Yesterday, 11:07 AM
গুপ্ত বীজ
|
Adultery গুপ্ত বীজ
|
|
11 hours ago
পর্ব ১: সাধের উঠান ও শাশুড়ির বিষবাণ
জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুর। ছায়াবাজ গ্রামটায় আজ একটু উৎসবের আমেজ। দিয়া ভাবির সাধের অনুষ্ঠান। দিয়াদের দোতলা দালানের মস্ত বড় উঠানে সামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। চারপাশ থেকে পাড়া-পড়শী, জ্যাঠাই-খুড়ি আর বউ-ঝিদের আনাগোনা। বাতাসে কচি পাঁঠার মাংস আর গোবিন্দভোগ চালের পায়েসের সুবাস। উঠানের এক কোণে একটা কাঠের সোফায় সেজেগুজে বসে আছে দিয়া। গা ভর্তি সোনার গয়না, কপালে বড় লাল সিঁদুরের টিপ, লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন আস্ত একটা লক্ষ্মী প্রতিমা। পাশে বসে পাড়ার বউরা কেউ ঠাট্টা-তামাশা করছে, কেউ বা দিয়ার গোলগাল পেটটা দেখিয়ে বলছে, "লক্ষণ তো পুরা কোল আলো করা পুত্তুর সন্তানের রে দিয়া!" চারপাশে এতো কোলাহল, মিষ্টি একটা পরিবেশ, কিন্তু শ্রীময়ীর কানে সেসব কিছুই ঢুকছে না। সে বসে আছে তার শাশুড়ি মহামায়া দেবীর ঠিক গা ঘেঁষে। মহামায়ার মুখটা সকাল থেকেই তিতা করলার মতো হয়ে আছে। একে তো অন্যের ঘরের সুখ সহ্য হয় না, তার ওপর নিজের ঘরে কোনো 'সুসংবাদ' নাই। শ্রীময়ীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে একটা চিলতে থুতু ফেললেন মহামায়া। তারপর ফিসফিসানি অথচ ধারালো গলায় শুরু করলেন— শাশুড়ি: "আমার যে কবে ভাগ্য হইবো, একটু নাতি-নাতনির মুখ দেখুম! কপালটাই পোড়া আমার। দুনিয়ার সব মাগীগো কোলে ছাও-পাও খেলে, আর আমার ঘরে একখান অলক্ষ্মী আইসা জাঁইতা বসছে!" শ্রীময়ী মাথা নিচু করে রইল। শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে চোখ দুটো বুজে ফেলল। এই তিন বছরে এমন কথা তার নিত্যদিনের সঙ্গী। ডাক্তার-কবিরাজ, শিবের মাথায় জল ঢালা, মাদুলি—কিছুই বাকি রাখেনি সে। অথচ বছর খানেক আগে একবার খুব মিনতি করে স্বামী সৌম্যকে বলেছিল— শ্রীময়ী: "ওগো, ডাক্তার তো আমার কোনো সমস্যা পায় নাই। তুমি যদি একবার শহরে গিয়া একটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাইতা...।" ঐ কথা শোনামাত্র সৌম্য যেন বাঘের মতো গর্জে উঠেছিল। খাটের ওপর লাথি মেরে বলেছিল— সৌম্য: "তর এতো বড় সাহস? তুই আমারে নপুংসক কবি? নিজের বাঝা (বন্ধ্যা) দোষ ঢাকনের লিগা আমার ওপর দোষ চাপাস? আর কোনোদিন যদি এই কথা মুখে আনছস, " এই কথা যদি শাশুড়ির কানে যেত, তবে তো শ্রীময়ীকে মেরেই কেটে ভাসিয়ে দিত নদীতে। মহামায়া দেবী শ্রীময়ীকে চুপ করে থাকতে দেখে আরও খেপে গেলেন। কনুই দিয়ে একটা গুঁতো মেরে বললেন— শাশুড়ি: "কী রে ? কানে তালা লাগছে? কী কপাল কইরা যে একখান বাঝা