7 hours ago
সন্ধ্যাটা সেদিন অন্য রকম ছিল।
সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। দুপুরের পর থেকে মেঘগুলো যেন আরও নিচে নেমে এসেছিল, আর বিকেল গড়াতেই শুরু হয়েছিল বৃষ্টি। প্রথমে হালকা, তারপর ক্রমশ প্রবল। ছাদের কার্নিশ বেয়ে পানি পড়ছিল অবিরাম, গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির ভারে নুয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠলেও বৃষ্টির পর্দার ওপারে শহরটাকে কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছিল।
আমি ঘরে বসে পড়ার চেষ্টা করছিলাম। বই খোলা ছিল সামনে, কিন্তু মন পড়ায় ছিল না। মাঝেমধ্যে জানালার দিকে তাকাচ্ছিলাম। বৃষ্টির শব্দের মধ্যে একটা অদ্ভুত একাকিত্ব আছে—যেন বাইরের পৃথিবীটাকে ধুয়ে-মুছে দূরে সরিয়ে দেয়, আর মানুষকে নিজের ভাবনার সামনে একা বসিয়ে রাখে।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাজমা আন্টির নাম দেখে একটু অবাক হলাম। মিলি এখন পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য হলে থাকে। তাই আন্টির সঙ্গে আগের মতো নিয়মিত দেখা হয় না, কথাও হয় মাঝেমধ্যে।
কল ধরতেই ওপাশ থেকে তাঁর কণ্ঠস্বর পেলাম।
— রাহাত, তুমি কি এখন ব্যস্ত?
কণ্ঠটা পরিচিত, কিন্তু তাতে যেন ক্লান্তির একটা আস্তরণ পড়েছে।
— না, আন্টি। বলুন। কী হয়েছে?
তিনি একটু থেমে বললেন,
— আমার শরীরটা আজ একদম ভালো লাগছে না বাবা। সকাল থেকে জ্বর জ্বর ভাব। বিকেলের দিকে আরও খারাপ লাগছে।
— জ্বর মেপেছেন?
— না। মাপা হয়নি। মাথাটাও কেমন ভার হয়ে আছে। কিছু খেতেও ইচ্ছে করছে না।
আমি বইটা বন্ধ করে দিলাম।
— মিলিকে বলেছেন?
প্রশ্নটা শুনে তিনি তাড়াতাড়ি উত্তর দিলেন,
— না, ওকে বলিনি। বললে মেয়েটা অস্থির হয়ে যাবে। পরীক্ষার জন্য কত কষ্ট করে হলে থেকে পড়ছে! এখন যদি জানতে পারে আমি অসুস্থ, তাহলে এই বৃষ্টির মধ্যেই চলে আসতে চাইবে। ওর পড়াশোনার ক্ষতি হবে, তার ওপর অযথা দুশ্চিন্তা করবে।
মায়ের কণ্ঠে সন্তানের জন্য যে উদ্বেগ থাকে, কথাগুলোর মধ্যে তা স্পষ্ট ছিল। নিজের অসুস্থতা নিয়ে তাঁর যতটা না চিন্তা, তার চেয়ে বেশি চিন্তা মিলিকে নিয়ে।
আমি বললাম,
— আপনি একা আছেন, আর শরীর খারাপ। আমাকে আগে বলেননি কেন?
— ভাবলাম, একটু বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না। বাড়িটাও কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
শেষ কথাটা খুব আস্তে বললেন তিনি।
আমি জানি, মিলি বাড়িতে থাকলে নাজমা আন্টির দিনটা কতটা ব্যস্ততায় কাটে। মেয়েকে নিয়ে ছোটখাটো বকাবকি, রান্নাঘরে যাতায়াত, কখনো পড়ার খোঁজ নেওয়া—এসবের মধ্যেই একটা বাড়ি জীবন্ত থাকে। সেই মেয়েটা এখন কয়েক দিনের জন্য দূরে। আর ঠিক সেই সময়েই অসুস্থতা এসে তাঁকে একা করে দিয়েছে।
আমি আর দেরি করলাম না।
— আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আসছি।
— এই বৃষ্টিতে আসবে?
