21-01-2026, 01:11 AM
১
ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসে থাকলে সময়টা কেমন যেন থমকে যায়। চারপাশে শত শত মানুষ, অথচ অদ্ভুত এক ধরনের নির্জনতা কাজ করে। এই নির্জনতা কানের নয়, মগজের। ঢাকা শহরের শুক্রবারগুলো এমনিতে একটু অলস হয়। সূর্য ওঠার পর থেকেই তার একটা 'আজকে ছুটি' ভাব থাকে। রোদ থাকে, কিন্তু সেই রোদে তেজ থাকে না, থাকে একধরণের ফ্যাকাশে হাহাকার। আমি লেকের ধারের বেঞ্চটায় বসে ভাবছিলাম—আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়ছি, অথচ নিজের জীবনের সম্পর্কের সমীকরণগুলোই ঠিকঠাক মেলাতে পারছি না।
আমার নাম তন্ময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস বা আইআর-এর সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। নামটা বেশ রোমান্টিক—তন্ময়। নামের অর্থ হচ্ছে কোনো কিছুতে গভীরভাবে মগ্ন থাকা। কিন্তু আমি খুব একটা মগ্ন থাকতে পারি না। আমার মনোযোগ চড়ুই পাখির মতো। এই ডালে কিছুক্ষণ, ওই ডালে কিছুক্ষণ। তবে আমার একটা বিশেষ গুণ আছে, আমি আড্ডা জমাতে পারি। একটা মরা আড্ডাকে জ্যান্ত করে তোলার জন্য আমার উপস্থিতি যথেষ্ট। দেখতে আমি আহামরি কিছু না। উচ্চতা পাঁচ ফুট আট, গায়ের রং শ্যামলা আর ফর্সার মাঝামাঝি একটা কনফিউজিং জায়গায় আটকে আছে। আয়নায় নিজেকে দেখলে মাঝে মাঝে মনে হয়, চেহারাটায় বিশেষ কিছু নেই, কিন্তু চোখদুটোয় একটা কৌতুক আছে। এই কৌতুকভাবটাই হয়তো মানুষকে টানে। মেয়েরা সাধারণত সুন্দর ছেলেদের প্রেমে পড়ে না, তারা প্রেমে পড়ে সেইসব ছেলেদের, যারা তাদের হাসাতে পারে, কিংবা যাদের কথায় কোনো লজিক নেই কিন্তু শুনতে ভালো লাগে। আমি গিটার বাজাতে পারি, প্রচুর সিনেমা দেখি আর ফিলোসফি ঝাড়তে পারি—এগুলোই আমার তুরুপের তাস।
বাসায় ফিরলাম বেলা বারোটার দিকে। আমাদের বাসা ধানমন্ডি ৯/এ-তে। অ্যাপার্টমেন্টের নাম 'সাউথ প্রশান্তি'। নামটা বেশ আইরনিক। ঢাকা শহরে 'প্রশান্তি' শব্দটা কেবল সাইনবোর্ডেই মানায়, বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। চারতলায় আমাদের ফ্ল্যাট। লিফটে ওঠার সময় নিজের ছায়া দেখলাম স্টিলের দরজায়। মনে হলো ছায়াটা আমার চেয়ে বেশি ক্লান্ত।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা আর পোলাওয়ের গন্ধ একসঙ্গে নাকে লাগল। আমাদের বাসাটা বেশ গোছানো। বসার ঘরে ক্রিম কালারের সোফা, দেয়ালে বড় একটা অয়েল পেইন্টিং—গ্রামের দৃশ্য। বাবা কিনেছিলেন কোনো এক প্রদর্শনী থেকে। বাবা, জামিল চৌধুরী, একটা প্রাইভেট ব্যাংকের ম্যানেজার। বয়স তিপ্পান্নর কোঠায়, কিন্তু চুলে কলপ দেওয়ার কারণে তাকে পঁয়তাল্লিশের বেশি মনে হয় না। বাবা এখন সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। শুক্রবার তিনি কাগজের প্রতিটি লাইন পড়েন, এমনকি হারানো বিজ্ঞপ্তিও বাদ দেন না।
মা রান্নাঘরে। মা, রাশেদা চৌধুরী, তিনিও ব্যাংকার। সিনিয়র একাউন্টেন্ট। মা এবং বাবা দুজনেই প্রচুর টাকা আয় করেন, কিন্তু তাদের জীবনটা একটা রুটিনের ফ্রেমে বাঁধানো। সকাল আটটায় বের হওয়া, রাত আটটায় ফেরা। মাঝখানের সময়টুকু তারা কোথায় খরচ করেন, তা তারা নিজেরাও জানেন না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আধুনিক মানুষ হচ্ছে উন্নত মানের রোবট। তাদের ব্যাটারি আছে, চার্জ দিতে হয়, আর নির্দিষ্ট প্রোগ্রামিং অনুযায়ী চলতে হয়।
আমি সোফায় বাবার পাশে ধপাস করে বসে পড়লাম। বাবা কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন, "বাইরে খুব রোদ?" আমি বললাম, "রোদ না বাবা, ওটা রেডিয়েশন। মনে হচ্ছে মাইক্রোওভেনের ভেতর দিয়ে হেঁটে এলাম।" বাবা খবরের কাগজটা নামালেন। চশমার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। এই তাকানোটা আমি চিনি। তিনি এখন একটা সিরিয়াস কথা বলবেন অথবা কোনো উপদেশ দেবেন। "তন্ময়, তোর রেজাল্ট কবে দেবে?" আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, "দিয়ে দেবে। ভার্সিটির রেজাল্ট তো আর ট্রেনের শিডিউল না যে ঠিক সময়ে আসবে। হুট করে চলে আসবে একদিন।"
বাবা আবার কাগজে মন দিলেন। তিনি সম্ভবত আমার উত্তরে সন্তুষ্ট নন, কিন্তু শুক্রবার দুপুরে মেজাজ খারাপ করতে চাইছেন না। ভেতর থেকে মৃন্ময় বের হলো। আমার ছোট ভাই। ও এবার ইন্টারে পড়ছে। কানে হেডফোন, হাতে ফোন। ও পৃথিবীতে থেকেও পৃথিবীতে নেই। ওর জগতটা ভার্চুয়াল। আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে বাথরুমে ঢুকে গেল। এই জেনারেশনটা অদ্ভুত। এদের ইমোশনগুলো সব টাচস্ক্রিনে বন্দি।
দুপুরের খাওয়ার আয়োজন এলাহি। মা শুক্রবারের রান্নাটা নিজের হাতে করেন। পোলাও, খাসির মাংস, চিংড়ি মাছের মালাইকারি আর সালাদ। খাবার টেবিলে বসে মনে হলো, এই মুহূর্তটাই বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের সর্বোচ্চ সুখ। এসি চলছে, ফ্যানের বাতাস, আর সামনে ধোঁয়া ওঠা খাবার। মা খেতে খেতে বললেন, "তন্ময়, তোর আজ বিকেলে কোনো কাজ আছে?"
মায়ের এই প্রশ্নটা বিপদসংকেত। 'কাজ আছে' বললে মা জানতে চাইবেন কী কাজ। 'কাজ নেই' বললে তিনি নিজের কোনো কাজ চাপিয়ে দেবেন। আমি সাবধানে বললাম, "একটু বের হওয়ার কথা আছে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা।"
মা বললেন, "আড্ডা তো রোজই দিস। আজ আড্ডাটা বাদ দে।" আমি মাংসের হাড্ডি চিবুতে চিবুতে বললাম, "কেন? বিশেষ কোনো ঘটনা?" মা একটু নড়েচড়ে বসলেন। মুখে একটা মিষ্টি হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলেন। মা যখন কোনো কঠিন কাজ আমাকে দিয়ে করাতে চান, তখন এই হাসিটা দেন। "আমার এক বান্ধবী আজ দেশে আসছে। তনিমা। তনিমা হামিদ।" আমি বললাম, "ও আচ্ছা। ভালো তো।"
"ওকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করতে হবে।"
আমি খাওয়া থামিয়ে দিলাম। শুক্রবার বিকেলবেলা এয়ারপোর্ট যাওয়া আর স্বেচ্ছায় ফাঁসির দড়িতে মাথা দেওয়া একই ব্যাপার। এয়ারপোর্ট রোডের ট্রাফিক জ্যাম হলো পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য। মানুষ সেখানে গাড়িতে বসে বসে বুড়ো হয়ে যায়। আমি বললাম, "ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দাও। আমি গিয়ে কী করব?" মা বললেন, "ড্রাইভারের আজ ছুটি। আর তনিমা একা আসছে না, সাথে লাগেজ থাকবে। তাছাড়া ও আমার ইউনিভার্সিটির ক্লোজ ফ্রেন্ড। এতদিন পর আসছে, কেউ একজন রিসিভ করতে না গেলে কেমন দেখায়? আমি তো একা যেতে পারব না।"
আমি বাবার দিকে তাকালাম। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে চিংড়ি মাছের খোসা ছাড়াচ্ছেন। আমি বললাম, "মা, প্লিজ। আজ রাস্তায় যা জ্যাম থাকবে! তাছাড়া আমি তোমার বান্ধবীকে চিনিও না। গিয়ে কী বলব? 'হ্যালো আন্টি, ওয়েলকাম টু হেল'?" মা চোখ বড় বড় করে তাকালেন। "খবরদার তন্ময়! ফাজলামি করবি না। তুই আমার সাথে যাবি।”
"তুমি যাচ্ছ?"
