Yesterday, 05:56 AM
Darun
|
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
|
|
Yesterday, 05:56 AM
Darun
Yesterday, 07:01 AM
গল্পটা পড়ে বেশ ভালোই লাগলো, আপনার লেখার হাত অসম্ভব সুন্দর। আপনার গল্পের পরবর্তী অংশ পড়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রইলাম।
Yesterday, 01:46 PM
Welcome back fire asar jonno dhonnobad.... Khub bhalo laglo dekhe purano lekhokera fire aschen...... Update khub bhalo hoche chalia jan...
Today, 12:52 AM
৫।
ঢাকা শহরে সময় কখনোই ঘড়ির কাঁটার নিয়মে চলে না। এখানে সময়ের নিজস্ব একটা আপেক্ষিকতা আছে। আইনস্টাইন যদি সুইজারল্যান্ডে না জন্মে ঢাকায় জন্মাতেন, তাহলে থিওরি অফ রিলেটিভিটি আবিষ্কার করার জন্য উনাকে ট্রেনের উদাহরণ দিতে হতো না; মিরপুর থেকে কারওয়ান বাজার রুটের যেকোনো লোকাল বাসে একবার উঠিয়ে দিলেই উনি মহাকর্ষ আর সময়ের সব সূত্র এক নিমেষে বুঝে যেতেন।
আমার অফিসের অফিশিয়াল সময় হলো সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা। কাগজে-কলমে আট ঘণ্টার ডিউটি। কিন্তু ঢাকায় আট ঘণ্টার কোনো অফিস নেই। কারওয়ান বাজার থেকে মিরপুর দশ নাম্বারের দূরত্ব খুব বেশি না হলেও, এই পথটুকু পাড়ি দিতে আমার প্রতিদিন গড়ে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। যাওয়ার সময় এক ঘণ্টা, আসার সময় এক ঘণ্টা। অর্থাৎ, আমার আট ঘণ্টার অফিস আসলে আমার জীবনের দশটা ঘণ্টা গিলে খায়। দিনের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দশ ঘণ্টা যদি অফিসে আর রাস্তায় চলে যায়, আট ঘণ্টা ঘুমে যায়, তবে একজন ব্যাচেলর মানুষের নিজের জন্য বাঁচার সময় থাকে মাত্র ছয় ঘণ্টা। এই ছয় ঘণ্টাতেই তাকে বাজার করতে হয়, কাপড় ধুতে হয়, বাবা-মায়ের সাথে ফোনে কথা বলতে হয়, আর জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে হতাশ হতে হয়। আজ বারো তারিখ। ফেব্রুয়ারি মাস। ফেব্রুয়ারি মাস মানেই ঢাকা শহরে একটা হালকা বসন্তের আমেজ থাকার কথা। শিমুল-পলাশ ফুটুক বা না ফুটুক, অন্তত বাতাসে একটা শুকনো, ঝিরঝিরে ভাব থাকে। কিন্তু আজ প্রকৃতিও যেন ঢাকা শহরের ট্রাফিক জ্যামের মতো পাগল হয়ে গেছে। অফিস থেকে বের হয়েছি তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বাজে। কারওয়ান বাজারের সিগন্যালে দাঁড়িয়ে বিকল্প বাসের জন্য অপেক্ষা করছি, হঠাৎ আকাশ কালো করে মেঘ করে এল। কোনো পূর্বাভাস নেই, কোনো প্রস্তুতি নেই— ঝুপ করে একপশলা ভারী বৃষ্টি নেমে গেল। ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে এই বৃষ্টির কোনো বৈজ্ঞানিক বা ভৌগোলিক লজিক আমার জানা নেই। কোথা থেকে এল এই বৃষ্টি, কীভাবে এল, খোদাই জানে! তড়িঘড়ি করে একটা বাসে উঠে পড়লাম। বাসের ভেতরটা গাদাগাদি ভিড়। আমি কোনোমতে জানালার পাশে একটা সিট পেয়ে গেলাম, যেটা ঢাকা শহরে রীতিমতো লটারি পাওয়ার সমতুল্য। বাস চলতে শুরু করল। