Thread Rating:
  • 40 Vote(s) - 2.63 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Romance নিষিদ্ধ বসন্ত
পরের দিন সন্ধ্যায় আবার সেই কোণে দেখা হলো। আমি পৌঁছে দেখলাম ঐশী আগে থেকেই বসে আছে। আজকে ওকে দেখে একটু থমকে গেলাম।

পরনে একটা সাদা কুর্তি, হালকা ফুলের কাজ করা। চুল পুরোপুরি খোলা, পিঠের দিকে নেমে গেছে। মুখে হালকা একটু গ্লো। চোখের নিচের কালি কমেছে। ওকে দেখে মনে হলো অনেকদিন পর একটু হালকা লাগছে। আলো ওর মুখে পড়েছে। আমি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম।
“আজকে তোকে দেখে… অন্যরকম লাগছে,” আমি বললাম। “চুল খোলা রেখেছিস। সাদা কুর্তিটা তোর গায়ে খুব মানিয়েছে। মুখে একটা শান্ত ভাব। অনেকদিন পর তোকে এত হালকা দেখলাম।”
ঐশী হাসল। এবার হাসিটা পুরোপুরি ফুটল।
আমি বললাম। “তোকে দেখে মন ভালো হয়ে যায়।”
ও লজ্জায় চোখ নামাল। কিন্তু হাসছিল। আমরা বই খুললাম। পড়তে পড়তে আমি ওর হাতের কাছে হাত রাখলাম। একসময় আঙুল দিয়ে ওর হাতটা ছুঁলাম। ঐশী চমকে উঠল। ওর হাত একটু কেঁপে উঠল। কিন্তু সরায়নি।
আমি আস্তে করে ওর হাতটা ধরলাম। ওর আঙুল ঠান্ডা। আমার আঙুলের সাথে জড়িয়ে গেল। ঐশী নিঃশ্বাস একটু আটকে গেল। ওর কাঁধ কাঁপল।
“রাহাত…” ও আস্তে বলল। গলা কাঁপছে। “আমার… আমার পরিবার। আমি কখনো ভাবিনি কোনো ছেলে বন্ধু আমার হতে পারে। বাবা-মা যদি জানে… ওরা কল্পনাও করতে পারবে না। কিন্তু দেখ, তুই আমার বন্ধু হয়ে গেছিস। আমি… আমি বুঝতে পারছি না এটা ঠিক হচ্ছে কি না।”
আমি ওর হাত চেপে ধরলাম। “তুই যা ভাবিস, তাই ঠিক। আমি তোর বন্ধু। এর বেশি কিছু চাই না, যদি তুই না চাস।”
ঐশী আমার দিকে তাকাল। চোখে লজ্জা, ভয়, কনফিউশান আর একটু স্বস্তি। “আমি চাই। কিন্তু ভয়ও পাই।আমার বাবা মা ভাল ভাবে নিবে না কোন ছেলের সাথে বন্ধুত্ব। " আমি বললাম "ওরা ত আর জানতেছে না আর তোর যেকোনো দরকারে যখন বুঝবি আমি হেল্প করতে পারব আমাকে ডাকিস।”
ও কিছু বলল না। শুধু হাতটা আমার হাতেই রাখল। কাঁপুনি ধীরে ধীরে কমল। আমরা চুপ করে বসে রইলাম। বই খোলা, কিন্তু কেউ পড়ছে না।
