Yesterday, 08:29 AM
সে আজকে সত্যিই ভেঙে পড়েছিল। বিয়ের ভয় তার ভিতরের দেয়াল নড়িয়ে দিয়েছিল। সেই ফাঁক দিয়ে তার শরীর বেরিয়ে এসেছিল — না বলে, না চেয়ে, শুধু চেপে ধরে। তার দুধ আমার মুখে এসেছিল। তার নিপল শক্ত হয়ে উঠেছিল। তার গুদ ভিজে গিয়েছিল। সে চেয়েছিল ভুলে যেতে। চেয়েছিল কেউ তাকে শুধু সান্ত্বনা না দিয়ে, তার শরীরকেও ছুঁয়ে দেখুক। কারণ সেই মুহূর্তে তার মন দুর্বল ছিল, আর দুর্বল মন শরীরের উষ্ণতায় আশ্রয় খোঁজে।
রিকশার জানালা দিয়ে রাতের আলো আসছিল। আমি ফারিয়ার কথা ভাবছিলাম।
সে আজকে সত্যিই ভেঙে পড়েছিল। বিয়ের ভয় তার ভিতরের সেই শান্ত, লাজুক মেয়েটাকে একটু সরিয়ে দিয়েছিল। সেই ফাঁক দিয়ে তার শরীর বেরিয়ে এসেছিল। আমি যখন তার নিপল মুখে নিয়েছিলাম, তার গুদে আঙুল ঢুকিয়েছিলাম, তার পাছা চেপে ধরেছিলাম — সে সরে যায়নি। বরং তার হাত আমার চুলে ঢুকেছিল। তার শ্বাস ভারী হয়েছিল। তার গুদ ভিজে গিয়েছিল। সে চেয়েছিল ভুলে যেতে। আর ভুলে যাওয়ার জন্য সে তার শরীরকে আমার হাতে দিয়েছি।
আমি জানি। সে ভাবছে, আমি কাঁদতে কাঁদতে তার সাথে পার্কে গেলাম। নিজেকে খুলে দিলাম। আমি কি এতটাই দুর্বল? এই চিন্তা তাকে লজ্জা দিচ্ছে। তার বাবার কথা, বিয়ের কথা, সেই অজানা ছেলের কথা — সব মিলে তাকে বলছে যে আজকে যা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি। সে নিজেকে খারাপ মেয়ে ভাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু পুরোপুরি পারছে না। কারণ তার ভিতরে আরও একটা স্বর আছে, যেটা জানে যে সে কাউকে জোর করেনি। সে শুধু একটু ভুলে যেতে চেয়েছিল। আর সেই ভুলে যাওয়ার মধ্যে তার শরীরও জেগে উঠেছিল।
এখন তার মন আর শরীর আলাদা কথা বলছে।
তার মন বলছে, এটা ভুল হয়েছে। কালকে স্বাভাবিক থাকতে হবে। রাহাত যেন টের না পায় যে আমার শরীর এখনো সেই ছোঁয়া মনে করছে। কিন্তু তার শরীর অন্য কথা বলছে। তার নিপল এখনো সংবেদনশীল। তার উরুর ভিতরে এখনো সেই স্যাঁতস্যাঁতে অনুভূতি রয়ে গেছে। সে যখন বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করবে, তখন আমার মুখের স্পর্শ, আমার আঙুলের চাপ — সব মনে পড়বে। আর মনে পড়লেই তার শরীর আবার একটু গরম হয়ে উঠবে। এই গরম হওয়া তাকে আরও বিভ্রান্ত করবে। কারণ সে বুঝতে পারবে না — সে কি শুধু সান্ত্বনা চেয়েছিল, নাকি সত্যিই চেয়েছিল যে কেউ তার শরীরকে এভাবে ব্যবহার করুক?
ফারিয়া এখন এই দ্বন্দ্বে আছে।
সে আমাকে বিশ্বাস করে। সে জানে আমি তার দুর্বলতায় আগে সুযোগ নিইনি। কিন্তু আজকে সে নিজেই সুযোগ দিয়েছে। তাই সে ভাবছে, আমি কি তার দুর্বলতা দেখে এগিয়ে এসেছি, নাকি সেই আমাকে টেনেছে? এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না। আর না জানায় সে ভয় পাচ্ছে। ভয় পাচ্ছে যে কালকে যখন চোখে চোখ পড়বে, তখন তার শরীর আবার সাড়া দেবে কিনা। সে চায় না যে আমি টের পাই। তাই সে বলেছে, “স্বাভাবিক থাকবি।”
কিন্তু আমি জানি, সেই স্বাভাবিক থাকা তার জন্য সহজ হবে না।
কারণ তার শরীর আজকে একবার জেগে উঠেছিল। তার দুধ আমার মুখে এসেছিল। তার গুদ আমার আঙুল চেপে ধরেছিল। তার পাছা আমার তালুতে কেঁপেছিল। সেই জেগে ওঠা সহজে ঘুমাবে না। সে এখন নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করবে যে এটা শুধু একটা দুর্বল মুহূর্ত ছিল। কিন্তু তার শরীর সেই কথা মানবে না। তার শরীর জানে যে সেই মুহূর্তে সে নিজেই চেয়েছিল।
আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম।
ফারিয়া এখন তার রুমে। হয়তো চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। হয়তো নিজের বুকের উপর হাত রেখে ভাবছে, আমি কি খারাপ মেয়ে হয়ে গেলাম? নাকি শুধু একটু সত্যি হয়ে গিয়েছিলাম?
আমি জানি না সে কী সিদ্ধান্ত নেবে।
কিন্তু জানি, তার শরীর আজকে যা চেয়েছিল, সেটা তার মন এখনো পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারবে না।
পরদিন সকাল থেকেই আবার সেই পুরোনো রুটিনে ফিরে যাওয়ার কথা। ক্লাস, নোটস, গ্রুপ স্টাডি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চেনা ব্যস্ততা। মাঝখানে কত কিছু ঘটে গেছে, কত কথা জমেছে, কত সম্পর্কের সমীকরণ বদলেছে; অথচ বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, জীবন নিজের নিয়মেই চলছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোনটা হাতে নিতেই গ্রুপে একের পর এক মেসেজ চোখে পড়ল।
মিলি: — কাল থেকে সবাই ঠিকমতো পড়তে বসবি তো? নাকি আবার গ্রুপ স্টাডির নামে আড্ডা হবে?
সাদিয়া: — পড়তে বসার আগে এই ঘোষণা কে দিল? নিজে কতক্ষণ পড়বি সেটা বল আগে।
ফারিন: — আমার তো মনে হয়, মিলি নিজেই পড়তে চায় না। সবাইকে ডেকে নিজের একাকিত্ব দূর করবে।
মিলি: — তোরা আমার নামে এত অপবাদ দিস কেন? ?
ফারিয়া: — কারণ তুই নির্দোষ হলে আমাদের এত বিনোদনের অভাব হয়ে যেত।
আমি মেসেজগুলো পড়ে হেসে ফেললাম। তারপর লিখলাম—
রাহাত: — তোদের পড়াশোনার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের চেয়ে গ্রুপের কমেন্টের উত্তর দেওয়াই বেশি কঠিন হবে।
সাদিয়া: — বাহ! জনাব রাহাত সাহেবও উপস্থিত। তা, গত পরীক্ষায় নিজের অবস্থা মনে আছে তো?
