10-08-2026, 01:10 AM
অগোচরা
অধ্যায় ১ - শুরুর আরম্ভ
পরম নিশ্চিন্তে যে মেয়েটা আমার নগ্ন বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে, সে জানেই না আমি কী ভাবছি। আমি ভাবছি, আদৌ মুক্তি পেয়েছি কি না?
মুক্তি আছে আমার হাতের নাগালে আর পাশের ঘরে!
আমি একজন শুটার। ছিলাম আর কি। সত্যি বলতে, হতে হতেও হয়ে উঠিনি। যদি হতাম, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পদক থাকতো আমার ঝুলিতে। কিন্তু সে সুযোগ আমি কখনও পাইনি। বলা ভালো, আমাকে সুযোগই দেওয়া হয়নি। অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিল আমাকে, আর এই ঘটনাটাই আমূল পাল্টে দেয় আমার জীবন।
আমার চেয়ে ভালো শুটার না হয়েও সালেকীন নামের একজন এশিয়ান গেমসের ৫০ মিটার দূরপাল্লার শুটিংয়ে অংশ নেবার সুযোগ পেয়ে যায়। দীর্ঘদিন থেকে সে শুটিং ক্লাবের মেম্বার। অন্যদিকে আমাকে কখনও সাধারণ মেম্বারশিপও দেয়নি তারা।
সালেহীনের আরেকটি বড় পরিচয় ছিল-প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর আপন ভাগ্নে সে। এদিকে আমি…আমার গল্পটা আসলে সিনেমার মতো। কখনও কখনও মনে হয়, সিনেমাও এমনটা হয় কী না কে জানে!
এ দেশে মন্ত্রী মানে ছোটখাটো রাজা। নারীকে পুরুষ, পুরুষকে নারী বানানো ছাড়া সবই করতে পারে এরা। নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে ভাগ্নেকে এশিয়ান গেমসে পাঠায় ঐ মন্ত্রী, ধুলিস্যাৎ করে দেয় আমার স্বপ্ন। ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি এ রকম সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবো। এমন অন্যায়ের শিকার হয়ে একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম, ডুবে গিয়েছিলাম হতাশায়। চারপাশের মানুষজন আমার পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা দিতো। তাদের এই সান্ত্বনা আরো বেশি অসহ্য ঠেকতো আমার কাছে।
তীব্র হতাশা নিয়ে এখানে সেখানে বিক্ষিপ্তভাবে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করে দিলাম, সঙ্গি হিসেবে পেয়ে গেলাম বাল্যবন্ধু মুন্নাকে। এর আগে তার সঙ্গে অতোটা সখ্যতা ছিল না আমার, ক্লাস টু থেকে এইট পর্যন্ত পড়েছি একসঙ্গে, কিন্তু মুন্না পর পর দুবার ফেল করলে আমাদের কলেজ থেকে টিসি দেয়া হয় তাকে, সে চলে যায় অন্য একটা কলেজে। এরপর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগও কমে আসে আমার। পাশাপাশি মহল্লায় থাকি বলে মাঝেমধ্যে পথেঘাটে দেখা হতো অবশ্য।
আমার এমন দুর্দিনে সেই মুন্নাই হয়ে উঠল একমাত্র সহচর। ফেন্সিডিলে আসক্ত ছিল সে, আমার দুঃখ ভোলাতে উদাত্তচিত্তে বোতল বাড়িয়ে দিয়েছিল—সেই থেকে শুরু হয়ে গেল আমারও।
তবে তার ফেন্সিডিল সেবনের সঙ্গি হলেও আমাকে এক টাকাও খরচ করতে হতো না। ফেন্সি সেবন করার পর প্রচুর চিনি দিয়ে চা পান করতাম নেশা গাঢ় করার জন্য, সেই সাথে চলতো সিগারেট। গভীর রাতে বাড়ি ফিরতাম, কখনও কখনও মুন্নার বাড়িতেও থেকে যেতাম রাতে। সারা রাত আমরা ভিসিআরে হিন্দি-ইংরেজি সিনেমা দেখতাম, সিগারেট খেতাম। ভোরের দিকে ক্লান্তিতে ঘুম আসতো। খুব বেলা করে উঠতাম দুজন। মানুষজন যখন দুপুরের খাবার খাওয়ার প্রস্তুতি নিতো, আমরা তখন নাস্তা করতাম। এভাবেই দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল একটা ঘোরের মধ্যে। ভালো-মন্দ হিসেব করার মতো বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি।
কিন্তু আমার এই আসক্তির কথা বেশিদিন গোপন থাকেনি।
বাবাকে হারিয়ে ছিলাম জ্ঞান হবার আগেই, মাকে হারাই ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়। পরগাছার মতো বড় ভাইয়ের সংসারে মানুষ হয়েছি, সেই ভাই নেশা করার কথা জেনে যাবার পর ভীষণ রেগে গেল, চড়থাপ্পড় মেরে গালাগালি করলো আমাকে। তারটা খেয়ে-পরে আমি কী না নেশা করছি! ভাবি আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছিল, এমন ছেলে বাড়িতে থাকলে তার সন্তানেরাও নষ্ট হয়ে যাবে।