মনের ভিতরে একটা কথা ঘুরছিল। ঐশী আমার থেকে আলাদা। ওর জীবনে কোনো ছেলে ছিল না। পরিবারের দেয়াল এত উঁচু যে ও নিজেই বিশ্বাস করতে পারেনি কেউ ওর কাছে আসতে পারে। আজকে ও যখন বলল “তুই আমার বন্ধু হয়ে গেছিস”, তখন ওর গলায় যে দ্বিধা ছিল, সেটা শুধু লজ্জার নয়। একটা নতুন জগতে পা রাখার ভয়। আর আমি… আমি ওর সেই ভয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। ওর হাত ধরে। জানি না এই হাত ধরাটা ওর জন্য কতটা বড়। জানি না আমি এই বিশ্বাসটা রাখতে পারব কি না।
বাইরে লাইব্রেরির আলো ধীরে ধীরে কমে আসছিল। আমাদের হাত এখনো জড়ানো। ঐশীর কাঁপুনি থেমে গেছে। কিন্তু ওর আঙুল এখনো আমার আঙুল চেপে ধরে আছে।
আমি আস্তে করে বললাম, “চল, একটু পড়াশোনাও করি। নইলে তুই বলবি আমি শুধু হাত ধরতে এসেছি।”
ঐশী হাসল। “তাই তো মনে হচ্ছে।”
আজকের টপিক ছিল Literary Theory-এর একটা ছোট অংশ — Metaphor আর Simile। আমি বইয়ের পাতায় আঙুল রেখে বললাম, “Metaphor হলো সরাসরি তুলনা না করে কিছু একটাকে অন্য কিছু বলে দেওয়া। যেমন… তুই একটা শান্ত নদী। বাইরে থেকে শান্ত, কিন্তু ভিতরে স্রোত আছে।”
ঐশী আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু তুলল। “আমি নদী? তাহলে তুই কী?”
“আমি হয়তো সেই পাথর, যে নদীর মাঝখানে পড়ে আছে। স্রোত আমাকে ঘিরে ঘুরছে, কিন্তু আমি সরছি না।”
ঐশী হেসে ফেলল। “তোর উদাহরণ সবসময় এমন হয়। আরও সহজ করে বল।”
আমি হাসলাম। “ঠিক আছে। Simile হলো ‘যেমন’ বা ‘মতো’ দিয়ে তুলনা। যেমন… তোর হাসিটা সকালের আলোর মতো। হঠাৎ ফোটে, আর সবকিছু একটু উজ্জ্বল হয়ে যায়।”
ঐশীর গাল আবার লাল হলো। ও আমার হাতটা একটু চেপে ধরল। “তুই আবার শুরু করলি।”
“পড়াশোনাই করছি,” আমি বললাম। “উদাহরণ না দিলে বুঝবি কীভাবে?”
ঐশী মাথা নাড়ল। “বুঝেছি। কিন্তু তোর উদাহরণ সব আমার উপর দিয়ে যায়।”
“কারণ তুই সামনে বসে আছিস,” আমি বললাম। “তোর সাদা কুর্তির উপর আলো পড়েছে। দেখে মনে হয় তুই নিজেই একটা metaphor। বাইরে থেকে সহজ, ভিতরে অনেক কথা।”
ঐশী আমার দিকে তাকিয়ে চোখ সরু করল। “তুই কি আজকে পড়াশোনা করতে এসেছিস, নাকি আমাকে পাগল করতে?”
