Thread Rating:
  • 35 Vote(s) - 3.49 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
WRITER'S SPECIAL লাভ এন্ড লাস্ট ইন ঢাকা (ধানী লংকা- আপডেট ৫)
#54
গ

ডিবেট ক্লাবের মিটিং রুমটা সেদিন একটু বেশি গরম লাগছিল। এসি চলছিল ঠিকই, কিন্তু মানুষের ভিড়ে বাতাস ভারী হয়ে গিয়েছিল। টেবিলের চারপাশে সাত-আটজন বসে। কেউ নোটবুক খুলেছে, কেউ ফোনে কিছু দেখছে। সামনের দেয়ালে হোয়াইটবোর্ডে লেখা Club Day Committee. বুশরা এসেছিল সময়মতো। সামনের দিকের চেয়ারে বসল। খাতা খুলে রাখল। কলম হাতে। মুখে কোনো বিশেষ অভিব্যক্তি নেই। শুধু মনোযোগ। নোমান এল একটু দেরি করে। দরজা দিয়ে ঢুকেই একটা চেয়ারে বসল। পা তুলে আরেকটা চেয়ারের ওপর রাখল। কেউ কিছু বলল না।


সভাপতি বলল, ক্লাব ডে-তে ডিবেট ক্লাবের বুথ কেমন হবে, কী কী লাগবে, কে কী দায়িত্ব নেবে এসব ঠিক করতে হবে। সবাই একটু একটু করে মতামত দিতে লাগল। কেউ বলল পোস্টার লাগবে বেশি। কেউ বলল ফ্রেশারদের জন্য ছোট ছোট ডিবেট গেম রাখা যেতে পারে। কেউ বলল স্যুভেনির দিলে ভালো হয়। বুশরা মাথা নিচু করে নোট নিচ্ছিল। মাঝে মাঝে চোখ তুলে শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল সবকিছু গুছোনো দরকার। কোনো কাজই এলোমেলো হওয়া উচিত না। সে একসময় বলল, বুথের ডিজাইন আগে ফাইনাল করা দরকার। তারপর দায়িত্ব ভাগ করা। নাহলে শেষ মুহূর্তে গোলমাল হবে। নোমান তখন ফোন থেকে চোখ তুলে বলল, ডিজাইন নিয়ে এত টেনশনের দরকার নেই। আগের বছর যেভাবে হয়েছিল, সেভাবেই চলবে। বেশি কিছু নতুন করার দরকার নেই। ফ্রেশাররা এলে কথা বলে টানলেই হয়।


বুশরার কলম এক মুহূর্ত থেমে গেল। সে মাথা তুলে নোমানের দিকে তাকাল। চোখে বিরক্তি। কিন্তু কিছু বলল না। সভাপতি আরেকজনের কথা শুনতে লাগল। বুশরা আবার নোট নিতে শুরু করল। কলমের চাপ একটু বেড়ে গিয়েছিল। পাতায় দাগ কাটাকাটি হচ্ছিল। মিটিং চলতে থাকল। দায়িত্ব ভাগ হতে লাগল। কেউ পোস্টার দেখবে, কেউ স্যুভেনির আনবে, কেউ বুথ সাজাবে। নোমানের নাম উঠল বুথ ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে। বুশরার নাম উঠল কনটেন্ট আর প্রমোশনাল ম্যাটেরিয়ালের দায়িত্বে। দুজনের কাজ আলাদা। কিন্তু মিটিংয়ের মাঝে মাঝেই তাদের মতের অমিল বেরিয়ে আসছিল।


নোমান বলল, ফ্রেশারদের জন্য খুব সিরিয়াস কিছু রাখার দরকার নেই। হালকা মজার ডিবেট টপিক রাখা ভালো। বুশরা মনে মনে বলল, ডিবেট ক্লাব মানেই তো সিরিয়াসনেস। মজা করতে করতে ক্লাবের মান নামিয়ে আনার দরকার নেই। কিন্তু সে মুখ খুলল না। শুধু খাতায় লিখে রাখলটপিক সিলেকশন নিয়ে পরে কথা বলতে হবে।


