15-10-2026, 01:17 AM
মিলির সঙ্গে দেখা হওয়ার পরের দিনগুলো পরীক্ষার প্রস্তুতিতেই কেটে যাচ্ছিল। হোস্টেলে থেকে মিলি মাঝেমধ্যে ফোন করত, কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে মেসেজ দিত। আমিও সময় পেলে ওকে বুঝিয়ে দিতাম। আপাতত জীবনের এই ছোটখাটো ব্যস্ততাগুলোই ভালো লাগছিল।
ঐশীর সঙ্গে আর কোনো কথা হয়নি। শেষবার মেসেজে সে শুধু সময় চেয়েছিল। আমিও আর তাকে বিরক্ত করিনি। কিছু সম্পর্ককে জোর করে এগিয়ে নেওয়া যায় না—এই কথাটা নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম।
সেদিন রাতেও বই খুলে বসেছিলাম। ঘড়িতে প্রায় সাড়ে দশটা। চারপাশ বেশ শান্ত, শুধু মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নামটা দেখে একটু অবাক হলাম—সাদিয়া।
কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে চাপা গলায় ভেসে এল,
— কী করছিস?
— পড়ছি। তুই?
— ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম।
— তাহলে ফোন করলি কেন? ঘুমাতে দিতাম না?
সাদিয়া একটু হাসল, কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
— রাহাত, তোর সঙ্গে একটা কথা ছিল।
ওর গলার স্বর শুনে বুঝলাম, সাধারণ কোনো কথা বলার জন্য ফোন করেনি।
— বল। কী হয়েছে?
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সাদিয়া বলল,
— রিয়াজ আবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
আমি বইটা বন্ধ করে বিছানায় হেলান দিলাম।
— রিয়াজ? এত দিন পর?
— হ্যাঁ। প্রথমে মেসেজ করেছিল। তারপর আজ ফোনও করল।
— কী বলল?
সাদিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— বলছে, ও ভুল করেছে। আমাকে নাকি এখনও ভালোবাসে। আবার সবকিছু নতুন করে শুরু করতে চায়।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। রিয়াজের সঙ্গে সাদিয়ার সম্পর্কটা যে শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেটা আমি জানতাম। রিয়াজই ওকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সেই সময় সাদিয়া বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে কতটা ভেঙে পড়েছিল, সেটাও আমার অজানা ছিল না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— আর তুই কী বলেছিস?
— আমি বলেছি, আমি আর ওই সম্পর্কে ফিরতে চাই না।
— তাহলে সমস্যা কোথায়?
— সমস্যা হলো, ও বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে। বলছে, মানুষ ভুল করে, একটা সুযোগ তো দিতেই পারি। এমনভাবে কথা বলে, যেন আমি ওকে আরেকবার সুযোগ না দিলে আমিই খারাপ মানুষ হয়ে যাব।
আমি শান্ত গলায় বললাম,
— ওর ভুলের জন্য তুই কেন নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে অপরাধবোধে ভুগবি? ও যখন তোকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তখন তোকে একা সামলাতে হয়েছিল সবকিছু। এখন ও ফিরে এসেছে বলেই তোর সবকিছু ভুলে যেতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা রইল।
তারপর সাদিয়া বলল,
— জানিস, একসময় ওর একটা মেসেজের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতাম! আর এখন ও ফোন করলে বিরক্ত লাগে। কখনো কখনো মনে হয়, মানুষটা কি সত্যিই সেই রিয়াজ, যাকে আমি এত ভালোবেসেছিলাম?
— মানুষটা একই হতে পারে। কিন্তু তোর অনুভূতি আর আগের জায়গায় নেই।
— তুই মনে করিস, আমি ভুল করছি না তো?
— না চাইলে ফিরবি না। ভালোবাসা কোনো পুরোনো চুক্তি না যে একবার রাজি হয়েছিলি বলে সারাজীবন সেই সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে।
সাদিয়া মৃদু স্বরে বলল,
— তোর সঙ্গে কথা বললে মাথাটা একটু পরিষ্কার হয়।
আমি হেসে বললাম,
— কারণ আমি তোর সমস্যার সমাধান করি না। শুধু তোর মাথার ভেতরকার জটগুলো একটু নেড়েচেড়ে দিই।
— বাহ! নিজেকে তো বেশ জ্ঞানী ভাবিস!
— ভাবতে তো দোষ নেই। বাস্তবে কেউ স্বীকার করে না, তাই ফোনে সুযোগটা কাজে লাগাই।
এবার সাদিয়া একটু জোরে হেসে উঠল।
কথার ভার কিছুটা হালকা হলো। আমরা রিয়াজের কথা থেকে ধীরে ধীরে অন্য প্রসঙ্গে চলে এলাম। পরীক্ষার প্রস্তুতি, হোস্টেলের মেয়েদের বিচিত্র কাণ্ড, আর আমাদের পরিচিত মানুষদের নিয়ে টুকটাক আলোচনা চলতে লাগল।
রাত বাড়ছিল। তবু কেউই ফোনটা কাটার কথা বলছিলাম না।
একসময় সাদিয়া বলল,
— আচ্ছা রাহাত, একটা কথা বলি?
— বল।
— তুই কি মনে করিস, মানুষ একবার কারও খুব কাছের হয়ে গেলে পরে আবার আগের মতো স্বাভাবিক থাকতে পারে?
প্রশ্নটা শুনে আমি ফোনটা কানের কাছে একটু শক্ত করে ধরলাম।
— কোন অর্থে বলছিস?
— তুই বুঝেও না-বোঝার ভান করছিস কেন?
ওর গলায় পরিচিত সেই দুষ্টুমি মেশানো অভিমান। এই স্বরটা আমার অচেনা নয়। একসময় আমাদের রাতের কথোপকথনগুলো এমনই হতো—প্রথমে সাধারণ কথা, তারপর পুরোনো স্মৃতি, তারপর এমন কিছু প্রসঙ্গ, যেগুলো দিনের বেলায় আমরা হয়তো এড়িয়ে যেতাম।
আমি মৃদু হেসে বললাম,
— সব কথা কি মুখে বলে বুঝিয়ে দিতে হয়?
— না। কিন্তু কিছু কথা শুনতে ভালো লাগে।
— তাহলে তুই ঠিক কী শুনতে চাইছিস?
সাদিয়া উত্তর দিল না। কয়েক সেকেন্ড পর শুধু বলল,
— তুই আগের মতোই আছিস, রাহাত।
— এটা প্রশংসা, নাকি অভিযোগ?
