Thread Rating:
  • 57 Vote(s) - 3.53 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Adultery মায়ের বান্ধবী
#21
৪
ঢাকা শহরের রিকশা ভ্রমণ অনেকটা রোলার কোস্টারের মতো। এখানে গতির চেয়ে ঝাঁকুনি বেশি, আর রোমাঞ্চের চেয়ে আতঙ্ক। কিন্তু আজকের ভ্রমণটা আতঙ্ক নয়, বরং এক অদ্ভুত ঘোরলাগা অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমাদের রিকশা শাহবাগ মোড় পার হয়ে চারুকলার উল্টো পাশ দিয়ে ক্যাম্পাসের দিকে ঢুকছে।
তনিমা আন্টি এখন পুরোপুরি আমুদে মুডে আছেন। তার কাঁধের ঝোলা ব্যাগটা কোলের ওপর রাখা। তিনি ডান হাত দিয়ে রিকশার হুডের লোহার রডটা ধরে আছেন, আর বাম হাতটা মুক্ত। তিনি অনর্গল কথা বলছেন। শাহবাগের ফুলের দোকানগুলো দেখে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, "তন্ময়, দেখ দেখ! রজনীগন্ধা! উফ, কতদিন এই ফুলের মালা কিনি না। সিডনিতে তো সব প্লাস্টিকের মতো দেখতে ফুল, কোনো গন্ধ নেই। থাম তো একটু।"

আমি রিকশাওয়ালা চাচাকে থামতে বললাম। আন্টি একগাদা রজনীগন্ধার স্টিক আর বেলী ফুলের মালা কিনলেন। বেলী ফুলের মালাটা তিনি খোপায় জড়ালেন না, হাতে পেঁচিয়ে রাখলেন। রজনীগন্ধার স্টিকগুলো আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "নে, ধর। রোমিওর মতো বসে থাক।" আমি লজ্জিত ভঙ্গিতে ফুলগুলো হাতে নিলাম। শাহবাগের মোড়ে পুলিশের চেকপোস্টের সামনে রজনীগন্ধা হাতে বসে থাকাটা খুব একটা বীরত্বের কাজ নয়।

রিকশা আবার চলতে শুরু করল। আমরা ছবির হাটের সামনে দিয়ে টিএসসির দিকে এগোচ্ছি। আমার বুকের ভেতর একটা মৃদু ধড়ফড়ানি শুরু হলো। এটা প্রেমের ধড়ফড়ানি নয়, এটা হচ্ছে মানসম্মান যাওয়ার ভয়। আমি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র। আমার ডিপার্টমেন্ট সোশ্যাল সায়েন্স বিল্ডিংয়ে। এখান দিয়ে সোজা গেলেই ডিপার্টমেন্ট। কিন্তু আমি চাচাকে বললাম, "চাচা, মল চত্বর দিয়ে যাবেন না। ফুলার রোড দিয়ে ঘুরে কার্জন হলের দিকে যান।"

আন্টি অবাক হয়ে বললেন, "কেন রে? টিএসসি হয়ে মল চত্বর দিয়ে গেলে তো সোজা হতো। তোর ডিপার্টমেন্ট দেখব না?" আমি আমতা আমতা করে বললাম, "না মানে... ওই রাস্তাটা ভাঙা। রিকশায় খুব ঝাঁকুনি হবে। আর আজ রোববার, ডিপার্টমেন্টে ক্লাস হচ্ছে। ওখানে রিকশা থামানো যাবে না।"

আসল কারণটা আন্টিকে বলা যাবে না। ঢাকা ভার্সিটির পোলাপান একেকটা জ্যান্ত সিসিটিভি ক্যামেরা এবং নির্দয় ট্রল-মাস্টার। আমি যদি এই ভরদুপুরে আমার মায়ের বয়সী একজন স্মার্ট, জিন্স-টপস পরা মহিলার সাথে রিকশায় ঘনিষ্ঠ হয়ে বসি, আর সেটা আমার ব্যাচমেট বা জুনিয়রদের চোখে পড়ে—তাহলে রক্ষা নেই। আজ রাতেই 'ডিইউ ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন' বা কোনো ট্রল গ্রুপে আমার ছবিসহ পোস্ট চলে আসবে। ক্যাপশন হবে—"ক্যাম্পাসের ছোট ভাইদের সুগার মমি ভাগ্য! আমরা কি দোষ করলাম?" কিংবা "অসম প্রেমের উপাখ্যান: বড় আপু ও কচি ভাই।" এইসব ভার্চুয়াল বুলিংয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি ইচ্ছে করেই নিজের টেরিটরি এভয়েড করলাম। যাদের বিশ্বাস নেই, তাদের চোখের আড়ালে থাকাই শ্রেয়।

আমরা ফুলার রোড দিয়ে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে দিয়ে জগন্নাথ হলের দিকে গেলাম। ছায়াশীতল রাস্তা। কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো ডালপালা মেলে আকাশ ঢেকে রেখেছে। আন্টি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "এই রাস্তাটা... আহ! এই রাস্তায় কত রিকশা রাইড দিয়েছি। তখন অবশ্য রিকশার হুড তোলা থাকত।" আমি কৌতুক করে বললাম, "হুড তোলা থাকত কেন? রোদ ছিল বলে, নাকি অন্য কোনো কারণে?"

আন্টি আমার পিঠে একটা মৃদু থাপ্পড় দিলেন। "তোর ফাজলামি আর গেল না। সব কিছুতেই রোমান্স খুঁজিস। হুড তোলা থাকত কারণ তখন আমরা লাজুক ছিলাম। এখনকার মতো এত ওপেন ছিলাম না।"
ঘুরতে ঘুরতে দুপুর হয়ে এল। খিদে পেয়েছে। আন্টিকে বললাম, "মধুর ক্যান্টিনে যাবেন? ওখানের পরিবেশ কিন্তু খুব একটা হাই-ফাই না। তবে খাবারটা ইমোশন।" আন্টি বললেন, "অবশ্যই যাব। মধুর ক্যান্টিনে না গেলে তো ক্যাম্পাস ট্যুর কমপ্লিট হবে না। ওখানে কি এখনো সেই লম্বা টেবিলগুলো আছে?"

"আছে। সাথে বোনাস হিসেবে আছে পলিটিক্যাল স্লোগান আর ধোঁয়া ওঠা চা।"

আমরা মধুর ক্যান্টিনে ঢুকলাম। প্রবল হট্টগোল। একপাশে ছাত্রদলের মিছিলের প্রস্তুতি চলছে, অন্যপাশে ছাত্র ইউনিয়নের জটলা। মাঝখানে সাধারণ ছাত্ররা নির্বিকার ভঙ্গিতে শিঙাড়া খাচ্ছে। আন্টি ঢুকেই কেমন যেন থমকে গেলেন। তার চোখেমুখে একটা নস্টালজিয়ার ছায়া। তিনি চারপাশটা দেখলেন। দেওয়ালের ছবিগুলো, পুরনো চেয়ার-টেবিল। আমরা এক কোণায় জায়গা পেলাম। আমি শিঙাড়া, মোগলাই আর চা অর্ডার করলাম। আন্টি শিঙাড়াটা হাতে নিয়ে ভেঙে ধোঁয়াটা দেখলেন। তারপর মুখে দিলেন। তার চোখ বন্ধ হয়ে এল। "উহ! সেইম টেস্ট! বিলিভ মি তন্ময়, পৃথিবীর কোথাও এই টেস্ট পাবি না। এটার মধ্যে ঘাম আর বিপ্লবের স্বাদ আছে।" আমি হাসলাম। "ঘামের স্বাদটা একটু বেশিই মনে হয় আন্টি।"