— আপনি একা আছেন। বৃষ্টি একটু কমলে তো আরও দেরি হবে। আমি সাবধানে আসব।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর তিনি বললেন,
— আচ্ছা বাবা। সাবধানে এসো।
ফোন রাখার পর একটা ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
বাইরে পা দিতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল। রাস্তায় হাঁটুসমান পানি না হলেও বেশ কিছু জায়গায় পানি জমে ছিল। যানবাহন চলছিল ধীরে, আর বৃষ্টির ছাঁটে রাস্তার পাশের দোকানগুলোর সামনের অংশ ভিজে যাচ্ছিল। একটা রিকশা পেয়ে উঠে বসলাম। গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগল।
নাজমা আন্টিদের বাসার সামনে পৌঁছানোর সময় সন্ধ্যা আরও গাঢ় হয়েছে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিংবেল চাপলাম।
কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। তারপর দরজাটা খুলে গেল।
নাজমা আন্টিকে দেখে প্রথমেই মনে হলো, অসুস্থতা তাঁকে বেশ ক্লান্ত করে দিয়েছে।
মুখটা স্বাভাবিকের তুলনায় ফ্যাকাসে, চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ। কপালের কাছে কয়েকটি চুল এলোমেলো হয়ে আছে। চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে, পরিচর্যার স্বাভাবিক পরিপাটিটুকু যেন আজ আর বজায় রাখার শক্তি পাননি। পরনে সাধারণ একটা শাড়ি, গায়ে হালকা শাল। শাড়ির রংটা ঘরের মৃদু আলোয় আরও শান্ত, আরও ম্লান দেখাচ্ছিল। কিন্তু তাও ভিতর থেকে তার পেটানো শরীরটা যেন ঊঁকি দিচ্ছে।
তবু তাঁর শরীরের মধ্যে এমন একটা স্বাভাবিক সৌন্দর্য ছিল, যা অসুস্থতার ক্লান্তিতেও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
মধ্যবয়সী একজন নারীর সৌন্দর্যকে কেবল মুখের গড়ন দিয়ে বিচার করা যায় না—অন্তত আমার তখন তেমনই মনে হলো। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে ছিল অভিজ্ঞতার গভীরতা, ঠোঁটের কোণে ছিল পরিচিত স্নেহের আভাস, আর কথা বলার ভঙ্গিতে এমন এক স্বচ্ছন্দতা, যা সময়ের সঙ্গে তৈরি হয়। তাঁর সৌন্দর্যে কিশোরীসুলভ চঞ্চলতা ছিল না; বরং ছিল পরিণত, শান্ত একটা আকর্ষণ।
বয়স তাঁর মুখে কিছু সূক্ষ্ম রেখা এঁকে দিয়েছে, কিন্তু সেই রেখাগুলোকে ক্লান্তির চিহ্নের চেয়ে জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ বলেই বেশি মনে হয়। চোখের চারপাশের হালকা ভাঁজ, কথা বলার সময় ভ্রু সামান্য কুঁচকে যাওয়া, কিংবা কাউকে দেখে মৃদু হাসার অভ্যাস—এসবের মধ্যে এমন এক স্বাভাবিকতা ছিল, যা আলাদা করে নজর কাড়তে চাইত না, অথচ চোখ এড়িয়েও যেত না।
আমাকে দেখে তিনি একটু হাসলেন।
— এত বৃষ্টির মধ্যে সত্যিই চলে এলে?
— আপনি অসুস্থ, আর আমি আসব না?
তিনি দরজাটা একটু বেশি খুলে পাশে সরে দাঁড়ালেন।
— এসো বাবা, ভেতরে এসো। পুরো ভিজে গেছ তো!
ঘরে ঢুকে ছাতাটা এক পাশে রাখলাম। আমার জামার হাতা আর প্যান্টের নিচের অংশ ভিজে গিয়েছিল।
নাজমা আন্টি দরজাটা বন্ধ করে বললেন,
— তোয়ালে এনে দিই?
— না, দরকার নেই। আপনি বরং বসুন। আপনার শরীর কেমন লাগছে এখন?
