Thread Rating:
  • 40 Vote(s) - 2.63 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Romance নিষিদ্ধ বসন্ত
পরীক্ষার দিনগুলোতে মানুষের মাথায় সাধারণত সিলেবাস, প্রশ্ন আর ফলাফল নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকার কথা। কিন্তু আমাদের সবার জীবনই যে বইয়ের পাতায় আটকে থাকে, তা নয়। কারও কাছে পরীক্ষা শেষ হওয়া মানে স্বস্তি, কারও কাছে নতুন কোনো বিপদের শুরু।


ফারিয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ছিল ঠিক উল্টো।

সেদিন মিলির পড়া বুঝিয়ে দিতে দিতে ফোনটা হাতে নিয়েছিলাম। বন্ধুদের গ্রুপে বেশ কিছু মেসেজ জমে ছিল। তার মধ্যে ফারিয়ার একটা ছোট্ট মেসেজ চোখে পড়ল।

— পরীক্ষা শেষ হলেই যে শান্তি পাব, এমনটা আর মনে হচ্ছে না।

কথাটা পড়ে কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ফারিয়ার সমস্যাটা আমাদের কারও অজানা ছিল না। পরিবার তার বিয়ের কথা প্রায় ঠিক করেই ফেলেছে। পাত্র তার বিদেশে থাকা কাজিন। পরিবারের চোখে হয়তো সবকিছুই যথাযথ—পরিচিত পরিবার, বিদেশে থাকা ছেলে, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। কিন্তু ফারিয়ার চোখে ব্যাপারটা এত সহজ ছিল না।

ওর আপত্তিটা শুধু ছেলেটাকে পছন্দ না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ওর মনে হতো, নিজের জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্তে ওর ইচ্ছাটারই যেন কোনো দাম নেই।

আর সবচেয়ে বড় কথা, পরীক্ষা শেষ হলেই ছেলেটা আসবে।

মানে, যে সময়টাকে ফারিয়ার একটু নিশ্চিন্তে শ্বাস নেওয়ার কথা ছিল, সেই সময়টাতেই ওকে নতুন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।

আমি মেসেজের উত্তর দিলাম।

— কী হয়েছে? আবার বিয়ের কথা বলেছে?

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না। তারপর ও লিখল—

— একই কথা। সবাই এমনভাবে কথা বলছে, যেন আমার মতামত দেওয়ার আর কিছু নেই। শুধু পরীক্ষাটা শেষ হওয়ার অপেক্ষা।

আমি লিখলাম—

— পরীক্ষা নিয়ে এখন যতটা পারো মন দাও। বাকি ব্যাপারটা নিয়ে তোমাকে একা ভাবতে হবে না। আমরা আছি।

মেসেজটা পাঠিয়ে বুঝলাম, কথাটা বলা যত সহজ, বাস্তবে ততটা নয়। আমরা বন্ধুরা ওর পাশে থাকতে পারি, ওর কথা শুনতে পারি; কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের পরিবারের সামনে দাঁড়ানোর সাহসটা ওকেই খুঁজে নিতে হবে।

কিছুক্ষণ পর ফারিয়া শুধু লিখল—

— জানি। কিন্তু মাঝে মাঝে খুব ভয় লাগে, রাহাত।

সেই ছোট্ট বাক্যটার মধ্যে কতটা অসহায়ত্ব লুকিয়ে ছিল, সেটা ওকে সামনে না দেখেও বুঝতে পারছিলাম।
ফারিয়া আবার বলল," কল করব?"

আমি জিজ্ঞেস করলাম," পারমিশন নিচ্ছিস?"
সে শুধু উত্তরে বলল
— কিছু ভালো লাগছে না রে।

আমি কল করলাম। ফারিয়া প্রথমে ধরল না। কয়েক মিনিট পর নিজেই ভিডিও কল দিল।

ওর মুখ দেখেই বুঝলাম, আজকের অস্বস্তিটা অন্য দিনের মতো নয়। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, চুলগুলো এলোমেলো। পাশে খোলা বই পড়ে আছে, কিন্তু ওর মন যে সেখানে নেই, সেটা বুঝতে অসুবিধা হলো না।

— কী হয়েছে?

ফারিয়া মাথা নাড়ল।

— কিছু না।

— কিছু না হলে আমাকে ফোন করেছিস কেন?

ও একটু হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না।

— বাড়িতে আবার ঝামেলা হয়েছে। মা আর বাবা… একই কথা, একই ঝগড়া। আমি আর নিতে পারছি না।

কথাটা বলেই ও চুপ করে গেল।

আমি তাড়াহুড়ো করে কোনো উপদেশ দিলাম না। জানতাম, এই মুহূর্তে ওর দরকার এমন কেউ, যে ওর কথা শুনবে; প্রতিটা সমস্যার জন্য সঙ্গে সঙ্গে সমাধান বাতলে দেবে না।

কিছুক্ষণ পর ফারিয়া নিজেই বলল,

— তার ওপর পরীক্ষা শেষ হলেই ও আসবে। সবাই এমনভাবে কথা বলে, যেন বিয়েটা হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। আমার কী ইচ্ছা, সেটা কেউ জানতে চায় না।

— তুই কি বাড়িতে পরিষ্কার করে বলেছিস যে তুই এই বিয়েতে রাজি না?

