06-04-2026, 05:42 PM
দিদি কবে আপডেট দিবেন
|
Fantasy হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (চলবে)
|
|
06-04-2026, 05:42 PM
দিদি কবে আপডেট দিবেন
08-04-2026, 05:30 PM
আপডেট কি দিবেন না দিদি
08-04-2026, 10:20 PM
এটাও গেলো মনে হয়।
10-04-2026, 06:15 PM
দিদি গল্প কি দিবেন না আর
10-04-2026, 11:50 PM
Eagerly waiting for updates...
12-04-2026, 10:23 AM
আমার মনে হয় উনি একটু পার্সোনাল কারণে বিজি রয়েছেন। ফ্রী হলেই আপডেট আসবে। আমরা একটু অপেক্ষা করি। উনি তার ভক্তদের আবদার ফেলে দিবেন না
12-04-2026, 02:30 PM
![]() পর্ব ১৩
ছক কাটা স্বপ্ন
শনিবার সকাল। ঘড়ির কাঁটা নয়টা ছুঁইছুঁই। সামিনার আজ সাপ্তাহিক ছুটি, তাই অ্যালার্মের সেই যান্ত্রিক চিৎকার আজ তাকে তাড়া করেনি। জানালার পর্দার কষ বেয়ে আসা একফালি উজ্জ্বল রোদ তার চোখের ওপর স্থির হয়ে আছে। সামিনা ধীর পায়ে ঘুম থেকে জেগে উঠল। শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে একটা আলসেমি মাখানো আবেশ, যেন গতকালের সেই চারটে বেজে এক মিনিটের রেশটা এখনো তার রক্তকণিকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বিছানা ছাড়ার আগে সে একবার নিজের হাতের তালুর দিকে তাকাল। কাল সে মোর্শেদের বাইকের পেছনে বসে ছিল। বাতাসের ঝাপটায় তার শাড়ির আঁচল উড়ছিল আর মোর্শেদের পিঠের সেই শক্ত পেশির উষ্ণতা সে অনুভব করছিল তার বুকের খুব কাছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজ সকালে তার মনে কোনো অপরাধবোধ নেই, নেই কোনো অস্থিরতা। বরং এক ধরণের প্রশান্তি তাকে ঘিরে ধরেছে। তার মনে হলো, কাল যা হয়েছে বা আজ যা হচ্ছে, তা তো হওয়ারই ছিল। যেন মহাবিশ্বের কোনো এক অমোঘ নিয়মে মোর্শেদ আর সামিনা এই বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছে। এটা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এক অনিবার্য পরিণতি। সামিনা আলগোছে বিছানা ছাড়ল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের আলুথালু চুলগুলো হাত দিয়ে একবার ঠিক করে নিল। আয়নায় প্রতিফলিত নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে হাসল। এক অদ্ভুত স্বাভাবিকত্ব তার আচরণে। সে যেন গত রাতের সেই রাজকীয় কামনার দেবী থেকে মুহূর্তেই রূপান্তরিত হয়ে গেল এক সুশৃঙ্খল গৃহকর্ত্রীতে। ঘর থেকে বেরিয়ে সে সোজা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। প্রতিদিনের অভ্যস্ত হাতে চুলায় কেতলি চাপাল। ডাল চড়ানোর শব্দ, আটা মাখার তাল—সবই চলছে একদম ঘড়ির কাঁটা মেপে। বাবার ডায়াবেটিসের কথা মাথায় রেখে চিনির বদলে সুগার-ফ্রি ব্যবহার করা, মায়ের জন্য কড়া লিকারের চা—সবকিছুতেই সে নিখুঁত। ড্রাইনিং টেবিলে নাস্তা সার্ভ করার সময় তার বাবা চশমার ওপর দিয়ে একবার মেয়ের দিকে তাকালেন। “আজ কি ছুটির দিনেও খুব ব্যস্ত মা? তোকে খুব ফুরফুরে লাগছে যে?” সামিনা রুটির প্লেটটা বাবার সামনে নামিয়ে রেখে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “ছুটি তো শুধু কলেজের বাবা, ঘরের কি আর ছুটি আছে? শরীরটা একটু হালকা লাগছে আজ, হয়তো কালকের বৃষ্টিতে গরমটা কমেছে বলে।” বাবার প্রশ্নের উত্তরটা সে দিল একদম নিস্পৃহভাবে। কোনো বাড়তি উত্তেজনা নেই, কোনো লুকোচুরি নেই। পরিবারের সবাইকে নাস্তা খাইয়ে সে যখন নিজে এক কাপ চা নিয়ে জানালার ধারে গিয়ে বসল, তখন তার ফোনটা ডাইনিং টেবিলের ওপর এক কোণায় পড়ে আছে। সে জানে, মোর্শেদও হয়তো এখন জেগেছে। হয়তো সে-ও কালকের সেই তামাটে ঘ্রাণটার কথা ভাবছে। কিন্তু সামিনা তড়িঘড়ি করে ফোনটা হাতে নিল না। এই যে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার এক ধরণের সুক্ষ্ম খেলা, এটাই তাকে একধরণের মানসিক জয় দিচ্ছে। ডাইনিং