Thread Rating:
  • 14 Vote(s) - 3.36 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Fantasy হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (চলবে)
#41
[Image: Whats-App-Image-2026-02-06-at-9-19-38-PM.jpg]

তৃতীয় পর্ব
অবয়বের নিষিদ্ধ ভূগোল

রয়্যাল এনফিল্ড মেটিওর ৩৫০-এর ইঞ্জিনের ভরাট গুমগুম শব্দটা যখন সাইনবোর্ডের ধারের সেই ভাঙাচোরা চায়ের দোকানের সামনে এসে থামল, তখন চারপাশের বাতাসে কেবল ভোরের কাঁচা রোদের গন্ধ। মোর্শেদ তার গ্লাভস পরা হাত দিয়ে চাবিটা ঘুরিয়ে বাইকটা বন্ধ করল। ইঞ্জিনের শব্দটা এক ঝটকায় থেমে যেতেই চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে বাইক থেকে পুরোপুরি নামল না, কেবল স্ট্যান্ডটা নামিয়ে বাইকের ওপর একপাশে কাত হয়ে আয়েশ করে বসল।

সামনে ছোট টিনের ছাপড়া ঘর, উপরে প্লাস্টিকের তেরপল টাঙানো। ভেতরে কেরোসিনের চুলার ওপর ধোঁয়া ওঠা বড় একটা অ্যালুমিনিয়ামের কেতলি। মোর্শেদ হেলমেটের ভাইজারটা উপরে তুলে গম্ভীর গলায় ডাকল, “মামা, এক প্যাকেট মার্লবরো রেড দেন। আর এক কাপ কড়া লিকারের চা, চিনি ছাড়া।”
দোকানের মালিক বৃদ্ধ লোকটা তখনও ঠিকমতো চোখ মেলতে পারেনি। আধশোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে মোর্শেদের বাইকের গ্লসি কালো বডি আর ইঞ্জিনের ক্রোম ফিনিশিংয়ের দিকে তাকিয়ে একটু ভ্যাবাচ্যকা খেয়ে গেল। তারপর হাত দিয়ে কপাল ঘষতে ঘষতে বলল, “মামা, লিকার তো মাত্র বসাইলাম। আগের লিকার বাসি হইয়া গেছে, ফালাইয়া দিছি। নতুনটা হইতে মিনিট দশেক সময় লাগব।”
মোর্শেদ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ঘড়ির দিকে তাকাল। সকাল ৬টা বেজে ৩০ মিনিট। সে বাইকের ফুয়েল ট্যাংকের ওপর ডান হাতটা রেখে নির্লিপ্তভাবে বলল, “অসুবিধা নাই। আমার তাড়াহুড়ো নেই। আপনি আপনার মতো সময় নিয়ে বানান।”
এই এলাকাটা দিনের বেলা থাকে মানুষের নরকগুলজার। হাজার হাজার মানুষের চিৎকার, রিকশার বেল আর বাসের তীব্র হর্নে বাতাস সবসময় ভারী হয়ে থাকে। কিন্তু এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। ঢাকার এই প্রবেশপথ বা সাইনবোর্ড এলাকাটা এখন যেন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। রাস্তাটা একদম ফাঁকা নয়, তবে খুব একটা ব্যস্তও নয়। মাঝে মাঝে দুই-একটা দূরপাল্লার নাইট কোচ ধুলো উড়িয়ে সপাটে বেরিয়ে যাচ্ছে, তাদের হেডলাইটের হলুদ আলো তখনো মোর্শেদের চোখে এসে বিঁধছে। দুই-একটা প্রাইভেট কারের চাকা পিচঢালা রাস্তার ওপর যে সরু শব্দ তুলছে, তা কান পাতলে শোনা যায়।
ভোরের ঠান্ডা বাতাসটা এখন বেশ প্রবল। কোনো বাধা ছাড়াই সেটা মোর্শেদের খোলা মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে, আর সেই ছোঁয়াটা এক ধরণের আদিম প্রশান্তি দিচ্ছে। মোর্শেদ বুঝতে পারল, তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী শরীরের চামড়া এই বাতাসের চুমু বা স্পর্শে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই নির্জন হাইওয়ে, ধুলোর গন্ধ আর ভোরের এই নীলচে আলো—এটাই এখন তার একমাত্র সত্যিকারের জগত।
সে সিগারেটটা বের করল। এক প্যাকেট মার্লবরো থেকে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরে দিয়াশলাই জ্বালানোর আগমুহূর্তে সে আশপাশটা আবার দেখে নিল। রাস্তার ধারের ঘাসগুলোর ওপর শিশির জমে আছে, যা দূর থেকে হীরের টুকরোর মতো চিকচিক করছে। দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা ঘষতেই একটা কমলা রঙের অগ্নিশিখা অন্ধকার আর স্নিগ্ধতার বুক চিরে জেগে উঠল। মোর্শেদ দীর্ঘ একটা টান দিল। তামাকের কড়া স্বাদ আর ধোঁয়া তার ফুসফুসে প্রবেশ করতেই তার অস্থির স্নায়ুগুলো শিথিল হতে শুরু করল।
সে তার ল্যাপটপ আর বনানীর দশতলার আভিজাত্য থেকে অনেক দূরে এখন একাকী এক যাত্রী। বাইকের মেটালিক বডিটা তার উরুর নিচে বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে। মোর্শেদ ভাবল, মানুষ যখন গতির নেশায় ছুটে চলে, তখন সে নিজের অনেক কিছু পেছনে ফেলে আসে। কিন্তু যখন কোথাও থামে, তখন সেই ফেলে আসা স্মৃতিগুলো আবার ছায়ার মতো তাকে ঘিরে ধরে। আকাশের এক কোণে সূর্যটা লাল আভা ছড়াতে শুরু করেছে। কুয়াশার পাতলা চাদরটা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, আর উন্মোচিত হচ্ছে হাইওয়ের সেই দীর্ঘ কালো ফিতেটা, যা তাকে হয়তো এক অজানা গন্তব্যের দিকে ডাকছে।
চাওয়ালা তখন চিনি ছাড়া লিকারের কাপটা হাতে নিয়ে দোকানের বাইরে এল। কাপ থেকে বের হওয়া গরম ধোঁয়া মোর্শেদের হাতের সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। মোর্শেদ চায়ে একটা চুমুক দিল। কড়া তেতো লিকারটা তার জিভে এক ধরণের ঝাঁঝালো অনুভূতি তৈরি করল। সে দূরে দিগন্তের দিকে তাকাল, যেখানে আকাশ আর রাস্তা এক হয়ে গেছে। আজ তার এই বাইকের ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে পৃথিবীর আর কোনো কোলাহল মিলবে না। সে শুধুই একজন রাইডার, যার গন্তব্য হয়তো কোনো মানচিত্রে নেই, আছে কেবল তার অবচেতন মনের গভীর কোনো অতৃপ্তিতে।
সিগারেটের শেষ অংশটা সে রাস্তার ধারে ছুড়ে ফেলল। আগুনের সেই টুকরোটা বাতাসের তোড়ে নিভে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ জ্বলে রইল। মোর্শেদ আবার চায়ে চুমুক দিয়ে ভাবল, এই পথটাই তার আসল বাড়ি। এখানে কোনো পিছুটান নেই, কোনো জটিল সমীকরণ নেই, আছে শুধু সে আর তার নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ ছায়া।
কড়া লিকারের সেই তেতো স্বাদটা জিভ দিয়ে তালুতে ঠেকিয়ে সে কিছুক্ষণ নির্নিমেষ চেয়ে রইল সামনের ধূসর হাইওয়ের দিকে। এই সাতসকালে গন্তব্যহীনভাবে সে এখানে কেন এসে থামল, সেটা নিজের কাছেও পরিষ্কার নয়। তার অবচেতন মন কি তাকে কোনো কিছুর টানে এখানে নিয়ে এসেছে? সে কি আরও সামনে এগিয়ে যাবে? দাউদকান্দি পেরিয়ে কুমিল্লার দিকে কি একবার ঘুরে আসবে? নাকি এই চায়ের দোকানের তেরপলের নিচেই আরও কিছুক্ষণ বসে থাকবে?
তার ভেতরের চিরচেনা সেই দোলাচলটা আবার শুরু হলো। হাইওয়ের এই মুক্ত বাতাস তাকে টানছে, আবার মেটিওর-এর ইঞ্জিনের উত্তাপ তাকে বলছে আরও কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিতে। এই নিঃসঙ্গতার মধ্যে এক ধরণের অদ্ভুত স্বাধীনতা আছে, যা তাকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে বাধ্য করে।
ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই হাত চলে গেল জ্যাকেটের পকেটে। সেখান থেকে আইফোনটা বের করে স্ক্রিনটা আনলক করল সে। অভ্যাসবশতই তার আঙুল চলে গেল মেসেঞ্জার আইকনে। সামিনার ইনবক্সটা খুলতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু কেঁপে উঠল। নামের পাশে সবুজ বাতিটা নেই। সে স্ক্রল করে ওপরে তাকাতেই দেখল— ‘এক্টিভ ৬ আওয়ারস এগো’।
মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মানে কাল রাতে তাদের সেই তীব্র কথোপকথন শেষে অফলাইনে যাওয়ার পর সামিনা আর অনলাইনে আসেনি। সামিনার কি তাকে মনে নেই? নাকি সামিনা তাকে ইচ্ছে করেই এই অপেক্ষার যন্ত্রণায় ফেলে রেখেছে? ঢাকার জ্যামের মতো সামিনাও যেন এক এক সময় তার জীবনের সবটুকু গতি স্তব্ধ করে দেয়।
মোর্শেদ ফোনটা বাইকের ট্যাংকের ওপর রেখে আবার সিগারেটে টান দিল। ধোঁয়াগুলো বাতাসের সাথে লড়ে লড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল নিজের হাতের তালুর দিকে। ৪৫ বছর—সংখ্যাটা অনেক বড় শোনায়। এই বয়সে এসে তার পরিচিত অনেক বন্ধুই আজ মেদবহুল শরীরের অধিকারী হয়েছে, কেউ কেউ চশমার পুরু কাঁচের আড়ালে নিজেদের যৌবনকে চিরতরে কবর দিয়ে ফেলেছে। তারা এখন রিটায়ারমেন্ট আর সন্তানদের কলেজ-কলেজ নিয়ে চিন্তিত। নিজেকে তারা স্বেচ্ছায় ‘বুড়ো’ বানিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু মোর্শেদ কি সে দলে? সে নিজের ছয় ফুট দুই ইঞ্চির পেটানো শরীরটার দিকে তাকাল। রাইডিং জ্যাকেটের নিচে তার সুঠাম চওড়া কাঁধ আর মজবুত পেশিগুলো এখনও পঁচিশ বছরের তরুণের মতো টানটান। এই শরীরটাকে সে নিজের ইকোসিস্টেমের মতো করেই পরম যত্নে গড়ে তুলেছে। দিনের পর দিন জিমের ঘাম আর হাইওয়ের ধুলোবালি তাকে দিয়েছে এক ইস্পাতকঠিন অবয়ব।
পার্থক্য শুধু সামান্য কিছু জায়গায়। সে বাইকের রিয়ার ভিউ মিররে নিজের মুখটা একবার দেখার চেষ্টা করল। হেলমেট খোলা অবস্থায় অবাধ্য চুলগুলো এখন অনেকটা পাতলা হয়ে এসেছে। কপালের দুই কোণ থেকে চুলগুলো একটু পেছনে হটেছে, আর কানের পাশের চুলগুলোতে রুপোলি পাক ধরেছে। কাঁচাপাকা সেই দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে মোর্শেদ বুঝতে পারল, তার এই কাঠিন্য কেবলই অভিজ্ঞতার দান। এই মুখটা রোদ চেনে, এই মুখটা বৃষ্টি আর বাতাসের ঝাপ্টা চেনে। হাইওয়ের ধুলো তার ত্বকের লোমকূপে মিশে গিয়ে তাকে এক ধরণের অমসৃণ আভিজাত্য দিয়েছে।
হ্যাঁ, বয়সটা তার চেহারায় কথা বলে, কিন্তু তার রক্তে নয়। তার ভেতরের সেই আদিম ক্ষুধা, গতির প্রতি সেই তীব্র আসক্তি—এগুলো আজও সেই পঁচিশের উত্তাপ নিয়েই বেঁচে আছে। হয়তো সেই কারণেই সামিনার মতো এক রহস্যময়ী নারীর শব্দগুলো তাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করতে পেরেছে। সে জানে, এই পোক্ত শরীর আর অভিজ্ঞ মনের মিশেলটাই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।
চায়ের কাপটা এখন প্রায় খালি। সিগারেটের অবশিষ্টাংশটা সে পিষে ফেলল জুতো দিয়ে। ফোনটা আবার হাতে নিয়ে সামিনার সেই ‘লাস্ট এক্টিভ’ সময়টার দিকে তাকাল। ছয় ঘণ্টা আগের সেই সামিনা কি এখন তার নিজের ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে? নাকি এখনও সে ঘুমের রাজ্যে সেই ‘নীল জ্যামিতি’র নকশা বুনছে?
চায়ের কাপের একদম নিচে জমে থাকা শেষ ঠান্ডা লিকারটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে মোর্শেদ একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল। চায়ের সেই তেতো স্বাদটা যেন তার মনের অস্থিরতার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। মেটিওর-এর সিটে হেলান দিয়ে সে আকাশের নীলচে আভার দিকে তাকিয়ে থাকল, কিন্তু তার চোখের সামনে ভাসতে লাগল কাল রাতের সেই নিকষ অন্ধকার ঘরের দৃশ্য।
পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে মোর্শেদ জীবনটাকে অনেক কাছ থেকে দেখেছে। তার জীবনে নারীসঙ্গ কোনো নতুন বিষয় নয়। ডিভোর্সের পরের এই পাঁচ বছরে কত নারী তার এই বনানীর ফ্ল্যাটে এসেছে, কতজনের সাথে সে নিছক শরীরের প্রয়োজনে রাত কাটিয়েছে, তার হিসেব সে রাখেনি। অভিজ্ঞ মোর্শেদ জানে নারীর শরীরের ঘ্রাণ কেমন হয়, জানে কামনার চূড়ায় পৌঁছে কীভাবে নিস্তেজ হতে হয়। কিন্তু সামিনা?
সামিনা যেন এক সম্পূর্ণ অন্যরকম গোলকধাঁধা। মোর্শেদ নিজের মনেই একটা বাঁকা হাসি হাসল। যার গলার আওয়াজ সে শোনেনি, যার মুখটা পর্যন্ত সে ভালো করে দেখেনি, সেই এক ছায়ামানবী তাকে এভাবে শাসন করছে? সামিনার কোনো অস্তিত্ব কি সত্যিই আছে, নাকি সে মোর্শেদের একাকীত্বের ইকোসিস্টেম থেকে জন্ম নেওয়া কোনো এক মায়া?
কাল রাতের সেই উত্তেজনার কথা মনে পড়তেই মোর্শেদের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সে ভাবল, একজন পঁয়তাল্লিশ বছরের পোক্ত মানুষ, যার শরীর আর মন অভিজ্ঞতায় ঠাসা, সে কেন একজন সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণের মতো আচরণ করছে? কাল রাতে যখন মেসেঞ্জারের নীল আলোয় সামিনার শব্দগুলো তার ফোনের স্ক্রিনে ফুটে উঠছিল, তখন মোর্শেদের মনে হচ্ছিল সে যেন পঁচিশ বছর আগে তার প্রথম প্রেমের উত্তেজনায় কাঁপছে।
সামিনার শব্দগুলো ছিল ভীষণ তীক্ষ্ণ, অনেকটা কামুক ফিসফিসানির মতো। সে যখন বলেছিল, "মিস্টার রাইডার, আপনি কি জানেন নীল জ্যামিতি আসলে কী? এটা শরীরের সেই বাঁক, যা কোনো স্কেল দিয়ে মাপা যায় না।"—তখন মোর্শেদের মনে হয়েছিল তার এসি ১৬ ডিগ্রিতে থাকা ঘরটা হঠাৎ করেই অগ্নিকুণ্ড হয়ে উঠেছে।
মোর্শেদ কাল রাতে একাই ছিল সেই বিশাল ফ্ল্যাটে। বাইরের বারান্দায় অন্ধকার, আর ভেতরে কেবল তার ফোনের আলো। সামিনার কল্পনা যেন ফোনের আলোয় প্রোজেক্টরের মত তার মস্তিষ্কে ভেসে উঠতে চাইছিল। তার অভিজ্ঞ মন যেন সামিনার সেই ছায়াশরীরকে অনুভব করতে চাইছিল।
উত্তেজনাটা ছিল অবর্ণনীয়। সে অনুভব করছিল তার পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠছে, হৃদস্পন্দন যেন মেটিওর-এর ইঞ্জিনের গর্জনের চেয়েও তীব্র হয়ে বাজছে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে যেখানে আবেগগুলো স্তিমিত হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে সামিনা তার ভেতরে কামনার এক আদিম দাবানল জ্বেলে দিয়েছে। মোর্শেদ নিজের অবচেতন মনেই সামিনার সেই অদৃশ্য শরীরটাকে কল্পনা করতে শুরু করেছিল। সামিনার শাড়ির আঁচলটা অবাধ্যভাবে খসে পড়ছে, আর তার নিচে উন্মোচিত হচ্ছে সেই রহস্যময় 'নিষিদ্ধ ভূগোল'।
সেই নিঃসঙ্গ রাতে, মোর্শেদ একাই সেই উত্তেজনার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল। কোনো স্পর্শ ছাড়াই, কেবল শব্দের জাদুতে সে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিল এক অলীক কামনার কাছে। যখন সব শেষ হলো, যখন সে নিস্তেজ হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিল, তখন এক ধরণের অপরাধবোধ নয়, বরং এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। সে ভাবল, এটা কি সামিনার জাদু? নাকি নিছকই তার দীর্ঘদিনের জমানো একাকীত্বের এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ?
সামিনা তাকে একাই উত্তেজিত করে তোলে, আবার একাই তাকে নিস্তেজ হতে বাধ্য করে। এই যে একতরফা এক মরণখেলা, এতে মোর্শেদ যেন এক অসহায় পুতুল। সে চায় সামিনাকে রক্ত-মাংসের শরীরে অনুভব করতে। সে চায় তার সেই 'নীল জ্যামিতি'র প্রতিটি রেখাকে নিজের হাতের তালুতে মানচিত্রের মতো পড়ে নিতে।
চায়ের দোকানের সেই শব্দগুলো—কেতলির টগবগানি, দূরে বাসের হর্ন—সবই যেন এখন মোর্শেদের কাছে ফিকে মনে হচ্ছে। তার মনের ভেতরে কেবল কাল রাতের সেই কামুক আলাপগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সামিনা কি জানে, সে মোর্শেদের মতো এক শক্ত মানুষকে কতটা দুর্বল করে ফেলেছে? সামিনা কি জানে, তার একেকটা মেসেজ মোর্শেদের অভিজ্ঞ রক্তে কতটা প্রলয় ঘটিয়ে দেয়?
মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার হাতের শিরাগুলো ফুটে উঠেছে। এই শরীরটা, যা হাজার মাইল রাইড করেও ক্লান্ত হয় না, তা আজ একজন নারীর অদেখা অবয়বের কাছে নতজানু। সে আবার ভাবল, আজ সকালে কি সামিনা সত্যিই আয়নার সামনে দাঁড়াবে? সে কি তার সেই নিষিদ্ধ ভূগোলের একটা নকশা তাকে পাঠাবে?
মোর্শেদের কামনার এই আগুন এখন আর কেবল মনের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। এটা তার পেশিতে, তার রক্তে, তার নিঃশ্বাসে ছড়িয়ে পড়েছে। সে জানে, এই হাইওয়ে তাকে আজ কোনো শান্ত গন্তব্যে নিয়ে যাবে না। যতক্ষণ না সে সামিনার সেই ছবির দেখা পাচ্ছে, ততক্ষণ তার এই অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খাবে। সে কোনো আনারি কিশোর নয়, অথচ সামিনার প্রতিটি শব্দ তাকে নতুন করে জন্মানোর স্বাদ দিচ্ছে।
সে আবার সিগারেট ধরাল। ধোঁয়াগুলো কুয়াশার সাথে মিশে গিয়ে এক বিমূর্ত রূপ নিল। মোর্শেদ বিড়বিড় করে নিজেকেই নিজে বলল, "আমি কি হারছি? নাকি এটাই শুরু?"
মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলবারের ওপর দুই হাত রেখে সোজা হয়ে বসল। চারপাশটা এখনো সেই মায়াবী কুয়াশার চাদরে ঢাকা। হাইওয়ের এই নিঃসঙ্গতা যেন তাকে এক অদ্ভুত নেশায় পেয়ে বসেছে। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। এবার আর কোনো টেক্সট নয়, বরং নিজের এই মুহূর্তের একটা প্রতিচ্ছবি সে সামিনাকে পাঠাতে চায়।
সে ফোনটাকে এমনভাবে সেট করল যাতে হাইওয়ের সেই দীর্ঘ ধূসর পথ আর তার বাইকের সামনের অংশটা ফ্রেমের ভেতর চলে আসে। মোর্শেদ নিজে বাইকের সিটের ওপর একটু উঁচু হয়ে আধশোয়া ভঙ্গিতে বসল। তার ডান হাতটা শক্তভাবে ধরে আছে মেটিওর-এর সেই ক্রোম ফিনিশিংয়ের হ্যান্ডেলবার। সেই হ্যান্ডেল ধরা হাতের আঙুলের ভাঁজে ধরা আছে একটা আধখাওয়া জ্বলন্ত সিগারেট। সিগারেটের অগ্রভাগ থেকে পাতলা নীলচে ধোঁয়ার একটা রেখা ভোরের বাতাসে কুন্ডলী পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।
ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যাচ্ছে দিগন্তবিস্তৃত সেই হাইওয়ে, যা কুয়াশার ভেতর দিয়ে ক্রমে অস্পষ্ট হতে হতে কোথাও যেন এক অসীম শূন্যতায় হারিয়ে গেছে। আকাশের রংটা ধোঁয়াটে ধূসর, যেন কোনো বিষণ্ণ শিল্পীর ক্যানভাস। মোর্শেদ কয়েকটা ছবি তুলল। একটা ছবিতে তার হাতের পেশিগুলো স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে, আর হাতের রোমগুলো ভোরের শিশিরে ভিজে একটু চিকচিক করছে।
সবচেয়ে নিখুঁত ছবিটা বেছে নিয়ে সে সামিনার ইনবক্সে গেল। ছবির নিচে ছোট করে লিখল— “গুড মর্নিং। এই ধূসর সকালে আপনার 'নীল জ্যামিতি'র রঙ কি একটু ছড়ানো যাবে? আমি পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে আছি।”
সে সেন্ড বাটনে চাপ দিল। মেসেঞ্জারের সেই চিরচেনা শব্দটা হলো, কিন্তু ছবির নিচে যে গোল চিহ্নটা থাকে, সেটা ভরাট হলো না। কেবল একটা ফাঁপা টিক চিহ্ন (Single Tick) দেখা গেল। মোর্শেদ স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। না, মেসেজটা ডেলিভারড হয়নি।
তার মানে সামিনা এখনো অনলাইন হয়নি। ছয় ঘণ্টা আগে সেই যে সে তার মায়াবী জগত নিয়ে আড়ালে চলে গেছে, এখনো ফেরেনি। সামিনার ফোনটা হয়তো এখন তার মাথার কাছে কোনো টেবিলের ওপর নির্জীব পড়ে আছে, কিংবা সে হয়তো এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
মোর্শেদের বুকের ভেতর একটা সূক্ষ্ম হাহাকার খেলে গেল। এই যে এত আয়োজন, পঁয়তাল্লিশ বছরের এক অভিজ্ঞ পুরুষের এই যে কিশোরের মতো আকুলতা—সবই যেন একতরফা। সে জানে সামিনা অনলাইনে এলে তবেই এই ছবির সার্থকতা। অথচ এই মুহূর্তে হাইওয়ের এই ঠান্ডা বাতাস আর জ্বলন্ত সিগারেটের উত্তাপটুকু শেয়ার করার মতো কেউ নেই।
সে ফোনটা আবার বাইকের ট্যাংকের ওপর রাখল। সামনের রাস্তাটা এখন আরও বেশি রহস্যময় মনে হচ্ছে। সামিনা কি ইচ্ছে করেই দেরি করছে? নাকি সে মোর্শেদকে এই প্রতীক্ষার আগুনে পুড়িয়ে আরও বেশি পরিপক্ক করে নিতে চায়?
মোর্শেদ সিগারেটে শেষ একটা লম্বা টান দিয়ে সেটা রাস্তার পাশে ছুড়ে মারল। আগুনের ফুলকিটা কিছুক্ষণ জ্বলল, তারপর শিশিরভেজা ঘাসের ওপর নিভে গেল। সে জানে, যতক্ষণ না সামিনার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠছে, ততক্ষণ মোর্শেদের এই হাইওয়ে রাইডও যেন অসম্পূর্ণ। সে নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে থাকল, ভোরের সেই ধূসর একাকীত্বের ভেতর সামিনার এক চিলতে উপস্থিতির জন্য।
মোর্শেদ বাইকের চাবি অন করল। মেটিওর-এর ৩৫০ সিসির ইঞ্জিনটা একবার গর্জে উঠে ধকধক ছন্দে স্থির হলো। হাইওয়ের সেই ধূসর সকালটা এখন ধীরে ধীরে উজ্জ্বল রোদে রূপ নিচ্ছে। মোর্শেদের মনে হলো, এই স্থবির হয়ে বসে থাকা তার জন্য নয়। সে গ্লাভস জোড়া পরে নিল, হেলমেটের ভাইজার নামিয়ে দিয়ে ক্লাচ রিলিজ করল। বাইকটা সামনের অনন্ত পথের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ঢাকার কোলাহল পেছনে ফেলে সে এগিয়ে চলল দাউদকান্দির দিকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শীতের ভোরের সেই আমেজ উবে গিয়ে মাথার ওপর কড়া রোদ চড়তে শুরু করেছে। জ্যাকেটের ভেতর দিয়ে রোদের তেজ এখন পিঠে বিঁধছে। সাধারণ সময়ে মোর্শেদ এই রাইডটা দারুণ উপভোগ করত। হাইওয়ের বাতাস যখন তার বুক চিরে বেরিয়ে যায়, তখন সে এক ধরণের আদিম স্বাধীনতা অনুভব করে। কিন্তু আজ সেই স্বাধীনতা যেন কোথাও একটা শেকলে আটকে আছে।
সে যতবারই বাইকের গতি বাড়াচ্ছে, ততবারই তার মন অবচেতনভাবে বাম পকেটের দিকে চলে যাচ্ছে—যেখানে ফোনটা সাইলেন্ট মুডে রাখা। প্রতিটা সিগন্যালে, প্রতিটা বাঁকে তার মনে হচ্ছে—এই বুঝি ফোনটা কেঁপে উঠল! এই বুঝি সামিনার থেকে একটা মেসেজ এলো!
দাউদকান্দি ব্রিজের ওপর দিয়ে যখন সে বাইক নিয়ে যাচ্ছে, নিচে মেঘনা নদীর শান্ত নীল জল রোদে চিকচিক করছে। মোর্শেদ এক মুহূর্তের জন্য বাইকের গতি কমাল। এই বিশাল জলরাশি, এই আদিগন্ত বিস্তৃত আকাশ—সবই আজ সামিনার অদেখা অবয়বের কাছে ম্লান মনে হচ্ছে। পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ মোর্শেদ নিজের ওপর বিরক্ত বোধ করল। সে তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। কত নারী তার জীবনে এসেছে, কতবার সে শরীর আর মনের আদান-প্রদান করেছে—কিন্তু কোনো এক ছায়ামানবীর জন্য এমন স্থবির আকুলতা তার পুরুষালি অহংকারে একটু হলেও আঘাত দিচ্ছে।
বেলা দুইটা। রোদের তেজ এখন চরমে। হাইওয়ের পিচ থেকে তাপের হল্কা বের হচ্ছে, যা হেলমেটের ভেতরেও মোর্শেদকে ঘেমে নেয়ে একাকার করে ফেলছে। সে দাউদকান্দির একটা মোড় থেকে বাইকটা ঘোরাল। আর না, সামনে গিয়ে লাভ নেই। তার শরীর এখন ক্লান্ত, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ক্লান্ত তার মন। সামিনা এখনো অফলাইন। সেই যে কাল রাতে সে একটা রহস্যের চাদর বিছিয়ে দিয়ে চলে গেল, তারপর থেকে আর কোনো চিহ্ন নেই।
ফেরার পথটা মোর্শেদের কাছে বড্ড দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর মনে হতে লাগল। যে রাইডিং তাকে মুক্তি দিত, আজ সেই রাইডিং যেন তাকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তুলেছে। হানিফ ফ্লাইওভার দিয়ে যখন সে বনানীর দিকে ঢুকছে, তখন শহরের জ্যাম আর মানুষের চিৎকার তার বিরক্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
অবশেষে বনানীর সেই পরিচিত ফ্ল্যাটের পার্কিংয়ে সে বাইকটা থামাল। মেটিওর-এর ইঞ্জিনের উত্তাপ তখনো তার উরুর নিচে অনুভূত হচ্ছে, ঠিক যেমন তার মনের ভেতর সামিনাকে নিয়ে জমানো উত্তাপটুকু। সে হেলমেটটা খুলে বাইকের ওপর রাখল। আয়নায় নিজের মুখটা দেখল—ধুলো আর রোদে মুখটা কালচে হয়ে গেছে, চোখের কোণে এক রাশ ক্লান্তি।
লিফটে করে দশতলায় ওঠার সময় সে আবার ফোনটা বের করল। ডাটা কানেকশন অন আছে, কিন্তু নোটিফিকেশন প্যানেলটা একদম খালি। সামিনা এখনো আসেনি। সামিনা তাকে কোনো ছবি পাঠায়নি।
ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই এসির সেই কৃত্রিম ঠান্ডা বাতাস তাকে অভ্যর্থনা জানাল। কিন্তু এই আভিজাত্য, এই বিশাল ফ্ল্যাট—সবই এখন তার কাছে একটা খাঁচা মনে হচ্ছে। জ্যাকেটটা সোফার ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে বারান্দার দিকে তাকাল। দুপুরের কড়া রোদ জানালার কাঁচ চিরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইছে।
মোর্শেদ এক গ্লাস বরফ মেশানো জল নিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। তার মনে এক ধরণের তিতকুটে হতাশা দানা বাঁধছে। সে কি সামিনার কাছে কেবল একটা খেলার পুতুল? নাকি সামিনা তাকে এভাবেই অভুক্ত রেখে তার তৃষ্ণাকে আরও তীব্র করতে চায়? পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে এই ধরণের ভার্চুয়াল বিরহ তাকে যেন এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতায় ফেলে দিচ্ছে।
সে চোখ বন্ধ করল। সামিনা তাকে ছবি দেয়নি, কিন্তু তার মনের ক্যানভাসে সামিনা এখন হাজারো রঙে আঁকা এক নিষিদ্ধ মানচিত্র। যে মানচিত্রের প্রতিটি পাহাড়ি বাঁক আর গভীর উপত্যকা সে আজ স্পর্শ করতে চেয়েছিল, কিন্তু দিনশেষে সে ফিরে এসেছে একরাশ ক্লান্তি আর শূন্যতা নিয়ে।
মোর্শেদ বিড়বিড় করে বলল, “সামিনা, আপনি কি সত্যিই আছেন? নাকি আপনি কেবল আমার এই একাকীত্বের ইকোসিস্টেমের একটা অসুখ?”
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 6 users Like KaminiDevi's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#42
সোফার কোণে পিঠ ঠেকিয়ে রাখা মোর্শেদের চোখের পাতা কখন যে ভারী হয়ে এসেছিল, সে নিজেও টের পায়নি। রোদে পোড়া শরীরের ক্লান্তি আর সামিনার দিক থেকে আসা নীরবতার একরাশ হতাশা তাকে এক গভীর, অসাড় ঘুমের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই ঘুম স্থায়ী হলো না। হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা হঠাৎ দীর্ঘ একটা কেঁপে উঠতেই মোর্শেদ চমকে জেগে উঠল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল—এটা কি শুধুই মনের ভুল, নাকি আসলেও কোনো সংকেত?


