08-10-2026, 10:46 PM
(This post was last modified: 08-10-2026, 10:49 PM by কাদের. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
খ
ঢাকা ডিবেট ফেস্ট আসছে। নর্থ সাউথ ডিবেট ক্লাব থেকে দুইটা টিম যাবে। প্রথম টিম আগেই ফাইনাল হয়ে গেছে। তিনজন সিনিয়র। রাফিয়া হাসান, তানভীর আহমেদ আর সাদমান চৌধুরী। রাফিয়া ক্লাবের অন্যতম সেরা স্পিকার। লজিক্যাল স্ট্রাকচার আর রিবাটালে তার হাত পরিষ্কার। তানভীর স্টাইলিশ স্পিকার, কন্ট্রোলড অ্যাগ্রেশন নিয়ে কথা বলে। সাদমান নীরব কিন্তু মারাত্মক। কেস ফ্রেমিংয়ে তার দক্ষতা অন্য লেভেলের। তিনজনে মিলে গত দুই বছরে কয়েকটা বড় টুর্নামেন্ট জিতেছে। ক্লাবে সবাই জানে, প্রথম টিম মানেই প্রায় নিশ্চিত কোয়ালিফিকেশন। তাদের নিয়ে কারো কোনো দ্বিধা নেই।
দ্বিতীয় টিমের দুইজন আগেই ঠিক হয়ে গেছে। বুশরা এবং মাহিকা। মাহিকা বুশরার এক বছরের সিনিয়র। দুজনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভালো। কথা কম বলে, কিন্তু একে অপরের পয়েন্ট ধরতে পারে। বুশরা কেস বিল্ড করে, মাহিকা রিবাটালে ধারালো থাকে। তৃতীয় সদস্য নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
কমিটি মিটিংয়ে নামগুলো উঠল। কয়েকজনের নাম আলোচনা হচ্ছিল। হঠাৎ নোমানের নামও উঠল। বুশরা একটু অবাক হয়ে তাকাল। নোমান ক্লাবে আসে ঠিকই। ছোটখাটো প্র্যাকটিস রাউন্ডে মাঝে মাঝে কথা বলে। কিন্তু বড় কোনো ম্যাচে তাকে সে দেখেনি। ডিবেটার হিসেবে তার কোনো পরিচিতিও নেই বুশরার চোখে। ছেলেটা ক্লাবে এসে পা তুলে বসে, ফোন দেখে, হালকা কথা বলে। দায়িত্বকে কখনো সিরিয়াসলি নেয় বলে মনে হয় না। এমন মানুষের নাম ক্যান্ডিডেট হিসেবে উঠতে দেখে বুশরার ভ্রূ কুঁচকে গেল।
সিনিয়রদের মধ্যে একজন, আরিয়ান, বলল,
“নোমান ভালো করে। ওর চান্স আছে।”
বুশরা কিছু বলল না। মনে মনে বিরক্ত হলো। নোমান আর তার এক টিমে—এই চিন্তাটাই অস্বস্তিকর। ছেলেটা ক্লাবে এসে এমনভাবে আচরণ করে যেন সবকিছু হালকা। এমন মানুষকে নিয়ে বড় প্রতিযোগিতায় যাওয়াটা ঠিক মনে হচ্ছিল না। সে চেয়েছিল তৃতীয় সদস্য হিসেবে কেউ একজন সিরিয়াস, পরিচিত ডিবেটার আসুক। নোমান নয়।
শেষে সিদ্ধান্ত হলো, একটা বাছাই ডিবেট হবে। দশজন ক্যান্ডিডেট। একই টপিকের পক্ষে-বিপক্ষে পাঁচ মিনিট করে কথা বলবে। সিলেকশন কমিটি ভোট দিয়ে তৃতীয় সদস্য ঠিক করবে।
টপিক ঠিক হলো:
**“This House believes that social media has done more harm than good to modern relationships.”**
---
বাছাই রাউন্ডের দিন ক্লাব রুম ভরে গিয়েছিল। সামনে স্পিকারদের জন্য জায়গা, পেছনে দর্শক। বুশরা আর মাহিকা পেছনের সারিতে বসল। খাতা খুলে রাখল। কথা কম। শুধু পর্যবেক্ষণ।
