Thread Rating:
  • 7 Vote(s) - 3.86 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
#21
Darun
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#22
গল্পটা পড়ে বেশ ভালোই লাগলো, আপনার লেখার হাত অসম্ভব সুন্দর। আপনার গল্পের পরবর্তী অংশ পড়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রইলাম।
Like Reply
#23
Welcome back fire asar jonno dhonnobad.... Khub bhalo laglo dekhe purano lekhokera fire aschen...... Update khub bhalo hoche chalia jan...
Like Reply
#24
৫।
ঢাকা শহরে সময় কখনোই ঘড়ির কাঁটার নিয়মে চলে না। এখানে সময়ের নিজস্ব একটা আপেক্ষিকতা আছে। আইনস্টাইন যদি সুইজারল্যান্ডে না জন্মে ঢাকায় জন্মাতেন, তাহলে থিওরি অফ রিলেটিভিটি আবিষ্কার করার জন্য উনাকে ট্রেনের উদাহরণ দিতে হতো না; মিরপুর থেকে কারওয়ান বাজার রুটের যেকোনো লোকাল বাসে একবার উঠিয়ে দিলেই উনি মহাকর্ষ আর সময়ের সব সূত্র এক নিমেষে বুঝে যেতেন।


আমার অফিসের অফিশিয়াল সময় হলো সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা। কাগজে-কলমে আট ঘণ্টার ডিউটি। কিন্তু ঢাকায় আট ঘণ্টার কোনো অফিস নেই। কারওয়ান বাজার থেকে মিরপুর দশ নাম্বারের দূরত্ব খুব বেশি না হলেও, এই পথটুকু পাড়ি দিতে আমার প্রতিদিন গড়ে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। যাওয়ার সময় এক ঘণ্টা, আসার সময় এক ঘণ্টা। অর্থাৎ, আমার আট ঘণ্টার অফিস আসলে আমার জীবনের দশটা ঘণ্টা গিলে খায়। দিনের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দশ ঘণ্টা যদি অফিসে আর রাস্তায় চলে যায়, আট ঘণ্টা ঘুমে যায়, তবে একজন ব্যাচেলর মানুষের নিজের জন্য বাঁচার সময় থাকে মাত্র ছয় ঘণ্টা। এই ছয় ঘণ্টাতেই তাকে বাজার করতে হয়, কাপড় ধুতে হয়, বাবা-মায়ের সাথে ফোনে কথা বলতে হয়, আর জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে হতাশ হতে হয়।

আজ বারো তারিখ। ফেব্রুয়ারি মাস।

ফেব্রুয়ারি মাস মানেই ঢাকা শহরে একটা হালকা বসন্তের আমেজ থাকার কথা। শিমুল-পলাশ ফুটুক বা না ফুটুক, অন্তত বাতাসে একটা শুকনো, ঝিরঝিরে ভাব থাকে। কিন্তু আজ প্রকৃতিও যেন ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামের মতো পাগল হয়ে গেছে।

অফিস থেকে বের হয়েছি তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বাজে। কারওয়ান বাজারের সিগন্যালে দাঁড়িয়ে বিকল্প বাসের জন্য অপেক্ষা করছি, হঠাৎ আকাশ কালো করে মেঘ করে এল। কোনো পূর্বাভাস নেই, কোনো প্রস্তুতি নেই— ঝুপ করে একপশলা ভারী বৃষ্টি নেমে গেল।

ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই বৃষ্টির কোনো বৈজ্ঞানিক বা ভৌগোলিক লজিক আমার জানা নেই। কোথা থেকে এল এই বৃষ্টি, কীভাবে এল, খোদাই জানে! তড়িঘড়ি করে একটা বাসে উঠে পড়লাম। বাসের ভেতরটা গাদাগাদি ভিড়। আমি কোনোমতে জানালার পাশে একটা সিট পেয়ে গেলাম, যেটা ঢাকা শহরে রীতিমতো লটারি পাওয়ার সমতুল্য। বাস চলতে শুরু করল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। বাসের অন্য যাত্রীরা হুড়মুড় করে কাঁচের জানালাগুলো টেনে বন্ধ করে দিচ্ছে, যেন বাইরের এক ফোঁটা পানি ভেতরে এলে তারা গলে যাবে।

আমার পাশে বসা ভদ্রলোকও তার পাশের জানালাটা বন্ধ করার জন্য হাত বাড়ালেন। আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, "ভাই, জানালাটা একটু খোলা থাক না।"

ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন, "বলেন কী ভাই? গায়ে ছিটা লাগবে তো! ফাল্গুন মাসের বৃষ্টি, গায়ে লাগলে জ্বর আসবে।"

আমি শান্ত গলায় বললাম, "জ্বর আসলে প্যারাসিটামল খেয়ে নেব। কিন্তু এই অসময়ের বৃষ্টি তো আর রোজ পাব না।"

ভদ্রলোক আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি পাবনা মেন্টাল হাসপাতাল থেকে এইমাত্র পালিয়ে বাসে উঠেছি। তিনি বিরবির করে কী যেন একটা বললেন, কিন্তু জানালাটা বন্ধ করলেন না।

আমি জানালার কাঁচটা অর্ধেক খুলে দিলাম। বৃষ্টির ছাঁট সরাসরি এসে আমার মুখে-বুকে লাগতে শুরু করল। বাতাসে একটা অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ। ধুলোমাখা ঢাকা শহরের বুকে যখন প্রথম বৃষ্টি পড়ে, তখন মাটি আর ধুলো মিশে এই ঘ্রাণটা তৈরি হয়। আমার শার্টের হাতা ভিজে যাচ্ছে, চশমার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা জমছে। কিন্তু আমার অদ্ভুত এক ধরনের ভালো লাগা শুরু হলো। মনে হলো, এই যে প্রতিদিন পঁচিশ হাজার টাকার বাজেটে জীবন পার করা, নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ নিয়ে টেনশন করা, আর ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে কিম জং উন বা জেফ বেজোসের খবর অনুবাদ করা— এই সমস্ত যান্ত্রিকতার বাইরে আমি আসলে প্রকৃতিরই একটা অংশ। বৃষ্টির এই শীতল ফোঁটাগুলো যেন আমার একঘেয়ে জীবনের ওপর একটা সতেজ প্রলেপ বুলিয়ে দিচ্ছে।

বৃষ্টির কথা ভাবতে ভাবতেই আমার মাথায় এল— ফেব্রুয়ারি মাস তো অর্ধেক চলে গেল! বইমেলা চলছে। আমি এখনো একদিনও বইমেলায় যাইনি। মিরপুরের মেস আর কারওয়ান বাজারের অফিস— এই চক্রের বাইরে বের হওয়া হয়নি। ঠিক করলাম, আগামী সোমবার যাব। সোমবার আমার ডে-অফ। ১৬ই ফেব্রুয়ারি পড়বে দিনটা। একা একা বাংলা একাডেমির মাঠে ঘুরব। কিছু বই কেনা দরকার। কয়েকটা ভালো ইংরেজি থেকে বাংলা ডিকশনারি, আর আমার প্রিয় দুজন স্প্যানিশ লেখকের অনুবাদ।

বইমেলার কথা ভাবতে গিয়েই আমার আরেকটা কথা মনে পড়ল। এই মাসের শেষে ছুটি নিয়ে কয়েকদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি নওগাঁ যাব। হাতে তিন দিন ছুটি জমিয়ে রাখব। বাবা-মাকে দেখে আসা দরকার। উমরাহ করানোর টাকা তো জমাতে পারছি না, অন্তত সশরীরে গিয়ে মুখটা তো দেখিয়ে আসি!

বইমেলা আর বইয়ের চিন্তার সুতোর টানটা হঠাৎ করেই আমার মস্তিষ্কের আরেকটা প্রকোষ্ঠে গিয়ে ধাক্কা খেল। বইমেলা মানেই বই, বই মানেই প্রকাশনী, আর প্রকাশনী মানেই আনিকা নাওহার।

আজ বিকেলের ঘটনা।

আমি নিউজরুমে বসে রয়টার্সের একটা খবর অনুবাদ করছিলাম। নিউজটা ছিল ইউরোপের কোনো এক দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে। অত্যন্ত বোরিং একটা কাজ। আমাদের নিউজ রুমের এক কোণায় একটা টেলিভিশন সবসময় চালু থাকে। সাউন্ড মিউট করা থাকে, শুধু স্ক্রিনে নিউজ চ্যানেলগুলো চলতে থাকে। মাঝে মাঝে ব্রেকিং নিউজ এলে এহসান ভাই চিল্লিয়ে ওঠেন, "ওই রাশেদ, ভলিউমটা দে তো!"

আজ বিকেলে আমি ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে একটু ঘাড় মটকাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ টিভি স্ক্রিনের দিকে আমার চোখ আটকে যায়।

টেলিভিশনে তখন ‘বইমেলা প্রসঙ্গ’ নামের একটা লাইভ প্রোগ্রাম হচ্ছিল। একজন উপস্থাপিকা বইমেলার কোনো একটা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে লেখকদের ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন।

আমি দেখলাম, টিভি স্ক্রিনে আনিকা নাওহার দাঁড়িয়ে আছেন। নিউজ রুমের কোলাহল, এহসান ভাইয়ের চিল্লাচিল্লি, মামুনের কি-বোর্ডের খটখট শব্দ— সবকিছু যেন আমার কান থেকে মুছে গেল। আমি একদৃষ্টে টিভির দিকে তাকিয়ে রইলাম। স্ক্রিনের নিচে লেখা— ‘আনিকা নাওহার, প্রবাসী কবি ও ঔপন্যাসিক’।

ইন্টারভিউটা ছিল মাত্র তিন-চার মিনিটের। টিভিতে সাউন্ড মিউট করা ছিল বলে আমি উনার কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমার শোনার দরকারও ছিল না। আমি শুধু দেখছিলাম।

কী অপূর্ব দেখাচ্ছিল উনাকে! পরনে একটা হালকা ছাই রঙের জামদানি শাড়ি, যার পাড়ে চিকন রূপালি সুতোর কাজ। শাড়িটা উনার শরীরের সাথে এমনভাবে লেপ্টে ছিল যেন ওটা কোনো কাপড় নয়, বরং উনার ব্যক্তিত্বেরই একটা সম্প্রসারিত অংশ। কাঁধের ওপর দিয়ে এলিয়ে পড়া আঁচল, আর খোলা চুলগুলো বাতাসে হালকা উড়ছে। উনার সেই বিখ্যাত শান্ত, স্নিগ্ধ হাসিটা স্ক্রিন ভেদ করে যেন সোজা আমার ডেস্কে এসে পড়ছিল। উপস্থাপিকা যখন কোনো প্রশ্ন করছিলেন, উনি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন এবং তারপর উত্তর দেওয়ার সময় উনার ঠোঁটের নিখুঁত নড়াচড়া আর চোখের বুদ্ধিমত্তার দীপ্তি— সবকিছু মিলিয়ে উনাকে একটা চলন্ত পেইন্টিংয়ের মতো মনে হচ্ছিল।

আমি মনে মনে ভাবলাম, একটা ছত্রিশ বছর বয়সী নারী কীভাবে এত সুন্দর হতে পারে! উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর শারীরিক জ্যামিতি ক্যামেরার লেন্সেও একটুও ম্লান হয়নি; বরং টিভি স্ক্রিনে উনাকে আরও বেশি রহস্যময়ী, আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগছিল।

মাত্র তিন-চার মিনিট। তারপর ক্যামেরা ঘুরে গেল অন্য কোনো লেখকের দিকে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতিতে ফিরে গেলাম। কিন্তু আমার মাথার ভেতরে ওই ছাই রঙের জামদানি শাড়িটা আটকে রইল।

বাস যখন মিরপুর দশ নাম্বারে পৌঁছাল, তখনো ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। আমি বাস থেকে নেমে মেসে হাঁটা ধরলাম। আমার কাছে ছাতা নেই। আমি ভিজতে ভিজতেই এগোলাম। মেসে যখন পৌঁছালাম, তখন আমি পুরোপুরি কাকভেজা। শার্ট শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, চুল থেকে পানি ঝরছে।

মেসের দরজা খুলল তুহিন। আমাকে এই অবস্থায় দেখে সে চোখ কপালে তুলে বলল
, "হোয়াট হ্যাপেনড ব্রাদার? ইউ লুক লাইক আ ওয়েট ক্যাট! এই অসময়ে বৃষ্টি কই পেলেন?"

আমি জুতো খুলতে খুলতে বললাম, "আকাশে মেঘ ছিল, সেখান থেকেই পেয়েছি। বৃষ্টি কি আমি পকেটে করে এনেছি নাকি?"