ধড়ফড় করে উঠে বসে সে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। ঘরের ভেতর বিকেলের শেষ বিচ্ছুরিত আলো এসে পড়েছে। স্ক্রিনে ভেসে থাকা মেসেঞ্জারের লোগোটা দেখে তার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

সামিনা জাহান: "বিকেলের তপ্ত রোদে আপনার হাইওয়ের ছবিটা কিন্তু বেশ মায়াবী ছিল, মিস্টার রাইডার! বিশেষ করে আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত ওই সিগারেটটা... দারুণ সিনেমাটিক।"

মোর্শেদ ঘড়ির দিকে তাকাল। সন্ধ্যা ৬টা বেজে ১০ মিনিট। সেই ভোরে পাঠানো ছবির উত্তর এল সন্ধ্যায়! মোর্শেদের শরীরের ভেতর এক ধরণের তিতকুটে অভিমান দানা বাঁধল। সে দ্রুত টাইপ করল—
মোর্শেদ: "ছবিটা সিনেমার মতো লাগলেও এর পেছনের মানুষটা কিন্তু রক্ত-মাংসের। আপনার উত্তরের অপেক্ষায় হাইওয়েতে পুড়ে বিকেলে আধমরা হয়ে ঘরে ফিরেছি। আপনি কি তবে সত্যিই মায়া? ইচ্ছে হলে দেখা দেন, ইচ্ছে না হলে অদৃশ্য হয়ে যান?"
কয়েক সেকেন্ড পরেই ওপাশে ‘টাইপিং...’ স্ট্যাটাসটা দেখা গেল। মোর্শেদ অধীর আগ্রহে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

সামিনা: "উফ্, মিস্টার রাইডার তো দেখছি বেশ অভিমানী! আসলে আজ বাচ্চাদের নিয়ে রঙের সমুদ্রে এমনভাবে ডুবে ছিলাম যে ফোনের কথা মনেই ছিল না। কলেজের ছোট ছোট দস্যুগুলো আজ আমাকে এক মুহূর্ত নিশ্বাস নিতে দেয়নি।"

মোর্শেদ: "বাচ্চাদের রঙ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন ভালো কথা, কিন্তু আমার জগতটা যে আপনি আজ ভোরেই বর্ণহীন ধূসর করে রেখে গিয়েছিলেন, সে খবর কি রাখেন? আপনি তো কথা দিয়েছিলেন আজ সকালে আয়নার সামনে দাঁড়াবেন। আমার জন্য সেই ‘নীল জ্যামিতি’র একটা নকশা পাঠাবেন।"

সামিনা: (একটা হাসির ইমোজি পাঠিয়ে) "আপনার ধৈর্য তো একদমই কম! আমি তো বলিনি পাঠাব না। কিন্তু ব্যস্ততার মাঝে তাড়াহুড়ো করে কি আর ওই জ্যামিতি মেলালে চলে? শিল্পীর জন্য মেজাজটা তো আগে তৈরি হতে হয়।"

মোর্শেদ: "শিল্পী না হয় মেজাজ তৈরি করুক, কিন্তু এই রাইডারের ইঞ্জিন যে অতিরিক্ত গরম হয়ে আছে। এই যে দুপুরে রোদ আর ধুলোর মধ্যে মাইলকে মাইল ছুটলাম, এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি যে আমি একা। মনে হচ্ছিল আপনি বুঝি ফোনের ওপাশ থেকে আমাকে দেখছেন। অথচ দিনশেষে বনানীর এই ঠান্ডা ঘরে আমি এখন ভীষণ একা।"

সামিনা: "একা কেন হবেন? আপনার মেটিওর তো আছে। আচ্ছা সত্যি করে বলুন তো, আপনি কি সত্যিই আমাকে মিস করছিলেন, নাকি আমার ছবিটাকে?"