মাইয়া ঘরে তুলছিলাম! বিয়ার তিন বছর পার হইয়া গেল, এখনো পেটডায় একটা ইঁদুরও পয়দা করতে পারলি না? কান ছিদ্র কইরা কথা ঢুকতাছে, নাকি তুলা গুঁজ্যা রাখছ?" শ্রীময়ী: (খুব ধীর আর অপরাধীর গলায়) "হ মা, শুনতেছি...।" শাশুড়ি: "হ তো কী? মুখ দিয়া শুধু 'হ' বাইর হয়! ঐ দেহো, ওহোনাও তো একটা ফুটফুটে ছেলে জন্ম দিল গেল বৈশাখে। আর এই দিয়াও পোয়াতি। তর কবে হইবো রে বাঝার বেটি? কাইলকা যদি আমি মরি, পাড়ার মাইনষে তো আমারে শ্মশানে নেওয়ার আগেও থুতু দিব, বলবে তর বংশে পিণ্ডি দেওয়ার কেউ নাই!" ওহোনা দিয়ার পাশেই বসে ছিল। সে শ্রীময়ীর খুড়তুতো শ্বশুরের বউমা, দুই বাড়ি পরেই থাকে। ওহোনাও বিয়ের পর দুই-তিন বছর ভুগেছিল। কত ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়ে শেষমেশ গত বৈশাখে তার কোল আলো করে ছেলে এসেছে। শাশুড়ি: "একটু লজ্জা শরম থাকলে ওহোনার পায়ে গিয়া পড়তি। জিগাইতি, কোন ডাক্তারের ওষুদ খাইয়া ওর পেটটা বাঁধলো! আমার পোলাডা রোদে পুইড়া, বৃষ্টিতে ভিইজ্যা শহরে পইড়া রইছে টাকা কামানোর লিগা। আর এই নচ্ছার মাগী গাঁয়ে হাওয়া লাগাইয়া ঘুইরা বেড়ায়!" শ্রীময়ীর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। কান্নাটা গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছে। সৌম্য সপ্তাহে মাত্র দুই দিনের জন্য বাড়ি আসে। শনিবার-রবিবার থেকে সোমবার ভোরে আবার শহরে চলে যায়। ওই দুই দিনে শ্রীময়ী নিজের মনের ব্যথা, চোখের জল ভাগ করে নেওয়ার মতো একটু সময়ও পায় না। উল্টো সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়, কখন স্বামী রেগে যায়। এমন সময় দিয়া ভাবির শ্বশুর অমরবাবু ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন। হাসিমুখে বললেন— অমরবাবু: "বৌদি, ও বউমারা, আসেন আসেন। দুপুরের খাবারের আয়োজন পুরা রেডি। ছাদের ওপর প্যান্ডেল করা হইছে, সবাই চলেন।" মহামায়া দেবী একগাল কৃত্রিম হাসি ছড়ালেন— শাশুড়ি: "হ চলেন দাদা, আমরা তো ঘরের মানুষই। চল রে বউ।" সবাই হুড়মুড় করে দোતলার ছাদের দিকে রওনা দিল। মহামায়াও আগে আগে হাঁটা দিলেন। কিন্তু শ্রীময়ীর পা দুটো যেন মাটির সাথে আটকে গেছে। বুকের ভেতর এমন এক জ্বালা, যেখানে আজ এই আনন্দের দিনে এক লোকমা ভাত মুখে তোলার রুচিও তার নেই। মানুষের নানান কথার খোঁচা আর শাশুড়ির বিষাক্ত গালিগালাজ তার পেটের ক্ষিধেকে এক নিমেষে মেরে ফেলেছে। খাওয়াদাওয়া শেষ হলো। পাড়ার লোকজনের সাথে লোকদেখানো হাসি-কুশল বিনিময় করে বিদায় নিলেন মহামায়া দেবী। শ্রীময়ী শাশুড়ির পিছু পিছু ধীরপায়ে বাড়ির পথ ধরল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছি হচ্ছি করছে, বাঁশঝাড়ের ওপাশ থেকে