টেবিল পরিষ্কার করতে করতে সামিনা লক্ষ্য করল তার হাত দুটো আজ অন্যদিনের চেয়ে বেশি সচল। নাস্তার সব প্লেট, চায়ের কাপ আর পিরিচগুলো তুলে সে রান্নাঘরের সিঙ্কে নিয়ে এল। কলের পানি ছেড়ে সেগুলোকে ভিজিয়ে রাখল সাবান-পানির ফেনায়। কাজটা করার সময় তার প্রতিটি নড়াচড়ায় এক ধরণের ছন্দ কাজ করছে। একটু পরেই রান্নাঘরের ভ্যাপসা গরমে তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। কোমর ছাড়িয়ে পিঠের ওপর ছড়িয়ে থাকা অবাধ্য চুলের ঢলটা এই মুহূর্তে বড় বেশি ভার মনে হচ্ছে তার। সামিনা দু হাত বাড়িয়ে সেই বিশাল চুলের সমুদ্রকে একসাথে জড়ো করল। তারপর নিপুণ অভ্যস্ততায় সেগুলোকে পেঁচিয়ে মাথার ঠিক মাঝখানে উঁচুতে তুলে একটা শক্ত খোঁপা করল। ক্লিপটা আটকানোর পর সে আয়না ছাড়াই হাত দিয়ে একবার আন্দাজ করার চেষ্টা করল। সত্যি, তার ওই ঘন চুলের ভারে খোঁপাটা দেখতে যেন একটা ঢাউস ফুটবলের মতো হয়েছে। সে নিজে মনে মনে একটু হাসল—এই বাঁধন বেশিক্ষণ টিকবে না, তার চুলের যে ওজন, একটু পরেই হয়তো আলগা হয়ে ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়বে। সামিনা এবার মন দিল দুপুরের রান্নায়। চুলার ওপর কড়াই চড়িয়ে তেল গরম হতেই সে একে একে মসলাগুলো ছাড়তে শুরু করল। পেঁয়াজ-আদার সাথে যখন দারুচিনি আর এলাচের ঘ্রাণটা রান্নাঘরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল, তখন এক অদ্ভুত মায়া কাজ করল তার ভেতরে। সে খুন্তি দিয়ে কড়াইয়ের মসলাটা কষাতে লাগল। গরম ভাপটা তার মুখে এসে লাগছে, গলার ভাঁজে ঘাম জমছে, কিন্তু তার সবটুকু মনোযোগ সেই রান্নার দিকে—ঠিক যেন কোনো সাধনায় মগ্ন এক নারী। মসলা কষানোর সেই চিড়বিড় শব্দের মধ্যেই ড্রয়িংরুমের টেবিলে রাখা ফোনটা হঠাৎ তীক্ষ্ণ সুরে বেজে উঠল। সামিনা হাতের খুন্তিটা এক মুহূর্তের জন্য থামাল। এই সময়ে কে ফোন করতে পারে? মোর্শেদ? নাকি কলেজ থেকে কেউ? মসলার কড়াইটা চুলার একদম নিভু নিভু আঁচে রেখে সে চট করে হাতটা ধুয়ে নিল। ওড়নায় ভেজা হাত মুছতে মুছতে সে দ্রুত পা বাড়াল ফোনের দিকে। স্ক্রিনে 'মোর্শেদ' নামটা ভেসে উঠতেই সামিনার ঠোঁটের কোণে একটা আলগা হাসি খেলে গেল। সে গলার স্বরটা একটু স্বাভাবিক করে নিয়ে ফোনটা কানে তুলল। "আসসালামু আলাইকুম।" সামিনার গলায় এক ধরণের শান্ত আভিজাত্য। ওপাশ থেকে মোর্শেদের ভরাট আর কিছুটা চড়া কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "সালামের উত্তর পরে দিচ্ছি। আগে বলো, সকাল থেকে কোনো খবর নেই কেন? ফোনটা কি একদম ড্রয়ারে বন্দি করে রেখেছিলে?" সামিনা ফোনের ওপাশ থেকে মোর্শেদের সেই চিরচেনা আধিপত্য মেশানো সুরটা অনুভব করতে পারল। সে হাসল, "ছুটির দিন তো, তাই ঘরের কাজে একটু ব্যস্ত ছিলাম। আর এই তো মাত্র রান্নাঘরে ঢুকলাম।" "রান্নাঘরে? তার মানে কালকের সেই রাইড আর বিকেল চারটের কথা সব ভুলে এখন খুন্তি নাড়াচাড়ায় মন দিয়েছ?" মোর্শেদের গলায় দুষ্টুমির সুর। "নাকি কালকের ডেটটা তোমার খুব একটা পছন্দ হয়নি? রাইডার মোর্শেদ কি সামিনা ম্যাডামকে ইমপ্রেস করতে ব্যর্থ হলো?" সামিনা এক মুহূর্ত থামল। কালকের সেই রয়্যাল এনফিল্ডের গর্জন, বাতাসের ঝাপটা আর মোর্শেদের কাঁধে হাত রাখার সেই শিহরণ তার মনে এখনো টাটকা। সে খুব নিচু গলায় কিন্তু স্পষ্ট করে বলল, "ব্যর্থ হননি। আপনি ভালো করেই জানেন কালকের সময়টা কেমন ছিল। আপনার ওই মেটিয়রের গতি আর... আর আপনার সঙ্গ—দুটোই বেশ মনে রাখার মতো।" "উমম, শুধু মনে রাখার মতো? আর কিছু না?" মোর্শেদ যেন ওপাশ থেকে সামিনাকে আরও একটু উস্কে দিতে চাইল। "আমি তো ভেবেছিলাম আজ সকালে উঠেই তুমি মেসেজ করে বলবে— 'মোর্শেদ, চলো আজই আবার কোথাও বেরিয়ে পড়ি!' তুমি তো দেখছি উল্টো আমায় ভুলেই গেলে।" সামিনা আলতো করে খোঁপাটা আর