— জানি না। হয়তো দুটোই।
আমি বিছানায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। রিয়াজের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর সাদিয়ার রাতগুলো কেমন ছিল, সেটা আমার মনে আছে। সে অনেক কথা বলত, কখনো রাগ করত, কখনো নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েই সন্দেহ করত। আর আমি ওকে বারবার বলতাম, নিজের ইচ্ছা থাকা কোনো অপরাধ নয়, নিজের কথা বলতে লজ্জা পাওয়ারও কিছু নেই।
আমাদের মধ্যে সেই সময় এমন এক ঘনিষ্ঠতা তৈরি
হয়েছিল, যেটা বাইরের কাউকে বোঝানো সহজ নয়। ভিডিও কলে দীর্ঘ রাত কাটানো, পরস্পরের সামনে নির্ভয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা—এসবের মধ্যে আকর্ষণ ছিল, বিশ্বাসও ছিল। কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল এই নিশ্চয়তা যে, অন্যজন তাকে ছোট করবে না।
সাদিয়া ধীরে বলল,
— রিয়াজের সঙ্গে থাকাকালীন সবসময় মনে হতো, আমাকে ওর পছন্দমতো হতে হবে। কী বলব, কী পরব, কার সঙ্গে কথা বলব—সবকিছুতেই যেন একটা অদৃশ্য অনুমতি লাগত। প্রথম দিকে ভাবতাম, হয়তো এটাই ভালোবাসা।
আমি বললাম,
— কিন্তু তুই তো জানিস, ভালোবাসা আর নিয়ন্ত্রণ এক জিনিস নয়।
— জানি। তোর কাছ থেকেই তো বুঝেছিলাম।
কথাটা শুনে আমি চুপ করে গেলাম।
সাদিয়া আবার বলল,
— একটা সময় তোর সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে হতো, আমি আবার নিজের মতো হতে পারছি। তুই কখনো আমাকে জেরা করিসনি। আমি কী অনুভব করছি, সেটা শুনতে চেয়েছিস। এমনকি যেসব কথা বলতে গিয়ে আমার নিজেরই লজ্জা লাগত, সেগুলোও তোর কাছে বলতে পারতাম।
— কারণ তোর অনুভূতিগুলো তোর নিজের। সেগুলো নিয়ে তোকে লজ্জা দেওয়ার অধিকার আমার নেই।
— এই জন্যই বোধহয় তোর সঙ্গে এতটা স্বচ্ছন্দ ছিলাম।
ওর কণ্ঠে এবার হাসি ছিল না। বরং একটা পুরোনো অনুভূতির কোমলতা ছিল, যেটা আমাদের দুজনেরই চেনা।
কিছুক্ষণ পর সাদিয়া একটু নিচু স্বরে বলল,
— আমাদের সেই রাতগুলোর কথা মনে পড়ে?
আমি বুঝলাম, ও কোন সময়টার কথা বলছে। তবু সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললাম,
— কোন রাতগুলো?
— রাহাত!
ওর ধমকের মধ্যে লজ্জা ছিল, অভিমানও ছিল।
আমি হেসে ফেললাম।
— আচ্ছা, মনে পড়ে।
— তুই ইচ্ছে করেই আমাকে দিয়ে কথা বলাস।
— তুই নিজেই তো প্রসঙ্গ তুলেছিস।
— থাক, তোর সঙ্গে কথা বলাই ভুল হয়েছে।
— তা হলে ফোনটা রেখে দে।
— রাখব না।
উত্তরটা এত দ্রুত এল যে আমি আবার হেসে উঠলাম।
সাদিয়াও হাসল। সেই হাসির মধ্যে আগের দিনের পরিচিত স্বচ্ছন্দতা ফিরে এল। আমাদের দুজনেরই জানা ছিল, অতীতের সেই ঘনিষ্ঠতা শুধু কয়েকটি ভিডিও কলের স্মৃতি ছিল না। তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিশ্বাস, আকর্ষণ, একাকিত্বের সময়ে পরস্পরের সঙ্গ এবং এমন কিছু অনুভূতি, যেগুলোকে তখন কোনো নির্দিষ্ট নাম দেওয়া হয়নি।
— জানিস, সাদিয়া, — আমি বললাম, — পুরোনো কথা মনে পড়তেই পারে। কিন্তু তুই এখন কী চাস, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
ও কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
— আমি শুধু চাই, তোর সঙ্গে কথা বলার সময় যেন আবার নিজেকে লুকাতে না হয়।
— তা হলে লুকাবি না।
— আর যদি এমন কিছু বলি, যেটা শুনে তুই অন্য কিছু ভাবিস?
আমি শান্ত গলায় বললাম,
— তা হলে আগে তোর কথাটা বুঝব। নিজের মতো করে অর্থ বানিয়ে নেব না।
সাদিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— তুই জানিস, তোর এই ব্যাপারটাই আমার ভালো লাগে? তুই আমাকে নিজের মতো থাকতে দিস।
— আর তুই জানিস, তোর একটা সমস্যা আছে?
— কী?
— তুই একটা সাধারণ কথাকে দশটা প্রশ্নে পরিণত করতে পারিস।
ও হেসে উঠল।
— তুইও কম না। সব বুঝেও এমন ভাব করিস, যেন কিছুই বুঝিস না।
রাত তখন আরও গভীর হয়েছে। কথার মধ্যে মাঝে মাঝে পুরোনো দিনের ইঙ্গিত ফিরে আসছিল। দুজনেই জানতাম, আমাদের সম্পর্কের ইতিহাসটা অন্য বন্ধুদের মতো সরল নয়। কিন্তু অতীতের ঘনিষ্ঠতা মানেই যে বর্তমানেও একই জায়গায় ফিরে যেতে হবে, তা নয়।
সাদিয়া হঠাৎ বলল,
রাহাত, তুই এখনো আমার ওপর রাগ করিস না তো?
— কীসের জন্য?
— জানি না। কখনো কখনো মনে হয়, আমি হয়তো তোকে এমন একটা জায়গায় রেখেছিলাম, যার নাম নিজেও জানতাম না।
আমি কিছুক্ষণ ভেবে বললাম,
— সব সম্পর্কের নাম সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করতে হয় না, সাদিয়া। তবে দুজনের অনুভূতি নিয়ে যেন কেউ খেলি না—এটাই চাই।
ও ধীরে বলল,
— আমিও।
তারপর আর কিছুক্ষণ কোনো কথা হলো না। ফোনের ওপাশে সাদিয়ার নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। নীরবতাটা অস্বস্তিকর ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, এত দিনের পরিচয়ের কারণে কিছু কথা না বলেও বোঝা যায়।
শেষ পর্যন্ত সাদিয়াই নীরবতা ভাঙল।
— ভিডিও কল দেই?
সাদিয়ার কথাটা শুনে আমি একটু চুপ করে গেলাম। ফোনের ওপাশে তার নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। রাত তখন প্রায় এগারোটা।
“ভিডিও কল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ। অনেকদিন হলো।”
আমি হাসলাম।
“তুই তো আজকেই ক্যাম্পাসে দেখেছিস।”
“সেটা অন্য। রাতে যখন একা থাকি, তখন অন্যরকম লাগে।”
আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম। মনে মনে ভাবছি আগের বারের কথা তারপর বললাম,
“ঠিক আছে। দে।”
কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে সাদিয়ার মুখ ভেসে উঠল। সে বিছানায় শুয়ে আছে। মাথার নিচে একটা বালিশ। চুল খোলা, একপাশে ছড়ানো। পরনে একটা হালকা গোলাপি নাইট ড্রেস। ঘরের আলো মৃদু। তার চোখের নিচে হালকা কালি। দেখে মনে হলো সত্যিই ঘুমাতে পারছিল না।
“দেখলি?” সে হাসল। “এখন কেমন লাগছি?”