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। বাসের অন্য যাত্রীরা হুড়মুড় করে কাঁচের জানালাগুলো টেনে বন্ধ করে দিচ্ছে, যেন বাইরের এক ফোঁটা পানি ভেতরে এলে তারা গলে যাবে। আমার পাশে বসা ভদ্রলোকও তার পাশের জানালাটা বন্ধ করার জন্য হাত বাড়ালেন। আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, "ভাই, জানালাটা একটু খোলা থাক না।" ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে বললেন, "বলেন কী ভাই? গায়ে ছিটা লাগবে তো! ফাল্গুন মাসের বৃষ্টি, গায়ে লাগলে জ্বর আসবে।" আমি শান্ত গলায় বললাম, "জ্বর আসলে প্যারাসিটামল খেয়ে নেব। কিন্তু এই অসময়ের বৃষ্টি তো আর রোজ পাব না।" ভদ্রলোক আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি পাবনা মেন্টাল হাসপাতাল থেকে এইমাত্র পালিয়ে বাসে উঠেছি। তিনি বিরবির করে কী যেন একটা বললেন, কিন্তু জানালাটা বন্ধ করলেন না। আমি জানালার কাঁচটা অর্ধেক খুলে দিলাম। বৃষ্টির ছাঁট সরাসরি এসে আমার মুখে-বুকে লাগতে শুরু করল। বাতাসে একটা অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ। ধুলোমাখা ঢাকা শহরের বুকে যখন প্রথম বৃষ্টি পড়ে, তখন মাটি আর ধুলো মিশে এই ঘ্রাণটা তৈরি হয়। আমার শার্টের হাতা ভিজে যাচ্ছে, চশমার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা জমছে। কিন্তু আমার অদ্ভুত এক ধরনের ভালো লাগা শুরু হলো। মনে হলো, এই যে প্রতিদিন পঁচিশ হাজার টাকার বাজেটে জীবন পার করা, নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ নিয়ে টেনশন করা, আর ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে কিম জং উন বা জেফ বেজোসের খবর অনুবাদ করা— এই সমস্ত যান্ত্রিকতার বাইরে আমি আসলে প্রকৃতিরই একটা অংশ। বৃষ্টির এই শীতল ফোঁটাগুলো যেন আমার একঘেয়ে জীবনের ওপর একটা সতেজ প্রলেপ বুলিয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টির কথা ভাবতে ভাবতেই আমার মাথায় এল— ফেব্রুয়ারি মাস তো অর্ধেক চলে গেল! বইমেলা চলছে। আমি এখনো একদিনও বইমেলায় যাইনি। মিরপুরের মেস আর কারওয়ান বাজারের অফিস— এই চক্রের বাইরে বের হওয়া হয়নি। ঠিক করলাম, আগামী সোমবার যাব। সোমবার আমার ডে-অফ। ১৬ই ফেব্রুয়ারি পড়বে দিনটা। একা একা বাংলা একাডেমির মাঠে ঘুরব। কিছু বই কেনা দরকার। কয়েকটা ভালো ইংরেজি থেকে বাংলা ডিকশনারি, আর আমার প্রিয় দুজন স্প্যানিশ লেখকের অনুবাদ। বইমেলার কথা ভাবতে গিয়েই আমার আরেকটা কথা মনে পড়ল। এই মাসের শেষে ছুটি নিয়ে কয়েকদিনের জন্য গ্রামের বাড়ি নওগাঁ যাব। হাতে তিন দিন ছুটি জমিয়ে রাখব। বাবা-মাকে দেখে আসা দরকার। উমরাহ করানোর টাকা তো জমাতে পারছি না, অন্তত সশরীরে গিয়ে মুখটা তো দেখিয়ে আসি! বইমেলা আর বইয়ের চিন্তার সুতোর টানটা হঠাৎ করেই আমার মস্তিষ্কের আরেকটা প্রকোষ্ঠে গিয়ে ধাক্কা খেল। বইমেলা মানেই বই, বই মানেই প্রকাশনী, আর প্রকাশনী মানেই আনিকা নাওহার। আজ বিকেলের ঘটনা। আমি নিউজরুমে বসে