Yesterday, 09:51 AM
ঢাকার উত্তরার একটি পুরনো ছয় তলা বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায়, একটি সাধারণ দুই বেডরুমের ফ্ল্যাটে থাকত রাফি আর নুসরাত। ফ্ল্যাটটা খুব বড় না—একটা ছোট ড্রয়িং রুম, একটি ডাইনিং স্পেস, দুটো বেডরুম, আর একটা রান্নাঘর। দেয়ালের রং একসময় সাদা ছিল, এখন হালকা ময়লা হয়ে গেছে। জানালার পর্দা হালকা নীল, বাতাসে দুলছে। বাইরে উত্তরার রাস্তায় গাড়ির হর্ন আর রিকশাওয়ালার ডাক শোনা যায়।
রাফি, বয়স বত্রিশ। চেহারা সাধারণ, চশমা পরে, শরীর একটু পাতলা। বনানীর একটি নামকরা সফটওয়্যার কোম্পানিতে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সকাল সাড়ে আটটার দিকে ল্যাপটপ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে যায়, সন্ধ্যা সাতটা-আটটার আগে ফেরে না। অফিসের ডেডলাইন, ক্লায়েন্ট কল, প্রজেক্ট প্রেশার—সবকিছু সে একাই সামলায়। বাসায় এসে ক্লান্ত শরীর নিয়ে সোফায় বসে যায়, মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে। সে ভদ্র, পরিশ্রমী, আর নুসরাতকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু তার মনের গভীরে একটা গোপন অন্ধকার ইচ্ছা লুকিয়ে আছে। সে চায় তার লাজুক, সরল স্ত্রীকে অন্য কোনো পুরুষের হাতে দেখতে—ব্যবহৃত, আকাঙ্ক্ষিত, অসহায়। এই চিন্তা তাকে রাতের অন্ধকারে উত্তেজিত করে, আবার লজ্জাও দেয়। সে কখনো কাউকে বলেনি।
নুসরাত, বয়স আটাশ। কুমিল্লার এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে। পাঁচ বছর আগে রাফির সঙ্গে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ হয়েছে। গায়ের রং ফর্সা, মুখখানা গোলগাল, চোখ দুটো বড় আর লাজুক। লম্বা কালো চুল প্রায় সময় খোঁপা করে বাঁধা থাকে। বাড়িতে সে সাধারণত সালোয়ার-কামিজ বা শাড়ি পরে। সে খুব সরল, ঘরকুনো, আর অতিরিক্ত লাজুক। স্বামীর সামনেও কখনো জোরে কথা বলে না। রাফি যখন তাকে প্রশংসা করে, সে মুখ লাল করে চোখ নিচু করে নেয়। তার জীবন ঘুরপাক খায় রান্নাঘর, কাপড় কাচা, ঘর পরিষ্কার আর বিকেলের টিভি সিরিয়াল নিয়ে। সে রাফিকে গভীরভাবে ভালোবাসে। স্বামীর সুখই তার সুখ।
তাদের সংসার শান্ত। কোনো ঝগড়া নেই, কোনো বড় অভিযোগ নেই। কিন্তু রাফির মনের সেই গোপন ফ্যান্টাসি দিন দিন বড় হয়ে উঠছিল।
এক গুমোট গরম সন্ধ্যায় আকাশ ভারী মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। বাতাস বইছিল না। ঘরের ভিতর গরম। সিলিং ফ্যান ঘুরছিল ধীরে ধীরে, একটা অদ্ভুত শব্দ করছিল। কয়েকদিন ধরে বাড়ির ইলেকট্রিক লাইনে সমস্যা চলছিল। লাইট হঠাৎ জ্বলে উঠছে, আবার নিভে যাচ্ছে। বেডরুমের সুইচবোর্ড গরম হয়ে যাচ্ছে, ফ্যানও মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছে।
রাফি রাতের খাবারের টেবিলে বসে ভাত মুখে দিয়ে বলল,
