Yesterday, 02:23 PM
ছায়ার ভেতর তিন নারী
প্রথম পর্ব: বদলে যাওয়ার শুরু
অধ্যায় ১ — নীরব বাড়ি
স্বামী মারা যাওয়ার পর মিতালীর বাড়িটা অদ্ভুতভাবে বড় হয়ে গিয়েছিল।
একসময় যে বাড়িতে সন্ধ্যা নামলেই স্বামীর কণ্ঠ শোনা যেত, এখন সেখানে ঘড়ির টিকটিক শব্দও আলাদা করে শোনা যেত। তিন সন্তান একই বাড়িতে থাকলেও তাদের জীবন যেন তিনটি আলাদা ঘরে বন্দি।
মিতালী নিজের জীবনকে নিয়মের মধ্যে ধরে রেখেছিলেন। ভোরে ওঠা, প্রার্থনা, সংসারের হিসাব, সন্তানদের খোঁজ নেওয়া—সবকিছুই ছিল পূর্বনির্ধারিত।
তার পোশাকও ছিল সেই জীবনের প্রতিচ্ছবি। প্রশস্ত, সংযত পোশাক; মাথা ঢাকা; সামান্য গয়না। বাইরে গেলে তার হাঁটাচলা ছিল শান্ত, চোখ নিচু, কথাবার্তা মেপে।
কিন্তু বাড়ির অন্য দুই নারী যেন সম্পূর্ণ অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা।
সাওলি সকালবেলা ঘুমাত, দুপুরে উঠত। রাত ছিল তার সক্রিয় সময়। তার ঘরের ড্রেসিং টেবিল ভর্তি প্রসাধনী, সুগন্ধি, চুলের সামগ্রী আর নানা ধরনের গয়না।
সোহিনী আরও পরিপাটি। তার পোশাক বাছাইয়ের মধ্যে ছিল হিসাব। কোন অনুষ্ঠানে কী পরবে, কার সঙ্গে দেখা হলে কেমন দেখাবে—এসব নিয়ে সে অনেক বেশি সচেতন।
মিতালী কখনো কখনো দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের দেখতেন।
তিনি বুঝতেন, দুই মেয়ে বড় হয়েছে।
কিন্তু তাদের বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যেন তিনি তাদের হারিয়েও ফেলছেন।
অধ্যায় ২ — বন্ধ দরজার ওপারে
প্রথমে মিতালী শুধু গন্ধ পেতেন।
সিগারেটের গন্ধ।
তারপর শুনতেন হাসির শব্দ।
তারপর গভীর রাতে অপরিচিত মানুষের কণ্ঠ।
একদিন রাতে তিনি সাওলির দরজায় ধাক্কা দিলেন।
— “দরজা খোল।”
ভেতর থেকে কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর সাওলি দরজা খুলল।
চুল এলোমেলো, চোখে গাঢ় মেকআপের ছাপ, কানে ঝুলন্ত কয়েকটি নতুন দুল।
মিতালী ঘরের দিকে তাকালেন।
— “এখানে এত লোক কেন?”
সাওলি কাঁধ ঝাঁকাল।
— “বন্ধুরা এসেছে।”
— “এখন রাত কত?”
— “জানি।”
— “তাহলে সবাইকে চলে যেতে বল।”
সাওলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “মা, তুমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।”
সেই রাতের কথোপকথন খুব বড় কোনো ঝগড়ায় পরিণত হয়নি।
কিন্তু মিতালী নিজের ঘরে ফিরে বুঝলেন, তার কর্তৃত্বে প্রথম ফাটল ধরেছে।
অধ্যায় ৩ — প্রথম আপস
কয়েক মাস ধরে একই ঘটনা চলল।
মিতালী বকতেন।
সাওলি প্রতিবাদ করত।
সোহিনী যুক্তি দিত।
জিহান চুপ করে থাকত।
তারপর একদিন মিতালী আর কিছু বললেন না।
সাওলি রাত তিনটায় ফিরেছিল।
দরজা খুলে দেখল মা বসে আছেন।
সে ভেবেছিল আবার ঝগড়া হবে।
কিন্তু মিতালী শুধু বললেন,
— “খেয়ে নিস।”
সাওলি থেমে গেল।
— “তুমি রাগ করছ না?”
মিতালী মাথা নাড়লেন।
— “রাগ করে কী লাভ?”