রয়টার্সের একটা খবর অনুবাদ করছিলাম। নিউজটা ছিল ইউরোপের কোনো এক দেশের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে। অত্যন্ত বোরিং একটা কাজ। আমাদের নিউজ রুমের এক কোণায় একটা টেলিভিশন সবসময় চালু থাকে। সাউন্ড মিউট করা থাকে, শুধু স্ক্রিনে নিউজ চ্যানেলগুলো চলতে থাকে। মাঝে মাঝে ব্রেকিং নিউজ এলে এহসান ভাই চিল্লিয়ে ওঠেন, "ওই রাশেদ, ভলিউমটা দে তো!" আজ বিকেলে আমি ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে একটু ঘাড় মটকাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ টিভি স্ক্রিনের দিকে আমার চোখ আটকে যায়। টেলিভিশনে তখন ‘বইমেলা প্রসঙ্গ’ নামের একটা লাইভ প্রোগ্রাম হচ্ছিল। একজন উপস্থাপিকা বইমেলার কোনো একটা স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে লেখকদের ইন্টারভিউ নিচ্ছিলেন। আমি দেখলাম, টিভি স্ক্রিনে আনিকা নাওহার দাঁড়িয়ে আছেন। নিউজ রুমের কোলাহল, এহসান ভাইয়ের চিল্লাচিল্লি, মামুনের কি-বোর্ডের খটখট শব্দ— সবকিছু যেন আমার কান থেকে মুছে গেল। আমি একদৃষ্টে টিভির দিকে তাকিয়ে রইলাম। স্ক্রিনের নিচে লেখা— ‘আনিকা নাওহার, প্রবাসী কবি ও ঔপন্যাসিক’। ইন্টারভিউটা ছিল মাত্র তিন-চার মিনিটের। টিভিতে সাউন্ড মিউট করা ছিল বলে আমি উনার কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আমার শোনার দরকারও ছিল না। আমি শুধু দেখছিলাম। কী অপূর্ব দেখাচ্ছিল উনাকে! পরনে একটা হালকা ছাই রঙের জামদানি শাড়ি, যার পাড়ে চিকন রূপালি সুতোর কাজ। শাড়িটা উনার শরীরের সাথে এমনভাবে লেপ্টে ছিল যেন ওটা কোনো কাপড় নয়, বরং উনার ব্যক্তিত্বেরই একটা সম্প্রসারিত অংশ। কাঁধের ওপর দিয়ে এলিয়ে পড়া আঁচল, আর খোলা চুলগুলো বাতাসে হালকা উড়ছে। উনার সেই বিখ্যাত শান্ত, স্নিগ্ধ হাসিটা স্ক্রিন ভেদ করে যেন সোজা আমার ডেস্কে এসে পড়ছিল। উপস্থাপিকা যখন কোনো প্রশ্ন করছিলেন, উনি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন এবং তারপর উত্তর দেওয়ার সময় উনার ঠোঁটের নিখুঁত নড়াচড়া আর চোখের বুদ্ধিমত্তার দীপ্তি— সবকিছু মিলিয়ে উনাকে একটা চলন্ত পেইন্টিংয়ের মতো মনে হচ্ছিল। আমি মনে মনে ভাবলাম, একটা ছত্রিশ বছর বয়সী নারী কীভাবে এত সুন্দর হতে পারে! উনার সেই ৩৬-২৮-৩৬-এর শারীরিক জ্যামিতি ক্যামেরার লেন্সেও একটুও ম্লান হয়নি; বরং টিভি স্ক্রিনে উনাকে আরও বেশি রহস্যময়ী, আরও বেশি আকর্ষণীয় লাগছিল। মাত্র তিন-চার মিনিট। তারপর ক্যামেরা ঘুরে গেল অন্য কোনো লেখকের দিকে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে ইউরোপের মুদ্রাস্ফীতিতে ফিরে গেলাম। কিন্তু আমার মাথার ভেতরে ওই ছাই রঙের জামদানি শাড়িটা আটকে রইল। বাস যখন মিরপুর দশ নাম্বারে পৌঁছাল, তখনো ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছে। আমি বাস থেকে নেমে মেসে হাঁটা ধরলাম। আমার কাছে ছাতা নেই। আমি ভিজতে ভিজতেই এগোলাম। মেসে যখন পৌঁছালাম, তখন আমি পুরোপুরি