08-02-2026, 04:09 AM
প্রথম অধ্যায়: শ্রাবণ মেঘের মায়া
১. প্রেসিডেন্সির করিডোর ও একুশ বছরের অস্থিরতা
কলকাতার আকাশটা আজ সকাল থেকেই এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ডুবে আছে। কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে ট্রামলাইনের ঘর্ষণ আর হকারদের চিৎকার ছাপিয়েও মেঘের গুরুগম্ভীর ডাকটা কানে আসছে। একুশ বছর বয়সী অর্ণব প্রেসিডেন্সি কলেজের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আকাশের সেই ধূসর রঙটা দেখছিল। তার চোখে এক ধরণের অস্থিরতা—যা কেবল যৌবনের নয়, বরং এমন কিছুর যা সে নিজে চিনেও চিনতে চাইছে না।
অর্ণব বাংলা অনার্সের শেষ বর্ষের ছাত্র। এই কলেজে তিন বছরে সে অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছে, কিন্তু গত ছয় মাসে তার পৃথিবীটা আমূল বদলে গেছে। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় সে দেখল ক্লাসরুমের সামনে ছাত্রদের জটলা। কিন্তু তার পা জোড়া যেন কোনো এক অদৃশ্য টানে সরাসরি গিয়ে থামল প্রথম বেঞ্চের সেই নির্দিষ্ট কোণটিতে। সেখান থেকে ডাইসের দূরত্ব মাত্র তিন ফুট। সেই তিন ফুটের ব্যবধানেই দাঁড়িয়ে থাকে অর্ণবের নিষিদ্ধ পৃথিবী।
অর্ণব জানে, তার এই আকর্ষণ কেবল শ্রদ্ধা বা ভালো লাগার নয়। এটা এমন এক আদিম টান যা সমাজ বা নৈতিকতার তোয়াক্কা করে না। সে যখন প্রথম বেঞ্চে বসে, সে আসলে ক্লাসের নোট নিতে আসে না; সে আসে একজোড়া চোখের গভীরে ডুব দিতে, একজোড়া ঠোঁটের নড়াচড়া লক্ষ্য করতে।
২. নীলাঞ্জনার প্রবেশ: এক স্নিগ্ধ অগ্নিকন্যা
ঠিক ১১টা ০৫ মিনিটে করিডোরে সেই পরিচিত শব্দটা প্রতিধ্বনিত হলো। চামড়ার হিল জুতোর ছান্দিক শব্দ—খট, খট, খট। ক্লাসরুমের গুঞ্জন মুহূর্তেই জল ঢালা আগুনের মতো নিভে গেল। নীলাঞ্জনা চ্যাটার্জি ঘরে ঢুকলেন।
নীলাঞ্জনার বয়স বড়জোর সাতাশ কি আটাশ। পরনে হালকা ল্যাভেন্ডার রঙের একটা তসরের শাড়ি, যা তাঁর শরীরের প্রতিটি বাঁককে এক শৈল্পিক গাম্ভীর্য দিয়েছে। তাঁর কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনি চামড়ার ব্যাগ, হাতে বুদ্ধদেব বসুর একটা কবিতার বই। তাঁর চোখে সরু ফ্রেমের চশমা, আর কপালে একটা ছোট্ট কালো টিপ—এই সাধারণ সাজটুকুই অর্ণবের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
তিনি ডাইসে ব্যাগটা রেখে চশমাটা একবার মুছে নিলেন। অর্ণব দেখল, ম্যাডামের আঙুলগুলো লম্বা এবং ফর্সা, নখগুলো সযত্নে কাটা কিন্তু তাতে কোনো রঙ নেই। এই সাদামাটা ভাবটাই অর্ণবকে প্রতিদিন নতুন করে অবাক করে। তিনি যখন বইটা খুললেন, তাঁর কবজিতে থাকা কয়েকগাছি কাঁচের চুড়ি মৃদু শব্দ করে উঠল। সেই শব্দটা অর্ণবের কানে যেন কোনো বসন্তের বাতাসের মতো শোনাল।
"আজ আমরা জীবনানন্দ দাসের 'বোধ' কবিতাটা নিয়ে একটু অন্যভাবে আলোচনা করব," নীলাঞ্জনা শান্ত স্বরে শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরটা যেন কোনো পাহাড়ি ঝরনার কুলকুল ধ্বনির মতো স্নিগ্ধ, আবার তাতে এক ধরণের চাপা কর্তৃত্ব আছে।
৩. শব্দের আড়ালে লুকানো ইশারা
পড়াতে পড়াতে নীলাঞ্জনা কবিতাটির গভীরে প্রবেশ করছিলেন। তাঁর ব্যাখ্যার প্রতিটি শব্দ যেন অর্ণবের মনের ভেতরে হাতুড়ি পেটাচ্ছিল।
"আলো-অন্ধকারে যাই— মাথার ভিতরে / স্বপ্ন নয়, কোন্ এক বোধ কাজ করে;"
এই লাইনটা পড়ার সময় নীলাঞ্জনা হঠাৎ থামলেন। তিনি বই থেকে চোখ তুলে সরাসরি অর্ণবের চোখের দিকে তাকালেন। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো পুরো ক্লাসরুমটা শূন্য হয়ে গেছে। সেখানে কেবল দুজন মানুষ—একজন শিক্ষিকা আর একজন ছাত্র, যাদের মাঝখানে বয়ে যাচ্ছে এক অব্যক্ত বিদ্যুতের স্রোত।
"অর্ণব," নীলাঞ্জনা ডাকলেন। তাঁর স্বরে এক ধরণের কাঁপুনি ছিল কি? "তুমি কি বলতে পারো, কবি কেন এই বোধকে স্বপ্ন বলতে নারাজ? কেন তিনি একে একটা বাস্তব যন্ত্রণা হিসেবে দেখছেন?"
