10 hours ago
(This post was last modified: 10 hours ago by কাদের. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
আপডেট ৬
ক
বিকেলের রোদটা একটু হেলে পড়েছিল। ক্যাম্পাসের বাইরে ফুটপাতের ওপর একটা ছোট চায়ের দোকান। প্লাস্টিকের চেয়ার, ময়লা টেবিল, আর বাতাসে চায়ের সাথে মিশে থাকা ধোঁয়ার গন্ধ। আবিদ আর সাজিদ সেখানে বসেছিল। দুজনের সামনে দুটো কাপ। কথা হচ্ছিল সাধারণ বিষয়ে । ক্লাসের প্রেসার, আসন্ন পরীক্ষা, আর একটুখানি ফুটবল। আবিদের কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ। কালো রঙের, একটু ভারী। সে মাঝে মাঝে হাত দিয়ে ব্যাগটা স্পর্শ করে নিচ্ছিল, যেন নিশ্চিত হতে চায় সেখানেই আছে।
হঠাৎ পাশ থেকে কয়েকজন ছেলে এগিয়ে এল। সংখ্যায় পাঁচ-ছয়জন। বয়স আন্দাজ বিশ-পঁচিশের মধ্যে। পোশাক এলোমেলো, চোখে একটা অস্থিরতা। আবিদ আর সাদিজ থেকে অল্প দূরে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে জোরে জোরে কথা বলতে থাকল। আবিদ সাজিদ দুইজনে বিরক্ত হলো এত জোরে কথা বলায়। ওদের কথার শব্দে নিজেদের কথা নিজেরা শুনতে কষ্ট হচ্ছে। আবিদ একটু পাশ ফিরে একটা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল ভাই একটু আস্তে কথা বলবেন, সমস্যা হচ্ছে। ছেলেটা ওর দিকে তাকালো তারপর গ্রুপের ভিতর গিয়ে কিছু একটা বলল। প্রথমে কয়েক সেকেন্ড কথার তোড় কমে গেলে তবে এইবার অন্য রকম ফিসফিসানি। ভিতর থেকে কার একজনের গলা। এত বড় সাহস কোন বাপের পোলার। গ্রুপের একজন সোজা আবিদের দিকে এসে দাঁড়াল। যে একটু লম্বা আর শক্তিশালী দেখতে, আবিদের ব্যাগের দিকে আঙুল তুলে বলল কিছু একটা। গলার স্বর উঁচু। অভিযোগটা স্পষ্ট ব্যাগটা তাদের কোনো পরিচিত ছেলের। চুরি করা। আবিদ প্রথমে বুঝতেই পারেনি। সে মাথা নাড়ল, না বলার চেষ্টা করল। সাজিদও পাশে থেকে ব্যাখ্যা করতে গেল। কিন্তু ছেলে গুলো শোনার মেজাজে ছিল না। এত দ্রুত ঘটনা ঘটতে থাকলো যে আবিদ বা সাজিদ কেউ ঠিক কি হচ্ছে বুঝে উঠতে পারল না।
আবিদ সাজিদের প্রতিবাদের মুখে ছেলে গুলো তাদের ঘিরে ফেলল। একজন আবিদের কাঁধে হাত রাখল। আরেকজন ব্যাগ টেনে ধরল। আবিদের গলা শুকিয়ে গেল। চুরির অপবাদ। সে কখনো এমন কিছুর মুখোমুখি হয়নি। তার হাত কাঁপছিল। সাজিদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। দুজনেই ভয় পেয়েছিল। ভয়টা শুধু শারীরিক আঘাতের নয়। অপমানের। অজানা লোকের সামনে চোর বলে অভিযুক্ত হওয়ার। চারপাশের মানুষজন দূর থেকে তাকিয়েছিল, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। ঢাকার রাস্তায় এমন দৃশ্য নতুন নয়। মানুষ দূরে থাকে।
যেহেতু কথা আবিদ বলেছিল এবং আবিদের কাধে ব্যাগ আছে তাই পুরো গ্রুপটা আবিদ কে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সাজিদ ফোন বের করল। হাত কাঁপতে কাঁপতে নোমানকে ডুবল কল দিল। নোমান কল ধরার আগে ঠাস করে জোরে একটা শব্দ হলো। সাজিদ তাকিয়ে দেখে আবিদ গাল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। এইভাবে প্রকাশ্যে কেউ তাকে বিনা কারণে চড় মারতে পারে এটা যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। এর মাঝে নোমান ফোন ধরল। কথা খুব সংক্ষেপ। সাজিদ অল্প কথায় শুধু বলল কোথায় আছে, কী হচ্ছে, আর তাড়াতাড়ি আসতে। নোমান ওপাশ থেকে কিছু জিজ্ঞেস করেছিল কি না, সাজিদ ঠিক শোনেনি। শুধু কেটে দিল। আবিদের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। যেন বলতে চাইল হেল্প আসছে।