সাওলি প্রথমবার মায়ের মুখের দিকে গভীরভাবে তাকাল।
সেই মুহূর্তে দুজনের মধ্যে অদ্ভুত এক নীরবতা তৈরি হলো।
মিতালী ভাবলেন, তিনি হয়তো বাস্তবতাকে মেনে নিতে শিখছেন।
কিন্তু আসলে তিনি প্রথমবার সীমারেখা সরিয়ে দিচ্ছিলেন।
অধ্যায় ৪ — মেয়েদের পৃথিবীতে প্রবেশ
সাওলির জন্মদিনে বাড়িতে বড় আয়োজন হলো।
মিতালী প্রথমে নিজের ঘরেই ছিলেন।
কিন্তু সাওলি এসে তাকে বলল,
— “মা, তুমি সারাক্ষণ একা বসে থাকবে?”
— “তোমাদের অনুষ্ঠান।”
— “তুমিও তো এই বাড়ির মানুষ।”
মিতালী শেষ পর্যন্ত নিচে এলেন।
সেদিন তিনি লক্ষ্য করলেন, মেয়েরা তাকে আর বাধা হিসেবে দেখছে না।
বরং নিজেদের জগতের একজন হিসেবে গ্রহণ করছে।
সাওলি তার মায়ের চুল একটু গুছিয়ে দিল।
সোহিনী হালকা মেকআপ করে দিল।
আয়নায় নিজেকে দেখে মিতালী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তিনি নিজেকে চিনতে পারছিলেন।
কিন্তু একই সঙ্গে নতুন কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন।
একজন নারী, যিনি এতদিন শুধু মা ছিলেন।
সেদিন প্রথমবার তিনি নিজের জন্য সাজলেন।
এবং আশ্চর্যজনকভাবে ভালো লাগল।
অধ্যায় ৫ — পোশাকের পরিবর্তন
পরিবর্তন এবার নিয়মিত হয়ে উঠল।
মিতালীর আলমারিতে নতুন পোশাক যোগ হতে লাগল।
প্রথমে সাওলি কিনে আনত।
তারপর মিতালী নিজেই দোকানে গিয়ে পছন্দ করতে শুরু করলেন।
তিনি আগের মতো পোশাকের রঙ নিয়ে দ্বিধা করতেন না।
চুল খোলা রাখতেন।
নতুন সুগন্ধি ব্যবহার করতেন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় কাটাতেন।
একদিন সোহিনী বলল,
— “মা, তোমাকে এখন অনেক তরুণ দেখায়।”
মিতালী হেসে ফেললেন।
— “বয়স কমে গেছে নাকি?”
— “না। কিন্তু তোমার চোখে আগের ভয়টা নেই।”
কথাটা মিতালীর মনে রয়ে গেল।
তিনি বুঝতে শুরু করলেন—সাজগোজ তার কাছে শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন নয়।
এটা ছিল নিজের ওপর আবার অধিকার ফিরে পাওয়ার অনুভূতি।
অধ্যায় ৬ — ট্যাটুর প্রথম রেখা
সাওলির কবজির ছোট ট্যাটুটি মিতালীর খুব পছন্দ হয়েছিল।
এক সন্ধ্যায় তিনি আঙুল দিয়ে নকশাটার দিকে ইশারা করে বললেন,
— “এটা করিয়েছিস কবে?”
— “অনেকদিন আগে।”
— “ব্যথা করেনি?”
— “করেছিল। কিন্তু সহ্য করা যায়।”
কথাটা মিতালীর মনে অদ্ভুতভাবে দাগ কাটল।
কয়েক সপ্তাহ পর তিনি নিজেই একটি ছোট নকশা বেছে নিলেন।
কবজির কাছে খুব সূক্ষ্ম একটি অসম্পূর্ণ বৃত্ত।
সাওলি অবাক হয়ে বলল,
— “সত্যি করবে?”
