Yesterday, 06:55 PM
**–**
একটি সমাজ, একটি পরিবার এবং একজন নারীর আত্মাকে তিল তিল করে ভেঙে ফেলার গল্প "পরিত্যক্তা"।
**পর্ব -৪
***
ভোরের প্রথম আলো ফোটার বহু আগেই জমিদার বাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে মেঘলার ঘুম নিজে থেকেই সজাগ হওয়া শুরু হয়। দীর্ঘ সাত বছরের এই বন্দি জীবনে ভোরে সবার আগে ঘুম থেকে ওঠা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কড়া নিয়মের ঘানিপেষা এই সংসারে মেঘলার ঘুম ভাঙার নিজস্ব কোনো অধিকার নেই; ভোরের পাখির ডাকের আগেই তার কাজের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায় বাসি কাপড়েই।
গত রাতের সেই চরম শারীরিক নির্যাতন, ইঁদারার ঠান্ডা জলের ধকল আর ফ্লোরে শক্ত পাথরে ঘুমিয়ে থাকার কারণে মেঘলার সারা শরীর তখন তীব্র ব্যথায় টনটন করছে। হাড়ের প্রতিটি জোড়ায় যেন সুচ ফোটার মতো যন্ত্রণা। কিন্তু এই অসুস্থতা বা ব্যথার কোনো মূল্য নেই এই পরিবারে। সেই অবশ ও জখম শরীর নিয়েই মেঘলা নিঃশব্দে উঠে বসল।প্রথমে সে রান্নাঘরের অন্ধকার কোণ থেকে ঝাড়ুটা তুলে নিল। তিন তলা এই জমিদার বাড়ির বিশাল ড্রয়িংরুম, বারান্দা, সিঁড়ি এবং উঠোন, একে একে সব জায়গা ঝাড়ু দিয়ে ধুলো পরিষ্কার করতে শুরু করল সে কোমর নিচু করে, কারন ঝাড়ুটা বেশ খাটো। প্রতিটি পদক্ষেপে তার কোমর ও পিঠের পেশিগুলো ফেটে পড়ার উপক্রম হচ্ছিল, তবুও সে থেমে রইল না।
উঠোনের এক কোণ থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাতা আর ধুলো পরিষ্কার করার পর সে দ্রুত হাতে রান্নাঘরে প্রবেশ করল।কাঠের উনুনে আগুন ধরিয়ে সবার জন্য গরম চা ও জলখাবার প্রস্তুত করার পালা।কাঠের উনুন ধরতে সময় লাগে, উনুনের পাশে বশে ক্রমাগত নিচু হয়ে ফু দিতে হয়,হাত পাখাটা অনেকদিন আগেই ভেঙে গিয়েছে। রান্না ঘরে একটাই ছোট জানলা। কাঠের আচের ধোঁয়া বেরনোর জন্যে যথেষ্ট নয়। সেই ধোঁয়ার মধ্যেই কাশতে কাশতে উনুন ধরায় মেঘলা। কাশির ঝাঁকিতে ঢল ঢ্লে ব্লাউজের মধেই যেন এলোপাথাড়ি লাফাতে শুরু করে ভারী বুক দুটো। আবার বেশি জোরেও কাশা যাবে না,
যদি তাদের আবার ঘুম ভেঙে যায়! শরীর এবং মনের প্রতিটি কোষে এক অসম্ভব সংযমকে বহন করে নিয়ে চলে মেঘলা।
চা বানিয়ে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে শাশুড়ি ও শ্বশুরের ঘরের দিকে এগোতে হলো। হাতজোড় করে অত্যন্ত ভয়ের সুরে সে দরজায় টোকা দিয়ে তাদের ঘুম ভাঙাল—— “বাবা... মা... সকাল হয়ে গেছে, চা তৈরি... উঠে পড়ুন।”শাশুড়ি মা দরজা খুলেই গম্ভীর মুখে মেঘলার আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে বললেন "এখনো বাসি কাপড় ছাড়া হয়নি নাকি মহারানীর"।
সবার চা দিয়ে আসার পর মেঘলার আসল কাজটি এখনো বাকি আছে— বাড়ির কর্তাবাবু আবিরকে মানে তার স্বামী কে ঘুম থেকে ডেকে তোলা। সে কাঁপতে কাঁপতে দোতলার শোবার ঘরে প্রবেশ করল। বিশাল নরম বিছানায় আবির তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মেঘলা এগিয়ে গিয়ে তার স্বামীর মুখের দিকে তাকাল, কী শান্ত, নিষ্পাপ হয়ে ঘুমিয়ে আছে মানুষটা! অথচ জেগে উঠলেই সে কতটা নিষ্ঠুর, কতটা ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এই অবয়বটার দিকে তাকাতেই আনমনে ভেসে উঠল সাত বছর আগের সেই দিনগুলোর স্মৃতি।
বিয়ের পর প্রথম কটা মাস আবির তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসত, চোখে চোখে রাখত, মাথার ওপর ছায়ার মতো আগলে রাখত! তখন এই মানুষটির দুহাতের ছোঁয়াতেই মেঘলার সমস্ত পৃথিবী আলোয় ভরে যেত।কিন্তু পরক্ষণেই তীব্র এক অপরাধবোধে মেঘলার বুক কেঁপে উঠল। সে মনে মনে নিজেকেই ধিক্কার দিল। আবিরের কি কোনো দোষ আছে? সে তো কেবল চেয়েছিল একটা সন্তান, তার বংশের রক্ত ও উত্তরাধিকার। কিন্তু সেই সহজ চাওয়াটুকুও পূরণ করতে পারেনি এই অপয়া অভাগী মেঘলা! যদিও সমাজের আড়ালে সত্যিটা হলো সমস্যাটা খোদ আবিরের পুরুষত্বহীনতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে, তবুও দীর্ঘদিনের অত্যাচার, শাশুড়ির বিষোদ্গার আর সমাজমাধ্যমের সংস্কারে পিষে গিয়ে মেঘলা এখন অপরাধী। সে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, তার এই শূন্য কোলই বুঝি আবিরের সমস্ত পৈশাচিক ক্রুদ্ধতার একমাত্র ন্যায্য কারণ।
নিজের এই অসহায় অবস্থাকে অভিশপ্ত মেনে নিয়ে মেঘলা আলতো হাতে আবিরের কাঁধের কাছে গেল। যদি সামান্য অসতর্কতায় তার ঘুম ভেঙে যায় এবং সে রেগে যায়, সেই ভয়ে মেঘলার বুক তখন কাঁপছে। বিশাল নরম বিছানায় আবির তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মাথার ওপরের সিলিং ফ্যানটা মৃদু শব্দে ঘুরছে, কিন্তু সেই ঘূর্ণনও যেন মেঘলার কাঁপতে থাকা বুকের স্পন্দনকে থামাতে পারছে না। সামান্য একটু অসতর্কতা, একটু জোরালো শব্দ, আর তাতেই যদি এই মানুষটার ঘুম ভেঙে যায় এবং সে রাগে ফেটে পড়ে, এই আশঙ্কায় মেঘলার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল।
তবুও ভেতরের কোনো এক গভীর মায়ার টানে, সাত বছর আগের সেই হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার রেশ ধরে রেখে মেঘলা নিজেকে আর আটকে রাখতে পারল না। সে কাঁপতে কাঁপতে আবিরের মাথার কাছে গিয়ে বসল। অত্যন্ত আলতো হাতে সে আবিরের অবিন্যস্ত চুলে হাত রাখল। মাথার চুলগুলোতে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে, যেন কোনো শিশুকে ঘুম থেকে জাগানোর মতো চরম সাবধানে সে ফিসফিস করে ডেকে উঠল—— “ওগো, শুনছো... বেলা হয়ে গেল! এবার একটু ঘুম থেকে উঠুন...”