খুব আত্মসম্মানে লেগেছিল কথাগুলো। সেদিনই এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়ি আমি। চিরতরের জন্য। একই এলাকায় থাকার সুবাদে বড়ভাই আর ভাবির সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা হয়ে গেলে তারা এড়িয়ে যেতো আমাকে। এক সময় আমিও এড়িয়ে যেতে শুরু করলাম। আমার জীবন থেকে মুছে ফেললাম তাদেরকে, হয়ে গেলাম পুরোপুরি পরিবারবিহীন পিছুটানহীন একজন মানুষ।
মুন্নার বাপের বেশ কয়েকটি বাড়ি ছিল পুরান ঢাকায়, একটা বাদে সবগুলো ভাড়া দিয়ে রাজার হালে থাকতো তারা। গেন্ডারিয়ায় এরকম একটি ভাড়া দেয়া বাড়ির চিলেকোঠায় মুন্নার ঘর ছিল মওজ-মাস্তি করার জন্য। ওখানে ইয়ার-দোস্ত নিয়ে তাস খেলতো, নেশাপানি করতো, কখনও কখনও মেয়েমানুষ নিয়ে আসতো। বাড়ি ছাড়ার পর কিছুদিনের জন্য আমার ঠাঁই হলো সেই চিলেকোঠায়। সেখানে তাস খেলা, মদ্যপান চলতো প্রতিদিন।
রিপন নামে হ্যাংলা মতোন এক ছেলে ছিল মুন্নার পরিচিত, সেই ছেলে কোত্থেকে যেন অল্প বয়সি তরুণীদের নিয়ে আসতো রাতের বেলায়। মেয়েগুলোকে রেখে চলে যেতো, নিয়ে যেতো পরদিন সকালে। দেখে মনে হতো কলেজপড়ুয়া, খারাপ মেয়ে হিসেবে ওদেরকে মেনে নিতে কষ্ট হতো আমার।
এমন না যে মুন্না একাই সম্ভোগ করার জন্য নিয়ে আসতো ওদেরকে, প্রতিবার আমাকেও সাধতো কিন্তু আমি কখনও ওসব করিনি। কেন করিনি, জানি না।
আমার কি ঘেন্না লাগতো? অস্বস্তি হতো? নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। কাজ শেষে মুন্না ঘুমিয়ে পড়তো, নয়তো ছাদের এককোণে গিয়ে সিগারেট খেতো, তখন ওদের সঙ্গে আলাপ করতাম আমি, নিতান্তই আগ্রহ থেকে।
নাম কি? কই থাকো?
এই পেশায় কেন আসছো?
বাড়িতে কে কে আছে?
সত্যি বলতে, এমন প্রশ্ন শুনে মেয়েগুলো খুবই বিরক্ত হতো। সম্ভবত এরকম প্রশ্ন তারা অনেকবার অনেকের কাছ থেকে শুনেছে। তবে তারা বুঝতো আমি মুন্নার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ঐ চিলেকোঠাতেই থাকি, তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও জবাব দিতো।
মিথ্যেই বলতো তারা। আমি বুঝতাম, তারপরও ওদের মিথ্যেগুলো শুনতাম আগ্রহ নিয়ে। মিথ্যে যদি ধরা যায়, সত্যিটাও বের করে নেওয়া যায় অনায়াসে। আমি ওদের মিথ্যে থেকে সত্যিটা আন্দাজ করে নিতাম।
টানবাজারে যায়। একদিন আমারে কী কয়, জানোস?”
আমি উন্মুখ হয়ে রইলাম শোনার জন্য।
“কয়, শবনরে বিয়া করবো!” সিগারেটে শেষ টানটা বেশ জোরে দিয়ে হাসতে লাগলো মুন্না। “পুরা মাথা খারাপ হয়া গেছিল মাদারচোদের। ওর এই আলগা পিরিতি হোগা দিয়া ভইরা দিছে টানবাজারের মাস্তানরা। ক্যামনে জানি হেরা টের পাইয়া গেছিল…খানকি ভাগাইতে চাস, মাদারচোদ! দীন ইসলামরে এমন মাইর দিছে…থেরেটও করছে…আর যদি টানবাজারে দেহি, মাইরা শীতলক্ষ্যায় ফালায়া দিমু।”
ঐ মেয়েটাও কি দীন ইসলামকে ভালোবাসতো? এমন প্রশ্ন না করে পারিনি আমি।
“ক্যামতে কমু,” গাল চুলকে বলেছিল মুন্না। “তয় ঐ মাইয়াও ভাইগ্যা যাইতে রাজি হয় নাই।”
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম।
“খানকিপাড়ায় এইরকম বহুত মানুষ আহে যায়…লাগায়া মাগায়া দিওয়ানা হইয়া কয় ভালোবাসে, বিয়া করবো, বুঝছোস? মাইয়াগুলান এইসব বহুত দেহে…দুইদিন পর এইসব নাগোরগো পেরেম-পিরিতি ফুট্টুস মারে!” কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুন্না আবার বলল, “তুইও কি তৃপ্তির…”
মাথা দোলালাম আমি। জোর দিয়ে বললাম, ও রকম কিছুই না। মেয়েটার প্রতি আমার মায়া জন্মে গেছে। স্রেফ মায়া। আমার কথা শুনে অবাক হয়েছিল মুন্না। অচেনা মানুষের প্রতি মায়া জন্মে কীভাবে? বিশ্বাস করতে পারছিল না।
“মায়া করোস ভালা কথা, মায়া কইরা-ই লাগাইতি!”
মায়া যে কী, মুন্নাকে সেটা বোঝাতে পারিনি। কেন যে মেয়েটার প্রতি আমার হুট করে মায়া জন্মালো, নিজেও জানি না। এই মায়ার তল কিংবা বিস্তৃতি কোথা থেকে শুরু, কোথায় গিয়ে শেষ হয়, তা-ও আমার অজানা।
শুধু জানি, মায়া খুব খারাপ জিনিস!