প্রথম কয়েকজন ক্যান্ডিডেট কথা বলল। একজন খুব জোরে জোরে পয়েন্ট দিল, কিন্তু স্ট্রাকচার ছিল না। আবেগ দিয়ে ভরিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। আরেকজন খুব সাবধানে কথা বলল, প্রতিটা শব্দ মাপজোখ করে, কিন্তু কোনো ধার ছিল না। তৃতীয়জন উদাহরণ দিতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলল। চতুর্থজন ভালো শুরু করল, কিন্তু মাঝপথে পয়েন্ট হারিয়ে ফেলল।
মাহিকা আস্তে বলল,
“দ্বিতীয়জনের কেস পরিষ্কার ছিল। কিন্তু অ্যাটাক নেই। শুধু ডিফেন্ড করছে।”
বুশরা মাথা নাড়ল।
“প্রথমজন শুধু আবেগ দিয়েছে। লজিক কম। তৃতীয়জন উদাহরণে ডুবে গেছে।”
এভাবে একটার পর একটা স্পিচ চলতে থাকল। বুশরা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। কে কী পয়েন্ট দিচ্ছে, কোথায় দুর্বলতা, কোথায় ওভারকনফিডেন্ট সব নোট করছিল। মাহিকাও মাঝে মাঝে মন্তব্য করছিল। দুজনেই প্রায় একমত হচ্ছিল বেশিরভাগ স্পিকার নিয়ে। কেউ কেউ ভালো বলছিল, কিন্তু ফেস্ট লেভেলের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে হচ্ছিল।
শেষের দিকে নোমান উঠল। বুশরা সোজা হয়ে বসল। মনে মনে একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—ছেলেটা হালকা কথা বলবে, হাসবে, কোনো গভীর পয়েন্ট দিতে পারবে না। ক্লাবে সে যেমন আচরণ করে, স্পিচেও তেমনই হবে। নোমান মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কোনো কাগজ নেই। হাত পকেটে। একটু চুপ করে থেকে শুরু করল। গলাটা স্থির। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সে বলল, সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্ককে ধ্বংস করেনি। সম্পর্কের ভিতরের অসততাকে শুধু দৃশ্যমান করেছে। আগে মানুষ লুকিয়ে রাখত। এখন লুকানোর জায়গা কমেছে। এটা ক্ষতি না, উন্মোচন। সে কয়েকটা উদাহরণ দিল—পুরনো সম্পর্কের ভণ্ডামি, নতুন সম্পর্কের স্বচ্ছতা, অতিরিক্ত এক্সপোজারের ভয়। লজিকাল কানেকশন পরিষ্কার রাখল। রিবাটালে আগের কয়েকজনের পয়েন্ট তুলে এনে ভেঙে দিল। শেষের দিকে বলল, আমরা সোশ্যাল মিডিয়াকে দোষ দিই কারণ নিজেদের দুর্বলতাকে স্বীকার করতে চাই না। সম্পর্কের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানো সহজ।
স্পিচ শেষে ঘরে একটু নীরবতা রইল। কয়েকজন মাথা নাড়ল।
মাহিকা আস্তে বলল,
“ভালো বলেছে। পয়েন্টগুলো পরিষ্কার। আর কনফিডেন্স আছে। গলার টোনও কন্ট্রোলড।”
বুশরা কিছু বলল না। খাতায় কলম ঘষছিল। মনে মনে খুঁত ধরতে চাইছিল। স্ট্রাকচার একটু লুজ ছিল হয়তো। উদাহরণ আরও মজবুত হতে পারত। শেষের লাইনটা একটু বেশি ড্রামাটিক মনে হয়েছে। কিন্তু যুক্তিগুলো দুর্বল ছিল না। এটা সে অস্বীকার করতে পারল না। ছেলেটা যেভাবে আগের স্পিকারদের পয়েন্ট তুলে ভেঙেছে, সেটা সহজ কাজ না।
