Posts: 334
Threads: 3
Likes Received: 390 in 201 posts
Likes Given: 238
Joined: Jul 2025
Reputation:
49
(07-02-2026, 08:15 PM)Ra-bby Wrote: কই, আমি শুনতে পেলাম না যে
ইউটিউবে গিয়ে দেখন তো ভাই , এখন থেকেই যাবেন , একটু কস্ত করে দেখেন
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
•
Posts: 317
Threads: 2
Likes Received: 1,355 in 250 posts
Likes Given: 126
Joined: Oct 2025
Reputation:
223
(07-02-2026, 08:23 PM)gungchill Wrote: ইউটিউবে গিয়ে দেখন তো ভাই , এখন থেকেই যাবেন , একটু কস্ত করে দেখেন
youtube a thik ase. but aikhane amar device theke sound aschena.....janina amr device problem kina
অসমাপ্ত আত্মজীবনী
খেলা যে চলছে কোন লেবেলে
Posts: 334
Threads: 3
Likes Received: 390 in 201 posts
Likes Given: 238
Joined: Jul 2025
Reputation:
49
09-02-2026, 08:00 PM
(This post was last modified: 09-02-2026, 08:23 PM by gungchill. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
কিছু সম্পর্কঃ ৯ (ঙ) এর বাকি অংশ
আয়শা আর রানী যখন করিডর দিয়ে হেটে আসছিলো , তখনো রাজিব কোরিডরে বসা , ও নাস্তা আনতে যায়নি , কারন ও জানতো বাসা থেকে খাবার কিছুক্ষনের মাঝেই পৌঁছে যাবে । আয়শার সাথে ওর কথা হয়েছিলো । ওদের দেখে রাজিব উঠে দাড়ায়, হাসি মুখে সামনে এগিয়ে জেতে নেয় , ঠিক তখনি পেছনে জয়ের আবির্ভাব হয় , হাতে টিফিন ক্যারিয়ার । এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় রাজিব , চোখাচোখি হয় জয়ের সাথে । চোখাচোখি হতেই দুজনেই প্রায় একসাথে চোখ সরিয়ে নেয়—যেন কেউ প্রথমে থামলে অন্যজনের ভেতরের কথা বেরিয়ে পড়বে।
রাজিব নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকে, আর সামনে এগোয় না। জয়ের মুখটা দেখেই রাজিবের পা দুটো থমকে যায়। ঠিক ভয় নয়, ঠিক রাগও নয়—একটা পুরোনো পরিচিত অনুভূতি, যেটা এখন আর পরিচিত লাগে না। একসময় যাদের দূরত্ব বোঝারই কথা ছিল না, তাদের মাঝখানে এখন কয়েক কদম ফাঁক পড়ে গেছে—আর সেই ফাঁকটা পেরোতে রাজিবের অদ্ভুত লাগে।
জয় নিজেও একটু থমকে দাড়ায় , হাতে ধরে টিফিন ক্যারিয়ারের উপর হাতের চাপ আরো কিছুটা বারে , চোখে রাগ নেই—আছে একটা ছোট্ট ভুল।হয়তো ভুলও নয়, কিন্তু ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা।
রাজিব , জয়ের দিকটা উপেক্ষা করেই রানী আর আয়শার দিকে তাকায়। হাঁটার সময় আয়শা রানীর একটা হাত ধরে রেখেছে। রাজিব একটা ছোট শ্বাস ফেলে। রানীকে স্বাভাবিকই লাগছে তার কাছে। এতে একটু স্বস্তি পায় রাজিব।
সকালে রানীকে ফোন করে সে ডাক্তাররা রহিম সম্পর্কে যতটা ভালো খবর বলেছিল, তার চেয়েও একটু বাড়িয়ে বলেছিল—রানী যেন দুশ্চিন্তামুক্ত থাকে।
রানী একবার রাজিবের দিকে তাকিয়ে আবার স্বাভাবিকভাবেই চোখ ফিরিয়ে নেয়। ঠিক তখনই রাজিবের চোখে একটা ব্যাপার ধরা পড়ে। রানী শুধু ভারমুক্তই নয়—ওর চোখের কোণে যেন একটা হালকা উজ্জ্বলতা লেগে আছে, আর ঠোঁটের কোণে একটা চেপে রাখা হাসি।
রাজিব একটু অবাক হয়। অনেক দিন পর রানীর মুখে এমন একটা সহজ ভাব দেখছে সে। তবে বিষয়টা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবে না। বরং ভালোই লাগে। গতকাল ওকে এমন ভয় পেতে দেখার পর, আজ এই মুখটাই রাজিবের জন্য যথেষ্ট।
আয়শার দিকে তাকিয়ে ওর মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। আয়শা যেমন এখনো রানীর হাত ধরে আছে, রাজিবের বুঝতে অসুবিধা হয় না—কেন রানী এতটা ভারমুক্ত। নিশ্চয়ই আয়শা আর জান্নাতই গত রাত আর আজকের সকালটা ওর পাশে থেকে ওকে এই অবস্থায় এনে দিয়েছে।
“ কিরে তুই এখানে দাড়িয়ে কেনো?” কাছে আসতেই আয়শা জিজ্ঞাসা করে ,
হাল্কা হাসে রাজিব , বলে “ বড় আব্বু নাস্তা কিনতে পাঠিয়েছে , হেব্বি রেগে আছে তোমাদের দেরি দেখে”