তুহিন মাথা নেড়ে বলল, "ভেরি ব্যাড ওয়েদার। আমার আইইএলটিএস-এর লিসেনিং মক টেস্ট ছিল, বৃষ্টির শব্দের জন্য কনসেন্ট্রেশন ব্রেক হয়ে গেছে।"

আমি তুহিনকে পাশ কাটিয়ে আমার রুমে গেলাম। ভেজা কাপড়গুলো ছেড়ে একটা শুকনো টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরলাম। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে অদ্ভুত এক ধরনের ক্লান্তি ভর করল শরীরে। বৃষ্টির পানিতে ভেজার কারণে শরীরটা একটু শীত শীত করছে, আবার ভেতর থেকে একটা ঘুম ঘুম ভাবও আসছে।

রহিমা খালা রান্না করে টেবিলে খাবার ঢেকে রেখে গেছেন। আমি আর দেরি না করে ডাইনিংয়ে গিয়ে খেয়ে নিলাম। মেন্যু সেই চিরচরিত— পাতলা ডাল, ডিম ভুনা আর আলুর ভর্তা। কিন্তু আজ অমৃতের মতো লাগল।

খাওয়া শেষ করে আমি বিছানায় এসে শুলাম। আজ আর কোনো বইয়ের প্রুফ দেখার কাজ নেই। চন্দ্রবিন্দুর মতিন সাহেবকে গতকালই সব বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। আনিকা নাওহারের উপন্যাসের প্রথম তিন চ্যাপ্টারও পড়া শেষ। ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে আমার কিছু অবজারভেশন আমি উনাকে হোয়াটসঅ্যাপে জানিয়ে দিয়েছি। উনি শুধু একটা 'থাম্বস আপ' ইমোজি দিয়ে রিপ্লাই দিয়েছিলেন।

বাইরে বৃষ্টির শব্দটা একটানা বেজেই চলেছে। টিনের চাল হলে বৃষ্টির শব্দটা তীক্ষ্ণ হতো, কিন্তু ঢাকার কংক্রিটের ছাদের ওপর বৃষ্টির শব্দটা একটা গোঙানির মতো শোনায়। আমি চোখ বন্ধ করলাম। ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যেতে আমার খুব একটা সময় লাগল না।

কিন্তু সেই রাতে আমি যে স্বপ্নটা দেখলাম, তা আমার অনুবাদক জীবনের সমস্ত লজিক, সমস্ত ফ্যাক্ট আর সমস্ত বাস্তবতাকে চুরমার করে দিল।

স্বপ্নটা শুরু হলো খুব রিয়েলিস্টিক একটা সেট-আপ দিয়ে। আমি দেখলাম, আমি বাংলা একাডেমির বইমেলায় দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু মেলাটা স্বাভাবিক নেই। আকাশ ভেঙে ভয়ানক বৃষ্টি নামছে। চারিদিকে একটা চরম বিশৃঙ্খলা আর আতঙ্ক। লেখক, পাঠক, দর্শনার্থীরা সবাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াচ্ছে। প্রকাশকরা স্টলের ভেতর থেকে বড় বড় নীল আর সাদা রঙের পলিথিন বের করে তাদের হাজার হাজার টাকার বই ঢাকার চেষ্টা করছে। চারদিকে শুধু চিৎকার, "বই ভিজে গেল! পলিথিন দাও! ত্রিপল টানাও!"

আমি মেলার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশের এই ভয়াবহ হুড়োহুড়ির মাঝে আমি একদম স্থির। হঠাৎ আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম। আমার পাশ দিয়ে হাজার হাজার মানুষ দৌড়াচ্ছে, কিন্তু কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। আমি যেন এই পৃথিবীতে থেকেও নেই। আমি একটা অদৃশ্য সত্তা।

তার চেয়েও বড় যে ধাক্কাটা আমি খেলাম, তা হলো নিজের দিকে তাকিয়ে। আমি দেখলাম, আমার শরীরে কোনো কাপড় নেই। আমি সম্পূর্ণ নগ্ন। বাস্তব জীবনে এরকম পরিস্থিতিতে পড়লে যেকোনো মানুষের লজ্জায়, ভয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু স্বপ্নে আমার ভেতরে কোনো লজ্জা কাজ করল না। বরং, আমার মনে হলো এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থা। এই যে আকাশ থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, এই বৃষ্টি আমার সম্পূর্ণ অনাবৃত শরীরকে ধুয়ে দিচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিল, এই বৃষ্টি যেন শুধু পানি নয়, এটা একটা পবিত্র জলধারা। ঢাকা শহরের পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের রাশেদের গায়ে যে ক্লান্তি, যে হতাশা, যে একঘেয়েমি জমেছিল— এই বৃষ্টি যেন আমার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ থেকে সেই ময়লাগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। আমি যেন আদিম যুগের কোনো এক পবিত্র মানব, যে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে গেছে।

আমি চোখ বন্ধ করে মুখটা আকাশের দিকে তুলে দুই হাত প্রসারিত করলাম। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা আমার বুকে, পেটে, ঊরুতে এসে আছড়ে পড়ছে। এক অদ্ভুত আদিম শান্তি।

ঠিক সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম, কেউ একজন আমার প্রসারিত ডান হাতটা আলতো করে ধরল। স্পর্শটা এতই জীবন্ত আর এতই কোমল ছিল যে আমি চমকে চোখ খুললাম। আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আনিকা নাওহার।

চারপাশে তখনো পলিথিন টানানোর যুদ্ধ চলছে, কিন্তু আমাদের চারপাশে যেন একটা অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি হয়ে গেছে, যেখানে শুধু আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। আমি অবাক হয়ে উনার দিকে তাকালাম। এবং আমার স্নায়ুগুলো যেন মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে গেল।

আনিকা নাওহারও সম্পূর্ণ অনাবৃত। তাঁর শরীরে এক সুতোও কোনো আবরণ নেই। আমি একজন অনুবাদক। আমি শব্দের কারিগর। কিন্তু উনাকে সেই অবস্থায় দেখে আমার মনে হলো, পৃথিবীর কোনো ভাষার কোনো ডিকশনারিতে এমন কোনো শব্দ তৈরি হয়নি, যা দিয়ে উনার সেই মুহূর্তের রূপকে বর্ণনা করা যায়।

বৃষ্টির পানি উনার মাথা থেকে শুরু করে সারা শরীরে গড়িয়ে পড়ছে। উনার ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর লেপ্টে আছে। আমি উনার শারীরিক গঠনের যে জ্যামিতির কথা ভেবেছিলাম, আজ তা কোনো কাপড়ের আড়াল ছাড়া, সম্পূর্ণ আদিম এবং নিখুঁতরূপে আমার চোখের সামনে উপস্থিত।

উনার কাঁধের গড়নটা যেন কোনো গ্রিক ভাস্করের নিপুণ হাতে খোদাই করা মার্বেল পাথর। বৃষ্টির পানি সেই কাঁধ বেয়ে নেমে আসছে উনার সুডৌল, পূর্ণাঙ্গ এবং উদ্ধত বক্ষদেশের ওপর। পানিগুলো সেখানে বাধা পেয়ে দুই ভাগ হয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। উনার নিটোল পেট, নাভির গভীরতা এবং তারপর সেই সরু কোমর— সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত নান্দনিকতার সৃষ্টি করেছে। কোমরের নিচ থেকে উনার নিতম্বের বাঁকটা এতই নিখুঁত আর এতই মসৃণ যে, মনে হচ্ছিল প্রকৃতি তার সমস্ত শিল্পবোধ দিয়ে এই নারীদেহটি নির্মাণ করেছে।

উনার ফর্সা ত্বকের ওপর বৃষ্টির পানির ফোঁটাগুলো মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছিল। ঠান্ডায় উনার শরীরের রোমকূপগুলো সামান্য জেগে উঠেছে, আর বক্ষচূড়া দুটো সামান্য দৃঢ় হয়ে আছে।

কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সম্পূর্ণ নগ্নতার মাঝে কোনো ধরনের অশ্লীলতা বা কদর্যতা ছিল না। উনাকে দেখে আমার মনে কোনো পাশবিক বা আদিম কামনার উদ্রেক হলো না; বরং আমার মনে হলো আমি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র এবং সুন্দর কোনো শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বতিচেল্লির সেই বিখ্যাত পেইন্টিং ‘দ্য বার্থ অফ ভেনাস’-এর ভেনাস যেন ক্যানভাস থেকে নেমে এসে সরাসরি বৃষ্টির নিচে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে।

উনি আমার হাতটা শক্ত করে ধরে উনার সেই শান্ত, স্নিগ্ধ চোখ জোড়া তুলে আমার দিকে তাকালেন। উনার চোখে কোনো লজ্জা বা জড়তা ছিল না। ছিল এক ধরনের গভীর আত্মসমর্পণ এবং আত্মবিশ্বাস।

বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের মাঝেই উনি খুব নরম গলায় বললেন, "রাশেদ, এখানে আর কোনো মুখোশ নেই। না মিথ্যার, না সত্যের। এখানে শুধু আমরা আছি।"

উনার কথাগুলো বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে একটা অদ্ভুত সিম্ফনি তৈরি করল। আমি কিছু বলতে পারলাম না। আমি শুধু উনার হাতের উষ্ণতা অনুভব করলাম। এই কনকনে ঠান্ডা বৃষ্টির মাঝেও উনার হাতটা কী অদ্ভুত গরম!

আমরা দুজন সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায়, হাতে হাত রেখে, বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশে পৃথিবীর সমস্ত বই ভিজে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সমস্ত জ্ঞান ধুয়ে মুছে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। আমরা দুজন যেন পৃথিবীর আদি মানব-মানবী, যারা সবেমাত্র স্বর্গের বাগানে চোখ খুলেছে।

হঠাৎ করে একটা প্রচণ্ড শব্দ হলো। হয়তো মেঘ ডাকার শব্দ, অথবা বাসের কোনো হর্ন। আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। আমি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। আমার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে। বাইরে তখনো বৃষ্টির সেই একটানা গোঙানির শব্দ চলছে।

আমি অন্ধকারে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইলাম। আমার ডান হাতের তালুটা তখনো গরম হয়ে আছে। আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছি, আনিকা নাওহারের সেই নরম হাতটা যেন এখনো আমার হাতের মুঠোয় ধরা আছে।

আমি দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললাম। আমার মাথার ভেতর তখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এক অদ্ভুত, বর্ণনাতীত অনুভূতি। সিগমুন্ড ফ্রয়েড সাহেব সত্যি খুব ভালো জানতেন। মানুষের মন বড়ই জটিল একটা জায়গা।

আমি সবসময় নিজেকে একজন ‘শুকনা’ মানুষ বলে দাবি করে এসেছি। আমি ভেবেছি আমার ভেতরে ইমোশন নেই, কামনা নেই, বাসনা নেই। আমি একজন নিরাসক্ত অনুবাদক, যে শুধু অন্যের খবর ট্রান্সলেট করে।

কিন্তু আজ রাতের এই স্বপ্ন আমাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে দিল। শুধু স্বপ্নে নয়, বাস্তবেও। ফ্রয়েড বলেছেন, মানুষের অবদমিত কামনা-বাসনাগুলো, যেগুলো সে সজ্ঞানে স্বীকার করতে চায় না, সেগুলো স্বপ্নের মাধ্যমে প্রতীকী বা সরাসরি রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসে।

আমি আনিকা নাওহারকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, এটা সত্যি। উনার রূপ, উনার আভিজাত্য আমাকে আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু আমি অবচেতন মনে উনাকে এতটা তীব্রভাবে, এতটা আদিমভাবে চেয়েছি— সেটা আমি নিজেই জানতাম না।

আমার এই সাধারণ, পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের জীবনে, যেখানে আমি আমার বাবা-মায়ের উমরাহ নিয়ে চিন্তা করি, সেখানে একজন বিবাহিত, লন্ডনপ্রবাসী, আইটি ফার্মের মালিক এবং রূপবতী নারীর প্রতি আমার এই আকাঙ্ক্ষা— এটা শুধু অবাস্তবই নয়, এটা রীতিমতো হাস্যকর।

কিন্তু স্বপ্ন তো আর লজিক বোঝে না। স্বপ্ন ব্যাংক ব্যালেন্স দেখে না, স্বপ্ন সমাজ বোঝে না। আমি বিছানা থেকে নেমে এক গ্লাস পানি খেলাম। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়েছে রুমে। আয়নায় নিজের মুখটা দেখলাম।

সাধারণ একটা মুখ। কিন্তু এই সাধারণ মুখের আড়ালে যে একটা আদিম, বন্য এবং ক্ষুধার্ত পুরুষ লুকিয়ে আছে, সেটা আমি আজ প্রথম আবিষ্কার করলাম। আমি মনে মনে হাসলাম। একটা তিক্ত হাসি।

"রাশেদ আহমেদ, তুমি আর যাই হও, তুমি কোনো সাধু নও। তুমিও রক্ত-মাংসের একজন মানুষ। এবং তোমার ভেতরের সেই মানুষটা আজ রাতে বৃষ্টির নিচে আনিকা নাওহারের সাথে যে আদিম স্নানটা করেছে, সেটা তুমি সারাজীবনেও ভুলতে পারবে না।"

বাইরে বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। আমি আবার বিছানায় গিয়ে শুলাম। কিন্তু আমি জানি, আজ রাতে আমার আর ঘুম আসবে না। আমার ডান হাতের তালুটা জ্বলছে।

ফ্রয়েড সাহেবের থিওরি আর আমার বাস্তবতার মাঝখানে আনিকা নাওহার এখন এক প্রবল বৃষ্টির নাম হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। যে বৃষ্টিতে ভিজলে মানুষ পবিত্র হয়, না কি আরও বেশি তৃষ্ণার্ত হয়— সেটা আমি জানি না।
[+] 12 users Like Orbachin's post
Like Reply
#25
Darun
Like Reply
#26
আপডেট প্লিজ
Like Reply
#27
Darun egoche... Chalia jan
Like Reply
#28
৬।
যৌনতা জিনিসটা আসলে কী
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের নিচের কালি দেখতে দেখতে আমি এই অতি জটিল এবং আদিম বিষয়টা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। গত রাতের সেই অদ্ভুত, নগ্ন এবং বন্য স্বপ্নের পর আমার মস্তিষ্ক যেন স্বাভাবিক লজিকে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, আমি যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছি। যে রাশেদ আহমেদকে আমি চিনতাম— শান্ত, নিরাসক্ত, পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের একঘেয়ে অনুবাদক— তার ভেতরে এত তীব্র একটা আদিম ক্ষুধা লুকিয়ে ছিল, সেটা আমি নিজেই জানতাম না।

যৌনতা নিয়ে আমাদের সমাজে এক ধরনের অদ্ভুত লুকোচুরি আছে। আমরা সবাই এই প্রক্রিয়ার ফসল, অথচ আমরা এমন ভান করি যেন এটা পৃথিবীতে এক্সিস্টই করে না। বাসে একটু গা লাগলে আমরা এমনভাবে চমকে উঠি, যেন আমরা সবাই আকাশ থেকে পড়া কোনো পবিত্র ফেরেশতা। আমি ব্রাশে পেস্ট লাগাতে লাগাতে ভাবলাম, যৌনতা নিয়ে পৃথিবীর বড় বড় দার্শনিক আর বিজ্ঞানীরা কী বলে গেছেন?


