Thread Rating:
  • 27 Vote(s) - 3.26 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Romance জীবন যে রকম ( সম্পূর্ণ ধারাবাহিক উপন্যাস) By Lekhak
#1
[Image: NsgjsDUL_o.jpeg]

[Image: rpfpnfaR_o.jpg]

‘জীবন যে রকম’ উপন্যাস লেখা শুরু করেছিলাম আজ থেকে প্রায় আট- ন বছর আগে। শুরু করেও শেষ করে উঠতে পারিনি। লেখার জগত থেকে হারিয়েই গেছিলাম। জীবনের অনেক বাঁধা প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে আজ আবার ডায়েরী আর পেন নিয়ে বসেছি। এই উপন্যাসের অনেক ঘটনাই বাস্তবে আমার জীবনের সাথে মিল। প্রেমের উপন্যাস আমি আরো একটি লিখেছি। দুটোই অসমাপ্ত ছিল। ফিরে এলাম অসমাপ্ত উপন্যাস সমাপ্তি করণের ইচ্ছা নিয়ে। তবে পাঠকদের জানিয়ে রাখি, শেষ টুকু পড়তে হলে, কাহিনীর শুরু থেকে আবার একবার পড়ে নিতে হবে। কারণ দুটি অধ্যায়ের সংযুক্তিকরণ হয়েছে পুরোনো লেখার সাথেই। সকলকে আমার নমষ্কার ও ধন্যবাদ জানাই। 
ইতি
লেখক
 
[+] 4 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.
#2
[Image: 7SFR0C87_t.jpg]
এক
 
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মত খবরের কাগজটা তন্ন তন্ন করে খুঁজছিলাম। কিছুতেই পাচ্ছিলাম না। মা বলল, ‘আজ তো খবরের কাগজ দেবে না রে খোকা। কাল যে ছুটী ছিল তোর কি খেয়াল নেই?’ সত্যি তো। কাল যে ছুটী ছিল একেবারেই ভুলে গেছি। ২৬শে জানুয়ারী, প্রজাতন্ত্র দিবস। সর্বভারতীয় ছুটী। আগামীকাল এই প্রত্রিকার কোন সংষ্করণ প্রকাশিত হবে না। প্রথম পাতায় দেখেছি, কিন্তু একেবারেই সেটা মনে নেই।
প্রতিদিনই সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চা খেতে খেতে খবরের কাগজটা পড়ি। রোজ একবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাগজ পড়ার অভ্যাসটা আমার চিরদিনের। রাজনীতি থেকে খেলাধূলা। কোথায় কি ঘটেছে, সব যেন একবার ভাল করে চোখ বুলোনো চাই ই চাই। কাগজ পড়ে তারপর স্নানে ঢুকি। অফিসে যাওয়ার তাড়া থাকে বলে, লেখালেখিগুলো সকালের দিকে একদমই হয় না। তরকারীর সাথে দুটো রুটি। মুখে কিছু দিয়েই অফিসের জন্য আমাকে তারপরে বেরোতে হয়। এগারোটার মধ্যে অফিসে না ঢুকলে আবার বসের গালিগালাজ শুনতে হবে।
ভাবছিলাম, স্নানটা তাহলে সেরে নেব কিনা? আজ একবার শুভেন্দুর বাড়ী যেতে হবে। কি জানি, এতদিন পরে কেন আমাকে ডেকেছে শুভেন্দু? অফিস থেকে বেরিয়ে পিকনিক গার্ডেনে যেতে একঘন্টা সময় লাগবে। শুভেন্দু বলেছে ‘‘ঠিক সাতটার মধ্যে আসবি। তোর জন্য অনেক সারপ্রাইজ আছে।’’
পুরোন দিনের স্মৃতিগুলো এখনও যখন মনে পড়ে, ভালো লাগে। সেদিনের সেই উচ্ছ্বল জীবন, আর আজকের কর্মব্যাস্ত জীবনের মধ্যে যেন কত ফারাক। জীবন যেন বড়ই ম্যারমেরে। চার্মিং ব্যাপারটাই নেই। কোথায় যে হারিয়ে গেল সেই দিনগুলো। মাঝে মাঝে ভেসে ওঠে সেই চেনা পরিচিত মুখগুলো। শুভেন্দু, শুক্লা, সৌগত, মিনু আর রনি। আর সাথে বিদিশা তো আছেই।
জানি না ওরা এখন সব কোথায়। বিদিশা বিয়ে করে মুম্বাই চলে গিয়েছিল। ওর স্বামী ওখানে ভালো কোম্পানীতে চাকরি করে। শুনেছি খুব দামী ফ্ল্যাটে থাকে ওরা। সৌগতও বিয়ে করল। বউটা ভারী মিষ্টি। মুখটা একেবারে প্রতিমার মত। বিয়েতে আমাদের সবাইকে নেমতন্ন করেছিল। সবাই আমরা গিয়েছিলাম। যায়নি কেবল বিদিশা। সেদিন ওকে খুব মিস করেছিলাম। শেষবারের মতন দেখতে চেয়েছিলাম। সে সুযোগ আর হয় নি। বিদিশা সৌগতকে কথা দিয়েছিল বিয়েতে আসবে, তাও আসেনি। হয়তো আমারই জন্য। বুকের মধ্যে চাপা এক দূঃখ নিয়ে গুমড়ে গুমড়ে অনেকদিন মরেছি বিদিশার জন্য। ভেবেছিলাম, শেষবারের মতন ওকে একবার দেখব। বিদিশাকে উইশ করব। ওকে বলব, ‘‘বিদিশা, তোমার বিবাহিত জীবন সুখময় হোক। দেবকে চটকরে ভুলে যেতে তোমারও হয়তো কষ্ট হবে জানি। কিন্তু কি করবে? এটাই তো জীবন। আমিও তোমার স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে আর বাঁচতে চাই না। যা হয়েছে এটাকেই ভাগ্যের পরিহাস বলে আমি মেনে নেবো। তুমিও তাই মেনে নাও।’’
 
সেদিন শুভেন্দু আমাকে বলেছিল, ‘‘সত্যি দেব, তোর জন্য আমার দূঃখ হয়। মিনুটা যে কি করল। সবকিছু জেনেও ও তোর ক্ষতিটা করল। বিদিশা তোকে ভুল বুঝল। যখন সত্যিটা জানতে পারল। তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে।’’
 
ভালবাসার খেসারত দিতে দিতে একদিন ভালবাসাটাই এভাবে মিথ্যে হয়ে যায়। জানি বিদিশা আমাকে হয়তো ক্ষমা করে দেবে। কিন্তু ওকে কি আমি সত্যি ভুলে যেতে পারব? কখনই নয়। আমি তো প্রেম কি তাই জানতাম না জীবনে। বিদিশাই শিখিয়েছিল হাতে হাত ধরে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কখনও কলকাতার রাজপথে, কখনও ভিক্টোরিয়ায়, কখনও ইডেন গার্ডেন এ কিংবা গঙ্গার পাড়ে, দুজনের ভালোবাসার একে অপরকে পাওয়ার আনন্দ এক অনুভূতি। যেন এক আচ্ছন্ন করা তীব্র সুখ। সেদিন বিদিশা আমাকে বলেছিল, ‘‘আমাকে ছাড়া ‘দেব’ তুমি কোনদিন সুখী হতে পারবে না জানি। আর আমিও তোমার সঙ্গ ছাড়া কোনদিন সুখে থাকতে পারবো না। জেনে রেখো বিদিশা যদি দেবকে কোনদিন কাছে না পায়, তাহলে বিদিশা মরে যাবে।’’
সেদিন বিদিশার চোখে মুখে ফুটে উঠেছিল স্পষ্ট এক স্বীকারোক্তি। বিদিশার সেদিনের সেই কথাগুলো আজও আমার মনে আছে। কিন্তু দুনিয়াটা এরকমই। কেউ কারুর জন্য মরে না। অথচ সবাই নাকি মরতে চায়। এই আমি কেমন দিব্যি বেঁচে আছি। বিদিশাও হয়তো তাই। মরার কথা তুলে ভালবাসাটাকে সেদিন হয়তো আরো শক্ত মজবুত করতে চেয়েছিল বিদিশা। কিন্তু ও আর আমি, কেউ আমরা ভালবাসাটাকে ধরে রাখতে পারিনি। সন্দেহ, অবিশ্বাস বিদিশার মনটাকে ছাড়খাড় করে দিয়েছিল। ভেবেছিল, আমি বুঝি ওর প্রতি আর আসক্ত নই। কলেজে আমাদেরই সহপাঠিনী ‘মিনু’ তখন আমার প্রেমে মত্ত। বিদিশার কাছ থেকে মিনু আমাকে ছিনিয়ে নিতে চায়। যে কোন মূল্যে মিনু হাসিল করতে চায় আমাকে। সেদিনের সেই বর্ষামুখর কালো রাত। মিনু নির্লজ্জ্বের মতন একটা কান্ড করে বসল। আর তা দেখে বিদিশাও হারিয়ে গেল আমার জীবন থেকে। হারিয়ে গেল প্রেম। পড়ে রইল কিছু টুকরো স্মৃতি। জীবনের সেই ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো যদি অধ্যায়কারে লিখতে বসি, তাহলে একটা বড় উপন্যাস তো হবেই। জানি না পাঠকরা সেটাকে আনন্দ সহকারে নেবেন কিনা? কিন্তু যদি কোনদিন সুযোগ হয়, সে উপন্যাস নিশ্চই আমি লিখব। তবে নিজের জীবন কাহিনী লিখতে একটু কষ্ট তো হবে বৈকি।
মা বলল, কি রে খোকা? জল গরম করবি না? নাকি এই ঠান্ডা জলেই চান করবি। সর্দি লেগে যাবে যে। সকালবেলা গানের রেওয়াজে অসুবিধে হবে।
ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিন একঘন্টা গানের রেওয়াজ করি। একথাটা বলা হয় নি। ক্ল্যাসিকাল গানের চর্চাটা যেটা শুরু করেছিলাম। আজও রয়ে গেছে। বাবা বলতেন, পড়াশুনা ছাড়া, একমাত্র গানের মধ্যেই মা স্বরস্বতীকে পাওয়া যায়। তোর গলা এত ভালো, রেয়াজ কোনদিন ছাড়িস না। বাবা আজ নেই, কিন্ত তাঁর কথাটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছি। মনে পড়ে বিদিশা কলেজে আমার গান শুনেই কেমন পাগল হয়েগিয়েছিল আমার প্রতি। ও বলেছিল,তোমার গলা এত মিষ্টি। মনে হয় ঠিক যেন মধু ঝরে পড়ছে গলা দিয়ে। প্রথমে ও আমার গানের প্রেমে পড়েছিল, তারপর পড়ল আমার।
শুধু বিদিশা কেন? অনেক মেয়েকেই গান শুনিয়ে তাদের মন জয় করে নিয়েছিলাম। তারা সবাই যে আমার সাথে প্রেম করতে চেয়েছিল তা ঠিক নয়। আসলে বিদিশা জীবনে এসে যাওয়াতে, অন্যকারুর প্রেমিক হতে আমারো ঠিক মন চায়নি। ভালবাসা আর প্রেমটা ছিল স্বচ্ছ, গাঢ়। একে অপরকে অঙ্গীকার করার মতন। একটা মেয়েকে ভালবেসে, তার জীবনটা নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে আমিও চাই নি। প্রেমের মধ্যে কোন দাগ ছিল না। আমার ভালোবাসায় কোন ছল ছিল না। প্রগাঢ় ভালবাসায় কলঙ্ক যেটা এল, সেটা শুধু মিনুর জন্য। মিনুও আমার গানের পাগল ছিল। বিদিশাকে জব্দ করার জন্যই ও এই খেলাটা খেলল।
 কলেজের পরে মিনুর সাথে অনেকবারই দেখা হয়েছে। এই কবছরে মিনু যেন আরো অনেক পাল্টে গেছে। ওকে এখন দেখলে মনে হয়, পুরুষ ধরায় ও যেন গিনিসবুকে নাম তুলতে চলেছে। আমার পরেও কত ছেলেকে ফাঁসানোর চেষ্টা করল। সঙ্গী বদলানোর তাগিদে চার চারটে বিয়েও করল। কিন্তু কারুর সাথেই সেভাবে কোনদিন একাত্ম হয়ে ঘর করতে পারল না। মিনু বলতো, আমি এখনও রাইট পার্টনারটাকে খুঁজছি। যেদিন পাবো, সেদিন আমি এই খেলাটা ছেড়ে দেবো। বছর তিনেক আগে মিনুর সাথে শেষ দেখা হয়েছিল। তখন ও যে লোকটার সাথে আমায় আলাপ করিয়েছিল,সেটা ওর ফোর্থ হাজব্যান্ড। ভদ্রলোক নাকি দুবাইতে অনেকদিন ছিলেন। পয়সাওয়ালা। মিনু তাকে ফাঁসিয়েছে এবং দিব্যি ঘর করছে তার সাথে। এরপরে অবশ্য মিনুর খবর আর জানিনা। আর রাখতেও চাই না।
শুক্লা মেয়েটা একটু অন্যস্বভাবের। সৌগতর সাথে ও কিছুদিন ভাব করল আমার আর বিদিশার মতন। তারপর সৌগত বিয়ে করল। শুক্লাও বিয়ে করে নিল আর একজনকে। পরে শুনেছিলাম, সৌগতকে বিয়ে করা নিয়ে নাকি মত দেয়নি শুক্লার বাবা মা। অথচ ভাগ্যের এমনই পরিহাস। একবছর ঘুরতে না ঘুরতেই, শুক্লার সাথে ওর স্বামীর ছাড়াছাড়ি। এখন শুনেছি, শুক্লা নাকি একা থাকে। সল্ট লেকে একটা ফ্ল্যাট কিনেছে। ব্যাঙ্কে ভালো চাকরি করে বলে লোন পেতে নাকি অসুবিধে হয় নি। সৌগতর বিয়েতে শুক্লাও এসেছিল। দেখলাম পুরোনো অ্যাফেয়ারটা ভুলে গেছে ওরা দুজনেই। বিয়েবাড়ীতে শুক্লাকে পেয়ে সৌগত স্বাভাবিক। শুক্লাও তাই। যেন দেখে মনে হবে না এই দুজনেও আমার আর বিদিশার মতন হাত ধরাধরি করে ভিক্টোরিয়াতে ভিজেছিল একদিন। সেদিন শুভেন্দু আমাদের চারজনকে দেখে হাসতে হাসতে ভিক্টোরিয়ার ভেতরটায় পুকুরটায় পড়ে গিয়ে কিছুতেই আর উঠতে পারে না। পরে জেনেছিলাম, ও জলকে ভীষন ভয় পায়, সাঁতার জানে না। আমাকে বলল, ‘‘কি করব? তোদের যা রকম দেখলাম, হাসতে হাসতে পা পিছলে পুকুরটার মধ্যে পড়ে গেলাম। জলের মধ্যে পড়ে গিয়ে দেখি, আর কিছুতেই উঠতে পারি না।’’
আমি আর সৌগত দুজনে শুভেন্দুর হাত ধরে ওকে টেনে তুলেছিলাম জল থেকে। আসলে বিদিশা বৃষ্টিতে মাথা বাঁচানোর জন্য ওর শালোয়ারের ওড়নাটা আমার মাথায় দিয়েছিল। ওড়নার তলায় আমি আর বিদিশা তখন একটু একে অপরকে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করছি। তাই দেখে সৌগত আর শুক্লাও তাই করতে লাগল। শুভেন্দু গিয়েছিল বাদাম কিনতে। ফেরার পথে ওড়নার তলায় আমাদের চারজনকে চুমোচুমি করতে দেখে ও হেসে অস্থির। প্রথমে আনন্দে কিছুটা নাচতে চেষ্টা করল। তারপর হেসে একেবারে কুতিয়ে পড়ছে। সেই সময়ই পা পিছলে একেবারে পুকুরের জলে। আমি আর সৌগত ছুটে গেলাম। বিদিশা বলল, ধরো ধরো ওকে ধরো। যা আজকে করলো। সব আনন্দটাই মাটি হয়ে গেল।
মনে পড়ে সেই সব দিন। কত স্মৃতি আজও ভুলবার নয়। আজও ভাবি পুরোনো দিনগুলোতে একবার যদি ফিরে যেতে পারতাম। যদি বয়সটা কমে গিয়ে আবার সেই কলেজের দিনগুলোর মতন হৈ চৈ আর মাতামাতিতে মেতে উঠতে পারতাম। আনন্দ আছে, আছে হূল্লোরবাজী, ঘন্টার পর ঘন্টা ক্যান্টিনে কেটে যাওয়া, কফি হাউসের বড় টেবিলটাকে দখল করে দেদারে ঘন্টার পর ঘন্টা আমাদের প্রানখোলা আড্ডা মারা। এছাড়া প্রতি শুক্রবার নতুন কোন ছবি রিলিজ করলে, অ্যাডভান্স টিকিট কেটে আবার দেখা চাই। হিট ছবির গানগুলো আমি ক্যান্টিনে বসে গাইতাম। মাঝে মাঝে প্রিন্সিপাল ওপর থেকে নিচে নেমে আসতেন। আমাকে বলতেন, ‘‘দেব তোমার গলা ভালো আমি জানি, তা বলে পড়াশুনাটাও তো মন দিয়ে করো। সামনে বি এস সি ফাইনাল পরীক্ষা। তুমি যে কি রেজাল্ট করবে, আমার যে তোমাকে নিয়ে বড় চিন্তা হচ্ছে।’’
আমি এক চান্সে বি এস সি পাশ করেছিলাম ঠিকই। তবে কলেজ ছেড়ে দেবার পর ক্যান্টিনের ভেতরটা পুরো বদলে গিয়েছিল। স্বরস্বতী পূজোয় একবার করে যখন যেতাম। তখন দেখতাম ক্যান্টিনের ভেতরে কাঠের টেবিলগুলো আর নেই। ওখানে সব বাঁধানো সিমেন্টের টেবিল হয়ে গেছে। আসলে আমার গানের সাথে টেবিল বাজিয়ে এমন নাচানাচি হত, আওয়াজটা প্রিন্সিপালের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যেত। আমাকে উনি বকা দিতেন, আবার ভালও বাসতেন। কারন কলেজের প্রতিবছরের কালচারাল প্রোগ্রাম আমাকে বাদ দিয়ে যে হত না। ঐ প্রোগ্রামে আমি নিজে গাইতাম সবার প্রথমে। ভাড়া করা যারা আর্টিস্টরা আসত, তারা একে একে সব গেয়ে চলে যেত। কিন্তু আমাকে প্রোগ্রামের শেষেও অনেকের আবদার মেটাতে হত। কিসব ছিল সেইসব দিন। পুরোন দিনগুলোর কথা মনে পড়লে বড় অদ্ভূত লাগে। ভাবি মানুষের জীবনটা অনেক স্বল্প দৈর্ঘ্যের। আনন্দটা কম, কষ্টটা বেশী হয়তো সেই জন্যই। শুভেন্দু বলেছিল, ‘‘তুই বড্ড বেরসিক হয়ে গেছিস দেব। একা একা থাকিস, মাঝে মধ্যে সময় কাটাতে আমাদের কাছে তো আসতে পারিস। কি এক বিদিশাকে তুই ভালবেসে জীবনটা শুধু ওর স্মৃতিতেই কাটিয়ে দিলি। মেয়েদের মন বোঝা যে বড় শক্ত। দেখতো আমাকে, কাউকে ভাল না বেসে কেমন দিব্যি আছি আমি। ভাগ্যিস বিদিশার মত আমার জীবনে কেউ আসেনি। প্রেম যারা করে তারা সব মুর্খ হয়। পৃথিবীতে প্রেমের মত বোকামি আর কিছুতেই নেই। তুই না মানলেও আমি এটা প্রবলভাবে মানি। যারা তোর মত সারাদিন কেবল লেখালেখিতে ডুবে থাকে, তারাও দেখ, হয়তো তোরই মতন। কাউকে ভালবেসে বিফল হয়ে এখন এটাকেই জীবনের সঙ্গী হিসেবে মেনে নিয়েছে। মাঝে মধ্যে একটু আড্ডাতে তাই আয়। ফুর্তীর আসর জমাই। গল্পগুজব করি। সাথে হূইস্কি কিংবা রাম অথবা ভদকা তো আছেই। তুই এলে আমার রনির দুজনেরই খুব ভালো লাগবে।’’

 
[+] 4 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#3
শুভেন্দুর পিকনিক গার্ডেনের বাড়ীতে বেশ কয়েকবার গেছি। আমার মত ও এখনো বিয়ে করেনি। প্রতি শনি রবিবার নিয়ম করে রনি ওর কাছে যায়। কলেজের সময় থেকেই রনির সাথে শুভেন্দুর একটা আলাদা খাতির ছিল। রনি বিয়ে করেছে শুভেন্দুরই বোন মাধুরীকে। ওদের এখন শালা জামাইবাবুর সম্পর্ক। আমাকে পেলে দুজনেই মিনু আর বিদিশার কথা তুলে একটু হাসি ঠাট্টা মশকরা করত। বিদিশাকে রনি একবার ঠাট্টা করে কলেজে বলেছিল, ‘‘দেবকে দেখে আমার খুব হিংসে হয়। তুই কি দেখে দেবের প্রেমে পড়লি বলতো? কেন? পাত্র হিসেবে আমি কি খারাপ ছিলাম? তোকে রাজরানী করে রাখতাম। নে এবার দেবকে বাতিল করে দে। কালীঘাটে গিয়ে দুজনে মালা দিই। আর দেবকে বলি, বিদিশা তোর সাথে প্রেম করে ভুল করেছিল, এখন পস্তাচ্ছে। তাই ওকে আমি বিয়ে করে নিলাম।’’
বিদিশাও কম যায় না। রনিকে বলেছিল, ‘‘শুভেন্দুর বাড়ীতে কার টানে তুই যাস, সেকী আমি আর জানি না? শুধু শুধু মেয়েটার মাথা খাচ্ছিস। আগে ওকে যে প্রতিশ্রুতি গুলো দিয়েছিস, সেগুলো পালন করার চেষ্টা কর। তারপর তোকে বলব, কেন আমি দেবের সাথে প্রেম করি। সত্যিকারের ভালোবাসা দেব রাখতে জানে। ও যদি কাউকে কথা দেয়, সেকথা ও রাখতে জানে।’’
রনি বলেছিল, ‘‘দেবকে নিয়ে তুই এত আদিখ্যেতা করিস কেন বলতো বিদিশা। পৃথিবীতে বুঝি দেবই একা ভালবাসতে জানে। আমরা কেউ ভালবাসতে জানি না?’’
বিদিশা বলেছিল, ‘‘মাধুরীকে কি তুই সত্যি ভালবাসিস?’’
রনি বলেছিল, হ্যাঁ।
 বিদিশা বলেছিল, ‘‘তাহলে আবার আমার পেছনে পড়ছিস কেন? তার মানে তোর ভালবাসাটা মেকী। ওর মধ্যে কোন স্বচ্ছতা নেই। ঠিক আছে শুভেন্দুকে আমি বলছি, ও ঠিক জুতো পেটা করবে তোকে। বোনের সাথে প্রেম করা। মজা বার করে দেবে তোর।’’
সবই ঠাট্টার ছলনে কথাগুলো বলা। বিদিশা জানতো, রনি ইয়ার্কী মারছে,  রনিও তাই। কেউ কারুর কথা তখন গায়ে মাখেনি। শেষ পর্যন্ত শুভেন্দু বোন মাধুরীকে বিয়ে করে রনি প্রতিশ্রুতি পালন করল। আর বিদিশার বলা কথাগুলো আমি রাখতে পারলাম না। জানি না হয়তো আমারই দোষে। মিনুকে বিশ্বাস করেছিলাম। মিনু সেই বিশ্বাসের মর্যাদা আমার রাখতে পারেনি। শুধু কয়েকটা ভুলের দোষে বিদিশা আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল। এক এক জন আলাদা আলাদা মানুষের জীবন অন্যরকম হয়। আমার জীবনটা যেন কি রকম।
[+] 3 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#4
দুই
 
মা বলল, কি রে দেব? তুই কি আজকে অফিস যাবি না? সকালে উঠে লেখালেখি করতে শুরু করলি, অফিস যাবি কখন? নটা তো বেজে গেল। এরপরে কখন চানে যাবি, আর কখন তৈরী হবি। তোকে দেখে মনে হচ্ছে তোর আজ কোন তাড়া নেই।
মাকে বললাম, না গো মা। অফিস তো যাবই। আজ আবার শুভেন্দুর বাড়ীতেও একটু আমাকে যেতে হবে। ও বলেছে সাতটার পরে আসতে। ভাবছি অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা ওখানেই-
মা বলল, শুভেন্দু? কেনরে? হঠাৎ এতদিন পর?
কারনটা আমিও জানি না। মা’ কে বললাম, ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বলেনি। শুধু বলল, তোকে ডেকেছি যখন ব্যাস আসতেই হবে। আর কিছু আমি শুনতে চাই না। আজ তোকে আসতেই হবে উইথ আউট ফেল। তোর জন্য এখানে অনেক সারপ্রাইজ আছে।
শুভেন্দু বলেছে, অথচ আমি ওর ডাকে যাইনি, এমন খুবই কম হয়েছে। শুভেন্দু আমাকে একসময় অনেক হেল্প করেছিল। ব্যাবসার আর্থিক ক্ষতিতে দেনায় একসময় ডুবে গিয়েছিলাম। শুভেন্দু আমাকে বেশ কিছু টাকা ধার দিয়ে তখন বাঁচিয়েছিল। দেনাগুলো শোধ করেছি, ওকেও একটু একটু করে পুরোটা শোধ করেছি। শুভেন্দুর করা উপকার জীবনে কোনদিন ভুলতে পারব না। একমাত্র কলেজের পরে ওই আমার সাথে যোগাযোগটা রেখেছিল। পিকনিক গার্ডেনে চারতলা ওদের বিশাল বাড়ী। শুভেন্দুরা চার ভাই। শুভেন্দু তার মধ্যে ছোট। বড়ভাই ওকালতি করেন, মেজভাই ডাক্তার। আর সেজ ভাইয়ের সাথে শুভেন্দু জয়েন্টলি প্রোমোটারি ব্যাবসা করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকটা ফ্ল্যাট বাড়ী তৈরী করে অনেক টাকা রোজজগার করে নেয়। শুভেন্দুর একটি মাত্র বোন মাধুরীকে বিয়ে করল রনি। এদিক দিয়ে রনি খুব লাকি। আসলে রনিদের আবার বড়বাজারে বিশাল বিল্ডিং মেটারিয়ালের দোকান। রনি যখন কলেজে পড়ে, তখন ওর বাবা দোকানটা চালাতো। বিশাল ব্যাবসা। রনি ব্যবসার দায়িত্ব নিল কলেজ পাশ করার পর। সেজভাই দীপেন্দু আগে থেকেই প্রোমোটারি লাইনে ছিল। শুভেন্দু এবার যুক্ত হল। ব্যাবসায়িক এবং কলেজের বন্ধুত্বের গাঢ় সম্পর্ক। রনি তারপর থেকেই শুভেন্দুর বাড়ীতে যাতায়াত শুরু করল। মাধুরীকে দেখে রনির প্রেম। তারপরেই বিয়ে। রনির বিয়েতে আমরা সবাই গিয়েছিলাম। বিদিশাও এসেছিল। তার ঠিক পরের দিনই বিদিশা আমাকে ছেড়ে চলে যায়। বৌভাতে বিদিশা যায় নি। বলেছিল, ‘দেব’ যেখানে থাকবে, সেখানে কোনদিন যাব না। ও ভীষন পাপী। মিনুকে নিয়ে যা কান্ডটা ‘দেব’ করেছে, তারপর ওর মুখ দেখাটাও পাপ। আমি কেন যে ওকে ভালবেসে ভুলটা করেছিলাম, সেটাই এখন বুঝতে পারছি। ‘দেব’ ই আমার চোখ খুলে দিয়েছে।
 বৌভাতে আমিও যাইনি। বিদিশার দূঃখে সারারাত অনেক কেঁদেছিলাম। ছেলে হয়ে কোন মেয়ের জন্য কাঁদছি। মা বলেছিল, তুই কি পাগল? যে বিদিশার জন্য এত কষ্ট পাচ্ছিস?
মাকে বলেছিলাম, মা কষ্ট কেন পাচ্ছি, তুমি বুঝবে না। পৃথিবীতে ছেলেরাই শুধু দোষ করে আর মেয়েরা বুঝি সব ধোয়া তুলসী পাতা। বিশ্বাসটা অর্জন করতে যে অনেক সময় লেগে যায় মা, কিন্তু ভাঙতে একদিনও যে লাগে না এটা যেমন সত্যি। তেমনি সত্যি আর মিথ্যের বিচার না করেই, কেউ কাউকে অবিশ্বাস করতে একমূহূর্তও সময় নেয় না। এটা কি সহজে মেনে নেওয়া যায়? বিদিশা কেন এমন করল? ও যদি সত্যিটা একবার আমার কাছে জানতে চাইত, তাহলে হয়তো-
 
