15-10-2026, 01:14 AM
সপ্তম অধ্যায়: পরীক্ষার আগে
সামনেই পরীক্ষা। অথচ আমার পড়াশোনার অবস্থা তথৈবচ। বই খুলে বসলে দশ মিনিট পরেই মন অন্যদিকে চলে যায়। তার ওপর মিলি এখন হোস্টেলে থাকে, তাই আগের মতো ওর সঙ্গে দেখা করার সুযোগও কমে গেছে।
সেদিন বিকেলে ফোন হাতে নিয়ে মিলিকে মেসেজ করলাম।
— কী খবর, ম্যাডাম? পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন?
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
— প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে পরীক্ষা আমার জীবনের শেষ অধ্যায় হতে চলেছে।
আমি হেসে লিখলাম,
— এত ভয় পাওয়ার কী আছে? তুই তো এমনিতেই সারাবছর পড়াশোনা করিস।
— খুব মজা পাচ্ছিস, না? তোর নিজের প্রস্তুতি কতটুকু?
— আমার প্রস্তুতি অসাধারণ। শুধু প্রশ্নপত্রটা আমার প্রস্তুতির সঙ্গে মানিয়ে নিলেই হয়।
মিলি একটা হাসির ইমোজি পাঠাল। তারপর লিখল,
— ফাজলামি বাদ দে। কাল বিকেলে হোস্টেলে আসবি? একটা অধ্যায় বুঝতে পারছি না।
আমি লিখলাম,
— আসব। তবে চা খাওয়ানোর দায়িত্ব তোর।
— আগে পড়া বুঝিয়ে দে, তারপর দেখা যাবে।
ফোনটা রেখে আবার বই খুললাম। মনে মনে ভাবলাম, পরীক্ষার আগে অন্তত পড়াশোনার একটা অজুহাতে মিলির সঙ্গে দেখা হবে।
পরদিন বিকেলে মিলির হোস্টেলে গেলাম। গেটের সামনে ফোন করতেই ও জানাল, নিচে অপেক্ষা করতে। কিছুক্ষণ পর ওকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। পরনে সাধারণ একটা সালোয়ার-কামিজ, চুল পেছনে বাঁধা, কাঁধে ব্যাগ।
আমাকে দেখেই বলল,
— তোর আসতে এত দেরি হলো কেন?
— পাঁচ মিনিট দেরি করেছি। তুই এমনভাবে বলছিস, যেন পাঁচ বছর অপেক্ষা করেছিস।
— তোর সঙ্গে কথা বললে পড়ার সময়টাই নষ্ট হয়।
— তা হলে ডাকলি কেন?
মিলি মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— ভুল করেছি। চল, এবার থেকে নিজেই পড়ব।
আমি হেসে ওর সঙ্গে ভেতরে ঢুকলাম।
হোস্টেলের পড়ার ঘরে কয়েকজন মেয়ে বসে পড়ছিল। মিলি আমাকে একটা খালি চেয়ারে বসিয়ে বই খুলে দিল। প্রথম আধঘণ্টা সত্যিই পড়াশোনা হলো। ও প্রশ্ন করছিল, আমি বোঝাচ্ছিলাম। মাঝেমধ্যে ওর ভুল হলে একটু খোঁচা দিচ্ছিলাম, আর ও আমার দিকে বিরক্ত হয়ে তাকাচ্ছিল।
একসময় মিলি বই বন্ধ করে বলল,
— আচ্ছা, তুই কি সবকিছুতেই এত আত্মবিশ্বাসী?
— না। যেসব বিষয়ে কিছুই জানি না, সেসব বিষয়ে আরও বেশি।
মিলি হেসে ফেলল।
— তোর কোনো উন্নতি হবে না।
— সেটা নিয়ে তুই এত চিন্তা করিস কেন?
— কারণ তোর মতো বন্ধুকে পরীক্ষায় পাস করাতে গেলে আমার নিজেরই ফেল করার সম্ভাবনা আছে।
আমি হেসে উঠলাম। অনেক দিন পর মিলির সঙ্গে এভাবে বসে সময় কাটাতে ভালো লাগছিল। ওর সঙ্গে কথাবার্তায় একটা সহজ স্বাচ্ছন্দ্য ছিল, যদিও আমি জানতাম, আমাদের সম্পর্কের মধ্যে এমন কিছু জটিলতা রয়েছে, যেগুলোকে শুধু বন্ধুত্ব বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
পড়া শেষ করে নিচে নামার সময় মিলি বলল,
— কাল আবার আসবি। একটা বিষয় বাকি আছে।
— প্রতিদিন এভাবে ডাকলে তো আমার নিজের পড়াশোনা শেষ হবে না।
— তোর পড়াশোনা নিয়ে আমার কোনো দায় নেই।
— বাহ্! বন্ধুত্বের এই নমুনা!