সিগমুন্ড ফ্রয়েডের কথা ধরলে, মানুষের জীবনের প্রতিটি কাজের পেছনেই নাকি অবদমিত যৌনাকাঙ্ক্ষা কাজ করে। আপনি যে একটা সুন্দর বাড়ি বানাচ্ছেন, ভালো চাকরি খুঁজছেন, এমনকি সুন্দর করে চুল আঁচড়াচ্ছেন— সবকিছুর পেছনেই আছে বিপরীত লিঙ্গকে আকর্ষণ করার একটা সুপ্ত বাসনা। রিচার্ড ডকিন্স তার ‘দ্য সেলফিশ জিন’ বইয়ে বলেছেন, আমরা মানুষেরা হচ্ছি আমাদের জিনের বহনকারী গাড়ি মাত্র। আমাদের জিনের একটাই উদ্দেশ্য— যেকোনো মূল্যে সারভাইভ করা এবং বংশবৃদ্ধি করা। আর এই বংশবৃদ্ধির জন্য জিন আমাদের মস্তিষ্কে এমন একটা কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন তৈরি করে, যার নাম আমরা দিয়েছি ‘যৌনতা’ বা ‘প্রেম’। জিন আমাদের বোকা বানিয়ে নিজের কাজ উদ্ধার করে নেয়।

কিন্তু পুরুষ আর নারীর কাছে যৌনতার ধারণা কি এক?

আমি বেসিনে মুখ ধুতে ধুতে ভাবলাম, না, এক নয়। বিবর্তনবাদ অনুযায়ী, একজন পুরুষের মূল লক্ষ্য হলো তার জিন যত বেশি সম্ভব ছড়িয়ে দেওয়া। কারণ পুরুষের রিপ্রোডাক্টিভ কস্ট বা প্রজনন ব্যয় খুব কম। তাই পুরুষ প্রকৃতিগতভাবেই ‘ভিজ্যুয়াল’ বা দৃষ্টি-নির্ভর। একটা সুন্দর, প্রতিসম (symmetrical) শরীর, চওড়া নিতম্ব, ভরাট বক্ষদেশ— এগুলো দেখলে পুরুষের মস্তিষ্ক সিগন্যাল দেয় যে, এই নারী সুস্থ এবং সন্তান ধারণে সক্ষম। তাই পুরুষ খুব সহজেই শারীরিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়।

অন্যদিকে, একজন নারীর প্রজনন ব্যয় অনেক বেশি। তাকে দীর্ঘ নয় মাস গর্ভধারণ করতে হয়, জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়। তাই নারী শুধু শরীর দেখে আকৃষ্ট হয় না। সে খোঁজে নিরাপত্তা, ক্ষমতা, বুদ্ধিমত্তা এবং কমিটমেন্ট। সে চায় এমন একজন পুরুষ, যে তাকে এবং তার সন্তানকে প্রটেকশন দিতে পারবে। এ কারণেই হয়তো পুরুষরা পর্নোগ্রাফি বা ভিজ্যুয়াল জিনিসের প্রতি বেশি আসক্ত হয়, আর নারীরা আকৃষ্ট হয় ইমোশনাল কানেকশন বা রোমান্টিক উপন্যাসের প্রতি।

প্রাচীনকালে যৌনতা ছিল নেহাতই একটা বায়োলজিক্যাল প্রয়োজন। টিকে থাকার লড়াই। কিন্তু আধুনিক মানুষ এই বায়োলজিক্যাল প্রয়োজনটাকে একটা বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত করেছে। যৌনতা এখন শুধু আর প্রজননের উপায় নেই, এটা এখন ক্ষমতা, বিনোদন আর পণ্যের প্রতীক।

এই যে আমি আনিকা নাওহারের কথা ভাবছি, এটা কেন হচ্ছে? আমার হঠাৎ করে একটা অদ্ভুত থিওরির কথা মনে পড়ল। এডওয়ার্ড ওয়েস্টারমার্কের ‘ওয়েস্টারমার্ক ইফেক্ট’। মানুষ কেন নিজের মা, বোন বা পরিবারের কাছের মানুষদের নিয়ে কখনো যৌনভাবে ভাবে না? অথচ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা মেয়েকে নিয়ে খুব সহজেই ফ্যান্টাসাইজ করতে পারে! কেন?

সমাজবিজ্ঞানীরা হয়তো বলবেন, এটা সমাজের নিয়ম বা নৈতিকতার কারণে। কিন্তু বিবর্তনবাদীরা বলেন অন্য কথা। প্রকৃতি খুব স্মার্ট। রক্তের সম্পর্কের কারও সাথে প্রজনন হলে জেনেটিক মিউটেশন বা বিকলাঙ্গ সন্তান হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তাই প্রকৃতি মানুষের মস্তিষ্কে একটা বিল্ট-ইন সফটওয়্যার দিয়ে দিয়েছে। জন্মের পর থেকে জীবনের প্রথম কয়েক বছর আমরা যাদের সাথে একসাথে বড় হই, যাদেরকে প্রতিদিন দেখি— আমাদের মস্তিষ্ক তাদেরকে ‘ডু নট টাচ’ বা ‘ফ্যামিলি’ নামক ফোল্ডারে সেভ করে ফেলে। এদের প্রতি আমাদের কোনো সেক্সুয়াল রেসপন্স তৈরি হয় না। একেই বলে ওয়েস্টারমার্ক ইফেক্ট।

কিন্তু যখনই আমরা ফ্যামিলির বাইরে নতুন কোনো মুখ দেখি, নতুন কোনো জিন দেখি— মস্তিষ্ক তখন হিসেব কষতে শুরু করে। আর সেই নতুন মুখটার যদি একটা পারফেক্ট ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতি থাকে, যদি তার শরীরে একটা দামি পারফিউমের গন্ধ থাকে, আর তার চোখে যদি একটা পরিণত বুদ্ধিমত্তার ছাপ থাকে— তখন মস্তিষ্ক অ্যালার্ম বাজিয়ে ওঠে— “মেট! মেট! মেট!”

আমি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে নিজের ঘরে ফিরে এলাম। আমার মস্তিষ্ক গত রাতে আনিকা নাওহারকে দেখে ঠিক এই অ্যালার্মটাই বাজিয়েছে। মেসের সকালবেলাটা আজ বেশ শান্ত। রাজু আজ বারান্দায় নেই। সে হয়তো কাল রাত জেগে বিসিএস পড়েছে , এখন ঘুমাচ্ছে। আমি ডাইনিংয়ে গিয়ে দেখলাম তুহিন বসে বসে রুটি আর ডিম ভাজি খাচ্ছে।"গুড মর্নিং ব্রাদার রাশেদ!" তুহিন ডিমের কুসুম দিয়ে রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল।

"মর্নিং। আইইএলটিএস-এর কী অবস্থা?"

তুহিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "ভাই, স্পিকিং নিয়ে প্যারা নাই। আই ক্যান স্পিক লাইক এ নেটিভ। বাট রিডিংয়ে গিয়ে আটকে যাচ্ছি। এত কঠিন কঠিন প্যাসেজ দেয়! কালকে একটা প্যাসেজ পড়লাম ডাইনোসরের বিলুপ্তি নিয়ে। আচ্ছা ভাই, ডাইনোসররা যে মরে গেল, এটা নিয়ে আমাদের এত টেনশন করার কী আছে? আমরা কি ওদের আত্মীয় লাগি?"

আমি চেয়ার টেনে বসে রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললাম, " আত্মীয় লাগি না ঠিকই, তবে আমরা ডাইনোসরদের রিপ্লেসমেন্ট। ওরা বিলুপ্ত না হলে আমরা আসতাম না। আমাদের অস্তিত্বের সাথে ওদের বিলুপ্তি যুক্ত।" তুহিন চোখ পিটপিট করে বলল, "আপনার কথাবার্তা মাঝে মাঝে আমি বুঝি না ভাই। খুব ফিলোসফিক্যাল।" আমি হাসলাম। আমার নিজের ফিলোসফি নিয়েই আমি আজ বিপদে আছি, তুহিন আর কী বুঝবে!

সকাল নয়টা চল্লিশে আমি কারওয়ান বাজারের বাসে ঝুলছি।

বিকল্প বাস আজ অতিরিক্ত ভিড়। আমার সামনে একটা কলেজপড়ুয়া ছেলে তার বিশাল ভারী ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে এক বয়স্ক লোক, যিনি বাসের প্রতিটা ঝাঁকুনিতে আল্লাহ-রসুলের নাম জপছেন। এই বাসের ভেতরের মানুষগুলোকে দেখলে মনে হয় না যে এদের জীবনে যৌনতা, রোমান্স বা প্রেম বলে কিছু আছে। অথচ এরা প্রত্যেকেই সেই আদিম প্রক্রিয়ার ফসল।

অফিসে পৌঁছালাম দশটা দশে।

এহসান ভাই আজ একটু উত্তেজিত। তার কপালে ভাঁজ। আমাকে দেখেই বললেন, "রাশেদ, আজকে কিন্তু প্রচুর প্রেসার। ইউক্রেন-রাশিয়া বর্ডারে আবার উত্তেজনা শুরু হয়েছে। আমি তোমাকে কয়েকটা নিউজ অ্যাসাইন করেছি, একদম ঝটপট নামিয়ে ফেলবে।" আমি ডেস্কে গিয়ে বসলাম। মামুনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে একটা ফরাসি নিউজ পোর্টালের খবর অনুবাদ করছে। "কী খবর মামুন?" আমি ল্যাপটপ অন করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম। মামুন খুব উৎসাহ নিয়ে বলল, "ভাই, ফাটাফাটি নিউজ। ফ্রান্সের এক মন্ত্রীর সাথে এক মডেলের পরকীয়া ফাঁস হয়ে গেছে। আমি হেডলাইন দিচ্ছি— ‘ফরাসি নেতার পরকীয়ায় ফ্রান্স জুড়ে ছি ছি রব, মডেলের সাথে গোপন অভিসার’।" আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "মামুন, এটা ফ্রান্স, বাংলাদেশ না। ফ্রান্সে পরকীয়া নিয়ে কেউ ছি ছি করে না। ওদেশে এটা খুব ডালভাত ব্যাপার। তুমি হেডলাইন দাও— ‘ফ্রান্সের রাজনীতিতে নতুন স্ক্যান্ডাল: মডেলের সাথে মন্ত্রীর সম্পর্ক ফাঁস’।" মামুন একটু হতাশ হলো। "ভাই, আপনার নিউজগুলো এত শুকনা কেন? একটু মসলা না দিলে কি নিউজ পড়ে মজা আছে?"

"আমাদের কাজ খবর দেওয়া, চটপটি বানানো না মামুন।"

আমি আমার কাজে মন দিলাম। ইউক্রেন-রাশিয়ার বর্ডারের খবর। ট্যাঙ্ক, মিসাইল, কূটনীতি, মৃত্যু। কিন্তু আমার মাথার ভেতর তখনো একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্যপটের রেশ রয়ে গেছে। আনিকা নাওহারের সেই বৃষ্টিভেজা, নগ্ন শরীরটা আমার নিউরনের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি যখন ল্যাপটপে টাইপ করছি— "রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এক কঠোর বার্তায় জানিয়েছেন...", তখন আমার চোখের সামনে ভাসছে আনিকা নাওহারের সেই নিটোল নাভির গভীরতা।

আমি কয়েকবার চোখ বন্ধ করে মাথা ঝাঁকালাম। এ কেমন পাগলামি শুরু হয়েছে আমার! আমি একজন ম্যাচিউর মানুষ। আমি জানি এই ফ্যান্টাসির কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তবুও আমার মন বারবার ওই কল্পনার জগতেই ছুটে যাচ্ছে। সারাদিন অফিসে কাজের প্রচুর চাপ ছিল। ফারহানা আপা আজ বাসা থেকে চিকেন বিরিয়ানি এনেছিলেন। আমাকে ডেকে খাওয়ালেন। নিতি এসে দুইবার আমার ডেস্ক থেকে স্ট্যাপলার নিয়ে গেছে আর বলেছে, "রাশেদ ভাই, আপনি আজ এত চুপচাপ কেন? প্রেমে-টেমে পড়লেন নাকি?"

