5 hours ago
নাজমা আন্টির অবস্থা দেখে জ্বরটা মাপার ব্যবস্থা করলাম। ওষুধের বাক্সে একটা থার্মোমিটার পাওয়া গেল। তাপমাত্রা দেখে বুঝলাম, তাঁর জ্বর আছে। তবে শুধু জ্বরই নয়, তাঁর মুখের ক্লান্তি, শরীরের দুর্বলতা আর অল্প হাঁটাচলাতেই হাঁপিয়ে যাওয়ার ভঙ্গিটা আমাকে ভাবিয়ে তুলল।
— আন্টি, আপনার কি আগে থেকেই শরীর খারাপ যাচ্ছিল?
তিনি সোফার পিঠে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। আমার প্রশ্ন শুনে চোখ খুললেন।
— শরীর খারাপ বলতে... অনেক দিন ধরেই একটু দুর্বল লাগে। সকালে ঘুম থেকে উঠেও মনে হয়, রাতভর যেন বিশ্রাম হয়নি। কখনো মাথা ঘোরে, কখনো বুকটা ধড়ফড় করে। কিন্তু এসব নিয়ে আর কত ভাবব বলো?
— ডাক্তার দেখিয়েছেন?
— হ্যাঁ, কিছুদিন আগে দেখিয়েছিলাম। রক্ত পরীক্ষা করাতে বলেছিলেন। তখনই বলেছিলেন, আমার আয়রন নাকি বেশ কম। কিছু ওষুধও দিয়েছিলেন।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
— তাহলে ওষুধ খাচ্ছেন না কেন?
তিনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসলেন।
— খাই বাবা। তবে সব সময় নিয়ম করে খাওয়া হয় না। কখনো ভুলে যাই, কখনো খালি পেটে খেতে বলে অথচ সময়মতো খাওয়াই হয় না। আবার কখনো মিলির কোনো কাজ থাকে, সেটা করতে গিয়ে নিজের কথাই ভুলে যাই।
কথাগুলো বলার সময় তাঁর মুখে এমন একটা স্বাভাবিক ভঙ্গি ছিল, যেন নিজের অবহেলার কথা স্বীকার করেও সেটাকে খুব বড় কোনো বিষয় বলে মনে করছেন না।
আমি বললাম,
— কিন্তু এটা তো অবহেলা করার মতো বিষয় নয়। আয়রনের ঘাটতিতে শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে, মাথা ঘুরতে পারে, বুক ধড়ফড় করতে পারে। আপনার এই দুর্বলতার কারণটা চিকিৎসককে আবার দেখিয়ে নিশ্চিত হওয়া দরকার।
আন্টি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— তুমি তো দেখি বেশ ডাক্তার হয়ে গেছ!
— ডাক্তার হইনি। কিন্তু আপনার শরীর খারাপ হলে চিন্তা তো হবেই।
তিনি আর কথা বাড়ালেন না। শুধু মাথাটা সোফার পিঠে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করলেন।
আমি লক্ষ করলাম, অসুস্থতার মধ্যেও তাঁর নিজের ওপর নির্ভরশীল থাকার একটা প্রবণতা আছে। কাউকে ডেকে সাহায্য চাওয়ার চেয়ে নিজে নিজে সব সামলে নেওয়াটাই যেন তাঁর অভ্যাস। অথচ মানুষ যতই শক্ত হোক, শরীরের একটা সীমা আছে। সেই সীমা পেরিয়ে গেলে ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সব সময় তাকে সামলানো যায় না।
নাজমা আন্টির ক্ষেত্রেও বোধ হয় সেটাই হয়েছে।
রান্নাঘরে ঢুকে দেখলাম, দুপুরের পর থেকে তেমন কিছু রান্না করা হয়নি। ফ্রিজে কিছু সবজি, মুরগির মাংস আর কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ছিল। মনে হলো, এই অবস্থায় তাঁকে ভারী কিছু খেতে দেওয়ার চেয়ে হালকা কিছু তৈরি করাই ভালো হবে।
আমি রান্নাঘর থেকে জিজ্ঞেস করলাম,
— আন্টি, স্যুপ খেতে পারবেন?
তিনি বসার ঘর থেকে বললেন,
— তুমি আবার স্যুপ বানাতে পারো নাকি?
— চেষ্টা করে দেখতে পারি। খারাপ হলে কিন্তু দোষ দিতে পারবেন না।
— আচ্ছা, দেখি তোমার রান্নার প্রতিভা কতটুকু!
কণ্ঠে ক্লান্তি থাকলেও রসিকতার সুরটা ফিরে এসেছিল।
আমি চুলায় হাঁড়ি বসালাম। সামান্য তেল, পেঁয়াজ, আদা, কাটা সবজি আর মুরগির মাংস দিয়ে ধীরে ধীরে স্যুপ তৈরি করতে লাগলাম। রান্নাঘরের জানালায় বৃষ্টির পানি এসে লাগছিল। মাঝেমধ্যে বাতাসের ঝাপটায় জানালাটা কেঁপে উঠছিল। দূরে কোথাও বজ্রপাতের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
রান্না করতে করতে বসার ঘরের দিকে তাকালাম।
নাজমা আন্টি চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। শালটা কাঁধের ওপর টেনে নিয়েছেন। ঘরের মৃদু আলোয় তাঁর মুখের ক্লান্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাধারণত তাঁকে দেখলে মনে হয়, নিজের সংসারের প্রতিটি ব্যাপারে তাঁর পরিষ্কার ধারণা আছে। কথা বলেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, কোনো সমস্যা হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেদিন সেই দৃঢ়তার আড়ালে একটা ক্লান্ত মানুষকে দেখতে পাচ্ছিলাম।
তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সময়ের সঙ্গে একজন নারীর সৌন্দর্য শুধু বদলায় না, তার প্রকাশও বদলে যায়। যৌবনের চঞ্চলতার জায়গায় আসে স্থিরতা, চোখের দৃষ্টিতে জমা হয় অভিজ্ঞতা, আর হাসির মধ্যে মিশে থাকে এমন কিছু না-বলা কথা, যার অর্থ বুঝতে হলে শুধু তাকিয়ে থাকলেই হয় না—মানুষটাকে চিনতেও হয়।
নাজমা আন্টির মধ্যে সেই পরিণত সৌন্দর্যটা ছিল। নিজের যত্ন নেওয়ার সময় না পাওয়া, সংসারের দায়িত্ব, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ—সবকিছুর ছাপ তাঁর চেহারায় থাকলেও তাঁর ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক আকর্ষণ হারিয়ে যায়নি।
আমি নিজের ভাবনা থেকে সরে এসে আবার স্যুপের দিকে মন দিলাম।
এই মুহূর্তে তাঁর সৌন্দর্য নিয়ে ভাবার চেয়ে তাঁর শরীরটা একটু ভালো করার চেষ্টা করাই জরুরি।
কিছুক্ষণ পর স্যুপ তৈরি হয়ে গেল। একটা বাটিতে ঢেলে সামান্য ঠান্ডা হতে দিলাম। তারপর বসার ঘরে নিয়ে এলাম।
— আন্টি, উঠে একটু বসুন। স্যুপ এনেছি।
তিনি চোখ খুলে আমার দিকে তাকালেন।
— সত্যিই বানিয়েছ?