মিটিং শেষ হতে হতে বুশরার মুখটা শক্ত হয়ে গিয়েছিল। সে ব্যাগ গুছিয়ে উঠল। নোমানের দিকে আর তাকাল না। করিডোরে বেরিয়ে হালকা নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে রাগটা জমাট বাঁধছিল। ছেলেটা সবসময় এমনই। কোনো কিছুকেই সিরিয়াসলি নেয় না। আগের বছর যা হয়েছে তাই হবেএসব কথা সহজে বলে। অথচ ক্লাবের নামে যে দায়িত্ব, সেটা তার কাছে হালকা মনে হয়।


বুশরা সেদিন আর কাউকে কিছু বলল না। বাসায় গিয়েও মনে মনে সেই মিটিংটা ঘুরছিল। নোমানের পা তুলে বসা, ফোন দেখা, হালকা করে কথা বলা সবকিছু বুশরা কে ইরেটেট করছিল। ক্লাবের সবার সাথে নোমানের ভাল সম্পর্ক। তার উপর স্টার বাস্কেটবল প্লেয়ার হবার কারণে একটা আলাদা ট্রিটমেন্ট পায় নোমান। বুশরার এটা ভাল লাগে না। এটা ডিবেট ক্লাব। এখানে যদি কেউ আলাদা ট্রিটমেন্ট পায় সেটা পেতে পারে খালি ডিবেট পারফরমেন্সের জন্য। খেলার জন্য আলাদা ক্লাব তো আছে। তবে বুশরা জানে সবার সামনে কিছু বলা ঠিক হবে না। তাই রাগটা ভেতরে পুষে রাখল।

ক্লাব ডে-র দিন সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের ওপেন স্পেসটা ভরে গিয়েছিল। নর্থ বিল্ডিং আর সাউথ বিল্ডিংয়ের মাঝখানের জায়গায় সারি সারি বুথ। রঙিন কাপড়, পোস্টার, ব্যানার। ফ্রেশারদের ভিড়। কেউ বুথ ঘুরে দেখছে, কেউ ফর্ম তুলছে, কেউ ছবি তুলছে। মাইকে ঘোষণা হচ্ছে। গানের শব্দ ভাসছে। বাতাসে ধুলো আর ঘামের গন্ধ। রোদটা একটু একটু করে তীব্র হচ্ছিল।


ডিবেট ক্লাবের বুথটা মাঝামাঝি জায়গায়। সাদা-কালো থিম। পোস্টারে বড় করে লেখা Speak. Think. Lead. টেবিলের ওপর ক্লাবের পুরনো ট্রফিগুলো সাজানো। ফ্রেশারদের জন্য একটা ছোট রেজিস্ট্রেশন ফর্ম। পাশে কয়েকটা চেয়ার। বুথের সামনে একটা ছোট স্পেস খালি রাখা হয়েছিল, যাতে দু-একজন দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারে।

ক্লাব ফেস্টের দিন বুশরা এসেছিল হালকা পেস্তা রঙের সালোয়ার কামিজ পরে। কামিজটা হাঁটুর একটু ওপর পর্যন্ত, হাতা কনুই পর্যন্ত। গলাটা সামান্য খোলা। মাথায় সাদা স্কার্ফ, ঘাড়ের দুই পাশ দিয়ে আলগা করে ছেড়ে দেওয়া। কোনো গয়না নেই। শুধু কানে ছোট দুল। মুখে মেকআপ নেই। চোখে শুধু একটু ক্লান্তি আর মনোযোগ। নোমান তাকে দেখে একবার থেমে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল মেয়েটা সাধারণ পোশাকেও পরিপাটি লাগে। কোনো চটক নেই। তবে পোশাকের থেকে যেটা সবচেয়ে বেশি চোখে লাগে সেটা হলো বুশরার কনফিডেন্স। এতদিন দূর থেকে যেটাকে এরোগেন্স মনে হয়েছে আজকে সামনে থেকে সেটাকে কনফিডেন্স মনে হচ্ছে নোমানের। মনে মনে নোট করে নিল পয়েন্টটা।