আবিরের কানের কাছে সেই নরম কন্ঠের আকুতি পৌঁছাতেই সে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে নড়েচড়ে উঠল। ধড়ফড় করে চোখ মেলে সে যখন তাকাল, তার চোখে কোনো ভালোবাসার লেশমাত্র ছিল না, ছিল কেবল সকালবেলার তীব্র খিটখিটে মেজাজ। মেঘলার দিকে এক পলক তাকিয়ে সে কর্কশ ও ধমকের সুরে বলে উঠল—— “এখানেবসে ফালতু সময় নষ্ট করছ কেন? যাও, গিয়ে তাড়াতাড়ি চা নিয়ে এসো!”
স্বামীর এই নিষ্ঠুর ও তাচ্ছিল্যভরা কথাটি শোনার সাথে সাথেই মেঘলার উজ্জ্বল হতে চাওয়া মুখটা পলকের মধ্যে ফের মলিন হয়ে গেল। বুকের ভেতরটায় যেন মোচড় দিয়ে উঠল একরাশ দীর্ঘশ্বাসে। সে একটিও টু শব্দ করল না; নিজেকে অপরাধী মনে করে সে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেল। উনুনের উপরে আগের রাখা চায়ের কেটলিটা চাপিয়ে সে চা টা একটু গরম করে নিল, তারপর কাপে ঢেলে কোনোমতে হাতে করে আবার শোবার ঘরে ফিরে এল।
আবির তখনো বিছানায় বসে । মেঘলা কাপটা তার হাতে তুলে দিল। আবির কোনো কথা না বলে কাপে চুমুক দিল। স্বামীর সেই উদাসীন মুখের দিকে তাকিয়ে মেঘলার বউ মনটা কেমন যেন আনচান করে উঠল। বহুদিন পর হাতের চা কেমন হয়েছে—এই সাধারণ কথাটুকু জানার জন্য তার ভেতর একটা সুপ্ত আকুলতা জেগে উঠল। বড় মায়ার সুরে, অত্যন্ত নরম গলায় সে প্রশ্ন করে বসল—
— “চা... চা কি ঠিকমতো হয়েছে গো? কেমন হয়েছে বলুন তো?”
এই সরল প্রশ্নটাই যেন আবিরের ঘুমন্ত ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দিল। সে মুহূর্তের মধ্যে হুঙ্কার দিয়ে ফেটে পড়ল। হাতের চা ভর্তি কাপটা সে এক ঝটকায় সজোরে ছুড়ে মারল ফ্লোরের ওপর। ঝনঝন শব্দে চিনের মাটির কাপটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, আর গরম চা ফ্লোরের মার্বেলের গায়ে ছিটিয়ে পড়ল।
আবির বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে উঠল—
— “তোর সাহস তো দিন দিন অনেক বেড়ে গেছে দেখছি! আমি কি ভিখারি যে তোর হাতের এই পচা চা খেয়ে বাহবা দেব? সকালবেলা ফালতু জেরা করার শখ হয়েছে, না কি আমার ওপর মাতব্বরি ফলানোর ইচ্ছা হয়েছে? এই নোংরা ছাইয়ের মতো চা মুখে দেওয়া যায় নাকি! তোর হাতে স্বাদের বালাই তো দূরের কথা, কেবল ছাই ছাড়া আর কিচ্ছু নেই!”
আবিরের এই আকস্মিক চিৎকারে মেঘলা ভয়ে শিউরে উঠল। সে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে দুই হাত দিয়ে কান চেপে একপাশে কুঁকড়ে গেল। বুকটা কেঁপে উঠল এই ভয়ে যে এই বুঝি আবিরের চওড়া হাতটা তার গালে এসে পড়বে। সে কোনো প্রতিবাদ করার সাহস পেল না, পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আবির তখন রাগে গমগম করতে করতে নিজের ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গায়ের পাঞ্জাবিটা ঠিক করতে করতে সে কড়া গলায় হুকুম দিল—
— “আমি একটু বাজার থেকে ঘুরে আসছি, এসেই সোজা শহরে রওনা দেব। আমার এক বন্ধুর বিয়ে ,তিন দিনের বিয়ের নিমন্ত্রণ আছে, সেখানে তিন দিন আমাকে বাইরে থাকতে হবে। আর আমি যখন বাড়ি ফিরে আসব, তখন যেন দেখি আমার যাওয়ার সমস্ত জামাকাপড় একদম নিখুঁতভাবে গোছানো আছে! যদি একটুও এদিক-ওদিক দেখি, তবে তোর পিঠের চামড়া আমি এক্কেবারে তুলে নেব, বলে রাখছি!”
