Thread Rating:
  • 40 Vote(s) - 2.63 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Romance নিষিদ্ধ বসন্ত
পরের কয়েকটা দিন একই ছন্দে কাটল। সকালে উঠে ক্লাস, দুপুরে লাইব্রেরি, বিকেলে গ্রুপ চ্যাটে কথা। মিলি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করত কেমন আছি, সাদিয়া কোনো মজার ছবি পাঠাত,মিম শেয়ার করত ওরা গ্রুপে, ঐশী পড়াশোনার সময়সূচি শেয়ার করত শুধু, গ্রুপে শুধু কখনো কখনো একটা করে রিঅ্যাকশন দিত। আমি সাড়া দিতাম, মাঝে মধ্যে কিন্তু কথা বেশি হয়নি কারও সাথে।

ক্লাসে সবাইকে দেখতাম। সামনের বেঞ্চে মিলি আর সাদিয়া, পেছনে ফারিন। ঐশী একটু দূরে বসত। স্যার যখন Literary Theory নিয়ে কথা বলতেন, তখন মনে পড়ত সেই রাতের গ্রুপ স্টাডির কথা। কিন্তু এখন আর সেই উত্তাপ ছিল না। শুধু নোট নেওয়া, আর মাঝে মাঝে চোখাচোখি হলে একটু হেসে নেওয়া। পড়শোনা নিয়ে ভালই সিরিয়াস সবাই। 
তিন দিনের জন্য সিলেটে গেলাম। বাবার সাথে ফার্মেসির হিসাব দেখলাম, পুরনো রাস্তায় হেঁটে বেড়ালাম, রাতে ছাদে বসে থাকলাম। ঢাকার শব্দ নেই। শুধু গাছের পাতার শব্দ আর দূরের মসজিদের আজান। মনে হচ্ছিল, কিছুদিনের জন্য সবকিছু থেমে আছে। আফরিন আন্টির চাহনি, রিয়া আন্টির শাড়ি, সোনিয়া আন্টির কথা — আর আমার সেই নাজমা আন্টি,,সব যেন একটু দূরে সরে গেছে। শুধু শান্তি।
তিন দিন পর ঢাকায় ফিরলাম। ক্যাম্পাসে ঢুকতেই আবার সেই পুরনো বাতাস। গ্রুপ চ্যাটে মেসেজ এল। মিলি লিখল, “ফিরেছিস? কাল থেকে আবার স্টাডি করি।” সাদিয়া একটা স্টিকার পাঠাল। ফারিন সময় জিজ্ঞেস করল।
আমি উত্তর দিলাম। হোস্টেলের ঘরে ব্যাগ রেখে জানালার ধারে দাঁড়ালাম। বাইরে ক্যাম্পাসের আলো জ্বলছে। মনে হলো, সিলেটের শান্তিটা এখানে এসেই মিলিয়ে গেছে। আবার সেই বৃত্ত। আবার সবাই। আবার সেই চাহনিগুলো।
ফোনটা পকেটে রাখলাম। কাল থেকে আবার শুরু।
ক্যাম্পাসে ফিরে প্রথম কয়েকদিন ঐশীকে দেখলাম। ও আগের মতো কথা বলছিল না। গ্রুপ চ্যাটে সবাই যখন মেসেজ করত, ও শুধু দেখে যেত। ক্লাসেও একটু দূরে বসত। চোখাচোখি হলে হাসত, কিন্তু হাসিটা আগের মতো ছিল না। একটু শুকনো।
প্রথমে ভাবলাম, হয়তো পরিবারের কোনো চাপ। অথবা পড়াশোনার টেনশন। কিন্তু দুদিন পর বুঝলাম।
একদিন লাইব্রেরিতে ওকে একা পেলাম। আমি কাছে গিয়ে বললাম, “ঐশী, কেমন আছিস? কথা বলছিস না কেন?”