মিতালী আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “হ্যাঁ।”
ট্যাটুটি করার পর কয়েকদিন তিনি বারবার কবজির দিকে তাকালেন।
তার কাছে এটি কোনো ফ্যাশন মাত্র ছিল না।
এটি ছিল তার জীবনের পুরোনো অধ্যায়ের সঙ্গে নতুন অধ্যায়ের মাঝখানে একটি চিহ্ন।
পরে কানের পিয়ার্সিংও বাড়ল।
একটি নতুন ছোট দুল।
তারপর আরেকটি।
প্রতিবারই তিনি বলতেন,
— “এটাই শেষ।”
আর প্রতিবারই কয়েক মাস পর নতুন কিছু যোগ হতো।
অধ্যায় ৭ — নেশার দরজা
নেশার জগতে মিতালীর প্রবেশও ধীরে হয়েছিল।
প্রথমে তিনি শুধু পাশে বসতেন।
তারপর অন্যদের হাতে কী আছে সেটা নিয়ে কৌতূহলী হতেন।
এক রাতে সাওলি তাকে বলল,
— “তুমি এত চিন্তা করো কেন? একটু রিল্যাক্স করো।”
মিতালী হেসে বললেন,
— “আমি তো রিল্যাক্স করতেই পারি না।”
সাওলি বলল,
— “সেটাই তোমার সমস্যা।”
সেই রাতের পর মিতালী মাঝে মাঝে মেয়েদের সঙ্গে বসতে শুরু করলেন।
যে জিনিসগুলো একসময় তার কাছে ঘৃণ্য মনে হতো, সেগুলো ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠল।
পরিচিত জিনিসকে মানুষ খুব সহজেই স্বাভাবিক বলে ভাবতে শুরু করে।
মিতালীর ক্ষেত্রেও তাই হলো।
অধ্যায় ৮ — রাতের শহর
একসময় রাত দশটার পর মিতালী বাইরে থাকলে প্রতিবেশীরা অবাক হতো।
তারপর রাত বারোটা।
তারপর রাত দুইটা।
শহরের আলো তাকে টানতে শুরু করেছিল।
রেস্তোরাঁ, লাউঞ্জ, পার্টি, বন্ধুদের জমায়েত—প্রতিটি জায়গায় তিনি নতুন পরিচিতি পাচ্ছিলেন।
কেউ তাকে বিধবা নারী হিসেবে চিনত না।
কেউ তার মৃত স্বামীর কথা জানত না।
কেউ জানত না তিনি তিন সন্তানের মা।
তিনি শুধু মিতালী।
এই পরিচয়টি তার কাছে নেশার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।
অধ্যায় ৯ — সামাজিক মাধ্যমে নতুন মিতালী
সাওলি একদিন মায়ের ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করল।
মিতালী প্রথমে আপত্তি করেছিলেন।
— “আমার ছবি কেন দিচ্ছিস?”
— “কারণ তোমাকে ভালো লাগছে।”
ছবিটি ছড়িয়ে পড়ল।
অচেনা মানুষের প্রশংসা আসতে লাগল।
মিতালী প্রথমে বিব্রত হয়েছিলেন।
তারপর নিজেই ছবি তুলতে শুরু করলেন।
নতুন পোশাক।
নতুন চুলের স্টাইল।
ক্যাফেতে বসে ছবি।
রাতের শহরের আলোয় ছবি।
ট্যাটু দেখা যাচ্ছে এমন ছবি।
তার অনুসারী বাড়তে লাগল।
মিতালী আবিষ্কার করলেন, নিজের জীবনকে শুধু বাঁচাই নয়—দেখানোও যায়।
তিনি নিজের একটি নতুন অনলাইন পরিচয় তৈরি করলেন।
সেখানে তিনি আর শুধু ‘মা’ নন।
তিনি স্বাধীন, আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের সিদ্ধান্তে চলা একজন নারী।
অধ্যায় ১০ — জিহানের দূরত্ব
সবাই যখন মিতালীর পরিবর্তনকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করছিল, জিহান তখন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল।
এক রাতে সে মাকে বলল,
— “তুমি কি সুখী?”