“ক্লান্ত।”
“ধুর।” সে মুখ বাঁকাল। “সত্যি করে বল।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। স্ক্রিনের আলোয় তার মুখটা একটু নরম লাগছিল।
“ভালো লাগছে। আগের মতোই।”
সাদিয়া একটু চুপ করে থেকে বলল,
সাদিয়া আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে সেই পুরনো আস্থা আর একটু অভিমান মেশানো। তামে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। আমি বলেই ফেললাম," এভাবে পরীক্ষার আগে রাত বিরাতে এইগুলা দেখালে পরিক্ষা গুল্লায় যাবে।"
সাদিয়া বলে উঠল, " আরেহ, পরিক্ষার আগে মন মাইন্ড ফ্রেশ করতে হয়, এরপর শুধু একমনে পড়ালেখা! "
আমি বললাম," আচ্ছা তাই, পরিক্ষার আগে ফ্রেশ মাইন্ড রাখতে আমাকে ব্যবহার করা হচ্ছে?"
সাদিয়া অভিমানের সুরে বলল," আরে শালা, ফ্রেশ কি আমি একা হব,তুই মনে হচ্ছে বেশি সাধু হয়ে গেছিস"। শুনে আমি হেসে উঠলাম।
সাদিয়া ফোনটা একটু কাছে নিয়ে এল। তার গলা দেখা গেল। নাইট ড্রেসের নেকলাইন একটু নিচে নেমে গেছে।
“রাহাত… তুই কি কখনো ভাবিস আমাদের সেই রাতগুলোর কথা?”
“ভাবি।”
“কী ভাবিস?”
“যে তুই তখন খুব একা ছিলে। আর আমিও।”
সাদিয়া হাসল। হাসিটা একটু তিক্ত।
“শুধু একা ছিলাম? আর কিছু না?”
আমি তার চোখের দিকে তাকালাম।
“আরও কিছু ছিল। কিন্তু সেই ‘আরও কিছু’র নাম আমরা কেউ দিইনি।”
সাদিয়া চোখ নামাল। তার আঙুলগুলো বিছানার চাদরে ঘষা খাচ্ছিল।
“আজকে রিয়াজ ফোন করার পর মনে হলো… আমি যদি ওর কাছে ফিরে যাই, তাহলে আবার সেই পুরনো নিয়মগুলো মানতে হবে। আর তোর সাথে যদি কথা বলি, তাহলে… তাহলে আমি নিজের মতো থাকতে পারি। কিন্তু নিজের মতো থাকতে গেলে কী হয়, সেটাও জানি না।”
আমি শান্ত গলায় বললাম,
“তুই যা চাইবি, তাই হবে। আমি তোকে কিছু বলব না।”
সাদিয়া মাথা তুলল। তার চোখে একটা অদ্ভুত চাহনি।
“আর যদি আমি বলি যে… আজকে তোর সাথে কথা বলতে বলতে আমার মনে হচ্ছে, আমি আবার সেই রাতগুলোর মতো হতে চাই?”
আমি চুপ করে রইলাম। স্ক্রিনের ওপাশে সাদিয়া আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার শ্বাস একটু ভারী হয়ে উঠেছিল। ঘরের আলোয় তার গলায় একটা হালকা ছায়া পড়েছিল।
“বল,” আমি বললাম। “কী হতে চাইছিস?”
সাদিয়া ঠোঁট চেপে ধরল। তারপর খুব আস্তে বলল,
“জানি না। শুধু… আজকে একা থাকতে ইচ্ছে করছে না।”
ফোনের ওপাশে নীরবতা নেমে এল। শুধু তার শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম — সে রিয়াজের কথা বলতে বলতে আসলে নিজের ভেতরের সেই পুরনো জায়গাটাতে ফিরে যেতে চাইছে, যেখানে সে লুকাতে হতো না। কিন্তু সে জানে না যে সেই জায়গাটা এখনো আছে কিনা।
আমি বললাম,
“তাহলে কথা বল। যতক্ষণ ইচ্ছে। আমি শুনছি।”
সাদিয়া একটু হাসল। তারপর ফোনটা আরও একটু কাছে নিয়ে এল।
“ঠিক আছে। কিন্তু তুই যদি ক্লান্ত হয়ে যাস, বলে দিস।”
“বলব।”
আমরা আবার কথা বলতে শুরু করলাম। কিন্তু এবার কথার মধ্যে সেই পুরনো উষ্ণতা ফিরে এসেছিল। সাদিয়া মাঝে মাঝে চুপ করে আমার দিকে তাকাত, আমিও তাকাতাম। কেউ কিছু বলত না। শুধু স্ক্রিনের আলোয় দুজনের মুখ দেখা যেত। রাত আরও গভীর হচ্ছিল। আর মনে হচ্ছিল, কিছু সম্পর্ক শেষ হয় না — শুধু থেমে থাকে, যতক্ষণ না কেউ আবার সেই থেমে থাকা জায়গাটা স্পর্শ করে।
সাদিয়া চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনের মৃদু আলোয় তার চোখ একটু ভারী লাগছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম সে কিছু একটা বলতে চাইছে, কিন্তু ইচ্ছে করেই থামছে।
“কী হলো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। “হঠাৎ চুপ করে গেলি?”
সাদিয়া ঠোঁটের কোণায় হাসল।
“কিছু না। শুধু ভাবছি… তোর সাথে এভাবে কথা বলতে বলতে আবার সেই পুরনো রাতগুলোর কথা মনে পড়ে যায়।”
“মনে পড়লে খারাপ লাগে?”
“না।” সে চোখ নামাল। “বরং… ভালো লাগে। কিন্তু ভালো লাগলেই তো সব করা যায় না।”
আমি একটু হাসলাম।
“তুই নিজেই তো বললি, পরীক্ষার আগে মন ফ্রেশ রাখতে হয়।”
সাদিয়া আমার দিকে তাকাল। তার চোখে অভিমান আর একটু দুষ্টুমি মেশানো।
“ফ্রেশ করতে বলেছিলাম, এভাবে গলিয়ে দিতে বলিনি।”
“আমি তো এখনো কিছু করিনি।”
সাদিয়া চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। তার শ্বাস ভারী, কিন্তু সে এখনো নিজেকে পুরোপুরি ছাড়েনি। আমি ফোন হাতে ধরে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। স্ক্রিনের ওপাশে তার মুখ দেখা যাচ্ছে — ঠোঁট একটু ফাঁক, ভ্রু হালকা কুঁচকানো, যেন সে একই সাথে কিছু চাইছে এবং কিছু আটকানোর চেষ্টা করছে।
আমি বুঝতে পারছিলাম তার মনের অবস্থা।
সাদিয়া এখন দ্বন্দ্বে আছে। একদিকে রিয়াজের ফোন তাকে পুরনো সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে — সেই সম্পর্ক যেখানে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো, যেখানে তার শরীরের কথা শোনা হতো না। অন্যদিকে আমার সাথে তার পুরনো রাতগুলোর স্মৃতি জেগে উঠেছে। সেই রাতগুলোতে সে নিজেকে লুকাতে হয়নি। সে খোলামেলা কথা বলতে পেরেছিল। তার শরীরের কথা বলতে পেরেছিল। আর সেই স্বাধীনতাটাই তাকে আবার টানছে।
কিন্তু সে ভয়ও পাচ্ছে।
সে জানে, আজকে যদি সে নিজেকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়, তাহলে পরের দিন তার মনে প্রশ্ন জাগবে — “আমি কি আবার সেই জায়গায় ফিরে গেলাম? নাকি এটা অন্য কিছু?” সে রিয়াজের কাছে ফিরতে চায় না। কিন্তু আমার সাথে যা ছিল, তারও কোনো নাম ছিল না। তাই সে এখন নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে।
সাদিয়া চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনের মৃদু আলোয় তার চোখ একটু ভারী লাগছিল।
নাইট ড্রেসের একটা স্ট্র্যাপ কাঁধ থেকে একটু নেমে গেছে। সে সেটা ঠিক করে নিল।
“তোর চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় তুই কী ভাবছিস।”
আমি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সাদিয়াও তাকিয়ে ছিল। কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না। তারপর আমি আস্তে করে বললাম,
“চোখ বন্ধ কর।”
সাদিয়া ভ্রু কুঁচকাল।
“কেন?”