তপ্ত হাওয়া বইছে। গ্রামের কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় মহামায়ার মুখের বিষ একটুও কমেনি। বরং ভরপেট খাওয়ার পর তাঁর গলার জোর আরও বেড়েছে। শ্রীময়ী আঁচল দিয়ে মুখটা চেপে ধরল, যাতে কান্নার আওয়াজ বাইরে না আসে। সে জানে, এই গ্রামের মাটিতে তার চোখের জলের কোনো দাম নেই। যতক্ষণ না তার গর্ভ থেকে কোনো সন্তান আসছে, ততক্ষণ সে এই বাড়িতে একটা দাসী আর 'অপয়া' ছাড়া আর কিছুই না। সূয্যি মামাটা যেমন আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছে, শ্রীময়ীর জীবনটাও যেন এক অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে।
10 hours ago
.....শ্রীময়ী
10 hours ago
Darun
9 hours ago
পর্ব ২: পুকুরপাড়ের গুপ্তকথা ও এক কালবোশেখী রহস্য
দুদিন পরের কথা। দুপুর বারোটা বাজে। জ্যৈষ্ঠের চড়া রোদ মাথার ওপর ঠিকরে পড়ছে। শ্রীময়ী বাড়ি থেকে শ’দুয়েক মিটার দূরে রাধামাধব মুদি দোকানে এসেছিল তরকারির জন্য গুঁড়ো হলুদ কিনতে। মাথায় আঁচলটা আলগা করে টানা। হঠাৎ দোকানে সওদা করতে আসা ওহোনাকে দেখে শ্রীময়ীর বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। ওহোনাকে দেখলেই শ্রীময়ীর মনে হয়, এই বুঝি আবার বাচ্ছা-কাচ্ছা নিয়ে খোঁটা দেওয়া শুরু করবে! সম্পর্কে ভাসুর-বউ হলেও ওহোনার সাথে শ্রীময়ীর কোনোদিনই তেমন খাপ খায় না। বিশেষ করে গত বৈশাখে ছেলে জন্ম দেওয়ার পর থেকে ওহোনার ভাবসাবই আলাদা। শরীরে মেদ জমেছে, বুকটা মায়াবী ভারী হয়েছে, স্লিভলেস ব্লাউজ আর জমকালো শাড়ি পরে গাঁয়ে দেমাক নিয়ে ঘোরে। শ্রীময়ীকে দেখেই ওহোনা ডাগর চোখে তাকিয়ে চড়া গলায় বলে উঠল— ওহোনা: "আরে শ্রীময়ী যে! কেমন আছিস রে? সেদিন তোরে তোর শাশুড়ির সাথে দিয়ার সাধে দেখলাম বটে, কিন্তুক ভিড়ের চোটে কথা বলার সুযোগই পাইলাম না।" শ্রীময়ী: (ম্লান হেসে) "ঐ চলে যাচ্ছে গো বৌদি, কোনোমতে বেঁচে আছি আর কী।" শ্রীময়ীর শুকিয়ে যাওয়া আমসি মুখ আর চোখের নিচের কালি দেখে ওহোনা ঝানু মহিলার মতো এক পলকেই সব বুঝে গেল। ওহোনা: "কী ব্যাপারে রে? মুখখানা অমন আমসি হয়ে আছে ক্যান? তোর শাশুড়ি মাগী আবার নতুন কোনো কীতন শুরু করছে নাকি?" শ্রীময়ী: "ও তো রোজকার কথা বৌদি। আর কী বলব তোমায়!" ওহোনা: "এক কাজ কর, চল ঐ বলাইবাবুর পুকুরপাড়ে গিয়া একটু বসি। বাতাস আছে ওদিকটায়, মনটাও হালকা হবে তোর।" শ্রীময়ী: (আমতা আমতা করে) "আরে না না বৌদি, এখন না। ঘরে দুপুরের রান্না বাকি আছে, তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।" ওহোনা: "আরে রাখ তোর রান্না! যাবি এখন, পাঁচটা মিনিট বোস আমার সাথে। চল তো!" ওহোনার জোরাজুরিতে শ্রীময়ী আর না করতে পারল না। দুপুর বারোটার