Thread Rating:
  • 14 Vote(s) - 3.36 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Fantasy হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (চলবে)
#1
Star 
আমি এই সাইটে দীর্ঘদিন কেবল পাঠিকা হিসেবেই আছি। আইডি খুলেছিলাম মন্তব্য করতে। কখনও লেখালেখি করব ভাবি নি। সেরকম কোনও অভিজ্ঞতাও নেই৷ তবুও মনের মধ্যে নানা রকম রঙ খেলা করে। স্বপ্নও থাকে কিছু লুকোনো। যেগুলোকে ফ্যান্টাসী বলেই চাপিয়ে রাখি আমরা ভিন্ন একদিকে। সেরকম কত কল্পনার রাজ্যেই তবে  ভেসে যায় আমাদের আদরের পথঘাট। এমনই এক কাল্পনিক জগৎকে কথায় রূপ দেবার প্রচেষ্টায় এই লেখা শুরু। একটি স্লো বিলাদ ফ্যান্টাসী সিরিজ ই বানানোর প্রচেশজটায় আছি আমি। তাই তাড়াহুড়ো যাদের, তারা তৃপ্তি নাও পেতে পারেন। মাসে ২ থেকে ৩টা আপডেট দেবার ইচ্ছে আছে। একজন সহলেখক/এডিটর খুঁজছিলাম। না পাওয়ায় সাহস করে একাই শুরু করছি। ভুল ত্রুটি নিজগুনে ক্ষমা করবেন। সকলকে নমস্কার, সালাম, আদাব। 


[img][Image: 691893411_1000019930.png][/img]

মুখবন্ধ 

জীবন কি কেবলই একঘেয়ে রুটিন, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে কোনো অজানাকে ছোঁয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা? ৩৮ বছর বয়সে পৌঁছে যখন চারপাশের দেয়ালগুলো কেবলই ‘বিচ্ছেদ’ আর ‘একাধিক শূন্যতা’র কথা মনে করিয়ে দেয়, তখন হঠাত করেই কোনো এক অনলাইন প্লাটফর্মের নীল আলোয় নতুন কারো অস্তিত্ব জানান দেয়। একঘেয়ে শহর, ইটপাথরের খাঁচা আর যান্ত্রিক সম্পর্কের ভিড়ে আমরা যখন হাঁপিয়ে উঠি, তখনই শুরু হয় আসল খোঁজার পালা।
এই উপন্যাসটি কেবল দুজন মাঝবয়সী মানুষের প্রেমের গল্প নয়; এটি মূলত শেকল ভাঙার গল্প। একজন ৩৮ বছর বয়সী নারী এবং একজন ৪৫ বছর বয়সী পুরুষ—যাদের পিঠে বিচ্ছেদের ক্ষত আর চোখে অভিজ্ঞতার ভার—তারা যখন প্রথাগত ক্যাফে-রেস্টুরেন্টের দেখা করার রীতি ভেঙে বাইকের সিটে বসে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়, তখন থেকেই বদলে যেতে থাকে জীবনের সংজ্ঞা।
এই ভ্রমণে বাঙালির চেনা আবেগের মোড়কে আছে পশ্চিমা ঘরানার ভবঘুরে জীবনবোধ। এখানে প্রেম আছে, আছে রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার, আর আছে শরীর ও মনের আদিম ও অকৃত্রিম টান। যৌনতা এখানে কেবল জৈবিক চাহিদা নয়, বরং দীর্ঘদিনের গুমোট একাকিত্ব থেকে মুক্তির এক পলায়ন। ধুলোবালিমাখা পথ, ইঞ্জিনের গর্জন আর হিমেল বাতাসের মাঝে তাদের এই ‘রোড ট্রিপ’ শেষ পর্যন্ত তাদের কোথায় নিয়ে যায়, তা-ই এই গল্পের মূল উপজীব্য।
শহুরে ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময় চেয়ে নিয়ে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি এই বোহেমিয়ান যাত্রায়। যেখানে গন্তব্য নয়, পথই হলো আসল গন্তব্য।
(চলবে)
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 6 users Like KaminiDevi's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#2
Dekhi kemon hoi.. Chalia jan sathe achi
Like Reply
#3
আপনার আইডিয়া টা সত্যি ই নতুন বিশেষ করে বাংলা গল্পের জন্য ।ইংরেজি ইরোটিকায় আছে এমন , বাংলায় আমি অন্তত পাইনি । সময় করে লিখে ফেলুন , আপনার লেখার প্রথম গ্লিপমস দেখেই বোঝজাচ্ছে যে ভালো হবে য
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 1 user Likes gungchill's post
Like Reply
#4
শুরু করুন……সাথে আছি
Like Reply
#5
[img=1100x750][Image: 692112564_gemini_generated_image_hb7n6hb7n6hb7n6h.png][/img]

প্রথম অধ্যায়ঃ একাকীত্বের ইকোসিস্টেম

রাত বারোটা বেজে দশ। ঢাকার বনানীর ফ্ল্যাটের দশতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মোর্শেদ তার তৃতীয় সিগারেটটা ধরাল। সামনের প্যানোরামিক উইন্ডো দিয়ে রাতের ঢাকা শহরটাকে একটা বিশাল আলোকোজ্জ্বল ক্যানভাস মনে হয়, কিন্তু মোর্শেদের কাছে এটা কেবলই কংক্রিটের জঙ্গল।

নিচে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় তার ৩৫০ সিসির রয়্যাল এনফিল্ড মেটিওর ক্রুজার বাইকটা কভার দিয়ে ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছেঠিক যেন এক ঘুমন্ত শিকারী। পঁয়তাল্লিশ বছরের মোর্শেদের জীবনে এই বাইকটা কেবল একটা বাহন নয়, এটা তার মুক্তি। পাঁচ বছর আগে যখন তার দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটেছিল, তখন এই ঘরটা এক অদ্ভুত নীরবতায় ডুবে গিয়েছিল। শুরুতে সেই নীরবতা তাকে গিলতে আসত, কিন্তু এখন সে এটাতেই অভ্যস্ত। এখন তার নিজস্ব একটা 'ইকোসিস্টেম' গড়ে উঠেছেযেখানে কড়া কফি, কখনও হুইস্কির ধক, মার্লবরো রেড এর ধোঁয়া আর মাঝরাতে হাইওয়ের নির্জনতায় বাইকের গতির গর্জনই প্রধান অনুষঙ্গ।

সেদিন বন্ধুদের আড্ডা থেকে ফিরে মোর্শেদ ফেসবুকের সেই জনপ্রিয় 'রাইডার্স গ্রুপে' নিজের একটা পাহাড়ি ভ্রমণের ছবি পোস্ট করল। কুয়াশা ঘেরা বান্দরবানের রাস্তায় তার দানবীয় বাইকটার সেই ছবিটার নিচে মুহূর্তেই রিঅ্যাকশন আর কমেন্টের বন্যা বয়ে গেল।

কমেন্ট বক্সে স্ক্রল করতে করতে মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। রাইডার্স কমিউনিটিতে তার নামটা গত কয়েক বছরে বেশ ভারি হয়েছে। ছোট ভাইদের কাছে সে এক 'লিভিং লিজেন্ড'—যে সংসার বা সামাজিকতার মায়া কাটিয়ে দুই চাকার ওপর জীবনকে খুঁজে নিয়েছে।


প্রথম কমেন্টটা সোহেলের। গত বছর সাজেক ট্রিপে ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল। ও লিখেছে, “বস, আপনি একাই একশো! আমাদের মত ফ্যামিলি ম্যানদের কাছে আপনি এক একটা দীর্ঘশ্বাস। কবে বেরোচ্ছেন আবার?”



নিচে রিয়াজ যোগ করেছে, “মোর্শেদ ভাই মানেই তো ফ্রিডম। আপনার এই মেটিওরটা যখন নীলগিরির বাঁকে কাত হয়, তখন মনে হয় পাহাড়টাও আপনার প্রেমে পড়ে গেছে! স্যালুট বস!”



আরেকজন একটু রসিকতা করে লিখেছে, “ভাই, সলো রাইডিং তো অনেক হলো। এবার পেছনে কাউকে বসিয়ে একটা ‘কাপল গোল’ সেট করেন না!”



মোর্শেদ আলতো করে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে চোখ রাখল। অ্যাশট্রেতে আগের সিগারেটের অবশিষ্টাংশটা গুঁজে দিয়ে পকেট থেকে বের করল নতুন একটা মার্লবরো রেড। ফ্লিন্ট জ্বালিয়ে গভীর একটা টান দিল সে। ধোঁয়াটা ফুসফুসে আটকে রেখে জানালার কাঁচের দিকে তাকিয়ে রইল। কাঁচের প্রতিচ্ছবিতে নিজের পঁয়তাল্লিশ বছরের মুখটা আবছা দেখা যাচ্ছে। দাড়িগুলো কাঁচাপাকা, চোখের নিচে সামান্য কালচে আভা। একেই হয়তো লোকে 'ম্যাচিউরড লুক' বলে প্রশংসা করে, কিন্তু মোর্শেদ জানে এর পেছনে কতগুলো বিনিদ্র রাত জমা আছে।



সিলিং ফ্যানের মৃদু ঘূর্ণন আর এসির গুঞ্জনের মাঝে ঘরটা আবার সেই চেনা নিস্তব্ধতায় ভরে উঠল। এই ইকোসিস্টেমে সে রাজা, কিন্তু মাঝে মাঝে এই সিংহাসনটা খুব বেশি ঠান্ডা মনে হয়। টেবিলে রাখা ক্রিস্টাল গ্লাসের তলায় জমে থাকা হুইস্কির হলদেটে দাগটার দিকে চোখ গেল তার। মনে মনে ভাবল, “আজ কি আরেক পেগ হবে? নাকি শরীরের ওপর আর অত্যাচার না করে কালকের ট্যুরের ম্যাপটা দেখব?”


সে জানে, এক গ্লাস হুইস্কি হয়তো আজকের একাকিত্বের তীক্ষ্ণতা কমিয়ে আনবে, কিন্তু কাল ভোরে বাইকের ক্ল্যাচ ছাড়ার সময় যে একাগ্রতা দরকার, সেটা হয়তো শিথিল হয়ে যাবে। গ্লাসের পাশের আধখোলা বোতলটা তাকে প্রলুব্ধ করছিল। অ্যালকোহলের সেই বিশেষ গন্ধটা ঘরময় ভাসছে, যা ইদানীং তার পারফিউমের চেয়েও বেশি আপন।

মোর্শেদ ল্যাপটপটা বন্ধ করতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই একটা নোটিফিকেশন তার মনোযোগ কেড়ে নিল।

আইডির নাম 'সামিনা জাহান' প্রোফাইল পিকচারে কোনো মানুষের চেহারা নেই, কেবল একটা অন্ধকার জানলা দিয়ে বৃষ্টির ঝাপটা আসার ছবি। কমেন্টটা ছিল ছোট কিন্তু তীক্ষ্ণ
"পাহাড়ের এই বাঁকে বৃষ্টির সময় বাইক চালানো কি খুব বেশি বিপজ্জনক নয়?"

মোর্শেদ সাধারণত অচেনা মানুষের কমেন্টে রিপ্লাই দেয় না। কিন্তু এই প্রশ্নটার মধ্যে এক ধরণের প্রচ্ছন্ন মায়া বা আগলে রাখার সুর ছিল, যা তাকে অবাক করল। সে কিবোর্ডে আঙুল ছোঁয়াল   
"বিপজ্জনক তো বটেই, তবে ওই বিপদের মধ্যেই আসল নেশা লুকিয়ে আছে। জীবনটা তো এমনিতেই অনেকটা খাদের কিনারে চলা।"

কমেন্টটা করে মোর্শেদ ভাবতে থাকল, এই গ্রুপে এইটা কি সত্যিই মেয়ে? নাকি ফেইক আইডি? বাংলাদেশে ফিমেল রাইডার নেই বললেই চলে। কি মনে করে মোর্শেদ যা করে না কখনও তাই করে বসল, একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিল। দু মিনিট পরই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করে ওপাশ থেকে মেসেজ এলো -
সামিনা: "নেশা কি শুধু গতিতে? নাকি নিজের একাকীত্বকে পেছনে ফেলে আসার চেষ্টায় মানুষ পাহাড়ে ছোটে?"