মাহিকা আবার বলল,
“আমার মনে হয় ও ভালো ডিবেটার। আর একটু প্র্যাকটিস করলে ফেস্টের জন্য রেডি হয়ে যাবে। ওর মধ্যে একটা ন্যাচারাল ফ্লো আছে।”
বুশরা মাথা নাড়ল শুধু। মনে মনে বলল, কীভাবে সম্ভব? এতদিন তো দেখিনি। ছেলেটা ক্লাবে এসে এমন করে কথা বলে যেন সবকিছু হালকা। অথচ আজকের স্পিচে হালকা কিছু ছিল না। কোনো অতিরিক্ত হাসি ছিল না। কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা ছিল না। শুধু পয়েন্ট। পরিষ্কার পয়েন্ট।
এই দ্বন্দ্বটা তার ভেতর চাপ সৃষ্টি করছিল। সে নোমানকে একটা ফ্রেমে ফেলে রেখেছিল হালকা, দায়িত্বহীন, সিরিয়াস নয়। আজকের স্পিচ সেই ফ্রেমটা কেঁপে দিয়েছে।
---
রেজাল্ট ঘোষণা হলো সন্ধ্যায়। নোমান নির্বাচিত।
বুশরা খবরটা শুনে চুপ করে থাকল। ভেতরে একটা অস্বস্তি চাপছিল। সে সিদ্ধান্ত নিল ক্লাব প্রেসিডেন্টের সাথে আলাদা করে কথা বলবে। আয়ানকে সে সম্মান করে। আয়ানের কথাবার্তায় একটা পরিপক্কতা আছে। তিনি কখনো হালকা করে কিছু বলেন না। তাই তার কাছে গিয়ে নিজের আপত্তিটা রাখাটাই যৌক্তিক মনে হলো।
প্রেসিডেন্টের অফিস রুমে গিয়ে দাঁড়াল বুশরা। আয়ান ল্যাপটপ দেখছিলেন। মাথা তুলে তাকালেন।
“বলো বুশরা।”
বুশরা সোজাসুজি বলল,
“স্যার, নোমানকে নেওয়াটা ঠিক হয়নি মনে হচ্ছে। ঢাকা ডিবেট ফেস্ট ছোট প্রতিযোগিতা না। এখানে দেশের সেরা টিমগুলো আসে। নোমান ক্লাবে তেমন ডিবেট করেনি। বড় মঞ্চে ভড়কে যেতে পারে। আমরা টিম হিসেবে দুর্বল হয়ে যাব।”
আয়ান চেয়ার ছেড়ে একটু হেলান দিয়ে বসলেন। চশমাটা সরিয়ে রাখলেন।
“তুমি ওকে কম চেনো।”
বুশরা চুপ করে থাকল। আয়ানের গলায় কোনো বিরক্তি ছিল না। শুধু একটা শান্ত নিশ্চয়তা।
আয়ান বললেন,
“নোমানকে আমি আগে থেকে চিনি। কলেজে ও খুব ভালো ডিবেটার ছিল। কলেজে এসে আরও ধারালো হয়। ঢাকার অনেক টপ ডিবেটারকে ও কলেজ-কলেজ লেভেলে ফেস করেছে। কয়েকজন তো এখন ইউনিভার্সিটি লেভেলেও নামকরা। ওদের কেউ কেউ এখনো বলে, নোমানকে আর্গুমেন্ট দিয়ে চাপানো মুশকিল ছিল। ওর একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল—পরিস্থিতি যত খারাপ হোক, গলার টোন কখনো ভাঙত না।”
বুশরা অবাক হয়ে তাকাল। আয়ান আবার বললেন,
“একবার আন্তঃকলেজ ফেস্টে ওর টিম ফাইনালে উঠেছিল। ও পজিশন থ্রি ছিল। শেষ স্পিচে পুরো কেসটা উল্টে দিয়েছিল। জজরা পরে বলেছিল, ওই স্পিচ না হলে ম্যাচটা অন্যভাবে যেত। আরেকবার একটা টিম ওকে টার্গেট করে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছিল। নোমান হাসিয়ে উড়িয়ে দিয়ে শুধু লজিকে ফিরে গিয়েছিল। রেগে যায়নি। ওর ওই কন্ট্রোলটাই ওর শক্তি। অনেকেই ভালো কথা বলে। কিন্তু চাপের মুখে শান্ত থাকাটা আলাদা ব্যাপার।”
আয়ান একটু থেমে বললেন,
