10 hours ago
(This post was last modified: 9 hours ago by কাদের. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
আপডেট ৫
ক
ঢাকা ডিবেট ফেস্টের প্রস্তুতি শুরু হওয়ার পর থেকে বুশরার রুটিনটা একটু বদলে গেছে। আগে সে শুধু নিজের পড়াশোনা আর আবিদের সাথে সময় নিয়ে ব্যস্ত থাকত। এখন তার সপ্তাহের চারদিন ডিবেট প্র্যাকটিসে কাটছে। মাহিকা আর নোমানের সাথে। সাপ্তাহে চার দিন এক ঘন্টা করে। মাঝে মাঝে ডিবেট ক্লাবের অফিসে বসে তিন জন। কোন কোন দিন কোন ফাকা ক্লাস রুমে। একদিন নিচের প্লাজাতেও বসেছিল। প্রস্তুতির সময়টাতে নিজেরা নিজেরা কোন টপিক ঠিক করে আলোচনা করে ঠিক কিভাবে এনালাইসিস করা যায় দ্রুততম সময়ে মূল যুক্তি গুলো। কিভাবে প্রতিপক্ষের যুক্তি আগে থেকে অনুমান করে সেগুলো কে অকেজো করে দেওয়া যায় নিজেদের বক্তব্যের সময়। প্রতিপক্ষ তাদের যুক্তির বিরুদ্ধে কি কথা বলতে পারে। এইসব প্রাকটিসে কাটছে। সিনিয়র হিসেবে মাহিকা মাঝে মাঝে কিছু টিপস দেয়। মাঝে একদিন এনএসইউর এর অন্য ডিবেট গ্রুপটার সাথে আলোচনা হলো। ঠিক হলো ঢাকা ফেস্টের সাত দিন আগে একটা প্রস্তুতিমূলক ডিবেট হবে দুই গ্রুপের মাঝে যাতে মূল ডিবেটের আগে একটু ওয়ার্ম আপ হয়ে যায়।
ডিবেট প্রাকটিস শুরু হবার প্রথম সপ্তাহটা বুশরার কাছে অস্বস্তিকর লেগেছিল। নোমান এলেই তার শরীর একটু শক্ত হয়ে যায়। নোমানের সাথে তার কখনো সরাসরি কথা হয় নি। ডিবেট ক্লাবের বাইরে বা কোন কমন ক্লাসে হয়তো দুই একটা কথা হয়েছে। লাস্ট একদিন ক্লাসের দরজার কাছে বন্ধুদের নিয়ে জোরে কথা বলছিল দেখে একটা কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এইসব কারণে নোমানের সম্পর্কে শুরু থেকে একটা নেগেটিভ ধারণা বুশরার। আবার ক্লাব ফেস্টের সময় নোমানের কাজকর্ম দেখে মনে হয়েছে ছেলেটা কাজ করতে জানে। সব মিলিয়ে বুশরার পর্যবেক্ষণ ছেলেটা খুব সহজে কথা বলে, সহজে হাসে, সহজে রাগ করে না। কিন্তু একটা কেয়ারলেস ব্যাপার আছে ছেলেটার মাঝে। ডিবেট প্রাকটিসে দেখা যাবে কোন দিন দশ মিনিট দেরীতে আসবে আবার যেদিন টাইমমত আসবে সেদিন দশ মিনিট আগে চলে যাবে। কোন দিন পকেটে কলম থাকবে না আবার কোন দিন আলোচনার মাঝে মোবাইল স্ক্রল শুরু করে দিবে। বুশরার চোখে এটা দায়িত্বহীনতার লক্ষণ। অথচ প্র্যাকটিসের সময় নোমান যখন কেস ভাঙে, তখন তার চোখে একটা অন্য মানুষ দেখা যায়। মনোযোগী। ধারালো। বুশরা আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করেছে নোমানের ব্যাপারে। মেয়েরা সহজে নোমানের