"হ্যাঁ, আমি যাচ্ছি। তুই আমাকে নিয়ে যাবি, তনিমাকে রিসিভ করবি, তারপর ওকে হোটেলে ড্রপ করে দিয়ে আসব। ব্যাস, সিম্পল।"
সিম্পল না, মোটেও সিম্পল না। এর মধ্যে অনেকগুলো 'কিন্তু' আছে। প্রথমত, এয়ারপোর্টের ভিড়। দ্বিতীয়ত, অচেনা এক আন্টির সাথে গাড়িতে বসে থাকা। তৃতীয়ত, ছুটির বিকেলটা মাটি হওয়া। কিন্তু আমি জানি, মায়ের এই আদেশের ওপর আপিল চলে না। সুপ্রিম কোর্টের রায় হয়ে গেছে।
খাওয়া শেষ করে আমি আমার ঘরে ঢুকলাম। ঘরটা আমার নিজের মতো করে সাজানো। দেয়ালে কিছু মুভি পোস্টার—'গডফাদার', 'পাল্প ফিকশন', আর হুমায়ূন আহমেদের 'আগুনের পরশমণি'। জানালার পাশে আমার গিটারটা রাখা। খাটের ওপর ছড়ানো ছিটানো বই। আমি বিছানায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ফ্যানটা ঘুরছে। বনবন করে ঘুরছে। আমাদের জীবনটাও এই ফ্যানের মতো। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে শুধু ঘুরে মরছি। গতি আছে, কিন্তু গন্তব্য নেই।
তনিমা হামিদ। নামটা কয়েকবার আউড়ালাম। কেমন দেখতে হবে ভদ্রমহিলা? নিশ্চয়ই মোটাসোটা, চোখে ভারী চশমা, আর গলায় প্রচুর স্বর্ণের গয়না। প্রবাসী বাঙালি মহিলারা দেশে ফিরলে নিজেদের এক একটা গয়নার দোকান বানিয়ে ফেলেন। তাদের হাতে-গলায় এত স্বর্ণ থাকে যে মনে হয় তারা হাঁটার সময় ঝনঝন শব্দ হবে। আর পান চিবুতে চিবুতে বলবেন, "উফ, ঢাকা শহরটা আর থাকার জায়গা নেই, এত ডাস্ট!আমাদের ওখানের বাতাস কত পিওর!" ভাবতেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এই ধরনের মেকি মানুষদের আমি সহ্য করতে পারি না। এরা শেকড় ভুলে গিয়ে এখন প্লাস্টিকের ফুল হয়ে গেছে।
বিকেল সাড়ে চারটা। মা রেডি হয়ে আমার দরজায় নক করলেন। "কিরে তন্ময়, এখনো শুয়ে আছিস? ওঠ। দেরি হয়ে যাবে তো।" আমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠলাম। আলমারি খুলে একটা জিন্স আর কালো টি-শার্ট বের করলাম। টি-শার্টের বুকে লেখা—'I pretend to work, they pretend to pay.' লেখাটা কর্পোরেট স্লেভদের জন্য প্রযোজ্য, আমার জন্য না। তবুও পরলাম। চুলটা আঁচড়ে নিলাম। খুব বেশি পরিপাটি হওয়ার দরকার নেই। এয়ারপোর্টে যাচ্ছি, কোনো বিয়েবাড়িতে না।
ড্রইংরুমে গিয়ে দেখি মা একদম টিপটপ। হালকা নীল রঙের একটা জামদানি শাড়ি পরেছেন। সাথে ম্যাচিং করা ব্যাগ। মাকে বেশ সুন্দর লাগছে। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সেও মা নিজেকে খুব সুন্দর মেইনটেইন করেছেন। তার মুখে একটা চাপা উত্তেজনা। বান্ধবীর সাথে দেখা হবে, তাও বহু বছর পর। মেয়েদের বন্ধুত্বগুলো অদ্ভুত হয়। পনেরো বছর দেখা না হলেও দেখা হওয়ার পর মনে হয় গতকালই শেষ দেখা হয়েছিল।
আমি আর মা নিচে নামলাম। গ্যারেজের সামনে দাঁড়ালাম। দারোয়ান চাচা গেটে টুল পেতে বসে ঝিমুচ্ছে। বিকেলের রোদটা এখন নরম হয়ে এসেছে। আকাশে কমলা রঙের আভা। ধানমন্ডির এই সময়টা আমার খুব প্রিয়। সবকিছুর মধ্যে একটা ঘরে ফেরার তাড়া থাকে, আবার একটা অলসতাও থাকে। আমাদের সাদা রঙের পুরনো মডেলের করোলার ড্রাইভার কুদ্দুস মিয়া জানালা দিয়ে মুখ বের করে হাসল। পান খাওয়া দাঁত। "চলেন ভাইজান"
পেছনের দরজা খুলে মাকে আগে উঠতে দিলাম। তারপর আমি উঠলাম। এসির ঠান্ডা বাতাস আর লেবু ফ্লেভারের এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ। গন্ধটা একটু উগ্র। আমার নাকে বাড়ি মারল। গাড়ি চলতে শুরু করল। ধানমন্ডি থেকে এয়ারপোর্ট। লম্বা জার্নি। মা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। হয়তো অতীতে ফিরে গেছেন। ক্যাম্পাসের দিনগুলোতে। তনিমা হামিদের সাথে কাটানো সময়গুলোতে।
আমার কেন জানি মনে হলো, আজকের এই যাত্রাটা সাধারণ কোনো যাত্রা নয়। আমি জানি না কেন মনে হলো। কিছু কিছু অনুভূতির কোনো ব্যাখ্যা থাকে না। লজিক দিয়ে সব মাপা যায় না। মনের ভেতর একটা খটকা, একটা অস্থিরতা। কুদ্দুস মিয়া আয়নায় বারবার তাকাচ্ছে। রেডিওতে গান বাজছে—'পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে...'। আসলেই কি পৃথিবী ছোট? নাকি আমরা আমাদের চারপাশের দেয়ালগুলো বড় করে ফেলেছি বলে পৃথিবীটাকে ছোট মনে হয়?
গাড়ি সাতমসজিদ রোড ধরে এগোচ্ছে। জ্যাম শুরু হয়ে গেছে। লাল বাতির সারি। আমি সিটে গা এলিয়ে দিলাম। অসম এক সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।
২
এয়ারপোর্টের ক্যানোপির নিচে দাঁড়িয়ে থাকাটা এক ধরনের শাস্তি। বিনা অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মতো আমি আর মা দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে গিজগিজ করছে মানুষ। কারো হাতে ফুলের তোড়া, কারো চোখেমুখে উৎকণ্ঠা, আবার কেউবা অকারণে উত্তেজিত হয়ে লাফালাফি করছে। ঢাকা শহরের মানুষের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তারা ভিড় দেখলে আরো বেশি ভিড় বাড়াতে পছন্দ করে। ফাঁকা জায়গায় তাদের দম বন্ধ হয়ে আসে।
মা বারবার ঘড়ি দেখছেন। ফ্লাইট ল্যান্ড করেছে পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে। ইমিগ্রেশন আর লাগেজ বেল্টের গোলকধাঁধা পার হয়ে বের হতে সময় লাগে, এটা মা জানেন। তাও তার অস্থিরতা কমছে না। তিনি প্রতি পাঁচ সেকেন্ড পর পর পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁকি দিচ্ছেন, যেন এতে করে ভেতরের যাত্রীরা দ্রুত বের হয়ে আসবে।
আমি বললাম, "মা, তুমি কি অলিম্পিকের হাই জাম্প প্র্যাকটিস করছ?" মা বিরক্ত হয়ে তাকালেন। "চুপ কর তো। কত বছর পর দেখা হবে, তুই বুঝবি না। আমার হার্টবিট বেড়ে গেছে।"
"হার্টবিট বাড়লে কার্ডিওলজিস্ট দেখানো উচিত। এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই।" মা আমার কথায় কান দিলেন না। হঠাৎ তিনি চিৎকার করে উঠলেন, "ওই যে! ওই তো তনিমা!"আমি তাকালাম। এবং তাকিয়ে একটা ছোটখাটো ধাক্কা খেলাম। আমার কল্পনার তনিমা আন্টির সাথে বাস্তব তনিমা আন্টির কোনো মিল নেই। আমি ভেবেছিলাম মোটাসোটা, শাড়ি পরা, পানের রসে ঠোঁট লাল করা কোনো এক মহিলা বের হবেন। যার পেছনে কুলি ধরাধরি করে তিন-চারটা বিশাল সুটকেস নিয়ে আসবে। কিন্তু গেট দিয়ে যিনি বের হলেন, তাকে দেখে মনে হলো তিনি ভুল করে বাংলাদেশে চলে এসেছেন। তার গন্তব্য হয়তো ছিল মিয়ামি বিচ বা হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ।
ভদ্রমহিলার বয়স মায়ের বয়সীই হবে—চুয়াল্লিশ বা পঁয়তাল্লিশ। কিন্তু তাকে দেখে বড়জোর বত্রিশ-তেত্রিশ মনে হচ্ছে। শরীর ছিপছিপে, মেদহীন। উচ্চতা মাঝারি। পরনে ফেডেড ব্লু জিন্স, গায়ে সাদা রঙের টি-শার্ট যার বুকে বড় করে লেখা 'Stay Wild'। মাথায় একটা লাল রঙের বেসবল ক্যাপ উল্টো করে পরা। চোখে বিশাল আকৃতির সানগ্লাস, যা মুখের অর্ধেক ঢেকে রেখেছে। হাতে মাত্র একটা মাঝারি সাইজের ট্রলি ব্যাগ। কাঁধে একটা লেদার হ্যান্ডব্যাগ। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো তার হাঁটার ভঙ্গি। তিনি এমন দুলকি চালে হাঁটছেন যেন এটা কোনো এয়ারপোর্ট না, তিনি নিজের ড্রয়িংরুমে হাঁটাহাঁটি করছেন।
মা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। "তনিমা! বিশ্বাস হচ্ছে না তুই এসেছিস!" ভদ্রমহিলা সানগ্লাসটা কপালে তুলে মাকে জড়িয়ে ধরলেন। তার গলার স্বর বেশ চড়া এবং স্পষ্ট। "ওহ মাই গড! রাশেদা! ইউ লুক সো... সো... দেশি! একদম টিপিক্যাল বাঙালি গিন্নি হয়ে গেছিস তো!"
আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছি। 'টিপিক্যাল বাঙালি গিন্নি' কথাটা মায়ের জন্য খুব একটা কমপ্লিমেন্ট না। কিন্তু মা সেটা গায়ে মাখলেন না। খুশিতে তার চোখ ছলছল করছে। তনিমা আন্টি মাকে ছেড়ে এবার আমার দিকে তাকালেন। আমাকে আপাদমস্তক স্ক্যান করলেন। যেন কোনো শপিং মলে ম্যানিকুইন দেখছেন। "এইটা তোর ছেলে? তন্ময় না নাম?"
মা গর্বিত ভঙ্গিতে বললেন, "হ্যাঁ, তন্ময়। এখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস।" তনিমা আন্টি আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমি ভদ্রতা করে নিচু হয়ে সালাম করতে গেলাম। তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন। হ্যান্ডশেক করার জন্য। "হাই ইয়াং ম্যান! ডোন্ট টাচ মাই ফিট। আই ফিল ওল্ড। জাস্ট হ্যান্ডশেক।" আমি হাত মেলালাম। তার হাতে বেশ জোর। পুরুষদের মতো শক্ত হ্যান্ডশেক।
তিনি বললেন, "ইউ আর কোয়াইট টল। বাট ইউ নিড টু ওয়ার্ক আউট। শোল্ডার ড্রপ করে আছে।Posture is very important. বুঝলে?" তার বাংলা বলার ভঙ্গিটা অদ্ভুত। তিনি 'পসচার'কে বললেন 'পস্চা', আর 'বুঝলে' শব্দটা বললেন 'বুজলে'—যেন তার জিভে কোনো সমস্যা আছে অথবা বাংলা শব্দগুলো তার দাঁতের ফাঁকে আটকে যাচ্ছে। একে বলা হয় 'বাংলিশ'। গুলশান-বনানী এলাকার টিনএজারদের মধ্যে এই রোগ দেখা যায়, কিন্তু পঁয়তাল্লিশ বছরের একজন মহিলার মুখে এটা শুনে মনে হলো তিনি ইচ্ছে করেই শব্দগুলোকে চিবিয়ে চিবিয়ে হত্যা করছেন।
আমি বিনীত ভঙ্গিতে হাসলাম। "জি আন্টি। আসলে ভার্সিটির পড়ালেখার চাপে শোল্ডার ড্রপ করে গেছে। ওটা গ্র্যাভিটির দোষ, আমার না।" আন্টি ভুরু কুঁচকে তাকালেন। আমার হিউমার ধরতে পারলেন কি না বুঝলাম না। তিনি বললেন, "ওহ রিয়েলি? গ্র্যাভিটি? ইউ আর ফানি। আই লাইক ফানি বয়েজ।" তারপর তিনি মায়ের দিকে ফিরে বললেন, "লেটস গো। এই হিউমিডিটি আমাকে কিল করছে। মাই স্কিন ইজ বার্নিং। এসি গাড়ি এনেছিস তো?"
ড্রাইভার কুদ্দুস মিয়া পার্কিং লটে অপেক্ষা করছিল। আমরা গাড়ির কাছে গেলাম। কুদ্দুস মিয়া তনিমা আন্টিকে দেখে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দেখে মনে হচ্ছে সে ভাবছে, এই মহিলা কি সিনেমার নায়িকা নাকি যাত্রাপার্টি থেকে পালিয়ে আসা কেউ। সে দ্রুত নেমে এসে আন্টির হাত থেকে ট্রলি ব্যাগটা নিতে চাইল। আন্টি তাকে ধমক দিলেন। "নো নো, ডোন্ট টাচ। আমি নিজে পারব। সেলফ হেল্প ইজ বেস্ট হেল্প। বুঝলে?" কুদ্দুস মিয়া কিছু না বুঝে ভ্যাবলার মতো হাসল। "জি ম্যাডাম, বুঝছি। নিজে সাহায্য করাই ভালা।"
আমি সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসলাম। মা এবং তনিমা আন্টি পেছনে। গাড়ি স্টার্ট দিল। এয়ারপোর্টের গোল চত্বর পার হয়ে মূল রাস্তায় উঠতেই জ্যামের লেজ দেখা গেল। ঢাকা শহর তার নিজস্ব ভঙ্গিতে মেহমানকে স্বাগত জানাচ্ছে। পেছন থেকে তনিমা আন্টির গলা ভেসে এল।
"রাশেদা, তোর ঢাকা তো একদম হেল হয়ে গেছে। দিস ট্রাফিক! ওহ গড! মানুষ এখানে বাঁচে কীভাবে? ইটস সাফোকোটিং।" মা বললেন, "অভ্যাস হয়ে গেছে রে। এখন আর খারাপ লাগে না। তুই তো অনেকদিন পর এলি, তাই এডজাস্ট করতে কষ্ট হচ্ছে।" আন্টি বললেন, "একচুয়ালি আমি তো ক্রাউড একদম নিতে পারি না। আমার ওখানে, আই মিন সিডনিতে, লাইফ ইজ সো পিসফুল। কোনো নয়েজ নেই, ডাস্ট নেই। এখানে তো নিঃশ্বাস নিলেই মনে হয় লাংস ভর্তি কার্বন ডাই-অক্সাইড ঢুকছে।"
আমি জানালার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, "একচুয়ালি আন্টি, কার্বন ডাই-অক্সাইড আমাদের জাতীয় সম্পদ। আমরা এটা শেয়ার করতে পছন্দ করি।" মুখে বললাম, "আন্টি, এই ধুলোবালি হচ্ছে আমাদের ইমিউনিটি বুস্টার। এগুলো না থাকলে আমাদের শরীর খারাপ হয়ে যায়। আমরা ক্লিন এয়ারে বেশিক্ষণ থাকলে অসুস্থ বোধ করি।" আন্টি একটু সামনে ঝুঁকে এলেন। আমার সিটের পেছনে হাত রেখে বললেন, "ইউ আর ভেরি সারকাস্টিক। তোর বাবা জামিল ভাই তো খুব সিরিয়াস টাইপ ছিল।" মা বললেন, "না না, ও একদম আমার মতো। একটু বেশি কথা বলে, এই যা।"
গাড়ি ধীরগতিতে এগোচ্ছে। আন্টি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ক্রমাগত ধারাভাষ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তার বাংলা এবং ইংরেজির খিচুড়ি ভাষায় তিনি শহরের প্রতিটি ধূলিকণা এবং রিকশার চাকার সমালোচনা করছেন। "লুক এট দ্যাট বাস! ওটা কি বাস নাকি টিনের কৌটা? মাই গড! মানুষ বাদুড় হয়ে ঝুলছে! হাউ রিস্কি! আর এই রিকশাগুলো! এত স্লো ভেহিকেল মেইন রোডে কেন? এদেরকে তো মিউজিয়ামে রাখা উচিত।"
আমি বললাম, "আন্টি, রিকশা আমাদের হেরিটেজ। আর বাদুড় হয়ে ঝুলে থাকাটা আমাদের এক ধরণের ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ। এতে হাতের মাসল স্ট্রং হয়। আপনি যে জিম করেন, এরা বাসে ঝুলে সেই বেনিফিট পায়।" আন্টি এবার শব্দ করে হাসলেন। "হা হা হা! ইউ আর ক্রেজি! রাশেদা, তোর ছেলে তো একটা পিস!" আমি মনে মনে বললাম, "আপনিও কম পিস নন আন্টি। হাফ প্যান্ট পরা পিস।"
কুদ্দুস মিয়া আড়চোখে আমাকে দেখছে। সে হয়তো ভাবছে, এই বিদেশ ফেরত মহিলা এবং আমার কথোপকথন কোনো নাটকের অংশ। সে একবার আমাকে ফিসফিস করে বলল, "ভাইজান, ম্যাডাম কি বাংলা ভালো বুঝেন না?" আমি বললাম, "বোঝেন। কিন্তু উনার বাংলা শব্দগুলো এয়ারপোর্টে লাগেজে আটকা পড়েছে। এখন শুধু ইংরেজি রিলিজ হচ্ছে।" কুদ্দুস মিয়া দাঁত বের করে হাসল।