কথাটা শেষ করেই আবির আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ভারী বুটের আওয়াজ তুলে সে ঘর ছেড়ে সদর দরজার দিকে বেরিয়ে গেল।
ঘরের ভেতরে তখন পড়ে আছে ভাঙা চায়ের কাপের টুকরো আর ফ্লোরে ছড়িয়ে থাকা চা। মেঘলা শূন্য দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কাঁপতে কাঁপতে নিচু হয়ে সেই ভাঙা কাঁচ ও চা পরিষ্কার করার জন্য ফ্লোরে বসে পড়ল, আর তার দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল অবিরত নোনতা জলের ধারা।
আবির নিচে নামার পর অন্দরের গুমোট বাতাসকে চিরে বেজে উঠল আবিরের গম্ভীর ও দাপুটে গলা—
— “এই কার্তিক! শুনছিস নাকি? বাজারের থলেটা নিয়ে উঠানে আয় তো জলদি! বাজারে কিছু দোকানে হিসাব ও কাজ বাকি আছে, আমি বাইরে যাওয়ার আগে যেন কোনো ভুলের বাতিক না দেখি!”
আবিরের ডাক শোনা মাত্রই বাইরে থেকে কার্তিকের চটজলদি সাড়া ভেসে এল—
— “এই আসছি, কর্তা মশাই!”—এক দৌড়ে কার্তিক উঠানে এসে হাজির হলো। তার চোখে-মুখে একরকম অতি-তৎপরতার ছাপ, যা আবিরের সামনে সবসময় সে বজায় রাখে।
আবিরের ঠিক পিছন পিছন কার্তিক সদর দরজা দিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। তাদের পায়ের শব্দ এবং গলার আওয়াজ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যাওয়ার পর, বাড়ির বাতাসটা খানিকক্ষণের জন্য যেন কিছুটা হালকা হয়ে এল। কিন্তু মেঘলার বুকের ভেতরকার চাপা দীর্ঘশ্বাসটা একটুও কমল না।
আবিরের বাজার থেকে ফিরে আসার আগের এই কয়েকটা মুহূর্ত তার কাছে একেকটি যুগের সমান দীর্ঘ বলে মনে হচ্ছিল। সকালের এই নিস্তব্ধতা যেন কোনো এক আসন্ন ঝড়ের আগের থমথমে নীরবতা।
এর কিছু সময় পর, আবির যখন বাজার সেরে বাড়ি ফিরল, তখন থেকেই জমিদার বাড়িতে এক ব্যস্ত ও গম্ভীর পরিবেশ তৈরি হলো। বাজারে নিজের পছন্দের জিনিসপত্র আর কেনাকাটা সারার পর আবিরের যেন দম ফেলার ফুসরত নেই। সে এসেই সোজা ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল। সেখানকার বড় মার্বেল টেবিলে তখন খেরো খাতা, জমিদারি হিসাবের পুরনো ফাইল আর কিছু জরুরি কাগজপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
আবির ঝাপিয়ে পড়ল সেই কাজে।
টেবিলের একপাশে দাঁড়িয়ে মেঘলা দূর থেকে আড়চোখে একবার তাকাল—কে জানে, কিসের এত তাড়াহুড়ো আর ব্যস্ততা মানুষটার! সারাদিন কেবল হুকুম আর কাজের হিসাব মেলানোই যেন তার একমাত্র নেশা।
কিছুক্ষণ হিসাবপত্র ও কাগজপত্র ঘাটার পর আবিরের কাজ শেষ হলো। সে গম্ভীর মুখে চেয়ার ছেড়ে উঠে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। অন্দরে গোসলখানার দরজা খোলার ভারী শব্দ হলো, আর তারপর দীর্ঘক্ষণ ধরে শাওয়ারের ঠান্ডা জলে বাইরের ধুলোবালি ও ক্লান্তি ধুয়ে সে স্নান সেরোল। স্নান শেষে গা মুচে সে সোজা ডাইনিং টেবিলে এসে বসল।
মেঘলা তখন চুপচাপ, মুখে রা টু শব্দটি না করে, থরথর হাতে দুপুরের খাবার টেবিলে পরিবেশন করতে লাগল। বড় ভাতের থালা, বাটিতে ধোঁয়া ওঠা মাছের ঝোল আর গরম রুটি দেখে আবির তৃপ্তির একটা শব্দ করল। সে ধীরেসুস্থে নিজের খাবার শেষ করে হাত ধুয়ে আবার ড্রয়িংরুমে এসে বসল। ততক্ষণে ঘরের এক কোণে তার বড় চামড়ার স্যুটকেসটা গোছানো রয়েছে—যার ভেতর মেঘলা নিজের হাতে আবিরের সমস্ত জামাকাপড়, পাঞ্জাবি ও পারফিউমের শিশি একদম নিখুঁতভাবে ভাঁজ করে গুছিয়ে রেখেছিল।
এরপর আবির নিজের গায়ে একটা অভিজাত ও দামি কোট গলিয়ে নিল। চুলে পোমেডের নিখুঁত ও পরিপাটি আঁচড়, আর গায়ে ছড়ানো ফ্রেঞ্চ পারফিউমের মাদকী ও ভারী গন্ধ—বাইরে থেকে দেখলে এই মানুষটিকে দেখে যে কেউ এক পলকে ভুল করতে বাধ্য। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হবে, এ যেন কোনো বনেদি ও সম্ভ্রান্ত জমিদার বংশের মার্জিত, সফল ও অত্যন্ত সুশিক্ষিত উত্তরসূরি। কিন্তু এই নিখুঁত ভিনিয়ারের আড়ালে যে কী পরিমাণ নিষ্ঠুরতা, পিশাচসুলভ শীতলতা আর অহংকার লুকিয়ে আছে, তা কেবল ওই বাড়ির পুরনো দেওয়ালগুলোই জানে।
ড্রেসিং টেবিলের বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবির শেষবারের মতো নিজের চুল ও পোশাকটা ঠিকঠাক দেখে নিল। তারপর হঠাৎ করেই তার গলা আবার চড়ে বসল, সে অত্যন্ত কর্কশ ও দাপুটে গলায় ডেকে উঠল—
— “এই মেঘলা!