রাজিবের কথা শুনে রানী চেপে রাখা হাসি ফিক করে বেরিয়ে আসে , আয়শা ভ্রূকুটি করে আর পেছনে জয় নিসব্দে আই রোল করে ।
“ বাদ দে তোর বড় আব্বুর কথা , সে তো মনে করে , আমি মেশিন , রান্না হও বলবে আর রান্না হয়ে যাবে , চল ভেতরে”
রাজিব ও মুচকি হাসল , তারপর ওদের নিয়ে ভেতরে গেলো ,
******
ভেতরে গিয়েই রানীর নজর প্রথমে পড়ে ওর আব্বুর উপর। গাড়ির ভেতরে জয়ের সঙ্গে খুনসুটির রেশ ধরে এতক্ষণ চোখের কোণে যে ঝিলিকটা ছিল, সেটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে যায়। তার জায়গা নেয় এক ধরনের শান্ত দৃষ্টি।
হ্যাঁ, রানী দেখতে পাচ্ছে—রহিম এখন ভালো আছে। বন্ধু জয়নালের সঙ্গে গল্প করছে।
রানীর বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা শ্বাস খুব ধীরে বেরিয়ে আসে। তার সঙ্গে প্রায় ফিসফিস করে বেরিয়ে আসে শব্দটা—“আব্বু…”
এটা ডাকার ডাক না। যেন একটা পরীক্ষা। মানুষটা সত্যিই আছে কি না, সেটুকু যাচাই করে নেওয়া।
গতকাল এই মানুষটাকে হারিয়ে ফেলবে ভেবে পুরো পৃথিবীটা হঠাৎ খুব কঠিন লেগেছিল। তাই এই একটুকু শব্দ দিয়ে রানী যেন নিজেকে বুঝিয়ে নেয়—মানুষটা এখনো আছে।
রহিম মেয়ের দিকে তাকায়। প্রথমেই ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে ওঠে। তারপর নজর যায় রানীর নরম দৃষ্টির দিকে। ঠিক তখনই বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে রহিমের। এই প্রথম একটু ভয় পায় সে। ভয়টা নিজের জন্য নয়—আবার পুরোপুরি নিজের জন্যও।
নিচের ঠোঁটে হালকা একটা কাঁপুনি দেখা দেয়, এতটাই ক্ষীণ যে চোখে পড়ার কথা নয়।
“আব্বু…”
মেয়ের মুখে শব্দটা শুনেই রহিম বুঝে নেয়। এই ডাক বলে দেয়, গতকাল রানী কতটা ভয় পেয়েছিল।
রহিম হাত বাড়ায়। রানী হেঁটে আসে। এই হাঁটার মধ্যেও একটা অনিশ্চয়তা চোখে পড়ে রহিমের—যেন সে নিজেও ঠিক জানে না, সত্যিই আব্বুর কাছেই আসছে কি না।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেবিনের বাতাস ভারী হয়ে যায়। রহিম নিজেই সেটা হালকা করার চেষ্টা করে। রানীর হাত ধরে নরম গলায় বলে,“খুব ভয় পেয়েছিলি রে মা। ভয় নেই, আমি এত তাড়াতাড়ি যাচ্ছি না।”
রানীর চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে।
আধশোয়া ভঙ্গিতে রহিম মেয়েকে বুকে টেনে নেয়। তখন সে টের পায় সেই উষ্ণতা—রক্তের উষ্ণতা—যে উষ্ণতা কোনো ডাক্তারের ওষুধ, কোনো নার্সের সেবা এনে দিতে পারে না।
এই উষ্ণতা রহিমের একার নয়, রানীর শরীরের একারও নয়। দুজনের শরীরে বয়ে চলা একই রক্তই এই উষ্ণতা তৈরি করেছে—যার কোনো বিকল্প নেই, যা আর কেউ তৈরি করতে পারে না।
চোখ তুলে রহিম তাকায় রাজিবের দিকে। ছেলেটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। শরীর আর পোশাকে ক্লান্তির ছাপ, সারারাত না ঘুমানোর চিহ্ন স্পষ্ট।সেই সব ক্লান্তির চিহ্ন ছাপিয়ে উঠেছে তৃপ্তি—আর তার ছায়া হয়ে আছে, তৃপ্তির আড়ালে চাপা পড়া ভয়।
রহিম ভেবে পায় না—কীভাবে সে এখনো নিজের ছেলে-মেয়ের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। এদের জন্য সে আসলে কী করেছে, আর কী করতে পারেনি। কান্নাটা আর ঠোঁটের কাঁপুনিতে সীমাবদ্ধ থাকে না , ছোট্ট দু’ফোঁটা জল হয়ে চোখে চিকচিক করতে থাকে ।
*****
কেবিনের ভেতরটা এখন ভেজা আবেগে ভরপুর। রহিম জড়িয়ে রেখেছে রানীকে—চোখে জমে আছে জলের ফোঁটা। রানী বাবার বুকে মিশে নিঃশব্দে কাঁদছে। রাজিব একটু দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে দেখছে। তার মনে কী চলছে, বোঝা খুব মুশকিল নয়—এখন সব ঠিক আছে, কিন্তু একটা ঝড় এলেই সব ওলটপালট হতে পারে।পাশে বসে জয়নাল নীরবে দেখছে। আয়শা দাঁড়িয়ে আছে, মুখে মৃদু হাসি। জয় সবার পেছনে—ওর দৃষ্টি শুধু রানীর হালকা হালকা কেঁপে ওঠা পিঠের ওপর নিবদ্ধ।
প্রথম নীরবতা ভাঙলো আয়শা। হাসিমুখে একটু এগিয়ে এসে, রানীর পিঠে হাত রেখে রহিমকে জিজ্ঞেস করলো,“এখন কেমন আছেন ভাই?”