বিদিশাকে মা যতবারই দেখেছে, বিস্মিত হয়েছে। আমাকে বলেছে, নারে মেয়েটার মুখ চোখ খুব সুন্দর। আজকাল তো এমন মেয়ে পাওয়াই যায় না। কি রূপ, সুন্দর মুখশ্রী ওর। ভগবান যেন আলাদা তুলি দিয়ে ওকে গড়েছেন। ওর দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, কলেজে ওই বোধহয় সবচেয়ে সুন্দরী। কেবল তোকেই ও শুধু ভালবেসেছে। আমি বলতাম, মা, বিদিশা শুধু সুন্দরী নয়। ওর মনটাও খুব ভাল। একেবারে ফুলের মতন নরম। বিদিশার পক্ষে আঘাত সহ্য করা তাই খুব কষ্ট। ও বলে, ‘‘জানোতো দেব, তোমার কাছ থেকে কোনদিন তো আমি আঘাত পাব না। তাই তোমার সাথে প্রেম করতেও খুব নিশ্চিন্ত বোধ করি। কি জানি অন্যের মনে কি আছে? তুমি খুব সরল। তোমার এই সরল মনটাই আমার সবচেয়ে বেশী ভালো লাগে। তাই তোমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি, ভাবি দেব বলে পৃথিবীতে বোধহয় একজনই পুরুষ আছে, যে বিদিশার মনটাকে বুঝবে, তাকে ঠকাবে না। কোনদিন বিদিশাকে ছেড়ে দেব চলে যাবে না।’’
কলেজে বিদিশা সবসময় শাড়ী পড়ে আসত। কলেজ ছুটীর পরে আমরা দুজনে ঠিক দুঘন্টা একসাথে ঘুরতাম। কখনও কলেজ স্কোয়ারে, কখনও লেবুতলা পার্কে। এছাড়া ছুটীর দিনগুলোতে ভিক্টোরিয়া, গঙ্গার পাড় তো আছেই। বিদিশা বেশ কয়েকবার আমার বাড়ীতে এসেছে। মা’র সাথে প্রথম যেদিন আলাপ করালাম। ঢুপ করে মাকে একটা প্রনাম করে বসল। মা ওর থুতনীতে হাত রেখে আশীর্ব্বাদ করে বলল, বাহ্ তোমার মুখটা তো খুব সুন্দর। তুমি কি দেবের বন্ধু? না অন্যকিছু?
বিদিশা মুখ নিচু করে লজ্জায় হেসেছিল। আমাকে পরে বলেছিল, তুমি খুব দুষ্টু। মাকে বলোনি কেন? আমি তোমার কে?
বিদিশার গালে হাত রেখে বলেছিলাম, মা বাবাকে যেচে কিছু বলতে হয় না। ওনারা দেখলেই সব বুঝতে পারেন। মা যেমন তোমাকে দেখে বুঝে গেছে তুমি আমার কে?
বিদিশা একবারই আমাকে ওর বাসায় যেতে বলেছিল। সেদিন ওর জন্মদিন ছিল। তার আগে জানতাম না বিদিশারা খুব বড়লোক। ল্যান্সডাউনে বিশাল ওদের বাড়ীটা দেখে আমার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। রনি সেদিন টিপ্পনি কেটে আমায় বলেছিল, ওরেব্বাস, দেব, তুই কি লাকী রে। বিদিশারা এত বড়লোক, আমরা কেউ তো এটা জানতাম না। কপাল করে তুই ই ওকে শুধু পেলি। না এর জন্য তোকে এবার একটা পার্টী দিতে হবে।
পার্টি আমি দেবো কি? সেদিন যা এলাহী ব্যাপার দেখেছিলাম, আমার মাথার ঠিক ছিল না। লোকে লোকারণ্য। যেন বিয়েবাড়ী। জন্মদিনেও এত অতিথির সমাগম হতে পারে, আমার ধারনা ছিল না। কম করেও চারশোর ওপরে অতিথি। এলাহী খাবারের আয়োজন। আমি জীবনে এরকম বার্থডে পার্টি দেখিনি।
 অত বড় বাড়ীতে গাদা গাদা লোকের মধ্যে আমি যেন নেহাতই এক নগন্য অতিথি। চুপচাপ এক কোনে দাঁড়িয়ে বিদিশাকে একদৃষ্টে দেখে যাচ্ছিলাম। ও ঘোরাঘুরি করছিল, সবাইকে অ্যাটেন্ড করছিল। কিন্তু কিছুতেই একবারও আমার কাছে এসে কথা বলছিল না। কারুর সাথে আমার পরিচয়ও করিয়ে দিচ্ছিল না। হয়তো আমাকে সেদিন পরীক্ষা করেছিল বিদিশা। শুভেন্দুর সাথে একটা সিগারেট টানবো বলে সবে মাত্র বাইরে বেরিয়ে এসেছি। এমন সময় বিদিশা বাইরে এসে আমাদেরকে বলল, ‘‘এখানে কি করছ? ও ফোঁকার জন্য বাইরে আসা হয়েছি বুঝি? এই শুভেন্দু চল শীগগীর ভেতরে চল। কেক কাটা হবে। তোদেরকে বাদ দিয়ে আমি কেক কাটতে পারছি না।’’ আমাকে বলল, ‘‘যেই একটু কথা কম বলেছি, অমনি রাগ হয়েছে বুঝি? চলো ভেতরে চলো। বাবা মা দুজনেই তোমাকে দেখেছে দূর থেকে। বলেছি, ‘দেব’ হচ্ছে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। দেখোতো ওর সাথে কথা বলে, তোমাদের মেয়ে যাকে ভালবেসেছে, সে একদম ঠিকঠাক হয়েছে কিনা?
বিদিশার বাবা মা আমার সাথে কথা বলবে? তার আগেই আমার হাত পা গুলো কেমন কাঁপছিল। শুভেন্দু বলল, ‘এই দেব, নার্ভাস হয়ে গেলি নাকি? তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে বহূত টেনশনে পড়ে গেছিস। চল চল ভেতরে চল। কেক কাটা হবে। বিদিশা নয়তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। বাবা মার পর তোকেই ও ফার্স্ট কেকটা খাওয়াবে। এমন সুযোগ কিছুতেই মিস করিস না।’’
বিদিশার মা বাবা খুব ভাল। দুজনেই খুব অমায়িক। কেক কাটার পর বিদিশা ঠিক আমার মুখে প্রথম কেকটা গুঁজে দিল। তাই দেখে রনি আবার বলল, কিরে আমাদেরকেও খাওয়া। শুধু দেবকে খাওয়াবি, আর আমরা বাদ?
সেদিন বিদিশার জন্মদিনে আমরা সবাই গিয়েছিলাম। শুধু মিনু বাদে। শুক্লা এসেছিল একটু রাতের দিকে। সৌগত, শুক্লা আসছে না দেখে ওর জন্য ছটফট করে মরছিল। শেষ পর্যন্ত শুক্লা এলো। তবে দেরীতে। বলল, সরি গাইস্। একটু লেট হয়ে গেল। বাড়ীতে মার শরীরটা খুব খারাপ। হঠাৎই জ্বর। আমি শুধু এলাম, বিদিশার জন্য। ও অনেক করে আসতে বলেছে। আর যাই হোক বিদিশার কথা তো আর চট করে কখনও ফেলা যায় না। পার্টিটা অন্যকারুর হলে হয়তো আসতাম না।
সেদিন অনেক রাত্রি অবধি বিদিশাদের বাড়ীতে ছিলাম। ফেরার পথে সবাই মিলে একটা ট্যাক্সি ধরলাম। শুভেন্দু আর রনি এমন বদমাইশ, সৌগতকেও পটিয়ে নিয়ে, ট্যাক্সিভাড়াটা আমাকে দিয়েই দেয়া করালো। ফেরার পথে আবার দোকান থেকে তিনবোতল বিয়ার কিনলো ওরা তিনজনে। সে পয়সাও আমি দিলাম। আমাকে বলল, ‘‘আজকি শাম, তোর আর বিদিশাকে নাম। এবার থেকে মাঝে মধ্যেই আমরা তোর আর বিদিশার খুশীতে পার্টি দেবো। আর সে খরচা পুরো তুই বীয়ার করবি। বিদিশার সাথে যতদিন তোর বিয়ে না হচ্ছে, এইভাবেই তুই আমাদের খুশি করে যা। বন্ধুদের খুশি করলে, আমরাও তোকে আশীর্ব্বাদ করব। প্রেমটা তাহলে আরও জমাট বাঁধবে।’’
সত্যিই জমাট বেঁধেছিল আমার আর বিদিশার প্রেমটা। প্রথম প্রথম ওকে অবশ্য বেশী পাত্তা দিতাম না। একদিন লাইব্রেরী রুমে বসে আছি। দেখলাম বিদিশা ঢুকলো, তিনটে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে। আমি যে টেবিলটায় বসে বায়োলজী পড়ছি, ও ঠিক তার পাশের টেবিলটাতেই বসল। আড়চোখে আমাকে দেখছে। আমি বইয়ের মধ্যে চোখটাকে নিবদ্ধ করে বসে আছি। মেয়েটাকে ক্যান্টিনে দেখেছি, বেশ কিছুদিন ধরে। মূগ্ধ হয়ে আমার গান শোনে। কিন্তু আজকে হঠাৎ লাইব্রেরী রুমে আমার পাশে বসে এখানে কি করছে?
 ও এভাবে আড়চোখে দেখছেই বা কেন আমাকে? মনে হল, কিছু একটা মতলব নিয়ে এসেছে মনে হয়। কিছুক্ষণ বসে, আমার দিকে ওভাবে তাকিয়ে তারপর চলে গেল। একটু পরে শুভেন্দু এলো ওখানে। ওকে বললাম, মেয়েটাকে চিনিস?
শুভেন্দু বলল, কোন মেয়েটা বলতো?
-একটু আগে এখানে এসেছিল। আমাকে দেখছিল আড়চোখে। মেয়েটাকে কদিন দেখেছি ক্যান্টিনে। দেখতে বেশ ভালো। স্লিম ফিগার, লম্বা হাইট। চোখ মুখও খুব সুন্দর। কিন্তু আমার প্রতি ওর এত ছোঁক ছোঁক কেন? এত আগ্রহ নিয়ে দেখছিল, মনে হল-
শুভেন্দু বলল, কোন মেয়েটা বলতো? আমাদের ক্লাসের নিশ্চই নয়। তাহলে তুইও বুঝতে পারতিস। এ কলেজে সুন্দরী বলতে তো একজনই আছে। তুই যা বর্ণনা দিচ্ছিস, তাতে মনে হচ্ছে, ফার্স্ট ইয়ারের ওই মেয়েটা। কি যেন নাম। ওকে আমিও দেখেছি একদিন, ক্লাসে এসে তোর খোঁজ করছিল। তুই সেদিন কলেজে আসিস নি।
আমি অবাক হলাম। বললাম, আমার খোঁজ করছিল? কে বলতো? ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে। এমন সুন্দরী মেয়ে এ কলেজে কে আছে? তুই কার কথা বলছিস?
শুভেন্দু বলল, প্রেমঘটিত কোন ব্যাপার মনে হচ্ছে। এ মেয়েটা তোর প্রেমে পড়ল না তো? কি রে দেব? এতো লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট মনে হচ্ছে।
কলেজে এত মেয়ে। আমি তো কারুর সাথে প্রেম করিনি। শুভেন্দুকে বললাম, হেঁয়ালি ছাড়। ব্যাপারটা জানতে হবে। তুই খবর নিয়ে দেখতো মেয়েটা আসলে কে? দেব চটকরে কারুর সাথে ভীড়বে না।
শুভেন্দু আমার কথা মত কাজ করল। আমাকে বলল, তুই এখানেই বস। আমি এখুনি আসছি।
আমাকে লাইব্রেরী রুমে বসিয়ে রেখে ও চলে গেল। ফিরে এল আধঘন্টা পরে। আমাকে এসে বলল, এই দেব, বিদিশা তোকে ডাকছে, চল আমার সঙ্গে একটু তিনতলায় চল। ও সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে বলল, ওকে একটু ডাকবে? বলো, আমি ওর জন্য এখানে অপেক্ষা করছি।
আমি একটু বিরক্ত হলাম। শুভেন্দুকে বললাম, কেন? আমি যাব কেন? কে না কে বিদিশা আমাকে ডাকছে, ওর কিছু বলার থাকলে, ওকে বল, এখানেই আসতে। আমি তো লাইব্রেরী রুমেই বসে আছি।
শুভেন্দু ঠিক বুঝতে পারল না। আমাকে বলল, ‘‘যা বাবা। মহা হ্যাপাতো? তুই তো বললি, আমাকে যেতে। ও তোকে কিছু হয়তো বলতে চায়। চল না আমার সঙ্গে। তাহলেই বুঝতে পারবি।’’
আমি কিছুতেই গেলাম না। শুভেন্দুকে বললাম, ছাড় ওকে। ছেড়ে দে। পরে দেখা যাবে। ওর যদি দরকার থাকে, ও নিজেই আমার কাছে আসবে। আমি যাব না।
আসলে বিদিশাকে আমি খেলাতে চাইনি। কিন্তু কেন জানি আমার মনে হয়েছিল, কলেজের মেয়েগুলো সব বন্ধু হিসেবেই ঠিকই আছে। বেশী প্রেমের খেলা খেলতে গেলে মুশকিল। একেতো কলেজে এসে গান গেয়ে এমনই হীরো বনেছি, তাতেই পড়াশুনার বারোটা বাজছে। তারপরে আবার প্রেমে পড়লে, পড়াশুনা একেবারেই ডকে উঠবে। ভালো চাকরি পাওয়া তো দূর কেরানীর চাকরীও তখন জুটবে না কপালে। অতএব এসব বিদিশা টিদিশাকে যত দুরে রাখা যায় ততই মঙ্গল।
[+] 2 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#5
শুক্লা আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল। ক্লাসে ও আর আমি পাশাপাশি বসতাম। শুক্লা আমার কাছ থেকে ফিজিক্স এর নোট নিত। আমার ডায়েরীর পাতাগুলো উল্টে পাল্টে দেখত। ভালো কিছু চোখে পড়লে, সঙ্গে সঙ্গে টুকে রাখতো। এদিকে সৌগত বেশ কিছুদিন ধরেই শুক্লার সাথে লাইন মারার চেষ্টা করছে। শুক্লা কিছুতেই পাত্তা দিচ্ছে না। একদিন কলেজে এসে শরীরটা আমার ভীষন খারাপ হল। গরমে প্রচন্ড বমি হচ্ছে। চোখমুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। প্রায় অজ্ঞান হবার মত অবস্থা হল। সবাই চোখে মুখে জল দিয়ে আমাকে ক্যান্টিনে একটু ছায়ার মধ্যে নিয়ে গেল। শুক্লার কোলে মাথা রেখে তখন শুয়ে আছি। শুক্লা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তাই দেখে বিদিশাও বুঝে গেল, আমি বোধহয় শুক্লার সাথে নিশ্চই প্রেম করি। ওর আমার প্রতি জেদটা আরো বেড়ে গেল।
আমি বিদিশাকে সাতদিন, আমার কাছে ভীড়তে দিইনি। তারপরই এল সেইদিনটা। সেদিন ছিল কলেজে সরস্বতী পূজোর দিন। বিদিশাকে দেখলাম, ঠিক আমার পেছনেই এসে দাঁড়িয়েছে। একটা ঘি রঙের লাল পেড়ে শাড়ী পড়েছে। কপালে লাল টিপ। সরস্বতী পূজোয় মেয়েরা যেমন সাজে, তার থেকেও সুন্দর লাগছে ওকে। আমাকে বলল, ‘‘তুমি খুব ভালো গাও। তোমার গান শুনেছি, আমি মুগ্ধ। আজকে তো সরস্বতী পুজো। আমাদের গান শোনাবে না?’’
আমি ভাল করে একবার তাকালাম বিদিশার দিকে। ওকে কয়েক পলক দেখলাম। বিদিশার ঠোঁটের কোনে হঠাৎই এক চিলতে হাসি দেখলাম। মনে হল, মেয়েটা যেন কিছু আশা করে রয়েছে আমার কাছ থেকে পাবে বলে। গান শোনাব না ওর আমাকে ভাললাগাটাকে মেনে নেবো, কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার হাতে হঠাৎই একটা চিরকূট গুঁজে দিয়ে বিদিশা বলল, ‘আমি এখানে কিছু লিখে রেখেছি। তোমাকে দেবার জন্য। পড়ে দেখো।’ বলেই এক নিমেষে ছুটে পালিয়ে গেল ওখান থেকে।
আমি ওর গুঁজে দেওয়া কাগজটা হাতে নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। একটু পরে শুভেন্দু এল ওখানে। আমাকে বলল, কিরে? কি বলছিল বিদিশা? তোকে কিছু বলল?
আমি বললাম, না সেরকম কিছু না। একটা কাগজ শুধু গুঁজে দিয়ে গেল হাতে। বলল, তোমার জন্য লিখেছি, এটা পড়ে দেখো।
শুভেন্দু বলল, খুলে দেখ। আমার মনে হচ্ছে নিশ্চই এটা প্রেমপত্র। বিদিশা তোকে মনে হয় প্রেম নিবেদন করেছে। জিও বেটা, আজ থেকে তোমার নাম প্রেম কুমার।
[+] 1 user Likes Lekhak is back's post
Like Reply
#6
তিন
 
এটা ঠিক, আজকাল যেভাবে প্রেম ভালোবাসা হয়, আমাদের সময় প্রেমটা এরকম ছিল না। তখন প্রেমটা দানা বাঁধতে একটু সময় নিত। একটু বোঝাপড়ার জন্য সময় লাগত। বিদিশা আমাকে চিঠিতে দুলাইন লিখেছিল, ‘‘আমি তোমাকে ভালবাসি। তুমিও কি তাই?’’
 
মেয়েটাকে যতবারই দেখেছি আমার মন্দ লাগেনি। রূপ আছে, গুনও আছে নিশ্চই। কিন্তু ওকে পাবার জন্য আমার মধ্যে তখনও ব্যাকুলতাটা আসেনি। সেইভাবে ছটফটানিটাও অনুভব করিনি। মনে হয়েছিল এতই কি সহজ? ও বলল, আমাকে মেনে নিতে হবে? সত্যি ভালবাসে কিনা একবার যাচাই করে নেওয়া তো দরকার।
 শুভেন্দু বলল, ‘দেব’ তুই না দিনকে দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিস। আরে ও তোকে প্রেম নিবেদন করল। ওর ভালোবাসাটাকে অ্যাকসেপ্ট কর। কলেজে সবাই তোকে নিয়ে মাতামাতি করে বলে, তুই একটু দেমাকী হয়েছিস। দেখতো মেয়েটা কেমন সরল, সুন্দর। পুরুষেরা চিরদিন এমন নারীকেই ভালবেসে এসেছে যার স্নিগ্ধ কোমলতা ব্যাটাছেলেদের শান্তি দিতে পারে। বিদিশার মত মেয়ে আর একটা খুঁজে পাবি তুই?
ঠিক ঐ মূহূর্তে কোন চিন্তা আমার মাথায় এল না। ভাবলাম,শুভেন্দু যা বলছে, তার ঠিক কতটা সত্যি? সুন্দরী নারী বিদিশা। আমার মধ্যে কি এমন ও দেখল, যে আমাকে ওর ভালো লেগে গেল।
শিয়ালদহর কাফেটোরিয়াতে পরের দিন আমরা সবাই বসে আছি। ঠিক ঐ সময়ে বিদিশাও ওখানে এসে উপস্থিত হলো। শুভেন্দু, রনি, সৌগত আর আমি চারজনেই আমরা বিদিশার মুখের দিকে তাকালাম। ওরা তিনজনে বিদিশাকে দেখে খুব খুশি হল। কিন্তু আমি ভীষন অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম।
শুভেন্দু বলল, কি রে দেব? তুই কি ওকে খেলাচ্ছিস?
আমি কোন জবাব দিচ্ছি না।
রনি কিছু জানে না। শুভেন্দুকে বলল, কি হয়েছে রে শুভ? দেব কাকে খেলাচ্ছে?
শুভেন্দু বলল, ঐ যে মেয়েটাকে দেখছিস, দেবের খোঁজে এখানে পর্যন্ত চলে এসেছে। দেব ওকে খেলাচ্ছে।
আমি রেগে গেলাম। বললাম, কি যাতা বলছিস? আমি কাউকে খেলাচ্ছি না।
রনি বলল, কি হয়েছে ব্যাপারটা? আমাকে খুলে বল দেখি।
শুভেন্দু, বিদিশার চিঠি দেবার ব্যাপারটা ওকে সব খুলে বলল। তাই শুনে রনি বলল, ওরে দেব। এই ছিল তোর মনে? ঠিক আছে তুই যদি ওর সাথে লাইন মারতে না চাস, তাহলে বল, আমিই লাইন মারা শুরু করছি।
বিদিশাকে আমাদের মাঝে রনিই ডেকে বসালো। ততক্ষণে শুক্লাও ওখানে এসে উপস্থিত। বিদিশা আমারই উল্টোদিকের চেয়ারটায় এসে বসেছে। ও মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকানোর চেষ্টা করছে। আমি মুখ নিচু করে বসে আছি। রনি বলল, এই যে বিদিশা, আমাদের এই বন্ধু মাননীয় শ্রী দেব মহাশয় কে দেখছো তো? ইনি খুব লাজুক প্রকৃতির। ইনি যখন গান গেয়ে সবাইকে মাতিয়ে রাখেন, তখন ইনার মুখ দিয়ে মধু ঝরে পড়ে। কিন্তু প্রেম নিবেদনে ইনি একটু কাঁচা। ইনার গলা দিয়ে তখন আওয়াজ বেরোয় না। কন্ঠস্বর রোধ হয়ে থাকে। জিভে আড়ষ্ঠতা এসে যায়। তুমি একে বাদ দিয়ে বাকী তিনজনের মধ্যে কাউকে পছন্দ হয় কিনা দেখোতো? দেব মনে হচ্ছে ঠিক খেলতে চাইছে না তোমার সঙ্গে।
ইচ্ছে হচ্ছিল রনির পাছায় ক্যাঁত করে একটা লাথি মারি। ও বিদিশার সামনে আমাকে জেনেবুঝেই বেইজ্জ্বত করছে, সেটাও বুঝতে পারছি। কোন কথা না বলে আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে বিদিশার হাতটা ধরলাম। ওকে বললাম, এসো তো তুমি আমার সঙ্গে। এসব ফালতু ছেলেদের সাথে মুখ লাগিয়ে কোন লাভ নেই। চলো আমরা বরং আলাদা কোথাও গিয়ে বসি।
বিদিশার হাত ধরে ওকে আমি ক্যাফেটরিয়া থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছি। পেছনে একবার তাকিয়ে দেখলাম, রনি হাসছে। ওকে দেখে বাকীরাও হাসছে। রনি হাসতে হাসতে বলল, এই তো গুরু জেগেছে। কেয়া বাত কেয়া বাত। এই না হলে দেব। তরপরে আবার হাসতে হাসতে বলল, সবই যখন জানো, শালা ন্যাকামো করছিলে কেন? কচি খোকা।
 শুভেন্দু হাসতে হাসতে বলল, যাঃ এই বিদিশা এলো। আর অমনি তুই আমাদের ভুলে গেলি? তুই কি স্বার্থপর রে। দেব যাস না আমাদের ছেড়ে। তাকা, একবার তাকা। প্লীজ প্লীজ।
আমরা বাইরে বেরিয়ে এসেছি। ওদের হাসির আওয়াজটা তখনও ভেতর থেকে আসছিল। বিদিশা একটু দূরে গিয়ে বলল, তোমার চিঠিটা আজকেই পেয়েছি। শুভেন্দু আমার হাতে তোমার চিঠিটা দিয়ে বলল, দেব তোমাকে কাফেটরিয়াতে আসতে বলেছে। এই নাও দেবের চিঠি।
আমি বললাম, কই দেখি। চিঠি? কই আমি তো লিখিনি তোমাকে।
বিদিশা একটা কাগজ দিল আমার হাতে। খুলে দেখলাম। তাতে আমারই নামকরে বিদিশাকে চিঠিটা লেখা হয়েছে,
 
বিদিশা, আমি জানি না, তোমার ভালবাসাকে আমি কিভাবে গ্রহন করব? আমার মত অতিসাধারন একটা ছেলেকে তুমি ভালবেসে ফেলেছ। মুখ ফুটে আমিও এতদিন বলতে পারিনি। আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি বিদিশা। এ জীবনে কেন, জনমে জনমে আমি তোমাকে চাই। আমার ভালোবাসা তুমিও গ্রহন করো। আর আজকে কাফেটরীয়াতে অবশ্যই এসো। আমি ওখানে তোমার জন্য অবশ্যই অপেক্ষা করব। ইতি তোমার দেব।
 
চিঠিটা পড়ার পর আমি আর বিদিশাকে কিছু বলিনি। ওকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম কলেজ স্কোয়ারে। দুজনে নিরিবিলিতে বসে অনেক্ষণ কথা বলেছিলাম। ফিরে এসেছিলাম সন্ধে হবার পর। তারপর পরপর দুদিন শুভেন্দু কলেজে আসেনি। যেদিন এসেছিল, ওকে খুব তাড়া করেছিলাম। কলেজ গেট থেকে একেবারে বড় রাস্তার মোড় পর্যন্ত। আমার তাড়া খেয়ে কান ধরে শেষ পর্যন্ত হাসতে হাসতে শুভেন্দু বলেছিল। মাফ করে দে বস। এটা তো করতেই হত। নইলে তোদের প্রেম পর্বটা যে শুরু হতে হতেও বাকী থেকে যেত। বিদিশারও আফশোস থাকত না। আর আমাদের তো নয়ই।
আসলে ওরা সবাই এটা জানত। শুভেন্দু সবাইকে বলে রেখেছিল। এমনকি শুক্লাকেও। সেদিন কাফেটরিয়াতে ওরা কেউ বুঝতে দেয়নি আমাকে। এমনকি রনিও নয়। আজ মনে পড়ে সেসব কথা। আর ভাবি বন্ধুত্বটা আমাদের এমনই ছিল।
[+] 2 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#7
চার
 
বিদিশাকে নিয়ে আমি অনেক ঘুরেছি। ওর সাথে বাসে করে যখন ঘুরতাম, বাসের ঝাঁকুনিতে মাঝে মাঝে বিদিশা আমার গায়ের ওপর টলে পড়ত। মজা পেয়ে আমি একহাত দিয়ে ওকে বুকে টেনে নিতাম। বিদিশা আমার কাঁধে মাথা রাখতো। আমার শরীরে হেলান দিয়ে দাঁড়াতো। সারা রাস্তায় আমাকে ওর বড় আপন মনে হত। বিদিশার মনে হত ও যেন আমার ওপর নিশ্চিন্তে নির্ভর করতে পারে। খুব কাছ থেকে ও বুক ভরে নিঃশ্বাস নিত। বিদিশার কোমরে হাত দিলে ওর সারা শরীরটা শিরশির করে উঠত। এ যেন এক অদ্ভূত অনুভূতি। বিদিশা বলত, ‘‘তুমিই আমার জীবনের একমাত্র প্রেমিক দেব। প্রেমের মানে কি তা, আমি তোমার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছি।’’ ভিক্টোরিয়ায়, গঙ্গার ঘাটে নিরিবিলিতে যখন ওকে জড়িয়ে ধরতাম, বিদিশা বলত, ‘‘তোমার মধ্যেই আমার শরীর এখন হারাতে চায় দেব। একজন পুরুষের শরীরেই নারী তার নারীত্বকে আবিষ্কার করে। তাই আজ তোমার শরীরের অস্তিত্বের মধ্যে আমার শরীরের উপস্থিতি খুঁজে পাচ্ছি।’’
 