রান্নাঘরের দিক থেকে উনুনের ধোঁয়া, কড়াইয়ের ছ্যাঁতছেঁত শব্দ আর বাসনের খটখট আওয়াজ সামলে মেঘলা তখন সবেমাত্র একটু জিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। আবিরের ওই গম্ভীর ও মেজাজি গলা কানে যাওয়া মাত্রই তার বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল। সে কোনোমতে নিজের মলিন শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে, মাথা নিচু করে পা টিপে টিপে ড্রয়িংরুমে গিয়ে হাজির হলো। আবিরের ঠিক সামনে মাত্র কয়েক হাত দূরে সে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইল; তার ফ্যাকাশে মুখখানা দেখে মনে হচ্ছিল এই বুঝি সে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। আবিরের চোখের দিকে সরাসরি তাকানোর সাহস তার তখন বিন্দুমাত্রও ছিল না।
আবির একপাশে তাকিয়ে অত্যন্ত আদেশের সুরে বলতে শুরু করল—
— “শোন ভালো করে! তিন দিনের জন্য আমি বাড়ির বাইরে যাচ্ছি। বাড়িতে বাবা-মায়ের দেখাশোনা ও যত্নে যেন কোনো রকম ত্রুটি না হয়, তা যেন মাথায় থাকে!
মেঘলা অত্যন্ত ভয়ে, কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে উত্তর দিল—
— “সব... সব ঠিকমতো গুছিয়ে রেখেছি... আপনাকে কোনো চিন্তা করতে হবে না। আপনি সাবধানে ঘুরে আসবেন আর এদিকের সবকিছুর খেয়াল আমি রাখব।”
আবির তার কথায় আর কান দিল না, সেটার কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই সে মনে করল না। সে একটা চরম অবজ্ঞার দৃষ্টি ফেলে ভারী বুটের বিকট শব্দ তুলে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে বাবা-মাকে প্রণাম জানিয়ে সে ঘর থেকে বের হলো। ঠিক তখনই কার্তিক পিছন পিছন এসে সুটকেসটা হাতে তুলে নিয়ে গাড়ির কাছে এগিয়ে দিতে সঙ্গে চলল।
বাড়ির বাইরে মূল রাস্তার ধারের মেঠোপথের পাশে তখন তার ব্যক্তিগত গাড়িটা স্টার্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মেঘলা ঘরের দরজার কোণ থেকে একটু আধা-উঁকি দিয়ে দেখল, আবির গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে জাঁকিয়ে বসল আর কার্তিক সুটকেসটা ভেতরে তুলে দিল। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠল এবং টায়ার থেকে ধুলো উড়িয়ে গাড়িটা গ্রামের মেঠোপথ ধরে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
আবিরের গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই তিন তলা বাড়ির সেই গুমোট বাতাসটা খানিকক্ষণের জন্য যেন কিছুটা হালকা হয়ে এল। কিন্তু মেঘলার বুকের ভেতরকার চাপা দীর্ঘশ্বাসটা আরও ভারী হয়ে বসল। আবির না থাকা এই তিনটে দিন কীভাবে সে শাশুড়ি মায়ের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে কাটাবে, আর কাজের এই পাহাড় একা কীভাবে সামলাবে—সেই কথা ভেবে তার হাত-পা বরফ হয়ে আসছিল।
অথচ সে ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে, ঠিক এই তিন দিনের দূরত্বই তার সাজানো-গোছানো জীবনের সমস্ত হিসাব চিরতরে ওলটপালট করে দিতে আসছে।
ওদিকে গ্রাম ছেড়ে আবিরের গাড়ি যখন পিচঢালা হাইওয়ে ধরে কলকাতার বাইপাস পেরিয়ে শহরের অন্দরে প্রবেশ করছে, তখন পেছনের সেই জঙ্গলঘেরা জমিদার বাড়ির অন্ধকার আর মেঘলার করুণ মুখটা আবিরের মাথা থেকে পুরোপুরি মুছে গেছে। গাড়ির জানলার কাঁচ নামিয়ে বাইরের শহুরে রোদ, হর্ন আর মানুষের ভিড় দেখতে দেখতে তার মনটা হঠাৎ করেই ভীষণ ফুরফুরে হয়ে উঠল। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর একঘেয়েমি যেন এক নিমিষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
গাড়িটি গিয়ে থামল কলকাতার অন্যতম অভিজাত এক ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়িতে—যেখানে তার বাল্যবন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদারের বিবাহ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এটি সাধারণ কোনো হোটেল নয়, বন্ধুর নিজস্ব এক বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ রাজবাড়ির মতো বাড়ি, যার চারপাশে আলোকসজ্জা, সানাইয়ের সুর আর আমন্ত্রিত অতিথিদের কোলাহলে বাড়িটি তখন গমগম করছে।
গাড়ি থেকে নামামাত্রই আবিরের পুরনো বন্ধুরা তাকে ঘিরে ধরল।
— “আরে আবির! আয় আয়! তোকে তো দেখাই যায় না ভাই!”—বন্ধুর উষ্ণ কোলাকুলি আর পিঠ চাপড়ানির চোটে আবিরের মুখে একটা চওড়া ও সন্তুষ্ট হাসি ফুটে উঠল।
শহরের এই জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ, চারপাশের নামী দামি মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে আবির যেন এক অন্য দুনিয়ায় প্রবেশ করল। সে যেন এতদিন একটা দমবন্ধ করা খাঁচায় বন্দি ছিল, আর হঠাৎ করেই ডানা মেলে দিয়েছে এক অবাধ আকাশে। বন্ধুদের সাথে হাসিমুখে কথা বলতে বলতে সে সম্পূর্ণ ভুলে গেল যে, তার পেছনের ওই গ্রাম্য বাড়িতে কী পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
আর ঠিক সেই বিশাল প্রাসাদের ড্রয়িংরুমের ভিড়ের ভেতরেই, সুদৃশ্য এক ঝাড়বাতির নিচে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, শীতল ও হিসেবি দৃষ্টিতে আবিরের এই আনন্দোল্লাস লক্ষ্য করছিল এক নারী—তন্দ্রা। যে বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, ঘৃণা আর নিখুঁত একটা প্রতিশোধের ব্লুপ্রিন্ট নিয়ে ঠিক এই মুহূর্তটির জন্যই এতকাল অপেক্ষা করছিল।
……..(চলবে)।।।।।।