“দুটোই,” আমি হাসলাম। “তুই লজ্জা পেলেও হাসছিস। তাই মনে হচ্ছে মজা পাচ্ছিস।”
ঐশী কিছু বলল না। শুধু হাসল। ওর হাত এখনো আমার হাতে। কাঁপুনি নেই আর। বরং ও নিজেই একটু চেপে ধরেছে।
আমি আবার বইয়ের দিকে তাকালাম। “তাহলে একটা নিজে থেকে বল। আমাকে নিয়ে একটা simile বানা।”
ঐশী একটু ভাবল। তারপর আস্তে করে বলল, “তুই… তুই একটা পুরনো বইয়ের মতো। বাইরে থেকে গম্ভীর, কিন্তু ভিতরে অনেক পাতা আছে। যেগুলো আস্তে আস্তে খুলতে হয়।”
আমি হেসে উঠলাম। “ভালো বলেছিস। কিন্তু পাতাগুলো খুললে কী পাবি, সেটা বলিসনি।”
ঐশী লজ্জায় মাথা নাড়ল। “সেটা আর বলব না। তুই নিজেই জানিস।”
আমরা আবার হাসলাম। পড়াশোনা চলছিল। কিন্তু প্রতিটি উদাহরণে একটু করে খুনসুটি মিশে যাচ্ছিল। ঐশী লজ্জা পাচ্ছিল, তবুও উত্তর দিচ্ছিল। ওর চোখে এখন আর শুধু দ্বিধা নেই। একটু মজাও আছে।
বাইরে আলো হঠাৎ করে একদম কমে গেল। আকাশে মেঘ করেছে৷ এই ওয়েদারের কোনো ভরসা নেই,কখন যে কি হয়। আমাদের হাত এখনো জড়ানো। বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ ছাড়া ঘরটা শান্ত।

বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হলো। জানালার কাচে ফোঁটার শব্দ। আমরা পড়াশোনা থামালাম না। আমি আবার একটা উদাহরণ দিলাম। ঐশী হাসল, লজ্জা পেল, আবার উত্তর দিল। আমাদের হাত এখনো জড়ানো।
একসময় আমি বললাম, “মনে আছে কক্সবাজারে সেই বৃষ্টির রাত? সমুদ্রের ধারে হেঁটেছিলাম। তোর চুল ভিজে গিয়েছিল। তুই আমার হাত চেপে ধরেছিলে, যাতে পড়ে না যাস। বলেছিলে, বৃষ্টিতে একটু ভয় লাগে।”
ঐশী আমার দিকে তাকাল। এবার চোখ সরায়নি। “মনে আছে। তুই বলেছিলে, বৃষ্টিতে আমাকে অন্যরকম লাগে। আমি তখন কিছু বলিনি। কিন্তু মনে মনে ভেবেছিলাম, তুই হয়তো মজা করছিস।”
“মজা করিনি,” আমি বললাম। “এখনও তাই লাগে।”
আমাদের চোখাচোখি হলো। লাইব্রেরির আলো মিটমিট করছে। বৃষ্টির শব্দ আরও ঘন। ঐশীর চোখে একটা নীরবতা। আমার ভিতরেও একটা উত্তাপ জমা হচ্ছিল। যেন এই মুহূর্তটা আগেও কোথাও দেখেছি। কক্সবাজারের সেই রাতে। এখন এখানে। একই বৃষ্টি। একই হাত।
বাতাস একটু ঠান্ডা হয়ে এসেছে। জানালা খোলা। ঐশী একটু কাঁপল। ওর কাঁধ আমার দিকে সরে এল।
“একটু ঠান্ডা লাগছে,” ও আস্তে বলল।
আমি ওর আরও কাছে সরে গেলাম। আমাদের কাঁধ লেগে গেল। আমি ওর হাতটা দুই হাতে নিয়ে একটু ঘষলাম। ওর আঙুল ঠান্ডা ছিল। ধীরে ধীরে উষ্ণ হলো।
“এখন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ঐশী মাথা নাড়ল। ওর মাথা আমার কাঁধের কাছে চলে এসেছে। ও সরায়নি। “একটু ভালো।”