খাওয়া শেষে আমরা আবার রিকশায়। এবার গন্তব্য রমনা পার্ক আর শিল্পকলা একাডেমি। রিকশা মৎস্য ভবনের মোড় পার হয়ে রমনার পাশ দিয়ে যাচ্ছে। রাস্তাটা ফাঁকা। দুপাশে বিশাল সব গাছ। আন্টি হঠাৎ বললেন, "তন্ময়, সত্যি করে বল তো, তোর কি কোনো প্রেমিকা নেই?" আমি মাথা নাড়লাম। "না আন্টি। সত্যি নেই।" আন্টি অবিশ্বাসীর মতো তাকালেন। "এত বড় ছেলে, ভার্সিটিতে পড়িস, গিটার বাজাস, ফিলোসফি ঝাড়িস—তোর প্রেমিকা নেই? হাউ ইজ দ্যাট পসিবল? মেয়েরা কি অন্ধ নাকি?" আমি বললাম, "মেয়েরা অন্ধ না আন্টি, তারা অত্যন্ত দূরদর্শী। তারা আমার ভবিষ্যৎ দেখে ফেলেছে—একটা বেকার, উদাসীন দার্শনিক, যার পকেটে টাকার চেয়ে বাতাস বেশি থাকে। তাই তারা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে।" 

আন্টি শব্দ করে হাসলেন। হাসলে তার গালের পাশে টোল পড়ে। এই বয়সেও টোল পড়াটা বেশ আকর্ষণীয়। তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ার ভঙ্গি করলেন। "তুই নিজেকে খুব আন্ডারএস্টিমেট করছিস। প্রেমে না পড়লে জীবন বৃথা। লাইফ ইজ নট আবাউট ক্যারিয়ার অ্যান্ড মানি। ইটস আবাউট মোমেন্টস। কারো হাত ধরে চুপচাপ বসে থাকার নামই জীবন।" তার কথার রেশ ধরে আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আন্টি, আপনার কি মনে আছে টিএসসির ওই দাস চত্বরের কথা? যেখানে আমরা একটু আগে পাশ কাটিয়ে এলাম?" আন্টির হাসিটা হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল। তিনি দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। তাকিয়ে রইলেন রাস্তার পাশের রেলিংয়ের দিকে। "মনে থাকবে না কেন? ওখানেই তো আমার জীবনের প্রথম বড় ভুলটা করেছিলাম।" আমি অবাক হলাম। "ভুল বলছেন কেন? ওখানেই তো সৌরভ আঙ্কেলের সাথে আপনার পরিচয়, তাই না?"
আন্টি ম্লান হাসলেন। "হ্যাঁ। পঁচিশ বছর আগে। তখন আমি ফার্স্ট ইয়ারে। সৌরভ থার্ড ইয়ারে। টিএসসিতে কবিতা উৎসব হচ্ছিল। আমি ভলান্টিয়ার ছিলাম। সৌরভ এসে বলল, 'আপা, একটা ব্যাজ হবে?' আমি ব্যাজ পরিয়ে দিতে গিয়েছিলাম, পিনটা ওর আঙুলে ফুটে গেল। রক্ত বের হলো। ও হেসে বলল, 'রক্ত যখন নিলেন, তখন হৃদয়টাও নিয়ে নিন।' কী চিপ ডায়লগ! কিন্তু তখন ওটাই শেক্সপিয়রের সনেট মনে হয়েছিল।"

আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। সিনেমার মতো কাহিনী। "তারপর?" "তারপর প্রেম। তুমুল প্রেম। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘোরাঘুরি, রিকশায় হুড তুলে বসে থাকা, হাত ধরে কার্জন হলে হাঁটা। তিন বছর পর বিয়ে। ফ্যামিলির অমতে বিয়ে করেছিলাম। তারপর ও স্কলারশিপ পেল, আমরা আমেরিকা চলে গেলাম। মনে হলো রূপকথার গল্প। হ্যাপিলি এভার আফটার।"

"তারপর সেই রূপকথা ভাঙল কেন?" আমি খুব সাবধানে প্রশ্নটা করলাম। আন্টি চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। রিকশা একটা স্পিডব্রেকার পার হলো। ঝাঁকুনিতে আন্টি আমার ওপর এসে পড়লেন। তিনি সরে গেলেন না। বরং আমার হাতটা ধরলেন। তার হাতটা ঠান্ডা। "কেন ভাঙল? সত্যি বলতে কি, আমি নিজেও জানি না তন্ময়। কোনো বড় ঝগড়া হয়নি। কোনো মারামারি, পরকীয়া—কিছুই না। জাস্ট একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হলো, আমরা দুজন একই ছাদের নিচে থাকি, কিন্তু আমরা দুজন দুই গ্রহে বাস করি। আমাদের কথা বলার কিছু নেই। ও ওর ক্যারিয়ার নিয়ে বিজি, আমি আমার জগত নিয়ে। আমরা একে অপরের দিকে তাকাতাম, কিন্তু দেখতাম না।"

তনিমা আন্টি থামলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, "আসলে কী জানিস? আমাদের কোনো বাচ্চা ছিল না। তোর বাবা-মা, মানে রাশেদা আর জামিল ভাই—ওদের মধ্যেও হয়তো অনেক অমিল ছিল। হয়তো ওরাও অনেকবার ভেবেছে আলাদা হয়ে যাবে। কিন্তু তোরা ছিলি। তুই আর মৃন্ময়। তোরা হলি সেই সিমেন্ট, যা একটা নড়বড়ে দেয়ালকে ধসতে দেয় না। স্বামী-স্ত্রী যখন নিজেদের মুখের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি বোধ করে, তখন তারা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে যায়। কম্প্রোমাইজ করে। আমাদের সেই কম্প্রোমাইজ করার রিজনটা ছিল না। আমাদের শুধু একে অপরের ভুলগুলো চোখে পড়ত। একটা সময় মনে হলো, এভাবে থাকার চেয়ে আলাদা থাকাই ভালো। উই জাস্ট ড্রিফটেড অ্যাপার্ট।"

আন্টির কথাগুলো কানে বাজছিল। আমাদের সমাজে ডিভোর্সকে খুব বড় কোনো ট্র্যাজেডি বা স্ক্যান্ডাল হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু মাঝেমধ্যে এটা কেবল দুটো মানুষের ক্লান্তির ফলাফল। আমি আমার বাবা-মায়ের কথা ভাবলাম। তাদের ঝগড়া আমি দেখেছি। মায়ের চিৎকার, বাবার নীরবতা। কিন্তু পরক্ষণেই তারা আমার বা মৃন্ময়ের রেজাল্ট বা অসুখ নিয়ে এক হয়ে গেছেন। আমাদের অস্তিত্বই তাদের সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রেখেছে। আন্টির সেই আঠাটা ছিল না।

রিকশা এখন রমনা পার্কের পাশ দিয়ে মগবাজারের দিকে যাচ্ছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হচ্ছে। আকাশের রং ধূসর থেকে কালচে নীল হচ্ছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বলে উঠেছে। এই পুরোটা সময় রিকশার সিটে আমাদের শরীর বারবার পরস্পরের সাথে স্পর্শ লাগছিল। ঢাকা শহরের রিকশার সিটগুলো খুব একটা প্রশস্ত হয় না। দুজন স্বাস্থ্যবান মানুষ বসলে নড়াচড়ার জায়গা থাকে না। আন্টি যদিও স্লিম, কিন্তু আমিও খুব রোগা নই। রিকশা যখন গর্তে পড়ে বা ব্রেক কষে, তখন ফিজিক্সের নিয়মেই আমরা একে অপরের গায়ে এসে পড়ি।