মোর্শেদ সোফায় একটু আরাম করে বসল। সামিনার এই কথার প্যাঁচ তাকে আবার সেই চেনা ঘোরটার মধ্যে টেনে নিচ্ছে। সে উত্তর দিল—
মোর্শেদ: "ছবি তো কেবল একটা অবয়ব, সামিনা। আমি আসলে সেই রহস্যটাকে মিস করছিলাম, যা আমাকে পঁচিশ বছরের তরুণের মতো অস্থির করে তোলে। আপনি জানেন না, ৪৫ বছর বয়সে এসে এই চঞ্চলতা কতটা যন্ত্রণার, আবার কতটা আনন্দের।"

সামিনা: "যন্ত্রণার আনন্দই তো আসল নেশা। ঠিক আছে, অনেক তো অভিমান হলো। এখন একটু ফ্রেশ হয়ে নিন। আপনার এই পোড়া মুখ আর ক্লান্ত চোখের ছবি দেখলে তো আমার ছবি তোলার অনুপ্রেরণাটাই মরে যাবে!"

মোর্শেদ: "অর্থাৎ, আপনি ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে রাতেই সেই মহেন্দ্রক্ষণ আসছে?"

সামিনা: "ইঙ্গিত নয়, সম্ভাবনা। তবে শর্ত একটাই—মেজাজ বিগড়ে দেবেন না। এখন যান, এক কাপ কড়া কফি খেয়ে নিজেকে একটু গুছিয়ে নিন।"

মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে একটা জয়ের হাসি ফুটে উঠল। অভিমানটুকু মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সে ফোনটা রেখে ব্যালকনির দিকে তাকাল। সন্ধ্যার অন্ধকার নামছে বনানীর আকাশে, কিন্তু মোর্শেদের ভেতরে এখন এক তীব্র প্রত্যাশার আলো জ্বলছে।
রাত দশটা গড়িয়ে এগারোটার ঘরে কাঁটা। বনানীর ফ্ল্যাটে এখন পিনপতন নীরবতা। মোর্শেদ ডিনার শেষ করে হাতে এক গ্লাস অন দ্য রক্স হুইস্কি নিয়ে বারান্দার ইজি চেয়ারে বসল। আজ আর সিগারেট নয়, বরং দামী একটা সিগার ধরিয়েছে সে। নীলচে ধোঁয়াগুলো রাতের অন্ধকারে সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। ফোনটা টেবিলের ওপর রাখা। ঠিক তখনই স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। সামিনার মেসেজ।

সামিনা: "কী করছেন মিস্টার রাইডার? ডিনার হয়েছে?"

মোর্শেদ সিগারটা অ্যাশট্রেতে রেখে দ্রুত টাইপ করল—
মোর্শেদ: "ডিনার তো অনেক আগেই শেষ। এখন কেবল আপনার অপেক্ষা করছি। আপনি কি জানেন, এই অপেক্ষাটা এখন আমার নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে?"

সামিনা: "ওহ্! আপনি তো দেখি বেশ সিরিয়াস। আমি এই মাত্র সব কাজ সেরে, ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে ঘুমাতে আসলাম। সারাদিনের ওই দস্যি বাচ্চাগুলোর ধুলোবালি ঝেড়ে এখন বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিতেই মনে পড়ল—এক চঞ্চল রাইডার বোধহয় আমার জন্য এখনো জেগে আছে।"

মোর্শেদের চোখের সামনে ভেসে উঠল দৃশ্যটা। সামিনা বিছানায় শুয়ে, তার শরীরের প্রতিটি রেখা যেন রাতের অন্ধকারে এক বিমূর্ত আল্পনা। মোর্শেদ ভাবতে চাইল, সামিনা এখন ঠিক কী পোশাকে আছে? তার পরনে কি নীল রঙের কোনো পাতলা সুতির স্লিভলেস কামিজ, নাকি ঘিয়া রঙের ঢিলেঢালা একটা নাইটি? কাপড়ের মসৃণতা কি সামিনার গায়ের তপ্ত ত্বকের সাথে মিশে গিয়ে এক ধরণের ঘর্ষণ তৈরি করছে?

সামিনার সেই অবাধ্য চুলগুলো নিয়ে মোর্শেদের কৌতূহল সবচেয়ে বেশি। সে কি ঘুমানোর আগে তার একরাশ ঘন কালো চুলগুলোকে আলতো করে একটা হাতখোঁপা করে বেঁধে নিয়েছে? নাকি দীর্ঘ দিনের অভ্যাস মতো সেগুলোকে একদম অবাধে বালিশের ওপর ছড়িয়ে দিয়েছে? মোর্শেদের মনে হলো, সামিনার চুলগুলো নিশ্চয়ই অবাধ্য; কোনো বাঁধনই বোধহয় সেগুলোকে আটকে রাখতে পারে না। বালিশের সাদা কভারে ছড়িয়ে থাকা সেই কালো চুলের ঢেউগুলো যেন এক অন্ধকার সমুদ্র।

সামিনার সেই 'ফ্রেশ' হয়ে ওঠার মুহূর্তটা কল্পনা করতেই মোর্শেদের বুকটা আবার ভারী হয়ে উঠল। কোনো দামী পারফিউম নয়, বরং খুব সাধারণ কোনো সাবানের স্নিগ্ধ সুবাস আর সদ্য ধোয়া ভেজা চুলের সোঁদা ঘ্রাণ যেন মোবাইল স্ক্রিন চিরে সরাসরি মোর্শেদের নাকে এসে ধাক্কা দিল। সেই ঘ্রাণে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল এক আদিম এবং বিশুদ্ধ আকর্ষণ। মোর্শেদ চোখ বন্ধ করে সেই অদৃশ্য ঘ্রাণটুকু নিজের ফুসফুসে টেনে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করল।

মোর্শেদ: "ঘুমাতে আসলেন? একা? নাকি আপনার ওই রঙের জগত আর তুলিগুলোকেও পাশে নিয়ে শুয়েছেন?"

সামিনা: "তুলিরা তো ড্রয়িং রুমে। বিছানায় এখন কেবল আমি আর আমার একাকীত্ব। ঠিক আপনার ওই দশতলার ফ্ল্যাটের মতো।"

মোর্শেদ: "আমার একাকীত্ব কিন্তু এখন আর আগের মতো নেই, সামিনা। সেখানে এখন আপনার শব্দেরা রাজত্ব করছে। কিন্তু শব্দ দিয়ে তো আর তৃষ্ণা মেটে না। আমি এখনো সেই প্রতিশ্রুত ছবিটার অপেক্ষায় আছি। সকাল গেল, দুপুর গেল, বিকেলও ফুরোলো। এবার কি সেই 'নীল জ্যামিতি'র পর্দা উঠবে না?"

সামিনা: (একটু সময় নিয়ে) "আপনি বড্ড অধৈর্য। একটা ছবি দিলেই কি সব তৃষ্ণা মিটে যাবে? নাকি তখন নতুন কোনো বায়না শুরু হবে?"

মোর্শেদ: "মানুষের কামনার কি শেষ আছে? তবে আপনার ওই অদেখা রূপটা এখন আমার কাছে এক নিষিদ্ধ ভূগোলের মতো। আমি জানতে চাই, ওই শব্দের আড়ালে যে নারী লুকিয়ে আছে, সে দেখতে ঠিক কতটা কামুক। আপনি বলেছিলেন আয়নার সামনে দাঁড়াবেন। দাঁড়িয়েছিলেন কি?"

সামিনা: "দাঁড়িয়েছিলাম। আয়নায় নিজেকে দেখছিলাম আর ভাবছিলাম—একজন পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ মানুষ, যিনি হাইওয়ে দাপিয়ে বেড়ান, তিনি কি আমার এই সাধারণ অবয়ব সহ্য করতে পারবেন? নাকি পুড়ে ছারখার হয়ে যাবেন?"

মোর্শেদ: "পুড়ে যেতেই তো চাইছি। আপনি কি জানেন না, আগুনের ধর্মই হলো পুড়িয়ে ছাই করা? আমি সেই দহনের অপেক্ষায় আছি। সামিনা, দয়া করে আর রহস্য বাড়াবেন না। আমাকে আজকারের আপনাকে দেখতে দিন। কোনো পুরনো ছবি নয়, ঠিক এই মুহূর্তে আপনি যেমন আছেন—বালিশে মাথা রেখে কিংবা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে—তেমন একটা ছবি পাঠান।"

মোর্শেদের গলার স্বর যেন মেসেজের হরফেও ফুটে উঠছে। তার শরীর এখন টানটান উত্তেজনায় কাঁপছে। হুইস্কির গ্লাসটা হাতে নিয়েও সে চুমুক দিতে ভুলে গেছে। সামিনার ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসছে না কয়েক মিনিট হলো। ‘সিন’ হয়ে আছে কিন্তু কোনো টাইপিং স্ট্যাটাস নেই। মোর্শেদ বুঝতে পারছে, ওপাশে সামিনা হয়তো নিজেকে প্রস্তুত করছে, অথবা মোর্শেদের এই আকুলতা উপভোগ করছে।

মোর্শেদ আবার লিখল: "চুপ করে আছেন কেন? আপনি কি ভয় পাচ্ছেন? নাকি আমাকে পাগল করে দেওয়াই আপনার লক্ষ্য?"

সামিনা: "ভয় আপনাকে নয়, নিজেকে পাচ্ছি। আচ্ছা, যদি ছবিটা এমন হয় যা দেখে আপনার রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়, তার দায় কি আপনি নেবেন?"

মোর্শেদ: "ঘুম তো আপনি কাল রাতেই কেড়ে নিয়েছেন। এখন শুধু সেই বিনিদ্র রাতটাকে সার্থক করে দিন। পাঠান সামিনা... আমি আপনার প্রতিটি রেখাকে জুম করে দেখতে চাই।"

মোর্শেদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রইল। তার বুকের ধুকপুকানি এখন মেটিওর-এর আইডল ইঞ্জিনের শব্দের চেয়েও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে তাদের কথোপকথন এক নতুন স্তরে পৌঁছাল। সামিনার প্রতিটি মেসেজ যেন মোর্শেদের বনানীর সেই নিরিবিলি ফ্ল্যাটের দেয়ালগুলোতে কামনার প্রতিধ্বনি তুলছিল। মোর্শেদ বুঝতে পারছিল, সামিনা আজ তাকে খুব সহজেই মুক্তি দেবে না।
অবশেষে, ঘড়ির কাঁটা যখন বারোটা ছুঁইছুঁই, সামিনা লিখল—
সামিনা: "মিস্টার রাইডার, আপনি কি প্রস্তুত? আমি কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি। তবে মনে রাখবেন, কল্পনা সবসময় বাস্তবের চেয়ে বেশি সুন্দর হয়। আমি কি আপনার সেই সুন্দর কল্পনাটা ভেঙে দেব?"

মোর্শেদের গলার কাছে কী যেন একটা দলা পাকিয়ে এল। সে হুইস্কির গ্লাসটা একপাশে সরিয়ে রেখে ফোনটা দুই হাতে শক্ত করে ধরল। সে লিখল—
মোর্শেদ: "কল্পনা আর বাস্তবের লড়াইটা আজ হতে দিন সামিনা। আমি আপনার সেই জ্যামিতিক নকশায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাই। পাঠান... আমি আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে পারছি না।"

কয়েক সেকেন্ড পর, মেসেঞ্জারের সেই পরিচিত 'পপ' শব্দটা হলো। একটা ইমেজ ফাইল লোড হতে শুরু করল। মোর্শেদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। সে দেখল নীল রঙের প্রোগ্রেস বারটা শেষ হয়ে ছবিটা পুরোপুরি ফুটে উঠল।
ছবিটি ছিল বিস্ময়কর এবং একই সাথে অতৃপ্তিদায়ক।
মোর্শেদ স্ক্রিনের ওপর আঙুল ছোঁয়াতেই ছবিটা পূর্ণ অবয়বে ফুটে উঠল। সামিনা যে ছবিটি পাঠিয়েছে, সেটি কোনো সাধারণ সেলফি নয়; বরং আড়াল আর প্রকাশের এক নিপুণ খেলা।

ছবিতে সামিনা একটি বড় কাঠের টেবিলের ওপাশে বসে আছে। তার পরনে টকটকে মেরুন রঙের একটি সালোয়ার কামিজ। কামিজের গাঢ় রঙ সামিনার দুধে-আলতা গায়ের রঙের সাথে মিশে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে। সামিনার চেহারাটা গোলগাল এবং ডাগর, যার মধ্যে এক ধরণের আভিজাত্য মেশানো সতেজতা আছে। তার ঠোঁটদুটো বেশ পুরু এবং মাংসল—মোর্শেদের মনে হলো সেই ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা রহস্যময় হাসিটা কোনো অভিজ্ঞ শিকারীর মতো তাকে বিদ্ধ করছে।
সামিনার চুলগুলো মাথার পেছনে শক্ত করে খোঁপা করা। যার কারণে তার ঘাড়ের দুপাশ একদম উন্মুক্ত হয়ে আছে। সেই খোঁপার বাঁধন দেখা না গেলেও বোঝা যাচ্ছে। তবে ছবি দেখে এটা বোঝার উপায় নেই তার চুল ঠিক কতটা লম্বা বা ঘন, কিন্তু খোঁপার সেই ভার সামিনার মাথার পেছনের অংশে এক ধরণের গাম্ভীর্য যোগ করেছে। টেবিলের ওপর রাখা তার হাতদুটোর কব্জিতে কয়েকগাছি কাঁচের চুড়ি, যা স্তব্ধ ছবিতেও যেন রিনরিন শব্দ তুলছে।

সামিনার এই 'বড়সড়' এবং ভরাট শরীরী গড়ন মোর্শেদের কল্পনাকে এক ধাক্কায় কয়েক ধাপ ওপরে নিয়ে গেল। যদিও টেবিলের ওপাশে বসে থাকার কারণে সামিনার শরীরের পূর্ণ অবয়ব বা সেই ‘নীল জ্যামিতি’র নিচের অংশটুকু একদমই আড়ালে রয়ে গেছে, কিন্তু টেবিলের ওপর উপচে পড়া তার বুকের উপরিভাগের উদ্ধত ভঙ্গি আর চওড়া কাঁধের বিভাস মোর্শেদকে বুঝিয়ে দিল—এই নারী কেবল শব্দের মায়া নয়, বরং এক আদিম এবং শক্তিশালী মোহিনী।

মোর্শেদ ছবিটা জুম করল। সামিনার ফরসা ত্বকের ওপর মেরুন কামিজের প্রতিফলন এক ধরণের গোলাপি আভা তৈরি করেছে। তার সেই পুরু ঠোঁটের কারুকাজ আর গোলগাল চেহারার লাবণ্য মোর্শেদের ভেতর এক অবর্ণনীয় দহন তৈরি করল। সে ভাবল, এই টেবিলটা যদি না থাকত? এই লুকোচুরি যদি না থাকত?