একবার ঠিক করল, যদিও মোর্শেদ তা দেখতে পাচ্ছে না। সে বলল, "ভুলে যাইনি মোর্শেদ সাহেব। আসলে আমি তো আপনার মতো উড়নচণ্ডী নই। আমাকে বাস্তবতার ভেতরেই থাকতে হয়। তাছাড়া আমি আপনাকে নিয়ে ভাবছিলাম না, এটা আপনাকে কে বলল?" "ও আচ্ছা! তার মানে ভাবছিলে? কী ভাবছিলে শুনি?" মোর্শেদের গলার স্বর এবার একটু নরম, কিছুটা ঘনিষ্ঠ। “কিচ্ছু ভাবছিলাম না। আপনি একটা বোকা, এই ভাবছিলাম” বলে খিলখিল করে হেসে উঠলো সামিনা। তার সাথে মোর্শেদও হাসিতে যোগ দিল। নিচু স্বরে কথা বলতে বলতেই সামিনা আবার রান্নাঘরে ফিরে গেল। "ওরে বাবা! এতো কড়া কথা?" মোর্শেদ ওপাশ থেকে হাসছে, বোঝা যাচ্ছে সে বেশ আয়েশ করে বসে আছে। "তা রান্নাঘরে খুন্তি নাড়াচাড়ার শব্দ পাচ্ছি। আজ স্পেশাল কী হচ্ছে? ছুটির দিনের মেনু কী?" সামিনা মসলার কড়াইয়ে আর একবার নাড়া দিয়ে বলল, "তেমন কিছু না। সাধারণ ডাল, ভাত আর পাবদা মাছের ঝোল করছি। কেন? আপনার কি খুব খিদে পেয়েছে?" "খুব! তবে পাবদা মাছের ঝোলের কথা শুনে খিদেটা আরও চড়ে গেল। আচ্ছা সামিনা, তুমি কি সত্যিই ভালো রান্না করো নাকি শুধু ছাত্রছাত্রীদের শাসনই করতে পারো?" সামিনা কৌতুকের সুরে বলল, "সেটা না হয় কোনো একদিন খেয়েই বিচার করবেন। তবে আজ যে মসলাটা কষাচ্ছি, তার ঘ্রাণে পাশের বাসার লোকও উঁকি দিচ্ছে। আপনি তো অনেক দূরে, তাই শুধু আফসোসই করতে পারেন।" মোর্শেদ ফোনের ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল, যা সামিনার কানে এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিল। মোর্শেদ নিচু স্বরে বলল, “আফসোস তো হচ্ছেই সামিনা। তবে এই ঘ্রাণ নিয়ে তো আর সাত দিন থাকা যাবে না। আমার খুব ইচ্ছে করছে আজ বিকেলেই আবার তোমাকে নিয়ে কোথাও বেরিয়ে পড়ি। কালকের সেই রাইডটা যেন মাঝপথেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, আমার তৃষ্ণা মেটেনি।” সামিনা চট করে একবার রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকাল। বাবা পাশের ঘরে রেডিও শুনছেন, মা হয়তো বারান্দায়। সে ফোনের স্পিকারটা কানের একদম কাছে নিয়ে এল। তার গলার স্বর এবার একদম নিচে নেমে এল, প্রায় ফিসফিস করে বলল, “একদম পাগলামি করবেন না মোর্শেদ সাহেব। আজ আর সম্ভব নয়। আগামী শুক্রবারের আগে আমার আর এক মুহূর্ত সময় হবে না।” মোর্শেদ ওপাশ থেকে একটু থামল। সামিনার সেই ফিসফিসানি শব্দগুলো তার কানে যেন এক নিষিদ্ধ আমন্ত্রণের মতো বাজছে। সে মৃদু হেসে বলল, “গলার স্বর এতো নিচে কেন সামিনা? বাড়িতে কি সবাই আছে? তুমি কি সবার অলক্ষ্যে আমার সাথে কথা বলছ?” সামিনার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ধরা পড়ে যাওয়ার একটা ভয় যেমন আছে, তেমনি মোর্শেদের এই ধরে ফেলতে পারার ভেতরে এক ধরণের অদ্ভুত রোমাঞ্চও আছে। সে আবার ফিসফিসিয়ে বলল, “হ্যাঁ, সবাই আছে। আমি এখন রান্না করছি, ফোন করার এটাই মোক্ষম সময় ছিল আপনার। বেশি কথা বলবেন না, কেউ শুনে ফেলতে পারে।” মোর্শেদ এবার একটু গম্ভীর হলো, কিন্তু তার গলায় সেই আদুরে টানটা রয়ে গেল, “তার মানে তুমি আসলে চাইছিলে আমি এই সময়েই ফোন করি? লুকিয়ে কথা বলার এই যে মজা, এটা তো তুমিও বেশ উপভোগ করছ সামিনা। তোমার গলার এই ফিসফিসানি আমাকে বলছে, তুমিও আগামী শুক্রবারের জন্য আমার মতোই ছটফট করছ।” সামিনা এবার একটু শাসন করার স্বরে কিন্তু ভিজে গলায় বলল, “আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন।“ মোর্শেদ ফোনের ওপাশ থেকে একটু হাসল। সেই হাসির শব্দে এক ধরণের গভীর আশ্লেষ থাকলেও সে নিজেকে সংযত করে নিল। সামিনার গলার ওই ফিসফিসানি মোর্শেদকে এক অদ্ভুত তৃপ্তি দিচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, ঢাকার এই ছকে বাঁধা জীবনের আড়ালে সামিনা তার জন্য একটা গোপন জানালা খুলে রেখেছে। মোর্শেদ খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, আজ আর জ্বালাব না। বুঝতে পারছি বাড়িতে সিচুয়েশন টাইট। কিন্তু সত্যি কথা বলো তো সামিনা, তোমার কি একবারও ইচ্ছে করছে না সব ফেলে আজই আমার সাথে বেরিয়ে পড়তে? ওই কলেজের খাতা আর রান্নার ধোঁয়া থেকে মুক্তি পেতে ইচ্ছে করে না?” সামিনা চট করে একবার রান্নাঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে গলার স্বর আরও নামিয়ে আনল। প্রায় শ্বাস ফেলার মতো করে ফিসফিসিয়ে বলল, “ইচ্ছে অনিচ্ছার কথা বাদ দিন। আমি তো বলেছিই— আগামী শুক্রবারের আগে আমার আর এক মুহূর্ত সময় হবে না।“ ফোনের ওপাশ থেকে মোর্শেদের একটা ছোট নিঃশ্বাস শোনা গেল। সামিনার সেই ফিসফিসানি মোর্শেদকে আরও আমোদ দিচ্ছে। সে খুব স্বাভাবিক স্বরে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, শুক্রবারই সই। সাতটা দিন নাহয় ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকিয়েই কাটাব। কিন্তু বলো তো, এবার তোমাকে নিয়ে কোথায় যাওয়া যায়? কোন দিকে ঘুরলে সামিনা ম্যাডামের মেজাজ ফুরফুরে থাকবে?” সামিনা এক হাত দিয়ে ফোনের রিসিভারটা কানের সাথে চেপে ধরে অন্য হাতে কড়াইয়ের তলায় খুন্তিটা চালাচ্ছিল। সে খুব নিচু স্বরেই বলল, “আমি তো শহর-টহর খুব একটা চিনি না মোর্শেদ সাহেব। কোথায় ভালো জায়গা আছে বা কোথায় যাওয়া যায়—সেসব পরিকল্পনার ভার আপনার ওপরই রইল। আমি শুধু আপনার পেছনে বসে চারপাশ দেখব।” মোর্শেদ হেসে বলল, “বাহ! দায়িত্ব তো বেশ ভালোই এড়িয়ে গেলে। ঠিক আছে, তবে এবার এমন এক জায়গায় নিয়ে যাব যে তুমি অবাক হয়ে যাবে। কিন্তু আমার একটা শর্ত আছে।” সামিনা চট করে বাধা দিয়ে বলল, “শর্ত আপনার নয়, শর্ত আমার। আগামী শুক্রবার কিন্তু আমার একটা কড়া শর্ত মানতে হবে আপনাকে।” মোর্শেদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী শর্ত শুনি?” “আগামী শুক্রবার যা হবে, সব আমার পছন্দে হবে। মানে, খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে সবকিছু এবার আমার তরফ থেকে থাকবে। এবার আমি আপনাকে খাওয়াব, আপনি কিন্তু কোনোভাবেই মানা করতে পারবেন না।” মোর্শেদ ওপাশ থেকে প্রায় আকাশ থেকে পড়ল, “বলছ কী সামিনা? আমি থাকতে তুমি বিল মেটাবে বা তুমি খাওয়াবে? ওসব একদম হবে না। ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।” সামিনা এবার খুন্তি নাড়ানো থামিয়ে ফোনের ওপর জেদ ধরল। তার গলার স্বর ফিসফিসে হলেও তাতে একটা অনড় জেদ ছিল, “আমি বলে দিয়েছি মানে দিয়েছি। এবার আমিই খাওয়াব আপনাকে। আপনি যদি রাজি না হন বা ওদিন কোনো জোরাজুরি করেন, তাহলে কিন্তু আমার যাওয়া হবে না। আমি একদমই যাব না বলে দিলাম।” মোর্শেদ ওপাশ থেকে কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেল, তবে তার গলায় একটা আদুরে শাসনও ছিল। সে নিচু স্বরে বলল, “শোনো সামিনা, তুমি আমাকে খাওয়াবে এটা শুনতে ভালো লাগছে ঠিকই, কিন্তু রেস্টুরেন্টে গিয়ে সামিনা ম্যাডাম বিল দেবেন আর মোর্শেদ সাহেব পাশে বসে আঙুল চুষবেন—এটা আমার আত্মসম্মানে লাগবে। তুমি নিশ্চয়ই চাইবে না এমন কিছু করতে যা আমার ইগোতে আঘাত দেয়?” সামিনা ঠোঁট কামড়ে হাসল। খুন্তি দিয়ে মসলাটা নাড়তে নাড়তে সে আলতো করে ফোনের ওপর ফুঁ দিল। তারপর গলার স্বর আরও নিচে নামিয়ে রহস্যময় এক স্বরে বলল, “আচ্ছা, আপনার আত্মসম্মান এতোই ঠুনকো? ঠিক আছে, তবে আমি বিল দেব না, তাতে আপনার আত্মসম্মান বেঁচে থাক। কিন্তু আমি যদি নিজের হাতে কিছু রান্না করে নিয়ে আসি? আপনার নিশ্চয়ই আমার হাতে তৈরি খাবার খেতে আত্মসম্মানে লাগবে না? নাকি সেখানেও আপনার ওই পুরুষালি ইগো বাধা হয়ে দাঁড়াবে?” মোর্শেদ এক মুহূর্ত চুপ থেকে হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল। তার