মোর্শেদ সিগারেটের শেষ অংশটা অ্যাশট্রেতে পিষে দিল। উত্তরটা দিতে তার একটু সময় লাগল। মেসেঞ্জারে টাইপিং ডটগুলো বার বার উঠছে আর নামছে।

মোর্শেদ: "একাকীত্ব কি অত সহজে পেছনে ফেলা যায়? ওটা তো ছায়ার মতো সাথে ঘোরে। আপনি হঠাৎ এই কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন?"

সামিনা: "কারণ আমার মনে হলো, ওই পাহাড়ী কুয়াশার ভেতরে আপনার বাইকের হেডলাইটের আলোটা আসলে কাউকে খুঁজছে। হয়তো নিজেকেই।"

মোর্শেদ স্তব্ধ হয়ে গেল। ওপারে থাকা মানুষটি তাকে চেনে না, দেখেওনি, অথচ প্রথম আলাপে সে তার মনের সেই দেয়ালটা চিনে ফেলেছে যা মোর্শেদ গত পাঁচ বছর ধরে সযত্নে গড়ে তুলেছিল।

সামিনা: "বিরক্ত করছি না তো? আসলে রাতগুলো মাঝে মাঝে বড্ড লম্বা মনে হয়। বিশেষ করে যখন চারপাশের দেওয়ালগুলো কথা বলতে শুরু করে।"

মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝতে পারল, এই রাতের ইকোসিস্টেমে সে আর একা নয়। ওপারে আরও একজন নিঃসঙ্গ মানুষ তার মতো করেই অস্তিত্বের লড়াই করছে। সে টাইপ করল
মোর্শেদ: "না, বিরক্ত নই। বরং মনে হচ্ছে অনেকদিন পর কেউ একজন ঠিক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আপনার দেয়ালগুলো কি খুব বেশি অভিযোগ করে? নাকি ওগুলোও আমার মতো কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে?"

সামিনা: (খানিকটা সময় নিয়ে উত্তর এল) “অভিযোগ করার বয়স তো পার করে এসেছি মোর্শেদ সাহেব। এখন দেয়ালগুলো কেবল প্রশ্ন করে। যেমন ধরুন, এই যে মধ্যরাতে একজন অপরিচিত রাইডারের সাথে আমি জীবনের দর্শন নিয়ে আলাপ করছি—এটা কি একাকীত্ব, নাকি স্রেফ কৌতূহল?”


মোর্শেদ একটা মুচকি হাসি হাসল। মেয়েটির কথায় ধার আছে, আবার একটা মখমলে আবরণও আছে। সে লিখল— 
মোর্শেদ: “কৌতূহল তো বিপজ্জনক। বিশেষ করে যদি সেই কৌতূহল একজন বাইকারের প্রতি হয়। আমরা কিন্তু খুব একটা সুবিধার মানুষ নই। বাতাসের টানে উধাও হয়ে যাওয়া আমাদের স্বভাব।”


সামিনা: “উধাও হওয়া তো এক ধরণের আর্ট। সবাই পারে না। তবে আপনার প্রোফাইল তো বলছে আপনি কেবল বাতাসের টানে ছোটেন না, আপনি আপনার মেটিওর ৩৫০-এর গর্জনে নিজের হাহাকার ঢাকতে পছন্দ করেন। এই যে আপনি এখন সিগারেট খাচ্ছেন, আপনার কি মনে হয় না ধোঁয়ার ওই কুণ্ডলীগুলো আপনার না বলা কথাগুলোর চেয়েও বেশি স্পষ্ট?”


মোর্শেদ চমকে উঠল। সে আসলেও তখন একটা নতুন সিগারেট ধরিয়েছে। 
মোর্শেদ: “আপনি কি জ্যোতিষী? নাকি আমার জানালার বাইরে ল্যাম্পপোস্টে বসে আড়ি পাতছেন? আমার সিগারেট খাওয়ার খবর আপনি জানলেন কী করে?”


সামিনা: “জ্যোতিষী নই, তবে মানুষের নিঃসঙ্গতার একটা গন্ধ থাকে। যারা এই ইকোসিস্টেমে বাস করে, তারা একে অপরের নিঃশ্বাস টের পায়। আর ল্যাম্পপোস্টে বসার মতো বয়স বা শরীর—কোনোটাই আমার নেই। ৩৮ বছরের একজন নারী ল্যাম্পপোস্টে বসলে সেটা বড়জোর একটা কমেডি সিন হতে পারে।”


মোর্শেদ: “৩৮? আপনি তো তাহলে বেশ অল্পবয়সী। পঁয়তাল্লিশের এই বুড়োকে তো আপনি চাইলে এখন থেকেই ‘আঙ্কেল’ বলে সম্মোধন করতে পারেন। তাতে অন্তত আপনার কৌতূহলটা একটু নিরাপদ দূরত্বে থাকবে।”


সামিনা: “আঙ্কেল? (একটা হাসির ইমোজি এল) রাইডারদের কোনো বয়স হয় না মোর্শেদ সাহেব। তাদের থাকে শুধু সিসি আর মাইলেজ। আর পঁয়তাল্লিশ বছর তো পুরুষের জন্য স্রেফ একটা ‘ক্লাসিক’ বয়স। যেমন আপনার বাইকটা—যতই পুরনো মডেল হোক, রাস্তার ধুলো ওড়াতে তার জুড়ি নেই।”


মোর্শেদ এবার একটু নড়েচড়ে বসল। কথাগুলো বেশ মিষ্টি অথচ তীরের মতো বিঁধছে। 
মোর্শেদ: “আপনার কথার প্যাঁচ বেশ মারাত্মক। বুঝতে পারছি না এটা কি প্রশংসা নাকি সাবলীল ফ্লার্টিং। তবে এই বয়সে এসেও কেউ যদি ‘ক্লাসিক’ বলে ডাক দেয়, তবে সেটা অগ্রাহ্য করার মতো ক্ষমতা আমার অন্তত নেই।”

সামিনা: “ফ্লার্টিং? আপনি কি মাঝরাতে সব অপরিচিত মহিলার মেসেজেই ফ্লার্টিং খুঁজে পান? নাকি আপনার অবচেতন মন চাইছে কেউ একজন আপনাকে একটু অন্যভাবে দেখুক? বাইকের গিয়ার বদলানো সহজ মোর্শেদ সাহেব, কিন্তু মনের গিয়ার বদলানো অনেক কঠিন।”

মোর্শেদ কিবোর্ড থেকে আঙুল সরিয়ে নিল। সামিনার প্রতিটি শব্দ যেন এই অন্ধকার ঘরের ভেতর ইকো করছে। সে একটা নতুন সিগারেট ধরাল। জানালার কাঁচের ওপাশে বনানী ডিওএইচএস-এর শুনশান রাস্তা। দূরে এয়ারপোর্ট রোডের দিকে কোনো একটা ভারি ট্রাকের চাকা ঘষার শব্দ নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে গেল। মোর্শেদ ধোঁয়া ছাড়ল, ঘরের নীলচে আলোয় সেই ধোঁয়াগুলো দলা পাকিয়ে যাচ্ছে।


মোর্শেদ: “মনের গিয়ার শিফট করার মেকানিক্সটা আমার জানা নেই সামিনা। তবে আমি সাধারণত সোজা পথেই চলি। বনানী ডিওএইচএসের এই নিরিবিলি ব্লকে থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি তো, তাই হয়তো শব্দের মারপ্যাঁচ খুব একটা বুঝি না। আপনি কি এই শহরেরই বাসিন্দা?”


সামিনা: “আমি শহরের অন্য প্রান্তের মানুষ। যে প্রান্তে রাত কোনোদিন ঘুমায় না। যাত্রাবাড়ীর জ্যাম আর হট্টগোলের মধ্যে আমার বাস। আপনার মতো ডিওএইচএসের রাজকীয় আভিজাত্য আমার জানালায় এসে লাগে না। সেখানে কেবল বাসের হর্ন আর মানুষের কোলাহল।”


মোর্শেদ ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। সে জানে বনানীর এই দশতলা বিল্ডিংটা তার কাছে একটা নিঃসঙ্গ দুর্গ। ১৬টি ফ্ল্যাট থেকে মাসে চার লাখ টাকার মতো ভাড়া আসে, সাথে বেইলি রোডের দোকানটার আয়। তার কোনো অফিস যাওয়ার তাড়া নেই, বসের ঝাড়ি নেই। এই অলস প্রাচুর্যই তাকে অকাল বার্ধক্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না, তা সে জানে না।


মোর্শেদ: “যাত্রাবাড়ী? তার মানে তো আপনি বেশ লড়াকু মানুষ। আমাদের এই ডিওএইচএসের নীরবতা কিন্তু মাঝে মাঝে খুব ভীতিজনক। বড় মস্ত বড় বাড়ি, কিন্তু কথা বলার মানুষ নেই। আমার এই ঘরে কেবল এক দূর সম্পর্কের মামা আর মামী থাকেন। তারা নিজেদের জগত নিয়ে ব্যস্ত, আমি আমার। আপনার পরিবারে নিশ্চয়ই অনেক মানুষ?”


সামিনা: “হ্যাঁ, আমি আমার বাবা-মায়ের সাথেই থাকি। তবে আমার জগতটা একটু অন্যরকম। চারুকলায় পড়েছিলাম, রঙ আর ক্যানভাস নিয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু এখন যাত্রাবাড়ীর একটা ছোট কলেজে বাচ্চাদের আর্ট শেখাই। খুব সামান্য বেতন, হয়তো আপনার বাইকের এক মাসের মেইনটেন্যান্স খরচও তার চেয়ে বেশি। তবুও দিন শেষে বাচ্চাদের খাতার ওই কাঁচা হাতের আঁকিবুকিগুলো দেখে মনে হয়, জীবনটা হয়তো একদম বৃথা নয়।”


মোর্শেদ টাইপ করতে গিয়ে থামল। সামিনার কথায় কোনো আক্ষেপ নেই, বরং এক ধরণের সতেজতা আছে। সে ভাবল, যে মেয়েটার বেতন তার একদিনের হাতখরচের সমান হতে পারে, তার মনটা কত বেশি স্বচ্ছ। মোর্শেদের জীবনে টাকার অভাব নেই, কিন্তু সামিনার মতো ওই ছোট ছোট আনন্দগুলোও নেই।


মোর্শেদ: “টাকা দিয়ে কি আর জীবনের মানে খুঁজে পাওয়া যায় সামিনা? আপনার মতো সৃজনশীল মানুষেরা তো আমাদের মতো ‘বিলিয়নিয়ার’দের চেয়ে অনেক বেশি ধনী। আপনি অন্তত কিছু সৃষ্টি করছেন। আর আমি? আমি শুধু রাস্তার মাইলফলক গুনি। আপনার কলেজের বাচ্চারা তো আপনাকে অনেক ভালোবাসে নিশ্চয়ই?”


সামিনা: “ভালোবাসে কি না জানি না, তবে ওরা আমাকে ‘রঙিন ম্যাডাম’ বলে ডাকে। আচ্ছা মোর্শেদ সাহেব, আপনি যে বললেন আপনার পরিবারে তেমন কেউ নেই, আপনার বাবা-মা কি...?”


মোর্শেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সিগারেটের ছাইটা ট্রের ওপর ঝেড়ে সে লিখল— 
মোর্শেদ: “বাবা-মা দুজনেই অনেক আগে চলে গেছেন। এই বাড়িটা তাদেরই স্মৃতি। মামা-মামী আছেন বলেই বাড়িটা বাড়ি মনে হয়, নয়তো এটা একটা মিউজিয়াম হয়ে যেত। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার এই রাজকীয় একাকীত্বের চেয়ে আপনার ওই ঘিঞ্জি যাত্রাবাড়ীর শোরগোল অনেক ভালো। সেখানে অন্তত প্রাণের স্পন্দন আছে।”


সামিনা: “ঘিঞ্জি জায়গাগুলো দেখতে ভালো লাগে না মোর্শেদ সাহেব, কিন্তু সেখানে মানুষ মানুষকে অনুভব করতে পারে। আপনি যখন বাইক নিয়ে হাইওয়েতে ছোটেন, তখন কি একবারও মনে হয় না যে এই গতি শেষে ফেরার মতো কোনো আপন মুখ থাকলে ভালো হতো?”