আমরা চুপ করে বসে রইলাম। বৃষ্টি পড়ছে। বই খোলা। কিন্তু কেউ পড়ছে না। ঐশীর শ্বাস আমার গলার কাছে। উষ্ণ। আমার হাত এখনো ওর হাতে। ওর আঙুল আমার আঙুল চেপে ধরে আছে।
মনে হলো, এই ঠান্ডার মধ্যে একটা অন্য উত্তাপ তৈরি হয়েছে। যেটা শুধু হাত ধরে থাকলেই হয় না। চোখে চোখ রাখলে হয়। কক্সবাজারের সেই রাতের কথা মনে পড়লে হয়। আর এখন, এই লাইব্রেরির কোণে, বৃষ্টির শব্দে, সেই একই অনুভূতি ফিরে এসেছে।
ঐশী আস্তে করে বলল, “তুই আরও কাছে আয়। ঠান্ডা লাগছে।”
আমি সরে গেলাম। আমাদের শরীর এখন পাশাপাশি। ওর মাথা আমার কাঁধে। আমি ওর হাত চেপে ধরে রাখলাম। উষ্ণতা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল।
বাইরে বৃষ্টি থামেনি। ভিতরেও কিছু থামেনি।
বৃষ্টির শব্দ জানালার কাচে সমানভাবে পড়ছিল। ঐশীর মাথা আমার কাঁধে। আমি আস্তে করে বললাম,
“বৃষ্টি যখন এভাবে পড়ে, তখন মনে হয় সবকিছু একটু থেমে যায়। একটা কবিতার লাইন মনে পড়ছে… ‘বৃষ্টি নামে, আর তুমি কাছে এসো। দূরত্ব গলে যায় ফোঁটায় ফোঁটায়।’ আজকে তোকে দেখে সেই লাইনটাই মনে হচ্ছে। তোর সাদা কুর্তিতে বৃষ্টির আলো পড়েছে। মুখে একটা শান্ত ভাব। মনে হয় তুই নিজেই এই বৃষ্টির অংশ।”
ঐশী আমার কাঁধে মাথা রেখেই হাসল। “তুই কবিতাও জানিস?”
“একটু একটু,” আমি বললাম। “আরেকটা লাইন আছে… ‘ভেজা চুলে তোমার ঘ্রাণ, বৃষ্টির মতোই নরম।’ তোর চুল এখনও ভেজেনি। কিন্তু কাছে এসে মনে হচ্ছে, বৃষ্টির গন্ধ তোর গায়ে লেগে আছে।”
ঐশী লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু সরায়নি। “তুই আজকে বেশি কথা বলছিস।”
“বৃষ্টি হলে বেশি কথা আসে,” আমি হাসলাম। “চল, আরেকটু পড়াশোনা করি। নইলে তুই বলবি আমি শুধু কবিতা শোনাতে এসেছি।”
একথা শুনে ও শব্দ করে হেসে উঠল। 
আমরা আবার বইয়ের দিকে ঝুঁকলাম। এবারের অংশ ছিল Imagery। আমি ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিলাম। কীভাবে লেখক ছবি আঁকেন শব্দ দিয়ে। ঐশী মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছিল। আমাদের হাত এখনো জড়ানো। ওর মাথা মাঝে মাঝে আমার কাঁধে ঠেকছিল।
“যেমন এই বৃষ্টি,” আমি বললাম। “লেখক যদি লেখেন ‘জানালার কাচে ফোঁটা পড়ছে’, সেটা শুধু দৃশ্য নয়। সেই ফোঁটার শব্দ, ঠান্ডা বাতাস, আর তোর কাঁধের উষ্ণতা — সব মিলিয়ে একটা imagery হয়ে যায়। পাঠক শুধু দেখে না, অনুভবও করে।”
ঐশী আমার দিকে তাকাল। “তুই আবার আমার কথা ঢুকিয়ে দিলি!"
“উদাহরণ তো দিতে হবে,” আমি হাসলাম। “তুই সামনে না থাকলে এত সহজে বোঝাতে পারতাম না।”
ও হাসল। লজ্জা পেল। কিন্তু এবার উত্তর দিল। “তাহলে আমি যদি লিখি… ‘তার হাতের উষ্ণতা বৃষ্টির ঠান্ডা মুছে দেয়।’ সেটা imagery হবে?”