তৃপ্তির সঙ্গে রাত কাটালেও ওকে আমি ছুঁয়েও দেখিনি মেয়েটাও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমি কেন এমনটা করলাম। ওকে শুধু বলেছিলাম, এমনি। আর মানুষ যখন বলে এমনি…বুঝে নিতে হবে ‘এমনি’টা এমনি এমনি কিছু না, গভীর কারণ রয়েছে এর পেছনে। যে কারণের কথা সে গুছিয়ে বলতে পারে না। কিংবা বলতে চায় না।
এভাবে কিছুদিন চলার পর মনের ভেতরে খচখচানি শুরু হয়ে গেল-মুন্নার দয়ায় আর কতো দিন? টাকা রোজগারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে আমাকে। নিজের অন্নের সংস্থান নিজেকেই করতে হবে।
কিন্তু কী করবো আমি?
এখন পর্যন্ত একটা কাজই ভালোভাবে করতে পারি-লং রেঞ্জের রাইফেল দিয়ে শুটিং করা। বাড়ি ছাড়ার পর পড়াশোনার পাটও চুকে গেছে। জগন্নাথ কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়েছিলাম, ক্লাস করেছিলাম মাত্র কয়েক মাস, হতাশার চোরাবালিতে ডুবে যাবার পর সেখানে আর যাওয়া হয়নি।
একদিন সেই কলেজের এক ছাত্রনেতা সজল ভাই দেখা করলো আমার সঙ্গে। পাশের মহল্লার বড় ভাই হিসেবে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। আমার মহল্লার কিছু বড় ভাইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল তার, মহল্লায় নিয়মিত আড্ডা দিতে আসতো। দেখা হলে সালাম দিতাম, সে-ও আমার খোঁজ খবর নিতো। হয়তো শাঁখারিবাজারের শুকলাল ঘোষে ঢুকেছি কাচ্চি খেতে, দেখি সজল ভাইও আছে সেখানে, ব্যস, বিলের টাকা আর দিতে হতো না আমাকে। এটা পুরান ঢাকার অলিখিত নিয়ম-বড়রা ছোটদের হোটেলের বিল দিয়ে দেয়।
সজল ভাইয়ের বাপ বিরাট বড়লোক, অঢেল টাকার মালিক, তাই দেদারসে টাকা খরচ করতে কসুর করতো না। ঐদিন আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কাবাব-পরোটা খাইয়ে আপ্যায়ন করলো খুব। অন্য সবার মতো সান্ত্বনাও দিলো, সেই সাথে উসকে দিলো আমার ভেতরে থাকা তুষের আগুন।
“তোর মতো শুটাররে কেমনে বাদ দিলো হারামজাদারা!” আমার কাঁধে স্নেহময় হাত রেখে আক্ষেপের ভঙ্গিতে বলেছিল। “সালেকীনের মামুর আরেক ভাইগ্না আজগর কলেজে ভর্তি হইছে…মামুর জোরে আমাগো পার্টিতে হান্দাইছে।”
বুঝতে পারলাম, সালেকীনের মামা আমার সাথে যা করেছে, সজল ভাইদের সঙ্গেও তাই করছে।
“আমরা কতোদিন ধইরা কতো কষ্ট কইরা রাজনীতি করি আর এই হালারপো দুইদিন ধইরা কলেজে ঢুইকা-ই রেডিমেড নেতা হইবার চাইতাছে! ওর হোগা দিয়া আমি নেতাগিরি ঢুকায়া দিমু!”
এসব রাজনীতির সাথে আমার কী সম্পর্ক? আমাকে কেন এসব কথা বলছে সজল ভাই?—মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
“ওরে খায়া ফালাইতে অইবো।”
আমার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলেছিল। যেন যুগ যুগ ধরে আমরা দুজনে মিলে ‘খেয়ে ফেলার কাজটা করছি একসঙ্গে। স্পষ্ট কথা, তারপরও আমি বুঝতে পারছিলাম না।
“ত্রিশ হাজার দিমু তোরে…” কথাটা বলেই পকেট থেকে দশ হাজার টাকার বান্ডিল বের করে দেয়। “এই কামটায় কোনো রিস্ক নাই। গোলাগুলির মইদ্যে দূর থেইক্যা মাইরা দিবি…সব ব্যবস্থা করুম আমি। কেউ কিচ্ছু বুঝবার পারবো না।”
তারপর সবটা খুলে বলেছিল। আমার কাজ কেবল নিরাপদ দূরত্বে থেকে সহি নিশানা লাগানো।
ত্রিশ হাজার টাকা তখনকার দিনে কম না। হেসেখেলে আমার ছয় মাস চলে যাবে। তারপরও অনেক দ্বিধা ছিল আমার মধ্যে কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল ঐ মন্ত্রীর উপরে ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ উগলে দেবার সুযোগ আর অতোগুলো টাকার হাতছানির যৌথ প্রলোভনে রাজি হয়ে গেলাম আমি।
জগন্নাথ কলেজে বিবাদমান দুটো ছাত্রসংগঠনের মধ্যে মারামারি লাগার পর কলেজ ক্যাম্পাস দখল করে ফেলেছিল সজল ভাইদের প্রতিপক্ষ সংগঠনটি। ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হবার পর তারা তক্কে তক্কে ছিল পুণর্দখল করার জন্য। কিন্তু একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে ক্যাম্পাস হয়ে পড়ে দূর্গ-সশস্ত্র প্রহরা থাকে দিন-রাত। ভেতরে ঠিক কতোজন কতোগুলো অস্ত্র নিয়ে কোথায় অবস্থান করছে, সেটা নিশ্চিত করে জানার উপায় থাকে না। তার চেয়েও বড় কথা, গুলির মজুদ কী রকম, সেসব জানতে পারা আরো কঠিন কাজ। সেই কঠিন কাজ অবশ্য সহজ হয়ে গেছিল একজনের কারণে।
“বিধুদারে টার্গেট কর্!”