খাঁ খাঁ রোদে বলাইবাবুর পুকুরপাড় একেবারে নিঝুম। চারধারে কেউ কোথাও নেই, শুধু বাঁশঝাড়ের পাতা কাঁপিয়ে সোঁ সোঁ করে বাতাস বইছে। দুজনে ঘাটের বাঁধানো চাতালে গিয়ে বসল। ওহোনা: "তোর যে ডাক্তার দেখানোর কথা ছিল, সেই ডাক্তারবাবু কী বলল রে?" শ্রীময়ী: "আমার সব রিপোর্ট তো ঠিকই আছে বৌদি। কোনো খুঁত পায় নাই ডাক্তার।" ওহোনা: "তা তোর বরের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাইছিস?" শ্রীময়ী: "পাগল নাকি! একবার শুধু মুখে বলছিলাম ওগো তুমি একটা টেস্ট করাও। ওরে বাবা! যে রাগ! মারতেই বাকি রাখল শুধু। বলল—আমি নাকি ওরে নপুংসক বানাইতে চাইছি!" কথাটা বলে শ্রীময়ী খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। চারপাশের গরম বাতাস যেন ওর বুকের দীর্ঘশ্বাসের সাথে মিশে যাচ্ছে। চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল ওর। শ্রীময়ী: "আমি আর পারছি না গো বৌদি, সত্যি পারছি না। রোজ দিন শাশুড়ির ওই বিষাক্ত ভাষণ আর গালিগালাজ সহ্য হয় না। আমারে বাঝা বলে, অপয়া বলে।" ওহোনা: "চিন্তা করিস না, সব ঠিক হইয়া যাবে।" শ্রীময়ী: (ওহোনার হাতটা চেপে ধরে আকুল হয়ে) "বৌদি, তুমি কোন ডাক্তার দেখাইছিলে, বলো না গো! আমায় একটু বলো, আমি পায়ে ধরে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি!" শ্রীময়ীর এমন আকুতি দেখে ওহোনা একটু থতমত খেয়ে গেল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে চোখজোড়া ঘুরিয়ে বলল— ওহোনা: "না... মানে... ডাক্তার তো সবই একই রে শ্রীময়ী। ঠিকঠাক চিকিৎসা হইলেই হইলো।" শ্রীময়ী: (এবার একদম ভেঙে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল) "তুমি আমারে লুকাইও না বৌদি! আমি আর পারছি না। আমার কপালে কি কোনোদিনই সুখ হবে না? না বর কথা শোনে, না শাশুড়ি আমার দুঃখ বোঝে! আমার মরণ ছাড়া আর কোনো পথ নাই রে বৌদি!" শ্রীময়ীর এই বুকফাটা কান্না দেখে ওহোনার পাষাণ মনেও কেমন যেন একটা দয়া হলো। সে চারপাশটা ভালো করে দেখে নিল—ঘাটে বা রাস্তায় কোনো মানুষজন নেই। ওহোনা একটু নড়েচড়ে বসে গলাটা নামাল। ওহোনা: "দেখ শ্রীময়ী, তোরে কাঁদতে দেখে আমার মনটা কেমন করতাছে। আমার ইচ্ছা করতাছে তোরে সব সত্যি কথা বলি। কিন্তু তুই শুনলে সইতে পারবি না।" শ্রীময়ী: (তাড়াতাড়ি আঁচল দিয়ে চোখ মুছে) "বলো গো বৌদি, বলো! তুমি যা করতে বলবা আমি তা-ই করব। আমার সাধ্যমতো সব চেষ্টা করব আমি।" ওহোনা আবার একটু চুপ হয়ে গেল। বুকভরে একটা শ্বাস নিয়ে চারপাশের শূন্যতা মেপে নিয়ে বলল— ওহোনা: "দেখ শ্রীময়ী, তুই আমারে ভুল বুঝিস না। আমার অবস্থা তোর থেকেও হাজার গুণ খারাপ আছিল। আমার ঐ রাক্ষসী শাশুড়ি আমারে ঘাড় ধইরা বাপের