আমি ওর দিকে তাকালাম। “হবে। আর সেটা খুব সত্যিও হবে।”
ঐশী আবার মাথা নিচু করল। কিন্তু হাসছিল। আমরা আরও কিছুক্ষণ পড়লাম। অধ্যায়টা প্রায় শেষ। বাইরে বৃষ্টি এখনো পড়ছে। ভিতরে আমাদের কাঁধ এখনো লেগে আছে। বইয়ের পাতা উল্টানোর শব্দ আর বৃষ্টির ফোঁটা — দুটো মিলে একটা শান্ত ছন্দ তৈরি করেছে।

কবিতায় আর কথায় আরও কিছুক্ষণ কাটল। বৃষ্টির ফোঁটা আর আমাদের নিচু গলার ছন্দ মিলেমিশে গিয়েছিল। ঐশীর মাথা এখনো আমার কাঁধে। হাত জড়ানো।

হঠাৎ আমি বললাম, “চল, একটু বৃষ্টিতে ভিজি। অনেকদিন হয়নি।”
ঐশী মাথা তুলল। “না। আমি ভিজব না। কাপড় ভিজে যাবে। হোস্টেল ফিরতে অসুবিধা হবে।”
“তুই না ভিজলেও আমি যাই,” আমি হাসলাম। “তুই এখানে বসে দেখ।”
ও আমার হাত চেপে ধরল। “রাহাত, যাইস না। ঠান্ডা লাগবে।”
আমি ওর হাত আস্তে করে ছাড়ালাম। “একটুই তো। দেখে আসি।”
উঠে জানালার দিকে গেলাম। লাইব্রেরির বারান্দায় বের হলাম। বৃষ্টি মাথায় পড়ল। ঠান্ডা। চুল ভিজে গেল সাথে সাথে। আমি হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ধরলাম। পেছন ফিরে তাকালাম। কাচের ওপাশে ঐশী দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখ আমার দিকে।
একটু পরে দরজা খুলে ও বেরিয়ে এল। বৃষ্টি ওর সাদা কুর্তিতে পড়ল। কাপড় সাথে সাথে গায়ে লেগে গেল। চুল ভিজে কপালে এসে পড়ল। ও আমার কাছে এসে দাঁড়াল।
“তোকে দেখে না এসে পারলাম না” ও আস্তে বলল। গলায় একটু রাগ, একটু হাসি।
আমি হাসলাম। “এসে গেছিস তো।”
আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলাম। বৃষ্টি দুজনের গায়েই পড়ছে। ঐশীর চুল ভেজা। সাদা কুর্তি গায়ে সেঁটে গেছে। ও কাঁপছে একটু। আমি ওর কাছে সরে গেলাম। আমাদের কাঁধ আবার লেগে গেল।
“ঠান্ডা লাগছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ঐশী মাথা নাড়ল। “একটু। কিন্তু… ভালোও লাগছে।”
ওকে দেখে রবিন্দ্রনাথের সেই লাইন গুলা মনে পরল, "একটুকু ছোয়া লাগে একটুকু  কথা শুনি,তাই দিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী "
আমি ওর ভেজা চুলের একটা গুছি সরিয়ে দিলাম। ওর কপালে হাত ঠেকল। ঠান্ডা। ও চোখ বন্ধ করল এক সেকেন্ড। তারপর আবার তাকাল।
বৃষ্টি আমাদের ঘিরে পড়ছে। দূরে ক্যাম্পাসের আলো ঝাপসা। ঐশীর চোখে জলের ফোঁটা। নাকি বৃষ্টির। বোঝা যাচ্ছে না। ও আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু বলছে না। আমিও বলছি না।
শুধু বৃষ্টির শব্দ। আর আমাদের ভেজা কাপড়ের ঠান্ডা। কিন্তু তার নিচে একটা উষ্ণতা আছে। যেটা কক্সবাজারের সেই রাত থেকে শুরু হয়ে আজকে এখানে এসে থেমেছে।
ঐশী আস্তে করে বলল, “চল, ভিতরে যাই। অনেক ভিজে গেছি।”
ঐশীর কথায় যেন ঘোর কাটল। এতক্ষণ বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম, অথচ সময়ের কথা একবারও মনে হয়নি। ওর চুল থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে। আমার শার্টও পুরো ভিজে গেছে।

আমি হেসে বললাম, “তুই তো বলেছিলি ভিজবি না।”
ঐশী চোখ ছোট করে তাকাল।
“তুই একা বৃষ্টিতে ভিজবি, আর আমি বসে বসে দেখব—এটা কি হয়?”