একই সময় জয়নাল পাশ থেকে হাত রাখলো রহিমের কাঁধে।
আয়শা আর জয়নালের নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া যেন রহিমকে নিজের আবেগ কন্ট্রোলের শক্তি যোগান দিলো। রানীকে ছেড়ে সে ওকে সোজা করে দাঁড় করালো। ঠোঁট চেপে সাহসী হাসিতে দু’বার হালকা ঝাঁকুনি দিলো রানীর দু’বাহু ধরে—যেন বলতে চাইছে, আব্বু এখনো আছে।তারপর হাসিমুখে আয়শার দিকে তাকিয়ে বলল,“এখন ভালো আছি। আপনাদের অনেক কষ্ট দিলাম, ভাবি”—বলে একটু হাসার চেষ্টা করল।
“এই কষ্টের সুদে–আসলে শোধ নেবো ভাই। একদম নিয়ম মেনে চলবেন, আর ক্লাস করা বন্ধ—একদম টোটাল অফ,”বলে আয়শা এখনো হালকা কাঁদতে থাকা রানীর কাঁধ এক বাহুতে জড়িয়ে ধরলো। রানীর দিকে তাকিয়ে আবার বলল,“কি বলিস মা, তুই, আমি আর সবাই মিলে কঠিন সাজা দেবো তোর আব্বুকে।”
বলবার সময় আয়শার গলাও ধরে এলো। বারবার আফরোজার কথা মনে পড়ছে—এই সময় আফরোজা থাকলে কী করতো, সেই ভাবটাই ভেসে উঠছে মনে।
আয়শার এই মৃদু শাসনে জয়নালের কণ্ঠে একটু কঠোরতা এলো। বলল,“শালা, যদি আর কোচিংয়ের নাম নিবি, আমি তোর ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো।”
কথাটা শুনে রানী আয়শার বুকে মুখ গুঁজেই হালকা হেসে ওঠে। চোখের কোণটা আঙুলের ডগায় মুছে নেয় সে—কান্না থামেনি, কিন্তু এখন আর ভাঙন নেই।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজিব ধীরে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে। এতক্ষণ যে চাপা ভয়টা বুকের ভেতর আটকে ছিল, সেটা আর নেই। সে দেয়ালের দিকে হেলান দেয়—মাথাটা হালকা পেছনে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য। ভাবটা এমন, পরে কী হবে দেখা যাবে—এই মুহূর্তটা থাক।
জয় সবার শেষে একটু এগিয়ে এলো। চোখেমুখে হালকা দুষ্টুমি ধরে রেখে বলল,
“কি ব্যাপার ছোট আব্বু, কিছুদিন আগে আমাকে খুব সাহস দিচ্ছিলেন—এখন নিজেই চিতপটাং!”
রহিম হেসে উঠলো। বলল,“মাঝে মাঝে তোদের ইয়াংম্যানদের একটু খাটিয়ে নিতে ইচ্ছে হয় রে।”
আগের গুমোট ভাবটা কেটে গেছে। তবে কেবিনের ভেতরটা এখনো উষ্ণ। এই উষ্ণতা ছড়াচ্ছে সম্পর্কগুলো। এভাবেই কিছু সম্পর্ক আমাদের জীবনকে, শরীরকে উষ্ণতা দেয়—নির্জীব শীতলতা থেকে দূরে সরিয়ে আনে।
বেঁচে থাক এই সম্পর্কগুলো। বেঁচে থাক এই উষ্ণতা।
*****
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
Posts: 894
Threads: 0
Likes Received: 425 in 401 posts
Likes Given: 897
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
Posts: 317
Threads: 2
Likes Received: 1,355 in 250 posts
Likes Given: 126
Joined: Oct 2025
Reputation:
223
10-02-2026, 05:54 PM
(This post was last modified: 10-02-2026, 08:49 PM by Ra-bby. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
(09-02-2026, 08:00 PM)gungchill Wrote: আগের গুমোট ভাবটা কেটে গেছে। তবে কেবিনের ভেতরটা এখনো উষ্ণ। এই উষ্ণতা ছড়াচ্ছে সম্পর্কগুলো। এভাবেই কিছু সম্পর্ক আমাদের জীবনকে, শরীরকে উষ্ণতা দেয়—নির্জীব শীতলতা থেকে দূরে সরিয়ে আনে।
বেঁচে থাক এই সম্পর্কগুলো। বেঁচে থাক এই উষ্ণতা।
❤️
অসমাপ্ত আত্মজীবনী
খেলা যে চলছে কোন লেবেলে
Posts: 334
Threads: 3
Likes Received: 390 in 201 posts
Likes Given: 238
Joined: Jul 2025
Reputation:
49
(10-02-2026, 05:54 PM)Ra-bby Wrote: ❤️?
ভালোবাসা গ্রহন করলাম , কিন্তু প্রশ্নবোধক চিহ্ন টা ঠিক বুঝলাম না ?