“কর না। দেখ কী হয়।”
সে একটু দ্বিধা করল। তারপর ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার শ্বাস স্বাভাবিকই ছিল তখনো।
“ভাব, আমি তোর পাশে বসে আছি,” আমি বললাম। গলা নিচু। “আমার হাত তোর কাঁধে। আঙুল দিয়ে তোর নাইট ড্রেসের স্ট্র্যাপটা আস্তে নামিয়ে দিচ্ছি। তুই কিছু বলছিস না। শুধু শ্বাস নিচ্ছিস।”
সাদিয়ার কাঁধ একটু শক্ত হয়ে গেল। সে চোখ খুলল না, কিন্তু তার গলায় একটা সতর্কতা এল।
“রাহাত… এভাবে বলিস না।”
“কেন? খারাপ লাগছে?”
সে উত্তর দিল না সঙ্গে সঙ্গে। তারপর খুব আস্তে বলল,
“খারাপ লাগছে না। সেইজন্যই… থাম।”
আমি থামলাম না।
“আমার ঠোঁট তোর কাঁধে লেগে আছে। খুব আলতো। তোর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। আমি তোর গলার কাছে মুখ নিয়ে যাচ্ছি। তুই মাথা একটু কাত করে দিচ্ছিস। ইচ্ছে করে না, কিন্তু সরেও যাচ্ছিস না।”
সাদিয়া নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল। তার এক হাত বিছানার চাদর মুঠো করে আছে।
“রাহাত…”
“হুম?”
“আমি… নিজেকে সামলাতে চাইছি।”
“সামলা। আমি তোকে কিছু করতে বলছি না। শুধু শুনছিস।”
সে চুপ করে রইল। তার শ্বাস একটু ভারী হয়ে উঠেছিল। আমি আবার বললাম,
“এখন আমার হাত তোর বুকের উপর। নাইট ড্রেসের উপর দিয়ে। আঙুল দিয়ে আস্তে ঘষছি। তোর নিপল শক্ত হয়ে উঠেছে। আমি সেটা টের পাচ্ছি। তুই শ্বাস আটকে রাখছিস। কিন্তু হাত সরাচ্ছ না।”
সাদিয়ার উরু একটু নড়ে উঠল। সে চোখ খোলেনি। তার গলা কাঁপছিল যখন বলল,
“তুই… জানোস আমি কেমন হয়ে যাই এভাবে শুনলে।”
“জানি। সেইজন্যই বলছি।”
আমি একটু থামলাম। তারপর আরও নিচু গলায় বললাম,
“আমার হাত এখন নিচে যাচ্ছে। তোর নাইট ড্রেস আস্তে করে কোমর পর্যন্ত তুলছি। তুই পা জড়ো করে রাখছিস। আমি জোর করছি না। শুধু আমার আঙুল তোর উরুর ভেতরের দিকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তুই কাঁপছিস। কিন্তু সরাচ্ছিস না।”
সাদিয়া একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ল। তার চোখ এখনো বন্ধ। ঠোঁট একটু ফাঁক হয়ে গেছে।
“রাহাত… আমি আর… সামলাতে পারছি না…”
“পারছিস,” আমি বললাম। “এখনো পারছিস। কিন্তু আর একটু পরে পারবি না। কারণ আমি থামব না। আর তুইও আমাকে থামাতে চাইছিস না।”
সাদিয়া উত্তর দিল না। শুধু তার শ্বাস আরও ভারী হয়ে উঠল। স্ক্রিনের ওপাশে সে শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ, হাত নিজের শরীরে নেই। কিন্তু তার শরীর ধীরে ধীরে আমার কথার সাথে মিশে যাচ্ছিল। সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল।
আমি বুঝতে পারছিলাম তার মনের অবস্থা।
তার উরু নড়ছে। শ্বাস ভারী হচ্ছে। গলা কাঁপছে। সে বলছে “সামলাতে পারছি না”, কিন্তু এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। কারণ সে জানে, একবার ভেঙে পড়লে আবার জোড়া লাগাতে সময় লাগবে। আর পরীক্ষার আগে সে সেই ঝামেলায় পড়তে চায় না।
আমি তার এই দ্বন্দ্বটা দেখতে পাচ্ছিলাম।
সাদিয়া চায় কেউ তাকে ছুঁয়ে দেখুক — শুধু শরীর নয়, তার ভেতরের কথাটাও। সে চায় কেউ তাকে নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু অনুভব করতে দেয়। কিন্তু একই সাথে সে ভয় পায় যে, এই অনুভূতিটাকে আবার নাম দিতে হবে। আর নাম দিলেই হয়তো সবকিছু জটিল হয়ে যাবে।
তাই সে এখন মাঝখানে আছে।
চোখ বন্ধ। শরীর গরম। কিন্তু মন এখনো একটু আগলে রাখা। সে আমার কথা শুনছে, সাড়া দিচ্ছে, কিন্তু নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করেনি। যেন বলতে চাইছে — “আরও বল। কিন্তু আমাকে একবারে নিয়ে যেও না। আস্তে আস্তে নিয়ে যাও। যাতে আমি নিজেই বুঝতে পারি যে আমি কোথায় যাচ্ছি।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার শ্বাস আরও একটু ভারী হয়ে উঠেছে। সে এখনো কিছু বলেনি। কিন্তু আমি জানতাম — আর একটু পরেই তার সেই সামলানোর চেষ্টাটা ভেঙে যাবে। কারণ সে আসলে ভাঙতেই চেয়েছিল। শুধু কেউ তাকে ধীরে ধীরে সেই জায়গায় নিয়ে যাক, যেন সে পরে নিজেকে দোষ না দেয়।
আমি আবার কথা বললাম। খুব আস্তে।
“তুই এখনো নিজেকে আটকে রাখছিস। আমি জানি। কিন্তু তোর শরীর তোকে ধরে রাখছে না। তোর শরীর ইতিমধ্যে আমার কথার সাথে মিশে গেছে। তুই শুধু মন দিয়ে বাধা দিচ্ছিস। আর সেই বাধাটাও আর বেশিক্ষণ থাকবে না।”
ঐশীর সঙ্গে আর কোনো কথা হয়নি। শেষবার মেসেজে সে শুধু সময় চেয়েছিল। আমিও আর তাকে বিরক্ত করিনি। কিছু সম্পর্ককে জোর করে এগিয়ে নেওয়া যায় না—এই কথাটা নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম।
সেদিন রাতেও বই খুলে বসেছিলাম। ঘড়িতে প্রায় সাড়ে দশটা। চারপাশ বেশ শান্ত, শুধু মাঝে মাঝে রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাওয়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে নামটা দেখে একটু অবাক হলাম—সাদিয়া।
কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে চাপা গলায় ভেসে এল,
— কী করছিস?