রাহাত: — অতীত নিয়ে আলোচনা করে বর্তমান নষ্ট করতে চাই না।
ফারিন: — মানে অবস্থা খারাপ ছিল। বুঝেছি।
রাহাত: — তোমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় একাডেমিক ভুল।
মিলি: — বেশি কথা না বলে কাল সময়মতো আসিস। নোটস নিয়ে আসবি।
রাহাত: — জি ম্যাডাম। আপনার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।
ফারিয়া: — এই যে এত ভদ্রতা! সামনে দেখা হলে যেন চিনতে পারি।
রাহাত: — চিনতে না পারলে পরিচয়পত্র দেখাব।
ফারিয়া: — পরিচয়পত্রে কি লেখা থাকবে, ‘বিশেষভাবে বিরক্তিকর’?
রাহাত: — না, লেখা থাকবে ‘বন্ধুদের দ্বারা মানসিকভাবে নির্যাতিত’।
এরপর কিছুক্ষণ শুধু হাসির ইমোজি আর একে অন্যকে খোঁচা দেওয়ার পালা চলল। এমন ছোটখাটো কথাবার্তাই হয়তো বন্ধুত্বের আসল সৌন্দর্য। এখানে কাউকে নিজের মনের অবস্থা ব্যাখ্যা করতে হয় না, প্রতিটি কথার পেছনে কোনো গভীর অর্থ খুঁজতে হয় না। কখনো কখনো একটা সাধারণ হাসিই যথেষ্ট।
গ্রুপের মেসেজ দেখতে দেখতে হঠাৎ ঐশীর নামটা চোখে পড়ল। এতক্ষণ সে চুপ ছিল।
ঐশী: — আচ্ছা, কাল সবাই কয়টায় আসবি? আমার কিছু নোটসও মিলিয়ে নিতে হবে।
মিলি: — এগারোটার দিকে চলে আয়।
ঐশী: — ঠিক আছে। রাহাত, তোর কাছে কি আগের ক্লাসের নোটস আছে?
আমি কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর দিলাম।
রাহাত: — আছে। নিয়ে আসব।
ঐশী: — থ্যাংকস।
রাহাত: — আরে, এতে থ্যাংকসের কী আছে? দরকার হলে নিয়ে নিস।
কথাবার্তাটা সেখানেই শেষ হয়ে গেল। না কোনো অস্বস্তিকর প্রশ্ন, না পুরোনো প্রসঙ্গ টেনে আনা। আমাদের মধ্যে যা কিছু কথা হয়েছিল, তার সবটাই যে প্রতিবার আলোচনায় আনতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। কিছু বিষয় সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
ফোনটা পাশে রেখে ভাবলাম, হয়তো এভাবেই সবকিছুকে স্বাভাবিক হতে দিতে হয়। কাউকে তাড়া না দিয়ে, কারও কাছ থেকে জবাবদিহি দাবি না করে।
বিকেলের দিকে ফারিন আলাদা করে মেসেজ দিল।
ফারিন: — কালকের পড়ার জন্য কিছু প্রস্তুতি নিয়েছিস?
রাহাত: — হ্যাঁ, বইটা খুলে টেবিলে রেখেছি।
ফারিন: — তারপর?
রাহাত: — তারপর বইয়ের দিকে তাকিয়ে জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে ভাবছিলাম।
ফারিন: — তোর চিকিৎসা দরকার।
রাহাত: — সেটা অনেক দিন ধরেই জানি। কিন্তু ভালো ডাক্তার পাচ্ছি না।
ফারিন: — পেলে আমাকেও জানাস। তোকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করব।
আমি হাসলাম। ফারিনের সঙ্গে কথাবার্তা বরাবরই এমন—সহজ, দ্রুত, খুনসুটিতে ভরা। কখনো কখনো ওর কথার আড়ালে অন্য কোনো অনুভূতি আছে কি না, সেটা নিয়ে ভাবার সুযোগ হয়েছিল; কিন্তু সেদিন আর সেসব নিয়ে মাথা ঘামালাম না।
কিছুক্ষণ পর সাদিয়ার মেসেজ এল।
সাদিয়া: — কাল দেরি করে আসিস না। তোর জন্য বসে থাকতে ভালো লাগে না।
রাহাত: — আমি তোকে বসে থাকতে বলেছি নাকি?
সাদিয়া: — না, কিন্তু তুই দেরি করলে তোকে বকতে আমার ভালো লাগে।
রাহাত: — বন্ধুত্বের নামে অত্যাচার।
সাদিয়া: — মানিয়ে নে।
ব্যস। ছোট্ট কথোপকথন, সামান্য খুনসুটি। রাতের কোনো দীর্ঘ আলাপ নয়, অতীতের কোনো হিসাব নয়। আমরা বন্ধুদের মতোই কথা বললাম।
সন্ধ্যায় মিলি আবার গ্রুপে সবাইকে মনে করিয়ে দিল, পরদিন যেন কেউ পড়াশোনার বদলে আড্ডা দিতে না বসে। স্বাভাবিকভাবেই সবাই তার কথার প্রতিবাদ করল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, প্রথম এক ঘণ্টা পড়াশোনা, তারপর চা খেতে যাওয়া যাবে—যদিও কেউই বিশ্বাস করছিল না যে প্রথম এক ঘণ্টা সত্যিই পড়া হবে।
রাত বাড়তে থাকল। ফোনের স্ক্রিন একসময় নিস্তব্ধ হয়ে এল। আমি পরদিনের বইপত্র গুছিয়ে রাখলাম। ব্যাগে নোটবুক, কলম, আগের ক্লাসের খাতা—সব ঠিকঠাক আছে কি না দেখে নিলাম।
জীবনে সবকিছু একসঙ্গে ঠিক হয়ে যায় না। কিছু প্রশ্ন থেকে যায়, কিছু অনুভূতি অমীমাংসিত থাকে, কিছু মানুষকে বুঝতে সময় লাগে। তবু পরদিন সকালে ক্লাসে যেতে হবে, বন্ধুদের সঙ্গে বসতে হবে, কারও নোটস মিলিয়ে দিতে হবে, কারও সঙ্গে হাসাহাসি করতে হবে।
আর সেটাই তো জীবন।
পরদিন সকাল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে ঢুকতেই দূর থেকে মিলির কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
— এই যে! মহারাজ অবশেষে এসেছেন!
মিলি, ফারিন আর ফারিয়া একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল। একটু দূরে সাদিয়া ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিল, আর ঐশী হাতে কয়েকটা খাতা নিয়ে ক্লাসরুমের দিকে যাচ্ছিল।
আমি কাছে যেতেই মিলি বলল,
— নোটস এনেছিস?
— সুপ্রভাত বলারও সময় পেলাম না, সরাসরি নোটস!
ফারিন হেসে বলল,
— ওর জীবনে নোটসই প্রথম, বন্ধুরা পরে।
— তোদের বন্ধুত্বের সংজ্ঞা খুব অদ্ভুত, বুঝলি?
ফারিয়া আমার হাত থেকে ব্যাগটা টেনে নিয়ে বলল,
— দেখি, সত্যিই এনেছিস, নাকি আবার গল্প বানাচ্ছিস।
— এই যে! আমার ব্যাগ তল্লাশি করার ওয়ারেন্ট আছে?
— আছে। বন্ধুত্বের ওয়ারেন্ট।
আমরা হাসতে হাসতে ক্লাসরুমে ঢুকলাম।
ঐশী ইতিমধ্যে একটা বেঞ্চে বসে খাতা খুলেছে। আমাকে দেখে বলল,
— নোটসটা একটু দিবি? আমার আগের ক্লাসের একটা অংশ বাদ পড়েছে।
আমি খাতাটা এগিয়ে দিলাম।
— এই নে। দেখে নিস, কিছু বুঝতে অসুবিধা হলে বলিস।
— আচ্ছা।
সাদিয়া এসে পাশের চেয়ার টেনে বসল।
— তোরা শুরু করেছিস, আর আমাকে ডাকিসনি?