বাড়ি পাঠাইয়া দিছিল বাঝা থাপ্পড় দিয়া। কত কাকুতি-মিনতি, কান্নাকাটি কইরা পা ধরে আবার এই বাড়িতে ফিরতে পারছি।" শ্রীময়ী: "তারপর? তারপর কীভাবে পেট বাঁধল বৌদি? কত টাকার ওষুধ খাইছিলে? দাদাবাবু নিশ্চয়ই তোমায় অনেক সাপোর্ট করছে? আমার বরটার মতো তো খচ্চর না সে!" ওহোনা: (একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে) "আর কিসের দাদাভাই তোর! কারে কী বলবি! কাউরে কোনোদিন বলিস না এই কথা—আসল সমস্যাটা আমার আছিল না, সমস্যা আছিল তোর দাদাভাইয়ের শরীরে। আমার সব রিপোর্ট একদম জলের মতো পরিষ্কার আছিল।" শ্রীময়ী: (অবাক হয়ে) "কী করে বুঝলে বৌদি? দাদাবাবু কি টেস্ট করাইছিল?" ওহোনা: "ধুর পাগল! টেস্ট করাইব ঐ মরদ? পুরুষ মানুষের ইগো বুঝিস না? টেস্ট করায় নাই, কিন্তু আমি পরে গিয়া ঠিকই বুইঝা গেছি সমস্যা কার।" শ্রীময়ী: "কী বুঝলা?" ওহোনা: "বুঝলাম যে, তোর দাদাভাইয়ের মতো খোজার দ্বারা কোনোদিন কোনো মাগীর পেট বাঁধবে না।" শ্রীময়ী: "মানে? কী বলছ বৌদি এসব মাথা মুণ্ডু? তাহলে তোমার এই ফুটফুটে ছেলে... তোমার পেট বাঁধল কী করে?" ওহোনা এবার শ্রীময়ীর একদম কানের কাছে মুখটা আনল। গলার স্বর আরও এক পর্দা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল— ওহোনা: "এই পোলা তোর দাদাভাইয়ের দেওয়া না রে শ্রীময়ী...।" কথাটা শোনামাত্র শ্রীময়ী যেন আকাশ থেকে পড়ল! ওর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে এল। বড় বড় চোখ করে তাকাল ওহোনার দিকে। শ্রীময়ী: "কী বলছ কী তুমি বৌদি? মাথা ঠিক আছে তো তোমার? তবে... তবে কার পোলা ওটা?" ওহোনা: "আসিফ ভাই... আমাদের জমিতে যে জন-মজুরের কাজ করে। ও তো তোদের জমিতেও কতবার লাঙল দিছে, চিনিস না তারে?" শ্রীময়ী: (থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে) "হা... হা... ওই বিলের ধারে যে থাকে? ওই লোকটা? আমায় কী বিশ্বাস করতে বলো বৌদি! আমিও তো ও আমাদের জমিতে কাজ করার সময় কতবার গিয়ে ভাত দিয়ে আসছি! কিন্তু তুমি... তুমি ওই নোংরা, ছোটলোক মানুষটার সাথে... ছিঃ!" ওহোনা মাথা নিচু করে রইল। ওর চোখে কোনো অপরাধবোধ নেই, বরং এক অদ্ভুত বাঁচার লড়াইয়ের জেদ। ওহোনা: "আমার আর কোনো উপায় আছিল না রে শ্রীময়ী, তুই বিশ্বাস কর! আমার পিঠ দেয়ালে ঠেইক্যা গিয়াছিল। আমার সামনে আর কোনো রাস্তা খোলা আছিল না। একদিন দুপুরে আমিও ওরে মাঠে ভাত দিতে গেছিলাম। কথার পিঠে কথা উঠতেই আসিফ আমারে বলল, ওর নাকি দুই বউ। আর বড় বউ আবার পোয়াতি হইছে, ওটা নাকি ওর পাঁচ নম্বর বাচ্চা! প্রত্যেক বছর নাকি ওর ঘরে একটা কইরা বাচ্চা হয়। বুইঝা দ্যাখ এবার ব্যাপারটা...।" শ্রীময়ী পাথরের মতো বসে রইল। আসিফ নামের ওই কালো, চওড়া বুকের