— পড়ছি। তুই?
— ঘুমানোর চেষ্টা করছিলাম।
— তাহলে ফোন করলি কেন? ঘুমাতে দিতাম না?
সাদিয়া একটু হাসল, কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
— রাহাত, তোর সঙ্গে একটা কথা ছিল।
ওর গলার স্বর শুনে বুঝলাম, সাধারণ কোনো কথা বলার জন্য ফোন করেনি।
— বল। কী হয়েছে?
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সাদিয়া বলল,
— রিয়াজ আবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
আমি বইটা বন্ধ করে বিছানায় হেলান দিলাম।
— রিয়াজ? এত দিন পর?
— হ্যাঁ। প্রথমে মেসেজ করেছিল। তারপর আজ ফোনও করল।
— কী বলল?
সাদিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— বলছে, ও ভুল করেছে। আমাকে নাকি এখনও ভালোবাসে। আবার সবকিছু নতুন করে শুরু করতে চায়।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। রিয়াজের সঙ্গে সাদিয়ার সম্পর্কটা যে শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেটা আমি জানতাম। রিয়াজই ওকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সেই সময় সাদিয়া বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে কতটা ভেঙে পড়েছিল, সেটাও আমার অজানা ছিল না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— আর তুই কী বলেছিস?
— আমি বলেছি, আমি আর ওই সম্পর্কে ফিরতে চাই না।
— তাহলে সমস্যা কোথায়?
— সমস্যা হলো, ও বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে। বলছে, মানুষ ভুল করে, একটা সুযোগ তো দিতেই পারি। এমনভাবে কথা বলে, যেন আমি ওকে আরেকবার সুযোগ না দিলে আমিই খারাপ মানুষ হয়ে যাব।
আমি শান্ত গলায় বললাম,
— ওর ভুলের জন্য তুই কেন নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে অপরাধবোধে ভুগবি? ও যখন তোকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তখন তোকে একা সামলাতে হয়েছিল সবকিছু। এখন ও ফিরে এসেছে বলেই তোর সবকিছু ভুলে যেতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা রইল।
তারপর সাদিয়া বলল,
— জানিস, একসময় ওর একটা মেসেজের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতাম! আর এখন ও ফোন করলে বিরক্ত লাগে। কখনো কখনো মনে হয়, মানুষটা কি সত্যিই সেই রিয়াজ, যাকে আমি এত ভালোবেসেছিলাম?
— মানুষটা একই হতে পারে। কিন্তু তোর অনুভূতি আর আগের জায়গায় নেই।
— তুই মনে করিস, আমি ভুল করছি না তো?
— না চাইলে ফিরবি না। ভালোবাসা কোনো পুরোনো চুক্তি না যে একবার রাজি হয়েছিলি বলে সারাজীবন সেই সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে।
সাদিয়া মৃদু স্বরে বলল,
— তোর সঙ্গে কথা বললে মাথাটা একটু পরিষ্কার হয়।
আমি হেসে বললাম,
— কারণ আমি তোর সমস্যার সমাধান করি না। শুধু তোর মাথার ভেতরকার জটগুলো একটু নেড়েচেড়ে দিই।
— বাহ! নিজেকে তো বেশ জ্ঞানী ভাবিস!
— ভাবতে তো দোষ নেই। বাস্তবে কেউ স্বীকার করে না, তাই ফোনে সুযোগটা কাজে লাগাই।
এবার সাদিয়া একটু জোরে হেসে উঠল।
কথার ভার কিছুটা হালকা হলো। আমরা রিয়াজের কথা থেকে ধীরে ধীরে অন্য প্রসঙ্গে চলে এলাম। পরীক্ষার প্রস্তুতি, হোস্টেলের মেয়েদের বিচিত্র কাণ্ড, আর আমাদের পরিচিত মানুষদের নিয়ে টুকটাক আলোচনা চলতে লাগল।
রাত বাড়ছিল। তবু কেউই ফোনটা কাটার কথা বলছিলাম না।
একসময় সাদিয়া বলল,
— আচ্ছা রাহাত, একটা কথা বলি?
— বল।
— তুই কি মনে করিস, মানুষ একবার কারও খুব কাছের হয়ে গেলে পরে আবার আগের মতো স্বাভাবিক থাকতে পারে?
প্রশ্নটা শুনে আমি ফোনটা কানের কাছে একটু শক্ত করে ধরলাম।
— কোন অর্থে বলছিস?
— তুই বুঝেও না-বোঝার ভান করছিস কেন?
ওর গলায় পরিচিত সেই দুষ্টুমি মেশানো অভিমান। এই স্বরটা আমার অচেনা নয়। একসময় আমাদের রাতের কথোপকথনগুলো এমনই হতো—প্রথমে সাধারণ কথা, তারপর পুরোনো স্মৃতি, তারপর এমন কিছু প্রসঙ্গ, যেগুলো দিনের বেলায় আমরা হয়তো এড়িয়ে যেতাম।
আমি মৃদু হেসে বললাম,
— সব কথা কি মুখে বলে বুঝিয়ে দিতে হয়?
— না। কিন্তু কিছু কথা শুনতে ভালো লাগে।
— তাহলে তুই ঠিক কী শুনতে চাইছিস?
সাদিয়া উত্তর দিল না। কয়েক সেকেন্ড পর শুধু বলল,
— তুই আগের মতোই আছিস, রাহাত।
— এটা প্রশংসা, নাকি অভিযোগ?