— জি। এবার খেয়ে বলুন, পাশ করেছি নাকি ফেল করেছি।
তিনি বাটিটা হাতে নিয়ে একটু চেখে দেখলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— মন্দ হয়নি তো!
— শুধু মন্দ হয়নি? এত কষ্ট করে বানালাম, আর আপনি বলছেন মন্দ হয়নি!
তিনি হেসে ফেললেন। সেই হাসিটা আগের চেয়ে একটু স্বাভাবিক লাগল।
— আচ্ছা বাবা, বেশ হয়েছে। এবার খুশি?
— এই তো। এবার পুরোটা খান।
তিনি ধীরে ধীরে স্যুপ খেতে লাগলেন। আমি পাশে বসে রইলাম। বাইরে বৃষ্টির শব্দ, ঘরের ভেতর চামচের মৃদু আওয়াজ—সব মিলিয়ে সময়টা অদ্ভুত শান্ত হয়ে উঠেছিল।
স্যুপ শেষ করে তিনি বাটিটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিলেন।
— জানো, অনেক দিন পর কেউ এভাবে সামনে বসে আমার খাওয়ার দিকে খেয়াল রাখল।
কথাটা শুনে আমি তাঁর দিকে তাকালাম।
— মিলি তো নিশ্চয়ই রাখে।
— রাখে। কিন্তু এখন তো ও এখানে নেই। আর ও থাকলেও আমি ওকে সব সময় বুঝতে দিই না যে আমার শরীর খারাপ। মেয়েটার নিজেরই কত চিন্তা!
আমি বললাম,
— কিন্তু আপনি সব কিছু একা সামলাতে গিয়ে নিজেকেও তো কষ্ট দিচ্ছেন।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
— সব সময় নিজের কথা ভাবলে সংসার চলে না, রাহাত।
কথাটা শুনে আর তর্ক করলাম না। কারণ, তাঁর জীবনের কতটা আমি জানি? বাইরে থেকে একটা মানুষকে দেখে তার সমস্ত লড়াই বোঝা যায় না।
রাত বাড়তে লাগল।
বৃষ্টি কিছুটা কমলেও আকাশে মেঘের গর্জন থামেনি। আমি আন্টিকে ওষুধের ব্যাপারে তাঁর চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলতে বললাম। জ্বরের জন্য কী করা উচিত, সেটাও নিশ্চিত হতে চাইলাম। তাঁর অবস্থা খারাপের দিকে গেলে চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে—এ কথা পরিষ্কার করে দিলাম।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝলাম, তাঁর শরীরটা এখনও স্বাভাবিক হয়নি। কখনো চোখ বন্ধ করে থাকছেন, কখনো আবার অল্প কথায় উত্তর দিচ্ছেন। মাঝেমধ্যে এমনভাবে বিড়বিড় করছেন, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন।
আমি কাছে গিয়ে ডাকলাম,
— আন্টি?
তিনি চোখ খুললেন।
— হুম?
— কেমন লাগছে এখন?
— একটু ভালো। তবে শরীরটা খুব ভার লাগছে।
আমি তাঁকে আরাম করে বসতে সাহায্য করলাম। তারপর পানি এগিয়ে দিলাম।
তিনি পানি খেয়ে আবার চোখ বন্ধ করলেন। কিছুক্ষণ পর অস্পষ্ট স্বরে বললেন,
— মিলিটা ছোট ছিল তখন...
আমি চুপ করে রইলাম।
— ওর বাবা চলে যাওয়ার পর... কী যে দিন গেছে আমার...
কথাগুলো খুব ধীরে বেরিয়ে আসছিল। মনে হলো, তিনি বর্তমানের ঘরটাকে ভুলে অনেক দূরের কোনো সময়ে ফিরে গেছেন।
আমি নরম গলায় বললাম,
— আন্টি, আপনি চাইলে একটু বিশ্রাম নিন। পরে কথা বলবেন।
তিনি মাথা নাড়লেন।
— না, বলতে দাও। এসব কথা কাউকে বলা হয় না। সবাই ভাবে আমি খুব শক্ত মানুষ। সব পারি। কিন্তু সব সময় কি আর পারা যায়, বাবা?
আমি কিছু বললাম না।
তিনি নিজেই বলতে শুরু করলেন।
— মিলির বাবা যখন মারা গেল, তখন ওর বয়স খুব বেশি ছিল না। এতটুকু একটা মেয়ে। ওর নিজের পৃথিবীটা তখনও ঠিকমতো তৈরি হয়নি। আমি কীভাবে ওকে বলব যে, যার হাত ধরে ও বড় হবে ভেবেছিল, সেই মানুষটা আর ফিরবে না?
কথা বলতে বলতে তাঁর গলা ভারী হয়ে এল।
— প্রথম কয়েকটা মাস আমার কিছুই মনে থাকত না। কখন খেয়েছি, কখন ঘুমিয়েছি, কী করতে হবে—কিছুই না। ঘুম ভেঙে মনে হতো, এই বুঝি মানুষটা দরজা খুলে ঘরে ঢুকবে। তারপর হঠাৎ মনে পড়ত, সে আর আসবে না।
তিনি একটু থামলেন।
বাইরে বৃষ্টির ফোঁটা আবার জানালায় আছড়ে পড়তে শুরু করেছে।
— কিন্তু কাঁদারও তো একটা সময় থাকে, তাই না? মিলি তখন আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। ওর চোখে ভয় দেখতাম। মনে হতো, আমি যদি ভেঙে পড়ি, তাহলে ওকে সামলাবে কে?
আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। চোখের কোণে পানি জমেছে। তিনি হাতের পিঠ দিয়ে চোখটা মুছে নিয়ে আবার বললেন,
— তখন থেকে নিজেকে বুঝিয়েছি, আমার কষ্টটা আমার কাছেই থাক। মেয়েটার সামনে আমাকে শক্ত থাকতে হবে। ওর কলেজ, পড়াশোনা, অসুখ-বিসুখ—সবকিছু আমাকে দেখতে হবে। ওর বাবা নেই, তাই বলে ও যেন কখনো নিজেকে অসহায় না ভাবে।
তাঁর কথায় কোনো নাটকীয়তা ছিল না। যেন বহুবার নিজের মনকে বলা কথাগুলোই আবার উচ্চারণ করছেন।
— কত রাত যে ওর পড়ার টেবিলের পাশে বসে কাটিয়েছি! ও পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ত, আমি বইগুলো গুছিয়ে দিতাম। কখনো জ্বর এলে সারারাত কপালে পানি দিয়েছি। আবার সকালে উঠে রান্না, সংসারের কাজ, নিজের কাজ—সব করতে হয়েছে। কারও কাছে তো সব সময় হাত পাততে পারিনি।
আমি আস্তে বললাম,
— আপনি একা এত কিছু সামলেছেন, আন্টি।
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
— একা সামলানো ছাড়া উপায় কী ছিল? জীবন তো আর কারও জন্য থেমে থাকে না।
কথাটা শুনে মনে হলো, এটাই বোধ হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।
জীবন থেমে থাকেনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তাঁর নিজের জীবনও আগের মতো চলেছে।
নাজমা আন্টি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর একটু অন্য দিকে তাকিয়ে বললেন,
— জানো, রাহাত, মানুষের জীবনে শুধু দায়িত্বই থাকে না। নিজেরও কিছু ইচ্ছে থাকে। ছোট ছোট ইচ্ছে। কারও সঙ্গে বসে চা খেতে ইচ্ছে করে, কোথাও বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে, মন খারাপ হলে কাউকে ফোন করে অনেকক্ষণ কথা বলতে ইচ্ছে করে। কখনো শুধু চাইতে ইচ্ছে করে, কেউ এসে বলুক—আজ তোমাকে কিছু করতে হবে না, আজ তুমি একটু বিশ্রাম নাও।
তিনি হালকা হাসলেন।
— কিন্তু এসব কথা কাউকে বলা যায় না। বিশেষ করে একটা মেয়ে বড় করার দায়িত্ব যখন নিজের কাঁধে থাকে, তখন নিজের ইচ্ছেগুলোকে খুব সহজেই বিলাসিতা বলে মনে হয়।
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তাঁর কণ্ঠে এবার এমন একটা বিষণ্নতা ছিল, যা জ্বরের ক্লান্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
— মিলি বড় হয়েছে। ওর নিজের জগৎ তৈরি হচ্ছে। বন্ধুবান্ধব, পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ—সবকিছু নিয়ে ওর কত পরিকল্পনা। ওকে দেখে আমার ভালো লাগে। মনে হয়, এত কষ্ট করে হলেও আমি কিছু একটা করতে পেরেছি। কিন্তু কখনো কখনো...
তিনি থেমে গেলেন।
— কখনো কখনো কী, আন্টি?
তিনি আমার দিকে তাকালেন না। চোখ স্থির ছিল সামনের টেবিলটার ওপর।
— কখনো কখনো মনে হয়, আমি নিজের জন্যও তো একটা জীবন চাইতে পারতাম।
কথাটা বলেই তিনি যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। তাড়াতাড়ি যোগ করলেন,
— কথাটা শুনে আবার অন্য কিছু ভেবো না। আমি মিলিকে নিয়ে কোনো দিন আফসোস করিনি। ও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কিন্তু একজন মা হওয়ার আগে আমি তো একজন মানুষও ছিলাম, তাই না?
আমি ধীরে মাথা নাড়লাম।
— অবশ্যই, আন্টি।
— আমারও কখনো একা থাকতে ভালো লাগেনি। কখনো মনে হয়েছে, পাশে যদি এমন কেউ থাকত, যার কাছে সারাদিনের ক্লান্তিটুকু বলা যায়! যে আমার সব দায়িত্ব কেড়ে নেবে, তা নয়—শুধু কিছুটা বুঝবে। আমার কথা শুনবে। আমি সব সময় শক্ত থাকার অভিনয় না করলেও যার সামনে নিজেকে ছোট মনে হবে না।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— কিন্তু তারপরই মিলির কথা মনে পড়েছে। ও কী ভাববে? সমাজ কী বলবে? ওর ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হবে না তো? এত প্রশ্নের মধ্যে নিজের ইচ্ছেটাকে আর আলাদা করে চিনতেই পারিনি।
কথাগুলো শুনে আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
যে নারীকে আমি এতদিন দেখেছি একজন যত্নশীল মা হিসেবে, তাঁর ভেতরে যে এতগুলো অপূর্ণ ইচ্ছে জমে আছে, তা আগে কখনো বুঝিনি। তিনি শুধু মিলির মা নন। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি শোকের পরও জীবনকে ধরে রেখেছেন, নিজের দুঃখকে আড়াল করে মেয়ের জন্য একটা নিরাপদ পৃথিবী তৈরি করেছেন।
কিন্তু সেই নিরাপদ পৃথিবী তৈরি করতে গিয়ে নিজের জন্য যে জায়গাটা ফাঁকা রেখেছিলেন, সেখানে কী ছিল?