একটি সমাজ, একটি পরিবার এবং একজন নারীর আত্মাকে তিল তিল করে ভেঙে ফেলার গল্প "পরিত্যক্তা"।
**পর্ব -৪
***
ভোরের প্রথম আলো ফোটার বহু আগেই জমিদার বাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে মেঘলার ঘুম নিজে থেকেই সজাগ হওয়া শুরু হয়। দীর্ঘ সাত বছরের এই বন্দি জীবনে ভোরে সবার আগে ঘুম থেকে ওঠা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কড়া নিয়মের ঘানিপেষা এই সংসারে মেঘলার ঘুম ভাঙার নিজস্ব কোনো অধিকার নেই; ভোরের পাখির ডাকের আগেই তার কাজের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায় বাসি কাপড়েই।
গত রাতের সেই চরম শারীরিক নির্যাতন, ইঁদারার ঠান্ডা জলের ধকল আর ফ্লোরে শক্ত পাথরে ঘুমিয়ে থাকার কারণে মেঘলার সারা শরীর তখন তীব্র ব্যথায় টনটন করছে। হাড়ের প্রতিটি জোড়ায় যেন সুচ ফোটার মতো যন্ত্রণা। কিন্তু এই অসুস্থতা বা ব্যথার কোনো মূল্য নেই এই পরিবারে। সেই অবশ ও জখম শরীর নিয়েই মেঘলা নিঃশব্দে উঠে বসল।প্রথমে সে রান্নাঘরের অন্ধকার কোণ থেকে ঝাড়ুটা তুলে নিল। তিন তলা এই জমিদার বাড়ির বিশাল ড্রয়িংরুম, বারান্দা, সিঁড়ি এবং উঠোন, একে একে সব জায়গা ঝাড়ু দিয়ে ধুলো পরিষ্কার করতে শুরু করল সে কোমর নিচু করে, কারন ঝাড়ুটা বেশ খাটো। প্রতিটি পদক্ষেপে তার কোমর ও পিঠের পেশিগুলো ফেটে পড়ার উপক্রম হচ্ছিল, তবুও সে থেমে রইল না।
উঠোনের এক কোণ থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাতা আর ধুলো পরিষ্কার করার পর সে দ্রুত হাতে রান্নাঘরে প্রবেশ করল।কাঠের উনুনে আগুন ধরিয়ে সবার জন্য গরম চা ও জলখাবার প্রস্তুত করার পালা।কাঠের উনুন ধরতে সময় লাগে, উনুনের পাশে বশে ক্রমাগত নিচু হয়ে ফু দিতে হয়,হাত পাখাটা অনেকদিন আগেই ভেঙে গিয়েছে। রান্না ঘরে একটাই ছোট জানলা। কাঠের আচের ধোঁয়া বেরনোর জন্যে যথেষ্ট নয়। সেই ধোঁয়ার মধ্যেই কাশতে কাশতে উনুন ধরায় মেঘলা। কাশির ঝাঁকিতে ঢল ঢ্লে ব্লাউজের মধেই যেন এলোপাথাড়ি লাফাতে শুরু করে ভারী বুক দুটো। আবার বেশি জোরেও কাশা যাবে না,
যদি তাদের আবার ঘুম ভেঙে যায়! শরীর এবং মনের প্রতিটি কোষে এক অসম্ভব সংযমকে বহন করে নিয়ে চলে মেঘলা।
চা বানিয়ে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে শাশুড়ি ও শ্বশুরের ঘরের দিকে এগোতে হলো। হাতজোড় করে অত্যন্ত ভয়ের সুরে সে দরজায় টোকা দিয়ে তাদের ঘুম ভাঙাল—— “বাবা... মা... সকাল হয়ে গেছে, চা তৈরি... উঠে পড়ুন।”শাশুড়ি মা দরজা খুলেই গম্ভীর মুখে মেঘলার আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে বললেন "এখনো বাসি কাপড় ছাড়া হয়নি নাকি মহারানীর"।
সবার চা দিয়ে আসার পর মেঘলার আসল কাজটি এখনো বাকি আছে— বাড়ির কর্তাবাবু আবিরকে মানে তার স্বামী কে ঘুম থেকে ডেকে তোলা। সে কাঁপতে কাঁপতে দোতলার শোবার ঘরে প্রবেশ করল। বিশাল নরম বিছানায় আবির তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মেঘলা এগিয়ে গিয়ে তার স্বামীর মুখের দিকে তাকাল, কী শান্ত, নিষ্পাপ হয়ে ঘুমিয়ে আছে মানুষটা! অথচ জেগে উঠলেই সে কতটা নিষ্ঠুর, কতটা ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এই অবয়বটার দিকে তাকাতেই আনমনে ভেসে উঠল সাত বছর আগের সেই দিনগুলোর স্মৃতি।
বিয়ের পর প্রথম কটা মাস আবির তাকে ঠিক কতটা ভালোবাসত, চোখে চোখে রাখত, মাথার ওপর ছায়ার মতো আগলে রাখত! তখন এই মানুষটির দুহাতের ছোঁয়াতেই মেঘলার সমস্ত পৃথিবী আলোয় ভরে যেত।কিন্তু পরক্ষণেই তীব্র এক অপরাধবোধে মেঘলার বুক কেঁপে উঠল। সে মনে মনে নিজেকেই ধিক্কার দিল। আবিরের কি কোনো দোষ আছে? সে তো কেবল চেয়েছিল একটা সন্তান, তার বংশের রক্ত ও উত্তরাধিকার। কিন্তু সেই সহজ চাওয়াটুকুও পূরণ করতে পারেনি এই অপয়া অভাগী মেঘলা! যদিও সমাজের আড়ালে সত্যিটা হলো সমস্যাটা খোদ আবিরের পুরুষত্বহীনতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে, তবুও দীর্ঘদিনের অত্যাচার, শাশুড়ির বিষোদ্গার আর সমাজমাধ্যমের সংস্কারে পিষে গিয়ে মেঘলা এখন অপরাধী। সে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, তার এই শূন্য কোলই বুঝি আবিরের সমস্ত পৈশাচিক ক্রুদ্ধতার একমাত্র ন্যায্য কারণ।
নিজের এই অসহায় অবস্থাকে অভিশপ্ত মেনে নিয়ে মেঘলা আলতো হাতে আবিরের কাঁধের কাছে গেল। যদি সামান্য অসতর্কতায় তার ঘুম ভেঙে যায় এবং সে রেগে যায়, সেই ভয়ে মেঘলার বুক তখন কাঁপছে। বিশাল নরম বিছানায় আবির তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মাথার ওপরের সিলিং ফ্যানটা মৃদু শব্দে ঘুরছে, কিন্তু সেই ঘূর্ণনও যেন মেঘলার কাঁপতে থাকা বুকের স্পন্দনকে থামাতে পারছে না। সামান্য একটু অসতর্কতা, একটু জোরালো শব্দ, আর তাতেই যদি এই মানুষটার ঘুম ভেঙে যায় এবং সে রাগে ফেটে পড়ে, এই আশঙ্কায় মেঘলার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল।
তবুও ভেতরের কোনো এক গভীর মায়ার টানে, সাত বছর আগের সেই হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার রেশ ধরে রেখে মেঘলা নিজেকে আর আটকে রাখতে পারল না। সে কাঁপতে কাঁপতে আবিরের মাথার কাছে গিয়ে বসল। অত্যন্ত আলতো হাতে সে আবিরের অবিন্যস্ত চুলে হাত রাখল। মাথার চুলগুলোতে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে, যেন কোনো শিশুকে ঘুম থেকে জাগানোর মতো চরম সাবধানে সে ফিসফিস করে ডেকে উঠল—— “ওগো, শুনছো... বেলা হয়ে গেল! এবার একটু ঘুম থেকে উঠুন...”