তিনি ধীরে ধীরে বসার ঘরের দিকে এগোলেন। হাঁটার ভঙ্গিতে ক্লান্তি ছিল, তবে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার একটা চেষ্টা স্পষ্ট। আমি তাঁর পেছনে গিয়ে সোফার পাশে দাঁড়ালাম।
বসার ঘরটা পরিষ্কার, গোছানো। টেবিলের ওপর কয়েকটা বই, একটা পানির বোতল, আর পাশে রাখা চশমা। ঘরের এক কোণে মিলির কিছু পড়ার জিনিস এখনও পড়ে আছে। তার অনুপস্থিতি যেন ছোট ছোট জিনিসের মধ্যেও ধরা পড়ছিল।
একটা বাড়ি যে শুধু দেয়াল আর আসবাবপত্র দিয়ে তৈরি হয় না, তা সেদিন বেশ ভালো করে বুঝতে পারলাম। মানুষের উপস্থিতিই বাড়ির আসল শব্দ। সেই শব্দ না থাকলে পরিচিত ঘরও কেমন নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
নাজমা আন্টি সোফায় বসে শালটা কাঁধের ওপর টেনে নিলেন। তাঁর মুখে ক্লান্তির ছাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
— সকাল থেকে ঠিকমতো কিছু খাওয়া হয়নি, তাই না? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
— একটু খেয়েছিলাম। তারপর আর ভালো লাগেনি।
— এটা তো ঠিক করেননি। শরীর খারাপ হলে না খেয়ে থাকলে আরও দুর্বল লাগবে।
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— দেখেছ, মিলি বাড়িতে না থাকলে এখন আমাকে বকাঝকা করার লোকও নেই। তুমিই এসে শুরু করলে!
— বকাঝকা করছি না, আন্টি। বলছি, নিজের যত্ন নিতে হবে।
— আচ্ছা বাবা, আর বলব না। এখন খুশি?
তাঁর এই ছোট্ট রসিকতায় আমিও হেসে ফেললাম। অসুস্থতার মধ্যেও কথার স্বাভাবিক ছন্দটা ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন তিনি।
আমি রান্নাঘর থেকে একটা গ্লাসে পানি এনে দিলাম। তিনি গ্লাসটা হাতে নিলেন। আঙুলের ভঙ্গিতে সামান্য দুর্বলতা চোখে পড়ল। পানি খেয়ে গ্লাসটা টেবিলে রাখার সময় তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তুমি না এলে আজ সত্যিই খুব অসহায় লাগত।
কথাটা শুনে বুকের ভেতর একটা নরম অনুভূতি জেগে উঠল।
— এসব বলবেন না। দরকার হলে আমাকে ফোন করবেন। আমি তো কাছেই আছি।
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দৃষ্টি সরিয়ে জানালার দিকে তাকালেন। কাচের ওপরে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়ছে। বাইরে মেঘের গর্জন শোনা গেল।
— জানো, রাহাত, সন্ধ্যার পর একা বাড়িতে থাকলে অসুস্থতাটা যেন আরও বেশি করে টের পাওয়া যায়। দিনের বেলায় কিছু না কিছু করা যায়। কিন্তু সন্ধ্যা হলে চারদিক চুপচাপ হয়ে আসে। তখন নিজের শরীরের কষ্টটাও বেশি মনে হয়।
আমি তাঁর কথার মধ্যে বাধা দিলাম না।
কিছু কিছু সময় মানুষকে পরামর্শ দেওয়ার চেয়ে মন দিয়ে শোনাটাই বেশি জরুরি। বিশেষ করে যখন সে নিজের দুর্বলতার কথা খুব সহজে কাউকে বলতে পারে না।
নাজমা আন্টির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, এতদিন তাঁকে আমরা মূলত মিলির মা হিসেবেই দেখেছি। আমার কাছে উনার প্রতি আকর্ষন টা অন্যরকম ছিল মাজেমধ্যে কিন্তু এই চিন্তা নিয়ে বেশি আগাই নি কখনো, তাও ভাবি তাঁর নিজস্ব একটা জীবন আছে, নিজের ক্লান্তি আছে, নিজের নিঃসঙ্গতাও আছে—এসব নিয়ে আলাদা করে কখনো ভাবিনি।
মায়ের পরিচয়ের বাইরে একজন নারীও যে কখনো একা হয়ে পড়েন, কখনো কারও সঙ্গ চান, কখনো নিজের অসুস্থতার কথা বলে একটু নিশ্চিন্ত হতে চান—সেটা সেদিন নতুন করে উপলব্ধি করলাম।
তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হলো, মানুষের সৌন্দর্যকে হয়তো সব সময় সাজসজ্জা দিয়ে প্রকাশ করতে হয় না। কখনো একটা ক্লান্ত মুখ, মৃদু স্বরে বলা কয়েকটি কথা, কিংবা নিজের দুর্বলতা লুকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টার মধ্যেও এক ধরনের গভীর মানবিক আকর্ষণ থাকে।
আমি অবশ্য নিজের এই ভাবনাকে আর বেশি দূর এগোতে দিলাম না। তিনি অসুস্থ, আর আমাকে ডেকেছেন ভরসা করে। এই মুহূর্তে আমার প্রথম কাজ তাঁর যত্ন নেওয়া।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
— আন্টি, আগে আপনার জ্বরটা মাপি। তারপর কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করি। প্রয়োজন হলে ডাক্তারকে ফোন করব।
তিনি একটু অবাক হয়ে তাকালেন।
— তুমি এত কিছু করবে?