হয়তো কিছু না-বলা কথা। হয়তো পুরোনো স্মৃতি। হয়তো এমন এক সঙ্গের আকাঙ্ক্ষা, যা তিনি নিজেকেও স্বীকার করতে দেননি।
আমি বললাম,
— নিজের জন্য কিছু চাওয়াটা তো অন্যায় নয়, আন্টি।
তিনি এবার আমার দিকে তাকালেন। চোখে ক্লান্তির পাশাপাশি একটা মৃদু বিস্ময়।
— তোমাদের বয়সে কথাগুলো খুব সহজ মনে হয়, রাহাত। কিন্তু জীবনের একটা সময়ের পর মানুষ নিজের ইচ্ছের চেয়ে অন্যদের কথা বেশি ভাবে। তারপর একসময় নিজের ইচ্ছেগুলোই আর ঠিক করে মনে থাকে না।
তিনি একটু হাসলেন।
— এখন তো কখনো কখনো মনে হয়, আমি কী পছন্দ করি, কী করলে আমার ভালো লাগবে—সেটাও নতুন করে ভাবতে হবে।
আমি তাঁর কথার উত্তর খুঁজে পেলাম না।
সব দুঃখের সমাধান দেওয়া যায় না। কিছু কষ্টকে শুধু স্বীকার করে নিতে হয়। আর কিছু মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অভাবটা টাকা-পয়সা বা সুযোগের নয়—তাদের কথা মন দিয়ে শোনার মতো একজন মানুষের।
কথা বলতে বলতে নাজমা আন্টির চোখ আবার ভারী হয়ে এল। জ্বরের কারণে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। আমি তাঁকে আর কথা না বাড়িয়ে বিশ্রাম নিতে বললাম।
— আন্টি, এখন আর কথা নয়। আপনি একটু আরাম করুন। সকালে দরকার হলে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করব।
তিনি মাথা নাড়লেন।
— তুমি কি এখন চলে যাবে?
প্রশ্নটা শুনে তাঁর দিকে তাকালাম।
কণ্ঠে শিশুসুলভ কোনো আবদার ছিল না। ছিল অসুস্থ অবস্থায় একা হয়ে পড়ার স্বাভাবিক ভয়।
আমি বললাম,
— আপনার শরীরটা পুরোপুরি স্থির না হওয়া পর্যন্ত আমি যেতে চাইছি না। তবে প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করব। আপনাকে এভাবে একা রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।
তিনি যেন কিছুটা স্বস্তি পেলেন।
— মিলিকে বলোনি তো?
— না। তবে আপনার অবস্থা খারাপ হলে ওকে জানাব। আপনার মেয়ে আপনার জন্য চিন্তা করবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন আপাতত আপনি বিশ্রাম নিন।
তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
আমি বসার ঘরের আলোটা একটু কমিয়ে দিলাম, কিন্তু ঘর পুরো অন্ধকার করলাম না। তাঁর পানি, ফোন আর প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো হাতের কাছে রাখলাম। তারপর নিজের ফোন থেকে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করার চেষ্টা করলাম।
আয়রনের ঘাটতি দীর্ঘদিনের দুর্বলতার একটা কারণ হতে পারে, কিন্তু আজকের জ্বর বা হঠাৎ অসুস্থতার সব ব্যাখ্যা সেটি দেয় না। তাই তাঁর অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ছিল। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, অস্বাভাবিক বুক ধড়ফড় বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
আমি তাঁর পাশে বসে রইলাম।
মাঝেমধ্যে তিনি আধোঘুমে কিছু বলছিলেন। কখনো মিলির নাম, কখনো পুরোনো কোনো ঘটনার কথা। সব কথা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছিলাম, তাঁর স্মৃতির অনেকটা জুড়েই রয়েছে সেই মানুষগুলো, যাদের জন্য তিনি নিজের জীবনকে বারবার নতুন করে সাজিয়েছেন।
একসময় তিনি চোখ না খুলেই বললেন,
— মিলিটাকে একটু দেখো, বাবা। ও যেন আমার মতো সবকিছু একা সামলাতে গিয়ে নিজেকে ভুলে না যায়।
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
আমি আস্তে বললাম,
— আপনি আগে সুস্থ হয়ে উঠুন, আন্টি। মিলির কথা আমরা সবাই মিলে দেখব।
তিনি আর উত্তর দিলেন না।
আমি জানালার দিকে তাকালাম। বৃষ্টি তখন অনেকটাই কমে এসেছে। রাস্তার আলোয় ভেজা গাছের পাতাগুলো চকচক করছে। রাত গভীর হচ্ছে, আর শহরটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে।
সেদিন নাজমা আন্টির পাশে বসে আমি প্রথমবার তাঁর জীবনের অন্য একটা দিক চিনতে পেরেছিলাম।
একজন নারী, যিনি বছরের পর বছর নিজের শোককে সামলে রেখেছেন। যিনি মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য নিজের আনন্দ, নিজের অবসর, নিজের সঙ্গের প্রয়োজন—সবকিছুকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছেন। যিনি শক্ত থাকার অভ্যাস করতে করতে হয়তো ভুলেই গিয়েছেন, তাঁরও কখনো দুর্বল হওয়ার অধিকার আছে।
তাঁর জন্য আমার মায়া হচ্ছিল। শ্রদ্ধাও হচ্ছিল।
আর সেই শ্রদ্ধার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল এক ধরনের নীরব কৌতূহল—এই মানুষটাকে আমরা এতদিন কতটুকুই বা চিনেছি?
সেদিন রাতের বৃষ্টিতে তাঁর বাড়িতে এসে আমি শুধু একজন অসুস্থ মানুষের পাশে বসিনি। বসেছিলাম এমন একজন মানুষের পাশে, যাঁর জীবনের গল্পের অনেক অধ্যায়ই এতদিন বন্ধ ছিল।
সেই অধ্যায়গুলো খুলতে শুরু করেছিল খুব সাধারণ কিছু কথার মধ্য দিয়ে—এক বাটি স্যুপ, মৃদু আলো, জানালার ওপরে বৃষ্টির শব্দ, আর বহু বছর ধরে জমে থাকা কিছু স্মৃতি।
আর আমি বুঝতে পারছিলাম, কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে গভীর নিঃসঙ্গতা প্রকাশ পায় না তার কান্নায়।
প্রকাশ পায় সেই মুহূর্তে, যখন সে খুব আস্তে বলে—
“আমারও তো একটা জীবন ছিল, রাহাত। শুধু সেই জীবনের কথা কাউকে বলা হয়নি।”
— আন্টি, আপনার কি আগে থেকেই শরীর খারাপ যাচ্ছিল?
