এক
গ্রামের এক কোণায় টিনের ছাদ দেওয়া আধাপাকা ঘর। হারিকেনের টিমটিমে আলোয় বুশরা তার ২ বছরের ছোট ছেলেটারে কোলে নিয়ে পায়চারি করছেন। ছেলেটা সমানে কান্না করছে। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরে শেয়ালের হুক্কাহুয়া শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ বাঁশবাগানের দিক থেকে রঘুর কাশির শব্দ পাওয়া গেল।
বুশরা: (দরজার খিল খুলতে খুলতে) "রঘু আইলি বাপ? আইজ তো অনেক রাইত করলি। ছোটটা তো কানতে কানতে সারা হইল, কিছুতেই ঘুমায় না।"
রঘু: (হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ, জামা-কাপড়ে কালচে মবিলের দাগ আর ঘামের গন্ধ। দাওয়ায় বসে গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে) "হ মা, ফিরতে দেরি হইয়া গেল। গ্যারেজে মহাজন একটা পুরান ট্রাকের ইঞ্জিন খুলতে কইছিল। কাজ শেষ না কইরা তো আসা যায় না। ছোটটা কান্দে ক্যান? শরীর খারাপ নাকি?"
বুশরা: "কী জানি রে বাপ, মনে হয় পেটে ব্যথা। দুধও খাইতাছে না। তোর বাপে থাকলে আজ না হয় একটা ডাক্তার দেখাইতাম। দুইটা বছর গেল, মানুষটা মইরা গেল না জ্যান্ত আছে হেই খবরটাও দিল না।"
রঘু: (কড়া গলায়) "মা, তোমার ঐ এক কথা! বাপের নাম আর এই ঘরে নিও না। যে মানুষটা আমাগো এই অবস্থায় ফালায়া রাইখা শহরে গিয়া মৌজ করতাছে, তার কথা ভাইবা লাভ নাই। জমানো টাকা তো সব শেষ করলা তারে খুঁজতে গিয়া।"
বুশরা: (চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন) "তোর মেজ ভাই তো ঘুমাইয়া গেছে। ওরে কইছিলাম তোর লাইগা উইঠা থাকতে, কিন্তু পড়ার চাপে মনে হয় চোখ লাইগা আইছে।"
রঘু: "ঘুমান দাও ওরে। পড়ালেখাটাই ওর আসল কাম। আমার মতো যেন ওরে গ্যারেজের ময়লা ঘাঁটতে না হয়। মা, এই নাও—বাজারে আসবার সময় খাসির মাংস, কাচা বাজার আর ছোটটার লাইগা একটা বিস্কুটের প্যাকেট আনছি। খাইয়া যদি ও শান্ত হয়।"
বুশরা: "তোর নিজের খাওয়ার টাকা ছিল তো? নাকি না খাইয়া এইগুলা আনছস?"
রঘু: (ম্লান হেসে) "মহাজনের হোটেলে দুপুরে পেট ভইরা ডাল-ভাত খাইছি মা। চিন্তা কইরো না। যাও, পোলডারে কিছু খাওয়াও। আমি হাত-মুখ ধুইয়া আসি।"
বুশরা: (রঘুর দিকে তাকিয়ে মনের ভেতর ডুকরে কেঁদে ওঠেন) "১৯ বছর বয়স তোর, এই বয়সে তোর কলেজে যাওয়ার কথা ছিল। আমার পোড়া কপালের লাইগা আজ তোরে শহরের গ্যারেজে গতর খাটতে পাঠাইলাম।"
রঘু: (চোখের কোণে জল চেপে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়) "গাইয়া পোলা আমি মা, গতর না খাটলে ভাত আইবো কই থিকা? কান্দা থামাও। কাল তো শুক্রবার, আমি বাড়িতেই আছি। সকাল বেলা মেজ ভাইরে নিয়া বসুমু, দেহি ও কেমন পড়ালেখা করতাছে।"
ঘরের পেছনে বাঁশঝাড়ের ধারে একটা পুরানো টিউবওয়েল (কলপাড়)। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু হারিকেনের একটা আবছা আলো এসে পড়ছে কলের ওপর।
রঘু উঠান পেরিয়ে কলপাড়ে গিয়ে হারিকেনটা মাটিতে রাখল। তারপর নিজের ময়লা শার্ট আর প্যান্টটা খুলে একপাশে রাখল। পরনে শুধু একটা পুরনো, ছোট গামছা। দিনের বেলার রোদে পোড়া, গ্যারেজের খাটুনিতে পোক্ত হওয়া ওর ১৯ বছরের শরীরটা হারিকেনের আলোয় চিকচিক করছে। ও কলের হাতল ধরে জোরে জোরে চাপতে শুরু করল। ঠাণ্ডা পানি ওর ক্লান্ত গায়ে পড়তেই এক ধরণের স্বস্তির শব্দ করল।
বুশরা সরকার কোলে ছোট ছেলেটাকে নিয়ে ওকে সামলাতে সামলাতে পেছনে পেছনে কলপাড়ে এলেন। ওর হাতে রঘুর জন্য একটা শুকনো গামছা।
বুশরা: "রঘু, আস্তে চাপ বাপ। অত রাইতে অত জোরে আওয়াজ হইলে আশেপাশের মাইনষে কী ভাববো?"