মোর্শেদ স্তব্ধ হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে কোনো একটা স্পোর্টস বাইক উচ্চ শব্দে চলে গেল। সেই শব্দের রেশটুকু ঘরে মিলিয়ে যেতেই মোর্শেদ টাইপ করল— 
মোর্শেদ: “হয়তো মনে হয়। তবে ফেরার জায়গাগুলো যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন মানুষ অজানার দিকেই বেশি টান অনুভব করে। আপনি কি কখনো এমন কোনো রাইডারের পেছনে বসেছেন, যে আপনাকে কুয়াশাভেজা কোনো ভোরে নিয়ে যাবে?”


সামিনা: (খানিকটা দুষ্টুমির সুরে) “আমি তো মধ্যবিত্ত কলেজ টিচার, আমার ঘোরাঘুরি লোকাল বাসে আর রিকশায়। তবে কল্পনা করতে দোষ নেই। আপনার মেটিওরটা কি খুব বেশি ঝাঁকুনি দেয়? নাকি পেছনে বসা মানুষটাকে খুব সাবধানে আগলে রাখে?”


মোর্শেদ: “সেটা নির্ভর করে পেছনের মানুষটা কতটা শক্ত করে ধরতে পারে তার ওপর। যদি সে ভয় পায়, তবে ঝাঁকুনি বেশি লাগবে। আর যদি সে গতির সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিতে পারে, তবে মনে হবে সে মেঘের ওপর দিয়ে উড়ছে।”


সামিনা: “উড়তে তো সবাই চায়। কিন্তু ডানার ভার বইবার ক্ষমতা কজনের থাকে? আচ্ছা, আজ অনেক রাত হলো। কাল ভোরে আমাকে কলেজে যেতে হবে, বাচ্চাদের খাতা দেখতে হবে। আপনি তো নিশ্চয়ই দুপুর পর্যন্ত ঘুমোবেন?”

মোর্শেদ একটা ম্লান হাসি হাসল। 
মোর্শেদ: “আমার দিন আর রাতের পার্থক্য খুব কম। তবে আজ হয়তো একটু তাড়াতাড়িই ঘুম ভেঙে যাবে। আপনার ‘রঙিন ম্যাডাম’ পরিচয়ের বাইরেও একজন মানুষকে আজ খুঁজে পেলাম বলে মনে হচ্ছে। সাবধানে থাকবেন সামিনা।”

সামিনা: (খানিকটা সময় নিয়ে) “খুঁজে পাওয়াটা সহজ মোর্শেদ সাহেব, কিন্তু চিনে নেওয়াটা কঠিন। মানুষ তো বহুরূপী। আপনি যাকে ‘মানুষ’ হিসেবে দেখছেন, সে হয়তো কেবল একলা রাতের একটা কাল্পনিক প্রতিচ্ছবি। তবুও, আপনার এই খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাটুকুকে সম্মান জানাই।”


মোর্শেদ কিবোর্ড থেকে হাত সরিয়ে নিল। ল্যাপটপের নীলচে আলোয় তার চেহারায় এক ধরণের অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করছে। সে অ্যাশট্রের দিকে তাকাল—সেখানে সিগারেটের ফিল্টারগুলোর একটা ছোটখাটো পাহাড় জমেছে। সারা ঘর ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে আছে, ঠিক যেন তার জীবনের গত পাঁচটা বছরের প্রতিচ্ছবি। জানালার বাইরে বনানী ডিওএইচএসের নিস্তব্ধতা এখন আরও গাঢ়। দূরে একটা বাইকের ইঞ্জিনের গর্জন শোনা গেল, হয়তো কোনো রাইডার তার মতোই রাতের বুক চিরে ছুটে চলছে।



সামিনা: “কি হলো? চুপ হয়ে গেলেন যে? বনানীর অভিজাত নিস্তব্ধতা কি আপনাকে গিলে খেল? নাকি আমার মতো এক সাধারণ কলেজ টিচারের সাথে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন?”



মোর্শেদ দ্রুত টাইপ করল— 

মোর্শেদ: “না, ক্লান্ত হইনি। বরং ভাবছিলাম, আমাদের জীবনের এই বৈপরীত্যের কথা। আপনি থাকেন কোলাহলের মাঝে থেকেও হৃদয়ে রঙ নিয়ে, আর আমি থাকি এই শান্ত সুশীতল ডিওএইচএস-এ, নিশ্চিত জীবন এর ভেতরে ধূসরতা নিয়ে। আমার এই দামী মেটিওর ৩৫০-এর চাকায় যতটা ধুলো ওড়ে, তার চেয়ে বেশি ধুলো জমেছে বোধহয় আমার মনের ওপর।”



সামিনা: “ধুলো ঝেড়ে ফেলা যায় মোর্শেদ সাহেব। তবে তার জন্য মনের জানালায় হাওয়া লাগাতে হয়। আচ্ছা, আপনি যখন বাইক নিয়ে বের হন, তখন কি একবারও মনে হয় না যে এই গতিটা কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের চেয়ে বরং নিজেকেই হারিয়ে ফেলার জন্য?”


মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সামিনা তাকে ঠিক কত গভীরে গিয়ে আঘাত করছে, তা সে হয়তো নিজেও জানে না। তার মামা-মামী এখন পাশের ঘরে ঘুমিয়ে। এই বিশাল বাড়িতে মোর্শেদ কেবল একজন রাজকীয় অতিথি। সে আবার লিখল— 
মোর্শেদ: “হয়তো নিজেকে হারানোর জন্যই এই ছোটাছুটি। কিন্তু আজ কেন যেন মনে হচ্ছে, মাঝে মাঝে হারিয়ে যাওয়া মানুষকেও খুঁজে নিতে হয়। আপনি কি কোনোদিন আমার বাইকের পেছনে বসে এই কুয়াশাভরা ঢাকার রাত দেখবেন? অবশ্য যাত্রাবাড়ী থেকে বনানী অনেক দূর, মাঝপথে হয়তো আপনি ভয় পেয়ে যাবেন।”


সামিনা: “ভয়? যে নারী প্রতিদিন বাসের ভিড় ঠেলে কলেজে যায়, তার কাছে ভয় শব্দটা খুব বিলাসিতা। তবে হ্যাঁ, কোনোদিন যদি আকাশ খুব বেশি মেঘলা থাকে আর আপনার গতির নেশা আমাকে না টলায়, তবে হয়তো দেখা যেতেও পারে। তবে তার আগে আপনাকে আমার ওই ‘ঘিঞ্জি’ যাত্রাবাড়ীর গন্ধ সহ্য করার ক্ষমতা রাখতে হবে।”


মোর্শেদ: “আমি আসব সামিনা। আপনার সেই চেনা কোলাহলের ভেতর থেকেই আপনাকে খুঁজে বের করব। একদিন হয়তো আপনার কলেজের গেটে কোনো এক ক্লাসিক বাইকের গর্জন শুনতে পাবেন। দেখবেন, আপনার সেই রঙিন ছাত্রছাত্রীরা আমাকে দেখে অবাক হচ্ছে।”

সামিনা: “সেটা দেখা যাবে। আপাতত নিজের ইকোসিস্টেমে ফিরে যান। রাত এখন শেষের দিকে। কাল ভোরে কিন্তু আমার বাচ্চারা আমার অপেক্ষায় থাকবে। শুভরাত্রি, মিস্টার রাইডার।”

মোর্শেদ ল্যাপটপটা বন্ধ করল। ঘরটা এখন ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, কিন্তু তার মনের ভেতরে এক ধরণের স্বচ্ছতা ফিরে এসেছে। সে বিছানায় গা এলিয়ে দিল, কিন্তু চোখে ঘুম নেই। তার মাথায় এখন শুধু ঘুরছে সামিনার সেই কথাগুলো— "মানুষ চিনে নেওয়া কঠিন।" মোর্শেদ জানালার পর্দা সরিয়ে নিচে তাকাল। তার কালো রঙের মেটিওরটা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চিকচিক করছে। 
কে এই সামিনা? একটা ফেসবুকের বাইকার গ্রুপে সে এলোই বা কি করে? সত্যিই কি একজন মহিলা? চেনা কেউ ঠাট্টা করছে? কথা বলে তো সেরকম লাগল না।
সামিনার আইডিতে ঘুরতে লাগলো মোর্শেদ। কোনও ছবি দেওয়া নেই। শুধু বিভিন্ন আর্টস এন্ড ক্র্যাফট। 
মোর্শেদের নিজের ছবিই প্রোফাইলে দেওয়া। নিশ্চয়ই পর্দার ওইপাশের সেই ভদ্রমহিলা তাকে ইতোমধ্যেই দেখে নিয়েছে। মোর্শেদের কল্পনায় তখনও আবছা হয়ে আছে সামিনা নামের রহস্যময়ী নারীটি। চেহারা, অবয়ব, কন্ঠ সবই অচেনা। কেবলই একটা ধারণা রয়ে গেছে। 

আচ্ছা? কাল আবার কথা হবে তো? নাকি হারিয়ে যাবে ফেসবুক থেকে? এসব ভাবতে ভাবতেই একাকিত্বে মাখা রাতটাকে বুজে থাকা চোখের অন্ধকারে মিশিয়ে দিল মোর্শেদ। 
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 8 users Like KaminiDevi's post
Like Reply
#6
[Image: Whats-App-Image-2026-02-05-at-7-37-04-AM.jpg]

প্রচ্ছদ

[Image: Gemini-Generated-Image-hb7n6hb7n6hb7n6h.png]

প্রথম পর্ব।

আমি চেষ্টা করব প্রতিটি পর্বের সারমর্মের একটি ছবি অন্তত দেওয়ার। সেটা কখনও নেট থেকে ডাউনলোড করা হতে পারে, কখনও আর্টিফিশাল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করব। প্রয়োজন পড়লে নিজে ছবি এঁকেও দিতে পারি। যদিও আমি সামিনার মত ভাল ছবি আঁকতে জানি না। যাই হোক। প্রথম পর্ব প্রকাশিত। পাঠকদের রেস্পন্সের অপেক্ষায়।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 6 users Like KaminiDevi's post
Like Reply
#7
(04-02-2026, 08:58 PM)gungchill Wrote: আপনার আইডিয়া টা সত্যি ই নতুন বিশেষ করে বাংলা গল্পের জন্য ।ইংরেজি ইরোটিকায় আছে এমন , বাংলায় আমি অন্তত পাইনি । সময় করে লিখে ফেলুন , আপনার লেখার প্রথম গ্লিপমস দেখেই বোঝজাচ্ছে যে ভালো হবে য

হ্যা সাধারণত বাংলাদেশ ছোট্ট একটা দেশ বলে এই বিষয়টা সেভাবে বাস্তবেও ঘটতে দেখা যায় না। লেখা তো নেই ই এরকম। বিদেশে এসব প্রচুর হয়। ভাবলাম বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি এমন একটা কিছু চিন্তা করা যায় তাহলে কিভাবে কি করা যেতে পারে। সে প্রয়াস থেকেই লেখার শুরু।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
Like Reply
#8
সুন্দর শুরু……..

ভিন্ন ধারার গল্প খুবই রেয়ার। আর বেশিরভাগ গল্পই অসম্পূর্ণ । আপনার লেখার হাত ভালো…..আশাকরি কষ্ট হলেও গল্পটা শেষ করবেন…….

এটা যেহেতু এডাল্ট সাইট সেহেতু গল্পে সেক্স সিন কম থাকলে রেসপন্স কম পাবেন…..
[+] 1 user Likes Maleficio's post
Like Reply
#9
(05-02-2026, 03:01 PM)Maleficio Wrote: সুন্দর শুরু……..

ভিন্ন ধারার গল্প খুবই রেয়ার। আর বেশিরভাগ গল্পই অসম্পূর্ণ । আপনার লেখার হাত ভালো…..আশাকরি কষ্ট হলেও গল্পটা শেষ করবেন…….