“তাহলে আমার জন্যই এলি?”
“না, বৃষ্টির জন্য এসেছি। তুই নিজেকে এত গুরুত্বপূর্ণ ভাবিস কেন?”
কথাটা বলেই ও হেসে ফেলল।
আমি বললাম, “ঠিক আছে। মনে রাখব।”
আমরা লাইব্রেরির ভেতরে ফিরে এলাম। বারান্দার পাশে দাঁড়িয়ে জামা থেকে পানি ঝাড়তে ঝাড়তে ঐশী বলল, “এখন হোস্টেলে ফিরব কীভাবে? দেখ, সব ভিজিয়ে দিলি।”
“আমি তোকে ভিজতে বলিনি।”
“কিন্তু তুই চলে যাচ্ছিলি বলে আমাকেও আসতে হলো।”
কথাটা বলে ও থেমে গেল। যেন নিজের অজান্তেই একটু বেশি কিছু বলে ফেলেছে।
আমি ওর দিকে তাকালাম।
“কেন? আমি চলে গেলে কী হতো?”
ঐশী সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল।
“আবার শুরু করলি! সব কথার উত্তর দিতে হবে নাকি?”
আমি হেসে বললাম, “না। কিছু উত্তর না হয় পরে শুনব।”
ও মাথা নাড়ল। কিন্তু মুখের হাসিটা আর লুকাতে পারল না।
লাইব্রেরির ঘড়িতে তখন রাত আটটা পঁয়তাল্লিশ। বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষণ নেই। বাইরে রাস্তার বাতিগুলো পানির ওপর প্রতিফলিত হচ্ছে। আমরা ব্যাগ গুছিয়ে নিচতলায় নামলাম।
গেটের কাছে এসে ঐশী বলল, “তুই ছাতা এনেছিস?”
“না।”
“বাহ! যে ছেলে আমাকে পড়াতে আসে, সে নিজেই এত বোকা!”
“তোর কাছে ছাতা আছে?”
ও ব্যাগ খুলে একটা ছোট ছাতা বের করল।
বৃষ্টি তখনও থামেনি। লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে ছোট্ট ছাতাটা খুলতেই ঐশি আমার পাশে এসে দাঁড়াল। ছাতাটা দুজনের জন্য একটু ছোট। ফলে পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে বারবার ওর কাঁধ আমার বাহুতে এসে লাগছিল। কখনো ওর হাতের পিঠ, কখনো কনুই ছুঁয়ে যাচ্ছিল আমার শরীর।
প্রথম দিকে দুজনেই একটু সরে হাঁটার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু রাস্তার ওপর বৃষ্টির পানি জমে থাকায় আর ছাতার নিচে জায়গা কম থাকায় সেই চেষ্টা বেশিক্ষণ টিকল না।
আমি ছাতাটা ওর দিকে একটু সরিয়ে দিলাম।
ঐশি আমার দিকে তাকিয়ে বলল,
— এইভাবে ছাতা ধরলে তুই নিজেই ভিজে যাবি।
— তাতে কী?
— তোর ঠান্ডা লাগবে।
— আমার জন্য এত চিন্তা করছিস কেন?
ঐশি চোখ সরিয়ে নিল।
— উফ্‌! তোর সঙ্গে কথা বলাই ভুল।
— তা হলে কথা বলিস না। হাতটা ধরে হাঁট।
কথাটা বলেই আমি ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। ঐশি আমার দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন আমার মাথায় কোনো সমস্যা আছে।
— তুই কি সব মেয়ের সঙ্গেই এমন করিস?
— সব মেয়েকে তো আর এভাবে ছাতার নিচে পাই না!