রঘু: (কল চাপতে চাপতেই, গায়ে পানি দিতে দিতে) "ভাবলে ভাবুক গে মা। সারাদিন গ্যারেজের পোড়া মবিল আর ঘামে শরীরটা রি রি করতাছিল। একটু ঠাণ্ডা পানি না পড়লে ঘুম আইবো না।"
বুশরা: (কলপাড়ে রঘুর ভেজা পিঠের দিকে তাকিয়ে, গলাটা একটু নামিয়ে) "বাপ... একটা কথা জিজ্ঞেস করমু? রাগ করবি না তো?"
রঘু: (পানি দেওয়া থামিয়ে, চোখ মুছে মায়ের দিকে তাকিয়ে) "কও কী কবা। রাগ করুম ক্যান?"
বুশরা: (একটু ইতস্তত করে) "আইজ শহরে গিয়া... তোর বাপের কোনো খবর... মানে, কেউ কি কিছু কইছে? দুইটা বছর হইলো, লোকটা কই গেল, কেমন আছে..."
রঘু: (হঠাৎ কলের হাতলটা জোরে চেপে ধরল, ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। গলাটা ধরে এল রাগে) "মা! তোমারে কতবার কইছি, ওই লোকের কথা আমার সামনে তুলবা না। যে লোক নিজেরে 'বাপ' বইলা পরিচয় দেওয়ার যোগ্যতা হারাইছে, তার খবরের আমার দরকার নাই।"
বুশরা: "তবুও তো ও তোর জন্মদাতা রে বাপ... মনের কোণে একটা আশা থাকে, যদি ফিরে আসে..."
রঘু: (মায়ের কথা থামিয়ে দিয়ে) "আশা? কীসের আশা? যে মানুষটা আমাগো এই অবস্থায় ফালায়া রাইখা, জমানো টাকা নিয়া চম্পট দিছে? তুমি জানো মা, শহরের গ্যারেজে মহাজন আমারে কেমন কইরা খাটায়? কত গালি দেয়? শুধু এই ঘরটার লাইগা, মেজ ভাইয়ের পড়ার লাইগা আমি সব সহ্য করি। আর তুমি এখনো ওই লোকের লাইগা কান্দো?"
বুশরা: "আমি কান্দি না রে রঘু। আমার ভয় লাগে, লোকটা যদি কোনো বিপদে পইড়া থাকে..."
রঘু: (জোরে কলে চাপ দিয়ে মাথাটা ভেজাতে ভেজাতে) "বিপদে পড়লে পড়ুক। আমাগো কথা কি ও একবারও ভাবছে? নাই। তাহলে আমাগোও ভাবার দরকার নাই। ও এখন আমাগো লাইগা মইরা গেছে।"
রঘু এবার গামছাটা দিয়ে শরীর মুছতে মুছতে বাঁশঝাড়ের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকল। ওর চোখে বাপের প্রতি চাপা ক্ষোভ আর আগামীর দায়িত্বের ভার স্পষ্ট।
রঘু: "যাও মা, ঘরে যাও। ছোটটা আবার কানতে পারে। আমি আসতাছি।"
বুশরা কিছু না বলে, চোখের কোণে জমে থাকা জলটা আঁচলে মুছে ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। কলপাড়ে শুধু রঘুর গামছা মোছার শব্দ আর হারিকেনের টিমটিমে আলো রয়ে গেল।
রঘু কলপাড় থেকে ফিরে এসে গামছা দিয়ে শরীরটা মুছে একটা পরিষ্কার লুঙ্গি পরে নিল। খালি গায়েই সে বারান্দায় পা রাখল। রাতের ফুরফুরে বাতাসে তার শরীরের ভেজা ভাবটা একটু আরাম দিচ্ছে। বারান্দায় পা রাখতেই সে দেখল, মা আগেই একটা পাটি পেতে সেখানে সব গুছিয়ে রেখেছে।
ঘরের ভেতরে ছোট ভাইটা এখন শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে, তাই বুশরা এই সুযোগে রঘুর জন্য খাবার সাজাতে বসেছে। অবাক করার বিষয় হলো, মা নিজেও এখনো এক লোকমা ভাত মুখে দেয়নি। প্রতিদিন রঘু ফিরলে তবেই সে সাথে নিয়ে খেতে বসে।
রঘু পাটির এক কোণে বসে পড়ে ক্লান্ত গলায় বলল, "মা, দাও মা ভাত দাও, খুধায় পেট চোঁ চোঁ করতাছে। তুমিও তো খাও নাই দেহি, আমার লাইগা বইসা আছ ক্যান? তুমিও বসো, একলগেই খাই।"
বুশরা ভাতের থালাটা রঘুর সামনে এগিয়ে দিতে দিতে মৃদু হেসে বলল, "তুই সারাটা দিন খাটস বাপ, তোর লগে একবেলা ভাত না খাইলে আমার পেটে হজম হয় না। নে, এই মাগুর মাছের ঝোলটা দিয়া মাখায়া খা, শরীরটা একটু জোর পাইবি।"
রঘু এক গ্রাস ভাত মুখে দিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা মা, সারাদিন তোমার কেমন গেল? বাড়িতে কোনো আপদ-বিপদ বা সমস্যা হয় নাই তো? মেজটা ঠিকঠাক পড়ছে তো?"
বুশরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের থালায় ভাত নিতে নিতে বলল, "দিন তো কাইটা যায় রে বাপ, কিন্তু তোর ঐ ছোট ভাইডারে নিয়া বড় জ্বালায় আছি। দাতে ব্যথা নাকি পেটে ব্যথা বুঝবার পারি না, খালি কান্দে। আর মেজটা... ও তো তরে যমদূত মনে করে, তরে ডরাইয়া সন্ধ্যা হইতেই বই নিয়া বসছে। তবে ঘরের চালটা দিয়া আইজ একটু পানি পড়ছে, সামনের বর্ষায় মনে হয় বিপদ হইবো।"
রঘু ভাত চিবোতে চিবোতে একটু থমকে গেল। চালের ফুটোটার কথা শুনে ওর কপালে ভাজ পড়ল।
"চালের কথা চিন্তা কইরো না মা। সামনের শুক্রবারে মহাজনের কাছ থেইকা কিছু টাকা আগাম চাইমু। দুইটা টিন আইনা দিলেই ঠিক হইয়া যাইবো। তুমি শুধু মেজটারে একটু নজরে রাইখো, ও যেন পড়ালেখাটা না ছাড়ে। আমার হাত দুইটা তো গ্রিজেই পইড়া রইলো, ওর হাত দুইটা যেন কলম ধরে।"
বুশরা ছেলের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলেন, মাত্র ১৯ বছরের একটা ছেলে কী অবলীলায় পুরো সংসারের পাহাড়সম চিন্তা নিজের মাথায় তুলে নিচ্ছে।
রঘু ভাতের গ্রাস মুখে দিয়া এক মুহূর্ত থাইমা গেল। হারিকেনের কাঁপা কাঁপা আলোয় তার মায়ের ক্লান্ত মুখটার দিকে চাইয়া সে একটু গম্ভীর গলায় কইলো, "মা, মেজডারে তুমি ভালোমতো বুঝাইয়া কইয়ো।
ওরে কইয়ো যেন পড়ার টেবিলে ফাঁকি না দেয়। ওরে মানুষের মতো মানুষ হইতে হইবো। আমার তো হাত-পা গ্রিজের কালিতে ভইরা গেছে, কিন্তু ওর কপালটা যেন পরিষ্কার থাকে।"
বুশরা সরকার ভাতের লোকমা হাতে নিয়া চুপচাপ শুনতাছিলেন। রঘু আবার কইলো, "আর শোনো, তুমি বাড়িতে সাবধানে থাইকো। আমি কালকে গ্যারেজে যাওয়ার সময় কিছু টাকা তোমার আঁচলে দিয়া যামুনে। ওই টাকা দিয়া ছোটডারে একবার ডাক্তার দেখাইয়া আইসো।"
বুশরা জিগাইলেন, "কই নিমু বাপ? এই গঞ্জের হাতুড়ে ডাক্তার দিয়া তো কাম হইতাছে না।"
রঘু পানি খাইয়া মুখ মুইছা কইলো, "পাড়ার ওই যে মাকসুদ ভাই আছে না? উনার চেম্বারে নিয়া যাইয়ো ছোটডারে। মাকসুদ ভাই মানুষ ভালো, ওরে একটু দেখান লাগবো যে আসলে কী হইছে। আমার তো মা দম ফালানোর সময় নাই, শহরে গিয়া রাত ১১টা পর্যন্ত খাটন লাগে। তুমি মেজডারে লগে লইয়া দুপুরের দিকে যাইয়ো। ওই সময় রোদ কড়া থাকে বইলা মাকসুদ ভাইয়ের চেম্বার ফাঁকা থাকে, উনিও একটু ফ্রী থাকে মনে হয়। ভালো কইরা দেখাইতে পারবা।"
বুশরা মাথা নাইড়া সায় দিলেন, "আইচ্ছা বাপ, কালকে জুম্মার পরেই না হয় ওরে নিয়া যামু। তুই অত চিন্তা করিস না। আগে নিজে দুইটা ভাত শান্তি কইরা খা।"
রঘু একটা দীর্ঘশ্বাস ফালাইলো। ১৯ বছরের কাঁধে এখন শুধু পরিবারের ভাত-কাপড় না, অসুখ-বিসুখ আর ঘরের ফুটো চালের চিন্তাও পাথর হইয়া বইসা আছে। সে আবার ভাতের থালায় মন দিল, কারণ কাল ভোরেই আবার সেই মবিলের গন্ধে ভরা শহরে ছুটতে হইবো।
রঘু ভাতের শেষ গ্রাসটা মুখে দেওয়ার আগে থাইকা একটু থামল। হারিকেনের কাঁপা কাঁপা আলোয় দেখল মায়ের মুখটা আবার কেমন জানি পাংশু হইয়া গেছে। বাপের কথা মনে পড়লেই বুশরার চোখের কোণটা চিকচিক করে, রঘু সেটা বুঝতে পারে।
হাতটা ভাতের থালায় রাইখাই রঘু একটু নিচু গলায় কইলো, "মা, তুমি যে কারণে সারাদিন মন খারাপ কইরা থাকো, আমি জানি। আমি তো হাত গুটায়ে বইসা নাই। গ্যারেজের মালিকের লগে তো তোমার সোয়ামির আগে থেইকা দস্তি (বন্ধুত্ব), আমি রোজ তারে জিগাই। মালিক খুঁইজা দেখতাছে।"
বুশরা ভাতের লোকমা হাতে নিয়া রঘুর মুখের দিকে চাইল, চোখে একরাশ আশা। রঘু একটু শক্ত হইয়া আবার কইলো, "খবর একদম পাই নাই তা না। মালিক কইছে সে বাইচা আছে, আর ভালোই আছে শহরে। কই আছে হেইডা এখনো পরিষ্কার না, তবে মানুষটা মরদ মানুষ, ঠিকই আছে। তাই তুমি অহেতুক ভাইবা নিজের শরীরডারে শেষ কইরো না।"