প্রথমদিকে আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। আমাদের সমাজে বয়সে বড় কোনো নারীর সাথে, বিশেষ করে মায়ের বয়সী কারো সাথে এভাবে গা ঘেঁষে বসাটা 'স্বাভাবিক' নয়। আমার অবচেতন মন আমাকে বারবার সতর্ক করছিল—"তন্ময়, একটু সরে বোস। তন্ময়, হাতটা সরা।" কিন্তু আন্টি ছিলেন সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। তিনি কথা বলতে বলতে উত্তেজনায় আমার উরুতে হাত রাখছেন, হাসতে হাসতে আমার কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে দিচ্ছেন, কিংবা রিকশার ঝাঁকুনিতে আমার শরীরের ওপর হেলে পড়ছেন। তার মধ্যে কোনো আড়ষ্টতা নেই। কোনো সংকোচ নেই। তার স্পর্শে কোনো যৌনতা ছিল না, ছিল এক ধরণের নির্ভরতা। এক ধরণের আপনবোধ।

তিনি যখন হাসতে হাসতে আমার হাত চেপে ধরছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল তিনি আমাকে 'ছেলে' বা 'ভাইপো' হিসেবে দেখছেন না, তিনি আমাকে দেখছেন একজন সঙ্গী হিসেবে। একটা মানুষ, যে তার কথাগুলো শুনছে। তার একাকীত্বের ভাগীদার হচ্ছে। ধীরে ধীরে আমার অস্বস্তিটা কাটতে শুরু করল। আমি বুঝতে পারলাম, সমস্যাটা আন্টির না, সমস্যাটা আমার এবং আমার সমাজের। আমরা সব স্পর্শের মধ্যে পাপ খুঁজি। সব সম্পর্কের মধ্যে নাম খুঁজি। কিন্তু কিছু মুহূর্ত থাকে যখন কোনো নাম বা সম্পর্কের চেয়ে পাশে থাকাটা বেশি জরুরি। আন্টি এখন একা। এই বিশাল শহরে, এই জ্যামের মধ্যে, তার পাশে আমি ছাড়া কেউ নেই। এই সামান্য স্পর্শটুকু হয়তো তাকে সাহস জোগাচ্ছে। তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে তিনি অদৃশ্য নন।

আমিও একসময় নিজেকে ছেড়ে দিলাম। রিকশা যখন জোরে ব্রেক কষল, আমি আন্টিকে ধরে সামলালাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। "থ্যাঙ্কস। তোর রিফ্লেক্স ভালো।" আমি বললাম, "আপনার বডিগার্ড, ভুলে গেলেন?" 
"হুঁ, হ্যান্ডসাম বডিগার্ড।"

রাত সাতটার দিকে আমরা ধানমন্ডির দিকে ফিরছিলাম। সাতাশ নম্বর মোড় পার হয়ে বত্রিশ নম্বরের দিকে ঢুকছে রিকশা। ধানমন্ডি লেকের ওপরের ব্রিজটায় হালকা বাতাস দিচ্ছে। নিচে লেকের পানিতে সোডিয়াম বাতির ছায়া কাঁপছে। আন্টি চুপ করে আছেন অনেকক্ষণ। তার হইচই করা ভাবটা কমে গেছে। তাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। শরীরের ক্লান্তি নয়, মনের ক্লান্তি। পুরনো স্মৃতি ঘাঁটাঘাঁটি করলে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

ব্রিজের ওপর রিকশা উঠতেই আন্টি বললেন, "তন্ময়, আজকের দিনটার জন্য থ্যাঙ্ক ইউ।" আমি বললাম, "থ্যাঙ্ক ইউ কেন আন্টি? আমিও তো ঘুরলাম। ভালোই লাগল।" আন্টি আমার দিকে তাকালেন। আবছা আলোয় তার চোখ দুটো চকচক করছে। "শুধু ঘোরার জন্য না। আমার বকবক শোনার জন্য। আমাকে জাজ না করার জন্য। আর..." তিনি বাক্যটা শেষ করলেন না। হাতটা আলতো করে আমার হাতের ওপর রাখলেন। "তোর মা খুব লাকি রে। খুব লাকি।" আমি বুঝতে পারলাম, তিনি শুধু আমাকে নিয়ে বলছেন না। তিনি আমার মায়ের সংসারের কথা বলছেন। স্বামী, সন্তান, সংসার—এই যে একটা বৃত্ত, যা মাকে আগলে রেখেছে, সেটা আন্টির নেই। তিনি স্বাধীন, তিনি ধনী, তিনি আধুনিক—কিন্তু দিনশেষে তিনি একা। এই রিকশার সিটে আমার পাশে বসেও তিনি আসলে একা।

রিকশা ৩২ নম্বরের গলি দিয়ে সাউথ প্রশান্তির দিকে এগোচ্ছে। রাস্তার দুপাশে বড় বড় অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। প্রতিটি জানালায় আলো জ্বলছে। প্রতিটা আলোর পেছনে একটা করে গল্প আছে। কোনোটা পূর্ণতার, কোনোটা শূন্যতার। আমার পাশে বসা তনিমা আন্টি সেই শূন্যতার গল্পটা বহন করে নিয়ে চলেছেন। আমি শুধু আজকের বিকেলের জন্য সেই গল্পের শ্রোতা হলাম। আমাদের অসম ভ্রমণ শেষ হলো। কিন্তু আমার মনে হলো, এই ভ্রমণের রেশটা সহজে কাটবে না। আমার কাঁধে এখনো আন্টির মাথার স্পর্শ লেগে আছে। আর নাকে লেগে আছে শাহবাগ থেকে কেনা সেই রজনীগন্ধার ঘ্রাণ, যা এখন আন্টির কোলের ওপর নেতিয়ে পড়েছে।
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#22
Very good
[+] 2 users Like Saj890's post
Like Reply
#23
ভালো লাগলো, খুব সুন্দর কাহিনী, পড়তে ভালো লাগে। এগিয়ে নিয়ে যান।
Like Reply
#24
Valo laglo
Like Reply
#25
(22-01-2026, 09:43 PM)mailme_miru Wrote: [Image: pixnova-4661df5607745f55637db9352b6d99ef.jpg]
[Image: pixnova-6c549bd4dd02bbe64d54f79d9e4ad5cf.jpg]
[Image: pixnova-395bf41eaa7d095c6baff00c83ad6470.jpg]


আমাকে তনিমা আন্টি ভেবে নাও

তনিমা আন্টির  নানী
--------------------
xossip picture adda - https://photos.app.goo.gl/dSKFGuGLQv1vThtf8

[+] 2 users Like 212121's post
Like Reply
#26
অসাধারণ
Like Reply
#27
অসম্ভব সুন্দর হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় পর্ব ৩ পড়েছিলাম। আজ সারাদিনে আর আসা হয়নি। এখন আসলাম এই গল্পটার আপডেট আসছে নাকি দেখার জন্য। আপডেট পেয়ে ভালো লাগল। গল্পটাও ভালো আগাচ্ছে। লেখক মহোদয় শারীরিক আকর্ষণের পাশাপাশি মানসিক দিকটাও বেশ খেয়াল করবেন বলে আশা করছি। যদি সম্ভব হয় তো রোজ আপডেট দেওয়ার চেষ্টা করবেন....
Like Reply
#28
৫
নেশা জিনিসটা বড় অদ্ভুত। একবার ধরলে আর ছাড়া যায় না। আমার নেশাটা অবশ্য মদের না, ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার। গত এক সপ্তাহে আমি ডিপার্টমেন্টের ছায়াও মাড়াইনি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র হয়ে আমি এখন 'পারিবারিক সম্পর্ক' এবং 'ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা' নিয়ে পিএইচডি করছি। আমার বন্ধুরা হয়তো ভাবছে আমি টাইফয়েড বা জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছি, কিংবা কোনো গোপন মিশনে আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে গেছি। আসলে আমি আন্ডারগ্রাউন্ডই হয়েছি, তবে সেটা তনিমা আন্টির সাথে ঢাকা শহরের সরকারি অফিস আর জ্যামের অতল গহ্বরে।
গত কয়েকদিনে একটা বিষয় আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে—তনিমা আন্টি শুধু নস্টালজিয়া বিলাস করতে বা পুরনো ক্যাম্পাসের ধুলো মাখতে দেশে আসেননি। তার আসার পেছনে একটা কঠিন এবং নির্মম উদ্দেশ্য আছে। তিনি তার শিকড় উপড়ে ফেলতে এসেছেন। ঢাকায় তার নামে এবং তার বাবার নামে যত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আছে—ফ্ল্যাট, জমিসব তিনি বিক্রি করে দেবেন। এক সুতো জমিও তিনি রাখবেন না। যেন এই দেশের সাথে তার কোনো পিছুটান না থাকে। কোনো অজুহাত না থাকে ফিরে আসার।