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
•
Posts: 334
Threads: 3
Likes Received: 390 in 201 posts
Likes Given: 238
Joined: Jul 2025
Reputation:
49
![[Image: afroja-prototype.png]](https://i.ibb.co.com/sd9T83hW/afroja-prototype.png)
সম্পূর্ণ AI জেনারেটেড , জীবিত অথবা মৃত কারো সাথে কোন সম্পর্ক নেই ।
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
Posts: 334
Threads: 3
Likes Received: 390 in 201 posts
Likes Given: 238
Joined: Jul 2025
Reputation:
49
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
Posts: 334
Threads: 3
Likes Received: 390 in 201 posts
Likes Given: 238
Joined: Jul 2025
Reputation:
49
কিছু সম্পর্কঃ ৯ (চ)
কেবিন যেন এখন পারিবারিক মিলনমেলা। অ্যান্টিসেপটিকের হালকা ঝাঁঝালো গন্ধের ভেতরেও একধরনের ঘরোয়া উষ্ণতা মিশে আছে। রহিম আধশোয়া হয়ে বেডে হেলান দেওয়া। রানী পাশে বসে আছে। জয়নাল অপর পাশে। জয় রহিমের পায়ের কাছে বসে। আয়শা একটা চেয়ার বেডের কাছে টেনে এনে বসেছে। আর রাজিব সোফায়। জয়নাল, রহিম আর রাজিব খাচ্ছে। প্লাস্টিকের কন্টেইনার খুলে ভাত–তরকারির হালকা বাষ্প উঠছে।
অনুপস্থিত শুধু একজন—সে হচ্ছে জান্নাত। রহিম একবার ওর কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। আয়শা বলেছে, বিকেলের দিকে আসবে।
কথাগুলো এখন আর নিচু স্বরে হচ্ছে না। হাসপাতালের নিয়মের চেয়ে কিছুটা উঁচুতেই চলছে। তার সঙ্গে মাঝেমাঝেই জয়নালের হা-হা করে হাসি যোগ হচ্ছে, শব্দটা সাদা দেওয়ালে ঠেকে ফিরে আসছে। একমাত্র চুপচাপ রাজিব। গত রাতের ক্লান্তি আর গতদিনের মানসিক ধকল এখনো পুরো কাটিয়ে ওঠেনি। চোখের নিচে হালকা কালি, কাঁধের পেশিতে টান। তবে সেটা এখন আর বোঝা যাচ্ছে না—নিজের চিরচেনা অদৃশ্য বর্মটা পরে নিয়েছে যেন।
এর মাঝেই নার্স চলে এলো। কেবিনের অবস্থা দেখে নার্সের চোখ কপালে উঠল। কড়া গলায় জানিয়ে দিল—এটা হাসপাতাল, বাসা নয়। রহিমের ভাইটাল চেক আর ওষুধগুলো বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় আবার বলে গেল, এত মানুষ একসাথে থাকা যাবে না।
নার্স চলে যেতেই কেবিন আবার গমগমে হয়ে উঠল আলোচনায়। তবে এবার বাদ সাধল আয়শা—যেন নার্সেরই প্রতিনিধি হয়ে। জয়নালকে কয়েকবার নিচু স্বরে কথা বলতে বলল। তার কণ্ঠে ক্লান্তি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণও আছে।
রাজিবের খাওয়া শেষ হতেই আয়শা ওকে বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হতে আর একটু রেস্ট নিতে বলল। কারণ রাজিবের শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। আঙুলের ফাঁকে চামচটা কয়েক সেকেন্ড স্থির ছিল। প্রথমে রাজিব রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু আয়শা নাছোড়—একপ্রকার ধমকেই রাজিবকে রাজি করাল।
রহিমও একবার নরম করে বলল। ঠিক বাবার নির্দেশ নয়, বরং অনেকটা অনুরোধের সুরে। যেন ছেলেকে কিছু বলতে গিয়ে রহিম নিজেই একটু সংকোচ বোধ করছে। গলার স্বর নিচু, তবু ভারী।
রহিমের কথা শুনে রাজিব একবার কেবিনের দিকে তাকায়। রহিম, রানী, আয়শা—সবার দিকে চোখ যায়। রানীর দিকে দৃষ্টিটা কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়; সেখানে একঝলক নীরব বোঝাপড়া। কিন্তু জয়কে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। তারপর ধীরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগোয়। পেছন থেকে শরীরটা দেখে বোঝা যায়, সামান্য সামনে ঝুঁকে আছে—ক্লান্তি আর অবসন্নতার ওজন কাঁধে নিয়ে। হাঁটার সময় জুতোর তলায় মেঝের হালকা ঘষাঘষির শব্দ শোনা যায়।
আয়শা রানী আর জয়কেও থাকতে দিল না। ওদের পাঠাল ক্লাস করতে। রানী এক–দু’বার প্রতিবাদ করল। কথার ফাঁকে সে ঠোঁট চেপে ধরে এক মুহূর্তের জন্য; আঙুলগুলো ওড়নার কিনারায় শক্ত হয়ে ওঠে, তারপর আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায়।
কিন্তু জয় সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেল। কথা বলার সময় সে এক ফাঁকে রানীর দিকে তাকায়—তাকানোটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরে যেন কিছু ঠিক করে নেওয়ার তাড়াহুড়া আছে। ওর চেহারা এখনো হাস্যোজ্জ্বল। তবে সেই হাসির স্তরের নিচে একটা দৃঢ় সংকল্পের উপস্থিতি চোখে পড়ে—চোয়ালটা অল্প শক্ত, চোখের দৃষ্টি স্থির।
গত রাতে নিজের সঙ্গে করা সংকল্পের দ্বিতীয় ধাপের জন্য রানীকে একা পাওয়া এখন ওর কাছে খুব জরুরি।
*****
হাসপাতালের বাইরে বেরুতেই রাজীবের চোখে সূর্যের আলো সুঁইয়ের মতো বিধল। গতকাল থেকে আর সূর্য দেখা হয়নি। আলো নাকি শক্তির উৎস। কিন্তু রাজীবের বেলায় উল্টো হলো। বাইরে পা দিতেই মনে হলো শরীরের সব শক্তি যেন একসাথে ঝরে গেছে। কপালে হালকা ঘাম চিকচিক করছে, তবু ভেতরটা ঠান্ডা।
হাঁটার সময় পায়ে জোর নেই। মাথা ধরেছে। চোখ জ্বালা করছে ঘুমের অভাবে। শরীরটা হালকা টলছে। হাঁটুর ভেতরে যেন ফাঁপা শব্দ, পায়ের তলায় মাটি একটু নরম হয়ে আসছে।
বাইকটা হাসপাতালের বাইরেই পড়ে আছে। গতকাল সকালে রেখে গিয়েছিল, তারপর আর খেয়াল করা হয়নি। সিটে ধুলো জমেছে, পাখির মল শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে। রোদে গরম হয়ে চামড়াটা কড়া। বসার মতো অবস্থাও নেই। তবে পরিষ্কার থাকলেও রাজীব হয়তো উঠতে পারত না। বাইকের দিকে তাকিয়ে ইচ্ছাই হলো না হাত দেওয়ার। রিকশা নেওয়াই সহজ মনে হলো।
রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে রইল। সামনে তিন–চারটা রিকশা। কেউ যাবে না। রাজীব আর জোর করল না। শরীরের অবসাদ ওকে মাধ্যাকর্ষণের মতো টেনে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। কাঁধ দুটো একটু একটু করে ঝুলে পড়ছে।
গতকাল সে ভয় পেয়েছিল। সত্যিকারের ভয়। বুকের ভেতরটা তখন কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আগে আব্বুর উপস্থিতির মূল্য বুঝত না। অবহেলা করেনি কোনোদিন, কিন্তু গুরুত্বও পুরোপুরি বোঝেনি। গতকালের ধাক্কা তাকে বুঝিয়েছে—কিছু না করেও রহিম ওর আর রানীর জন্য কত বড় আশীর্বাদ। বাবা হারানোর মুখে গিয়েই সে বুঝেছে, আসলে কতটা নির্ভর করে আছে।
হাসপাতালে থাকতে এই অবসাদ টের পায়নি। তখন স্নায়ু টানটান ছিল। মন শুধু একটা দিকেই কাজ করছিল—আব্বুর কী দরকার, কখন কী লাগবে। দায়িত্ব ওকে ধরে রেখেছিল। হাত ব্যস্ত থাকলে ভেতরের শূন্যতা বোঝা যায় না।
কিন্তু এখন দায়িত্ব থেকে কয়েক কদম দূরে আসতেই শরীর আর মন দুটোই ভেঙে পড়ছে। বুকের মাঝখানে হালকা চাপ অনুভব হচ্ছে, নিঃশ্বাস একটু ভারী।
হঠাৎ রাজীবের মনে একটা প্রশ্ন জাগল। প্রশ্ন না, অনুধাবন।
এই অবসাদ কি নতুন?