বিদিশাকে নিয়ে প্রথমে যেটুকু আমার দ্বিধা আর সংকোচ ছিল, বিদিশাই সেটা কাটিয়ে দিল। দূর্বার, দুরন্ত প্রেমের মধ্যে দিয়ে আমরা দিনগুলো অতিবাহিত করছি। একদিন বিদিশা এল বাড়ীতে। সেদিন মা ঘরে ছিল না। আমি কলেজে যাইনি। শরীরটা একটু খারাপ। বিদিশা  কলেজে এসে আমাকে দেখতে পাচ্ছে না বলে পাগলের মত খোঁজাখুঁজি করছে। শুভেন্দুর কাছ থেকে ও জানলো, আমার শরীর খারাপ। আমি কলেজে না গিয়ে বাড়ীতেই এখন বসে রয়েছি।
শুভেন্দু বিদিশাকে বলল, দেবকে পেতে গেলে তোকে এখন ওর বাড়ীতে যেতে হবে। যা, দেখ গিয়ে হয়তো তোরই জন্য পথ চেয়ে বসে আছে।
বিদিশা এল। আমি কোনরকমে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুললাম। দেখি বিদিশা দাঁড়িয়ে।
-কি ব্যাপার? তুমি কলেজে যাও নি। শুভেন্দু বলল, তোমার শরীর খারাপ। আশ্চর্য তো তুমি! আমাকে একবারও বলোনি?
বিদিশাকে ঘরের ভেতরে ডেকে নিলাম। ও বলল, মা নেই বুঝি? তুমি একা?
আমার কপালে হাত রাখলো বিদিশা। বলল, জ্বর? সর্দি হয়েছে? ওষুধ খেয়েছ?
আসতে আসতে আমার বুকের কাছে এসে দাঁড়ালো বিদিশা।
আমি বললাম, শরীরটা ভালো নয়। তাই কলেজে যাইনি। একটু জ্বরও জ্বরও এসেছে। মা নেই। আজ সকালেই মাসীর বাড়ী গেছে। তাই আমি একা।
চকিতে মুখ তুললো বিদিশা। তারপর ডায়েরীটা টেবিলের ওপর রেখে, হঠাৎই আছড়ে পড়ল আমার বুকে। সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে উঠলো। আমি দেখলাম বিদিশা পাগলের মতন আমার কাঁধে গলায় মুখ ঘষছে। পায়ের পাতা থেকে হাতের আঙুল অবধি একটা ‘কি জানি কি’ বিন্দু বিন্দু হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আমি বিদিশার কাঁধে হাত রাখলাম। দুহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে ও। আমি দাঁড়িয়ে থেকে টলতে লাগলাম। তারপর বিদিশার মুখ দুহাতে অঞ্জলির মত করে ওপরে তুললাম।  দেখলাম বিদিশার চোখে জল।
 এখন এই নির্জন দুপুরে, আমারই ঘরেতে চারদেয়ালের মধ্যে বিদিশা আমাকে জড়িয়ে রেখেছে।  আমার সমস্ত ছেলেবেলা, কৈশোর থেকে টেনে এনে ছুঁড়ে দিল যৌবনের রহস্যময় বিস্ময়ে। আমার চোখে চোখ রাখলো বিদিশা। ভিজে চোখের পাতায় এত কথা লেখা থাকতে পারে আমি কখনও জানতাম না। দুহাতে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। তিল তিল করে বুকের মধ্যে একটা বোধ ছড়িয়ে যাচ্ছে। এরই নাম কি সুখ! একটা ঘোরের মধ্যে চাপা স্বরে আমি বলে উঠলাম, ‘বিদিশা আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি’।
আমার বুকের মধ্যে একটা গাল চেপে বিদিশা বললো, জানি, জানি, জানি!
তুমি কষ্ট করে আমার জন্য এলে?
কেন আসবো না? কেন?
ও যেন একটু একটু করে দুলছিলো। ওর দুহাতের মধ্যে জড়িয়ে থাকা আমার শরীরটায় সেই দুলুনি লাগলো। বিদিশার মসৃণ মুখ, ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসির ঢেউ- আমি মাথা নিচু করলাম, মুখ নামালাম। আমার চোখের সামনে একশ নন্দন কানন। বিদিশা চোখ বুজে ফেললো। মনে হল, ওকি ভয় পাচ্ছে? ও কি চাইছে না? আমি দেখলাম কি একটা আশ্চর্য মায়ায় বিদিশা ক্রমশ সুন্দর থেকে সুন্দর হয়ে উঠছে আরো। বিদিশার ঠোঁটে ঠোঁট রাখছিলাম আমি। বিদিশার গরম নিস্বাস লাগছে মুখে। আর ঠিক সেই সময় এক ঝটকায় মুখ সরিয়ে নিল বিদিশা। তারপর আমার কাছ থেকে সরে গিয়ে হুহু করে কেঁদে ফেললো। আমাকে বলল, আমি খারাপ, খুব খারাপ। তোমাকে আমি ঠকিয়েছি।
খুব নাড়া খেলে যেমন সাড়া থাকে না আচমকা। আমি প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলাম না। ওর কাছে গিয়ে ওর কাঁধে হাতটা রাখলাম। বিদিশাকে বললাম, কি যাতা বলছ?
‘তুমি আমাকে খুব বিশ্বাস করো না? বিদিশা মুখ ফেরাচ্ছিল না।
আমি তোমাকে শুধু বিশ্বাস করি না বিদিশা, আমি তোমাকে খুব ভালবাসি।
অথচ দেখো, তোমার কাছে আমি সত্যিটা লুকিয়েছি।
কি লুকিয়েছো বলবে তো?
তোমার আগে আমি একটা ছেলেকে ভালবাসতাম দেব, এ সত্যিটা তোমাকে একবারও বলা হয় নি। তুমি কি আমাকে ক্ষমা করে দেবে ‘দেব’?
সেদিন বিদিশার সরল মুখটা দেখে আমার মনে হয়েছিল, ও তো এই কথাটা আমার কাছে চেপেই যেতে পারতো? সত্যিটা না বললে, কি এমন হত? আমি তো ও না বললে কোনদিন জানতে পারতাম না।
বিদিশাকে বললাম, যাকে ভালবাসতে সে এখন কোথায়?
বিদিশা বললো, সে নেই। আমাকে ছেড়ে সে চলে গেছে।
অবাক হয়ে বললাম, কেন?
বিদিশা বললো, ভালোবাসাটা একতরফা ছিল, তাই। আমি ওকে ভালোবাসতাম। কিন্তু ও আমাকে সেভাবে ভালোবাসেইনি কোনদিন। ছেড়ে যাওয়াতে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আমার বিশ্বাসটাকে চূর্ণ করেছিল সে। সেভাবে মর্যাদা দেয় নি আমাকে।
দেখলাম ওর চোখে এবার বেশ খানিকটা জল। বিদিশাকে বললাম, আমি কিন্তু তোমাকে ছেড়ে যাব না বিদিশা। তুমি আমাকে সম্পূর্ণরূপে বিশ্বাস করতে পারো।
 সত্যি বলছো?
একদম সত্যি।
কথাটা বলার পরই বিদিশাকে দেখলাম, ও দুহাতে শিশুর মতন জড়িয়ে ধরল আমাকে। তারপর আমার ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো। যেন চমকে উঠলাম আমি। এরকম হচ্ছে কেন? শরীরের সব রক্ত আচমকা টলে উঠলো কেন? চন্দনের ফোঁটা পড়িয়ে দেবার মত বিদিশা আমার কপালে, চোখের পাতায়, গালে, চিবুকে-এখন সারা মুখে ছোট ছোট চুমু খেয়ে যাচ্ছে। শুধু নিষিদ্ধ করে রাখছে ঠোঁটটা। আমার সমস্ত শরীর শক্ত হয়ে গেলো। অনুভব করলাম, বুকের বাতাস এত ভারী কেন? শেষ পর্যন্ত তিন বছর না খাওয়া কোন ভিখিরীর মত ঝাঁপিয়ে পড়লাম বিদিশার ঠোঁটে। দুটো নরম উষ্ণ অথচ সিক্ত জবাফুলের মত ঠোঁট পাগলের মত নিতে চাইলাম নিজের মত করে। অস্ফুট আওয়াজ করে উঠলো বিদিশা, উঃ একেবারে রাক্ষস। লাগে না বুঝি।’’ একটু থমকে গেলাম আমি। মুখ তুলে দেখলাম বিদিশা হাসছে। আমাকে বলছে, ‘উম আমাকে নাও, নাও, নাও।’
হঠাৎই শরীরে মনে হল, আমার আর জ্বর নেই। অসুস্থ শরীরটাকে যেন সুস্থ করে দিয়েছে বিদিশা। একটা ঝড়ো বাতাসের মত আমি বিদিশাকে বুকে তুলে নিলাম। আমার অগোছালো বিছানায় বিদিশাকে শুইয়ে দিলাম যত্ন করে। ছেলেমানুষের মতন বিদিশা তখন আমায় দেখছিল। খাটের পাশে হাঁটু গে’ড়ে বসে আমি বিদিশার হাতে মুখ রাখলাম। কি নরম জলের মত গন্ধ বিদিশার হাতে, সমস্ত ছেলেবেলা মনে করিয়ে দেয়। আস্তে আস্তে মুখ নামালাম ওর হাতের ওপরের দিকে, বাজুতে। বিদিশার বুকের কাছে মুখ রেখে ও কৃপণের মত চুপ করে বসে থাকলাম খানিক। আজ অবধি কোন যুবতী মেয়ের বুককে এত কাছ থেকে দেখিনি। বিদিশার বুক কি নরম?
একটা হাত আমার মাথায় রেখেছে বিদিশা। আঙ্গুলগুলো আমার চুলের ভেতরে খেলা করছে। বিদিশার বুকের মধ্যে থেকে মন কেমন করা সুবাস উঠে আসছে আমার নাকে। এই শাড়ী আর অন্তর্বাসের আড়াল খুললেই বিদিশার সমস্ত যৌবনটা আমার সামনে এসে দাঁড়াবে। অথচ ওটা খুলতে আমার কেমন যেন ভয় হচ্ছিলো। একবার আড়াল ঘুচে গেলেই সব যে দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিদিশা তখন কি ভাববে?
আমি আসতে আসতে মুখ নামালাম নিচে। বিদিশার কোমর পেট কি নরম-আঃ।
বিদিশা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। এখন ওর ঠোঁটদুটো ঈষৎ খোলা। চিকচিকে কুন্দ ফুলের মত সাদা দাঁত দেখা যাচ্ছে। জিভের ডগা দাঁতের গায়ে সামান্য নড়ছে। বিদিশা আমাকে ডাকলো, ‘এই শোনো।’
মুখ তুললাম আমি। বিদিশার গলার স্বরটা কেমন অনরকম।
‘এখানে আমার পাশে এসে শোও।’ হাত বাড়িয়ে আমাকে ডাকলো বিদিশা। মূহূর্তে পরিবেশটা কেমন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে, টের পাচ্ছিলাম আমি। এই বিদিশা কেমন এক আকুতি নিয়ে আমাকে ডাকছে। আমার ভেতরে একটা শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে দিচ্ছে। উঠে গিয়ে আমি বিদিশার পাশে শুয়ে পড়লাম। বিদিশা আরো একটু সরে এলো। তারপর আমার বুকে আঙুলের ডগা দিয়ে কি যেন লিখতে লাগল। চোখ বন্ধ করে আমি লেখাটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম।
এই আমাকে বিয়ে করবে? আজ কিংবা কাল। খুব আস্তে আস্তে বিদিশা বললো।
‘বিদিশা!’ আমি অবাক হয়ে গেলাম।
এখনই বিয়ে?
 এখনও তো কলেজের গন্ডীই পার হলাম না।
কেন কিসের অসুবিধা? তুমি তো পাশ করে চাকরি পেয়ে যাবে তাই না?
‘কিন্তু আমার তো একটু সময় দরকার। তুমি তো সবই জানো অনার্সটা পাশ করতে এখনও দেড়বছর। আমিও তোমাকে বিয়ে করতে চাই। কিন্তু বিয়ে করে তোমাকে আমি খাওয়াবো কি?
‘আমি জানি না। কিছু জানি না। এসব তুমি ভাববে, আমি আমার সবকিছু তোমাকে দিয়ে দিলাম।’ ছেলেমানুষের মত আমার বুকে মুখ ঘষতে লাগল বিদিশা।
বিদিশাকে বললাম, কিন্তু তোমার বাবা মা? তাদের কাছে তো আমাকে যেতে হবে। কথা বলতে হবে। তবে না বিয়ে।
বিদিশা বললো, বাবাকে তো সব বলাই আছে। তুমি বরং যা করার তাড়াতাড়ি করে ফেলো। আমি আর পারছি না।
কিন্তু এত তাড়াতাড়ি?
প্রেমিক থেকে পতিদেবতা বানাতে চাইছি তোমাকে, তুমি বুঝতে পারছো না?
বিদিশা এরপরে আমার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল। আমিও তখন চোখ বুজে চিন্তা করছি বিদিশাকে নিয়ে কি করব? ও এত ছেলেমানুষি করছে। এও কি হয় নাকি? বিয়ে, তা বলে এখনই?
চিন্তা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। সন্ধেবেলা ঘুম ভাঙল আমার। দেখি বিদিশাও চোখ খুলে তাকিয়েছে আমার দিকে, তখনো ও আমাকে ছেড়ে যেতে চাইছিলো না। আমার বুকের কাছে মুখটা ঘষছে আবার। বিদিশাকে বললাম, ‘বিদিশা এক কাজ করলে হয় না? আমি যদি শুভেন্দু আর সৌগতকে বলি ব্যাপারটা। তুমি তো জানো। ওদের কাছে আমি সব কথা খুলে বলি। কিছু লুকোই না। ওরা যদি আমাকে কিছু হেল্প করে।’
বিদিশা বলল, ‘বিয়ে করবে তুমি। আর ওরা তোমাকে কি হেল্প করবে?’
আমি বললাম, ‘তুমি জানো না। শুভেন্দুরা খুব বড়লোক। ওদের অনেক পয়সা। আমি যদি শুভেন্দুকে বলি আমাকে একটা কাজ জুটিয়ে দিতে, ও ঠিক পারবে। আমার তো সেরকম চেনাপরিচিত কেউ নেই। তোমাকে বিয়ে করবো, তার আগে রোজগার পাতির একটা ব্যবস্থা তো করতে হবে।
কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বিদিশা বললো, ‘এই একটা কাজ করবে? তুমি তো ভালো গান গাও। আমাকে গান শেখাবে?’
অবাক হয়ে বললাম, গান শেখাবো? তোমাকে? কিন্তু এর সাথে বিয়ের বা রোজগারের কি সন্মন্ধ আছে? গান তো এমনি শেখাতে পারি তোমাকে।
বিদিশা আমার গালে একটা টোকা দিয়ে বললো, দূর বোকা। গান কি এমনি শেখাবে নাকি? আমি বাবাকে বলবো, মাসে মাসে এরজন্য দুহাজার টাকা করে দিতে। বাবা না করবেন না।
বিদিশার ছেলেমানুষির মত কথা শুনে আমার খুব হাসি পাচ্ছিলো। বললাম, ‘আমি তোমাকে গান শেখাবো। তোমার বাবা আমাকে টাকা দেবেন। আর সেই টাকায় আমি সংসার চালাবো। বা কি সুন্দর। একেবারে বুদ্ধিমতী মেয়ের মত কথা বলেছো তুমি।
বিদিশা কিছুক্ষণ বোকার মত ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলো আমার দিকে। মুখ নিচু করে বললো, হ্যাঁ তাও তো ঠিক। বাবা এভাবে টাকা দেবেই বা কেন? আমি তো তখন তোমার কাছেই থাকবো।
[+] 2 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#8
বিছানায় উঠে বসে গালে হাত দিয়ে কি যেন ভাবতে লাগলো বিদিশা। মনে হল, এমন ভাবে আমার জন্য চিন্তা করা শুরু করে দিয়েছে, এবার কিছু একটা ও করেই ছাড়বে।
কিছুক্ষণ ভেবে টেবে এবার নিজেই খুশিতে আমার গালে একটা চুমু খেয়ে বসলো। আমাকে বললো, হয়ে গেছে। আর কোন চিন্তা নেই।
আমি বললাম, কি হয়ে গেছে? কি চিন্তা নেই?
বিদিশা বললো, চাকরি করে কি হবে? তুমি বরং ব্যাবসা করো।
‘ব্যাবসা? সে তো অনেক টাকার ব্যাপার বিদিশা। অত টাকা আমি কোথায় পাবো?’
বিদিশা আবার শুয়ে পড়ে, আমার মুখের কাছে মুখটা এনে বললো, ‘তুমি ব্যাবসা করবে কিনা বলো। টাকার জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না।’
যেন লাগলে টাকা দেবে গৌরী সেন। বুঝলাম বাবাকেই গৌরী সেন বানাতে চাইছে বিদিশা। আমার বুকের ওপর আবার আঙুল দিয়ে হিজিবিজি কাটতে কাটতে বললো, কত চাই? দুলাখ, পাঁচলাখ, না আরো বেশী? যা চাইবে, তাই পাবে। আমি আছি না?
‘ও আমার দরদীনি গো। কি বলে কি মেয়েটা? অত টাকা জোগাড় করে দেবে তুমি আমাকে?’
বিদিশা বললো, কেন বিশ্বাস হচ্ছে না?
আমার বুকের ওপর হাতটা রেখে আস্বস্ত করলো বিদিশা। চোখের পাতাদুটো একবার বুজিয়ে বোঝাতে চাইলো, আমি আছি না?
আমি জানি বিদিশারা খুব বড়লোক। দু পাঁচ লাখ টাকা ওর বাবার কাছে কিছুই নয়। তবু বললাম, ‘বিদিশা, তুমি আমার জন্য এতটা করবে?’
‘কেন করতে পারি না?’ বিদিশা যেন এবার একটু অভিমানি হয়ে গেল। আমাকে বললো, ‘আমি কি তোমার কেউ নই?’
উঠে বসে ওর গাল দুটো দুহাতে ধরলাম। বললাম, তুমিই তো আমার সব কিছু বিদিশা। আমার সাথী তুমি, আমার ভালোবাসা তুমি, আমার প্রেরণা তুমি। আমার জীবনের যা কিছু, সবকিছু তুমি।
বিদিশা চোখে চোখ রেখে বললো, থাক আর কবি হতে হবে না। তাহলে তুমি আমাকে না করবে না বলো।
ঘাড় নেড়ে ওকে জানান দিলাম। বললাম, তোমাকে আমি কি কখনও না করতে পারি?
দেখলাম ওর ঠোঁটদুটো আমার ঠোঁটের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে এবার। চুমুটা খেতেই যাচ্ছিলাম। বিদিশা বললো, মা বাড়ীতে নেই, আমাকে পেয়ে খুব দস্যিপানা করতে ইচ্ছে করছে বুঝি?
আমি ওর কথা শুনে মুখটা ঘুরিয়ে নিলাম। দেখলাম বিদিশা আবার নিজে থেকেই আমার গালে গাল ঘষছে। যেন রাগ ভাঙাচ্ছে, সেভাবেই আমার থুতনীটা হাত দিয়ে নাড়তে লাগল। আমাকে বললো, কি রাগ আমার পতিদেবতার? আমি বুঝি চুমু খেতে মানা করেছি তোমাকে?
নিজেই নরম ঠোঁটটা আমার কঠিন ঠোঁটের সাথে ডুবিয়ে দিলো। চুম্বনটা গাঢ হচ্ছে, এই প্রথম ভালবাসার গভীরতা অনুভব করছি। আমাকে চুমু খেতে খেতেই বিদিশা আমাকে জড়িয়ে ধরে হাত দিয়ে আমার পিঠের সবল মাংস পেশীর সাথে খেলা করতে লাগল। সুখটটা যেন ভালবাসার আলিঙ্গনে ক্রমশ আছড়ে পড়ছে। ভাবছি বিদিশার মত মেয়ে আমি পেয়েছি, আমার জীবন ধন্য। আজ যেন বিদিশার মধ্যে এক অনন্য রূপকে আমি দেখলাম। ওকে যেন নতুন করে আমি আবিষ্কার করলাম। 
সেদিনের সেই অনুভূতির স্মৃতি আজও আমার মনকে অস্থির করে তোলে। মাঝে মাঝে ভাবি, কেন তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে বিদিশা? আমি তো তোমাকে ঠকাতে চাইনি। সত্যিই চাইনি।
[+] 2 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#9
পাঁচ
 
‘তোর মনে হচ্ছে আজ অফিস যাবার কোনো ইচ্ছে নেই। সকালে উঠেই ডায়েরী খুলে বসে গেছিস লিখতে। ঘড়িতে কটা বেজেছে, খেয়াল করেছিস?’
মাকে দেখলাম আমার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। আমার পিঠে হাত দিয়ে দেখছে, আমি আপন মনে কিসব লিখে যাচ্ছি। মা বললো, ‘কি লিখছিস? গল্পো?’ হেসে বললাম হ্যাঁ মা গল্পো। তবে জীবনের কিছু পুরোনো কথাও এর মধ্যে আছে। ওগুলো সব মনে পড়ে যাচ্ছে, তাই একটার পর একটা লিখে যাচ্ছি।
‘অফিসে যাবি না?’
‘হ্যাঁ যাবো তো। এই আর একটা পাতা লিখে নিই।’
মা জানে লেখার নেশাটা আমার অনেকদিনের। সেই ছোটবেলা থেকে লিখে আসছি। কত কিছু লিখলাম। বিদিশাকেও আমার কতগুলো লেখা পড়িয়েছিলাম। আমার গল্প আর কবিতা গুলো পড়ে বিদিশা বলেছিল, ‘তুমি এত ভালো গান গাও, আবার এত ভালো লেখো,  এতসব পারো কি করে? কি প্রতিভা তোমার।’
আমি বলেছিলাম, ‘দূর। এরজন্য আবার প্রতিভার দরকার হয় নাকি? লিখতে লিখতে ওটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। আর গানটা গাইতে গেলে সাধনা করতে হয়। সবই রেওয়াজের ওপর। প্র্যাকটিস না করলে কোনকিছুতেই দক্ষ হওয়া যায় না।
বিদিশা জানতো না ওকে দেওয়া আমার চিঠিটা শুভেন্দু লিখে দিয়েছিল। আমাকে বললো, ‘আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে একটা সুন্দর প্রেমপত্র লিখবে। শব্দের মালা বসিয়ে যেমনটা তুমি লেখো। চিঠিটা পড়ে আমিও আবেগে আপ্লুত হয়ে যাবো। আমার ভেতরের অনুভূতিটা চিনচিন করে উঠবে। তা না। কি একটা লিখলে। ওটা কি প্রেমপত্র হল?’
হেসে বলেছিলাম, ওটা তো আমি লিখিনি। ওটা শুভেন্দু আমার হয়ে লিখে দিয়েছিল।
বিদিশা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিল, কেন? শুভেন্দু লিখবে কেন? তোমার ঠিঠি ও লিখবে কেন?
এই রে বোকার মতন সত্যি কথাটা বলে এখন বিপদে পড়ে গেছি। যাতে ওর রাগ না হয়, বিদিশার গালে হাত রেখে বলেছিলাম, শুভেন্দু তাড়াহূড়ো করে না লিখলে, সেদিন তুমি কি ক্যাফেটরিয়াতে আসতে? না আমরা একে অপরকে ভালবাসতে পারতাম? মিছিমিছি ওর ওপর রাগ করছ। ও তো আমাকে জানিয়েই চিঠি লিখেছে তোমাকে।
একটু যেন মন খারাপ করে ফেলেছিল বিদিশা। ভুলটা আমারই জন্য। রাগ ভাঙাতে আমি কত কিছু করলাম। ওর জন্য মান্না দের গানটা গাইলাম, ‘সুন্দরী গো দোহাই তোমার মান কোরো না। আজ নিশীথে, কাছেই থেকো। না বোলো না। সুন্দরী গো।’
কলেজে গিয়ে বিদিশার ক্লাসে ঢুকে গেলাম সোজা। দেখলাম বিদিশা চুপ করে বসে আছে সিটে। মুখটা ভারভার। উস্কো খুস্কো। ওর পাশে গিয়ে বসে পড়লাম। বিদিশা লজ্জা পেয়ে গেলো। ওর ক্লাসের ছেলেমেয়েগুলো আমাকে দেখে বলতে লাগল, ‘আরে গায়ক মশাই যে। তা হঠাৎ আমাদের ক্লাসে পদার্পন। কি মনে করে?’
আমি বিদিশার হাত ধরে টানছি। ‘এই চলো না চলো না।’ ও লজ্জা পেয়ে বললো, ‘ধ্যাত। কি হচ্ছেটা কি? সবাই দেখছে। ছাড়ো বলছি।’
 আমিও অগত্যা চুপ করে বসে রইলাম। একটু পরে প্রফেশর এলেন। আমাকে দেখে ভিমরী খেলেন। বললেন, ‘দেব’ তুমি এখানে? কি ব্যাপার? নিজের ক্লাসে না গিয়ে এখানে বসে কি করছ?
আমি নাছোড়বান্দা প্রেমিকের মত জবাব না দিয়ে চুপচাপ বসে আছি। বিদিশা ওই দেখে মুখ টিপে ফিক ফিক করে হাসতে লাগলো। ক্লাসের বাকীরাও সবাই হাসতে লাগল। বুঝলাম জোর ফাঁসা ফেসেছি আজকে। একেবারে বেইজ্জ্বত হয়ে গেছি। আজ আমার রেহাই নেই। সেদিন কলেজে ঢ্যাড়া পিটে গেল, সবাই জেনে গেল, তারমানে আমি বিদিশার সাথে প্রেম করি।
বিদিশা খুব লজ্জ্বা পেয়েছিল সেদিন। ওর রাগ ভাঙাতে আমি যে এতটা করতে পারি, ওর ধারনা ছিল না। বিদিশা কখনও আমাকে ভুল না বোঝে, আমাকে খারাপ না ভাবে আমি সবসময়ই চেষ্টা করতাম। ওর জন্য আমি একটা গান লিখতে চেয়েছিলাম, সেটা লেখা হয় নি। কিন্তু বিদিশা আমাকে বলেছিল, তুমি যেদিন আমাকে নিয়ে কিছু লিখবে, সেদিন বুঝবো, তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো। কোন গল্প কাহিনী, কবিতা, উপন্যাস। পারবে আমাদের প্রেম কাহিনী নিয়ে লিখতে?
বিদিশাকে বলেছিলাম, কেন পারবো না? ও তো আমার কাছে জলভাত।  
‘তাহলে লিখে দেখাও।’
কলম নিয়ে সেদিন আর কিছু লেখা হয় নি। কিন্তু আজ লিখছি। ‘বিদিশা তুমি জানো না, আমার জীবন কাহিনীর কতটা অধ্যায় জুড়ে তুমি বসে আছো। সব কথা আজ লিখতে চাই, তোমার আর আমার প্রেমকাহিনী নিয়ে সবাইকে সব কথা বলতে চাই। কিন্তু তুমি তো এখন অনেক দূরে। এ লেখা কি শেষ পর্যন্ত তোমাকে পড়াতে পারবো বিদিশা? তুমি তো আমাকে ছেড়ে চলে গেছো। আর তো ফিরে আসবে না কোনোদিন। তাহলে?
একটু হেসে মা পেছন থেকে বললো, কার কথা লিখছিস?
মাকে কি আর বলতে পারি, বিদিশার কথা। বললাম,ঐ কলেজের সব ঘটনাগুলো লিখছি। যেগুলো যেগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে, সেগুলো।
 