তিনি সোফার পিঠে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। আমার প্রশ্ন শুনে চোখ খুললেন।
— শরীর খারাপ বলতে... অনেক দিন ধরেই একটু দুর্বল লাগে। সকালে ঘুম থেকে উঠেও মনে হয়, রাতভর যেন বিশ্রাম হয়নি। কখনো মাথা ঘোরে, কখনো বুকটা ধড়ফড় করে। কিন্তু এসব নিয়ে আর কত ভাবব বলো?
— ডাক্তার দেখিয়েছেন?
— হ্যাঁ, কিছুদিন আগে দেখিয়েছিলাম। রক্ত পরীক্ষা করাতে বলেছিলেন। তখনই বলেছিলেন, আমার আয়রন নাকি বেশ কম। কিছু ওষুধও দিয়েছিলেন।
আমি অবাক হয়ে বললাম,
— তাহলে ওষুধ খাচ্ছেন না কেন?
তিনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসলেন।
— খাই বাবা। তবে সব সময় নিয়ম করে খাওয়া হয় না। কখনো ভুলে যাই, কখনো খালি পেটে খেতে বলে অথচ সময়মতো খাওয়াই হয় না। আবার কখনো মিলির কোনো কাজ থাকে, সেটা করতে গিয়ে নিজের কথাই ভুলে যাই।
কথাগুলো বলার সময় তাঁর মুখে এমন একটা স্বাভাবিক ভঙ্গি ছিল, যেন নিজের অবহেলার কথা স্বীকার করেও সেটাকে খুব বড় কোনো বিষয় বলে মনে করছেন না।
আমি বললাম,
— কিন্তু এটা তো অবহেলা করার মতো বিষয় নয়। আয়রনের ঘাটতিতে শরীর দুর্বল হয়ে যেতে পারে, মাথা ঘুরতে পারে, বুক ধড়ফড় করতে পারে। আপনার এই দুর্বলতার কারণটা চিকিৎসককে আবার দেখিয়ে নিশ্চিত হওয়া দরকার।
আন্টি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— তুমি তো দেখি বেশ ডাক্তার হয়ে গেছ!
— ডাক্তার হইনি। কিন্তু আপনার শরীর খারাপ হলে চিন্তা তো হবেই।
তিনি আর কথা বাড়ালেন না। শুধু মাথাটা সোফার পিঠে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করলেন।
আমি লক্ষ করলাম, অসুস্থতার মধ্যেও তাঁর নিজের ওপর নির্ভরশীল থাকার একটা প্রবণতা আছে। কাউকে ডেকে সাহায্য চাওয়ার চেয়ে নিজে নিজে সব সামলে নেওয়াটাই যেন তাঁর অভ্যাস। অথচ মানুষ যতই শক্ত হোক, শরীরের একটা সীমা আছে। সেই সীমা পেরিয়ে গেলে ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সব সময় তাকে সামলানো যায় না।
নাজমা আন্টির ক্ষেত্রেও বোধ হয় সেটাই হয়েছে।
রান্নাঘরে ঢুকে দেখলাম, দুপুরের পর থেকে তেমন কিছু রান্না করা হয়নি। ফ্রিজে কিছু সবজি, মুরগির মাংস আর কয়েকটি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস ছিল। মনে হলো, এই অবস্থায় তাঁকে ভারী কিছু খেতে দেওয়ার চেয়ে হালকা কিছু তৈরি করাই ভালো হবে।
আমি রান্নাঘর থেকে জিজ্ঞেস করলাম,
— আন্টি, স্যুপ খেতে পারবেন?
তিনি বসার ঘর থেকে বললেন,
— তুমি আবার স্যুপ বানাতে পারো নাকি?
— চেষ্টা করে দেখতে পারি। খারাপ হলে কিন্তু দোষ দিতে পারবেন না।
— আচ্ছা, দেখি তোমার রান্নার প্রতিভা কতটুকু!
কণ্ঠে ক্লান্তি থাকলেও রসিকতার সুরটা ফিরে এসেছিল।
আমি চুলায় হাঁড়ি বসালাম। সামান্য তেল, পেঁয়াজ, আদা, কাটা সবজি আর মুরগির মাংস দিয়ে ধীরে ধীরে স্যুপ তৈরি করতে লাগলাম। রান্নাঘরের জানালায় বৃষ্টির পানি এসে লাগছিল। মাঝেমধ্যে বাতাসের ঝাপটায় জানালাটা কেঁপে উঠছিল। দূরে কোথাও বজ্রপাতের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
রান্না করতে করতে বসার ঘরের দিকে তাকালাম।
নাজমা আন্টি চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। শালটা কাঁধের ওপর টেনে নিয়েছেন। ঘরের মৃদু আলোয় তাঁর মুখের ক্লান্তি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাধারণত তাঁকে দেখলে মনে হয়, নিজের সংসারের প্রতিটি ব্যাপারে তাঁর পরিষ্কার ধারণা আছে। কথা বলেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, কোনো সমস্যা হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেদিন সেই দৃঢ়তার আড়ালে একটা ক্লান্ত মানুষকে দেখতে পাচ্ছিলাম।
তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, সময়ের সঙ্গে একজন নারীর সৌন্দর্য শুধু বদলায় না, তার প্রকাশও বদলে যায়। যৌবনের চঞ্চলতার জায়গায় আসে স্থিরতা, চোখের দৃষ্টিতে জমা হয় অভিজ্ঞতা, আর হাসির মধ্যে মিশে থাকে এমন কিছু না-বলা কথা, যার অর্থ বুঝতে হলে শুধু তাকিয়ে থাকলেই হয় না—মানুষটাকে চিনতেও হয়।
নাজমা আন্টির মধ্যে সেই পরিণত সৌন্দর্যটা ছিল। নিজের যত্ন নেওয়ার সময় না পাওয়া, সংসারের দায়িত্ব, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ—সবকিছুর ছাপ তাঁর চেহারায় থাকলেও তাঁর ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক আকর্ষণ হারিয়ে যায়নি।
আমি নিজের ভাবনা থেকে সরে এসে আবার স্যুপের দিকে মন দিলাম।
এই মুহূর্তে তাঁর সৌন্দর্য নিয়ে ভাবার চেয়ে তাঁর শরীরটা একটু ভালো করার চেষ্টা করাই জরুরি।
কিছুক্ষণ পর স্যুপ তৈরি হয়ে গেল। একটা বাটিতে ঢেলে সামান্য ঠান্ডা হতে দিলাম। তারপর বসার ঘরে নিয়ে এলাম।
— আন্টি, উঠে একটু বসুন। স্যুপ এনেছি।
তিনি চোখ খুলে আমার দিকে তাকালেন।
— সত্যিই বানিয়েছ?