কয়েক মুহূর্তের জন্য আমি সজল ভাইয়ের কথা বুঝতে পারলাম না। টেলিস্কোপ থেকে চোখ সরিয়ে তাকালাম তার দিকে। আমার ঠিক পাশেই আছে সে, কোমর থেকে পিস্তল বের করে জিন্সের প্যান্টে আলতো করে চাপড় মারলো।
“জলদি কর্!…ভিতরে ঢুইকা পড়বো!”
রীতিমতো বজ্রাহত আমি। এরকম কথা শোনার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। সজল ভাই তার নিজের নেতাকে মারতে চাচ্ছে!
“যা কইতাছি কর্!” পিস্তলটা দিয়ে নিজের গাল চুলকে খুবই শান্তকণ্ঠে আদেশ করলো।
দম বন্ধ হয়ে এলো আমার। চট করেই বুঝে গেলাম, তার কথার বরখেলাপ হলে আমার জন্য কী পরিণতি অপেক্ষা করবে। কিন্তু এটাও মাথায় জেঁকে বসলো, কাজ শেষে আমাকে…
“গুলি কর্!” তাড়া দিলো সজল ভাই
জীবনের প্রথম মিশনেই, রীতিমতো গানপয়েন্টে আমি। ভয়ানক বিপদ। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই।
বিধুদাকে টেলিস্কোপের ক্রশ-হেয়ারে নিয়ে নিলাম। সে তখন ক্যাম্পাস দখল করা জেনারেলের ভূমিকায়। দুহাতে পিস্তল নিয়ে নিজের ক্যাডার বাহিনিকে নির্দেশ দিচ্ছে
জায়গামতো অবস্থান নেবার জন্য। ততক্ষণে ভেতরে থাকা প্রতিপক্ষ দলের ক্যাডাররা ক্যাম্পাস থেকে সটকে পড়তে শুরু করেছে। আকাশের দিকে তাক্ করে বিধুদা গুলি ছুঁড়তে লাগলো প্রতিপক্ষকে পালানোর সুযোগ করে দেবার জন্য।
ট্রিগার না চেপে আর কোনো উপায় ছিল না।
আমার অব্যর্থ নিশানা বিধুদাকে বিদীর্ণ করে ফেলল! সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়লো সে। সদ্য ক্যাম্পাস দখল করা তার ক্যাডার বাহিনি হতভম্ব হয়ে পড়লো এ ঘটনায়। এলোপাথারি গুলি ছুঁড়তে শুরু করলো তারা।
আমার দম বন্ধ হয়ে এলো। এই বুঝি সজল ভাইয়ের পিস্তলটা গর্জে উঠবে, পেছন থেকে উড়িয়ে দেবে আমার মাথার খুলি!
“গুটায়ে ফেল সব…জলদি কর্!”
সজল ভাই তাড়া দিলো। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। এ যাত্রায় প্রাণটা বেঁচে গেল তাহলে!
রাইফেল, টেলিস্কোপ আর স্ট্যান্ডটা গুটিয়ে ব্যাগে ভরে নেবার পর সজল ভাই আমাকে নিরাপদে বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দিলো। কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারলো না কিন্তু সারাটা রাত নির্ঘুম কাটলো আমার। মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো, যা করেছি ঠিকমতো করতে পেরেছি তো?
পরদিন সজল ভাই ডেকে পাঠালো আমাকে। ইসলামপুরের পরিত্যক্ত এক বাড়িতে দেখা করলাম। নির্জন দোতলায় একটা চেয়ারে বসে বিয়ার খাচ্ছে বিমর্ষ মুখে। গত বছর স্বৈরাচারের পতনের পরই এই বাড়িটা দখলে নিয়েছে সে।
“হালায় তো মরে নাই,” আফসোসের সুর তার কণ্ঠে। “গুলি ঠিকই লাগছে, তয় হাতে…” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আরেকটু এইদিক ওইদিক হইলেই কাম হইয়া যাইতো।”
অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রাখলাম আমি।
“যাউকগিয়া, কেউ যেন এইটা জানবার না পারে, আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বলল সজল ভাই। “জানবার পারলে আমি তো শ্যাষই…তুই-ও খাম হইয়া যাইবি। বুঝছোস?”
মাথা নেড়ে সায় দিলাম। তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে পুরো ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে দিলো।
এটা আমি আশা করিনি। ভেবেছিলাম কাজ যেহেতু হয়নি টাকা আর দেবে না।
চুপচাপ টাকাগুলো নিয়ে চলে আসি ওখান থেকে।
চলবে?
আমি xossipy সাইটে নতুন, কিভাবে ছবি আড করতে হয়, কিভাবে পোস্ট করতে হয় ঠিকমতো জানি না। সবাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি।
উপন্যাসটি ভালো লাগলে কমেন্ট করে জানাবেন। ধন্যবাদ ?