কাকভেজা। শার্ট শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, চুল থেকে পানি ঝরছে। মেসের দরজা খুলল তুহিন। আমাকে এই অবস্থায় দেখে সে চোখ কপালে তুলে বলল, "হোয়াট হ্যাপেনড ব্রাদার? ইউ লুক লাইক আ ওয়েট ক্যাট! এই অসময়ে বৃষ্টি কই পেলেন?" আমি জুতো খুলতে খুলতে বললাম, "আকাশে মেঘ ছিল, সেখান থেকেই পেয়েছি। বৃষ্টি কি আমি পকেটে করে এনেছি নাকি?" তুহিন মাথা নেড়ে বলল, "ভেরি ব্যাড ওয়েদার। আমার আইইএলটিএস-এর লিসেনিং মক টেস্ট ছিল, বৃষ্টির শব্দের জন্য কনসেন্ট্রেশন ব্রেক হয়ে গেছে।" আমি তুহিনকে পাশ কাটিয়ে আমার রুমে গেলাম। ভেজা কাপড়গুলো ছেড়ে একটা শুকনো টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরলাম। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে অদ্ভুত এক ধরনের ক্লান্তি ভর করল শরীরে। বৃষ্টির পানিতে ভেজার কারণে শরীরটা একটু শীত শীত করছে, আবার ভেতর থেকে একটা ঘুম ঘুম ভাবও আসছে। রহিমা খালা রান্না করে টেবিলে খাবার ঢেকে রেখে গেছেন। আমি আর দেরি না করে ডাইনিংয়ে গিয়ে খেয়ে নিলাম। মেন্যু সেই চিরচরিত— পাতলা ডাল, ডিম ভুনা আর আলুর ভর্তা। কিন্তু আজ অমৃতের মতো লাগল। খাওয়া শেষ করে আমি বিছানায় এসে শুলাম। আজ আর কোনো বইয়ের প্রুফ দেখার কাজ নেই। চন্দ্রবিন্দুর মতিন সাহেবকে গতকালই সব বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। আনিকা নাওহারের উপন্যাসের প্রথম তিন চ্যাপ্টারও পড়া শেষ। ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে আমার কিছু অবজারভেশন আমি উনাকে হোয়াটসঅ্যাপে জানিয়ে দিয়েছি। উনি শুধু একটা 'থাম্বস আপ' ইমোজি দিয়ে রিপ্লাই দিয়েছিলেন। বাইরে বৃষ্টির শব্দটা একটানা বেজেই চলেছে। টিনের চাল হলে বৃষ্টির শব্দটা তীক্ষ্ণ হতো, কিন্তু ঢাকার কংক্রিটের ছাদের ওপর বৃষ্টির শব্দটা একটা গোঙানির মতো শোনায়। আমি চোখ বন্ধ করলাম। ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যেতে আমার খুব একটা সময় লাগল না। কিন্তু সেই রাতে আমি যে স্বপ্নটা দেখলাম, তা আমার অনুবাদক জীবনের সমস্ত লজিক, সমস্ত ফ্যাক্ট আর সমস্ত বাস্তবতাকে চুরমার করে দিল। স্বপ্নটা শুরু হলো খুব রিয়েলিস্টিক একটা সেট-আপ দিয়ে। আমি দেখলাম, আমি বাংলা একাডেমির বইমেলায় দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু মেলাটা স্বাভাবিক নেই। আকাশ ভেঙে ভয়ানক বৃষ্টি নামছে। চারিদিকে একটা চরম বিশৃঙ্খলা আর আতঙ্ক। লেখক, পাঠক, দর্শনার্থীরা সবাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াচ্ছে। প্রকাশকরা স্টলের ভেতর থেকে বড় বড় নীল আর সাদা রঙের পলিথিন বের করে তাদের হাজার হাজার টাকার বই ঢাকার চেষ্টা করছে। চারদিকে শুধু চিৎকার, "বই ভিজে গেল! পলিথিন দাও! ত্রিপল টানাও!" আমি মেলার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশের এই ভয়াবহ হুড়োহুড়ির মাঝে আমি একদম স্থির। হঠাৎ আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলাম। আমার