অর্ণব উঠে দাঁড়াল। তার বুক ধকধক করছে। সে নীলাঞ্জনার চোখের মণির দিকে তাকাল। সেই চোখে শাসন আছে, কিন্তু তার গভীরে কোথাও কি এক নিঃসঙ্গতার হাহাকার লুকিয়ে নেই?
"ম্যাম," অর্ণব গলা পরিষ্কার করে বলল, "স্বপ্ন তো মানুষ ঘুমিয়ে দেখে, যা সকালে ভেঙে যায়। কিন্তু এই বোধ হলো এমন এক সত্য যা মানুষকে জাগিয়ে রাখে। এটা অনেকটা সেই নিষিদ্ধ আকর্ষণের মতো, যা সমাজ স্বীকার করে না, কিন্তু রক্তে তা সারাক্ষণ নাচন দেয়। মানুষ চায় একে অস্বীকার করতে, কিন্তু এই বোধ তার ছায়ার মতো পিছু ছাড়ে না।"
পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ। নীলাঞ্জনা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর ফর্সা মুখটা যেন এক মুহূর্তের জন্য আরক্ত হয়ে উঠল। তিনি দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলেন। "সুন্দর ব্যাখ্যা। বসো।"
৪. বৃষ্টির নির্জনতা ও লাইব্রেরির সেই কোণ
কলেজ ছুটির পর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। কলকাতার রাস্তা নিমেষেই জলমগ্ন। ট্রাম চলাচল বন্ধ, রিকশাওয়ালাদের হাঁকডাক কমে গেছে। অর্ণব লাইব্রেরির ভেতর বসে ছিল একটা পুরনো পাণ্ডুলিপি দেখার বাহানায়। সে জানত, এই বৃষ্টিতে নীলাঞ্জনা ম্যাম বেরোতে পারবেন না।
লাইব্রেরির অন্ধকার কোণে, যেখানে আর্ট আর লিটারেচারের পুরনো বইগুলো থাকে, সেখানে নীলাঞ্জনা একা দাঁড়িয়ে জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিলেন। লাইব্রেরিয়ান সম্ভবত অন্য পাশে কাজে ব্যস্ত। আবছা অন্ধকারে নীলাঞ্জনার শাড়ির রঙটা আরও গাঢ় দেখাচ্ছিল।
অর্ণব খুব সাবধানে তাঁর পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। তাঁর শরীর থেকে আসা সেই পরিচিত ল্যাভেন্ডার আর পুরনো বইয়ের মিশেলে এক অদ্ভুত ঘ্রাণ অর্ণবের স্নায়ুকে অবশ করে দিচ্ছিল।
"ম্যাম, আজ বোধহয় বৃষ্টি থামবে না," অর্ণব খুব নিচু স্বরে বলল।
নীলাঞ্জনা চমকে ফিরে তাকালেন। তাঁর চশমাটা নাকের ডগায় নেমে এসেছে। অন্ধকারেও তাঁর চোখের দীপ্তি স্পষ্ট। "তুমি এখনো যাওনি অর্ণব? হোস্টেলে ফিরবে কী করে?"
"ফিরতে ইচ্ছা করছে না ম্যাম। বৃষ্টির এই শব্দে একা থাকতে ভয় লাগে," অর্ণব এক পা এগিয়ে এল।
নীলাঞ্জনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার জানলার দিকে ফিরলেন। "একা থাকাটাই তো আমাদের নিয়তি, অর্ণব। বিশেষ করে যখন আমরা এমন কিছু খুঁজি যা আমাদের পাওয়ার কথা নয়।"
"কেন পাওয়ার কথা নয়?" অর্ণবের স্বরে এবার জেদ। সে এবার নীলাঞ্জনার ঠিক পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তাঁদের কনুই প্রায় একে অপরকে স্পর্শ করছে। "কে ঠিক করে দেয় আমরা কী পাব আর কী পাব না? ওই জীর্ণ সমাজ?"