আর নোমান সেদিন পরেছিল কালো স্লিম-ফিট জিন্স আর সাদা পোলো শার্ট। শার্টের হাতা একটু ভাঁজ করা। কব্জিতে কালো ঘড়ি। চুল আগের মতোই এলোমেলো, কিন্তু ইচ্ছে করে এমনই রাখা। জুতো পরিষ্কার। গায়ে হালকা পারফিউম। বুশরা তাকে দেখেছিল চোখের কোণ দিয়ে। মনে হয়েছিল শার্টটা তার গায়ে মানিয়েছে। কালো আর সাদার কনট্রাস্ট ভালো লাগছে। কিন্তু ক্লাব ডে-তে এতটা ক্যাজুয়াল কেন? একটু ফরমাল কিছু পরলেই পারত। মনে হয় সবকিছুকেই এত হালকা করে দেখে। গুরুত্ব দেয় না কোনো অনুষ্ঠানকে। সে চোখ সরিয়ে নিয়েছিল দ্রুত। কিন্তু ভাবটা মনে থেকে গিয়েছিল।

বুশরা সকাল থেকেই বুথে ছিল। পোস্টার ঠিক করে দিয়েছে। ফর্মগুলো গুছিয়ে রেখেছে। কেউ এলে হাসতে হাসতে কথা বলছে। ক্লাবের ব্যাপারে বলছে। তার কণ্ঠস্বর পরিষ্কার। কোনো অতিরিক্ত উত্তেজনা নেই। শুধু দায়িত্ব। মাঝে মাঝে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। সবকিছু সময়মতো চলছে কিনা দেখছিল।
নোমান এল একটু পরে। হাতে কফি। চুল এলোমেলো। সে বুথের একপাশে দাঁড়াল। ফ্রেশারদের সাথে কথা বলতে শুরু করল। সহজে। হাসতে হাসতে। কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিল। কেউ দ্বিধা করলে উৎসাহ দিল। বুশরা মাঝে মাঝে চোখের কোণ দিয়ে দেখছিল। ছেলেটা কথা বলতে পারে। মানুষ টানতে পারে। এটা সে অস্বীকার করতে পারছিল না। তবুও মনে মনে বলছিল, কথা বলা আর দায়িত্ব পালন করা এক কথা না।
দুপুরের দিকে প্রথম সমস্যাটা হলো। বুথের ব্যানারটা হঠাৎ কেউ ঠেলে দেওয়ায় একদিক দিয়ে খুলে গেল। হাওয়ায় উড়তে শুরু করল। দুইজন জুনিয়র ধরার চেষ্টা করল। পারল না। ব্যানারটা আরও খুলে যাচ্ছিল। আশেপাশের বুথ থেকে লোকজন তাকিয়ে দেখছিল। একটু গোলমাল পাকতে যাচ্ছিল। কেউ কেউ হাসছিল। কেউ ফোন বের করে ভিডিও তোলার ভান করছিল। তবে ঠিক হেল্প করছিল না কেউ।  বুশরা এগিয়ে গেল। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারছিল না। টেপ কোথায় রাখা আছে মনে করতে পারছিল না। জুনিয়ররা হাতপাখা করছিল। অন্য ক্লাবের একজন পাশ থেকে টিপ্পনি কেটে বলছিল, ডিবেটের ব্যানার তর্কের জোরে হারিয়ে গেল মনে হয়। একটা হাসির রোল উঠল ভীড়ে।