— এত কিছু মানে? আপনার শরীর খারাপ। এটুকু তো করতেই পারি।
তিনি মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
— তোমাকে ডেকে ভালোই করেছি, বাবা।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার ওপারে শহরটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল, আর ঘরের ভেতর মৃদু আলোয় নাজমা আন্টির মুখে ক্লান্তির সঙ্গে মিশে ছিল এক ধরনের স্বস্তি।
সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর পাশে বসে আমার মনে হয়েছিল, মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন পরিচিত সম্পর্কগুলোর অর্থ একটু বদলে যায়। কোনো নাটকীয় ঘটনা ঘটে না, কোনো বড় প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয় না। শুধু একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে বসে থাকে—বাইরে বৃষ্টি পড়ে, ঘরের ভেতর কথাবার্তা ধীরে ধীরে এগোয়, আর সেই সাধারণ সময়টুকুই অজান্তে স্মৃতির মধ্যে জায়গা করে নেয়।
আমি তখনও জানতাম না, নাজমা আন্টির সঙ্গে এই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাটা আমার কাছে কতটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শুধু এটুকু জানতাম—সেদিন তিনি একা ছিলেন, অসুস্থ ছিলেন, আর আমাকে বিশ্বাস করে ডেকেছিলেন।
সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখাই তখন আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। দুপুরের পর থেকে মেঘগুলো যেন আরও নিচে নেমে এসেছিল, আর বিকেল গড়াতেই শুরু হয়েছিল বৃষ্টি। প্রথমে হালকা, তারপর ক্রমশ প্রবল। ছাদের কার্নিশ বেয়ে পানি পড়ছিল অবিরাম, গাছের পাতাগুলো বৃষ্টির ভারে নুয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠলেও বৃষ্টির পর্দার ওপারে শহরটাকে কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছিল।
আমি ঘরে বসে পড়ার চেষ্টা করছিলাম। বই খোলা ছিল সামনে, কিন্তু মন পড়ায় ছিল না। মাঝেমধ্যে জানালার দিকে তাকাচ্ছিলাম। বৃষ্টির শব্দের মধ্যে একটা অদ্ভুত একাকিত্ব আছে—যেন বাইরের পৃথিবীটাকে ধুয়ে-মুছে দূরে সরিয়ে দেয়, আর মানুষকে নিজের ভাবনার সামনে একা বসিয়ে রাখে।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নাজমা আন্টির নাম দেখে একটু অবাক হলাম। মিলি এখন পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য হলে থাকে। তাই আন্টির সঙ্গে আগের মতো নিয়মিত দেখা হয় না, কথাও হয় মাঝেমধ্যে।
কল ধরতেই ওপাশ থেকে তাঁর কণ্ঠস্বর পেলাম।
— রাহাত, তুমি কি এখন ব্যস্ত?
কণ্ঠটা পরিচিত, কিন্তু তাতে যেন ক্লান্তির একটা আস্তরণ পড়েছে।
— না, আন্টি। বলুন। কী হয়েছে?
তিনি একটু থেমে বললেন,
— আমার শরীরটা আজ একদম ভালো লাগছে না বাবা। সকাল থেকে জ্বর জ্বর ভাব। বিকেলের দিকে আরও খারাপ লাগছে।
— জ্বর মেপেছেন?
— না। মাপা হয়নি। মাথাটাও কেমন ভার হয়ে আছে। কিছু খেতেও ইচ্ছে করছে না।
আমি বইটা বন্ধ করে দিলাম।
— মিলিকে বলেছেন?