হাসির শব্দে এক ধরণের স্বস্তি আর গভীর আনন্দ উপচে পড়ল। সে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, “আরে! এ তো মেঘ না চাইতেই জল! তুমি নিজের হাতে রান্না করবে? এ তো আমার পোয়াবারো সামিনা! বিশ্বাস করো, রেস্টুরেন্টের ওই মরা খাবারের চেয়ে তোমার হাতের রান্নার প্রস্তাবটা কয়েক গুণ বেশি দামী।” মোর্শেদ একটু থেমে এবার চপল গলায় বলল, “এক কাজ করলে কেমন হয়? আমরা তাহলে কোনো রেস্টুরেন্টের চার দেয়ালের মাঝে গিয়ে বন্দী হবো না। তার চেয়ে চলো কোথাও খোলা আকাশের নিচে একটা পিকনিক পিকনিক ভাব করে ফেলি। আমি বাইক নিয়ে আসব, আর তুমি তোমার রান্নার হাড়ি-পাতিল নিয়ে আসবে। মাটির ওপর বসে দুজনে খাব। কী বলো? রাজি?” সামিনা এবার চুলে হাত দিয়ে সেই খোঁপাটা একবার ঠিক করে নিল। তার চোখেমুখে জয়ের ঝিলিক। সে খুব আয়েশ করে বলল, “হুমম, ভেবে দেখি। আপনি যখন এতো করে বলছেন, তখন রাজি হওয়া যেতে পারে। তবে রান্নার মেনু কিন্তু আমার পছন্দের হবে। সেখানে আপনি নাক গলাতে পারবেন না।” “একদম না! তুমি যা খাওয়াবে তা-ই অমৃত। আচ্ছা সামিনা, তুমি এখন ঠিক কী রান্না করছো? তোমার হাতের ওই খুন্তির শব্দটা কিন্তু আমার কানে গানের মতো বাজছে। মনে হচ্ছে আমি তোমার রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তোমাকে দেখছি।” সামিনা একটু কেঁপে উঠল। মোর্শেদের এই কথাগুলো তার কল্পনার ভেতরে এক ধরণের দৃশ্য তৈরি করছে। সে মৃদু হেসে বলল, “আপনার কল্পনাশক্তি তো বেশ প্রখর! রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে না থেকে বরং ওখানেই থাকুন। আমি পাবদা মাছের ঝোলটা নামিয়ে নেই। ওদিন কিন্তু আমি আপনার জন্য এর চেয়েও স্পেশাল কিছু করব।” মোর্শেদ ওপাশ থেকে গাঢ় স্বরে বলল, “উফ সামিনা, তুমি কি জানো তুমি আমার খিদেটা কতটা বাড়িয়ে দিলে? শুক্রবার কি কাল হতে পারে না? তোমার ওই ফিসফিসানি আর রান্নার শব্দ শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছে আমি এখনই বাইক স্টার্ট দেই।” মিনা ফোনের ওপাশ থেকে মোর্শেদের গলার সেই অস্থিরতা টের পাচ্ছিল। সে ঠোঁটের কোণে হাসিটা টিপে রেখে খুব ধীরলয়ে বলল, “বাইক স্টার্ট দিতে হবে না এখনই। অত ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই, তার জন্য আগামী শুক্রবার পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। কিন্তু আমার তো চিন্তা হচ্ছে অন্য জায়গায়। আপনি যে বললেন মাটিতে বসে পিকনিক করবেন—এই ইট-পাথরের ঢাকা শহরে কোথায় আপনি আমার সাথে এমন রান্নাবাটি খেলার জায়গা পাবেন শুনি?” মোর্শেদ একটু সময় নিয়ে হাসল। সামিনার এই ‘রান্নাবাটি’ শব্দটা তাকে যেন এক মুহূর্তের জন্য কৈশোরে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। সে খুব মোলায়েম সুরে বলল, “তুমি থাকতে জায়গার অভাব হবে না সামিনা। তবে একদম ঢাকা শহরের এই জ্যাম আর হৈচৈ-এর মধ্যে না থেকে আমরা চাইলে একটু বাইরের দিকে বেরিয়ে যেতে পারি। উত্তরের দিকে যেতে পারি, অথবা দক্ষিণে। তোমার কোন দিকটা পছন্দ?” সামিনা ভুরু কুঁচকে কড়াইয়ের দিকে তাকাল। খুন্তিটা একপাশে রেখে সে একটু অবাক হয়েই প্রশ্ন করল, “উত্তর বা দক্ষিণ মানে? আমি তো ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থা অত ভালো বুঝি না। কী আছে ওদিকে?” মোর্শেদ এবার একটু বুঝিয়ে বলার ঢঙে বলল, “ধরো, যদি উত্তরের দিকে যাই তবে সাভারের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যেতে পারি। ওখানে গাছপালার ছায়া আছে, নির্জনতা আছে। আর যদি দক্ষিণের দিকে যেতে চাও, তবে নারায়ণগঞ্জ পার হয়ে সোনারগাঁর দিকে যাওয়া যায়। ওদিকের পুরনো আমেজটা তোমার ভালো লাগতে পারে। এখন বলো, তোমার কোনটা পছন্দ? জাহাঙ্গীরনগর না সোনারগাঁ?” সামিনা এক মুহূর্ত