নাকি এটা সবসময়ই ছিল?সম্ভবত ছিল।
কিন্তু দায়িত্বগুলো সেটাকে ঢেকে রাখত।
কারও না কারও দরকার ছিল বলে সে টিকে ছিল।
দায়িত্ব ছাড়া রাজীব ঠিক কে?
যদি একদিন দায়িত্বগুলোর অবসান হয়—
যদি আশেপাশের মানুষদের কাছে তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়—
তাহলে কি এই অবসাদই তার একমাত্র সঙ্গী হয়ে থাকবে?
এই ভাবনাটা এই মুহূর্তে রাজীবকে একটা আয়নার সামনে এনে দাঁড় করায়—যে আয়নায় নিজের চোখের ভেতরের শূন্যতা দেখতে রাজীব ভয় পায়।
*****
রাজীব যখন এসব ভাবছিল, ঠিক তখনই হাসপাতালের গেট থেকে জয় আর রানী বেরিয়ে এলো। দুজনেই হাসিমুখে কথা বলতে বলতে। দুপুরের রোদে তাদের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে। রাজীবের দিকে প্রথম দৃষ্টি যায় রানীর। ওদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজীব। রোদে তার শার্টের কাপড়টা একটু ফিকে দেখাচ্ছে।
রানীর হাসিমুখটা একটু নরম হয়ে যায়। ম্লান নয় ঠিক, তবে একটা অন্যরকম ভাব—যেন সে চাইছে না রাজীব ওর হাসিটা দেখুক। ঠোঁটের কোণ একটু থেমে যায়।
ব্যাপারটা জয়ের চোখ এড়ায় না। রানীর দৃষ্টি লক্ষ করে জয় তাকায় রাজীবের দিকে। চোয়ালটা সামান্য শক্ত হয়ে যায়। ইচ্ছাকৃত নয়, যেন স্বাভাবিক রিফ্লেক্স। আঙুলগুলো চাবির রিমে অল্প চাপ দেয়।জয় বলে,“তুই দাঁড়া, আমি গাড়ি নিয়ে আসছি।”এই বলে সে পার্কিং লটের দিকে চলে যায়। তার পায়ের শব্দ কংক্রিটে ঠকঠক করে ওঠে।
রানী ছোট্ট করে একটা হাসি দেয়। জয় চলে গেলে আবার রাজীবের পিঠের দিকে তাকায়। রাজীব সামান্য কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁধ দুটো একটু নুয়ে। শারীরিক অবসাদটা বোঝা যাচ্ছে। রানী টের পায়। মনে মনে ভাবে—সারারাত হাসপাতালে ছিল, ঘুম হয়নি নিশ্চয়ই।
রানী এগিয়ে যায়। পেছনে দাঁড়িয়ে বলে,“ভাইয়া, এখনো দাড়িয়ে আছিস কেনো?”