মায়ের দীর্ঘশ্বাসটা যেন রাতের অন্ধকারকেও ভারী কইরা তুলল। রঘু তাড়াতাড়ি গ্লাসের পানিটা খাইয়া মুখ মুছতে মুছতে কইলো, "এখন এইগুলা থাউক। তুমি ভালো কইরা দুইটা ভাত খাইয়া লও দেহি। আমার খাওয়া শেষ প্রায়, ছোটডা উইঠা পড়ার আগেই শুইয়া পড়ো। কাল তোগো টাকা দিয়া আমি আবার ভোরেই ছুট দিমু।"
রঘু পাটি থেইকা উঠতে উঠতে দেখল বুশরা এখনো ভাতের থালার দিকে চাইয়া আছে। ১৯ বছরের ছেলেটা জানে, বাপের খবর সে পাইছে ঠিকই, কিন্তু যে মানুষটা পরিবার থেইকা মুখ ফিরাইছে তার প্রতি রঘুর মনে ঘেন্না ছাড়া আর কিছু নাই। কিন্তু মায়ের মনে শান্তি দেওয়ার লাইগা তারে এই মিছা সান্ত্বনাটুকু দিতেই হয়।
খাওয়া শেষ কইরা রঘু এক মুহূর্ত দেরি করলো না। মা হাত ধোয়ার আগেই সে নিজেই ভাতের থালা, পানির গ্লাস আর তরকারির বাটিগুলা এক এক কইরা ধইরা ঘরের ভেতরে নিয়া রাখলো। বুশরা সরকার বারণ করতে চাইছিলেন, কিন্তু রঘুর চোখের দিকে তাকায়া আর কিছু কইলেন না। ১৯ বছরের ছেলেটা এখন শুধু অন্নদাতা না, এই ঘরের অতন্দ্র প্রহরীও বটে।
ঘরের ভেতরে ছোট ভাইটা তখনো অঘোরে ঘুমাইতেছে। রঘু দাওয়ায় আইসা একটা বিড়ি ধরাইলো, কিন্তু মনের ভেতরটা বিষাইয়া আছে। ৪৯ বছর বয়স হইলেও তার মা দেখতে এখনো বেশ সুন্দরী। গ্রামের মাইনষের চোখ তো আর ভালো না, অভাবের সংসারে একলা মহিলা দেখলে শকুনের মতো নজর দেয় কতজনে। রঘুর বাপে নাই দুই বছর, এই সুযোগে কত রঙ-তামাশা চলের বাজারে গেলেই সে শুনতে পায়।
রঘু বিড়ির ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আড়চোখে মায়ের দিকে চাইল। মনে মনে ভাবল, "মাকসুদ ভাই ডাক্তার মানুষ হইলেও তার চরিত্র নিয়া বাজারে কত কথা শুনি। একা পাইলে সেও হয়তো সুযোগ খুঁজবো।"
এই কারণেই সে মেজডারে লগে যাইতে কইছে। মেজ ভাইটা চ্যাংড়া হইলেও একটা মরদ তো সাথে থাকবো।
রঘু নিচু গলায় মার কাছে গিয়া দাঁড়াইল। কইলো, "মা, শোনো। কালকে মাকসুদ ভাইয়ের ওহানে যখন যাইবা, মেজডারে একদম হাত ছাড়া করবা না। ওরে কইবা একদম চেম্বারের ভেতরে তোমার লগে লগে থাকতে। ডাক্তার মানুষ বইলাই যে সবাই ধোয়া তুলসী পাতা, তা না। পাড়ার মাইনষের মতিগতি ভালো ঠেকতাছে না ইদানীং।"
বুশরা সরকার আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে একটু অবাক হইয়া চাইলেন। পোলাটা যে এতো কিছু বোঝে, সেটা ভাইবা তার বুকটা ধক কইরা উঠল।
রঘু আবার কইল, "আমি শহরে থাকি, ফিরতে ফিরতে রাত ১১টা বাজে। গ্রামটা আগের মতো নাই মা। কেউ যদি উল্টাপাল্টা কিছু কয় বা করার চেষ্টা করে, আমারে ছুটির দিনে সকালেই জানাইবা। আমি গ্যারেজের কাম শিখছি বইলা কি গায়ে জোর নাই ভাইবো না।"
বুশরা ছেলের মাথায় হাত রাইখা কইলেন, "তুই অত চিন্তা করিস না রে বাপ। আল্লাহ ভরসা। তুই ঘরে গিয়া শোও, কাল সকালে আবার তোরে শহরে দৌড়াইতে হইবো।"
১৯ বছরের এই ছেলেটার কাঁধে এখন শুধু গ্রিজের দাগ না, মায়ের সম্মান বাঁচানোর এক কঠিন লড়াইও শুরু হইছে।
গ্রামের এক কোণায় টিনের ছাদ দেওয়া আধাপাকা ঘর। হারিকেনের টিমটিমে আলোয় বুশরা তার ২ বছরের ছোট ছেলেটারে কোলে নিয়ে পায়চারি করছেন। ছেলেটা সমানে কান্না করছে। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর দূরে শেয়ালের হুক্কাহুয়া শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ বাঁশবাগানের দিক থেকে রঘুর কাশির শব্দ পাওয়া গেল।
বুশরা: (দরজার খিল খুলতে খুলতে) "রঘু আইলি বাপ? আইজ তো অনেক রাইত করলি। ছোটটা তো কানতে কানতে সারা হইল, কিছুতেই ঘুমায় না।"
রঘু: (হাতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ, জামা-কাপড়ে কালচে মবিলের দাগ আর ঘামের গন্ধ। দাওয়ায় বসে গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে) "হ মা, ফিরতে দেরি হইয়া গেল। গ্যারেজে মহাজন একটা পুরান ট্রাকের ইঞ্জিন খুলতে কইছিল। কাজ শেষ না কইরা তো আসা যায় না। ছোটটা কান্দে ক্যান? শরীর খারাপ নাকি?"