নীলাঞ্জনা মাথা ঘুরিয়ে অর্ণবের দিকে তাকালেন। তাঁর মুখটা এখন অর্ণবের খুব কাছে। বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছে তাঁদের দুজনের নিশ্বাসের শব্দ।
"অর্ণব, তুমি অনেক বেশি কথা বলছ," নীলাঞ্জনা শাসনের সুরে বললেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে কোনো কঠোরতা ছিল না। বরং সেখানে ছিল এক ধরণের আর্তি।
৫. গণ্ডি পেরিয়ে এক সাহসী পদক্ষেপ
অর্ণব আজ নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। সে ধীরে ধীরে তার হাতটা টেবিলের ওপর রাখা নীলাঞ্জনার হাতের ওপর রাখল। নীলাঞ্জনা কেঁপে উঠলেন। তিনি হাতটা সরিয়ে নিতে চাইলেন, কিন্তু অর্ণব তাঁর আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে ধরল।
"ম্যাম... নীলাঞ্জনা," অর্ণব প্রথমবার তাঁর নাম ধরে ডাকল। "আমি জানি আপনিও ঠিক একই বোধ অনুভব করছেন যা আমি করি। ওই যে কবিতার সেই 'বোধ'—যা আমাদের ঘুমাতে দেয় না।"
নীলাঞ্জনার চোখের পলক স্থির হয়ে গেছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "এটা ভুল অর্ণব। আমি তোমার টিচার। মানুষ জানলে আমাকে ছিঁড়ে খাবে। তোমার কেরিয়ার শেষ হয়ে যাবে।"
"কেরিয়ার আর সম্মানের চেয়ে জীবন বড় ম্যাম," অর্ণব আরও কাছে সরে এল। সে অনুভব করল নীলাঞ্জনার শরীরের উষ্ণতা। বৃষ্টির ছাঁটে তাঁর কাঁধের দিকটা ভিজে গেছে, শাড়িটা ত্বকের সাথে লেপ্টে আছে। অর্ণব তাঁর অন্য হাতটা দিয়ে নীলাঞ্জনার ভিজে চুলে আঙুল বোলাতে লাগল।
নীলাঞ্জনা এবার এক অদ্ভুত আবেশে চোখ বুজে ফেললেন। তাঁর দীর্ঘদিনের জমানো একাকীত্ব যেন এই যুবকের স্পর্শে বরফের মতো গলতে শুরু করেছে। তিনি নিচু স্বরে বললেন, "তুমি জানো না তুমি কিসের ভেতর নিজেকে জড়াচ্ছ। আমি এক আগ্নেয়গিরি অর্ণব, যা তোমাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে।"
"আমি সেই ছাই হতেই চাই," অর্ণব এবার নীলাঞ্জনার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল।
অন্ধকার লাইব্রেরির সেই নির্জন কোণে, বৃষ্টির অঝোর ধারার শব্দকে সাক্ষী রেখে, অর্ণব তাঁর ঠোঁটদুটো নীলাঞ্জনার কাঁপতে থাকা ঠোঁটে চেপে ধরল। নীলাঞ্জনা প্রথম কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে থাকলেও, মুহূর্তেই তাঁর ভেতরের অবদমিত কামনার বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি দুহাতে অর্ণবের শার্টটা খামচে ধরলেন এবং এক তীব্র তৃষ্ণায় অর্ণবকে নিজের সাথে একীভূত করে নিতে চাইলেন।
সেই মুহূর্তে কোনো নৈতিকতা ছিল না, কোনো বয়সের পার্থক্য ছিল না। ছিল কেবল দুজন তৃষ্ণার্ত মানুষের অস্তিত্বের লড়াই। নীলাঞ্জনার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ অর্ণবের হাতের স্পর্শে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছিল। তিনি অনুভব করছিলেন, দীর্ঘ বছরের কৃচ্ছ্বসাধনের পর কেউ যেন তাঁকে নারী হিসেবে পূর্ণতা দিচ্ছে।
৬. এক নতুন যুদ্ধের সূচনা
কিছুক্ষণ পর যখন তাঁরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন, দুজনেরই নিশ্বাস ভারী। নীলাঞ্জনা দ্রুত নিজের শাড়ি আর চুল গুছিয়ে নিলেন। তাঁর চোখে এখন ভয় আর মুগ্ধতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ।
"এক্ষুণি যাও এখান থেকে," নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বললেন। "আর শোনো... আজ রাতে আমার ফ্ল্যাটে কেউ নেই। যদি সাহস থাকে, রাত ন'টার পর আসবে। পেছনের গেট দিয়ে।"
অর্ণব কোনো কথা না বলে শুধু একটা বিজয়ী হাসি হাসল। সে জানত, এই উপন্যাস কেবল শুরু হলো। এই গল্পের প্রতিটি পাতা এখন রক্ত, ঘাম আর আদিম আবেগে লেখা হবে।
সে যখন লাইব্রেরি থেকে বেরোচ্ছিল, তখন বাইরে বৃষ্টি থেমে গিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী গোধূলি নেমেছে। কিন্তু অর্ণব জানত, আসল ঝড়টা শুরু হবে আজ রাতে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)