আমি মুচকি হেসে বলেছি, "অনুবাদকদের প্রেমে পড়ার কোনো নিয়ম নেই নিতি। আমরা শুধু অন্যের প্রেমের খবর অনুবাদ করি।" অফিস শেষ করে মেসে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে গেল।
আজ মেসে রহিমা খালা খুব সাধারণ রান্না করেছেন। আলু ঘাটি আর ডিমের তরকারি। আমি চুপচাপ খেয়ে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম।

আমার রুমের ভেতরে এক ধরনের গুমোট নীরবতা। সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ঘুরছে। বাইরে রাস্তার গাড়িঘোড়ার আওয়াজ অনেক কমে এসেছে। আমি আমার ছোট বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিলাম। ঘরের আলো নেভানো, শুধু রাস্তার সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো জানালার গ্রিল গলে আমার বিছানার ওপর একটা জেলখানার মতো ছায়া তৈরি করেছে। আমি প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম।

স্ক্রিন আনলক করতেই হোয়াটসঅ্যাপের আইকনটা চোখে পড়ল। আমার আঙুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে হোয়াটসঅ্যাপে চলে গেল। কন্টাক্ট লিস্টে গিয়ে সার্চ করলাম— 'Anika Nawhar'। উনার কোনো মেসেজ আসেনি। আমার পাঠানোর কথাও না। আমি গতকাল রাতে উনার উপন্যাসের ভাষা নিয়ে যে ফিডব্যাক দিয়েছিলাম, উনি শুধু একটা থাম্বস আপ দিয়েছিলেন। আমি উনার নামের ওপর ট্যাপ করে চ্যাটবক্সটা ওপেন করলাম। তারপর উনার প্রোফাইল পিকচারটার (DP) ওপর ক্লিক করলাম। ছবিটা বড় হয়ে আমার পুরো স্ক্রিন জুড়ে ভেসে উঠল।

ছবিটা ইংল্যান্ডে তোলা। ব্যাকগ্রাউন্ডে লন্ডনের টেমস নদী আর বিশাল একটা নাগরদোলা— লন্ডন আই। শীতের দেশ বলে আনিকা নাওহার বেশ জম্পেশ শীতের কাপড় পরে আছেন। উনার গায়ে একটা গাঢ় নীল রঙের ভারী ট্রেঞ্চ কোট। গলায় একটা লাল রঙের মাফলার খুব সুন্দর করে পেঁচানো। মাথার চুলগুলো খোলা, বাতাসে একটু উড়ছে। দুই হাত ওভারকোটের পকেটে ঢোকানো। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে উনি খুব স্বাভাবিক, স্নিগ্ধ একটা হাসি দিয়েছেন।

ছবিতে উনার শরীরের এক ইঞ্চি চামড়াও দৃশ্যমান নয়, শুধু মুখমণ্ডল ছাড়া। একদমই রিভিলিং বা আবেদনময় কোনো ছবি নয়। সম্পূর্ণ শালীন, পরিশীলিত এবং একজন বুদ্ধিমতী লেখকের যেমন ছবি হওয়া উচিত, ঠিক তেমনই। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক বড়ই অদ্ভুত। সে যা দেখতে পায় না, তা কল্পনা করে নিতে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে।

আমি অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে উনার ওই শীতের পোশাকে ঢাকা ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম। আর হঠাৎ করেই আমার শরীরের ভেতর একটা প্রচণ্ড উত্তাপ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। আমার শ্বাসের গতি ভারী হয়ে এল। আমার কল্পনার ক্যানভাসে ছবিটা পাল্টাতে শুরু করল। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার মাথার ভেতর তখন আর লন্ডনের টেমস নদী নেই। আমার কল্পনায় আনিকা নাওহার এখন আমার এই ছোট্ট, অন্ধকার রুমের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন।

আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, উনি খুব ধীর লয়ে উনার গলার ওই লাল মাফলারটা খুলে ফেললেন। উনার চোখের সেই শান্ত, বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিটা এখন আর নেই; সেখানে এখন এক ধরনের বন্য, ক্ষুধার্ত এবং আদিম তৃষ্ণা। আমি বিছানা থেকে উঠে উনার সামনে দাঁড়ালাম। উনার শরীর থেকে সেই চেনা শ্যানেল পারফিউমের গন্ধটা আমার নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিচ্ছে। আমি কল্পনায় উনার গাঢ় নীল ট্রেঞ্চ কোটের বোতামগুলো একটা একটা করে খুলতে শুরু করলাম। উনার ভারী ওভারকোটটা খসে মেঝেতে পড়ে গেল। আমার শরীরের ভেতরের উত্তাপটা এখন একটা আগ্নেয়গিরির মতো ফুটছে। আমি আমার ট্রাউজারের ভেতর হাত দিলাম। আমার পুরুষাঙ্গ তখন চরম উত্তেজনায় কঠিন হয়ে আছে। আমার হাতের মুঠোয় আমি নিজের সেই স্পন্দনশীল আদিমতাকে অনুভব করলাম।

কল্পনার জগতে আনিকা নাওহারের আবরণগুলো একে একে খসে পড়ছে। আমি উনাকে জড়িয়ে ধরলাম। উনার সেই ফর্সা, নিখুঁত কাঁধের ওপর আমার ঠোঁট রাখলাম। আমি স্পষ্ট অনুভব করছি উনার গায়ের উত্তাপ। উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর জ্যামিতিক শরীরটা এখন আমার দুই হাতের মুঠোয়। আমি উনার ভরাট বক্ষদেশের ওপর আমার মুখ গুঁজে দিলাম। উনার গায়ের পারফিউমের সুবাসের সাথে এখন মিশে গেছে এক ধরনের নোনতা ঘামের গন্ধ— যেটা সম্পূর্ণ আদিম এবং পাশবিক। আমার হাতের গতি বাড়তে লাগল। আমি বিছানায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছি, কিন্তু কল্পনায় আমি আনিকাকে আমার বিছানায় টেনে নিয়েছি। উনার দুই পায়ের মাঝখানে আমি আমার শরীরটাকে স্থাপন করেছি। উনার সেই সুডৌল, মসৃণ ঊরু দুটো আমার কোমর জড়িয়ে আছে।

"রাশেদ..." কল্পনার আনিকা ফিসফিস করে আমার নাম ধরল। উনার সেই প্রমিত বাংলার মোহনীয় কণ্ঠস্বর এখন কামনার আধিক্যে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। উনার নখগুলো আমার পিঠে বসে যাচ্ছে।
আমি উনার শরীরের গভীরে প্রবেশ করলাম। আমার কল্পনায় কোনো রোমান্স নেই, কোনো সাহিত্য নেই। সেখানে শুধু আছে ঘাম, ঘর্ষণ আর মাংসের আদিম উল্লাস। আমি উনার ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরলাম। উনার ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস আমার কানের কাছে একটা ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ছে। আমি উনার কোমরের বাঁকটাকে দুই হাতে শক্ত করে ধরে আরও তীব্রভাবে, আরও বন্যভাবে উনার ভেতরে নিজেকে সঞ্চালিত করতে লাগলাম।

উনার শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। উনার গলা দিয়ে একটা অস্ফুট, চাপা গোঙানির শব্দ বের হচ্ছে। আমার হাতের মুঠি আরও দ্রুত হলো। আমার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু , প্রতিটি শিরা টানটান হয়ে গেছে। আমার শ্বাস আটকে আসছে। কল্পনায় আনিকার শরীরটা আমার নিচে প্রবল তৃষ্ণায় কাঁপছে। উনার সেই আভিজাত্য, উনার সেই লেখিকা সত্তা— সব কিছু গলে গিয়ে এখন শুধু একটা তৃষ্ণার্ত নারীদেহ আমার সামনে উন্মুক্ত।"আনিকা..." আমি বাস্তবেও একটা চাপা গোঙানি দিয়ে উঠলাম।

আমার শরীরের ভেতর থেকে একটা তীব্র বৈদ্যুতিক শক যেন মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে এল। এবং ঠিক পরমুহূর্তেই এক প্রচণ্ড, বন্য স্খলনের মাধ্যমে আমার শরীরের সমস্ত জমানো উত্তেজনা, সমস্ত তৃষ্ণা ছিটকে বেরিয়ে এল। আমি হাঁপাতে লাগলাম। আমার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। হাতের তালুতে সেই আঠালো, উষ্ণ তরলের স্পর্শ।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মাথাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে রইল। কোনো চিন্তা নেই, কোনো দর্শন নেই, কোনো ইউক্রেন-রাশিয়ার বর্ডার নেই। শুধু এক ধরনের অদ্ভূত, শূন্য প্রশান্তি। কিন্তু এই প্রশান্তির আয়ু খুব কম। আস্তে আস্তে আমার শ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এল। আমি চোখ খুললাম। রাস্তার হলুদ আলোটা এখনো আমার বিছানায় পড়ে আছে। সিলিং ফ্যানটা আগের মতোই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করছে। আমার এক হাতে মোবাইলটা ধরা, স্ক্রিনে তখনো আনিকা নাওহারের সেই ওভারকোট পরা শালীন ছবিটা জ্বলজ্বল করছে।

হঠাৎ করে আমার ভেতরে এক ধরনের তীব্র অপরাধবোধ এবং একাকিত্ব ভর করল। পোস্ট-কয়টাল ট্রিস্টেস (Post-coital tristesse)— যৌন স্খলনের পর মানুষের মনে যে হঠাৎ করে একটা তীব্র বিষণ্ণতা নেমে আসে, এটা বিজ্ঞানেরই একটা প্রমাণিত বিষয়। কিন্তু আমার এই বিষণ্ণতাটা বিজ্ঞানের চেয়েও অনেক বেশি বাস্তব। আমি বাথরুমে গেলাম। নিজেকে পরিষ্কার করে বেসিনের আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম।

আমি এইমাত্র একজন বুদ্ধিমতী, অভিজাত এবং আমার চেয়ে যোজন যোজন দূরের এক বিবাহিতা নারীর সম্পূর্ণ শালীন একটা ছবি দেখে মাস্টারবেট করেছি। আমার নিজেকে খুব ক্ষুদ্র, খুব নোংরা এবং খুব একা মনে হলো।

মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য কী? নারী?

যদি তা-ই হয়, তবে সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আমি যে পথটা বেছে নিয়েছি, সেটা আমার নিজের কাছেই খুব করুণ মনে হচ্ছে। আমি জানি, আনিকা নাওহারের সাথে বাস্তবে আমার কোনোদিন এরকম কিছু হবে না। আমি কেবল অন্ধকারে শুয়ে কল্পনার ফানুস উড়াতে পারি।

আমি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে রুমে ফিরে এলাম। মোবাইলটা চার্জে লাগিয়ে আমি আবার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। বাইরে ঢাকা শহরটা ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাল সকালে আবার আমাকে উঠতে হবে, আবার সেই বিকল্প বাসে ঝুলতে হবে, আবার সেই অন্যের খবর অনুবাদ করতে হবে। আমি চোখ বন্ধ করলাম। আমার হাতের তালুতে তখনো আনিকা নাওহারের কল্পিত উষ্ণতা লেগে আছে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। এই শহরে আমার মতো বিরক্তিকর মানুষের বেঁচে থাকার জন্য হয়তো মাঝে মাঝে এরকম কিছু আদিম, নোংরা এবং গোপন কল্পনার প্রয়োজন হয়। নাহলে এই একঘেয়ে রুটিনের চাপে আমি হয়তো কবেই পাগল হয়ে যেতাম।
[+] 8 users Like Orbachin's post
Like Reply
#29
ভাই ক্ষমতার কফিন কি আর কন্টিনিউ করবেন না..?
Like Reply
#30
Valo hoche
Like Reply
#31
Very nice
Like Reply
#32
৭।

ফেব্রুয়ারি মাসের ষোলো তারিখ। সোমবার। আজ আমার ডে-অফ। সকাল থেকেই আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত ছটফটানি কাজ করছিল। ব্যাচেলর মানুষদের ছুটির দিন সাধারণত কাটে ঘুমিয়ে, মেসের মিলের হিসাব কষে, অথবা সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে জীবনের উদ্দেশ্য হাতড়ে। কিন্তু আজ আমার রুটিন ভিন্ন। আমি আজ বইমেলায় যাব।

বইমেলায় যাওয়ার পেছনে একটা খুব শক্ত লজিক আমি নিজেকে দিয়েছি। আমি একজন অনুবাদক। আমাকে প্রচুর পড়তে হয়। আমার কিছু ডিকশনারি কেনা দরকার। বিশেষ করে একটা ভালো স্প্যানিশ-টু-ইংলিশ ডিকশনারি, আর গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কয়েকটা বইয়ের নতুন অনুবাদ। এই লজিকটা এতটাই শক্ত যে, আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখে চোখ রেখে বললাম, “রাশেদ, তুমি নিতান্তই সাহিত্যের টানে মেলায় যাচ্ছ। এর বাইরে অন্য কোনো উদ্দেশ্য তোমার নেই।”

কিন্তু পাঠকদের কাছে আমি মিথ্যা বলতে চাই না। আমি জানি আমি কেন মেলায় যাচ্ছি।
আমি মেলায় যাচ্ছি আনিকা নাওহারকে দেখতে। ব্যাপারটা আসলে হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো সমাপতন নয়। গত কয়েকদিন ধরে আমি একটা অদ্ভুত রোগে ভুগছি। রোগের নাম— ‘ফেসবুক স্টকিং’। আনিকা নাওহার আমাকে উনার নাম্বার দিয়েছিলেন পাণ্ডুলিপি পাঠানোর জন্য। আমি অত্যন্ত স্মার্ট একটা ছেলের মতো সেই নাম্বারটা সেভ করেছিলাম, কিন্তু উনাকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর সাহস আমার হয়নি। ঢাকা শহরের পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের একজন অনুবাদক, ইংল্যান্ড প্রবাসী এক কোটিপতি আইটি ফার্মের মালকিনকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবে— এটা ভাবতেই আমার আঙুল কেঁপে যেত।

কিন্তু রিকোয়েস্ট না পাঠালেও
, ফেসবুকের মার্ক জাকারবার্গ সাহেব স্টকিং করার চমৎকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আনিকা নাওহারের প্রোফাইল লক করা নেই। পাবলিক প্রোফাইল। আমি দিনে অন্তত তিনবার সেই প্রোফাইলে ঢুঁ মারি। আজ সকালেই উনার প্রোফাইলে একটা পোস্ট দেখলাম। বাংলা একাডেমির বটতলার একটা ছবি দিয়ে উনি লিখেছেন— "আজকের বিকেলটা কাটবে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর স্টলে। প্রিয় পাঠকদের অপেক্ষায়।"

ব্যাস। আমার ডিকশনারি কেনার লজিকটা সাথে সাথেই জন্ম নিয়ে নিল। বিকেল চারটার দিকে আমি মেলায় পৌঁছালাম। বাংলা একাডেমি আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঝখানে যে ধুলাবালি আর মানুষের সমুদ্র, তার ভেতরে আমি নিজেকে সঁপে দিলাম। ঢাকা শহরের মানুষ এমনিতেই বই পড়ে কম, কিন্তু বইমেলায় আসে সবচেয়ে বেশি। মেলায় আসাটা আমাদের একটা বাৎসরিক তীর্থযাত্রার মতো হয়ে গেছে।