বুশরা: "কী জানি রে বাপ, মনে হয় পেটে ব্যথা। দুধও খাইতাছে না। তোর বাপে থাকলে আজ না হয় একটা ডাক্তার দেখাইতাম। দুইটা বছর গেল, মানুষটা মইরা গেল না জ্যান্ত আছে হেই খবরটাও দিল না।"
রঘু: (কড়া গলায়) "মা, তোমার ঐ এক কথা! বাপের নাম আর এই ঘরে নিও না। যে মানুষটা আমাগো এই অবস্থায় ফালায়া রাইখা শহরে গিয়া মৌজ করতাছে, তার কথা ভাইবা লাভ নাই। জমানো টাকা তো সব শেষ করলা তারে খুঁজতে গিয়া।"
বুশরা: (চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন) "তোর মেজ ভাই তো ঘুমাইয়া গেছে। ওরে কইছিলাম তোর লাইগা উইঠা থাকতে, কিন্তু পড়ার চাপে মনে হয় চোখ লাইগা আইছে।"
রঘু: "ঘুমান দাও ওরে। পড়ালেখাটাই ওর আসল কাম। আমার মতো যেন ওরে গ্যারেজের ময়লা ঘাঁটতে না হয়। মা, এই নাও—বাজারে আসবার সময় খাসির মাংস, কাচা বাজার আর ছোটটার লাইগা একটা বিস্কুটের প্যাকেট আনছি। খাইয়া যদি ও শান্ত হয়।"
বুশরা: "তোর নিজের খাওয়ার টাকা ছিল তো? নাকি না খাইয়া এইগুলা আনছস?"
রঘু: (ম্লান হেসে) "মহাজনের হোটেলে দুপুরে পেট ভইরা ডাল-ভাত খাইছি মা। চিন্তা কইরো না। যাও, পোলডারে কিছু খাওয়াও। আমি হাত-মুখ ধুইয়া আসি।"
বুশরা: (রঘুর দিকে তাকিয়ে মনের ভেতর ডুকরে কেঁদে ওঠেন) "১৯ বছর বয়স তোর, এই বয়সে তোর কলেজে যাওয়ার কথা ছিল। আমার পোড়া কপালের লাইগা আজ তোরে শহরের গ্যারেজে গতর খাটতে পাঠাইলাম।"
রঘু: (চোখের কোণে জল চেপে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়) "গাইয়া পোলা আমি মা, গতর না খাটলে ভাত আইবো কই থিকা? কান্দা থামাও। কাল তো শুক্রবার, আমি বাড়িতেই আছি। সকাল বেলা মেজ ভাইরে নিয়া বসুমু, দেহি ও কেমন পড়ালেখা করতাছে।"
ঘরের পেছনে বাঁশঝাড়ের ধারে একটা পুরানো টিউবওয়েল (কলপাড়)। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু হারিকেনের একটা আবছা আলো এসে পড়ছে কলের ওপর।
রঘু উঠান পেরিয়ে কলপাড়ে গিয়ে হারিকেনটা মাটিতে রাখল। তারপর নিজের ময়লা শার্ট আর প্যান্টটা খুলে একপাশে রাখল। পরনে শুধু একটা পুরনো, ছোট গামছা। দিনের বেলার রোদে পোড়া, গ্যারেজের খাটুনিতে পোক্ত হওয়া ওর ১৯ বছরের শরীরটা হারিকেনের আলোয় চিকচিক করছে। ও কলের হাতল ধরে জোরে জোরে চাপতে শুরু করল। ঠাণ্ডা পানি ওর ক্লান্ত গায়ে পড়তেই এক ধরণের স্বস্তির শব্দ করল।
বুশরা সরকার কোলে ছোট ছেলেটাকে নিয়ে ওকে সামলাতে সামলাতে পেছনে পেছনে কলপাড়ে এলেন। ওর হাতে রঘুর জন্য একটা শুকনো গামছা।
বুশরা: "রঘু, আস্তে চাপ বাপ। অত রাইতে অত জোরে আওয়াজ হইলে আশেপাশের মাইনষে কী ভাববো?"