“ক্লাবে ও কম করে কারণ ও চায় না। না পারার জন্য না। তুমি ওকে শুধু ক্লাবের হালকা ভার্সন দেখেছ। আসলটা অন্য। ও যখন সিরিয়াস হয়, তখন অন্য মানুষ হয়ে যায়।”
বুশরা দাঁড়িয়ে শুনছিল। কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছিল। আয়ানকে সে বিশ্বাস করে। আয়ান কখনো অতিরঞ্জন করেন না। তাই নোমানের এই পুরনো পরিচয়টা তার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছিল। যে ছেলেটা ক্লাবে পা তুলে বসে, দায়িত্বকে হালকা করে, সেই ছেলেটা একসময় এতটা সিরিয়াস ডিবেটার ছিল—এই চিন্তাটা মানতে কষ্ট হচ্ছিল। আয়ানের মুখে নোমানের প্রশংসা শোনাটা আরও অদ্ভুত লাগছিল। কারণ আয়ান খুব কম মানুষের প্রশংসা করেন।
আয়ান শেষে বললেন,
“তুমি ওর সাথে টিম করবে। সুযোগ দাও। দেখো। আমি ভুল করছি না।”
বুশরা শুধু মাথা নাড়ল। আর কিছু বলল না। রুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে এসে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে বাইরের আলো পড়ছিল। মনে মনে একটাই কথা ঘুরছিল—
ছেলেটা আসলে কী?
যতবার সে নোমানকে একটা ফ্রেমে ফেলতে চেয়েছে, ততবার ফ্রেমটা ভেঙে গেছে। আজকের দিনে আরও একবার ভাঙল। প্রথমে ক্লাব ডে-তে, তারপর আজকের স্পিচে, এখন আয়ানের মুখে।
বুশরা স্কার্ফ ঠিক করল। ব্যাগ কাঁধে নিল। হাঁটতে শুরু করল।
মনে মনে বিস্ময়টা চেপে রাখল। কিন্তু বিস্ময়টা থেকে গেল। একটা অস্বস্তিকর, অস্বীকার করা যায় না এমন বিস্ময়।
ঢাকা ডিবেট ফেস্ট আসছে। নর্থ সাউথ ডিবেট ক্লাব থেকে দুইটা টিম যাবে। প্রথম টিম আগেই ফাইনাল হয়ে গেছে। তিনজন সিনিয়র। রাফিয়া হাসান, তানভীর আহমেদ আর সাদমান চৌধুরী। রাফিয়া ক্লাবের অন্যতম সেরা স্পিকার। লজিক্যাল স্ট্রাকচার আর রিবাটালে তার হাত পরিষ্কার। তানভীর স্টাইলিশ স্পিকার, কন্ট্রোলড অ্যাগ্রেশন নিয়ে কথা বলে। সাদমান নীরব কিন্তু মারাত্মক। কেস ফ্রেমিংয়ে তার দক্ষতা অন্য লেভেলের। তিনজনে মিলে গত দুই বছরে কয়েকটা বড় টুর্নামেন্ট জিতেছে। ক্লাবে সবাই জানে, প্রথম টিম মানেই প্রায় নিশ্চিত কোয়ালিফিকেশন। তাদের নিয়ে কারো কোনো দ্বিধা নেই।
দ্বিতীয় টিমের দুইজন আগেই ঠিক হয়ে গেছে। বুশরা এবং মাহিকা। মাহিকা বুশরার এক বছরের সিনিয়র। দুজনের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভালো। কথা কম বলে, কিন্তু একে অপরের পয়েন্ট ধরতে পারে। বুশরা কেস বিল্ড করে, মাহিকা রিবাটালে ধারালো থাকে। তৃতীয় সদস্য নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