— বাহ্‌! কথাটা বেশ শিখেছিস দেখছি।
— অভিজ্ঞতা বলে একটা জিনিস আছে, ম্যাডাম।
ঐশি চোখ ছোট করে আমার দিকে তাকাল।
— তোর এই অভিজ্ঞতার গল্প একদিন শুনব।
— একদিন কেন? আজই শুনবি?
— থাক, দরকার নেই। তোর গল্প শুনতে গেলে বৃষ্টি থেমে যাবে।
আমি হেসে উঠলাম। ঐশিও হাসল, কিন্তু ওর চোখে কৌতূহলটা থেকে গেল। হয়তো আমার কথার আড়ালে অন্য মেয়েদের উপস্থিতি ও টের পাচ্ছিল। কিংবা নিছকই আমাকে খোঁচা দেওয়ার সুযোগ খুঁজছিল।
যাই হোক, আমি বিষয়টা আর বাড়ালাম না।
রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে পা পড়তেই ঐশি একটু হোঁচট খেল। মুহূর্তের মধ্যে ও আমার বাহু আঁকড়ে ধরল। আমি ওর কাঁধের কাছে হাত রেখে সামলে দিলাম।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য ও আমার একেবারে কাছে চলে এসেছিল।
ওর মুখটা আমার মুখের বেশ কাছে। ভেজা চুলের কয়েকটা গোছা গাল ছুঁয়ে আছে। ওর চোখে চোখ পড়তেই ঐশি দ্রুত সোজা হয়ে দাঁড়াল।
— সাবধানে হাঁটতে পারিস না?
আমি বললাম,
— তুই আমার হাত ধরেছিলি, নাকি আমি তোর হাত ধরেছিলাম?
— পড়ে যাচ্ছিলাম বলে ধরেছি!
— আচ্ছা, বুঝলাম।
— কী বুঝলি?
— কিছু না।
আমি হাসলাম। ঐশি আমার বাহুতে হালকা একটা চাপড় দিয়ে বলল,
— তোর হাসিটা বন্ধ কর।
— চেষ্টা করছি।
কিন্তু আমার হাসি বন্ধ হলো না।
কিছুটা পথ এগোনোর পর আমি হঠাৎ গুনগুন করে উঠলাম—

“একটুকু ছোঁয়া লাগে,
একটুকু কথা শুনি,
তাই দিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী…”
ঐশি হাঁটতে হাঁটতে আমার দিকে তাকাল।
— রবীন্দ্রনাথের গান?
— হ্যাঁ।
— এখন কেন মনে পড়ল?
— সবকিছুর কি ব্যাখ্যা দিতে হয়?
— তোর ক্ষেত্রে হয়। তুই বিনা কারণে কিছু করিস না।
আমি একটু হেসে বললাম,
— তা হলে ধরে নে, গানটা তোর জন্যই গাইলাম।
ঐশি এবার মুখ ঘুরিয়ে নিল। বৃষ্টির মধ্যে ওর ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসিটা অবশ্য আমার চোখ এড়াল না।
কিছুক্ষণ পর ও বলল,
— তুই সব সময় এত সহজে কথা বলিস কীভাবে?
— কীভাবে আবার? মুখ খুললেই কথা বের হয়।
— আমি সেটা বলছি না।
আমি বুঝেও না বোঝার ভান করলাম।
— তা হলে কী বলছিস?
ঐশি মাথা নাড়ল।
— থাক। তোর সঙ্গে পারব না।
আমি মনে মনে হাসলাম। ঐশির এই দ্বিধাটা আমার ভালো লাগছিল। ওর মধ্যে কৌতূহল আছে, আকর্ষণ আছে, আবার নিজের সীমা নিয়ে সতর্কতাও আছে। আর আমি? আমি নিজেও তখন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, ওর এই কাছাকাছি থাকাটা আমার কাছে কতটা বিশেষ, আর কতটা নিছক মুহূর্তের টান।
[+] 3 users Like Avi9695's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: নিষিদ্ধ বসন্ত - by Avi9695 - 12-10-2026, 07:37 PM



Users browsing this thread: genny1122, 2 Guest(s)