মা আমার কথাটা শুনে কেমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। বললো, ‘কেন লিখছিস ওসব পুরোনো কথা? কে মনে রাখে? নিজেকে শুধু শুধু কষ্ট দিস। এখনো ভুলতে পারিস নি তুই বিদিশার কথা। তাই না?
‘তুমি কি করে জানলে আমি বিদিশার কথা লিখছি? আমি তো-’
মা বললো, আমার চোখকে তুই ফাঁকি দিতে পারবি? যে মেয়েটা তোকে ছেড়ে চলে গেলো। একবার ফিরেও তাকালো না। ঘর করলো না, তার কথা তোর এখনো মনে পড়ে? কি পেয়েছিস তুই বিদিশার কাছ থেকে? সত্যিকারের ভালবাসা? ও যদি তোকে সত্যি ভালোবাসতো, তাহলে কি এভাবে ছেড়ে যেত?
আমাকে বলে নিজেই একটু বিষন্ন হয়ে পড়লো মা। সেদিন মায়ের চোখে আমিও জল দেখেছিলাম, আজ আবারো দেখলাম। ডায়েরীর পাতাটা বন্ধ করে মাকে বললাম, এই দেখো, তুমি আবার মন খারাপ করছো। তাহলে লেখাটা বন্ধ করে দিই। মা আমার মাথায় হাতটা রাখলো। বললো, না রে বাবা, তুই লেখ। আমি তো এমনি বলছিলাম।
 মাকে বললাম, এই দেখো না শুভেন্দু এতদিন বাদে ফোন করলো, আমাকে ওর বাড়ী যেতে বললো, আর আমারো পুরোনো কথা সব মনে পড়ে গেল। তাই ভাবি একটু লিখি। তুমি যখন বলছো, তাহলে লিখবো না।
মা আবারো আস্বস্ত করলো আমাকে। বললো, ‘না তুই লেখ। আমি তোকে বাঁধা দেবো না। আজ অবধি তোর কোনো কাজে বাঁধা দিয়েছি কি? তবে তুই যদি এখন না বেরোস, তাহলে আমাকে বলে দে। আমি একটু স্নানটা সেরে আসি। এসে তাহলে তোর খাবারটা বেড়ে দেবোখনে।
মা’কে বললাম, ঠিক আছে তুমি যাও। আমি একটু পরেই লেখালেখি শেষ করছি।
যাবার আগে মা বললো, বিদিশারা এখন কোথায় থাকে রে? বিয়ের পরে তো মুম্বাই চলে গিয়েছিল শুনেছিলাম। এখন কি ওখানেই?
মাকে বললাম, তোমার এখনো মনে আছে তাহলে। মা বললো, কেন তুই তো আমাকে বলেছিলিস। ওর মুম্বাইতে বিয়ে হয়েছে। পয়সাওয়ালা শশুড় বাড়ী পেয়েছে। সুখে ঘর করছে। আর হবে নাই বা কেন? ওরা নিজেরাও তো খুব বড়লোক ছিলো।
মাকে বললাম, এখন আর বিদিশার খবর জানি না মা। আর জানবোই বা কি করে? ও তো পরে আর যোগাযোগ করেনি আমার সঙ্গে। চলে যাবার পরে কোনো ফোনও করেনি আমাকে।
যাবার আগে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মা বললো, ‘ছেলে আমার বিদিশা বিদিশা করেই গেলো। এবার একটা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে কর। তাহলে আমিও একটু হাল্কা হই।’
মা চলে গেল। আমি আবার ডায়েরীটা খুলে ভাবছি কি লিখবো। কলেজের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আরো লিখতে ইচ্ছে করছে। বিদিশার সাথে আমার প্রেম। নেতাজী ইন্ডোরে অনেক রাত অবধি জলসা দেখতে গিয়ে কি অবস্থা হয়েছিল সেদিন। বিদিশা বাড়ীতে বলে আসেনি। আর প্রোগ্রাম শেষ হবার পর ইন্ডোর স্টেডিয়াম থেকে বেরোনোর সময়ই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। তুমুল বৃষ্টিতে কেউ বেরোতে পারছে না অডিটোরিয়াম থেকে। বিদিশা আমার হাতটা ধরে বললো, কি হবে বলোতো? বাড়ীতে বলে আসিনি। এখন বৃষ্টি। মা আমাকে পুরো খেয়ে ফেলবে। কিছু একটা ব্যবস্থা করো। একটা ট্যাক্সি। যেমন করে পারো।
বিদিশা যাতে সময় মত বাড়ী পৌঁছোতে পারে বৃষ্টির তোয়াক্কা না করে ভিজে চপচপে হয়ে ওর জন্য ছুটে গিয়ে ট্যাক্সি ধরেছিলাম। বাড়ীতে ওকে ড্রপ করে দিয়ে যখন নিজের বাড়ী ফিরছি, তখন বাজে রাত্রি একটা। মা বসে আছে ঘরে। আমার জন্য প্রবল চিন্তা করছে। আমি ঘরে ঢুকতেই মা বললো, তুই বিদিশা ছাড়া আর কটা মেয়ের সাথে ভাব পাতিয়েছিস?
আমি অবাক। মাকে বললাম, কেন? একথা বলছো কেন?
মা বললো, মিনু বলে একটা মেয়ে এসেছিল সন্ধেবেলা। তোর খোঁজ করছিল। বললো, মাসীমা দেব কোথায় গেছে বলতে পারবেন? আজ তো কলেজে দেখলাম না ওকে।
চমকে উঠেছিলাম আমি। মিনু? কেন? ও কেন আমার বাড়ীতে আসবে? আর ওকে বাড়ীর ঠিকানাই বা কে বললো, তাহলে কি সৌগত?
মা বললো, ‘মেয়েটা একটা ছেলেকে সাথে নিয়ে এসেছিল। আমাকে বললো, আমি দেবের বন্ধু। আর এ হলো সৌগত। আমরা দুজনেই দেবের বন্ধু। দেবকে খুব দরকার। বলুন না ও কোথায় গেছে?
[+] 3 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#10
আমি জানি, মা সেদিন সরল মনে মিনুকে সব বলে দিয়েছিল, ‘ও তো ফাংশন দেখেতে গেছে। ফিরবে সেই দেরীতে। আমাকে বলে গেছে ফিরতে ফিরতে রাত এগারোটা হবে।’
মিনুর চোখে মুখে তখন কৌতূহল। মাকে জিজ্ঞাসা করে বসলো, কার সাথে গেছে বলতে পারবেন?
মা’ও সরল মনে ওকে বলেদিল, ‘ও যে বললো, বিদিশাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। কলেজে ওরা দুজনে কেউ তো যায়নি আজকে। সোজা বাড়ী থেকে চলে গেছে ফাংশনে।’
বাড়ীতে ফেরার পর, মা, মিনুকে সব বলে দিয়েছে দেখে আমি আঁতকে উঠেছিলাম। মিনু কদিন ধরেই আমার পেছনে শুধু পড়ে রয়েছে। খালি জ্বালাতন করছে। ওর ছোটো বোনকে আমায় গান শেখাতে হবে।
আমি রাজী নই। যেটুকু সময় পাই, কলেজ, পড়াশুনা তার বাইরে শুধু বিদিশার সাথে প্রেম। এর মধ্যে মাষ্টারী করার আর আমার সখ নেই। তবু মিনু আমার পেছন ছাড়বে না। একেবারে জোঁকের মতন পেছনে লেগে রয়েছে।
সেদিন মিনুকে কথা দিয়েছিলাম, ওর বাড়ীতে যাব। ঝেমেলাটা সৌগতই আগে পাকিয়ে রেখেছে। ওর হয়ে এমন ভাবে আমাকে সাধাসাধি করতে শুরু করলো, যেন মাথাব্যাথাটা ওর। মিনু সৌগতকে রিকোয়েস্ট করেছে, ‘তুই আমার হয়ে দেবকে রাজী করা। দেব কিছুতেই রাজী হচ্ছে না। তুই বললে হয়তো রাজী হবে।’
সৌগত মিনুর হয়ে আমার কাছে এসে যখন পীড়াপীড়ি করতে শুরু করলো, ওকে বললাম, তোর এখানে কি স্বার্থ আছে বলতো? কেন এই নিয়ে আমাকে বারে বারে ডিস্টার্ব করছিস?
এটা আসলে সৌগতর দোষ নয়। এটা নাকি আমার গলার দোষ। সৌগত বললো, ‘কি করব? যা গানের গলা তোর। মিনু তোর পুরো ফিদা হয়ে গেছে। ওর ছোটবোন বেশ কিছুদিন ধরেই গান শিখছে। মিনুর ধারণা, তোর হাতে পড়লে ও নাকি ভালো গায়িকা হতে পারবে। এখন ধরেছে আমাকে। দেব তুই আমার মানটা রাখ।’
কলেজ থেকে মিনুদের বাড়ীটা খুব কাছে। গলি ধরে শর্টকাটে গেলে পাঁচ মিনিট। আমি জানি, মিনুর স্বভাবটা ভালো নয়। রোজ কলেজ থেকে একটা করে ছেলে ধরে ওর বাড়ী নিয়ে যায়। যেহেতু বাড়ীটা কলেজের খুব কাছে, কেউ নাও করে না। ইদানিং মিনুকে নিয়ে আদিখ্যেতাটা খুব বেড়ে গেছে সকলের। যেন সবার নয়নের মনি। চার পাঁচটা ছেলের সাথে সবসময় বসে আছে। তারা ওর গায়ের যেখানে সেখানে হাত দিচ্ছে, খুনসুটি করছে। দেখতে ভীষন বাজে লাগে এসব। আমি একটু অন্য স্বভাবের। চোখের সামনে বাড়াবাড়িটা বেশী পছন্দ নয়। তাও কাউকে কিছু বলিনা। ওটা যার যার ব্যক্তিগত, মজ্জাগত স্বভাব। অন্যতে যেটা করে আনন্দ পায়, সেখানে আমার হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই।
মিনু কদিন ধরেই ক্যান্টিনে খুব যাতায়াত শুরু করেছে। আগে খুব একটা বেশী আসতো না। কার মুখে শুনেছে, ক্যান্টিনে রোজ একঘন্টা করে আমি গান গেয়ে পুরো ক্যান্টিন মাতিয়ে রাখি। কলেজে আমার এই গুনে সুনাম অনেক। সারা কলেজ আমার গান শোনার জন্য পাগল।
জানি না আমার মধ্যে ও কি পেয়েছিল। মিনুকে প্রথম যেদিন কলেজে দেখেছিলাম, বুঝেছিলাম ও একটু অন্য টাইপের। বিদিশার মতই মিনুর স্লীম ফিগার। তবে গায়ের রঙটা বিদিশার মত অত ফর্সা নয়। নাকটা একটু চ্যাপটা মতন, চোখ মুখ সুন্দর। তবে বিদিশার মত অতীব সুন্দরী নয়।
 কদিন ধরেই মেয়েটাকে আমার সহ্য হচ্ছে না। কলেজে ফার্স্ট ইয়ারটা সেভাবে আসেই নি মিনু। সেসময় নাকি ওর মা মারা গিয়েছিল। কোনরকমে পরীক্ষা দিয়ে সেকেন্ড ইয়ার থেকে আসা শুরু করলো কলেজে। এসেই দেখছে কলেজে আমি তখন খুব ফেমাস। সবাই দেব কে একনামে চেনে। এ কলেজে দেব বলতে একজনই আছে। প্রথমে মিনু আমার গানের ভক্ত হলো। তারপর থেকে যেচে গায়ে পড়ে আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করত। আমি খুব একটা পাত্তা দিতাম না। এদিকে কলেজে বিদিশার সাথেও ভালো করে আমি কথা বলতে পারি না। মিনু কাছে থাকলে ছুক ছুক করে। কি যে চায় মেয়েটা আমার ঠিক বোধগম্য হয় না। যখন আমাকে ওর বোনের কথাটা তুললো, তখন ভাবলাম এটা মনে হয় একটা বাহানা। এই সুযোগে আমাকেও বোধহয় ওর বাড়ীতে নিয়ে যেতে চাইছে।
আমি কিছুতেই মিনুর সাথে ভীড়বো না। ওর বাড়ীতেও যাবো না। এরপরে সৌগত যখন এসে আমায় বললো, বিশ্বাসটা কিছুটা হলেও হল। কিন্তু আমি কিছুতেই রাজী হতে পারছিলাম না। গানের মাষ্টারি করে পয়সা রোজগার করার ইচ্ছা আমার একেবারেই নেই। এটা স্রেফ বন্ধুত্বের খাতিরে আমাকে করতে হবে, আর এর জন্য কিছুটা সময়ও আমার নষ্ট হবে।
আমি সৌগতকে না করে দিয়েছি, কারণ বিদিশাও শুনে আমাকে মানা করে দিয়েছে। ঠিক ফাংশনে যাবার আগের দিন মিনু এসে প্রায় পায়ে ধরে আমাকে সাধাসাধি করতে শুরু করলো। ‘দেব’ তোর পায়ে পড়ছি, তোকে রিকোয়েস্ট করছি, তুই প্লীজ একবার চল। সেরকম হলে সপ্তাহে একদিনের জন্য আসবি। ক্ষতি কি আছে? আমার বোন তাতেই খুশি হবে।
বোনকে খুশি করার জন্য আমাকে যেতে হবে? এতো ভারী আবদার। বললাম, ঠিক আছে কাল একবার যাবো। কিন্তু শেখাবো কিনা বলতে পারছি না। তোর বোনের গলাটা একবার দেখে নেবো। তারপর আমার ভালো ওস্তাদের সাথে জানাশোনা আছে। তোর বোনকে ওখানে পাঠিয়ে দেবো, ভালো তালিম পাবে।
মিনু তাতেই খুশী হল। সেদিন আমার কলেজে গিয়ে, ওখান থেকে মিনুদের বাড়ীতে যাবার কথা। সকালে বিদিশা, ফোন করে বললো, ‘এই আজ একটা ফাংশন দেখতে যাবে? নেতাজী ইন্ডোরে। বোম্বে থেকে ভালো ভালো আটিস্ট আসছে।
আমি বললাম, টিকিট কত করে? বিদিশা বললো, তিনশ টাকা করে। ওই নিয়ে তোমাকে কিছু চিন্তা করতে হবে না। টিকিটের দাম আমি দেবো। তবে আমি বাড়ীতে কিছু বলতে চাই না। বাবা শুনলে যেতে দিতে চাইবে না। কলেজে না গিয়ে আমরা না হয় একটু ঘুরবো, ফিরবো, তারপর বিকেলে পৌঁছে যাবো, নেতাজী ইন্ডোরে।
মিনুকে শেষমেষ কথা দিয়েও কলেজে যাইনি বিদিশার জন্য। বিকেলবেলা আমার বাড়ীতে এসে হাজির। সাথে সৌগতকেও নিয়ে এসেছে। কেন কলেজে যাইনি, সেটা আবার যাচাই করছে এসে। সাংঘাতিক মেয়ে।
বিদিশার মত আমাকে প্রেম নিবেদন করেনি মিনু। কিন্তু ওর ওই একটা আবদার মেটাতে গিয়ে আমাকে কত খেসারত দিতে হয়েছিল, সে কথা বলবো আপনাদের, পরে।
 ডায়েরীর কয়েকটা পাতা লেখা শেষ করে এবার আমি উঠে পড়লাম। সত্যি অনেক দেরী হয়ে গেছে। এবার রেডী হয়ে আমাকে বেরোতে হবে। মা’ও দেখি তখন আমার খাবার বেড়ে দেবার তোড়জোড় করছে। সেলফোনটা হাতে নিয়ে ভাবছি, শুভেন্দুকে একটা ফোন করবো কিনা? আমার যেন আর তর সইছে না। ভাবছি, সাতটা নয়, দুঘন্টা আগেই নয় ওর বাড়ী চলে যাবো। গিয়ে বলবো, ‘দ্যাখ, তুই ডেকেছিস, আমি আগে ভাগেই তাই চলে এসেছি। এবার বল, কি সারপ্রাইজ দিবি আমাকে।’
ব্যাপারটা জানতে খুব ইচ্ছে করছিলো। তখন কত করে জানতে চাইলাম। শুভেন্দু কিছুতেই বললো না আমাকে। ওখানে না যাওয়া অবধি ও কিছুই বলবে না আমাকে। শুভেন্দু বলেছে, সন্ধেবেলা রনিও আসবে ওর বউকে নিয়ে। তিনজনে আমরা গল্প করবো, খুব মজা হবে।
সারপ্রাইজের কথাটা এখনো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। জানি, শুভেন্দুর স্বভাবটা বরাবরই এরকমের। ও কিছুতেই আগে থেকে কিছু বলে না। আমাকে যেমন বিদিশাকে চিঠি দেবার ব্যাপারটা লুকিয়েছিল। একবার কাউকে কিছু না বলে কুলুমানালি সিমলা ঘুরে এলো। ফিরে যখন এলো তখন ও খুব অসুস্থ। বাড়ীতে গিয়ে জানলাম ও বেড়াতে গিয়েছিল তারপর ফিরে এসেই এই কান্ডটা বাঁধিয়েছে। অথচ কলেজে আমাদের কাউকেই কিছু বলে যায়েনি ও। বাবু ফিরে এসেছেন ওখান থেকে। সুন্দর সুন্দর কিছু গিফ্ট কিনে এনেছেন বন্ধুদের জন্য। আমাকে বললো, কলেজে যেতে পারছি না, তাই তোদের বাড়ীতে ডেকে গিফ্টগুলো সব দিচ্ছি, এটাও একধরনের সারপ্রাইজ।
শুভেন্দু কখন কি বলে, আর কখন কি করে বসে বোঝা মুশকিল। আমাকে বললো, ভাবছি ‘দেব’ এবার তোদের মত আমিও একটা প্রেম করবো। তোকে আর সৌগত দেখে আমারও লাইন মারতে ইচ্ছে করছে শালা! ভালো জমিয়েছিস তোরা, দুজনে যা শুরু করেছিস, এবার না ইতিহাস রচনা হয়ে যায়।
প্রেমের অনেক ডেফিনেশন আছে। শুভেন্দুকে বোঝানোর চেষ্টা করতাম। শুভেন্দু বলতো, প্রেম হচ্ছে সব বেকার জিনিষ। ওসব মূর্খরা করে। চালু লোকেরা কখনও প্রেম করবে না। দুদিন মেয়েটেয়ে নিয়ে ঘুরবে, তারপর ফুটিয়ে দেবে। ব্যাস।
আমি বলতাম ও তো অসামাজিক প্রেম হয়ে গেল। সামাজিক প্রেমের, সত্যিকারের ভালোবাসার ডেফিনেশনটাই অন্যরকম।
শুভেন্দু বলতো, তুই বোঝা দেখি-
আমি বলতাম, দেখ, তুই প্রেরক হিসেবে বা প্রেরনাদায়ক হিসেবে কাউকে চাস না জীবনে?
শুভেন্দু বলতো, প্রেরণা না হাতি। এখন মেয়েরা শুধু পয়সা চায় পয়সা। বুঝলি? ও তোকে মোটিভেশন দেবে কি? পয়সাটাই ওদের কাছে মোটিভেশন।
-তাহলেও জীবন সঙ্গিনীতো একটা দরকার। যে তোকে অনাবিল এক আনন্দের স্তরে নিয়ে যাবে। তোকে ভালোবাসবে, আদর করবে, সোহাগ করবে, চুম্বন করবে। একাকীত্ব ঘুচিয়ে দেবে। রমনী ছাড়া জীবন কি করে কাটাবি, এ কখনো হয় নাকি? এখন যে যুবতী, সেই তো হবে তোর রমনী।’
আমার কথা শুনে কেমন ভাবুক মত হয়ে গেল শুভেন্দু। শেষ পর্যন্ত রাজী হয়ে বললো, কিন্তু কার সাথে প্রেমটা করা যায় বল দেখি। তুই তো শালা ভালোটাকে নিয়ে বসে আছিস। কলেজে মেয়েগুলো সব ঢোকে, দুদিনের মধ্যেই অন্য ছেলের সাথে ফিট হয়ে যায়। সেরকম কে আছে, যে আমার সাথে প্রেম করবে?
[+] 2 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#11
সৌগত. শুক্লার পেছনে লাইন দিয়ে বসে আছে। এদিকে শুক্লা তো কিছুতেই রাজী হচ্ছে না। আমাকে শুভেন্দু বললো, ‘তুই তাহলে এক কাজ কর। সৌগতর যখন কোন চান্স নেই, আমাকে শুক্লার সাথে ভিড়িয়ে দে। ওকে আমার জীবন সঙ্গিনী বানিয়ে নিচ্ছি।’
-তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমরা এই চারজনে এত ভালো বন্ধু। শুধু একটা মেয়ের জন্য বন্ধুত্ব খারাপ করবি নাকি?
শুভেন্দু দেখলো না ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। ও আশা ছেড়ে দিল। দুদিন বাদে হঠাৎই আমার পাশে বসে বললো, ‘তোদের এই প্রেম টেম কিছু টিকবে না। সব বকওয়াশ জিনিষ। ভেবে দেখলাম, আমি যা আছি ঠিকই আছি। এসব রমনী ভালোবাসার চক্করে পড়ে থেকে লাভ নেই। এই মেয়েগুলো সব দুষ্টু। এরা সব মুখোস পড়ে থাকে। আমার বাবা দুষ্ট গোয়ালের চেয়ে শূন্য গোয়াল অনেক ভালো।
কথাটা ইয়ার্কী মেরেই বলেছিল শুভেন্দু। কিন্তু ওর কথাটা সত্যি হয়ে গেল। আমার আর সৌগতর দুজনেরই প্রেম টিকলো না শেষ পর্যন্ত।
স্নান সেরে আমি সবে মাত্র বাথরুম থেকে বেরিয়েছি। মা বললো, দেখতো নিচে একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো। কে যেন নিচে থেকে 'দেব'' দেব' বলে ডাকছে। ও তো মেয়ের গলা। আমি খালি গায়ে পাজামাটা গলিয়ে নিয়ে বারান্দায় গেলাম। দেখলাম এক মহিলা পেছন ফিরে আমার পাড়ার একটা ছেলেকে কি জিজ্ঞাসা করছে। একটু পরেই মহিলা পেছন ফিরলো। আমি দেখে অবাক। দেখি শুক্লা হাত নাড়ছে আমার দিকে রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে। অবাক হলাম। শুক্লা এসেছে, এতদিন পরে। আমার বাড়ীতে কি মনে করে? সকাল থেকেই পুরোনো বন্ধুরা আমাকে সব স্মরণ করছে একে একে। শুভেন্দুর ফোনের পর শুক্লাও এতদিন পরে হঠাৎ?
 
নিচে থেকেই শুক্লা বললো, কোনদিক দিয়ে যাবো বলতো? তোদের সিঁড়িটা কোনদিকে?
আমি বারান্দা থেকে ওকে ওপরে ওঠার সিঁড়িটা দেখিয়ে দিলাম। নিচে দাঁড়িয়ে তখনো শুক্লা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। ওর হাসিটা দেখে মনে হল, শুক্লার সেই পুরোনো হাসি। কলেজে ওর হাসি দেখে সৌগত বলতো, ‘মেয়েরা বিয়ের আগে সব হাসে, আর বিয়ের পরে ভালো স্বামী না জুটলে সব কাঁদতে শুরু করে। ওর এই সুন্দর হাসিটা কতদিন থাকবে বলতো ‘দেব’? বলছি আমার অফারটাকে অ্যাকসেপ্ট করে নিতে, কিছুতেই করছে না। আমি ওকে রাজরানী করে রেখে দিতাম, এই হাসিটাও ও সারাজীবনের মত প্রানখুলে হাসতে পারতো। তা না, শুধু শুধু ও জেদ ধরে বসে আছে।’
শুক্লা যখন সৌগতর সাথে প্রেম করা শুরু করলো, তখন আবার সৌগতর মুখে হাসি ধরে না। এমন ভাব করতে লাগলো, তখন আবার আমাকে চেনে না। অথচ একসময় আমার কাছে এসে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতো। শুক্লার মন পাচ্ছে না বলে আমার কাছে এসে আফসোস করত। বলতো, ‘মেয়েদের মুখে হাসিটাই কি যথেষ্ট নাকি? ওসব ঢঙ্গী হাসি। আসল হল, মেয়েদের মন। শুক্লার মনটা খুব কঠোর। আমার প্রতি এতটা নির্দয় হচ্ছে কেন বুঝতে পারছি না।’
ওকে বলতাম, ‘তুই এককাজ কর, কালীঘাটে গিয়ে একটা মানত করে আয়। শুক্লার সাথে তোর ফিটিং হয়ে গেলে মাকালীকে খুশি করে আসবি। মানত করলে মা কালী তোর মনবাসনা নিশ্চই পূরণ করবে।’
 সৌগত বলতো, ‘তুই হচ্ছিস মহা ঢ্যামনা। বিদিশাকে পেয়ে গেছিস তো, এখন আর আমাকে নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। আমি শালা দেবদাসের মত জ্বলে পুড়ে মরছি, কারুর আমাকে নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই?’
এরপরে এমন কান্ড করে বসলো সৌগত আমার তো মাথায় হাত। দেখি অ্যানুয়াল ফাংশনের দিন সকালবেলাই এক পেট মাল খেয়ে বসে আছে। কলেজে এসে শুক্লাকেও হঠাৎ সামনাসামনি পেয়ে গেল। সৌগতর চোখদুটো তখন এমন টকটকে লাল হয়ে রয়েছে, শুক্লা ওই দেখে ভয় পেয়ে গেলো। সৌগত বললো, তুমি আমার সাথে প্রেম করবে কিনা বলো? নইলে আমি কিন্ত-
শুক্লা প্রথমে ভয় পেয়েছিল, তারপরে একটু সাহসী হয়ে বললো, কি করবে? সোসাইড? শোলের ধর্মেন্দ্রর মত?
আমি সৌগতকে বললাম, এই সৌগত কি হচ্ছে টা কি? সাতসকালে মাল খেয়ে এসব কি করছিস তুই?
হঠাৎ কোত্থেকে তখন শুভেন্দুও ওখানে এসে হাজির। আমাকে বললো, ‘লে হালুয়া এর আবার কি হল?’
আমি শুভেন্দুকে কিছুটা দূরে নিয়ে গেলাম। কানে কানে বললাম, ‘ওকে কিছু বলিস না। তাহলে আরো বামাল করবে। আমি শুক্লাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করছি।’
শুক্লা তো রেগে অস্থির। আমাকে বললো, ‘মাল খেয়ে আবার চোখ রাঙাচ্ছে আমাকে। কত বড় সাহস ওর। তুই কি ভাবিস? যার তার সাথে শুক্লার মত মেয়ে ভেড়ে না। আগে ওর চরিত্রটাকে ঠিক করতে বল।’ তারপরে ওর সাথে প্রেম করবো কিনা আমি ভেবে দেখবো।’
পাছে সৌগত বেশী হজ্জূতি না করতে পারে। শুক্লা সবসময় আমার পাশেই বসে রইলো। সৌগত তখনো চোখ বড় বড় করে দেখে যাচ্ছে শুক্লাকে দূর থেকে। একটু পরে দেখি সৌগত মাথা নিচু করে হেঁটে চলে যাচ্ছে কলেজ ছেড়ে। শুভেন্দু মাথা নেড়ে বললো, ‘কোথায় যাচ্ছে মালটা?সুইসাইড করতে নাকি? এই শালাগুলোর ন্যাকামো দেখলে আর বাঁচি না।’
কলেজ ছেড়ে সৌগত চলে গেল। এবার শুভেন্দু শুক্লার কাছে গেল। শুক্লাকে বললো, ‘সৌগতর জন্য আমি এতবড় স্যাক্রিফাইস করলাম, আর তুই কিনা ব্যাচারেকে কষ্ট দিচ্ছিস?’
শুক্লা বললো, ‘মানে?’
শুভেন্দু বললো, ‘দেব’ আমাকে বলেছিলো, ‘বিদিশা আর ওর মত আমাকেও একটা প্রেম করতে। আমি রাজী হয়েছিলাম, শ্র্রেফ তোর জন্য। তোকে আমার মনে ধরেছিল। তারপরে দেখলাম, না কাজটা করা ঠিক হবে না। এটা সৌগতকে দূঃখ দেওয়া হবে। ও  এমনি তোকে ভালোবাসে। ব্যাচারাকে কষ্ট দিয়ে আর লাভ নেই। আর তুই কিনা ওকে শেষ পর্যন্ত দেবদাস বানিয়েই ছাড়লি? ‘পার্বতী’ এই ছিল তোর মনে?’
শুক্লা কিন্তু কিন্তু করেও শুভেন্দুর কথাটার শেষ উত্তর দিতে পারেনি। তারপর থেকে সৌগত বেশ কয়েকদিন ধরে কলেজে আর আসছে না। আর শুক্লাও কলেজে এসে খালি আমাকে জিজ্ঞাসা করছে, ‘সৌগত এসেছে? আজও এলো না? পরপর তিনদিন হয়ে গেল ওর দেখা নেই। কোথায় গেল ছেলেটা মনটা খারাপ লাগছে।’
 আমি বিদিশাকে যা করতে পারেনি, শুক্লা তাই করে বসলো। যেদিন সৌগত কলেজে আবার এলো, দেখলাম ওর চোখ মুখ শুকনো। যেন শুক্লার জন্য কেঁদে কেঁদে চোখের তলায় কালি পড়ে গেছে। ভালো করে কারুর সাথে কথা বলছে না। মাথা নিচু করে বসে আছে একদম লাস্টের সীটে। শুক্লা সৌগতকে দেখে আমার পাশের সীটটা থেকে উঠে গেল ওর কাছে। সৌগতর পাশে গিয়ে বসলো। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। মুখটা নিচু করে সৌগতকে বললো, ‘কি হয়েছে তোমার? কলেজে আসোনি কেন এতদিন?’
সৌগত জবাব দিচ্ছেনা। মুখ নিচু করে তখনো বসে আছে। আমাদের ফিজিক্স এর প্রফেশর নয়নবাবু এলেন, ক্লাস শুরু হলো। আমি নোট নিচ্ছি, স্যারের লেকচার শুনছি। হঠাৎই চোখটা গিয়ে পড়ল পেছনে ওদের সীটে। দেখি শুক্লা তখন মাথাটা এলিয়ে দিয়েছে সৌগতর ঘাড়ে। যেন পার্বতী মাথা গুঁজেছে দেবদাসের শরীরে। অমর প্রেমকথার রেপ্লিকা দেখছি চোখের সামনে। জানতাম যা শুরু করেছে দুজনে, নয়নবাবুর ঠিক চোখে পড়বে। হলও তাই। স্যার, ওদের দুজনের ওই রকম দেখে হঠাৎই ধমক দিয়ে বললেন, ‘সৌগত আর শুক্লা, কি করছো তোমরা পেছনে? বিহেভ ইয়োরসেল্ফ।
শুভেন্দু ফিক ফিক করে হাসছে। আমাকে পরে বললো, ‘দেখলি? শালা কত নাটকই পারে এরা দুজনে।’
 