“নুসরাত, কাল একটা ইলেকট্রিশিয়ান ডাকতে হবে। এই তারগুলো আর চলবে না। আবহাওয়া খারাপ দেখাচ্ছে, বৃষ্টি এলে আরও সমস্যা হবে।”
নুসরাত চোখ নিচু করে মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ… বেডরুমের সুইচবোর্ডটাও আলগা হয়ে গেছে। আমি দেখব। চিন্তা কোরো না।”
সে কথাগুলো বলার সময় তার গলা খুব আস্তে বেরিয়েছিল, যেন নিজেই লজ্জা পাচ্ছে।
পরদিন সকাল। রাফি অফিস যাওয়ার আগে নুসরাতকে বলে গেল,
“ইলেকট্রিশিয়ান এলে সাবধানে থেকো। দরজা খোলা রাখবে না।”
নুসরাত মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। রাফি চলে যাওয়ার পর সে রান্নাঘর পরিষ্কার করতে লাগল। সাদা কটন শাড়ি পরেছিল, চুল খোঁপা করে বাঁধা। গলায় কোনো গয়না নেই, হাতে শুধু একটা সাধারণ চুড়ি।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে দরজায় জোরালো কড়া নাড়ার শব্দ হলো। নুসরাত দরজার কাছে গিয়ে চোখের কোণ দিয়ে দেখল। বাইরে দাঁড়িয়ে একজন পঞ্চাশ বছর বয়সী পুরুষ। কালো শক্ত চামড়া, মজবুত বুক ও হাত, চুলে পাক ধরেছে, কপালে ঘাম। হাতে টুলবক্স। চেহারায় কাজের ক্লান্তি আর অভিজ্ঞতার ছাপ। এলাকার পুরনো ইলেকট্রিশিয়ান রফিক। দশ বছর ধরে এই বিল্ডিংয়ের কাজ করে। কাছাকাছি একটা বস্তিতে থাকে।
নুসরাত দরজা খুলল। রফিকের শরীর থেকে ঘাম আর পুরনো তার-কাজের গন্ধ ভেসে এল।
“মেমসাহেব, তারের প্রবলেম? দাদা ফোন করেছিল,” গম্ভীর ভরা গলায় বলল রফিক। কপালের ঘাম হাতের পেছন দিয়ে মুছল।
নুসরাত একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। চোখ নিচু করে আস্তে বলল,
“হ্যাঁ… লাইট ফ্লিকার করছে। বেডরুমের সুইচবোর্ডও ঢিলা। আসুন… দেখুন।”
রফিক ভারী পদক্ষেপে ভেতরে ঢুকল। তার জুতার নিচে মেঝেতে শব্দ হচ্ছিল। নুসরাত একটু সরে দাঁড়াল। শাড়ির আঁচল হাত দিয়ে চেপে ধরল। বুকের ভিতর একটা অজানা অস্বস্তি কাজ করছিল। রফিকের চোখ একবার তার দিকে উঠল, তারপর দ্রুত সরিয়ে নিল।
রফিক তার ভারী টুলবক্স হাতে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। জুতার নিচে মেঝেতে মৃদু কিন্তু ভারী শব্দ হচ্ছিল। সে প্রথমে ড্রয়িং রুমের সুইচবোর্ডগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। আঙুল দিয়ে সুইচগুলো চেপে দেখছিল, তারপর স্ক্রু ড্রাইভার বের করে সুইচবোর্ডের কভার খুলল। ভেতরের তারগুলো দেখে মাথা নেড়ে বলল—
“মেমসাহেব, এই বাড়ির তারগুলো অনেক পুরনো। অন্তত দশ-বারো বছরের পুরনো মনে হচ্ছে। অনেক জায়গায় ইনসুলেশন উঠে গেছে। মেইনটেন্যান্স হয়নি কখনো। এইভাবে চলতে থাকলে একদিন বড় কোনো শর্ট সার্কিট হবে। আগুনও লাগতে পারে।”
তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর, অভিজ্ঞ, একটু ভারী। রাফির পালিশ করা কর্পোরেট ইংরেজি আর নরম কথার থেকে একদম আলাদা। রফিকের কথায় একটা কাঁচা, মাটির গন্ধ ছিল—যেন সারাজীবন শুধু তার, বিদ্যুৎ আর ঘাম নিয়েই কেটেছে। তার শরীর থেকে ঘাম আর পুরনো টুলের গন্ধ মিশে একটা তীব্র গন্ধ ছড়াচ্ছিল ঘরজুড়ে।
নুসরাত রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়াল। সে মাছ কাটার ছুরি হাতে নিয়েছিল, কিন্তু হাত কাঁপছিল। মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকাচ্ছিল। রফিক বেডরুমের সুইচবোর্ড খুলে কাজ করছিল। তার মজবুত হাত দুটো দ্রুত নড়ছিল। কালো শক্ত চামড়ার ওপর ঘাম চকচক করছিল। গলার কাছে শিরা ফুলে উঠেছিল। নুসরাত জানত না, এই সাধারণ মেরামতির কাজ তাদের শান্ত জীবনে ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন আনতে চলেছে। আর অনেক দূরে বনানীর অফিসের কিউবিকলে বসে রাফিরও কোনো ধারণা ছিল না যে, সে যে ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকেছে, সে তার গোপন চিন্তায় একদিন জায়গা করে নেবে।
রফিক কাজ করছিল। সুইচবোর্ড খুলে তার মেরামতি করছিল, কিন্তু তার চোখ বারবার রান্নাঘরের দিকে চলে যাচ্ছিল। নুসরাত রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মাছ কাটছিল। শাড়ির আঁচল কাঁধ থেকে সামান্য সরে গিয়েছিল। ফর্সা ঘাড়, কানের নিচের নরম অংশ, আর একটুখানি কাঁধের চামড়া মৃদু আলোয় দেখা যাচ্ছিল। রফিকের চোখে একটা লোভাতুর, ক্ষুধার্ত দৃষ্টি ফুটে উঠছিল। পঞ্চাশ বছরের এই মানুষটি অনেকদিন ধরে এমন সুন্দর, লাজুক, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন গৃহিণী দেখেনি। এত সরল, এত অসহায় লাগা একটা বউ। তার শরীরের প্রতিটা নড়াচড়া রফিকের চোখে পড়ছিল।
সে মাঝে মাঝে হাসি মুখে কথা বলছিল, গলা একটু নামিয়ে—
“মেমসাহেব, আপনার হাতের রান্নার গন্ধ তো খুব ভালো লাগছে। মাছ ভাজার গন্ধ… আপনার স্বামী সত্যিই ভাগ্যবান।”
নুসরাত অস্বস্তি বোধ করছিল। তার গলা শুকিয়ে আসছিল। সে চুপচাপ মাথা নিচু করে কাজ করে যাচ্ছিল। ছুরি দিয়ে মাছ কাটার সময় হাত কাঁপছিল। রফিকের কথাগুলো তার কানে বাজছিল, কিন্তু সে কোনো জবাব দিচ্ছিল না। শুধু একবার আস্তে করে বলল,
“আপনি… কাজ শেষ করুন।”
বাইরে আকাশ কালো হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ ঝড় উঠল। প্রবল বাতাস বইতে শুরু করল। জানালার পর্দা সজোরে উড়ে যাচ্ছিল। কাচের জানালায় বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছিল। তারপর শুরু হলো প্রচণ্ড বৃষ্টি। ছাদের ওপর পানির শব্দ যেন ঢোল বাজার মতো। রাস্তায় গাছের ডাল ভাঙার আওয়াজ, টিনের চালে বৃষ্টির তোড়। বিকেলের মধ্যেই আকাশ যেন রাত হয়ে গেল। ঘরের ভেতরটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে এল। লাইটগুলো ফ্লিকার করতে করতে একসময় পুরোপুরি নিভে গেল।