সময়টা লম্বা মনে হয়েছিল। আসলে হয়তো সাত-আট মিনিট। লোকগুলো এখনো ঘিরে ছিল। একজন আবিদের ব্যাগ জোর করে খুলতে চাইছিল। আবিদ দুই হাত দিয়ে ব্যাগ চেপে ধরেছিল। তার কপালে ঘাম। চোখে জল আসার মতো অবস্থা, কিন্তু সে আটকে রেখেছিল। সাজিদ বারবার বলছিল এটা ভুল, ব্যাগটা আবিদের নিজের, ভেতরে ল্যাপটপ আছে, আইডি কার্ড আছে। কিন্তু কথাগুলো বাতাসে হারিয়ে যাচ্ছিল।
নোমান এল কয়েকজনকে সাথে নিয়ে। রাফি ছিল, তানভির ছিল, আরও দু-তিনজন চেনা মুখ। তারা দূর থেকেই পরিস্থিতি দেখে নিয়েছিল। নোমান সোজা এগিয়ে গিয়ে মাঝখানে দাঁড়াল। তার চেহারায় রাগের কোনো চিহ্ন ছিল না। শুধু একটা শান্ত, স্থির দৃষ্টি। সে আগে আবিদের দিকে একবার তাকাল। তারপর লোকগুলোর দিকে। প্রথমে সে মিটমাটের চেষ্টা করল। কথা বলল আস্তে। পরিচয় দিল। আবিদের পরিচয় দিল। বলল আমরা নর্থ সাউথের ছাত্র, ব্যাগটা আবিদের নিজের, ভেতরে ল্যাপটপ আর বই আছে। সে নিজেও দেখতে পারে। লোকগুলোর মধ্যে একজন একটু নরম হল মনে হয়েছিল। কিন্তু যে লম্বা ছেলেটা নেতৃত্ব দিচ্ছিল, সে মানল না। গলার স্বর আরও চড়া করল। বলল তারা নিশ্চিত, ব্যাগটা চোরাই। নোমানের কথায় কান দিল না।
নোমান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ফোন বের করল। একটা নম্বরে কল দিল। কথা বলল খুব সংক্ষেপে। নাম ধরে ডাকল কাউকে। “বড় ভাই” বলে সম্বোধন করল। পরিস্থিতি এক লাইনে বলল। লোকেশন দিল। তারপর ফোন কাটল। দু-তিন মিনিটের মধ্যেই আরেকজন এল। বয়স তিরিশের কাছাকাছি, গাড়ি থেকে নেমে সোজা এগিয়ে এল। তার উপস্থিতিতে বাতাসটা যেন একটু বদলে গেল। লোকগুলো চিনল তাকে। কথা কম হল। ওই মানুষটা শুধু কয়েকটা কথা বলল। গলার স্বর নীচু, কিন্তু ওজনে ভারী। লোকগুলো মাথা নিচু করল। একজন ক্ষমা চাইল। তারপর সরে গেল দ্রুত। ছেলে গুলো চলে যেতে নোমান গাড়ি থেকে নামা লোকটার কাছে দাঁড়িয়ে সালাম দিল আর এত দ্রুত আসার জন্য বার বার ধন্যবাদ দিল। সাজিদ আর আবিদ দুইজন তখন খানিকটা ট্রমা গ্রস্ত। নোমান সেই গাড়ি থেকে নামা লোকের সাথে কি কথা বলছে ঠিক না শুনলেও বুঝল নোমান খালি একটু পর পর জ্বি ভাই, জ্বি ভাই করে সম্মান দেখাচ্ছে। একটু পর লোকটা আবিদ সাজিদের পিঠ চাপড়ে দিয়ে কিছু একটা বলে আবার গাড়িতে উঠে চলে গেল। আবিদ তখনো ব্যাগ চেপে ধরেছিল। তার হাত কাঁপছিল। সাজিদের চোখ ছলছল হয়ে গিয়েছিল। দুজনেই যেন হঠাৎ বাতাস পেয়েছিল। নোমান পাশ থেকে আবিদের কাঁধে হাত রাখল। শক্ত করে নয়। শুধু একটা স্পর্শ। আবিদ সেই স্পর্শ অনুভব করল। তার ভেতরের ভয়টা একটু একটু করে নামতে শুরু করল।
নোমানের সাথে আসা ছেলেরাও পাশে দাঁড়িয়েছিল। কেউ বেশি কথা বলল না। শুধু উপস্থিতি দিয়েই যেন একটা দেয়াল তৈরি করেছিল। আবিদ আর সাজিদ দুজনেই বারবার ধন্যবাদ বলছিল। কথাগুলো গুছিয়ে বেরোচ্ছিল না। শুধু মুখ দিয়ে বেরোচ্ছিল ধন্যবাদ, ধন্যবাদ। নোমান মাথা নাড়ল। বলল চল, এখান থেকে সরে যাই।