প্রশ্নটা শুনে তিনি তাড়াতাড়ি উত্তর দিলেন,
— না, ওকে বলিনি। বললে মেয়েটা অস্থির হয়ে যাবে। পরীক্ষার জন্য কত কষ্ট করে হলে থেকে পড়ছে! এখন যদি জানতে পারে আমি অসুস্থ, তাহলে এই বৃষ্টির মধ্যেই চলে আসতে চাইবে। ওর পড়াশোনার ক্ষতি হবে, তার ওপর অযথা দুশ্চিন্তা করবে।
মায়ের কণ্ঠে সন্তানের জন্য যে উদ্বেগ থাকে, কথাগুলোর মধ্যে তা স্পষ্ট ছিল। নিজের অসুস্থতা নিয়ে তাঁর যতটা না চিন্তা, তার চেয়ে বেশি চিন্তা মিলিকে নিয়ে।
আমি বললাম,
— আপনি একা আছেন, আর শরীর খারাপ। আমাকে আগে বলেননি কেন?
— ভাবলাম, একটু বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এখন আর ভালো লাগছে না। বাড়িটাও কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
শেষ কথাটা খুব আস্তে বললেন তিনি।
আমি জানি, মিলি বাড়িতে থাকলে নাজমা আন্টির দিনটা কতটা ব্যস্ততায় কাটে। মেয়েকে নিয়ে ছোটখাটো বকাবকি, রান্নাঘরে যাতায়াত, কখনো পড়ার খোঁজ নেওয়া—এসবের মধ্যেই একটা বাড়ি জীবন্ত থাকে। সেই মেয়েটা এখন কয়েক দিনের জন্য দূরে। আর ঠিক সেই সময়েই অসুস্থতা এসে তাঁকে একা করে দিয়েছে।
আমি আর দেরি করলাম না।
— আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আসছি।
— এই বৃষ্টিতে আসবে?
— আপনি একা আছেন। বৃষ্টি একটু কমলে তো আরও দেরি হবে। আমি সাবধানে আসব।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর তিনি বললেন,
— আচ্ছা বাবা। সাবধানে এসো।
ফোন রাখার পর একটা ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
বাইরে পা দিতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল। রাস্তায় হাঁটুসমান পানি না হলেও বেশ কিছু জায়গায় পানি জমে ছিল। যানবাহন চলছিল ধীরে, আর বৃষ্টির ছাঁটে রাস্তার পাশের দোকানগুলোর সামনের অংশ ভিজে যাচ্ছিল। একটা রিকশা পেয়ে উঠে বসলাম। গন্তব্যে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লাগল।
নাজমা আন্টিদের বাসার সামনে পৌঁছানোর সময় সন্ধ্যা আরও গাঢ় হয়েছে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কলিংবেল চাপলাম।
কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল। তারপর দরজাটা খুলে গেল।
নাজমা আন্টিকে দেখে প্রথমেই মনে হলো, অসুস্থতা তাঁকে বেশ ক্লান্ত করে দিয়েছে।
মুখটা স্বাভাবিকের তুলনায় ফ্যাকাসে, চোখের নিচে হালকা ক্লান্তির ছাপ। কপালের কাছে কয়েকটি চুল এলোমেলো হয়ে আছে। চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে, পরিচর্যার স্বাভাবিক পরিপাটিটুকু যেন আজ আর বজায় রাখার শক্তি পাননি। পরনে সাধারণ একটা শাড়ি, গায়ে হালকা শাল। শাড়ির রংটা ঘরের মৃদু আলোয় আরও শান্ত, আরও ম্লান দেখাচ্ছিল। কিন্তু তাও ভিতর থেকে তার পেটানো শরীরটা যেন ঊঁকি দিচ্ছে।
তবু তাঁর শরীরের মধ্যে এমন একটা স্বাভাবিক সৌন্দর্য ছিল, যা অসুস্থতার ক্লান্তিতেও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
মধ্যবয়সী একজন নারীর সৌন্দর্যকে কেবল মুখের গড়ন দিয়ে বিচার করা যায় না—অন্তত আমার তখন তেমনই মনে হলো। তাঁর চোখের দৃষ্টিতে ছিল অভিজ্ঞতার গভীরতা, ঠোঁটের কোণে ছিল পরিচিত স্নেহের আভাস, আর কথা বলার ভঙ্গিতে এমন এক স্বচ্ছন্দতা, যা সময়ের সঙ্গে তৈরি হয়। তাঁর সৌন্দর্যে কিশোরীসুলভ চঞ্চলতা ছিল না; বরং ছিল পরিণত, শান্ত একটা আকর্ষণ।
বয়স তাঁর মুখে কিছু সূক্ষ্ম রেখা এঁকে দিয়েছে, কিন্তু সেই রেখাগুলোকে ক্লান্তির চিহ্নের চেয়ে জীবনের অভিজ্ঞতার ছাপ বলেই বেশি মনে হয়। চোখের চারপাশের হালকা ভাঁজ, কথা বলার সময় ভ্রু সামান্য কুঁচকে যাওয়া, কিংবা কাউকে দেখে মৃদু হাসার অভ্যাস—এসবের মধ্যে এমন এক স্বাভাবিকতা ছিল, যা আলাদা করে নজর কাড়তে চাইত না, অথচ চোখ এড়িয়েও যেত না।
আমাকে দেখে তিনি একটু হাসলেন।
— এত বৃষ্টির মধ্যে সত্যিই চলে এলে?