সে দ্রুত কাঁপাকাঁপা আঙুলে টাইপ করল—
মোর্শেদ: "সামিনা, আপনি কি জানেন আপনি কতটা প্রলয়ংকরী? আপনার এই গোলগাল চেহারার আড়ালে যে কী পরিমাণ কামুকতা লুকিয়ে আছে, তা আপনার এই পুরু ঠোঁটদুটো চিৎকার করে বলছে। কিন্তু ওই টেবিলটা... ওটা কেন মাঝখানে রাখলেন? আপনি কি চান আমি আপনার শরীরের পূর্ণ মানচিত্রটা না দেখেই পাগল হয়ে যাই?"

সামিনা: (একটা চোখের ইমোজি দিয়ে) "সবটুকু দেখতে চাইলে তো ধৈর্য হারালে চলবে না, মিস্টার রাইডার। টেবিলটা তো আসলে একটা পর্দা। এই গোলগাল চেহারার আড়ালে যে রহস্য আছে, তা উদ্ধার করা কি এতই সহজ? আপনি কি ভয় পাচ্ছেন, নাকি আরও গভীরে ডুব দিতে চাইছেন?"

মোর্শেদ: "আমি ডুব দিতে চাই না সামিনা, আমি হারিয়ে যেতে চাই। আপনার এই মেরুন কামিজ আর ওই ভরাট শরীরের নেশা আমাকে হাইওয়ের গতির চেয়েও বেশি উন্মাদ করে দিচ্ছে। কিন্তু এই ছবিটা অসম্পূর্ণ। আমি আপনার সেই খোঁপা খুলে যাওয়া চুল আর টেবিলের আড়াল ছাড়া আপনাকে দেখতে চাই।"

এই কথার পর কেমন যেন একটা হঠাৎ নিরবতা গ্রাস করল দুজনকেই। এই অস্বস্তিকর নিরবতা ভাঙাতে মোর্শেদ ভাবতে লাগল কি বলা যায় সামিনাকে? 

মোর্শেদ দ্রুত টাইপ করল—
মোর্শেদ: "এই ছবিটা তো বাসি, সামিনা। এটা হয়তো মাস ছয়েক আগের কোনো সোনালী বিকেলের স্মৃতি। এতে আপনি আছেন, কিন্তু আপনার বর্তমানের সেই উত্তাপ নেই। আমি আজকের সামিনাকে দেখতে চেয়েছিলাম। যে সামিনা মাত্রই ফ্রেশ হয়ে বালিশে মাথা রেখেছেন।"

সামিনা: (একটু সময় নিয়ে লিখল) "বাসি? আপনি কি তবে শিল্পের বয়স মাপেন, মিস্টার রাইডার? এই ছবিটাতে কি আপনি আমাকে খুঁজে পাননি?"

মোর্শেদ: "আমি আপনাকে পেয়েছি, কিন্তু আপনার সেই 'নীল জ্যামিতি'কে পাইনি। আমি কাল্পনিক কোনো ছায়াশরীর চাই না, আমি চাই রক্ত-মাংসের বর্তমান। আমি জানতে চাই এই মুহূর্তে আপনার চুলের গন্ধ কেমন, আপনার পরনের সেই পাতলা সুতির কাপড়টা আপনার শরীরের সাথে কীভাবে যুদ্ধ করছে। এই ছবিটা আমাকে তৃষ্ণার্ত করেছে ঠিকই, কিন্তু তৃষ্ণা মেটাতে পারেনি।"

সামিনা ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর লিখল—
সামিনা: "আপনি আসলেই একজন জেদী রাইডার। ঠিক আছে, আজকের মতো এই ছবিটা নিয়েই ঘুমোতে যান। আমি কথা দিচ্ছি—কাল সকালে কলেজে যাওয়ার আগে আমি আয়নার সামনে দাঁড়াব। একদম ফ্রেশ, ভোরের সেই প্রথম আলোয়। শুধু আপনার জন্য একটা ছবি তুলব। এবার কি খুশি?"

মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, সামিনা তাকে আবার এক দীর্ঘ অপেক্ষার জালে জড়িয়ে দিল। কিন্তু এই অপেক্ষার মধ্যেই যেন এক অদ্ভুত উত্তেজনা আছে।

পরমুহূর্তেই মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। যদিও সরাসরি বর্তমানের কোনো ছবি সে পেল না, কিন্তু সামিনার এই নতিস্বীকার তার কাছে এক বিশাল জয় মনে হলো। কাল ভোরে সামিনা আয়নার সামনে দাঁড়াবে—শুধু তার জন্য। এই কল্পনাটুকু মোর্শেদের পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ শরীরে এক তীব্র শিহরণ জাগিয়ে তুলল। তার শিরদাঁড়া বেয়ে এক ধরণের অদ্ভুত উত্তাপ নেমে যাচ্ছে। কাল ভোরের সেই প্রথম আলোয় সামিনা যখন স্নান সেরে আয়নার সামনে দাঁড়াবে, তখন তার সেই ফরসা গোলগাল শরীরটার ওপর দিয়ে ভোরের নরম আলো কীভাবে খেলা করবে, সেটা ভেবেই মোর্শেদের ভেতরে কামনার এক অবাধ্য স্রোত বয়ে গেল।

সে দ্রুত টাইপ করল—
মোর্শেদ: "খুশি? আপনি জানেন না সামিনা, এই খুশির মাশুল আমার শরীর কীভাবে দিচ্ছে। কাল ভোরের ওই আলোর অপেক্ষায় আমার রাতটা এখন হাজার বছর লম্বা মনে হবে। ওই আয়নাটা খুব ভাগ্যবান, সে কাল সকালে আপনার ওই ভরাট শরীরের প্রতিটি বিভঙ্গ প্রথম দেখবে। আমার হিংসে হচ্ছে আয়নাটার ওপর।"

সামিনা: "উফ্, আপনার কল্পনা তো দেখি হাইওয়ের গতির চেয়েও জোরে ছুটছে! আয়নাটার ওপর হিংসে করে লাভ নেই, শিল্পী তার সৃষ্টিকে আগে আয়নাতেই পরখ করে নেয়। তবে মনে রাখবেন, ভোরের আলো কিন্তু খুব স্বচ্ছ হয়, সেখানে কোনো কিছু আড়াল করা কঠিন।"

মোর্শেদ: "আমি তো আড়াল চাই না সামিনা। আমি চাই উন্মোচন। আমি চাই আপনার ওই মেরুন কামিজের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্যগুলো কাল ভোরে একে একে আমার ফোনে ধরা দিক। আপনার ওই পুরু ঠোঁটদুটো কাল সকালে কী বলবে? নাকি তারা কেবল ছবিতেই কথা বলবে?"

সামিনা: "ঠোঁটদুটো কাল সকালে হয়তো একটু বেশিই নীরব থাকবে, মিস্টার রাইডার। কারণ তখন তারা আপনার উত্তরের অপেক্ষায় থাকবে। আচ্ছা, অনেক রাত হলো, এবার কিন্তু আমার ঘুমানো দরকার। কাল সকালে উঠতে হবে, বাচ্চাদের জগত ডাকছে আমাকে।"

মোর্শেদ: "বাচ্চাদের জগত তো আছেই, কিন্তু এই রাইডারের জগতটা যে এখন আপনার ওই 'ভোরের ছবিতে' আটকে আছে। আচ্ছা সামিনা, কাল সকালে কি আপনার ওই খোঁপাটা খোলা থাকবে? আমি আপনার সেই চুলের অরণ্যে হারিয়ে যেতে চাই।"

সামিনা: "সেটা কাল সকালেই দেখা যাবে। এখন আর কোনো প্রশ্ন নয়। এবার চোখ বন্ধ করুন আর কাল ভোরের স্বপ্ন দেখুন। শুভরাত্রি, আমার জেদী রাইডার।"

মোর্শেদ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর নিঃশ্বাস নিল। তার শরীর এখন এক ধরণের মিষ্টি যন্ত্রণায় অবশ হয়ে আসছে। সামিনা বিদায় নিলেও তার ঘ্রাণ আর তার ওই গোলগাল চেহারার লাবণ্য যেন ঘরের বাতাসে মিশে আছে। মোর্শেদ অনুভব করল, তার প্যান্টের বেল্টটা এখন বড্ড বেশি টাইট মনে হচ্ছে। সে ফোনটা হাতে নিয়ে টাইপ করল না, কেবল একটি জ্বলন্ত লাল রঙের 'চুমুর ইমোজি' পাঠিয়ে দিল।

সামিনা মেসেজটা 'সিন' করল, কিন্তু আর কোনো উত্তর দিল না। মোর্শেদ বুঝল, খেলাটা এখন সামিনার কোর্টে। সে বারান্দার ইজি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। কাল ভোরের সেই প্রথম আলো আর সামিনার সেই প্রতিশ্রুত 'নিষিদ্ধ ভূগোল' দেখার নেশায় সে এখন বিভোর।

সে হুইস্কির শেষ চুমুকটা দিয়ে ল্যাপটপ আর ফোনের আলো নিভিয়ে দিল। অন্ধকার ঘরে কেবল তার দ্রুত হতে থাকা নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। কাল সকালটা কি আসলেও কোনো নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে? মোর্শেদ এখন কেবল সেই অপেক্ষার ইকোসিস্টেমে বন্দী।

সামিনা অফলাইন হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে মেসেঞ্জারের সেই সবুজ বিন্দুটা নিভে গেল, কিন্তু মোর্শেদের ভেতরের দাবানলটা তখন মাত্র ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। সে ফোনটা হাতে নিয়ে আবার সেই ছবিটাতে ফিরে গেল। অন্ধকার ঘরে ফোনের উজ্জ্বল আলোটা তার মুখে এসে পড়ছে, আর তার স্থির চোখ দুটো যেন সামিনার ওই ভরাট অবয়বটাকে গিলে খেতে চাইছে।

সে ছবিটা জুম করল। সামিনার সেই গোলগাল ভরাট মুখটা—যাতে এক ধরণের আদিম সতেজতা আর আভিজাত্য মাখানো। মোর্শেদ তার আঙুল দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে সামিনার সেই পুরু, মাংসল ঠোঁটদুটো স্পর্শ করার চেষ্টা করল। সে কল্পনা করল, এই ঠোঁটদুটো যখন কথা বলে, তখন তারা কতটা প্রলয়ংকরী হয়ে ওঠে। সামিনার সেই ফরসা ত্বকের লাবণ্য তার চোখের মণি ছাপিয়ে সরাসরি মস্তিষ্কের কোষে গিয়ে আঘাত করছে।

তার চোখ এবার স্থির হলো সামিনার সেই খোঁপা করা চুলের দিকে। যদিও ছবিতে চুলগুলো গোছানো, কিন্তু মোর্শেদের মনে হলো সে যেন ওই খোঁপার প্রতিটি ভাঁজ অনুভব করতে পারছে। সে ভাবতে লাগল, এই মুহূর্তেই যদি সে ওই খোঁপার বাঁধনটা আলগা করে দিত? সেই একরাশ কালো অবাধ্য চুল যখন সামিনার ওই চওড়া ফরসা কাঁধ আর ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়ত, তখন সামিনাকে দেখতে কেমন লাগত? মেরুন কামিজের সেই স্লিভলেস কাটিং দিয়ে বেরিয়ে আসা সামিনার ভরাট বাহু আর তার শরীরের সেই উদ্ধত বিভঙ্গগুলো মোর্শেদকে এক মুহূর্তের জন্যও স্থির থাকতে দিচ্ছে না।

টেবিলের আড়ালে থাকা সামিনার সেই ‘নিষিদ্ধ ভূগোল’ এখন মোর্শেদের কল্পনায় পূর্ণতা পাচ্ছে। সামিনার সেই বড়সড় ভরাট শরীর, তার কোমর আর নিতম্বের সেই জ্যামিতিক বাঁকগুলো সে নিজের মনের ক্যানভাসে আঁকতে শুরু করল। মোর্শেদ অনুভব করল, তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী পোক্ত শরীরটা এখন আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। তার যৌনাঙ্গ প্রবল বিক্রমে জাগ্রত হয়ে উঠেছে, যা তার প্যান্টের কাপড়ের ভেতর দিয়ে এক ধরণের অসহ্য চাপ তৈরি করছে।

ঘরের এসিটা সচল থাকলেও মোর্শেদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। একাকীত্বের এই ইকোসিস্টেমে সামিনা যেন এক মরণনেশা হয়ে ঢুকে পড়েছে। মোর্শেদ নিজের অজান্তেই তার প্যান্টের বোতামটা আলগা করে দিল। তার হাত চলে গেল সেই জাগ্রত কামনার ওপর।

পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসেও সে নিজেকে আবিষ্কার করল এক সদ্য যৌবনে পা ফেলা তরুণের মতো। কোনো অভিজ্ঞ পুরুষের সংযম নয়, বরং এক আদিম আর ক্ষুধার্ত পশুর মতো সে হস্তমৈথুন করতে শুরু করল। তার চোখের সামনে কেবল সামিনার সেই গোলগাল মুখ, সেই পুরু ঠোঁট আর মেরুন কামিজের নিচে লুকিয়ে থাকা সেই রহস্যময় ভরাট শরীরের হাহাকার। প্রতিটি ঘর্ষণে সে যেন সামিনার সেই 'নীল জ্যামিতি'র আরও কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

অন্ধকার ঘরে কেবল মোর্শেদের দ্রুত আর ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। সে চোখ বন্ধ করল। এখন আর সে বনানীর ফ্ল্যাটে নেই; সে যেন সামিনার সেই অদেখা শরীরের প্রতিটি ভাঁজে হারিয়ে যাচ্ছে। উত্তেজনার পারদ যখন চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছাল, তখন মোর্শেদ এক তীব্র যন্ত্রণাদায়ক সুখে কুঁকড়ে গেল। নিস্তেজ হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দেওয়ার পর তার মনে হলো—সামিনা তাকে আজ সশরীরে না এসেও পুরোপুরি জয় করে নিয়েছে।

মেটিওর-এর ইঞ্জিনের উত্তাপের চেয়েও তীব্র এক দহন তাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। সে নিঃশব্দে শুয়ে থাকল, ভোরের সেই প্রতিশ্রুত আলোর অপেক্ষায়, যখন সামিনা সত্যিই তার সবটুকু পর্দা সরিয়ে মোর্শেদের সামনে ধরা দেবে।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 7 users Like KaminiDevi's post
Like Reply
#43
[Image: Whats-App-Image-2026-02-07-at-6-54-52-PM.jpg]

৩য় পর্বের সমাপ্তি।
৪র্থ পর্ব কি নতুন কোনও মোড় নিয়ে আসবে? জানতে চোখ রাখুন। শীঘ্রই আপডেট আসছে।

কারও কোনও পরামর্শ বা মন্তব্য সাদরে গ্রহণ করা হয়, তাই নিজের মতামত জানাতে ভুলবেন না সবাই। ধন্যবাদ
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 2 users Like KaminiDevi's post
Like Reply
#44
নিঃসন্দেহে আপনি atmosphere, tension এবং psychological pull তৈরি করতে পারদর্শীএই পর্বে এসে যদিও কিছু জায়গায় সংযম কমে গেছে, ফলে শুরুতে যে সূক্ষ্মতা ও layered tension ছিল, শেষের দিকে তা কিছুটা একমাত্রিক মনে হয়েছেসামিনাকে শারীরিকভাবে উপস্থিত না রেখে মানসিকভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে রাখা,

 “দেখাবো/দেখাবো নাএবং এখন/পরেধরনের delay–এর ব্যবহার দারুন ছিলো
 
কথোপকথনের গতি সামিনা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মোর্শেদের মতো অভিজ্ঞ মানুষকে react করায়এটা শক্তিশালী
 
 ৪৫ বছরের একজন আত্মবিশ্বাসী পুরুষের অপেক্ষায় শিশুসুলভ হয়ে ওঠা, কামনা ও ego-র দোলাচলও বিশ্বাসযোগ্যভাবে এসেছে
 
তবে শেষ অংশে over-explicit হয়ে পড়ায় subtlety কিছুটা হারিয়েছেযদিও বুঝি এটি এই ফোরামের প্রত্যাশার সঙ্গে মানানসই
 
এখানে সামিনা যতটা power-centric, মোর্শেদ ততটাই এক জায়গায় আটকে থাকা মনে হয়েছে; সে অপেক্ষা করে, চায়, উত্তেজিত হয়কিন্তু নতুন কোনো inner realization বা মানসিক shift স্পষ্ট হয় নাসর্বশেষে সরাসরি masturbation-এ চলে যাওয়া (ফোরামের চাহিদা সত্ত্বেও) চরিত্রের সম্ভাব্য সংযম ও অভিজ্ঞতার গভীরতাকে পুরোটা কাজে লাগাতে পারেনি; হাত কাঁপা, শ্বাস আটকে আসা, শারীরিক-মানসিক অস্থিরতার ইঙ্গিতেই থামলে মোর্শেদের সংবেদনশীলতা ও tension আরও শক্ত থাকত। 