শুরু হলো আমাদের দৌড়ঝাঁপ। ভূমি অফিস
, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, রাজউক, এবং তেজগাঁওয়ের নাম না জানা সব সরকারি দালান। এই জায়গাগুলো নরকের একটা করে শাখা অফিস। এখানে ঢুকলে মনে হয় সময় থমকে গেছে। চারপাশে ফাইলের পাহাড়, লাল ফিতা দিয়ে বাঁধা শত বছরের ধুলো, আর পান খাওয়া দাঁত বের করে বসে থাকা কিছু মানুষ—যাদের চোখের দিকে তাকালেই মনে হয় তারা আপনার পকেট স্ক্যান করছে।

আন্টি এই পরিবেশের সাথে একদমই বেমানান। তার গায়ে বিদেশি পারফিউমের গন্ধ
, চোখে দামি রোদচশমা, আর পরনে স্মার্ট ক্যাজুয়াল। তিনি যখন কোনো এসি ল্যান্ডের রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ান, তখন পিওন থেকে শুরু করে বড় কর্তা পর্যন্ত সবাই নড়েচড়ে বসে। একদিন তেজগাঁও রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়েছি। প্রচন্ড ভিড়। গরমে মানুষের গায়ের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। আন্টি একটা রুমাল দিয়ে নাক চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। এক দালাল গোছের লোক এসে বলল, "আপা, কাজটা ফাস্ট করায় দিমু? কিছু খরচাপাতি লাগব।" আন্টি সানগ্লাস নামিয়ে লোকটার দিকে এমনভাবে তাকালেন যে লোকটা ভড়কে গেল। তিনি বললেন, "শোনো, আমি জীবনে অনেক টাকা খরচ করেছি। কিন্তু ঘুষ দেওয়ার জন্য এক পয়সাও বাজেট রাখিনি। কাজ হলে হবে, না হলে আমি মিনিস্ট্রি পর্যন্ত যাব। ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড?" লোকটা 'আন্ডারস্ট্যান্ড' করল কি না জানি না, তবে সুড়সুড় করে কেটে পড়ল। আন্টির এই রূপটা আমার চেনা ছিল না। তিনি শুধু হুল্লোড় করা নারী নন, প্রয়োজনে তিনি বাঘের মতো গর্জনও করতে পারেন।

কখনও আমরা নিজেদের গাড়িতে যেতাম
, কখনও উবারে, আবার কখনও রিকশায়। তবে নিজেদের গাড়িটা আমরা কম ব্যবহার করছিলাম। কারণ ড্রাইভার কুদ্দুস মিয়াকে নিয়ে আন্টির সন্দেহ আছে। তিনি মনে করেন কুদ্দুস মিয়া বাসায় গিয়ে সব রিপোর্ট করে দেয়—কোথায় গেলাম, কার সাথে দেখা করলাম, কী কাগজ সাইন করলাম।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ফাইলের পেছনে দৌড়ে
, উকিলের সাথে চিল্লাপাল্লা করে, আর ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে যখন আমরা বাসায় ফিরতাম, তখন আন্টিকে বিধ্বস্ত লাগত। শরীরের ক্লান্তি না, এক ধরণের মানসিক অবসাদ তাকে গ্রাস করত। একটা জমি বিক্রি করা মানে শুধু মাটি বিক্রি করা না, সেই মাটির সাথে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলোকেও নিলামে তোলা।

সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। সারাদিন মতিঝিলে এক ব্যাংকের লকার আর উকিল পাড়ায় দৌড়াদৌড়ি করে আমরা যখন বের হলাম
, তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। ঢাকা শহরের সন্ধ্যাটা আমার খুব প্রিয়। হাজার হাজার বাতি জ্বলে ওঠে, কিন্তু সেই আলোতে অন্ধকার কাটে না, বরং রহস্য বাড়ে। আমরা রিকশায় করে আসছিলাম। আমি ভাবছিলাম আজ বাসায় গিয়ে সোজা ঘুম দেব। শরীর আর চলছে না। হঠাৎ আন্টি আমার পিঠে খোঁচা দিলেন।

"তন্ময়?"
"জি আন্টি।"
"তোর কি তাড়া আছে? বাসায় ফেরার?"
আমি ঘড়ি দেখলাম। "না, তেমন তাড়া নেই। কেন বলুন তো?" আন্টি একটু চুপ করে থাকলেন। তারপর নিচু গলায় বললেন, "আমার গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। একটু ড্রিংক করা দরকার। আই নিড আ ড্রিংক। ব্যাডলি।" আমি চমকে উঠলাম। ড্রিংক মানে যে পেপসি বা কফি না, সেটা বুঝতে আমার বাকি রইল না। আমাদের সমাজে মদ খাওয়াটা এখনো ট্যাবু, বিশেষ করে নারীদের জন্য। আর আমার মতো ছেলের জন্য কোনো বয়োজ্যেষ্ঠ নারীকে বারে নিয়ে যাওয়াটা রীতিমতো অ্যাডভেঞ্চার এবং কেলেঙ্কারির মাঝামাঝি কিছু। আমি আমতা আমতা করে বললাম, "ড্রিংক করবেন? মানে... অ্যালকোহল?" আন্টি সোজা তাকিয়ে বললেন, "হ্যাঁ। অ্যালকোহল। আমি কি এখন বাসায় বসে তোর বাবার সামনে গ্লাসে হুইস্কি ঢালব? সেটা পসিবল না। আমাকে কোনো বারে নিয়ে চল। ভালো কোনো বার। যেখানে সেইফলি বসা যায়।"
আমি মহাবিপদে পড়লাম। ঢাকার বারগুলো আমি চিনি না তা নয়। বন্ধুদের মুখে শুনেছি, দু-একবার কৌতূহলবশত উঁকিও দিয়েছি, কিন্তু তাই বলে নিজের মায়ের বান্ধবীকে নিয়ে বারে যাওয়া? এটা সিলেবাসের বাইরে। কিন্তু আন্টির গলার স্বরে এমন একটা হাহাকার ছিল যে আমি না করতে পারলাম না। তার আজ খুব দরকার। হয়তো সারাদিনের এই জমি বিক্রির শোক ভুলতে, অথবা নিজেকে অসাড় করে দিতে।

আমি একটু চিন্তা করে বললাম
, "মগবাজারের দিকে একটা জায়গা আছে। লাকি রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার। শুনেছি ওটার পরিবেশ মোটামুটি ভালো। ফ্যামিলি কেবিন টাইপ কর্নার আছে। ওখানে যাবেন?"
আন্টি বললেন, "যেখানে নিয়ে যাবি, সেখানেই যাব। জাস্ট ভিড়ভাট্টা আর চিল্লাপাল্লা যেন না থাকে।"