খেটে খাওয়া মানুষটাকে সে খুব ভালো করেই চেনে। কিন্তু ওহোনার জীবনের এই চরম আর ভয়ানক রহস্যের কথা শুনে শ্রীময়ীর দুই কান যেন ভোঁ ভোঁ করে অবশ হয়ে গেল। পুকুরপাড়ের সেই নিঝুম দুপুরে চারপাশের বাঁশঝাড় ভেদ করে সোঁ সোঁ শব্দে বাতাস বয়ে যেতে লাগল, যেন শ্রীময়ীর চেনা পৃথিবীটাকে এক লহমায় ওলটপালট করে দেওয়ার জন্য এক কালবোশেখী ঝড় ধেয়ে আসছে। শ্রীময়ী তখনো পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। ওহোনার মুখের দিকে তাকানোর মতো শক্তিও যেন তার নেই। ওহোনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রীময়ীর কাঁধে হাত রাখল। ওহোনা: "দেখ শ্রীময়ী, আমি জানি কাজটা ধর্মে সইবে না, ঠিক হয় নাই। কিন্তু সমাজ যখন আমারে বাঝা বলে প্রতিদিন একটু একটু কইরা মারতাছিল, তখন এই ধর্ম-অধর্মের কথা মাথায় আছিল না রে। আর ওই আসিফও তো এমনি এমনি কামটা করে নাই। আমার কান থেকে এক জোড়া সোনার দুল চ্যায়া নিছিল।" শ্রীময়ী: (হতভম্ব হয়ে) "আর তুমি... তুমি সত্যি ওরে নিজের সোনার দুল দিয়া দিলে বৌদি?" ওহোনা: "উপায় আছিল না রে বোন। ওই সোনার দুলের বদলে আজ আমি সমাজে যে সম্মান পাইছি, কোলের যে সন্তান পাইছি, তার দাম ওইটুক সোনার থেইক্যা অনেক অনেক বেশি। এখন আর আমার শাশুড়ি আমারে গালি দেয় না, পাড়ার মাইনষে বন্ধ্যা কয় না।" শ্রীময়ী: (মাথা নাড়তে নাড়তে) "আমার এখনো বিশ্বাস হইতেছে না বৌদি... তুমি এমন একটা কাণ্ড করতে পারলা!" ওহোনা: "স্বাভাবিক, এটা সহজে বিশ্বাস করার মতো কথা না। এই চরম গোপন কথা আজ পর্যন্ত শুধু আমার বুকেই চাপা আছিল। আজ তোর এই চোখের জল সইতে পারলাম না বইলাই তোরে মন খুইলা সব বললাম।" শ্রীময়ী: "কিন্তু তুমি... মানে ওই লোকটার সাথে, ওর বাসায়... ছিঃ, আমি ভাবতেই পারতাছি না বৌদি!" ওহোনা: "না রে পাগল, ওর বাসায় কেন হইতে যাইব? ওর বাসায় তো দুই কুঁড়ি বউ-বাচ্চা গিজগিজ করতাছে।" শ্রীময়ী: "তবে কি... তবে কি তোমার নিজের শয়নকক্ষে?" ওহোনা: "উঁহু, আমার বাসায় হইলে তো পরদিনই জানাজানি হইয়া যাইত। ঐ যে আমাদের পুব পাড়ের পুকুরপাড়ের জমিটা আছে না? গত পৌষ মাসে যখন খুব কুয়াশা আছিল, ও সেখানে লাঙল দেওয়ার কাম নিছিল। দুপুরবেলা যখন সবাই ঘরে ঘুমায়, আমি ওরে ভাত দিতে গেছিলাম। ভাত খাওয়ার পর... ঐ পাশের ঘন ঝাউবনের আড়ালে...।" ওহোনার কথা শেষ হওয়ার আগেই শ্রীময়ীর দুই কান ঝাঁ ঝাঁ করে গরম হয়ে উঠল। তার চোখের সামনে যেন ওই পৌষ মাসের কনকনে ঠাণ্ডা আর ঝাউবনের অন্ধকার জ্যৈষ্ঠের এই চড়া রোদেও ভেসে উঠল। সে একদৃষ্টে ওহোনার দিকে তাকিয়ে রইল, তার মুখ দিয়ে কোনো কথা সরল না। লজ্জায়, ঘৃণায় আর এক অজানা আতঙ্কে তার শরীর কাঁপতে লাগল। ওহোনা: "দেখ শ্রীময়ী, আমি