রাজীবের চিন্তার সুতো কেটে যায়। পেছনে ফিরে তাকায়। রানী দাঁড়িয়ে আছে, কপালের উপর হাত দিয়ে রোদ থেকে চোখ বাঁচানোর চেষ্টা করছে। রোদের আলোয় ওর চোখ চিকচিক করছে।
“তুই আবার এই রোদে বেরিয়ে এলি কেন?”রাজীব জিজ্ঞেস করে। জিজ্ঞাসায় অভিভাবকসুলভ শাসনের চেয়ে উৎকণ্ঠাই বেশি। গতকাল রানীর উপর খুব চাপ গেছে। এখন আবার রোদে দাঁড়িয়ে মাথা ঘুরে যায় কিনা সেই চিন্তা মাথায় ঘুরছে।
রানী বলে,“বড় আম্মু পাঠালো। বলল এখানে থেকে রুমে ভিড় না বাড়াতে। নার্স বেশি লোক থাকতে দিচ্ছে না। তাই ক্লাসে যাচ্ছি।”
“ক্লাস করতে পারবি? না হলে আমার সাথে চল। আজ রোদ খুব বেশি।”
রাজীব বলে। তার কণ্ঠে ক্লান্তির ভেতরেও টান আছে।
“না না, সমস্যা হবে না। আমি জয়… এর সাথে যাচ্ছি। ও গাড়ি নিয়ে আসতে গেছে।”
জয়ের নাম নিতে গিয়ে রানীর মুখ একটু নিচু হয়ে যায়। গালের পাশ দিয়ে চুলের গোছা নড়ে ওঠে। এক মুহূর্তের জন্য “জয় ভাইয়া” প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সামলে নেয়। কোনোদিন জয়কে ভাই ডাকেনি সে। বললে হয়তো অন্যরকম হয়ে যেত।
“সত্যি পারবি তো? এখন শরীর কেমন লাগছে? আয়, একটু ছায়ায় দাঁড়া।”
রাজীব ছায়ার দিকে সরে গিয়ে রানীর জন্য জায়গা করে দেয়। গরম বাতাসের মধ্যে ছায়াটা একটু ঠান্ডা লাগে।
রানী ছায়ায় এসে দাঁড়ায়। তারপর জিজ্ঞেস করে,“তোর বাইক কই? রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
“বাইকের অবস্থা খারাপ। ময়লা হয়ে আছে। আর ঘুম পেয়েছে। বাইক চালানোর অবস্থায় নেই।”নির্লিপ্তভাবে বলে রাজীব। চোখের পাতা ভারী হয়ে নেমে আসে আবার ওঠে।
রানী ভালো করে একবার রাজীবের দিকে তাকালো। এলোমেলো চুল, চোখ দুটো হালকা লাল হয়ে আছে। বারবার হাই তুলছে, চোখে পানি জমছে। রানীর চোখের দৃষ্টি একটু নরম হলো। বুকের ভেতর হালকা কেমন একটা টান অনুভব করে।সকালে একবার ফোনে কথা হয়েছিল। হাসপাতালে এসে আর কথা হয়নি রাজীবের সাথে। ওর শরীরের অবস্থা জিজ্ঞেস করার সময় হয়নি। এখনো করলো না। আসলে কেমন যেন একটা বাধা কাজ করছে ভেতরে। শুধু ছোট করে একটা শ্বাস বের হলো বুক থেকে।তারপর ইতস্তত করে বলল,“তুইও চল আমাদের সাথে। গাড়িতে। জয় তোকে নামিয়ে দেবে।”
রাজীব হেসে বলল,“আরে না, রিকশা নিলেই হবে। তুই যা।”
রানী জানে জয়ের সাথে রাজীবের সম্পর্ক আর আগের মতো নেই। আগের মতো নেই তো নয়ই, উল্টো আগের ঠিক বিপরীত হয়ে গেছে। কী কারণে হয়েছে সেটা রানী জানে না। রাজীব কোনোদিন বলেনি। রানীও জিজ্ঞেস করার সাহস করেনি।
রানীর মাঝে মাঝে মনে হয়, রাজীবের সামনে জয়কে নিয়ে বেশি কথা বললেই হয়তো রাজীব ওর মনের কিছু ধরে ফেলবে। আর রানীও সেই সময় পুরো স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না। জয়কে নিয়ে ঝামেলা, রাজীবের সাথে সম্পর্কের শীতলতা—সব মিলিয়ে একটা চাপা টান তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি। অন্তত রানীর দিক থেকে।
রাজীবও আজকাল মেপে কথা বলে। যেন ভয় পায়—কিছু বেশি না হয়ে যায়। ঠোঁটের কোণে অর্ধেক কথা এসে থেমে থাকে।
এমন সময় গাড়ি নিয়ে আসে জয়। হর্ন দেয়। শব্দটা একটু তীক্ষ্ণ শোনায়। সরাসরি তাকায় না রাজীব আর রানীর দিকে।
রানী একবার রাজীবের দিকে তাকায়, একবার জয়ের দিকে। কী যেন ভাবে। চোখে এক মুহূর্তের দ্বিধা। তারপর বলে,“ঠিক আছে, তুই বাসায় গিয়ে রেস্ট নে। আমি বিকেলে আবার হাসপাতালে আসবো। তুই আসিস না।”
রাজীব কিছু বলে না। রানীর চলে যাওয়া দেখে। গাড়ির সামনে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবে রানী, একবার পেছনে তাকিয়ে রাজীবকে দেখে, তারপর পেছনের দরজা খুলে পেছনের সিটে বসে। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা শুকনো। গাড়ি ছেড়ে দেয়। ধুলো একটু উড়ে উঠে আবার বসে যায়।রাজীব বুঝতেই পারে না—কিছুক্ষণ আগের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে করা ভাবনাগুলো কোথায় মিলিয়ে গেছে।
এখন তার চিন্তা একটাই—রানী ক্লাস আর হাসপাতালের চাপে আবার অসুস্থ হয়ে যায় কিনা। বুকের ভেতর হালকা অস্বস্তি জমে থাকে।
তার সঙ্গে আরেকটা চিন্তা। সে গুরুত্ব দিতে চায় না। কিন্তু সরিয়েও রাখতে পারে না।
জয়ের কাছ থেকে রানীকে দূরে রাখা উচিত কি না।
কিছুদিন আগে যেদিন জয় তাকে মেরেছিল, সেদিন রানী নিয়ে খুব খারাপ ইঙ্গিত করেছিল। কথাগুলো এখনো কানের ভেতর বাজে। জয়কে সে ছোটবেলা থেকে চেনে। তবু আজকাল মাঝে মাঝে মনে হয়—সবকিছু কি আগের মতো আছে?
মনটা যেন ইচ্ছে করেই সেই প্রশ্নটা আঁকড়ে ধরে আছে। বুকের ভেতর অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে জমাট বাঁধে।
*****
কিছুদূর যেতেই জয় গাড়ি ব্রেক করল। রানী একটু আনমনা ছিল বলে এই হঠাৎ ব্রেকে চমকে উঠল, শরীরটা সামান্য সামনে দুলে গিয়ে আবার সোজা হলো, সামনে তাকাল।
“ম্যাডাম আপনি কই যাইবেন সেইটা তো বললেন না” জয় ইয়ার্কি করে ড্রাইভারের ভাষায় বলল, ওদের বাড়ির ড্রাইভারও ঠিক এরকম করেই কথা বলে। গলায় বাড়তি ভণিতা, ঠোঁটে টানা হাসি।
রানী প্রথমে বুঝতে পারে না, জিজ্ঞাসা করে, “এই তুমি এভাবে কথা বলছো কেন? ড্রাইভার চাচার মতো?”