ও বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে করে বলল, “তুই বলেছিলে একদিন সময় দিবি। শুধু আমাকে বুঝিয়ে দিবি। আমি অপেক্ষা করছিলাম। তারপর শুনলাম তুই সিলেট চলে গেছিস। কিছু বলিসনি।”
আমি চুপ করে গেলাম। সত্যিই ভুলে গিয়েছিলাম। সিলেটে যাওয়ার আগে মনে ছিল, কিন্তু বাড়িতে গিয়ে সব গুলিয়ে গেছে। ফিরে এসেও মনে পড়েনি।
“সরি,” আমি বললাম। “সত্যি ভুলে গিয়েছিলাম। ইচ্ছে করে নয়।”
ঐশী মাথা নাড়ল। “কোনো সমস্যা নেই। তুই ব্যস্ত। আমি বুঝি।”
কিন্তু ওর গলায় যে সুর ছিল, সেটা রাগের চেয়ে বেশি হতাশার। ও আবার বইয়ের দিকে চোখ নামাল। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর বললাম, “কাল সময় দিবি? সন্ধ্যায়। যেখানে বলবি।”
ঐশী একটু তাকাল। “দেখি। আগে বলে দিস। হঠাৎ চলে যাইস না।”
আমি মাথা নাড়লাম। “বলব।”
ও আর কিছু বলল না। আমি সরে এলাম। মনে হলো, ছোট একটা কথা ভুলে যাওয়ায় ওর কাছে অনেক বড় হয়ে গেছে। কারণ ও হয়তো অনেকদিন ধরে সেই সময়টার জন্য অপেক্ষা করছিল। আর আমি সেটা মনে রাখিনি।

পরের দিন সন্ধ্যায় ঐশীকে মেসেজ করলাম। ও উত্তর দিল। লাইব্রেরির সেই পুরনো কোণে দেখা করার কথা হলো।
সন্ধ্যা ছয়টার কিছু পরে লাইব্রেরির তৃতীয় তলায় পৌঁছালাম। পেছনের দিকের সেই কোণটা আজকে আরও ফাঁকা। জানালার ধারে একটা টেবিলে ঐশী বসে আছে। আমাকে দেখে ও মাথা তুলল। উঠে দাঁড়াল না, শুধু একটু সোজা হলো।
পরনে একটা হালকা সবুজ কুর্তি। কাপড় নরম, একটু ঢিলে। নিচে কালো লেগিংস। চুল আধখোলা, একপাশে বেঁধে রেখেছে, বাকিটা কাঁধের উপর পড়ে আছে। মুখে কোনো মেকআপ নেই। চোখের নিচে হালকা কালি। দেখে মনে হলো কয়েকদিন ভালো ঘুমায়নি। তবুও ওকে দেখে একটা স্বস্তি হলো। অনেকদিন পর এভাবে একা একা বসে আছে, আর আমি এসেছি।
আমি ওর উল্টোদিকে বসলাম। টেবিলের উপর ওর বই খোলা, কিন্তু পাতা উল্টানো হয়নি।
“অনেকক্ষণ অপেক্ষা করালাম?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
ঐশী মাথা নাড়ল। “না। একটু আগে এসেছি। ভেবেছিলাম হয়তো আজও আসবি না।”
ওর গলা শান্ত। রাগ নেই। কিন্তু সেই শান্তির নিচে একটা ক্লান্তি আছে। আমি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। ওর হাত বইয়ের উপর রাখা। আঙুলগুলো সরু। কুর্তির হাতা একটু গুটিয়ে রেখেছে, কব্জি দেখা যাচ্ছে।
“সরি,” আমি বললাম। “সিলেটে গিয়ে সব ভুলে গিয়েছিলাম। ফিরে এসেও মনে পড়েনি। তুই চুপচাপ ছিলে, তাই বুঝতে পারিনি।”
ঐশী একটু হাসল। হাসিটা পুরোপুরি উঠল না। “রাগ করিনি। শুধু মনে হয়েছিল হয়তো তুই আর সময় দিতে চাস না। নিজে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ওই Phonetics-এর অংশটা এখনো গুলিয়ে যায়।”
আমি বইটা ওর দিকে ঠেলে দিলাম। “আজকে শেষ করে ফেলি। যতক্ষণ লাগে।”
ঐশী মাথা নাড়ল। ওর চুলের একটা গুছি কানের পাশে পড়েছিল। ও সেটা সরিয়ে নিল। আমরা বই খুললাম। আমি ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিলাম। ঐশী মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছিল। এবার প্রশ্নগুলো আগের মতো দ্বিধাগ্রস্ত নয়। বরং পরিষ্কার।