প্রতি আকৃষ্ট হয়। বুশরা স্বীকার করে প্রচলিত নিয়মে নোমান হ্যান্ডসাম। লম্বা। চেহারায় ঠিক চকলেট বয় টাইপ ব্যাপার নেই বরং একটা রাফ লুক আছে। ড্রেসাপে খুব মনযোগ দেয় বুঝা যায়। আবার খেলাধূলায় ভাল। চেহারা, গুড এথলেট এইসব সুপারফেশিয়াল ব্যাপার। আজ আছে কাল নেই। বুশরা মানুষের ভিতরের চরিত্র নিয়ে আগ্রহী বেশি। যদিও নোমান সম্পর্কে খুব বেশি জানে না বুশরা তবে এইটুকু বুঝে এই ধরনের ছেলেদের গার্লফ্রেন্ডের অভাব হয় না। এরা সমাজের প্লেবয়। যারা সম্পর্কে কে ঠুনকো ভাবে। এক সম্পর্ক থেকে অন্য সম্পর্কে প্রজাপতির মত উড়ে বেড়ায় তাদের কে সহ্য করতে পারে না বুশরা। সমাজ, ধর্ম, পরিবার থেকে শেখা মূল্যবোধ তাকে এইসব মানুষ থেকে দূরে থাকতে শিখিয়েছে। তবে মেয়েরা অনেক সময় এই ধরণের ছেলেদের পছন্দ করে। ওর নিজের বান্ধবী আর সাদিয়া আর কাশফিয়া যেমন ফ্যানগার্লের মত আচরণ করে দূর থেকে নোমান কে দেখলে তাতে ওর নিজের লজ্জা লাগে। কাশফিয়া, সাদিয়ার সাথে ওর অনেক মিল। ওদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড এক রকম। সাদিয়া হি-জাব করে। কাশফিয়া হি-জাব না করলেও কাপড়ে খুব পরিশীলিত। তারপরেও ওদের এই রকম হ্যাংলামো বুঝে উঠতে পারে না বুশরা। একদিন বুশরা বলেছিল, তোরা কি বুঝিস তোদের মত আর অনেক মেয়ে হয়তো এই ছেলেটা কে চায়? আর এই ছেলেটাকে দেখলেই বুঝা যায় হয়ত এক সাথে চার পাচটা মেয়ে ঘুরাচ্ছে। খেয়াল করে দেখ হাটার সময় যে মেয়ে হাই দিচ্ছে তার সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। একটু কি পার্সনালিটি নেই ছেলেটার? সাদিয়া উত্তর দিল সবাই ওকে চায় দেখে তো আমরা ওকে চাই। বুশরা অবাক হয়ে বলল মানে? সাদিয়া বলল দেখ বাজারে গিয়ে তুই কোন ফোনটা কিনিস? যে ফোনটা আজকাল বেশি চলছে। সবাই যে ফোনটা কিনছে। কারণ তুই কাস্টমার এর স্যাটিশফেকশন থেকে ফোন কোয়ালিটি আন্দাজ করতে পারবি। এই যে নোমান কে দেখে বাকি মেয়েরা ছটফট করে উঠে এটা থেকে বুঝা যায় আমি এমন কিছু একটা পছন্দ করছি যার ভ্যালু আছে। আর অনেকে যেটা চায়। বুশরা বলল এটা কেমন তুলনা হল? মানুষ তো পণ্য না যে অন্য কাস্টমার কি বলল তা দেখে কিনতে হবে। সম্পর্ক তো এমন হওয়া উচিত যেটাতে একদম ফ্রেশ কাউকে পাওয়া যায়। কাশফিয়া এইবার পাশ থেকে বলল ডিয়ার তোমার কথাতে তোমার উত্তর আছে। তুমি বলেছ ফ্রেশ কাউকে দরকার রিলেশনের জন্য। এইবার বল তুমি পণ্যের সাথে তুলনা কর নি? বুশরা বলল কিভাবে? কাশফিয়া বলল কারণ সাদিয়া ফোনের তুলনা দিয়েছে মানুষের