নোমান তখন কফি রেখে এগিয়ে এল। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সে ব্যানারটার খুলে যাওয়া অংশটা ধরল। চারপাশ দেখল। তারপর বুথের পেছন থেকে একটা চেয়ার টেনে আনল। চেয়ারের ওপর উঠে ব্যানারটার উপরের অংশটা আবার আটকানোর চেষ্টা করল। হাতের কাছে যে টেপটা পড়েছিল, সেটা তুলে নিল। দ্রুত কিন্তু পরিপাটিভাবে আটকে দিল। তারপর নেমে এসে ব্যানারটার নিচের অংশটাও ঠিক করে দিল। পুরো কাজটা পাঁচ মিনিটের মধ্যে শেষ। কোনো অতিরিক্ত কথা নেই। কোনো অভিযোগ নেই।


ফ্রেশাররা হাততালি দিল। জুনিয়ররাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। নোমান শুধু কাঁধ ঝাঁকাল। আবার কফি হাতে নিল। বুথের একপাশে গিয়ে দাঁড়াল। যেন কিছুই হয়নি। বুশরা দাঁড়িয়ে দেখছিল। তার মুখে কোনো হাসি আসেনি। কিন্তু চোখে একটা অবাক ভাব ছিল। ছেলেটা এতক্ষণ হালকা কথা বলছিল। মনে হচ্ছিল কোনো কিছুতেই মন নেই। অথচ সমস্যা হতেই সে শান্তভাবে সামলে নিল। কোনো হট্টগোল করেনি। কোনো অভিযোগ করেনি। শুধু কাজটা করেছে। ভালোভাবে করেছে। রাগটা একটু কমল। পুরোপুরি না। কিন্তু একটু।

বেশ কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় সমস্যাটা এল। একদল ফ্রেশার বুথের সামনে জড়ো হয়েছিল। তারা ডিবেট ক্লাবে নাম লেখাতে আগ্রহী। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন ফর্মের প্রিন্টেড কপি ফুরিয়ে গিয়েছিল। ক্লাবের জুনিয়ররা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। কেউ বলছিল ল্যাপটপ থেকে নতুন করে প্রিন্ট নিতে হবে। কেউ বলছিল অফিসে গিয়ে কপি আনতে হবে। ভিড় বাড়ছিল। কয়েকজন ফ্রেশার অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হচ্ছিল। কেউ কেউ অন্য বুথের দিকে পা বাড়াচ্ছিল।


বুশরা তখন অন্য একদলকে ক্লাবের ব্যাপারে বলছিল। সে দিকে মনোযোগ দিতে পারছিল না। জুনিয়ররা তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সাহায্য চাইছিল। কিন্তু বুশরা তখন ব্যস্ত। নোমান আবার এগিয়ে এল। সে জুনিয়রদের একজনকে বলল ল্যাপটপ খুলে দিতে। তারপর নিজের ফোন থেকে হটস্পট চালু করল। দ্রুত একটা গুগল ফর্ম খুলে ফেলল। আগের ফর্মের প্রশ্নগুলো মনে করে মোটামুটি তুলে দিল। লিংকটা বের করে একজন জুনিয়রকে দিল। বলল, এই লিংকটা সবাইকে স্ক্যান করে দাও। যারা নাম লেখাতে চায়, এখনই লিখে ফেলতে পারবে। পরে প্রিন্টেড কপি এলে মিলিয়ে নেওয়া যাবে। জুনিয়ররা তাড়াতাড়ি কিউআর কোড বের করল। ফ্রেশাররা ফোন বের করে স্ক্যান করতে লাগল। ভিড়টা আবার শান্ত হলো। কেউ আর চলে গেল না। কয়েকজন তো তখনই নাম লিখে ফেলল।