মিলি হেসে বলল,
— বেশি কথা না বলে কাল আসিস।
আমি বেরিয়ে আসার সময় ও গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। বিদায় নেওয়ার আগে বলল,
— আর শোন, কাল কিন্তু দেরি করবি না।
আমি মাথা নেড়ে চলে এলাম।
পরীক্ষার চাপের মধ্যে কয়েকটা দিন কেটে গেল। ঐশীর সঙ্গে আর কোনো কথা হয় নি। ফারিনের সংগে কথা হয়, মিলির সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল। তবে ফারিয়া আর সাদিয়ার সঙ্গে বেশ কিছুদিন দেখা হয়নি।
একদিন দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বেরিয়ে দেখি, ফারিয়া আর সাদিয়া একটা গাছের নিচে বসে কথা বলছে। আমাকে দেখে ফারিয়া হাত তুলে ডাকল।
— এই যে মশাই! আমাদের কথা কি ভুলে গেছিস?
আমি কাছে গিয়ে বললাম,
— তোদের ভুলে গেলে তোদের কাছ থেকে বাঁচব কীভাবে?
সাদিয়া হেসে বলল,
— দেখেছিস ফারিয়া? মানুষটা আগের মতোই আছে। মুখে শুধু ফাজলামি।
আমি ওদের পাশে বসে বললাম,
— তোরা কেমন আছিস? পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন চলছে?
ফারিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— প্রস্তুতি ভালোই চলছিল। তারপর সিলেবাসের বাকি অংশটা দেখলাম।
— বুঝলাম। অর্থাৎ প্রস্তুতি শেষ, এবার ভাগ্যের পরীক্ষা।
সাদিয়া হেসে ফেলল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— আচ্ছা, তোর খবর কী? আজকাল তোকে তেমন দেখা যায় না।
— পরীক্ষা সামনে। একটু ব্যস্ত।
ফারিয়া আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
কিছুক্ষণ পর কথাবার্তা ঘুরে গেল পরীক্ষা, শিক্ষক আর বন্ধুদের নানা কাণ্ডকারখানার দিকে। সাদিয়া তার প্রেমিক রিয়াজের কথা বলতে গিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল,
— ছেলেরা পরীক্ষার সময়ও শান্তিতে থাকতে দেয় না।
আমি বললাম,
"তর না ব্রেকআপ হয়ে গেছিল।"
" আরে আমাকে আবার এখন মেসেজ করতেছে প্যাচআপ করতে চায়।" শালার মনে হয় মাল উঠছে সেজন্য।" এটা শুনে সবাই হু হু করে হেসে উঠলাম।
— "তা হলে রিয়াজকে বল, পরীক্ষার পর অভিযোগের তালিকা জমা দিতে। মাল সব মাথা থেকে নামিয়ে দিবি।"
সাদিয়া আমার দিকে একটা কাগজ ছুড়ে মারার ভঙ্গি করল।
— তোর সঙ্গে কোনো সিরিয়াস কথা বলা যায় না!
ফারিয়া হেসে বলল,
— ওর সঙ্গে সিরিয়াস কথা বলতে গেলে আগে ওর মুখ বন্ধ করার ব্যবস্থা করতে হবে।
আমি দুজনের দিকে তাকিয়ে বললাম,
— তোরা দুজন মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিস। এটা আমি মনে রাখব।
আড্ডাটা বেশ জমে উঠেছিল। অনেক দিন পর সবাইকে একসঙ্গে পেয়ে মনে হচ্ছিল, পরীক্ষার চাপের মধ্যেও জীবনের স্বাভাবিক ছন্দটা কোথাও হারিয়ে যায়নি।
বিকেল গড়িয়ে আসছিল। উঠে পড়ার আগে ফারিয়া বলল,
— শোন, পরীক্ষা শেষ হলে কিন্তু সবাই মিলে কোথাও যাব। আর কোনো অজুহাত চলবে না।
আমি বললাম,
— আগে পরীক্ষা শেষ হোক। তারপর দেখা যাবে।
সাদিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— এই কথাটাই সবাই বলে। তারপর আর কারও দেখা পাওয়া যায় না।
আমি হেসে বললাম,
— ঠিক আছে, ম্যাডাম। কথা দিলাম, পরীক্ষা শেষে দেখা হবে।
ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম।
সামনে পরীক্ষা, চারদিকে পড়াশোনার চাপ, আর আমার জীবনে একসঙ্গে জড়িয়ে আছে এতগুলো মানুষ, এতগুলো অসমাপ্ত সম্পর্কের গল্প। আমি জানতাম না, সামনের দিনগুলো কী নিয়ে আসবে। আপাতত শুধু চেয়েছিলাম, পরীক্ষাটা কোনোভাবে শেষ হোক।
কিন্তু জীবন যে শুধু পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দিয়ে মানুষকে যাচাই করে না, সেটা বুঝতে আমার তখনো বাকি ছিল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)