বনানী পার হওয়ার সময় আন্টি হঠাৎ সিরিয়াস হলেন। "শোন রাশেদা, আমি কিন্তু কোনো রিলেটিভের বাসায় উঠব না। ইউ নো মি, আই নিড মাই প্রাইভেসি। আমি আগেই অনলাইনে চেক করেছি, গুলশানে কয়েকটা ভালো হোটেল আছে। ওয়েস্টিন বা সেরকম কিছু। তুই আমাকে জাস্ট ড্রপ করে দিবি।" মা আমার দিকে তাকালেন। আমি আয়নায় মায়ের চোখ দেখতে পাচ্ছি। সেই চোখে একটা কৌতুক খেলা করছে। মা বললেন, "তোর হোটেলে ওঠার দরকার নেই। আমি বুকিং দিয়ে রেখেছি।" আন্টি অবাক হলেন। "তাই? কোথায় বুকিং দিয়েছিস? ফাইভ স্টার তো? আই হোপ সার্ভিস ভালো।"
মা খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, "জায়গাটার নাম 'সাউথ প্রশান্তি'। ধানমন্ডিতে। লেকের কাছেই। খুব ভালো পরিবেশ। সিকিউরিটি টাইট, আর খাবার দাবার একদম হোমমেড স্টাইল।"আন্টি ভুরু কুঁচকে নামটা আউড়ালেন। "সাউথ প্রশান্তি? নামটা তো শুনিনি। নতুন হয়েছে নাকি? বুটিক হোটেল?" মা বললেন, "হ্যাঁ, অনেকটা ওরকমই। এক্সক্লুসিভ। বেশি গেস্ট এলাউ করে না। খুব সিলেক্টেড মানুষ থাকে।"
"ওহ, দ্যাটস গ্রেট। আমার আবার নয়েজ সহ্য হয় না। রুমগুলো কেমন? স্পেশাস?" আমি কাশি দিয়ে হাসি চাপালাম। মা কত সুন্দর করে মিথ্যা বলছেন! সাউথ প্রশান্তি আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের নাম। মা সেটাকে ফাইভ স্টার হোটেল বানিয়ে ফেললেন। আমি বললাম, "আন্টি, রুমগুলো বেশ বড়। আর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, সেখানকার শেফ খুব স্পেশাল। তার হাতের রান্না খেলে আপনি সিডনির পিৎজা-বার্গার ভুলে যাবেন।" আন্টি উৎসাহিত হলেন। "রিয়েলি? আই লাভ অথেনটিক বেঙ্গলি ফুড। কতদিন ভালো সর্ষে ইলিশ খাই না! ওখানে তো ফ্রোজেন ফিশ খেয়ে খেয়ে জিভের টেস্ট নষ্ট হয়ে গেছে।"মা বললেন, "তাহলে তো কথাই নেই। সাউথ প্রশান্তিতে আজ স্পেশাল মেনু আছে। পোলাও আর খাসির মাংস।"
আন্টি ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে এক চুমুক খেলেন। তারপর বললেন, "ঠিক আছে। তোরা যখন বলছিস, ট্রাই করে দেখি। বাট যদি ভালো না লাগে, আমি কিন্তু কালই শিফট করব। আই এম ভেরি পার্টিকুলার এবাউট মাই কমফোর্ট।" আমি মনে মনে বললাম, "একবার ঢুকলে বের হওয়ার উপায় নেই আন্টি। সাউথ প্রশান্তি থেকে চেক আউট করা এত সহজ না। মায়ের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল নামক তালা সেখানে ঝোলানো আছে।"
মহাখালী ফ্লাইওভারের ওপর গাড়িটা মোটামুটি ভালো গতিতে চলল। আন্টি এবার তার আইফোন বের করে সেলফি তোলা শুরু করলেন। ঠোঁট বাঁকিয়ে, চোখ বড় বড় করে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুললেন। তারপর মাকে জোর করে পাশে এনে বললেন, "কাম অন, একটা সেলফি নেই। ক্যাপশন দেব—উইথ মাই চাইল্ডহুড বেস্টি ইন ঢাকা।" মা একটু আড়ষ্ট হয়ে পোজ দিলেন। ফার্মগেট পার হয়ে পান্থপথের সিগন্যালে যখন আমরা আটকা পড়লাম, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বলে উঠেছে। আন্টি জানালার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"শহরটা কেমন বদলে গেছে রে রাশেদা। আগে আমরা রিকশায় করে কত ঘুরতাম। এখন তো আকাশ দেখা যায় না। শুধু বিল্ডিং আর ফ্লাইওভার।" তার গলার স্বরে এবার আর সেই মেকি ভাবটা নেই। খাঁটি দীর্ঘশ্বাস। আমি বুঝলাম, তার এই ইংরেজি বুলি আর আধুনিকতার আড়ালে কোথাও একটা নস্টালজিক মন লুকিয়ে আছে। যে মনটা তার ফেলে আসা অতীতকে খুঁজছে। আমি বললাম, "আন্টি, শহর বদলায়, মানুষ বদলায়। কিন্তু স্মৃতি বদলায় না। ওগুলো ঠিকই থাকে।"
আন্টি আমার দিকে তাকালেন। সানগ্লাসটা খুলে ফেলেছেন। তার চোখে একটা বিষাদ মাখানো হাসি। "ইউ টক লাইক এ ফিলোসফার। তোর কি গার্লফ্রেন্ড আছে?" আমি বললাম, "ফিলোসফারদের গার্লফ্রেন্ড থাকে না আন্টি। তাদের থাকে থিওরি।"
"গুড আনসার। ভেরি স্মার্ট।"
ধানমন্ডি সাতাশ নম্বর পার হয়ে আমরা যখন ন'নম্বর রোডে ঢুকলাম, তখন রাত আটটা বাজে। সাউথ প্রশান্তি অ্যাপার্টমেন্টের সামনে গাড়ি থামল। গেটের ওপর বড় করে লেখা 'সাউথ প্রশান্তি'। আন্টি জানালা দিয়ে নামটা দেখলেন। "এই যে, এসে গেছি। বিল্ডিংটা তো নাইস। কিন্তু রিসিপশন কোথায়?" মা বললেন, "ভেতরে চল। সব ব্যবস্থা করা আছে।" আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। কুদ্দুস মিয়া ট্রলি নামিয়ে দিল। লিফটে ওঠার সময় আন্টি একটু সন্দেহজনক দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। "লবিটা তো বেশ ছোট। কোনো বেল বয় নেই?" আমি বললাম, "আন্টি, এখানে সেলফ সার্ভিস। মডার্ন কনসেপ্ট।" লিফট চারে থামল। মা ব্যাগ থেকে চাবি বের করলেন। আন্টি অবাক হয়ে বললেন, "তোর কাছে চাবি কেন? তুই কি এই হোটেলের ওনার?" মা হাসতে হাসতে দরজা খুললেন। "ভেতরে আয়, সব বলছি।"
আমরা ভেতরে ঢুকলাম। বাবা সোফায় বসে টিভি দেখছিলেন। মাকে এবং আন্টিকে দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তনিমা আন্টি ঘরটা ভালো করে দেখলেন। দেয়ালে আমার সেই ছোটবেলার ছবি, বাবার অয়েল পেইন্টিং, কর্নারে রাখা মানিপ্ল্যান্টের গাছ। তিনি ধীরে ধীরে আমার মায়ের দিকে ফিরলেন। তার চোখে বিস্ময়। "রাশেদা! ইউ চিটার! এটা তোর বাসা!"