এটা যেহেতু এডাল্ট সাইট সেহেতু গল্পে সেক্স সিন কম থাকলে রেসপন্স কম পাবেন…..

পর্যাপ্ত পরিমাণ যৌনদৃশ্য দেবার পরিকল্পনা আছে। সেগুলো হবেও খুব রগরগে। অন্তত আমার সামর্থ্য অনুযায়ী। কিন্তু সেটা একটু পরপরই না। আমার স্লো বার্ন পছন্দ। তাই গল্পটা স্লোলি আগানোর প্লান করছি। ভ্রমণ, প্রেম, সম্পর্ক, উত্তেজনা ও যৌনতার মিশেল ঘটাতে চাই। দেখা যাক কতদূর যেতে পারি। সবসময় পরামর্শ দেবেন এরকম। 

ধন্যবাদ।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 2 users Like KaminiDevi's post
Like Reply
#10
wow... so beautifully written... It is really a matter of regret that you were not writing before... Pls keep going.. eagerly waiting...
[+] 1 user Likes Luffy2096's post
Like Reply
#11
Darun darun... Chalia jan... Bhalo egoche
Like Reply
#12
(05-02-2026, 04:43 PM)Luffy2096 Wrote: wow... so beautifully written... It is really a matter of regret that you were not writing before... Pls keep going.. eagerly waiting...

বাড়িয়ে বলছেন। অতো ভাল কিছু মোটেই না। আর আমি তো মাত্র লেখা শুরু করলাম। দেখা যাক কতদূর কি এগোনও যায়।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
Like Reply
#13
Plot looks very interesting
Like Reply
#14
আমার মনে হয় সেক্স স্টোরিজ সর্ব অবস্থায় স্লো বার্নিং হওয়া বাঞ্ছনীয়। নাহলে সেটা সেক্স স্টরি ই বলে মনে হয় না। দারুন হয়েছে। আপনার সহ লেখক হতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। আপনাকে প্রাইভেট মেসেজ করেছি দেখতে পারেন।
Like Reply
#15
খুবই চমৎকার শুরু করেছেন। আপনার লেখার হাত ভাল। একটা আর্ট আছে লেখায়, সম্পূর্ণ আলাদা ধাঁচের। অনেক দিন থেকে এরকম একটা লেখা কামনা করছিলাম। ধন্যবাদ আপনাকে।
Like Reply
#16
শুরু চমৎকার লাগছিল। তবে অনুরোধ রইলো মাসে ১/২/৩ যাই আপডেট দেন গল্প টা শেষ করেন।
অন্য লেখক মতো হারিয়ে যায়িয়েন না
Like Reply
#17
আপনার প্রথম লেখা দেখে তো মনে হয় আপনি প্রথম নন, বরং একজন অভিজ্ঞ লেখিকা। লেখাটি চমৎকার হয়েছে। লেখার গতি সাবলীল। গল্পেও অনেক নতুনত্ব রয়েছে। আশা করি গল্পটি চমৎকার হবে। তবে একটা অনুরোধ, গল্পের পুরো প্লট এবং কাহিনী আগেই চিন্তা করে সেভাবে গল্পের চরিত্র সৃষ্টি এবং কাহিনী এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছি। এতে অন্তত মাঝপথে গল্পের খেই হারিয়ে ফেলার সুযোগ থাকবে না, বরং একটি সুন্দর লক্ষ্য ও সমাপ্তির দিকে গল্পটি এগিয়ে যাবে। এতে সর্বাবস্থায় গল্পের আকর্ষণ বজায় থাকবে। আর একটা কথা, আমরা পাঠকরা সবসময় একটি পরিপূর্ণ সাধের গল্প চাই। তাই হঠাৎ মাঝপথে গল্পটি থামিয়ে দিয়েন না। যদি কখনো ব্যক্তিগত কোনো ব্যস্ততায় বা সমস্যায় পর্ব পোস্ট করতে বিলম্ব হয় ফোরামে সেটা জানালে আমরা সবসময় আপনার সাথে থাকব। আপনার সফলতা কামনা করছি।
Like Reply
#18
[Image: Gemini-Generated-Image-b3gjlrb3gjlrb3gj.png]

পর্ব দুই
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 2 users Like KaminiDevi's post
Like Reply
#19
অধ্যায় দুই
শব্দের আড়ালে ছায়াশরীর

সকাল ১১টা বেজে দশ মিনিট। জানালার ভারী পর্দার ফাঁক গলে বনানীর তীব্র রোদ এসে পড়েছে মোর্শেদের বিছানায়। ঘুমের ভেতর থেকে অস্বস্তি নিয়ে সে পাশ ফিরল, কিন্তু রোদের তেজ তাকে আর ঘুমাতে দিল না। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে সাধারণত মানুষের ঘুম ভোরে ভেঙে যায়, কিন্তু মোর্শেদের এই অভ্যাস নেই। তার রাতগুলো শেষ হয় অনেক দেরিতে, তাই দিন শুরু হয় মধ্য-দুপুরে।

আড়মোড়া ভেঙে যখন সে উঠে বসল, তখন মাথাটা বেশ ভারী হয়ে আছে। গতরাতের সেই হুইস্কি আর আধশোয়া হয়ে ল্যাপটপে কাটানো সময়গুলোর রেশ যেন এখনো শিরা-উপশিরায় মিশে আছে। সে আলস্যভরা পায়ে জানালার কাছে গিয়ে পর্দাটা সরিয়ে দিল। বাইরে বনানী ডিওএইচএসের সুশীতল নীরবতা। নিচে তার রয়্যাল এনফিল্ড মেটিওর ৩৫০ কভার দিয়ে ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে। মোর্শেদ যান্ত্রিকভাবে ড্রয়ার থেকে মার্লবরোর প্যাকেট আর লাইটারটা বের করল। বাসি মুখে সিগারেটের প্রথম টানে যে ঝাঁঝালো ধোঁয়াটা ফুসফুসে ঢুকল, সেটাই যেন তাকে মনে করিয়ে দিল যে সে এখনো তার নিজের ইকোসিস্টেমে বেঁচে আছে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাধারণত গভীর রাতের কোনো বিশেষ মুহূর্ত বা কথা মানুষকে সকালে তাড়না দেয়, কিন্তু মোর্শেদ এই মুহূর্তে বেশ নিস্পৃহ। কাল রাতে সামিনা নামের সেই রহস্যময়ী নারীর সাথে হওয়া দীর্ঘ কথোপকথন তার মাথায় এই মুহূর্তে তেমন কোনো ঢেউ তুলছে না। বরং সে খুব নির্লিপ্তভাবে তার আজকের দিনটার পরিকল্পনা করতে শুরু করল। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে ডাইনিং টেবিলে বসতেই দেখল তার মামা-মামী হয়তো খেয়েদেয়ে নিজেদের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন । টেবিলে ঢাকা দেওয়া আছে রুটি আর অমলেট। মোর্শেদ নির্বিকারভাবে নাস্তাটা শেষ করল।

নাস্তা শেষে এক মগ কড়া ব্ল্যাক কফি হাতে সে আবার নিজের ঘরে ফিরে এলো। কফির তিতকুটে স্বাদ জিভে লাগতেই হঠাৎ এক নিমেষে গতরাতের সেই শব্দগুলো তার মস্তিষ্কে ধাক্কা দিল— "মানুষ চিনে নেওয়া কঠিন"। এতক্ষণ যে স্মৃতিটাকে সে অবদমিত করে রেখেছিল, তা এক তীব্র টানে সামনে চলে এল। মোর্শেদ কফির মগটা টেবিলে রেখে দ্রুত ল্যাপটপটা খুলল। তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী হার্টবিটটা কেন যেন এই মুহূর্তে একটু অনিয়মিত হয়ে উঠছে।

সে সোজা চলে গেল মেসেঞ্জারে। অবচেতন মনে সে আশা করেছিল, হয়তো সামিনার কোনো একটা মেসেজ এসে পড়ে আছে। কিন্তু ইনবক্স একদম ফাঁকা । মোর্শেদ কিছুটা ইতস্তত করে কিবোর্ডে আঙুল রাখল। সে টাইপ করল: "শুভ সকাল। আপনার রঙ আর ক্যানভাসের জগত কি আজ খুব ব্যস্ত? নাকি বাচ্চারা আপনাকে খুব জ্বালাচ্ছে?"

মেসেজটা সেন্ড করার পর সে দেখল পাশে কেবল একটা ধূসর টিক চিহ্ন। অর্থাৎ মেসেজটা সামিনার ফোনে পৌঁছায়নি, সে অনলাইনে নেই। সামিনা বলেছিল সে এক মধ্যবিত্ত কলেজ শিক্ষিকা, হয়তো এই সময়ে সে যাত্রাবাড়ীর কোনো ঘিঞ্জি ক্লাসরুমে বাচ্চাদের আঁকাআঁকি শেখাচ্ছে।

বিরক্ত হয়ে মোর্শেদ ফেসবুকের সেই 'রাইডার্স গ্রুপ'-এ ঢুকল। তার সেই পাহাড়ি ছবির নিচে কমেন্টের সংখ্যা এখন কয়েকশ ছাড়িয়ে গেছে। সোহেল, রিয়াজরা আরও অনেক চটকদার কথা লিখেছে, তাকে 'লিভিং লিজেন্ড' বলে আকাশচুম্বী প্রশংসা করেছে। মোর্শেদ যান্ত্রিকভাবে কয়েকজনকে উত্তর দিল, কিন্তু কোনোভাবেই সে লেখায় মন বসাতে পারল না। তার চোখ বারবার খুঁজছে সেই আইডিটা—সামিনা জাহান।প্রোফাইল পিকচারে থাকা সেই অন্ধকার জানালার বৃষ্টিভেজা ছবিটা যেন এখন তার সামনে এক প্রকাণ্ড দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সে সামিনার ওয়ালে গিয়ে আবার স্ক্রল করতে লাগল। কাল রাতে দেখা সেই আর্টস আর ক্র্যাফটের ছবিগুলো ছাড়া আর কিছুই নতুন নেই। কোনো মানুষের মুখ নেই, কোনো ব্যক্তিগত তথ্য নেই। এক অদ্ভুত অস্থিরতা মোর্শেদকে গ্রাস করতে শুরু করল। বনানীর এই নিঃসঙ্গতা যেন তাকে গিলে খেতে আসছে। কাল রাতে সে ছিল এই ইকোসিস্টেমের রাজা, আর আজ এক রহস্যময়ী নারীর নীরবতা তাকে এক সাধারণ দাসে পরিণত করেছে। সামিনার কোনো খোঁজ নেই, তার বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে মোর্শেদের মনে সংশয় দানা বাঁধল। 

সামিনার টাইমলাইনটা মোর্শেদ সারা দিনে অন্তত দশবার স্ক্রল করল। সেখানে রহস্যময়ী এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কিছু জলরঙের ছবি, অর্ধেক আঁকা এক জোড়া চোখ, আর একটা পুরনো ভাঙা জানালার ফ্রেম—ব্যস, এটুকুই। কোনো মানুষের মুখ নেই, কোনো ব্যক্তিগত আড্ডার ছবি নেই, এমনকি কোনো চেক-ইন পর্যন্ত নেই। এক অদ্ভুত অস্থিরতা মোর্শেদকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। সামিনা জাহান কি আদৌ কোনো রক্ত-মাংসের মানবী? নাকি কেউ তাকে নিয়ে কোনো সূক্ষ্ম কৌতুক করছে? এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে সে কি শেষ পর্যন্ত কোনো 'ক্যাটফিশ' বা ফেক আইডির ফাঁদে পা দিল? তার মতো একজন ঝানু রাইডার, যে পাহাড় আর সমতলের হাজার হাজার মাইল একাকী পাড়ি দিয়েছে, সে কি সামান্য কিছু শব্দের মায়াজালে আটকা পড়ে গেল?