সাথে আর তুই দিলি ভেজিটেবলের সাথে। ভেজিটেবল মানুষ ফ্রেশ চায়। এইবার হো হো করে হেসে উঠে সাদিয়া। কাশফিয়া সাদিয়ার সেইসব পণ্যের সাথে তুলনা মনে করে একটু কান লাল হয় বুশরার। এমনকি ওদের ডিবেট টিমের সিনিয়র মাহিকা আপু পর্যন্ত নোমান কে হালকা ছাড় দেন। এই যে দশ মিনিট পরে আসা কখনো দশ মিনিট আগে চলে যাওয়া এইগুলা নিয়ে আপু তেমন কিছু বলে না। একদিন মাহিকা আপু কে এই ব্যাপারে কমপ্লেইন করার পর আপু বলল আরে নোমান একটু এমন। আপুর কথার সুরে প্রশ্রয়ের সুর। বান্ধবীদের অহেতুন নোমানের প্রতি দূর্বলতা আর মাহিকা আপুর প্রশ্রয় এইসব নোমানের প্রতি বুশরার বিরক্তি আরেকটু শক্ত করে।
নোমানের সাথে ইন্টারেকশনে বুশরার জড়তা থাকলেও নোমান এমন ভাবে কথা বলে যেন বহু দিনের পরিচিত। একদিন প্র্যাকটিসের সময় বুশরা একটা পয়েন্ট আটকে গেল। মাহিকা সাহায্য করতে গিয়েও পারল না। নোমান খাতা থেকে মাথা তুলে বলল,
“এক সেকেন্ড। তোমার সেকেন্ড আর্গুমেন্টটা উল্টো করে দাঁড় করাও। তাহলে প্রথমটার সাথে কানেক্ট হবে।”
বুশরা তাকাল। নোমান উঠে এসে তার খাতার পাশে দাঁড়াল। আঙুল দিয়ে লাইন দেখিয়ে বলল। তার হাতের গন্ধটা বুশরার নাকে এল পারফিউম আর হালকা সিগারেটের মিশ্রণ। বুশরা দ্রুত খাতা সরিয়ে নিল। সিগারেটের গন্ধ একদম সহ্য হয় না বুশরার তবে আজকের পারফিউমের গন্ধ সাথে মিলে অন্য রকম লাগছে। তবে এমন গা ঘেষে দাড়ানোয় একটু অস্বস্তি হলো বুশরার জোড় গলায় বলল,
“আমি বুঝেছি, একটু সরে দাড়াও।”
নোমান একটু হাসল।
“রাগ করছ?”
“না।”
“রাগ করলে বলো। আমি দূরে সরে যাই।”
বুশরা জবাব দিল না। নোমানও আর কিছু না বলে নিজের জায়গায় ফিরে গেল। কিন্তু বুশরার মনে সেই সিগারেট মিশ্রিত পারফিউমের গন্ধটা লেগে রইল অনেকক্ষণ।
রাতে বাসায় ফিরে সে আবিদকে ফোন করল। আবিদ জিজ্ঞেস করল কেমন কেটেছে দিন। বুশরা বলল, “ভালো।” আর কিছু বলল না। আবিদও চাপ দিল না। ফোন কাটার পর বুশরা ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকল। মনে মনে বলল,
“আমি শুধু টিমের জন্য ওর সাথে কথা বলছি। অন্য কিছু না।”
কিন্তু নিজেকেই বিশ্বাস করাতে পারল না পুরোপুরি।
দ্বিতীয় সপ্তাহে প্র্যাকটিসে আর চাপ বাড়ল। একদিন মাহিকা দেরি করল। বুশরা আর নোমান একা রুমে বসে রইল প্রায় বিশ মিনিট। নোমান প্রথমে ফোন দেখছিল। তারপর ফোন রাখল।
“তুমি আমাকে পছন্দ করো না, তাই না?”
বুশরা খাতা থেকে মাথা তুলল।
“এটা কেমন প্রশ্ন?”
নোমান বলল,
“এই প্রশ্নে সমস্যা কি? আমি জিজ্ঞেস করছি তুমি কি আমার উপর বিরক্ত?”