পাশ দিয়ে হাজার হাজার মানুষ দৌড়াচ্ছে, কিন্তু কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। আমি যেন এই পৃথিবীতে থেকেও নেই। আমি একটা অদৃশ্য সত্তা। তার চেয়েও বড় যে ধাক্কাটা আমি খেলাম, তা হলো নিজের দিকে তাকিয়ে। আমি দেখলাম, আমার শরীরে কোনো কাপড় নেই। আমি সম্পূর্ণ নগ্ন। বাস্তব জীবনে এরকম পরিস্থিতিতে পড়লে যেকোনো মানুষের লজ্জায়, ভয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু স্বপ্নে আমার ভেতরে কোনো লজ্জা কাজ করল না। বরং, আমার মনে হলো এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থা। এই যে আকাশ থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, এই বৃষ্টি আমার সম্পূর্ণ অনাবৃত শরীরকে ধুয়ে দিচ্ছে। আমার মনে হচ্ছিল, এই বৃষ্টি যেন শুধু পানি নয়, এটা একটা পবিত্র জলধারা। ঢাকা শহরের পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের রাশেদের গায়ে যে ক্লান্তি, যে হতাশা, যে একঘেয়েমি জমেছিল— এই বৃষ্টি যেন আমার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ থেকে সেই ময়লাগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। আমি যেন আদিম যুগের কোনো এক পবিত্র মানব, যে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে গেছে। আমি চোখ বন্ধ করে মুখটা আকাশের দিকে তুলে দুই হাত প্রসারিত করলাম। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা আমার বুকে, পেটে, ঊরুতে এসে আছড়ে পড়ছে। এক অদ্ভুত আদিম শান্তি। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম, কেউ একজন আমার প্রসারিত ডান হাতটা আলতো করে ধরল। স্পর্শটা এতই জীবন্ত আর এতই কোমল ছিল যে আমি চমকে চোখ খুললাম। আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আনিকা নাওহার। চারপাশে তখনো পলিথিন টানানোর যুদ্ধ চলছে, কিন্তু আমাদের চারপাশে যেন একটা অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি হয়ে গেছে, যেখানে শুধু আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। আমি অবাক হয়ে উনার দিকে তাকালাম। এবং আমার স্নায়ুগুলো যেন মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে গেল। আনিকা নাওহারও সম্পূর্ণ অনাবৃত। তাঁর শরীরে এক সুতোও কোনো আবরণ নেই। আমি একজন অনুবাদক। আমি শব্দের কারিগর। কিন্তু উনাকে সেই অবস্থায় দেখে আমার মনে হলো, পৃথিবীর কোনো ভাষার কোনো ডিকশনারিতে এমন কোনো শব্দ তৈরি হয়নি, যা দিয়ে উনার সেই মুহূর্তের রূপকে বর্ণনা করা যায়। বৃষ্টির পানি উনার মাথা থেকে শুরু করে সারা শরীরে গড়িয়ে পড়ছে। উনার ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর লেপ্টে আছে। আমি উনার শারীরিক গঠনের যে জ্যামিতির কথা ভেবেছিলাম, আজ তা কোনো কাপড়ের আড়াল ছাড়া, সম্পূর্ণ আদিম এবং নিখুঁতরূপে আমার চোখের সামনে উপস্থিত। উনার কাঁধের গড়নটা যেন কোনো গ্রিক ভাস্করের নিপুণ হাতে খোদাই করা মার্বেল