সিঁড়ি দিয়ে শুক্লা উপরে উঠে এসেছে দ্বোতলায়। কলেজে যখন পড়তো, কোনদিন আমার এই ফ্ল্যাটে ও আসেনি। দুদুবার মিনু এসেছিল আর বিদিশাতো বেশ কয়েকবার। কিন্তু শুক্লাকে এতদিন পরে আজ প্রথম আসতে দেখে আমি সত্যি অবাক হয়ে গেলাম। ওকে বললাম, আরে ‘শুক্লা? তুই? আমি তো ভাবতেই পারিনি তুই আসবি। এ কাকে দেখছি আমি? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।’
দরজা খুলে ঘরে ঢোকালাম ওকে। শুক্লা বললো, ‘আমি জানতাম তুই অবাক হবি। কেমন যেন পরপর হয়ে গেছিস তুই। খোঁজখবরও রাখিস না। ফোন নম্বরটাও সেই যে একবার দিয়েছিলিস, হারিয়ে ফেলেছি। পুরোনো মোবাইলটা জলে পড়ে নষ্ট হয়ে গেল, আর আমার পুরোনো বন্ধুদের নম্বরগুলোও সব হারিয়ে গেল। কাউকে পাই না। না তোকে, না শুভেন্দুকে, না রনিকে। কাউকেই নয়। শেষমেষে আজ আর থাকতে পারিনি। ট্যাক্সি ধরে তোর কাছে ছুটে এসেছি।’
ওকে বললাম, ‘বেশ করেছিস। এতদিন বাদে আমাকেও যে তোর মনে পড়েছে। আয় ভেতরে আয়।’
আমার বসার ঘরে শুক্লাকে বসালাম, বললাম, কি খাবি বল? ওফ তোকে দেখে আমার যা আনন্দ হচ্ছে না, কি আর বলবো।
শুক্লা বললো, তা গায়ক মশাইয়ের খবর কি? বিয়ে থা কি করা হয়েছে? না এখনো সেই-
কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। ভাবছি, শুক্লার কথার কি উত্তর দেবো। ওকে বললাম, ‘না আমি ভাবছি চিরকুমারই আমি থাকতে চাই।’
শুক্লা হেসে একটু টিপ্পনি করলো আমাকে। বললো, চিরকুমার না ছাই? বলো, এখনো তোমার বিদিশার জন্য মন পড়ে আছে। তাই না? বিয়ে করে যে তোকে ছেড়ে চলে গেল। আর তুইও পারিস।
[+] 3 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#12
মা তখন ঘরে চলে এসেছে। শুক্লা মাকে দেখে বললো, ‘মাসীমা, ছেলের এখনো বিয়ে দেন নি কেন? কি করেছেন কি? আমি তো ভাবলাম, এতোদিন বাদে দেবের বাড়ী যাচ্ছি, নিশ্চই ওর বউটাকেও দেখতে পাবো।’
মা বললো, ‘কি আর করবো বলো? এটা তো আমার ছেলেরই মর্জী সব। আমি তো কবে থেকে ওকে বলছি। উনি শুনবেন, তবে তো কথা।’
মার সাথে শুক্লার আলাপ করালাম। মাকে বললাম, ‘মা, একে তুমি চেনো? এ হল শুক্লা। আমার কলেজের বান্ধবী।’
মা যেন পুরোনো কিছু মনে করার চেষ্টা করছে। মানে মিনুর চেহারার সাথে শুক্লার চেহারাটা মেলানোর চেষ্টা করছে। ভাবছে আগে ওকে দেখেছে কিনা? আমি ঠিক বুঝে গেলাম, মা’কে বললাম, ‘না মা, একে তুমি আগে কখনো দেখো নি। এর নাম শুক্লা। ও আজই প্রথম আমার বাড়ীতে এলো।’
মা এবার বুঝতে পারলো, শুক্লাকে বললো, ‘চা খাবে তুমি? তাহলে চা করে নিয়ে আসি।’
শুক্লা বললো, ‘তা খেতে পারি মাসীমা। তবে আপনি ব্যস্ত হবেন না। আজ আমি দেবের কাছে এসেছি, ওরজন্য একটা বীরাট সারপ্রাইজ আছে বলে। আপনার ছেলে শুনলে একেবারে চমকে যাবে।’
কথাটা এমন ভাবে বললো, আমি সত্যি চমকে গেলাম। এও এতদিন পরে এসে বলে সারপ্রাইজ? কি হচ্ছেটা কি আজকে? সকাল থেকে উঠে খালি সারপ্রাইজের কথা শুনছি। কিসের সারপ্রাইজ?
শুক্লা মুচকি মুচকি হাসতে লাগল। আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আছে আছে বৎস। সাধে কি তোর কাছে আমি এসেছি? এমনি এমনি? খবর তো একটা আছে। ক্রমশ প্রকাশ্য।’
আমার মনে হল, এরা বোধহয় সবকটা এতদিন পরে একজোট হয়েছে আবার। আমার মুখে কি হাসি ফোটাবে কে জানে? কিছুতো একটা ব্যাপার নিশ্চই আছে, যেটা শুভেন্দু, শুক্লা দুজনেই জানে। অথচ আমাকে বলতে চাইছে না।
আমি বেশ ধন্দে পড়ে গেলাম। মনে পড়লো, শুভেন্দুর কথা। শুভেন্দু বলেছে, আজ ওর বাসায় যেতে। সেখানে রনি থাকবে। আর সাথে রনির বউ থাকবে। কিন্তু শুক্লার কথা তো বলেনি। আবার শুক্লা সাতসকালে আমার বাড়ীতে ছুটে চলে এসেছে। আমাকে সারপ্রাইজের কথা বলছে। তাহলে শুক্লাও নিশ্চই জানে বিষয়টা। আসল ব্যাপারটা কি? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।
ওকে বললাম, ‘কে বলেছে তোকে? শুভেন্দু?’
শুক্লা যেন আকাশ থেকে পড়লো। আমাকে বললো, ‘শুভেন্দু কেন বলবে? আমার কাছে তো ওর ফোন নম্বরই নেই। একটু আগেই তোকে তো বললাম। সব ফোন নম্বরগুলো হারিয়ে গেছে।’
ঠিক ক্লিয়ার হচ্ছে না। শুক্লাকে বললাম, দাঁড়া, দাঁড়া। তুই বলছিস শুভেন্দুর ফোন নম্বর তোর কাছে নেই। অথচ শুভেন্দুও আমাকে ফোন করে একই কথা বলেছে।
শুক্লা বললো, কি বলেছে?
-ওই সারপ্রাইজ। তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে। কি সারপ্রাইজ কে জানে। আমাকে বললো, এখানে এলে সব জানতে পারবি। সন্ধেবেলা ওর বাড়ীতে যেতে বলেছে। ওখানে গেলে নাকি সারপ্রাইজটা আমাকে দেখাবে।
 শুক্লা বললো, ‘তুইও শুভেন্দুর কথা বিশ্বাস করিস? ও আর্ধেক কথা মুখ দিয়ে বলে। আর আর্ধেক কথা পেট দিয়ে। পট্টী মেরে ওখানে নিয়ে যাচ্ছে তোকে। ও আবার দেবে তোকে সারপ্রাইজ?’
আমার কিছুই মাথায় ঢুকছে না। সব অদ্ভূতুড়ে লাগছে। এরা সব পুরোনো বন্ধুগুলো আমাকে নিয়ে মজা করছে নাকি? শুক্লাকে বললাম, ‘কি সারপ্রাইজ বলবি তো? তবে তো বুঝবো। তুইও বলবি না। শুভেন্দুও বললো না। তাহলে আমি কোথায় যাই বলতো?’
শুক্লা দেখলাম, ওর ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে কি একটা বার করলো। আমার হাতে দিয়ে বললো, এটা দেখতো।
হাতে নিয়ে দেখলাম, ওটা একটা ছোট্টো ভাঁজ করা কাগজ, তাতে হিজিবিজি কিসব লেখা রয়েছে। শুক্লাকে বললাম, ‘এগুলো কি? আমি তো কিছুই ভালো করে বুঝতে পারছি না।
শুক্লা বললো, ‘ভালো করে দেখ। তাহলেই বুঝতে পারবি।’
একটা ছোট্ট চিরকূটের মত কাগজ। তাতে মাঝখানে দুতিন লাইন লেখা রয়েছে। কিন্তু লেখাটাকে পেন দিয়ে হিজিবিজি করে কে যেন কেটে দিয়েছে। ভালো করে লেখাটা পড়া যাচ্ছে না। শুধু ওপরে ছোট্ট একটা নাম। নামটা কষ্ট করে হলেও পড়া যাচ্ছে। ব এ রস্সিকার, দ এ রস্সিকার, তালবশ্য এ আকার। এ কি? এতো বিদিশা। বিদিশাকে লেখা শুভেন্দুর সেই চিঠি। তোর কাছে এলো কি করে? আমার নাম করে বিদিশাকে যে চিঠিটা শুভেন্দু দিয়েছিল। এতো সেই চিঠিটা। তুই এই চিঠিটা কোথায় পেলি?
শুক্লাকে দেখি, একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই পুরোনো দিনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো আবার মনে করাচ্ছে আমাকে। কিছু দূঃখ, কিছু আনন্দ এই নিয়েই তো জীবন। সবাই তো সুখী হতে চায়। তারমধ্যেও কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না। আমাকে বললো, আমিও পারলাম না জীবনে সুখী হতে। আর তুই ও নয়।
কাগজটা হাতে নিয়ে ভালো করে আবার দেখতে লাগলাম।  তলার লেখাগুলো সব পেন দিয়ে কাটা। নিজের নামটাই যা কাটেনি বোঝা যাচ্ছে।
শুক্লাকে দেখলাম, কিরকম অদ্ভূত ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, আমার মনের ভেতরটা বোঝার চেষ্টা করছে। আমাকে বললো, কলেজ ছাড়ার পর তোকে তো কোনদিন বলিনি। ভেবেছিলাম বলবও না কোনোদিন। তুই কি ভেবেছিলিস, বিদিশা এই কান্ড করতে পারে?
আমার মুখে যেন ভাষা নেই, সেভাবেই বললাম, কিন্তু বিদিশার তোকে এই চিঠি?
শুক্লা বললো, ‘হ্যাঁ তোকে না বলেই আমি সেদিন বিদিশাদের বাড়ীতে গিয়েছিলাম। সেদিন বিদিশাকে আমি অনেক করে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। ওকে বলেছিলাম, দেব কে তুই ভুল বুঝছিস বিদিশা। ওর মত ছেলে হয় না। দেব যা করেছে, না বুঝেই করে ফেলেছে। ওকে তুই ক্ষমা করে দে। ছেলেটার কাছে গিয়ে একবার দেখ। তোর জন্য শুধু শুধু ও কত কষ্ট পাচ্ছে।’
আমি অবাক চোখে তাকিয়ে আছি শুক্লার দিকে। শুক্লা বললো, ‘সেদিন কিছুতেই আমার কথা মানতে চাইল না বিদিশা। অতকরে ওকে বোঝলাম, তাও মানলো না। যখন ফিরে আসছি, আমার হাতে এই কাগজটা দিলো। আমাকে বললো, ‘দেবকে দিও। এটা ওরই চিঠি। মন থেকে যখন মুছে ফেলেছি, তখন চিঠিটা রেখেই বা কি হবে? চিঠিটা হাতে নিয়ে দেখলাম হিজিবিজি করে কেটে দিয়েছে পুরো চিঠিটা। রাগে, ক্রোধে বিদিশা তখন ফেটে পড়ছে। আমি তাও বললাম, এ চিঠি আমি দেবকে দিয়ে কি করবো বিদিশা? তোর যদি রাখতে ইচ্ছে না হয়, তুই চিঠিটা ফেলে দে। এ চিঠি আমাকে কেন দিচ্ছিস?’
 শুক্লা বললো, সেদিন তোদের দূরন্ত প্রেমটার ইতি সমাপ্তি ঘটলো। চোখের সামনে দেখলাম, ভালোবাসার মৃত্যু ঘটেছে। ভালোবাসাকে নাকি অত সহজে ধরে রাখা যায় না। তুই ও পারলি না। আর আমি তো নই ই।
আমি বললাম, আমাকে তো তুই বলিসনি। কেন গেলি তুই বিদিশার বাড়ীতে?
শুক্লা বললো, ‘তোকে তো আমি চিনি। তোর জন্য শুক্লা যা করতে পারবে। আর কেউ নয়। সেদিন বাড়ী বয়ে ওর কাছে আমি গেছিলাম। অনেক আশা নিয়েই গেছিলাম। কিন্তু বিদিশার মনকে আমি সেদিন ঘোরাতে পারিনি। কেন জানি না, আমার মনে হয়েছিল, মেয়েটার মন বলে কিছু নেই। চট করে যার বিশ্বাস এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে পারে। সে কি করে তোর মনটা জিততে চেয়েছিল? চিঠিটা আমার হাতে দিতে এতটুকু ওর বাঁধলো না?
শুক্লা বললো, ‘ভাবছিস এতদিন পরে এই চিঠি তোকে কেন আমি এনে দেখাচ্ছি। তাই তো? রাগে ঘেন্নায়, আমারো সেদিন মনে হয়েছিল, ওর কাছে আমি গেলাম, আর ও বলছে এই চিঠিটা তোকে এনে দিতে? বিদিশার মনটা এত নিষ্ঠুর? তোর মনের অবস্থা তখন কি,আমি তো জানি। তোকে এনে বিদিশার চিঠিটা দেখাবো আর বলবো, এই দেখ, কি করেছে বিদিশা, এই দেখ সেই চিঠি। হিজিবিজি করে কেটেছে লেখাগুলোকে। এর জন্য তুই আর কত কষ্ট পাবি? ভুলে যা ওকে। বিদিশার মত মেয়ে তোর যোগ্য নয়।
আমি বললাম, তারপরে?
শুক্লা বললো, ‘তারপরে মন চাইলেও আর আসতে পারিনি তোর কাছে। জানি তুই কষ্ট পাবি। এই চিঠি তোকে কিছুতেই দেখানো যায় না। চিঠিটা তাই নিজের কাছেই রেখে দিলাম। ডায়েরীর পাতার মধ্যে কোথায় যে রেখেছিলাম, মনেও নেই। ঘরের মধ্যে থেকেই চিঠিটা তারপর হারিয়ে গেলো। আর খুঁজেও দেখিনি কোনদিন। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে পুরোনো ডায়েরীগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করছি। হঠাৎই দেখি, পুরোনো একটা ডায়েরীর মধ্যে এই সেই চিঠি।
আমি অবাক হয়ে বললাম, এতদিন বাদে, তুই চিঠিটা আবার আমার কাছে নিয়ে এলি? কেন হঠাৎ? এ আর দেখে আমি কি করবো?
শুক্লা বললো, যে তোকে কষ্ট দিয়ে চলে গেল, সে অন্তত জীবনে সুখী হোক, তুই তো এটাই চেয়েছিলিস?
আমি বললাম, আমি চাই সবাই ভালো থাকুক। পৃথিবীতে আমিই যদি একমাত্র কষ্ট পাই, তাহলেও কোন দূঃখ নেই। ভগবান সবাইকে সুখ দিক, আমাকে দূঃখ দিলে কোন কষ্ট নেই। ভাগ্যে যা আছে লেখা, সেটা কি আর খন্ডানো যায়? হয়তো এটাই আমার লেখা ছিল জীবনে।
 
শুক্লা বললো, জীবনটা বড় অদ্ভূত। তাই না দেব?
আমি বললাম, যার যার জীবন যেরকম, সেরকমই তাকে মানিয়ে নিতে হবে। এটাই তো ধ্রুব সত্য।
শুক্লা বললো, ‘বিদিশার জন্য তুই কি এখনো কষ্ট পাস?’
ওকে হেসে বললাম, নিজের কষ্টটা নিজের কাছেই রাখতে হয়। সবাইকে অত বলতে নেই। আমি অন্যের দূঃখটা শুনতে বেশী ভালোবাসি। এই পৃথিবীতে তো আর আমি একা নই। সবার কথাই ভাবতে হবে। ভগবানেরও অনেক দায়িত্ব।
শুক্লা বললো, আমিই না তোকে পরে বলেছিলাম,বিদিশা নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছে।
[+] 2 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#13
শুক্লাকে বললাম, হ্যাঁ। তুই ফোন করে আমাকে পরে বলেছিলিস। বিদিশা তোর কাছে পরে দূঃখ করেছে। ও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।  কিন্তু তখন বিদিশারও আর করার কিছুই নেই। ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বিদিশা বিয়ে করে মুম্বাই চলে যাচ্ছে।
শুক্লা অবাক করে আমাকে বললো, বিদিশা, তোকে যদি এতদিন পরে তোকে আবার দেখতে চায়, যাবি না ওর কাছে?
আমি শুক্লার দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। কি বলছে ও কিছুই বুঝতে পারছি না।
 
শুক্লা বললো, বিদিশা এখন কলকাতায়। ও তোর সাথে একবার দেখা করতে চায়। আমাকে অনেক করে বলেছে।
আমি বললাম, বিদিশা কলকাতায় কেন? ও কি এখন এখানেই রয়েছে?
শুক্লা বললো, এখানেই থাকবে ও। আর ফিরে যাবে না, মুম্বাইতে। বিদিশার স্বামীর সাথে বিদিশার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তাই ও-
 
কথাটা তখনো শেষ করেনি শুক্লা।  আমি যেন কেমন ভাবুক মত হয়ে গেছি। আপন মনে কি যেন ভাবছি।  আর মনে হচ্ছে, পুরোনো দূঃখের স্মৃতিতে দগ্ধ মনটায় হঠাৎই এ যেন এক খুশীর খবর। মরে যাওয়া ভালোবাসাতে নতুন করে আবার প্রাণের স্পন্দন। শুনেছি, হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা নাকি কখনো সখনো ঘুরে ফিরে আসে। এটা কি তাহলে তাই? ভগবান কি এইভাবেই প্রেমিক প্রেমিকার পরীক্ষা নেয়? যে দূঃখ দেয়, ভগবান নাকি তাকে কখনো সুখী করেনা। আর যে দূঃখ পায় ভগবান শুধু তার ধৈর্য্যেরই পরীক্ষা নেয়।  যেমনটি আমার নিয়েছে ভগবান এই কটা দিন। 
 
এর থেকেও বড় সারপ্রাইজটা আমার জন্য বোধহয় অপেক্ষা করছিল। শুক্লা যেখানটায় বসে ছিল, ওখান থেকে উঠে এসে আমার পাশে হঠাৎ বসলো। আমার হাত দুটো ধরে বললো, ‘দেব’ তুই কি বিদিশার কাছে আবার ফিরে যাবি?
আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, কিছু তো ভাবিনি এখনো। তুই বল-
শুক্লা বললো, ‘যাস না দেব, যাস না। আমি বলছি, বিদিশার কাছে তোর ফিরে না যাওয়াটাই আর ভালো। আমি তোকে-
 
বিদিশার চিন্তাতে আমি কেমন মশগুল হয়ে গিয়েছিলাম। কি একটা বলতে গিয়ে শুক্লাও হঠাৎই থেমে গেছে। দেখলাম মা, চা নিয়ে ঢুকেছে ঘরে। শুক্লা মায়ের হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে মা’কে ঢুপ করে একটা প্রনাম করে বসলো। মা, শুক্লার মাথায় দুহাত রেখে বললো, ‘থাক থাক মা, আমাকে আর প্রনাম করতে হবে না। আমি এমনি তোমাকে আশীর্ব্বাদ করছি।’
চায়ের সাথে চানাচুর আর মিষ্টি। শুক্লা বললো, এ কি মাসিমা? দেবকে দিলেন না। শুধুই আমাকে?
মা বললো, ‘ও তো খেয়েছে এই সবে। তুমি খাও। দেব সকালে একবারই চা খায়, তারপরে আর খায় না।’
শুক্লা আমাকে বললো, ‘কলেজে তো খুব চা খেতিস। ঘন্টায় ঘন্টায়। এখন সব কমে গেছে বুঝি?
 এক সময়ে চায়ের একটা নেশা ছিল। চায়ের সাথে বিস্কুট আর সিগারেট। বিদিশা বলতো, ‘তোমার এই চায়ের নেশাটা খুব বাজে। আর এত ঘনঘন সিগারেট খাও কেন তুমি? জানো বেশী সিগারেট খেলে ক্যানসার হয়। গলা খারাপ হয়ে যায়। তোমাকে গলাটা বাঁচিয়ে রাখতে হবে কিনা?’
আমি বিদিশার জন্য চায়ের নেশা কমিয়ে দিলাম। সিগারেট খাওয়াও ছেড়ে দিলাম। কিন্তু বড়ই অদ্ভূত। বিদিশাই তারপরে আমাকে ছেড়ে চলে গেল।
শুক্লাকে দেখলাম, চা খাচ্ছে, আর বারে বারেই আমার দিকে তাকাচ্ছে। কি যেন বলতে গিয়ে একটু আগে থেমে গিয়েছিল ও। শুক্লার এমন দৃষ্টি, কলেজে যখন পড়তাম, আগে কখনো দেখিনি। আমার পাশেই বসে রয়েছে ও। অথচ কলেজে যখন পাশে বসতো, কোনদিন এভাবে কখনো তাকাতো না আমার দিকে।
-’কিছু বলবি শুক্লা? কি যেন বলতে গিয়ে থেমে গেলি তুই?’
শুক্লা বললো, ‘তোকে যদি কিছু বলি, তাহলে তোর মান হবে। অভিমান হবে আমার ওপর। রাগ করবি না বল?’
শুক্লাকে বললাম, ‘তুই তো আমার ক্ষতি কোনোদিন চাস নি। রাগ করবো কেন? কি বলছিলিস বল?’
চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে, আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘সব বলবো তোকে, যদি পারিস, আজ সন্ধেবেলা আসবি একবার আমার ফ্ল্যাটে?’
আমি বললাম, ‘সন্ধেবেলা? আমাকে তো শুভেন্দুও আবার ডেকেছে ওর বাড়ীতে। কি করে যাবো?’
শুক্লা বললো, ‘ওকে বারণ করে দে। বল, শুক্লাও আমাকে ডেকেছে। আমি শুক্লার ফ্ল্যাটে যাচ্ছি।’
শুভেন্দুকে আজ অবধি কোনদিন না করিনি। শুক্লার কথায় না বলবো, মনটা কেমন খচখচ করতে লাগলো। বিদিশার চিন্তাটাও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। শুভেন্দু আমাকে সারপ্রাইজের কথা বলেছে, সেটাও আমাকে জানতে হবে। ওকে যদি না বলে দিই।, শুভেন্দু অসন্তুষ্ট হবে, সারপ্রাইজটাও আমার জানা হবে না।
-’কি হল? কিছু বলছিস না যে? বল আজ আসবি কিনা? আমি তো এখন অফিসে যাবো। ওখান থেকে ফিরে সন্ধেবেলা ফ্ল্যাটেই থাকবো। তোর জন্য অপেক্ষা করবো। আসবি তো?’
সল্টলেকের কোয়ালিটি বাস স্টপেজের কাছে শুক্লারা ফ্ল্যাট কিনেছিল আমি জানি। এই শুভেন্দুই আমাকে বলেছিল, ‘জানিসতো দেব, শুক্লারা এখন সল্টলেকে থাকে। আগে থাকতো বেহালায়। এখন ওখানেই রয়েছে মা বাবাকে নিয়ে।’
শুভেন্দু পুরোনো বন্ধু বান্ধবদের সব খবর গুলো কেমন পেয়ে যায়, অথচ আমি পাই না। নিজেকে বেশ কিছুদিন গুটিয়ে রেখেছিলাম, হয়তো সেইজন্য।
শুক্লা বললো, ‘আমার ফ্ল্যাটটাতেও তো তুই কোনদিন আসিস নি। তা একবার এসে দেখে যা। সবাই তো এসেছে। শুধু তুই বাকী।’
আমি বললাম, ‘সবাই বলতে কে কে?’
শুক্লা বললো, ‘কেন শুভেন্দু, রনি। ওরা দুজনেই তো এসেছে।’
-’আর সৌগত?’
নামটা শুনে মুখটা কেমন যেন হয়ে গেল শুক্লার। আমাকে বললো, ‘কষ্ট দিচ্ছিস?’
 ভাবিনি ওর মুখটা এমন করুন হয়ে উঠবে। শুক্লাকে আমি কোনদিন কাঁদতে দেখিনি। চোখের কোনে জলটা চিকচিক করছিল। রুমাল দিয়ে তাড়াতাড়ি চোখটা মুছে নিয়ে বললো, ‘না তোকে এমনি বললাম, আমি জানি তুই কোনদিন কাউকে কষ্ট দিতে শিখিস নি।’ সৌগত কি করে আসবে? ও তো বিয়ে করে কবেই চলে গেছে আমাদের থেকে অনেক দূরে। মনে নেই? ওর বিয়েতে তো আমিও তো গিয়েছিলাম।’
বললাম, জানিস সৌগত এখন কোথায়?
শুক্লা বললো, ‘শুনেছিলাম তো অ্যামেরিকায়। নিউ জার্সি তে রয়েছে। যে মেয়েটাকে বিয়ে করেছিল, কি সুন্দর দেখতে মেয়েটাকে। বিয়ে করার একবছর পরেই অ্যামেরিকাতে চলে গেল। আমাকে একটা বিয়ের কার্ড পাঠিয়েছিল সৌগত। তখন আমি বেহালাতেই রয়েছি। কার্ডটা পেয়ে যাবো কিনা ভাবছি। তারপরই সৌগত আমাকে ফোন করলো। বললো, কি গো আসবে না? নাকি রাগ এখনো রয়েছে আমার প্রতি? আমি কিন্তু সব কিছু ভুলেই ওর বিয়েতে গিয়েছিলাম।’
শুক্লাকে বললাম, ‘তোকে কিন্তু সেদিন দেখে আমিও খুব অবাক হয়েছিলাম শুক্লা। পরে ভেবেছিলাম, শুক্লার মনটাও কি তাহলে বিদিশার মত বিষিয়ে গেল। এত সুন্দর গড়ে উঠেছিল তোদের প্রেমটা। অথচ হঠাৎই কোথাথেকে কি যেন হয়ে গেল। তুই আবার সৌগতর বিয়েতেও এসেছিলিস, আমার খুব অবাক লেগেছিল।’
শুক্লা বললো, ‘অবাক তো লাগবেই। তুই যে আমার কথা ভাববি, আমি খুব ভালো করেই জানতাম। এই সৌগতই না কতদিন তোর পেছনে পড়েছিল, আমাকে রাজী করানোর জন্য।’
আমি হেসে বললাম, হ্যাঁ। মনে পড়ে সেসব কথা। তারপরেই ওকে বললাম, ‘সৌগতর জন্য তোর কোনদিন আফশোস হয় না শুক্লা? দুজনে পৃথিবীর এখন দুই মেরুতে। কখনো মনে হয় না, এই জীবনটা আমরা হয়তো চেষ্টা করলে একসাথেই কাটাতে পারতাম।’
শুক্লা বললো, ‘আফশোস তো হয়। এই যেমন তোরও হয় বিদিশার জন্য। কিন্তু কথায় বলে, আফসোস করে নাকি কিছু হয় না। পৃথিবীতে আমরা কি কেউ পেছনের দিকে তাকিয়ে চলি? বল? সবাই চায়, সামনের দিকে তাকাতে। আমিও তাই-
 