তোরে কোনো জোর করতাছি না। তোর যদি মনে লয়, তুই একবার চেষ্টা কইরা দেখতে পারিস। এতটুকু তোরে গ্যারান্টি দিয়া বলতে পারি—তুই নিরাশ হবি না। আসিফের গাঙে পুরা জোয়ার।" ওহোনার এই শেষ কথাটাই যেন শ্রীময়ীর সতীত্বে আর আত্মসম্মানে গিয়ে মস্ত বড় একটা ধাক্কা দিল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তড়িৎস্পৃষ্টের মতো চাতাল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল— শ্রীময়ী: "তুমি ভাবলে কী করে বৌদি? এমন একটা জঘন্য আর নোংরা কাজ আমি করব? তোমার মতো একটা ভদ্র ঘরের বউয়ের মুখ থেকে আমি এই কথা আশা করি নাই! ওই একটা সস্তা, নোংরা জন-মজুরের সাথে... ছিঃ ছিঃ! আমার মরতে হইলেও মরব, তাও এমন পাপের ভাগী আমি কোনোদিন হবো না!" ঘৃণায় গা রি রি করে উঠল শ্রীময়ীর। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ওহোনার উত্তরের অপেক্ষা না করেই গায়ের আঁচলটা শক্ত করে জড়িয়ে হনহন করে বাড়ির দিকে রওনা দিল। ওহোনা পেছন থেকে একবার ডেকে ওঠার চেষ্টা করল— ওহোনা: "আরে শোন শোন শ্রীময়ী! রাগিস না রে বোন! আমার কথাডা শুইন্যা যা...!" কিন্তু কে শোনে কার কথা! শ্রীময়ী তখন কান বন্ধ করে প্রায় দৌড়ে পালাচ্ছে সেই পুকুরপাড় আর ওহোনার সেই ভয়ঙ্কর গোপন সত্য থেকে। কিন্তু যতই সে দূরে যাচ্ছে, তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত ঝড় যেন তাকে অনবরত তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
9 hours ago
পর্ব ৩
পুকুরপাড়ের সেই দুপুরের পর কেটে গেছে দুটো দিন। কিন্তু শ্রীময়ীর মাথার ভেতর থেকে ওহোনার ওই ঝাউবনের কথা কোনোমতেই সরছে না। ওহোনার সেই প্রতিটি কথা, আসিফের সেই চওড়া কালো খাটুনি শরীর আর সোনার দুলের বিনিময়ে পাওয়া সন্তানের গল্প যেন তার মগজে সাপের মতো কিলবিল করছে। সে যেন নিজের অজান্তেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। সংসারের কাজে মন বসছিল না তার। ফল যা হওয়ার তা-ই হলো। আজ রবিবার। স্বামী সৌম্য শহর থেকে এসেছে। রবিবার মানেই বাড়িতে একটু খাসির মাংসের আয়োজন। কিন্তু শ্রীময়ী যখন কড়া নাড়ছিল, তার মন পড়ে ছিল সেই ঝাউবনে। ফলস্বরূপ, মাংসের তরকারিতে লবণের পরিমাণ এতটাই বেশি হয়ে গেল যে মুখে তোলার কোনো উপায় রইল না। দুপুরের খাওয়ার টেবিলে সৌম্য মাংসের টুকরোটা মুখে দিয়েই থু-থু করে ফেলে দিল। কাঁসার থালাটা ঝনঝন করে ঠেলে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল— সৌম্য: " তরকারিতে কি এক বস্তা নুন ঢালছস? কুত্তাও তো এই নুন-পোড়া মাংস মুখে নিব না! সারাদিন ঘরে বইসা বইসা করসটা কী তুই?" পাশে বসে মহামায়া যেন আগুনেই ঘি ঢাললেন। তিনি শ্রীময়ীকে তুলোধোনা করার এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না। শাশুড়ি: "আর কইয়ো না বাবা! এর মন তো সংসারে নাই। পোড়ামুখী বাঝা তো বটেই, এখন রান্ধন বাড়নও ভুইলা গেছে। রাঁধতে দিছি মাংস, আর ও আমাগো খাওয়াইতাছে নুন-বিষ! বলি, রান্নাটা অন্তত ঠিকঠাক করো বউমা! সৌম্য আর এক লোকমাও মুখে তুলল না। রাগবশত হাত ধুয়ে, পরনের লুঙ্গিটা একটু ওপরে তুলে গটগট করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। শাশুড়িও রেগেমেগে কোনোমতে দুই মুঠো ডাল-ভাত মুখে দিয়ে থালা ঠেলে উঠে পড়লেন। নিঝুম রান্নাঘরে একলা বসে রইল শ্রীময়ী। সামনের কাঁসার থালায় তখনো পড়ে আছে সাদা ভাত আর এক বাটি কালচে ঝোলের নোনতা মাংস। তার চোখ থেকে টসটস করে জল পড়তে লাগল ভাতের থালায়। সে মনের ভেতর ডুকরে কেঁদে উঠল—"ভগবান! আগের জন্মে আমি এমন কী পাপ করছিলাম যে এই জন্মে আমার এই দশা? নিজের ঘরে আদর পাইলাম না, বরের মুখে একটা মিষ্টি কথা শুনলাম না, আর শাশুড়ির এই বিষাক্ত গালিগালাজ আর কত সইবো?" রাতে সৌম্য বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে, এসে খাটের ওপর আয়েশ করে শুয়ে পড়ল। শ্রীময়ী তার স্বামীর এই চওড়া পিঠটার দিকে তাকিয়ে রইল। এই পুরুষ মানুষটা তাকে কোনোদিন একটু বোঝার চেষ্টা করেনি। তার নিজের শরীরের কোনো ক্রুটি থাকতে পারে—এই সত্যিটা মেনে নেওয়ার মতো সাহসও সৌম্যর নেই। পুরুষালি অহংকার তার সবটুকু মানবিকতাকে গ্রাস করে নিয়েছে। সৌম্যর নাক ডাকার আওয়াজ যখন ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল, শ্রীময়ী তখন জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। দূরে বলাইবাবুর সেই পুকুরপাড়ের ঝাউবনটা অন্ধকারের বুকে কালচে একটা ছায়ার মতো জেগে আছে। হঠাৎ শ্রীময়ীর বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত কম্পন টের পেল সে। ওহোনার সেই বিষাক্ত অথচ জাদুকরী কথাগুলো আবার তার কানে বাজতে লাগল—"সোনার দুলের বদলে আজ আমি সমাজে যে সম্মান পাইছি, কোলের যে সন্তান পাইছি, তার দাম ওইটুক সোনার থেইক্যা অনেক অনেক বেশি..." শ্রীময়ী নিজের পেটে হাত রাখল। কানের কাছে হাত দিয়ে দেখল, তার কানেও তো এক জোড়া সোনার পাশা দুল জ্বলজ্বল করছে। সে কি তবে ওহোনার মতোই...? ঘৃণায় নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল সে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, এই অপমান আর কত দিন?
8 hours ago
Lovely writings
8 hours ago
চমৎকার গল্প ভাই পরের আপডেট দিন দাদা অপেক্ষা সহ্য হচ্ছেনা একটু বড় আপডেট দেবেন
2 hours ago
দারুণ গল্প পরের আপডেট দিন দাদা
1 hour ago
Great great update.... Waiting for next update
|
|
« Next Oldest | Next Newest »
|