অধ্যায় ১ - শুরুর আরম্ভ
পরম নিশ্চিন্তে যে মেয়েটা আমার নগ্ন বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে, সে জানেই না আমি কী ভাবছি। আমি ভাবছি, আদৌ মুক্তি পেয়েছি কি না?
মুক্তি আছে আমার হাতের নাগালে আর পাশের ঘরে!
আমি একজন শুটার। ছিলাম আর কি। সত্যি বলতে, হতে হতেও হয়ে উঠিনি। যদি হতাম, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পদক থাকতো আমার ঝুলিতে। কিন্তু সে সুযোগ আমি কখনও পাইনি। বলা ভালো, আমাকে সুযোগই দেওয়া হয়নি। অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছিল আমাকে, আর এই ঘটনাটাই আমূল পাল্টে দেয় আমার জীবন।
আমার চেয়ে ভালো শুটার না হয়েও সালেকীন নামের একজন এশিয়ান গেমসের ৫০ মিটার দূরপাল্লার শুটিংয়ে অংশ নেবার সুযোগ পেয়ে যায়। দীর্ঘদিন থেকে সে শুটিং ক্লাবের মেম্বার। অন্যদিকে আমাকে কখনও সাধারণ মেম্বারশিপও দেয়নি তারা।
সালেহীনের আরেকটি বড় পরিচয় ছিল-প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর আপন ভাগ্নে সে। এদিকে আমি…আমার গল্পটা আসলে সিনেমার মতো। কখনও কখনও মনে হয়, সিনেমাও এমনটা হয় কী না কে জানে!
এ দেশে মন্ত্রী মানে ছোটখাটো রাজা। নারীকে পুরুষ, পুরুষকে নারী বানানো ছাড়া সবই করতে পারে এরা। নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে ভাগ্নেকে এশিয়ান গেমসে পাঠায় ঐ মন্ত্রী, ধুলিস্যাৎ করে দেয় আমার স্বপ্ন। ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি এ রকম সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবো। এমন অন্যায়ের শিকার হয়ে একেবারে ভেঙে পড়েছিলাম, ডুবে গিয়েছিলাম হতাশায়। চারপাশের মানুষজন আমার পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা দিতো। তাদের এই সান্ত্বনা আরো বেশি অসহ্য ঠেকতো আমার কাছে।
তীব্র হতাশা নিয়ে এখানে সেখানে বিক্ষিপ্তভাবে ঘোরাঘুরি করতে শুরু করে দিলাম, সঙ্গি হিসেবে পেয়ে গেলাম বাল্যবন্ধু মুন্নাকে। এর আগে তার সঙ্গে অতোটা সখ্যতা ছিল না আমার, ক্লাস টু থেকে এইট পর্যন্ত পড়েছি একসঙ্গে, কিন্তু মুন্না পর পর দুবার ফেল করলে আমাদের কলেজ থেকে টিসি দেয়া হয় তাকে, সে চলে যায় অন্য একটা কলেজে। এরপর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগও কমে আসে আমার। পাশাপাশি মহল্লায় থাকি বলে মাঝেমধ্যে পথেঘাটে দেখা হতো অবশ্য।
আমার এমন দুর্দিনে সেই মুন্নাই হয়ে উঠল একমাত্র সহচর। ফেন্সিডিলে আসক্ত ছিল সে, আমার দুঃখ ভোলাতে উদাত্তচিত্তে বোতল বাড়িয়ে দিয়েছিল—সেই থেকে শুরু হয়ে গেল আমারও।
তবে তার ফেন্সিডিল সেবনের সঙ্গি হলেও আমাকে এক টাকাও খরচ করতে হতো না। ফেন্সি সেবন করার পর প্রচুর চিনি দিয়ে চা পান করতাম নেশা গাঢ় করার জন্য, সেই সাথে চলতো সিগারেট। গভীর রাতে বাড়ি ফিরতাম, কখনও কখনও মুন্নার বাড়িতেও থেকে যেতাম রাতে। সারা রাত আমরা ভিসিআরে হিন্দি-ইংরেজি সিনেমা দেখতাম, সিগারেট খেতাম। ভোরের দিকে ক্লান্তিতে ঘুম আসতো। খুব বেলা করে উঠতাম দুজন। মানুষজন যখন দুপুরের খাবার খাওয়ার প্রস্তুতি নিতো, আমরা তখন নাস্তা করতাম। এভাবেই দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল একটা ঘোরের মধ্যে। ভালো-মন্দ হিসেব করার মতো বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম আমি।
কিন্তু আমার এই আসক্তির কথা বেশিদিন গোপন থাকেনি।
বাবাকে হারিয়ে ছিলাম জ্ঞান হবার আগেই, মাকে হারাই ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময়। পরগাছার মতো বড় ভাইয়ের সংসারে মানুষ হয়েছি, সেই ভাই নেশা করার কথা জেনে যাবার পর ভীষণ রেগে গেল, চড়থাপ্পড় মেরে গালাগালি করলো আমাকে। তারটা খেয়ে-পরে আমি কী না নেশা করছি! ভাবি আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছিল, এমন ছেলে বাড়িতে থাকলে তার সন্তানেরাও নষ্ট হয়ে যাবে।