আমার বেক্তিগত মতামত । লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই সবার উপরে স্থান পাবে । 
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 4 users Like gungchill's post
Like Reply
#45
(07-02-2026, 07:49 PM)gungchill Wrote: নিঃসন্দেহে আপনি atmosphere, tension এবং psychological pull তৈরি করতে পারদর্শীএই পর্বে এসে যদিও কিছু জায়গায় সংযম কমে গেছে, ফলে শুরুতে যে সূক্ষ্মতা ও layered tension ছিল, শেষের দিকে তা কিছুটা একমাত্রিক মনে হয়েছেসামিনাকে শারীরিকভাবে উপস্থিত না রেখে মানসিকভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে রাখা,

 “দেখাবো/দেখাবো নাএবং এখন/পরেধরনের delay–এর ব্যবহার দারুন ছিলো
 
কথোপকথনের গতি সামিনা যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মোর্শেদের মতো অভিজ্ঞ মানুষকে react করায়এটা শক্তিশালী
 
 ৪৫ বছরের একজন আত্মবিশ্বাসী পুরুষের অপেক্ষায় শিশুসুলভ হয়ে ওঠা, কামনা ও ego-র দোলাচলও বিশ্বাসযোগ্যভাবে এসেছে
 
তবে শেষ অংশে over-explicit হয়ে পড়ায় subtlety কিছুটা হারিয়েছেযদিও বুঝি এটি এই ফোরামের প্রত্যাশার সঙ্গে মানানসই
 
এখানে সামিনা যতটা power-centric, মোর্শেদ ততটাই এক জায়গায় আটকে থাকা মনে হয়েছে; সে অপেক্ষা করে, চায়, উত্তেজিত হয়কিন্তু নতুন কোনো inner realization বা মানসিক shift স্পষ্ট হয় নাসর্বশেষে সরাসরি masturbation-এ চলে যাওয়া (ফোরামের চাহিদা সত্ত্বেও) চরিত্রের সম্ভাব্য সংযম ও অভিজ্ঞতার গভীরতাকে পুরোটা কাজে লাগাতে পারেনি; হাত কাঁপা, শ্বাস আটকে আসা, শারীরিক-মানসিক অস্থিরতার ইঙ্গিতেই থামলে মোর্শেদের সংবেদনশীলতা ও tension আরও শক্ত থাকত। 

আমার বেক্তিগত মতামত । লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই সবার উপরে স্থান পাবে । 

আমার ইচ্ছে ছিল না খোলাখুলি বর্ণনাটা দেওয়ার। এটাকে টেস্টিং বলতে পারেন। মেইন কোর্সে যাওয়ার আগে, একটু এপ্লাই করে দেখছি কেমন প্রভাব পড়ে।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
Like Reply
#46
[Image: 20260207-233416.jpg]


সামিনা অপেক্ষায় আছে, তার কাঙ্ক্ষিত পুরুষের জন্য।
Like Reply
#47
সুন্দর একটি পর্ব। কিছু স্পষ্টতা, কিছু ধোঁয়াশা এই দোলাচলেই শেষ এই পর্বটি। আশা করি আগামী পর্বে সামিনা তার পরিপূর্ণ অবয়ব নিয়ে ধরা দিবে।
Like Reply
#48
চমৎকার…..পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায়….
Like Reply
#49
[Image: IMG-2617.jpg]
[+] 1 user Likes Maleficio's post
Like Reply
#50
Darun cholche.... Awasome update
Like Reply
#51
(07-02-2026, 11:39 PM)mailme_miru Wrote: [Image: 20260207-233416.jpg]


সামিনা অপেক্ষায় আছে, তার কাঙ্ক্ষিত পুরুষের জন্য।

আমরা আশা করি, সত্যিই সামিনা তার কাঙ্ক্ষিত পুরুষকে খুঁজে পাবে।

(07-02-2026, 11:55 PM)skam4555 Wrote: সুন্দর একটি পর্ব। কিছু স্পষ্টতা, কিছু ধোঁয়াশা এই দোলাচলেই শেষ এই পর্বটি। আশা করি আগামী পর্বে সামিনা তার পরিপূর্ণ অবয়ব নিয়ে ধরা দিবে।

অসংখ্য ধন্যবাদ। দেখা যাক আগামী পর্বে সামিনা ধরা দেয় নাকি অধরাই থেকে যায়।

(08-02-2026, 01:09 AM)Maleficio Wrote: চমৎকার…..পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায়….

শীঘ্রই আপডেট আসছে।

(08-02-2026, 02:33 AM)Slayer@@ Wrote: Darun cholche.... Awasome update

ধন্যবাদ পাশে থাকার জন্য।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
Like Reply
#52
[Image: Gemini-Generated-Image-9cfut49cfut49cfu.png]