আবিরের কানের কাছে সেই নরম কন্ঠের আকুতি পৌঁছাতেই সে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে নড়েচড়ে উঠল। ধড়ফড় করে চোখ মেলে সে যখন তাকাল, তার চোখে কোনো ভালোবাসার লেশমাত্র ছিল না, ছিল কেবল সকালবেলার তীব্র খিটখিটে মেজাজ। মেঘলার দিকে এক পলক তাকিয়ে সে কর্কশ ও ধমকের সুরে বলে উঠল—— “এখানেবসে ফালতু সময় নষ্ট করছ কেন? যাও, গিয়ে তাড়াতাড়ি চা নিয়ে এসো!”
স্বামীর এই নিষ্ঠুর ও তাচ্ছিল্যভরা কথাটি শোনার সাথে সাথেই মেঘলার উজ্জ্বল হতে চাওয়া মুখটা পলকের মধ্যে ফের মলিন হয়ে গেল। বুকের ভেতরটায় যেন মোচড় দিয়ে উঠল একরাশ দীর্ঘশ্বাসে। সে একটিও টু শব্দ করল না; নিজেকে অপরাধী মনে করে সে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেল। উনুনের উপরে আগের রাখা চায়ের কেটলিটা চাপিয়ে সে চা টা একটু গরম করে নিল, তারপর কাপে ঢেলে কোনোমতে হাতে করে আবার শোবার ঘরে ফিরে এল।
আবির তখনো বিছানায় বসে । মেঘলা কাপটা তার হাতে তুলে দিল। আবির কোনো কথা না বলে কাপে চুমুক দিল। স্বামীর সেই উদাসীন মুখের দিকে তাকিয়ে মেঘলার বউ মনটা কেমন যেন আনচান করে উঠল। বহুদিন পর হাতের চা কেমন হয়েছে—এই সাধারণ কথাটুকু জানার জন্য তার ভেতর একটা সুপ্ত আকুলতা জেগে উঠল। বড় মায়ার সুরে, অত্যন্ত নরম গলায় সে প্রশ্ন করে বসল—
— “চা... চা কি ঠিকমতো হয়েছে গো? কেমন হয়েছে বলুন তো?”
এই সরল প্রশ্নটাই যেন আবিরের ঘুমন্ত ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলে দিল। সে মুহূর্তের মধ্যে হুঙ্কার দিয়ে ফেটে পড়ল। হাতের চা ভর্তি কাপটা সে এক ঝটকায় সজোরে ছুড়ে মারল ফ্লোরের ওপর। ঝনঝন শব্দে চিনের মাটির কাপটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল, আর গরম চা ফ্লোরের মার্বেলের গায়ে ছিটিয়ে পড়ল।
আবির বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দাঁত কিড়মিড় করে চেঁচিয়ে উঠল—
— “তোর সাহস তো দিন দিন অনেক বেড়ে গেছে দেখছি! আমি কি ভিখারি যে তোর হাতের এই পচা চা খেয়ে বাহবা দেব? সকালবেলা ফালতু জেরা করার শখ হয়েছে, না কি আমার ওপর মাতব্বরি ফলানোর ইচ্ছা হয়েছে? এই নোংরা ছাইয়ের মতো চা মুখে দেওয়া যায় নাকি! তোর হাতে স্বাদের বালাই তো দূরের কথা, কেবল ছাই ছাড়া আর কিচ্ছু নেই!”
আবিরের এই আকস্মিক চিৎকারে মেঘলা ভয়ে শিউরে উঠল। সে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে দুই হাত দিয়ে কান চেপে একপাশে কুঁকড়ে গেল। বুকটা কেঁপে উঠল এই ভয়ে যে এই বুঝি আবিরের চওড়া হাতটা তার গালে এসে পড়বে। সে কোনো প্রতিবাদ করার সাহস পেল না, পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আবির তখন রাগে গমগম করতে করতে নিজের ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। গায়ের পাঞ্জাবিটা ঠিক করতে করতে সে কড়া গলায় হুকুম দিল—
— “আমি একটু বাজার থেকে ঘুরে আসছি, এসেই সোজা শহরে রওনা দেব। আমার এক বন্ধুর বিয়ে ,তিন দিনের বিয়ের নিমন্ত্রণ আছে, সেখানে তিন দিন আমাকে বাইরে থাকতে হবে। আর আমি যখন বাড়ি ফিরে আসব, তখন যেন দেখি আমার যাওয়ার সমস্ত জামাকাপড় একদম নিখুঁতভাবে গোছানো আছে! যদি একটুও এদিক-ওদিক দেখি, তবে তোর পিঠের চামড়া আমি এক্কেবারে তুলে নেব, বলে রাখছি!”