খুব আত্মসম্মানে লেগেছিল কথাগুলো। সেদিনই এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়ি আমি। চিরতরের জন্য। একই এলাকায় থাকার সুবাদে বড়ভাই আর ভাবির সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা হয়ে গেলে তারা এড়িয়ে যেতো আমাকে। এক সময় আমিও এড়িয়ে যেতে শুরু করলাম। আমার জীবন থেকে মুছে ফেললাম তাদেরকে, হয়ে গেলাম পুরোপুরি পরিবারবিহীন পিছুটানহীন একজন মানুষ।
মুন্নার বাপের বেশ কয়েকটি বাড়ি ছিল পুরান ঢাকায়, একটা বাদে সবগুলো ভাড়া দিয়ে রাজার হালে থাকতো তারা। গেন্ডারিয়ায় এরকম একটি ভাড়া দেয়া বাড়ির চিলেকোঠায় মুন্নার ঘর ছিল মওজ-মাস্তি করার জন্য। ওখানে ইয়ার-দোস্ত নিয়ে তাস খেলতো, নেশাপানি করতো, কখনও কখনও মেয়েমানুষ নিয়ে আসতো। বাড়ি ছাড়ার পর কিছুদিনের জন্য আমার ঠাঁই হলো সেই চিলেকোঠায়। সেখানে তাস খেলা, মদ্যপান চলতো প্রতিদিন।
রিপন নামে হ্যাংলা মতোন এক ছেলে ছিল মুন্নার পরিচিত, সেই ছেলে কোত্থেকে যেন অল্প বয়সি তরুণীদের নিয়ে আসতো রাতের বেলায়। মেয়েগুলোকে রেখে চলে যেতো, নিয়ে যেতো পরদিন সকালে। দেখে মনে হতো কলেজপড়ুয়া, খারাপ মেয়ে হিসেবে ওদেরকে মেনে নিতে কষ্ট হতো আমার।
এমন না যে মুন্না একাই সম্ভোগ করার জন্য নিয়ে আসতো ওদেরকে, প্রতিবার আমাকেও সাধতো কিন্তু আমি কখনও ওসব করিনি। কেন করিনি, জানি না।
আমার কি ঘেন্না লাগতো? অস্বস্তি হতো? নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। কাজ শেষে মুন্না ঘুমিয়ে পড়তো, নয়তো ছাদের এককোণে গিয়ে সিগারেট খেতো, তখন ওদের সঙ্গে আলাপ করতাম আমি, নিতান্তই আগ্রহ থেকে।
নাম কি? কই থাকো?
এই পেশায় কেন আসছো?
বাড়িতে কে কে আছে?
সত্যি বলতে, এমন প্রশ্ন শুনে মেয়েগুলো খুবই বিরক্ত হতো। সম্ভবত এরকম প্রশ্ন তারা অনেকবার অনেকের কাছ থেকে শুনেছে। তবে তারা বুঝতো আমি মুন্নার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ঐ চিলেকোঠাতেই থাকি, তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও জবাব দিতো।
মিথ্যেই বলতো তারা। আমি বুঝতাম, তারপরও ওদের মিথ্যেগুলো শুনতাম আগ্রহ নিয়ে। মিথ্যে যদি ধরা যায়, সত্যিটাও বের করে নেওয়া যায় অনায়াসে। আমি ওদের মিথ্যে থেকে সত্যিটা আন্দাজ করে নিতাম।
টানবাজারে যায়। একদিন আমারে কী কয়, জানোস?”
আমি উন্মুখ হয়ে রইলাম শোনার জন্য।
“কয়, শবনরে বিয়া করবো!” সিগারেটে শেষ টানটা বেশ জোরে দিয়ে হাসতে লাগলো মুন্না। “পুরা মাথা খারাপ হয়া গেছিল মাদারচোদের। ওর এই আলগা পিরিতি হোগা দিয়া ভইরা দিছে টানবাজারের মাস্তানরা। ক্যামনে জানি হেরা টের পাইয়া গেছিল…খানকি ভাগাইতে চাস, মাদারচোদ! দীন ইসলামরে এমন মাইর দিছে…থেরেটও করছে…আর যদি টানবাজারে দেহি, মাইরা শীতলক্ষ্যায় ফালায়া দিমু।”
ঐ মেয়েটাও কি দীন ইসলামকে ভালোবাসতো? এমন প্রশ্ন না করে পারিনি আমি।
“ক্যামতে কমু,” গাল চুলকে বলেছিল মুন্না। “তয় ঐ মাইয়াও ভাইগ্যা যাইতে রাজি হয় নাই।”
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম।
“খানকিপাড়ায় এইরকম বহুত মানুষ আহে যায়…লাগায়া মাগায়া দিওয়ানা হইয়া কয় ভালোবাসে, বিয়া করবো, বুঝছোস? মাইয়াগুলান এইসব বহুত দেহে…দুইদিন পর এইসব নাগোরগো পেরেম-পিরিতি ফুট্টুস মারে!” কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুন্না আবার বলল, “তুইও কি তৃপ্তির…”
মাথা দোলালাম আমি। জোর দিয়ে বললাম, ও রকম কিছুই না। মেয়েটার প্রতি আমার মায়া জন্মে গেছে। স্রেফ মায়া। আমার কথা শুনে অবাক হয়েছিল মুন্না। অচেনা মানুষের প্রতি মায়া জন্মে কীভাবে? বিশ্বাস করতে পারছিল না।
“মায়া করোস ভালা কথা, মায়া কইরা-ই লাগাইতি!”
মায়া যে কী, মুন্নাকে সেটা বোঝাতে পারিনি। কেন যে মেয়েটার প্রতি আমার হুট করে মায়া জন্মালো, নিজেও জানি না। এই মায়ার তল কিংবা বিস্তৃতি কোথা থেকে শুরু, কোথায় গিয়ে শেষ হয়, তা-ও আমার অজানা।
শুধু জানি, মায়া খুব খারাপ জিনিস!