রফিক জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, গলা একটু ভারী করে—
“মেমসাহেব, এখন বেরোলে বিপদ। বৃষ্টির তোড় এত প্রবল যে রাস্তায় পা রাখা যাবে না। গাছ ভেঙে পড়ছে। একটু থাকতে হবে। আপনি ভয় পাবেন না।”
নুসরাতের বুক জোরে জোরে কাঁপছিল। সে কী বলবে বুঝতে পারছিল না। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তার ভেতরটা অস্বস্তিতে ভরে উঠছিল। একা বাড়িতে একজন অচেনা বয়স্ক পুরুষ—এই চিন্তাটাই তাকে অস্থির করে তুলছিল।
একটু পরে রাফির ফোন এল। নুসরাত কাঁপা হাতে ফোন ধরল। রাফির গলায় চিন্তার ছাপ আর একটু ক্লান্তি—
“নুসরাত, অফিস থেকে বেরোতে পারছি না। রাস্তা জলে ভেসে গেছে, ট্রাফিকও ভয়ংকর। গাড়ি আটকে আছে। আমি খুব রাত করে ফিরব, হয়তো মাঝরাতের পর। তুমি ভয় পেয়ো না। রফিকদা যদি আটকে যায়, তাকে খেতে দিও। সে ভালো লোক, ভয়ের কিছু নেই। দরজা বন্ধ রেখো।”
নুসরাত কাঁপা গলায় বলল,
“কিন্তু রাফি… একা… আমি… ভয় করছে…”
“আরে, চিন্তা কোরো না। আমি যত তাড়াতাড়ি পারি আসব। ফোন অন রাখো।” বলে ফোন কেটে দিল রাফি। তার মনে সেই গোপন ফ্যান্টাসি একটু একটু করে মাথা চাড়া দিচ্ছিল। অন্ধকার বাড়িতে তার লাজুক স্ত্রী আর একজন বয়স্ক পুরুষ—এই ছবিটা তার মাথায় ঘুরছিল, কিন্তু সে নিজেও স্বীকার করতে চাইছিল না।
সন্ধ্যা নামতেই পুরো এলাকায় লোডশেডিং হয়ে গেল। চারদিক ঘন অন্ধকার। শুধু বাইরের ঝড়ের শব্দ আর বৃষ্টির তোড়। নুসরাত কাঁপা হাতে একটা মোমবাতি জ্বালাল। ঘরের মাঝখানে একটা ছোট টেবিলে মোমবাতিটা রাখল। মৃদু হলুদ আলোয় ঘরটা রহস্যময় আর একটু ভয়ংকর লাগছিল। দেয়ালে দুজনের ছায়া বড় হয়ে নড়ছিল। রফিক এখনো কাজ শেষ করেনি। সে সোফায় বসে টুলবক্স গুছোচ্ছিল। তার শরীর থেকে ঘামের গন্ধ এখনো আসছিল।
“মেমসাহেব, এত অন্ধকারে ভয় লাগছে না?” রফিক হাসতে হাসতে বলল। সে কথা বলতে বলতে একটু কাছে সরে এল। সোফা থেকে উঠে এক পা এগোল। “আমি তো অনেক বাড়িতে কাজ করি। অনেক গল্প জানি। চলুন, গল্প করি। সময় কাটবে। একা একা বসে থাকলে ভয় আরও বাড়ে।”
নুসরাত পিছিয়ে গেল। তার পিঠ রান্নাঘরের দেয়ালে লেগে গেল। ভয় করছিল। গলা শুকিয়ে আসছিল।
“না… আমি রান্না করছি। আপনি বসুন। কাজ শেষ হলে চলে যাবেন।”
রফিক উঠে দাঁড়াল। অন্ধকারে তার ছায়া দেয়ালে অনেক বড় হয়ে দেখাচ্ছিল। সে নুসরাতের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, গলা একটু নামিয়ে—
“আপনি খুব লাজুক তো। এমন সুন্দর বউয়ের স্বামী অফিসে বসে থাকে, আর আপনি একা… এই অন্ধকারে… এই ঝড়ের রাতে…”
বলতে বলতে তার হাতটা নুসরাতের কাঁধের কাছে চলে এল। আলতো করে ছুঁয়ে গেল শাড়ির কাপড়। শাড়ির পাতলা কাপড়ের ওপর দিয়ে তার রুক্ষ, কাজের দাগযুক্ত আঙুলের স্পর্শ। নুসরাতের শরীর কেঁপে উঠল।
নুসরাত চমকে উঠল। জোরে বলল—
“এই! কী করছেন! দূরে থাকুন!”