কমিটি মিটিংয়ে নামগুলো উঠল। কয়েকজনের নাম আলোচনা হচ্ছিল। হঠাৎ নোমানের নামও উঠল। বুশরা একটু অবাক হয়ে তাকাল। নোমান ক্লাবে আসে ঠিকই। ছোটখাটো প্র্যাকটিস রাউন্ডে মাঝে মাঝে কথা বলে। কিন্তু বড় কোনো ম্যাচে তাকে সে দেখেনি। ডিবেটার হিসেবে তার কোনো পরিচিতিও নেই বুশরার চোখে। ছেলেটা ক্লাবে এসে পা তুলে বসে, ফোন দেখে, হালকা কথা বলে। দায়িত্বকে কখনো সিরিয়াসলি নেয় বলে মনে হয় না। এমন মানুষের নাম ক্যান্ডিডেট হিসেবে উঠতে দেখে বুশরার ভ্রূ কুঁচকে গেল।
সিনিয়রদের মধ্যে একজন, আরিয়ান, বলল,
“নোমান ভালো করে। ওর চান্স আছে।”
বুশরা কিছু বলল না। মনে মনে বিরক্ত হলো। নোমান আর তার এক টিমে—এই চিন্তাটাই অস্বস্তিকর। ছেলেটা ক্লাবে এসে এমনভাবে আচরণ করে যেন সবকিছু হালকা। এমন মানুষকে নিয়ে বড় প্রতিযোগিতায় যাওয়াটা ঠিক মনে হচ্ছিল না। সে চেয়েছিল তৃতীয় সদস্য হিসেবে কেউ একজন সিরিয়াস, পরিচিত ডিবেটার আসুক। নোমান নয়।
শেষে সিদ্ধান্ত হলো, একটা বাছাই ডিবেট হবে। দশজন ক্যান্ডিডেট। একই টপিকের পক্ষে-বিপক্ষে পাঁচ মিনিট করে কথা বলবে। সিলেকশন কমিটি ভোট দিয়ে তৃতীয় সদস্য ঠিক করবে।
টপিক ঠিক হলো:
**“This House believes that social media has done more harm than good to modern relationships.”**
---
বাছাই রাউন্ডের দিন ক্লাব রুম ভরে গিয়েছিল। সামনে স্পিকারদের জন্য জায়গা, পেছনে দর্শক। বুশরা আর মাহিকা পেছনের সারিতে বসল। খাতা খুলে রাখল। কথা কম। শুধু পর্যবেক্ষণ।
প্রথম কয়েকজন ক্যান্ডিডেট কথা বলল। একজন খুব জোরে জোরে পয়েন্ট দিল, কিন্তু স্ট্রাকচার ছিল না। আবেগ দিয়ে ভরিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল। আরেকজন খুব সাবধানে কথা বলল, প্রতিটা শব্দ মাপজোখ করে, কিন্তু কোনো ধার ছিল না। তৃতীয়জন উদাহরণ দিতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলল। চতুর্থজন ভালো শুরু করল, কিন্তু মাঝপথে পয়েন্ট হারিয়ে ফেলল।
মাহিকা আস্তে বলল,
“দ্বিতীয়জনের কেস পরিষ্কার ছিল। কিন্তু অ্যাটাক নেই। শুধু ডিফেন্ড করছে।”
বুশরা মাথা নাড়ল।
“প্রথমজন শুধু আবেগ দিয়েছে। লজিক কম। তৃতীয়জন উদাহরণে ডুবে গেছে।”
এভাবে একটার পর একটা স্পিচ চলতে থাকল। বুশরা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। কে কী পয়েন্ট দিচ্ছে, কোথায় দুর্বলতা, কোথায় ওভারকনফিডেন্ট সব নোট করছিল। মাহিকাও মাঝে মাঝে মন্তব্য করছিল। দুজনেই প্রায় একমত হচ্ছিল বেশিরভাগ স্পিকার নিয়ে। কেউ কেউ ভালো বলছিল, কিন্তু ফেস্ট লেভেলের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে হচ্ছিল।