“তুই তো আমাকে ড্রাইভারই বানিয়ে দিয়েছিস, আমি সামনে গাড়ি চালাচ্ছি তুই পেছনে বসে ম্যাডাম সেজেছিস” জয় রাগত স্বরে বলল। কিন্তু রাগের ভেতরেও খুনসুটির রেশ স্পষ্ট।
জয়ের কথা শুনে রানী হেসে ওঠে, হাসির শব্দে গাড়ির ভেতরটা হালকা হয়ে যায়। মজা করে বলে, “ড্রাইভার, ক্যাম্পাসে যাও” একদম গম্ভীর ভাব নিয়ে বলে, ঠোঁট চেপে গাম্ভীর্য ধরার চেষ্টা করে।
“দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা, একা পেয়ে নেই আবার তোকে” জয় কপট রাগ দেখিয়ে বলে, চোখ দুটো সরু করে তাকায়।
“কি করবে একা পেলে, হ্যা?” রানীও দুষ্টুমি করে জিজ্ঞাসা করে, ভ্রু সামান্য তুলে।
“তুই কি সামনে আসবি? নাকি আমি গাড়ি নিয়ে এক টানে হাইওয়ে ধরবো?” জয় হুমকি দেয়, স্টিয়ারিংয়ে আঙুল ঠুকঠুক করে।
“আসছি বাবা আসছি” রানী পেছনের দরজা খুলে সামনে এসে বসে, কারণ জয়ের পক্ষে এই পাগলামি করা অসম্ভব কিছু নয়, তারপর বলে, “এই যে হলো” সিটবেল্ট টানতে টানতে তার চুলের গোছা কাঁধে পড়ে।
জয় হাসে, তারপর রানীর হাত ধরে বলে, “এই যে এখন হলো”। দুজনের চোখ একত্র হয়, কয়েক সেকেন্ড স্থির। জয়ের ঠোঁটে মুচকি হাসি, কিন্তু চোখের হাসিটা অনেক বেশি ঝলমলে। রানী হালকা করে নিজের চোখ নামিয়ে নেয়, গাড়ির ভেতরে এসির ঠাণ্ডা বাতাসেও গালে হালকা উষ্ণতা অনুভূত হয়, আঙুলের ডগায় কেমন একটা কাঁপুনি লাগে।
কিন্তু পরক্ষণেই জয় নিজের স্বভাবে ফিরে যায়, বলে, “এর চেয়ে বেশি ভালো হত তুই যদি আমার কোলে বসতি, হা হা হা” বলে নিজেই হেসে ওঠে।
রানী দ্রুত হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জয়ের বাহুতে প্লেফুলি আঘাত করে, বলে, “সব সময় তুমি এমন করো কেন?” আঘাতটা নরম, কিন্তু স্পর্শটা টের পাওয়া যায়।
রানীর গালে উষ্ণতার সাথে লালিমাও যোগ হয়, চোখে একসাথে লজ্জা আর হাসির ঝিলিক খেলে যায়।
*****
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
Posts: 334
Threads: 3
Likes Received: 390 in 201 posts
Likes Given: 238
Joined: Jul 2025
Reputation:
49
কিছু সম্পর্ক ৯ (চ) এর বাকি অংশ.........
জয়, রানী আর আয়শা বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরই জান্নাত বের হয়েছিলো। গত রাতে জয়ের কাছ থেকে রাখা ওর কার্ডটা কাজে লাগিয়েছে প্রথমে। নিজের ভিডিও স্টুডিওর জন্য কিছু ডেকোরেশন কিনেছে। উষ্ণ আলো ছোড়ানো ল্যাম্প, একটা কাঠের ফ্রেম, আর দেয়ালে ঝোলানোর জন্য কালো ব্যাকড্রপ কাপড়।
এর পর সোজা ক্যাম্পাসে। একটা জরুরি ক্লাস ছিলো।
ক্লাস শেষে ক্যাম্পাস-লাগোয়া পার্কের গেটে চা খাচ্ছিল কয়েকজন বন্ধুর সাথে। দুপুরের কড়া রোদ গাছের ঘন ছায়ায় এসে যেন একটু থেমে গেছে।। শুকনো পাতার ওপর হাওয়া বইলে খসখস শব্দ উঠছে। পাশের টং দোকানের কাঁচের বয়ামে বিস্কুটের স্তর, আর কাপে ধোঁয়া উঠছে পাতলা দুধচায়ের।
জান্নাত চশমাটা নাকের ওপর একটু তুলে নিয়ে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিল।
ঠিক তখনই এলো আবরার।জান্নাতকে দেখে হেসে এগিয়ে এলো। এসেই জিজ্ঞাস করলো,“ভাই ছালা (পাট দিয়ে বানানো ভারি বস্তা) এনেছো?”