সে দ্রুত পিছিয়ে গেল। তার বুক দুরুদুরু করছিল, ভয়ে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। মোমবাতির মৃদু আলোয় রফিকের চোখে সেই লোভাতুর দৃষ্টি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তার ঠোঁটে একটা ধীর হাসি ফুটে উঠেছিল। বাইরে ঝড়ের আওয়াজ আরও বেড়ে উঠল। বৃষ্টির শব্দ যেন ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ছিল। মোমবাতির শিখা দুলছিল।
রফিক হেসে বলল, গলা আরও একটু নামিয়ে—
“আরে ভয় কীসের মেমসাহেব? আমি তো শুধু সাহায্য করতে চাইছি। এই অন্ধকারে একা থাকা কি ভালো? চলুন, একটু কাছে বসুন। গল্প করি। আমি কোনো খারাপ কাজ করব না… যদি আপনি না চান।”
বাড়ির বাইরে তুমুল বৃষ্টি পড়ছিল, আর ভিতরে একটা অস্বস্তিকর, উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল।
রাফি, বয়স বত্রিশ। চেহারা সাধারণ, চশমা পরে, শরীর একটু পাতলা। বনানীর একটি নামকরা সফটওয়্যার কোম্পানিতে সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সকাল সাড়ে আটটার দিকে ল্যাপটপ ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে যায়, সন্ধ্যা সাতটা-আটটার আগে ফেরে না। অফিসের ডেডলাইন, ক্লায়েন্ট কল, প্রজেক্ট প্রেশার—সবকিছু সে একাই সামলায়। বাসায় এসে ক্লান্ত শরীর নিয়ে সোফায় বসে যায়, মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে। সে ভদ্র, পরিশ্রমী, আর নুসরাতকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু তার মনের গভীরে একটা গোপন অন্ধকার ইচ্ছা লুকিয়ে আছে। সে চায় তার লাজুক, সরল স্ত্রীকে অন্য কোনো পুরুষের হাতে দেখতে—ব্যবহৃত, আকাঙ্ক্ষিত, অসহায়। এই চিন্তা তাকে রাতের অন্ধকারে উত্তেজিত করে, আবার লজ্জাও দেয়। সে কখনো কাউকে বলেনি।
নুসরাত, বয়স আটাশ। কুমিল্লার এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে। পাঁচ বছর আগে রাফির সঙ্গে অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ হয়েছে। গায়ের রং ফর্সা, মুখখানা গোলগাল, চোখ দুটো বড় আর লাজুক। লম্বা কালো চুল প্রায় সময় খোঁপা করে বাঁধা থাকে। বাড়িতে সে সাধারণত সালোয়ার-কামিজ বা শাড়ি পরে। সে খুব সরল, ঘরকুনো, আর অতিরিক্ত লাজুক। স্বামীর সামনেও কখনো জোরে কথা বলে না। রাফি যখন তাকে প্রশংসা করে, সে মুখ লাল করে চোখ নিচু করে নেয়। তার জীবন ঘুরপাক খায় রান্নাঘর, কাপড় কাচা, ঘর পরিষ্কার আর বিকেলের টিভি সিরিয়াল নিয়ে। সে রাফিকে গভীরভাবে ভালোবাসে। স্বামীর সুখই তার সুখ।
তাদের সংসার শান্ত। কোনো ঝগড়া নেই, কোনো বড় অভিযোগ নেই। কিন্তু রাফির মনের সেই গোপন ফ্যান্টাসি দিন দিন বড় হয়ে উঠছিল।
এক গুমোট গরম সন্ধ্যায় আকাশ ভারী মেঘে ঢেকে গিয়েছিল। বাতাস বইছিল না। ঘরের ভিতর গরম। সিলিং ফ্যান ঘুরছিল ধীরে ধীরে, একটা অদ্ভুত শব্দ করছিল। কয়েকদিন ধরে বাড়ির ইলেকট্রিক লাইনে সমস্যা চলছিল। লাইট হঠাৎ জ্বলে উঠছে, আবার নিভে যাচ্ছে। বেডরুমের সুইচবোর্ড গরম হয়ে যাচ্ছে, ফ্যানও মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছে।