শেষের দিকে নোমান উঠল। বুশরা সোজা হয়ে বসল। মনে মনে একটা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল—ছেলেটা হালকা কথা বলবে, হাসবে, কোনো গভীর পয়েন্ট দিতে পারবে না। ক্লাবে সে যেমন আচরণ করে, স্পিচেও তেমনই হবে। নোমান মাইকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কোনো কাগজ নেই। হাত পকেটে। একটু চুপ করে থেকে শুরু করল। গলাটা স্থির। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সে বলল, সোশ্যাল মিডিয়া সম্পর্ককে ধ্বংস করেনি। সম্পর্কের ভিতরের অসততাকে শুধু দৃশ্যমান করেছে। আগে মানুষ লুকিয়ে রাখত। এখন লুকানোর জায়গা কমেছে। এটা ক্ষতি না, উন্মোচন। সে কয়েকটা উদাহরণ দিল—পুরনো সম্পর্কের ভণ্ডামি, নতুন সম্পর্কের স্বচ্ছতা, অতিরিক্ত এক্সপোজারের ভয়। লজিকাল কানেকশন পরিষ্কার রাখল। রিবাটালে আগের কয়েকজনের পয়েন্ট তুলে এনে ভেঙে দিল। শেষের দিকে বলল, আমরা সোশ্যাল মিডিয়াকে দোষ দিই কারণ নিজেদের দুর্বলতাকে স্বীকার করতে চাই না। সম্পর্কের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানো সহজ।
স্পিচ শেষে ঘরে একটু নীরবতা রইল। কয়েকজন মাথা নাড়ল।
মাহিকা আস্তে বলল,
“ভালো বলেছে। পয়েন্টগুলো পরিষ্কার। আর কনফিডেন্স আছে। গলার টোনও কন্ট্রোলড।”
বুশরা কিছু বলল না। খাতায় কলম ঘষছিল। মনে মনে খুঁত ধরতে চাইছিল। স্ট্রাকচার একটু লুজ ছিল হয়তো। উদাহরণ আরও মজবুত হতে পারত। শেষের লাইনটা একটু বেশি ড্রামাটিক মনে হয়েছে। কিন্তু যুক্তিগুলো দুর্বল ছিল না। এটা সে অস্বীকার করতে পারল না। ছেলেটা যেভাবে আগের স্পিকারদের পয়েন্ট তুলে ভেঙেছে, সেটা সহজ কাজ না।
মাহিকা আবার বলল,
“আমার মনে হয় ও ভালো ডিবেটার। আর একটু প্র্যাকটিস করলে ফেস্টের জন্য রেডি হয়ে যাবে। ওর মধ্যে একটা ন্যাচারাল ফ্লো আছে।”
বুশরা মাথা নাড়ল শুধু। মনে মনে বলল, কীভাবে সম্ভব? এতদিন তো দেখিনি। ছেলেটা ক্লাবে এসে এমন করে কথা বলে যেন সবকিছু হালকা। অথচ আজকের স্পিচে হালকা কিছু ছিল না। কোনো অতিরিক্ত হাসি ছিল না। কোনো অপ্রয়োজনীয় কথা ছিল না। শুধু পয়েন্ট। পরিষ্কার পয়েন্ট।
এই দ্বন্দ্বটা তার ভেতর চাপ সৃষ্টি করছিল। সে নোমানকে একটা ফ্রেমে ফেলে রেখেছিল হালকা, দায়িত্বহীন, সিরিয়াস নয়। আজকের স্পিচ সেই ফ্রেমটা কেঁপে দিয়েছে।
---
রেজাল্ট ঘোষণা হলো সন্ধ্যায়। নোমান নির্বাচিত।
বুশরা খবরটা শুনে চুপ করে থাকল। ভেতরে একটা অস্বস্তি চাপছিল। সে সিদ্ধান্ত নিল ক্লাব প্রেসিডেন্টের সাথে আলাদা করে কথা বলবে। আয়ানকে সে সম্মান করে। আয়ানের কথাবার্তায় একটা পরিপক্কতা আছে। তিনি কখনো হালকা করে কিছু বলেন না। তাই তার কাছে গিয়ে নিজের আপত্তিটা রাখাটাই যৌক্তিক মনে হলো।
প্রেসিডেন্টের অফিস রুমে গিয়ে দাঁড়াল বুশরা। আয়ান ল্যাপটপ দেখছিলেন। মাথা তুলে তাকালেন।
“বলো বুশরা।”
বুশরা সোজাসুজি বলল,
“স্যার, নোমানকে নেওয়াটা ঠিক হয়নি মনে হচ্ছে। ঢাকা ডিবেট ফেস্ট ছোট প্রতিযোগিতা না। এখানে দেশের সেরা টিমগুলো আসে। নোমান ক্লাবে তেমন ডিবেট করেনি। বড় মঞ্চে ভড়কে যেতে পারে। আমরা টিম হিসেবে দুর্বল হয়ে যাব।”