তৃপ্তির সঙ্গে রাত কাটালেও ওকে আমি ছুঁয়েও দেখিনি মেয়েটাও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমি কেন এমনটা করলাম। ওকে শুধু বলেছিলাম, এমনি। আর মানুষ যখন বলে এমনি…বুঝে নিতে হবে ‘এমনি’টা এমনি এমনি কিছু না, গভীর কারণ রয়েছে এর পেছনে। যে কারণের কথা সে গুছিয়ে বলতে পারে না। কিংবা বলতে চায় না।
এভাবে কিছুদিন চলার পর মনের ভেতরে খচখচানি শুরু হয়ে গেল-মুন্নার দয়ায় আর কতো দিন? টাকা রোজগারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে আমাকে। নিজের অন্নের সংস্থান নিজেকেই করতে হবে।
কিন্তু কী করবো আমি?
এখন পর্যন্ত একটা কাজই ভালোভাবে করতে পারি-লং রেঞ্জের রাইফেল দিয়ে শুটিং করা। বাড়ি ছাড়ার পর পড়াশোনার পাটও চুকে গেছে। জগন্নাথ কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়েছিলাম, ক্লাস করেছিলাম মাত্র কয়েক মাস, হতাশার চোরাবালিতে ডুবে যাবার পর সেখানে আর যাওয়া হয়নি।
একদিন সেই কলেজের এক ছাত্রনেতা সজল ভাই দেখা করলো আমার সঙ্গে। পাশের মহল্লার বড় ভাই হিসেবে আগে থেকেই পরিচয় ছিল। আমার মহল্লার কিছু বড় ভাইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল তার, মহল্লায় নিয়মিত আড্ডা দিতে আসতো। দেখা হলে সালাম দিতাম, সে-ও আমার খোঁজ খবর নিতো। হয়তো শাঁখারিবাজারের শুকলাল ঘোষে ঢুকেছি কাচ্চি খেতে, দেখি সজল ভাইও আছে সেখানে, ব্যস, বিলের টাকা আর দিতে হতো না আমাকে। এটা পুরান ঢাকার অলিখিত নিয়ম-বড়রা ছোটদের হোটেলের বিল দিয়ে দেয়।
সজল ভাইয়ের বাপ বিরাট বড়লোক, অঢেল টাকার মালিক, তাই দেদারসে টাকা খরচ করতে কসুর করতো না। ঐদিন আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কাবাব-পরোটা খাইয়ে আপ্যায়ন করলো খুব। অন্য সবার মতো সান্ত্বনাও দিলো, সেই সাথে উসকে দিলো আমার ভেতরে থাকা তুষের আগুন।
“তোর মতো শুটাররে কেমনে বাদ দিলো হারামজাদারা!” আমার কাঁধে স্নেহময় হাত রেখে আক্ষেপের ভঙ্গিতে বলেছিল। “সালেকীনের মামুর আরেক ভাইগ্না আজগর কলেজে ভর্তি হইছে…মামুর জোরে আমাগো পার্টিতে হান্দাইছে।”
বুঝতে পারলাম, সালেকীনের মামা আমার সাথে যা করেছে, সজল ভাইদের সঙ্গেও তাই করছে।
“আমরা কতোদিন ধইরা কতো কষ্ট কইরা রাজনীতি করি আর এই হালারপো দুইদিন ধইরা কলেজে ঢুইকা-ই রেডিমেড নেতা হইবার চাইতাছে! ওর হোগা দিয়া আমি নেতাগিরি ঢুকায়া দিমু!”
এসব রাজনীতির সাথে আমার কী সম্পর্ক? আমাকে কেন এসব কথা বলছে সজল ভাই?—মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
“ওরে খায়া ফালাইতে অইবো।”
আমার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলেছিল। যেন যুগ যুগ ধরে আমরা দুজনে মিলে ‘খেয়ে ফেলার কাজটা করছি একসঙ্গে। স্পষ্ট কথা, তারপরও আমি বুঝতে পারছিলাম না।
“ত্রিশ হাজার দিমু তোরে…” কথাটা বলেই পকেট থেকে দশ হাজার টাকার বান্ডিল বের করে দেয়। “এই কামটায় কোনো রিস্ক নাই। গোলাগুলির মইদ্যে দূর থেইক্যা মাইরা দিবি…সব ব্যবস্থা করুম আমি। কেউ কিচ্ছু বুঝবার পারবো না।”
তারপর সবটা খুলে বলেছিল। আমার কাজ কেবল নিরাপদ দূরত্বে থেকে সহি নিশানা লাগানো।
ত্রিশ হাজার টাকা তখনকার দিনে কম না। হেসেখেলে আমার ছয় মাস চলে যাবে। তারপরও অনেক দ্বিধা ছিল আমার মধ্যে কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল ঐ মন্ত্রীর উপরে ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ উগলে দেবার সুযোগ আর অতোগুলো টাকার হাতছানির যৌথ প্রলোভনে রাজি হয়ে গেলাম আমি।
জগন্নাথ কলেজে বিবাদমান দুটো ছাত্রসংগঠনের মধ্যে মারামারি লাগার পর কলেজ ক্যাম্পাস দখল করে ফেলেছিল সজল ভাইদের প্রতিপক্ষ সংগঠনটি। ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হবার পর তারা তক্কে তক্কে ছিল পুণর্দখল করার জন্য। কিন্তু একবার হাতছাড়া হয়ে গেলে ক্যাম্পাস হয়ে পড়ে দূর্গ-সশস্ত্র প্রহরা থাকে দিন-রাত। ভেতরে ঠিক কতোজন কতোগুলো অস্ত্র নিয়ে কোথায় অবস্থান করছে, সেটা নিশ্চিত করে জানার উপায় থাকে না। তার চেয়েও বড় কথা, গুলির মজুদ কী রকম, সেসব জানতে পারা আরো কঠিন কাজ। সেই কঠিন কাজ অবশ্য সহজ হয়ে গেছিল একজনের কারণে।
“বিধুদারে টার্গেট কর্!”