মিতালী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
— “হ্যাঁ।”
জিহান বলল,
— “তাহলে আমার মনে হয় তুমি নিজেকে বোঝাচ্ছ।”
মিতালী বিরক্ত হলেন।
— “তুই আমার জীবন বুঝবি না।”
জিহান শান্তভাবে বলল,
— “আগে তুমি আমাদের জীবন বুঝতে চাইতে। এখন তুমি শুধু নিজেরটা বাঁচতে চাও।”
মিতালী আর উত্তর দিলেন না।
জিহান সেদিন নিজের ঘরে চলে গেল।
কিছুদিন পর সে বাড়ির বাইরে বেশি সময় কাটাতে শুরু করল।
মায়ের সঙ্গে কথা কমল।
খাবার টেবিলে তিনজনের হাসির মাঝখানে তার নীরবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
মিতালী সেটা লক্ষ্য করতেন।
কিন্তু নিজেকে বলতেন—
“ওরও নিজের জীবন আছে।”
এই বাক্যটি ধীরে ধীরে তার অপরাধবোধকে চাপা দেওয়ার ঢাল হয়ে উঠল।
অধ্যায় ১১ — তিন নারীর নতুন পরিচয়
সময়ের সঙ্গে মিতালী, সাওলি ও সোহিনীকে শহরের অনেকেই একসঙ্গে চিনতে শুরু করল।
তিনজনের সাজ আলাদা।
সাওলি ছিল সবচেয়ে বেপরোয়া।
সোহিনী ছিল পরিমিত কিন্তু আকর্ষণীয়।
মিতালী তাদের মাঝামাঝি—পরিণত বয়সের আত্মবিশ্বাস আর নতুন জীবনের উচ্ছ্বাসের অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
তাদের সামাজিক জীবন বিস্তৃত হলো।
নতুন বন্ধু।
নতুন পরিচিতি।
নতুন সম্পর্ক।
নতুন ব্যবসায়িক যোগাযোগ।
আর প্রতিটি নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের সঙ্গে তাদের পুরোনো পারিবারিক জীবন আরও দূরে সরে যেতে লাগল।
মিতালী কখনো কখনো মাঝরাতে বাড়ি ফিরে সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
পুরো বাড়ি অন্ধকার।
শুধু জিহানের ঘরের দরজার নিচ দিয়ে আলো বেরোচ্ছে।
তিনি দরজার সামনে গিয়ে থামতেন।
কড়া নাড়তেন না।
শুধু কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে আবার নিজের ঘরে ফিরে যেতেন।
কারণ তিনি জানতেন—
তার ছেলে তাকে হারিয়ে ফেলছে।
আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, তিনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন না যে তাকে ফিরে পেতে তিনি সত্যিই চেষ্টা করতে চান কি না।
এভাবেই পতনের পরবর্তী অধ্যায়ের দরজা খুলে গেল।
প্রথম পর্ব: বদলে যাওয়ার শুরু
অধ্যায় ১ — নীরব বাড়ি
স্বামী মারা যাওয়ার পর মিতালীর বাড়িটা অদ্ভুতভাবে বড় হয়ে গিয়েছিল।
একসময় যে বাড়িতে সন্ধ্যা নামলেই স্বামীর কণ্ঠ শোনা যেত, এখন সেখানে ঘড়ির টিকটিক শব্দও আলাদা করে শোনা যেত। তিন সন্তান একই বাড়িতে থাকলেও তাদের জীবন যেন তিনটি আলাদা ঘরে বন্দি।
মিতালী নিজের জীবনকে নিয়মের মধ্যে ধরে রেখেছিলেন। ভোরে ওঠা, প্রার্থনা, সংসারের হিসাব, সন্তানদের খোঁজ নেওয়া—সবকিছুই ছিল পূর্বনির্ধারিত।
তার পোশাকও ছিল সেই জীবনের প্রতিচ্ছবি। প্রশস্ত, সংযত পোশাক; মাথা ঢাকা; সামান্য গয়না। বাইরে গেলে তার হাঁটাচলা ছিল শান্ত, চোখ নিচু, কথাবার্তা মেপে।
কিন্তু বাড়ির অন্য দুই নারী যেন সম্পূর্ণ অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা।
সাওলি সকালবেলা ঘুমাত, দুপুরে উঠত। রাত ছিল তার সক্রিয় সময়। তার ঘরের ড্রেসিং টেবিল ভর্তি প্রসাধনী, সুগন্ধি, চুলের সামগ্রী আর নানা ধরনের গয়না।
সোহিনী আরও পরিপাটি। তার পোশাক বাছাইয়ের মধ্যে ছিল হিসাব। কোন অনুষ্ঠানে কী পরবে, কার সঙ্গে দেখা হলে কেমন দেখাবে—এসব নিয়ে সে অনেক বেশি সচেতন।
মিতালী কখনো কখনো দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের দেখতেন।
তিনি বুঝতেন, দুই মেয়ে বড় হয়েছে।
কিন্তু তাদের বড় হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যেন তিনি তাদের হারিয়েও ফেলছেন।
অধ্যায় ২ — বন্ধ দরজার ওপারে
প্রথমে মিতালী শুধু গন্ধ পেতেন।
সিগারেটের গন্ধ।
তারপর শুনতেন হাসির শব্দ।
তারপর গভীর রাতে অপরিচিত মানুষের কণ্ঠ।
একদিন রাতে তিনি সাওলির দরজায় ধাক্কা দিলেন।
— “দরজা খোল।”
ভেতর থেকে কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।
তারপর সাওলি দরজা খুলল।
চুল এলোমেলো, চোখে গাঢ় মেকআপের ছাপ, কানে ঝুলন্ত কয়েকটি নতুন দুল।
মিতালী ঘরের দিকে তাকালেন।
— “এখানে এত লোক কেন?”