রঘু: (কল চাপতে চাপতেই, গায়ে পানি দিতে দিতে) "ভাবলে ভাবুক গে মা। সারাদিন গ্যারেজের পোড়া মবিল আর ঘামে শরীরটা রি রি করতাছিল। একটু ঠাণ্ডা পানি না পড়লে ঘুম আইবো না।"
বুশরা: (কলপাড়ে রঘুর ভেজা পিঠের দিকে তাকিয়ে, গলাটা একটু নামিয়ে) "বাপ... একটা কথা জিজ্ঞেস করমু? রাগ করবি না তো?"
রঘু: (পানি দেওয়া থামিয়ে, চোখ মুছে মায়ের দিকে তাকিয়ে) "কও কী কবা। রাগ করুম ক্যান?"
বুশরা: (একটু ইতস্তত করে) "আইজ শহরে গিয়া... তোর বাপের কোনো খবর... মানে, কেউ কি কিছু কইছে? দুইটা বছর হইলো, লোকটা কই গেল, কেমন আছে..."
রঘু: (হঠাৎ কলের হাতলটা জোরে চেপে ধরল, ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। গলাটা ধরে এল রাগে) "মা! তোমারে কতবার কইছি, ওই লোকের কথা আমার সামনে তুলবা না। যে লোক নিজেরে 'বাপ' বইলা পরিচয় দেওয়ার যোগ্যতা হারাইছে, তার খবরের আমার দরকার নাই।"
বুশরা: "তবুও তো ও তোর জন্মদাতা রে বাপ... মনের কোণে একটা আশা থাকে, যদি ফিরে আসে..."
রঘু: (মায়ের কথা থামিয়ে দিয়ে) "আশা? কীসের আশা? যে মানুষটা আমাগো এই অবস্থায় ফালায়া রাইখা, জমানো টাকা নিয়া চম্পট দিছে? তুমি জানো মা, শহরের গ্যারেজে মহাজন আমারে কেমন কইরা খাটায়? কত গালি দেয়? শুধু এই ঘরটার লাইগা, মেজ ভাইয়ের পড়ার লাইগা আমি সব সহ্য করি। আর তুমি এখনো ওই লোকের লাইগা কান্দো?"
বুশরা: "আমি কান্দি না রে রঘু। আমার ভয় লাগে, লোকটা যদি কোনো বিপদে পইড়া থাকে..."
রঘু: (জোরে কলে চাপ দিয়ে মাথাটা ভেজাতে ভেজাতে) "বিপদে পড়লে পড়ুক। আমাগো কথা কি ও একবারও ভাবছে? নাই। তাহলে আমাগোও ভাবার দরকার নাই। ও এখন আমাগো লাইগা মইরা গেছে।"
রঘু এবার গামছাটা দিয়ে শরীর মুছতে মুছতে বাঁশঝাড়ের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকল। ওর চোখে বাপের প্রতি চাপা ক্ষোভ আর আগামীর দায়িত্বের ভার স্পষ্ট।
রঘু: "যাও মা, ঘরে যাও। ছোটটা আবার কানতে পারে। আমি আসতাছি।"
বুশরা কিছু না বলে, চোখের কোণে জমে থাকা জলটা আঁচলে মুছে ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। কলপাড়ে শুধু রঘুর গামছা মোছার শব্দ আর হারিকেনের টিমটিমে আলো রয়ে গেল।
রঘু কলপাড় থেকে ফিরে এসে গামছা দিয়ে শরীরটা মুছে একটা পরিষ্কার লুঙ্গি পরে নিল। খালি গায়েই সে বারান্দায় পা রাখল। রাতের ফুরফুরে বাতাসে তার শরীরের ভেজা ভাবটা একটু আরাম দিচ্ছে। বারান্দায় পা রাখতেই সে দেখল, মা আগেই একটা পাটি পেতে সেখানে সব গুছিয়ে রেখেছে।
ঘরের ভেতরে ছোট ভাইটা এখন শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছে, তাই বুশরা এই সুযোগে রঘুর জন্য খাবার সাজাতে বসেছে। অবাক করার বিষয় হলো, মা নিজেও এখনো এক লোকমা ভাত মুখে দেয়নি। প্রতিদিন রঘু ফিরলে তবেই সে সাথে নিয়ে খেতে বসে।
রঘু পাটির এক কোণে বসে পড়ে ক্লান্ত গলায় বলল, "মা, দাও মা ভাত দাও, খুধায় পেট চোঁ চোঁ করতাছে। তুমিও তো খাও নাই দেহি, আমার লাইগা বইসা আছ ক্যান? তুমিও বসো, একলগেই খাই।"
বুশরা ভাতের থালাটা রঘুর সামনে এগিয়ে দিতে দিতে মৃদু হেসে বলল, "তুই সারাটা দিন খাটস বাপ, তোর লগে একবেলা ভাত না খাইলে আমার পেটে হজম হয় না। নে, এই মাগুর মাছের ঝোলটা দিয়া মাখায়া খা, শরীরটা একটু জোর পাইবি।"
রঘু এক গ্রাস ভাত মুখে দিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা মা, সারাদিন তোমার কেমন গেল? বাড়িতে কোনো আপদ-বিপদ বা সমস্যা হয় নাই তো? মেজটা ঠিকঠাক পড়ছে তো?"
বুশরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের থালায় ভাত নিতে নিতে বলল, "দিন তো কাইটা যায় রে বাপ, কিন্তু তোর ঐ ছোট ভাইডারে নিয়া বড় জ্বালায় আছি। দাতে ব্যথা নাকি পেটে ব্যথা বুঝবার পারি না, খালি কান্দে। আর মেজটা... ও তো তরে যমদূত মনে করে, তরে ডরাইয়া সন্ধ্যা হইতেই বই নিয়া বসছে। তবে ঘরের চালটা দিয়া আইজ একটু পানি পড়ছে, সামনের বর্ষায় মনে হয় বিপদ হইবো।"
রঘু ভাত চিবোতে চিবোতে একটু থমকে গেল। চালের ফুটোটার কথা শুনে ওর কপালে ভাজ পড়ল।
"চালের কথা চিন্তা কইরো না মা। সামনের শুক্রবারে মহাজনের কাছ থেইকা কিছু টাকা আগাম চাইমু। দুইটা টিন আইনা দিলেই ঠিক হইয়া যাইবো। তুমি শুধু মেজটারে একটু নজরে রাইখো, ও যেন পড়ালেখাটা না ছাড়ে। আমার হাত দুইটা তো গ্রিজেই পইড়া রইলো, ওর হাত দুইটা যেন কলম ধরে।"
বুশরা ছেলের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলেন, মাত্র ১৯ বছরের একটা ছেলে কী অবলীলায় পুরো সংসারের পাহাড়সম চিন্তা নিজের মাথায় তুলে নিচ্ছে।
রঘু ভাতের গ্রাস মুখে দিয়া এক মুহূর্ত থাইমা গেল। হারিকেনের কাঁপা কাঁপা আলোয় তার মায়ের ক্লান্ত মুখটার দিকে চাইয়া সে একটু গম্ভীর গলায় কইলো, "মা, মেজডারে তুমি ভালোমতো বুঝাইয়া কইয়ো।
ওরে কইয়ো যেন পড়ার টেবিলে ফাঁকি না দেয়। ওরে মানুষের মতো মানুষ হইতে হইবো। আমার তো হাত-পা গ্রিজের কালিতে ভইরা গেছে, কিন্তু ওর কপালটা যেন পরিষ্কার থাকে।"
বুশরা সরকার ভাতের লোকমা হাতে নিয়া চুপচাপ শুনতাছিলেন। রঘু আবার কইলো, "আর শোনো, তুমি বাড়িতে সাবধানে থাইকো। আমি কালকে গ্যারেজে যাওয়ার সময় কিছু টাকা তোমার আঁচলে দিয়া যামুনে। ওই টাকা দিয়া ছোটডারে একবার ডাক্তার দেখাইয়া আইসো।"
বুশরা জিগাইলেন, "কই নিমু বাপ? এই গঞ্জের হাতুড়ে ডাক্তার দিয়া তো কাম হইতাছে না।"
রঘু পানি খাইয়া মুখ মুইছা কইলো, "পাড়ার ওই যে মাকসুদ ভাই আছে না? উনার চেম্বারে নিয়া যাইয়ো ছোটডারে। মাকসুদ ভাই মানুষ ভালো, ওরে একটু দেখান লাগবো যে আসলে কী হইছে। আমার তো মা দম ফালানোর সময় নাই, শহরে গিয়া রাত ১১টা পর্যন্ত খাটন লাগে। তুমি মেজডারে লগে লইয়া দুপুরের দিকে যাইয়ো। ওই সময় রোদ কড়া থাকে বইলা মাকসুদ ভাইয়ের চেম্বার ফাঁকা থাকে, উনিও একটু ফ্রী থাকে মনে হয়। ভালো কইরা দেখাইতে পারবা।"
বুশরা মাথা নাইড়া সায় দিলেন, "আইচ্ছা বাপ, কালকে জুম্মার পরেই না হয় ওরে নিয়া যামু। তুই অত চিন্তা করিস না। আগে নিজে দুইটা ভাত শান্তি কইরা খা।"
রঘু একটা দীর্ঘশ্বাস ফালাইলো। ১৯ বছরের কাঁধে এখন শুধু পরিবারের ভাত-কাপড় না, অসুখ-বিসুখ আর ঘরের ফুটো চালের চিন্তাও পাথর হইয়া বইসা আছে। সে আবার ভাতের থালায় মন দিল, কারণ কাল ভোরেই আবার সেই মবিলের গন্ধে ভরা শহরে ছুটতে হইবো।
রঘু ভাতের শেষ গ্রাসটা মুখে দেওয়ার আগে থাইকা একটু থামল। হারিকেনের কাঁপা কাঁপা আলোয় দেখল মায়ের মুখটা আবার কেমন জানি পাংশু হইয়া গেছে। বাপের কথা মনে পড়লেই বুশরার চোখের কোণটা চিকচিক করে, রঘু সেটা বুঝতে পারে।
হাতটা ভাতের থালায় রাইখাই রঘু একটু নিচু গলায় কইলো, "মা, তুমি যে কারণে সারাদিন মন খারাপ কইরা থাকো, আমি জানি। আমি তো হাত গুটায়ে বইসা নাই। গ্যারেজের মালিকের লগে তো তোমার সোয়ামির আগে থেইকা দস্তি (বন্ধুত্ব), আমি রোজ তারে জিগাই। মালিক খুঁইজা দেখতাছে।"