মনে হল শুক্লা যেন দূঃখ কষ্টটাকে চেপে রেখেছে, আমারই মতন।  ভালোবাসা ওরও টেকেনি। পৃথিবীতে আমরা দুজন যেন একই পথের যাত্রী।
শুক্লাকে বললাম, ‘তাহলেও আমার আর তোর ব্যাপারটা তো আলাদা। সৌগতর সঙ্গে তোর বিয়ে দিতে নাকি তোর বাবা মা আপত্তি করেছিল। সৌগতও জেদের বশে বিয়ে করে ফেললো ওই মেয়েটাকে। এটা কি সত্যি?’
শুক্লা বললো, ‘হ্যাঁ বাবা মা আপত্তি করেছিল। প্রথমে মনে হয়েছিল ঠিকই তো করেছে। এটা তো সত্যি। আমিই বা জোর করবো কেন?’
শুক্লাকে বললাম, ‘তুই তো সৌগতকে ভালোবাসতিস। জোর করলি না কেন?’
শুক্লা বললো, ‘আমার ভালোবাসাটা আসলে ঠুনকো ছিল। সেটাই বলতে চাইছিস তো? আমি তো বিদিশার মত অত ওকে ভালোবাসতাম না। যতটা বিদিশা তোকে ভালোবাসতো।’
শুক্লাকে বললাম, ‘আমি বিশ্বাসই করবো না সেকথা। শুধু এটুকু জানতাম, বিদিশা আমাকে যতটা ভালোবাসে, শুক্লা ঠিক ততটাই ভালোবাসে সৌগতকে। বিদিশা আমাকে ছেড়ে গেলেও শুক্লা কিছুতেই ছাড়তে পারে না সৌগতকে।’
[+] 2 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#14
আমার দিকে তাকিয়ে অল্প একটু হাসলো শুক্লা। বললো, ‘দেব তুই এখনো কত সরল। সেই আগের মতই রয়ে গেছিস। তোকে দেখে ভাবি, ইস প্রেমটা যদি তখন আমি তোর সাথেই করতাম।’
বলতে বলতেই হেসে ফেললো শুক্লা। ‘আমাকে বললো, ভয় পেলি?’
আমি বললাম, ‘ভয় পাবো কেন? তোর প্রতি আমার সহানুভূতিটা সবসময়ই ছিল। আমি জানতাম শুক্লার মত মেয়ে হয় না। তাও মনটা একটু খচখচ করেছিল সেদিন। বিদিশা তারপরপরেই আমাকে যখন ছেড়ে গেল, তুই আমার প্রতি অনেক সহানুভূতি দেখিয়েছিলিস।  অথচ আমি সেটা তোকে দেখাতে পারলাম না। অবাক হলাম, যখন দেখলাম সৌগতও মানিয়ে নিয়েছে ব্যাপারটা। তোদের দুজনের মধ্যে আবার দেখা হল। কিন্তু সেই দূঃখের অনুভূতিটা যেন নেই। কোথায় হারিয়ে গেছে।’
শুক্লা বললো, ‘ওর সাথে আমার পরেও একবার দেখা হয়েছিল। কার যেন বিয়েতে আবার দেখা হল। ও হ্যাঁ মনে পড়েছে। রনির বিয়েতে। সৌগত এসেছিল। সাথে ওর সুন্দর বউটা। আমার সাথে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেছিল। বললো, ভালো আছো? আমি বললাম, হ্যাঁ। ওকে বললাম, তুমি? সৌগত বললো, আমি খুব ভালো আছি।
শুক্লার কথা শুনে আমারো পুরোনো অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। ওকে বললাম, ‘মাঝে মাঝে আমিও ভাবি শুক্লা, এই ভালোবাসাই যদি পরষ্পরকে কাছে আনার জন্য সৃষ্টি হয়, তাহলে এভাবে বিচ্ছেদ কেন শুরুতেই? পুরোনো ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মনকে তো প্রভাবিত করবেই। তুই হয়তো ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবি। কিন্তু সত্যিই কি সব ভুলে থাকতে পারবি?’
শুক্লা হঠাৎই আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘সৌগত তখন একটা অবাঙ্গালী মেয়েকে নিয়ে বাইকে করে ঘুরতো, সেটা কি জানতিস?’
আমি অবাক হলাম। বললাম, ‘না, আমি জানতাম না, শুক্লা ছাড়াও সৌগতর অন্য কোনো প্রেমিকা আছে।’
শুক্লা বললো, আমিও জানতাম না। ‘সৌগতকে, বেহালায় যেদিন আমাদের বাড়ীতে নিয়ে গেলাম। বাবা মায়ের সাথে ওর আলাপ করালাম। বাবা বললো, তোমরা সব এক একটা ব্রিলিয়ান্ট বয়। আমি শুক্লার মুখে তোমার কথাও শুনেছি। দেব ছেলেটাও ভালো। আর তুমি তো ভালো অবশ্যই।’
শুক্লাকে বললাম, ‘মেসোমশাই আমার কথা এখনো বলেন? সেই একবারই তোর বেহালার বাড়ীতে গেছিলাম। উনি অনেক্ষণ ধরে আমার সাথে গল্প করেছিলেন।’
শুক্লা বললো, ‘বাবা তোকে খুব পছন্দ করতো। শুধু বলতো, দেবের মত ছেলে হয় না। কিন্তু সৌগতটা যে কি করলো।’
আমি বললাম, ‘তোর বাবা মা কি এটা জানতে পেরেছিলেন? কি করে জানলো? তুই বলেছিলিস?’
শুক্লা মাথাটা একটু নিচু করলো। আমাকে বললো, ‘হ্যাঁ আমিই বলেছি। আমি সৌগতকে একবার নয়, বেশ কয়েকবার ঘুরতে দেখেছি ওই মেয়েটাকে নিয়ে। মনের মধ্যে কষ্টটাকে চেপে রেখেছিলাম। জানিস তো দেব, আমার আবার বিশ্বাস ভাঙতে একটু সময় লাগে। মনে প্রানে যাকে বিশ্বাস করি, চটকরে তার প্রতি বিশ্বাস ভেঙে যায় না। সৌগতকে আমি নিজেই অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছি। ও বলতো, দূর তুমি পাগল নাকি? ও তো আমার শুধু বন্ধু।’
 আমি অবাক হয়ে শুনছি শুক্লার কথা। শুক্লা বললো, ‘আমি ভুল করেছি আমি মানি। প্রথম প্রথম আমি সহ্যও করতাম। সৌগত বলতো, ও আমার বন্ধু। এর বেশী কিছু নয়। কিন্তু সৌগতর হাবভাব দেখে মনে হত, এর মধ্যে নিশ্চই কিছু একটা ব্যাপার আছে। আচ্ছা ‘দেব’, মানুষ কাউকে ভালোবাসলে কি আনসোশাল হয়ে যায়? পরষ্পরের প্রতি বিশ্বাস আর সন্মান অক্ষুন্ন রেখে যদি প্রেম করা যায়, তাতে তো হানিকর কিছু ঘটে না। ভালোবাসার মূলমন্ত্র যদি আন্ডার স্ট্যান্ডিং হয়। তাহলে যেকোনো ব্যাপারই মানিয়ে নেওয়া চলে। আমি প্রথমে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পরে মনে হল সৌগত যে মেয়েটার সাথে ঘুরছে, এটাকি আমাকে অসন্মান করা নয়? আমার কেন জানি না বিশ্বাসটাই চলে গেল সৌগতর প্রতি। মনে হল ও মিথ্যে কথা বলছে আমাকে। তারপরে যখন ওই আবার অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করলো। বুঝলাম সেদিন সত্যি কথাটাই বলেছিল সৌগত। আমারই ওর কথাটা মেনে নেওয়া উচিত ছিল।’
শুক্লার কথা শুনে মনে হল, এখনো চরম একটা আফশোস রয়েছে সৌগতর জন্য। সবাই যেন ভুলের খেসারত দিয়ে যাচ্ছি আমরা। আর এটাই দিয়ে যেতে হবে আজীবন ধরে।
শুক্লা বললো,ছাড়াছাড়ি মানে তো কয়েকটা সম্পর্কের কাটান ছাড়ান। এই যেমন তোর জীবনটাকে নিয়েও কাটাছেড়া করল মিনু আর বিদিশা। আমারো তাই। ওই অবাঙ্গালী মেয়েটাই আমার বিশ্বাসটাকে সেদিন ভেঙে দিলো।
শুক্লাকে বললাম, ‘তুই এখনো দূঃখ পাস?’
শুক্লা বললো, ‘দূঃখ তো আমারই পাবার কথা। ভুলতো আমিই করেছি। সৌগত নয়। যে ভুল করে তারই তো দূঃখ পাওয়া উচিত। অথচ ভগবান বোধহয় তোর বেলায় উল্টোটাই করেছে।’
হেসে বললাম, ‘কেন? একথা বলছিস কেন?’
শুক্লা বললো, ‘ভুল করলো বিদিশা, আর তুই যেমন ওর জন্য শুধু শুধু দূঃখ করে মরলি। কার ভুল কে করলো? আর এখন দেখ, ও কেমন আফসোস করছে তোর প্রতি। এই ভুলের কি কোনো ক্ষমা হয়?
পৃথিবীতে বিদিশাই একমাত্র মেয়ে। যাকে কোনোদিন আমি ক্ষমা করতে পারবো না। এ কখনো হয় না। বিদিশার মনটা ফুলের মত নরম। যে ফুল অল্প আঘাতও সহ্য করতে পারে না। সেদিন হয়তো, অল্প আঘাতেই ওর মনটা ভেঙে গিয়েছিল। বিদিশা আমাকে ভুল বুঝেছিল, তাই বলে কি ওকে আমি ক্ষমা করতে পারি না? নিশ্চই পারি।
শুক্লা হঠাৎই আমার হাতের ওপর হাতটা রেখে বললো, ‘আচ্ছা ‘দেব’, আমি যদি তোকে বলি, তোকে আমি ভালোবাসি। তুই কি প্রমান চাস?
আমি বললাম, ‘আমি যদি কোনো অন্যায় কাজ করি আর এসে তোকে বলি ক্ষমা করে দে। তুই করবি।’
শুক্লা বললো, ‘আমি সেটাকে অন্যায় বলেই ভাববোই না। কারণ তোর প্রতি আমার সেরকমই বিশ্বাস আছে। বিদিশা তাহলে কেন এটা করলো না?’
শুক্লার কথাগুলো আমার কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছি না, ও কেন চাইছে না। কেন বলছে, বিদিশার সাথে আমার দেখা না করাই ভালো।
কিছু একটা বলতে গিয়েও শুক্লা আবার থেমে গেল। আমাকে বললো, ছাড় এসব পুরোনো কথা। তুই আসবি কিনা বল?
 নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললো, ও বাবা। কটা বাজে খেয়াল করেছিস? আমাকে আবার অফিসে যেতে হবে, তোর এখানে এমনিতেই আমি লেট। এরপরে আরো বসলে আরো লেট হবে। এবার আমি উঠবো। বল না যাবি কিনা?

শুক্লাকে বললাম, তোর অফিস মানে তো ব্যাঙ্ক। কোন ব্যাঙ্কে আছিস যেন?

শুক্লা বললো, ‘পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্কে আছি। ওই চাকরিটাই তো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এখান থেকে সোজা বালীগঞ্জ যাবো। ব্যাঙ্কে সারাদিন ডিউটি দেবো। তারপর খাটাখাটনি করে বাড়ীতে একটু বিশ্রাম।’

শুক্লাকে বললাম, ‘মেসোমশাই, মাসীমা কেমন আছেন? মানে তোর বাবা মা?’

শুক্লা বললো, ‘বাবা তো মারা গেছেই সেই কয়েক বছর আগে। মা হালে মারা গেলেন। ক্যানসার হয়েছিল।’

অবাক হয়ে শুক্লাকে বললাম, তুই তাহলে একা?

শুক্লা বললো হ্যাঁ একা। বড় নিসঙ্গ আমি।

 

শুক্লা এরপরে উঠি উঠি করছে। মা ঘরে এলো। শুক্লাকে বললো, চলে যাচ্ছো?

শুক্লা বললো, ‘হ্যাঁ মাসিমা। পরে একদিন আসবো। এই আপনার ছেলেকে বলে গেলাম, আমার ফ্ল্যাটে যেতে। বাবু এখন যাবে কিনা আমাকে কথা দিতে পারছেন না। ‘

মা বললো, ‘তা যাবে খন। অসুবিধের কি আছে?’

আমি মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছি। শুভেন্দুর কথাটা একটু আগে মাকে বলেছি। মা বোধহয় ভুলেই গেছে। শুক্লা আমাকে বললো, ‘এই বদমাইশটা। তোর ফোন নম্বরটা আমাকে দে তো। কথা বলতে বলতে আসল কাজটাই ভুলে গেছি।’

আমি শুক্লাকে আমার সেলফোন নম্বরটা দিলাম। শুক্লা সেভ করলো। আমাকে বললো, ‘তুই তাহলে আমাকে কনফার্ম করিস। এখন তো কিছু আমাকে বললি না।’

শুক্লাকে বললাম, ‘দেখছি, আমি শুভেন্দুকে ফোন করে। তোকে বিকেলে আমি ফোন করবো। বলেছিস যখন নিশ্চই যাবো। শুধু আমাকে শুভেন্দুর সাথে একটু কথা বলতে দে।’

আমাকে শুক্লা বললো, ‘তোকে নিচে যেতে হবে না কষ্ট করে। আমি নিজেই চলে যাচ্ছি।’

বারান্দা থেকে দাঁড়িয়ে ওর দিকে হাত নাড়লাম। শুক্লাও হাত নাড়লো।  তারপর ওর শরীরটা আসতে আসতে গলির মুখটা থেকে মিলিয়ে গেল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি, আমাকে শুক্লা বিদিশার কাছে যেতে মানা করলো। আবার ওর ফ্ল্যাটেও যেতে বলে গেল। কিন্তু কেন বলে গেল? মনে কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে গেল।

 
 
[+] 3 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#15
ছয়
 
কথায় বলে প্রেম ভালোবাসা থেকে নাকি একধরণের শক্তির জন্ম নেয়। জীবনের বাঁচার রসদ খুঁজে পাওয়া যায়। অদ্ভূত এক হতাশায় জীবনটা কেটে গিয়েছিল বেশ কয়েকটা বছর। ভাবলাম, বিদিশার ফিরে আসাটা কি কোনো কিছুর ইঙ্গিত বহন করছে? আমি যেন একটা অবলম্বনের পথ খোঁজারই চেষ্টা করছিলাম। অথচ শুক্লাই এসে আমাকে কেমন দ্বিধায় ফেলে দিল। মন থেকে শুক্লার না চাওয়াটা একটু অবাকই করলো আমাকে। এতদিন পরে চিঠিটাও খুঁজে খুঁজে ঠিক নিয়ে এসেছে আমার কাছে। ও কি বলতে চাইলো ঠিক স্পষ্ট হল না।
মনে পড়ছিল, কলেজে যেকটা দিন আমাদের কেটেছে, শুক্লাকে কোনদিন বিদিশার প্রতি এত বিদ্বেশ করতে দেখিনি। ও কোনদিন বিদিশাকে দেখে হিংসেও করতো না। আমি বিদিশার সাথে চুটিয়ে প্রেম করছি। শুক্লাকে কোনদিন অখুশি হতে দেখিনি।  যখন প্রেমটা আমাদের ক্রমেই দানা বাঁধতে শুরু করেছে তখনো শুক্লা স্বাভাবিক। কোনদিন প্রেম ভালোবাসার কথা ও আমাকে বলেনি। আর শুক্লাকেও সে চোখে আমি কোনদিন দেখিনি।
শুক্লা বলতো, ‘দেব’ হচ্ছে এমন একটা ছেলে, যার সাথে যে মেয়ে প্রেম করবে, সেই ধন্য হয়ে যাবে। আমি করিনি তো কি আছে। দেব আমার খুব ভালো বন্ধু। কিন্তু বিদিশা করেছে। সেই দিক দিয়ে বিদিশাকে আমি খুব লাকি বলেই মনে করবো। সুন্দরী হলেই শুধু হয় না।  ভালো ছেলেদের মন পাওয়ার জন্যও মেয়েদের অনেক তপস্যা করতে হয়। বিদিশা করেছে, তাই ও দেবকে পেয়েছে। আমি চাই দেব আর বিদিশা জীবনে আরো সুখী হোক। প্রেম ভালোবাসা দিয়ে ওরা একে অপরকে পাওয়ার আনন্দটা আরো উপভোগ করুক।
নিজেও যখন সৌগতর সঙ্গে প্রেম করা শুরু করলো, তখন আমাকে বললো, ‘তুই ই আমাকে পথ দেখালি দেব। তোকে দেখেই শিখলাম পৃথিবীতে প্রেম জিনিষটা কত সুন্দর। মধুর প্রেমের সত্যিই কোনো বিকল্প হয় না।’
সৌগত আর শুক্লা আমাকে আর বিদিশাকে খুব নকল করতো। বিদিশা আমাকে ভ্যালেনটাইন্স ডে তে কার্ড দিচ্ছে, সাথে ডায়েরী আর পেন। আর সুন্দর কারুকার্য করা একটা রুমাল। শুক্লা তাই দেখে বললো, ‘আমিও সৌগতকে তাহলে এগুলো দিই? শুধু কার্ড কেন দেবো? সাথে ডায়েরী, পেন আর রুমালটাও তো দেওয়া দরকার।’
কলেজস্ট্রীটে গিয়ে সব কিনে নিয়ে এসেছে। আমাকে এনে দেখাচ্ছে, আর বলছে, ‘দেখ, বিদিশার মত কিনেছি সব। ভালো হয়েছে?’
প্রথম প্রথম আমি আর বিদিশা মাঝে মাঝে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে যেতাম। বেশ কয়েকটা নতুন সিনেমাও দেখে ফেলেছি দুজনে। শুক্লা আবদার করে বসলো, ‘এবার থেকে তোরা একা যাবি না। গেলে আমরা চারজনে মিলে যাবো।’
মাঝে মাঝে শুভেন্দুও এসে জুড়ে বসতো আমাদের সাথে। আমাকে আর শুক্লাকে বলতো, ‘এই শোন, তোদের দুজনের এই যে প্রেমটা হচ্ছে না। এসবই আমার বদলৌতে। সেদিন যদি বিদিশাকে আমি চিঠিটা না দিতাম না, তাহলে দেব কোথায় আর বিদিশা কোথায়? আর শোনো, পারুল রানী, তুমি তোমার প্রেমিকের যা অবস্থা করেছিলে, দেবদাস হতে হতে বেঁচে গেছে ব্যাচারা সৌগত। ভাগ্যিস তোর মনটা ঘোরাতে পেরেছিলাম সেদিন। নইলে?
 শুভেন্দুর আমাদের সাথে ভিক্টোরিয়াতে গিয়ে যে কি অবস্থা হয়েছিল, সেকথা তো আগেই বলেছি। ও কখনো বোর ফিল করত না। আমরা চারজনে আপন মনে যখন নিজেদের মধ্যে ভাব, ভালোবাসার কথা বলছি, শুভেন্দু তখন আপনমনে বাদাম চিবোতো। আর মুখে বলতো, ‘তোরা প্রেম কর। আমার ভাই বাদামই ঠিক আছে।’
 
শুক্লা চলে যাবার পরে শুভেন্দুর সেই বিদিশাকে দেওয়া চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেক্ষণ ধরে দেখছিলাম, আর পুরোনো কথাগুলো আবার মনে পড়ে যাচ্ছিল।
মা, ঘরে ঢুকে বললো, ‘তোর মনে হচ্ছে কাজে বেরোনোর আজ বারোটা বেজে গেল। কোনো তাড়া নেই, সেই সকাল থেকে লেখালেখি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লি। তারপরে এখন আবার বসে বসে কি ভাবতে শুরু করেছিস?’
আমি বিদিশার কথাই ভাবছিলাম, মাকে সেভাবে বলতে পারলাম না। শুধু বললাম, ‘মা কোনো একটা সিদ্ধান্ত নিতে আমাকে খুব দোটনায় থাকতে হচ্ছে। ভাবছি, কি সিদ্ধান্ত নেবো?’
মা বললো, ‘কি সিদ্ধান্ত?’
- ‘সেটা তোমাকে এখনি বলা যাবে না। আমি পরে বলবো।’
মা বললো, ‘তুই তো সব কথা আমাকে সেভাবে বলিস না। নিজের ভেতরেই লুকিয়ে রাখিস। যদি মনে করিস বলবি না। তাহলে বলিস না। আমি আর কি বলবো?’
মাকে বললাম, ‘তোমাকে আজ অবধি কোনোকিছু কি আমি লুকিয়েছি? তুমি তো সবই আমার পুরোনো কথাগুলো জানো। আমার অতীতে যে ঘটনাগুলো ঘটে গেছে, সেগুলোই মাঝে মাঝে বসে আমি ভাবি। কলেজের দিনগুলোর কথা এতদিন বাদে মনে পড়ে যাচ্ছিল। তাই সকালে লিখছিলাম। তারপরে শুক্লাও এলো। এতদিন বাদে আমার বাড়ীতে প্রথম এসেছে, ওর সাথে কথা বলে ভালো লাগল। পুরোনো স্মৃতিগুলো মনকে নাড়া দিচ্ছে এই আর কি।
মা বললো, ‘শুক্লা তোকে কিছু বলেছে?’
অবাক হলাম। বললাম, ‘না কই কিছু বলেনি তো। কি বলবে?’
মা বললো, ‘আমি শুনেছি আড়াল থেকে। ও বিদিশার কথা বলছিল। বিদিশা নাকি ফিরে এসেছে কলকাতায়। ওর স্বামীকে ছেড়ে।’
আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি, মাও তাকিয়ে আছে আমার দিকে। দেখছে জবাবে আমি কি বলি?
মাকে বললাম, ‘কেন তুমি শুনে খুশি হও নি? বিদিশা ফিরে এসেছে।’
একটা চাপা দূঃখ। ঠিক আমারই মতন। মাকে বরাবরই দেখে এসেছি, আমার জন্য আফশোস করতে। মা আমার এমনই। যখন আমি দূখী তো মা দূখী। আবার আমি সুখি তো মাও সুখী। যেভাবে ছেলের মুখে হাসি ফুটলে মায়েরও মুখে হাসি ফোটে, ঠিক সেভাবেই মা, আমাকে বললো, আমি তোর মুখে হাসিটা দেখে ফেলেছি। এতদিন বাদে তুই খুশী হয়েছিস। আমি কি খুশী না হয়ে থাকতে পারি?
আমি মাকে আনন্দে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, ‘খুশি হয়েছি মা, খুব খুশি হয়েছি। বিদিশা ফিরে এসেছে, আমার থেকে বড় খুশী বোধহয় পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
 শুক্লার কথাটা মন থেকে মুছে ফেললাম। মনে মনে বললাম, যে মেয়েটিকে আমি এত ভালোবাসতাম, যার কথা আমি সবসময় ধ্যান করতাম, তাকে যদি এতদিন বাদে আবার দেখতে পাই, চোখ তো ফেরাতে পারবো না। বিদিশা যদি আমার খোঁজ করে, আমি নিশ্চই ওর কাছে যাবো।
মনে মনে বললাম, ভাগ্যিস, এই গল্পটার নাম, একটি ভালোবাসার মৃত্যু দিইনি। তাহলে বিদিশার ফিরে আসাটা একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়তো।
 
বিকেল হতেই শুভেন্দুর বাড়ী যাব বলে তৈরী হয়ে নিলাম। অফিসে ফোন করে বলে দিয়েছি, ‘আজ আর অফিসে যাচ্ছি না। কিছু কাজ পড়ে গেছে। সুতরাং কালকে আবার আসছি যথারীতি।’
শুভেন্দু বলেছে, সাতটার মধ্যে ওর ওখানে যেতে। আমি যখন বাড়ী থেকে বেরোলাম, তখন ঘড়িতে বিকেল পাঁচটা বেজে দশ মিনিট।  বাড়ী থেকে বেরিয়ে হন হন করে হাঁটতে হাঁটতে বড় রাস্তার মোড় অবধি গেলাম। মনে হল, এই যাঃ। কিছু একটা আমি ফেলে এসেছি। খেয়াল হল, বিদিশাকে দেওয়া শুভেন্দুর ওই চিঠিটা বাড়ীতে ফেলে এসেছি। শুক্লা যেটা বাড়ী বয়ে এসে আমাকে দিয়ে গেল। শুভেন্দুকে দেখালে বেশ ভালো হত। বিদিশার কথা আমিও শুভেন্দুকে আগে থেকে বলতে পারতাম।
চিঠিটা তাড়াহূড়োতে আর পকেটে ঢোকানো হয় নি। খেয়াল হলো বসার ঘরের টেবিলের ওপরেই রেখে এসেছি। মা’র চোখে পড়লেও পড়তে পারে। কিন্তু ঐ চিরকূট দেখে মা আর কিছুই বুঝবে না। ওতে হিজিবিজি ছাড়া আর কিছু নেই।
 
কাঁকুড়গাছি মোড় থেকে একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। ট্যাক্সিওয়ালাকে বললাম, পিকনিক গার্ডেন যাবো। ট্যাক্সিওয়ালা বললো, বাইপাস ধরবো? আমি বললাম, যেদিক দিয়ে খুশি চলুন। আমার পিকনিক গার্ডেন পৌঁছোলেই হল।
ট্যাক্সিওয়ালা ফুলবাগান পেরিয়ে বাইপাশই ধরলো। বুঝলাম রুবী হসপিটাল থেকে তারমানে ডানদিকে টার্ণ নিতে হবে। আমি তাহলে ঠিক ছটার আগেই শুভেন্দুদের বাড়ীতে পৌঁছে যাবো।
ট্যাক্সিতে যেতে যেতে ভাবছি, শুভেন্দুতো বলেছে সারপ্রাইজের কথা। রনিও ওখানে থাকবে। তারমানে রনিও ব্যাপারটা জানে। অথচ শুক্লা বললো, শুভেন্দুর সাথে এ ব্যাপারে নাকি কোনো কথা হয় নি। বিদিশাকে শুক্লাই দেখেছে, কাল গড়িয়াহাটের মোড়ে। শুভেন্দু যে সারপ্রাইজের কথা বলছে, এটা তাহলে কোন সারপ্রাইজ?
কিছুতেই মাথায় কিছু এলো না। কত চিন্তা করলাম। ভাবলাম, বিদিশাকে কি তাহলে শুভেন্দুও দেখেছে শুক্লার মত? কিন্তু আমাকে ও বললো না কেন? অন্তত বিদিশার ব্যাপার হলে শুভেন্দু আমাকে লুকোবে না।  এই ক বছরে অনেক যন্ত্রণায় মরেছি। অনেক কষ্ট পেয়েছি। শুভেন্দু প্রথম প্রথম সান্তনা দিয়েছে আমাকে। পরে বলেছে, ছেড়ে দে বিদিশাকে। মনে কর, বিদিশা বলে তোর জীবনে কেউ কোনদিন ছিল না। আবার নতুন করে জীবনটাকে শুরু কর। সেই বিদিশাই যখন ফিরে এলো। শুভেন্দুর তো বলা উচিৎ ছিল।
ট্যাক্সিতে যেতে যেতে শুভেন্দুকে মোবাইলে ধরার চেষ্টা করলাম। এক চান্সেই ওকে পেয়ে গেলাম। শুভেন্দুকে বললাম, ‘আমি কিন্তু তোর ওখানে যাবো বলে রওনা দিয়ে দিয়েছি। সাতটার আগেই মনে হচ্ছে পৌঁছে যাবো। এই ধরেনে ছটা সোয়া ছটা।
[+] 2 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#16
শুভেন্দু হাসলো। বললো, ‘রনি থাকবে বাড়ীতে। আমি সাড়ে ছটার মধ্যে কাজ সেরে ঢুকবো। আর যে সারপ্রাইজটার কথা তোকে বলেছি, তার জন্য আরো আধঘন্টা তোকে অপেক্ষা করতে হবে।’
মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না। ওকে বললাম, ‘হেঁয়ালিটা রাখ না। কি সারপ্রাইজ দিবি, সেটা আগে থেকে বল না?’
শুভেন্দু বললো, ‘সারপ্রাইজ ইজ অলওয়েজ সারপ্রাইজ। আগে থেকে বললে, ওটা আর সারপ্রাইজ থাকে না। তুমি এসো। ধীরে ধীরে সব রহস্য উন্মোচন হবে। একটু অপেক্ষা কর বৎস।’
শুক্লার সকালে আমার বাড়ীতে আসার ব্যাপারটা চেপে গিয়েই ওকে বললাম, ‘তুই কিন্তু যে সারপ্রাইজের কথা আমাকে বলছিস। ওটা আমি আগে থেকেই জানি। আমার জানা হয়ে গেছে, আজ সকালে।’
শুভেন্দু বললো, কি জেনেছিস? আমাকে বল দেখি।
আমি বললাম, না থাক। বলবো না।
শুভেন্দু বললো, ‘বলবি না যখন তুইও চেপে থাক। দেখা যাক তোর জানার সাথে আমার সারপ্রাইজ মেলে কিনা’। ফোনটা রাখতে রাখতেই আবার বললো, ‘তোর মুখে আমি অনেকদিন হাসি দেখিনি। আজ তোর মুখে আমি হাসি ফোটাবো।’
আমি বুঝে গেলাম, তারমানে বিদিশার কথাই শুভেন্দু আমাকে বলতে চাইছে।
 
ট্যাক্সির কাঁচ দিয়ে কতগুলো ছেলে মেয়েকে হাত ধরাধরি করে ঘুরতে ফিরতে দেখছি। আর ভাবছি বয়সটা আমার দশবছর কমে গেছে। কি জানি হয়তো বিদিশারই জন্য।
 
রনির কথা ভেবে, রনিকেও একটা ফোন লাগালাম। রনি বললো, ‘কিরে দেব? তুই আসছিস তো?’
একটু আগেই শুভেন্দুর সাথে ফোনে কথা হয়েছে রনিকে সেটা বললাম। রনি বললো, ‘তোর জন্য আমি আর শুভেন্দু একটা পাত্রী ঠিক করেছি। তুই এলে, সেই মেয়েটিকে তোকে দেখাবো। শুভেন্দু যে সারপ্রাইজটার কথা বলেছে, ওটা সেই সারপ্রাইজ।’
আমি বললাম, ‘পাত্রীটি কে?’
রনি বললো, ‘ধরে নাও খুব সুন্দরী। তবে এখন একটু বয়স হয়েছে। তবে সৌন্দর্য তার কমে নি। তোমার সাথে ভালো মানিয়েও যাবে, কোনো চিন্তা নেই।  এবার একটু ধৈর্য নিয়ে তুমিও এসো।  আর হ্যাঁ আজকে কিন্তু খুব সহজে তোমায় ছাড়ছি না। অনেক গান শোনাতে হবে, সেই রাত অবধি। যিনি আসবেন, তিনিও তোমার গান শুনবেন।’
তারপর আবার হেসে রনি বললো, ওফ দেব, কতদিন তোর গান শুনি না। সেই কবে শুনেছিলাম লাস্ট। মনেই নেই। তারপর মনে হয় একজুগ হয়ে গেছে।
মোবাইলটা কানে ধরে নিজের ভেতরের আনন্দটা ওকে প্রকাশ করতে পারছি না। শুধু রনি বললো, আজ তুই মুকেশের ওই গানটা আবার গাইবি। যেটা খুব গাইতিস আগে। বলে নিজেই গাইতে লাগলো -সুহানি চাঁদনী রাতে। হামে শো নেহী দেতে। তুমহারী প্যায়ার কী বাতে, হামে শো নেহী দেতে।
 রনি ফোনটা ছাড়ার পরেই ধরে নিলাম, এ মেয়ে বিদিশা না হয়ে কিছুতেই যায় না। ও যা বলছে, তাতে আর রহস্যের কিছু নেই। শুক্লার মত শুভেন্দুও হয়তো দেখে ফেলেছে বিদিশাকে। রাস্তায় দেখতে পেয়ে ওকে ইনভাইট করেছে বাড়ীতে। আজ সেখানে আমিও যাচ্ছি। সামনা সামনি আজ আমরা আবার দুজনে মুখোমুখি।
 
বিদিশাকে আমি ভালোবাসতাম। সেই ভালোবাসার মধ্যে কোনো খুঁত ছিল না।  জানি, ভালোবাসার মধ্যে যদি সততা থাকে, সে ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না। সেদিন বিদিশা আমাকে ভুল বুঝেছিল, তাই আমার জীবন থেকে ও হারিয়ে গিয়েছিলো। বিদিশার যখন ভুলটা ভাঙলো, তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে। কিন্তু আমার এই স্বচ্ছ ভালোবাসাই ওকে আবার ফিরিয়ে আনলো আমার কাছে। এই পৃথিবীতে দেবকে ছেড়ে বিদিশা আর যাবে কোথায়?
 