রাফি রাতের খাবারের টেবিলে বসে ভাত মুখে দিয়ে বলল,
“নুসরাত, কাল একটা ইলেকট্রিশিয়ান ডাকতে হবে। এই তারগুলো আর চলবে না। আবহাওয়া খারাপ দেখাচ্ছে, বৃষ্টি এলে আরও সমস্যা হবে।”
নুসরাত চোখ নিচু করে মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ… বেডরুমের সুইচবোর্ডটাও আলগা হয়ে গেছে। আমি দেখব। চিন্তা কোরো না।”
সে কথাগুলো বলার সময় তার গলা খুব আস্তে বেরিয়েছিল, যেন নিজেই লজ্জা পাচ্ছে।
পরদিন সকাল। রাফি অফিস যাওয়ার আগে নুসরাতকে বলে গেল,
“ইলেকট্রিশিয়ান এলে সাবধানে থেকো। দরজা খোলা রাখবে না।”
নুসরাত মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। রাফি চলে যাওয়ার পর সে রান্নাঘর পরিষ্কার করতে লাগল। সাদা কটন শাড়ি পরেছিল, চুল খোঁপা করে বাঁধা। গলায় কোনো গয়না নেই, হাতে শুধু একটা সাধারণ চুড়ি।
সকাল সাড়ে নয়টার দিকে দরজায় জোরালো কড়া নাড়ার শব্দ হলো। নুসরাত দরজার কাছে গিয়ে চোখের কোণ দিয়ে দেখল। বাইরে দাঁড়িয়ে একজন পঞ্চাশ বছর বয়সী পুরুষ। কালো শক্ত চামড়া, মজবুত বুক ও হাত, চুলে পাক ধরেছে, কপালে ঘাম। হাতে টুলবক্স। চেহারায় কাজের ক্লান্তি আর অভিজ্ঞতার ছাপ। এলাকার পুরনো ইলেকট্রিশিয়ান রফিক। দশ বছর ধরে এই বিল্ডিংয়ের কাজ করে। কাছাকাছি একটা বস্তিতে থাকে।
নুসরাত দরজা খুলল। রফিকের শরীর থেকে ঘাম আর পুরনো তার-কাজের গন্ধ ভেসে এল।
“মেমসাহেব, তারের প্রবলেম? দাদা ফোন করেছিল,” গম্ভীর ভরা গলায় বলল রফিক। কপালের ঘাম হাতের পেছন দিয়ে মুছল।
নুসরাত একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। চোখ নিচু করে আস্তে বলল,
“হ্যাঁ… লাইট ফ্লিকার করছে। বেডরুমের সুইচবোর্ডও ঢিলা। আসুন… দেখুন।”
রফিক ভারী পদক্ষেপে ভেতরে ঢুকল। তার জুতার নিচে মেঝেতে শব্দ হচ্ছিল। নুসরাত একটু সরে দাঁড়াল। শাড়ির আঁচল হাত দিয়ে চেপে ধরল। বুকের ভিতর একটা অজানা অস্বস্তি কাজ করছিল। রফিকের চোখ একবার তার দিকে উঠল, তারপর দ্রুত সরিয়ে নিল।
রফিক তার ভারী টুলবক্স হাতে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকল। জুতার নিচে মেঝেতে মৃদু কিন্তু ভারী শব্দ হচ্ছিল। সে প্রথমে ড্রয়িং রুমের সুইচবোর্ডগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। আঙুল দিয়ে সুইচগুলো চেপে দেখছিল, তারপর স্ক্রু ড্রাইভার বের করে সুইচবোর্ডের কভার খুলল। ভেতরের তারগুলো দেখে মাথা নেড়ে বলল—
“মেমসাহেব, এই বাড়ির তারগুলো অনেক পুরনো। অন্তত দশ-বারো বছরের পুরনো মনে হচ্ছে। অনেক জায়গায় ইনসুলেশন উঠে গেছে। মেইনটেন্যান্স হয়নি কখনো। এইভাবে চলতে থাকলে একদিন বড় কোনো শর্ট সার্কিট হবে। আগুনও লাগতে পারে।”
তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর, অভিজ্ঞ, একটু ভারী। রাফির পালিশ করা কর্পোরেট ইংরেজি আর নরম কথার থেকে একদম আলাদা। রফিকের কথায় একটা কাঁচা, মাটির গন্ধ ছিল—যেন সারাজীবন শুধু তার, বিদ্যুৎ আর ঘাম নিয়েই কেটেছে। তার শরীর থেকে ঘাম আর পুরনো টুলের গন্ধ মিশে একটা তীব্র গন্ধ ছড়াচ্ছিল ঘরজুড়ে।