বুশরা ভাতের লোকমা হাতে নিয়া রঘুর মুখের দিকে চাইল, চোখে একরাশ আশা। রঘু একটু শক্ত হইয়া আবার কইলো, "খবর একদম পাই নাই তা না। মালিক কইছে সে বাইচা আছে, আর ভালোই আছে শহরে। কই আছে হেইডা এখনো পরিষ্কার না, তবে মানুষটা মরদ মানুষ, ঠিকই আছে। তাই তুমি অহেতুক ভাইবা নিজের শরীরডারে শেষ কইরো না।"
মায়ের দীর্ঘশ্বাসটা যেন রাতের অন্ধকারকেও ভারী কইরা তুলল। রঘু তাড়াতাড়ি গ্লাসের পানিটা খাইয়া মুখ মুছতে মুছতে কইলো, "এখন এইগুলা থাউক। তুমি ভালো কইরা দুইটা ভাত খাইয়া লও দেহি। আমার খাওয়া শেষ প্রায়, ছোটডা উইঠা পড়ার আগেই শুইয়া পড়ো। কাল তোগো টাকা দিয়া আমি আবার ভোরেই ছুট দিমু।"
রঘু পাটি থেইকা উঠতে উঠতে দেখল বুশরা এখনো ভাতের থালার দিকে চাইয়া আছে। ১৯ বছরের ছেলেটা জানে, বাপের খবর সে পাইছে ঠিকই, কিন্তু যে মানুষটা পরিবার থেইকা মুখ ফিরাইছে তার প্রতি রঘুর মনে ঘেন্না ছাড়া আর কিছু নাই। কিন্তু মায়ের মনে শান্তি দেওয়ার লাইগা তারে এই মিছা সান্ত্বনাটুকু দিতেই হয়।
খাওয়া শেষ কইরা রঘু এক মুহূর্ত দেরি করলো না। মা হাত ধোয়ার আগেই সে নিজেই ভাতের থালা, পানির গ্লাস আর তরকারির বাটিগুলা এক এক কইরা ধইরা ঘরের ভেতরে নিয়া রাখলো। বুশরা সরকার বারণ করতে চাইছিলেন, কিন্তু রঘুর চোখের দিকে তাকায়া আর কিছু কইলেন না। ১৯ বছরের ছেলেটা এখন শুধু অন্নদাতা না, এই ঘরের অতন্দ্র প্রহরীও বটে।
ঘরের ভেতরে ছোট ভাইটা তখনো অঘোরে ঘুমাইতেছে। রঘু দাওয়ায় আইসা একটা বিড়ি ধরাইলো, কিন্তু মনের ভেতরটা বিষাইয়া আছে। ৪৯ বছর বয়স হইলেও তার মা দেখতে এখনো বেশ সুন্দরী। গ্রামের মাইনষের চোখ তো আর ভালো না, অভাবের সংসারে একলা মহিলা দেখলে শকুনের মতো নজর দেয় কতজনে। রঘুর বাপে নাই দুই বছর, এই সুযোগে কত রঙ-তামাশা চলের বাজারে গেলেই সে শুনতে পায়।
রঘু বিড়ির ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আড়চোখে মায়ের দিকে চাইল। মনে মনে ভাবল, "মাকসুদ ভাই ডাক্তার মানুষ হইলেও তার চরিত্র নিয়া বাজারে কত কথা শুনি। একা পাইলে সেও হয়তো সুযোগ খুঁজবো।"
এই কারণেই সে মেজডারে লগে যাইতে কইছে। মেজ ভাইটা চ্যাংড়া হইলেও একটা মরদ তো সাথে থাকবো।
রঘু নিচু গলায় মার কাছে গিয়া দাঁড়াইল। কইলো, "মা, শোনো। কালকে মাকসুদ ভাইয়ের ওহানে যখন যাইবা, মেজডারে একদম হাত ছাড়া করবা না। ওরে কইবা একদম চেম্বারের ভেতরে তোমার লগে লগে থাকতে। ডাক্তার মানুষ বইলাই যে সবাই ধোয়া তুলসী পাতা, তা না। পাড়ার মাইনষের মতিগতি ভালো ঠেকতাছে না ইদানীং।"
বুশরা সরকার আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে একটু অবাক হইয়া চাইলেন। পোলাটা যে এতো কিছু বোঝে, সেটা ভাইবা তার বুকটা ধক কইরা উঠল।
রঘু আবার কইল, "আমি শহরে থাকি, ফিরতে ফিরতে রাত ১১টা বাজে। গ্রামটা আগের মতো নাই মা। কেউ যদি উল্টাপাল্টা কিছু কয় বা করার চেষ্টা করে, আমারে ছুটির দিনে সকালেই জানাইবা। আমি গ্যারেজের কাম শিখছি বইলা কি গায়ে জোর নাই ভাইবো না।"
বুশরা ছেলের মাথায় হাত রাইখা কইলেন, "তুই অত চিন্তা করিস না রে বাপ। আল্লাহ ভরসা। তুই ঘরে গিয়া শোও, কাল সকালে আবার তোরে শহরে দৌড়াইতে হইবো।"
১৯ বছরের এই ছেলেটার কাঁধে এখন শুধু গ্রিজের দাগ না, মায়ের সম্মান বাঁচানোর এক কঠিন লড়াইও শুরু হইছে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)