নিজের ওপর একটা চাপা বিরক্তি নিয়ে মোর্শেদ ফেসবুকের রাইডার্স কমিউনিটি গ্রুপটাতে আবার ঢুকল। এবার সে কেবল সামিনার অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজতে চাইছে। সে সার্চ বক্সে গিয়ে সামিনার নাম লিখে গ্রুপটির ভেতরকার অ্যাক্টিভিটি চেক করতে শুরু করল। কিন্তু ফলাফল সেই শূন্য। সামিনা এই গ্রুপে কোনো পোস্ট দেয়নি, অন্য কারও ছবিতে কোনো কমেন্ট করেনি, এমনকি মোর্শেদের ছবির নিচে ওই একটা মন্তব্য ছাড়া আর কোথাও তার উপস্থিতির চিহ্ন নেই।


মোর্শেদ ভাবতে লাগল, রাইডার্স গ্রুপে সামিনার আসার উদ্দেশ্য কী হতে পারে? সে তো বাইকার নয়, ট্রাভেলারও নয়। একজন আর্ট টিচার, যার জগত তুলি আর ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ, সে কেন হঠাৎ এমন একটা উগ্র গতির নেশায় বুঁদ হওয়া মানুষের ভিড়ে এসে ভিড়ল? আর এসেই বা কেন সরাসরি মোর্শেদকেই বেছে নিল? সামিনা কি তাকে আগে থেকেই চেনে? নাকি সেও মোর্শেদের মতোই কোনো একাকীত্বের গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পথ চলতে চলতে এখানে এসে ঠেকেছে?



ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মোর্শেদের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। তার মনের ভেতর প্রশ্নের পাহাড় জমছে। সে নিজের মনেই ঠিক করে নিল, সামিনার সাথে যদি আবার কথা বলার সুযোগ হয়, তবে সবার আগে এই প্রশ্নটাই সে করবে—"সামিনা, এই অচেনা গতির দুনিয়ায় আপনার প্রবেশের কারণটা ঠিক কী ছিল?"


মেসেঞ্জারের সেই ধূসর টিক চিহ্নটা এখনো নীল হয়ে ওঠেনি। সামিনা এখনো অফলাইন। মোর্শেদ কফির মগের তলানিতে জমে থাকা ঠান্ডা তিতকুটে তরলটুকু এক চুমুকে শেষ করল। সামিনার এই রহস্যময় নীরবতা তাকে যতটা না বিচলিত করছে, তার চেয়ে বেশি করছে আকর্ষিত। সে বুঝতে পারছে, এই ছায়া শরীরী নারীর রহস্য ভেদ না করা পর্যন্ত তার রাতের ঘুম আর দুপুরের শান্তি—দুই-ই এখন থেকে অনিশ্চিত।

কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক ভাবে সিগারেট খাওয়ার পর হুট করে মোর্শেদ খেয়াল করল, তার সামিনাকে পাঠানো মেসেজটা রিসিভড হয়েছে। কিন্তু সামিনা সেটির রিপ্লাই করা তো পরের কথা, দেখেও নি। একটা চাপা রাগ আর অপমান বোধ মোর্শেদ কে গ্রাস করল। অনলাইনে এসে চলেও গেল, অথচ রিপ্লাই ও করল না? রাগতভাবেই বাইক এর চাবিটা হাতে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটের দরজার দিকে এগোলো মোর্শেদ। গতি ছাড়া আর কোনওভাবে এই আগুন নিভবে না। 

সামিনার জীবনের ইকোসিস্টেম মোর্শেদের থেকে একদম আলাদা। এখানে বিলাসবহুল একাকীত্বের কোনো অবকাশ নেই, আছে মধ্যবিত্তের হিসেবী আর হাঁপিয়ে ওঠা ব্যস্ততা। সকাল সাড়ে ছয়টায় অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে যায়। ডিভোর্সি মেয়ে হিসেবে বাপের বাড়িতে থাকার কিছু অলিখিত নিয়ম আছে। সংসারে নিজের জায়গাটা অটুট রাখতে তাকে সারাক্ষণই এক ধরণের তটস্থ অবস্থায় থাকতে হয়। অসুস্থ মায়ের পথ্য তৈরি থেকে শুরু করে সকালের নাস্তা—সবটাই সামিনাকে করতে হয় কলেজের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার অনেক আগে।

সকালবেলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সামিনা যখন নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিল, তখন তার মাথায় গতরাতের কোনো স্মৃতিই সেভাবে ভিড় করেনি। বরং মনে মনে সে মিলিয়ে নিচ্ছিল দুপুরের টিফিনে কী নেবে আর আজ কোন ক্লাসে কী পড়াবে। তার জগতটা খুব সীমাবদ্ধ—কলেজের ক্লাসরুম, ছাত্রছাত্রীদের শোরগোল আর বাড়ির কিছু নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। ড্রয়ার থেকে শাড়ি বের করে পরার সময় সে একবারও ফোনের দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না। তার ফোনটা এখন কেবলই যোগাযোগের একটা যন্ত্র, নেশা নয়।
ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে সে যখন যাত্রাবাড়ীর জ্যাম আর ধুলোবালির মধ্যে দিয়ে কলেজের পথে রওনা হলো, তখনো সে একবারের জন্যও ইন্টারনেট অন করেনি। সামিনা জানে, একবার অনলাইন হওয়া মানেই এক অদৃশ্য জগতের গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়া। আর সেই জগতে মোর্শেদের মতো মানুষেরা শব্দের মায়াজাল বিছিয়ে রাখে। সামিনা সেই মায়ায় এখনই পা দিতে চায় না।



কলেজে পৌঁছানোর পর থেকেই সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। স্টাফ রুমে সহকর্মীদের সাথে টুকটাক কথা আর ক্লাসে ক্লাসে ঘুরে বেড়ানো। দুপুরের দিকে চতুর্থ শ্রেণির একটি আর্ট ক্লাস ছিল। সামিনা আজ ঠিক করেছিল বাচ্চাদের খুব সাধারণ কিছু আঁকা শেখাবে। ক্লাসরুমে ঢুকে সে চকের ডাস্টার হাতে ব্ল্যাকবোর্ডটা পরিষ্কার করল। আজ তার শেখানোর কথা ছিল একটি রিকশা।



বোর্ডে চক ঘষতে ঘষতে সামিনা হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। তার অবচেতন মনের গভীর কোনো কোণ থেকে গতরাতের সেই রাইডার মিস্টার মোর্শেদের গলার স্বর যেন প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। বিশেষ করে মোর্শেদের সেই বাইকের বর্ণনা। চক চলতে লাগল অবাধ্যের মতো। সামিনা রিকশার চাকা আঁকতে গিয়ে খেয়ালই করল না যে সে হ্যান্ডেলের জায়গায় রিকশার পরিবর্তে একটু চওড়া, ক্রোম ফিনিশড ক্রুইজার বাইকের হ্যান্ডেল এঁকে ফেলছে।



রিকশার সেই চিরচেনা হুড বা বসার সিটের বদলে বোর্ডের ওপর ফুটে উঠল একটা ভারি ৩৫০ সিসির পেশিবহুল ইঞ্জিনের আদল। চকের সাদা রেখাগুলো যেন এক অদ্ভুত গতিময়তা খুঁজে পাচ্ছিল। সামিনা যখন মগ্ন হয়ে বাইকের ফুয়েল ট্যাঙ্কের কার্ভটা ফুটিয়ে তুলছে, ঠিক তখনই ক্লাস ক্যাপ্টেন রাফসান পেছন থেকে অবাক হয়ে বলে উঠল, "ম্যাম, এটা তো রিকশা হলো না! এটা তো একদম বাইকের মতো লাগছে। ঐ যে বড় বড় রাজকীয় বাইকগুলো থাকে না? ঠিক তেমন!"



সামিনার হাতের চকের টুকরোটা মেঝেতে পড়ে দু’টুকরো হয়ে গেল। সে থমকে দাঁড়িয়ে বোর্ডের দিকে তাকাল। নিজের অজান্তেই সে বোর্ডে এঁকে ফেলেছে একটি রয়্যাল এনফিল্ড—ঠিক মোর্শেদ যেমনটা বর্ণনা করেছিল। ক্লাসের বাচ্চারা সবাই হোহো করে হেসে উঠল। সামিনা যেন নিজের মনের এক গোপন চুরিতে হাতে-নাতে ধরা পড়ে গেছে। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত সঙ্কোচ আর লজ্জা খেলা করতে লাগল।

সে দ্রুত ডাস্টার দিয়ে ড্রয়িংটা মুছতে শুরু করল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লেগে রইল এক চিলতে মিটিমিটি লাজুক হাসি। এই বয়সে এসে এমন বালখিল্য আচরণ সামিনা নিজেই নিজের কাছে ব্যাখ্যা করতে পারছিল না। কেন একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের শখের বাহন তার মনের ক্যানভাসে এভাবে জায়গা দখল করে নিল? কেন সে আঁকতে গিয়ে রিকশার হাতলের বদলে হাইওয়ের সেই ক্রুইজার বাইকের গতিকে কল্পনা করে ফেলল?



বিকেলের দিকে যখন ক্লাস শেষ হলো, তখনও সামিনার ফোনের ডাটা অফ। সে জানে না বনানীর কোনো এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসে একজন মানুষ তার নীল ডটটার অপেক্ষায় অস্থির হয়ে উঠছে। সে জানে না মোর্শেদ তার পুরো প্রোফাইল অন্তত দশবার তন্নতন্ন করে খুঁজে ফেলেছে। সামিনা চায় এই রহস্যটা আরও কিছুটা দীর্ঘ হোক। হাইওয়ের নীল জ্যামিতিতে যেমন বাঁক থাকে, তাদের এই সম্পর্কের বাঁকগুলোও যেন সেভাবেই লুকানো থাকে।



কলেজ থেকে ফেরার পথে বাসের জানালা দিয়ে জ্যামের দিকে তাকিয়ে সামিনা আবার নিজের মনেই হাসল। রিকশা আঁকতে গিয়ে বাইক এঁকে ফেলার সেই ঘটনাটা তাকে এক বিচিত্র আনন্দ দিচ্ছে। সে ভাবছে, যদি কখনও মোর্শেদকে এই ঘটনাটা বলা হয়, সে কি হাসবে? নাকি সেও অবাক হয়ে ভাববে যে সামিনার মতো এক শান্ত স্বভাবের কলেজ শিক্ষিকাও তার গতির নেশায় কিছুটা হলেও আক্রান্ত হয়েছে?


বাসের ভিড় আর যাত্রাবাড়ীর ধোঁয়ার মাঝে সামিনা নিজেকে খুব নিরাপদ মনে করতে লাগল, যেন এই সাধারণ জীবনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে তার আসল স্বাধীনতা।

সন্ধ্যার আকাশটা আজ কেমন যেন ঘোলাটে, ঠিক মোর্শেদের মনের অবস্থার মতো। বনানীর আভিজাত্য ছেড়ে সে তার মেটিওর নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। নিকুঞ্জের রেললাইনের ধারে একটা ঘিঞ্জি, বস্তিমতো এলাকা—যেখানে নাগরিক সভ্যতার চাকচিক্য এসে থমকে দাঁড়ায়। এখানে একটা পুরনো ঝুপড়ি চায়ের দোকান আছে, যেটার মালিক খলিল। খলিলের এই টং দোকানটাই মোর্শেদের গোপন আস্তানা। রাইডার কমিউনিটির সেই ‘লিভিং লিজেন্ড’ এখানে স্রেফ একজন সাধারণ খদ্দের।

মোর্শেদ দোকানের এক কোণে রাখা নড়বড়ে বেঞ্চিতে বসল। সন্ধ্যার এই আলো-আঁধারিতে চারপাশের পরিবেশটা বড় বেশি অসংলগ্ন মনে হচ্ছে। সাধারণত এই সময় তার সাগরেদ বা পরিচিত ছোট ভাইয়েরা এসে ভিড় করে, কিন্তু আজ এখনো কেউ আসেনি। মোর্শেদের ভেতরটা আজ কেমন যেন হাহাকার করছে। গতরাতের সেই আলাপ আর আজকের সারাদিনের নীরবতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, আজ শুধু হুইস্কি বা মার্লবোরোর ধোঁয়ায় কাজ হবে না। তার স্নায়ুগুলো আজ আরও গাঢ় কিছু চাইছে।