নোমান আবার পেছনে সরে গেল। কোনো কৃতিত্ব নেওয়ার ভান নেই। শুধু কাজটা হয়ে গেছে দেখে নিশ্চিন্ত। বুশরা এবার পুরোপুরি দেখছিল। প্রথমবার ব্যানার ঠিক করার সময় সে অবাক হয়েছিল। এবার আরও বেশি। ছেলেটা শুধু শারীরিক কাজই পারে না। মাথাও খাটায়। সমস্যা দেখলে পথ বের করে। কোনো নাটক করে না। কোনো বড় বড় কথা বলে না। শুধু করে। তার মনে হলো, হয়তো ছেলেটা পুরোপুরি অকাজের না। দায়িত্ব পেলে পারে। শুধু চায় না সবসময় দায়িত্ব নিতে। এই চিন্তাটা তার রাগটাকে আরও একটু কমিয়ে দিয়েছিল। পুরোপুরি মুছে যায়নি। কিন্তু ধারটা কমে গিয়েছিল।

বেশিক্ষণ পর নোমান বুথের একপাশে দাঁড়িয়ে ফ্রেশারদের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার নজর গেল বুশরার দিকে। বুশরা তখন তিনজন ফ্রেশার মেয়ের সাথে কথা বলছিল। গলা খুব জোরে না। কিন্তু পরিষ্কার। সে শুধু ক্লাবের কথা বলছিল না। শুনছিলও। মেয়েরা যখন দ্বিধা করছিল, বুশরা তাড়াহুড়ো করছিল না। ধীরে ধীরে বুঝিয়ে বলছিল কেন ডিবেট ক্লাবে থাকাটা কাজে লাগে। শুধু প্রতিযোগিতা না। কথা বলার সাহস, লজিক্যালি চিন্তা করা, মানুষের সামনে দাঁড়ানো এসবের কথা বলছিল। মেয়েগুলো মন দিয়ে শুনছিল। একসময় তারা হাসল। নাম লেখানোর কথা বলল।


নোমানের মনে হলো, মেয়েটা শুধু পড়াশোনায় ভালো এটাই তার আগের ধারণা ছিল। ভালো রেজাল্ট, নিয়মকানুন, সিরিয়াস ফেস। এসব দেখেই সে ভেবেছিল বুশরারা শুধু বইয়ের পৃথিবীতে থাকে। মানুষের সাথে মেশা, টানা, সাজানো এসব তাদের কাজ না। কিন্তু এখন দেখছিল অন্য ছবি। বুশরা বুথের টেবিলটা নিজে গুছিয়ে দিয়েছিল। ট্রফিগুলো এমনভাবে সাজিয়েছিল যাতে সামনে থেকে সুন্দর দেখায়। পোস্টারের একটা কোণ উল্টে গিয়েছিল, সে নিজে গিয়ে ঠিক করে এসেছিল। ফ্রেশারদের সাথে কথা বলার সময় কোনো কৃত্রিম উত্তেজনা নেই। অথচ মানুষ থেমে যাচ্ছে। শুনছে।


নোমান একটু অবাক হলো। তার ধারণাটা ভুল ছিল হয়তো। ভালো ছাত্রী মানেই শুধু পড়াশোনাএ টা সবসময় ঠিক না। মেয়েটার মধ্যে একটা অন্যরকম দক্ষতা আছে। মানুষকে বোঝানোর। জায়গাটাকে পরিপাটি রাখার। কথা বলে টানার। সে কফি থেকে চোখ না সরিয়েই ভাবল, এতদিন শুধু বিরক্তিই দেখেছে মেয়েটার মধ্যে। নিয়ম নিয়ে কথা, রাগ, কঠোর মুখ। অথচ আজ অন্য কিছুও দেখা যাচ্ছে। এই অবাক হওয়াটা তার কাছে অচেনা লেগেছিল। সে সাধারণত ভালো ছাত্রীদের দিকে বেশি খেয়াল করে না। করেও না। কিন্তু আজ খেয়াল করতে হয়েছিল। বুশরা তখন আরেকদল ফ্রেশারের সাথে কথা বলছিল। নোমান আর তাকিয়ে রইল না। মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু মনে মনে কথাটা থেকে গেল মেয়েটা শুধু পড়াশোনায় ভালো না। অন্য কিছুও পারে।