মিলি বলল,
— তুই তো ফোনে ব্যস্ত ছিলি।
— তাই বলে আমার শিক্ষাজীবন থেমে থাকবে?
— তোর শিক্ষাজীবন নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
আবার হাসির রোল উঠল।
ক্লাস শুরু হওয়ার আগে আমরা সবাই মিলে নোটস মিলিয়ে নিলাম। কেউ একটা বিষয় বুঝতে না পারলে অন্যজন বোঝাল, কেউ ভুল উত্তর দিলে বাকিরা মিলে তাকে নিয়ে মজা করল। ফারিন মাঝেমধ্যে পড়া বাদ দিয়ে অন্য প্রসঙ্গ তুলছিল, আর মিলি বারবার তাকে মূল বিষয়ে ফিরিয়ে আনছিল। সাদিয়া একসময় ঘোষণা করল, এই গ্রুপে পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে নতুন বন্ধু খুঁজতে হবে।
ফারিয়া বলল,
— নতুন বন্ধু খুঁজে লাভ নেই। রাহাতের মতো বিরক্তিকর মানুষ আর পাওয়া যাবে না।
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
— তোমাদের এই ভালোবাসা একদিন আমাকে বিখ্যাত করবে।
— আগে পরীক্ষায় পাস কর, তারপর বিখ্যাত হবি—ঐশী শান্তভাবে বলল।
সবাই আবার হেসে উঠল।
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, এই মুহূর্তে আমাদের কারওই অতীতের সব প্রশ্নের উত্তর দরকার নেই। আমরা কেউ কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না, কেউ কোনো সম্পর্কের নাম নির্ধারণ করছি না। আমরা শুধু একসঙ্গে বসে পড়ছি, হাসছি, একে অন্যকে বিরক্ত করছি।
হয়তো এই স্বাভাবিকতার মধ্যেই একটা নতুন অধ্যায়ের শুরু।
আর আমি জানতাম না, এই চেনা দিনগুলোর আড়ালেই ভবিষ্যতে কত অচেনা ঘটনা অপেক্ষা করে আছে।
গ্রুপ স্টাডি শুরু হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পরেই আমাদের পড়াশোনার বারোটা বেজে গেল। মিলি একটা কঠিন প্রশ্ন নিয়ে ব্যস্ত, ঐশী তার খাতায় নোট তুলছে, আর সাদিয়া ফোনে কারও পাঠানো মেসেজ পড়ে মুচকি হাসছে। ফারিয়া মাঝেমধ্যে পড়ায় মন দিলেও ফারিনের মন যেন এক জায়গায় স্থির হচ্ছিল না।
আমি একটা প্রশ্নের উত্তর লিখছিলাম। হঠাৎ ফারিন আমার খাতার ওপর ঝুঁকে পড়ল।
— এই যে, তোর লেখা এত খারাপ কেন?
আমি কলম থামিয়ে ওর দিকে তাকালাম।
— আমার লেখা খারাপ, নাকি তুই পড়তে পারিস না?
— বাহ! নিজের অযোগ্যতা স্বীকার করার সাহস নেই দেখছি।
— তোর মতো সুন্দরী পরীক্ষক হলে হাতের লেখা এমনিতেই খারাপ হয়ে যায়।
কথাটা বলেই আবার খাতায় চোখ নামিয়ে নিলাম। ফারিন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর আমার বাহুতে হালকা একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,
— তুই কি সব মেয়েকেই এভাবে কথা বলিস?
— না তো।
— তাহলে?
— সবার সঙ্গে তো আর এত কথা বলার ইচ্ছা হয় না।
ফারিনের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
— ওহ! তাহলে আমি স্পেশাল?
— নিজেই বুঝে নে। সবকিছু মুখে বলে দিলে রহস্য থাকে কোথায়?
— রহস্য! তোর মধ্যে আবার রহস্য আছে নাকি? আমার তো মনে হয় তোর মাথার ভেতর শুধু ফাঁকা মাঠ।
— সেই মাঠে কিন্তু তুই বেশ ঘুরে বেড়াচ্ছিস।
ও এবার হাসি চাপতে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
— অসহ্য একটা ছেলে!
— তবু আমার পাশ থেকে উঠছিস না কেন?
ফারিন এবার আমার দিকে তাকাল। চোখে দুষ্টুমি, মুখে চাপা হাসি।
— কারণ তোর খাতা থেকে নোটস তুলতে হবে। বেশি কিছু ভেবে বসিস না।
— আমি তো কিছু ভাবিনি। তুই এত ব্যাখ্যা দিচ্ছিস কেন?
— রাহাত!
— জি, ফারিন সাহেবা?
— চুপ কর!
আমি হেসে আবার পড়ায় মন দিলাম। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, ফারিনও আর আগের মতো সহজে নিজের হাসিটা লুকাতে পারছে না।
দুপুরের দিকে পড়াশোনা শেষ করে সবাই ক্যান্টিনে গেলাম। চা আর সিঙ্গারা নিয়ে টেবিলে বসতেই আড্ডা শুরু হয়ে গেল। মিলি পরীক্ষার দুশ্চিন্তা নিয়ে কথা বলছিল, সাদিয়া তার সঙ্গে তর্ক করছিল, আর ফারিয়া আমাদের সবার পুরোনো কীর্তিকলাপ মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর মিলি আর সাদিয়াকে একটা কাজে বাইরে যেতে হলো। ফারিয়া ঐশীর সঙ্গে লাইব্রেরিতে যাবে বলে উঠে দাঁড়াল।
যাওয়ার আগে ফারিয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোরা আবার পড়াশোনা বাদ দিয়ে আড্ডা শুরু করিস না।
আমি বললাম,
— আমরা খুবই ভদ্র মানুষ।
ফারিন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— এই কথাটা রেকর্ড করে রাখা উচিত। ভবিষ্যতে প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগবে।
সবাই হাসতে হাসতে চলে গেল।
ক্যান্টিনের এক কোণে তখন আমরা দুজন বসে আছি। চারপাশে মানুষের কথাবার্তা, চায়ের কাপের শব্দ, বাইরে বিকেলের রোদ। ফারিন চায়ে চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকাল।
— আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— কর।
— তুই কি সব সময় এমন, নাকি শুধু বন্ধুদের সামনে?
— কেমন?
— মানে, এত কথা বলিস, এত হাসিস… কিন্তু কখনো কখনো মনে হয় তুই কিছু একটা লুকিয়ে রাখিস।
প্রশ্নটা শুনে আমি একটু থামলাম। তারপর হালকা হাসলাম।
— সবাই কি সব কথা সবার সামনে বলতে পারে?
— পারে না। কিন্তু কাউকে কাউকে বলতে ইচ্ছা করে।
— যেমন?
ফারিন কাপটা টেবিলে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
— সেটা যার সঙ্গে কথা বলছি, তার ওপর নির্ভর করে।
আমি ইচ্ছে করেই একটু ঝুঁকে বললাম,
— তাহলে আমার ওপর কতটা নির্ভর করে?
ফারিন চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।
— তুই না, একদম অসহ্য!
— প্রশ্নের উত্তর দিলি না তো।
— সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলে আর কথা বলবি কী নিয়ে?
আমি মৃদু হেসে বললাম,
— তোর সঙ্গে কথা বলার বিষয়ের অভাব হবে না। তুই চাইলে সারাদিন তোর প্রশংসা করতে পারি।
— সত্যি? বল দেখি, আমার কী ভালো লাগে তোর?