মা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "তো কী হয়েছে? এটা কি ফাইভ স্টার হোটেলের চেয়ে কম? এখানে তুই যা চাইবি তাই পাবি। সাথে ফ্রি আড্ডা।" আন্টি কৃত্রিম রাগ দেখালেন। "আই কান্ট বিলিভ দিস! তুই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করলি? আমি হোটেলে থাকব বললাম না?" বাবা এগিয়ে এলেন। হাসিমুখে বললেন, "তনিমা, অনেকদিন পর দেখলাম। হোটেলে থাকবে মানে? আমরা থাকতে তুমি হোটেলে থাকবে, এটা তো হতে পারে না।" আন্টি বাবার দিকে তাকিয়ে একটু নরম হলেন। "জামিল ভাই! আপনিও এই ষড়যন্ত্রে ছিলেন?" বাবা বললেন, "আমি তো মাত্র জানলাম। তবে রাশেদা যা করেছে, ভালোই করেছে। এসো, বোসো।"
তনিমা আন্টি তার কাঁধের ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে ফেললেন। তারপর ধপাস করে বসে পড়লেন। "ওকে, আই গিভ আপ। তোদের এই ইমোশনাল টর্চার আমি নিতে পারব না। থাকছি। তবে শর্ত আছে, আমাকে এসি রুম দিতে হবে আর ব্রেকফাস্টে কফি মাস্ট।"মা আন্টির পাশে বসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। "সব পাবি। এখন ফ্রেশ হয়ে নে।" আমি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। আমার দায়িত্ব শেষ। অতিথি এখন ঘরে। নাটক শুরু হলো বলে। অসম বয়সী, অসম রুচি এবং অসম ভাষার এই মানুষটি আমাদের শান্ত পুকুরে কেমন ঢেউ তোলেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। দরজা বন্ধ করার আগে শুনলাম আন্টি বলছেন, "বাই দ্য ওয়ে রাশেদা, তোর ছেলের সেন্স অফ হিউমার কিন্তু ডেঞ্জারাস। ওকে একটু চোখে চোখে রাখিস।"
আমি মুচকি হাসলাম। সাউথ প্রশান্তিতে ঝড় আসছে। রঙিন ক্যাপ পরা ঝড়।
চলবে
ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসে থাকলে সময়টা কেমন যেন থমকে যায়। চারপাশে শত শত মানুষ, অথচ অদ্ভুত এক ধরনের নির্জনতা কাজ করে। এই নির্জনতা কানের নয়, মগজের। ঢাকা শহরের শুক্রবারগুলো এমনিতে একটু অলস হয়। সূর্য ওঠার পর থেকেই তার একটা 'আজকে ছুটি' ভাব থাকে। রোদ থাকে, কিন্তু সেই রোদে তেজ থাকে না, থাকে একধরণের ফ্যাকাশে হাহাকার। আমি লেকের ধারের বেঞ্চটায় বসে ভাবছিলাম—আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়ছি, অথচ নিজের জীবনের সম্পর্কের সমীকরণগুলোই ঠিকঠাক মেলাতে পারছি না।
আমার নাম তন্ময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস বা আইআর-এর সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। নামটা বেশ রোমান্টিক—তন্ময়। নামের অর্থ হচ্ছে কোনো কিছুতে গভীরভাবে মগ্ন থাকা। কিন্তু আমি খুব একটা মগ্ন থাকতে পারি না। আমার মনোযোগ চড়ুই পাখির মতো। এই ডালে কিছুক্ষণ, ওই ডালে কিছুক্ষণ। তবে আমার একটা বিশেষ গুণ আছে, আমি আড্ডা জমাতে পারি। একটা মরা আড্ডাকে জ্যান্ত করে তোলার জন্য আমার উপস্থিতি যথেষ্ট। দেখতে আমি আহামরি কিছু না। উচ্চতা পাঁচ ফুট আট, গায়ের রং শ্যামলা আর ফর্সার মাঝামাঝি একটা কনফিউজিং জায়গায় আটকে আছে। আয়নায় নিজেকে দেখলে মাঝে মাঝে মনে হয়, চেহারাটায় বিশেষ কিছু নেই, কিন্তু চোখদুটোয় একটা কৌতুক আছে। এই কৌতুকভাবটাই হয়তো মানুষকে টানে। মেয়েরা সাধারণত সুন্দর ছেলেদের প্রেমে পড়ে না, তারা প্রেমে পড়ে সেইসব ছেলেদের, যারা তাদের হাসাতে পারে, কিংবা যাদের কথায় কোনো লজিক নেই কিন্তু শুনতে ভালো লাগে। আমি গিটার বাজাতে পারি, প্রচুর সিনেমা দেখি আর ফিলোসফি ঝাড়তে পারি—এগুলোই আমার তুরুপের তাস।
বাসায় ফিরলাম বেলা বারোটার দিকে। আমাদের বাসা ধানমন্ডি ৯/এ-তে। অ্যাপার্টমেন্টের নাম 'সাউথ প্রশান্তি'। নামটা বেশ আইরনিক। ঢাকা শহরে 'প্রশান্তি' শব্দটা কেবল সাইনবোর্ডেই মানায়, বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। চারতলায় আমাদের ফ্ল্যাট। লিফটে ওঠার সময় নিজের ছায়া দেখলাম স্টিলের দরজায়। মনে হলো ছায়াটা আমার চেয়ে বেশি ক্লান্ত।
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই একটা ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা আর পোলাওয়ের গন্ধ একসঙ্গে নাকে লাগল। আমাদের বাসাটা বেশ গোছানো। বসার ঘরে ক্রিম কালারের সোফা, দেয়ালে বড় একটা অয়েল পেইন্টিং—গ্রামের দৃশ্য। বাবা কিনেছিলেন কোনো এক প্রদর্শনী থেকে। বাবা, জামিল চৌধুরী, একটা প্রাইভেট ব্যাংকের ম্যানেজার। বয়স তিপ্পান্নর কোঠায়, কিন্তু চুলে কলপ দেওয়ার কারণে তাকে পঁয়তাল্লিশের বেশি মনে হয় না। বাবা এখন সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। শুক্রবার তিনি কাগজের প্রতিটি লাইন পড়েন, এমনকি হারানো বিজ্ঞপ্তিও বাদ দেন না।
মা রান্নাঘরে। মা, রাশেদা চৌধুরী, তিনিও ব্যাংকার। সিনিয়র একাউন্টেন্ট। মা এবং বাবা দুজনেই প্রচুর টাকা আয় করেন, কিন্তু তাদের জীবনটা একটা রুটিনের ফ্রেমে বাঁধানো। সকাল আটটায় বের হওয়া, রাত আটটায় ফেরা। মাঝখানের সময়টুকু তারা কোথায় খরচ করেন, তা তারা নিজেরাও জানেন না। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, আধুনিক মানুষ হচ্ছে উন্নত মানের রোবট। তাদের ব্যাটারি আছে, চার্জ দিতে হয়, আর নির্দিষ্ট প্রোগ্রামিং অনুযায়ী চলতে হয়।
আমি সোফায় বাবার পাশে ধপাস করে বসে পড়লাম। বাবা কাগজ থেকে চোখ না সরিয়েই বললেন, "বাইরে খুব রোদ?" আমি বললাম, "রোদ না বাবা, ওটা রেডিয়েশন। মনে হচ্ছে মাইক্রোওভেনের ভেতর দিয়ে হেঁটে এলাম।" বাবা খবরের কাগজটা নামালেন। চশমার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। এই তাকানোটা আমি চিনি। তিনি এখন একটা সিরিয়াস কথা বলবেন অথবা কোনো উপদেশ দেবেন। "তন্ময়, তোর রেজাল্ট কবে দেবে?" আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, "দিয়ে দেবে। ভার্সিটির রেজাল্ট তো আর ট্রেনের শিডিউল না যে ঠিক সময়ে আসবে। হুট করে চলে আসবে একদিন।"
বাবা আবার কাগজে মন দিলেন। তিনি সম্ভবত আমার উত্তরে সন্তুষ্ট নন, কিন্তু শুক্রবার দুপুরে মেজাজ খারাপ করতে চাইছেন না। ভেতর থেকে মৃন্ময় বের হলো। আমার ছোট ভাই। ও এবার ইন্টারে পড়ছে। কানে হেডফোন, হাতে ফোন। ও পৃথিবীতে থেকেও পৃথিবীতে নেই। ওর জগতটা ভার্চুয়াল। আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে বাথরুমে ঢুকে গেল। এই জেনারেশনটা অদ্ভুত। এদের ইমোশনগুলো সব টাচস্ক্রিনে বন্দি।
দুপুরের খাওয়ার আয়োজন এলাহি। মা শুক্রবারের রান্নাটা নিজের হাতে করেন। পোলাও, খাসির মাংস, চিংড়ি মাছের মালাইকারি আর সালাদ। খাবার টেবিলে বসে মনে হলো, এই মুহূর্তটাই বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের সর্বোচ্চ সুখ। এসি চলছে, ফ্যানের বাতাস, আর সামনে ধোঁয়া ওঠা খাবার। মা খেতে খেতে বললেন, "তন্ময়, তোর আজ বিকেলে কোনো কাজ আছে?"
মায়ের এই প্রশ্নটা বিপদসংকেত। 'কাজ আছে' বললে মা জানতে চাইবেন কী কাজ। 'কাজ নেই' বললে তিনি নিজের কোনো কাজ চাপিয়ে দেবেন। আমি সাবধানে বললাম, "একটু বের হওয়ার কথা আছে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা।"
মা বললেন, "আড্ডা তো রোজই দিস। আজ আড্ডাটা বাদ দে।" আমি মাংসের হাড্ডি চিবুতে চিবুতে বললাম, "কেন? বিশেষ কোনো ঘটনা?" মা একটু নড়েচড়ে বসলেন। মুখে একটা মিষ্টি হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলেন। মা যখন কোনো কঠিন কাজ আমাকে দিয়ে করাতে চান, তখন এই হাসিটা দেন। "আমার এক বান্ধবী আজ দেশে আসছে। তনিমা। তনিমা হামিদ।" আমি বললাম, "ও আচ্ছা। ভালো তো।"
"ওকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করতে হবে।"
আমি খাওয়া থামিয়ে দিলাম। শুক্রবার বিকেলবেলা এয়ারপোর্ট যাওয়া আর স্বেচ্ছায় ফাঁসির দড়িতে মাথা দেওয়া একই ব্যাপার। এয়ারপোর্ট রোডের ট্রাফিক জ্যাম হলো পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য। মানুষ সেখানে গাড়িতে বসে বসে বুড়ো হয়ে যায়। আমি বললাম, "ড্রাইভারকে পাঠিয়ে দাও। আমি গিয়ে কী করব?" মা বললেন, "ড্রাইভারের আজ ছুটি। আর তনিমা একা আসছে না, সাথে লাগেজ থাকবে। তাছাড়া ও আমার ইউনিভার্সিটির ক্লোজ ফ্রেন্ড। এতদিন পর আসছে, কেউ একজন রিসিভ করতে না গেলে কেমন দেখায়? আমি তো একা যেতে পারব না।"
আমি বাবার দিকে তাকালাম। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে চিংড়ি মাছের খোসা ছাড়াচ্ছেন। আমি বললাম, "মা, প্লিজ। আজ রাস্তায় যা জ্যাম থাকবে! তাছাড়া আমি তোমার বান্ধবীকে চিনিও না। গিয়ে কী বলব? 'হ্যালো আন্টি, ওয়েলকাম টু হেল'?" মা চোখ বড় বড় করে তাকালেন। "খবরদার তন্ময়! ফাজলামি করবি না। তুই আমার সাথে যাবি।”
"তুমি যাচ্ছ?"