আমরা রিকশা ঘুরিয়ে মগবাজারের দিকে নিলাম। আমার বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে। পরিচিত কেউ যদি দেখে ফেলে
? যদি কোনো পুলিশ রেইড হয়? নানান আজেবাজে চিন্তা মাথায় ঘুরছে। আমি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র, কিন্তু এখন আমি আন্তর্জাতিক মানের রিস্ক নিচ্ছি।
বারটা একটা পুরনো বিল্ডিংয়ের দোতলায়। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কী চলছে। শুধু গেটের সামনে দুজন ষণ্ডা মার্কা দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। আমি আর আন্টি সিঁড়ি দিয়ে উঠলাম। দারোয়ানরা আন্টিকে দেখে একটু অবাক হলো। সাধারণত এই ধরণের জায়গায় নারীরা খুব একটা আসে না, আর এলেও সাথে পুরুষ সঙ্গী থাকে বয়ফ্রেন্ড বা স্বামী গোছের। আমি তো দেখতে নেহাতই বাচ্চার মতো। ভেতরে ঢুকতেই একটা ঝাপসা অন্ধকার আর এসির ঠান্ডা বাতাস আমাদের ঘিরে ধরল। আলো-আঁধারি পরিবেশে মানুষজন নিচু গলায় কথা বলছে। কোথাও টুংটাং গ্লাসের শব্দ।

ম্যানেজার গোছের একজন এগিয়ে এল। আমি বললাম
, "একটু নিরিবিলি কর্নার হবে?" সে আমাদের একদম কোণায়, একটা দেওয়ালের আড়ালে টেবিল দেখিয়ে দিল। জায়গাটা বেশ সেমি-প্রাইভেট। লাল রঙের ভেলভেটের সোফা, মাঝখানে কাঁচের টেবিল। টেবিলের নিচে মৃদু নীল আলো জ্বলছে।আমরা বসলাম। আন্টি তার সানগ্লাসটা খুললেন না। এই অন্ধকারেও তিনি সানগ্লাস পরে আছেন। হয়তো নিজের চোখ লুকাতে চাইছেন।

ওয়েটার মেনু নিয়ে এল। আন্টি মেনু না দেখেই বললেন
, "ব্ল্যাক লেবেল আছে? ডাবল পেগ। অন দ্য রকস। আর সাথে চিল্ড ওয়াটার।" ওয়েটার আমার দিকে তাকাল। "স্যার, আপনার জন্য?" আমি ঢোক গিলে বললাম, "আমাকে একটা পেপসি দিন। আর চিকেন ফ্রাই। স্পাইসি যেন হয়।" ওয়েটার চলে গেল। যাওয়ার সময় তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ছিল। সে হয়তো ভাবছে—কী অদ্ভুত জুটি! সুগার মমি আর তার পোষা বিড়াল। লোকে যা ভাবার ভাবুক, আমার এখন ওসব ভাবার সময় নেই।
পানীয় চলে এল। আন্টির গ্লাসে অ্যাম্বার রঙের তরল, ভেতরে বরফের টুকরো ভাসছে। আমার সামনে কালো রঙের পেপসি। দুটোই তরল, কিন্তু দুটোর জগত আলাদা। আন্টি গ্লাসটা হাতে নিলেন। কোনো 'চিয়ার্স' বললেন না। এক চুমুকে অর্ধেকটা গ্লাস খালি করে ফেললেন। তার চোখেমুখে কোনো বিকার নেই। যেন তিনি পানি খাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ প্রথম চুমুকে মুখ বিকৃত করে, একটা ঝাল ঝাল ভাব করে। আন্টির সেসব কিছুই হলো না। বোঝা গেল, এই তরল তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী।

আমি স্ট্র দিয়ে পেপসিতে চুমুক দিলাম। চিকেন ফ্রাইটা এখনো আসেনি। আন্টি গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আছেন। নীল আলোয় গ্লাসটা রহস্যময় লাগছে।
"তন্ময়, তুই আমাকে জাজ করছিস না তো?" আন্টি হঠাৎ প্রশ্ন করলেন। আমি বললাম, "না আন্টি। আমি জাজ করার কেউ না। তাছাড়া আমি তো ফিলোসফার হতে চাই। ফিলোসফাররা জাজ করে না, তারা অবজার্ভ করে।" আন্টি হাসলেন। শুকনো হাসি। "তোর এই ফিলোসফিটা আমার ভালো লাগে। শোন, আমি জানি তুই ভাবছিস আমি কেন সব বিক্রি করে দিচ্ছি। ভাবছিস না?"
"একটু ভাবছি। তবে মনে হচ্ছে আপনি কোনো বন্ধন রাখতে চাইছেন না।"

আন্টি গ্লাসের বাকিটুকু শেষ করলেন। বরফের টুকরোগুলো নড়ে উঠল।
"বন্ধন... হাহ! বন্ধন তো কবেই ছিঁড়ে গেছে রে। এখন শুধু সুতোগুলো ঝুলছে। ওগুলো কেটে দিচ্ছি। আমি আর কখনো এই দেশে ফিরব না। আর কখনো না। এই দেশ আমাকে শুধু কষ্ট দিয়েছে। আমার শৈশব, আমার যৌবন, আমার প্রেম, আমার সংসার—সব এই শহরে কবর দেওয়া আছে। আমি কবরের ওপর দিয়ে হাঁটতে চাই না।"

ওয়েটার এসে আবার গ্লাস ভরে দিয়ে গেল। আন্টি দ্বিতীয় গ্লাস শুরু করলেন। তার কথাগুলো একটু জড়িয়ে যাচ্ছে না
, বরং আরও পরিষ্কার হচ্ছে। মদ পেটে পড়লে মানুষ সত্য কথা বলে। আবরণ খুলে ফেলে।  চিকেন ফ্রাই এসেছে। আমি একটা লেগ পিস তুলে নিলাম। আন্টি খাচ্ছেন না। তিনি শুধু পান করছেন। তার খাওয়ার ভঙ্গিটা রাজকীয়। ধীরে, সুস্থে, কিন্তু বিরামহীন। আমি লক্ষ্য করলাম, তার সানগ্লাসের নিচ দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। খুব সন্তর্পণে। নীল আলোয় সেটা চিকচিক করে উঠল। তিনি হাত দিয়ে মুছলেন না। পানিটা গড়িয়ে তার গালের ভাজে হারিয়ে গেল। এই নারী, যিনি গত কয়েকদিন ধরে সরকারি অফিসের কর্কশ টেবিলে বসে দলিলে সই করেছেন, ধমক দিয়েছেন, এখন এই বারের অন্ধকারে বসে নিঃশব্দে কাঁদছেন। তার কান্না কেউ দেখছে না, আমি ছাড়া।

প্রায় এক ঘণ্টা পার হলো। আন্টি তিন বা চার পেগ শেষ করেছেন। আমি দুই বোতল পেপসি আর এক প্লেট চিকেন ফ্রাই শেষ করেছি। আন্টির অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না তিনি মাতাল হয়েছেন। তিনি সোজা হয়ে বসে আছেন। শুধু তার চোখের দৃষ্টিটা একটু ঘোলাটে।
"তন্ময়, বিল দিতে বল।"

আমি ওয়েটারকে ডাকলাম। বিল এল। টাকার অঙ্কটা দেখে আমার চোখ কপালে উঠল। আমার তিন মাসের হাতখরচের সমান। আন্টি ব্যাগ থেকে কার্ড বের করে দিলেন। পিন দিলেন। কোনো টিপস দিলেন না। তার হাত একটুও কাঁপল না।

আমরা যখন নিচে নামলাম
, তখন রাত নয়টা বাজে। রাস্তা কিছুটা ফাঁকা হয়ে এসেছে। আন্টি টলছেন না, কিন্তু খুব সাবধানে পা ফেলছেন। আমি তার কনুইটা আলতো করে ধরে রাখলাম। তিনি আপত্তি করলেন না। বরং আমার ওপর একটু ভর দিলেন। "তন্ময়, গাড়ি ডাক। উবার ডাক।"

আমি ফোন বের করলাম। উবার অ্যাপটা ওপেন করলাম। লোকেশন দিলাম
'সাউথ প্রশান্তি'। "গাড়ি খুঁজছে আন্টি। একটু দাঁড়ান।"
আমরা বারের নিচের অন্ধকার সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। দারোয়ানরা আড়চোখে তাকাচ্ছে। আন্টি দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছেন। আমি কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম। তিনি বলছেন, "সব শেষ। সব শেষ। আর আসব না। গুডবাই ঢাকা। গুডবাই..."