খলিল নিঃশব্দে মোর্শেদের হাতে এক চিমটি কালো কুচকুচে গাঁজা আর একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে গেল। মোর্শেদ জানে, তার এই উচ্চবিত্ত ইকোসিস্টেমে সে একজন সফল মানুষ, কিন্তু এই ঝুপড়ির অন্ধকারে সে একজন পলাতক আসামি। নিজের একাকীত্ব থেকে পলাতক। সে নিপুণ হাতে সিগারেটটা থেকে তামাক বের করে গাঁজাটুকু ভরে নিল। আগুনের ছোঁয়ায় যখন প্রথম টানটা দিল, তখন চারপাশের শব্দগুলো যেন মন্থর হতে শুরু করল।



বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে মোর্শেদ একবারও ফোনের নেট অন করেনি। এক ধরণের ইগো কাজ করছিল তার ভেতর—সামিনা আগে মেসেজ না দিলে সেও করবে না। কিন্তু এখন তার এক বন্ধুকে জরুরি একটা ফোন করা দরকার, একাকিত্বে ভুগছে সে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল।



নেট অন করার সাথে সাথেই ফোনের নোটিফিকেশন বারটা যেন পাগল হয়ে উঠল। একের পর এক গ্রুপ মেসেজ আর ইমেইল। কিন্তু সেই সব কোলাহলের মাঝে ‘টুং’ করে একটা শব্দ কানে বাজল—মেসেঞ্জারের সেই পরিচিত টোন। মোর্শেদের হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর প্রচণ্ড বেগে ধকধক করতে শুরু করল।



বন্ধুকে ফোন করার কথা সে বেমালুম ভুলে গেল। কাঁপাকাঁপা আঙুলে সে ইনবক্সটা খুলল। দেখল, সামিনার সেই অন্ধকার জানালার প্রোফাইল পিকচারটার পাশে সবুজ বাতি জ্বলছে, আর নিচে একটা মেসেজ ঝিলিক দিচ্ছে। মোর্শেদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে একটা সাধারণ টেক্সট মেসেজ তাকে এভাবে তছনছ করে দেবে, তা সে কল্পনাও করেনি।



সে মেসেজটা ওপেন করল। সামিনা লিখেছে: “দুঃখিত মিস্টার রাইডার, আজ সারাদিন ক্যানভাস আর বাস্তবের রঙ মেলাতে গিয়ে ফোনের কথা মনেই ছিল না। আর আপনার সকালের মেসেজের উত্তর? আমার বাচ্চাদের নিয়ে আমি এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে আপনার ওই গতির জগতটা আমার কাছে আজ মরীচিকা মনে হচ্ছিল। তবে একটা মজার কান্ড হয়েছে আজ, শুনলে হয়তো আপনি হাসবেন।”



গাঁজার ধোঁয়া আর সামিনার শব্দের মায়া—দুটো মিলে মোর্শেদের চারপাশের বাতাসটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। নিকুঞ্জের এই নোংরা বস্তির কোণে বসে মোর্শেদের মনে হলো, সে যেন এক বিশাল নীল জ্যামিতির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রতিটি বাহু তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওই রহস্যময়ী নারীর দিকে। সে টাইপ করতে গিয়েও থেমে গেল। তার আঙুলগুলো কাঁপছে। মোর্শেদ বুঝতে পারছে, সে আজ থেকে আর কেবল রাস্তার রাইডার নেই, সে এখন সামিনার শব্দের গোলকধাঁধায় পথ হারানো এক পথিক।



চায়ের দোকানের ঝাপসা আলোয় মোর্শেদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন ওখানেই সামিনার ছায়া শরীরটা লুকিয়ে আছে। সে লিখল, “কী সেই মজার কাণ্ড? আমি কি শুনতে পারি?”


বাইরে তখন রাতের ঢাকা তার নিজস্ব রূপ ধারণ করছে, কিন্তু মোর্শেদের পৃথিবীটা এখন স্রেফ ওই কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিনে বন্দি।

নিকুঞ্জের সেই ঘিঞ্জি গলির ঝুপড়ি দোকানে তখন গাঁজার ধোঁয়া আর সস্তা চায়ের গন্ধ মিলেমিশে একাকার। মোর্শেদ তার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এই ছোট কাঁচের আড়ালে অন্য কোনো গ্রহের সন্ধান পাওয়া যাবে। সামিনার টাইপ করা প্রতিটি শব্দ তার মগজে এক ধরণের ঝংকার তুলছে।

সামিনা লিখল, "শুনুন মিস্টার রাইডার, আজ কলেজে বাচ্চাদের ড্রয়িং ক্লাসে আমি যা করেছি, সেটা আমার ৩৮ বছরের জীবনে এক বিরল ঘটনা। বাচ্চাদের রিকশা আঁকা শেখাতে গিয়ে আমি ব্ল্যাকবোর্ডে মস্ত বড় একখানা বাইক এঁকে ফেলেছি! রিকশার সেই নিরীহ হাতলের বদলে আপনার ওই ক্রুজার বাইকের সেই বাঁকানো হ্যান্ডেলবার আর ফুয়েল ট্যাঙ্ক কখন যে আমার চকের নিচে ফুটে উঠেছে, আমি নিজেও জানি না। ক্লাস ক্যাপ্টেন ধরিয়ে না দিলে আমি হয়তো ওটাকেই রিকশা বলে চালিয়ে দিতাম!"


মোর্শেদ শব্দ করে হেসে উঠল। নিকুঞ্জের এই অন্ধকার আস্তানায় তার এই হাসিটা বেশ বেমানান শোনাল। আশেপাশে দুই-একজন কৌতূহলী চোখে তাকাল, কিন্তু মোর্শেদের সেদিকে খেয়াল নেই। সে দ্রুত টাইপ করল, "বলেন কী! তার মানে আপনি কি অবচেতন মনে আমার মেটিওর-এর প্রেমে পড়ে গেলেন? নাকি রাইডারের?"
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 7 users Like KaminiDevi's post
Like Reply
#20
সামিনা উত্তর দিতে দেরি করল না, "উঁহু, প্রেমে পড়া সহজ নয়। তবে আপনার ওই গতির বর্ণনাগুলো বোধহয় আমার শিল্পী সত্তাকে একটু বেশিই নাড়া দিয়েছে। আমি বাইক আর রিকশার জ্যামিতি গুলিয়ে ফেলেছিলাম। আর আমার ছাত্ররা তো হেসেই খুন। তারা ভাবছে তাদের আর্ট টিচার বোধহয় এখন থেকে কোনো বাইক গ্যাং-এর মেম্বার হয়ে গেছে!"



মোর্শেদ একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। নেশাটা এখন তার রক্তে কথা বলছে। সে লিখল, "আচ্ছা সামিনা, আপনার এই যে বাইক নিয়ে এত কল্পনা, আপনি কি কখনো বাইক চালিয়েছেন? নাকি শুধুই ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ?"



সামিনা হেসেই খুন। স্ক্রিনে একের পর এক হাসির ইমোজি ভেসে উঠল। সে লিখল, "আমি? বাইক চালাব? মিস্টার মোর্শেদ, আমি সাইকেল চালাতেই হিমশিম খাই। তবে হ্যাঁ, বাইকের পেছনে বসতে আমার সব সময় খুব ভালো লাগে। যদিও সেভাবে কোনোদিন চড়া হয়নি। বড়জোর ওই কাজিনদের পেছনে বসে গলির মোড় পর্যন্ত যাওয়া। হাইওয়েতে বাতাসের ঝাপটা মুখে নিয়ে বাইকে চড়ার অভিজ্ঞতা আমার ডিকশনারিতে নেই।"



মোর্শেদ এবার একটু নড়েচড়ে বসল। সে সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইল না। সে লিখল, "অভিজ্ঞতা নেই বলেই তো সেটা তৈরি করার একটা রোমাঞ্চ থাকে। হাইওয়েতে যখন বাইক ১০০ কিমি গতিতে চলে, তখন পৃথিবীর সব চিন্তা ওই বাতাসের সাথে উড়ে যায়। শুধু থাকে সামনে অবারিত রাস্তা আর ইঞ্জিনের ছন্দ। আপনি তো শিল্পী, এই ছন্দটা আপনার চেনার কথা।"

কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর মোর্শেদ আবার লিখল, "একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করছে। আপনি বাইক চালান না, চেনেনও না—তাহলে এই রাইডার্স গ্রুপে আপনার মতো একজন শান্ত স্বভাবের আর্ট টিচার কী করতে এলেন? আপনি কি ভুল করে এই গতির দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছেন?"

সামিনা রিপ্লাই দিল, "আসলে কয়েকদিন আগে ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে একটা পাহাড়ি বনের ছবি আমার চোখে পড়ে। গভীর অরণ্যের মাঝ দিয়ে একটা সরু রাস্তা চলে গেছে—ছবিটা এতই জীবন্ত ছিল যে আমি ভাবলাম হয়তো কোনো ট্রাভেল গ্রুপ। সেখানে ক্লিক করতেই এই রাইডার্স গ্রুপটা সামনে এল। অ্যাড হওয়ার পর দেখলাম এখানে মানুষেরা গতির চেয়েও বেশি সৌন্দর্যের উপাসনা করে। আপনার ওই নীল পাহাড়ের ছবিটা দেখেই মূলত আমি কমেন্ট করার সাহস পেয়েছিলাম।"

মোর্শেদ মৃদু হেসে লিখল, "তার মানে আপনি বনের টানে এসে বাইকের জালে আটকে গেলেন? তবে একটা কথা কবুল করি—আপনি আজ বোর্ডে বাইক এঁকেছেন, আর আমি আজ সারাদিন আমার বনানীর ঘরের জানালায় বসে আপনার ওই রহস্যময়ী ছায়া শরীরটা কল্পনা করেছি। আমি ভেবেছি, আপনি যখন কলেজে বাচ্চাদের পড়ান, তখন আপনার কপালের ওই টিপটা কি ঘামে ভিজে যায়? নাকি আপনি খুব গম্ভীর হয়ে ক্লাসে বসে থাকেন?"

সামিনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে লিখল, "আপনি কি এখন আমার অবয়ব নিয়ে ফ্লার্ট করছেন, মিস্টার রাইডার? একজন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী মানুষের কল্পনা কি এতই প্রখর?"

মোর্শেদ লিখল, "পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সটা তো কেবল সংখ্যার জ্যামিতি। ভেতরে যে রাইডার আছে, সে তো এখনো অজানার সন্ধানে ঘর ছাড়ে। আমি কল্পনা করছি, আপনি যখন বাসে করে ফিরছেন, তখন জ্যামের ফাঁকে কোনো একটা বাইক পাশ দিয়ে চলে গেলে আপনি কি একবারের জন্যও ভাবেন—ওখানে মোর্শেদ থাকলেও থাকতে পারত?"

সামিনা উত্তর দিল, "হয়তো ভেবেছি। হয়তো আজ বোর্ডে ওই ক্রুজার বাইকটা আপনার অস্তিত্বের জানান দিতেই এসেছিল। আপনার শব্দগুলো খুব ধারালো, মোর্শেদ সাহেব। আপনি খুব সহজেই একজন নারীর মগজে ঢুকে পড়ার কায়দা জানেন।"

মোর্শেদ নেশাগ্রস্ত চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকল। নিকুঞ্জের অন্ধকার যেন এখন সামিনার নীল জ্যামিতিতে ঢেকে গেছে। সে লিখল, "মগজে তো ঢুকেছি, এবার হৃদপিণ্ড আর হাইওয়ের পালসটা মেলাতে চাই। কোনো একদিন কি আমার এই মেটিওরের পেছনের সিটটা আপনার জন্য বরাদ্দ হতে পারে? যেখানে কোনো ব্ল্যাকবোর্ড থাকবে না, থাকবে শুধু পিচঢালা রাস্তা আর নীল আকাশ?"