জান্নাত চায়ের গ্লাসটা হাত বদল করে বলল,
“কাজ শেষ করো, তারপর দেখি কয়েটা লাগবে। তখন ব্যবস্থা করে দেবো।”
জান্নাতের বলা শেষ হয়তেই দুজনেই এক সাথে হেঁসে উঠলো। এর পর জান্নাত আবরারকে চা অফার করলো। দুজনে চা খেতে খেতে স্ক্রিপ্ট নিয়ে আরো বিস্তারিত আলাপ করতে লাগলো। আবরার বেশ ভালো কিছু সাক্রাস্টিক আইডিয়া দিলো। জান্নাত নিজেও কিছু যোগ করলো। কাগজে পয়েন্ট লিখতে লিখতে আঙুলে কালি লেগে গেল, তবু খেয়াল করলো না।
মনে মনে জান্নাত খুশি। আবরার কাজের ছেলে। বেশ উন্নত স্যাটায়ার করেছে। স্যাটায়ারের সাথে রাজনৈতিক খোঁচা বেশ গভিরে লাগবে।
তবে জান্নাত দ্বিতীয় বারের মত সাবধান করে দিলো—রাজীব যেন এখানে রানী আর জয়ের ইনভলভমেন্ট না বোঝে। কারণ এডিটিং তো রাজীবই করবে।
“আরে না না, কিছুতেই বুঝবে না। এক জয় সাহেবকে শত্রু বানিয়েই লাইফ হেল হয়ে গেলো। সাথে সাথে রাজীব ভাই কেও ক্ষেপাতে চাই না।”
আবরার হালকা মাথা নাড়িয়ে বলল। চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা নিয়ে একটু থামল।
তারপর সিরিয়াস হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল। জান্নাত ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিলো।
“আবরার, তুমি শুধু স্ক্রিপ্ট দেখো। আমি বাকিটা দেখছি।”
“ওকে বস হয়ে যাবে। তুমি শুধু আমার চটের বস্তার ব্যবস্থা রেখো।”
“সেটা আমি দেখবো।” জান্নাত মুখ টিপে হেঁসে বলল। তবে ওর চোখে কিসের যেন একটা ছায়া—দৃঢ়তা, নাকি আসন্ন ঝড়ের জন্য প্রস্তুতি—বোঝা গেল না।
কিছুক্ষণ পর আবরার রহিম এর খবর জানতে চাইলে জান্নাত বলল,“ছোট আব্বু এখন ভালো। কেবিনে দিয়েছে। আমি লাঞ্চের পর যাবো। তুমি চাইলে আমার সাথে যেতে পারো।”
প্রথমে আবরার রাজি হয়ে গেলো।
কিন্তু পরক্ষণেই কাপে জমে থাকা চায়ের আস্তরণটা আঙুল দিয়ে ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,“সেখানে কি কেষ্ট সাহেব থাকবে?”
জান্নাত হেঁসে বলল,“থাকতেও পারে।”
“ওরে বাবা, আমার দরকার নেই। তুমি আমার পক্ষ থেকে কন্ডোলেন্স দিয়ে দিয়ো আঙ্কেলকে… আর রাধাকেও।”
জান্নাত ভ্রু নাচিয়ে বলল,“জয়ের সামনেই দেবো?”
আবরার নাটকীয় কাতরতায় বলল,“ভাই, আমি মরলে তোমাকে কে এতো সুন্দর করে স্ক্রিপ্ট লিখে দেবে?”
*****
এদিকে রাজীব , রানী আর জয় চলে জাওয়ার পর আর রিক্সার জন্য ওয়েট করেনি । নিজেই এক টুকরো কাপর আর বাইকের সিট পরিস্কার করেছে । বাইক নিয়েই বাড়ি ফিরেছে। বাসায় ফিরে বেশ লম্বা সময় নিয়ে সাওয়ার নিয়েছে। নির্ঘুম রাত আর মানসিক উত্তেজনায় শরীর তেতে ছিলো , শীতল পানির স্পর্শ অনেকটাই সেই তাপ দূর করতে সক্ষম হয়েছে । কিন্তু একটা ব্যাপার কিছুতেই মন থেকে মুছতে পারছে না । জয়ের সাথে রানীর মেলামেশা , ঠিক অপছন্দ নয় , কিন্তু মনের মাঝে একটা খচখচ রয়েই জাচ্ছে । রাজীব জয় কে চেনে , জয় রানীকে অন্য চোখে দেখবে না। কিন্তু আবার এও মনে আসে , ও কি জয় কে পুরোপুরি চেনে? সেই রাতে জয় যেই ধরনের নোংরা ইঙ্গিত করেছিল । সেটা ওর চেনা জয়ের পক্ষে সম্ভব ছিলো না ।
তবে রানীর আচরন ওকে কিছুটা সস্তি দিচ্ছে , ও জয়ের সাথে সামনে বসেনি , বসেছে পেছনে । নিরাপদ দূরত্ব রেখেই চলছে । আর রাজীবের বিশ্বাস আছে রানীর উপরে । জয়কে ছোট বেলা থেকে চেনার পর ও জয়ের দিকে ঝুকবে না।
গোসলের পর শরীরের ক্লান্তি যেন হঠাৎ করেই জেঁকে বসে। শীতল পানি শরীরটাকে একরকম আদুরে করে ফেলেছে—পেশিগুলো ঢিলে হয়ে গেছে, চোখের পাতা ভারী।এখন আর সহ্য হচ্ছে না নরম বিছানার ছোঁয়া পাওয়ার অপেক্ষা।
ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতেই বিছানায় গা এলিয়ে দেয় রাজীব। গদি নরম। চাদরে ধোয়া কাপড়ের হালকা গন্ধ। শরীরটা ধীরে ধীরে ডুবে যায়।
কিন্তু মনে সেই অস্বস্তি।
জয়ের সাথে রানীর মেলামেশা।
সেই রাতের নোংরা ইঙ্গিত।
রানীর পেছনে বসা—একটা ছোট্ট স্বস্তি।
আবারও প্রশ্ন—সে কি জয়কে পুরো চেনে?
গতকাল থেকে ঘটে যাওয়া একটার পর একটা ঘটনা রাজীবের মস্তিষ্ককে আরও কিছুক্ষণ জাগিয়ে রাখে। ভাবনাগুলো মাথার ভেতর গোল হয়ে ঘুরতে থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসে।
ক্লান্তি শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়।
রাজীব হার মানে।
*******
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
Posts: 894
Threads: 0
Likes Received: 425 in 401 posts
Likes Given: 897
Joined: Jan 2024
Reputation:
14
|