আমি লিটল ম্যাগ চত্বর ঘুরে, এদিক-ওদিক ধাক্কা খেয়ে কয়েকটা বই কিনলাম। একটা স্প্যানিশ ডিকশনারি, আর দু-চারটে অনুবাদের বই। বইগুলো একটা পলিথিনের ব্যাগে ঝুলিয়ে আমি খুব ধীর পায়ে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর স্টলের দিকে এগোতে লাগলাম। স্টলের কাছাকাছি আসতেই আমার বুকের ভেতর ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। আমি দূর থেকে স্টলটা দেখতে পাচ্ছিলাম। বেশ বড় স্টল। সামনে অনেক মানুষের ভিড়। সেলসের দুজন ছেলে দাঁড়িয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বই বিক্রি করছে।

আমি চোখ ঘুরিয়ে আনিকা নাওহারকে খুঁজলাম। হ্যাঁ, উনি আছেন। স্টলের ভেতরের দিকে, যেখানে একটু বসার জায়গা করা হয়েছে, সেখানে উনি বসে আছেন। উনার পরনে আজ একটা অফ-হোয়াইট রঙের শাড়ি, সাথে কালো রঙের স্লিভলেস ব্লাউজ। উনার খোলা চুলগুলো কাঁধের এক পাশ দিয়ে সামনে এসে পড়েছে। উনার হাতে একটা কফির কাপ। কিন্তু আমার চোখ আটকে গেল উনার সামনের চেয়ারটায়। সেখানে বসে আছেন কবি সৈকত আমিন।

সৈকত আমিন এই প্রজন্মের একজন বেশ জনপ্রিয় কবি। উনার কবিতার চেয়ে উনার গলার স্বর, উনার চাপদাড়ি, আর উনার কাঁধে ঝোলানো খদ্দরের ঝোলাব্যাগটা বেশি জনপ্রিয়। উনি অত্যন্ত রোমান্টিক ভঙ্গিতে আনিকার দিকে ঝুঁকে পড়ে কথা বলছেন, আর আনিকা উনার কথায় হেসে উঠছেন। দৃশ্যটা দেখার সাথে সাথে আমার পেটের ভেতর একটা অদ্ভুত মোচড় দিয়ে উঠল। অ্যাসিডিটি হলে মানুষের পেটে যেমন একটা জ্বালাপোড়া শুরু হয়, আমার ঠিক তেমন একটা জ্বালাপোড়া শুরু হলো। কিন্তু এটা গ্যাস্ট্রিকের জ্বালাপোড়া নয়, এটা জেলাসি। ঈর্ষা।

আমি অবাক হয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলাম, আমি জেলাস ফিল করছি কেন? আনিকা নাওহার আমার কে? কেউ না। উনি একজন বিবাহিত নারী, ইংল্যান্ডে থাকেন। আমি উনার বইয়ের একজন সামান্য প্রুফরিডার মাত্র। সৈকত আমিনের মতো প্রতিষ্ঠিত কবি উনার সাথে বসে কফি খাবে, গল্প করবে— এটাই তো স্বাভাবিক। আমি কেন ঈর্ষায় জ্বলে যাচ্ছি? মানুষের মন বড়ই অদ্ভুত। লজিক দিয়ে ঈর্ষাকে ঠেকিয়ে রাখা যায় না। আমার মনে হচ্ছিল, আমি এক্ষুনি গিয়ে সৈকত আমিনের দাড়িগুলো ধরে টান দিই, আর বলি— "ভাই, আপনি কবিতা লেখেন ভালো কথা, কিন্তু এত কাছে ঘেঁষে কথা বলছেন কেন?"
কিন্তু আমি তো আর রাস্তার গুণ্ডা নই, আমি একজন ভদ্র অনুবাদক। আমি স্টলের সামনে গিয়ে এমন একটা ভাব ধরলাম যেন আমি এই পৃথিবীতে আনিকা নাওহার বা সৈকত আমিন নামের কাউকে চিনিই না। আমি সেলসের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বললাম, "ভাই, মার্কেজের 'হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচ্যুড'-এর নতুন অনুবাদটা কি আপনাদের এখানে বের হয়েছে?"

আমি আনিকাদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলাম। একটা লাইন আমি অন্তত পাঁচবার পড়লাম, কিন্তু মাথার ভেতর কিছুই ঢুকল না। আমার পুরো মনোযোগ আমার পিঠের পেছনে।
হঠাৎ একটা পরিচিত , মোহনীয় কণ্ঠস্বর আমার কানে ভেসে এল।"আরে, এই রাশেদ সাহেব না?" আমি এমনভাবে চমকে ওঠার ভান করলাম, যেন আমি মেলায় এসে আনিকা নাওহারকে দেখে রীতিমতো আকাশ থেকে পড়েছি। "ওহ! আনিকা আপা! আপনি এখানে?"

আনিকা কফির কাপটা টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। "আমি তো থাকবই, আমার বইয়ের স্টল। কিন্তু আপনি মেলায়? আজকে তো আপনার অফিস থাকার কথা।" আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললাম, "আজ সোমবার। আমার ডে-অফ। ভাবলাম মেলা থেকে কিছু ডিকশনারি কিনে নিয়ে যাই।" আনিকা আমার দিকে এগিয়ে এলেন। উনার সেই চেনা দামি পারফিউমের গন্ধটা মেলা প্রাঙ্গণের ধুলাবালির গন্ধকে হারিয়ে দিয়ে আমার নাকে এসে ঢুকল।

সৈকত আমিনও উঠে দাঁড়ালেন। আনিকা আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। "সৈকত ভাই, এ হচ্ছে রাশেদ। আমার বইয়ের চমৎকার এডিটিং আর প্রুফরিডিংয়ের পেছনে এর অবদান অনেক।"

সৈকত আমিন আমার দিকে এমন একটা অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকালেন, যেন আমি মেলা প্রাঙ্গণের ঝাড়ুদার। উনি হাত মেলালেন না, শুধু মাথা নেড়ে বললেন, "ও আচ্ছা।"

তারপর আনিকার দিকে ফিরে বললেন, "আনিকা, আমি তাহলে উঠি। ওইদিকে আরেকটা স্টলে আমার পাঠকরা অপেক্ষা করছে। আমি কাল আপনাকে ফোন দেব।" আনিকা হাসিমুখে বিদায় দিলেন।

সৈকত আমিন চলে যাওয়ার পর আমার ভেতরের সেই অ্যাসিডিটিটা যেন জাদুর মতো গায়েব হয়ে গেল। আমার মনে হলো, আমি যেন কোনো অলিম্পিক গেমসে গোল্ড মেডেল জিতে গেছি।
আনিকা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "চলুন, মেলাটা একটু ঘুরে দেখি। এই স্টলে বসে থাকতে থাকতে আমার কোমরে ব্যথা হয়ে গেছে।" আমরা দুজন স্টল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম।
মেলায় প্রচুর ভিড়। আনিকা নাওহার আমার ঠিক পাশ ঘেঁষে হাঁটছেন। ভিড়ের কারণে মাঝে মাঝেই উনার শরীরের নরম স্পর্শ আমার বাহুতে এসে লাগছে। প্রতিটা স্পর্শে আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা বিদ্যুতের ঝটকা নেমে যাচ্ছে।

আমি খুব চেষ্টা করছি স্বাভাবিক থাকার। কিন্তু আমার চোখ বারবার অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। উনার অফ-হোয়াইট শাড়ির ফাঁক দিয়ে উনার ফর্সা, মেদহীন কোমরের একটা অংশ বারবার উঁকি দিচ্ছে। উনার হাঁটার ছন্দে উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতির নিখুঁত ঢেউগুলো এমনভাবে দুলছে যে, আমার মনে হচ্ছিল আমি যদি এখন অনুবাদ বাদ দিয়ে এই নারীকে নিয়ে কবিতা লিখতে বসতাম, তাহলে সৈকত আমিনকে দশ গোল দিয়ে দিতাম।

"রাশেদ, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?" আনিকার কথায় আমি চমকে উনার দিকে তাকালাম।
"জি, বলুন।"
"আপনি আমার সামনে এত জড়তা দেখাচ্ছেন কেন? আপনি তো খুব দারুণ কথা বলেন। সেদিন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে কী সুন্দর করে শূন্যতা, আইডেন্টিটি ক্রাইসিস নিয়ে কথা বললেন! তাহলে এখন এত কম কথা বলছেন কেন?"

আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। আমি উনাকে কীভাবে বোঝাব যে
, উনার শারীরিক এই অদ্ভুত মোহনীয়তা আমাকে কথা বলতে দিচ্ছে না? আমার মাথার ভেতর শুধু একটাই চিন্তা— এই নারীর শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি বাঁক এত নিখুঁত হয় কীভাবে? আমি গলা পরিষ্কার করে বললাম, "আসলে আমি এমনিতেই কথা কম বলি। আর ঢাকা শহরের এই ভিড়ের মধ্যে কথা বলতে গেলে এনার্জি নষ্ট হয়। আমি বরং আপনার কথা শুনতে বেশি পছন্দ করছি।"

আনিকা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "আপনি খুব ডিপ্লোম্যাটিক আনসার দেন। এনিওয়ে, আপনি কী বই কিনলেন?"  আমি আমার পলিথিনের ব্যাগটা উনার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। "কিছু ডিকশনারি আর অনুবাদের বই। আর হ্যাঁ... আমার নিজের একটা বইও ব্যাগে আছে। এটা আমার প্রথম দিকের একটা স্প্যানিশ অনুবাদ। খুব একটা চলেনি বাজারে। কপিটা মেলায় একটা পুরোনো স্টলে পেলাম, তাই নিজের জন্যই কিনে নিলাম।"

আনিকা বইটা আমার হাত থেকে নিলেন। বইটার নাম  'অন্ধকার গোলকধাঁধা'। উনি বইয়ের প্রচ্ছদটা হাত বুলিয়ে দেখলেন।"আমি এই বইটা নেব," আনিকা বললেন।
"আপনার পড়ে ভালো লাগবে না। অনুবাদ খুব কাঁচা।"
"তাতে কী? এটা আমার এডিটরের বই। আমি অবশ্যই পড়ব। দাঁড়ান, আমি একটা ছবি তুলি।"

আনিকা উনার আইফোনটা বের করলেন। "রাশেদ, বইটা আমাকে দেওয়ার মতো করে ধরে দাঁড়ান।" আমি উনার দিকে বইটা বাড়িয়ে ধরলাম। উনি এক হাতে বইটা ধরে, আরেক হাতে ক্যামেরা অন করে একটা ছবি তুললেন। ছবি তোলা শেষ করে উনি বললেন, "আমি এই ছবিটা ফেসবুকে আপলোড করে আপনার বইয়ের একটা সুন্দর বিজ্ঞাপন দিয়ে দেব। দেখবেন, আগামী বছর আপনার বইয়ের কাটতি বেড়ে গেছে।"

আমি হাসলাম।

"এবার বলুন," আনিকা আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, "আমার কাছ থেকে এত বড় একটা ফেভার পাচ্ছেন, বিনিময়ে আমাকে কী খাওয়াবেন?"
প্রশ্নটা শোনার সাথে সাথে আমার মাথার ভেতর আমার সেই বন্য, আদিম সত্তাটা চিৎকার করে উঠল— "আমার শরীর! আমি আমার শরীর খাওয়াতে চাই আপনাকে!"

কিন্তু আমি তো রাশেদ আহমেদ। আমাকে ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকতে হয়। আমি সেই আদিম চিৎকারটাকে গলার কাছে আটকে রেখে, অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং নিরীহ ভঙ্গিতে বললাম, "চলুন, আপনাকে মেলা প্রাঙ্গণের সবচেয়ে ভালো চা খাওয়াই। এখানে একটা স্টলে খুব চমৎকার মাল্টা চা বানায়।" আনিকা হাসলেন। "ডান। চলুন।"

আমরা চা খেলাম। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমি আমার সেই মাস্টারস্ট্রোকটা খেললাম। আমি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললাম, "আনিকা আপা, আপনি যখন ফেসবুকে ছবিটা আপলোড করবেন, তখন আমাকে একটু ট্যাগ করে দিয়েন। তাহলে আমার বন্ধুরাও দেখতে পাবে।"

আনিকা চায়ের কাপ নামিয়ে একটু ভ্রু কুঁচকে বললেন, "ট্যাগ করব কীভাবে? আপনি তো আমার ফ্রেন্ডলিস্টেই নেই।" আমি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, "ওহ, তাই তো! খেয়ালই ছিল না। আপনি বরং আমাকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিন। আমি অ্যাকসেপ্ট করে নেব।"

এটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম সেরা একটা ট্রিক। আমি নিজে রিকোয়েস্ট পাঠালে সেটা কেমন যেন ‘ডেসপারেট’ মনে হতো। কিন্তু আমি পরিস্থিতি এমনভাবে তৈরি করলাম যে উনি নিজেই আমাকে রিকোয়েস্ট পাঠাতে বাধ্য হলেন। আনিকা সাথে সাথেই ফোন বের করে আমার নাম সার্চ করলেন। "এই যে, রাশেদ আহমেদ। প্রোফাইল পিকচারে একটা কালো বিড়ালের ছবি। তাই না?"