আমি ওর দিকে মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম। ওর চোখে কোনো অভিযোগ নেই। শুধু একটা শান্ত হতাশা।
ঐশী হাসল। বাইরে আলো কমে আসছিল। লাইব্রেরির ল্যাম্প জ্বলে উঠেছে। ঐশীর মুখে সেই আলো পড়েছে। ওর ঠোঁট একটু ফাঁক। মাঝে মাঝে আমাদের হাত বইয়ের উপর লেগে যাচ্ছিল। ও সরাচ্ছিল, কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি নয়। একবার ওর আঙুল আমার আঙুলের উপর থেকে গেল। ও থেমে গেল এক সেকেন্ড। তারপর সরিয়ে নিল। কিছু বলল না।
পড়া শেষ হতে হতে সাড়ে আটটা বাজল। ঐশী বই বন্ধ করে বলল, “আজকে অনেকটা বুঝেছি। থ্যাঙ্ক ইউ।”
“আরও দরকার হলে বলবি,” আমি বললাম। “এবার ভুলব না।”
ও উঠে দাঁড়াল। ব্যাগ কাঁধে তুলতে গিয়ে একটু ঝুঁকল। কুর্তির কাপড় ওর পিঠের সাথে লেগে গেল। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। ঐশী সোজা হয়ে আমার দিকে তাকাল।
“তুই সত্যিই ভুলবি না তো?”
“না,” আমি বললাম।
ও মাথা নাড়ল। আমরা একসাথে সিঁড়ি দিয়ে নামলাম। রাস্তায় আলো জ্বলছে। ঐশী আমার পাশে হাঁটছিল। কথা কম। কিন্তু এবার ওর কাঁধ আমার বাহুর খুব কাছে। হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝে লেগে যাচ্ছিল। ও সরাচ্ছিল না।
লাইব্রেরির গেটের বাইরে এসে ও থামল। “আজকে ভালো লাগল। অনেকদিন পর।”
আমি হাসলাম। “আমারও।”
ঐশী একটু তাকিয়ে থাকল। তারপর বলল, “কাল আবার আসব। যদি তুই আসিস।আর না আসলেও সমস্যা নেই। তোকে ডিস্টার্ব করতে চাইনা আসলে।
“আসব,” আমি বললাম। "আর তোর সাথে থাকলে ডিস্টার্ব ফিল কেন করব।বরং লাকি ফিল করি এরকম সুন্দরি মেয়ে আমার সময় চাচ্ছে।" 
ও লজ্জা পেয়ে হাসল। আর বলতে লাগল," সুন্দরী? আচ্ছা? আমাকে এত ভালভাবে দেখলি কবে যে সুন্দরী মনে হল।" আমি ও আরেকটু সুযোগ পেয়ে বললাম," যতটুকু দেখেছি সেটাই কি এনাফ না? আর সেই কক্সবাজারের রাত কি বুলে গেছিস? ঐশী লজ্জায় লাল হয়ে বলল," হইছে থাম। ওই রাত আর আনতে হবে না।"
 তারপর দুজন হোস্টেলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। আমি ওকে এগিয়ে দিয়ে ওর চলে যাওয়া দাঁড়িয়ে দেখলাম। ওর পেছন থেকে কুর্তির কাপড় হাওয়ায় একটু নড়ছিল। চুল কাঁধের উপর দুলছিল। একবার ও ফিরে তাকাল। তারপর আবার হেঁটে গেল।
আমি সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হলো, আজকের এই সময়টা ছোট। কিন্তু ঐশীর চোখে যে শান্তিটা দেখেছি, সেটা অনেকদিন পর। আর সেই শান্তির নিচে একটা অন্যরকম অপেক্ষাও ছিল। যেন ও জানে, এই দেখাগুলো এভাবেই চলবে না। একদিন কিছু একটা ঘটবে।
আমি হোস্টেলের দিকে রওনা দিলাম। রাতের বাতাস ঠান্ডা। কিন্তু মনের ভিতরে একটা উত্তাপ থেকে গেল।
[+] 4 users Like Avi9695's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: নিষিদ্ধ বসন্ত - by Avi9695 - 12-10-2026, 07:34 PM



Users browsing this thread: genny1122, 2 Guest(s)