“মানুষ তার বন্ধুদের উপর বিরক্ত হয় বা রাগ করে। তোমার সাথে আমার বিরক্ত হবার মত পরিচয় নেই” বুশরা স্বীকার না করলেও ওর গলায় ঝাঝ ভিন্ন কথা বলে।
নোমান বুশরার খোচার পরেও রাগ করলো না ঠিক। বলল “আচ্ছা বন্ধু না হই, ডিবেট টিমে তো একসাথে আছি। নিজেদের মাঝে বোঝাপড়া ভাল হলে টিম কেমিস্ট্রি বাড়বে। ডিবেট কিন্তু ঠিক ফরমুলার মত জিতে না। টিম কেমিস্ট্রি হেল্প করে জিততে। তাই নিজেদের মাঝে বোঝাপড়া বাড়ানোটা আমাদের দ্বায়িত্বর মাঝে পড়ে।”
নোমানের মুখে দায়িত্বের কথা শুনে বুশরা এইবার ক্ষেপে যায় “দায়িত্বের ব্যাপার? তুমি ডিবেটকে যতটা সিরিয়াসলি নাও, আমি তার চেয়ে বেশি নিই।”
নোমান হালকা হাসল।
“আমি সিরিয়াসলি নেই। শুধু তোমার মতো দায়িত্ব শো অফ করি না।” নোমানের গলায় এইবার হালকা খোচা। বুশরা চুপ করে গেল। নোমান তার দিকে তাকিয়ে থাকল। মেয়েটার স্কার্ফ আজ হালকা নীল। গলার কাছে একটু ঘামের চিহ্ন। গরম পড়েছে। নোমানের চোখ সেখানে আটকে গেল এক মুহূর্তের জন্য। সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। এমনিতে বুশরা রেগে আছে তার উপর ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখলে আবার কি বলবে কে জানে।
মনে মনে নিজেকে নিজে বলল,
“এই মেয়েটার দিকে এভাবে তাকাচ্ছিস কেন? ও তোকে কিছু দেবে না। এই ধরনের মেয়েদের নখড়া বেশি। এরা নিজেদের সতী ভাবে আর জগতের সবাই কে রাবণ। এদের কে ভাল কথা বললেও এরা ভাবে কোন স্বার্থ আছে।”
অথচ চোখ আবার চলে যাচ্ছিল। বুশরার হাতের দিকে। আঙুলের দিকে। সরু আংগুল। পিয়ানো শিল্পীদের মত। সরু আংগুলে পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছে খাতার।মাহিকা এসে পড়ায় কথা আর এগোল না। কিন্তু সেই বিশ মিনিটের নীরবতা দুজনের মনেই লেগে রইল।
একদিন প্র্যাকটিসের পর নোমান বুশরাকে বলল,
“কালকের কেসটা নিয়ে আমি একটা নতুন অ্যাপ্রোচ ভেবেছি। চাইলে শুনতে পারো।”
বুশরা প্রথমে না বলতে চেয়েছিল। কিন্তু কেসটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলল, “বলো।”
দুজনে সিঁড়ির কোণে দাঁড়াল। নোমান কথা বলতে বলতে হাত নাড়ছিল। বুশরা শুনছিল। নোমানের গলার স্বর কম। কাছ থেকে শুনতে গেলে তার শ্বাসও শোনা যায়। বুশরার গায়ে একটা অস্বস্তিকর উত্তাপ ছড়াল। নোমানের শরীর থেকে সেদিনের সেই পারফিউম মিশ্রিত সিগারেটের ঘ্রাণ। সে একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। নোমান লক্ষ করল। কিন্তু কিছু বলল না।
কথা শেষে বুশরা বলল,
“আইডিয়াটা খারাপ না।”
নোমান হাসল।
“‘খারাপ না’ মানে তোমার মুখে অনেক বড় প্রশংসা।”
বুশরা মুখ ঘুরাল। চলে গেল। নোমান তার পিছন থেকে তাকিয়ে থাকল। মেয়েটার হাঁটার ভঙ্গিটা দেখল। কাঁধ সোজা। মাথা উঁচু। যেন পৃথিবীর সব নিয়ম তার পক্ষে। এই উদ্ধত্ব হেটে যাওয়া মেয়েটার ভিতরের মেয়েটা কে ওর দেখতে ইচ্ছে করে। সব সময় কি এমন উদ্ধত্ব? প্রেমিকের সামনেও? বুশরা কে নিয়ে এমন প্রশ্ন মনে আসায় একটু বিরক্ত হলো। অহেতুক সময় নষ্ট। নোমান যাদের পছন্দ করে তারা অনেক বেশি সাবলীল। বুশরার মত এমন নৈতিকতা আকড়ে থাকা কেউ না।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)