আমি ওর দিকে তাকালাম। ফারিনের চোখে কৌতূহল, সঙ্গে একটা চ্যালেঞ্জও।
— তোর হাসিটা।
ও একটু থমকাল।
আমি আবার বললাম,
— আর তুই যখন কোনো কথা বলতে গিয়ে নিজেই হেসে ফেলিস, তখন মনে হয় তোর মাথায় নিশ্চয়ই কোনো দুষ্টুমি চলছে।
— আর কিছু?
— তোর একটা সমস্যা আছে।
— কী সমস্যা?
— তুই মানুষকে সহজে কথা বলতে দিস না। একটা কথা জিজ্ঞেস করবি, উত্তর দেওয়ার আগেই পাঁচটা নতুন প্রশ্ন নিয়ে হাজির হবি।
ফারিন হেসে উঠল।
— এটা প্রশংসা হলো?
— তোর ক্ষেত্রে অভিযোগও প্রশংসার মতো শোনায়।
ও মাথা নেড়ে বলল,
— তুই সত্যিই একটা পাজি।
— কিন্তু তুই আমার সঙ্গে বসে চা খাচ্ছিস।
— চা খেতে এসেছি, তোর প্রেমে পড়তে না।
কথাটা বলে ফারিন নিজেই হেসে ফেলল। আমি একটু ভ্রু তুলে বললাম,
— প্রেমের কথা তো আমি তুলিনি। তুই এত তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গটা নিয়ে এলি কেন?
— তোর সঙ্গে কথা বলাই ভুল হয়েছে!
— তা হলে উঠে যা।
আমি কথাটা বললাম একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। ফারিনও যেন সেই চ্যালেঞ্জটাই নিল। কাপটা নামিয়ে উঠে দাঁড়ানোর ভান করল, তারপর আবার বসে পড়ল।
— না, তোর চা খাওয়া শেষ হয়নি। ভদ্রতার খাতিরে বসে আছি।
— আহা! আমার জন্য এত ত্যাগ!
— আর একটা কথা বললে সত্যিই চলে যাব।
আমি হাসলাম। তারপর ইচ্ছে করেই চুপ করে রইলাম।
কয়েক মুহূর্ত পর ফারিন নিজেই বলল,
— কী হলো? হঠাৎ চুপ কেন?
— তুই তো চুপ করতে বলেছিলি।
— আমি বললেই চুপ করে যাবি?
— তুই বললে অনেক কিছুই করা যায়।
কথাটা বলার পর আমাদের চোখাচোখি হলো। এবার ফারিনের হাসিটা একটু নরম হয়ে এল। সে কিছু বলল না, আমিও না। আমাদের মধ্যে যে খুনসুটিটা এতক্ষণ চলছিল, তার ভেতরে যেন অল্পক্ষণের জন্য অন্য একটা অনুভূতি এসে দাঁড়াল।
কিন্তু ফারিনই প্রথম নীরবতা ভাঙল।
— রাহাত, তুই কি সবার সঙ্গে এমন ফ্লার্ট করিস?
আমি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললাম,
— তুই কি সবার ফ্লার্টের হিসাব রাখিস?
— না। তবে তোরটা ধরতে পারি।
— তাহলে তো তুই বেশ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করিস আমাকে।
— তোর মতো বিরক্তিকর মানুষকে এড়িয়ে চলতে গেলেও লক্ষ্য রাখতে হয়।
— অজুহাতটা ভালো। আরেকটু প্র্যাকটিস কর।
ফারিন আমার দিকে একটা টিস্যু ছুড়ে মারল।
— যা! তোর সঙ্গে কথা বলব না।
আমি টিস্যুটা তুলে বললাম,
— ঠিক আছে। কাল আবার কথা বলিস।
— কাল কেন?
— কারণ আজকের রাগটা কাল পর্যন্ত থাকবে বলে মনে হচ্ছে না।
ফারিন কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বলল,
— এত আত্মবিশ্বাস ভালো না।
— আর তোর এই হাসিটা দেখে আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়।
ও এবার সত্যিই লজ্জা পেল কি না বুঝলাম না। তবে চোখ নামিয়ে চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিল।
ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে আমরা পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম। বিকেলের বাতাসে ক্যাম্পাসের গাছগুলো নড়ছিল। সামনের পথটা প্রায় ফাঁকা।
হাঁটতে হাঁটতে ফারিন হঠাৎ আমার হাতের কাছে নিজের হাতটা নিয়ে এল। প্রথমে মনে হলো, হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়েছে। কিন্তু কয়েক পা যাওয়ার পর আবার আমাদের আঙুল ছুঁয়ে গেল।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
— কী ব্যাপার? রাস্তা এত সরু হয়ে গেছে?
ফারিন চোখ পাকিয়ে বলল,
— তুই একটু সরে হাঁটতে পারিস না?
— অবশ্যই পারি।
আমি একটু দূরে সরে গেলাম।
ও সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— এত দূরে না!
আমি হেসে আবার আগের জায়গায় ফিরে এলাম।
— তুই নিজেই বুঝিস না, কী চাস।
ফারিন এবার আর তর্ক করল না। শুধু হালকা স্বরে বলল,
— সব সময় কি সব কথা বুঝিয়ে বলতে হয়?
আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটু ধীর স্বরে বললাম,
— না। তবে তোর ইচ্ছেটা বুঝতে গিয়ে যদি ভুল করি, তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবি না।
ফারিন হাঁটা থামাল। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— সবকিছু নিয়ে এত হিসাব করিস কেন? মাঝে মাঝে মুহূর্তটাকে উপভোগ করলেই তো হয়।
আমি কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
— ঠিক বলেছিস।
তারপর আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। এবার ফারিন নিজেই আমার হাত ধরল—একেবারে স্বাভাবিকভাবে, যেন এই ছোট্ট ব্যাপারটার জন্য আলাদা কোনো ঘোষণা দেওয়ার দরকার নেই।
আমিও হাতটা সরিয়ে নিলাম না।
কিছু দূর যাওয়ার পর ও বলল,
— কাল আবার একসঙ্গে পড়বি?
— পড়ব। তবে শর্ত আছে।
— কী শর্ত?
— আজকের মতো চা খাওয়াবি।
— শুধু চা?
আমি মুচকি হেসে বললাম,
— সেটা তোকে ঠিক করতে হবে।
ফারিন আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। কয়েক পা যাওয়ার পর পিছন ফিরে বলল,
— কাল দেখা হবে, পাজি!
আমি দাঁড়িয়ে ওকে চলে যেতে দেখলাম। তারপর ফোন বের করে একটা মেসেজ লিখলাম।
রাহাত: — বাড়ি পৌঁছে জানাস।
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
ফারিন: — কেন? আমার জন্য চিন্তা হচ্ছে?
রাহাত: — না, তোর বাড়ির লোকজনকে জানাতে হবে যে তাদের মেয়েকে আজও বিরক্ত করে নিরাপদে ফেরত পাঠিয়েছি।
ফারিন: — খুব মজা পাচ্ছিস, তাই না?