— জি। এবার খেয়ে বলুন, পাশ করেছি নাকি ফেল করেছি।
তিনি বাটিটা হাতে নিয়ে একটু চেখে দেখলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— মন্দ হয়নি তো!
— শুধু মন্দ হয়নি? এত কষ্ট করে বানালাম, আর আপনি বলছেন মন্দ হয়নি!
তিনি হেসে ফেললেন। সেই হাসিটা আগের চেয়ে একটু স্বাভাবিক লাগল।
— আচ্ছা বাবা, বেশ হয়েছে। এবার খুশি?
— এই তো। এবার পুরোটা খান।
তিনি ধীরে ধীরে স্যুপ খেতে লাগলেন। আমি পাশে বসে রইলাম। বাইরে বৃষ্টির শব্দ, ঘরের ভেতর চামচের মৃদু আওয়াজ—সব মিলিয়ে সময়টা অদ্ভুত শান্ত হয়ে উঠেছিল।
স্যুপ শেষ করে তিনি বাটিটা আমার হাতে ফিরিয়ে দিলেন।
— জানো, অনেক দিন পর কেউ এভাবে সামনে বসে আমার খাওয়ার দিকে খেয়াল রাখল।
কথাটা শুনে আমি তাঁর দিকে তাকালাম।
— মিলি তো নিশ্চয়ই রাখে।
— রাখে। কিন্তু এখন তো ও এখানে নেই। আর ও থাকলেও আমি ওকে সব সময় বুঝতে দিই না যে আমার শরীর খারাপ। মেয়েটার নিজেরই কত চিন্তা!
আমি বললাম,
— কিন্তু আপনি সব কিছু একা সামলাতে গিয়ে নিজেকেও তো কষ্ট দিচ্ছেন।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
— সব সময় নিজের কথা ভাবলে সংসার চলে না, রাহাত।
কথাটা শুনে আর তর্ক করলাম না। কারণ, তাঁর জীবনের কতটা আমি জানি? বাইরে থেকে একটা মানুষকে দেখে তার সমস্ত লড়াই বোঝা যায় না।
রাত বাড়তে লাগল।
বৃষ্টি কিছুটা কমলেও আকাশে মেঘের গর্জন থামেনি। আমি আন্টিকে ওষুধের ব্যাপারে তাঁর চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলতে বললাম। জ্বরের জন্য কী করা উচিত, সেটাও নিশ্চিত হতে চাইলাম। তাঁর অবস্থা খারাপের দিকে গেলে চিকিৎসা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে—এ কথা পরিষ্কার করে দিলাম।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝলাম, তাঁর শরীরটা এখনও স্বাভাবিক হয়নি। কখনো চোখ বন্ধ করে থাকছেন, কখনো আবার অল্প কথায় উত্তর দিচ্ছেন। মাঝেমধ্যে এমনভাবে বিড়বিড় করছেন, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন।
আমি কাছে গিয়ে ডাকলাম,
— আন্টি?
তিনি চোখ খুললেন।
— হুম?
— কেমন লাগছে এখন?
— একটু ভালো। তবে শরীরটা খুব ভার লাগছে।
আমি তাঁকে আরাম করে বসতে সাহায্য করলাম। তারপর পানি এগিয়ে দিলাম।
তিনি পানি খেয়ে আবার চোখ বন্ধ করলেন। কিছুক্ষণ পর অস্পষ্ট স্বরে বললেন,
— মিলিটা ছোট ছিল তখন...
আমি চুপ করে রইলাম।
— ওর বাবা চলে যাওয়ার পর... কী যে দিন গেছে আমার...
কথাগুলো খুব ধীরে বেরিয়ে আসছিল। মনে হলো, তিনি বর্তমানের ঘরটাকে ভুলে অনেক দূরের কোনো সময়ে ফিরে গেছেন।
আমি নরম গলায় বললাম,
— আন্টি, আপনি চাইলে একটু বিশ্রাম নিন। পরে কথা বলবেন।
তিনি মাথা নাড়লেন।
— না, বলতে দাও। এসব কথা কাউকে বলা হয় না। সবাই ভাবে আমি খুব শক্ত মানুষ। সব পারি। কিন্তু সব সময় কি আর পারা যায়, বাবা?
আমি কিছু বললাম না।
তিনি নিজেই বলতে শুরু করলেন।
— মিলির বাবা যখন মারা গেল, তখন ওর বয়স খুব বেশি ছিল না। এতটুকু একটা মেয়ে। ওর নিজের পৃথিবীটা তখনও ঠিকমতো তৈরি হয়নি। আমি কীভাবে ওকে বলব যে, যার হাত ধরে ও বড় হবে ভেবেছিল, সেই মানুষটা আর ফিরবে না?
কথা বলতে বলতে তাঁর গলা ভারী হয়ে এল।
— প্রথম কয়েকটা মাস আমার কিছুই মনে থাকত না। কখন খেয়েছি, কখন ঘুমিয়েছি, কী করতে হবে—কিছুই না। ঘুম ভেঙে মনে হতো, এই বুঝি মানুষটা দরজা খুলে ঘরে ঢুকবে। তারপর হঠাৎ মনে পড়ত, সে আর আসবে না।
তিনি একটু থামলেন।
বাইরে বৃষ্টির ফোঁটা আবার জানালায় আছড়ে পড়তে শুরু করেছে।
— কিন্তু কাঁদারও তো একটা সময় থাকে, তাই না? মিলি তখন আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। ওর চোখে ভয় দেখতাম। মনে হতো, আমি যদি ভেঙে পড়ি, তাহলে ওকে সামলাবে কে?
আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। চোখের কোণে পানি জমেছে। তিনি হাতের পিঠ দিয়ে চোখটা মুছে নিয়ে আবার বললেন,
— তখন থেকে নিজেকে বুঝিয়েছি, আমার কষ্টটা আমার কাছেই থাক। মেয়েটার সামনে আমাকে শক্ত থাকতে হবে। ওর কলেজ, পড়াশোনা, অসুখ-বিসুখ—সবকিছু আমাকে দেখতে হবে। ওর বাবা নেই, তাই বলে ও যেন কখনো নিজেকে অসহায় না ভাবে।
তাঁর কথায় কোনো নাটকীয়তা ছিল না। যেন বহুবার নিজের মনকে বলা কথাগুলোই আবার উচ্চারণ করছেন।
— কত রাত যে ওর পড়ার টেবিলের পাশে বসে কাটিয়েছি! ও পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ত, আমি বইগুলো গুছিয়ে দিতাম। কখনো জ্বর এলে সারারাত কপালে পানি দিয়েছি। আবার সকালে উঠে রান্না, সংসারের কাজ, নিজের কাজ—সব করতে হয়েছে। কারও কাছে তো সব সময় হাত পাততে পারিনি।
আমি আস্তে বললাম,
— আপনি একা এত কিছু সামলেছেন, আন্টি।
তিনি আমার দিকে তাকালেন।
— একা সামলানো ছাড়া উপায় কী ছিল? জীবন তো আর কারও জন্য থেমে থাকে না।
কথাটা শুনে মনে হলো, এটাই বোধ হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।
জীবন থেমে থাকেনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তাঁর নিজের জীবনও আগের মতো চলেছে।
নাজমা আন্টি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর একটু অন্য দিকে তাকিয়ে বললেন,
— জানো, রাহাত, মানুষের জীবনে শুধু দায়িত্বই থাকে না। নিজেরও কিছু ইচ্ছে থাকে। ছোট ছোট ইচ্ছে। কারও সঙ্গে বসে চা খেতে ইচ্ছে করে, কোথাও বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করে, মন খারাপ হলে কাউকে ফোন করে অনেকক্ষণ কথা বলতে ইচ্ছে করে। কখনো শুধু চাইতে ইচ্ছে করে, কেউ এসে বলুক—আজ তোমাকে কিছু করতে হবে না, আজ তুমি একটু বিশ্রাম নাও।
তিনি হালকা হাসলেন।
— কিন্তু এসব কথা কাউকে বলা যায় না। বিশেষ করে একটা মেয়ে বড় করার দায়িত্ব যখন নিজের কাঁধে থাকে, তখন নিজের ইচ্ছেগুলোকে খুব সহজেই বিলাসিতা বলে মনে হয়।
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
তাঁর কণ্ঠে এবার এমন একটা বিষণ্নতা ছিল, যা জ্বরের ক্লান্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
— মিলি বড় হয়েছে। ওর নিজের জগৎ তৈরি হচ্ছে। বন্ধুবান্ধব, পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ—সবকিছু নিয়ে ওর কত পরিকল্পনা। ওকে দেখে আমার ভালো লাগে। মনে হয়, এত কষ্ট করে হলেও আমি কিছু একটা করতে পেরেছি। কিন্তু কখনো কখনো...
তিনি থেমে গেলেন।
— কখনো কখনো কী, আন্টি?
তিনি আমার দিকে তাকালেন না। চোখ স্থির ছিল সামনের টেবিলটার ওপর।
— কখনো কখনো মনে হয়, আমি নিজের জন্যও তো একটা জীবন চাইতে পারতাম।
কথাটা বলেই তিনি যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। তাড়াতাড়ি যোগ করলেন,
— কথাটা শুনে আবার অন্য কিছু ভেবো না। আমি মিলিকে নিয়ে কোনো দিন আফসোস করিনি। ও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কিন্তু একজন মা হওয়ার আগে আমি তো একজন মানুষও ছিলাম, তাই না?
আমি ধীরে মাথা নাড়লাম।
— অবশ্যই, আন্টি।
— আমারও কখনো একা থাকতে ভালো লাগেনি। কখনো মনে হয়েছে, পাশে যদি এমন কেউ থাকত, যার কাছে সারাদিনের ক্লান্তিটুকু বলা যায়! যে আমার সব দায়িত্ব কেড়ে নেবে, তা নয়—শুধু কিছুটা বুঝবে। আমার কথা শুনবে। আমি সব সময় শক্ত থাকার অভিনয় না করলেও যার সামনে নিজেকে ছোট মনে হবে না।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— কিন্তু তারপরই মিলির কথা মনে পড়েছে। ও কী ভাববে? সমাজ কী বলবে? ওর ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হবে না তো? এত প্রশ্নের মধ্যে নিজের ইচ্ছেটাকে আর আলাদা করে চিনতেই পারিনি।
কথাগুলো শুনে আমার ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো।
যে নারীকে আমি এতদিন দেখেছি একজন যত্নশীল মা হিসেবে, তাঁর ভেতরে যে এতগুলো অপূর্ণ ইচ্ছে জমে আছে, তা আগে কখনো বুঝিনি। তিনি শুধু মিলির মা নন। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি শোকের পরও জীবনকে ধরে রেখেছেন, নিজের দুঃখকে আড়াল করে মেয়ের জন্য একটা নিরাপদ পৃথিবী তৈরি করেছেন।
কিন্তু সেই নিরাপদ পৃথিবী তৈরি করতে গিয়ে নিজের জন্য যে জায়গাটা ফাঁকা রেখেছিলেন, সেখানে কী ছিল?