তারা কাছের একটা দোকানে গেল। ছোটখাটো রেস্টুরেন্ট। আবিদ জোর করেই সবাইকে নিয়ে ঢুকল। ট্রিট দিল। চা, সিঙ্গাড়া, বেশ কিছু খাবার। নোমান আপত্তি করলেও আবিদ শুনল না। সাজিদও পাশে থেকে জোর দিল। টেবিলে সবাই বসল। কথা কম হচ্ছিল। আবিদের হাত এখনো একটু কাঁপছিল। সে বারবার নোমানের দিকে তাকাচ্ছিল। মনে মনে বলছিল দুবার। দুবার এই ছেলেটা তাকে বিপদ থেকে বের করে এনেছে। নোমান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল, এমন ছেলেরা নিরীহ ভদ্র ছেলেদের দেখলেই এসে টাকা খাবার ধান্দায় পড়ে। তোদের চেহারায়, কথায়, পোশাকে ভদ্রতা আছে। তাই টার্গেট করে। এদের কাজই এই। আবিদ মাথা নাড়ল। কথাটা তার বুকে লাগল। সে নিজেও টের পাচ্ছিল সে প্রতিবাদ করতে গিয়েও গলার স্বর কাঁপিয়ে ফেলেছিল। নোমানের মতো শান্তভাবে দাঁড়াতে পারেনি।
খাবার শেষ হওয়ার পর বাইরে এসে দাঁড়াল তারা। সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। রাস্তায় লাইট জ্বলছে। আবিদ নোমানের দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আজ থেকে আর তুমি বলব না। তুই বল। দুবার আমাকে এভাবে বাঁচালির পর তোকে আর দূরের মানুষ ভেবে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। নোমান প্রথমে একটু অবাক হল। তারপর হাসল। হালকা, একটু মুচকি হাসি। মাথা নাড়ল। রাজি হল। নোমান বলল ওকে, যেহেতু আমাকে বন্ধু বলে স্বীকার করলি এখন থেকে তাহলে তোর ভাল মন্দের দ্বায়িত্ব নিতে হবে আমাকে। গুরুজনের গলার ভংগী নকল করে বলা কথাটা আবিদ আর সাজিদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলল।
সেদিনের পর থেকে তাদের কথা বলার ধরন বদলে গেল। আবিদের মুখে “তুই” শব্দটা এল। নোমানও ফিরিয়ে দিল। বন্ধুত্বটা যেন একটা অদৃশ্য রেখা পেরিয়ে অন্য জায়গায় চলে গেল। আবিদ মনে মনে অনুভব করল এই ছেলেটা শুধু সাহায্য করেনি। তাকে একটা নিরাপত্তা দিয়েছে। নোমানের কথায় টের পেয়েছে ঐদিন গাড়ি থেকে নামা ভদ্রলোক স্থানীয় এক যুবদল নেতা। নোমানের পরিচিত। আবিদ অবাক হলো নোমান যে খালি বাস্কেটবল খেলায় বা মেয়েদের সাথে ফ্লার্টিং এ ওস্তাদ তা না বরং ভার্সিটির বাইরের পলিটিক্যাল বড় ভাইদের চিনে। আবিদের ধারণা ছিল এমন লোকদের যারা চিনে এরা নিজেরাও গুন্ডা প্রকৃতির কিন্তু নোমানের সাথে তার কোন মিল নেই। নোমানের সাথে যত মিশছে তত ভাংগা গড়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে আবিদের চিন্তাভাবনা নোমান সম্পর্কে। নোমানের সহজ ব্যবহার, আড্ডা মাতিয়ে রাখার শক্তি আর দরকার পরলে হাজির হয়ে বিনা বাক্যে হেল্প করে পরে সেটা নিয়ে কোন রকম রিটার্ন না চাওয়া। সব মিলিয়ে আবিদের জগতে নতুন ভাল বন্ধু হিসেবে নোমানের আবির্ভাব একটা অবশ্যাম্ভাবী ব্যাপার এখন।
ঢাকার রাতের আলো আর শব্দ। সেই রাতে আবিদের মনে হল, কিছু কিছু মানুষ জীবনে হঠাৎ এসে দাঁড়ায়। আর তারপর আর দূরে সরে না। নোমান এমনই একজন হয়ে উঠছে যেন তার কাছে।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)