কথাটা শেষ করেই আবির আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। ভারী বুটের আওয়াজ তুলে সে ঘর ছেড়ে সদর দরজার দিকে বেরিয়ে গেল।
ঘরের ভেতরে তখন পড়ে আছে ভাঙা চায়ের কাপের টুকরো আর ফ্লোরে ছড়িয়ে থাকা চা। মেঘলা শূন্য দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কাঁপতে কাঁপতে নিচু হয়ে সেই ভাঙা কাঁচ ও চা পরিষ্কার করার জন্য ফ্লোরে বসে পড়ল, আর তার দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল অবিরত নোনতা জলের ধারা।
আবির নিচে নামার পর অন্দরের গুমোট বাতাসকে চিরে বেজে উঠল আবিরের গম্ভীর ও দাপুটে গলা—
— “এই কার্তিক! শুনছিস নাকি? বাজারের থলেটা নিয়ে উঠানে আয় তো জলদি! বাজারে কিছু দোকানে হিসাব ও কাজ বাকি আছে, আমি বাইরে যাওয়ার আগে যেন কোনো ভুলের বাতিক না দেখি!”
আবিরের ডাক শোনা মাত্রই বাইরে থেকে কার্তিকের চটজলদি সাড়া ভেসে এল—
— “এই আসছি, কর্তা মশাই!”—এক দৌড়ে কার্তিক উঠানে এসে হাজির হলো। তার চোখে-মুখে একরকম অতি-তৎপরতার ছাপ, যা আবিরের সামনে সবসময় সে বজায় রাখে।
আবিরের ঠিক পিছন পিছন কার্তিক সদর দরজা দিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। তাদের পায়ের শব্দ এবং গলার আওয়াজ ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে যাওয়ার পর, বাড়ির বাতাসটা খানিকক্ষণের জন্য যেন কিছুটা হালকা হয়ে এল। কিন্তু মেঘলার বুকের ভেতরকার চাপা দীর্ঘশ্বাসটা একটুও কমল না।
আবিরের বাজার থেকে ফিরে আসার আগের এই কয়েকটা মুহূর্ত তার কাছে একেকটি যুগের সমান দীর্ঘ বলে মনে হচ্ছিল। সকালের এই নিস্তব্ধতা যেন কোনো এক আসন্ন ঝড়ের আগের থমথমে নীরবতা।
এর কিছু সময় পর, আবির যখন বাজার সেরে বাড়ি ফিরল, তখন থেকেই জমিদার বাড়িতে এক ব্যস্ত ও গম্ভীর পরিবেশ তৈরি হলো। বাজারে নিজের পছন্দের জিনিসপত্র আর কেনাকাটা সারার পর আবিরের যেন দম ফেলার ফুসরত নেই। সে এসেই সোজা ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করল। সেখানকার বড় মার্বেল টেবিলে তখন খেরো খাতা, জমিদারি হিসাবের পুরনো ফাইল আর কিছু জরুরি কাগজপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
আবির ঝাপিয়ে পড়ল সেই কাজে।
টেবিলের একপাশে দাঁড়িয়ে মেঘলা দূর থেকে আড়চোখে একবার তাকাল—কে জানে, কিসের এত তাড়াহুড়ো আর ব্যস্ততা মানুষটার! সারাদিন কেবল হুকুম আর কাজের হিসাব মেলানোই যেন তার একমাত্র নেশা।
কিছুক্ষণ হিসাবপত্র ও কাগজপত্র ঘাটার পর আবিরের কাজ শেষ হলো। সে গম্ভীর মুখে চেয়ার ছেড়ে উঠে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। অন্দরে গোসলখানার দরজা খোলার ভারী শব্দ হলো, আর তারপর দীর্ঘক্ষণ ধরে শাওয়ারের ঠান্ডা জলে বাইরের ধুলোবালি ও ক্লান্তি ধুয়ে সে স্নান সেরোল। স্নান শেষে গা মুচে সে সোজা ডাইনিং টেবিলে এসে বসল।
মেঘলা তখন চুপচাপ, মুখে রা টু শব্দটি না করে, থরথর হাতে দুপুরের খাবার টেবিলে পরিবেশন করতে লাগল। বড় ভাতের থালা, বাটিতে ধোঁয়া ওঠা মাছের ঝোল আর গরম রুটি দেখে আবির তৃপ্তির একটা শব্দ করল। সে ধীরেসুস্থে নিজের খাবার শেষ করে হাত ধুয়ে আবার ড্রয়িংরুমে এসে বসল। ততক্ষণে ঘরের এক কোণে তার বড় চামড়ার স্যুটকেসটা গোছানো রয়েছে—যার ভেতর মেঘলা নিজের হাতে আবিরের সমস্ত জামাকাপড়, পাঞ্জাবি ও পারফিউমের শিশি একদম নিখুঁতভাবে ভাঁজ করে গুছিয়ে রেখেছিল।
এরপর আবির নিজের গায়ে একটা অভিজাত ও দামি কোট গলিয়ে নিল। চুলে পোমেডের নিখুঁত ও পরিপাটি আঁচড়, আর গায়ে ছড়ানো ফ্রেঞ্চ পারফিউমের মাদকী ও ভারী গন্ধ—বাইরে থেকে দেখলে এই মানুষটিকে দেখে যে কেউ এক পলকে ভুল করতে বাধ্য। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হবে, এ যেন কোনো বনেদি ও সম্ভ্রান্ত জমিদার বংশের মার্জিত, সফল ও অত্যন্ত সুশিক্ষিত উত্তরসূরি। কিন্তু এই নিখুঁত ভিনিয়ারের আড়ালে যে কী পরিমাণ নিষ্ঠুরতা, পিশাচসুলভ শীতলতা আর অহংকার লুকিয়ে আছে, তা কেবল ওই বাড়ির পুরনো দেওয়ালগুলোই জানে।
ড্রেসিং টেবিলের বিশাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আবির শেষবারের মতো নিজের চুল ও পোশাকটা ঠিকঠাক দেখে নিল। তারপর হঠাৎ করেই তার গলা আবার চড়ে বসল, সে অত্যন্ত কর্কশ ও দাপুটে গলায় ডেকে উঠল—
— “এই মেঘলা!