নুসরাত রান্নাঘরে গিয়ে দাঁড়াল। সে মাছ কাটার ছুরি হাতে নিয়েছিল, কিন্তু হাত কাঁপছিল। মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকাচ্ছিল। রফিক বেডরুমের সুইচবোর্ড খুলে কাজ করছিল। তার মজবুত হাত দুটো দ্রুত নড়ছিল। কালো শক্ত চামড়ার ওপর ঘাম চকচক করছিল। গলার কাছে শিরা ফুলে উঠেছিল। নুসরাত জানত না, এই সাধারণ মেরামতির কাজ তাদের শান্ত জীবনে ধীরে ধীরে একটা পরিবর্তন আনতে চলেছে। আর অনেক দূরে বনানীর অফিসের কিউবিকলে বসে রাফিরও কোনো ধারণা ছিল না যে, সে যে ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকেছে, সে তার গোপন চিন্তায় একদিন জায়গা করে নেবে।
রফিক কাজ করছিল। সুইচবোর্ড খুলে তার মেরামতি করছিল, কিন্তু তার চোখ বারবার রান্নাঘরের দিকে চলে যাচ্ছিল। নুসরাত রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মাছ কাটছিল। শাড়ির আঁচল কাঁধ থেকে সামান্য সরে গিয়েছিল। ফর্সা ঘাড়, কানের নিচের নরম অংশ, আর একটুখানি কাঁধের চামড়া মৃদু আলোয় দেখা যাচ্ছিল। রফিকের চোখে একটা লোভাতুর, ক্ষুধার্ত দৃষ্টি ফুটে উঠছিল। পঞ্চাশ বছরের এই মানুষটি অনেকদিন ধরে এমন সুন্দর, লাজুক, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন গৃহিণী দেখেনি। এত সরল, এত অসহায় লাগা একটা বউ। তার শরীরের প্রতিটা নড়াচড়া রফিকের চোখে পড়ছিল।
সে মাঝে মাঝে হাসি মুখে কথা বলছিল, গলা একটু নামিয়ে—
“মেমসাহেব, আপনার হাতের রান্নার গন্ধ তো খুব ভালো লাগছে। মাছ ভাজার গন্ধ… আপনার স্বামী সত্যিই ভাগ্যবান।”
নুসরাত অস্বস্তি বোধ করছিল। তার গলা শুকিয়ে আসছিল। সে চুপচাপ মাথা নিচু করে কাজ করে যাচ্ছিল। ছুরি দিয়ে মাছ কাটার সময় হাত কাঁপছিল। রফিকের কথাগুলো তার কানে বাজছিল, কিন্তু সে কোনো জবাব দিচ্ছিল না। শুধু একবার আস্তে করে বলল,
“আপনি… কাজ শেষ করুন।”
বাইরে আকাশ কালো হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ ঝড় উঠল। প্রবল বাতাস বইতে শুরু করল। জানালার পর্দা সজোরে উড়ে যাচ্ছিল। কাচের জানালায় বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছিল। তারপর শুরু হলো প্রচণ্ড বৃষ্টি। ছাদের ওপর পানির শব্দ যেন ঢোল বাজার মতো। রাস্তায় গাছের ডাল ভাঙার আওয়াজ, টিনের চালে বৃষ্টির তোড়। বিকেলের মধ্যেই আকাশ যেন রাত হয়ে গেল। ঘরের ভেতরটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে এল। লাইটগুলো ফ্লিকার করতে করতে একসময় পুরোপুরি নিভে গেল।
রফিক জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, গলা একটু ভারী করে—
“মেমসাহেব, এখন বেরোলে বিপদ। বৃষ্টির তোড় এত প্রবল যে রাস্তায় পা রাখা যাবে না। গাছ ভেঙে পড়ছে। একটু থাকতে হবে। আপনি ভয় পাবেন না।”
নুসরাতের বুক জোরে জোরে কাঁপছিল। সে কী বলবে বুঝতে পারছিল না। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তার ভেতরটা অস্বস্তিতে ভরে উঠছিল। একা বাড়িতে একজন অচেনা বয়স্ক পুরুষ—এই চিন্তাটাই তাকে অস্থির করে তুলছিল।
একটু পরে রাফির ফোন এল। নুসরাত কাঁপা হাতে ফোন ধরল। রাফির গলায় চিন্তার ছাপ আর একটু ক্লান্তি—