ভাবল। সোনারগাঁর সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের কথা সে বইয়ে পড়েছে, কিন্তু কখনো সেভাবে যাওয়া হয়নি। সে নিচু গলায় বলল, “সোনারগাঁর কথা শুনেছি অনেক। ওদিকের ওই পুরনো দালানগুলো নাকি বেশ সুন্দর?” মোর্শেদ যেন সামিনার মনের কথাটাই ধরতে পারল। সে উৎসাহী গলায় বলল, “চমৎকার চয়েস! সোনারগাঁর ওই পুরনো আমেজটা তোমার সাথে খুব ভালো যাবে। তাহলে ওটাই ফাইনাল? শুক্রবার সকালে আমি মেটিয়র নিয়ে তোমার পাড়ার মোড়ে থাকছি, আর তুমি থাকবে তোমার ওই জাদুর টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে। রাজি তো?” সামিনা মৃদু হেসে উত্তর দিল, “রাজি। তবে এখন কথা থামান, আমার মাছের ঝোল প্রায় শুকিয়ে এল।” ফোনটা রেখে দিয়ে মোর্শেদ সোফায় হেলান দিয়ে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল। তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি। সে ভাবতেও পারেনি সামিনা এতো সহজে রাজি হয়ে যাবে। অথচ সামিনা রাজী হলো শুধু তাই নয়, সে যেন মনে মনে এই সুযোগটার জন্যই মুখিয়ে ছিল। সামিনার ওই সাবধানী ফিসফিসানি আর রান্নার শব্দগুলো মোর্শেদের মাথার ভেতর একটা ঘোর তৈরি করছে। মোর্শেদ চোখ বুজে কল্পনা করার চেষ্টা করল— এই মুহূর্তে সামিনা তার রান্নাঘরের ভ্যাপসা গরমে ঘামছে। তার সেই পাহাড় সমান চুলের খোঁপাটা ঘাড়ের ওপর নড়ছে। ভাবতেই মোর্শেদের শরীরের ভেতর এক তীব্র কামনার স্রোত বয়ে গেল, নিমেষেই তার লিঙ্গ পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠল। একটা আদিম তাড়না তাকে অস্থির করে তুলল। তার খুব ইচ্ছে করছে এখনই ছুটে গিয়ে সামিনার সেই ঘিঞ্জি রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াতে। সামিনা যখন খুন্তি নাড়াতে ব্যস্ত থাকবে, তখন পেছন থেকে অতর্কিতে তাকে জাপটে ধরতে। নিজের শক্ত হয়ে ওঠা শরীরটাকে সামিনার ওই ভরাট মাংসল পাছার খাঁজে ঘষতে ঘষতে তার ঘাড়ের খাঁজে মুখ ডুবিয়ে দিতে। এই তীব্র উত্তেজনা মোর্শেদকে ঘরের ভেতর আর স্থির থাকতে দিল না। সে দ্রুত আলমারি থেকে একটা টি-শার্ট টেনে নিয়ে গায়ে চড়াল। তার এখন শরীরটাকে ঠাণ্ডা করা দরকার, অথবা কোনো তীব্র নেশায় এই উত্তেজনাকে ডুবিয়ে দেওয়া দরকার। সে নিচে নেমে এসে তার ব্ল্যাক মেটিয়রের ওপর বসল। চাবি ঘুরিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই সেই পরিচিত গম্ভীর গর্জনটা তার কানে এল। কিন্তু আজ এই যান্ত্রিক আওয়াজও তার ভেতরের আগুন নেভাতে পারছে না। মোর্শেদের এখন কড়া এক টান গাঁজা দরকার। সে জানে এই দুপুরে বন্ধুরা কোথায় আড্ডা দিচ্ছে। এদিকে ফোনটা রেখে সামিনা দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চুলার ওপর রাখা কড়াইয়ের মাছের ঝোল তখন শুকিয়ে গা মাখা হয়ে এসেছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। তার অবচেতন মন তখন এক অদ্ভুত অংকের হিসেবে ব্যস্ত। সে অবাক হয়ে ভাবল—কাল সে মোর্শেদের সাথে প্রথমবার সেই ‘অফিসিয়াল ডেট’-এ বেরিয়েছিল। মোটে চব্বিশ ঘন্টাও পার হয়নি, এরমধ্যেই সে দ্বিতীয় ডেটের সব পরিকল্পনা পাকা করে ফেলেছে! এমনকি কোথায় যাবে, কী খাবে—সবই এখন তার ঠোঁটের ডগায়। সামিনা নিজেকে যতটুকু সংযত আর রাশভারী বলে জানত, মোর্শেদের এক একটা ফোন কল বা আধিপত্য মাখানো ‘তুমি’ ডাক যেন সেই বাঁধগুলো এক নিমেষেই ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। রান্নাঘরের জানালার কাঁচের প্রতিবিম্বে সামিনা নিজেকে দেখল। আগুনের তাপে তার গাল দুটো রক্তিম হয়ে আছে, কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সে বেশ বুঝতে পারছে, তার এই শরীর আর মন—দুটোই এখন ভীষণভাবে মোর্শেদের শরীর ও মনের দখল চাইছে। মোর্শেদ তাকে কামনার চোখে দেখে, তাকে নিয়ে ফ্যান্টাসি করে—এই নিয়ে