রাহাত: — একটু।
ফারিন: — কাল দেখা হলে বুঝাব মজা কাকে বলে।
রাহাত: — অপেক্ষায় রইলাম।
ও আর উত্তর দিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর একটা হাসির ইমোজি পাঠাল।
আমি ফোনটা পকেটে রেখে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলাম।
ফারিনের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না। বন্ধুত্বের পরিচিত সীমারেখার বাইরে আমরা পা রাখছি কি না, সেটাও তখনও স্পষ্ট ছিল না। তবে আজকের বিকেলটা অন্য রকম ছিল। কথার ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা ইঙ্গিত, চোখাচোখি, পাশাপাশি হাঁটার সময় হাত ধরে থাকা—সব মিলিয়ে একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
সেটা প্রেম কি না, তা নিয়ে ভাবার দরকার বোধ করলাম না।
কিছু গল্পের শুরু হয় কোনো স্বীকারোক্তি দিয়ে নয়—শুরু হয় এমন একটা বিকেল থেকে, যেদিন দুজন মানুষ বাড়ি ফেরার পরও একে অন্যের কথাগুলো মনে করে হাসে।
রিকশার জানালা দিয়ে রাতের আলো আসছিল। আমি ফারিয়ার কথা ভাবছিলাম।
সে আজকে সত্যিই ভেঙে পড়েছিল। বিয়ের ভয় তার ভিতরের সেই শান্ত, লাজুক মেয়েটাকে একটু সরিয়ে দিয়েছিল। সেই ফাঁক দিয়ে তার শরীর বেরিয়ে এসেছিল। আমি যখন তার নিপল মুখে নিয়েছিলাম, তার গুদে আঙুল ঢুকিয়েছিলাম, তার পাছা চেপে ধরেছিলাম — সে সরে যায়নি। বরং তার হাত আমার চুলে ঢুকেছিল। তার শ্বাস ভারী হয়েছিল। তার গুদ ভিজে গিয়েছিল। সে চেয়েছিল ভুলে যেতে। আর ভুলে যাওয়ার জন্য সে তার শরীরকে আমার হাতে দিয়েছি।
আমি জানি। সে ভাবছে, আমি কাঁদতে কাঁদতে তার সাথে পার্কে গেলাম। নিজেকে খুলে দিলাম। আমি কি এতটাই দুর্বল? এই চিন্তা তাকে লজ্জা দিচ্ছে। তার বাবার কথা, বিয়ের কথা, সেই অজানা ছেলের কথা — সব মিলে তাকে বলছে যে আজকে যা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি। সে নিজেকে খারাপ মেয়ে ভাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু পুরোপুরি পারছে না। কারণ তার ভিতরে আরও একটা স্বর আছে, যেটা জানে যে সে কাউকে জোর করেনি। সে শুধু একটু ভুলে যেতে চেয়েছিল। আর সেই ভুলে যাওয়ার মধ্যে তার শরীরও জেগে উঠেছিল।
এখন তার মন আর শরীর আলাদা কথা বলছে।
তার মন বলছে, এটা ভুল হয়েছে। কালকে স্বাভাবিক থাকতে হবে। রাহাত যেন টের না পায় যে আমার শরীর এখনো সেই ছোঁয়া মনে করছে। কিন্তু তার শরীর অন্য কথা বলছে। তার নিপল এখনো সংবেদনশীল। তার উরুর ভিতরে এখনো সেই স্যাঁতস্যাঁতে অনুভূতি রয়ে গেছে। সে যখন বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করবে, তখন আমার মুখের স্পর্শ, আমার আঙুলের চাপ — সব মনে পড়বে। আর মনে পড়লেই তার শরীর আবার একটু গরম হয়ে উঠবে। এই গরম হওয়া তাকে আরও বিভ্রান্ত করবে। কারণ সে বুঝতে পারবে না — সে কি শুধু সান্ত্বনা চেয়েছিল, নাকি সত্যিই চেয়েছিল যে কেউ তার শরীরকে এভাবে ব্যবহার করুক?
ফারিয়া এখন এই দ্বন্দ্বে আছে।
সে আমাকে বিশ্বাস করে। সে জানে আমি তার দুর্বলতায় আগে সুযোগ নিইনি। কিন্তু আজকে সে নিজেই সুযোগ দিয়েছে। তাই সে ভাবছে, আমি কি তার দুর্বলতা দেখে এগিয়ে এসেছি, নাকি সেই আমাকে টেনেছে? এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে না। আর না জানায় সে ভয় পাচ্ছে। ভয় পাচ্ছে যে কালকে যখন চোখে চোখ পড়বে, তখন তার শরীর আবার সাড়া দেবে কিনা। সে চায় না যে আমি টের পাই। তাই সে বলেছে, “স্বাভাবিক থাকবি।”
কিন্তু আমি জানি, সেই স্বাভাবিক থাকা তার জন্য সহজ হবে না।
কারণ তার শরীর আজকে একবার জেগে উঠেছিল। তার দুধ আমার মুখে এসেছিল। তার গুদ আমার আঙুল চেপে ধরেছিল। তার পাছা আমার তালুতে কেঁপেছিল। সেই জেগে ওঠা সহজে ঘুমাবে না। সে এখন নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করবে যে এটা শুধু একটা দুর্বল মুহূর্ত ছিল। কিন্তু তার শরীর সেই কথা মানবে না। তার শরীর জানে যে সেই মুহূর্তে সে নিজেই চেয়েছিল।
আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম।
ফারিয়া এখন তার রুমে। হয়তো চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। হয়তো নিজের বুকের উপর হাত রেখে ভাবছে, আমি কি খারাপ মেয়ে হয়ে গেলাম? নাকি শুধু একটু সত্যি হয়ে গিয়েছিলাম?
আমি জানি না সে কী সিদ্ধান্ত নেবে।
কিন্তু জানি, তার শরীর আজকে যা চেয়েছিল, সেটা তার মন এখনো পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারবে না।
পরদিন সকাল থেকেই আবার সেই পুরোনো রুটিনে ফিরে যাওয়ার কথা। ক্লাস, নোটস, গ্রুপ স্টাডি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চেনা ব্যস্ততা। মাঝখানে কত কিছু ঘটে গেছে, কত কথা জমেছে, কত সম্পর্কের সমীকরণ বদলেছে; অথচ বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, জীবন নিজের নিয়মেই চলছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোনটা হাতে নিতেই গ্রুপে একের পর এক মেসেজ চোখে পড়ল।
মিলি: — কাল থেকে সবাই ঠিকমতো পড়তে বসবি তো? নাকি আবার গ্রুপ স্টাডির নামে আড্ডা হবে?
সাদিয়া: — পড়তে বসার আগে এই ঘোষণা কে দিল? নিজে কতক্ষণ পড়বি সেটা বল আগে।
ফারিন: — আমার তো মনে হয়, মিলি নিজেই পড়তে চায় না। সবাইকে ডেকে নিজের একাকিত্ব দূর করবে।
মিলি: — তোরা আমার নামে এত অপবাদ দিস কেন? ?
ফারিয়া: — কারণ তুই নির্দোষ হলে আমাদের এত বিনোদনের অভাব হয়ে যেত।
আমি মেসেজগুলো পড়ে হেসে ফেললাম। তারপর লিখলাম—
রাহাত: — তোদের পড়াশোনার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের চেয়ে গ্রুপের কমেন্টের উত্তর দেওয়াই বেশি কঠিন হবে।
সাদিয়া: — বাহ! জনাব রাহাত সাহেবও উপস্থিত। তা, গত পরীক্ষায় নিজের অবস্থা মনে আছে তো?
রাহাত: — অতীত নিয়ে আলোচনা করে বর্তমান নষ্ট করতে চাই না।
ফারিন: — মানে অবস্থা খারাপ ছিল। বুঝেছি।
রাহাত: — তোমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় একাডেমিক ভুল।
মিলি: — বেশি কথা না বলে কাল সময়মতো আসিস। নোটস নিয়ে আসবি।
রাহাত: — জি ম্যাডাম। আপনার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।
ফারিয়া: — এই যে এত ভদ্রতা! সামনে দেখা হলে যেন চিনতে পারি।
রাহাত: — চিনতে না পারলে পরিচয়পত্র দেখাব।
ফারিয়া: — পরিচয়পত্রে কি লেখা থাকবে, ‘বিশেষভাবে বিরক্তিকর’?