সাওলি কাঁধ ঝাঁকাল।
— “বন্ধুরা এসেছে।”
— “এখন রাত কত?”
— “জানি।”
— “তাহলে সবাইকে চলে যেতে বল।”
সাওলি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “মা, তুমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।”
সেই রাতের কথোপকথন খুব বড় কোনো ঝগড়ায় পরিণত হয়নি।
কিন্তু মিতালী নিজের ঘরে ফিরে বুঝলেন, তার কর্তৃত্বে প্রথম ফাটল ধরেছে।
অধ্যায় ৩ — প্রথম আপস
কয়েক মাস ধরে একই ঘটনা চলল।
মিতালী বকতেন।
সাওলি প্রতিবাদ করত।
সোহিনী যুক্তি দিত।
জিহান চুপ করে থাকত।
তারপর একদিন মিতালী আর কিছু বললেন না।
সাওলি রাত তিনটায় ফিরেছিল।
দরজা খুলে দেখল মা বসে আছেন।
সে ভেবেছিল আবার ঝগড়া হবে।
কিন্তু মিতালী শুধু বললেন,
— “খেয়ে নিস।”
সাওলি থেমে গেল।
— “তুমি রাগ করছ না?”
মিতালী মাথা নাড়লেন।
— “রাগ করে কী লাভ?”
সাওলি প্রথমবার মায়ের মুখের দিকে গভীরভাবে তাকাল।
সেই মুহূর্তে দুজনের মধ্যে অদ্ভুত এক নীরবতা তৈরি হলো।
মিতালী ভাবলেন, তিনি হয়তো বাস্তবতাকে মেনে নিতে শিখছেন।
কিন্তু আসলে তিনি প্রথমবার সীমারেখা সরিয়ে দিচ্ছিলেন।
অধ্যায় ৪ — মেয়েদের পৃথিবীতে প্রবেশ
সাওলির জন্মদিনে বাড়িতে বড় আয়োজন হলো।
মিতালী প্রথমে নিজের ঘরেই ছিলেন।
কিন্তু সাওলি এসে তাকে বলল,
— “মা, তুমি সারাক্ষণ একা বসে থাকবে?”
— “তোমাদের অনুষ্ঠান।”
— “তুমিও তো এই বাড়ির মানুষ।”
মিতালী শেষ পর্যন্ত নিচে এলেন।
সেদিন তিনি লক্ষ্য করলেন, মেয়েরা তাকে আর বাধা হিসেবে দেখছে না।
বরং নিজেদের জগতের একজন হিসেবে গ্রহণ করছে।
সাওলি তার মায়ের চুল একটু গুছিয়ে দিল।
সোহিনী হালকা মেকআপ করে দিল।
আয়নায় নিজেকে দেখে মিতালী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তিনি নিজেকে চিনতে পারছিলেন।
কিন্তু একই সঙ্গে নতুন কিছু দেখতে পাচ্ছিলেন।
একজন নারী, যিনি এতদিন শুধু মা ছিলেন।
সেদিন প্রথমবার তিনি নিজের জন্য সাজলেন।
এবং আশ্চর্যজনকভাবে ভালো লাগল।
অধ্যায় ৫ — পোশাকের পরিবর্তন
পরিবর্তন এবার নিয়মিত হয়ে উঠল।
মিতালীর আলমারিতে নতুন পোশাক যোগ হতে লাগল।
প্রথমে সাওলি কিনে আনত।
তারপর মিতালী নিজেই দোকানে গিয়ে পছন্দ করতে শুরু করলেন।
তিনি আগের মতো পোশাকের রঙ নিয়ে দ্বিধা করতেন না।
চুল খোলা রাখতেন।
নতুন সুগন্ধি ব্যবহার করতেন।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় কাটাতেন।
একদিন সোহিনী বলল,
— “মা, তোমাকে এখন অনেক তরুণ দেখায়।”
মিতালী হেসে ফেললেন।
— “বয়স কমে গেছে নাকি?”