সামিনার মনে কোনোদিন কোনো সংশয় ছিল না। মোর্শেদের চোখের চাউনি আর বাইকের পেছনে বসার সময় তার নিঃশ্বাসের তপ্ত আঁচই সব বলে দিয়েছিল। কিন্তু আজ সামিনার কাছে নিজের মনোভাবও আয়নার মতো পরিষ্কার হয়ে উঠছে। সে মোর্শেদকে শুধু একজন ‘রাইডার’ বা ‘বন্ধু’ হিসেবে দেখছে না; বরং সে নিজেই এখন এক গভীর তৃষ্ণা নিয়ে মোর্শেদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই যে রান্নার বাহানায় মোর্শেদকে খাওয়ানোর পরিকল্পনা, এটা কি কেবলই সৌজন্য? নাকি নিজের হাতের জাদুতে মোর্শেদকে পুরোপুরি নিজের আয়ত্তে আনার এক আদিম আকাঙ্ক্ষা? সামিনা একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে কড়াইটা চুলা থেকে নামাল। সে জানে, এই সাতটা দিন এখন তার কাছে এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার নাম। সপ্তাহের মাঝখানের দিনগুলো যেন কাটতেই চাইছিল না। কলেজের ক্লাসরুম, ব্ল্যাকবোর্ডের খসখসানি আর পরীক্ষার খাতা—সবকিছুর মাঝেই মোর্শেদের সেই অবাধ্য কণ্ঠস্বর আর সোনারগাঁর নির্জন দালানগুলো সামিনার অবচেতন মনে হানা দিচ্ছিল। মঙ্গলবার কলেজ থেকে ফেরার পথে সামিনা ঠিক করল, বাজারটা আজই সেরে ফেলবে। শুক্রবারের সেই বিশেষ ‘পিকনিক’-এর জন্য হাতে আর বেশি সময় নেই। দুপুরের চড়া রোদ মাথায় নিয়ে সামিনা যখন বাজারের মুখে এসে দাঁড়াল, তখন তার চুলে ঘাম জমতে শুরু করেছে। কিন্তু তার ক্লান্তি নেই, আছে এক ধরণের সুক্ষ্ম উত্তেজনা। সে মনে মনে মেনুটা আগেই সাজিয়ে রেখেছে। মোর্শেদ যেহেতু খাসির মাংস পছন্দ করে, তাই সামিনা ঠিক করেছে সে ‘স্পেশাল কাচ্চি বিরিয়ানি’ করবে। তবে সেটা হবে একদম ঘরোয়া ঘরানায়, যেখানে ঘি আর মশলার একটা আভিজাত্য থাকবে। সে কাঁচাবাজারের কাদা-জল মাড়িয়ে সোজা চলে গেল মাংসের দোকানে। কসাইকে কড়া গলায় নির্দেশ দিল, “একদম সিনা আর রান মিলিয়ে ভালো খাসির মাংস দেবেন, চর্বি যেন খুব বেশি না হয়।” মাংসের গুণমান নিয়ে সামিনার এই খুঁতখুঁতোনি দেখে কসাইও অবাক। এর আগে সে সামিনাকে এতোটা সময় নিয়ে মাংস বাছতে দেখেনি। মাংস নেওয়া শেষ করে সে গেল মশলার দোকানে। বিরিয়ানির জন্য সেরা বাসমতী চাল, শাহী জিরা, জয়ফল-জয়ত্রী আর এক কৌটো ভালো গাওয়া ঘি। প্রতিটি প্যাকেট সে নিজেই হাতে নিয়ে শুঁকে দেখছে—মোর্শেদের জন্য করা রান্নায় কোনো খুঁত সে বরদাস্ত করবে না। আলুগুলো যেন মাঝারি সাইজের হয় এবং রান্নায় দিলে মাখনের মতো গলে যায়—সেজন্য সে আলাদা করে পাহাড়ি লাল আলু বেছে নিল। ব্যাগটা ক্রমশ ভারী হচ্ছে, কিন্তু সামিনার মনে হচ্ছে সে যেন এই ভারটা বয়ে নেওয়ার মাঝেই এক ধরণের পরম সুখ পাচ্ছে। বাজারের কোলাহলের মাঝেও সে কল্পনা করতে পারছে—সোনারগাঁর সেই প্রাচীন অশ্বত্থ গাছের নিচে সে মোর্শেদের সামনে তার এই জাদুর জোগানগুলো সাজিয়ে দিয়েছে। মোর্শেদ যখন তৃপ্তি নিয়ে খাবে, তখন তার চোখের সেই প্রশংসা হবে সামিনার এই সব কষ্টের সেরা পুরস্কার। সবশেষে সে নিল কিছু সুগন্ধি পান। সে জানে, মোর্শেদ সিগারেট খায়, কিন্তু খাওয়ার পর সামিনার হাতে বানানো একটা বিশেষ পান হয়তো তাকে অন্যরকম আবেশ দেবে। বাজার শেষ করে রিকশায় ওঠার সময় সামিনা লক্ষ্য করল তার ঠোঁটে একটা সলজ্জ হাসি লেগে আছে। এই বাজারগুলো কেবল রান্নার উপকরণ নয়, এগুলো যেন মোর্শেদের হৃদয়ে পৌঁছানোর এক একটা গোপন সিঁড়ি। বাজারের ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে ঘরে ঢোকা মাত্রই ড্রয়িংরুমের সোফায় বসা মায়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সামনে পড়ল সামিনা। মা চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে হাতের কাজ থামিয়ে অবাক হয়ে তাকালেন। এতো বড় বাজারের ব্যাগ, খাসির মাংসের প্যাকেট আর ঘিয়ের কৌটো দেখে মায়ের চোখ কপালে উঠল। মা একটু