"হ্যাঁ, আমি যাচ্ছি। তুই আমাকে নিয়ে যাবি, তনিমাকে রিসিভ করবি, তারপর ওকে হোটেলে ড্রপ করে দিয়ে আসব। ব্যাস, সিম্পল।"
সিম্পল না, মোটেও সিম্পল না। এর মধ্যে অনেকগুলো 'কিন্তু' আছে। প্রথমত, এয়ারপোর্টের ভিড়। দ্বিতীয়ত, অচেনা এক আন্টির সাথে গাড়িতে বসে থাকা। তৃতীয়ত, ছুটির বিকেলটা মাটি হওয়া। কিন্তু আমি জানি, মায়ের এই আদেশের ওপর আপিল চলে না। সুপ্রিম কোর্টের রায় হয়ে গেছে।
খাওয়া শেষ করে আমি আমার ঘরে ঢুকলাম। ঘরটা আমার নিজের মতো করে সাজানো। দেয়ালে কিছু মুভি পোস্টার—'গডফাদার', 'পাল্প ফিকশন', আর হুমায়ূন আহমেদের 'আগুনের পরশমণি'। জানালার পাশে আমার গিটারটা রাখা। খাটের ওপর ছড়ানো ছিটানো বই। আমি বিছানায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ফ্যানটা ঘুরছে। বনবন করে ঘুরছে। আমাদের জীবনটাও এই ফ্যানের মতো। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে শুধু ঘুরে মরছি। গতি আছে, কিন্তু গন্তব্য নেই।
তনিমা হামিদ। নামটা কয়েকবার আউড়ালাম। কেমন দেখতে হবে ভদ্রমহিলা? নিশ্চয়ই মোটাসোটা, চোখে ভারী চশমা, আর গলায় প্রচুর স্বর্ণের গয়না। প্রবাসী বাঙালি মহিলারা দেশে ফিরলে নিজেদের এক একটা গয়নার দোকান বানিয়ে ফেলেন। তাদের হাতে-গলায় এত স্বর্ণ থাকে যে মনে হয় তারা হাঁটার সময় ঝনঝন শব্দ হবে। আর পান চিবুতে চিবুতে বলবেন, "উফ, ঢাকা শহরটা আর থাকার জায়গা নেই, এত ডাস্ট!আমাদের ওখানের বাতাস কত পিওর!" ভাবতেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এই ধরনের মেকি মানুষদের আমি সহ্য করতে পারি না। এরা শেকড় ভুলে গিয়ে এখন প্লাস্টিকের ফুল হয়ে গেছে।
বিকেল সাড়ে চারটা। মা রেডি হয়ে আমার দরজায় নক করলেন। "কিরে তন্ময়, এখনো শুয়ে আছিস? ওঠ। দেরি হয়ে যাবে তো।" আমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠলাম। আলমারি খুলে একটা জিন্স আর কালো টি-শার্ট বের করলাম। টি-শার্টের বুকে লেখা—'I pretend to work, they pretend to pay.' লেখাটা কর্পোরেট স্লেভদের জন্য প্রযোজ্য, আমার জন্য না। তবুও পরলাম। চুলটা আঁচড়ে নিলাম। খুব বেশি পরিপাটি হওয়ার দরকার নেই। এয়ারপোর্টে যাচ্ছি, কোনো বিয়েবাড়িতে না।
ড্রইংরুমে গিয়ে দেখি মা একদম টিপটপ। হালকা নীল রঙের একটা জামদানি শাড়ি পরেছেন। সাথে ম্যাচিং করা ব্যাগ। মাকে বেশ সুন্দর লাগছে। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সেও মা নিজেকে খুব সুন্দর মেইনটেইন করেছেন। তার মুখে একটা চাপা উত্তেজনা। বান্ধবীর সাথে দেখা হবে, তাও বহু বছর পর। মেয়েদের বন্ধুত্বগুলো অদ্ভুত হয়। পনেরো বছর দেখা না হলেও দেখা হওয়ার পর মনে হয় গতকালই শেষ দেখা হয়েছিল।
আমি আর মা নিচে নামলাম। গ্যারেজের সামনে দাঁড়ালাম। দারোয়ান চাচা গেটে টুল পেতে বসে ঝিমুচ্ছে। বিকেলের রোদটা এখন নরম হয়ে এসেছে। আকাশে কমলা রঙের আভা। ধানমন্ডির এই সময়টা আমার খুব প্রিয়। সবকিছুর মধ্যে একটা ঘরে ফেরার তাড়া থাকে, আবার একটা অলসতাও থাকে। আমাদের সাদা রঙের পুরনো মডেলের করোলার ড্রাইভার কুদ্দুস মিয়া জানালা দিয়ে মুখ বের করে হাসল। পান খাওয়া দাঁত। "চলেন ভাইজান"
পেছনের দরজা খুলে মাকে আগে উঠতে দিলাম। তারপর আমি উঠলাম। এসির ঠান্ডা বাতাস আর লেবু ফ্লেভারের এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ। গন্ধটা একটু উগ্র। আমার নাকে বাড়ি মারল। গাড়ি চলতে শুরু করল। ধানমন্ডি থেকে এয়ারপোর্ট। লম্বা জার্নি। মা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। হয়তো অতীতে ফিরে গেছেন। ক্যাম্পাসের দিনগুলোতে। তনিমা হামিদের সাথে কাটানো সময়গুলোতে।
আমার কেন জানি মনে হলো, আজকের এই যাত্রাটা সাধারণ কোনো যাত্রা নয়। আমি জানি না কেন মনে হলো। কিছু কিছু অনুভূতির কোনো ব্যাখ্যা থাকে না। লজিক দিয়ে সব মাপা যায় না। মনের ভেতর একটা খটকা, একটা অস্থিরতা। কুদ্দুস মিয়া আয়নায় বারবার তাকাচ্ছে। রেডিওতে গান বাজছে—'পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে...'। আসলেই কি পৃথিবী ছোট? নাকি আমরা আমাদের চারপাশের দেয়ালগুলো বড় করে ফেলেছি বলে পৃথিবীটাকে ছোট মনে হয়?
গাড়ি সাতমসজিদ রোড ধরে এগোচ্ছে। জ্যাম শুরু হয়ে গেছে। লাল বাতির সারি। আমি সিটে গা এলিয়ে দিলাম। অসম এক সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা।
২
এয়ারপোর্টের ক্যানোপির নিচে দাঁড়িয়ে থাকাটা এক ধরনের শাস্তি। বিনা অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মতো আমি আর মা দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে গিজগিজ করছে মানুষ। কারো হাতে ফুলের তোড়া, কারো চোখেমুখে উৎকণ্ঠা, আবার কেউবা অকারণে উত্তেজিত হয়ে লাফালাফি করছে। ঢাকা শহরের মানুষের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, তারা ভিড় দেখলে আরো বেশি ভিড় বাড়াতে পছন্দ করে। ফাঁকা জায়গায় তাদের দম বন্ধ হয়ে আসে।
মা বারবার ঘড়ি দেখছেন। ফ্লাইট ল্যান্ড করেছে পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে। ইমিগ্রেশন আর লাগেজ বেল্টের গোলকধাঁধা পার হয়ে বের হতে সময় লাগে, এটা মা জানেন। তাও তার অস্থিরতা কমছে না। তিনি প্রতি পাঁচ সেকেন্ড পর পর পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁকি দিচ্ছেন, যেন এতে করে ভেতরের যাত্রীরা দ্রুত বের হয়ে আসবে।
আমি বললাম, "মা, তুমি কি অলিম্পিকের হাই জাম্প প্র্যাকটিস করছ?" মা বিরক্ত হয়ে তাকালেন। "চুপ কর তো। কত বছর পর দেখা হবে, তুই বুঝবি না। আমার হার্টবিট বেড়ে গেছে।"
"হার্টবিট বাড়লে কার্ডিওলজিস্ট দেখানো উচিত। এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই।" মা আমার কথায় কান দিলেন না। হঠাৎ তিনি চিৎকার করে উঠলেন, "ওই যে! ওই তো তনিমা!"আমি তাকালাম। এবং তাকিয়ে একটা ছোটখাটো ধাক্কা খেলাম। আমার কল্পনার তনিমা আন্টির সাথে বাস্তব তনিমা আন্টির কোনো মিল নেই। আমি ভেবেছিলাম মোটাসোটা, শাড়ি পরা, পানের রসে ঠোঁট লাল করা কোনো এক মহিলা বের হবেন। যার পেছনে কুলি ধরাধরি করে তিন-চারটা বিশাল সুটকেস নিয়ে আসবে। কিন্তু গেট দিয়ে যিনি বের হলেন, তাকে দেখে মনে হলো তিনি ভুল করে বাংলাদেশে চলে এসেছেন। তার গন্তব্য হয়তো ছিল মিয়ামি বিচ বা হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ।
ভদ্রমহিলার বয়স মায়ের বয়সীই হবে—চুয়াল্লিশ বা পঁয়তাল্লিশ। কিন্তু তাকে দেখে বড়জোর বত্রিশ-তেত্রিশ মনে হচ্ছে। শরীর ছিপছিপে, মেদহীন। উচ্চতা মাঝারি। পরনে ফেডেড ব্লু জিন্স, গায়ে সাদা রঙের টি-শার্ট যার বুকে বড় করে লেখা 'Stay Wild'। মাথায় একটা লাল রঙের বেসবল ক্যাপ উল্টো করে পরা। চোখে বিশাল আকৃতির সানগ্লাস, যা মুখের অর্ধেক ঢেকে রেখেছে। হাতে মাত্র একটা মাঝারি সাইজের ট্রলি ব্যাগ। কাঁধে একটা লেদার হ্যান্ডব্যাগ। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো তার হাঁটার ভঙ্গি। তিনি এমন দুলকি চালে হাঁটছেন যেন এটা কোনো এয়ারপোর্ট না, তিনি নিজের ড্রয়িংরুমে হাঁটাহাঁটি করছেন।
মা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। "তনিমা! বিশ্বাস হচ্ছে না তুই এসেছিস!" ভদ্রমহিলা সানগ্লাসটা কপালে তুলে মাকে জড়িয়ে ধরলেন। তার গলার স্বর বেশ চড়া এবং স্পষ্ট। "ওহ মাই গড! রাশেদা! ইউ লুক সো... সো... দেশি! একদম টিপিক্যাল বাঙালি গিন্নি হয়ে গেছিস তো!"
আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছি। 'টিপিক্যাল বাঙালি গিন্নি' কথাটা মায়ের জন্য খুব একটা কমপ্লিমেন্ট না। কিন্তু মা সেটা গায়ে মাখলেন না। খুশিতে তার চোখ ছলছল করছে। তনিমা আন্টি মাকে ছেড়ে এবার আমার দিকে তাকালেন। আমাকে আপাদমস্তক স্ক্যান করলেন। যেন কোনো শপিং মলে ম্যানিকুইন দেখছেন। "এইটা তোর ছেলে? তন্ময় না নাম?"
মা গর্বিত ভঙ্গিতে বললেন, "হ্যাঁ, তন্ময়। এখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস।" তনিমা আন্টি আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমি ভদ্রতা করে নিচু হয়ে সালাম করতে গেলাম। তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন। হ্যান্ডশেক করার জন্য। "হাই ইয়াং ম্যান! ডোন্ট টাচ মাই ফিট। আই ফিল ওল্ড। জাস্ট হ্যান্ডশেক।" আমি হাত মেলালাম। তার হাতে বেশ জোর। পুরুষদের মতো শক্ত হ্যান্ডশেক।
তিনি বললেন, "ইউ আর কোয়াইট টল। বাট ইউ নিড টু ওয়ার্ক আউট। শোল্ডার ড্রপ করে আছে।Posture is very important. বুঝলে?" তার বাংলা বলার ভঙ্গিটা অদ্ভুত। তিনি 'পসচার'কে বললেন 'পস্চা', আর 'বুঝলে' শব্দটা বললেন 'বুজলে'—যেন তার জিভে কোনো সমস্যা আছে অথবা বাংলা শব্দগুলো তার দাঁতের ফাঁকে আটকে যাচ্ছে। একে বলা হয় 'বাংলিশ'। গুলশান-বনানী এলাকার টিনএজারদের মধ্যে এই রোগ দেখা যায়, কিন্তু পঁয়তাল্লিশ বছরের একজন মহিলার মুখে এটা শুনে মনে হলো তিনি ইচ্ছে করেই শব্দগুলোকে চিবিয়ে চিবিয়ে হত্যা করছেন।
আমি বিনীত ভঙ্গিতে হাসলাম। "জি আন্টি। আসলে ভার্সিটির পড়ালেখার চাপে শোল্ডার ড্রপ করে গেছে। ওটা গ্র্যাভিটির দোষ, আমার না।" আন্টি ভুরু কুঁচকে তাকালেন। আমার হিউমার ধরতে পারলেন কি না বুঝলাম না। তিনি বললেন, "ওহ রিয়েলি? গ্র্যাভিটি? ইউ আর ফানি। আই লাইক ফানি বয়েজ।" তারপর তিনি মায়ের দিকে ফিরে বললেন, "লেটস গো। এই হিউমিডিটি আমাকে কিল করছে। মাই স্কিন ইজ বার্নিং। এসি গাড়ি এনেছিস তো?"
ড্রাইভার কুদ্দুস মিয়া পার্কিং লটে অপেক্ষা করছিল। আমরা গাড়ির কাছে গেলাম। কুদ্দুস মিয়া তনিমা আন্টিকে দেখে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দেখে মনে হচ্ছে সে ভাবছে, এই মহিলা কি সিনেমার নায়িকা নাকি যাত্রাপার্টি থেকে পালিয়ে আসা কেউ। সে দ্রুত নেমে এসে আন্টির হাত থেকে ট্রলি ব্যাগটা নিতে চাইল। আন্টি তাকে ধমক দিলেন। "নো নো, ডোন্ট টাচ। আমি নিজে পারব। সেলফ হেল্প ইজ বেস্ট হেল্প। বুঝলে?" কুদ্দুস মিয়া কিছু না বুঝে ভ্যাবলার মতো হাসল। "জি ম্যাডাম, বুঝছি। নিজে সাহায্য করাই ভালা।"
আমি সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে বসলাম। মা এবং তনিমা আন্টি পেছনে। গাড়ি স্টার্ট দিল। এয়ারপোর্টের গোল চত্বর পার হয়ে মূল রাস্তায় উঠতেই জ্যামের লেজ দেখা গেল। ঢাকা শহর তার নিজস্ব ভঙ্গিতে মেহমানকে স্বাগত জানাচ্ছে। পেছন থেকে তনিমা আন্টির গলা ভেসে এল।
"রাশেদা, তোর ঢাকা তো একদম হেল হয়ে গেছে। দিস ট্রাফিক! ওহ গড! মানুষ এখানে বাঁচে কীভাবে? ইটস সাফোকোটিং।" মা বললেন, "অভ্যাস হয়ে গেছে রে। এখন আর খারাপ লাগে না। তুই তো অনেকদিন পর এলি, তাই এডজাস্ট করতে কষ্ট হচ্ছে।" আন্টি বললেন, "একচুয়ালি আমি তো ক্রাউড একদম নিতে পারি না। আমার ওখানে, আই মিন সিডনিতে, লাইফ ইজ সো পিসফুল। কোনো নয়েজ নেই, ডাস্ট নেই। এখানে তো নিঃশ্বাস নিলেই মনে হয় লাংস ভর্তি কার্বন ডাই-অক্সাইড ঢুকছে।"
আমি জানালার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, "একচুয়ালি আন্টি, কার্বন ডাই-অক্সাইড আমাদের জাতীয় সম্পদ। আমরা এটা শেয়ার করতে পছন্দ করি।" মুখে বললাম, "আন্টি, এই ধুলোবালি হচ্ছে আমাদের ইমিউনিটি বুস্টার। এগুলো না থাকলে আমাদের শরীর খারাপ হয়ে যায়। আমরা ক্লিন এয়ারে বেশিক্ষণ থাকলে অসুস্থ বোধ করি।" আন্টি একটু সামনে ঝুঁকে এলেন। আমার সিটের পেছনে হাত রেখে বললেন, "ইউ আর ভেরি সারকাস্টিক। তোর বাবা জামিল ভাই তো খুব সিরিয়াস টাইপ ছিল।" মা বললেন, "না না, ও একদম আমার মতো। একটু বেশি কথা বলে, এই যা।"
গাড়ি ধীরগতিতে এগোচ্ছে। আন্টি জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ক্রমাগত ধারাভাষ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তার বাংলা এবং ইংরেজির খিচুড়ি ভাষায় তিনি শহরের প্রতিটি ধূলিকণা এবং রিকশার চাকার সমালোচনা করছেন। "লুক এট দ্যাট বাস! ওটা কি বাস নাকি টিনের কৌটা? মাই গড! মানুষ বাদুড় হয়ে ঝুলছে! হাউ রিস্কি! আর এই রিকশাগুলো! এত স্লো ভেহিকেল মেইন রোডে কেন? এদেরকে তো মিউজিয়ামে রাখা উচিত।"
আমি বললাম, "আন্টি, রিকশা আমাদের হেরিটেজ। আর বাদুড় হয়ে ঝুলে থাকাটা আমাদের এক ধরণের ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ। এতে হাতের মাসল স্ট্রং হয়। আপনি যে জিম করেন, এরা বাসে ঝুলে সেই বেনিফিট পায়।" আন্টি এবার শব্দ করে হাসলেন। "হা হা হা! ইউ আর ক্রেজি! রাশেদা, তোর ছেলে তো একটা পিস!" আমি মনে মনে বললাম, "আপনিও কম পিস নন আন্টি। হাফ প্যান্ট পরা পিস।"
কুদ্দুস মিয়া আড়চোখে আমাকে দেখছে। সে হয়তো ভাবছে, এই বিদেশ ফেরত মহিলা এবং আমার কথোপকথন কোনো নাটকের অংশ। সে একবার আমাকে ফিসফিস করে বলল, "ভাইজান, ম্যাডাম কি বাংলা ভালো বুঝেন না?" আমি বললাম, "বোঝেন। কিন্তু উনার বাংলা শব্দগুলো এয়ারপোর্টে লাগেজে আটকা পড়েছে। এখন শুধু ইংরেজি রিলিজ হচ্ছে।" কুদ্দুস মিয়া দাঁত বের করে হাসল।
বনানী পার হওয়ার সময় আন্টি হঠাৎ সিরিয়াস হলেন। "শোন রাশেদা, আমি কিন্তু কোনো রিলেটিভের বাসায় উঠব না। ইউ নো মি, আই নিড মাই প্রাইভেসি। আমি আগেই অনলাইনে চেক করেছি, গুলশানে কয়েকটা ভালো হোটেল আছে। ওয়েস্টিন বা সেরকম কিছু। তুই আমাকে জাস্ট ড্রপ করে দিবি।" মা আমার দিকে তাকালেন। আমি আয়নায় মায়ের চোখ দেখতে পাচ্ছি। সেই চোখে একটা কৌতুক খেলা করছে। মা বললেন, "তোর হোটেলে ওঠার দরকার নেই। আমি বুকিং দিয়ে রেখেছি।" আন্টি অবাক হলেন। "তাই? কোথায় বুকিং দিয়েছিস? ফাইভ স্টার তো? আই হোপ সার্ভিস ভালো।"
মা খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, "জায়গাটার নাম 'সাউথ প্রশান্তি'। ধানমন্ডিতে। লেকের কাছেই। খুব ভালো পরিবেশ। সিকিউরিটি টাইট, আর খাবার দাবার একদম হোমমেড স্টাইল।"আন্টি ভুরু কুঁচকে নামটা আউড়ালেন। "সাউথ প্রশান্তি? নামটা তো শুনিনি। নতুন হয়েছে নাকি? বুটিক হোটেল?" মা বললেন, "হ্যাঁ, অনেকটা ওরকমই। এক্সক্লুসিভ। বেশি গেস্ট এলাউ করে না। খুব সিলেক্টেড মানুষ থাকে।"