— জানি না। হয়তো দুটোই।
আমি বিছানায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলাম। রিয়াজের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর সাদিয়ার রাতগুলো কেমন ছিল, সেটা আমার মনে আছে। সে অনেক কথা বলত, কখনো রাগ করত, কখনো নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েই সন্দেহ করত। আর আমি ওকে বারবার বলতাম, নিজের ইচ্ছা থাকা কোনো অপরাধ নয়, নিজের কথা বলতে লজ্জা পাওয়ারও কিছু নেই।
আমাদের মধ্যে সেই সময় এমন এক ঘনিষ্ঠতা তৈরি
হয়েছিল, যেটা বাইরের কাউকে বোঝানো সহজ নয়। ভিডিও কলে দীর্ঘ রাত কাটানো, পরস্পরের সামনে নির্ভয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা—এসবের মধ্যে আকর্ষণ ছিল, বিশ্বাসও ছিল। কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল এই নিশ্চয়তা যে, অন্যজন তাকে ছোট করবে না।
সাদিয়া ধীরে বলল,
— রিয়াজের সঙ্গে থাকাকালীন সবসময় মনে হতো, আমাকে ওর পছন্দমতো হতে হবে। কী বলব, কী পরব, কার সঙ্গে কথা বলব—সবকিছুতেই যেন একটা অদৃশ্য অনুমতি লাগত। প্রথম দিকে ভাবতাম, হয়তো এটাই ভালোবাসা।
আমি বললাম,
— কিন্তু তুই তো জানিস, ভালোবাসা আর নিয়ন্ত্রণ এক জিনিস নয়।
— জানি। তোর কাছ থেকেই তো বুঝেছিলাম।
কথাটা শুনে আমি চুপ করে গেলাম।
সাদিয়া আবার বলল,
— একটা সময় তোর সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে হতো, আমি আবার নিজের মতো হতে পারছি। তুই কখনো আমাকে জেরা করিসনি। আমি কী অনুভব করছি, সেটা শুনতে চেয়েছিস। এমনকি যেসব কথা বলতে গিয়ে আমার নিজেরই লজ্জা লাগত, সেগুলোও তোর কাছে বলতে পারতাম।
— কারণ তোর অনুভূতিগুলো তোর নিজের। সেগুলো নিয়ে তোকে লজ্জা দেওয়ার অধিকার আমার নেই।
— এই জন্যই বোধহয় তোর সঙ্গে এতটা স্বচ্ছন্দ ছিলাম।
ওর কণ্ঠে এবার হাসি ছিল না। বরং একটা পুরোনো অনুভূতির কোমলতা ছিল, যেটা আমাদের দুজনেরই চেনা।
কিছুক্ষণ পর সাদিয়া একটু নিচু স্বরে বলল,
— আমাদের সেই রাতগুলোর কথা মনে পড়ে?
আমি বুঝলাম, ও কোন সময়টার কথা বলছে। তবু সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললাম,
— কোন রাতগুলো?
— রাহাত!
ওর ধমকের মধ্যে লজ্জা ছিল, অভিমানও ছিল।
আমি হেসে ফেললাম।
— আচ্ছা, মনে পড়ে।
— তুই ইচ্ছে করেই আমাকে দিয়ে কথা বলাস।
— তুই নিজেই তো প্রসঙ্গ তুলেছিস।
— থাক, তোর সঙ্গে কথা বলাই ভুল হয়েছে।
— তা হলে ফোনটা রেখে দে।
— রাখব না।
উত্তরটা এত দ্রুত এল যে আমি আবার হেসে উঠলাম।
সাদিয়াও হাসল। সেই হাসির মধ্যে আগের দিনের পরিচিত স্বচ্ছন্দতা ফিরে এল। আমাদের দুজনেরই জানা ছিল, অতীতের সেই ঘনিষ্ঠতা শুধু কয়েকটি ভিডিও কলের স্মৃতি ছিল না। তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিশ্বাস, আকর্ষণ, একাকিত্বের সময়ে পরস্পরের সঙ্গ এবং এমন কিছু অনুভূতি, যেগুলোকে তখন কোনো নির্দিষ্ট নাম দেওয়া হয়নি।
— জানিস, সাদিয়া, — আমি বললাম, — পুরোনো কথা মনে পড়তেই পারে। কিন্তু তুই এখন কী চাস, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
ও কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
— আমি শুধু চাই, তোর সঙ্গে কথা বলার সময় যেন আবার নিজেকে লুকাতে না হয়।
— তা হলে লুকাবি না।
— আর যদি এমন কিছু বলি, যেটা শুনে তুই অন্য কিছু ভাবিস?
আমি শান্ত গলায় বললাম,
— তা হলে আগে তোর কথাটা বুঝব। নিজের মতো করে অর্থ বানিয়ে নেব না।
সাদিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— তুই জানিস, তোর এই ব্যাপারটাই আমার ভালো লাগে? তুই আমাকে নিজের মতো থাকতে দিস।
— আর তুই জানিস, তোর একটা সমস্যা আছে?
— কী?
— তুই একটা সাধারণ কথাকে দশটা প্রশ্নে পরিণত করতে পারিস।
ও হেসে উঠল।
— তুইও কম না। সব বুঝেও এমন ভাব করিস, যেন কিছুই বুঝিস না।
রাত তখন আরও গভীর হয়েছে। কথার মধ্যে মাঝে মাঝে পুরোনো দিনের ইঙ্গিত ফিরে আসছিল। দুজনেই জানতাম, আমাদের সম্পর্কের ইতিহাসটা অন্য বন্ধুদের মতো সরল নয়। কিন্তু অতীতের ঘনিষ্ঠতা মানেই যে বর্তমানেও একই জায়গায় ফিরে যেতে হবে, তা নয়।
সাদিয়া হঠাৎ বলল,
রাহাত, তুই এখনো আমার ওপর রাগ করিস না তো?
— কীসের জন্য?
— জানি না। কখনো কখনো মনে হয়, আমি হয়তো তোকে এমন একটা জায়গায় রেখেছিলাম, যার নাম নিজেও জানতাম না।
আমি কিছুক্ষণ ভেবে বললাম,
— সব সম্পর্কের নাম সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করতে হয় না, সাদিয়া। তবে দুজনের অনুভূতি নিয়ে যেন কেউ খেলি না—এটাই চাই।
ও ধীরে বলল,
— আমিও।
তারপর আর কিছুক্ষণ কোনো কথা হলো না। ফোনের ওপাশে সাদিয়ার নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। নীরবতাটা অস্বস্তিকর ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, এত দিনের পরিচয়ের কারণে কিছু কথা না বলেও বোঝা যায়।
শেষ পর্যন্ত সাদিয়াই নীরবতা ভাঙল।
— ভিডিও কল দেই?
সাদিয়ার কথাটা শুনে আমি একটু চুপ করে গেলাম। ফোনের ওপাশে তার নিশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। রাত তখন প্রায় এগারোটা।
“ভিডিও কল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“হ্যাঁ। অনেকদিন হলো।”
আমি হাসলাম।
“তুই তো আজকেই ক্যাম্পাসে দেখেছিস।”
“সেটা অন্য। রাতে যখন একা থাকি, তখন অন্যরকম লাগে।”
আমি কিছুক্ষণ ভাবলাম। মনে মনে ভাবছি আগের বারের কথা তারপর বললাম,
“ঠিক আছে। দে।”
কয়েক সেকেন্ড পর স্ক্রিনে সাদিয়ার মুখ ভেসে উঠল। সে বিছানায় শুয়ে আছে। মাথার নিচে একটা বালিশ। চুল খোলা, একপাশে ছড়ানো। পরনে একটা হালকা গোলাপি নাইট ড্রেস। ঘরের আলো মৃদু। তার চোখের নিচে হালকা কালি। দেখে মনে হলো সত্যিই ঘুমাতে পারছিল না।
“দেখলি?” সে হাসল। “এখন কেমন লাগছি?”