আমার মনে আছে, কলেজে বিদিশার সাথে যখন প্রেম শুরু করলাম, তখন রনি কত পেছনে লেগেছে আমাদের। বিদিশার সাথে ফাজলামী আর খুনসুটি তো করতোই এছাড়া আমাকেও কখনো কখনো ছাড়তো না। একদিন খুব গুরু গম্ভীর ভাবে আমাকে বললো, ‘দেব, একটা কথা খুব সিরিয়াসলি ভাবে তোকে জিজ্ঞাসা করছি। ‘এখনো অবধি বিদিশাকে তুই কটা চুমু খেয়েছিস? গালে, কপাল আর ঠোঁট মিলিয়ে কটা?’
তারপর আবার নিজেই হেসে বললো, ‘গুনে দেখিস নি, তাই না বল?’
 
রনিকে কোনদিন কাব্যিক হতে দেখিনি, আমাকে বলেছিল,‘প্রেম যখন হৃদয়ে আসে, তখন পুরুষ বা রমনী কি চায় জানিস? সে নিজেকে উজাড় করে দিতে চায়। বাঁচিয়ে রাখতে চায়, লালন করতে চায় তার প্রেমকে। সবার উপরে থাকে সমর্পনের ইচ্ছে।’ একেবারে পি সি সরকারের ম্যাজিকের মতন। এক ঝলক চাহনি, একটু ঠোঁটের কাঁপন, মাথাটা হেলিয়ে রাখা, হাতের আঙুলের নড়াচড়া। এর প্রত্যেকটিই প্রেমকে জাগিয়ে তুলতে পারে। ঠিক ম্যাজিকের মতন। কিন্তু খুব সাধারণ ম্যাজিক।’
 
রনির কথা ভাবছিলাম আর বিদিশার মুখটাকে চিন্তা করছিলাম, ট্যাক্সিতে যেতে যেতে হঠাৎই আমার মনে হল, বিদিশার মুখটা যেন আমার মুখের খুব কাছে। সেই আগে যেরমকম গরম নিঃশ্বাস ফেলতো আমার ঠোঁটের ওপরে। প্রথমবার চুমু খেতে গিয়ে ওর ঠোঁটটা একটু কেঁপে গিয়েছিল। কিন্তু আমি যখন ওর ঠোঁটে প্রেমের চিহ্ন এঁকে দিলাম, ও জড়িয়ে ধরলো আমাকে। প্রজাপতির মত বিদিশার আঙুলগুলো আমার পিঠে তখন খেলা করছে। বিদিশার ঠোঁটের ওপর আমার ঠোঁট। বিদিশার পায়ের ওপর আমার পায়ের উষ্ণ চাপ। দ্রুত নিঃশ্বাস একসাথে মিশে যাচ্ছে। আঙুল গুলো দিয়ে বিদিশা আমার পুরো শরীরটাকে এমন ভাবে খেলাচ্ছে, যেন শরীরের প্রতিটি কোনকে জানার জন্য ও কত অধীর। জড়িয়ে ধরে বিদিশাকে আমি বলছি, ‘বিদিশা, ভালোবাসাটাকে আমি অমর করে রাখতে চাই। তুমি আমাকে কোনদিন ভুলে যাবে না তো? বিদিশার মুখ দিয়ে শুধু গোঙানির মত শব্দ। দুটো ঠোঁট তখন ভালোবাসার আলিঙ্গনে আবদ্ধ। আমাকে জড়িয়ে ধরে বিদিশা বলছে, ‘না গো না। আমি কি তোমাকে ভুলে যেতে কখনো পারি?’
 ভালোবাসার বেশী সুখ নাকি কপালে কখনো সয় না। মূহূর্তগুলো সব ঝাপসা হয়ে যায়। এই বুঝি শুরু হল। আর কদিন পরেই সব শেষ। মনে হল, বিদিশার মুখটাকে আমি দেখছিলাম এতক্ষণ। তারপরেই ওর মুখটা কেমন ঝাপসা ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল আসতে আসতে। আমার মুখের কাছে বিদিশার মুখটা আর নেই, হঠাৎ দেখছি ওখানে মিনুর মুখটা চলে এসেছে। বিদিশার ঠোঁটদুটোও নেই। ওখানে মিনুর ঠোঁট দুটো চলে এসেছে।
মূহূর্তে মুখটা কেমন পাথরের মত হয়ে গেল আমার। মনে পড়ল, মিনুর বাড়ীতে সেদিন কি ঘটেছিল।
 
সেদিন ছিল শনিবার। বাবা বলতেন, শনিবার দিনটা আমার কাছে নাকি শুভ নয়। শনি যদি ঘাড়ে চেপে বসে, তাহলে তো আরো মুশকিল। সেদিন মিনু হয়েছিল আমার শনি। তখন ঠিক সন্ধে সাতটা। মিনু আমাকে বাড়ীতে ডাকলো। আগের দিন সৌগতর দাদার বিয়েতে গিয়েছিলাম। সারারাত সৌগতর দাদার বিয়ের বাসরে জেগেছি। অনেক রাত অবধি হৈহুল্লোর আর গানবাজনা হয়েছে। শরীরটা এমনি খারাপ। মিনুকে বললাম, ‘আজ ছেড়ে দে মিনু, আজ আমার বাড়ী থেকে বেরোনোর একদম ইচ্ছে নেই।’
মিনু শুনলো না। বললো, ‘তোকে কি এমনি এমনি আমি বাড়ীতে ডাকছি? কারন তো একটা আছে। তুই আয়। আমি দশমিনিটের মধ্যে তোকে ছেড়ে দেবো।’
জানতাম না সেদিন বিদিশাও আমার বাড়ীতে এসে হাজির হবে। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছি, মিনুর বাড়ী যাবো বলে। তার ঠিক একঘন্টা পরেই বিদিশাও আমার বাড়ীতে এসে হাজির। আমাকে দেখতে পাইনি। মা’ বলে দিয়েছে আমি মিনুর বাড়ী গেছি। বিদিশাও আর অপেক্ষা করেনি।
বিদিশার ভীষন রাগ ছিল মিনুর ওপর। কলেজে কোনদিন দাঁড়িয়ে কথা পর্যন্ত বলেনি মিনুর সঙ্গে। মিনুর বাড়ীতে আমি যাই, সেটা ওর বোনকে গান শেখানোর জন্য হলেও বিদিশার একেবারেই পছন্দ হতো না। সৌগতর দাদার বিয়ের দিন এই নিয়ে একটু মুখ ভার করেছিল বিদিশা। আমি ওর রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করছি। বিদিশা বললো, ‘আমি তো বলেছি মেয়েটা ভালো নয়। তুমি তাও শুধু শুধু। কি পাও তুমি ওখানে গিয়ে?’
বিদিশাকে কথা দিয়েছিলাম, আর মিনুর বাড়ীতে যাবো না। কিন্তু সেদিন নিয়তি আমাকে ডেকে নিয়ে গেল মিনুর কাছে।
যখন ওর বাসায় ঢুকলাম, তখন দেখলাম ওর ছোট বোনটা নেই। মিনু একা রয়েছে ঘরে। ওর চোখ দুটো কেমন ঘোলা ঘোলা। ঘরের মধ্যে শাড়ী ছেড়ে নাইটি পড়ে রয়েছে। মুখ চোখ দেখেই মনে হল, যেন শয়তান ভর করেছে ওকে।
শুরুটা করলো ভালোভাবে। আমাকে বললো, ‘সৌগতর দাদার বিয়েতে খুব আনন্দ হল। তাই না রে?’
-তুই তো যাসনি। গেলে আনন্দটা বুঝতে পারতিস।
-আমাকে তো সৌগত বলেনি। তোদের বলেছে আমি বাদ।
-তোকে কেন বলেনি, সেটা তো বলতে পারবো না। তবে আনন্দ তো খুব হয়েছে।
-এই দেব, তুই গান গেয়েছিস?
-গেয়েছি অনেক। ওরা ছাড়ছিল না তাই।
[+] 3 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#17
-বিদিশা গেছিল কাল?
-হ্যাঁ গেছিল। তাতে তোর কি?
-তুই দিন রাত শুধু বিদিশার কথাই চিন্তা করিস। তাই না?
-কেন ডেকেছিস, সেটাই বল। বিদিশার কথা বলতে ডেকেছিস আমাকে?
-ওফ বড্ড বিদিশা আর বিদিশা করিস তুই।
-কেন, বিদিশাকে বুঝি তোর হিংসে হয়? সহ্য হয় না, তাই না?
-আমার তো মনে হয়, বিদিশা তোর সাথে ঢং করে। ভালোবাসার আবার ও বোঝেটা কি?
-মিনু, তুই এসব কথা বলার জন্য আমাকে বাড়ীতে ডেকেছিস?
-ও তুই রাগ করলি? অত রাগটাক করে না মেরী জান।
-মিনু তুই কিন্তু সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস।
-আচ্ছা দেব, তুই কেন আমাকে এত অবজ্ঞা করিস বলতো? কেন, তোর প্রেমে পড়েছি, এটাই আমার দোষ?
- না তুই ছাড় আমাকে। যেতে দে এখান থেকে।
-যেতে দেবো বলে তো ডাকিনি তোকে। তোর সাথে একটু প্রেমের খেলা খেলবো। মদ না খেয়েই আজকে মাতালিনী হয়ে গেছি।
-তুই মদ খাসনি?
-সত্যি খাই নি। বিশ্বাস কর।
-তুই দিনকে রাত করতে পারিস। নয়কে ছয় করতে পারিস। মিনু তোর সাথে আমার কোনো কথা নেই।
মিনু এবার একটু খিলখিলিয়ে হাসতে লাগলো। আমাকে বললো, -শুধু শুধু আমার ওপরে রাগিস তুই।  আমার জীবনের বড় স্বপ্ন তো তুই। আজ বাদে কাল তোরই হাতে হাত রেখে সপ্তবনী প্রহর পার হবো।  তুই হবি আমার জীবনের জ্যাকপটের সবচেয়ে দামী ঘোড়া।
-মিনু তুই মদ খেয়েছিস। ইস কি নোংরা তুই।  ছাড় আমাকে ছাড়।
-কেন রে দেব? আমাকে কি তোর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা বেশ্য মাগী বলে মনে হয়?
-মিনু আই সে স্টপ নাও। লিভ মি।
-উঃ গোঁসা দেখো ছেলের? বিদিশা কে পেয়ে যেন বড় অহঙ্কার তোর। কেন আমাকেও একটু ভালোবাসতে চেষ্টা কর। ‘দেব’ প্লীজ।
-মিনু তুই কিন্তু বড্ড বাড়াবাড়ি শুরু করেছিস।
মনে হচ্ছিল মিনুর গালে একটা চড় মেরে দিই। তখনো মারতে পারিনি। আমাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে মিনু।  মুখটাকে আমার মুখের কাছে নিয়ে এসে মাকালীর মত জিভ বার করে বিশ্রী অঙ্গভঙ্গী করতে লাগলো।
-আমার জিভটা জ্বলে যাচ্ছে দেব। দেখ একটু আগে লঙ্কা খেয়ে ফেলেছি।  প্লীজ্ আমার জিভে তুই জিভ টা ঠেকা। আমাকে একটু আদর কর। বিচ্ছিরি আর বুনো আদর। শুয়োর যেমন শুয়োরের পেছনে পেছন ঠেকিয়ে আদর করে। ঠিক সেইভাবে তুই পারবি তো! আমার বুকের ভেতরে আগুন জ্বলছে, মাইরি দেব, তুই একটা ল্যাদল্যাদে পুতুল হয়ে যা। আমি তোকে ছিঁড়বো, চাটবো, চুষবো। আমি তোকে পায়ের নীচে ফেলে রাখবো পাপোশ করে। আমি তোকে মাথায় বসাবো। তুই হবি আমার গলার হার। তুই হবি আমার অন্তবাস। হবি তো?
 -তুই এসব খারাপ খারাপ কথা বলার জন্য আমাকে বাড়ীতে ডেকেছিস?
-ওফঃ। পারি না দেব। তুই যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানিস না। সবই জানিস। অথচ বিদিশার জন্য সব রেখে দিয়েছিস। বিদিশার কি দেখে মজেছিস তুই? বল না রে দেব? যেভাবে ও তোর ঘাড়ে চেপে বসেছে, যেন কচি লেবুর সাথে প্রথম বৃষ্টির মেলামেশা। ও যেন তোর এই ঠোঁটদুটো থেকে মধু চুরি করে নিয়েছে। হ্যাঁ রে দেব? তুই কি অসভ্য মাইরী। তুই কি পুরুষ বেশ্যা নাকি? বিদিশাকে এতসব দিলি কেন? আমার জন্য তো কিছু রাখতে পারতিস।
 
মিনুর কথা শুনেই বুঝতে পারছিলাম ও আমি আসার আগেই মদ খেয়েছে অনেকটা । অসংলগ্ন কথা বলছে, কথা জড়িয়ে আসছে। পেটের ভেতরে যেন ধাকতিনাকতি ধাকতিনাকতি শুরু হয়েছে। উল্টে আমাকেই বলে বসল। ‘এ আমার কি হল দেব? কথাগুলো ছড়িয়ে যাচ্ছে কেন? তুই আমাকে গুন করেছিস? বল না দেব, তুই কি করেছিস আমার?
 
আমার মুখটা তখন এত কঠিন হয়ে গেছে, আগে কোনদিন হয় নি।
 
মিনু বললো, ‘ওহ্ তুই কি কিউট রে? দেখি তোর বুক দেখি। তোর বগল দেখি।’
বলে আমার জামার বোতাম গুলো সব খুলতে লাগলো পট পট করে। মিনু প্রচন্ড আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। আমি ওর সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি করবো না ঠেলে দূরে সরিয়ে দেবো বুঝতে পারছি না।
 
মিনু বললো, ‘দেব তুই কিন্তু স্টেডী থাকবি। আমি তোকে সিডিউস করছি বলে ঘাবড়ে যাস না। তাড়াহূড়োতে তুই আবাব বৃষ্টি ঝরাতে শুরু করিস না। তাহলে কিন্তু আমি খুব রেগে যাবো। তুই তো জানিস, মেয়েদের সেক্স আসতে আসতে ওঠে। একটা বিন্দুতে পৌঁছে যাবার পর অনেক্ষণ স্ট্রে করে। তোদের মতো দুম ধড়াস কেলাস হয়ে যায় না।’
 
মিনু আমার জামাটা প্রায় খুলে ফেলেছে। বুকে একটা চুমু খেয়ে বললো, দেব, তুই মাইরি দারুন সেক্সী। আমার ভাগ্য ভালো বলতে হবে। তোর পেছনে এতদিন শুধু ঘুরঘুর করেছি, আমি কিনা সত্যি- দেব আজ তুই আমার সাথে বিট্রে করিস না প্লীজ।’
মিনু আমার মুখের মধ্যে জিভটা ঢুকিয়ে দিল জোর করে। আমাকে বললো, ‘দেখ, আমি কেমন মুখরোচক চানাচুর। আমাকে খেতে তোর দারুন লাগবে।’
ঠিক ঐ মূহূর্তে মিনুকে আমার একটা বেশ্যা বলে মনে হচ্ছিল। গালে একটা চড় মারতে গেলাম। মিনু চড়টা খেলো না। তার আগেই ওর কলিং বেলটা বেজে উঠলো। মিনু আমাকে ছেড়ে দিয়ে নিজেই দরজা খুলতে লাগলো। দরজা খুলতে গিয়ে আবার একটু টলেও গেল। দরজার সামনে বিদিশা দাঁড়িয়ে। আমি হতবাক। স্তম্ভিত হয়েগেছি বিদিশাকে দেখে। বুঝতে পারছি না ও কি করে এখানে এলো?
মিনু বিদিশাকে দেখে বলে উঠল। ‘কি চাই এখানে? ভাগো ভাগো। এটা তোমার জায়গা নয়। আমার দেবের ওপরে গোয়েন্দাগীরি? সারাটা দিন চিপটে বসে আছিস ওর সাথে। এখানেও রেহাই নেই?’
 বিদিশার চোখ মুখ দিয়ে তীব্র ঘেন্না ছড়িয়ে পড়ছে। আমি বুঝতে পারছি না,  বিদিশা আমার খোঁজে এখানে কি করে চলে এলো?
ভেতরে ঢুকলো না বিদিশা। আমাকেও কিছু বলার সুযোগ দিলো না।  মিনুকে বললো, ‘বড্ড ভুল হয়ে গেছে আমার। ভুল জায়গায় এসে পড়েছিলাম। সরি। আমি চলে যাচ্ছি।’
পেছন থেকে বিদিশাকে ডাকছি,’ বিদিশা যেও না। প্লীজ, প্লীজ। আমার কথা শোনো।’
মিনু তখন আমার জামাটা শক্ত করে ধরে রেখেছে, যাতে ছুটে আমি বিদিশার কাছে যেতে না পারি।
 
কখনো ভাবিনি, একটা ছোট্ট অঘটনই জীবনে বিষাদ ডেকে আনতে পারে। বিদিশা আমাকে ভুল বুঝলো। আমি তো কোনো নোংরামো করিনি মিনুর সাথে। মিনু শেষ চালটা দিয়ে হাসিল করতে চেয়েছিল আমায়। যখন দেখলো ও আর পারলো না। আশা ছেড়ে দিল। অথচ বিদিশা ভুল বুঝে আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেল।
 
বাড়ি ফিরে বিদিশাকে অনেক ফোন করার চেষ্টা করেছি সেদিন। বিদিশা ফোন ধরেনি। ল্যান্ডফোনের রিসিভার তুলে রেখে দিয়েছিল। আমার মনে হল শ্বাসরোধ হয়ে আসছে। কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস নিতেই পারলাম না। পকেট থেকে রুমাল বার করে চোখের ওপর চেপে ধরলাম। নিরুদ্ধ অশ্রু বাঁধ ভেঙে ঝরে পড়তে চাইছে। রুমাল দিয়ে সেটাকে আটকাতে চাইছি। একটা দূঃসহ বেদনার ভারে হৃদয়টা যেন গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে। মনে হল, বিদিশা তো আমার কাছে এখন নেই। থাকলে হয়তো বলতো কেঁদো না, তাহলে আমি কষ্ট পাবো।
আপ্রাণ চেষ্টা করেও আমি আমার কান্নাটাকে রোধ করতে পারলাম না। চোখ থেকে রুমালটা সরিয়ে নিলাম। ধীরে ধীরে আমার চোখ দিয়ে অশ্রুধারা নেমে এলো। এক একটা করে ফো’টা ঝরে পড়তে লাগলো।
 
প্রচন্ড একটা ব্রেক কষে ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে পড়েছে। আমার যেন হোশ ফিরলো। কোথায় যেন এতক্ষণ হারিয়ে গিয়েছিলাম এতক্ষণ, সেই অভিশপ্ত দিনটাতে। এমন জোরে ব্রেক কষেছে গাড়ীটা। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ট্যাক্সি ওয়ালা বললো, দেখেছেন, কিভাবে এরা গাড়ী চালায়? আর একটু হলে গাড়ীর তলায় যাচ্ছিল আর কি? আমরা নিজেরাও দুজনে মরতাম সাথে এও।
দেখলাম এক মটর সাইকেল আরোহী খুব জোরে বাইক চালিয়ে একেবারের ট্যাক্সির সামনে চলে এসেছে। ট্যাক্সি ওয়ালা পাশকাটাতে গেলে পাশের লাইটপোষ্টটায় ধাক্কা মারতো। সামনের কাঁচটা গুঁড়িয়ে যেতো। তারপরে কি হত আমি জানি না। ট্যাক্সিওয়ালাকে খুব ভালো বলতে হবে। সময় মত ব্রেক কষে ছেলেটার প্রাণটা বাঁচিয়ে দিয়েছে। সেই সাথে আমারও। নইলে অকালে চলে যেতো প্রাণটা।
 
শুভেন্দুর বাড়ীর খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। ট্যাক্সিওয়ালাকে বললাম, ‘দাদা আপনি আমার খুব উপকার করলেন আজকে। বেঁচে না থাকার মতই বেঁচেছিলাম এতদিন ধরে। যার সাথে দেখা হবে বলে যাচ্ছি। তারজন্যই বাঁচাটা আমার এখন নিতান্তই দরকার।’
[+] 3 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#18
শুভেন্দুদের বাড়ীর সামনের রাস্তাটা বেশ সরু। ওখানে ট্যাক্সি ঢোকে না। এর আগে যেকবারই ট্যাক্সি চড়ে আমি এসেছি, গলির মুখটায়  ট্যাক্সিটা আমাকে ছেড়ে দিতে হত। কিছুটা হেঁটে এগিয়ে গেলে তারপরেই শুভেন্দুদের বিশাল বাড়ী। পিকনিক গার্ডেনে শুভেন্দুরা খুব বড়লোক। নতুন লোক এলে বাড়ী খুঁজে নিতে তার অসুবিধে হবে না। শুভেন্দুদের নাম বললেই সবাই ওই বাড়ী দেখিয়ে দেবে।
 
দুর থেকে ওদের বাড়ীর একতলার বারান্দাটা দেখা যায়। বারান্দায় কেউ দাঁড়িয়ে থাকলে দূর থেকেই সেটা চোখে পড়ে। রাস্তাটায় ঢুকেই আমার মনে হল, শুভেন্দুর বোন মাধুরী দাঁড়িয়ে আছে ওখানে। দূর থেকে ও আমাকে দেখছে।
 
মাধুরীর স্বভাবটা খুব মিষ্টি। একে তো বড়লোকের একমাত্র মেয়ে। শুভেন্দুরা চারভাই। আর ওদের এই একটিই মাত্র আদরের বোন মাধুরী। খুব প্রানখোলা স্বভাবের মেয়ে মাধুরীর সাথে আমারও গল্প করতে খুব ভালো লাগতো। কলেজে পড়ার সময় শুভেন্দুদের বাড়ীতে যতবারই এসেছি, মাধুরীর সঙ্গেও একটা দাদা বোনের মত সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। মাধুরী, রনির সঙ্গে তখন থেকেই প্রেম করতো, কিন্তু শুভেন্দুর সাথে যেহেতু আমার একটা আলাদা খাতির ছিল, আমি এলে মাধুরী জমিয়ে আড্ডা দিত আমার সঙ্গে। ওর ডাক নাম ছিল ছুড়ী। ওকেও আমি ছুড়ী বলে ডাকতাম।
বয়সে শুভেন্দুর থেকে দু’বছরের ছোটো মাধুরী উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর আর পড়াশুনা করেনি। রনির সঙ্গে কয়েকবছর পরেই ওর বিয়ে হয়ে গেল। মাধুরী আর রনির সুন্দর একটা ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। নাম রেখেছে ‘দেবমাল্য’।
 
ওর বাচ্চা হবার পর শুভেন্দু আমাকে বললো, এই ‘দেব’ নামটা আমার খুব পছন্দ।  তোকেও যার জন্য আমার খুব পছন্দ।  মাধুরীর যেহেতু তোকে খুব ভালো লাগে, আমাকে বললো, ‘ছোড়দা, আমার ছেলের নাম, আমি দেব দিয়ে রাখবো।  দেবদার মতন। পরে রনিও রাজী হয়ে গেল। তাই ওর নাম রাখা হলো, ‘দেবমাল্য।’
 
দূর থেকে মাধুরী আমাকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠে বললো, ‘এই যে দেবদা, ছোট্টবোনটাকে ভুলে গেছো বুঝি? ওফ কতদিন তোমায় দেখি না। সেই দুবছর আগে একবার তুমি এসেছিলে। আবার এতদিন পর।’
 
শুভেন্দুর বাড়ীর গেটের সামনে যেতেই মাধুরী হাসতে হাসতে বারান্দা থেকে বেরিয়ে এলো। ওর গালটা টিপে দিয়ে বললাম, ‘ও আমার ছুড়ী রে। দাদাটার কথা বুঝি এতদিন বাদে মনে পড়লো?’
 
মাধুরী বললো, ‘তুমি না কেমন জানি হয়ে গেছো দেবদা। আগে কত আসতে আমাদের বাড়ীতে। এখানে আড্ডা হতো। গান বাজনা হতো। মজা হতো। তা না, সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে, তোমরা সব নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে।  আর আমাকেও তুমি ভুলে গেলে।
 মাধুরীকে বললাম, ‘তোকে আমি ভুলিনিরে ছুড়ী। শুভেন্দু যতবারই ফোন করেছে, তোর কথা জিজ্ঞাসা করেছি। রনিকে জিজ্ঞাসা করে দেখিস, ওকেও জিজ্ঞাসা করেছি তোর কথা। তোদের যখন ছেলে হল, শুভেন্দু আমাকে বললো, মাধুরী ওর ছেলের নাম রেখেছে দেবমাল্য। দেব নামটা ওর খুব পছন্দ। তোকে তো আমাদের বাড়ীর সবাই খুব পছন্দ করতো, তাই না? মাধুরীও বললো, আমি দেব নামটাই রাখবো। রনিও রাজী হয়ে গেল। তাই-
মাধুরী বললো, তুমি খুশি হয়েছো, ‘আমার ছেলের নাম দেবমাল্য রেখেছি বলে?’
আমি বললাম, বারে? খুশি হবো না? আমি তো তখনই খুশি হয়েছি। খুব খুশি হয়েছি।
মাধুরী বললো, ‘তোমার প্রতি আমার কিন্তু একটা ক্ষোভ আছে দেবদা। আমি খুব রেগে আছি তোমার ওপরে।’
ওর গালটা টিপে দিয়ে বললাম, ‘কেন রে ছুড়ী? রাগ কেন?’
মাধুরী বললো, ‘তুমি তখন আমার ছেলেকে দেখতে আসো নি কেন? জানো তোমায় কত এসপেক্ট করেছিলাম। তুমি এলে না। আর আমিও ছোড়দাকে বললাম, কি রে ছোড়দা? দেবদা তো এলো না? তুই কি কিছু জানাসনি নাকি দেবদাকে? ছোড়দা বললো, সব বলেছি। দেব এখন কাজবাজ নিয়ে ব্যস্ত। ওর এখন তোর ছেলেকে দেখতে আসার টাইম নেই।’
মাধুরীকে বললাম, শুভেন্দু এই কথা বলেছে তোকে? দাঁড়া ওকে আসতে দে। তারপর ওর মজা দেখাচ্ছি। মিথ্যে কথা বলা বের করছি।
মাধুরী মুখটা একটু করুন মত করে, ছেলেমানুষির মত করছিল। বার বার ঘাড় নেড়ে বলতে লাগল, ‘না, না, বলো, তুমি আসোনি কেন?’
মাধুরীকে বললাম, ‘দূর বোকা। আমি তখন ছিলাম না কি কলকাতায়? কোম্পানীর কাজে আমি তখন হায়দ্রাবাদে। একমাস মত ওখানে ছিলাম। কলকাতায় ফিরেই চলে গেলাম, সিঙ্গাপুরে। কোম্পানীর তরফ থেকে ট্রিপ। ফিরে এসেই আবার অসুস্থ হয়ে পড়লাম। একমাস মত বিছানায় শয্যাশায়ী। কাজকর্ম সব ডকে। এমন একটা রোগ বাঁধিয়ে ফেলেছি, ডাক্তার বললো, সাবধানে থাকুন। বাইরের খাবার একদম খাবেন না। আর মিষ্টি খাওয়া তো একদম বন্ধ।’
মাধুরী বললো, ‘কি যেন রোগটা হয়েছিল তোমার?’
আমি বললাম, ‘আলসার কোলাইটিস।’
মাধুরী শুনে বললো, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ শুনেছি। ও তো খুব কঠিন রোগ। ভীষন কষ্ট দেয়। পেটে ব্যাথা করে। রক্ত পড়ে। আমাশার মতন।’
মাধুরীকে বললাম, ‘হ্যাঁ, তারপর থেকেই মিষ্টি খাওয়া একেবারে বন্ধ। মিল্ক প্রোডাক্ট থেকেই না কি রোগটা হয়।’
মাধুরী বললো,তুমি তো আগে খুব মিষ্টি খেতে ভালবাসতে দেবদা। সব বন্ধ হয়ে গেল। তাই না?
আমি বললাম, হ্যাঁ।
মাধুরী বললো, ‘এ তোমার ভারী অন্যায় দেবদা। মাসীমাকে শুধু শুধু কষ্ট দিচ্ছো। বিয়ে থা তো এবার করো। আর কতদিন একা একা  থাকবে? তোমাকে দেখার জন্যও তো কাউকে দরকার?
তরপর নিজেই বললো, অবশ্য এখনকার মেয়েদের মধ্যে ভালো মেয়ে খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর। মেয়েরা এখন স্বামীদের কেউ দেখে না।
ওকে বললাম, ‘কেন? তুই মেয়ে দেখেছিস আমার জন্য?’
মাধুরী হেসে ফেললো, আমাকে বললো, ‘আমি যদি মেয়ে দেখি। সে মেয়ে তোমার পছন্দ হবে? সবাই তো আর বিদিশার মত সুন্দরী নয়।’
 এই বিদিশা নামটা আমার জীবনের সাথে এমন ভাবে জড়িত। শুধু আমি কেন? অনেকেই ওকে ভুলতে পারেনি। মাধুরীর মুখ দিয়ে বিদিশা নামটা শুনেই আমার বুকের ভেতরটা কেমন ছটফটানি শুরু হয়ে গেল। ওকে বললাম, ‘হ্যাঁ রে ছুড়ী, তুই কি কিছু জানিস? আমাকে সত্যি করে বলতো?
মাধুরী বললো, ‘কি জানবো? কি বলবো?
ওকে বললাম, ‘আজ এখানে নাকি কারুর আসার কথা আছে। কোনো একটা মেয়ে। শুভেন্দু আর রনি তো সেই কথাটাই বলেছে আমাকে।’
মাধুরী শুনে এমন ভাব করলো, যেন ও কিছুই জানে না। আমাকে বললো, ‘কই সেরকম তো আমি কিছু শুনিনি।’
আমি অবাক হলাম। মনে মনে ভাবলাম, তাহলে কি শুভেন্দু আর রনি, মাধুরীকেও ব্যাপারটা বলেনি? না ও সব জানে, রনি আর শুভেন্দুর মত মাধুরীও আমাকে গোপণ করছে।
মাধুরীকে বললাম, ‘কই তোর কত্তা কোথায়? ওকে ডাক দেখি একবার। দেখি জিজ্ঞাসা করে।’
মাধুরী বললো, ‘সে তো একটু আগেই বেরুলো তোমার জন্য।’
রনি আমার জন্য কোথায় গেছে? একটু অবাকই হলাম, ওকে বললাম, ‘কেন রে? আমার জন্য তোর কত্তা বেরিয়েছে? কোথায় গেছে?’
মাধুরী বললো, ‘গেছে হয়তো কিছু কিনতে টিনতে। দুপুর বেলা তো এক পেট ভাত খেয়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছিল। তুমি ফোনটা করলে। অমনি বাবু তড়াক করে জেগে উঠলেন। আমাকে বললো, তুমি বারান্দাতে দাঁড়িয়ে থাকো। ‘দেব’ আসছে। আমি ততক্ষণ দোকানটা থেকে চট করে ঘুরে আসছি।
বুঝে নিলাম, রনি কোথায় গেছে। মাল খাওয়ার নেশাটা রনির প্রচুর। তারপরেই আবার ভাবলাম, বিদিশা যদি সত্যি আসে, ওর সামনে এসব খাওয়াটা কি ঠিক হবে?
মাধুরী ভেতরে গিয়ে ওর বাচ্চাটাকে কোলে করে নিয়ে এলো। আমার সামনে আসতেই খেয়াল হল। ইস তাড়াহুড়োতে ওর জন্য কিছু কিনে আনা হয় নি। পকেট থেকে টাকা বার করতে যাচ্ছিলাম। মাধুরী বললো, ‘তুমি ওর মাথায় হাতটা রেখে আশীর্ব্বাদ করোতো। তাহলেই হবে। টাকা হাতে পেলে এক্ষুনি ওটাকে ছিঁড়ে দেবে। যা দুষ্টু।’
বাচ্চাটাকে দুহাত বাড়িয়ে কাছে ডাকছিলাম। ও ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে দেখছিল, কিন্তু কিছুতেই আসছিল না। মাধুরী ওকে বললো, ‘এটা কে বলোতো? এটা হলো তোমার কাকু।’ যাও কাকু ডাকছে যাও।’
আমি দুহাত বাড়িয়ে মাধুরীকে বললাম, ‘কাকু কি রে? বল, আমি ওর মামা হই।  মাধুরী বললো, হ্যাঁ এটা হলো তোমার দেব মামা। যাও মামার কাছে যাও।’
বাচ্চাটা এবার আমার কাছে চলে এলো। মাধুরী ওকে বললো, ‘মামা কিন্তু খুব ভালো গান জানে। তুমি মামার কাছে গান শিখবে?
বাচ্চাটা ঘাড় নাড়লো। দাঁত বার করে হেসে বললো, হাঁ।
মাধুরী বললো, দেবদা, তুমি বসো, আমি তোমার জন্য চা করে নিয়ে আসছি। ততক্ষনে রনিও এসে পড়বে।
আমি মাধুরীকে বললাম, শুভেন্দু কখন আসবে? আমাকে তো বললো, আধ ঘন্টার মধ্যে ঢুকছে।
[+] 1 user Likes Lekhak is back's post
Like Reply
#19
মাধুরী বললো, ‘ছোড়দা যদি তোমাকে আধঘন্টা বলে থাকে, তাহলে ধরে নাও ওটা একঘন্টা। ওর সব কিছুতেই লেট। আজও অবধি কোনদিন টাইম মত কিছু করেনি। তারপর হেসে বললো, দেখছো না বিয়েটাও করছে না এখনো। এখনো নাকি ওর বিয়ে করার টাইম হয় নি।’
আমি বললাম, শুভেন্দু তো বলেছে, ‘বিয়ে আর করবে না এ জীবনে।’
মাধুরী হেসে বললো, ‘ওর মত তুমিও সেই ভুলটা আর কোরো না।। বিয়ে যদি না করো। সারাজীবনের মত পস্তাতে হবে, এই আমি বলে দিচ্ছি।’
বলেই ও ভেতরে চলে গেল। আমি বসার ঘরটায় বসে একটা ম্যাগাজিন উল্টে পাল্টে দেখতে লাগলাম। মনে হল, সকালে ডায়েরীতে শুভেন্দুর ব্যাপারে অনেক কথাই লিখেছি, কিন্তু এই কথাটা একবারও লেখা হয় নি। শুভেন্দুর সব কিছুতেই লেট।’
 