— আপনি অসুস্থ, আর আমি আসব না?
তিনি দরজাটা একটু বেশি খুলে পাশে সরে দাঁড়ালেন।
— এসো বাবা, ভেতরে এসো। পুরো ভিজে গেছ তো!
ঘরে ঢুকে ছাতাটা এক পাশে রাখলাম। আমার জামার হাতা আর প্যান্টের নিচের অংশ ভিজে গিয়েছিল।
নাজমা আন্টি দরজাটা বন্ধ করে বললেন,
— তোয়ালে এনে দিই?
— না, দরকার নেই। আপনি বরং বসুন। আপনার শরীর কেমন লাগছে এখন?
তিনি ধীরে ধীরে বসার ঘরের দিকে এগোলেন। হাঁটার ভঙ্গিতে ক্লান্তি ছিল, তবে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার একটা চেষ্টা স্পষ্ট। আমি তাঁর পেছনে গিয়ে সোফার পাশে দাঁড়ালাম।
বসার ঘরটা পরিষ্কার, গোছানো। টেবিলের ওপর কয়েকটা বই, একটা পানির বোতল, আর পাশে রাখা চশমা। ঘরের এক কোণে মিলির কিছু পড়ার জিনিস এখনও পড়ে আছে। তার অনুপস্থিতি যেন ছোট ছোট জিনিসের মধ্যেও ধরা পড়ছিল।
একটা বাড়ি যে শুধু দেয়াল আর আসবাবপত্র দিয়ে তৈরি হয় না, তা সেদিন বেশ ভালো করে বুঝতে পারলাম। মানুষের উপস্থিতিই বাড়ির আসল শব্দ। সেই শব্দ না থাকলে পরিচিত ঘরও কেমন নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
নাজমা আন্টি সোফায় বসে শালটা কাঁধের ওপর টেনে নিলেন। তাঁর মুখে ক্লান্তির ছাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
— সকাল থেকে ঠিকমতো কিছু খাওয়া হয়নি, তাই না? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
— একটু খেয়েছিলাম। তারপর আর ভালো লাগেনি।
— এটা তো ঠিক করেননি। শরীর খারাপ হলে না খেয়ে থাকলে আরও দুর্বল লাগবে।
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
— দেখেছ, মিলি বাড়িতে না থাকলে এখন আমাকে বকাঝকা করার লোকও নেই। তুমিই এসে শুরু করলে!
— বকাঝকা করছি না, আন্টি। বলছি, নিজের যত্ন নিতে হবে।
— আচ্ছা বাবা, আর বলব না। এখন খুশি?