রাহাত: — না, লেখা থাকবে ‘বন্ধুদের দ্বারা মানসিকভাবে নির্যাতিত’।
এরপর কিছুক্ষণ শুধু হাসির ইমোজি আর একে অন্যকে খোঁচা দেওয়ার পালা চলল। এমন ছোটখাটো কথাবার্তাই হয়তো বন্ধুত্বের আসল সৌন্দর্য। এখানে কাউকে নিজের মনের অবস্থা ব্যাখ্যা করতে হয় না, প্রতিটি কথার পেছনে কোনো গভীর অর্থ খুঁজতে হয় না। কখনো কখনো একটা সাধারণ হাসিই যথেষ্ট।
গ্রুপের মেসেজ দেখতে দেখতে হঠাৎ ঐশীর নামটা চোখে পড়ল। এতক্ষণ সে চুপ ছিল।
ঐশী: — আচ্ছা, কাল সবাই কয়টায় আসবি? আমার কিছু নোটসও মিলিয়ে নিতে হবে।
মিলি: — এগারোটার দিকে চলে আয়।
ঐশী: — ঠিক আছে। রাহাত, তোর কাছে কি আগের ক্লাসের নোটস আছে?
আমি কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর দিলাম।
রাহাত: — আছে। নিয়ে আসব।
ঐশী: — থ্যাংকস।
রাহাত: — আরে, এতে থ্যাংকসের কী আছে? দরকার হলে নিয়ে নিস।
কথাবার্তাটা সেখানেই শেষ হয়ে গেল। না কোনো অস্বস্তিকর প্রশ্ন, না পুরোনো প্রসঙ্গ টেনে আনা। আমাদের মধ্যে যা কিছু কথা হয়েছিল, তার সবটাই যে প্রতিবার আলোচনায় আনতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। কিছু বিষয় সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো।
ফোনটা পাশে রেখে ভাবলাম, হয়তো এভাবেই সবকিছুকে স্বাভাবিক হতে দিতে হয়। কাউকে তাড়া না দিয়ে, কারও কাছ থেকে জবাবদিহি দাবি না করে।
বিকেলের দিকে ফারিন আলাদা করে মেসেজ দিল।
ফারিন: — কালকের পড়ার জন্য কিছু প্রস্তুতি নিয়েছিস?
রাহাত: — হ্যাঁ, বইটা খুলে টেবিলে রেখেছি।
ফারিন: — তারপর?
রাহাত: — তারপর বইয়ের দিকে তাকিয়ে জীবনের অনিশ্চয়তা নিয়ে ভাবছিলাম।
ফারিন: — তোর চিকিৎসা দরকার।
রাহাত: — সেটা অনেক দিন ধরেই জানি। কিন্তু ভালো ডাক্তার পাচ্ছি না।
ফারিন: — পেলে আমাকেও জানাস। তোকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করব।
আমি হাসলাম। ফারিনের সঙ্গে কথাবার্তা বরাবরই এমন—সহজ, দ্রুত, খুনসুটিতে ভরা। কখনো কখনো ওর কথার আড়ালে অন্য কোনো অনুভূতি আছে কি না, সেটা নিয়ে ভাবার সুযোগ হয়েছিল; কিন্তু সেদিন আর সেসব নিয়ে মাথা ঘামালাম না।
কিছুক্ষণ পর সাদিয়ার মেসেজ এল।
সাদিয়া: — কাল দেরি করে আসিস না। তোর জন্য বসে থাকতে ভালো লাগে না।
রাহাত: — আমি তোকে বসে থাকতে বলেছি নাকি?
সাদিয়া: — না, কিন্তু তুই দেরি করলে তোকে বকতে আমার ভালো লাগে।
রাহাত: — বন্ধুত্বের নামে অত্যাচার।
সাদিয়া: — মানিয়ে নে।
ব্যস। ছোট্ট কথোপকথন, সামান্য খুনসুটি। রাতের কোনো দীর্ঘ আলাপ নয়, অতীতের কোনো হিসাব নয়। আমরা বন্ধুদের মতোই কথা বললাম।
সন্ধ্যায় মিলি আবার গ্রুপে সবাইকে মনে করিয়ে দিল, পরদিন যেন কেউ পড়াশোনার বদলে আড্ডা দিতে না বসে। স্বাভাবিকভাবেই সবাই তার কথার প্রতিবাদ করল। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, প্রথম এক ঘণ্টা পড়াশোনা, তারপর চা খেতে যাওয়া যাবে—যদিও কেউই বিশ্বাস করছিল না যে প্রথম এক ঘণ্টা সত্যিই পড়া হবে।
রাত বাড়তে থাকল। ফোনের স্ক্রিন একসময় নিস্তব্ধ হয়ে এল। আমি পরদিনের বইপত্র গুছিয়ে রাখলাম। ব্যাগে নোটবুক, কলম, আগের ক্লাসের খাতা—সব ঠিকঠাক আছে কি না দেখে নিলাম।
জীবনে সবকিছু একসঙ্গে ঠিক হয়ে যায় না। কিছু প্রশ্ন থেকে যায়, কিছু অনুভূতি অমীমাংসিত থাকে, কিছু মানুষকে বুঝতে সময় লাগে। তবু পরদিন সকালে ক্লাসে যেতে হবে, বন্ধুদের সঙ্গে বসতে হবে, কারও নোটস মিলিয়ে দিতে হবে, কারও সঙ্গে হাসাহাসি করতে হবে।
আর সেটাই তো জীবন।
পরদিন সকাল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে ঢুকতেই দূর থেকে মিলির কণ্ঠ শুনতে পেলাম।
— এই যে! মহারাজ অবশেষে এসেছেন!
মিলি, ফারিন আর ফারিয়া একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল। একটু দূরে সাদিয়া ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিল, আর ঐশী হাতে কয়েকটা খাতা নিয়ে ক্লাসরুমের দিকে যাচ্ছিল।
আমি কাছে যেতেই মিলি বলল,
— নোটস এনেছিস?
— সুপ্রভাত বলারও সময় পেলাম না, সরাসরি নোটস!
ফারিন হেসে বলল,
— ওর জীবনে নোটসই প্রথম, বন্ধুরা পরে।
— তোদের বন্ধুত্বের সংজ্ঞা খুব অদ্ভুত, বুঝলি?
ফারিয়া আমার হাত থেকে ব্যাগটা টেনে নিয়ে বলল,
— দেখি, সত্যিই এনেছিস, নাকি আবার গল্প বানাচ্ছিস।
— এই যে! আমার ব্যাগ তল্লাশি করার ওয়ারেন্ট আছে?
— আছে। বন্ধুত্বের ওয়ারেন্ট।
আমরা হাসতে হাসতে ক্লাসরুমে ঢুকলাম।
ঐশী ইতিমধ্যে একটা বেঞ্চে বসে খাতা খুলেছে। আমাকে দেখে বলল,
— নোটসটা একটু দিবি? আমার আগের ক্লাসের একটা অংশ বাদ পড়েছে।
আমি খাতাটা এগিয়ে দিলাম।
— এই নে। দেখে নিস, কিছু বুঝতে অসুবিধা হলে বলিস।
— আচ্ছা।
সাদিয়া এসে পাশের চেয়ার টেনে বসল।
— তোরা শুরু করেছিস, আর আমাকে ডাকিসনি?
মিলি বলল,
— তুই তো ফোনে ব্যস্ত ছিলি।
— তাই বলে আমার শিক্ষাজীবন থেমে থাকবে?