বিদিশা কদিন ধরেই আমাকে বলছে, ‘জানো তো দারুন একটা ছবি রিলিজ করছে আগামী শুক্রবার। ছবির নাম ‘তেজাব।’ ওতে অনিল কাপুর আর মাধুরী দিক্ষিত আছে।’
আমি বললাম, তো?
বিদিশা বললো, তো মানে? দেখতে যাবো না? ওদিন পুরো একটা গ্রুপ যাবে।
আমি বললাম, কে কে?
বিদিশা বললো, তুমি আর আমি। সাথে শুক্লা আর সৌগত। আর রনি আর মাধুরীও থাকবে আমাদের সঙ্গে।
আমি বললাম, আর শুভেন্দু? ও তো না গেলে খেয়ে ফেলবে আমাদের।
বিদিশা বললো, ‘শুভেন্দুই তো দায়িত্ব নিয়েছে  সবার টিকিট কাটার। লাইন দিয়ে ও আগে টিকিটটা কাটবে। ও থাকবে না মানে? ও তো থাকছেই।’
বিদিশার কথা শুনে আমিও খুশি হলাম। বললাম, ‘তাহলে ঠিক আছে। সবাই মিলে যাবো। বেশ আনন্দ হবে।’
শুভেন্দু লাইন দিয়ে আমাদের জন্য আগে থেকে টিকিট কাটলো কষ্ট করে। কলেজে এসে বললো, ‘উফ কি মারপিট হচ্ছে রে লাইনে। বই একেবারে সুপারহিট।’
মোট সাতখানা টিকিট যথারীতি ওর কাছেই রেখে দিল। যেদিন আমরা সিনেমাটা দেখতে যাব। শুভেন্দুর আর পাত্তা নেই। এদিকে মাধুরীও চলে এসেছে বাড়ী থেকে। রনি এসে বললো, ও আমাকে বললো, তোরা হলের কাছে গিয়ে দাঁড়া। আমি দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছোচ্ছি। আমরা ছজনে ধর্মতলায় প্যারাডাইস সিনেমা হলে পৌঁছে গেলাম । দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবাই ঘড়ি দেখছি। এদিকে শুভেন্দুর আর পাত্তা নেই। তিনটের ম্যাটিনির শো চালু হয়ে গেল। সৌগত, রনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত কামড়াচ্ছে। আমিও তাই। বাবু এলেন ঠিক তার আধঘন্টা পরে। তখন বইটার অনেকগুলো সীন হয়ে গেছে। সৌগত শুভেন্দুকে বললো, হ্যাঁ রে তুই কি? এতো দেরী করে এলি? এই তোর দশ মিনিট?
শুভেন্দু হেসে বললো, ‘আমি টাইমলিই আসছিলাম। বাড়ী থেকে কিছুটা রাস্তা চলে আসার পর দেখি। টিকিটগুলোই সব ঘরের ড্রয়ারে ফেলে রেখে চলে এসেছি। আবার বাড়ী যেতে হলো। তাই দেরী হয়ে গেল।’ বলেই দাঁত বার করে আবার কেলাতে লাগলো। হি হি।
 মাধুরী চা নিয়ে এসে ঢুকেছে ঘরে, ঠিক তখুনি রনিও এসে হাজির। দেখলাম, ওর দুহাতে দুদুটো প্যাকেট। আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এসে গেছিস বস? বোস তাহলে, আমি একটু ভেতর থেকে আসছি।’
রনি মাধুরীকে সামনে পেয়ে কি মনে করে মাধুরীর হাতেই প্যাকেট দুটো দিয়ে দিলো। বললো, ‘তুমি এই প্যাকেট দুটো ভেতরে রেখে আসো তো। আমি আর যাবো না ভেতরে।’
মাধুরী বললো, কি এগুলো?
রনি বললো, ‘আছে কিছু। তবে এটা আমাকে নয়। তোমার ছোড়দাকে জিজ্ঞেস কোরো।’
মাধুরী একটু মুখ ভেংচি কাটলো। রনিকে বললো, ‘আহা। আমার কর্তাটিও যেন কম যান না। খালি ছোড়দাকে দোষ দিলে হবে? কমপিটিশন করতে আপনিও তো মাষ্টার।’
মাধুরী ভেতরে চলে গেল। রনি আমার সামনের সোফাটায় বসলো। আমাকে হেসে বললো, ‘বউটা আমার খুব ভালো। জানিস তো দেব। নইলে আমার মত ছাগলটাকে ভালোবেসে ফেললো। মাধুরীর অনেক গুন আছে। ঠিক কিনা বল?’
আমি রনিকে বললাম, তুই এখনো মাল খাওয়া চালিয়ে যাচ্ছিস?
রনি বললো, ‘শোন, তোর কথা ভেবে আমি একটা শায়েরী লিখেছি। বলেই শায়েরীটা শোনাতে লাগলো,
 
পি হ্যায় শরাব, হর গলি কি দুকান সে,
দোস্তি সি হো গয়ী হর শরাব কে জাম সে।
গুজরে হ্যায় হাম কুছ অ্যায়সী মুকাম সে,
কি আঁখে ভর আতী হ্যায় মহব্বত কে নাম সে।
 
রনির চোখের দিকে তাকালাম, হেসে বললাম, ‘তোর কি শালা আমার মত এত দূঃখ নাকি। যে দূঃখে তুই মদ খাবি।?’
রনি বললো, আমি তো দূঃখে মদ খাই না। আনন্দ করেই খাই। তবে তোর জন্য কি আমাদের দূঃখ হয় না। এই তো শুভেন্দু। তোকে এত জ্ঞান মারে, উপদেশ দেয়, শালা তোর দূঃখে একদিন কেঁদেই ফেললো।
আমি বললাম, সেকীরে তাই নাকি?
রনি বললো, হ্যাঁ সেকী কান্না। তুই যদি একবার দেখতিস।
আমি বললাম, তাহলে মনে হয় একটু বেশী নেশা হয়ে গেছিলো।
রনি বললো, ‘তা ঠিক। তবে ও তোকে খুব ভালোবাসে, জানিস তো দেব? এখনো বলে, বন্ধুদের মধ্যে তোর পরে দেবই আমার খুব কাছের ছিলো। সেই যে কলেজের পর ঘটনা ঘটে গেল। তারপর ও নিজেকে কেমন গুটিয়ে নিল। শালা হারামী মিনু। শয়তান, মাগীর বাচ্চা। ঢ্যামনা মাগী। বিদিশাকে পুরো চটিয়ে দিলো।’
রনি এমন গালাগাল দিতে শুরু করেছে। মাধুরী ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ওকে বললো, কি হচ্ছেটা কি? কাকে গালাগাল দিচ্ছো এভাবে?
 রনি বললো, ‘জানো না? ওই শয়তান মিনু ঢেমনিটাকে। ওই তো দেব আর বিদিশার প্রেমটাকে বরবাদ করে ছাড়লো। ইস কি সুন্দর ছিলো সেই সময়টা। আমরা সবাই মিলে ঘুরতাম, ফিরতাম। তা না আপদটা এসে জুটে বসলো। আর দেবের জীবনটাকে নষ্ট করে দিলো।’
মাধুরী সবই জানে। বললো, ‘ছাড়ো না ওসব পুরোনো কথা। এখন দেবদার কি করা যায় সেটা আগে বলো। আমি কি মেয়ে দেখবো নাকি একটা দেবদার জন্য?’
রনি জোর করে পাশে বসালো মাধুরীকে। ওর গাল টিপে দিয়ে বললো, ‘তাই? তুমিও দেখবে? কিন্তু আজ যে আসছে, তাকে দেখলে, দেবের তো কাউকে আর পছন্দ হবে না।’
মাধুরী কিছুই জানে না। রনি কে বললো, ‘কে আসছে গো?’
রনি বললো, ‘ওটা এখন বলা যাবে না। ক্রমশ প্রকাশ্য।’
মাধুরী বললো, ঢং রাখো দেখি। কি হবে বললে?
রনি বললো, ‘শুভেন্দু আমাকে মানা করেছে। বললে আস্তো রাখবে না। দেবকে তো বলা যাবে না। তোমাকেও নয়।’
মাধুরী বললো, ‘আহা ন্যাকা। কি হবে বললে? আমার ছোড়দাটাও যেমন, আর তুমিও তেমন।’
কানটা রনির মুখের দিকে বাড়িয়ে মাধুরী বললো, ঠিক আছে আমার কানে কানে বলো। দেবদা শুনতে পাবে না।
রনি বললো, ‘না তোমার পেট খুব পাতলা। তুমি ঠিক বলে দেবে দেব কে । আর সব মাটি হয়ে যাবে আজকে।’
মাধুরী রেগে মেগে বললো, ‘ঠিক আছে যাও। বলতে হবে না। কে না কে খেদী পেঁচী আসবে। তারজন্য সব নখরা হচ্ছে।’
 
আমি ওদের দুজনের রকমটা দেখছিলাম। রনিকে বললাম, আমি সব জানি। কে আসবে তাও জানি। শুধু মজাটা দেখছি। শেষ পর্যন্ত কি হয়।
বলতে বলতে শুভেন্দুও ঠিক তখন এসে ঢুকলো। ঘরে ঢুকে বললো, ‘দেখলি তো। ঠিক টাইম মত এসেছি। আজ আর দেরী করিনি।’
মাধুরীকে বললো, ‘এই ছুড়ী, এই প্যাকেটটা ভেতরে রেখে দিয়ে আয়।’
দেখলাম শুভেন্দুর হাতেও একটা প্যাকেট। রনির মত ও কিছু কিনে নিয়ে এসেছে। মাধুরী বললো, ‘এটা কি আছে রে ছোড়দা?’
শুভেন্দু বললো, ‘ওর মধ্যে একটা গিফ্ট আছে। একজনকে দেবো। সে আসছে।’
মাধুরী অবাক হয়ে তাকালো শুভেন্দুর দিকে। ওকে বললো, ‘কে আসছে? কাকে গিফ্ট দিবি?’
শুভেন্দু বললো, ‘আমাদের সবার তরফ থেকে এই গিফ্ট। আর কে আসছে? এখুনি তাকে দেখতে পাবি। একটু অপেক্ষা কর।’
মাধুরী যথারীতি ওই প্যাকেটটা নিয়েও ভেতরে চলে গেল। আমি বুঝলাম, বিদিশার জন্য আজ অনেক কিছু অপেক্ষা করছে এখানে। কলেজে দিনগুলো তো আর ভোলার নয়। আমার বন্ধুরা সব, আমার মতন। বিদিশাকে কেউ ওরা ভোলেনি। সামান্য একটা ভুলের খেসারতে বিদিশা সেদিন আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। বিদিশার সেদিনের সেই আচরণে সবাই একটু দূঃখ পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু আজ এতদিন পরে সবাই যেন একটু নড়ে চড়ে বসেছে। বিদিশা, আসবে বলে শুভেন্দু আর রনি বেশ এক্সসাইটেড হয়ে গেছে । ঠিক যেনো আমারই মতন।
[+] 2 users Like Lekhak is back's post
Like Reply
#20
আমার সামনে বসেই শুভেন্দু আমাকে বললো, কি ভাবছিস?
আমি বললাম, কই কিছু না তো?
কলেজে যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে শুভেন্দু হাসতো, ওর চেনা হাসিটাকে দেখে বুঝতে পারলাম, আমার মনের ভাবটা বোঝার চেষ্টা করছে। বিদিশাকে দেখলে, আমি হয়তো আত্মহারার মতন হয়ে উঠবো। মনের মধ্যে যে আলোড়নের সৃষ্টি হচ্ছে। সেটা সেভাবে প্রকাশ করতে পারছি না। আনন্দটা চেপে রেখেই বললাম, তোর সারপ্রাইজের জন্যই তো আমি এসেছি। এবার বল, কি তোর সারপ্রাইজ?
শুভেন্দু বললো, আমি যে সারপ্রাইজটা তোকে দেবো, নিতে পারবি তো? পাগল হয়ে যাবি না?
রনি শুভেন্দুর মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিল। আমি বললাম, আগে তো শুনি, দেখি। তারপরে দেখা যাবে, পাগল হই কিনা?
একটু রসিকতা করে শুভেন্দু রনিকে বললো, ‘দেব মনে হচ্ছে, আজ আর বাড়ী ফিরতে পারবে না। ওকে সারারাত এখানেই থাকতে হবে।’
আমাকে বললো, ‘তুই এক কাজ কর। মাসীমাকে ফোন করে বলেদে, আজ আমি শুভেন্দুদের বাড়ীতেই থেকে যাচ্ছি। সুতরাং তুমি শুধু শুধু আমাকে নিয়ে চিন্তা কোরো না।’
আমি বললাম, আগে সারপ্রাইজটা তো বল। তারপরে মা’কে ফোন করছি।
শুভেন্দু, রনি দুজনেই হাসতে লাগলো। আমাকে রনি বললো, ‘ভাবছিস কি সারপ্রাইজ তোর জন্য ওয়েট করছে। তাই না?’
আমি ওদের দুজনকেই হেসে বললাম, সেটা তোরা দুজনেই জানিস। তবে আমিও জানি কিছুটা। তবে এখন সেটা বলবো না।
শুভেন্দু বললো, কি জানিস? কে বলেছে তোকে?
পাছে ওরা কিছু জেনে যায় আমি বললাম, কেউ বলেনি আমাকে। আমি এমনি বলছি।
পকেটে মোবাইলটা ছিল, হঠাৎই দেখি শুক্লা ফোন করেছে আমাকে। খেয়াল হল, শুক্লাকে বলেছিলাম, ফোন করে ওকে জানাবো। ঘর থেকে যখন বেরিয়ে এসেছি, ওকে আর জানানো হয় নি। শুভেন্দুর আর রনির সামনেই শুক্লার ফোনটা রিসিভ করলাম।
ওরা দুজনে বলে উঠলো, কে রে?
আমি বললাম, শুক্লা।
শুক্লা বেশ রেগে রয়েছে আমার ওপরে। আমাকে বললো, কি রে দেব? তুই ফোন করলি না তো? আসছিস তো তাহলে?
শুভেন্দু আর রনি দুজনেই বেশ কৌতূহল চোখে তাকাচ্ছে আমার দিকে। আমি শুক্লাকে বললাম, ‘এই তো শুভেন্দুর বাড়ী এসেছি। তোকেও ফোন করতে ভুলে গেছি।  শুক্লা, সরি।
শুক্লা একটু আপসেট হল, আমাকে বললো, এ মা, তুই শুভেন্দুর বাড়ীতে চলে গেছিস? তা আমাকে বলবি তো?
বুঝতেই পারছিলাম, যেন খুব আশা করেছিল ব্যাচারা। ওকে বললাম, ‘শুভেন্দু আমার সামনেই আছে। কথা বলবি? রনিও আছে। নে কথা বল।’
শুভেন্দু এগিয়ে এসে, নিজে থেকেই আমার হাত থেকে ফোনটা নিলো। শুক্লাকে বললো, হায়, সুইট হার্ট! কেমন আছো তুমি?
আমি শুনতে পাচ্ছিনা শুক্লার কথা। বোধহয় ওকে বলেছে, আমার কথা তাহলে তোর মনে পড়লো?
 শুভেন্দু বললো, ‘কি করবো বলো? আমি তো তোমার গলায় তখনি মালা দিতে চেয়েছিলাম। দেব বারণ না করলে কি আর শুনতাম? সবই রেডী ছিল, মালা, ফুল, তোমার জন্য আমার উপহার। তুমি আমার দিকে ফিরেও তাকালে না। সৌগতর দিকেই ভীড়ে গেলে। ভগবান আমাকে সারাজীবন নিঃসঙ্গ করে রাখলো।
শুক্লা ওকে কিছু বলতে চাইছিল, শুভেন্দু ওকে বাঁধা দিয়ে বললো, আরে রাখ, রাখ, ও তো আমি এমনি রসিকতা করছি। জানিস তো ভালো একটা খবর আছে।
শুক্লা বললো, কি খবর?
দেব একটা বড়সড় পার্টী দিচ্ছে আমাদের জন্য। সেই কলেজে মাঝে মাঝে যেমন দিতো।
শুক্লা বললো, পার্টী? কি খুশিতে?
শুভেন্দু বললো, ওটা এখুনি বলা যাবে না। তাহলে দেবকে সারপ্রাইজটা আর দেওয়া যাবে না।
শুক্লা কি একটা বলতে গেলো। শুভেন্দুর মুখটা শুকনো মতন হয়ে গেল। আমাকে বললো, ‘এ আবার কি হল রে? এ যে দেখি উল্টো কথা বলছে।’
সকালে শুক্লা এসেছিল, আমার বাড়ীতে। বিদিশার কথা ওই আমাকে বলেছে। শুক্লা চায় না আমি বিদিশার সাথে আবার দেখা করি। মুখ খানা ফ্যাকাসে মতন হয়ে গেলে মানুষ যেমন কোনো তালগোল খুঁজে পায় না। শুভেন্দু সেভাবেই বললো, ‘আমি তো শুক্লার কিছু তাল খুঁজে পাচ্ছি না। তবে কী?-
 
মনে হল, ভালোবাসা উজাড় করে একদিন নিজেকে নিঃশ্বেস করে দিয়েছিলাম এই বিদিশারই জন্য। দূর আকাশের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ভাবতাম, আমার জীবনে বিদিশার উদয় হয়তো আর কোনদিন হবে না। ভালোবাসার কাঙালপনা করেও অজান্তেই আমি নিজের বলি দিয়েছি। নিজের খুশিকে বিসর্জন দিয়েছি। যখন এতদিন পরে আমি আবার বাঁচার একটা তাগিদ খুঁজে পাচ্ছি, তখন শুক্লা যেন ওই মিনুর মতই আমার স্বপ্নগুলোকে ছিন্ন ভিন্ন করে দিতে চাইছে। কেন সেটা হবে কেন? আমার জীবনে অতীতেই হোক, আর বর্তমানেই হোক, বা আগামীদিনেও হোক। বিদিশা ছাড়া আমার জীবনে কোনদিন কোনো নারী ছিল না, নেই, আর কোনদিন থাকবেও না। আমার জীবনটাই যে এরকম।
শুক্লার সাথে কথা বলে ফোনটা ছেড়ে দেবার পর কেমন থম মেরে গেলো শুভেন্দু।  মুখে ওর হাসিটা নেই। চোখের কোনে চিন্তার ভাঁজ। আমাকে শুধু মুখে বললো, স্ট্রেঞ্জ, ভাড়ী অদ্ভূত তো-
আমি বললাম, এত গম্ভীর হয়ে গেলি। কি হয়েছে বলবি তো? শুক্লা কিছু বলেছে তোকে?
শুভেন্দু বললো, দেখ, ‘দেব’ প্রেম আমি জীবনে করিনি। বিয়েও হয়তো করবো না। কিন্তু এই মিয়া যখন কারুর সাথে কথা বলে, বুঝে নিতে তার অসুবিধা হয় না। আমি তো আর অবুঝ বা ছেলেমানুষ নই?
 
শুভেন্দুকে বললাম, কি হয়েছে বলবি তো?
শুভেন্দু বললো, যে কিনা কলেজে থাকতে থাকতে একটা প্রেম করলো। তাকে বিয়ে করলই না। সে আবার অন্য একজনকে বিয়ে করলো। সেই মেয়ের এখনো বাসনা জেগে রয়েছে তোর প্রতি? এটা শুনেও কি তোর বিশ্বাস হচ্ছে না?
 শুভেন্দুর কথাটা শুনে এবার আমিও থম মেরে গেলাম। সকালে শুক্লা আমার বাড়ী এসেছিল, আমাকে ওর বাড়ীতে যেতেও ইনভাইট করে গেছে। কিন্তু তা বলে প্রেম ভালোবাসার কথা এখানে আসবে কেন? শুক্লা তো আমাকে কোনদিন ভালোবাসেনি। আমাকে তো কোনদিন এভাবে কামনা করেনি। আমাকে জয় করার কোনো স্বপ্নই সে দেখায়নি। আমি বিদিশাকে ভালোবেসেছিলাম, তার দিকেই শুধু হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। হঠাৎ আমাকে বাড়ীতে ডাকার জন্য শুক্লার মনে এত উদ্বেগকূল। এটা কি প্রেম না দেহগত বাসনা?
নিজেকে একটু হাল্কা করার চেষ্টা করলাম। শুভেন্দুকে তাও বললাম, না না শুক্লা এরকম মেয়েই নয়। হয়তো তোর বোঝার ভুল হয়েছে, কিংবা শোনার ভুল।
রনি পাশে বসেছিল চুপ করে। এবার ফোড়ণ কেটে বললো, ‘দেব’ শেষকালে শুক্লাও তোর প্রেমে পড়লো। ব্যাচারা বিদিশার কি হবে রে?
বলেই জিভ কেটে ফেললো রনি। তারপরেই বললো, এই যাঃ। ভুল হয়ে গেছে। হাঁটে হাঁড়ি ফাঁস হয়ে গেছে। যাঃ বলে দিলাম যে।
শুভেন্দু রনিকে বললো, ‘তুই না বললে, আমি তো বলতামই। এবারে দেবকে তাহলে আসল কথাটা বলি।’
বুঝতেই পারছি, শুভেন্দু এবার সারপ্রাইজের উন্মোচন করছে আমার কাছে। আমাকে বললো, শোন, দেব। শুক্লা তোকে কি বলেছে আমি জানি না। তবে গত পরশুই আমার বিদিশার সাথে দেখা হয়েছে। একটা চেনা মেয়েকে এতদিন বাদে দেখলাম, আমার তো বুঝে নিতে কখনো অসুবিধা হয় না। যে বিদিশাকে আমি দেখেছিলাম, সেই বিদিশা এখন আর নেই।
আমি শুভেন্দুর মুখের দিকে কৌতূহলের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। মনে অনেক প্রশ্ন জাগছে, ভাবছি বলবো কিনা। বিদিশা কেমন আছে? আমার কথা কিছু জিজ্ঞাসা করছিল? ও কি আগের মতই ভালোবাসে আমাকে? তাও চুপ করে রইলাম। দেখছিলাম, শুভেন্দু নিজে থেকে কিছু বলে কিনা?
শুভেন্দু আমাকে অবাক করে বললো, শেষ খেলাটা জিততে একটু শক্তি দেখাতে পারবি না? বিদিশার জন্য এটুকু তো তোকে করতেই হবে।
বিদিশাকে পাওয়ার জন্য যদি কোনো শক্তি দেখাতে হয়, নিশ্চই আমি দেখাবো। সেই অদম্য জেদটা নিয়েই তো আজ এখানে এসেছি। তবু বললাম, কি শক্তি দেখাতে হবে বল? বিদিশাকে তো কারুর হাত থেকে ছিনিয়ে আনার প্রশ্ন নেই। ও তো-
শুভেন্দু বললো, বিদিশা এখন ডিভোর্সী। তাই তো?
আমি বললাম, হ্যাঁ, শুক্লা তো আমাকে সেকথাই বলেছে, ওর স্বামীর সঙ্গে নাকি ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।  ও এখন কলকাতায় এসে রয়েছে। বাবা মায়ের কাছে থাকে। আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছে, শুক্লা তাই তো বললো ।
শুভেন্দু বললো, তোর জন্য আমার খুব কষ্ট লাগে, জানিস তো দেব। আমি বিদিশাকে বলেছি, কেন শুধু শুধু তুই দেবকে দোষী করলি? মিনুর সাথে দেবকি সেদিন কোনো নোংরামী করতেই গেছিল? নিজের কাছের লোকটাকে বিশ্বাস করতে পারলি না? মিনুর দোষটা তুই দেবের ঘাড়েই চাপালি? এতে কার ভালো হল? তোর না দেবের?
শুভেন্দুকে জিজ্ঞাসা করলাম, তোর সাথে বিদিশার কোথায় দেখা হয়েছিল?
শুভেন্দু বললো, গড়িয়াহাট মোড়ে।
খেয়াল হল, শুক্লাও তাই বলেছে। বিদিশার সঙ্গে শুক্লারও গড়িয়াহাট মোড়েই দেখা হয়েছে।
[+] 4 users Like Lekhak is back's post
Like Reply




Users browsing this thread: 1 Guest(s)