রান্নাঘরের দিক থেকে উনুনের ধোঁয়া, কড়াইয়ের ছ্যাঁতছেঁত শব্দ আর বাসনের খটখট আওয়াজ সামলে মেঘলা তখন সবেমাত্র একটু জিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। আবিরের ওই গম্ভীর ও মেজাজি গলা কানে যাওয়া মাত্রই তার বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল। সে কোনোমতে নিজের মলিন শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে, মাথা নিচু করে পা টিপে টিপে ড্রয়িংরুমে গিয়ে হাজির হলো। আবিরের ঠিক সামনে মাত্র কয়েক হাত দূরে সে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে রইল; তার ফ্যাকাশে মুখখানা দেখে মনে হচ্ছিল এই বুঝি সে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। আবিরের চোখের দিকে সরাসরি তাকানোর সাহস তার তখন বিন্দুমাত্রও ছিল না।
আবির একপাশে তাকিয়ে অত্যন্ত আদেশের সুরে বলতে শুরু করল—
— “শোন ভালো করে! তিন দিনের জন্য আমি বাড়ির বাইরে যাচ্ছি। বাড়িতে বাবা-মায়ের দেখাশোনা ও যত্নে যেন কোনো রকম ত্রুটি না হয়, তা যেন মাথায় থাকে!
মেঘলা অত্যন্ত ভয়ে, কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে উত্তর দিল—
— “সব... সব ঠিকমতো গুছিয়ে রেখেছি... আপনাকে কোনো চিন্তা করতে হবে না। আপনি সাবধানে ঘুরে আসবেন আর এদিকের সবকিছুর খেয়াল আমি রাখব।”
আবির তার কথায় আর কান দিল না, সেটার কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই সে মনে করল না। সে একটা চরম অবজ্ঞার দৃষ্টি ফেলে ভারী বুটের বিকট শব্দ তুলে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে বাবা-মাকে প্রণাম জানিয়ে সে ঘর থেকে বের হলো। ঠিক তখনই কার্তিক পিছন পিছন এসে সুটকেসটা হাতে তুলে নিয়ে গাড়ির কাছে এগিয়ে দিতে সঙ্গে চলল।
বাড়ির বাইরে মূল রাস্তার ধারের মেঠোপথের পাশে তখন তার ব্যক্তিগত গাড়িটা স্টার্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মেঘলা ঘরের দরজার কোণ থেকে একটু আধা-উঁকি দিয়ে দেখল, আবির গিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে জাঁকিয়ে বসল আর কার্তিক সুটকেসটা ভেতরে তুলে দিল। মুহূর্তের মধ্যে গাড়ির ইঞ্জিন গর্জে উঠল এবং টায়ার থেকে ধুলো উড়িয়ে গাড়িটা গ্রামের মেঠোপথ ধরে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
আবিরের গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই তিন তলা বাড়ির সেই গুমোট বাতাসটা খানিকক্ষণের জন্য যেন কিছুটা হালকা হয়ে এল। কিন্তু মেঘলার বুকের ভেতরকার চাপা দীর্ঘশ্বাসটা আরও ভারী হয়ে বসল। আবির না থাকা এই তিনটে দিন কীভাবে সে শাশুড়ি মায়ের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে কাটাবে, আর কাজের এই পাহাড় একা কীভাবে সামলাবে—সেই কথা ভেবে তার হাত-পা বরফ হয়ে আসছিল।
অথচ সে ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে, ঠিক এই তিন দিনের দূরত্বই তার সাজানো-গোছানো জীবনের সমস্ত হিসাব চিরতরে ওলটপালট করে দিতে আসছে।
ওদিকে গ্রাম ছেড়ে আবিরের গাড়ি যখন পিচঢালা হাইওয়ে ধরে কলকাতার বাইপাস পেরিয়ে শহরের অন্দরে প্রবেশ করছে, তখন পেছনের সেই জঙ্গলঘেরা জমিদার বাড়ির অন্ধকার আর মেঘলার করুণ মুখটা আবিরের মাথা থেকে পুরোপুরি মুছে গেছে। গাড়ির জানলার কাঁচ নামিয়ে বাইরের শহুরে রোদ, হর্ন আর মানুষের ভিড় দেখতে দেখতে তার মনটা হঠাৎ করেই ভীষণ ফুরফুরে হয়ে উঠল। দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর একঘেয়েমি যেন এক নিমিষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
গাড়িটি গিয়ে থামল কলকাতার অন্যতম অভিজাত এক ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়িতে—যেখানে তার বাল্যবন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদারের বিবাহ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। এটি সাধারণ কোনো হোটেল নয়, বন্ধুর নিজস্ব এক বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ রাজবাড়ির মতো বাড়ি, যার চারপাশে আলোকসজ্জা, সানাইয়ের সুর আর আমন্ত্রিত অতিথিদের কোলাহলে বাড়িটি তখন গমগম করছে।
গাড়ি থেকে নামামাত্রই আবিরের পুরনো বন্ধুরা তাকে ঘিরে ধরল।
— “আরে আবির! আয় আয়! তোকে তো দেখাই যায় না ভাই!”—বন্ধুর উষ্ণ কোলাকুলি আর পিঠ চাপড়ানির চোটে আবিরের মুখে একটা চওড়া ও সন্তুষ্ট হাসি ফুটে উঠল।
শহরের এই জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ, চারপাশের নামী দামি মানুষের ভিড়—সব মিলিয়ে আবির যেন এক অন্য দুনিয়ায় প্রবেশ করল। সে যেন এতদিন একটা দমবন্ধ করা খাঁচায় বন্দি ছিল, আর হঠাৎ করেই ডানা মেলে দিয়েছে এক অবাধ আকাশে। বন্ধুদের সাথে হাসিমুখে কথা বলতে বলতে সে সম্পূর্ণ ভুলে গেল যে, তার পেছনের ওই গ্রাম্য বাড়িতে কী পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
আর ঠিক সেই বিশাল প্রাসাদের ড্রয়িংরুমের ভিড়ের ভেতরেই, সুদৃশ্য এক ঝাড়বাতির নিচে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, শীতল ও হিসেবি দৃষ্টিতে আবিরের এই আনন্দোল্লাস লক্ষ্য করছিল এক নারী—তন্দ্রা। যে বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, ঘৃণা আর নিখুঁত একটা প্রতিশোধের ব্লুপ্রিন্ট নিয়ে ঠিক এই মুহূর্তটির জন্যই এতকাল অপেক্ষা করছিল।
……..(চলবে)।।।।।।
Ex_Professor
Let's make a happy moment.
Let's make a happy moment.


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)