— “না। কিন্তু তোমার চোখে আগের ভয়টা নেই।”
কথাটা মিতালীর মনে রয়ে গেল।
তিনি বুঝতে শুরু করলেন—সাজগোজ তার কাছে শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন নয়।
এটা ছিল নিজের ওপর আবার অধিকার ফিরে পাওয়ার অনুভূতি।
অধ্যায় ৬ — ট্যাটুর প্রথম রেখা
সাওলির কবজির ছোট ট্যাটুটি মিতালীর খুব পছন্দ হয়েছিল।
এক সন্ধ্যায় তিনি আঙুল দিয়ে নকশাটার দিকে ইশারা করে বললেন,
— “এটা করিয়েছিস কবে?”
— “অনেকদিন আগে।”
— “ব্যথা করেনি?”
— “করেছিল। কিন্তু সহ্য করা যায়।”
কথাটা মিতালীর মনে অদ্ভুতভাবে দাগ কাটল।
কয়েক সপ্তাহ পর তিনি নিজেই একটি ছোট নকশা বেছে নিলেন।
কবজির কাছে খুব সূক্ষ্ম একটি অসম্পূর্ণ বৃত্ত।
সাওলি অবাক হয়ে বলল,
— “সত্যি করবে?”
মিতালী আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “হ্যাঁ।”
ট্যাটুটি করার পর কয়েকদিন তিনি বারবার কবজির দিকে তাকালেন।
তার কাছে এটি কোনো ফ্যাশন মাত্র ছিল না।
এটি ছিল তার জীবনের পুরোনো অধ্যায়ের সঙ্গে নতুন অধ্যায়ের মাঝখানে একটি চিহ্ন।
পরে কানের পিয়ার্সিংও বাড়ল।
একটি নতুন ছোট দুল।
তারপর আরেকটি।
প্রতিবারই তিনি বলতেন,
— “এটাই শেষ।”
আর প্রতিবারই কয়েক মাস পর নতুন কিছু যোগ হতো।
অধ্যায় ৭ — নেশার দরজা
নেশার জগতে মিতালীর প্রবেশও ধীরে হয়েছিল।
প্রথমে তিনি শুধু পাশে বসতেন।
তারপর অন্যদের হাতে কী আছে সেটা নিয়ে কৌতূহলী হতেন।
এক রাতে সাওলি তাকে বলল,
— “তুমি এত চিন্তা করো কেন? একটু রিল্যাক্স করো।”
মিতালী হেসে বললেন,
— “আমি তো রিল্যাক্স করতেই পারি না।”
সাওলি বলল,
— “সেটাই তোমার সমস্যা।”
সেই রাতের পর মিতালী মাঝে মাঝে মেয়েদের সঙ্গে বসতে শুরু করলেন।
যে জিনিসগুলো একসময় তার কাছে ঘৃণ্য মনে হতো, সেগুলো ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠল।
পরিচিত জিনিসকে মানুষ খুব সহজেই স্বাভাবিক বলে ভাবতে শুরু করে।
মিতালীর ক্ষেত্রেও তাই হলো।
অধ্যায় ৮ — রাতের শহর
একসময় রাত দশটার পর মিতালী বাইরে থাকলে প্রতিবেশীরা অবাক হতো।
তারপর রাত বারোটা।
তারপর রাত দুইটা।
শহরের আলো তাকে টানতে শুরু করেছিল।
রেস্তোরাঁ, লাউঞ্জ, পার্টি, বন্ধুদের জমায়েত—প্রতিটি জায়গায় তিনি নতুন পরিচিতি পাচ্ছিলেন।
কেউ তাকে বিধবা নারী হিসেবে চিনত না।
কেউ তার মৃত স্বামীর কথা জানত না।
কেউ জানত না তিনি তিন সন্তানের মা।
তিনি শুধু মিতালী।
এই পরিচয়টি তার কাছে নেশার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল।
অধ্যায় ৯ — সামাজিক মাধ্যমে নতুন মিতালী
সাওলি একদিন মায়ের ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করল।
মিতালী প্রথমে আপত্তি করেছিলেন।
— “আমার ছবি কেন দিচ্ছিস?”