সেদিন আবিদের আসার কথা ছিল। সকালে মেসেজ করেছিল। ক্লাব ডে দেখতে যাবে। দুপুরের দিকে আরেকটা মেসেজ এল। বাসায় একটা জরুরি কাজ পড়েছে। মায়ের সাথে বাইরে যেতে হবে। আসতে পারবে না। বুশরা মেসেজটা পড়ে শুধু লিখল ঠিক আছে।


আর কিছু বলল না। মনে মনে একটু খারাপ লাগল। আবিদ থাকলে ভালো লাগত। কিন্তু সে জানত আবিদ এমনিতেই দায়িত্বশীল। বাসার কাজ থাকলে আগে সেটাই করবে। যদিও আবিদ না আসায় একটু হতাশ হয়েছে তবে আবিদের এই দ্বায়িত্বশীলতা বুশরার পছন্দ।


নরমালি যারা থার্ড ইয়ারে থাকে তাদের দ্বায়িত্ব বেশি থাকে ক্লাব ডে তে। ফাইনাল ইয়ারের লোকজন একটু ইজি থাকে। জুনিয়ররা ঠিক সব বুঝে উঠতে পারে না। ফলে সেদিন বুথের সামনে বুশরা আর নোমানই বেশিক্ষণ ছিল। আবিদ আসেনি। তিনজনের একসাথে দেখা হয়নি। শুধু দুজন। পাশাপাশি। একই বুথে। একই ক্লাবের দায়িত্বে। অথচ তাদের মধ্যে এখনো একটা অদৃশ্য দূরত্ব। রাগ আর অবাক হওয়ার মিশেল। দুজনের দিক থেকেই।সন্ধ্যা নামার আগে বুথ গুছোনো শুরু হলো। নোমান চেয়ার সরিয়ে দিচ্ছিল। বুশরা ফর্মগুলো গুছিয়ে ব্যাগে রাখছিল। দুজনে কথা বলছিল না। শুধু কাজ করছিল। মাঝে মাঝে চোখ পড়ছিল একে অপরের দিকে। তারপর সরে যাচ্ছিল।


বুশরার মনে সেদিনের কয়েকটা ছবি থেকে গেল। একটা মিটিং রুমে নোমানের হালকা মনোভাব। আরেকটা ব্যানার ঠিক করার সময় তার শান্ত দক্ষতা। তৃতীয়টা ফর্ম ফুরিয়ে গেলে হটস্পট ধরিয়ে গুগল ফর্ম বানিয়ে দেওয়া। তিনটে ছবি পাশাপাশি। মিলছে না সহজে। অথচ তিনটেই সত্যি। নোমানের মনেও কয়েকটা ছবি থেকে গেল। বুশরা ফ্রেশারদের সাথে কথা বলছে। বুথ সাজাচ্ছে। পোস্টার ঠিক করছে। মানুষ থামিয়ে রাখছে। তার আগের ধারণাটা একটু কেঁপে গিয়েছিল। সে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে এল। পেছনে নোমান এখনো বুথ গুছাচ্ছিল। বুশরা আর ফিরে তাকাল না। কিন্তু মনে মনে একটা কথা বলল ছেলেটা অকাজের না হয়তো। শুধু অন্যরকম। আর সেই অন্যরকমটাই তার কাছে এখনো বিরক্তিকর। আর একটু অবাক করার মতোও বটে। নোমানও পেছন ফিরে তাকাল না। কিন্তু মনে মনে বলল মেয়েটা শুধু পড়াশোনায় ভালো না। অন্য কিছুও পারে। এটা সে আগে ভাবেনি।


দুজনেরই মনে সেদিন একটু করে ছবি বদলেছিল। খুব বেশি না। শুধু একটু।
[+] 8 users Like কাদের's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: লাভ এন্ড লাস্ট ইন ঢাকা (ধানী লংকা- আপডেট ২) - by কাদের - 07-10-2026, 08:15 PM



Users browsing this thread: 2 Guest(s)