সামিনা সেই কথার কোনও উত্তর দিল না। এবার মোর্শেদ একটু ভয় পেয়ে গেল। বেশি সাহস করে ফেলেছে কি সে? কিছুক্ষণ পর খেয়াল করল, সামিনা অফলাইনে চলে গেছে। 

আর  বসে থাকতে ইচ্ছে করল না মোর্শেদের। বাইক টেনে সে বাসায় চলে যাবে এখনই। খলিলের থেকে গাজা নিয়ে সে বাইকে চড়ে বসল। 

নিকুঞ্জের সেই ধোঁয়াটে আস্তানা ছেড়ে মোর্শেদ যখন বনানীর ফ্ল্যাটে ফিরল, তখন রাত বারোটা পার হয়ে গেছে। লিফটে ওঠার সময়ও সে বারবার ফোনের স্ক্রিনটা চেক করছিল, কিন্তু সামিনা সেই যে কিছু না বলে অফলাইন হলো, আর ফেরেনি। মোর্শেদের মনের ভেতর একটা খচখচানি রয়েই গেল। সামিনা কি ইচ্ছা করেই চ্যাটটা ওভাবে শেষ করল? নাকি সে সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে?
ফ্ল্যাটে ঢুকে মোর্শেদ কোনো আলো জ্বালাল না। বারান্দার বড় কাঁচের জানালা দিয়ে আসা শহরের নিওন আলোয় ঘরটা এক অদ্ভুত মায়াবী রূপ নিয়েছে। সে জ্যাকেটটা সোফায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে একটা জয়েন্ট জ্বালিয়ে নিল। নিকুঞ্জ থেকে আনা সেই কাঁচা ঘাসের তীব্র ঘ্রাণে ঘরটা ভরে উঠছে। নেশাটা তার মগজের কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়তেই সে সোফায় গা এলিয়ে দিল।

মাথার ভেতর সামিনার সেই কথাগুলো লুপের মতো বাজছে— "মগজে তো ঢুকেছেন, হৃদপিণ্ডে আর হাইওয়ের পালসটা মেলাতে চাই।" সে কি বেশি ফ্লার্ট করে ফেলল? সামিনা কি ভয় পেল? নাকি এই যে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া, এটাও সামিনার কোনো এক জ্যামিতিক চাল?

মোর্শেদ ভাবছিল দ্বিতীয় জয়েন্টটা ধরাবে কি না। ঠিক তখনই তার ফোনটা নীল আলোয় জ্বলে উঠল। একটা মেসেজ টোন। মোর্শেদ অনেকটা ছোঁ মেরে ফোনটা তুলল।

সামিনা অনলাইনে। সে লিখেছে: "সরি মিস্টার রাইডার। হুট করে কারেন্ট চলে গিয়েছিল বলে ওয়াইফাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফোনের ডাটাও কাজ করছিল না। আপনি কি ভেবেছিলেন আমি পালিয়েছি?"

মোর্শেদ এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে হাসল। তার দুশ্চিন্তার মেঘগুলো যেন এক নিমেষে কেটে গেল। সে দ্রুত টাইপ করল: "পালানোর পথ তো আমি আপনাকে দেব না সামিনা। তবে এই যে হঠাৎ করে অন্ধকার হয়ে যাওয়া, এটা আপনার রহস্যটাকে আরও বাড়িয়ে দিল। আমি তো ভেবেছিলাম আপনি কোনো মরীচিকা হয়ে বিলীন হয়ে গেলেন।"

সামিনা উত্তর দিল: "মরীচিকা হলে তো দেখা দেওয়া সহজ ছিল। রক্ত-মাংসের মানুষ বলেই তো নেটওয়ার্ক আর কারেন্টের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই যে অন্ধকারে বসে আছি, আমার জানালার বাইরে এখন শুধু রাস্তার একটা টিমটিমে আলো। মনে হচ্ছে আমি একটা শূন্যতায় বসে আছি।"

মোর্শেদ লিখল: "সেই শূন্যতায় আমার বাইকের হেডলাইটের আলো ফেললে কেমন হয়? আপনার অন্ধকার জানালায় যদি হঠাৎ কোনো আগন্তুক শব্দের জোয়ার নিয়ে আসে?"

সামিনা এবার একটা দীর্ঘ রিপ্লাই দিল: "শব্দের জোয়ার নিয়ে আসা সহজ, কিন্তু সেই স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া কঠিন। মিস্টার মোর্শেদ, এই অন্ধকারের একটা সুবিধা আছে জানেন? মানুষ তখন নিজের ভেতরের শব্দগুলো পরিষ্কার শুনতে পায়। আপনার ওই নীল পাহাড়ের বাইক রাইডিং-এর কথা ভাবতে ভাবতে আমি আসলে নিজের এই একঘেয়ে জীবনের মানে খুঁজছিলাম।"

মোর্শেদ বুঝতে পারল, নেশার ঘোরে সে সামিনার মনের আরও গভীরে প্রবেশ করছে। সে দ্বিতীয় জয়েন্টটা জ্বালিয়ে নিল। আগুনের ফুলকিটা অন্ধকারে একবার জ্বলে উঠল। সে লিখল: "মানে খোঁজার দরকার নেই সামিনা। জীবনটা কোনো ড্রয়িং বুক নয় যে সব রঙ পারফেক্ট হতে হবে। মাঝেমধ্যে হাইওয়ের মতো অগোছালো গতিতেও আনন্দ থাকে। আপনি আজ বোর্ডে বাইক এঁকেছেন, এটা কোনো ভুল নয়—এটা আপনার মুক্তির এক অবচেতন বহিঃপ্রকাশ।"

সামিনা লিখেছে: "আপনি খুব ভয়ঙ্কর ভাবে কথা বলেন। মানুষের মনের আগল খুলে ফেলার জাদুমন্ত্র আপনার জানা আছে। আচ্ছা, সত্যি করে বলুন তো—এই যে মধ্যরাতে একজন অপরিচিত নারীর সাথে এভাবে কথা বলছেন, আপনার কি কোনো ভয় করে না?"

মোর্শেদ হাসল। সে টাইপ করল: "ভয় তো তাদের লাগে যাদের হারানোর কিছু আছে। আমি তো পাঁচ বছর আগেই সব হারিয়ে একাকীত্বের এই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছি। এখন আমি শুধু খুঁজে পেতে চাই। যেমন আজ আপনাকে খুঁজে পেয়েছি।"

অন্ধকার ঘরে মোর্শেদ আর সামিনার এই শব্দ-সংঘাত এখন এক ভিন্ন মাত্রা নিচ্ছে। ফোনের স্ক্রিনের আলোয় মোর্শেদের মুখটা দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তার চোখে তখন এক শিকারী অথচ তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি। ওপাশে সামিনাও হয়তো অন্ধকারের গহ্বরে বসে নিজের অজান্তেই হাইওয়ের নীল জ্যামিতির জালে আটকে পড়ছে।

অন্ধকার ঘরে মোর্শেদের হাতের জয়েন্টটা নিভে এসেছে। ফোনের স্ক্রিনের নীল আলোয় তার মুখটা এখন অনেক বেশি গম্ভীর দেখাচ্ছে। সে বুঝতে পারল, সামিনার সাথে এই 'অপরিচিত' থাকার খেলাটা বেশিক্ষণ চালিয়ে গেলে হয়তো সামিনা আবার গুটিয়ে যাবে। ফ্লার্ট করার চেয়ে এখন সামিনার জীবনের গভীরে একটু উঁকি দেওয়া দরকার। সামিনা মানুষটা ঠিক কেমন, তার জীবনের বাঁকগুলো কোথায়—সেটা না জানলে হাইওয়ের এই নীল জ্যামিতি পূর্ণতা পাবে না।
মোর্শেদ বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে টাইপ করল, "আচ্ছা সামিনা, অনেক তো বাইক আর বোর্ড নিয়ে কথা হলো। এবার একটু আপনার কথা শুনি? যাত্রাবাড়ীর এই কলেজ শিক্ষিকার জীবনে রঙ আর তুলি ছাড়া আর কী আছে? মানে, বাড়ি ফিরলে আপনার জন্য অপেক্ষা করে থাকে এমন কেউ?"

ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসতে কিছুটা সময় নিল। হয়তো সামিনা ভাবছে কতটুকু বলবে। তারপর স্ক্রিনে ভেসে উঠল, "অপেক্ষা করার মতো মানুষ বলতে আমার মা। আর ভাই-ভাবির সংসার। আমি আসলে এই সংসারের এক কোণে নিজের একটা ছোট্ট জগত বানিয়ে নিয়েছি। আমার জীবনে এখন আর নতুন করে কারও অপেক্ষা করার অবকাশ নেই।"

মোর্শেদ সরাসরি পয়েন্টে গেল, "অর্থাৎ আপনি একা? মানে আপনার দাম্পত্য জীবন..."

সামিনা এবার বেশ সোজাসুজি উত্তর দিল, "আমি ডিভোর্সি। আজ প্রায় তিন বছর হতে চলল। একটা ভুল সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার পর মনে হয়েছে, একাকীত্ব আসলে অনেক বেশি নিরাপদ। অন্তত এখানে কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না।"

মোর্শেদের বুকে একটা চিনচিনে অনুভূতি হলো। সে টাইপ করল, "জানেন সামিনা, আমাদের জীবনে মিল অনেক। আমি আজ পাঁচ বছর হলো ডিভোর্সি। আমার এই বনানীর বিশাল ফ্ল্যাটটা আসলে একটা ১৬০০ স্কয়ার ফিটের খাঁচা। এই খাঁচায় আমি রাজা হতে পারি, কিন্তু দিনশেষে আমি ভীষণ একা। এই জন্যই হয়তো রাতের বেলা বাইক নিয়ে হাইওয়েতে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।"

সামিনা লিখল, "তার মানে আমরা দুজনই দুটো আলাদা গোলার্ধের একাকী মানুষ। অদ্ভুত না? ইন্টারনেটের এই ভিড়ে আমরা আমাদের নিঃসঙ্গতাগুলোকে ভাগ করে নিচ্ছি।"

মোর্শেদ এবার একটু দুষ্টু হাসি হেসে লিখল, "নিঃসঙ্গতা ভাগ করা তো ভালো, কিন্তু এই তিন বছরে আপনার জীবনে কি নতুন কোনো 'অনুপ্রেরণা' আসেনি? মানে কোনো বয়ফ্রেন্ড? নাকি আপনি এখনো সেই পুরনো কলেজের আর্ট টিচারের মতোই একদম সিঙ্গেল?"

সামিনা উত্তর দিল, "বয়ফ্রেন্ড? এই বয়সে এসে আবার প্রেম করার এনার্জি কোথায় মিস্টার রাইডার? বাচ্চারা জ্বালিয়ে মারে, কলেজ সামলাই, বাড়ি ফিরে মায়ের সেবা করি। প্রেম করার মতো বিলাসিতা আমার নেই। আমি 'প্রাউডলি সিঙ্গেল'। আর আপনার কী খবর? আপনার মেটিওরের পেছনের সিটে বসার জন্য নিশ্চয়ই মেয়েদের লাইন লেগে থাকে?"

মোর্শেদ লিখল, "মেয়েদের লাইন হয়তো লাগে, কিন্তু আমার পেছনের সিটটা বড় বেশি জেদি। সে সবাইকে জায়গা দেয় না। আপনি যেহেতু বললেন বাইকে চড়তে ভালোবাসেন, তাই ভাবছি আমার এই সিঙ্গেল সিটটা আপনার জন্য একবার উন্মুক্ত করা যায় কি না।"

সামিনা রিপ্লাই দিল, "আপনি কিন্তু আবার সেই ফ্লার্ট করা শুরু করলেন! হাইওয়ের রাইডাররা কি সবাই এমন হয়? কথায় কথায় মেয়েদের বাইকে তোলার স্বপ্ন দেখায়?"

মোর্শেদ মুচকি হেসে লিখল, "সবাই হয় কি না জানি না, তবে আমি কেবল তাকেই স্বপ্ন দেখাই যার কল্পনায় ড্রয়িং বোর্ড আর ক্রুজার বাইক এক হয়ে যায়। আচ্ছা সামিনা, এই যে আমরা ফ্লার্ট করছি, আপনার কি মনে হচ্ছে না যে আপনি আগুনের সাথে খেলছেন?"