— “কারণ তোমাকে ভালো লাগছে।”
ছবিটি ছড়িয়ে পড়ল।
অচেনা মানুষের প্রশংসা আসতে লাগল।
মিতালী প্রথমে বিব্রত হয়েছিলেন।
তারপর নিজেই ছবি তুলতে শুরু করলেন।
নতুন পোশাক।
নতুন চুলের স্টাইল।
ক্যাফেতে বসে ছবি।
রাতের শহরের আলোয় ছবি।
ট্যাটু দেখা যাচ্ছে এমন ছবি।
তার অনুসারী বাড়তে লাগল।
মিতালী আবিষ্কার করলেন, নিজের জীবনকে শুধু বাঁচাই নয়—দেখানোও যায়।
তিনি নিজের একটি নতুন অনলাইন পরিচয় তৈরি করলেন।
সেখানে তিনি আর শুধু ‘মা’ নন।
তিনি স্বাধীন, আত্মবিশ্বাসী এবং নিজের সিদ্ধান্তে চলা একজন নারী।
অধ্যায় ১০ — জিহানের দূরত্ব
সবাই যখন মিতালীর পরিবর্তনকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করছিল, জিহান তখন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল।
এক রাতে সে মাকে বলল,
— “তুমি কি সুখী?”
মিতালী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
— “হ্যাঁ।”
জিহান বলল,
— “তাহলে আমার মনে হয় তুমি নিজেকে বোঝাচ্ছ।”
মিতালী বিরক্ত হলেন।
— “তুই আমার জীবন বুঝবি না।”
জিহান শান্তভাবে বলল,
— “আগে তুমি আমাদের জীবন বুঝতে চাইতে। এখন তুমি শুধু নিজেরটা বাঁচতে চাও।”
মিতালী আর উত্তর দিলেন না।
জিহান সেদিন নিজের ঘরে চলে গেল।
কিছুদিন পর সে বাড়ির বাইরে বেশি সময় কাটাতে শুরু করল।
মায়ের সঙ্গে কথা কমল।
খাবার টেবিলে তিনজনের হাসির মাঝখানে তার নীরবতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
মিতালী সেটা লক্ষ্য করতেন।
কিন্তু নিজেকে বলতেন—
“ওরও নিজের জীবন আছে।”
এই বাক্যটি ধীরে ধীরে তার অপরাধবোধকে চাপা দেওয়ার ঢাল হয়ে উঠল।
অধ্যায় ১১ — তিন নারীর নতুন পরিচয়
সময়ের সঙ্গে মিতালী, সাওলি ও সোহিনীকে শহরের অনেকেই একসঙ্গে চিনতে শুরু করল।
তিনজনের সাজ আলাদা।
সাওলি ছিল সবচেয়ে বেপরোয়া।
সোহিনী ছিল পরিমিত কিন্তু আকর্ষণীয়।
মিতালী তাদের মাঝামাঝি—পরিণত বয়সের আত্মবিশ্বাস আর নতুন জীবনের উচ্ছ্বাসের অদ্ভুত সংমিশ্রণ।
তাদের সামাজিক জীবন বিস্তৃত হলো।
নতুন বন্ধু।
নতুন পরিচিতি।
নতুন সম্পর্ক।
নতুন ব্যবসায়িক যোগাযোগ।
আর প্রতিটি নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের সঙ্গে তাদের পুরোনো পারিবারিক জীবন আরও দূরে সরে যেতে লাগল।
মিতালী কখনো কখনো মাঝরাতে বাড়ি ফিরে সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
পুরো বাড়ি অন্ধকার।
শুধু জিহানের ঘরের দরজার নিচ দিয়ে আলো বেরোচ্ছে।
তিনি দরজার সামনে গিয়ে থামতেন।
কড়া নাড়তেন না।
শুধু কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে আবার নিজের ঘরে ফিরে যেতেন।
কারণ তিনি জানতেন—
তার ছেলে তাকে হারিয়ে ফেলছে।
আর সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো, তিনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন না যে তাকে ফিরে পেতে তিনি সত্যিই চেষ্টা করতে চান কি না।
এভাবেই পতনের পরবর্তী অধ্যায়ের দরজা খুলে গেল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)