অবাক স্বরেই জিজ্ঞেস করলেন, "ঘটনা কী রে সামিনা? এতো বাজার কার জন্য? ঘরে তো সব আছেই, আবার এতো মাংস কেন আনলি?" সামিনা এক মুহূর্তের জন্য থতমত খেয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা যেন একটা ধক করে উঠল। কিন্তু চেহারায় সেই স্বাভাবিকত্বের মুখোশটা টেনে এনে খুব নিস্পৃহ গলায় বলল, "মা, আসলে আগামী শুক্রবার কলেজে একটা ছোট প্রোগ্রাম আছে। আমাদের সব কলিগরা মিলে ঠিক করেছি প্রত্যেকে বাসা থেকে কিছু না কিছু স্পেশাল রান্না করে নিয়ে যাব। সবাই মিলে একসাথে খাব সেখানে।" মা ব্যাগগুলোর ভেতর উঁকি দিয়ে বললেন, "তা তো বুঝলাম। কিন্তু এই মাংস আর অন্য সব আয়োজন তো অতো বেশি মনে হচ্ছে না। অল্প কয়েকজনের খাবার। তুই কি অল্প কয়েকজনের জন্য রান্না করে নিয়ে যাবি?” সামিনা নিজের ভুলটা তখনই বুঝতে পারল। সে আসলে বাজার করেছে তাদের ঘরের আন্দাজে আর তার আর মোর্শেদের জন্য। কিন্তু কলেজে তো আর এতো অল্প খাবারে হবে না। সামিনা একটু আমতা আমতা করে বলল, "আসলে ওই যে বললাম, সবাই নিয়ে আসবে। সবাই মিলে মিশে খাবো তো। ম্যানেজ হয়ে যাবে। সমস্যা নেই।“ মা খুব একটা পাল্টা জেরা করলেন না, তবে তার চোখের চাউনিতে একটা রহস্যময় ছায়া রয়ে গেল। তিনি শুধু জিজ্ঞেস করলেন, "তা যাবি কখন? শুক্রবার তো ছুটির দিন, তোর তো বের হতে হতে অনেক দেরি হয়।" সামিনা তড়িঘড়ি করে গুছিয়ে নিল, "না মা, এবার একটু সকাল সকালই বের হতে হবে। ওই দশটা-সাড়ে দশটার দিকে হয়তো যাব।" মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাগটা রান্নাঘরের দিকে টেনে নিয়ে বললেন, "আচ্ছা ঠিক আছে। একা হাতে এতো রান্না করতে তোর কষ্ট হবে। শুক্রবার সকালে না হয় আমিই তোকে একটু সাহায্য করে দেব। পেঁয়াজ কাটা বা বাটা মশলার কাজগুলো আমিই সেরে দেবানি, তুই শুধু রান্নাটা করিস।" মায়ের এই অযাচিত সাহায্যের প্রস্তাব শুনে সামিনার মনের ভেতর এক ধরণের অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করল। মা ভাবছেন মেয়ে তার সহকর্মীদের জন্য কষ্ট করছে, অথচ সামিনা তৈরি হচ্ছে এক নিষিদ্ধ তৃষ্ণার পথে পা বাড়াতে। মায়ের সাথে এই লুকোচুরি তাকে যেমন অস্বস্তিতে ফেলছে, তেমনি ওই গোপন অভিসারের রোমাঞ্চটাও যেন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
12-04-2026, 09:15 PM
অনেকদিন অপেক্ষার পর আপনার আপডেট টা পেয়ে মনটা ভরে গেল। অনেক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে আমাদের একটা চমৎকার আপডেট উপহার দিলেন। আপনার গল্পের ভাষা কি মার্জিত আর অসাধারণ শব্দশৈলী। একদম পাক্কা লেখিকা আপনি। মানুষের মন খুব সহজেই জয় করে নিতে পারেন আপনার লিখার মাধ্যমে। আর গল্পের প্রেক্ষাপট খুব চমৎকারভাবে এগুচ্ছে। প্রাপ্ত বয়স্ক দুজন নর-নারী তারা আস্তে আস্তে পাশে আসছে। ভালো লাগা,, সেই থেকে একসময় ভালোবাসাও হবে। সত্যি রোমান্টিক গল্প লিখা উচিৎ এভাবেই। পরের আপডেট এর অপেক্ষায় রইলাম। ভালো থাকবেন।
13-04-2026, 11:04 AM
Khub sundar update.
Eagerly waiting for next update
14-04-2026, 12:47 AM
প্রতিটা আপডেটের জন্য চাতকের মত চেয়ে থাকি, কতবার যে আপনার থ্রেড থেকে ঘুরে যাই! আমাদেরকে কি আরেকটু দয়া করা যায়না?
14-04-2026, 05:32 AM
সেই হচ্ছে দিদি
14-04-2026, 09:08 AM
Khub valo laglo
6 hours ago
3 hours ago
কামিনী দেবী আপনার কো-রাইটার হওয়ার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করছি। আপনি আগ্রহী হলে আপনার সাথে কাজ করতে ইচ্ছুক আছি। তাই প্রয়োজনে আমার ই-মেইল ঠিকানায় আপনার মতামত জানাতে পারেন। আপনার লেখা বেশ পরিশীলিত ও মার্জিত এবং একজন ভালো লেখিকার যোগ্যতা আপনার আছে। সেজন্য ই আমি আপনার সাথে কাজ করতে চাই। ধন্যবাদ।
3 hours ago
|
|
« Next Oldest | Next Newest »
|