আমার ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল
—'ড্রাইভার ফজর আলী ইজ অন হিজ ওয়ে'। গাড়ি আসতে চার মিনিট লাগবে। এই চার মিনিট সময়টাকে মনে হলো অনন্তকাল। আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার মায়ের বয়সী এক নারীর পাশে, যার শরীরে দামি মদের গন্ধ, আর হৃদয়ে পোড়া স্বপ্নের ছাই। তিনি তার সব কিছু বিক্রি করে দিয়েছেন, শুধু এই স্মৃতিটুকু ছাড়া। আর আমি, তন্ময়, সেই স্মৃতির একমাত্র সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছি মগবাজারের এক ল্যাম্পপোস্টের নিচে।
Like Reply
#29
অসাধারণ!
Like Reply
#30
Nice story. Keep it up. Waiting for your next update.
Like Reply
#31
ভালো লাগলো। অপেক্ষা করছি কখন বরফ গলবে আর বয়সের পার্থক্য ভুলে সব একাকার হয়ে মিশে যাবে।
Like Reply
#32
VAlo laglo
Like Reply
#33
দারুন হিট
আই লাইক ইট
[+] 1 user Likes poka64's post
Like Reply
#34
অনেকদিন পর এরকম লেখা পড়লাম। জাস্ট অসাধারণ।
Like Reply
#35
Durdanto....update r opakhai roylam
[+] 1 user Likes nightangle's post
Like Reply
#36
৬

মগবাজার থেকে ধানমন্ডি খুব বেশি দূর নয়, কিন্তু আজকের এই পথটাকে আমার কাছে মনে হচ্ছে সাহারা মরুভূমির চেয়েও দীর্ঘ। গাড়ির জানালা বন্ধ, এসি চলছে ফুল স্পিডে, তবুও আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আমার পাশে বসে থাকা তনিমা আন্টি এখন আর সেই স্মার্ট, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নারী নন; তিনি এখন বিধ্বস্ত এক মানবিক ধ্বংসস্তূপ।

উবার ড্রাইভার ফজর আলী লোকটা বেশ নির্বিকার। সে তাকিয়ে আছে সামনের রাস্তার দিকে, কিন্তু আমি নিশ্চিত, তার কান পড়ে আছে পেছনের সিটে। মাঝেমধ্যে রিয়ার ভিউ মিররে তার চোখ চকচক করে উঠছে। ওই দৃষ্টিতে কৌতূহল আছে, আর আছে এক ধরণের নোংরা আনন্দ। ঢাকা শহরের ড্রাইভাররা পেছনের সিটের অনেক গোপন নাটকের নীরব দর্শক। তারা জানে, এই শহরের ভদ্রতার মুখোশের আড়ালে কী কী লুকিয়ে থাকে।

আন্টি প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। মাথাটা জানালার কাঁচে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। আমি ভেবেছিলাম তিনি হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু হঠাৎ
তিনি নড়ে উঠলেন। তার হাতটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে আমার হাতের ওপর এসে পড়ল। আমি শিউরে উঠলাম। তার হাতের তালু ঘর্মাক্ত এবং অস্বাভাবিক গরম।

তিনি বিড়বিড় করে ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করলেন। প্রথমে বোঝা যাচ্ছিল না
, শুধু ফিসফিসানি। তারপর স্বর একটু স্পষ্ট হলো। "হোয়াই? হোয়াই ডোন্ট ইউ লাভ মি ডার্লিং?"

আমি আড়ষ্ট হয়ে বসে রইলাম। আন্টি আমাকে তার
'ডার্লিং' ভাবছেন। মাতাল অবস্থায় মানুষের মস্তিষ্ক সময়ের হিসাব গুলিয়ে ফেলে। তিনি হয়তো ভাবছেন তিনি পঁচিশ বছর আগের কোনো এক রাতে, কোনো এক লং ড্রাইভে তার প্রাক্তন স্বামী বা প্রেমিকের পাশে বসে আছেন। তিনি আমার দিকে সরে এলেন। তার মাথাটা রাখলেন আমার কাঁধে। তারপর মুখটা ঘষতে থাকলেন আমার বুকে। "লুক অ্যাট মি... প্লিজ... এম আই নট বিউটিফুল? আমাকে দেখো। আমাকে ছোঁও।"

তার গলার স্বরে এমন এক আকুতি, যা শুনলে যেকোনো সুস্থ মানুষের মায়া হওয়ার কথা। কিন্তু আমার মায়া হওয়ার বদলে আতঙ্ক হচ্ছে। তিনি বিড়বিড় করে এমন সব শব্দ উচ্চারণ করতে শুরু করলেন যা শুনে আমার কান গরম হয়ে গেল। ইংরেজি ভাষার এই শব্দগুলো সাধারণত পর্নোগ্রাফি বা খুব ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত ছাড়া ব্যবহার করা হয় না। তিনি বলছিলেন, "মেইক মি ইওরস... ডেস্ট্রয় মি... আমি তোমার হতে চাই, যেভাবে তুমি চাও..."

আমি পাথর হয়ে বসে আছি। আমার হৃদস্পন্দন এত দ্রুত হচ্ছে যে মনে হচ্ছে বুকের পাঁজর ভেঙে যাবে। ড্রাইভার ফজর আলী কি শুনতে পাচ্ছে
? শোনারই কথা। আন্টির গলা যদিও খাদে নামানো, কিন্তু এই নিস্তব্ধ গাড়িতে প্রতিটি শব্দই হাতুড়ির মতো বাজছে। আমি আড়চোখে মিররের দিকে তাকালাম। ফজর আলীর চোখ রাস্তার দিকে। সে হয়তো ভান করছে শোনার, কিংবা শুনেও না শোনার ভান করছে।

আন্টির হাত আমার শার্টের বোতামের ওপর। তিনি খামচে ধরে আছেন। তার নিঃশ্বাসে অ্যালকোহলের তীব্র গন্ধের সাথে মিশে আছে দামি পারফিউম। এই মিশ্র গন্ধটা আমার নাকে এসে ধাক্কা মারছে। তিনি ক্রমাগত বলে চলেছেন
, "তুমি কেন আমাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছ? আমি তো তোমারই। আমাকে নাও... প্লিজ..."

আমি নিচু গলায়
, দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, "আন্টি, প্লিজ। চুপ করুন। ড্রাইভার আছে। আমরা বাসায় যাচ্ছি।" আমার কথা তার কানে পৌঁছাল বলে মনে হলো না। তিনি এখন অন্য জগতে। সেই জগতে তিনি প্রত্যাখ্যাত, তিনি একাকী, এবং তিনি মরিয়া হয়ে একটু উষ্ণতা খুঁজছেন।

হঠাৎ
তিনি আমার গালের কাছে মুখ আনলেন। তার ঠোঁট আমার কানের লতি স্পর্শ করল। একটা ভেজা, আঠালো স্পর্শ। আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। আমি পুরুষ। আমার বয়স তেইশ। আমার শরীরে টেস্টোস্টেরন আছে। একজন নারী, তিনি যেই হোন না কেন, যখন এভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে স্পর্শ করেন, তখন শরীর তার নিজস্ব নিয়মে সাড়া দিতে চায়। এক মুহূর্তের জন্য আমার ভেতরে একটা আদিম উত্তেজনা তৈরি হলো। খুব জঘন্য একটা অনুভূতি। পরমুহূর্তেই নিজেকে ধিক্কার দিলাম। ছিঃ! আমি কী ভাবছি? ইনি আমার মায়ের বয়সী। ইনি মাতাল। ইনি নিজের মধ্যে নেই। আমি যদি এখন সুযোগ নিই, বা সামান্যতম প্রশ্রয় দিই, তবে আমার আর রাস্তার নেড়ি কুকুরের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।

আমি খুব সাবধানে
, কিন্তু দৃঢ়ভাবে আন্টিকে একটু ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। "আন্টি, সোজা হয়ে বসুন। প্লিজ।" তিনি সরলেন না। বরং আরওঁ এলিয়ে পড়লেন। তার শরীরের পুরো ভার এখন আমার ওপর। তিনি ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে সেই একই প্রলাপ—"লাভ মি... লাভ মি..."