"ওহ, দ্যাটস গ্রেট। আমার আবার নয়েজ সহ্য হয় না। রুমগুলো কেমন? স্পেশাস?" আমি কাশি দিয়ে হাসি চাপালাম। মা কত সুন্দর করে মিথ্যা বলছেন! সাউথ প্রশান্তি আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের নাম। মা সেটাকে ফাইভ স্টার হোটেল বানিয়ে ফেললেন। আমি বললাম, "আন্টি, রুমগুলো বেশ বড়। আর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, সেখানকার শেফ খুব স্পেশাল। তার হাতের রান্না খেলে আপনি সিডনির পিৎজা-বার্গার ভুলে যাবেন।" আন্টি উৎসাহিত হলেন। "রিয়েলি? আই লাভ অথেনটিক বেঙ্গলি ফুড। কতদিন ভালো সর্ষে ইলিশ খাই না! ওখানে তো ফ্রোজেন ফিশ খেয়ে খেয়ে জিভের টেস্ট নষ্ট হয়ে গেছে।"মা বললেন, "তাহলে তো কথাই নেই। সাউথ প্রশান্তিতে আজ স্পেশাল মেনু আছে। পোলাও আর খাসির মাংস।"
আন্টি ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে এক চুমুক খেলেন। তারপর বললেন, "ঠিক আছে। তোরা যখন বলছিস, ট্রাই করে দেখি। বাট যদি ভালো না লাগে, আমি কিন্তু কালই শিফট করব। আই এম ভেরি পার্টিকুলার এবাউট মাই কমফোর্ট।" আমি মনে মনে বললাম, "একবার ঢুকলে বের হওয়ার উপায় নেই আন্টি। সাউথ প্রশান্তি থেকে চেক আউট করা এত সহজ না। মায়ের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল নামক তালা সেখানে ঝোলানো আছে।"
মহাখালী ফ্লাইওভারের ওপর গাড়িটা মোটামুটি ভালো গতিতে চলল। আন্টি এবার তার আইফোন বের করে সেলফি তোলা শুরু করলেন। ঠোঁট বাঁকিয়ে, চোখ বড় বড় করে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুললেন। তারপর মাকে জোর করে পাশে এনে বললেন, "কাম অন, একটা সেলফি নেই। ক্যাপশন দেব—উইথ মাই চাইল্ডহুড বেস্টি ইন ঢাকা।" মা একটু আড়ষ্ট হয়ে পোজ দিলেন। ফার্মগেট পার হয়ে পান্থপথের সিগন্যালে যখন আমরা আটকা পড়লাম, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বলে উঠেছে। আন্টি জানালার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"শহরটা কেমন বদলে গেছে রে রাশেদা। আগে আমরা রিকশায় করে কত ঘুরতাম। এখন তো আকাশ দেখা যায় না। শুধু বিল্ডিং আর ফ্লাইওভার।" তার গলার স্বরে এবার আর সেই মেকি ভাবটা নেই। খাঁটি দীর্ঘশ্বাস। আমি বুঝলাম, তার এই ইংরেজি বুলি আর আধুনিকতার আড়ালে কোথাও একটা নস্টালজিক মন লুকিয়ে আছে। যে মনটা তার ফেলে আসা অতীতকে খুঁজছে। আমি বললাম, "আন্টি, শহর বদলায়, মানুষ বদলায়। কিন্তু স্মৃতি বদলায় না। ওগুলো ঠিকই থাকে।"
আন্টি আমার দিকে তাকালেন। সানগ্লাসটা খুলে ফেলেছেন। তার চোখে একটা বিষাদ মাখানো হাসি। "ইউ টক লাইক এ ফিলোসফার। তোর কি গার্লফ্রেন্ড আছে?" আমি বললাম, "ফিলোসফারদের গার্লফ্রেন্ড থাকে না আন্টি। তাদের থাকে থিওরি।"
"গুড আনসার। ভেরি স্মার্ট।"
ধানমন্ডি সাতাশ নম্বর পার হয়ে আমরা যখন ন'নম্বর রোডে ঢুকলাম, তখন রাত আটটা বাজে। সাউথ প্রশান্তি অ্যাপার্টমেন্টের সামনে গাড়ি থামল। গেটের ওপর বড় করে লেখা 'সাউথ প্রশান্তি'। আন্টি জানালা দিয়ে নামটা দেখলেন। "এই যে, এসে গেছি। বিল্ডিংটা তো নাইস। কিন্তু রিসিপশন কোথায়?" মা বললেন, "ভেতরে চল। সব ব্যবস্থা করা আছে।" আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। কুদ্দুস মিয়া ট্রলি নামিয়ে দিল। লিফটে ওঠার সময় আন্টি একটু সন্দেহজনক দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। "লবিটা তো বেশ ছোট। কোনো বেল বয় নেই?" আমি বললাম, "আন্টি, এখানে সেলফ সার্ভিস। মডার্ন কনসেপ্ট।" লিফট চারে থামল। মা ব্যাগ থেকে চাবি বের করলেন। আন্টি অবাক হয়ে বললেন, "তোর কাছে চাবি কেন? তুই কি এই হোটেলের ওনার?" মা হাসতে হাসতে দরজা খুললেন। "ভেতরে আয়, সব বলছি।"
আমরা ভেতরে ঢুকলাম। বাবা সোফায় বসে টিভি দেখছিলেন। মাকে এবং আন্টিকে দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তনিমা আন্টি ঘরটা ভালো করে দেখলেন। দেয়ালে আমার সেই ছোটবেলার ছবি, বাবার অয়েল পেইন্টিং, কর্নারে রাখা মানিপ্ল্যান্টের গাছ। তিনি ধীরে ধীরে আমার মায়ের দিকে ফিরলেন। তার চোখে বিস্ময়। "রাশেদা! ইউ চিটার! এটা তোর বাসা!"
মা খিলখিল করে হেসে উঠলেন। "তো কী হয়েছে? এটা কি ফাইভ স্টার হোটেলের চেয়ে কম? এখানে তুই যা চাইবি তাই পাবি। সাথে ফ্রি আড্ডা।" আন্টি কৃত্রিম রাগ দেখালেন। "আই কান্ট বিলিভ দিস! তুই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করলি? আমি হোটেলে থাকব বললাম না?" বাবা এগিয়ে এলেন। হাসিমুখে বললেন, "তনিমা, অনেকদিন পর দেখলাম। হোটেলে থাকবে মানে? আমরা থাকতে তুমি হোটেলে থাকবে, এটা তো হতে পারে না।" আন্টি বাবার দিকে তাকিয়ে একটু নরম হলেন। "জামিল ভাই! আপনিও এই ষড়যন্ত্রে ছিলেন?" বাবা বললেন, "আমি তো মাত্র জানলাম। তবে রাশেদা যা করেছে, ভালোই করেছে। এসো, বোসো।"
তনিমা আন্টি তার কাঁধের ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে ফেললেন। তারপর ধপাস করে বসে পড়লেন। "ওকে, আই গিভ আপ। তোদের এই ইমোশনাল টর্চার আমি নিতে পারব না। থাকছি। তবে শর্ত আছে, আমাকে এসি রুম দিতে হবে আর ব্রেকফাস্টে কফি মাস্ট।"মা আন্টির পাশে বসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। "সব পাবি। এখন ফ্রেশ হয়ে নে।" আমি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। আমার দায়িত্ব শেষ। অতিথি এখন ঘরে। নাটক শুরু হলো বলে। অসম বয়সী, অসম রুচি এবং অসম ভাষার এই মানুষটি আমাদের শান্ত পুকুরে কেমন ঢেউ তোলেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। দরজা বন্ধ করার আগে শুনলাম আন্টি বলছেন, "বাই দ্য ওয়ে রাশেদা, তোর ছেলের সেন্স অফ হিউমার কিন্তু ডেঞ্জারাস। ওকে একটু চোখে চোখে রাখিস।"
আমি মুচকি হাসলাম। সাউথ প্রশান্তিতে ঝড় আসছে। রঙিন ক্যাপ পরা ঝড়।
চলবে


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)

![[Image: pixnova-4661df5607745f55637db9352b6d99ef.jpg]](https://i.ibb.co/398L4fPq/pixnova-4661df5607745f55637db9352b6d99ef.jpg)
![[Image: pixnova-6c549bd4dd02bbe64d54f79d9e4ad5cf.jpg]](https://i.ibb.co/vvkJD9Gc/pixnova-6c549bd4dd02bbe64d54f79d9e4ad5cf.jpg)
![[Image: pixnova-395bf41eaa7d095c6baff00c83ad6470.jpg]](https://i.ibb.co/rfNKsFhn/pixnova-395bf41eaa7d095c6baff00c83ad6470.jpg)