07-10-2026, 08:13 PM
(This post was last modified: 07-10-2026, 08:16 PM by কাদের. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
আপডেট ৩
ক
বুশরার সকাল শুরু হয় অনেক আগে। আজানের আওয়াজ শুনে চোখ খোলে। বিছানা থেকে উঠে ওজু করে নামাজ পড়ে। তারপর একটু সময় নিয়ে বসে থাকে। জানালা দিয়ে বাইরের আলো ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকতে থাকে। উত্তরার এই ফ্ল্যাটটা ছোট। দুই রুমের। বাবা-মা অন্য রুমে। বুশরা নিজের রুমেই সব করে। পড়ার টেবিলটা জানালার পাশে। বইগুলো গুছানো। খাতাগুলো সাজানো। কোনো জিনিস এলোমেলো থাকে না। নাশতা করে ক্যাম্পাসের দিকে বেরোয়। রাস্তায় গাড়ির ভিড়। রিকশাওয়ালারা চিৎকার করে। বুশরা হেডফোন লাগায় না। বাইরের শব্দ শুনতে শুনতে যায়। মনে মনে আজকের কাজগুলো সাজায়। কোন ক্লাসে কোন টপিক, কোন অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে, লাইব্রেরিতে কতক্ষণ বসবে। সবকিছু মাথায় গুছানো থাকে।
ক্যাম্পাসে ঢুকলেই তার হাঁটার গতি একটু বদলে যায়। আরও পরিপাটি। স্কার্ফ ঠিক করে নেয়। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সোজা ক্লাসের দিকে যায়। সামনের সারিতে বসে। নোট নেয়। প্রফেসরের চোখের দিকে তাকায়। কেউ পাশে কথা বললে বিরক্ত হয়। মনে হয় সময় নষ্ট হচ্ছে। পড়াশোনা তার কাছে শুধু নম্বরের ব্যাপার না। এটা তার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রমাণ। যে নিয়ম মানে, সে এগিয়ে থাকে। যে মানে না, সে পিছিয়ে পড়ে। এই বিশ্বাসটা তার ভেতর গভীরভাবে গেঁথে আছে।
লাইব্রেরিতে বসলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। চারপাশের মানুষগুলো তার কাছে অস্পষ্ট হয়ে যায়। শুধু বইয়ের পাতা আর নিজের খাতা। মাঝে মাঝে চোখ তুলে দেখে কেউ চেনা মুখ আছে কিনা। সাদিয়া এলে একটু কথা হয়। কিন্তু বেশি নয়। পড়া শেষ না হলে উঠতে চায় না।
বাসায় ফিরে আবার পড়া। রাতের নামাজ। তারপর আবিদের ফোন। প্রতিদিন প্রায় একই সময়। কথাগুলো শান্ত। কোনো অতিরিক্ত আবেগ নেই। কোনো জোরে হাসি নেই। শুধু দিনের কাজকর্ম শেয়ার। আবিদ তার কথাগুলো মন দিয়ে শোনে। বুশরাও শোনে। এই নিয়মিত কথাটা তার দিনের শেষের একটা স্থির বিন্দু। যেন সবকিছু ঠিকঠাক জায়গায় আছে। বুশরার জীবনটা এমনই। পরিষ্কার রেখায় আঁকা। কোনো বাঁক নেই। কোনো হঠাৎ করে বদলে যাওয়ার জায়গা নেই। সে নিজেও চায় না। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ তার কাছে স্বাধীনতার চেয়ে বড়।