গাড়িটা পান্থপথের সিগন্যালে দাঁড়িয়েছে। বাইরে হকাররা ফুল আর বেলুন বিক্রি করছে
। কাঁচের ওপাশে স্বাভাবিক জীবন, আর এপাশে এক মাতাল নাটকের মঞ্চ। আমি নিজেকে সামলালাম। এখন উত্তেজনা বা ঘৃণার সময় নয়, এখন ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের সময়। যেকোনো মূল্যে এই মহিলাকে নিরাপদে এবং গোপনে বাসায় ঢোকাতে হবে।

আমি পকেট থেকে ফোন বের করলাম। হাত কাঁপছে। মৃন্ময়ের নাম্বারে ডায়াল করলাম। ও নিশ্চয়ই এতক্ষণে পড়ার টেবিলে
, অথবা গেম খেলছে। একবার রিং হতেই ও ধরল। "হ্যালো ভাইয়া? তোমরা কোথায়? আম্মা ফোন দিয়েছিল, জিজ্ঞেস করছিল তোমরা ফিরেছ কি না।" আমি ফিসফিস করে বললাম, "শোন, কথা কম বল। মন দিয়ে শোন। আমরা আসছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব। বাবা কোথায়?"

"বাবা ড্রয়িংরুমে। টিভি দেখছে।"

"সর্বনাশ। শোন, তুই এক্ষুনি একটা কাজ করবি। বাবাকে তোর রুমে ডেকে নিয়ে যা। বলবি তোর ম্যাথ প্রবলেম সলভ করে দিতে, বা কম্পিউটার কাজ করছে না—যেকোনো একটা বাহানা। বাবাকে যেন ড্রয়িংরুমে না দেখি। আর মেইন দরজাটা হালকা চাপিয়ে রাখবি, লক করবি না। আমি বেল বাজাব না।"

মৃন্ময় চালাক ছেলে। ও গলার স্বর শুনেই বুঝেছে পরিস্থিতি জটিল।
"ভাইয়া, কিছু হয়েছে? আন্টির কিছু হয়েছে?"

"পরে বলব। যা বললাম কর। বাবা যেন কোনোভাবেই মেইন ডোরের দিকে না আসে। জলদি যা।"


ফোন কেটে দিলাম। গাড়ি সাতাশ নম্বর পার হয়ে ধানমন্ডির দিকে ঢুকছে। আমার বুকের ওপর আন্টির মাথাটা এখন ভারী পাথরের মতো। তিনি আর কথা বলছেন না। বিড়বিড়ানি থামিয়ে এখন শুধু ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছেন। সম্ভবত অ্যালকোহল তার শরীরে পুরোপুরি জাঁকিয়ে বসেছে। তিনি সেমি-কনশাস স্টেজে চলে গেছেন
। এটা ভালো, আবার খারাপও। ভালো কারণ তিনি আর অশ্লীল কথা বলছেন না। খারাপ কারণ তাকে এখন পাঁজাকোলা করে নামাতে হবে।

ধানমন্ডি ৯/এ-তে ঢোকার সময় আমি ফজর আলীকে বললাম
, "ভাই, গেটের একদম ভেতরে ঢোকাবেন। লিফটের সামনে।" ফজর আলী মাথা নাড়ল। দারোয়ান মোতালেব গেট খুলে দিল। গাড়িটা পার্কিং লটে, লিফটের ঠিক সামনে এসে থামল। আমি দ্রুত ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। ফজর আলী আড়চোখে পেছনের সিটের দিকে তাকিয়ে বলল, "ম্যাডামের শরীর কি খুব খারাপ স্যার? ধরমু?" আমি কঠিন গলায় বললাম, "না, আমি পারব। আপনি যান।" সে আর কথা বাড়াল না।

এখন আসল চ্যালেঞ্জ। আমি আন্টিকে ডাকলাম।
"আন্টি! আন্টি! উঠুন। আমরা এসেছি।" তিনি চোখ মেললেন না। গোঙানির মতো শব্দ করলেন। আমি গাড়ি থেকে নামলাম। তারপর এপাশ দিয়ে ঘুরে এসে তার দিকের দরজা খুললাম। "নামুন আন্টি। প্লিজ, একটু শক্ত হোন।" আমি তার হাত ধরে টান দিলাম। তিনি বস্তার মতো আমার গায়ের ওপর এসে পড়লেন। তার পায়ে হিল জুতো। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না। আমি তার এক হাত আমার কাঁধের ওপর দিয়ে নিলাম, অন্য হাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরলাম। তার শরীরের সবটুকু ভার আমার ওপর।

ভাগ্য ভালো
, লিফটটা নিচতলায় ছিল। এবং লবিতে কেউ নেই। মোতালেব চাচা গেটের বাইরে টুল নিয়ে বসে আছে। সে দেখেনি। আমি কোনোরকমে আন্টিকে টেনে লিফটের ভেতরে ঢোকালাম। গ্রাউন্ড ফ্লোরের বোতাম টিপে দিলাম। লিফটের দরজা বন্ধ হতেই আমি আয়নায় আমাদের দুজনকে দেখলাম।

দৃশ্যটা বীভৎ
স এবং করুণ। আমার চুল এলোমেলো, শার্টের একপাশ কুঁচকে আছে। আর আমার কাঁধে ঝুলে আছেন তনিমা আন্টি। তার চোখ বন্ধ, মুখটা হা হয়ে আছে, লিপস্টিক ছড়িয়ে গেছে ঠোঁটের চারপাশে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সদ্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা কোনো সৈনিক।

লিফট ওপরে উঠছে। হঠাৎ
আন্টি নড়ে উঠলেন। তিনি চোখ মেললেন। ঘোলাটে, রক্তজবা চোখ। তিনি আমার দিকে তাকালেন। খুব কাছে। এত কাছে যে আমি তার চোখের মনির ভেতরের কালো গহ্বরটা দেখতে পাচ্ছি। তিনি হঠাৎ হেসে উঠলেন। মাতাল হাসি। "তুমি... তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছ? কেন? আমি কি রাক্ষসী?" আমি বললাম, "না আন্টি। চুপ করুন। আমরা এসে গেছি।" তিনি আমার কথা শুনলেন না। তিনি তার দুই হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরলেন। লিফটের ওইটুকু জায়গায় আমি নড়তে পারছি না। তিনি আমাকে কাছে টানলেন। "কিস মি... জাস্ট ওয়ানস... একটা চুমু দাও। কেউ জানবে না। কেউ না..."

তিনি তার মুখটা আমার মুখের দিকে এগিয়ে আনলেন। আমি প্রাণপণ শক্তিতে মাথাটা পেছনে সরালাম। তার ঠোঁট আমার গালে ঘষা খেল
। আমার মনে হলো কোনো গরম লোহা আমার গাল স্পর্শ করেছে। আমি ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিতে চাইলাম, কিন্তু লিফটের ওয়ালে পিঠ ঠেকে আছে। "আন্টি! কী করছেন! " তিনি আমাকে ছাড়লেন না। বরং আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন। "ডোন্ট রিজেক্ট মি... আমি মরে যাচ্ছি... একটু আদর..."

ঠিক সেই মুহূর্তে লিফটের দরজা খোলার শব্দ হলো।
'টুং'। চারতলা। আমি এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিলাম। তিনি টাল সামলাতে না পেরে লিফটের দেয়ালে বাড়ি খেলেন। আমি দ্রুত তাকে আবার ধরলাম, যাতে পড়ে না যান। আমার কপাল ঘামছে, হাত কাঁপছে। যদি দরজা খোলার পর দেখি বাবা দাঁড়িয়ে আছেন?

