয়েছে। গত সকাল থেকে কম ঝামেলা যায়নি। প্রথমে ছোট আব্বু রহিমের আকস্মিক অসুস্থতা, তারপর রানীর ওই অবস্থা। ছেলেটা একা ভেঙে গেছে।
“তোমরা থাকো, আমি চা নিয়ে আসি। আর ডিউটি ডাক্তারের সাথে কথা বলে আসি।”
জান্নাত বেরিয়ে গেল।
কেবিনের দরজা টেনে বেরোতেই ভেতরের আড্ডার গরম শব্দটা পিছনে পড়ে গেল। করিডোরটা তুলনায় অনেক ঠান্ডা, অনেক সাদা। দেয়ালে ঝোলানো পোস্টার, দূরে নার্সের ডেস্ক, কারও চাপা কাশি, কোথাও ট্রলির চাকার শব্দ। সাদা আলোয় সবকিছু একটু বেশি পরিষ্কার, একটু বেশি নির্দয় লাগে।
কেবিন থেকে বেরিয়ে প্রথমে জান্নাত গেল ডিউটি ডাক্তারের ঘরে। রোগীর নাম, কেবিন নম্বর বলে পুরো ডিটেইল নিল। ডাক্তার বেশ ভালো রিপোর্ট দিল। বলল, রহিম এখন বিপদের বাইরে। ওটা একটা সতর্ক বার্তা ছিল, এখন নিজেকে সামলানোর সময় হয়েছে। তা ছাড়া রহিমের ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপও বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। তবে হসপিটালে থাকার দরকার হবে না। আজ বিকেলে বড় ডাক্তারের রাউন্ড শেষে হয়তো রিলিজ করে দেবে, কিন্তু বাড়িতে রেস্টে থাকতে হবে।
ডাক্তারের কথাগুলো শুনতে শুনতে জান্নাত মাথা নেড়ে সব মনে রাখল। কোন ওষুধ, কত দিন রেস্ট, কী কী কমাতে হবে, কী কী খেয়াল রাখতে হবে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, সে শুধু রোগীর খবর নিচ্ছে। কিন্তু জান্নাত নিজের ভেতরে ইতিমধ্যেই হিসাব কষতে শুরু করেছে, বাড়িতে গিয়ে কার কী দায়িত্ব হবে, ছোট আব্বুকে কীভাবে ক্লাস কমাতে রাজি করানো যায়, আর জয়নালের অতিরিক্ত ভয়কে কীভাবে সামলানো যায়।
ডাক্তারের কাছ থেকে আশা-জাগানিয়া তথ্য পেয়ে জান্নাত খুশি মনেই গেল চা নিয়ে আসতে। ক্যান্টিনে যাওয়ার পথে সেই করিডোর চোখে পড়ল, যেখানে দাঁড়িয়ে রাজীব নিজের সব পর্দা সরিয়ে একজন ভয় পাওয়া ছেলে হয়ে গিয়েছিল। করিডোরের একই সাদা আলো, একই দেয়াল, একই দূরের শব্দ। শুধু তখন এই জায়গাটা অনেক ভারী ছিল। রাজীবের মুখে তখন সেই পরিচিত স্থিরতা ছিল না, ছিল একেবারে কাঁচা ভয়। আর সেই বিরল মুহূর্তের সাক্ষী ছিল একমাত্র জান্নাত।
জান্নাতের মনে হলো, আরও সবার দেখা উচিত ছিল সেই দৃশ্য। বিশেষ করে রানীর।
তবে রানীর কথা ভাবতেই জান্নাতের মনে পড়ে গেল, নিজের একটু বিরক্তি কীভাবে রাজীবের ওপর আরও নতুন একটা ভার চাপিয়ে দিয়েছিল।
ক্যান্টিনের দিক থেকে খাবারের গন্ধ ভেসে আসছিল। দুধ জ্বাল দেওয়ার গন্ধ, রোগির স্যুপ এর গন্ধ, আর মানুষের ছোট ছোট কথাবার্তা। জান্নাত একবার করিডোরটার দিকে তাকাল, তারপর হাঁটা বাড়াল। এখন চা নিতে হবে। ডাক্তারের কথা জানাতে হবে। আর ছোট আব্বুকে বাড়ি নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। 

*****  
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 3 users Like gungchill's post
Like Reply
Heart 
announce Welcome back গাঙচিল

অসমাপ্ত আত্মজীবনী
party2.gif 
খেলা যে চলছে কোন লেবেলে
Like Reply
Darun
Like Reply




Users browsing this thread: 4 Guest(s)