আয়ান চেয়ার ছেড়ে একটু হেলান দিয়ে বসলেন। চশমাটা সরিয়ে রাখলেন।
“তুমি ওকে কম চেনো।”
বুশরা চুপ করে থাকল। আয়ানের গলায় কোনো বিরক্তি ছিল না। শুধু একটা শান্ত নিশ্চয়তা।
আয়ান বললেন,
“নোমানকে আমি আগে থেকে চিনি। কলেজে ও খুব ভালো ডিবেটার ছিল। কলেজে এসে আরও ধারালো হয়। ঢাকার অনেক টপ ডিবেটারকে ও কলেজ-কলেজ লেভেলে ফেস করেছে। কয়েকজন তো এখন ইউনিভার্সিটি লেভেলেও নামকরা। ওদের কেউ কেউ এখনো বলে, নোমানকে আর্গুমেন্ট দিয়ে চাপানো মুশকিল ছিল। ওর একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল—পরিস্থিতি যত খারাপ হোক, গলার টোন কখনো ভাঙত না।”
বুশরা অবাক হয়ে তাকাল। আয়ান আবার বললেন,
“একবার আন্তঃকলেজ ফেস্টে ওর টিম ফাইনালে উঠেছিল। ও পজিশন থ্রি ছিল। শেষ স্পিচে পুরো কেসটা উল্টে দিয়েছিল। জজরা পরে বলেছিল, ওই স্পিচ না হলে ম্যাচটা অন্যভাবে যেত। আরেকবার একটা টিম ওকে টার্গেট করে ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছিল। নোমান হাসিয়ে উড়িয়ে দিয়ে শুধু লজিকে ফিরে গিয়েছিল। রেগে যায়নি। ওর ওই কন্ট্রোলটাই ওর শক্তি। অনেকেই ভালো কথা বলে। কিন্তু চাপের মুখে শান্ত থাকাটা আলাদা ব্যাপার।”
আয়ান একটু থেমে বললেন,
“ক্লাবে ও কম করে কারণ ও চায় না। না পারার জন্য না। তুমি ওকে শুধু ক্লাবের হালকা ভার্সন দেখেছ। আসলটা অন্য। ও যখন সিরিয়াস হয়, তখন অন্য মানুষ হয়ে যায়।”
বুশরা দাঁড়িয়ে শুনছিল। কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছিল। আয়ানকে সে বিশ্বাস করে। আয়ান কখনো অতিরঞ্জন করেন না। তাই নোমানের এই পুরনো পরিচয়টা তার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছিল। যে ছেলেটা ক্লাবে পা তুলে বসে, দায়িত্বকে হালকা করে, সেই ছেলেটা একসময় এতটা সিরিয়াস ডিবেটার ছিল—এই চিন্তাটা মানতে কষ্ট হচ্ছিল। আয়ানের মুখে নোমানের প্রশংসা শোনাটা আরও অদ্ভুত লাগছিল। কারণ আয়ান খুব কম মানুষের প্রশংসা করেন।
আয়ান শেষে বললেন,
“তুমি ওর সাথে টিম করবে। সুযোগ দাও। দেখো। আমি ভুল করছি না।”
বুশরা শুধু মাথা নাড়ল। আর কিছু বলল না। রুম থেকে বেরিয়ে করিডোরে এসে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে বাইরের আলো পড়ছিল। মনে মনে একটাই কথা ঘুরছিল—
ছেলেটা আসলে কী?
যতবার সে নোমানকে একটা ফ্রেমে ফেলতে চেয়েছে, ততবার ফ্রেমটা ভেঙে গেছে। আজকের দিনে আরও একবার ভাঙল। প্রথমে ক্লাব ডে-তে, তারপর আজকের স্পিচে, এখন আয়ানের মুখে।
বুশরা স্কার্ফ ঠিক করল। ব্যাগ কাঁধে নিল। হাঁটতে শুরু করল।
মনে মনে বিস্ময়টা চেপে রাখল। কিন্তু বিস্ময়টা থেকে গেল। একটা অস্বস্তিকর, অস্বীকার করা যায় না এমন বিস্ময়।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)