হয়তো কিছু না-বলা কথা। হয়তো পুরোনো স্মৃতি। হয়তো এমন এক সঙ্গের আকাঙ্ক্ষা, যা তিনি নিজেকেও স্বীকার করতে দেননি।
আমি বললাম,
— নিজের জন্য কিছু চাওয়াটা তো অন্যায় নয়, আন্টি।
তিনি এবার আমার দিকে তাকালেন। চোখে ক্লান্তির পাশাপাশি একটা মৃদু বিস্ময়।
— তোমাদের বয়সে কথাগুলো খুব সহজ মনে হয়, রাহাত। কিন্তু জীবনের একটা সময়ের পর মানুষ নিজের ইচ্ছের চেয়ে অন্যদের কথা বেশি ভাবে। তারপর একসময় নিজের ইচ্ছেগুলোই আর ঠিক করে মনে থাকে না।
তিনি একটু হাসলেন।
— এখন তো কখনো কখনো মনে হয়, আমি কী পছন্দ করি, কী করলে আমার ভালো লাগবে—সেটাও নতুন করে ভাবতে হবে।
আমি তাঁর কথার উত্তর খুঁজে পেলাম না।
সব দুঃখের সমাধান দেওয়া যায় না। কিছু কষ্টকে শুধু স্বীকার করে নিতে হয়। আর কিছু মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় অভাবটা টাকা-পয়সা বা সুযোগের নয়—তাদের কথা মন দিয়ে শোনার মতো একজন মানুষের।
কথা বলতে বলতে নাজমা আন্টির চোখ আবার ভারী হয়ে এল। জ্বরের কারণে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। আমি তাঁকে আর কথা না বাড়িয়ে বিশ্রাম নিতে বললাম।
— আন্টি, এখন আর কথা নয়। আপনি একটু আরাম করুন। সকালে দরকার হলে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করব।
তিনি মাথা নাড়লেন।
— তুমি কি এখন চলে যাবে?
প্রশ্নটা শুনে তাঁর দিকে তাকালাম।
কণ্ঠে শিশুসুলভ কোনো আবদার ছিল না। ছিল অসুস্থ অবস্থায় একা হয়ে পড়ার স্বাভাবিক ভয়।
আমি বললাম,
— আপনার শরীরটা পুরোপুরি স্থির না হওয়া পর্যন্ত আমি যেতে চাইছি না। তবে প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করব। আপনাকে এভাবে একা রেখে যাওয়া ঠিক হবে না।
তিনি যেন কিছুটা স্বস্তি পেলেন।
— মিলিকে বলোনি তো?
— না। তবে আপনার অবস্থা খারাপ হলে ওকে জানাব। আপনার মেয়ে আপনার জন্য চিন্তা করবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন আপাতত আপনি বিশ্রাম নিন।
তিনি চোখ বন্ধ করলেন।
আমি বসার ঘরের আলোটা একটু কমিয়ে দিলাম, কিন্তু ঘর পুরো অন্ধকার করলাম না। তাঁর পানি, ফোন আর প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো হাতের কাছে রাখলাম। তারপর নিজের ফোন থেকে একজন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করার চেষ্টা করলাম।
আয়রনের ঘাটতি দীর্ঘদিনের দুর্বলতার একটা কারণ হতে পারে, কিন্তু আজকের জ্বর বা হঠাৎ অসুস্থতার সব ব্যাখ্যা সেটি দেয় না। তাই তাঁর অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ছিল। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, অস্বাভাবিক বুক ধড়ফড় বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
আমি তাঁর পাশে বসে রইলাম।
মাঝেমধ্যে তিনি আধোঘুমে কিছু বলছিলেন। কখনো মিলির নাম, কখনো পুরোনো কোনো ঘটনার কথা। সব কথা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম না। শুধু এটুকু বুঝতে পারছিলাম, তাঁর স্মৃতির অনেকটা জুড়েই রয়েছে সেই মানুষগুলো, যাদের জন্য তিনি নিজের জীবনকে বারবার নতুন করে সাজিয়েছেন।
একসময় তিনি চোখ না খুলেই বললেন,
— মিলিটাকে একটু দেখো, বাবা। ও যেন আমার মতো সবকিছু একা সামলাতে গিয়ে নিজেকে ভুলে না যায়।
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
আমি আস্তে বললাম,
— আপনি আগে সুস্থ হয়ে উঠুন, আন্টি। মিলির কথা আমরা সবাই মিলে দেখব।
তিনি আর উত্তর দিলেন না।
আমি জানালার দিকে তাকালাম। বৃষ্টি তখন অনেকটাই কমে এসেছে। রাস্তার আলোয় ভেজা গাছের পাতাগুলো চকচক করছে। রাত গভীর হচ্ছে, আর শহরটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে।
সেদিন নাজমা আন্টির পাশে বসে আমি প্রথমবার তাঁর জীবনের অন্য একটা দিক চিনতে পেরেছিলাম।
একজন নারী, যিনি বছরের পর বছর নিজের শোককে সামলে রেখেছেন। যিনি মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য নিজের আনন্দ, নিজের অবসর, নিজের সঙ্গের প্রয়োজন—সবকিছুকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছেন। যিনি শক্ত থাকার অভ্যাস করতে করতে হয়তো ভুলেই গিয়েছেন, তাঁরও কখনো দুর্বল হওয়ার অধিকার আছে।
তাঁর জন্য আমার মায়া হচ্ছিল। শ্রদ্ধাও হচ্ছিল।
আর সেই শ্রদ্ধার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল এক ধরনের নীরব কৌতূহল—এই মানুষটাকে আমরা এতদিন কতটুকুই বা চিনেছি?
সেদিন রাতের বৃষ্টিতে তাঁর বাড়িতে এসে আমি শুধু একজন অসুস্থ মানুষের পাশে বসিনি। বসেছিলাম এমন একজন মানুষের পাশে, যাঁর জীবনের গল্পের অনেক অধ্যায়ই এতদিন বন্ধ ছিল।
সেই অধ্যায়গুলো খুলতে শুরু করেছিল খুব সাধারণ কিছু কথার মধ্য দিয়ে—এক বাটি স্যুপ, মৃদু আলো, জানালার ওপরে বৃষ্টির শব্দ, আর বহু বছর ধরে জমে থাকা কিছু স্মৃতি।
আর আমি বুঝতে পারছিলাম, কখনো কখনো মানুষের সবচেয়ে গভীর নিঃসঙ্গতা প্রকাশ পায় না তার কান্নায়।
প্রকাশ পায় সেই মুহূর্তে, যখন সে খুব আস্তে বলে—
“আমারও তো একটা জীবন ছিল, রাহাত। শুধু সেই জীবনের কথা কাউকে বলা হয়নি।”


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)