পর্ব ৪র্থ
ঘর্মাক্ত রোদে নিশির ডাক
 
ভোর সোয়া ছয়টা। বনানী ডিওএইচএসের আকাশটা এখন মরা মাছের চোখের মতো ফ্যাকাসে ধূসর। চারপাশের অভিজাত নিস্তব্ধতাকে চিরে মাঝে মাঝে দু-একটা কাকের ডাক শোনা যাচ্ছে। মোর্শেদ তার বারান্দার ইজি চেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছে। তার সামনে রাখা কাঁচের টি-টেবিলটা এখন একটা ছোটখাটো ধ্বংসস্তূপ। অ্যাশট্রেটা উপচে পড়ছে মার্লবরো রেডের ফিল্টারে। গত কয়েক ঘণ্টায় সে যে কতগুলো সিগারেট পুড়িয়েছে, তার হিসেব নেই।
সারা রাত এক মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করতে পারেনি মোর্শেদ। পকেটে অঢেল অর্থ থাকলে একাকীত্ব কাটানোর নানা পথ খুলে যায়, মোর্শেদও তার ব্যতিক্রম নয়। দামী হুইস্কি থেকে শুরু করে রাইডিংয়ের নেশা—সবই সে পরখ করেছে। কিন্তু সামিনা নামের এই নারীটি তার জীবনে যে নতুন নেশার জন্ম দিয়েছে, তার তীব্রতা অন্য সব কিছুকে হার মানিয়ে দিচ্ছে। সামিনা যেন কোনো মানুষ নয়, বরং এক অদৃশ্য ড্রাগ, যা মোর্শেদের রক্তে মিশে গেছে। কাল সারা রাত সে আধোঘুমে, আধোজাগরণে সামিনার কথা ভেবেই পার করে দিয়েছে।
ভোরের এই মিঠে রোদে মোর্শেদের শরীরটা তন্দ্রায় একটু এলিয়ে আসছিল, কিন্তু সামিনার নেশা তাকে বেশিক্ষণ ঝিমোতে দিল না। হঠাত্‍ ধড়ফড় করে উঠে বসল সে। ঘড়িতে এখন সকাল পৌনে সাতটা। সামিনা কথা দিয়েছিল, আজ কলেজে যাওয়ার আগে সে মোর্শেদকে একটা ছবি পাঠাবে। এই প্রথম মোর্শেদ তাকে সশরীরে দেখবে—অন্তত ডিজিটাল পর্দায়। কিন্তু মেসেঞ্জার এখনো নিস্তব্ধ।
মোর্শেদ ফোনের স্ক্রিনটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল—সামিনা কি এখন উঠেছে? নাকি ও আরও ভোরে জাগে? ও তো বলেছিল ও আর্ট টিচার। মোর্শেদের কল্পনায় সামিনার একটা ধোঁয়াটে অবয়ব তৈরি হলো। যাত্রাবাড়ীর কোনো এক সাধারণ ফ্ল্যাটে সামিনা হয়তো এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শাড়ির কুঁচি ঠিক করছে। অথবা হয়তো রান্নাঘরে কড়া করে চা বানাচ্ছে। মোর্শেদ নিজের মনেই হাসল। সে কখনও ভাবেনি পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে কোনো এক অদেখা নারীর দৈনন্দিন রুটিন নিয়ে সে কিশোরদের মতো ব্যাকুল হয়ে পড়বে।
মিনিট পনেরো পার হয়ে গেল। ফোনের নোটিফিকেশন লাইটটা এখনো জ্বলে ওঠেনি। মোর্শেদের ভেতরে একটা চাপা অস্থিরতা কাজ করতে শুরু করল। সামিনা কি ইচ্ছা করেই দেরি করছে? নাকি সে মোর্শেদকে কেবল একলা রাতের কোনো মরীচিকা হিসেবেই রেখে দিতে চায়? মোর্শেদ ভাবল—"কয়টায় বের হয় সামিনা? ও কি বাসে যায়? যাত্রাবাড়ীর সেই জ্যামে আটকে থেকে ও কি এখন ঘামছে? নাকি ও আমাকে নিয়ে খেলছে?"
সে মেসেঞ্জার ওপেন করল। সামিনা অনলাইনে নেই। লাস্ট সিন দেখাচ্ছে ভোর ৫টা ২০ মিনিট। তার মানে ও অনেক ভোরেই জেগেছে। মোর্শেদ টাইপিং বক্সে আঙুল রাখল, কিন্তু কিছু লিখল না। একজন অভিজ্ঞ পুরুষের মতো সে তার অস্থিরতাকে আড়াল করতে চায়। সে চায় না সামিনা বুঝুক যে বনানীর এই দামী ফ্ল্যাটে বসে একজন কোটিপতি রাইডার সামান্য একটা ছবির জন্য কতটা তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে।
কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, মোর্শেদের ঝিমুনি তত কাটছে আর বাড়ছে তার আদিম ক্ষুধা। সামিনা ছবি না পাঠিয়ে তাকে এক ধরণের মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই প্রতীক্ষাটাই যেন একটা আলাদা নেশা। মোর্শেদের মনে হলো, সামিনা হয়তো এখন কোনো এক ব্যস্ত রাস্তায় রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে, আর মনে মনে মোর্শেদের এই অস্থিরতাকে উপভোগ করছে।
সে উঠে দাঁড়াল। বারান্দার রেলিং ধরে বাইরের দিকে তাকাল। তার কালো রঙের রয়্যাল এনফিল্ডটা নিচে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মোর্শেদের মনে এক অদ্ভুত জেদ দানা বাঁধল। সামিনা ছবি দেয়নি তাতে কী? সামিনা তো বলেছিল সে কোন কলেজে পড়ায়। মোর্শেদ কি পারবে না সেই ঘিঞ্জি যাত্রাবাড়ীর অলিগলিতে সামিনাকে খুঁজে বের করতে?
মোর্শেদ বিড়বিড় করে বলল, "সামিনা, তুমি ছবি না পাঠিয়ে আমাকে ঘরছাড়া করার পথটাই বেছে নিলে।"
বারান্দার রেলিংয়ে জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো রোদের স্পর্শে বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। মোর্শেদ তার আরামদায়ক ইজি চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। গত কয়েক ঘণ্টায় সে যে পরিমাণ নিকোটিন শরীরে ঢুকিয়েছে, তাতে মস্তিষ্কটা ঝিমঝিম করছে। সারা রাতের জেগে থাকা আর সামিনার ওই অদেখা রূপের কাল্পনিক ব্যবচ্ছেদ তাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে।
সে টলটলে পায়ে ঘরের ভেতর ফিরে এল। এসি-র ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ঘরটা একটা হিমঘরের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। মোর্শেদ তার বিশাল কিং সাইজ বেডটায় ধপাস করে গা এলিয়ে দিল। সাদা ধবধবে সিল্কের চাদরটা তার শরীরের উত্তাপে কুঁচকে গেল। এই বিছানাটা কতদিন ধরে কেবল একজন মানুষেরই ভার বহন করে আসছে। একাকীত্বের এই ইকোসিস্টেমে এই বিশাল খাটটা তার কাছে এক নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো।
বালিশে মাথা রেখেই সে তার স্মার্টফোনটা হাতে নিল। সামিনার নেশাটা এখন তার রক্তে টগবগ করছে। সে চাইছিল সামিনা তাকে ছবি পাঠাবে, কিন্তু সামিনা নিরুত্তর। মোর্শেদের মনে এক অদ্ভুত জেদ চাপল। সে নিজেই নিজেকে মেলে ধরবে সামিনার কাছে। সে ফোনটা উঁচিয়ে ধরল। বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় নিজের একটা সেলফি তুলল সে। ছবিতে তার পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ চেহারায় রাতের জাগরণ আর কামনার একটা অস্পষ্ট ছাপ ফুটে উঠেছে। হালকা কাঁচা-পাকা দাড়ি, চোখের নিচে কালচে ছায়া আর খোলা বুকের লোমের ওপর হিরের লকেটের মতো চিকচিক করছে ঘামের বিন্দু।
ছবিটা সিলেক্ট করে সে সামিনার ইনবক্সে সেন্ড করল। ছবির সাথে সে লিখল—
"এই হিমশীতল বিছানায় আমি একা, অথচ আমার শরীরে দাউদাউ করে জ্বলছে যাত্রাবাড়ীর কোনো এক অদেখা আগুনের আঁচ। আমার এই সুশৃঙ্খল একাকীত্ব আজ বড্ড অবাধ্য হতে চাইছে সামিনা। তুমি কি সত্যিই আসবে এই জ্যামিতি মেলাতে? শুভ সকাল, আমার কাল্পনিক মরণনেশা।"
মেসেজটা পাঠিয়ে সে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। কিন্তু না, মেসেজের পাশে থাকা সেই ছোট সার্কেলটা পূর্ণ হলো না। কেবল একটা সাদা টিক চিহ্ন পড়ে থাকল। অর্থাৎ সামিনা এখনো অনলাইনে আসেনি। মোর্শেদ বিড়বিড় করল, "এখনো ওঠেনি ও? নাকি ইচ্ছা করেই এড়িয়ে যাচ্ছে?"
সে ভাবতে লাগল—সামিনা কি এখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে? ওর অগোছালো চুলে কি সকালের আলো এসে পড়েছে? নাকি ও এখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত হাতে সিঁদুর বা কাজলের প্রলেপ দিচ্ছে? মোর্শেদের মনের ভেতর সামিনার একটা কাল্পনিক শরীর বারবার যাতায়াত করছে। সে ভাবল, সামিনা কি মেসেজটা দেখে হাসবে? নাকি তার এই সরাসরি কামনামদির আহ্বানকে ঘৃণা করবে?
মিনিট পাঁচেক পার হলো। দশ মিনিট। পনেরো মিনিট। ফোনের নীল আলোটা নিভে অন্ধকার হয়ে গেল, কিন্তু কোনো ফিরতি সংকেত এল না। মোর্শেদের ভেতরে এক ধরণের অবসাদ নেমে এল। অতিরিক্ত মদ্যপান আর নির্ঘুম রাতের ধকল এবার তার শরীর নিতে পারছে না। তার চোখের পাতা দুটো সীসার মতো ভারী হয়ে আসছে।
সে ফোনটা বুকের ওপর রেখেই চোখ বুজল। তার অবচেতন মন এখনো সামিনার অপেক্ষায় সজাগ। সে ভাবল, সামিনা যখন অনলাইনে আসবে, তখন নিশ্চয়ই ফোনটা কেঁপে উঠবে। সেই কম্পনটাই হবে তার আজকের দিনের শ্রেষ্ঠ সুর।
অপেক্ষার এই যন্ত্রণাদায়ক তৃপ্তি নিয়েই মোর্শেদ এক সময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। ঘুমের ভেতর সে দেখল, সে তার রয়্যাল এনফিল্ড নিয়ে একটা অন্তহীন হাইওয়ে দিয়ে ছুটছে। তার পেছনে সামিনা বসে আছে, যার হাত দুটো মোর্শেদের উদাম বুকের ওপর শক্ত করে রাখা। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর ইঞ্জিনের গর্জনের মাঝে সামিনা তার কানে ফিসফিস করে বলছে, "মানুষ চিনে নেওয়া বড্ড কঠিন, মোর্শেদ সাহেব।"
বনানীর সেই বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে তখন সকালের কড়া রোদ জানালার পর্দা ভেদ করে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু মোর্শেদ তখন এক অলীক প্রেমের ঘোরে আচ্ছন্ন। সামিনার সেই না আসা মেসেজ আর না দেখা ছবিটাই যেন তার ঘুমের ভেতর এক রহস্যময় ইকোসিস্টেম তৈরি করে ফেলেছে।
বেলা এগারোটা বেজে কুড়ি মিনিট। বনানী ডিওএইচএসের আকাশচুম্বী আভিজাত্য চিরে রোদের তীব্র তীক্ষ্ণ ফালিগুলো ভারী পর্দার ফাঁক গলে মোর্শেদের শয়নকক্ষে হানা দিয়েছে। এসি-র কৃত্রিম হিমশীতল বাতাসের সাথে বাইরের তপ্ত দুপুরের এই লড়াইয়ে ঘরটা কেমন গুমোট হয়ে আছে। মোর্শেদ পাশ ফিরল। গভীর এক অবশ করা ঘুম থেকে টেনে তোলার এই চেষ্টা তার শরীরের প্রতিটি পেশি প্রত্যাখ্যান করছে। সে দুহাতে মুখ ঘষল, তারপর চোখ মুখ কুঁচকে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে পড়ে থাকল কতক্ষণ।
চোখদুটো ভীষণ জ্বালা করছে। গত রাতের অতিরিক্ত মদ্যপান, উপর্যুপরি সিগারেটের ধোঁয়া আর ভোরের সেই তীব্র মানসিক উত্তেজনা—সব মিলে তার মগজের ভেতর এখন কেউ যেন হাতুড়ি পিটাচ্ছে। জানালার পর্দার পাশ দিয়ে আসা সূর্যের আলোটা তার চোখে বিঁধছে সূঁচের মতো। সে তাকাতে পারছে না। তবুও, শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে সে উঠে বসল। একটা অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করছে।
বিছানার পাশে পড়ে থাকা ফোনটার দিকে তাকাতেই তার হৃদস্পন্দন একটু বেড়ে গেল। সেই চেনা নেশা, সামিনার নেশা। মোর্শেদ হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল। আঙ্গুলের ছোঁয়ায় স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। কোনো নতুন নোটিফিকেশন নেই। সে দ্রুত মেসেঞ্জার ওপেন করল।
না, কোনো ছবি আসেনি।
ছবি তো দূরের কথা, মোর্শেদ ভোরে নিজের যে ছবি আর সেই কামনামদির মেসেজ পাঠিয়েছিল, সেটির পাশে থাকা সেই সাদা বৃত্তটি এখনো পূর্ণ হয়নি। অর্থাৎ সামিনা এখনো অনলাইনে আসেনি। মোর্শেদের মেসেজটি তার সার্ভারে পৌঁছালেও সামিনার হ্যান্ডসেটে পৌঁছায়নি।
এক মুহূর্তের জন্য মোর্শেদের মনে হলো সময়টা থেমে গেছে। পঁয়তাল্লিশ বছরের এই সুপ্রতিষ্ঠিত মানুষটি, যার ইশারায় ঢাকার রিয়েল এস্টেট জগতের ছোটখাটো ভূমিকম্প হতে পারে, সে আজ একজন অদেখা কলেজ শিক্ষিকার মেসেজের অপেক্ষায় ভিখারির মতো বসে আছে। একরাশ চরম বিতৃষ্ণা আর অপমানের এক বিষাক্ত ঢেউ তার বুক চিরে নেমে গেল। নিজেকে নিজের কাছেই খুব ছোট মনে হতে লাগল তার।
"সামিনা কি সত্যিই সাধারণ কোনো কলেজ শিক্ষিকা? নাকি সে আমাকে নিয়ে একটা মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলছে?"—মোর্শেদের মনে এই প্রশ্নটা তীরের মতো বিঁধল। তার মতো একজন মানুষের পাঠানো ছবি এবং এত খোলামেলা এক আহ্বানের কোনো উত্তর নেই, এমনকি রিসিভ পর্যন্ত করা হয়নি—এই অপমান মোর্শেদের দামী নীল রক্ত সহ্য করতে পারছে না। তার ইগোতে এক বিরাট ফাটল ধরেছে। তার মনে হলো, সামিনা হয়তো এই মুহূর্তে অন্য কারও সাথে হাসাহাসি করছে, অথবা মোর্শেদের এই অস্থিরতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে নিজের প্রাত্যহিক কাজ সারছে।
সে আর বিছানায় বসে থাকতে পারল না। ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মাথাটা ঘুরে উঠল একবার, কিন্তু সে তোয়াক্কা করল না। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা স্কচের বোতলটার দিকে হাত বাড়াল সে। গ্লাসে ঢালার সময়টুকুও যেন তার তর সইছে না। গরম হয়ে থাকা এক পেগ স্কচ সরাসরি গলার ভেতর চালান করে দিল সে। তীব্র তরলটা যখন তার খাদ্যনালী পুড়িয়ে পাকস্থলীতে নামল, তখন সে কিছুটা স্থির হলো। কিন্তু মনের ভেতর যে আগুন জ্বলছে, তা নেভানোর শক্তি এই অ্যালকোহলের নেই।
স্নান করার কথা একবার মাথায় এলেও সে তা বাতিল করে দিল। শরীরের ঘাম আর রাতের বাসি গন্ধের সাথেই সে এক ধরণের আদিম তৃপ্তি পাচ্ছে। এই নোংরা একাকীত্বই এখন তার ভূষণ। আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। হাজারো দামী ব্র্যান্ডের জামাকাপড়ের ভিড়ে সে এমন কিছু খুঁজছে যা তাকে এই মুহূর্তের অস্থিরতা থেকে মুক্তি দেবে। কিন্তু কোনো নতুন পোশাক আজ তার চামড়াকে শান্তি দিতে পারছে না।
মোর্শেদ আলমারি থেকে হাত সরিয়ে আনল। তার চোখ পড়ল ঘরের এক কোণে সোফার ওপর পড়ে থাকা কালকের সেই বাসি ডেনিম জিন্সটার ওপর। কাল সারা রাত যে অস্থিরতা সে যাপন করেছে, এই জিন্সটা তার সাক্ষী। সে ওটাই টেনে নিল। প্যান্টটা পরার সময় তার মনে হলো, সামিনার সাথে এই অদেখা যুদ্ধের ময়দানে নামতে হলে এই বাসি পোশাকটাই তার সঠিক বর্ম।
আলমারির ওপরের তাক থেকে একটা ধবধবে সাদা ফুল হাতা শার্ট বের করে আনল সে। বাইরের তপ্ত রোদে নীল বা কালো রঙ মানেই শরীরের ভেতর উনুন জ্বালিয়ে রাখা। সাদা রঙটা তাকে কিছুটা হলেও শীতলতা দেবে— অন্ততঃ বাহ্যিকভাবে। শার্টের বোতামগুলো লাগাতে লাগাতে মোর্শেদ আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল। এরপর খুব ধীরলয়ে শার্টের হাতা দুটোকে কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করে নিল সে।
আয়নার সামনে নিজের পেশিবহুল হাত দুটোর দিকে সে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সেও জিমের নিয়মিত ঘাম ঝরানো বৃথা যায়নি। তার শক্তিশালী হাতের শিরা-উপশিরাগুলো চামড়ার ওপর স্পষ্ট জেগে আছে— ঠিক যেন মানচিত্রের কোনো দুর্গম নদীপথ। এই শিরাগুলোর দিকে তাকালে এক ধরণের আদিম পৌরুষ অনুভূত হয়। তবে হাতের কব্জির কাছে দুই-একটা পাকা লোম রুপোলি সুতোর মতো উঁকি দিচ্ছে। মোর্শেদ হাসল— একটা বিষণ্ণ, বাঁকা হাসি। এই কয়েকটা পাকা লোমই তাকে জানান দিচ্ছে যে তার সময় ফুরিয়ে আসছে, অথচ তার তৃষ্ণা এখনো সতেজ।
সে নিচে ঝুঁকে তার হাশপাপিজ-এর বাদামী কালারের চেলসি বুট জোড়া পায়ে গলিয়ে নিল। জুতোর ফিতের টান বা চামড়ার শক্ত বাঁধন তাকে যেন মাটির সাথে আরও দৃঢ়ভাবে গেঁথে দিল।
না, সে সামিনাকে খুঁজতে বেরোচ্ছে না। সামিনার প্রতি তার যে অভিমান, সেই অভিমানকে প্রশ্রয় দিতেই সে ঘর ছাড়ছে। একজন স্বপ্রতিষ্ঠিত, সফল পুরুষকে এভাবে উপেক্ষিত রেখে সামিনা যে জয় পেয়েছে, মোর্শেদ সেই জয়ের স্বাদ তাকে এত সহজে নিতে দেবে না। সে আজ সামিনার ইনবক্সে কোনো নক করবে না, দেখবে না সে অনলাইনে এসেছে কি না। বরং সে আজ নিজের নিঃসঙ্গতাকে এই তপ্ত রাজপথে উড়িয়ে দেবে।
মোর্শেদ যখন তার শয়নকক্ষ ছেড়ে গ্যারেজে এল, তখন চারপাশের বাতাস আগুনের হল্কার মতো তার শরীরে বিঁধছে। কভার সরিয়ে তার রয়্যাল এনফিল্ড মেটিওর ৩৫০-এর ওপর যখন সে বসল, তখন সিটের চামড়াটা রোদে তেতে আছে। সে চাবিটা অন করল।
ইঞ্জিনের প্রথম স্টার্টটা যখন হলো, সেই গুরুগম্ভীর 'থাম্প' শব্দটা বনানীর নিস্তব্ধতাকে চিরে খানখান করে দিল। ক্লাচ চেপে গিয়ার ফেলতেই মোর্শেদ অনুভব করল এক অদ্ভুত মুক্তি। সে বনানীর ভিআইপি রোডের মসৃণতা ছাড়িয়ে মূল শহরের দিকে নাক ঘোরাল।
বাইরের রাস্তাটা তখন রোদে ফেটে চৌচির হওয়ার উপক্রম। পিচঢালা কালো রাস্তা থেকে আগুনের উত্তাপ উঠছে। মোর্শেদ তার হেলমেটের ভাইজারটা নামাল না। সরাসরি তপ্ত বাতাসটা চোখেমুখে লাগতে দিল। সে জানে না সে কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু তার মেটিওর আজ তাকে সেই সব রাস্তায় নিয়ে যাবে যেখানে একাকীত্ব আর গতির কোনো সীমানা নেই। সামিনার সেই অনুত্তরিত মেসেজটা এখন তার পকেটে থাকা ফোনের ভেতর ধিকধিক করে জ্বলছে, কিন্তু মোর্শেদ আজ নিজেকে জেতাবে। সে দেখাবে যে, সামিনা ছাড়াও তার একাকীত্বের এই ইকোসিস্টেম স্বয়ংসম্পূর্ণ।