"জি।"
"পাঠিয়ে দিয়েছি। অ্যাকসেপ্ট করুন।"

আমি ফোন বের করে রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করলাম। আমার ভেতরে তখন একটা দামামা বাজছে। আমি আনিকা নাওহারের ফ্রেন্ডলিস্টে ঢুকে গেছি। মেলা থেকে মেসে ফিরতে ফিরতে রাত নয়টা বেজে গেল।

আজ মেসে রহিমা খালা আসেননি। রাজু আর তুহিন মিলে বাইরে থেকে তেহারি কিনে এনেছে। আমি কোনোমতে একটু তেহারি মুখে গুঁজে নিজের রুমে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। সারাটা দিন আমার বেশ ভালো কেটেছে। কিন্তু রুমে ঢোকার পর থেকেই আমার ভেতর এক ধরনের অদ্ভুত, অস্বস্তিকর নেশার টান পড়তে শুরু করল। আমার মনে হচ্ছে আমার শরীরে অক্সিজেনের অভাব হচ্ছে। আমার হাতের তালু ঘামছে।

আমি জানি এই নেশাটা কীসের। আমি লাইটটা বন্ধ করে দিলাম। শুধু আমার টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলছে। আমি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হতে শুরু করেছে। আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়ালাম। ব্যাচেলরদের মেসে বাথরুম হলো একমাত্র পবিত্র এবং একান্ত নিজস্ব জায়গা। যেখানে পৃথিবীর কেউ আপনাকে ডিস্টার্ব করবে না।

আমি বাথরুমের দরজা ভেতর থেকে ছিটকিনি আটকে দিলাম। কমোডের ঢাকনাটা ফেলে তার ওপর বসলাম। বাথরুমের ভেতরের সাদা টাইলসগুলো একটু স্যাঁতস্যাঁতে, একটা ফিনাইলের গন্ধ ভাসছে বাতাসে। আমার আঙুলগুলো কাঁপছে। আমি ফেসবুক অ্যাপটা ওপেন করলাম। সোজা চলে গেলাম আনিকা নাওহারের প্রোফাইলে। আজ মেলায় তোলা সেই ছবিটা উনি আপলোড করেছেন। ক্যাপশনে লিখেছেন— "আমার প্রিয় প্রুফরিডার এবং চমৎকার একজন অনুবাদক রাশেদের সাথে বইমেলার এক পড়ন্ত বিকেল।" আমাকে ট্যাগ করা হয়েছে। ছবিতে শত শত লাইক আর কমেন্ট পড়ছে।
কিন্তু আমি ওই ছবির দিকে তাকালাম না। আমার উদ্দেশ্য ভিন্ন।

আমি উনার 'ফটোস' সেকশনে গেলাম। 'অ্যালবামস'-এ ক্লিক করলাম। উনার অনেকগুলো অ্যালবাম। 'লন্ডন ডায়েরিজ', 'বইমেলা ২০২৩', 'প্যারিস ভ্যাকেশন'। আমি স্ক্রল করতে করতে নিচের দিকে নামতে লাগলাম। আমার চোখ খুঁজছে এমন কিছু, যা আমার ভেতরের এই আদিম, বন্য নেশাটাকে শান্ত করতে পারে।

হঠাৎ একটা অ্যালবামে এসে আমার আঙুল থেমে গেল। অ্যালবামের নাম— 'বালি গেটঅ্যাওয়ে - ২০২১'। আমি অ্যালবামটা ওপেন করলাম। প্রথম ছবিটা দেখেই আমার মস্তিষ্কে যেন একটা শর্টসার্কিট হয়ে গেল। আমার চোখের তারা বড় হয়ে এল। ছবিটা একটা সুইমিংপুলের। আনিকা নাওহার পুলের নীল জলের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন। উনার পরনে একটা কালো রঙের টু-পিস সুইমস্যুট।

আমি আমার ট্রাউজারের বোতামটা খুলে ফেললাম। আমার ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা মোবাইলের স্ক্রিনের ওপর, আর আমার বাম হাত চলে গেল আমার ট্রাউজারের ভেতর। আমার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক জায়গায় এসে জমা হয়েছে। আমার সেই সুখের দণ্ডটি এখন চরম উত্তেজনায় পাথরের মতো কঠিন হয়ে আছে। আমি বাম হাত দিয়ে আমার সুখের দণ্ডটিকে মুঠি করে ধরলাম। আর ডান হাত দিয়ে ছবিগুলো একটা একটা করে সুইপ করতে লাগলাম।

দ্বিতীয় ছবি। আনিকা পুলের পাড়ে একটা ডেকচেয়ারে শুয়ে আছেন। উনার শরীর সম্পূর্ণ শুকনো। সূর্যের আলো উনার ফর্সা, মসৃণ ত্বকের ওপর ঠিকরে পড়ছে। কালো সুইমস্যুটের ওপরের অংশটা উনার ভরাট বক্ষদেশকে কোনোমতে আটকে রেখেছে। উনার দুই বক্ষের মাঝখানের সেই গভীর খাঁজটা আমার চোখের সামনে উন্মুক্ত। আমি চোখ বন্ধ করলাম। বাম হাতের মুঠিটা আরও শক্ত করে আমার সুখের দণ্ডের ওপর ওপর-নিচ করতে লাগলাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস বাথরুমের দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে।

আমি কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, আমি সেই বালির সুইমিংপুলে আনিকার ওপর ঝুঁকে আছি। উনার সেই ফর্সা, রোদ-পোহানো শরীরটা আমার নিচে। আমি উনার কালো সুইমস্যুটের ফিতেগুলো দাঁত দিয়ে টেনে খুলে ফেলছি। উনার সেই উন্মুক্ত, উদ্ধত বক্ষচূড়া দুটো আমার ঠোঁটের নিচে। ডান হাতে আমি আরেকটা ছবি সুইপ করলাম।

এবার আনিকা পুলের জলের ভেতর থেকে অর্ধেক শরীর তুলে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসছেন। উনার চুলগুলো ভিজে গলার কাছে লেপ্টে আছে। পানির কারণে সুইমস্যুটের কাপড়টা উনার শরীরের সাথে একদম মিশে গেছে, যার ফলে উনার নাভির গভীরতা এবং কোমরের নিচের সেই নিখুঁত বাঁকটা স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে। আমি কল্পনার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেলাম। আমার বাম হাতের গতি এখন একটা যন্ত্রের মতো হয়ে গেছে। ঘর্ষণের ফলে আমার হাতের তালুতে এক ধরনের উত্তাপ তৈরি হয়েছে।

আমি কল্পনায় আনিকাকে পুলের পানির ভেতরে জড়িয়ে ধরলাম। উনার ভেজা , পিচ্ছিল শরীরটা আমার শরীরের সাথে ঘষা খাচ্ছে। আমি উনার মসৃণ ঊরু দুটোর মাঝখানে আমার শরীরটাকে স্থাপন করেছি। উনার দুই হাত আমার গলা জড়িয়ে ধরে আছে। আমি পাগলের মতো উনার ঘাড়, উনার বুক, উনার ভেজা ঠোঁট চুম্বন করছি।"আনিকা..." আমি বাথরুমের নিস্তব্ধতায় ফিসফিস করে উনার নাম উচ্চারণ করলাম।

আমার কল্পনায় আনিকার চোখ দুটো কামনায় বুজে আসছে। উনি আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছেন, "রাশেদ... আরও... আরও..." আমার শরীরের সমস্ত স্নায়ু টানটান হয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। আমার তলপেটের নিচে একটা প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে। আমি জানি, আমি আর বেশিক্ষণ এই উত্তেজনা ধরে রাখতে পারব না। আমি আরেকটা ছবি সুইপ করলাম। এই ছবিতে আনিকা পুলের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছেন। পেছন থেকে তোলা ছবি। উনার সেই সুডৌল, আকর্ষণীয় নিতম্বের গঠনটা সম্পূর্ণ অনাবৃত প্রায়।

ছবিটা দেখার সাথে সাথেই আমার ভেতরের সেই বাঁধ ভেঙে গেল। একটা তীব্র, বৈদ্যুতিক স্রোত আমার মেরুদণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে এল। আমি মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিলাম। আমার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট, বন্য গোঙানি বের হয়ে এল। এবং সেই মুহূর্তেই আমার সুখের দণ্ড থেকে এক প্রচণ্ড, উষ্ণ স্খলনের মাধ্যমে আমার সমস্ত জমানো উত্তেজনা, সমস্ত নেশা, সমস্ত ফ্যান্টাসি ছিটকে বেরিয়ে এল বাথরুমের মেঝের ওপর।

আমি হাঁপাতে লাগলাম। আমার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। হাতের মুঠোটা শিথিল হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমার মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ শূন্য হয়ে গেল। কোনো ছবি নেই, কোনো কল্পনা নেই। আনিকা নাওহার নেই। তারপর ধীরে ধীরে সেই পরিচিত, তীব্র নিস্তেজতা এবং অপরাধবোধ আমাকে গ্রাস করতে শুরু করল।

পোস্ট-নাট ক্ল্যারিটি (
Post-nut clarity)।

আমি মোবাইলটা লক করে কমোডের ওপর রাখলাম। আমার বাম হাতে এবং বাথরুমের ফ্লোরে আমার কামনার চিহ্নগুলো একটা সাদা, আঠালো তরল হয়ে পড়ে আছে। আমি বাথরুমের আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। চোখগুলো লাল হয়ে আছে। চুল উষ্কখুষ্ক। আমি রাশেদ আহমেদ। একজন অনুবাদক। আমি একটু আগে বইমেলায় গিয়েছিলাম, অত্যন্ত ভদ্রভাবে সাহিত্যের কথা বলেছিলাম। আর এখন, মেসে ফিরে এসে বাথরুমের ভেতর এক বিবাহিতা নারীর ছবি দেখে একটা পশুর মতো মাস্টারবেট করলাম।

মানুষের দুটো রূপ থাকে। একটা সে সমাজকে দেখায়, আরেকটা সে বাথরুমের দরজা বন্ধ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখায়। আমি পানির ট্যাপটা ছেড়ে দিলাম। ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে করতে ভাবলাম, আমার এই ফ্যান্টাসির শেষ কোথায়? এই যে আমি আনিকা নাওহারকে নিয়ে এই অসম্ভব, নোংরা অথচ তীব্র উত্তেজনাময় কল্পনার জগতে ঢুকে পড়েছি— এখান থেকে আমি বের হবো কীভাবে? নাকি আমি বের হতে চাইই না?

আমি মুখ ধুয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম। রুমের ফ্যানটা এখনো ক্যাঁচক্যাঁচ করে ঘুরছে। আমি বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। আমার শরীরটা এখন সম্পূর্ণ নিস্তেজ। কোনো শক্তি নেই। কিন্তু আমার মাথার ভেতর একটা জিনিস খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমি আনিকা নাওহারের প্রেমে পড়িনি। আমি উনার শরীরের প্রেমে পড়েছি। উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর জ্যামিতির প্রেমে পড়েছি। আর এই প্রেমটা আমাকে ধীরে ধীরে একটা অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যে অন্ধকারের শেষ কোথায়, সেটা আমি নিজেও জানি না।
[+] 9 users Like Orbachin's post
Like Reply
#33
Khub sundor and deep dada.... Poroborti update er opekkhay
Like Reply
#34
Haha post nut clarity.... Darun laglo khub bhalo
Like Reply
#35
Fatafati
Like Reply
#36
(17-06-2026, 03:49 AM)Orbachin Wrote:
৭।

ফেব্রুয়ারি মাসের ষোলো তারিখ। সোমবার। আজ আমার ডে-অফ। সকাল থেকেই আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত ছটফটানি কাজ করছিল। ব্যাচেলর মানুষদের ছুটির দিন সাধারণত কাটে ঘুমিয়ে, মেসের মিলের হিসাব কষে, অথবা সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে জীবনের উদ্দেশ্য হাতড়ে। কিন্তু আজ আমার রুটিন ভিন্ন। আমি আজ বইমেলায় যাব।
লেখকের বাংলা ভাষার উপরে দখল নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। অত্যন্ত সুখপাঠ্য।
Like Reply
#37
Tongue 
একজন আমাকে ইনবক্সে এই গল্পের লিংক দিয়ে পড়তে বলল। একটানে পুরোটা পড়লাম এবং চমৎকার গল্প। আপনার ভাষার উপর দক্ষতা ভাল। গল্পের প্লট সুন্দর করে গড়ে উঠছে। রাশেদের মত ক্রিটিক করে বলতে গেলে গল্পের মূল চরিত্রের উপর কাফকার প্রভাব স্পষ্ট।  লেখাটা বন্ধ করবেন না।
[+] 1 user Likes কাদের's post
Like Reply
#38
৮।
ফেব্রুয়ারি মাসের ষোল তারিখের পর থেকে আমার জীবনের রুটিন, দর্শন এবং ব্যাংক ব্যালেন্স— এই তিনটিরই আমূল পরিবর্তন ঘটল। আমি সবসময় নিজেকে অতি হিসেবি, ম্যাড়ম্যাড়ে এবং রুটিন-বাঁধা মানুষ হিসেবে দাবি করে এসেছি। আমার কাছে জীবন একটা এক্সেল শিটের মতো। কোথায় কত খরচ হবে, কোথায় কতটুকু আবেগ দেখানো হবে, তার সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট ছক কাটা। কিন্তু আনিকা নাওহার নামের সেই ছত্রিশ বছর বয়সী, লন্ডন প্রবাসী, বিবাহিতা নারী আমার এক্সেল শিটে এমন  ভাইরাস ঢুকিয়ে দিলেন যে পুরো সিস্টেম ক্র্যাশ করে গেল। ১৬ তারিখ রাতের পর থেকে পরবর্তী এক সপ্তাহ আমি প্রতিদিন বইমেলায় যাওয়া শুরু করলাম।


আমার অফিসের ডিউটি শেষ হয় সন্ধ্যা ছয়টায়। কারওয়ান বাজার থেকে শাহবাগ হয়ে টিএসসি— এই রাস্তার জ্যাম সম্পর্কে যার ন্যূনতম ধারণা আছে
, সে জানে সন্ধ্যা ছয়টায় অফিস থেকে বের হয়ে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ বইমেলায় যাওয়ার কথা ভাববে না। বইমেলা বন্ধ হয় রাত সাড়ে আটটায়। বাসে উঠলে আমি মেলায় পৌঁছাব মেলা বন্ধ হওয়ার ঠিক পনেরো মিনিট আগে। তখন বই দেখা তো দূরের কথা, মেলার ধুলো ওড়ার দৃশ্য দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকবে না। তাই আমি আমার পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের জীবনে এক চরম বিলাসী সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি বাসের বদলে উবার মোটো (Uber Moto) ব্যবহার করা শুরু করলাম।

উবার মোটো ঢাকা শহরের এক অদ্ভুত আবিষ্কার। এই সার্ভিসের বাইকাররা নিজেদেরকে ঢাকা শহরের রাস্তায় ভ্যালেন্টিনো রসি বা মার্ক মার্কেজ মনে করেন। তাদের কাছে ফুটপাত
, ডিভাইডার, উল্টোপথ বলে কিছু নেই; তাদের লক্ষ্য একটাই— যেকোনো মূল্যে গন্তব্যে পৌঁছানো। সন্ধ্যা ছয়টা বাজার সাথে সাথে আমি এহসান ভাইয়ের ডেস্কের সামনে দিয়ে প্রায় দৌড়ে বের হতাম। এহসান ভাই অবাক হয়ে বলতেন, "কী ব্যাপার রাশেদ? এত তাড়া কীসের? বউ তো নাই যে বাসায় গিয়ে জবাবদিহি করতে হবে!"