নোমানের সকাল অন্যরকম। ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়। ক্লাস না থাকলে অনেক সময় দুপুর পর্যন্ত ঘুমায়। ফোনের ভাইব্রেশন বা বন্ধুদের কল তাকে তোলে। চোখ খুলেই প্রথমে মেসেজ চেক করে। কেউ রাতের কথা মনে করাচ্ছে, কেউ আজকের প্ল্যান জিজ্ঞেস করছে। উঠে গিয়ে গোসল করে। আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চুল ঠিক করে। শার্ট বেছে নেয়। সে জানে কোন পোশাকে কেমন দেখায়। ফ্যাশন তার কাছে শখের ব্যাপার না। এটা তার পরিচয়ের একটা অংশ।
ক্যাম্পাসে এসে সোজা কোনো এক জায়গায় বসে যায়। কখনো বয়েজ লাউঞ্জ, কখনো প্লাজার বেঞ্চি। ক্লাসে যায় মাঝে মাঝে। যে ক্লাসগুলোতে অ্যাটেনডেন্স বাধ্যতামূলক, সেগুলোতে যায়। বাকিগুলোতে যায় না। পড়াশোনা তার কাছে বাধ্যবাধকতা। ভালো রেজাল্টের কোনো তাগিদ নেই। সিজিপিএ তিনের কাছাকাছি থাকলেই চলে। বাবা-মা রাগ করে। সে শোনে, মাথা নাড়ে, তারপর নিজের মতো করে চলে।
বিকেল হলে খেলার মাঠে যায়। বাস্কেটবল। শরীর যখন ঘামে ভিজে যায়, তখন মনে হয় জীবনটা হালকা। মাঠে কেউ তাকে প্রশ্ন করে না পড়াশোনা নিয়ে। কেউ বলে না তুমি আরও ভালো করতে পারো। শুধু খেলা। জেতা বা হারা। তারপর গোসল। বন্ধুদের সাথে গল্প। মেয়েদের দিকে তাকানো। কেউ তাকালে হাসি। কেউ এগিয়ে এলে কথা।
রাতের বেলা তার সময় অন্যরকম কাটে। কখনো বন্ধুদের সাথে ঘোরা। কখনো কারো ফ্ল্যাটে। কখনো একা। রিমার সাথে দেখা হলে রাত দীর্ঘ হয়। শরীরের ক্ষুধা মেটানো। কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। কোনো আগামীকালের কথা নেই। শুধু সেই মুহূর্ত। যখন শরীরগুলো একে অপরের কাছাকাছি আসে, তখন আর কিছু ভাবতে হয় না। পরে ঘুমিয়ে পড়ে। সকালে উঠে আবার একই চক্র।
নোমানের জীবনে কোনো কঠিন রেখা নেই। সবকিছুই একটু এদিক ওদিক। নিয়ম ভাঙা তার কাছে দোষের কিছু না। বরং নিয়ম মানলে মনে হয় বন্দি হয়ে যাচ্ছে। সে চায় প্রতিদিন একটু অন্যরকম কাটুক। নতুন মুখ, নতুন গল্প, নতুন স্পর্শ। ভালোবাসা তাকে ভয় দেখায়। কারণ ভালোবাসা মানে দায়িত্ব। দায়িত্ব মানে বাঁধন। আর বাঁধন সে এখনো চায় না।
দুজন মানুষ। একই ক্যাম্পাস। একই শহর। একজন নিয়মের মাঝে জীবন কে সাজাতে ভালোবাসে। অন্যজন মুক্তির মাঝে জীবনের আনন্দ খুজে। একজন ভবিষ্যৎকে পরিষ্কার দেখতে চায়। অন্যজন বর্তমানকেই যথেষ্ট মনে করে। বুশরা যখন রাতে আবিদের সাথে কথা বলে, তখন তার মনে হয় সবকিছু জায়গামতো আছে। তার জীবনের গতিপথ সঠিক রাস্তায় আছে। নোমান যখন রাতে কারো সাথে শুয়ে থাকে, তখন তার মনে হয় তার জীবটা সঠিক পথে আছে। তার এমন জীবন চাই। যেখানে আনন্দ আছে, উপভোগ আছে কিন্তু দ্বায়িত্ব নেই। দুজনেরই নিজস্ব বলয় আছে। নিজস্ব বলয়ে তারা সুখী। কিন্তু আসলে কি তাদের জীবনে কিছুর অভাব নেই? এই দুই বৃত্ত কি কখনো পরষ্পর কে স্পর্শ করবে? হয়তো নিজেদের অজান্তে বুশরা নোমানের বৃত্ত ক্যাম্পাসের সংকীর্ণ গন্ডিতে কাছে চলে আসছে।



![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)