তাঁর এই ছোট্ট রসিকতায় আমিও হেসে ফেললাম। অসুস্থতার মধ্যেও কথার স্বাভাবিক ছন্দটা ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন তিনি।
আমি রান্নাঘর থেকে একটা গ্লাসে পানি এনে দিলাম। তিনি গ্লাসটা হাতে নিলেন। আঙুলের ভঙ্গিতে সামান্য দুর্বলতা চোখে পড়ল। পানি খেয়ে গ্লাসটা টেবিলে রাখার সময় তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তুমি না এলে আজ সত্যিই খুব অসহায় লাগত।
কথাটা শুনে বুকের ভেতর একটা নরম অনুভূতি জেগে উঠল।
— এসব বলবেন না। দরকার হলে আমাকে ফোন করবেন। আমি তো কাছেই আছি।
তিনি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দৃষ্টি সরিয়ে জানালার দিকে তাকালেন। কাচের ওপরে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো গড়িয়ে পড়ছে। বাইরে মেঘের গর্জন শোনা গেল।
— জানো, রাহাত, সন্ধ্যার পর একা বাড়িতে থাকলে অসুস্থতাটা যেন আরও বেশি করে টের পাওয়া যায়। দিনের বেলায় কিছু না কিছু করা যায়। কিন্তু সন্ধ্যা হলে চারদিক চুপচাপ হয়ে আসে। তখন নিজের শরীরের কষ্টটাও বেশি মনে হয়।
আমি তাঁর কথার মধ্যে বাধা দিলাম না।
কিছু কিছু সময় মানুষকে পরামর্শ দেওয়ার চেয়ে মন দিয়ে শোনাটাই বেশি জরুরি। বিশেষ করে যখন সে নিজের দুর্বলতার কথা খুব সহজে কাউকে বলতে পারে না।
নাজমা আন্টির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, এতদিন তাঁকে আমরা মূলত মিলির মা হিসেবেই দেখেছি। আমার কাছে উনার প্রতি আকর্ষন টা অন্যরকম ছিল মাজেমধ্যে কিন্তু এই চিন্তা নিয়ে বেশি আগাই নি কখনো, তাও ভাবি তাঁর নিজস্ব একটা জীবন আছে, নিজের ক্লান্তি আছে, নিজের নিঃসঙ্গতাও আছে—এসব নিয়ে আলাদা করে কখনো ভাবিনি।
মায়ের পরিচয়ের বাইরে একজন নারীও যে কখনো একা হয়ে পড়েন, কখনো কারও সঙ্গ চান, কখনো নিজের অসুস্থতার কথা বলে একটু নিশ্চিন্ত হতে চান—সেটা সেদিন নতুন করে উপলব্ধি করলাম।
তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হলো, মানুষের সৌন্দর্যকে হয়তো সব সময় সাজসজ্জা দিয়ে প্রকাশ করতে হয় না। কখনো একটা ক্লান্ত মুখ, মৃদু স্বরে বলা কয়েকটি কথা, কিংবা নিজের দুর্বলতা লুকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টার মধ্যেও এক ধরনের গভীর মানবিক আকর্ষণ থাকে।
আমি অবশ্য নিজের এই ভাবনাকে আর বেশি দূর এগোতে দিলাম না। তিনি অসুস্থ, আর আমাকে ডেকেছেন ভরসা করে। এই মুহূর্তে আমার প্রথম কাজ তাঁর যত্ন নেওয়া।
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
— আন্টি, আগে আপনার জ্বরটা মাপি। তারপর কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করি। প্রয়োজন হলে ডাক্তারকে ফোন করব।
তিনি একটু অবাক হয়ে তাকালেন।
— তুমি এত কিছু করবে?
— এত কিছু মানে? আপনার শরীর খারাপ। এটুকু তো করতেই পারি।
তিনি মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
— তোমাকে ডেকে ভালোই করেছি, বাবা।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার ওপারে শহরটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল, আর ঘরের ভেতর মৃদু আলোয় নাজমা আন্টির মুখে ক্লান্তির সঙ্গে মিশে ছিল এক ধরনের স্বস্তি।
সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর পাশে বসে আমার মনে হয়েছিল, মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন পরিচিত সম্পর্কগুলোর অর্থ একটু বদলে যায়। কোনো নাটকীয় ঘটনা ঘটে না, কোনো বড় প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয় না। শুধু একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে বসে থাকে—বাইরে বৃষ্টি পড়ে, ঘরের ভেতর কথাবার্তা ধীরে ধীরে এগোয়, আর সেই সাধারণ সময়টুকুই অজান্তে স্মৃতির মধ্যে জায়গা করে নেয়।
আমি তখনও জানতাম না, নাজমা আন্টির সঙ্গে এই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাটা আমার কাছে কতটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শুধু এটুকু জানতাম—সেদিন তিনি একা ছিলেন, অসুস্থ ছিলেন, আর আমাকে বিশ্বাস করে ডেকেছিলেন।
সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখাই তখন আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)