আমি হাসিমুখে বলতাম
, "বউ নাই ভাই, কিন্তু মেলা আছে। মেলা শেষ হয়ে যাচ্ছে।"

নিচে নেমে একটা উবার মোটো ডাকতাম। বাইকার এলে আমি পেছনে বসে বলতাম
, "ভাই, আমার খুব তাড়া। সাড়ে ছয়টার ভেতর আমাকে টিএসসি পৌঁছাতে হবে। আপনি পারলে রকেটের মতো উড়ান।"

বাইকাররাও আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারত কি না কে জানে, তারা কারওয়ান বাজারের জ্যাম এড়িয়ে, কখনো ফুটপাতের ওপর দিয়ে, কখনো রিকশার চাকার গা ঘেঁষে এমনভাবে বাইক চালাত যে, আমার মনে হতো মেলায় যাওয়ার আগে আমি হয়তো সোজা ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে গিয়ে পৌঁছাব।

কিন্তু এসব মৃত্যুভয় আমার মাথায় তখন কাজ করত না। আমার মাথায় শুধু একটা ছবি ঘুরত— আনিকা নাওহার। যতই জ্যাম থাকুক, বাইকারদের কল্যাণে আমি প্রতিদিন ছয়টা চল্লিশ থেকে ছয়টা পঞ্চাশের ভেতর মেলায় ঢুকে পড়তাম। প্রথম দুই দিনের কথা বলি। ১৭ এবং ১৮ তারিখ। এই দুই দিন আমি সম্পূর্ণ স্টকার (Stalker) মোডে ছিলাম। মেলায় ঢুকেই আমি আমার শিকারি চোখের দৃষ্টি জ্বেলে আনিকা নাওহারকে খুঁজতাম। মেলা প্রাঙ্গণের হাজার হাজার মানুষ, ধুলো, বইয়ের স্টল— সবকিছুর ভিড়ে আমি অত্যন্ত সন্তর্পণে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে ঘুরতাম। আমার উদ্দেশ্য বই কেনা নয়, আমার উদ্দেশ্য ছিল দূর থেকে উনাকে দেখা।

১৭ তারিখে উনাকে দেখলাম অন্য একটা প্রকাশনীর স্টলে দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে একটা গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি। সাথে একটা কালো শাল। শীতের আমেজ তখনো পুরোপুরি যায়নি। আমি ভিড়ের আড়ালে, একটা বড় স্টলের পিলারের পেছনে দাঁড়িয়ে উনাকে দেখছিলাম। উনি কয়েকজন তরুণের সাথে কথা বলছিলেন। উনার হাসির সময় গালে যে একটা ছোট টোল পড়ে, সেটা আমি দূর থেকেই খেয়াল করলাম।

১৮ তারিখে উনার পরনে ছিল একটা নীল সালোয়ার কামিজ। শাড়ির বাইরে উনাকে এই প্রথম দেখলাম। সালোয়ার কামিজে উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬ জ্যামিতি আরও বেশি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। বুকের ওড়নাটা একপাশে আলতো করে রাখা। আমি সেদিন একটা লিটল ম্যাগের স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে উনাকে দেখলাম। আমি দেখলাম উনি কীভাবে কথা বলার সময় হাত নাড়েন, কীভাবে মাথার চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দেন।

এই দুই দিন আমি উনার সামনে যাইনি। আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত অপরাধবোধ আর সংকোচ কাজ করছিল। আমি তো উনার কেউ নই! আমি প্রতিদিন উনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে উনি কী ভাববেন? উনি তো আর বোকা নন। একজন নারী খুব সহজেই বুঝতে পারে কোন পুরুষ তাকে কোন দৃষ্টিতে দেখছে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম, যদি আমার চোখের সেই আদিম ক্ষুধাটা উনি ধরে ফেলেন!

কিন্তু ১৯ তারিখে এসে আমার সব লজিক, সব লজ্জা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সেদিন মেলায় ঢুকে আমি প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পুরো সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আর বাংলা একাডেমি চত্বর চষে ফেললাম, কিন্তু আনিকাকে কোথাও দেখলাম না। আমার বুকের ভেতর এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতা আর হাহাকার শুরু হলো। মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটাই বৃথা হয়ে গেল। ঢাকা শহরের এত জ্যাম ঠেলে, বাইকের পেছনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আসাটাই লস!

আমি আর পারলাম না। লজ্জার মাথা খেয়ে, আমার সেই অতি-ভদ্র, ম্যাড়ম্যাড়ে অনুবাদক সত্তাটাকে গলা টিপে মেরে আমি পকেট থেকে ফোন বের করলাম। উনার নাম্বারে ডায়াল করলাম। কয়েকবার রিং হওয়ার পর উনি ফোন ধরলেন। "হ্যালো?" উনার সেই মোহনীয় কণ্ঠস্বর। মেলা প্রাঙ্গণের কোলাহলের মাঝেও গলাটা খুব স্পষ্ট শোনাল। আমার গলা একটু শুকিয়ে গেল। আমি একটু কেশে বললাম

"হ্যালো আনিকা? আমি রাশেদ বলছিলাম।"

"আরে রাশেদ! কেমন আছেন আপনি? উপন্যাসের ড্রাফট তো আর কিছু পাঠালাম না, আপনিও তো কোনো খোঁজ নিলেন না।"
"এই তো, আছি ভালোই। ড্রাফট পাঠান, আমি দেখে দেব। আপনি কি এখন মেলায় আছেন?" আমি খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করার চেষ্টা করলাম।
"হ্যাঁ, মেলায় তো প্রতিদিনই আসি। এখন আছি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে। 'অক্ষরবৃত্ত' প্রকাশনীর স্টলের পেছনে যে কফি শপটা আছে, সেখানে বসে আছি। আপনি কি মেলায় নাকি?"
"জি, এইমাত্র এলাম। ভাবলাম আপনি থাকলে একটু দেখা করে যাই।"
"অফকোর্স! চলে আসুন এখানে। আমি আছি।"

ফোন রাখার পর আমার মনে হলো, আমি যেন এভারেস্ট জয় করে ফেলেছি। আমি দ্রুত পায়ে 'অক্ষরবৃত্ত' প্রকাশনীর স্টলের দিকে এগোলাম। পেছনে কফির দোকানে গিয়ে দেখলাম, আনিকা বসে আছেন। আজ উনার পরনে একটা ছাই রঙের শাড়ি, সাথে লাল ব্লাউজ। উনার সামনে টেবিলে কফির কাপ। আর উনার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে আছে এক তরুণ। ছেলেটার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কবি বা সাহিত্য সমালোচক টাইপ কেউ হবে। আমি গিয়ে উনাদের টেবিলের সামনে দাঁড়ালাম। 

"আনিকা," আমি ডাকলাম।  আনিকা মুখ তুলে আমাকে দেখে খুব সুন্দর করে হাসলেন। "আসুন রাশেদ। বসুন।" 
উনি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, "নিলয়, এ হচ্ছে রাশেদ। খুব ভালো একজন অনুবাদক। আর রাশেদ, এ হলো নিলয়। নতুন কবিতা লেখে।"  নিলয় আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যেন আমি একটা অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। আমি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আনিকার পাশের খালি চেয়ারটায় বসে পড়লাম। "তা রাশেদ, আজ কী বই কিনলেন?" আনিকা কফির কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

আমি একটা মিথ্যা কথা বললাম। "তেমন কিছু না। আজকে মূলত হাঁটতে এসেছি।" নিলয় নামের ছেলেটা আবার তার সাহিত্যিক আলোচনা শুরু করল। "আনিকা আপা, আমি যেটা বলছিলাম, লাতিন আমেরিকান ম্যাজিক রিয়ালিজমের যে ধারাটা, সেটা কিন্তু আমাদের বাংলা সাহিত্যে ওভাবে আসেনি। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ একটু চেষ্টা করেছিলেন..." আমি ছেলেটার ম্যাজিক রিয়ালিজম নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখালাম না। আমার ম্যাজিক রিয়ালিজম তখন আমার ঠিক পাশেই বসে আছে।

আমি আনিকার দিকে আড়চোখে তাকালাম। লাল রঙের স্লিভলেস ব্লাউজের হাতার কাছ দিয়ে উনার ফর্সা, মসৃণ বাহুটা উন্মুক্ত হয়ে আছে। শাড়ির আঁচলটা একটু সরে যাওয়ায় উনার কলারবোন বা কণ্ঠাস্থির নিখুঁত খাঁজটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমি আমার দৃষ্টিকে খুব সাবধানে উনার মুখের দিকে ধরে রাখার চেষ্টা করছি, কিন্তু আমার চোখ বারবার সেই গভীর খাঁজগুলোর দিকে পিছলে যাচ্ছে। আমি মুখে অত্যন্ত গম্ভীর একটা ভাব ধরে রাখলাম। যেন আমি নিলয়ের ম্যাজিক রিয়ালিজমের কথায় খুব মনোযোগ দিচ্ছি। "রাশেদ, আপনার কী মনে হয়?" আনিকা হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। "আসলে, ম্যাজিক রিয়ালিজম ব্যাপারটা তো আমাদের যাপিত জীবনের সাথেই মিশে আছে। এই যে আমরা ঢাকা শহরে এত যানজট, এত দূষণের মাঝেও বেঁচে আছি, স্বপ্ন দেখছি— এটাই তো সবচেয়ে বড় ম্যাজিক রিয়ালিজম।"

আমার এই অত্যন্ত সস্তা এবং রেডিমেড দার্শনিক উত্তরে আনিকা বেশ ইমপ্রেসড হলেন বলে মনে হলো। উনি হাসলেন। নিলয় বুঝতে পারল যে তার একক আধিপত্যে ভাগ বসেছে। সে কিছুক্ষণ পর ঘড়ি দেখে উঠে পড়ল। নিলয় চলে যাওয়ার পর আনিকা আমার দিকে একটু ঝুঁকে এলেন। উনার পারফিউমের ঘ্রাণটা এবার আরও তীব্রভাবে আমাকে আঘাত করল।

"আপনার কিন্তু খুব সেন্স অফ হিউমার আছে রাশেদ। আপনি চুপচাপ থাকলেও, আপনার কথায় একটা তীক্ষ্ণতা থাকে," আনিকা বললেন।

আমি মনে মনে বললাম, আমার তীক্ষ্ণতা এখন আমার কথার চেয়ে আমার চোখের দৃষ্টিতে বেশি।"চলুন, মেলাটা একটু ঘুরি," আনিকা উঠে দাঁড়ালেন। সেই দিন থেকে শুরু হলো আমার জীবনের নতুন এক অধ্যায়। ১৯ তারিখ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত, মেলার শেষ দিনগুলোর প্রতিটা বিকেল এবং সন্ধ্যা আমি আনিকার সাথে কাটালাম। আমি অফিসে কাজ শেষ করেই উবার মোটোতে উড়ে মেলায় আসতাম। আনিকাকে খুঁজে বের করতাম। তারপর আমরা দুজন মিলে মেলায় হাঁটতাম।

এই চার-পাঁচ দিন আমি আনিকার সাথে প্রচুর কথা বলেছি। সাহিত্য, অনুবাদ, লন্ডন শহরের আবহাওয়া, উনার আইটি ফার্মের ব্যবসা, আমার অনুবাদক জীবনের হতাশা— সব কিছু। আনিকা খুব ভালো শ্রোতা। উনি যখন কথা শোনেন, তখন চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকেন। উনার সেই বাদামি চোখের দৃষ্টিতে এমন একটা কিছু আছে, যা যেকোনো পুরুষকে মুহূর্তের জন্য হলেও সম্মোহিত করে ফেলতে পারে। 

কিন্তু আমার ভেতরের অবস্থাটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা যখন লিটল ম্যাগ চত্বরের পাশ দিয়ে হাঁটতাম, আমি উনাকে মার্কেজের অনুবাদ নিয়ে কথা বলতাম, আর আমার চোখ পড়ে থাকত উনার হাঁটার সময় কোমরের সেই নিখুঁত দুলুনির দিকে। আমরা যখন চা খেতাম, আমি উনাকে বলতাম কীভাবে স্প্যানিশ ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করতে গিয়ে কালচারাল গ্যাপ তৈরি হয়, আর আমার মন তখন ব্যস্ত থাকত উনার ঠোঁটের লিপস্টিকের রঙ আর উনার বক্ষদেশের সেই সুডৌল গঠনের পরিমাপ করতে।