কয়েক মুহূর্তের জন্য আমি সজল ভাইয়ের কথা বুঝতে পারলাম না। টেলিস্কোপ থেকে চোখ সরিয়ে তাকালাম তার দিকে। আমার ঠিক পাশেই আছে সে, কোমর থেকে পিস্তল বের করে জিন্সের প্যান্টে আলতো করে চাপড় মারলো।
“জলদি কর্!…ভিতরে ঢুইকা পড়বো!”
রীতিমতো বজ্রাহত আমি। এরকম কথা শোনার জন্য একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। সজল ভাই তার নিজের নেতাকে মারতে চাচ্ছে!
“যা কইতাছি কর্!” পিস্তলটা দিয়ে নিজের গাল চুলকে খুবই শান্তকণ্ঠে আদেশ করলো।
দম বন্ধ হয়ে এলো আমার। চট করেই বুঝে গেলাম, তার কথার বরখেলাপ হলে আমার জন্য কী পরিণতি অপেক্ষা করবে। কিন্তু এটাও মাথায় জেঁকে বসলো, কাজ শেষে আমাকে…
“গুলি কর্!” তাড়া দিলো সজল ভাই
জীবনের প্রথম মিশনেই, রীতিমতো গানপয়েন্টে আমি। ভয়ানক বিপদ। কিন্তু কিচ্ছু করার নেই।
বিধুদাকে টেলিস্কোপের ক্রশ-হেয়ারে নিয়ে নিলাম। সে তখন ক্যাম্পাস দখল করা জেনারেলের ভূমিকায়। দুহাতে পিস্তল নিয়ে নিজের ক্যাডার বাহিনিকে নির্দেশ দিচ্ছে
জায়গামতো অবস্থান নেবার জন্য। ততক্ষণে ভেতরে থাকা প্রতিপক্ষ দলের ক্যাডাররা ক্যাম্পাস থেকে সটকে পড়তে শুরু করেছে। আকাশের দিকে তাক্ করে বিধুদা গুলি ছুঁড়তে লাগলো প্রতিপক্ষকে পালানোর সুযোগ করে দেবার জন্য।
ট্রিগার না চেপে আর কোনো উপায় ছিল না।
আমার অব্যর্থ নিশানা বিধুদাকে বিদীর্ণ করে ফেলল! সঙ্গে সঙ্গে লুটিয়ে পড়লো সে। সদ্য ক্যাম্পাস দখল করা তার ক্যাডার বাহিনি হতভম্ব হয়ে পড়লো এ ঘটনায়। এলোপাথারি গুলি ছুঁড়তে শুরু করলো তারা।
আমার দম বন্ধ হয়ে এলো। এই বুঝি সজল ভাইয়ের পিস্তলটা গর্জে উঠবে, পেছন থেকে উড়িয়ে দেবে আমার মাথার খুলি!
“গুটায়ে ফেল সব…জলদি কর্!”
সজল ভাই তাড়া দিলো। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। এ যাত্রায় প্রাণটা বেঁচে গেল তাহলে!
রাইফেল, টেলিস্কোপ আর স্ট্যান্ডটা গুটিয়ে ব্যাগে ভরে নেবার পর সজল ভাই আমাকে নিরাপদে বাড়ি পর্যন্ত পৌছে দিলো। কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারলো না কিন্তু সারাটা রাত নির্ঘুম কাটলো আমার। মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো, যা করেছি ঠিকমতো করতে পেরেছি তো?
পরদিন সজল ভাই ডেকে পাঠালো আমাকে। ইসলামপুরের পরিত্যক্ত এক বাড়িতে দেখা করলাম। নির্জন দোতলায় একটা চেয়ারে বসে বিয়ার খাচ্ছে বিমর্ষ মুখে। গত বছর স্বৈরাচারের পতনের পরই এই বাড়িটা দখলে নিয়েছে সে।
“হালায় তো মরে নাই,” আফসোসের সুর তার কণ্ঠে। “গুলি ঠিকই লাগছে, তয় হাতে…” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আরেকটু এইদিক ওইদিক হইলেই কাম হইয়া যাইতো।”
অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রাখলাম আমি।
“যাউকগিয়া, কেউ যেন এইটা জানবার না পারে, আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বলল সজল ভাই। “জানবার পারলে আমি তো শ্যাষই…তুই-ও খাম হইয়া যাইবি। বুঝছোস?”
মাথা নেড়ে সায় দিলাম। তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে পুরো ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে দিলো।
এটা আমি আশা করিনি। ভেবেছিলাম কাজ যেহেতু হয়নি টাকা আর দেবে না।
চুপচাপ টাকাগুলো নিয়ে চলে আসি ওখান থেকে।
চলবে?
আমি xossipy সাইটে নতুন, কিভাবে ছবি আড করতে হয়, কিভাবে পোস্ট করতে হয় ঠিকমতো জানি না। সবাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি।
উপন্যাসটি ভালো লাগলে কমেন্ট করে জানাবেন। ধন্যবাদ ?


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)