— তোর শিক্ষাজীবন নিয়ে আমাদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
আবার হাসির রোল উঠল।
ক্লাস শুরু হওয়ার আগে আমরা সবাই মিলে নোটস মিলিয়ে নিলাম। কেউ একটা বিষয় বুঝতে না পারলে অন্যজন বোঝাল, কেউ ভুল উত্তর দিলে বাকিরা মিলে তাকে নিয়ে মজা করল। ফারিন মাঝেমধ্যে পড়া বাদ দিয়ে অন্য প্রসঙ্গ তুলছিল, আর মিলি বারবার তাকে মূল বিষয়ে ফিরিয়ে আনছিল। সাদিয়া একসময় ঘোষণা করল, এই গ্রুপে পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে নতুন বন্ধু খুঁজতে হবে।
ফারিয়া বলল,
— নতুন বন্ধু খুঁজে লাভ নেই। রাহাতের মতো বিরক্তিকর মানুষ আর পাওয়া যাবে না।
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
— তোমাদের এই ভালোবাসা একদিন আমাকে বিখ্যাত করবে।
— আগে পরীক্ষায় পাস কর, তারপর বিখ্যাত হবি—ঐশী শান্তভাবে বলল।
সবাই আবার হেসে উঠল।
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, এই মুহূর্তে আমাদের কারওই অতীতের সব প্রশ্নের উত্তর দরকার নেই। আমরা কেউ কাউকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না, কেউ কোনো সম্পর্কের নাম নির্ধারণ করছি না। আমরা শুধু একসঙ্গে বসে পড়ছি, হাসছি, একে অন্যকে বিরক্ত করছি।
হয়তো এই স্বাভাবিকতার মধ্যেই একটা নতুন অধ্যায়ের শুরু।
আর আমি জানতাম না, এই চেনা দিনগুলোর আড়ালেই ভবিষ্যতে কত অচেনা ঘটনা অপেক্ষা করে আছে।
গ্রুপ স্টাডি শুরু হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পরেই আমাদের পড়াশোনার বারোটা বেজে গেল। মিলি একটা কঠিন প্রশ্ন নিয়ে ব্যস্ত, ঐশী তার খাতায় নোট তুলছে, আর সাদিয়া ফোনে কারও পাঠানো মেসেজ পড়ে মুচকি হাসছে। ফারিয়া মাঝেমধ্যে পড়ায় মন দিলেও ফারিনের মন যেন এক জায়গায় স্থির হচ্ছিল না।
আমি একটা প্রশ্নের উত্তর লিখছিলাম। হঠাৎ ফারিন আমার খাতার ওপর ঝুঁকে পড়ল।
— এই যে, তোর লেখা এত খারাপ কেন?
আমি কলম থামিয়ে ওর দিকে তাকালাম।
— আমার লেখা খারাপ, নাকি তুই পড়তে পারিস না?
— বাহ! নিজের অযোগ্যতা স্বীকার করার সাহস নেই দেখছি।
— তোর মতো সুন্দরী পরীক্ষক হলে হাতের লেখা এমনিতেই খারাপ হয়ে যায়।
কথাটা বলেই আবার খাতায় চোখ নামিয়ে নিলাম। ফারিন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর আমার বাহুতে হালকা একটা ধাক্কা দিয়ে বলল,
— তুই কি সব মেয়েকেই এভাবে কথা বলিস?
— না তো।
— তাহলে?
— সবার সঙ্গে তো আর এত কথা বলার ইচ্ছা হয় না।
ফারিনের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
— ওহ! তাহলে আমি স্পেশাল?
— নিজেই বুঝে নে। সবকিছু মুখে বলে দিলে রহস্য থাকে কোথায়?
— রহস্য! তোর মধ্যে আবার রহস্য আছে নাকি? আমার তো মনে হয় তোর মাথার ভেতর শুধু ফাঁকা মাঠ।
— সেই মাঠে কিন্তু তুই বেশ ঘুরে বেড়াচ্ছিস।
ও এবার হাসি চাপতে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
— অসহ্য একটা ছেলে!
— তবু আমার পাশ থেকে উঠছিস না কেন?
ফারিন এবার আমার দিকে তাকাল। চোখে দুষ্টুমি, মুখে চাপা হাসি।
— কারণ তোর খাতা থেকে নোটস তুলতে হবে। বেশি কিছু ভেবে বসিস না।
— আমি তো কিছু ভাবিনি। তুই এত ব্যাখ্যা দিচ্ছিস কেন?
— রাহাত!
— জি, ফারিন সাহেবা?
— চুপ কর!
আমি হেসে আবার পড়ায় মন দিলাম। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, ফারিনও আর আগের মতো সহজে নিজের হাসিটা লুকাতে পারছে না।
দুপুরের দিকে পড়াশোনা শেষ করে সবাই ক্যান্টিনে গেলাম। চা আর সিঙ্গারা নিয়ে টেবিলে বসতেই আড্ডা শুরু হয়ে গেল। মিলি পরীক্ষার দুশ্চিন্তা নিয়ে কথা বলছিল, সাদিয়া তার সঙ্গে তর্ক করছিল, আর ফারিয়া আমাদের সবার পুরোনো কীর্তিকলাপ মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর মিলি আর সাদিয়াকে একটা কাজে বাইরে যেতে হলো। ফারিয়া ঐশীর সঙ্গে লাইব্রেরিতে যাবে বলে উঠে দাঁড়াল।
যাওয়ার আগে ফারিয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তোরা আবার পড়াশোনা বাদ দিয়ে আড্ডা শুরু করিস না।
আমি বললাম,
— আমরা খুবই ভদ্র মানুষ।
ফারিন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
— এই কথাটা রেকর্ড করে রাখা উচিত। ভবিষ্যতে প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগবে।
সবাই হাসতে হাসতে চলে গেল।
ক্যান্টিনের এক কোণে তখন আমরা দুজন বসে আছি। চারপাশে মানুষের কথাবার্তা, চায়ের কাপের শব্দ, বাইরে বিকেলের রোদ। ফারিন চায়ে চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকাল।
— আচ্ছা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
— কর।
— তুই কি সব সময় এমন, নাকি শুধু বন্ধুদের সামনে?
— কেমন?
— মানে, এত কথা বলিস, এত হাসিস… কিন্তু কখনো কখনো মনে হয় তুই কিছু একটা লুকিয়ে রাখিস।
প্রশ্নটা শুনে আমি একটু থামলাম। তারপর হালকা হাসলাম।
— সবাই কি সব কথা সবার সামনে বলতে পারে?
— পারে না। কিন্তু কাউকে কাউকে বলতে ইচ্ছা করে।
— যেমন?
ফারিন কাপটা টেবিলে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
— সেটা যার সঙ্গে কথা বলছি, তার ওপর নির্ভর করে।
আমি ইচ্ছে করেই একটু ঝুঁকে বললাম,
— তাহলে আমার ওপর কতটা নির্ভর করে?
ফারিন চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।
— তুই না, একদম অসহ্য!
— প্রশ্নের উত্তর দিলি না তো।
— সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেলে আর কথা বলবি কী নিয়ে?
আমি মৃদু হেসে বললাম,
— তোর সঙ্গে কথা বলার বিষয়ের অভাব হবে না। তুই চাইলে সারাদিন তোর প্রশংসা করতে পারি।
— সত্যি? বল দেখি, আমার কী ভালো লাগে তোর?
আমি ওর দিকে তাকালাম। ফারিনের চোখে কৌতূহল, সঙ্গে একটা চ্যালেঞ্জও।
— তোর হাসিটা।
ও একটু থমকাল।
আমি আবার বললাম,
— আর তুই যখন কোনো কথা বলতে গিয়ে নিজেই হেসে ফেলিস, তখন মনে হয় তোর মাথায় নিশ্চয়ই কোনো দুষ্টুমি চলছে।
— আর কিছু?
— তোর একটা সমস্যা আছে।
— কী সমস্যা?