“নুসরাত, অফিস থেকে বেরোতে পারছি না। রাস্তা জলে ভেসে গেছে, ট্রাফিকও ভয়ংকর। গাড়ি আটকে আছে। আমি খুব রাত করে ফিরব, হয়তো মাঝরাতের পর। তুমি ভয় পেয়ো না। রফিকদা যদি আটকে যায়, তাকে খেতে দিও। সে ভালো লোক, ভয়ের কিছু নেই। দরজা বন্ধ রেখো।”
নুসরাত কাঁপা গলায় বলল,
“কিন্তু রাফি… একা… আমি… ভয় করছে…”
“আরে, চিন্তা কোরো না। আমি যত তাড়াতাড়ি পারি আসব। ফোন অন রাখো।” বলে ফোন কেটে দিল রাফি। তার মনে সেই গোপন ফ্যান্টাসি একটু একটু করে মাথা চাড়া দিচ্ছিল। অন্ধকার বাড়িতে তার লাজুক স্ত্রী আর একজন বয়স্ক পুরুষ—এই ছবিটা তার মাথায় ঘুরছিল, কিন্তু সে নিজেও স্বীকার করতে চাইছিল না।
সন্ধ্যা নামতেই পুরো এলাকায় লোডশেডিং হয়ে গেল। চারদিক ঘন অন্ধকার। শুধু বাইরের ঝড়ের শব্দ আর বৃষ্টির তোড়। নুসরাত কাঁপা হাতে একটা মোমবাতি জ্বালাল। ঘরের মাঝখানে একটা ছোট টেবিলে মোমবাতিটা রাখল। মৃদু হলুদ আলোয় ঘরটা রহস্যময় আর একটু ভয়ংকর লাগছিল। দেয়ালে দুজনের ছায়া বড় হয়ে নড়ছিল। রফিক এখনো কাজ শেষ করেনি। সে সোফায় বসে টুলবক্স গুছোচ্ছিল। তার শরীর থেকে ঘামের গন্ধ এখনো আসছিল।
“মেমসাহেব, এত অন্ধকারে ভয় লাগছে না?” রফিক হাসতে হাসতে বলল। সে কথা বলতে বলতে একটু কাছে সরে এল। সোফা থেকে উঠে এক পা এগোল। “আমি তো অনেক বাড়িতে কাজ করি। অনেক গল্প জানি। চলুন, গল্প করি। সময় কাটবে। একা একা বসে থাকলে ভয় আরও বাড়ে।”
নুসরাত পিছিয়ে গেল। তার পিঠ রান্নাঘরের দেয়ালে লেগে গেল। ভয় করছিল। গলা শুকিয়ে আসছিল।
“না… আমি রান্না করছি। আপনি বসুন। কাজ শেষ হলে চলে যাবেন।”
রফিক উঠে দাঁড়াল। অন্ধকারে তার ছায়া দেয়ালে অনেক বড় হয়ে দেখাচ্ছিল। সে নুসরাতের কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল, গলা একটু নামিয়ে—
“আপনি খুব লাজুক তো। এমন সুন্দর বউয়ের স্বামী অফিসে বসে থাকে, আর আপনি একা… এই অন্ধকারে… এই ঝড়ের রাতে…”
বলতে বলতে তার হাতটা নুসরাতের কাঁধের কাছে চলে এল। আলতো করে ছুঁয়ে গেল শাড়ির কাপড়। শাড়ির পাতলা কাপড়ের ওপর দিয়ে তার রুক্ষ, কাজের দাগযুক্ত আঙুলের স্পর্শ। নুসরাতের শরীর কেঁপে উঠল।
নুসরাত চমকে উঠল। জোরে বলল—
“এই! কী করছেন! দূরে থাকুন!”
সে দ্রুত পিছিয়ে গেল। তার বুক দুরুদুরু করছিল, ভয়ে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। মোমবাতির মৃদু আলোয় রফিকের চোখে সেই লোভাতুর দৃষ্টি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তার ঠোঁটে একটা ধীর হাসি ফুটে উঠেছিল। বাইরে ঝড়ের আওয়াজ আরও বেড়ে উঠল। বৃষ্টির শব্দ যেন ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ছিল। মোমবাতির শিখা দুলছিল।
রফিক হেসে বলল, গলা আরও একটু নামিয়ে—
“আরে ভয় কীসের মেমসাহেব? আমি তো শুধু সাহায্য করতে চাইছি। এই অন্ধকারে একা থাকা কি ভালো? চলুন, একটু কাছে বসুন। গল্প করি। আমি কোনো খারাপ কাজ করব না… যদি আপনি না চান।”
বাড়ির বাইরে তুমুল বৃষ্টি পড়ছিল, আর ভিতরে একটা অস্বস্তিকর, উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)