পাথর। বৃষ্টির পানি সেই কাঁধ বেয়ে নেমে আসছে উনার সুডৌল, পূর্ণাঙ্গ এবং উদ্ধত বক্ষদেশের ওপর। পানিগুলো সেখানে বাধা পেয়ে দুই ভাগ হয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ছে। উনার নিটোল পেট, নাভির গভীরতা এবং তারপর সেই সরু কোমর— সবকিছু মিলিয়ে এক অদ্ভুত নান্দনিকতার সৃষ্টি করেছে। কোমরের নিচ থেকে উনার নিতম্বের বাঁকটা এতই নিখুঁত আর এতই মসৃণ যে, মনে হচ্ছিল প্রকৃতি তার সমস্ত শিল্পবোধ দিয়ে এই নারীদেহটি নির্মাণ করেছে। উনার ফর্সা ত্বকের ওপর বৃষ্টির পানির ফোঁটাগুলো মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করছিল। ঠান্ডায় উনার শরীরের রোমকূপগুলো সামান্য জেগে উঠেছে, আর বক্ষচূড়া দুটো সামান্য দৃঢ় হয়ে আছে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সম্পূর্ণ নগ্নতার মাঝে কোনো ধরনের অশ্লীলতা বা কদর্যতা ছিল না। উনাকে দেখে আমার মনে কোনো পাশবিক বা আদিম কামনার উদ্রেক হলো না; বরং আমার মনে হলো আমি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র এবং সুন্দর কোনো শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বতিচেল্লির সেই বিখ্যাত পেইন্টিং ‘দ্য বার্থ অফ ভেনাস’-এর ভেনাস যেন ক্যানভাস থেকে নেমে এসে সরাসরি বৃষ্টির নিচে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে। উনি আমার হাতটা শক্ত করে ধরে উনার সেই শান্ত, স্নিগ্ধ চোখ জোড়া তুলে আমার দিকে তাকালেন। উনার চোখে কোনো লজ্জা বা জড়তা ছিল না। ছিল এক ধরনের গভীর আত্মসমর্পণ এবং আত্মবিশ্বাস। বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের মাঝেই উনি খুব নরম গলায় বললেন, "রাশেদ, এখানে আর কোনো মুখোশ নেই। না মিথ্যার, না সত্যের। এখানে শুধু আমরা আছি।" উনার কথাগুলো বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে একটা অদ্ভুত সিম্ফনি তৈরি করল। আমি কিছু বলতে পারলাম না। আমি শুধু উনার হাতের উষ্ণতা অনুভব করলাম। এই কনকনে ঠান্ডা বৃষ্টির মাঝেও উনার হাতটা কী অদ্ভুত গরম! আমরা দুজন সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায়, হাতে হাত রেখে, বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশে পৃথিবীর সমস্ত বই ভিজে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সমস্ত জ্ঞান ধুয়ে মুছে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। আমরা দুজন যেন পৃথিবীর আদি মানব-মানবী, যারা সবেমাত্র স্বর্গের বাগানে চোখ খুলেছে। হঠাৎ করে একটা প্রচণ্ড শব্দ হলো। হয়তো মেঘ ডাকার শব্দ, অথবা বাসের কোনো হর্ন। আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। আমি ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। আমার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে। বাইরে তখনো বৃষ্টির সেই একটানা গোঙানির শব্দ চলছে। আমি অন্ধকারে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে বসে রইলাম। আমার ডান হাতের