আমার এই দ্বৈত সত্তা আমাকে মাঝে মাঝে নিজের কাছেই খুব অদ্ভুত বানাত। বাইরে থেকে আমি একজন নিরাসক্ত, বুদ্ধিদীপ্ত অনুবাদক, যে সাহিত্যের গভীরে ডুব দিতে পারে। আর ভেতরে আমি একজন ক্ষুধার্ত নেকড়ে, যে সুযোগ পেলেই এই অপরূপা নারীকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে চায়। কী সুন্দর, কী অপরূপ, কী স্বর্গীয় কিছু হতে পারে এই নারীর শরীর! আমি মাঝে মাঝে উনার পাশে হাঁটতে হাঁটতে আনমনা হয়ে যেতাম। উনার শাড়ির কুঁচির নিচ দিয়ে যখন উনার হাইহিল পরা পায়ের গোড়ালিটা একটু দেখা যেত, আমার মনে হতো আমি বুঝি শ্বাস নিতে ভুলে গেছি।

কিন্তু আমার এই স্বর্গীয় অনুভূতির একটা চড়া মূল্য আমাকে চোকাতে হচ্ছিল। এবং সেটা হলো আর্থিক মূল্য। আনিকা নাওহার লন্ডন প্রবাসী। উনার লাইফস্টাইল অনেক উঁচু। উনি মেলার ধুলোমাখা টং দোকানের চা খেতে পারেন না। উনাকে নিয়ে যেতে হয় মেলার বাইরের ভালো কোনো কফিশপে। সেখানে দুই কাপ কফি আর হালকা স্ন্যাকসের বিল আসে আটশ থেকে হাজার টাকা। শুধু তাই নয়। মেলা শেষে আনিকাকে রিকশায় তুলে দেওয়ার দায়িত্বটাও আমি নিজের কাঁধে নিয়ে নিলাম। আনিকা থাকেন উনার এক আত্মীয়ের বাসায়, ধানমন্ডিতে। আমি মেলার গেট থেকে রিকশা ডাকতাম।

"আমি দিয়ে আসছি আপনাকে," আমি বলতাম।

আনিকা প্রথম দিন একটু আপত্তি করেছিলেন। "আরে না না
, আপনি কেন যাবেন! আপনার তো মিরপুরে উল্টো রাস্তা।" আমি বীরদর্পে বলতাম, "তাতে কী? ঢাকা শহরে রাত আটটা আর রাত দশটা একই কথা। আমি নামিয়ে দিয়ে তারপর যাব।" রিকশায় আনিকার পাশে বসাটা ছিল আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমাঞ্চ। রিকশার ছোট্ট সিটে উনার শরীরের কিছুটা অংশ আমার শরীরের সাথে লেগে থাকত। ঢাকা শহরের স্পিডব্রেকার বা খানাখন্দে রিকশা যখন ঝাঁকুনি খেত, তখন উনার শরীরটা আরও একটু আমার দিকে হেলে পড়ত। আমি আমার বাম হাতটা রিকশার হুডের রড ধরে এমনভাবে রাখতাম, যেন আমার হাতের নিচেই আনিকার শরীরটা উত্তপ্ত আছে। উনার শ্যাম্পু করা চুলের ঘ্রাণ আর শ্যানেল পারফিউম মিলে রিকশার ভেতরের পরিবেশটাকে একটা স্বপ্নের মতো বানিয়ে দিত।

ধানমন্ডিতে উনাকে নামিয়ে দিয়ে, উনার রিকশা ভাড়া মিটিয়ে আমি যখন আরেকটা সিএনজি বা উবার নিয়ে মিরপুর ফিরতাম, তখন আমার পকেট কাঁদত। এই সাত দিনে আমার কী পরিমাণ খরচ হয়েছে, তার একটা হিসাব আমি মনে মনে করলাম। 

প্রতিদিন উবার মোটোতে কারওয়ান বাজার থেকে মেলায় যাওয়া— ২০০ টাকা।

আনিকাকে নিয়ে কফি শপে বসা— ১০০০ টাকা।
উনাকে ধানমন্ডি ড্রপ করার রিকশা ভাড়া— ১৫০ টাকা।
ধানমন্ডি থেকে আমার মিরপুর ফেরা— ৩০০ টাকা।
সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ষোলশো থেকে সতেরোশো টাকা।

সাত দিনে আমার খরচ হয়ে গেল প্রায় বারো হাজার টাকা! আমার সারা মাসের থাকা-খাওয়ার বাজেট পঁচিশ হাজার। আর আমি মাত্র সাত দিনে আমার বেতনের তিন ভাগের এক ভাগ একটা মেয়ের পেছনে উড়িয়ে দিলাম
, যে মেয়ে কোনোদিন আমার হবে না, যাকে আমি কোনোদিন ছুঁতেও পারব না! আমার সেই 'উমরাহ ফান্ড'-এর তিন লাখ টাকার স্বপ্নটা দূর থেকে আমাকে ভেঙচি কাটতে লাগল। বাবা-মায়ের পবিত্র উমরাহ ফান্ডের টাকা আমি একজন বিবাহিত নারীর সাথে কফি খেয়ে আর রিকশায় ঘুরে শেষ করে দিচ্ছি।

আমি কি পাগল হয়ে গেলাম?

হ্যাঁ
, আমি পাগলই হয়ে গিয়েছিলাম। লজিক, ভবিষ্যৎ, ব্যাংক ব্যালেন্স— কোনো কিছুই আমার এই উন্মাদনাকে আটকাতে পারছিল না। শুধু মেলায় দেখাই নয়, আমাদের যোগাযোগটা ভার্চুয়াল জগতেও ছড়িয়ে পড়ল। আমি মেসে ফিরে রাতে উনাকে মেসেজ দেওয়া শুরু করলাম। প্রথমে খুব প্রফেশনাল মেসেজ। 

আমি: "আজকের মেলাটা বেশ ভালো ছিল। আপনার নতুন বইয়ের রেসপন্স তো দেখলাম চমৎকার।" 
আনিকা: "সবই আপনাদের মতো পাঠকদের ভালোবাসা। আর হ্যাঁ
, থ্যাংকস ফর ড্রপিং মি হোম। আপনি না থাকলে রিকশা পাওয়াই মুশকিল হতো।"
আমি: "এটা কোনো ব্যাপার না। ঢাকা শহরের এই জ্যামে আপনাকে একা ছেড়ে দেওয়াটা ঠিক হতো না।"

ধীরে ধীরে মেসেজের ধরন পাল্টাতে লাগল।


আনিকা: "আপনার কি স্প্যানিশ সাহিত্য ছাড়া অন্য কিছু পড়তে ভালো লাগে না?"
আমি: "লাগে। তবে স্প্যানিশদের মতো প্যাশন অন্য সাহিত্যে কম। আচ্ছা, আপনি সব সময় এত পারফেক্ট শাড়ি পরেন কীভাবে? লন্ডনে তো নিশ্চয়ই শাড়ি পরার সুযোগ পান না।"
আনিকা (হাসির ইমোজি): "শাড়ি পরাটা একটা আর্ট রাশেদ। এটা প্র্যাকটিসের চেয়ে ভেতরের অনুভূতির ওপর নির্ভর করে। আর আপনাকে কে বলল আমি পারফেক্ট শাড়ি পরি?"
আমি: "আমার অনুবাদকের চোখ বলছে। আপনার আজকের নীল শাড়িটা আপনাকে খুব মানিয়েছিল।"

এই ধরনের টুকটাক প্রশংসামূলক কথা, একটু ফ্লার্ট, একটু বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপ— এভাবেই আমাদের রাতের চ্যাটগুলো দীর্ঘ হতে লাগল। আনিকাও বেশ এনজয় করছিলেন বলে মনে হলো। হয়তো ইংল্যান্ডের যান্ত্রিক জীবনে উনার বোরিং স্বামীর সাথে উনার এমন কোনো সাহিত্যিক বা ফ্লার্টিংয়ের স্পেস ছিল না। আমি উনার সেই স্পেসটা পূরণ করছিলাম। কিন্তু আমার ভেতরের গল্পটা তো শুধু চ্যাটিংয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না।

রাত বারোটা বা একটার দিকে আনিকা যখন মেসেজ দিতেন, "গুড নাইট রাশেদ, কাল দেখা হবে," তখন আমার আসল রাত শুরু হতো। আমি আমার মেসের বিছানা ছেড়ে বাথরুমে যেতাম। দরজাটা ভেতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে আটকে দিতাম। তারপর আমার মোবাইলটা খুলতাম। আনিকা নাওহারের ফেসবুক প্রোফাইল। আমার চোখের সামনে ভাসত আজ বিকেলের সেই দৃশ্য। রিকশায় আমার পাশে বসা আনিকার শরীর। উনার সেই লাল ব্লাউজের হাতা, উনার উন্মুক্ত কলারবোন।

আমি বাথরুমের নিস্তব্ধতায় আমার ট্রাউজার খুলে ফেলতাম। আমার ডান হাতের আঙুলগুলো মোবাইলের স্ক্রিনে আনিকার ছবিগুলোর ওপর বুলিয়ে যেত, আর আমার বাম হাত আমার নিজের শরীরের সেই চরম উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঘর্ষণ তৈরি করত। আমার কল্পনার কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না। আমি কল্পনায় আনিকার সেই অফ-হোয়াইট শাড়িটা উনার শরীর থেকে খুলে ফেলতাম। উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর নিখুঁত শরীরটাকে আমি আমার দুই হাতের মুঠোয় পিষে ফেলতাম।

আমি কল্পনায় দেখতাম , আনিকা আমার এই স্যাঁতস্যাঁতে বাথরুমের ফ্লোরে শুয়ে আছেন। উনার চোখে সেই শান্ত, বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টি নেই। সেখানে এখন বন্য কামনার আগুন। আমি উনার দুই পায়ের মাঝখানে নিজেকে স্থাপন করতাম। উনার ঠোঁট দুটো কামড়ে ধরে উনার শরীরের গভীরে প্রবেশ করতাম।"রাশেদ... উমমম..." কল্পনার আনিকা আমার কানের কাছে গোঙাতেন।

আমি আমার হাতের গতি আরও বাড়াতাম। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে যেত। আমার মনে হতো, আমি যেন আমার সমস্ত জমানো হতাশা, আমার পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের গ্লানি, আমার একঘেয়ে জীবনের বিরক্তি— সব কিছু উনার শরীরের ভেতর ঢেলে দিয়ে নিজেকে মুক্ত করছি। একটা তীব্র, বৈদ্যুতিক স্রোত আমার মেরুদণ্ড বেয়ে উঠত। আমি মাথা পেছনের দিকে হেলিয়ে একটা অস্ফুট শব্দ করতাম। এবং পরমুহূর্তেই আমার শরীরের সমস্ত জমানো উত্তেজনা একটা উষ্ণ, আঠালো স্খলনের মাধ্যমে বাথরুমের মেঝের ওপর আছড়ে পড়ত। তারপর আবার সেই নিস্তেজতা। সেই পোস্ট-কয়টাল বিষণ্ণতা।

আমি পানির ট্যাপ ছেড়ে নিজেকে পরিষ্কার করতাম। আয়নায় নিজের লাল হয়ে থাকা চোখগুলোর দিকে তাকাতাম। আমি জানতাম, আমি একটা ইল্যুশনের মধ্যে বাস করছি। আনিকা নাওহার আমার কাছে একটা অলীক ফ্যান্টাসি ছাড়া আর কিচ্ছু না। আমি আমার সারা মাসের জমানো টাকা খরচ করে উনাকে রিকশায় পৌঁছে দিচ্ছি, উনাকে কফি খাওয়াচ্ছি, উনার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিক কথা বলছি— আর তার বিনিময়ে আমি বাথরুমের মেঝেতে দাঁড়িয়ে মাস্টারবেট করে আমার অবৈধ্য সুখ খুঁজে নিচ্ছি। এর চেয়ে প্যাথলজিক্যাল, এর চেয়ে করুণ জীবন আর কী হতে পারে? কিন্তু তবুও আমি এই চক্র থেকে বের হতে পারছিলাম না। ড্রাগ অ্যাডিক্টরা যেমন জানে যে ড্রাগ তাদের ধ্বংস করে দিচ্ছে, তবুও তারা সেটা ছাড়ে না— আমার অবস্থাও ঠিক তেমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আনিকা নাওহার আমার কাছে একটা কোকেনের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। উনার শরীরের ওই অদ্ভুত মোহনীয়তা, উনার ওই আভিজাত্য আমাকে নেশাগ্রস্ত করে ফেলেছিল।

আমি রুমে ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়তাম। আগামীকাল আবার অফিস। আবার সেই বিকল্প বাস। আবার এহসান ভাই। কিন্তু সন্ধ্যা হলেই আমি আবার উবার মোটো ডাকব। আবার সেই রকেটের মতো উড়ে মেলায় যাব। আবার সেই আনিকা নাওহারের পাশে হাঁটব। কারণ, মানুষের জীবন তো মাত্র একটাই। আর এই একঘেয়ে জীবনে যদি কোনো রূপবতী নারী কিছুদিনের জন্য হলেও একটা মরিচীকার মতো এসে দাঁড়ায়, তবে সেই মরিচীকার পেছনে দৌড়াতেও এক ধরনের অদ্ভুত, ধ্বংসাত্মক আনন্দ আছে। আমি রাশেদ আহমেদ। আমার এই ধ্বংসের পথে হাঁটা কেবল শুরু হয়েছে।
[+] 7 users Like Orbachin's post
Like Reply
#39
Great update once again
Like Reply
#40
চমৎকার লিখেছেন ❤️
আশা করি নিয়মিত আপডেট পাবো।
Like Reply




Users browsing this thread: 3 Guest(s)