বাইকের এক্সিলারেটরটা একটু বেশিই মুচড়ে দিল সে। রোদে পুড়ে যেতে থাকা ঢাকার রাস্তায় মোর্শেদ আজ এক একাকী অভিমানী নাবিক, যে তার যান্ত্রিক ঘোড়ায় চড়ে নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে পেতে চাইছে।
বনানীর সুশৃঙ্খল আভিজাত্য পেছনে ফেলে মোর্শেদের রয়্যাল এনফিল্ড এখন তেজগাঁওয়ের জটলা ছাড়িয়ে কমলাপুরের দিকে ছুটছে। সে নিজেকে ভীষণভাবে ব্যস্ত রাখতে চায়। সামিনা নামের ওই অদৃশ্য মরণনেশা থেকে নিজেকে ছিঁড়ে বের করে আনার জন্য সে আজ বাইকের এক্সিলারেটরটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি মুচড়ে ধরেছে। বাতাসের তপ্ত ঝাপটা তার সাদা শার্টটাকে বুক চিরে ফুলিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু তার মনের ভেতরের গুমোট তাতে একটুও কমছে না।
যতটুকু সময় সে বাইক চালাচ্ছে, ততটুকু সময় সে অন্য কিছু ভাবতে চায়। কিন্তু মস্তিষ্ক তার অবাধ্য। ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে তাল মিলিয়ে তার মাথায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে কাল রাতের সেই আধো-অন্ধকার কথোপকথন। সে কল্পনা করতে পারছে, সামিনা হয়তো এতক্ষণে তার সেই ছোট কলেজটার কোনো এক ক্লাসরুমে বাচ্চাদের ড্রয়িং খাতা দেখছে। কাল রাতে সামিনা তাকে বলেছিল স্নিগ্ধ অবস্থায় ঘুমাতে যাওয়ার কথা, আর আজ সকালে হয়তো সে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে খুব সাধারণ কোনো সাজে। মোর্শেদের চোখের সামনে ভাসে—সামিনা হয়তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কপালে একটা কালো টিপ বসিয়েছে, কিংবা ঘাড়ের অবাধ্য চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে আটকে নেওয়ার সময় তার ফর্সা ঘাড়ের ওপর ভোরের আলো খেলা করেছে। এই ছবিগুলো মোর্শেদ বাস্তবে দেখেনি, কিন্তু না দেখার এই রহস্যই তাকে বেশি পোড়াচ্ছে।
দুপুরের ঢাকা যেন এক নরককুণ্ড। পিচঢালা রাজপথগুলো জ্যামে আটকে গেছে। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা বাস আর রিকশার জটলা থেকে গরম হল্কা বেরোচ্ছে, যা মোর্শেদের সাদা শার্টের নিচে জমা হওয়া ঘামকে আরও চটচটে করে তুলছে। কিন্তু মোর্শেদের কোনো থামাথামি নেই। সে জ্যামের ফাঁক গলে, ফুটপাতের ধার ঘেঁষে অবলীলায় তার ভারী ৩৫০ সিসির দানবটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার গন্তব্য কমলাপুর রেল স্টেশনের পেছনের সেই ঘিঞ্জি বস্তি এলাকা। সেখানে একটা ভাঙাচোরা পুরোনো টং দোকান আছে— মোর্শেদের বন্ধুদের আড্ডার পুরোনো ঠেক। যখন তার পকেটে আজকের মতো এত প্রাচুর্য ছিল না, যখন জীবনের অর্থ ছিল স্রেফ বেঁচে থাকা, তখন সে এখানেই পড়ে থাকত। আজ নিজের এই সাজানো আভিজাত্য আর সামিনার দেওয়া 'ইগনোরেন্স' বা অবহেলা ভুলতে সে তার সেই পুরোনো বখে যাওয়া বন্ধুদের কাছে ফিরে যেতে চাইছে। যারা জীবনের কোনো গূঢ় মানে খোঁজে না, যারা স্রেফ ধোঁয়া আর আড্ডায় দিন পার করে দেয়।
বাইক চালাতে চালাতেই মোর্শেদের হঠাৎ তীব্র নেশার তৃষ্ণা পেল। নেশার কথা মনে হতেই তার মাথায় এল গাঁজার সেই আদিম ঘ্রাণের কথা। কমলাপুরের ওই গলিতে গেলেই মিলবে সেই তীব্র ঘ্রাণ, যা সাময়িকভাবে মগজটাকে অবশ করে দেবে। একই সাথে তার মনে পড়ে গেল সামিনার কথা—সামিনাও তো এক ধরণের নেশা, যার কোনো কাটান নেই। নেশা আর সামিনা—দুটো শব্দ মোর্শেদের মগজে এখন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সে অনুভব করল তার হাতের শিরাগুলো বাইকের হ্যান্ডেলবার চেপে ধরার কারণে আরও স্পষ্টভাবে জেগে উঠেছে। হাতের সেই পাকা লোমগুলো তপ্ত বাতাসে কাঁপছে, যা তাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে সে এখন আর কোনো তরুণ নয়। তার এই বয়সের গাম্ভীর্য আজ একজন সাধারণ নারীর কাছে পরাজিত। এই পরাজয়বোধ তাকে আরও উম্মাদ করে তুলছে।
রাস্তা এখন রোদে ফেটে চৌচির হওয়ার উপক্রম। পিচ থেকে ওঠা বাষ্পের আস্তরণ সামনের দৃশ্যপটকে কিছুটা ঝাপসা করে দিচ্ছে। মোর্শেদ তার বাইকের গতি আরও বাড়িয়ে দিল। সে নিজেকে এই জ্যাম, এই উত্তাপ আর এই অপমানের ঊর্ধ্বে নিয়ে যেতে চায়। কমলাপুরের সেই ধুলোবালি মাখা গলিটা এখন তার কাছে এক ধরণের আশ্রয়স্থল। সেখানে গেলে হয়তো সামিনার এই অদৃশ্য মায়া থেকে সে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে।
রয়্যাল এনফিল্ডের চাকাগুলো যখন কমলাপুরের এবড়োখেবড়ো রাস্তায় গিয়ে পড়ল, তখন মোর্শেদের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে সামিনাকে খুঁজতে বের হয়নি, সে বের হয়েছে নিজের অস্তিত্বের সেই পুরোনো শিকড় খুঁজতে—যেখানে কোনো আভিজাত্য নেই, কোনো অপমান নেই, আছে কেবল আদিম এক একাকীত্ব।
কমলাপুরের সেই পরিচিত ঘিঞ্জি গলিটার মুখে যখন মোর্শেদ তার রয়্যাল এনফিল্ড নিয়ে এসে থামল, তখন ঘড়িতে বারোটা বেজে কুড়ি মিনিট। মাথার ওপর সূর্যটা এখন যেন আগুন ঢালছে। সাদা শার্টটা পিঠের সাথে লেপটে গেছে ঘামে, কিন্তু মোর্শেদের সেদিকে খেয়াল নেই। বাইকটা স্ট্যান্ড করে সে হেলমেটটা হ্যান্ডেলে ঝুলিয়ে রাখল।
টং দোকানের সেই পুরনো কাঠের বেঞ্চিতে তাকাতেই মোর্শেদের চোখে পড়ল সেলিমকে। সেলিম ওর অনেক পুরনো বন্ধু, যার মৌচাক রুটে চলাচল করা হাইওয়ে বাসের একটা কোম্পানিতে ভালো শেয়ার আছে। গায়ে একটা ঢিলেঢালা হাফ হাতা শার্ট, চোখে সানগ্লাস কপালে তুলে সেলিম আয়েশ করে একটা সস্তা সিগারেট টানছে। মোর্শেদকে দেখেই সেলিম সিট ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে উঠল।
মোর্শেদ তখনও বাইক থেকে পুরোপুরি নামে নি, তার আগেই সেলিম ওর স্বভাবজাত ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠল, "আরে ওস্তাদ! কিরে হা*লার পুত, তুই মরস নাই অহনও? কোন চিপায় হারাইছিলি এত দিন?"
সেলিমের এই অকথ্য গালিটা যেন মোর্শেদের আভিজাত্যের দেয়ালে একটা ধাক্কা দিল, কিন্তু এটা বিরক্তির নয়, বরং এক অদ্ভুত স্বস্তির। বনানীর সেই ফর্মাল ড্রয়িংরুমের সভ্যতার চেয়ে সেলিমের এই নোংরা গালিটাই এখন তার কানে মধুর লাগছে। মোর্শেদ একটা ম্লান হাসি দিয়ে বাইক থেকে নামল। তারপর পা টেনে সেলিমের পাশের বেঞ্চিটায় গিয়ে বসল।
সেলিম হাসতে হাসতে বলল, "তোর দেখি হায়াত আছে রে কড়া। আইজকা সকালেই তোর কথা ভাবতেছিলাম।"
মোর্শেদ পকেট থেকে লাইটার বের করে একটা সিগারেট ধরিয়ে শান্ত গলায় বলল, "ভাবলে তো আর হয় না, ফোন তো দিতে পারিস একটা। ভুলে তো গেছিস সব।"
সেলিম এবার উল্টো রেগে গিয়ে ঝারি দেওয়ার সুরে বলল, "ওই মিয়া, তুই কি আমারে বলদ পাইছস? একটু আগেই তো তোরে ফোন দিলাম। তুই ধরস নাই। ভাবলাম রাইডার সাবে অহনও ঘুমায়, হুরমতি রাইতে কি আর তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙে?"
মোর্শেদ কিছুটা অবাক হলো। সেলিমের ফোন আসার কথা তো নয়। সে বাইক চালানোর সময় ফোনের ভাইব্রেশন অনুভব করেনি, নাকি মনের ভেতরে সামিনার ওই নীরবতা তাকে এতই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে বাইরের কোনো সংকেত তার মস্তিষ্কে পৌঁছায়নি?
মোর্শেদ বলল, "রাইডিং-এ ছিলাম তো, খেয়াল করি নাই মনে হয়।"
বলতে বলতে সে তার ডেনিম জিন্সের টাইট পকেট থেকে ফোনটা বের করল। ফোনটা হাতে নিতেই মোর্শেদের বুকের ভেতরটা আবার সেই পুরনো ছন্দে ধক করে উঠল। সেলিমের ফোন আসার চেয়েও বড় একটা আশঙ্কা তার মনে কাজ করছে— সামিনা কি অনলাইনে এসেছে? সে কি মেসেজটা সিন করেছে?
সে ফোনের স্ক্রিনটা অন করল। দেখল সেলিমের একটা মিসড কল পড়ে আছে ঠিক দশ মিনিট আগে। কিন্তু তার চোখ চলে গেল মেসেঞ্জার নোটিফিকেশনের দিকে। সেখানে কোনো নতুন সংকেত নেই। সামিনার সেই সাদা টিক চিহ্নটা এখনো তেমনি অটল হয়ে আছে, যেন মোর্শেদকে উপহাস করছে।
সেলিম পাশে বসে বকবক করেই যাচ্ছে, "কিরে, কারে খুঁজস ফোনের মইদ্যে? কোনো কচি মাল না কি? মুখ দেহি এক্কেবারে চুন হইয়া গেছে তোর!"
মোর্শেদ সেলিমের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। চারপাশের বস্তির হট্টগোল, সেলিমের চড়া গলার আড্ডা আর এই দুপুরের অসহ্য গরম— সবকিছুই যেন ম্লান হয়ে গেল ওই একটা ছোট ডিজিটাল আইকনের নীরবতার কাছে। তার আভিজাত্য, তার পেশিবহুল হাত, তার দামি মেটিওর— সবকিছুই যেন এই মুহূর্তে অর্থহীন মনে হচ্ছে।
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। তারপর সেলিমের দিকে তাকিয়ে বলল, "ধুর, বাদ দে। ওসব কিছু না। চা বল এক কাপ, কড়া লিকার।"
কিন্তু মোর্শেদ জানে, সে যতবারই ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখছে, তার মন পড়ে আছে ওই পকেটের ভেতরেই। সামিনার নেশা তাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছে, আর সে পুরনো বন্ধুদের আড্ডায় বসে সেই দহন আড়াল করার এক ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
পকেটের ভেতরে থাকা ফোনটা যেন আচমকা একটা বৈদ্যুতিক শক দিল মোর্শেদকে। সেলিম তখন আয়েশ করে একটা সস্তা সিগারেট ধরাচ্ছে আর মৌচাক রুটের বাসের চাকার হিসাব মেলাচ্ছে। কিন্তু মোর্শেদের পৃথিবীটা কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে মাত্রই ফোনটা চেক করে পকেটে রেখেছিল, কিন্তু তার অবচেতন মন বলছে—সে কিছু একটা ভুল দেখেছে। অথবা হয়তো, ইন্টারনেটের কোনো এক অদৃশ্য গলি বেয়ে এখন মাত্রই কিছু একটা এসে পৌঁছেছে তার কাছে।
কি মনে হতেই সাথে সাথে মোর্শেদ আবার ফোনের লকটা অন করল। এবার তার চোখের পাতা কাঁপছে। না, সে ভুল দেখেনি। মেসেঞ্জারের আইকনের ওপর একটা ছোট্ট লাল বৃত্তে ‘৩’ লেখাটি জ্বলজ্বল করছে। সামিনা! সামিনা তাকে মেসেজ করেছে।
এই তপ্ত দুপুরের আগুনের মাঝেও মোর্শেদের হৃদপিণ্ড একটা বিট মিস করে গেল। তার বুকের ভেতর যেন রয়্যাল এনফিল্ডের ইঞ্জিনের চেয়েও জোরে কোনো এক শব্দের প্রতিধ্বনি হচ্ছে। সামিনা মেসেজ করেছে! এই শব্দটা মোর্শেদের মস্তিষ্কে হাজার ওয়াটের বাল্বের মতো জ্বলে উঠল। তার অপমানের তিতকুটে স্বাদটা এক নিমেষে কর্পূরের মতো উড়ে গেল। সামিনা কি তাকে কোনো ছবি পাঠিয়েছে? সেই অদেখা শরীরের কোনো রহস্যময় জ্যামিতি কি এখন এই ডিজিটাল পর্দায় ভেসে উঠবে?
সে দ্রুত কাঁপানো আঙুলে মেসেঞ্জার ওপেন করল। না, সামিনা কোনো ছবি পাঠায় নি। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মোর্শেদের দম বন্ধ হয়ে এল। সেখানে পরপর তিনটি মেসেজ ভেসে আছে।
প্রথম মেসেজ: "মোর্শেদ?" দ্বিতীয় মেসেজ: "আপনি কি আছেন?" তৃতীয় মেসেজ: "নাকি খুব ব্যস্ত?"
মেসেজগুলোর সময় দেখাচ্ছে 10 minutes ago. অর্থাৎ মোর্শেদ যখন তীব্র গতিতে বাইক চালাচ্ছিল তখনই এসেছে। কিন্তু সেই মেসেজগুলোর থেকেও বড় অবাক করা বিষয় হলো, তাদের কথোপকথনের ঠিক নিচে নীল রঙের অক্ষরে একটা ছোট তথ্য ভেসে আছে যা মোর্শেদকে পাথর করে দিল।
একটি ‘মিসড কল’। মেসেজের রিপ্লাই না পেয়েই সামিনা তাকে ফোন করেছিল।
কমলাপুরের সেই ধুলোবালি আর সেলিমের চড়া গলার আড্ডার মাঝে মোর্শেদ যেন এক ভিন্ন গ্রহে চলে গেল। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে থাকা ওই ‘মিসড কল’ শব্দটা তাকে চাবুকের মতো আঘাত করছে। তার সমস্ত আভিজাত্য, তার পঁয়তাল্লিশ বছরের পুরুষালি গাম্ভীর্য এক নিমেষে ধুলোয় মিশে গেছে। যে সামিনা এতদিন কেবল শব্দের মায়াজালে তাকে নাচিয়েছে, যে সামিনা একটি সাধারণ ছবি পাঠাতেও কার্পণ্য করেছে—সে কি না সরাসরি কল করেছিল!
ব্যাপারটার আকস্মিকতায় মোর্শেদ বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মগজের ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ডানা ঝাপটাচ্ছে। কী দরকার হতে পারে? সামিনা কি কোনো বিপদে পড়ল? নাকি এই জ্যাম আর ধুলোবালির শহরে সেও মোর্শেদের মতো কোনো এক তীব্র একাকীত্বের শিকার হয়ে এই কলটা দিয়েছিল? মোর্শেদ নিজেকেই অপরাধী মনে করতে শুরু করল। কেন সে ওই অভিশপ্ত সকালে ঘুমাতে গেল?
সে একবার ভাবল একটা মেসেজ দিয়ে জিজ্ঞেস করবে— “সামিনা, আপনি কি ঠিক আছেন?” কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, মেসেজের যুগ তো গত রাতেই শেষ হয়ে গেছে। সামিনা যখন কলের সাহস দেখিয়েছে, তখন মোর্শেদ কেন পিছিয়ে থাকবে? সে কি তবে এখন কল ব্যাক করবে? বনানীর সেই সুশৃঙ্খল রাইডারের হাত আজ কাঁপছে। কল বাটনটায় আঙুল ছোঁয়ানোর আগে সে একবার বুক ভরে শ্বাস নিল। সে ঠিক করল, যেহেতু সামিনা একবার কল দিয়েছে আর সে ধরতে পারেনি, তাই সৌজন্যের খাতিরে হলেও তার একটা কল ব্যাক করা উচিত। নিজেকে এই যুক্তি দিয়ে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল সে।
ঠিক যখন সে কল দেওয়ার জন্য আঙুলটা স্ক্রিনের দিকে বাড়াল, তখনই তার হাতের ভেতর ফোনটা এক হিংস্র জানোয়ারের মতো ভাইব্রেট করে উঠল।
মোর্শেদের হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনটা এখন আর কালো নেই, সেখানে জ্বলজ্বল করছে সামিনার সেই চেনা প্রোফাইল পিকচার। সামিনা ফোন করছে। আবারও!
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 5 users Like KaminiDevi's post
Like Reply
#53
বনানীর কোনো দামী রেস্তোরাঁ নয়, কোনো নির্জন হাইওয়ে নয়—কমলাপুরের এক ঘিঞ্জি টং দোকানের সামনে, সেলিমের বাসের চাকার হিসেবের হট্টগোলের মাঝে মোর্শেদের কাছে এখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে দামী সংকেতটা বেজে চলেছে। সামিনার এই দ্বিতীয়বারের কল মোর্শেদকে এক অনস্বীকার্য সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল—সামিনা তাকে চাইছে। অন্তত এই মুহূর্তে, এই তপ্ত দুপুরে, সামিনা তার সাথে যুক্ত হতে চাইছে।
মোর্শেদের চারপাশের শব্দগুলো যেন নিভে গেল। সেলিমের বকবকানি, রিকশার বেল, দূরে ট্রেনের বাঁশি—সবকিছু ম্লান হয়ে শুধু ওই ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দটাই তার কানে বাজতে লাগল। মোর্শেদ ফোনটা কানের কাছে তোলার আগে এক মুহূর্তের জন্য নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল স্ক্রিনে। তারপর কাঁপা হাতে সবুজ বাটনটা স্লাইড করল।
কমলাপুরের সেই ধুলোবালি আর সেলিমের বাসের চাকার হিসাবের হট্টগোলের মাঝে মোর্শেদের পৃথিবীটা একটা ফোনের স্ক্রিনে এসে থমকে গেছে। ফোনের ভাইব্রেশনটা তার হাতের তালু ছাপিয়ে শিরদাঁড়া পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। মোর্শেদ ফোনটা কানে তুলল। তার গলার ভেতরটা হঠাত্‍ মরুভূমির মতো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এক অদ্ভুত জড়তা, যেন শব্দগুলো গলার ভেতরেই দলা পাকিয়ে আটকে আছে। পঁয়তাল্লিশ বছরের এই আত্মবিশ্বাসী মানুষটি আজ কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছে।
সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে খুব নিচু এবং খসখসে গলায় বলল, "হ্যালো।"
ওপাশ থেকে যে উত্তরটি এল, সেটি শোনার জন্য মোর্শেদ প্রস্তুত ছিল না। এক লহমায় তার চারপাশের জগতটা নিঃশব্দ হয়ে গেল।
"মোর্শেদ? আপনি কি ব্যস্ত? আপনাকে কল করে কি বিরক্ত করলাম?"
প্রথমবারের মতো সামিনার গলা শুনতে পেল মোর্শেদ। সে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল কণ্ঠের কারুকাজ। সামিনার গলা কোনো চঞ্চল কিশোরীর মতো নয়, আবার বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কোনো প্রৌঢ়ার মতো ফ্যাঁসফেঁসেও নয়। এমনকি কোনো গায়িকার মতো সুর করে বলা মাধুর্যও এতে নেই। এটা এক্কেবারে স্বাভাবিক, ভরাট এবং গভীর এক নারীর কণ্ঠস্বর। যে কণ্ঠে এক ধরণের কর্তৃত্ব আছে, আবার আছে এক রহস্যময় বিষাদ। এই ভরাট কণ্ঠস্বর মোর্শেদের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করল। তার মনে হলো, এই স্বর যেন অনেক চেনা, অনেকদিন ধরে হারানো কোনো সুর।