তালুটা তখনো গরম হয়ে আছে। আমি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছি, আনিকা নাওহারের সেই নরম হাতটা যেন এখনো আমার হাতের মুঠোয় ধরা আছে। আমি দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললাম। আমার মাথার ভেতর তখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এক অদ্ভুত, বর্ণনাতীত অনুভূতি। সিগমুন্ড ফ্রয়েড সাহেব সত্যি খুব ভালো জানতেন। মানুষের মন বড়ই জটিল একটা জায়গা। আমি সবসময় নিজেকে একজন ‘শুকনা’ মানুষ বলে দাবি করে এসেছি। আমি ভেবেছি আমার ভেতরে ইমোশন নেই, কামনা নেই, বাসনা নেই। আমি একজন নিরাসক্ত অনুবাদক, যে শুধু অন্যের খবর ট্রান্সলেট করে। কিন্তু আজ রাতের এই স্বপ্ন আমাকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে দিল। শুধু স্বপ্নে নয়, বাস্তবেও। ফ্রয়েড বলেছেন, মানুষের অবদমিত কামনা-বাসনাগুলো, যেগুলো সে সজ্ঞানে স্বীকার করতে চায় না, সেগুলো স্বপ্নের মাধ্যমে প্রতীকী বা সরাসরি রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসে। আমি আনিকা নাওহারকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, এটা সত্যি। উনার রূপ, উনার আভিজাত্য আমাকে আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু আমি অবচেতন মনে উনাকে এতটা তীব্রভাবে, এতটা আদিমভাবে চেয়েছি— সেটা আমি নিজেই জানতাম না। আমার এই সাধারণ, পঁচিশ হাজার টাকা বাজেটের জীবনে, যেখানে আমি আমার বাবা-মায়ের উমরাহ নিয়ে চিন্তা করি, সেখানে একজন বিবাহিত, লন্ডনপ্রবাসী, আইটি ফার্মের মালিক এবং রূপবতী নারীর প্রতি আমার এই আকাঙ্ক্ষা— এটা শুধু অবাস্তবই নয়, এটা রীতিমতো হাস্যকর। কিন্তু স্বপ্ন তো আর লজিক বোঝে না। স্বপ্ন ব্যাংক ব্যালেন্স দেখে না, স্বপ্ন সমাজ বোঝে না। আমি বিছানা থেকে নেমে এক গ্লাস পানি খেলাম। গলার ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়েছে রুমে। আয়নায় নিজের মুখটা দেখলাম। সাধারণ একটা মুখ। কিন্তু এই সাধারণ মুখের আড়ালে যে একটা আদিম, বন্য এবং ক্ষুধার্ত পুরুষ লুকিয়ে আছে, সেটা আমি আজ প্রথম আবিষ্কার করলাম। আমি মনে মনে হাসলাম। একটা তিক্ত হাসি। "রাশেদ আহমেদ, তুমি আর যাই হও, তুমি কোনো সাধু নও। তুমিও রক্ত-মাংসের একজন মানুষ। এবং তোমার ভেতরের সেই মানুষটা আজ রাতে বৃষ্টির নিচে আনিকা নাওহারের সাথে যে আদিম স্নানটা করেছে, সেটা তুমি সারাজীবনেও ভুলতে পারবে না।" বাইরে বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। আমি আবার বিছানায় গিয়ে শুলাম। কিন্তু আমি জানি, আজ রাতে আমার আর ঘুম আসবে না। আমার ডান হাতের তালুটা জ্বলছে। ফ্রয়েড সাহেবের থিওরি আর আমার বাস্তবতার মাঝখানে আনিকা নাওহার এখন এক প্রবল বৃষ্টির নাম হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। যে বৃষ্টিতে ভিজলে মানুষ পবিত্র হয়, না কি আরও বেশি তৃষ্ণার্ত হয়— সেটা আমি জানি না।
10 hours ago
Darun
|
|
« Next Oldest | Next Newest »
|