— বলেছি। কিন্তু ওরা মনে করে, এখন বুঝতে পারছি না। পরে নাকি সব ঠিক হয়ে যাবে।

ওর গলায় রাগের চেয়ে ক্লান্তিই বেশি ছিল।

— আমি শুধু পড়াশোনাটা শেষ করতে চাই। নিজের মতো একটু বাঁচতে চাই। এতটুকুও কি বেশি চাওয়া?

আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।

— না রে। এটা বেশি চাওয়া নয়। আর তোর মতামত গুরুত্বপূর্ণ। তুই কী চাস, সেটা ঠিক করার অধিকার তোর আছে।

ফারিয়া চোখ নামিয়ে ফেলল। কয়েক মুহূর্ত পর দেখলাম, চোখের কোণে পানি জমেছে।

— জানিস, মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি যদি কিছুদিনের জন্য সবকিছু থেকে দূরে চলে যেতে পারতাম!

— কোথাও পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে না। আগে একটু শান্ত হ। তুই চাইলে কথা বল, না চাইলে চুপ করে থাক। আমি শুনছি।

ও এবার কাঁদল। খুব জোরে নয়—চুপচাপ, নিজের কান্না নিজেই লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতে করতে। আমি স্ক্রিনের ওপাশ থেকে ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণ পর ও নিজেই চোখ মুছে বলল,

— সরি। তোকে এসব বলে বিরক্ত করলাম।

— আবার এই কথা! বন্ধুদের কাছে নিজের কষ্ট বলতেও অনুমতি নিতে হবে নাকি?

ফারিয়া একটু হাসল।

— তুই মাঝে মাঝে ভালো কথাও বলিস।

— মাঝে মাঝে?

— বেশি ভাবিস না।

ওর পরিচিত খুনসুটিটুকু ফিরে আসায় আমারও ভালো লাগল। কিন্তু হাসির আড়ালে যে দুশ্চিন্তা রয়ে গেছে, সেটা দুজনেই জানতাম।

কথা বলতে বলতে রাত বাড়ল। পড়াশোনা, ওর ডায়েরি, আমার দিনের গল্প—বিষয় বদলাতে বদলাতে ওর মুখের অস্বস্তি কিছুটা কমে এল। একসময় ফারিয়া বলল,

— তুই থাকলে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য মাথার ভেতরের আওয়াজগুলো থেমে যায়।

আমি কথাটাকে প্রেমের স্বীকারোক্তি বানালাম না। শুধু বললাম,

— তাহলে যখন কথা বলতে ইচ্ছে করবে, জানাস।

ও আমার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই চেনা দৃষ্টি—যেখানে ক্লান্তি আছে, একটু লজ্জা আছে, আর আছে এমন একটা স্বস্তি, যা ও হয়তো অন্য কোথাও সহজে পায় না।

সেদিনের কথোপকথন সেখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু আমাদের সম্পর্কের মধ্যে আগে থেকেই যে আকর্ষণ আর শারীরিক ঘনিষ্ঠতার স্মৃতি ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় ছিল না। ফারিয়া নিজেও জানত, রাহাতের কাছে সে শুধু নিজের কষ্টের কথা বলে না; কখনো কখনো সে নিজের ইচ্ছা, দুষ্টুমি আর আকর্ষণও প্রকাশ করে।

তবু আমি চাইনি, ওর কান্নার মুহূর্তকে কোনো সুযোগ হিসেবে নিতে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

— এখন কি একটু ভালো লাগছে?

ফারিয়া মাথা নাড়ল।

— হ্যাঁ। একটু।

— তাহলে আজ আর পড়ার চাপ নিস না। যা পারিস পড়ে ঘুমিয়ে পড়িস।

ও মৃদু হেসে বলল,

— তুই সবসময় এত ভালো ছেলে সাজিস কেন?

— আমি ভালো ছেলে, এটা তো তোরই ধারণা।

— ধুর! আবার শুরু করলি।

দুজনেই হেসে উঠলাম। কিছুক্ষণ পর ও বিদায় নিল।

কল শেষ করে ফোনটা নামিয়ে রাখলাম। ওর কষ্ট দূর হয়নি, বিয়ের সমস্যারও কোনো সমাধান হয়নি। কিন্তু অন্তত সেই রাতে ও একা ছিল না।

আর আমি বুঝলাম, মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত আসে, যেখানে ভালোবাসার বড় বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে সামান্য সঙ্গ, কিছু নির্ভার হাসি আর কারও পাশে বসে থাকার অনুভূতিটুকুই বেশি দরকার হয়।
Like Reply


Messages In This Thread
RE: নিষিদ্ধ বসন্ত - by Avi9695 - 8 hours ago



Users browsing this thread: genny1122, 2 Guest(s)