— তুই মানুষকে সহজে কথা বলতে দিস না। একটা কথা জিজ্ঞেস করবি, উত্তর দেওয়ার আগেই পাঁচটা নতুন প্রশ্ন নিয়ে হাজির হবি।
ফারিন হেসে উঠল।
— এটা প্রশংসা হলো?
— তোর ক্ষেত্রে অভিযোগও প্রশংসার মতো শোনায়।
ও মাথা নেড়ে বলল,
— তুই সত্যিই একটা পাজি।
— কিন্তু তুই আমার সঙ্গে বসে চা খাচ্ছিস।
— চা খেতে এসেছি, তোর প্রেমে পড়তে না।
কথাটা বলে ফারিন নিজেই হেসে ফেলল। আমি একটু ভ্রু তুলে বললাম,
— প্রেমের কথা তো আমি তুলিনি। তুই এত তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গটা নিয়ে এলি কেন?
— তোর সঙ্গে কথা বলাই ভুল হয়েছে!
— তা হলে উঠে যা।
আমি কথাটা বললাম একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। ফারিনও যেন সেই চ্যালেঞ্জটাই নিল। কাপটা নামিয়ে উঠে দাঁড়ানোর ভান করল, তারপর আবার বসে পড়ল।
— না, তোর চা খাওয়া শেষ হয়নি। ভদ্রতার খাতিরে বসে আছি।
— আহা! আমার জন্য এত ত্যাগ!
— আর একটা কথা বললে সত্যিই চলে যাব।
আমি হাসলাম। তারপর ইচ্ছে করেই চুপ করে রইলাম।
কয়েক মুহূর্ত পর ফারিন নিজেই বলল,
— কী হলো? হঠাৎ চুপ কেন?
— তুই তো চুপ করতে বলেছিলি।
— আমি বললেই চুপ করে যাবি?
— তুই বললে অনেক কিছুই করা যায়।
কথাটা বলার পর আমাদের চোখাচোখি হলো। এবার ফারিনের হাসিটা একটু নরম হয়ে এল। সে কিছু বলল না, আমিও না। আমাদের মধ্যে যে খুনসুটিটা এতক্ষণ চলছিল, তার ভেতরে যেন অল্পক্ষণের জন্য অন্য একটা অনুভূতি এসে দাঁড়াল।
কিন্তু ফারিনই প্রথম নীরবতা ভাঙল।
— রাহাত, তুই কি সবার সঙ্গে এমন ফ্লার্ট করিস?
আমি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললাম,
— তুই কি সবার ফ্লার্টের হিসাব রাখিস?
— না। তবে তোরটা ধরতে পারি।
— তাহলে তো তুই বেশ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করিস আমাকে।
— তোর মতো বিরক্তিকর মানুষকে এড়িয়ে চলতে গেলেও লক্ষ্য রাখতে হয়।
— অজুহাতটা ভালো। আরেকটু প্র্যাকটিস কর।
ফারিন আমার দিকে একটা টিস্যু ছুড়ে মারল।
— যা! তোর সঙ্গে কথা বলব না।
আমি টিস্যুটা তুলে বললাম,
— ঠিক আছে। কাল আবার কথা বলিস।
— কাল কেন?
— কারণ আজকের রাগটা কাল পর্যন্ত থাকবে বলে মনে হচ্ছে না।
ফারিন কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বলল,
— এত আত্মবিশ্বাস ভালো না।
— আর তোর এই হাসিটা দেখে আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়।
ও এবার সত্যিই লজ্জা পেল কি না বুঝলাম না। তবে চোখ নামিয়ে চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিল।
ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে আমরা পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম। বিকেলের বাতাসে ক্যাম্পাসের গাছগুলো নড়ছিল। সামনের পথটা প্রায় ফাঁকা।
হাঁটতে হাঁটতে ফারিন হঠাৎ আমার হাতের কাছে নিজের হাতটা নিয়ে এল। প্রথমে মনে হলো, হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়েছে। কিন্তু কয়েক পা যাওয়ার পর আবার আমাদের আঙুল ছুঁয়ে গেল।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
— কী ব্যাপার? রাস্তা এত সরু হয়ে গেছে?
ফারিন চোখ পাকিয়ে বলল,
— তুই একটু সরে হাঁটতে পারিস না?
— অবশ্যই পারি।
আমি একটু দূরে সরে গেলাম।
ও সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— এত দূরে না!
আমি হেসে আবার আগের জায়গায় ফিরে এলাম।
— তুই নিজেই বুঝিস না, কী চাস।
ফারিন এবার আর তর্ক করল না। শুধু হালকা স্বরে বলল,
— সব সময় কি সব কথা বুঝিয়ে বলতে হয়?
আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটু ধীর স্বরে বললাম,
— না। তবে তোর ইচ্ছেটা বুঝতে গিয়ে যদি ভুল করি, তখন কিন্তু আমাকে দোষ দিতে পারবি না।
ফারিন হাঁটা থামাল। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— সবকিছু নিয়ে এত হিসাব করিস কেন? মাঝে মাঝে মুহূর্তটাকে উপভোগ করলেই তো হয়।
আমি কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
— ঠিক বলেছিস।
তারপর আমরা আবার হাঁটতে শুরু করলাম। এবার ফারিন নিজেই আমার হাত ধরল—একেবারে স্বাভাবিকভাবে, যেন এই ছোট্ট ব্যাপারটার জন্য আলাদা কোনো ঘোষণা দেওয়ার দরকার নেই।
আমিও হাতটা সরিয়ে নিলাম না।
কিছু দূর যাওয়ার পর ও বলল,
— কাল আবার একসঙ্গে পড়বি?
— পড়ব। তবে শর্ত আছে।
— কী শর্ত?
— আজকের মতো চা খাওয়াবি।
— শুধু চা?
আমি মুচকি হেসে বললাম,
— সেটা তোকে ঠিক করতে হবে।
ফারিন আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। কয়েক পা যাওয়ার পর পিছন ফিরে বলল,
— কাল দেখা হবে, পাজি!
আমি দাঁড়িয়ে ওকে চলে যেতে দেখলাম। তারপর ফোন বের করে একটা মেসেজ লিখলাম।
রাহাত: — বাড়ি পৌঁছে জানাস।
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
ফারিন: — কেন? আমার জন্য চিন্তা হচ্ছে?
রাহাত: — না, তোর বাড়ির লোকজনকে জানাতে হবে যে তাদের মেয়েকে আজও বিরক্ত করে নিরাপদে ফেরত পাঠিয়েছি।
ফারিন: — খুব মজা পাচ্ছিস, তাই না?
রাহাত: — একটু।
ফারিন: — কাল দেখা হলে বুঝাব মজা কাকে বলে।
রাহাত: — অপেক্ষায় রইলাম।
ও আর উত্তর দিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর একটা হাসির ইমোজি পাঠাল।
আমি ফোনটা পকেটে রেখে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলাম।
ফারিনের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কোনো নাম ছিল না। বন্ধুত্বের পরিচিত সীমারেখার বাইরে আমরা পা রাখছি কি না, সেটাও তখনও স্পষ্ট ছিল না। তবে আজকের বিকেলটা অন্য রকম ছিল। কথার ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা ইঙ্গিত, চোখাচোখি, পাশাপাশি হাঁটার সময় হাত ধরে থাকা—সব মিলিয়ে একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল।
সেটা প্রেম কি না, তা নিয়ে ভাবার দরকার বোধ করলাম না।
কিছু গল্পের শুরু হয় কোনো স্বীকারোক্তি দিয়ে নয়—শুরু হয় এমন একটা বিকেল থেকে, যেদিন দুজন মানুষ বাড়ি ফেরার পরও একে অন্যের কথাগুলো মনে করে হাসে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)