মোর্শেদের এক মুহূর্ত আগের সেই অপমানবোধ আর বিরক্তি কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তার ভেতরে সেই পুরোনো খেলোয়াড় সুলভ ফ্লার্ট করার প্রবণতাটা জেগে উঠল। সে একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে হালকা স্বরে বলল, "হ্যাঁ, ভীষণ ব্যস্ত। আপনার অপেক্ষায় ব্যস্ত। কাল থেকে তো ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করেই যাচ্ছি। আপনি তো ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিলেন।"
মোর্শেদ ভেবেছিল তার এই মন্তব্যে সামিনা হয়তো একটু লজ্জিত হবে কিংবা কিছুটা কৌতুক করবে। কিন্তু সামিনা তার এই চতুর ফ্লার্ট করার চেষ্টাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল। তার কণ্ঠে কোনো লঘুতা এল না। বরং এক ধরণের সিরিয়াস ভাব ফুটে উঠল।
সামিনা কিছুটা থমকে গিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, "মোর্শেদ, আমাকে একটা হেল্প করতে পারবেন?"
সামিনার গলায় হঠাত্‍ এই অসহায়ত্ব বা অনুরোধের সুর মোর্শেদকে চমকে দিল। তার সব ফ্লার্ট করার ইচ্ছে এক নিমেষে উধাও। বনানীর সেই উদ্ধত রাইডার এখন সচেতন হয়ে উঠল। সামিনার মতো একজন নারী, যে তাকে এতদিন অবজ্ঞার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছিল, সে আজ সরাসরি সাহায্য চাইছে?
মোর্শেদ শক্ত হয়ে বসল। কমলাপুরের তপ্ত বাতাস আর সেলিমের হইচই তার কান পর্যন্ত আর পৌঁছাচ্ছে না। সে গম্ভীর গলায় বলল, "বলুন সামিনা। কী করতে হবে আমাকে?"
সামিনা ওপাশ থেকে একটু চুপ করে থাকল। সেই নীরবতা মোর্শেদের বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাতে শুরু করল। সামিনা কী বলতে চায়? সে কি সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছে? নাকি এই সাহায্যই হবে তাদের অদেখা দেয়ালটা ভেঙে ফেলার প্রথম সূত্র?
মোর্শেদ তার রয়্যাল এনফিল্ডের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরল। সে বুঝতে পারছে, গল্পের মোড় এখন আর মেসেঞ্জারের চ্যাটিংয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটা বাস্তব জীবনের কোনো এক জটিল বাঁক নিতে যাচ্ছে।
সামিনার সেই ভরাট কণ্ঠস্বর যখন মোর্শেদের কানে বাজল, তার ভেতরের সবটুকু আভিজাত্য আর গতরাতের জমানো অভিমান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সামিনার গলায় এক ধরণের চাপা উদ্বেগ, যা মোর্শেদকে মুহূর্তেই সতর্ক করে তুলল। সে আর এখন কোনো রাইডার নয়, কোনো কোটিপতি বাড়িওয়ালা নয়—সে এখন স্রেফ একজন পুরুষ, যে তার কাঙ্ক্ষিত নারীর ডাক শুনেছে।
মোর্শেদ মেরুদণ্ড সোজা করে বসল, তার গলার স্বরে এখন গভীর মমতা আর দায়িত্ববোধ। সে বলল, "অবশ্যই সামিনা। কী হেল্প বলুন? আপনি কি ঠিক আছেন? কোনো বিপদ হয়েছে কি আপনার?"
ওপাশ থেকে সামিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠস্বরে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এল তার। "না, আমি ঠিক আছি। শুনুন মোর্শেদ, আমার আজকে একটা খুব বড় কাজ আছে। আমাকে একটু টঙ্গি যেতে হবে এখনই। খুবই জরুরি দরকার। কিন্তু আমি কোনোভাবেই এই দুপুরের জ্যাম ঠেলে যাওয়ার মতো সাহস পাচ্ছি না। বাসে বা রিকশায় গেলে আমি সময়মতো পৌঁছাতে পারব না। আপনি কি আমাকে সাহায্য করবেন, প্লিজ?"
টঙ্গি! কমলাপুর থেকে টঙ্গি—পুরো ঢাকা শহরটা যেন এক অগ্নিকুণ্ড পার হয়ে যাওয়ার মতো পথ। কিন্তু মোর্শেদের মাথায় তখন দূরত্বের কোনো হিসেব নেই। সামিনা তাকে চেয়েছে, সামিনা তার বাইকের সেই পেছনের সিটটার অধিকার চেয়েছে—এই উপলব্ধিতে মোর্শেদের রক্তে যেন বসন্তের হাওয়া খেলে গেল।
মোর্শেদ কোনো দ্বিধা না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, "আপনি এখন কোথায় আছেন?"
সামিনা উত্তর দিল, "আমি আমার কলেজের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। যাত্রাবাড়ীর যে গলিটার কথা বলেছিলাম, তার মুখেই।"
মোর্শেদ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সে তার বাইকের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে বলল, "আপনি আপনার লাইভ লোকেশনটা এখনই মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিন। আমি এক্ষুনি আসছি। যত জ্যামই থাকুক, আমাকে আটকাতে পারবে না। সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট লাগবে সামিনা। আপনি শুধু ওখানেই থাকুন।"
সামিনা ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতে চাইল, হয়তো কোনো কৃতজ্ঞতা, কিন্তু মোর্শেদ আর কথা বাড়াল না। সে ফোনের লাল বাটনটা চেপে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল।
সে পাশে বসা সেলিমের দিকে একবারও তাকাল না। সেলিমের সেই বাসের চাকার হিসেব, বন্ধুদের আড্ডা আর গাঁজার ধোঁয়া—সব এখন মোর্শেদের কাছে মূল্যহীন। সে তার রয়্যাল এনফিল্ডের চাবিটা অন করল।
সে পাশে বসা সেলিমের দিকে একবারও তাকাল না। সেলিমের সেই বাসের চাকার হিসেব, বন্ধুদের আড্ডা আর গাঁজার ধোঁয়া—সব এখন মোর্শেদের কাছে মূল্যহীন। সে তার রয়্যাল এনফিল্ডের চাবিটা অন করল। ইঞ্জিনের সেই গম্ভীর 'থাম্প' শব্দটা শোনার সাথে সাথেই সেলিম সজোরে একটা গালি দিয়ে উঠল।
"ওই হারামি! কই যাস? আইলি মাত্র পাঁচ মিনিট, এর মইদ্যেই ফুড়ুত? চা টা তো চুলে দিছে মামা!" সেলিমের চোখেমুখে এক ধরণের বিরক্তমাখা বিস্ময়।
মোর্শেদ হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে কেবল বলল, "একটু জরুরি কাজ পইড়া গেল রে সেলিম। যামু আর আসমু।"
সেলিম দমবার পাত্র না। সে হাত নাড়িয়ে আপত্তি জানিয়ে বলল, "থো তোর জরুরি কাম! এই কড়া রৌদ্রে কোন পীরের দরগায় যাবি তুই? বইসা চা-টা খা।"
মোর্শেদ সেলিমের আপত্তিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাইকের গিয়ারে চাপ দিল। কিন্তু বেরোনোর ঠিক আগমুহূর্তে তার নজর পড়ল সেলিমের মাথার কাছে বেঞ্চিতে রাখা অতিরিক্ত হেলমেটটার দিকে। মোর্শেদ চিরকাল একা রাইড করে অভ্যস্ত। তার মেটিওরের দুই পাশের স্যাডেল ব্যাগে দামী রাইডিং গিয়ার থাকলেও তার বাইকে কোনো 'পিলিয়ন হেলমেট' বা পেছনের যাত্রীর জন্য অতিরিক্ত হেলমেট নেই। অথচ আজ তার পেছনের সিটে একজন বসবে। সামিনা। তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই মোর্শেদ একটা ঝুঁকি নিল।
সে বাইকটা আবার একটু নিউট্রাল করে সেলিমের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, "তোর ওই হেলমেটটা একটু দে তো সেলিম।"
সেলিম আকাশ থেকে পড়ল। সে উপহাসের সুরে দাঁত বের করে বলল, "আরে লর্ড সাবে কয় কি! তুই পিলিয়ন নিবি কবের থেইকা? তোর বাইকের পিছনের সিটে তো আজীবন ময়লা ছাড়া কিছু দেখলাম না। হঠাৎ কোন মালরে তুলবি?"
মোর্শেদ সেলিমের হাত থেকে ওর সাধারণ মানের লাল রঙের হেলমেটটা একরকম কেড়ে নিল। তারপর নিজের দামী হেলমেটটা সিটের পেছনের হুকে ঝুলিয়ে এবং সেলিমের হেলমেটটা নিজের মাথায় গলাতে গলাতে মুচকি হাসল। পঁয়তাল্লিশ বছরের গম্ভীর মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে আজ এক অদ্ভুত চপলতা।
সেলিম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। মোর্শেদ বাইকের ক্লাচ ছাড়তে ছাড়তে রসিকতা করে বলল, "আরে ভাই, দিনকাল ভালো না। টাকার খুব অভাব বুঝলি? তাই আজ থেকে 'পাঠাও' রাইড শুরু করলাম। পিলিয়ন না নিলে ইনকাম হবে কোত্থেকে?"
সেলিম হো হো করে হেসে উঠল। "শালা ফকিরি রাইডার! তোরে দিয়া আর কিচ্ছু হইবো না!"
সেলিমের অট্টহাসি আর কমলাপুরের ধুলোমাখা বাতাস পেছনে ফেলে মোর্শেদ তার বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল। তার পকেটে এখন সামিনার লাইভ লোকেশনটা ধিকধিক করছে। ঢাকার এই জ্যাম, এই উত্তাপ আর এই একাকীত্বের অবসান হতে আর মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্ব। মোর্শেদ জানে, এই যাত্রা আর যাই হোক, কোনো সাধারণ 'পাঠাও' রাইড হবে না।
১৫ মিনিট সময় চেয়েছিল মোর্শেদ, কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা আর রয়্যাল এনফিল্ডের ৩৫০ সিসি ইঞ্জিনের সম্মিলিত শক্তিতে সে ঠিক ১৩ মিনিটের মাথায় যাত্রাবাড়ীর সেই নির্দিষ্ট গলিটার মুখে এসে পৌঁছাল। ঢাকার এই ভরদুপুরের জ্যাম আর আগুনের মতো তপ্ত বাতাস তাকে আটকাতে পারেনি। বাইকের চাকা যখন সামিনার পাঠানো লোকেশনের ঠিক ওপর এসে থামল, মোর্শেদের বুকের ভেতর তখন হাজারটা ড্রাম একসাথে বাজছে।
সামনে একটা সাদামাটা দোতলা বিল্ডিং। দেওয়ালে শ্যাওলা আর লোনা ধরা দাগ, সাইনবোর্ডে লেখা 'কিশলয় আর্ট অ্যান্ড প্রাইভেট কলেজ'। কোনো আহামরি দৃশ্য নেই এখানে। রাস্তাটা কেমন একটা বিষণ্ণ ধূসর রোদে মাখা। আশেপাশের দোকানপাটগুলো দুপুরের তন্দ্রায় ঢুলছে। হয়তো বাচ্চাদের অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে, নয়তো এখনো ছুটির সময় হয়নি—পুরো এলাকাটাতে একটা ঝিমধরা নিস্তব্ধতা।
মোর্শেদ হেলমেটের ভাইজারটা তুলল। ঘাম তার কপাল বেয়ে চোখের কোণে এসে বিঁধছে, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। এই ধুলোবালি আর জীর্ণতার মাঝেই মোর্শেদের চোখ দুটো হঠাত্ স্থির হয়ে গেল।
রাস্তার ওপাশে, কলেজের লোহার গেটটার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক নারী।
মোর্শেদ তাকে আগে কখনও দেখেনি। সামিনা তাকে একটা সেলফি পাঠিয়েছে ঠিকই কিন্তু কোনও দিন ভিডিও কলেও মুখ দেখায়নি। কিন্তু এই ধূসর রাস্তার ভিড় আর অযাচিত কোলাহলের মধ্যে মোর্শেদের চিনতে এক মুহূর্তও ভুল হলো না। সামিনার উপস্থিতির মধ্যেই এমন একটা কিছু আছে, যা মোর্শেদের চোখকে চুম্বকের মতো টেনে নিল। সামিনা যেন এই ভাঙাচোরা গলি আর তপ্ত দুপুরের মাঝে কোনো এক ভুল করে চলে আসা মানবী।
মোর্শেদ বাইক থেকে নামল না, কেবল ডেনিম জিন্সের ওপর এক পা রেখে ভারসাম্য বজায় রেখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সামিনা দাঁড়িয়ে আছে। মোর্শেদের কল্পনা আর বাস্তবের মাঝে যে ব্যবধান ছিল, তা এক লহমায় চুরমার হয়ে গেল। সামিনা মাঝারি উচ্চতার এক নারী, আন্দাজে পাঁচ ফুট তিন থেকে ছয়ের মধ্যে হবে। তবে তার শরীরের গঠন এতটাই ভরাট আর মাংসল যে তাকে দেখে মোর্শেদের ভেতরের পশুটো এক লহমায় জেগে উঠল। সামিনার শরীরে মেদের আধিক্য নেই, বরং আছে এক ধরণের নিটোল পূর্ণতা। যাকে বলে এক্কেবারে ‘ডবকা’ গঠন।
সামিনা একটি সবুজ রঙের সুতির শাড়ি আর কালো রঙের হাফস্লিভ ব্লাউজ পরেছে। রোদ আর উত্তাপে তার ফর্সা গোলগাল মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে, যেন ফেটে রক্ত বের হবে। মোর্শেদ বিস্ময় আর আদিম লালসা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনা তার কল্পনার চাইতেও অনেক বেশি লাস্যময়ী। সবুজ শাড়ির অবহেলার প্যাঁচেও তার ভরাট নিতম্বের বিশালতা আড়াল হয়নি। সামিনার পাছা যে বেশ চওড়া এবং ভারীর দিকে, তা সামনে থেকে দেখেও টের পাওয়া যাচ্ছে। শাড়ির কুঁচিগুলো সেখানে গিয়ে টানটান হয়ে আছে, যেন ভেতরের মাংসল গোলকগুলো অবাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মোর্শেদ মনে মনে কল্পনা করল, এই ভারী নিতম্বের ওপর দিয়ে শাড়ির কাপড় যখন ঘর্ষিত হয়, তখন নিশ্চয়ই এক ধরণের মাদকতা তৈরি হয়।
মোর্শেদের চোখ এবার গেল সামিনার চুলে। কালো কুচকুচে চুলগুলোতে রাস্তার ধুলোর একটা হালকা আস্তরণ জমেছে। চুলগুলো মাথার ওপর একটা বিশাল খোঁপা করে বাঁধা। সেই খোঁপার আয়তন দেখেই মোর্শেদের বুকটা ধক করে উঠল। এত বিশাল খোঁপা সচরাচর দেখা যায় না। খোঁপাটি সামিনার ঘাড়ের ঠিক উপরে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে, যা দেখে বোঝা যায় সামিনার চুল যেমন লম্বা তেমনি ঘন। এই খোঁপাটি সামিনার চেহারায় একদিকে যেমন শিক্ষিকার গাম্ভীর্য এনে দিয়েছে, অন্যদিকে তার উন্মুক্ত ঘাড় আর কানের পাশের ঘাম মোর্শেদকে এক নিষিদ্ধ আমন্ত্রন জানাচ্ছে।
মোর্শেদ অনুভব করল, তার প্যান্টের ভেতরটা আবার টাইট হয়ে আসছে। প্রথম দর্শনেই সে সামিনার ওই উঁচু খোঁপা থেকে শুরু করে তার লালচে মুখ, আর ওই ঢেউ খেলানো হাইওয়ের মতো ভারী শরীরটার প্রেমে পড়ে গেল। এ প্রেম কোনো পবিত্র প্রেম নয়, এ হলো কামনায় মাখানো এক দগদগে তৃষ্ণা। সামিনার ওই বিশাল নিতম্ব আর ভরাট শরীরের প্রতিটি বাঁক মোর্শেদকে বুঝিয়ে দিল যে, আজকের এই যাত্রা স্রেফ টঙ্গি যাওয়ার যাত্রা নয়—এটা সামিনার শরীরের গহিন অরণ্যে প্রবেশের এক রাজকীয় সূচনা।
মোর্শেদ হেলমেটটা হাতে নিয়ে এক হাত দিয়ে ঘাম মুছল। তার চোখ এখনো সামিনার নিতম্বের সেই ভারী ভাঁজগুলোর ওপর আটকে আছে। সে বুঝতে পারল, আজ এই তপ্ত দুপুরে সে শুধু এক নারীকেই উদ্ধার করতে আসেনি, সে এসেছে নিজের অবদমিত কামনার এক চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে।
মোর্শেদ বাইকটা নিয়ে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল। ইঞ্জিনের গম্ভীর শব্দ শুনে সামিনা মুখ তুলল। তার চোখে এক ধরণের দ্বিধা আর কৃতজ্ঞতার মিশ্রণ। সে জানত মোর্শেদ আসবে, কিন্তু বনানীর সেই আভিজাত্য ফেলে এই নরককুণ্ডে মোর্শেদ এত দ্রুত হাজির হবে, তা হয়তো সে ভাবেনি।
মোর্শেদ বাইকটা সামিনার ঠিক সামনে এসে থামাল। দুজনের চোখের পলক এক হলো। এই প্রথম। ডিজিটাল পর্দার ওপারে থাকা ছায়াশরীরটি এখন তার থেকে মাত্র তিন হাত দূরে। সামিনার ভরাট শরীরের বাঁকগুলো রোদে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা মোর্শেদের গত রাতের সেই আদিম কল্পনাগুলোকে আবার উস্কে দিল। কিন্তু মোর্শেদ এখন সংযত। সে কেবল হেলমেটটা খুলে সামিনার দিকে তাকিয়ে রইল।
সামিনা একটু ম্লান হাসল। সেই হাসিটা মোর্শেদের পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ হৃদয়ে একটা কামড় দিল। সামিনা খুব নিচু স্বরে বলল, "আপনি আসলেই চলে এলেন?"
মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, "আমি কথা রাখলে এভাবেই রাখি সামিনা। এবার বলুন, টঙ্গি কতক্ষণে পৌঁছাতে হবে?"
সামিনা মোর্শেদের পেশিবহুল হাতের শিরাগুলো আর তার সাদা শার্টের হাতা গোটানো রুদ্ররূপের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে নিল। তাদের চারপাশের ধূসর জগতটা যেন এক নিমেষে রঙিন হতে শুরু করল।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 9 users Like KaminiDevi's post
Like Reply
#54
অসাধারণ
Like Reply
#55
Darun cholche..... Asadharon lagche.... Next update er opekhay
Like Reply
#56
(08-02-2026, 01:17 PM)Sadiyaxyz Wrote: অসাধারণ

(08-02-2026, 01:21 PM)BiratKj Wrote: Darun cholche..... Asadharon lagche.... Next update er opekhay

দুজনকেই অসংখ্য ধন্যবাদ
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
Like Reply
#57
Sera Sera hit story..
Like Reply
#58
সেলফি বিনিময়ের আগেই সরাসরি দেখা!!!
মনে হচ্ছে গল্পের গতি বাড়ছে……দেখা যাক কি হয়….

চালিয়ে যান….

[Image: IMG-2620.jpg]
[+] 1 user Likes Maleficio's post
Like Reply
#59
(08-02-2026, 06:37 PM)Maleficio Wrote: সেলফি বিনিময়ের আগেই সরাসরি দেখা!!!
মনে হচ্ছে গল্পের গতি বাড়ছে……দেখা যাক কি হয়….

চালিয়ে যান….

[Image: IMG-2620.jpg]

ধন্যবাদ
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
Like Reply
#60
Darun
Like Reply




Users browsing this thread: 5 Guest(s)