না
, কেউ নেই। করিডোর ফাঁকা। আমাদের ফ্ল্যাটের দরজাটা সামান্য ফাঁক করা। মৃন্ময় কাজ করেছে। আমি দ্রুত আন্টিকে পাঁজাকোলা করে ধরলাম। এখন আর তাকে হাঁটিয়ে নেওয়া সম্ভব না। তিনি হাঁটার শক্তি হারিয়েছেন। আমি তাকে কোলে তুলে নিলাম। ছিমছাম শরীর হওয়ায় বেঁচে গেছি, অ্যার সঙ্গে বিপদের সময় মানুষের গায়ে অসুরের শক্তি চলে আসে।

আমি নিঃশব্দে ফ্ল্যাটে ঢুকলাম। ড্রয়িংরুম অন্ধকার। শুধু করিডোরের আলো জ্বলছে। বাবার রুম থেকে উচ্চস্বরে টিভি বা কথার আওয়াজ আসছে না। মৃন্ময় হয়তো বাবাকে কোনো জটিল অংকের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে। আমি শ্বাস বন্ধ করে করিডোর পার হলাম। গেস্ট রুমটা করিডোরের শেষ মাথায়।
আন্টি আমার কোলে বিড়বিড় করছেন, "হোয়্যার এম আই? স্বর্গ? এটা কি স্বর্গ?" আমি মনে মনে বললাম, "না আন্টি, এটা ধানমন্ডি। আর আমরা নরক পার হয়ে এসেছি।"

গেস্ট রুমে ঢুকে আমি তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। তিনি বিছানায় পিঠ ঠেকানো মাত্রই হাত-পা ছড়িয়ে দিলেন। আমি দ্রুত তার পায়ের জুতো দুটো খুলে দিলাম। সালোয়ারের ওড়নাটা
, যেটা গলার কাছে প্যাঁচানো ছিল, সেটা আলগা করে একপাশে রাখলাম যাতে ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট না হয়। এসিটা অন করে দিলাম। টেম্পারেচার চব্বিশ।

তিনি পাশ ফিরে শুতে শুতে শেষবারের মতো অস্পষ্ট গলায় বললেন
, "তন্ময়... ডোন্ট লিভ মি..." আমি দাঁড়ালাম না। লাইট নিভিয়ে দিলাম। শুধু বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে রাখলাম। ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা আলতো করে টেনে দিলাম।

করিডোরে দাঁড়িয়ে আমি হাঁপাচ্ছি। বুকটা এখনো ধড়ফড় করছে। আমি নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালাম। মৃন্ময় তার রুমের দরজা সামান্য ফাঁক করে উঁকি দিল। আমাকে দেখে থাম্বস আপ দেখাল। অর্থাৎ
—'মিশন সাকসেসফুল'। আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালাম না।

নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিলাম। তারপর সোজা ফ্লোরে বসে পড়লাম। কার্পেটের ওপর।
আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে পানি খাওয়ার শক্তি আমার নেই। আজ রাতে আমি যা দেখলাম, যা অনুভব করলাম—তা আমি ভুলব কীভাবে? তনিমা আন্টি—যাকে আমি তিন দিন আগেও একজন দাপুটে, স্মার্ট, এবং জীবনমুখী নারী হিসেবে জানতাম, তার ভেতরের এই অন্ধকার রূপটা আমাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে। তার ওই আকুতি, "লাভ মি ডার্লিং"—এটা কোনো কামনার ডাক ছিল না। এটা ছিল এক গভীর, অতলান্তিক একাকীত্বের আর্তনাদ। একজন মানুষ কতটা নিঃসঙ্গ হলে নিজের বয়সের অর্ধেক বয়সী একটা ছেলের কাছে শরীর ঘঁষে উষ্ণতা খুঁজতে পারে?

আমার শরীরের ঘিনঘিনে অনুভূতিটা এখনো যাচ্ছে না। লিফটে তার সেই স্পর্শ
, সেই মাতাল নিঃশ্বাস—সব আমার চামড়ার নিচে গেঁথে গেছে। আমি বাথরুমে ঢুকলাম। শাওয়ার ছেড়ে দিলাম। ঠান্ডা পানি। আমি জামাকাপড় পরেই শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। পানি আমার শরীর ধুয়ে দিচ্ছে, কিন্তু মনের ময়লা কি ধুতে পারবে?

পুরুষ হিসেবে আমার যে সামান্য উত্তেজনা হয়েছিল
, সেটার জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। ফ্রয়েড হয়তো বলবেন এটা অবচেতন মনের খেলা, ইড আর সুপার-ইগোর দ্বন্দ্ব। কিন্তু আমি কোনো থিওরি শুনতে চাই না। আমি শুধু জানি, আমি আজ রাতে এমন একটা সীমানা পার করেছি, যেখান থেকে আর সহজে ফেরা যাবে না। আমাদের এই অসম সম্পর্কটা আর কখনো আগের মতো সহজ হবে না। কাল সকালে যখন আন্টির জ্ঞান ফিরবে, তিনি হয়তো সব ভুলে যাবেন। ব্ল্যাকআউট হয়ে যাবে। তিনি আবার সেই স্মার্ট, হাসিখুশি তনিমা আন্টি হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসবেন। কিন্তু আমি? আমি কীভাবে তার চোখের দিকে তাকাব? আমি তো জানি, ওই হাসির আড়ালে কোন কাঙাল সত্তা লুকিয়ে আছে।

রাত গভীর হচ্ছে। বাইরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। আমার মনে হলো
, আমরা সবাই আসলে ভিখারি। কেউ টাকার জন্য হাত পাতে, কেউ একটু ভালোবাসার জন্য, আর কেউ বা বিস্মৃতির জন্য। তনিমা আন্টি আজ মদ দিয়ে তার স্মৃতি মুছতে চেয়েছিলেন। আর আমি এখন পানির নিচে দাঁড়িয়ে আজকের রাতটা মুছতে চাইছি। ফোনটা বেজে উঠল। বের করে দেখলাম, মা ফোন করেছেন। 

"হ্যালো মা?"

"তন্ময়, কিরে তোরা ঘুমিয়ে পড়েছিস? আমি নিচে। লিফটে উঠছি। তনিমা খেয়েছে?"

আমি গলা ঝেড়ে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। "হ্যাঁ মা। আন্টি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। জার্নি আর দৌড়াদৌড়িতে খুব ক্লান্ত ছিলেন তো।" 

"আচ্ছা। ঠিক আছে। দরজা খোল। আমার চাবিটা ব্যাগের তলায়, খুঁজে পাচ্ছি না।"


আমি ভেজা কাপড়ে বাথরুম থেকে বের হলাম। একটা তোয়ালে দিয়ে গা মুছলাম
, টি-শার্টটা বদলালাম। মুখে একটা হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলাম। এখন আমাকে অভিনয় করতে হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন অভিনয়—স্বাভাবিক থাকার অভিনয়।  
Like Reply
#37
অসম্ভব সুন্দর হচ্ছে ব্রো। আপনার লেখার ধরন মারাত্মক প্রাঞ্জল। আশা করছি নেক্সট আপডেট দ্রুত পাব।
Like Reply
#38
সুন্দর গল্প
Like Reply
#39
খুবই সুন্দর, সাবলীল হাতের রচনা, পড়ে ভালো লাগে, মনে হয় খুব তাড়াতাড়ি শেষ হলো, আর একটু যদি বড় হতো, যাই হোক পরবর্তী update এর অপেক্ষায় থাকলাম।
Like Reply
#40
Osadharan
Like Reply




Users browsing this thread: 1 Guest(s)