সামিনা একটা হাসির ইমোজি দিয়ে লিখল, "আগুন যদি শব্দের হয়, তবে তাতে পুড়তে খুব একটা ভয় নেই। বরং উষ্ণতা পাওয়া যায়। তবে সাবধান মিস্টার মোর্শেদ, আমি কিন্তু আর্ট টিচার, আগুনের রঙও পাল্টে দিতে জানি!"
রাত গভীর হচ্ছে। মোর্শেদ অনুভব করল, সামিনা আর কেবল মেসেঞ্জারের ওপারে থাকা কোনো আইডি নয়, সে এখন তার অস্তিত্বের গভীরে ধীর পায়ে প্রবেশ করছে। দুজনের একাকীত্বের এই ইকোসিস্টেম এখন একে অন্যের সাথে মিশে গিয়ে এক নতুন জ্যামিতি তৈরি করছে।

অন্ধকার ঘরে দ্বিতীয় জয়েন্টটার শেষাংশটুকু অ্যাশট্রেতে পিষে ফেলল মোর্শেদ। নেশার আবেশে তার চারপাশটা এখন থিতু হয়ে এসেছে, কিন্তু মনের ভেতরে এক ধরণের চপলতা দানা বাঁধছে। সামিনার সাথে এই 'একাকীত্বের সমীকরণ' মেলাতে মেলাতে সে এখন অনেকটা সাহসী হয়ে উঠেছে।
সে টাইপ করল, "আচ্ছা সামিনা, কথা তো অনেক হলো। কিন্তু আমার কল্পনার ক্যানভাসটা না এখনো একটু অপূর্ণ রয়ে গেছে। আপনার রূপ নিয়ে কিছু ভাবব, তার তো কোনো উপায় রাখলেন না।"

সামিনা দ্রুত উত্তর দিল, "রূপ? ওমা! আপনি কি আমার রূপ দেখেছেন নাকি যে হুট করে এমন কথা বলছেন?"

মোর্শেদ কীবোর্ডে আঙুল চালাল, "দেখতে দিলেন কই? দুনিয়ার সবাই ফেসবুকে নিজেদের জীবনের অ্যালবাম খুলে বসে থাকে, আর আপনার ওয়ালে কেবল ওই অন্ধকার জানালার ছবি। আমি তো জানি না ওপাশে থাকা মানুষটা কি পরীর মতো সুন্দর, নাকি এক সাধারণ মায়াবিনী। আমাকে কি একবার দেখা দেওয়া যায় না?"

সামিনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা হাসির ইমোজি পাঠিয়ে লিখল, "না মিস্টার রাইডার, দেখা দেওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ। আমি আসলে পর্দার আড়ালে থাকতেই ভালোবাসি। তাছাড়া আমি তো আগেই বলেছি, আমি এক অতি সাধারণ কলেজ শিক্ষিকা। দেখলে আপনার ওই রাজকীয় বাইকের সাথে আমাকে মেলাতে পারবেন না।"

মোর্শেদ ছাড়ার পাত্র নয়। সে লিখল, "সাধারণই হোক বা অসাধারণ—মানুষের তো একটা অবয়ব থাকে। আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? নাকি নিজের সৌন্দর্য নিয়ে খুব বেশি সচেতন?"

সামিনা লিখল, "ভয়? না না। তবে একটা কথা বলে রাখি—দেখলে যদি প্রেমে পড়ে যান, সেই দায়িত্ব কিন্তু আমি নিতে পারব না। এই বয়সে এসে ওসব প্রেমের দায়ভার সামলানোর শক্তি আমার নেই।"

মোর্শেদ হেসে ফেলল। নেশার ঘোরে তার হাসিটা আজ অনেক বেশি প্রাণবন্ত। সে লিখল, "প্রেমের দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে না, ওটা আমার একাকীত্ব বুঝে নেবে। আচ্ছা ঠিক আছে, ছবি দিতে হবে না। কিন্তু আপনি তো আর্ট টিচার, ক্যানভাসে ছবি না এঁকেও তো শব্দ দিয়ে রূপের বর্ণনা দেওয়া যায়। নিজেকে একটু এঁকে দেখান না দেখি আপনার ওই শব্দের তুলিতে। আপনার চোখ দুটো কেমন? নাকি আপনার হাসিটা ওই বোর্ডে আঁকা বাইকের বাঁকের মতোই রহস্যময়?"

সামিনা রিপ্লাই দিল, "আপনি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন, মিস্টার রাইডার। নিজের বর্ণনা নিজে দেওয়াটা বেশ লজ্জার। তবে এটুকু বলতে পারি, আমার চোখে আপনি হয়তো একরাশ ক্লান্তি আর অবহেলার ছায়া ছাড়া আর কিছুই পাবেন না। আমি কোনো রূপবতী রাজকন্যা নই।"

মোর্শেদ লিখল, "ক্লান্তিতেই তো আসল মায়া থাকে সামিনা। বর্ণনাটা কি আরেকটু ডিটেইলড করা যায়? আর্ট টিচার তো এসব ভালো পারার কথা।"

কিছুক্ষণ ইনবক্সে 'typing...' লেখাটা ভেসে থাকল, যেন সামিনা কিছু একটা লিখতে গিয়েও মুছে ফেলল। মোর্শেদের হৃদস্পন্দনটা তখন বেশ চড়া। সে আশা করছিল সামিনা হয়তো এবার নিজের সম্পর্কে কোনো একটা ইঙ্গিত দেবে।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর সামিনা লিখল, "বর্ণনাটা আজ না হয় তোলা থাক। রাতের অন্ধকার এখন একটু বেশিই ঘন হয়ে গেছে। শব্দের তুলি দিয়ে নিজেকে আঁকতে গেলে হয়তো আমি নিজেই নিজের কাছে অচেনা হয়ে যাব। আজ আর নয়, মিস্টার মোর্শেদ। হাইওয়ের রাইডাররা যেমন গন্তব্য ছাড়াই বেরিয়ে পড়ে, আজকের আলাপটাও না হয় সেই গন্তব্যহীন মোড়েই শেষ হোক।"

মোর্শেদ কিছু একটা টাইপ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই দেখল সামিনার নামের পাশের সবুজ বাতিটা নিভে গেছে। সামিনা কোনো বর্ণনা বা ছবি না দিয়েই এক অদ্ভুত অতৃপ্তি রেখে অফলাইন হয়ে গেল।

মোর্শেদ স্তব্ধ হয়ে ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনা যেন এক রহস্যময়ী শিল্পী, যে মোর্শেদকে একটা সুন্দর ছবির সামনে দাঁড় করিয়ে ঠিক যখন পর্দাটা তোলার কথা, তখনই স্টুডিওর আলো নিভিয়ে দিয়েছে। 

অন্ধকার ঘরে মোর্শেদের মনে হলো, এই রহস্যটাই হয়তো সামিনাকে তার কাছে আরও বেশি অনিবার্য করে তুলছে।

সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনের লক বাটনটা টিপে দিল। বনানীর এই ফ্ল্যাটে এখন আবার সেই 'একাকীত্বের ইকোসিস্টেম' ফিরে এসেছে, তবে আজকের নিঃসঙ্গতাটা একটু অন্যরকম—সেখানে হাইওয়ের বাতাস আর এক অদৃশ্য নারীর মায়া মিশে আছে। 


অন্ধকার ঘরে মোর্শেদ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। ফোনের স্ক্রিনটা নিভে যাওয়ার পর ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। সামিনা অফলাইন হয়ে যাওয়ার পর বনানীর এই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটা এখন আবার তার কাছে এক প্রকাণ্ড মরুভূমির মতো মনে হচ্ছে।


একাধিকবার সে সামিনার প্রোফাইল পিকচারটা জুম করে দেখল—সেই একই বৃষ্টিভেজা আবছা জানালা। ৩৮ বছর বয়সের এক নারী, যার শব্দের মধ্যে অদ্ভুত এক পরিপক্বতা আর রহস্য আছে, সে দেখতে কেমন হতে পারে? সে কি খুব ছিপছিপে গড়নের, নাকি তার শরীরে মধ্যবয়সের এক ধরণের ভারী আভিজাত্য আছে? তার গায়ের রঙ কি চাপা নাকি উজ্জ্বল শ্যামলা? মোর্শেদ কল্পনা করতে চাইল সামিনা যখন আর্ট ক্লাসের বোর্ডে সেই ক্রুজার বাইকটা আঁকছিল, তখন তার চোখের দৃষ্টি কি তীক্ষ্ণ ছিল?
কিন্তু বেশিক্ষণ সে যুক্তিতে স্থির থাকতে পারল না। নিকুঞ্জ থেকে নিয়ে আসা সেই গাঁজার নেশাটা এখন তার রক্তে জোয়ারের মতো বইছে। দ্বিতীয় জয়েন্টটা শেষ করার পর থেকে তার স্নায়ুগুলো ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে, আর কল্পনাগুলো হয়ে উঠছে লাগামহীন।

মোর্শেদ সোফায় মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। নেশার ঘোরে ঘরের সিলিংটা যেন এক বিশাল নীল হাইওয়েতে পরিণত হলো। সেই হাইওয়ের একপাশে কোনো এক ছায়া শরীর দাঁড়িয়ে আছে। সে সামিনাকে কল্পনা করার চেষ্টা করল, কিন্তু সামিনার কোনো স্পষ্ট মুখাবয়ব তার সামনে ফুটে উঠল না। কেবল ফুটে উঠল এক জোড়া সুডৌল বাহু, শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে জেগে ওঠা এক ভাঁজ করা উদর আর হাইওয়ের বাতাসে উড়তে থাকা একরাশ কালো চুল।

মোর্শেদের কামনার পারদ চড়তে লাগল। সে অনুভব করল, তার মেটিওরের পেছনের সিটে কেউ একজন বসে আছে। তার দু’হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে মোর্শেদের কোমর। বাতাসের প্রচণ্ড গতির কারণে সেই রহস্যময়ী নারী মোর্শেদের পিঠের সাথে লেপ্টে আছে। মোর্শেদ তার পিঠে অনুভব করতে পারল এক জোড়া উষ্ণ মাংসল চাপের অস্তিত্ব। সেই নারীর গায়ের থেকে ভেসে আসা আর্দ্র গন্ধ আর ঘামের একটা বুনো সুবাস মোর্শেদের মগজে কামনার আগুন জ্বালিয়ে দিল।

নেশা আর একাকীত্বের চরম মুহূর্তে মোর্শেদের কল্পনা এখন বল্গাহীন। সে ভাবল, সেই অচেনা নারী যদি এখন এই ঘরে থাকত? যদি এই অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে সামিনার শাড়ির প্রতিটি পিন একে একে খুলে ফেলত? সামিনা কি বাধা দিত? নাকি হাইওয়ের গতির মতোই সেও নিজেকে বিলিয়ে দিত এই উত্তপ্ত ইকোসিস্টেমে? মোর্শেদের আঙুলগুলো অবচেতনেই সোফার কুশনটা শক্ত করে খামচে ধরল। তার কল্পনায় সামিনা এখন এক আদিম মানবী, যার কোনো মুখ নেই, কিন্তু যার শরীরের প্রতিটি বাঁক মোর্শেদের জন্য এক একটি নীল জ্যামিতির ধাঁধা।

কামনার এই তীব্র স্রোতে মোর্শেদ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। ঘরের এসিটা ১৬ ডিগ্রিতে চললেও তার কপাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরছে। সামিনার সেই না বলা শব্দগুলো এখন তার কানে কামুক ফিসফিসানি হয়ে বাজছে। হাইওয়ের সেই নীল জ্যামিতি এখন আর কোনো রাস্তার মানচিত্র নয়, তা হয়ে উঠেছে দুই অতৃপ্ত শরীরের এক গোলকধাঁধা।

নেশার ঘোর আর কামোত্তেজক কল্পনার চরম শিখরে পৌঁছানোর পর মোর্শেদ একসময় নিস্তেজ হয়ে পড়ল। বাইরের রাতটা এখন অনেক বেশি শান্ত, কিন্তু মোর্শেদের মনের ভেতর যে তুফান সামিনা তুলে দিয়ে গেছে, তার রেশ কাটতে হয়তো অনেক সময় লাগবে। সে এখনো জানে না সামিনা দেখতে কেমন, কিন্তু সামিনার সেই ‘ছায়া শরীর’ আজ রাতে মোর্শেদের এই বিলাসবহুল একাকীত্বকে তছনছ করে দিয়ে গেছে।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 8 users Like KaminiDevi's post
Like Reply




Users browsing this thread: 4 Guest(s)