“ক্লান্ত।”
“ধুর।” সে মুখ বাঁকাল। “সত্যি করে বল।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। স্ক্রিনের আলোয় তার মুখটা একটু নরম লাগছিল।
“ভালো লাগছে। আগের মতোই।”
সাদিয়া একটু চুপ করে থেকে বলল,
সাদিয়া আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে সেই পুরনো আস্থা আর একটু অভিমান মেশানো। তামে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। আমি বলেই ফেললাম," এভাবে পরীক্ষার আগে রাত বিরাতে এইগুলা দেখালে পরিক্ষা গুল্লায় যাবে।"
সাদিয়া বলে উঠল, " আরেহ, পরিক্ষার আগে মন মাইন্ড ফ্রেশ করতে হয়, এরপর শুধু একমনে পড়ালেখা! "
আমি বললাম," আচ্ছা তাই, পরিক্ষার আগে ফ্রেশ মাইন্ড রাখতে আমাকে ব্যবহার করা হচ্ছে?"
সাদিয়া অভিমানের সুরে বলল," আরে শালা, ফ্রেশ কি আমি একা হব,তুই মনে হচ্ছে বেশি সাধু হয়ে গেছিস"। শুনে আমি হেসে উঠলাম।
সাদিয়া ফোনটা একটু কাছে নিয়ে এল। তার গলা দেখা গেল। নাইট ড্রেসের নেকলাইন একটু নিচে নেমে গেছে।
“রাহাত… তুই কি কখনো ভাবিস আমাদের সেই রাতগুলোর কথা?”
“ভাবি।”
“কী ভাবিস?”
“যে তুই তখন খুব একা ছিলে। আর আমিও।”
সাদিয়া হাসল। হাসিটা একটু তিক্ত।
“শুধু একা ছিলাম? আর কিছু না?”
আমি তার চোখের দিকে তাকালাম।
“আরও কিছু ছিল। কিন্তু সেই ‘আরও কিছু’র নাম আমরা কেউ দিইনি।”
সাদিয়া চোখ নামাল। তার আঙুলগুলো বিছানার চাদরে ঘষা খাচ্ছিল।
“আজকে রিয়াজ ফোন করার পর মনে হলো… আমি যদি ওর কাছে ফিরে যাই, তাহলে আবার সেই পুরনো নিয়মগুলো মানতে হবে। আর তোর সাথে যদি কথা বলি, তাহলে… তাহলে আমি নিজের মতো থাকতে পারি। কিন্তু নিজের মতো থাকতে গেলে কী হয়, সেটাও জানি না।”
আমি শান্ত গলায় বললাম,
“তুই যা চাইবি, তাই হবে। আমি তোকে কিছু বলব না।”
সাদিয়া মাথা তুলল। তার চোখে একটা অদ্ভুত চাহনি।
“আর যদি আমি বলি যে… আজকে তোর সাথে কথা বলতে বলতে আমার মনে হচ্ছে, আমি আবার সেই রাতগুলোর মতো হতে চাই?”
আমি চুপ করে রইলাম। স্ক্রিনের ওপাশে সাদিয়া আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার শ্বাস একটু ভারী হয়ে উঠেছিল। ঘরের আলোয় তার গলায় একটা হালকা ছায়া পড়েছিল।
“বল,” আমি বললাম। “কী হতে চাইছিস?”
সাদিয়া ঠোঁট চেপে ধরল। তারপর খুব আস্তে বলল,
“জানি না। শুধু… আজকে একা থাকতে ইচ্ছে করছে না।”
ফোনের ওপাশে নীরবতা নেমে এল। শুধু তার শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম — সে রিয়াজের কথা বলতে বলতে আসলে নিজের ভেতরের সেই পুরনো জায়গাটাতে ফিরে যেতে চাইছে, যেখানে সে লুকাতে হতো না। কিন্তু সে জানে না যে সেই জায়গাটা এখনো আছে কিনা।
আমি বললাম,
“তাহলে কথা বল। যতক্ষণ ইচ্ছে। আমি শুনছি।”
সাদিয়া একটু হাসল। তারপর ফোনটা আরও একটু কাছে নিয়ে এল।
“ঠিক আছে। কিন্তু তুই যদি ক্লান্ত হয়ে যাস, বলে দিস।”
“বলব।”
আমরা আবার কথা বলতে শুরু করলাম। কিন্তু এবার কথার মধ্যে সেই পুরনো উষ্ণতা ফিরে এসেছিল। সাদিয়া মাঝে মাঝে চুপ করে আমার দিকে তাকাত, আমিও তাকাতাম। কেউ কিছু বলত না। শুধু স্ক্রিনের আলোয় দুজনের মুখ দেখা যেত। রাত আরও গভীর হচ্ছিল। আর মনে হচ্ছিল, কিছু সম্পর্ক শেষ হয় না — শুধু থেমে থাকে, যতক্ষণ না কেউ আবার সেই থেমে থাকা জায়গাটা স্পর্শ করে।
সাদিয়া চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনের মৃদু আলোয় তার চোখ একটু ভারী লাগছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম সে কিছু একটা বলতে চাইছে, কিন্তু ইচ্ছে করেই থামছে।
“কী হলো?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। “হঠাৎ চুপ করে গেলি?”
সাদিয়া ঠোঁটের কোণায় হাসল।
“কিছু না। শুধু ভাবছি… তোর সাথে এভাবে কথা বলতে বলতে আবার সেই পুরনো রাতগুলোর কথা মনে পড়ে যায়।”
“মনে পড়লে খারাপ লাগে?”
“না।” সে চোখ নামাল। “বরং… ভালো লাগে। কিন্তু ভালো লাগলেই তো সব করা যায় না।”
আমি একটু হাসলাম।
“তুই নিজেই তো বললি, পরীক্ষার আগে মন ফ্রেশ রাখতে হয়।”
সাদিয়া আমার দিকে তাকাল। তার চোখে অভিমান আর একটু দুষ্টুমি মেশানো।
“ফ্রেশ করতে বলেছিলাম, এভাবে গলিয়ে দিতে বলিনি।”
“আমি তো এখনো কিছু করিনি।”
সাদিয়া চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। তার শ্বাস ভারী, কিন্তু সে এখনো নিজেকে পুরোপুরি ছাড়েনি। আমি ফোন হাতে ধরে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। স্ক্রিনের ওপাশে তার মুখ দেখা যাচ্ছে — ঠোঁট একটু ফাঁক, ভ্রু হালকা কুঁচকানো, যেন সে একই সাথে কিছু চাইছে এবং কিছু আটকানোর চেষ্টা করছে।
আমি বুঝতে পারছিলাম তার মনের অবস্থা।
সাদিয়া এখন দ্বন্দ্বে আছে। একদিকে রিয়াজের ফোন তাকে পুরনো সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে — সেই সম্পর্ক যেখানে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো, যেখানে তার শরীরের কথা শোনা হতো না। অন্যদিকে আমার সাথে তার পুরনো রাতগুলোর স্মৃতি জেগে উঠেছে। সেই রাতগুলোতে সে নিজেকে লুকাতে হয়নি। সে খোলামেলা কথা বলতে পেরেছিল। তার শরীরের কথা বলতে পেরেছিল। আর সেই স্বাধীনতাটাই তাকে আবার টানছে।
কিন্তু সে ভয়ও পাচ্ছে।
সে জানে, আজকে যদি সে নিজেকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়, তাহলে পরের দিন তার মনে প্রশ্ন জাগবে — “আমি কি আবার সেই জায়গায় ফিরে গেলাম? নাকি এটা অন্য কিছু?” সে রিয়াজের কাছে ফিরতে চায় না। কিন্তু আমার সাথে যা ছিল, তারও কোনো নাম ছিল না। তাই সে এখন নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে।
সাদিয়া চুপ করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। স্ক্রিনের মৃদু আলোয় তার চোখ একটু ভারী লাগছিল।
নাইট ড্রেসের একটা স্ট্র্যাপ কাঁধ থেকে একটু নেমে গেছে। সে সেটা ঠিক করে নিল।
“তোর চোখের দিকে তাকালেই বোঝা যায় তুই কী ভাবছিস।”
আমি চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সাদিয়াও তাকিয়ে ছিল। কয়েক সেকেন্ড কেউ কিছু বলল না। তারপর আমি আস্তে করে বললাম,
“চোখ বন্ধ কর।”
সাদিয়া ভ্রু কুঁচকাল।
“কেন?”
“কর না। দেখ কী হয়।”
সে একটু দ্বিধা করল। তারপর ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার শ্বাস স্বাভাবিকই ছিল তখনো।
“ভাব, আমি তোর পাশে বসে আছি,” আমি বললাম। গলা নিচু। “আমার হাত তোর কাঁধে। আঙুল দিয়ে তোর নাইট ড্রেসের স্ট্র্যাপটা আস্তে নামিয়ে দিচ্ছি। তুই কিছু বলছিস না। শুধু শ্বাস নিচ্ছিস।”
সাদিয়ার কাঁধ একটু শক্ত হয়ে গেল। সে চোখ খুলল না, কিন্তু তার গলায় একটা সতর্কতা এল।
“রাহাত… এভাবে বলিস না।”
“কেন? খারাপ লাগছে?”
সে উত্তর দিল না সঙ্গে সঙ্গে। তারপর খুব আস্তে বলল,
“খারাপ লাগছে না। সেইজন্যই… থাম।”
আমি থামলাম না।
“আমার ঠোঁট তোর কাঁধে লেগে আছে। খুব আলতো। তোর গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। আমি তোর গলার কাছে মুখ নিয়ে যাচ্ছি। তুই মাথা একটু কাত করে দিচ্ছিস। ইচ্ছে করে না, কিন্তু সরেও যাচ্ছিস না।”
সাদিয়া নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরল। তার এক হাত বিছানার চাদর মুঠো করে আছে।
“রাহাত…”
“হুম?”
“আমি… নিজেকে সামলাতে চাইছি।”
“সামলা। আমি তোকে কিছু করতে বলছি না। শুধু শুনছিস।”
সে চুপ করে রইল। তার শ্বাস একটু ভারী হয়ে উঠেছিল। আমি আবার বললাম,
“এখন আমার হাত তোর বুকের উপর। নাইট ড্রেসের উপর দিয়ে। আঙুল দিয়ে আস্তে ঘষছি। তোর নিপল শক্ত হয়ে উঠেছে। আমি সেটা টের পাচ্ছি। তুই শ্বাস আটকে রাখছিস। কিন্তু হাত সরাচ্ছ না।”
সাদিয়ার উরু একটু নড়ে উঠল। সে চোখ খোলেনি। তার গলা কাঁপছিল যখন বলল,
“তুই… জানোস আমি কেমন হয়ে যাই এভাবে শুনলে।”
“জানি। সেইজন্যই বলছি।”
আমি একটু থামলাম। তারপর আরও নিচু গলায় বললাম,
“আমার হাত এখন নিচে যাচ্ছে। তোর নাইট ড্রেস আস্তে করে কোমর পর্যন্ত তুলছি। তুই পা জড়ো করে রাখছিস। আমি জোর করছি না। শুধু আমার আঙুল তোর উরুর ভেতরের দিকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। তুই কাঁপছিস। কিন্তু সরাচ্ছিস না।”
সাদিয়া একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ল। তার চোখ এখনো বন্ধ। ঠোঁট একটু ফাঁক হয়ে গেছে।
“রাহাত… আমি আর… সামলাতে পারছি না…”
“পারছিস,” আমি বললাম। “এখনো পারছিস। কিন্তু আর একটু পরে পারবি না। কারণ আমি থামব না। আর তুইও আমাকে থামাতে চাইছিস না।”
সাদিয়া উত্তর দিল না। শুধু তার শ্বাস আরও ভারী হয়ে উঠল। স্ক্রিনের ওপাশে সে শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ, হাত নিজের শরীরে নেই। কিন্তু তার শরীর ধীরে ধীরে আমার কথার সাথে মিশে যাচ্ছিল। সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছিল।
আমি বুঝতে পারছিলাম তার মনের অবস্থা।
তার উরু নড়ছে। শ্বাস ভারী হচ্ছে। গলা কাঁপছে। সে বলছে “সামলাতে পারছি না”, কিন্তু এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। কারণ সে জানে, একবার ভেঙে পড়লে আবার জোড়া লাগাতে সময় লাগবে। আর পরীক্ষার আগে সে সেই ঝামেলায় পড়তে চায় না।
আমি তার এই দ্বন্দ্বটা দেখতে পাচ্ছিলাম।
সাদিয়া চায় কেউ তাকে ছুঁয়ে দেখুক — শুধু শরীর নয়, তার ভেতরের কথাটাও। সে চায় কেউ তাকে নিয়ন্ত্রণ না করে শুধু অনুভব করতে দেয়। কিন্তু একই সাথে সে ভয় পায় যে, এই অনুভূতিটাকে আবার নাম দিতে হবে। আর নাম দিলেই হয়তো সবকিছু জটিল হয়ে যাবে।
তাই সে এখন মাঝখানে আছে।
চোখ বন্ধ। শরীর গরম। কিন্তু মন এখনো একটু আগলে রাখা। সে আমার কথা শুনছে, সাড়া দিচ্ছে, কিন্তু নিজেকে পুরোপুরি সমর্পণ করেনি। যেন বলতে চাইছে — “আরও বল। কিন্তু আমাকে একবারে নিয়ে যেও না। আস্তে আস্তে নিয়ে যাও। যাতে আমি নিজেই বুঝতে পারি যে আমি কোথায় যাচ্ছি।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার শ্বাস আরও একটু ভারী হয়ে উঠেছে। সে এখনো কিছু বলেনি। কিন্তু আমি জানতাম — আর একটু পরেই তার সেই সামলানোর চেষ্টাটা ভেঙে যাবে। কারণ সে আসলে ভাঙতেই চেয়েছিল। শুধু কেউ তাকে ধীরে ধীরে সেই জায়গায় নিয়ে যাক, যেন সে পরে নিজেকে দোষ না দেয়।
আমি আবার কথা বললাম। খুব আস্তে।
“তুই এখনো নিজেকে আটকে রাখছিস। আমি জানি। কিন্তু তোর শরীর তোকে ধরে রাখছে না। তোর শরীর ইতিমধ্যে আমার কথার সাথে মিশে গেছে। তুই শুধু মন দিয়ে বাধা দিচ্ছিস। আর সেই বাধাটাও আর বেশিক্ষণ থাকবে না।”


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)